ভাটিয়ালী গান – কুটি মনসুর

ভাটিয়ালী গান

২৫৭

পার হবো কেমনে অকূল নদী, দয়াল দরদী,
পার হবো কেমনে অকূল নদী।

সম্বল নাই, হইলাম কাঙাল,
বিপদে পইড়াছি দয়াল,
কিনার পাই দয়া করো যদি।
একে আমার ভাঙ্গা তরী,
পাল খাটে না, হায় কি করি,
কর্মে কি আছে দারুণ বিধি।

হয়তো মোরে পার করো,
না হয় ডুবাইয়া মারো,
মারতে পারো ইচ্ছা থাকে যদি।
অকূল গাঙ্গে ধরলাম পাড়ি, তুমি দয়াল হও কাণ্ডারী,
আমি এই তোমার আশায় কান্দি নিরবধি।

মাঝ দরিয়ায় নাও ঠেকাইয়া,
এই তোমার আশায় রইলাম চাইয়া,
তরাইও নাও দয়াল দরদী।
এই তোমায় দয়াল বলে কে ডাকিবে
যদি আমার তরী ডোবে,
কুটি মনসুর কয়, ডুইবা মরি যদি।

[রচনাকাল: ১০-০৭-১৯৭০; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: দিলরুবা খান]

২৫৮

উজান গাঙের মাঝি আমি,
ভাটির গাঙে যাই।
মনের কথা কইবো যদি,
বন্ধুর দেখা পাই।

মনের আশা মনে লইয়া,
উজান-ভাটির গাঙে যাইয়া রে,
বন্ধুর আশায় চাইয়া-চাইয়া

ধীরে ধীরে বৈঠা বাই।
দুঃখ-সুখের সাথী কইরা,
রাখবো তারে জনম ভইরা রে,
বন্ধু বিনে এই জীবনে
আপন বলতে কেহ নাই।

[রচনাকাল: ০৬-১২-১৯৮১; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মাহবুবুল আলম মনির]

২৫৯

ঈশান কোণে ধইরো পাড়ি,
নিশান রাইখো ঠিক রে মাঝি ভাই,
হইও না বেদিক।

বেলা গেল, পাড়ি ধরো লইয়া আল্লাহ্র নাম,
শক্ত কইরা হাইল ধইরা তুইলা দাও বাদাম।
মাঝি, তুইলা দাও বাদাম,
ঢেউয়ের উপর রাইখা নজর চালাও সামনের দিক।

কূল নাই সে অকূল গাঙে, ঢেউয়ের উপর ঢেউ ভাঙ্গে,
ঘুর্ণিপাকে ঘুরায় নৌকা, লক্ষ্য রাইখো সেইদিক।

কালো মেঘে আকাশ ছাওয়া, কোন সময় কি হয়,
বান ডাকিলে নদীর কূলে দমকা হাওয়ার ভয়।
মাঝি, দমকা হাওয়ার ভয়,
তাড়াতাড়ি জমাও পাড়ি, বেলা নাই অধিক।

[রচনাকাল: ২৮-০২-১৯৭০; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: ইন্দ্র মোহন রাজবংশী]

২৬০

জোয়ার পাইয়া রসিক নাইয়া,
পানসি বাইয়া যায়।
ছই ঘেরা নাও লইয়া মাঝি,
রঙিন পাল উড়ায়।

ইচ্ছা করে নদীর ঘাটে জল আনিতে যাবো,
ঘাটে যাইয়া বাপের দেশের মাঝির দেখা পাবো।
ডাইকা তারে জিজ্ঞাসিবো,
নাও যদি ভিড়ায়।

সুজন মাঝির নৌকায় যদি নিতো আমায় তুইলা,
হিজলতলী যাইতাম আমার বাপের দেশে চইলা।
পরের ঘরে মইলাম জ্বইলা,
জীবন যন্ত্রণায়।

[রচনাকাল: ১৭-১০-১৯৮৭; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আনোয়ারা বেগম]

২৬

হায় রে দরিয়ার তরঙ্গ রে দেইখা,
কিনার লাগাইয়া রে নাও বাইও।

উত্তরে সাজিলোরে মেঘ, দেওয়ায় দিলো ডাক,
ছুটিল কান্ডারীর বৈঠা,
আমার নৌকায় খাইলো পাক রে।

সমুদ্দুরে উঠে ঢেউ, কূলে আইসা মিশে,
যে দেশে মোর দরদী আছে,
আমি যাব সেই না দেশে রে।

আগা দিয়া উঠে ঢেউ, পাছা দিয়া যায়,
কত হীরামন মানিক্যে ভরা,
আমার স্রোতে লইয়া যায় রে।

[রচনাকাল: ২৬-১০-১৯৭৬; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নুরুন্নাহার আউয়াল]

২৬

ঢেউ চিনিয়া মন-মাঝিয়া,
বাইও এই তোমার নাও।
অকূল সায়রে মাঝি,
শক্ত হাতে বৈঠা বাও।

নিরিখ রাইখো নয়ন দুটি,
কইসা ধরো হাইলের গুটি রে,
জাঙার দড়ি বান্ধো আঁটি,
মাস্তুলেতে পাল খাটাও।

ভাইটাল কোণে পাড়ি ধরো,
মুর্শিদ নাম জপনা করো রে,
নামের গুণে যাইতে পারো,
হুশিয়াবে পাড়ি দাও।

বাইও নদীর বাঁকে বাঁকে,
নাও ডুবাইও না ঘূর্ণিপাকে রে,
মনসুর বলে, সাবধান থেকে
বেলা থাকতে কূলে যাও।

[রচনাকাল: ০৫-০৯-১৯৭১; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: বিপুল ভট্টাচার্য্য]

২৬

সাগরে উইঠাছে তুফান,
গুড় গুড় দেওয়া ডাকে রে,
পইড়াছি ঘোর ঘূর্ণিপাকে।

হাল নাই, পাল নাই, মোর নাই রে দাঁড়ের দড়ি,
এমনও ভয়াল দরিয়া কেমনে দেবো পাড়ি?
কেবা দয়াল বন্ধু হইয়া তরাইবে বিপাকে রে?

ভাঙ্গা আমার নায়ের তলা, ভাঙ্গা নায়ের ছইয়া,
পাগলা সিন্ধুর অন্ধ ঢেউয়ে গোলই গেলো খইয়া।

কত মাঝি গেলো তইরা সাগর পাড়ি দিয়া,
মনসুর কয়, মোর জীবন গেলো ভাঙ্গা তরী বাইয়া।
কে নিবে আজ পার করিয়া ভব-সাগর বাঁকে রে?

[রচনাকাল: ২৫-০২-১৯৯১; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: লোকমান হোসেন]

২৬

জোয়ারে ভাসাইলাম তরী,
কূল পাইলাম না বাইয়া,
আমার বেলা যায় ফুরাইয়া।

মাঝ দরিয়ায় রইলাম পড়ে,
ঠেকলো তরী বালুচরে,
সেইপারে যাই কেমন করে?
আমায় কে নিবে তরাইয়া?

বাঁকায় বাঁকায় বাইয়া তরী,
কইরাছি যে ভুল।
সুজন মাঝি হইতাম যদি,
পাইতাম নদীর কূল।

উথাল-পাথাল নদীর পানি,
ঢেউয়ে করে হানাহানি,
বিজলি ঠাটা কালো মেঘে,
আকাশ গেল ছাইয়া।

[রচনাকাল: ২০-১১-১৯৭৯; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: এম. এ. আলীম]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *