বেইমান বাটকারা – প্রেমেন্দ্র মিত্র

বেইমান বাটকারা – প্রেমেন্দ্র মিত্র

‘একটা বাটকারা।’

‘বাটকারা?’

‘হ্যাঁ, বাটকারা বোঝো না? যাকে দাঁড়িপাল্লা বলে।

‘বাটকারাও বুঝি দাঁড়িপাল্লাও বুঝি; কিন্তু দাঁড়িপাল্লা নিয়ে তুমি করবে কি?’-

রীতিমত বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘অনেক রকম গোয়েন্দাগিরির কথা শুনেছি, কিন্তু খুনের কিনারা করতে দীঁড়িপাল্লার কথা কখনো শুনি নি! আর দাঁড়িপাল্লার যদি তোমার কবিতার মিল চাও তো বলে দিচ্ছি, মাঝিমাল্লা বাকতাল্লা যেটা খুশি লাগাতে পারো!’

কথাটা যে স্বনামধন্য গোয়েন্দা কবি পরাশর বর্মার সঙ্গে হচ্ছিল, তা নিশ্চয় বলে দিতে হবে না। কোথায় কেন কিভাবে হচ্ছিল ‘তারই একটু একবার বলতে হয়।

সত্যিই একটা খুনের রহস্যের মীমাংসা করার মধ্যে পরাশরের ওই আজগুবি বায়না।

গোয়েন্দারা সাধারণত এই রকম এলোমেলো কথা বলে, কি গল্পের বইয়ে কি সত্যিকার জীবনে পাঠক বা সঙ্গীদের গুলিয়ে দেয়-এটা কিছু নতুন ব্যাপার নয়। শার্লক হোমস থেকে শুরু করে, কাঁচা পাকা সব গোয়েন্দার ধরনই এই।

পরাশর কবিতা যত অদ্ভুতই লিখুক, গোয়েন্দাগিরিতে এই সনাতন ধারা থেকে আলাদা নয়।

খানিকটা আমায় একটু বোকা বানাবার জন্যেও হয়তো সে ওরকম গোলমেলে কথা বলে।

কিন্তু কোথায় সেকেন্দ্রাবাদের ধনকুবের ছোটিরাম বজৌরীর রহস্যজনক হত্যা আর কোথায় দীড়িপাল্লার খৌঁজ-মাপ করার পক্ষে এটা গোয়েন্দার সাত-খুনের ওপর আট-খুন হয়ে যাচ্ছে নাকি!

হায়দ্রবাদের খুনের রহস্যের কিনারা করতেই আমরা আসিনি। এসেছিলাম ক’দিনের জন্যে বেড়াতে। কিংবা কলিকাতার নাগাড়ে একঘেয়ে বৃষ্টি এড়াতে বলা যেতে পারে।

এসে এই খুনের ব্যাপারে পরাশরকে মাথা লাগাতে হয়েছে।

এখানকার গোয়েন্দা-বিভাগের রেড্ডি সাহেব পরাশরের পুরানো বন্ধু। তিনিই পরাশরের পরামর্শ নিতে একদিন এসেছেন আমাদের হোটেলে।

হায়দ্রাবাদ স্টেশনের কাছেই একটা মাঝারি গোছের হোটেলে আমরা দু-কামরার একটা স্যুইট নিয়ে আছি। এমন কিছু আহামরি হোটেলেও নয়। কিন্তু শহরের এইরকম বুকের ওপর বসে থাকতেই পরাশর ভালোবাসে। এতে তার নাকি কবিতা আসে ভালো।

ইতিমধ্যে সে কতগুলো কবিতা লিখে ফেলেছে জানি না। আমাকে এখনো শুনতে বসতে হয়নি এই আমার সৌতাগ্য। পরাশর হোটেল থেকে বড়-একটা বেরোয় না। আমাদের দোতলার বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে তার কবিতার খোরাক জোগাড় করে। আমি ইতিমধ্যে হায়দ্রাবাদের যা কিছু দ্রষ্টব্য সালারজঙ মিউজিয়াম থেকে গোণলকুণ্ডা দুর্গ প্রায় সবই দেখে ফেলেছি।

হায়দ্রাবাদ থেকে এতদিনে হয়তো ফিরেই যেতাম। কিন্তু হঠাৎ দেশজোড়া রেলের ধর্মঘটে আটকে পড়তে হয়েছে।

আটকে না পড়লে বজৌরী হত্যারহস্যের মীমাংসা হতে! কিনা সন্দেহ।

রেড্ডি সাহেব দেখা করতে এসে সেদিন বিকেলে সংক্ষেপে সমপ্ত ব্যাপারটা জানালেন।

ছোটিরাম বজৌরী হায়দ্রাবাদের একজন ধনুকুবের। লোকটি কিন্তু অডুত প্রকৃতির। টাকার কুমীর হয়েও হাড়-কুঞ্জুস যাকে বলে। হায়দ্রাবাদেরই জোড়া শহর সেকেন্দ্রাবাদে একটা সাধারণ বাড়িতে থাকতেন। বাড়িটা দেখতে সাধারণ, কিন্তু কয়েকটা বিশেষত্ব আছে! সমস্ত বাড়িতে মাত্র তিনটি ঘর, একটিতে বজৌরী নিজে থাকতেন। আর একটিতে তাঁর প্রধান উত্তরাধিকারী ও ভাগ্নে রামসহায়। বাড়িতে এক বজৌরীর ঘরে ছাড়া বড় জানালা কোথাও নেই। সে জানালাটা থাকা একটু বিচিত্র, কারণ বাড়ির অন্য দরজা-জানালা প্রায় সেকেলে দুর্গের দরজা-জানালার মত ক্ষুদে ক্ষুদে ও মজবুত। সে দরজা দিয়ে মাথা নীচু করে ছাড়া সাধারণ মাপের লোক গলতে পারে না। সংকীণ জানলা দিয়ে আকাশের আলোকেও ভয়ে ভয়ে ঢুকতে হয়।

শুধু বজৌরীর নিজের ঘরের জানালাটা যেমন প্রশস্ত তেমনি শুধু মোটা দামী কাচের সার্শি দিয়ে আঁটা। এত সাবধান হয়েও বজৌরীকে শুধু এই খেয়ালটুকুর জন্যেই প্রাণ দিতে হয়েছে। তাঁর ওই কাচের সার্শি দেওয়া জানালাই ভেঙে কেউ কয়েক দিন আগে রাত্রে ঢুকে তাঁকে হত্যা করে গেছে। সে হত্যাকারী কে হতে পারে, বোঝা এইজন্যেই দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে হাড়-কুঞ্জুস হলেও খুন করবার মত শত্রুতা দুনিয়ায় কারুর সঙ্গে ছিল না। যে দুজনের ওপর কোনোরকম সন্দেহ আসতে পারে, তাদের একজন রামসহায় আর একজন রঘুনাথ নামে বজৌরীর আর এক ভাগ্নে! কিন্তু রঘুনাথ সেদিন হায়দ্রাবাদেই ছিল না বলে প্রায় অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে। তা ছাড়া বয়সে এখনও এরকম যুবক হলেও চেহারায় সে একটি জলহস্তী বিশেষ। তার পক্ষে জানলার সার্শি ভেঙে ঢোকা অসম্ভব বললেই হয়।

বাড়ির মধ্যে একা রামসহায়ই ছিল! তার ঘর যদিও আলাদা আর বজৌরী যদিও নিজের ঘরে প্রতিদিন খিল দিয়ে শুতেন, তবু সন্দেইটা স্বভাবিকভাবে তার ওপরই পড়েছে বেশি করে। কিন্তু মুস্কিল হয়েছে এই যে, মামা বজৌরীকে হত্যা করবার উদ্দেশ্যই তার বেলায় পাওয়া যাচ্ছে না। মারা যাওয়ার চেয়ে মামা বেঁচে থাকলেই তার লাভ বেশি। বজৌরীর ওই দুই ভাগ্নে ছাড়া তিনকুলের কেউ নেই। ভাগ্নের মধ্যে রামসহায়ই তাঁর প্রিয়! বছর দুই থেকে অন্য ভাগ্নে রঘুনাথের ওপর তিনি খাপ্পা হয়েই আছেন। রঘুনাথকে তাই বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় থাকতে হয়। রামসহায় শুধু মামার সঙ্গে থাকে তা নয়, বজৌরীর বিষয়-আশয় ব্যবসা দেখা-শোনার সব ভার তার ওপরে। বজৌরী বছর কয়েক আগে উইল করে, দুই ভাগ্নেকে সমানভাবে তাঁর সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করেছিলেন বটে, কিন্তু সে উইল্‌ও তিনি সম্প্রতি সপ্তাইখানেক আগে নাকি বদলাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন তাঁর ঘরের উকিল ইফতিকার সাহেবের কাছে। উইল বদলাবার ইচ্ছে যে কেন, তা বুঝতে কারও বাকি থাকেনি। সমানভাবে রঘুনাথ ও রামসহায়কে উত্তরাধিকারী করার বদলে রামসহায়কেই তিনি নিশ্চয় তাঁর সব কিছু দিয়ে যেতে মনস্থ করেছিলেন। সুতরাং উইল বদলাবার আগে তাঁর এই মুত্যু আর যারই হোক রামসহায়ের বাঞ্ছনীয় হওয়ার কথা নয়। এ মৃত্যুতে সুবিধে যা কিছু হয়েছে তা রঘুনাথের।

একজনের বেলায় সুবিধে থাকলেও কারণ ও উদ্দেশ্যের অভাব, আর অপরজনের বেলায় উদ্দেশ্য ও কারণ থাকলেও সুবিধের ও প্রমাণের অভাব, এই দুই সমস্যা-সঙ্কটের মধ্যে পড়ে রেড্ডি সাহেব পরাশরের কাছে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন।

সমস্ত শুনে আমি অবশ্য একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘এই দুই ভাগ্নে ছাড়া সন্দেহ করবার মত লোক কি আর কেউ নেই? এমনও তো হতে পারে যে, কোনো বদমাস গুণ্ডা কাচের জানলা ভেঙে ঢুকে বজৌরীকে খুন করে গেছে?

কথাটা তুলে বেশ একটু গর্বভরেই রেডিড ও পরাশরের দিকে চেয়েছিলাম। এই সম্ভাবনার কথা পরাশরের অন্তত ভাবা উচিত ছিল।

পরাশর কিন্তু লজ্জিত হওয়ার বদলে কেমন একটু কৌতুকভরেই আমার দিকে চেয়ে বলেছিল, ‘রেড্ডি সাহেবের মাথায় কি ওরকম সম্ভাবনার কথা আসেনি মনে করো? নেহাৎ বাজে বানানো গোয়েন্দা-গল্পে ছাড়া পুলিশ অত আহাম্মক হয় না।’

রেড্ডি সাহেব হেসে আমাকেই যেন সান্তনা দিতে বলেছিলেন, ‘না না, পুলিশও ভুল করে বইকি! তবে এক্ষেত্রে ওরকম ভুল আশা করি হয়নি। বাইরের কোনো খুনে বদমাসেরও বজৌরীকে খুন করার একটা কোনো উদ্দেশ্য তো থাকা দরকার! শুধু হায়দ্রাবাদ সেকেন্দ্রাবাদ নয়, এ অঞ্চলের কারুর জানতে বাকি নেই যে, বজৌরী পয়সা-কড়ির ব্যাপারে যেমন কুঞ্জুস তেমনি হুসিয়ার ছিলেন। বাড়িতে তিনি দু-দশ টাকার বেশি কখনও রাখতেন না। প্রতিদিন ব্যাঙ্ক থেকে চেক ভাঙিয়ে এনে তাঁর সংসার খরচ চলতো। সেই দু-দশ টাকার লোভে কাচের জানালা ভেঙে তাঁকে খুন করার ঝুঁকি কোনো গুণ্ডাই পারতপক্ষে নেবে না। এ ছাড়াও আর একটা ব্যাপার আছে, যার জন্যে খুনে গুন্ডাদের ওপর সন্দেহ আসে না। বজৌরী নেহাৎ পাগলামির খেয়ালে অতবড় কাচের জানালা ঘরে বসায়নি। কাচের জানালার সঙ্গে এমন বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ছিল যে, কাচের জানালার বাইরে থেকে কেউ ঘা দিলেই ভেতর থেকে তীব্র আলো জ্বলে উঠে বাইরে চারিদিক আলো করে দেবে, আর তার সঙ্গে সাইরেনের মত বিকট এক বিদ্যুৎ-যন্ত্র বাজতে থাকবে। বজৌরী সাহেবের সেকেন্দ্রবাদের বাড়িটা একটা নির্জন জায়গায় হলেও একেবারে লোকালয়ের বাইরে নয়। তাঁর বাড়ির পঞ্চাশ গজ দূরেই একটা বস্তি। অন্ধ্র দেশের একটা বড় পরব উপলক্ষে সেখানকার লোকেরা সেই বিশেষ রাত্রে সারারাত জেগে গান-বাজনা করেছে। ওরকম একটা বিদঘুটে আওয়াজ কিছুক্ষণ ধরে হলে তারা নিশ্চয় টের পেতো। কিন্তু…

পরাশর এই পর্যন্ত শুনে হঠাৎ বাধা দিয়ে বলেছিল, ‘দাঁড়ান রেডিড সাহেব, যদি কিছু মনে না করেন তো এইমাত্র যা বললেন, আর একবার তা শুনতে চাই।’

আমি শুধু নই, রেড্ডি সাহেবও একটু অবাক হয়েছিলেন এ অনুরোধে।

আমি তো বুঝতেই পারলাম না বজৌরী সাহেবের জানালার বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার বর্ণনা দু’বার শুনবার আগ্রহ কেন হতে পারে। এরকম বৈদ্যুতিক প্যাচ তো আজগুবি, আশ্চর্য কিছু নয়। পরাশর নিজেই তো এরকম প্যাঁচ অনেক জানে। তার সঙ্গে আলাপের পর তার থিদিরপুরের বাড়িতে গিয়ে প্রথমবার রীতিমত চমকেই গিয়েছিলাম।

বিশ্মিত হলেও রেড্ডি সাহেব পরাশরের অনুরোধ রেখে আবার আগের কথাগুলো বলেছিলেন।

পরাশর জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বস্তির লোকেরা কোনো আলো দেখেনি বা কোনো আওয়াজ শোনেনি?’

‘না।’ —রেডিড সাহেব বলেছিলেন, ‘খুব ভালো করে সে খোজ নিয়েছি। বস্তিসুদ্ধ লোকের মিথ্যে বলবার কোনো কারণ নেই। তাইতেই বোঝা যাচ্ছে জানালা ভেঙে ঢুকেই সে গুপ্ত সুইচটা অফ করে কল বিকল করে দিয়েছে। কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে আলো জ্বলে উঠে হর্ন বেজে উঠলেও তা গান-বাজনায় মত্ত বস্তির লোকদের সজাগ করেনি। এখন এই গুপ্ত সুইচের কথা জানা সম্ভব শুধু দুজনের, রঘুনাথ আর রামসহায়ের। শুধু তাই নয়, বজৌরীকে হত্যা করা হয়েছে তাঁরই নিজের রিভলবার দিয়ে। সে রিভলবারও তাঁর খাটের মাথার একটি গোপন খোপে থাকতো। সে খোপের খবর সাধারন গুন্ডা-বদমাসের জানার কথা নয়। সুতরাং আমাদের সন্দেহ…

এইবার আমিই বাধা দিয়ে বলেছিলাম, ‘মাপ করবেন রেড্ডি সাহেব, আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, বজৌরীকে হত্যা করতে পারে মাত্র দুজন—রঘুনাথ আর রামসহায়, আর এ হত্যায় লাভ শুধু রধুনাথের। কিন্তু রঘুনাথ যে সেদিন হায়দ্রাবাদের বাইরে ছিল তার অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে। কি সে সাক্ষ্য-প্রমাণ জানতে পারি?’

‘সাক্ষ্য-প্রমাণ পুলিসেরই।’ —রেড্ডি সাহেব হেসেছিলেন।

‘পুলিশেরই!’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।

‘হ্যাঁ, এখান থেকে কিছু দূরে বিদরী বলে একটা জায়গা আছে বোধ হয় জানেন, সেখানকার লোহার ওপর রুপোর মিনের কাজ শুধু ভারত নয় পৃথিবী বিখ্যাত। রখুনাথ যে সেদিন বিদরীতে ছিল পুলিশই তার সাক্ষী, আর সেখানকার থানার ডায়েরী তার প্রমাণ। রঘুনাথ একেবারে যাকে বলে উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে। জুয়ার নেশায় সে একেবারে অমানুষ হয়ে গেছে। বজৌরীর তার ওপর খাপ্পা হবার কারণও ওই। সে-রাত্রে বিদরীর এক জুয়ার আড্ডায় সে খেলতে গিয়েছিল। পুলিশ সেই আড্ডায় হানা দিয়ে যাদের গ্রেপ্তার করে হাজতে রাখে, তার মধ্যে রঘুনাথও একজন।’

‘বুঝলাম।’ —এইবার আমার আসল বানটি ছেড়েছিলাম, ‘কিন্তু রঘুনাথ যদি ভাড়াটে

কোনো গুন্ডাকে দিয়ে এই খুন করিয়ে থাকে, তাকে বজৌরীর ঘরের সমস্ত গুপ্ত কায়দার হদিস দিয়ে!’

রেড্ডি সাহেব এবার চুপ করে গেছলেন। পরাশরও কিছু না বলে বেশ যেন প্রশংসার দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়েছিল।

রেড্ডি সাহেব কিছুক্ষণ বাদে চিন্তিত মুখে বলেছিলেন, ‘এ কথাটা আমাদের যে মনে হয়নি, তা নয়। কিন্তু এ অঞ্চলের সব গুন্ডাই আমাদের জানা। তন্নতন্ন করে খোঁজ নিয়ে যা জেনেছি, তাতে তাদের কেউ এ-কাজ করেছে বলে মনে হয় না!’

আপনাদের এ অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও কি গুন্ডা নেই?’ রেড্ডি সাহেবকে বুঝিয়ে দিয়ে আমি বসেছিলাম, ‘রঘুনাথের পক্ষে বাইরে কোনো জায়গার গুন্ডা ভাড়া করে আনাই তো সুবিধে, আর সে তা নিশ্চয়ই করেছে।’

রেড্ডি সাহেব এবার একেবারে চুপ।

পরাশর পর্যন্ত মনে মনে এ যুক্তি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে বুঝতে পারছিলাম। খানিক ভ্রু কুঁচকে কি যেন ভেবে সে বলেছিল, ‘আপনি তো এখনো কাউকে গ্রেপ্তার

করেননি, রেড্ডি সাহেব?’

‘না, তবে দুজনকেই নজরবন্দী রেখেছি।’

‘তাহলে রঘুনাথের কাছে একবার নিয়ে যেতে পারেন?’ অনুরোধ করেছিল পরাশর।

‘নিশ্চয় পারি। কিন্তু বুঝতেই পারছেন, তাকে জেরা করতে কিছুই বাকি রাখিনি। আর সে জেরা আর তার জবাব দুয়েরই লিখিত বিবরণ আপনাকে দিতে পারি।’

‘বেশ তাই দেবেন। তবু এই জুয়াড়িটিকে একবার চাক্ষুষ দেখতে চাই।’ —বলেছিল পরাশর।

রেড্ডি সাহেবের পুলিশের গাড়িতেই তারপর রঘুনাথের বাসায় গেলাম।

***

হায়দ্রাবাদ অতি সুন্দর পরিচ্ছন্ন শহর। কিন্তু তারও নোংরা ঘেঞ্জিপাড়া আছে।

মামার স্নেহবঞ্চিত হয়ে রঘুনাথ এইরকম পাড়ারই একটি পুরোনো বাড়ির দুটি ঘর ভাড়া করে থাকে।

বেলা তখন প্রায় দশটা হবে।

কিন্তু রঘুনাথ তখনও বিছানা ছেড়ে ওঠেনি জানলাম তার চাকরের কাছে। রঘুনাথ চরিত্রে কোনো গুণের অভাব নেই বলেই মনে হলো। আগের রাতে মৌতাতটা একটু মাত্রাছাড়া হওয়াতেই বোধহয় এত বেলা পর্যন্ত ঘুম।

দুটি ঘরের একটি বসবার আর একটি শোবার। বসবার ঘরের আসবাবপত্রের সাজ-সজ্জার দুর্দশা দেখেই রঘুনাথের বর্তমান অবস্থা বোঝা কঠিন নয়।

ছোবড়া বেরুনো ময়লা দুটো কৌচ। রাজ্যের সিনেমা আর খেলাধুলার পুরোনো ছেঁড়া পত্রিকা ছড়ানো একটা টেবিল। তার দু’পাশে গোটা-তিনেক ভাঙা বেতের আর

রং চটা টিনের চেয়ার। দেয়ালে ফিল্মের নামকরা সব নায়িকাদের ছবি নানা জায়গায় আঠা দিয়ে আঁটা। গোটা-চারেক সুন্দরী মেয়ের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার আর একদিকে দেয়ালে লাগানো একটা ব্র্যাকেটে গোটাকতক রুপো ও ব্রোঞ্জের খেলাধুলো ব্যায়ামে উৎকর্ষের পুরস্কার-স্বরূপ ‘ট্রপি’।

রেড্ডি সাহেবের ধমকে চাকর শশব্যস্ত হয়ে মনিবকে জাগাতে ছুটলো। আমি ও রেড্ডি সাহেব ছেঁড়া কৌচের ওপরই বসলাম। পরাশর শুধু ঘুরে ঘুরে ওই ঘরে কি যে অত মনোযোগ দিয়ে দেখবার মতো কি পেলে সেই জানে।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, কোনোরকমে মুখে চোখে একটু জল দিয়েই বোধহয় রাত্রের শোবার পোশাকেই রঘুনাথ পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রেড্ডি সাহেবের দিকে চেয়ে ঝাঁঝের সঙ্গে বললে, ‘আবার জ্বালাতন করতে এসেছেন! এরকম দগ্ধে না মেরে একেবারে গ্রেপ্তার করলেই তো পারেন। সব ল্যাটা চুকে যায়।’

রেড্ডি সাহেব হেসে বললেন, ‘ল্যাটা কি অত সহজে চোকে! গ্রেপ্তার করতে হলে আটঘাট বেঁধে তো করতে হবে, যাতে একবার বাঁধা পড়লে আর ফসকে পালাবার সুযোগ না পান।’

আমি রেড্ডি সাহেবের কথা বলার মধ্যে রঘুনাথকে ভালো করে লক্ষ্য করেছিলাম। রেড্ডি সাহেবের কাছে জলহস্তীর মতো চেহারা বলে তার যা বর্ণনা শুনেছিলাম, সেটা

সম্পূর্ণ সত্য নয় দেখলাম। চেহারা বিশাল ও বেশ একটু স্থুল হলেও বেশ আঁট-সাট।

পরাশরের পরের প্রশ্নে বুঝলাম সেও এটাই লক্ষ্য করেছে।

পরাশর তার চেহারার দিকেই যেন সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ‘আপনি এককালে ভালো খেলোয়াড় ছিলেন মনে হচ্ছে রঘুনাথজি?’

রঘুনাথ ভ্রুকুটির সঙ্গে পরাশরের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘হ্যঁ, ছিলাম। তাতে অপরাধটা কি হয়েছে!’

‘না, অপরাধ কেন হবে! এটা তো গর্বের কথা।’ পরাশর হেসে বললে, ‘বন্দুকটাও আপনি চালান ভালো দেখছি। একবার পিপল ছোঁড়ার সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়ে একটা ট্রফি পেয়েছেন দেখছি!

হ্যাঁ, পেয়েছি।’ রঘুনাথের গলা আগের মতই রুক্ষ, কিন্তু এসব খোঁজে আপনার কি দরকার? কে আপনি?’

‘মনে করুন আপনার হিতৈযী।’ পরাশর হাসলো।

‘আমার হিতৈষী!’ তীক্ষ বিদ্রুপভরে রঘুনাথ বললে, ‘পুলিশের সঙ্গে এসেছেন আমার

হিতৈযী সেজে!’

‘পুলিশকেই বা আপনার শত্রু ভাবছেন কেন।’ পরাশর এবার একটু গম্ভীর স্বরেই বললে, ‘আপনি সত্যি দোষী না হলে পুলিশ আপনারই সহায়, জানবেন।’

‘থাক!’ রঘুনাথ রাগের সঙ্গে বললে, ‘পুলিশের হয়ে ওকালতি শোনবার আমার সময় নেই। কি জন্যে আবার বিরক্ত করতে এসেছেন চটপট বলে ফেলুন!’

রেড্ডি সাহেব এবার পরাশরের মুখের দিকে তাকালেন। বোঝাই গেল যে তিনি পরাশরকে যা প্রশ্ন করবার করতে বলেছেন। তাঁর নিজের নতুন করে জেরা করবার কিছু নেই।

আমাদের নীরবতা আর মুখ চাওয়া-চাওয়ি দেখে রঘুনাথ আবার ঝাঁঝিয়ে উঠলো, ‘কি, জিজ্ঞাসা করবার কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না?’

পরাশরের পরের প্রশ্নে রঘুনাথের অনুমানই ঠিক মনে হলো।

পরাশর জিজ্ঞাসা করলে, ‘যে রাত্রে আপনার মামা খুন হন, সে রাত্রে আপনি কোথায় ছিলেন?’

আমরা তো মনে মনে হাসলামই, রঘুনাথাও গলা ছেড়ে এবার হেসে উঠলো।

তারপর পরাশরের দিকে চেয়ে অবজ্ঞামিশ্রিত কৌতুকের সঙ্গে বললে, ‘এর চেয়ে ভালো প্রশ্ন আর খুঁজে পেলেন না?’

‘বেশ!’ পরাশর যেন লজ্জিত হয়ে বললে, ‘আরেকটা প্রশ্ন তাহলে করি। আপনি তো

সিনেমার ছবি খুব বেশী দেখেন। শাস্তারামের আদমী ছবিটা কেমন বলতে পারেন?’

রেড্ডি সাহেব ও আমি দুজনেই বোধ হয় একটু অস্বস্তি বোধ করলাম। কিছু না পেয়ে এরকম আবোল-তাবোল প্রশ্ন করা অপ্তত পরাশরের উচিত হয়নি।

রঘুনাথ তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই জবাব দিলে, ‘ও তো অনেক পুরোনো ছবি। এককালে খুব নাম করেছিল।’

হ্যাঁ। তাই জন্যেই জিজ্ঞাসা করছি।’ —পরাশর নিজের প্রশ্নটা নিরর্থক বুঝেই যেন জেদ করে জিজ্ঞাসা করলে, ‘ছবিটা কেমন?’

‘ভালোই!’ সংক্ষেপে জানালে রঘুনাথ।

‘ধন্যবাদ!’ বলে পরাশর রেড্ডিকে উঠতে ইঙ্গিত করলে।

‘আপনাদের জেরা হয়ে গেল?’ ব্যঙ্গভরে রঘুনাথ বললে, ‘এরকম জেরা হলে রোজ আসতে পারেন। তবে আরেকটু বেলায়। দশটার আগে আমি ঘুম থেকে উঠি না।’

‘জেনে রাখলাম। এরপর তাই আসবো।’ —যেন কৃতার্থ হয়ে বলে পরাশর। তারপর অদ্ভূত একটা অনুরোধ জানিয়ে বসলো, ‘আপনার এখানে অনেক ছবির পত্রিকা দেখছি, এই পুরোনো ফিল্মল্যান্ড পত্রিকাটা আপনার কাছে ধার চাইতে পারি ক’দিনের জন্যে?’

পরাশর টেবিলের ওপর থেকে একটা ছেঁড়া পুরোনো পত্রিকা সত্যিই হাত তুলে নিয়ে দেখালো।

‘পারেন!’ অবজ্ঞাভরে রঘুনাথ বললে, ‘ধার নেবার দরকার নেই। ওটা আপনাকে দান করলাম।’

‘আবার ধন্যবাদ!’’ —বলে পরাশর অম্লানবদনে পত্রিকা নিয়ে আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে এলো।

পুলিশের গাড়িতে এসে উঠবার পর রেড্ডি সাহেব আমাদের হোটেলেই গাড়ি চালাতে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। পরাশর তাঁকে থামিয়ে বললে, ‘না রেড্ডি সাহেব। বজৌরীর দুই ভাগ্নের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব করা উচিত নয়। রঘুনাথকে দেখলাম, একবার রামসহায়কেও দেখতে চাই। সেকেন্দ্রাবাদে বজৌরীর বাড়িতেই চলুন।’

‘তাই যাচ্ছি!’ বলে হেসে রেড্ডি সাহেব সেই নির্দেশ দিলেন।

বজৌরীর বাড়িতে গিয়ে দেখলাম, সেখানে তখনও পুলিশ পাহারা রয়েছে। রেড্ডি সাহেবের কাছে জানলাম, বজৌরীর ঘরটিও হত্যার পর যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই রাখা হয়েছে এখনো। শুধু পোস্টমর্টেমের জন্যে লাশ নিয়ে গিয়ে পুলিশ ফটোগ্রাফার ঘরের সব কিছুর ফটো তুলে গেছে। বলা বাহুল্য, ঘরের কোথাও কোনো কিছুতে পুলিশ কারও হাতের বা পায়ের ছাপ কিছু পায়নি।

রামসহায়কে বাড়িতেই আমরা পেলাম। বজৌরী আর রামসহায়ের ঘর আলাদা। তার ঘরের পাশেই বাইরে বেরুবার দরজা। বাড়ির ভেতরেও একজন পুলিশ মোতায়েন করে, তাই রামসহায়কে সেখানেই থাকতে দেওয়া হয়েছে। বাইরে বেরুনো সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট নিষেধ নেই, তবু শুনলাম রামসহায় বাড়ি থেকে একেবারে বেরোয় না বললেই হয়।

রেড্ডি সাহেবের কাছে যেমন বর্ণনা শুনেছিলাম, ঘরটা অবিকল তাই। আমার মত খাটো লোককেও মাথা নীচু করে দরজা দিয়ে ঢুকতে হয়। ঘরে একটিমাত্র জানালা, তাও আষ্টেপৃষ্ঠে শক্ত শিক দিয়ে আঁটা। ইচ্ছে করে কেউ এরকম ঘরে থাকতে রাজি হতে পারে বলে বিশ্বাস হয় না। তবে মানুষের রুচি নানারকম—তা ছাড়া অত্যাসে

সবই সয়ে যায়।

রামসহায়ের ছোট ঘরটি রঘুনাথের ঠিক উল্টো। জিনিসপত্র বেশি কিছু নেই, কিন্তু যা আছে তা পরিচ্ছন্ন ও দামী। একটি ভালো সোফা সেট। ছোট একটি পুরোনো কালের কাজকরা খাট। একটি ছোট টেবিল আর গুটি-দুয়েক গদি-দেওয়া মানানসই চেয়ার। একটি ড্রেসিং টেবিলের ওপরকার প্রসাধন দ্রব্য দেখে বোঝা যায় রামসহায় বেশ সৌখিন। এ ছাড়া ঘরে আছে একটি সেকেলে ধরনের ওয়ার্ডরোব ও একটি বইয়ের আলমারী। বইয়ের আলমারীটি ঝকঝকে তকতকে সাজানো। বইগুলি দেখলেই বোঝা যায় রামসহায়ের এ বিষয়ে যত্ন আছে। বইগুলি লক্ষ্য করে দেখলাম বেশির ভাগই দেশ-বিদেশ ভ্রমণ কাহিনীর।

পরাশরেরও যে তা চোখে পড়েছে তার প্রথম প্রশ্নে বোঝা গেল।

আমরা ঘরে গিয়ে বসবার পরই আলমারীটার দিকে চেয়ে পরাশর জিজ্ঞাসা করলে, ‘আপনি খুব বেড়াতে ভালোবাসেন, না রামসহায়জি?’

রামসহায়ের চেহারা রুগ্ন না হলেও রঘুনাথের ঠিক উল্টোই বলা যায়। পাতলা একহারা গড়ন। চোখে মুখে একটু ভাবুক গোছের ভাব। কিন্তু মেজাজ দুজনেরই সমান তিরিক্ষি।

পরাশরের প্রশ্নে রামসহায় প্রায় জ্বলে উঠে বললে, ‘পুলিশের সঙ্গে এসেছেন, পুলিশের মতই প্রশ্ন করুন। আপনাদের সঙ্গে অবান্তর আলাপের আমার কোনো আগ্রহ নেই।’

পরাশরকে অপ্রস্তুত অবস্থা থেকে বাঁচাবার জন্যে রেড্ডি সাহেব বললেন, ‘কোনটা সঙ্গত আর কোনটা অবান্তর প্রশ্ন, সে বিচার করবার ভার তো আপনার ওপর নয়। যা প্রশ্ন করা হয়েছে তার জবাব দিতে পারলে দিন।’

রামসহায়ের মুখ চোখ কঠিন হয়ে উঠলো এ কথায়। কিন্তু সে কিছু বলবার আগে পরাশরই যেন লজ্জিতভাবে বললে, না, না, ও-প্রশ্নের জবাব আপনাকে দিতে হবে না। যদি আপত্তি না থাকে রঘুনাথ আপনার সহোদর ভাই কি না জানাবেন?’

‘না, সহোদর নয়।’ রামসহায় অপ্রসন্ন স্বরেই জানালো, ‘রঘু আমার ছোট মাসির ছেলে। তবে আমরা সহোদরের মতই মানুষ হয়েছি একসঙ্গে। আমাদের দুজনের মা-ই ছেলেবেলায় মারা যান। মামাই আমাদের মানুষ করেছেন।’

‘তাই যদি হয় তাহলে আপনার মামা বজৌরী রঘুনাথের ওপর শেষে অত বিরূপ হয়েছিলেন কেন?’

‘সে মামার নিজের বোঝার ভুল। তিনি অত্যন্ত একগুঁয়ে বদরাগী লোক ছিলেন। কোনো একটা ভুল ধারণা করে তিনি ক্ষেপে গিয়ে ওকে বাড়ি থেকে বার করে দেন।’

পরাশর একটু হেসে বললে, ‘আপনার মাসতুতো ভাই রঘুনাথের চরিত্র খুব নিঙ্কলঙ্ক বলে তো মনে হয় না।’

রামসহায় অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে বললে, ‘আমার ভাইয়ের চরিত্র নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে পারবো না।’

পরাশর হেসে বললে, ‘কিন্তু চরিত্রের জন্যে যদি না হয় তাহলে কেন আপনার মামা রঘুনাথের ওপর ক্ষেপে গেলেন, তা তো আমাদের জানা দরকার।’

রামসহায় খানিক চুপ করে থেকে বললে, ‘টাকাপয়সার ব্যাপারে মামা ওকে মিথ্যে সন্দেহ করেছিলেন।’

‘তার মনে, টাকাপয়সার কিছু গোলমালের সঙ্গে রঘুনাথ জড়িত ছিল?’—রেড্ডি সাহেবই এবার বললেন, ‘কিন্তু বজৌরীর সন্দেহ যে মিথ্যে ছিল, তা আপনি জোর করে বলছেন কি করে?’

বলছি, রঘুকে আমি ছেলেবেলা থেকে জানি বলে। জাল-জুয়াচুরী করা তার পক্ষে অসম্তব।’

‘কিন্তু সে তো জুয়া খেলে!’ —রেড্ডি সাহেব আবার মন্তব্য করলেন।

‘হ্যাঁ জুয়াও খেলে, একটু আধটু মদও খায়, ফিল্ম সমন্ধেও তার নেশা আছে, কিন্তু তাই বলে চোর-জোচ্চোর হতে যাবে কেন? মামা অন্যায় করে ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবার পর ও-সব বদখেয়াল বাড়িয়েছিল।’

আচ্ছা, আপনার মামার মৃত্যুর পর রঘুনাথের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে? পরাশরই এবার প্রশ্ন করলো।

‘না।’

‘কবে শেষ দেখা হয়েছে তার সঙ্গে?’ পরাশর আচমকা অত্যন্ত কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করলে।

‘এ সেই—।’ এইটুকু বলেই রামসহায় হঠাৎ চুপ করে গেল।

‘বলুন, থামলেন কেন?’ পরাশর অত্যন্ত জবরদস্ত হয়ে উঠলো, ‘সেই রাত্রেই তার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল, কেমন?’

‘না।’ —রামসহায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো, ‘জোর করে আমার মুখে কথা বলাবার চেষ্টা করবেন না।

‘তাহলে, কবে কখন শেষ দেখা হয়েছে বলুন?’ —রেড্ডি সাহবে এবার কোতোয়ালী ধমকই দিলেন।

‘আমার মনে নেই!’ —রামসহায় কিন্তু অটল।

রেড্ডি সাহেব আবার কি বলতে যাচ্ছিলেন। পরাশর তাঁকে ইঙ্গিতে থামিয়ে হঠাৎ কথাটা ঘোরবার জন্যেই একটা আজগুবি প্রসঙ্গ তুলে বসলো।

আগের প্রশ্নটা সন্ধে যেন আর কোনো কৌতুহলই নেই এইভাবে ড্রেসিং টেবিলটার কাছে গিয়ে একটা শিশি তুলে নিয়ে বললে, ‘এটা তো খুব ভালো কোল্ড ক্রীম দেখছি। আপনি মেয়েদের মত রাত্রে কোল্ড ক্রীম মাখেন।’

এই প্রচ্ছন্ন বিদুগটুকুতেও কোনো কাজ হলো না।

রামসহায় জ্বলন্ত দৃষ্টিতে পরাশরের দিকে একবার শুধু চেয়ে চুপ করে রইলো।

‘আপনার যদি আর কিছু জিজ্ঞাসা করবার থাকে, জিজ্ঞাসা করুন রেড্ডি সাহেব। আমি বাড়িটা একবার ঘুরে দেখে আসি।’ —বলে পরাশর আমাদের একটু অবাক করে দিয়েই বেরিয়ে গেল।

রেড্ডি সাহেব নতুন প্রশ্ন আর কি করবেন। কড়া গলাটা এবার মোলায়েম করে তিনি সেই পুরোনো প্রশ্নই করলেন আবার।

বলুন না রামসহায়জি, সত্যি কবে শেষ রঘুনাথের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে।’

রামসহায়কে নিরুত্তর দেখে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, তারপরে, —‘বুঝতেই পারছেন সত্যি কে খুনী, ধরবার জন্যে সমস্ত খবর আমাদের জানা দরকার। আপনি কি চান না যে, আপনার মামার প্রকৃত খুনী ধরা পড়ে?’

‘চাই।’ —রামসহায় এবার মুখ খুললো, ‘কিন্তু রঘুনাথ খুনী নয়।’

‘আমরাও তো তা বলছি না, কিন্তু তার সমন্ধে সব সঠিক খবর সেই জন্যেই জানা দরকার।’

বেশ, যত পারেন জানুন। কিন্তু আমার সঙ্গে কবে তার শেষ দেখা হয়েছে, তার সঙ্গে খুনের ব্যাপারের সম্পর্ক কি!’

রেড্ডি সাহেব মিছেই তারপর রামসহায়কে আবার বোঝাতে বসলেন। তার মুখ যেন সাঁড়াশী দিয়ে আঁটা, তার কাছ থেকে কিছই আর বার করা গেল না।

হতাশ হয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, পরাশর বজৌরীর ঘরের বাইরে ঘাসের জমির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে একটা আতস কাচ দিয়ে তন্ময় হয়ে কি দেখছে। পাহারাদার পুলিশ তার পেছনে কৌতুকভরা মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে।

রেড্ডি সাহেবকে দেখে পুলিশ মুখখানা তাড়াতাড়ি গম্ভীর করে ফেলে কর্তব্যের খাতিরেই বোধহয় জানালে, ‘সাব, অন্দর মে ভি এইসা কিয়ে হ্যাঁ।’

পুলিশের গলার শব্দে চমকে পরাশর নিজেই যেন অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে উঠে আমাদের দিকে চেয়ে হাসলো।

রেড্ডি সাহেবও হেসে বললেন, ‘পায়ের দাগ খুঁজছিলেন মিস্টার বর্মা। সে কি আমরা কিছু খুঁজতে বাকি রেখেছি। তাছাড়া ইতিমধ্যে কবার বৃষ্টি হয়ে গেছে জানেন। দাগ কিছু এতদিন কি থাকে!’

‘হ্যা, তাই দেখলাম।’ —পরাশর লজ্জিততাবে জানালে, —কোনো দাগ নেই।

রেড্ডি সাহেবের পুলিশের গাড়িতেই তারপর বেরুলাম। কিন্তু সেদিন পরাশরের থামখেয়ালীতে বেলা দুপুর পর্যন্ত রেহাই পেলাম না।

গাড়ি কিছুদূর যাবার পরই পরাশর বললে, ‘বজৌরীর উকিল বন্ধুর নায় ইফতিকার

সাহেব, না?’

রেড্ডি সাহেব মাথা নেড়ে সায় দিতে পরাশর বললে, ‘তার কাছে যে একবার যেতে হয়।’

রেড্ডি সাহেব অনিচ্ছার সঙ্গেই বোধহয় রাজী হলেন। পরাশরের সঙ্গে পরামর্শ করতে যাবার জন্যে এখন বোধহয় মনে মনে তিনি আফসোসই করছিলেন।

ইফতিকার সাহেব যে বনেদি বংশের লোক তা তাঁর ঘর-বাড়ি শুধু নয়, চেহারা দেখেও বোঝা যায়। উকিলের চেয়ে নবাব বাদশা বলেই মনে হয় দেখলে। ওকালতিটা সখ করেই বোধহয় করেন। নইলে তাঁর কিছুর অভাব আছে বলে মনে হয় না।

রেড্ডি সাহেব পরস্পরের পরিচয় করিয়ে দেবার পর সাদরে বসতে বলে আমাদের জন্যে সরবৎ আনতে দিয়ে তিনি হেসে বললেন, ‘কি করতে পারি আপনাদের জন্যে বলুন?’

পরাশর তাকে হঠাৎ যা বলে বসলো, আমি ও রেড্ডিসাহেব দুজনেই তাতে থ।

কোনোরকম ভূমিকা না করেই পরাশর বললে, ‘আপনার ক’জোড়া জুতো আছে যদি দয়া করে বলেন।’

ইফতিকার সাহেব কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে পরাশরের দিকে বোধহয় তার মস্তিস্ক সুস্থ কি না বোঝবার চেষ্টা করে বিফল হয়ে বললেন, ‘তা তো ঠিক গুণে রাখিনি! তবে কুড়ি-বাইশ জোড়া সব রকম মিলিয়ে হবে বোধহয়।’

‘সেই সব জুতো জোড়া অনুগ্রহ করে আপনার চাকরকে একবার আনতে বলবেন কি?’

পরাশরের সত্যি মাথা খারাপ হয়ে গেছে মনে করে রেড্ডি কি বলতে যাচ্ছিলেন, ইফতিকার সাহেবই হেসে বাধা দিয়ে বললেন, ‘বেশ, তাই আনাচ্ছি।’

চিত্র-বিচিত্র কাজ করা দামি ট্রে-তে তখন সরবৎ এসে গেছে।

ইফতিকার সাহেব আমাদের সরবৎ দেবার পর চাকরকে তাঁর সব জুতো-জোড়া আনতে বলে দিলেন।

সরবৎ—এ চুমুক দিতে দিতে পরাশর জিজ্ঞাসা করলে, ‘আপনি তো বজোৌরীর বন্ধু

ও উকিল দুই-ই ছিলেন?

ইফতিকার মাথা নাড়লেন।

‘আচ্ছা বজৌরী তাঁর পুরোনো উইল বদলাবার কথা কতদিন আগে তোলেন?’

‘তাঁর মৃত্যুর হপ্তাখানেক আগে।’

‘কেন কিভাবে উইল বদলাতে চান, তা কিছু বলেছিলেন?’

না। তিনিও তখন ব্যস্ত, আমারও অন্য কাজে বোম্বে যাবার কথা ছিল। তাই শুধু উইল বদলাতে চান, এই কথাই জানিয়েছিলেন বলেছিলেন, নতুন উইলের খসড়া তিনি করেই রাখছেন। আমায় দেখাবেন পরে।’

পরাশর এবার রেড্ডি সাহেবকেই জিজ্ঞাসা করলে, ‘সে উইলের খসড়া বজৌরীর ঘরে পেয়েছেন?’

রেড্ডি সাহেব জানালেন, ‘না।’

‘আপনার কাছে পুরোনো উইলের কপি যদি থাকে একবার দেখাতে পারেন?’ পরাশর ইফতিকার সাহেবকে অনুরোধ জানালে।

রেড্ডির কাছে চোখের দৃষ্টিতে যেন অনুমতি চেয়ে ইফতিকার সাহেব বললেন, ‘নিশ্চয় পারি।’

চাবি দেওয়া একটা স্থীলের আলমারি খুলে ইফতিকার সাহেব উইলটা পরাশরের হাতে দিলেন।

পরাশর মনোযোগ দিয়ে সেটা পড়ে বললে, ‘এতে তো ভারি মজার একটা কথা লেখা দেখছি! রামসহায় ও রঘুনাথকেই সব ভাগ করে দেওয়া আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ যদি অপুত্রক মারা যায় তাহলে তার এবং দুজনেই সেভাবে মারা গেলে দুজনের সমস্ত উত্তরাধিকার আপনিই ট্রাস্টি হিসেবে পাবেন। শুধু তাই নয়, এই দুই ভাগ্নের পঁয়ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত সম্পত্তির পুরো দখল তারা পাবে না। সম্পত্তির ট্রাষ্টি হিসেবে আপনিই ততদিন তাদের সম্পত্তির আয় ভাগ করে দেবেন, আর তাদের কেউ বা দুজনেই যদি রাজদ্বারে দণ্ডিত হবার মত বা বংশের অমর্যাদাকর কোনো কাজ করে, তাহলে তাদের উত্তরাধিকার ট্রাস্টি হিসেবে আপনার দখলেই আসবে।’

ইফতিকার সাহেব একটু হেসে বললেন, ‘আমার বন্ধু বজৌরী একটু একগুঁয়ে খামখেয়ালী ছিলেন। রঘুনাথের চালচলনে সন্তুষ্ট না হয়েই ওরকম আজগুবি ব্যবস্থা উইলে করেছিলেন। আমার মনে হয় নিজের ভুল বুঝেই তিনি উইল আবার সংশোধন করতে চেয়েছিলেন।’

‘কিন্তু ওদের দুজনের ভালোমন্দ কিছু হলেই তো আপনার লাভ ইফতিকার সাহেব!’

পরাশরের এই বেমক্কা কথায় ঘরে যেন একটা বোমা পড়লো।

আমরা স্তম্ভিত! ইফতিকার সাহেবের আভিজাত্যের সুস্পষ্ট ছাপমারা মুখ এক মুহূর্তে রাঙা হয়ে উঠলো। অতি কষ্টে নিজেকে সামলে তিনি শান্ত অথচ তীব্র স্বরে বললেন, ‘আপনি হায়দ্রাবাদের, লোক নন বুঝতে পারছি মিস্টার বর্মা, নইলে জানতেন, আমাদের বংশের অনেক কিছু গিয়েও এখনও যা আছে, তাতে বজৌরীর সম্পত্তিতে লোভ করার আমার দরকার নেই!’

ঘরের অত্যন্ত থমথমে অবস্থা। রেড্ডি সাহেব সেটা হাল্কা করবার চেষ্টায় বন্ধুকে লজ্জা থেকে বাঁচাতে বললেন, ‘জাপনি কিছু মনে করবেন না ইফতিকার সাহেব। আমার বন্ধু মিস্টার বর্মা ওসব ভেবে কিছু বলেন নি। কথাটা নেহাতই ঠাট্টা!’

ইফতিকার সাহেব তা মেনে নিলেন কিনা জানি না। কিন্তু পরাশরকে মোটেই লজ্জিত বা অপ্রস্তুত বলে মনে হলো না।

চাকর তখন প্রায় বিশ জোড়া জুতা ঘরে এনে ফেলেছে। তার মধ্যে গোটা-তিন ‘জোড়া কি বুঝে জানি না বেছে নিয়ে পরাশর জিজ্ঞাসা করলে, ‘এই তিন জোড়া জুতো দুদিনের জন্যে নিয়ে যেতে পারি?

‘নিশ্চয়ই পারেন।’ —বলে ইফতিকার সাহেব এবার বোধহয় আগের আঘাতের শোধ নিলেন, —‘কিন্তু আমার গরীবখানায় এসে শুধু জুতোই নিয়ে যাবেন। এই সঙ্গে এটাও অনুগ্রহ করে নিলে কৃতার্থ হবো।’

ইফতিকার সাহেব ঘরের একটা ছোটো টেবিলে রাখা লোহার ওপর রুপোর কাজ করা বিদরীর একটি অপরূপ বাহারী ছোরা খাপসমেত পরাশরকে উপহার দিলেন।

পরাশর অম্লান বদনে সেটা নিলে। ইফতিকার সাহেবের আদেশে তাঁর চাকর তিন জোড়া জুতোর সঙ্গে সেটাও আমাদের সঙ্গে গাড়িতে তুলে দিয়ে গেল।

ইফতিকার সাহেবের বাড়ি থেকে বেরিয়েও নিস্তার নেই।

পরাশরের এ-বারের বায়না একেবারে সৃষ্টিছাড়া। বজৌরী সাহেবের যে কাচের জানালা তেঙে গেছে তা আবার নতুন করে লাগাতে হবে।

‘কিন্তু সে-রকম কাচ কোথায়?’ রেড্ডি সাহেব অনেক দুঃখেই হেসে বললেন বোধহয়।

যেখান থেকে বজৌরী ও-কাচ কিনেছিলেন, সেখানেই গিয়ে দেখা যাক না কেন? পরাশর জেদ ধরলে, ‘অনেক সময় এক মাপের কাচ ওদের একটার বেশিই থাকত।’

দোকান খুঁজে পেতে গিয়ে সত্যিই তা পাওয়া গেল। দোকানের মালিক জ্বানালেন, ওই রকম সরেস কাচের এক মাপের ছ’টি জানালা তাঁর দোকানে ছিল। পাঁচটি বিক্রি হয়ে আর একটি মাত্র আহে। বেজোড় বলে হয়তো বিক্রি হবে না মনে করে তাঁরা সেটা কাটাবার কথা ভাবছেন।

‘আর কাটাতে হবে না। আমিই এটা নেবো।’ বলে সত্যিই পরাশর নিজে থেকে টাকা দিয়ে সেটার বায়না দিয়ে এলো।

পরাশরের পাগলামিতে আমি তো বটেই, রেড্ডি সাহেবও তখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন।

রাস্তায় বিশেষ আর কোনো কথা হলো না। আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে তখনকার মত রেড্ডি সাহেব বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। ফিরে এলেন আবার সন্ধের পর। পরাশর তার মধ্যেই কি জন্যে জানি না একলাই একবার শহর ঘুরে এসেছে।

রেড্ডি সাহেব আমাদের হোটেলের ঘরের বারান্দায় আমাদের সঙ্গে চা খেতে বসে বললেন, ‘আপনি আজ অনেক কিছুই করেছেন মিস্টার বর্মা, কিন্তু সমস্যার কোনো খেই তাতে মিলবে কি?’

‘আপনার নিজের কার ওপর সন্দেহ হয় রেড্ডি সাহেব?’ পরাশর পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো।

‘ইফতিকার সাহেবের ওপর অন্তত নয়।’ রেড্ডি সাহেব হেসে বললেন, ‘আর রঘুনাথ তো সে রাত্রে বিদরীর হাজতেই ছিল।’

পরাশর কেমন দুষ্টুমির হাসি হেসে বললে, ‘তা বটে! আচ্ছা, এই ছবিটা একটু দেখুন তো রেড্ডি সাহেব।’

রথুনাথের ঘর থেকে ফিল্মের যে পত্রিকাটা পরাশর চেয়ে এনেছিল, সেইটেই ঘর থেকে এনে এক জায়গায় পরাশর খুলে দেখালো।

আমি ও রেড্ডি সাহেব ছবিটার ওপর ঝুঁকে পড়লাম।

‘এ তো কোনো ফিল্মের একটা দৃশ্য দেখছি।’ —আমি বললাম, ‘চার-পাঁচজন আর্টিস্ট রয়েছে।’

‘হ্যা’, বললে পরাশর, ‘লোকগুলোকে ভালো করে দেখো।’

‘তাই তো,’ —রেড্ডি সাহেব সোৎসাহে বলে উঠলেন, ‘রঘুনাথও এদের মধ্যে আছে মনে হচ্ছে।’

‘এবার নিচের নামগুলো পড়ুন!’ —পরাশর নির্দেশ দিলে।

পড়ে কিন্তু রঘুনাথের নাম তার মধ্যে পেলাম না।

‘রঘুনাথ কি ছদ্মনামে ফিল্মে নামে নাকি?’ —অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন রেড্ডি সাহেব।

‘প্রায় ঠিকই ধরেছেন। শুধু কথাটা একটু উল্টে বলতে হবে।’ পরাশর তার স্বভাবসিদ্ধ হেঁয়ালি করলে।

‘তার মানে?’ রেড্ডি সাহেব একটু অধৈর্যের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন।

‘মানে রঘুনাথ ছদ্মনামে ফিল্মে নামে না, রঘুনাথেরই ছদ্মনাম নিয়ে অন্য কেউ হাজতে যায়।’ পরাশর আমাদের হতভম্ব করে মিটমিট করে হাসতে লাগলো।

‘কি বলছেন আপনি!’ —রেড্ডি সাহেবের কণ্ঠস্বরে অবিশ্বাস।

‘যা বলছি তা খোঁজ করে মিলিয়েই দেখুন। ওই ছবির তলায় যার নামটা পাচ্ছেন, সেই বচ্চন সত্যিই ছোটখাটো একজন আর্টিস্ট। রঘুনাথের সঙ্গে তার চেহারার খুব বেশি  মিল। রথুনাথের ফিল্মের নেশা প্রচণ্ড। এই মিল চোখে পড়তেই রঘুনাথ বোম্বাই গিয়ে খোঁজ-টোজ করে বচ্চনের সঙ্গে ভাব করে। রঘুনাথ তাতে ফিল্মে নামতে পারেনি অবশ্য, কিন্তু বচ্চনের সঙ্গে বন্ধুত্বটা গভীর হয়েছে। রঘুনাথ সুবিধে পেলেই বোম্বাই যায় বচ্চনের সঙ্গে ফুর্তি করতে। বচ্চনও মাঝে মাঝে আসে হায়দ্রাবাদে—যেমন এসেছিল বজৌরী খুন হবার সময়ে। খুন হবার রাত্রে বচ্চন কিন্তু হায়দ্রাবাদে ছিল না, ছিল বিদরীতে এক জুয়ার আড্ডায়।’

‘আপনি এসব কথা জানলেন কি করে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন রেড্ডি সাহেব।

‘বলছি। তার আগে বলুন তো, পুলিশ সেদিন বিদরীতে জুয়ার আড্ডায় যে চড়াও হয়েছিল, সে কি নিজে থেকেই, না কারুর কাছে গুপ্ত খবর পেয়ে?

‘ঠিকই তো আপনি ধরেছেন!’ —রেড্ডি সাহেব বললেন সবিস্ময়ে, বিদরীর থানায় সেদিন ফোনে একজন ঐ গোপন জুয়ার আড্ডার খবর দেয়। পুলিশ সে খবর বিশ্বাস না করলেও একবার দেখতে না গিয়ে পারেনি। গিয়ে অবশ্য সত্যিই জুয়ার আড্ডা পেয়েছিল ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তার মধ্যে রঘুনাথও ছিল। পরের দিন সকালে জামিনে সে খালাস পায়।’

‘যে ধরা পড়ে ও যে খালাস পায় সে রঘুনাথ নয়, বচ্চন।’ —পরাশর এবার বোঝালে, বচ্চনের তাতে কোনো ক্ষতি নেই। কারণ তার নিজের নামে কোনো বদনাম হলো না। আর রঘুনাথ সামান্য একটু পুলিশের কেসে পড়ে অন্য জায়গায় থাকার অছিলায় খুনের দায়ের আসামী হওয়া থেকে নিষ্কৃতি পেলে।’

‘এখন বলুন, এসব আপনি জানলেন কি করে?’ —জিজ্ঞাসা করলেন রেড্ডি সাহেব।

প্রথমতঃ আঁচ করলাম, রঘুনাথের ঘরে ফিল্মের কাগজগুলো ঘাঁটতে বচ্চনের সঙ্গে রঘুনাথের চেহারার মিল দেখে, ও বচ্চনের ছবি যাতে আছে অধিকাংশ সেইরকম কাগজ ওখানে পেয়ে। রঘুনাথ যে এই কাগজগুলোই সব কেনে ও রাখে তার কোনো তাৎপর্য আছে বলে মনে হলো। দ্বিতীয়তঃ একেবারে যাকে বলে সরেজমিনে  তদন্ত করে জানলাম, বিকেলবেলা ম্যাজিস্টিক সিনেমা হলে গিয়ে সেখানকার একজন গেট-কীপারকে বচ্চনের এই ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করি।

‘কি গোলমেলে কথা বলছো?’ আমিই এবার বললাম, ‘ম্যাজিস্টিক সিনেমা হলের সঙ্গে এ ব্যাপারের কি সম্পর্ক?’

‘সম্পর্ক এই!’ —পরাশর কাগজটারই আর ক’টা পাতা সরিয়ে একটা সিনেমার টিকিটের আধখানা অংশ বার করলো। তারপর আমাদের হতভম্ব অবস্থাটা যেন উপভোগ করেই বললে, ‘যেদিন বজৌরী খুন হলো এটা সেই দিনেরই সন্ধ্যা ছ’টার

শো-র টিকিট। এক দিনের জন্যে সে তারিখে পুরোনো ‘আদমি’ ছবিটা ম্যাজিস্টিকে দেখানো হয়েছিল। আর সে ছবি দেখতে গেছলো রঘুনাথ। এ টিকিটের অর্ধাংশটা যে তার বিরুদ্ধে মারাত্মক সাক্ষী হয়ে উঠতে পারে জানলে নিশ্চয়ই ছিঁড়ে কোথাও ফেলে দিতো। এটা আমাদেরই ভাগ্যে এই কাগজটার মধ্যে থেকে গেছলো।’

‘ও, এই জন্যেই সেদিন আদমি ছবিটার কথা রঘুনাথকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন?’

‘হ্যাঁ,’ ও ছবিটা আমার নিজেরই প্রিয়। একদিনের ‘জন্যে এখানে দিয়েছিল, আমি জানতাম। টিকিটের ছেঁড়া অংশটা পেয়ে তারিখ দেখে বুঝতে পারি যে, ওই আদমির

শো-এরই টিকিট। আজ বিকেলে ম্যাজিস্টিক সিনেমায় গিয়ে ওই টিকিট যে-ক্লাসের,

তার গেট-কীপারকে জিজ্ঞেস করেই জানতে পারি যে, রঘুনাথ সেদিন সিনেমায় সত্যিই এসেছিল। রখুনাথ প্রায়ই সিনেমায় যায়। গেট-কীপার তাকে চেনে।’

রেড্ডি সাহেব খানিক গম্ভির হয়ে আপন মনে কি ভেবে নিয়ে বললেন, ‘আশ্চর্য! রঘুনাথ এই হায়দ্রাবাদেই থেকে পুলিশকে এভাবে ধোঁকা দিয়েছে। অথচ আমরা কিছুই জানতে পারিনি।’

‘জানতে কিন্তু পারতেনই! আমার অনুমান যদি ভুল না হয়, তাহলে বিদরীতে যে ধরা পড়েছিল, সে যে রঘুনাথ নয় এ খবর গোপনে দু’এক দিনের মধ্যেই পাবেন।’

‘বলেন কি!’ রেড্ডি সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘এ খবর আমাদের কেউ গোপনে

জানাতো?’

‘হ্যাঁ, বিদরীর জুয়ার আডডার খবর যেমন জানিয়েছিল, তেমনি।’

পরাশরকে তার পরের মুহূর্তেই বাকসিদ্ধ বলে মনে করলে কোনো দোষ হতো না।

‘রেড্ডি সাহেব এই হোটেলে আমাদের কাছে যে আসছেন থানায় জানিয়ে এসেছিলেন নিশ্চয়। একজন কনস্টেবল জরুরী চিঠি নিয়ে তাঁর সঙ্গে সেই মুহূর্তেই দেখা করতে এলো। চিঠিটা খুলে পড়ে কনস্টেবলকে বিদায় করে রেড্ডি সাহেব সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে পরাশরের দিকে তাকিয়ে বললেন, এ চিঠিতে কি লিখেছে জানেন?’

‘কি? বিদরীর ধরা পড়া রঘুনাথ যে জাল তাই কেউ গোপনে ফোনে জানিয়েছে, এই খবর তো?’

‘ঠিক তাই! ধন্যবাদ মিস্টার বর্মা। আমি চললাম। আর এক মুহূর্ত নষ্ট করবার সময় নেই।’ রেড্ডি উঠে দাঁড়ালেন।

‘অত ব্যস্ত হবেন না, রেড্ডি সাহেব!’ পরাশর হেসে বললে, ‘আপনার খুনী পালিয়ে যাচ্ছে না। তার ঘোরালো প্যাঁচ কে কাটতে পারে না, এই অহঙ্কারে সে নিশ্চিন্ত হয়ে আছে। আপনি শুধু যাবার সময় এই লেফাফার মধ্যে যে কাগজটুকু আছে, তা আপনাদের ফোরেনসিক ল্যাবরেটরিতে দিয়ে যাবেন তো। পরীক্ষা করে কালই সকালে যাতে রিপোর্টটা পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা করবেন।’

‘কি আছে ওতে?’ আমি না জিজ্ঞেস করে পারলাম না।

‘কালই সকালে জানা যাবে।’ বলে হেসে পরাশর কথাটা চাপা দিলে।

রেড্ডি সাহেব খামটা নিয়ে চলে গেলেন।

পরের দিন সকালে হায়দ্রাবাদের স্থানীয় খবরের কাগজটা খুলেই পরাশর উত্তেজিতভাবে বললে, ‘দেখছো রেড্ডি সাহেবের কাণ্ড।’

যে খবরটা দেখে পরাশরের এত উত্তেজনা, তা পড়ে আমিও একটু উত্তেজিত না হয়ে পারলাম না। খবরটা বজৌরীকে খুন করার দায়ে রঘুনাথের গ্রেপ্তার হওয়ার।

পরাশর সেই তখনই বাটকারার জন্যে অস্থির হয়ে উঠলো।

‘একটা বাটকারা চাই এখুনি।’ বললে উত্তেজিততাবে।

প্রথমটা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কি বললে?’

‘একটা বাটকারা।’

সেই বাটকারার জন্যে শেষ পর্যন্ত থানায় রেড্ডি সাহেবকে ফোন করলে আমার সামনেই। ফোন করে যা বললে, তার মাথামুন্ডু বুঝতে পারলাম না।

একটা বড় নির্ভুল দীড়িপাল্লা নিয়ে ইফতিকার সাহেব, রামসহায় এমন কি হাজত থেকে অনুমতি করিয়ে রঘুনাথকেও নিয়ে আমরা বজৌরীর বাড়িতে এক ঘন্টা বাদে জড়ো হচ্ছি এই ব্যবস্থার কথাই ফোনে হলো শুনলাম। কাচের দোকান থেকে তার সেই বায়না করা কাচটা আর দোকানের মালিককেও আনবার কথা সে বলে দিলে, আর সেই সঙ্গে ফোরেনসিক ল্যাবরেটরির রিপোর্ট।

এক ঘন্টা বাদে বজৌরীর বাড়িতে আমরা সবাই গিয়ে উপস্থিত হলাম।

পরাশর ছাড়া আর সকলেরই কেমন দিশাহারা ভাব। পরাশর কি যে করতে চায় কেউই আমরা জানি না। ইতিপূর্বে পরাশরের কাছে সাহায্য পাবার কৃতজ্ঞতাতেই নিশ্চয় রেড্ডি সাহেব এত তোড়জোড় করে সব কিছু জোগাড় করে এনেছেন। তাঁর মুখ দেখে কিন্তু মনে হলো, ব্যাপারটা তাঁর কাছে পাগলামি ছাড়া কিছু নয়।

পরাশর প্রথমেই যা করলো, তাকে পাগলামি ছাড়া আর কি-বা বলা যায়। বজৌরী সাহেবের ঘরের কোনো কিছু এ পর্যন্ত নড়ানো হয়নি। ভাঙা কাচগুলো পর্যন্ত যেখানে যেমন তেমনি ছড়ানো ছিল। পরাশরের নির্দেশে সেই সমস্ত ভাঙা কাচের টুকরো খুঁটে খুঁটে তুলে একটা পাল্লায় রাখা হলো, আরেকটা পাল্লায় সেই দোকানের আস্ত কাচটা।

ওজন করতে কিন্তু আস্ত কাচের দিকের পাল্লাটাই ঝুলে পড়লো।

আমাদের কাছে ব্যাপারটা এমন কিছু অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু পরাশর কাচের দোকানের মালিকের দিকে চেয়ে বিদ্রুপ করে বললে, ‘কি মশাই, আপনি না ছ’টা এক জাতের এক মাপের সরেস কাচের জানলা আপনার ছিল বলেছিলেন। এই ঘরের একটা কাচের গুঁড়োও আমরা ফেলিনি, সব পাল্লাতেই তুলেছি। তবে এদিকটার ওজন এত হয় কেন? আপনার তাহলে ঠকাবার ব্যবসা?’

কাচের দোকানের মালিক পুলিশের তলবেই এসে এতক্ষণ একটু ভয়ে-ভয়েই ছিলেন, কিন্তু এ-কথায় একেবারে জ্বলে উঠলেন, —’আমি ঠকাবার ব্যবসা করি! চলুন আয়ার দোকানে। বম্বে থেকে যাদের ওর্ডার দিয়ে এসব কাচ আনিয়েছি, তার চালান আমার কাছে এখনও আছে। হেঁজিপেজি কোম্পানির মালও নয়। দেখবেন চলুন সব এক মাপের এক দরের জিনিস কিনা!’

‘আহা, অত চটছেন কেন?’ —পরাশর এবার তাঁকে শান্ত করলে, ‘আপনার মাল যদি ঠিক হয়, তাহলে গোলমাল এখানে কিছু আছে! এ ঘরে কোথাও কাচের টুকরো আর পড়ে নেই তো।’

পরাশরের কথায় আবার তন্নতন্ন করে ঘরের চারিদিকে দেখা হলো। কোথাও একটা কণাও আর নেই।

এই সময়ের মধ্যে ইফতিকার সাহেবই প্রথম বিরক্ত হয়ে উঠে বলে ফেললেন, ‘এসব ছেলেখেলার জন্যে আমায় এখানে ডেকে আনার মানে কি আমি জানতে চাই

রেড্ডি সাহেব।’

‘পারবেন! পারবেন! এখনি জানতে পারবেন।’ রেড্ডি সাহেবের বদলে পরাশরই জবাব দিলে, ‘আপনার জুতোর তলায় যেটুকু কাচের গুঁড়ো ছিল, তাও আমি চেঁচে এনেছি এই যে!’

পরাশর পকেট থেকে একটা ছোটো কাগজের মোড়ক বার করে সকলকে খুলে দেখালো। কাগজের মধ্যে প্রায় ধুলোর মতো অতি সামান্য ক’টা কাচের গুঁড়ো। পরাশর কাগজটা ভাঙা কাচের পাল্লাটার ওপর ঝেড়ে দিয়ে আবার বললে, ‘আপনি সেদিন রাত্রে কেন একলা লুকিয়ে এসেছিলেন তা এখুনি অবশ্য বলবার দরকার নেই।’

ইফতিকার সাহেবের মুখ চোখ আগুন হয়ে উঠলো। তিনি তীব্র স্বরে বললেন, ‘না, এখুনি আমি বলতে চাই। বজৌরী সেদিন রাত্রে আমায় গোপনে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিল। তাই আমি এসেছিলাম।’

‘বজৌরী কি চিঠিতে আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছিল?’—পরাশরের গলায় বিদ্রুপের স্বর।

‘না, তিনি ফোন করেছিলেন। রাত এগারোটার পর। বলেছিলেন বিশেষ জরুরী দরকার। তিনি হঠাৎ অসুস্থ বোধ করছেন। তাই উইলটা সম্বন্ধে এখুনি ব্যবস্থা করতে

চান। আমি যেন রাত বারোটার মধ্যে নিশ্চিত ওখানেই যাই।’

‘আপনি তাই গেছলেন। ভালো।  কিন্তু ফোনে বজৌরীর গলা আপনি চিনতে পেরেছিলেন?’

‘না, একটু অন্যরকম লেগেছিল। ফোনে অনেকের গলা বদলে যায়, তাছাড়া ভেবেছিলাম অসুস্থ বলে গলাটা ওরকম হয়েছে।’

‘ওঃ ভেবেছিলাম।’ —পরাশর যেরকম ব্যঙ্গর স্বরে কথাটা বললে, তাতে ইফতিকার সাহেবের গায়ে জ্বালা ধরা স্বাভাবিক।

তিনি আগুন হয়েই বললেন, ‘আমি কি মিথ্যে কথা বলছি?’

‘যা বলছেন তার সত্য মিথ্যা এখুনি প্রমাণ হবে।’ —এবার যেন নরম সুরেই পরাশর বললে, ‘কিন্তু দাঁড়িপাল্লার রহস্যটার তো মীমাংসা হচ্ছে না? আচ্ছা এইটা দিয়ে দেখা যাক।’

পরাশর পকেট থেকে আর একটা কাগজের মোড়ক বার করে, তা থেকে দু-টুকরো কাচ পাল্লার মধ্যে ফেললো।

আশ্চার্য! সেই দুটো টুকরো-কাচেই পাল্লা দুটো প্রায় সমান সমান হয়ে গেল। ওপরের কাঁটার যেটুকু তফাৎ রইলো তা ধর্তব্যই নয়।’

ওটা কোন্‌ কাচের চুকরো আপনি দিলেন?’ —জিজ্ঞাসা করলেন রেড্ডি সাহেব।

এই কাচেরই টুকরো! পরীক্ষা করিয়ে দেখতে পারেন।’ —নিরীহ  ভালোমানুষের মত জবাব দিেল পরাশর।

‘তা বুঝলাম। কিন্তু ও টুকরো আপনার পকেটে গেল কোথা থেকে?’

‘ওই বাইরে থেকে কুড়িয়ে আমি পকেটে রেখে দিয়েছিলাম।’ বলে একটু হেসে পরাশর বললে, ‘হ্যাঁ রেড্ড সাহেব, আমি ওখানে সেদিন পায়ের দাগ খুঁজিনি। খুঁজছিলাম কাচের টুকরো।’

‘ওই বাইরে কাচের টুকরো যাবে কি করে?’

‘সেটাই তো ভাববার!’ —বলে পরাশর হাসলো।

‘আপনি খুব বাহাদুর মিস্টার বর্মা।’ —এবার রামসহায়ের তীক্ষ তিক্ত কণ্ঠ শোনা গেল, ‘কিন্তু, আপনার বুদ্ধির তারিফ করবার জন্যে এভাবে বসে থাকাটা আমাদের কাছে অসহ্য। যা করতে চান তাড়াতাড়ি করুন। কিছু না পারেন আমাকেই গ্রেপ্তার করুন।’

‘তাই করলাম রামসহায়জি!’ পরাশরের স্বর এবার বজ্ব-কঠিন।

আমরা সবাই অবাক হলেও রেড্ডি সাহেব এক নিমেষে দেখলাম পকেট থেকে হাতকড়া বার করে রামসহায়ের সামনে ধরেছেন।

রামসহায় সেদিকে চেয়ে তীব্র স্বরে বললে, ‘কি করেছেন আপনারা জানেন?’

‘জানি বইকি রামসহায়জি। —পরাশর তেমনি কড়া গলায় বললে, ‘আমরা কি করছি জানি, আপনি কি করছেন তাও। এক ঢিলে লোকে দু-পাখিই মারতে চায়। আপনি একেবারে তিন পাখি মারবার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রথম মামা বজৌরীকে খুন দ্বিতীয়তঃ বজৌরীর একান্ত বন্ধু হিতেষী ও সহায় ইফতিকার সাহেবের মত শরিফ, ইমানদার মানুষকে অপদস্থ করে ট্রাষ্টগিরি থেকে সরানো। তৃতীয়ত? আপনার

একমাত্র পথের ঝাঁটা রঘুনাথকে খুনের দায়ে ফীসিকাঠে ঝুলিয়ে সরিয়ে দেওয়া। রঘুনাথের নামে যেসব কথা লাগিয়ে আপনি আপনার মামার কান ভারি করেছিলেন, সেসব এতদিনে মিথ্যে বলে ধরে ফেলেই তিনি উইল বদলাতে চাইছিলেন! উইলের সেই খসড়া গোপনে দেখে নিয়ে আর রঘুনাথকে তার বধু বচ্চনের সঙ্গে দেখেই আপনার মনে এই শয়তানী ফন্দি আসে। মামাকে হত্যা করবার দিন ঠিক করে আপনি প্রথমে, রঘুনাথকে সে রাত্রে, রাত বারোটা নাগাদ আপনাদের বাড়ির বাইরে এসে অপেক্ষা করতে বললেন। সম্ভবত তাকে বুঝিয়ে ছিলেন যে, ইফতিকার সাহেব ওই সময়ে বজৌরীর ডাকে নতুন উইল বদলাবার জন্যে আসবেন। সে নতুন উইলে  রঘুনাথকে বঞ্চিত করা হবে বলেই বুঝিয়েছিলেন। তাই ইফতিকার সাহেবকে ওখানে ঢুকতে না দিলে বা ঢোকার পরও উইলের খসড়া নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তায় ধরে খসড়া কেড়ে নিলে কিছুদিনের জন্যে এখন উইল করা অন্তত বন্ধ হবে। কিছুদিন বন্ধ করতে পারলেই আপনি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মামার মত বদলাতে পারবেন বলে রঘুনাথকে আশা দিয়েছিলেন। রঘুনাথ জুয়াড়ি হলেও সত্যিই সরল। সে আপনার কথা বিশ্বাস করেছিল। এমনকি ইফতিকার সাহেবের ওপর হামলা করা সত্ত্বেও ধরা-ছৌঁয়ার মধ্যে না থাকার যে ফিকির আপনি রঘুনাথকে বলেছিলেন, মজার বলে তাও সে কোনোরকম সন্দেহ না করে কাজে লাগিয়েছিল। তার বন্ধু বচ্চন হায়দ্রাবাদে তখন এসেছে। বচ্চন ফুর্তিবাজ ফিল্মের লোক। সে এ মজার ফন্দিতে এককথায় রাজি হয়েছিল তার কোনো লোকসান নেই জেনে। কি রঘুনাথজি, ঠিক বলছি কিনা?’

রঘুনাথের দিকে ফিরে একথা জিজ্ঞাসা করতেই সে থতমত খেয়ে বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ। রামসহায় আমায় বুঝিয়েছিল যে মামাজি আমার ওপরে ক্ষেপে গিয়ে এখুনি উইল বদলে ফেলতে যাচ্ছেন। দু’দিনের জন্যে তাঁকে ঠেকাতে পারলে আবার তাঁকে ঠাণ্ডা করা যাবে। ও যে আমার বিরুদ্ধে মামাজিকে মিথ্যে করে লাগিয়েছে, আমি কোনোদিন ভাবতেও পারিনি।’

তাকে হাত তুলে থামিয়ে পরাশর আবার রামসহায়ের দিকে ফিরে বললে, ‘সেই রাত্রেই আপনি মামা বজৌরীর গলা যথাসম্ভব নকল করে ইফতিকার সাহেবকে ফোন করেন। ইফতিকার সাহেব ফাঁদে পড়ে এলে ভালোই, না এলেও আপনার কোনো ক্ষতি নেই। ফোন করে এসেই আপনি নিঃশব্দে মামার ঘরে তাঁর খাটের তলায় লুকিয়ে পড়েন।

একটু থেমে রেড্ডি সাহেবের দিকে চেয়ে পরাশর বললে, ‘দেখি ফোরেনসিক ল্যাবরেটরির রিপোর্টটা।’

রেড্ডি সাহেব পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে পরাশরের হাতে দিলেন। পরাশর সেটার ওপর চোখ বুলিয়ে বললে, ‘আপনি যে মামার ঘরে খাটের তলায় লুকিয়েছিলেন এই তার অকাট্য প্রমাণ।’

‘কি?’ রামসহায় চিৎকার করে উঠলো।

হাঁ আপনি মেয়েদের মত রাত্রে কোল্ড ক্রীম মাখেন। সেদিনও মেখে ছিলেন। খাটের তলায় ঘাপটি মেরে থাকবার সময় আপনার মুখের কোল্ড ক্রীম মেঝেয় লেগেছিল।  আমি সেদিন ঘরটা পরীক্ষা করবার সময় ওই দাগ দেখে ফেলে একটা কাগজে তা ঘষে তুলে নিয়ে পরে ল্যাবরেটরিতে পাঠাই। এই ল্যাবরেটরির রিপোর্ট। আপনি যে দামী বিশেষ ব্র্যান্ডের কোল্ড ক্রীম মাখেন তারই ছোপ ছিল খাটের তলায়।’

‘হতে পারে না! লাগতে পারে না দাগ মেঝেয়।’ —রামসহায় চিৎকার করে উঠলো, ‘সেদিন ক্রীম মেখে আমি ও-ঘরে’—

রামসহায় হঠাৎ চুপ করার সঙ্গেই খুট করে দুবার শব্দ হলো। দেখলাম হাতকড়া দুটো এতক্ষণে রেড্ডি সাহেব রামসহায়ের হাতে এঁটে দিয়েছেন।

রামসহায় কেমন হতভম্ব হয়ে গেছে নিজের নির্বুদ্ধিতায়। পরাশর হেসে উঠে বললে, ‘এইটুকুর জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম রামসহায়জি। আপনার নিজের মুখে এই ধরা দেওয়াটুকুর জন্যে। এ ল্যাবরেটরির রিপোর্ট কিছু নয়। কোল্ড ক্রীম আর কোথায় পাবো, আমি নিজে একটু মাথার তেল একটা কাগজে লাগিয়ে মিছিমিছি ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়েছিলাম। ল্যাবরেটরির এ রিপোর্টেও কোল্ড ক্রীমের কথা কিছু নেই। আপনি অত্যন্ত ধড়িবাজ! আপনার ঘরে কোল্ড ক্রীমের কৌটা দেখে আপনার ওপরও টেক্কা দেবার এই ফন্দি আমার মাথায় আসে। ফন্দিটা সফলও হয়েছে! অবশ্য কি করে আপনি মামার ঘরে ঢুকেছিলেন এখনো জানি না। যদি ইচ্ছা করেন বলতে পারেন। না বললেও কোনো ক্ষতি নেই। কারণ, কি করে ঘরে চুকেছিলেন, না জানলেও কি আপনি করেছিলেন তা আমরা জানি। আপনি মামার ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর খাটের গোপন খোপ থেকে রিভলবার বার করে প্রথম তাঁকে গুলি করেন, তারপর ভেতরে থেকে জানালাটা ঘা মেরে ভাঙেন। জানালার যা ব্যবস্থা ছিল তাতে বাইরে থেকে ধাক্কা দিলেই আলো জ্বলবে ও সাইরেন যন্ত্র বাজবে। ভেতর থেকে ভাঙায় সে-সব কিছু হয়নি। তারপর জানালাটা বাইরে থেকে ভাঙা হয়েছে বোঝাবার জন্যে আপনি বাইরের সমস্ত কাঁচ যতদুর সম্ভব তন্ন তন্ন করে খুঁজে ভেতরে এনে ফেলেন। তা সত্ত্বেও দুটো টুকরো আপনার নজরে পড়েনি। তাতে কিছু ক্ষতিও হতো না, যদি না জানালাটা ভেতর থেকেই ভাঙা হয়েছে সন্দেহ করে আমি বাইরে টুকরো খুঁজতে না যেতাম। কাচের টুকরো ভেতরে সব ফেলে আপনি বিদরীর থানায় ফোন করেন গোপন জুয়ার আড্ডার খবর দিয়ে জাল রঘুনাথকে ধরাবার জন্য। পরে সেদিন আবার সে রঘুনাথ যে জাল সে খবর আপনিই সেখানে জানিয়েছেন। বিদরীতে ফোন করার পর সে রাত্রে ইফতিকার সাহেব ও রঘুনাথকে একেবারে যাকে বলে অকুস্থলে সন্দেহজনক অবস্থায় ধরবার জন্যে আপনি নিশ্চয় এখানকার থানাতেও ফোন করবার চেষ্টা করেছিলেন। কেন যে ফোনে ধরতে পারেন নি, বলতে পারি না।’

‘ফোন তখন সম্ভবত এনগেজড ছিল। কারণ ইফতিকার সাহেব ওই সময়েই আমায় ফোন করেছিলেন থানায়—আমার মনে আছে।’ বলেন রেড্ডি সাহেব।

‘ইফতিকার সাহেব!’ পরাশর একটু হেসে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তাহলে আপনিই ফোনে পুলিশের কাছে খবরটা দেন।’

‘হ্যাঁ।’ বললেন ইফতিকার সাহেব, ‘আমি সে-রাত্রে বড় রাস্তায় গাড়ি রেখে ওইটুকু হেঁটে আসতে আসতেই দেখতে পাই বজৌরী সাহেবের ঘরের আলোটা হঠাৎ নিভে গেল। বজৌরী আমার জন্যেই অপেক্ষা করে থাকার কথা। সুতরাং হঠাৎ আলো নেভার মানে বুঝতে না পেরে আমি একটু চিন্তিততাবে তার জানালার দিকেই আগে যাই। আমার কাছে রাত্রে সব সময়েই টর্চ থাকে। সেই টর্চের আলো ফেলে আমি একেবারে স্তপ্তিত হয়ে যাই। জানালার কাঁচ ভাঙা আর ভেতরে যেভাবে বজৌরীর রক্তাক্ত দেহ খাটের ধারে পড়ে আছে, তাতে খুন ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। আমি তৎক্ষণাৎ সেখানে আর না দাড়িয়ে গাড়ি চালিয়ে বাড়িতে এসে রেড্ডি সাহেবকে ফোন করি। আমার জুতোর তলায় কাচের গুঁড়ো যদি লেগে থাকে তখনই লেগেছিল।

‘সে আমি জানি।’ বললে পরাশর, ‘আর তাই জন্যেই আপনাকে সন্দেহভাজনদের তালিকা থেকে তক্ষুণি বাদ দিয়েছি। রঘুনাথের জুতো আমি পরীক্ষা করে দেখিনি। কিন্তু তাতে কাচের গুঁড়ো বোধহয় পাওয়া যাবে না।’

‘না। সে রাত্রে মামাজির ওখানে যেতে আর আমার ইচ্ছেই হয়নি। ‘আদমি’ ছবিটা দেখে মনটা এমন ভরে গিয়েছিল যে, ওরকম নোংরা কাজ করতে যেতে আর প্রবৃত্তিই হয়নি। ভেবেছিলাম, মামাজি যদি অন্যায় করে আমায় উইলে বঞ্চিত করতে চায় তো করুক। মামাজি যে সেদিন খুন হয়েছেন আমি কল্পনা করতেও পারিনি।’

পরাশর সহানুভূতির সঙ্গে বললে, ‘হ্যাঁ, আপনি কি করে জানবেন যে, আপনার শয়তান ভাই খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় মামাকে গুলি করে মারছে তখন।’

‘ঘুমন্ত অবস্থায় মেরেছি’ রামসহায় গলায় বিষ ঢেলে বলে উঠলো, ‘তোমার মতো ছুঁচো গোয়েন্দা ওর চেয়ে বেশি কি বুঝবে! শোনো তাহলে আহম্মক, আমি বাইরে থেকে ক’টা ন্যাকড়া আর ভিজে খড়ে আগুন ধরিয়ে তার ধোয়া দরজার ফাঁক দিয়ে হাওয়া করে মামার ঘরে চালিয়ে দিয়ে ‘আগুন আগুন’ বলে চিৎকার করে মামার দরজায় ধাক্কা দিয়েছিলাম। মামা ভয়ে ধড়মড় করে জেগে উঠে দরজা খুলতেই অন্ধকারে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে খাটের মাথার খোপ থেকে রিভলবার বার করে তাঁকে গুলি করেছিলাম। বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, আমাকে উইল থেকে বাদ দিলে কি হয়।’

পরাশর হেসে উঠে বললে, ‘তারপর সে উইলের খসড়াটাও ঘর থেকে সরিয়ে নষ্ট করে বা পুড়িয়ে ফেলে দিয়েছিলেন?’

‘নিশ্চয়!’ দাঁতে দাঁত চেপে বললে রামসহায়।

পরাশর গভীরভাবে একবার বললে, ‘পাষন্ড বদমায়েসদের দম্ভই তাদের কাল হয় এই আমাদের বাঁচোয়া। নইলে কোনো গোয়োন্দাই বোধহয় তাদের চুলের ডগাও ছুঁতে পারতো না।’

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *