কুটি মনসুরের গান – সম্পাদনা : অণিমা মুক্তি গমেজ
কুটি মনসুরের গান
সম্পাদনা – অণিমা মুক্তি গমেজ
সংকলন – জাহিদ মনসুর, কে এম মজনু
প্রথম প্রকাশ – ফেব্রুয়ারি ২০১৯
প্ৰকাশক – জামাল নাসের মুকুল
প্রচ্ছদ – নাজিব তারেক
কৃতজ্ঞতা – কুটি মনসুর পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি
Kuti Mansurer Gan, Edited by : Anima Mukti Gomes, Published by Jamal Naser Mukul
.
যে মমতাময়ী মায়ের আদরমাখা ‘কুটি’ শব্দটি
নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে
বাংলার সংস্কৃতিতে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন
আমাদের কুটি মনসুর, তাঁর
সেই রত্নগর্ভা মা
আবেদুন নেছা খানমের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য
.
ভূমিকা
‘আইলাম আর গেলাম, পাইলাম আর খাইলাম, ভবে দেখলাম শুনলাম কিছুই বুঝলাম না’, ‘কে বলে মানুষ মরে আমি বুঝলাম না ব্যাপার, মানুষ মরিলে তবে বিচার হবে কার’, ‘আমি কি তোর আপন ছিলাম না রে জরিনা’, ‘হিংসা আর নিন্দা ছাড়ো মনটা কর পরিষ্কার’, ‘বিধি রে মানুষের ভিতর কেন বানাইলা অন্তর’- এইসব গান শুনেই তো আমরা বড় হয়েছি! ফরিদপুরের মাঠে-ঘাটে প্রান্তরে এই গান ছড়িয়ে রয়েছে এখনো। রথীন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠে এই সব গান শুনে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, আমার জন্মগ্রামে ফরিদপুরের, অধুনা মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তাঁকে গান গাইতে ডেকে নিয়েছিলাম স্থানীয় সৈকত একাডেমির পক্ষে। ঢাকা থেকে আমি তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম বলে এইসব গানের গীতিকার ও সুরকার যে আমাদের ফরিদপুরেরই কুটি মনসুর, তখন আলাপপ্রসঙ্গে তা জানা হয়ে যায়। এর আগে গানগুলোই শুনেছি, কিন্তু তাঁর স্রষ্টার নাম জানা ছিল না। যখন জানলাম যে, এই কুটি মনসুর আমাদেরই নিকট প্রতিবেশী, তখন গর্বে বুক ভরে যায়। একই মাটির সন্তান হিসেবে আমরা পরস্পর নৈকট্য অনুভব করি। রথীন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠে সরাসরি এই গান শুনতে পেরে আমরা আপ্লুত হই। সেবার গভীর রাত পর্যন্ত গ্রামের মানুষ এই গান সরাসরি শোনার সৌভাগ্য অর্জন করে।
কুটি মনসুরের বহু গান আমি বহুবার শুনেছি বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে। রথীন্দ্রনাথ ছাড়াও নীনা হামিদ, মুজিব পরদেশী ও ফকির আলমগীরের কণ্ঠে কিছু গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি। দীর্ঘ সময় পরে অণিমা মুক্তি গমেজের কণ্ঠে ‘ওরে ও দরদের আম্মাজান’ গানটি শুনতে গিয়ে ‘কলিজার টুকরা’ শব্দটির প্রতি আমার কান আটকে যায়। এমন দরদি কণ্ঠে গানটি তিনি গেয়েছেন যে, আমি বারবার ওই গান শুনি। এরপর আরো আগ্রহ নিয়ে তাঁর কণ্ঠে ‘আইলাম আর গেলাম, পাইলাম আর খাইলাম ভবে’, ‘কে বলে মানুষ মরে’, ‘যে দিন শুকাইবে দেল দরিয়ার পানি রে’, ‘প্রেম কইরা যে প্রেমিক মরে সই গো’, ‘আমার কথা তোমার মনে নাই’, ‘ময়নাপাখি গেলো রে খাঁচার বাঁধন কাটিয়া’, ‘সাবধানে চালাও তরী বাইয়া’, ‘খালি হাতে পুলসেরাতে কেমনে হব পার ‘ প্রভৃতি গানও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে শোনার স্বাদ গ্রহণ করি। কুটি মনসুরের গান অণিমা মুক্তি গমেজের কণ্ঠে কম-সংখ্যক গীত হলেও আবেদনের দিক থেকে রথীন্দ্রনাথ রায় ও নীনা হামিদের পরেই তার অবস্থান বলে আমার ধারণা। অন্য সকল শিল্পীর গান শোনার আগ পর্যন্ত এই ধারণা বদলানোর সুযোগ নাই। বলা যেতে পারে, অণিমার কণ্ঠে কুটি মনসুরের গান শোনার পরেই আমি এই গীতিকার সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠি।
কুটি মনসুরের সঙ্গে আলাপের বাসনা থাকলেও দেখা করার সুযোগ তখনও তৈরি হয়নি। শুনলাম তিনি অসুস্থ, মগবাজারের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। খবর পেয়ে সেই হাসপাতালে গিয়ে উপস্থিত হই। আমি তাঁকে চিনি ছবি দেখে আর লেখা গান শুনে। তিনি তো আমাকে চেনেন না! হাসপাতালের বিছানায় শায়িত কুটি মনসুরকে আমার হৃদয়ের প্রণাম জানাই, কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তিনি আমার মাথায় হাত রাখেন। কথা বলার মতো অবস্থায় তিনি ছিলেন না তখন। তাঁর সঙ্গে আমার ওটাই একমাত্র দেখা। তখন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও কিছুদিন পরে তিনি জগতের সকল মায়া কাটিয়ে চলে যান। তাঁর সঙ্গে কথা বলার, তাঁর সম্পর্কে তাঁর মুখ থেকে জানার সুযোগ আর রইল না।
তাঁর প্রয়াণের পরে তাঁর গানগুলো গ্রন্থিত হওয়ার প্রয়োজন খুব অনুভব করছিলাম। একসময় আলোকায়ন প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী বন্ধু জামাল নাসের মুকুল আমাকে কুটি মনসুরের গান প্রকাশের আগ্রহের কথা জানান। একজন ভক্ত যোগাযোগ করেছিলেন কুটি মনসুরের পরিবারের সঙ্গে। তাঁরা আগ্রহ দেখাননি। পরিবারের ঘনিষ্ঠ কোনো শিল্পী সম্পাদক হলে হয়তো রাজি হবেন— এই ভেবে অণিমা মুক্তি গমেজের কথা বলি। একদিন কথায়-কথায় তিনি নিজেকে কুটি মনসুরের কাছ থেকে কন্যাস্নেহের লাভের কথা বলেছিলেন। ‘আমি তাঁর একটি কন্যা’- এমন একটি উক্তির কথা মনে পড়ে গেলে তাঁকেই আমি এই কাজের যোগ্য বিবেচনা করি। সেই মোতাবেক প্রকাশক যোগাযোগ করেন। অণিমা মুক্তি গমেজ কন্যার অধিকারে কুটি মনসুরের গানের সংকলন সম্পাদনা করতে সমর্থ হন। পরিবার তাঁকে যথোচিত সহায়তা করেন। অজস্র গানের ভেতর থেকে গ্রন্থভুক্ত গানগুলো নির্বাচনে সহায়তা করেন কুটি মনসুরের ছেলে শিল্পী জাহিদ মনসুর। গ্রন্থের জন্য চমৎকার একটি ‘সম্পাদকের কথা’ লিখেছেন অণিমা মুক্তি গমেজ। কেবল কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই যোগ্য নন, সংগীত সংকলন ও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও যে তিনি যোগ্যতর হয়ে উঠেছেন, এই গ্রন্থ হাতে নিলে তার প্রমাণ মেলে। কুটি মনসুরকে বুঝতে সহায়ক হবে এই গ্রন্থ। গ্রন্থের সম্পাদক, প্রকাশক, সংকলক, প্রচ্ছদশিল্পীকে ধন্যবাদ জানাই।
ড. তপন বাগচী
কবি-গীতিকার-প্রাবন্ধিক
উপপরিচালক, গবেষণা
বাংলা একাডেমি, ঢাকা
.
সম্পাদকের কথা
বাংলা লোকসংগীতের জগতে কুটি মনসুর (১৯২৬-২০১৭) এক অপরিহার্য শিল্পীর নাম। লোকসংগীতের এমন কোনো আঙ্গিক নেই, যাতে তিনি কথা আর সুরের মালা গাঁথেননি। তাঁর রচিত এবং সুরারোপিত গানে আমরা খুঁজে পাই আবহমান বাংলার পলিমাটির সোঁদা গন্ধ, দিগন্তজোড়া সবুজের সরলতা আর কুলকুল রবে বয়ে-চলা নদীর উদার মমতা। সহজ সরল ভাষায় তিনি বলে গেছেন মানবমনের গভীর ভাবনার কথা, চিরন্তন আবেগের কথা। বাংলার লোকসংগীতের ভাণ্ডারকে তিনি করেছেন ক্রমশ সমৃদ্ধতর। যুগে যুগে তাই এ দেশ তাঁকে স্মরণ করবে শ্রদ্ধার সঙ্গে। সবসময় এই উচ্ছ্বাস তীব্রভাবে চোখে না পড়লেও কুটি মনসুরের নাম বাঙালির অন্তরে জাগ্রত থাকবে জসীমউদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, কানাইলাল শীল, মমতাজ আলী খান, আবদুল আলীম প্রমুখ গুণী শিল্পীর নামের মতো। কুটি মুনসুরের গান বাংলার জল-হাওয়া-মাটি থেকে মুছে যেতে পারে না কোনদিন। কেননা বিচিত্ৰ অজস্র বিষয় নিয়ে প্রায় ছয় সহস্রাধিক গান রচনা ও সুরারোপ করার নজির আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই।
লোকসংগীতে আত্মনিবেদিত এই গীতিকবি জন্মগ্রহণ করেন ২৮ ডিসেম্বর ১৯২৬ সালে ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন থানার লোহারটেক গ্রামে। প্রকৃত নাম মোহাম্মদ মনসুর আলী খান। এক বোন আর তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট ছিলেন বলে তাঁর মা তাঁকে ‘কুটি’ বলে ডাকতেন। মায়ের ডাকা নামটি উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর মমতাময়ী সেই মায়ের নাম ছিল আবেদুন নেছা খানম আর পিতার নাম মোহাম্মদ আবেদ আলী খান। ফরিদপুর এলাকায় মনসুর নামে আরেকজন সংগীতশিল্পী থাকায় তিনি নিজের নামের আগে মায়ের দেয়া ডাকনাম ‘কুটি’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। মায়ের স্মৃতি নামের সঙ্গে বহন করে কুটি মনসুর হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের লোকসংগীতের এক অনন্য দিকপাল, মরমী সুরসাধক, স্বভাবসুন্দর গীতিকবি। আর ডাকনামই হয়ে হয়ে তাঁর মূল নাম। তিনি হয়ে কুটিভাই কিংবা কুটিচাচা।
কুটি মনসুর একটি সংগ্রামী নাম। জীবনের প্রতিটি বাঁকে লৌহকঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁকে অগ্রসর হতে হয়েছে। শৈশবের খেলার সাথী পদ্মার ভাঙনের আর্তনাদ যেন গ্রাস করে চলেছিল কুটি মনসুরকে। তাই প্রকৃতির প্রেমে বেমালুম বুঁদ হয়ে পবিত্র সুরের ইন্দ্রজালে ডুবে থাকা কুটি মনসুরের সুখটুকু ভেসে গিয়েছিল পদ্মার করাল গ্রাসে। সেই থেকে এই উত্তরণ-অনেক বড় সাধনার ফল।
১৯৩২ সালে ৬ বছর বয়সে কুটি মনসুর স্কুলে ভর্তি হন। শিশুকাল থেকেই তাঁর প্রতিভার স্ফুরণ সবাই লক্ষ করেছিলেন। লেখাপড়ায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। পড়াশুনা কম করেও তিনি মেধা তালিকায় সব সময় উপরের দিকে স্থান পেতেন। তাই শিক্ষকরা তাঁকে খুব ভালবাসতেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে স্কুলের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে তিনি সকলকে চমকে দিয়েছিলেন শিক্ষকরা সেদিন দোয়া করে বলেছিলেন বেঁচে থাকলে এই কুটি মনসুর বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি হতে পারবে। শিক্ষকের সেই আন্তরিক প্রার্থনা অনেকটাই ফলে গিয়েছে। তিনি হয়েছেন বাংলাগানের মুকুটহীন এক গীতিকবি।
একসময় সেই শিক্ষক এবং গ্রামবাসীর অনুপ্রেরণায় কুটি মনসুর লেখাপড়া করে জীবনে অনেক বড় হবার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে তাঁর পিতা মারা যান। এরপর পড়াশোনায় আর মন বসেনি। তবু নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু গান করার কারণে তাঁর চাচারা তাঁকে মারধর করতেন। চাচাতো ভাইয়েরা কুটির উপর ক্ষিপ্ত হয়ে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার পাঁয়তারা করে। চাচাতো ভাইয়েরা তাঁর পৈত্রিক জমি জবরদখল করে ভোগ করতে থাকে এবং একপর্যায়ে চাচা ও চাচাতো ভাইদের উপর অভিমান করে ঢাকায় চলে আসেন।
বিদ্যায়তনিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে ফেললেও তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল অপরিসীম। প্রকৃতির পাঠশালা থেকে তিনি জ্ঞানের পাঠ সংগ্রহ করতেন। মরমি চেতনা প্রস্ফুটিত হয় তাঁর সৃষ্টিকর্তার উপর অগাধ বিশ্বাস থেকে। লোকগানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী হলেও মরমী গীতিকবি হিসেবে তিনি অধিক পরিচিত লাভ করেন।
কিশোর কুটি মনসুরকে সংসার কখনোই টানতে পারেনি। বড় ভাইবোনেরা সচ্ছল জীবনযাপন করলেও তাঁর দিকে খেয়াল রাখেনি কেউ। বালক কুটি মনসুরকে টেনে নিয়েছিলো মাটির মায়া আর মায়ার সুর। সেই সময়ে গ্রামে এবং গ্রামের আশেপাশে যেখানে যত কবিগান, বিচারগান, জারিগান হতো তিনি দুর্নিবার আগ্রহ নিয়ে ছুটে যেতেন সেখানে। এভাবেই তাকে গানের নেশা টেনে ধরে। বাংলাদেশ বেতরের মুখপত্র ‘বেতার বাংলা’য় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন-
“আমাদের পাশের গ্রামে আনসারউদ্দিন ফকির নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মারফতি, মুর্শিদি, আধ্যাত্মিক গান গাইতেন। আমি প্রতিদিন তার কাছে গিয়ে গান শুনতাম। তিনি প্রতিদিন আমাকে এভাবে আসতে দেখে একদিন বললেন, তুমি এসব গান শিখতে চাও? আমি বললাম, জ্বি, আমি শিখতে চাই। তিনি আমাকে তার শিষ্য বানিয়ে নিলেন। এরপর তার কাছে আমি অনেক মারফতি ও মুর্শিদি গান শিখেছি।” [সাক্ষাৎকার, বেতার বাংলা, বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা, ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫]
পারিবারিক পরিমণ্ডলে অর্থাৎ নিজের বংশে গান বাজনার রেওয়াজ ছিলো না বলে সংগীতপাগল কুটি মনসুর লুকিয়ে লুকিয়ে গান শিখেছেন আর লুকিয়ে লুকিয়েই দোতারায় তালিম নিতেন ‘হিন্দুপাড়া’র ‘সেরু মাঝি’ নামক এক দোতারাবাদকের কাছে। এই সেরু মাঝিই ছিলেন তাঁর দোতারার ওস্তাদ। তিনি দু’টাকা দিয়ে কুটি মনসুরকে একটি নিমের দোতারা কিনে দিয়ে তাঁকে সুরের দরিয়ায় ভাসিয়ে দেন। সুরের সাধনায় নিমজ্জিত হয়ে কুটি মনসুর নিজেই সংগীত রচনা করে তাতে সুর দিয়ে একমনে গাইতেন। একদিন ওস্তাদজি তাঁর গান শুনে তার কণ্ঠের প্রশংসা করেন। এতে তিনি উৎসাহিত হন এবং প্রকাশ্যে গান গাইতে শুরু করেন। বিষয়টি বাড়ির মুরুব্বিরা জানতে পেরে খুবই ক্ষুব্ধ হন এবং প্রচণ্ডভাবে শাসন করেন এই বলে যে গান নিয়ে থাকলে তাকে এই পরিবার ত্যাগ করতে হবে।
জগৎ সংসারের কোন রক্তচক্ষু কি সুরের সাধকের পথ রুদ্ধ করতে পারে? তাই সুরের মায়ায় সংসারের সকল বাঁধা উপেক্ষা করে ১৯৫০ সালে প্রিয় গ্রাম ছেড়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। সঙ্গে নিমের দোতারা আর পয়সা দশ আনা। অচেনা ঢাকা শহরে বহু কষ্টে কেটেছে তাঁর দিন। থাকার জায়গা নেই, খাবারের পয়সা নেই, লেখার জন্য রাতে আলো নেই তবু থেমে যাননি অদম্য সাহসী কুটি মনসুর। ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে তাঁর সাহসী কলম গর্জে ওঠে। তিনি লিখেন ‘দরদিনী মা – জননী কান্দিও না আর’। গানটি সুধীমহলে বেশ প্রশংসিত হয়। শিল্পী হিসেবে পরিচিতিও বাড়তে থাকে তাঁর।
১৯৫৩ সালে বহু কষ্টে তিনি আদমজী জুটমিলে চাকরি পান। সেখানে পরিশ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক কম থাকায় অবসরে ঢাকায় চাকরি খুঁজতেন। ১৯৫৯ সালে একদিন তার ফুপাতো ভাই ডা. জালাল সাহেবের সহযোগিতায় মৎস্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারণ শাখায় একটি সরকারি চাকরির সন্ধান পান যার কাজই হচ্ছে গানের মাধ্যমে দেশের মানুষকে মৎস্য চাষে উদ্বুদ্ধ করা। এর জন্য এস.এস.সি পাসের সার্টিফিকেট চাওয়া হয়েছিল। তিনি ছিলেন নবম শ্রেণি পাস। তারপরেও জালাল সাহেব তাঁকে দরখাস্ত করতে বলেন। কারণ তারা এমন একজন লোকই খুঁজছেন যিনি একাধারে গান লিখে সুর করে নিজেই গাইতে পারেন। একথা শুনে কুটি মনসুর আবেদন করলেন। মৎস্য বিভাগের কুটি মনসুর একজন কবি ও গায়ক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি গান রচনা করে প্রচার করতে থাকেন। সেইসময় এ সকল গান বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এসব কারণেই ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বেতারে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এরপর ১৯৬২ সালে গীতিকার এবং ১৯৬৪ সালে সুরকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৬৬ সালে তালিকাভুক্ত হন টেলিভিশনে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৭ সাল থেকে টেলিভিশনে কণ্ঠশিল্পিী, গীতিকার, সুরকার এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের কণ্ঠশিল্পী অডিশন বোর্ডের সম্মানিত বিচারকমণ্ডলীর একজন সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
কুটি মনসুরের সঙ্গে পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের আন্তরিক সখ্য ছিল। ফরিদপুরের সংগীতশিল্পী বিষ্ণুপদ ঘোষাল এক নিবন্ধে জানিয়েছেন, ‘এদেশের বহু অঞ্চলে আমাদের পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের গানের জলসায় রাত কাটিয়েছেন তিনি। তাঁর লেখঅ গানে তাই পল্লিকবির অনেক স্মৃতিকথার উল্লেখ লক্ষ করা যায়। কুটি মনসুর মূলত কবির অন্তরের সাথে আধ্যাত্ম প্রেম ও প্রীতির বাঁধনে বাঁধা অত্যন্ত আপনজন ও কাছের মানুষ।’ [বিষ্ণুপদ ঘোষাল, ‘মরমি সংগীত-গবেষক কুটি মনসুর: লোকসংগীতের এক প্রাণপুরুষ’ মাসিক ‘সংগীত’, ঢাকা, আগস্ট ১৯৯৭]
১৯৭১ সালে মরমি এই গীতিকবির কলম আবার গর্জে ওঠে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে। তিনি লেখেন-
ন্যায্য কথা বলতে গিয়ে
নেতারা সব জেলে
বাঙালিরা দোষী কোন জায়গায়!
তার রচিত গানগুলো তখন বাঙালির মনে সাহসের সঞ্চার করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবারো ঝলসে ওঠে কুটি মনসুরের অগ্নিঝরা কলম। সেই সময় লেখা অসংখ্য গানের মধ্যে জনপ্রিয় একটি গান হলো- শিয়াল কয় খাঁটাশ ভাইরে উপায় নাইরে জীবন বাঁচাই কেমন করে’ এই গানটির শেষের অন্তরাটি ছিল এরকম-
ইয়াহিয়া টিক্কাখান আর যুদ্ধবন্দী বেঈমান
জ্বালাইয়া পোড়াইয়া সোনার বাংলাদেশ করে শ্মশান
বঙ্গবন্ধু নির্দোষী হুকুম হয় তাঁর হবে ফাঁসি
কুটি মনসুর বলে বিশ্ববাসী বিচার কর ইয়াহিয়ারে
শিয়াল কয় খাটাশ ভাইরে উপায় নাইরে
জীবন বাঁচাই কেমন করে।
এমন অনেক গান লিখে মুক্তিযোদ্ধাদের মাতৃভূমি রক্ষায় অনুপ্রাণিত করার জন্য কুটি মনসুরের শ্বশুরবাড়ি ঢাকা জেলার দোহার অঞ্চলের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তাঁকে ‘কলমসৈনিক’ হিসেবে সনদ প্রদান করেন। এই স্বীকৃতি মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী হিসেবে।
সাধক এই গীতিকবি সাধারণ গানের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সময় মৎস্য অধিদপ্তর, কৃষি ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে বহু গান রচনা করে গেছেন, সুতরাং তাঁকে কেবল মরমি গীতিকবি বলা যায় না। এই পরিচয়ে তাঁকে সীমিম করার সুযোগ নেই। বাংলা গানের সকল শাখায় ছিল তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ। সাধনার জোরে তিনি জয় করেছিলেন সম্মান। সকল প্রতিকূলতাকে ঠেলে এ দেশের লোকগানের জগতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপরিহার্য। বেতার-টেলিভিশনের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রেও গীতরচনা ও সংগীত পরিচালনা করেন।
ফরিদপুরের বিশিষ্ট লোকসংগীত গবেষক খলিলুল্লাহ দিলদরাজ দৈনিক নব অভিযান পত্রিকায় এক প্রবন্ধে জানিয়েছেন, খোরশেদ কবি, আবদুল হালিম মিয়া, হাজেরা বিবি, কমলাবালা বৈষ্ণবী, দেওয়ান আহমদ ফকির, রজ্জব দেওয়ান, খালেক দেওয়ান ও আহমদ ফকির প্রমুখের সঙ্গে বিচারগানের পাল্লায় অংশ নিয়েছেন।* বিচারগানে অংশ নেওয়া এবং সারারাত প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুক্তিতর্কের পাল্লা চালিয়ে একজন শিল্পীর জন্য বিরাট কৃতিত্বের ব্যাপার। কুটি মনসুর সেই কৃতিত্বের ও অংশীদার।
[* খলিলুল্লাহ দিলদরাজ, লোককবি মরমিশিল্পী কুটি মনসুর, দৈনিক নব অভিযান, ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৮৫]
ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও কৃতিত্ব অর্জনের পরেও জাতীয় স্বীকৃতি না পাওয়ায় তাঁর কিছুটা আক্ষেপ ছিল। কিছুদিন আগে এক পত্রিকায় তিনি সেই আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছিলেন-
“৮৩ বছর বয়সে সারা দেশের মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছি বহুবার কিন্তু সরকারিভাবে কোন স্বীকৃতি পেলাম না। আমার কথা সরকার মনে রেখেছে বলে মনে হয় না। এই আক্ষেপ নিয়েই হয়তো একদিন বিদায় নিতে হবে।”[ দৈনিক বাংলাদেশ সময়’, ঢাকা, ১৭ জুন ২০১০]
সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করার পর ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপিতে সংগীত প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ পরিদপ্তরের অধীনে খণ্ডকালীন ভিত্তিতে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য তাঁর রচিত ৩০০টি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের গান দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাউলশিল্পীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এ সকল গান বাংলাদেশ বেতারের জনসংখ্যা কার্যক্রমেও প্রচার হচ্ছে। এরপর বঙ্গবন্ধু ললিতকলা একাডেমিতে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অধ্যক্ষ হিসিবে তিনি দ্বায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৯৮ সালে পরম সৌভাগ্যের কারণে এই মহান গীতিকবির সান্নিধ্য পাই আমি। অনেক কাছ থেকে দেখেছি সহজ-সরল নির্লোভ এক অসাধারণ শিল্পীকে। এম এ করিম নামের একজন গীতিকারের কিছু গানের সুর এবং সংগীত পরিচালনা করেন কুটি মনসুর। ঐ গানগুলোতে কণ্ঠ দেই আমি এবং বিশিষ্ট লোকসংগীতশিল্পী আবু বকর সিদ্দিক। তখন থেকেই তাঁর স্নেহের বন্ধনে আটকে আছি।
একসময় জানতে পারি কুটি মনসুর এবং আমার জন্মতারিখ একই। তারপর কুটি মনসুরের গান একসঙ্গে ঘটা করে জন্মদিন উদযাপন করেছি আমরা। এত মহান একজন গীতিকবি, একজন গুণী শিল্পীর হাত ধরে পরিবারের সঙ্গে কেক কেটেছি। এটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া, শ্রেষ্ঠ জন্মদিন হিসেবে স্মৃতির মণিকোঠায় জাগরূক থাকবে চিরদিন।
বহুদিন আমরা একসঙ্গে নানান গল্প করেছি। পরিবারের আরো একটি কন্যা হয়ে গেয়েছি তাঁর সুর করা গান গেয়ে। ছয়টি দশক ধরে সাধক এই গীতিকবি দেশকে উপহার দিয়েছেন বহু জনপ্রিয় গান, যে গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পীগণ।
আবদুল আলীম, মোস্তফা জামান আব্বাসী, আঞ্জুমান আরা বেগম, রথীন্দ্রনাথ রায়, সৈয়দ আব্দুল হাদী, ইন্দ্ৰমোহন রাজবংশী, ফকির আলমগীর, নীনা হামিদ, সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, মীনা বড়ুয়া, বিপুল ভট্টাচার্য, এন্ড্রু কিশোর, দিলরুবা খান, দীপ্তি ফিরোজ সাঁই, জানে আলম, মালা খুররম, মুজিব পরদেশী, কিরণচন্দ্র রায়, রাজবংশী, মোহাম্মদ খুরীদ আলম, কাননবালা সরকার, নাদিরা বেগম, নারায়ণ চন্দ্র শীল, চন্দনা মজুমদার, আকরামুল ইসলাম, শাম্মী আক্তার, সৈয়দ গোলাম আম্বিয়া, সুফিয়া মনোয়ার, নুরুন্নাহার আউয়াল, তপন চৌধুরী, রবি চৌধুরী, জহির আলীম, আজগর আলীম, জহুরা আলীম, এমএ মতিন, শাহাবুদ্দিন আহমেদ দোলন, আবু বকর সিদ্দিক, শুভ্র দেব, মমতাজ বেগম, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, শ্যামল কুমার পাল, তামান্না নিগার তুলি, মো. ইলিয়াস প্রমুখ শিল্পী তাঁর গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। স্বনামধন্য এই গীতিকবির গান উল্লেখিত শিল্পীদের কণ্ঠে সারা বাংলায় ছড়িয়ে আছে বাংলার ঐতিহ্য হয়ে। এই সম্পাদকেরও সৌভাগ্য হয় কুটি মনসুরের গান কণ্ঠে তুলে নেওয়ার।
কুটি মনসুর রচিত গান নিয়ে ইতোমধ্যে ৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো হলো- ‘আমার বঙ্গবন্ধু আমার ৭১’, ‘কুটি মনসুরের অমর সংগীত’, ‘মীন-গীতিকা’, ‘পরিবার পরিকল্পনার গান’ এবং ‘কুটি মনসুরের ভাণ্ডারী গান’।
সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এযাবৎ তিনি অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে সংবর্ধিত এবং পুরস্কৃত হয়েছেন। তার মধ্যে থেকে নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হল:
১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত পুরস্কার ২০১৭
২. ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার ১৪১১ বাং ৩. লোকাঙ্গন সাংস্কৃতিক সংগঠন পুরস্কার ২০১৪
৪. মহাকবি কায়কোবাদ স্মৃতি পদক ২০১১
৫. খেলাঘর জাতীয় শিশুকিশোর সাংস্কৃতিক উৎসব পুরস্কার ২০১০
৬. ওস্তাদ মমতাজ আলী খান সংগীত একাডেমি পদক ২০১০
৭. ইউনিটি কালচারাল অর্গানাইজেশন পুরস্কার ২০০৫
৮. বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার ২০০৪
৯. ফরিদপুর সংগীতশিল্পী কল্যাণ সমিতি পুরস্কার ১৯৯৮
১০. মনোয়ার স্মৃতি পুরস্কার ১৯৯৬ ১১. সুরাকাশ শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার ১৯৯৬
১২. দুরন্ত সাংস্কৃতিক সংঘ পুরস্কার ১৯৯৫
১৩. রূপসী বাংলা সংগীত একাডেমি পুরস্কার ১৯৯২
১৪. ঢাকা সাংস্কৃতিক সংসদ পুরস্কার ১৯৮৯
২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার বনশ্রীর ভাড়া বাসায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন কুটি মনসুর। এরপর তাঁকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে ২৯ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় তাঁকে। এই হাসপাতালেই ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুই সব শেষ কথা নয়। কুটি মনসুর আছেন, তাঁর গান আছে, তাঁর সুর আছে। যতদিন গান আছে, কুটি মনসুর ততদিনই বেঁচে থাকবেন।
কুটি মনসুরের অজস্র গানের ভেতর থেকে বেছে নিয়ে এই সংকলন করতে উৎসাহী হয়েছি। এই কাজে আন্তরিকভাবে সার্বিক সহযোগিতা করেছে কুটি মনসুরের পুত্র জাহিদ মনসুর ও পরিবারের সকল সদস্য। বানান সমন্বয় এবং গানগুলো নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ আলোকায়ন প্রকাশনী স্বত্বাধিকারী জামাল নাসের মুকুল ভাইকে কৃতজ্ঞতা জানাই। গ্রন্থের প্রচ্ছদ অংকনের কৃতিত্ব অগ্রজপ্রতিম চিত্রশিল্পী নাজিব তারেক। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না।
বাংলা একাডেমির গবেষণা উপবিভাগের উপপরিচালক, অগ্রজপ্রতিম কবি-গীতিকার ড. তপন বাগচীর সহযোগিতাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। সম্পাদনার বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর পরামর্শ পেয়ে ঋদ্ধ হয়েছি। তাঁর লেখা ভূমিকাটি এই গ্রন্থের মর্যাদা বাড়িয়েছে। এখন পাঠক ভরসা। এই বই হোক কুটি মনসুরের বাণীর শুদ্ধতা রক্ষার অবলম্বন, সেই প্রত্যাশা রইল।
অণিমা মুক্তি গমেজ
সংগীতশিল্পী
অধ্যক্ষ, ঢাকা ক্রেডিট কালচারাল একাডেমি
ফার্মগেইট, ঢাকা
.
পল্লিগীতির সুধাকণ্ঠী শিল্পী অণিমা মুক্তি গমেজ এখন নিয়মিত কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখছেন। গবেষণা করেছেন সমর দাসের সংগীতজীবন নিয়ে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, নেপাল, ফিলিপাইন, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, উজবেকিস্তান, ইতালি, মিশর, ভুটান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনি গান গেয়ে সুনাম অর্জন করেন। ‘মানুষ রতন’, ‘সাগর কূলের নাইয়া’, ‘মনের মানুষ’, ‘বন্ধু দয়াময়’ এবং ‘উজান দেশের মাঝি’ তাঁর জনপ্রিয় অ্যালবাম। শ্রীপুর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী সম্মাননা, ‘অনন্যা শীর্ষ দশ নারী’ সম্মাননা, বাংলাদেশ বিনোদন সাংবাদিক সংস্থা পদক, ঢাকা কালচারাল রিপোর্টার্স ইউনিটি পদক, বাংলাদেশ মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন পদক, ঢাকা বিভাগীয় লোকসংগীত চ্যাম্পিয়ান পদক, আন্তঃমহাবিদ্যালয় সংগীত চ্যাম্পিয়ান পদক এবং ভারতের শিলচর লোকসংগীত উৎসব সম্মাননা ও ত্রিপুরা ফোকলোর একাডেমি প্রদত্ত ‘লোকসংগীত অনন্যা’ সম্মাননা তাঁর সাহিত্য ও সংগীতচর্চায় স্বীকৃতি। গবেষণার জন্য দুইবার লাভ করেছেন তথ্য মন্ত্রণালয়ভুক্ত বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ফেলোশিপ। তাঁর সংগীতজীবনের ২৫ বছরের অবদান নিয়ে সৈয়দা আঁখি হক রচনা করেছেন ‘পল্লিগীতির সুধাকণ্ঠ : রুপালি সুরের আলপনা’ নামের গবেষণাগ্রন্থ। কবি অণিমা মুক্তি গমেজের জন্ম ঢাকার নবাবগঞ্জের হাসনাবাদে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংগীতে স্নাতকোত্তর। ঢাকা ক্রেডিট কালচারাল একাডেমির অধ্যক্ষ। স্বামী ক্রীড়াবিদ রঞ্জিত চন্দ্র দাস। প্রকাশিত গ্রন্থ: আমার রঙিন ঘুড়ি (ছড়া ২০১৭), আকাশ ছোঁয়ার গল্প (গল্প ২০১৭), ভালো ভূতের রাজ্যে (উপন্যাস ২০১৮), গানের মাস্টার কোকিল (গল্প ২০১৮), চাঁদের আলোয় পুড়ছে বিরহক্ষণ (কবিতা, ২০১৮), সমর দাস : জীবন ও সংগীত (গবেষণা, যন্ত্রস্থ)।




Leave a Reply