১০. কথা বলার ধরন পাল্টানো

১০. কথা বলার ধরন পাল্টানো

বিশ্বাস করবেন কি, সারা পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ রাখার জন্য আমরা চারটে পথই আছে জানি। এই চারটি

পথেই আমাদের মূল্যায়ন আর বিশ্লেষণ ঘটে। সেই চারটে পথ হল :

১। আমরা কি করি।

২। আমরা কেমন দেখতে।

৩। আমরা কি বলি।

৪। আমরা কিভাবে বলি।

জন-সংযোগের ক্ষেত্রে বক্তৃতা দান শেখানোর জন্য পাঠক্রম চালু করার সময় প্রথমে আমি কণ্ঠস্বর মার্জিত আর জোরালো গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রচুর অনুশীলনের বন্দোবস্ত রাখতাম। বেশ কিছুকাল এটা করার পর বুঝলাম এর কোন প্রয়োজন সত্যিই নেই, কারণ যারা রোজ তিন ও চার ঘন্টা সময় ব্যয় করতে পারেন তারাই এটা পারেন। সাধারণ মানুষ যারা জনসংযোগ চান তারা এত সময় ব্যয় করতে পারবেন না। আমি বুঝলাম জন্মদও কণ্ঠস্বরই সাধারণের পক্ষে যথেষ্ট। আমার সৌভাগ্য যে সময় থাকতেই ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। আমি বরং বক্তাদের সাধারণ বক্তৃতাদানের ভয় মুক্ত করতে চেষ্টা চালালাম-এর ফলও হল আশ্চর্য রকম ভাল। এবার যা করণীয় সে কথাই বলব।

১. আত্মসচেতনার খোলস ছাড়ুন

আমার পাঠক্রমে একটা চেষ্টা চালানো হয় বয়স্ক আত্মসচেতন মানুষদের যতখানি সম্ভব মুক্ত ভাবনার মানুষ হয়ে উঠতে। প্রায় হাত জোড় করে তাই সব সদস্যদের অনুরোধ করি, তারা যেন দয়া করে তাদের খোলস ছেড়ে বাইরে আসার চেষ্টা করেন। তাদের বলি এরকম করলে দুনিয়া তাদের আদর করে কাছে টেনে নেবে। মার্শাল বাক যেমন যুদ্ধ সম্পর্কে বলেছেন, ’ধারণাটা খুবই সহজ, তবে ঠিক মত কাজে লাগানোই কঠিন।’ এই কঠিন হয়ে থাকা কথাটা শুধু শারীরিক দিক থেকেই হয় না এটা মনের দিকেও থাকে। এ একটা বড় রকম বাধা।

শ্রোতাদের সামনে স্বাভাবিক থাকা তেমন সহজ নয় সন্দেহ নেই। অভিনেতারা কথাটা জানেন। আপনার বয়স যখন চার বছর ছিল তখন বোধ হয় অনায়াসেই কোন মঞ্চে উঠে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছেন, কিন্তু যখন আপনার বয়স চব্বিশ তখন মঞ্চে উঠলে অবস্থাটা কি রকম হয়? চারবছর বয়সে যে স্বাভাবিকতা ছিল তা কি আর অবশিষ্ট থাকে? না, আপনি তখন নিজেকে স্বভাবতই গুটিয়ে ফেলার অবস্থাতেই থাকবেন।

বয়স্কদের এইভাবে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শেখানো বেশ কঠিন কাজ না বলাই শ্রেয়। এটা শেখানোর সময় কথা বলার ফাঁকে বহুবার আমি কোন সদস্য বক্তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়েছি আর বলেছি, একজন স্বাভাবিক মানুষের মত কথা বলুন।’ বহুবারই দুশ্চিন্তা নিয়ে আমায় বাড়ি ফিরতে হয়েছে। না, জেনে রাখবেন, কথাটা অত সহজ শোনাচ্ছে কাজে আদৌও তা নয়। . আমি আমার ক্লাসের পাঠক্রমে সদস্যদের কথা বলার ফাঁকে একটু অভিনয়ের ভঙ্গী করতে বলি। তারা এ রকম করার পর আশ্চর্য হয়ে দেখে কাজটা বোকার মত মনে হলেও নিজেদের করার পর তা আর মনে হয় না। ক্লাসের শ্রোতারাও অবাক না হয়ে পারে না।

একাজ করতে গেলে আপনি আসলে পাখির ডানা মেলার মতই মুক্ত বলে নিজেকে ভাবেন–আপনি তখন আর খাঁচায় বন্ধ থাকেন না। মানুষ কেন দল বেঁধে নাটক দেখতে ছোটে জানেন? এর একটা মাত্রই কারণ আছে–তারা তাদের মত মানুষকে, সামনে নির্ভয়ে মুক্ত হয়ে আবেগ ইত্যাদির প্রকাশ করতে দেখতে চায়।

২. অন্যের নকল করবেন না

আমরা সেই সব বক্তাকে প্রাণ দিয়ে প্রশংসা জানাই যারা চমুকারভাবে কথা বলেন আর নিজেকে প্রকাশ করতে ভয় পান না বা ঘাবড়ে যান না। শ্রোতাদের সামনে তারা বেশ স্বাভাবিক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার অল্প কিছুদিন পরে আমার সঙ্গে দুই ভাই, স্যার রস আর স্যার কিথ স্মিথের লণ্ডনে দেখা হয়। তাঁরা সবে মাত্র লণ্ডন থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ঘোষিত পঞ্চান্ন হাজার ডলার পুরস্কার জিতে ছিলেন। তাঁরা সারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সাড়া তুলেছিলেন আর রাজা তাদের নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।

ক্যাপ্টেন হার্লি নামে একজন বিখ্যাত লোকচিত্রী তাঁদের সঙ্গে নিয়ে চলচ্চিত্র তুলেছিলেন। আমি তাঁদের একটা ছবিসহ প্রমাণ বিষয়ক কথিকা লিখতে সাহায্য করি। তারা দিনের পর দিন কথিকাটি অনুশীলন করেছিলেন।

তাঁদের তিনজনের অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম ছিল। পাশাপাশি বসে তাঁরা প্রায় অর্ধেক বিশ্ব ভ্রমণ করেন। তারা একই বক্তব্য রেখে চলেছিলেন। তবুও তাঁদের বক্তব্য কিন্তু একই রকম শোনায় নি।

যে কোন বক্তব্যের মধ্যে শুধু সাজানো কথাগুলো ছাড়াও থাকে বাচনভঙ্গী–আর এরই দাম সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে যে রঙ আর রস থাকে তারই গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী হয়। আপনি যা বলেন তার চেয়ে কিভাবে বলেন সেটাই বিচার্য।

বিখ্যাত রুশ চিত্রশিল্পী ব্রুলফ একবার একজন ছাত্রের আঁকা ছবি সংশোধন করে দেন। ছেলেটি পাল্টানো ছবি দেখে অবাক হয়ে বলে ওঠে : ‘কী আশ্চর্য! আপনি শুধু একটা আঁচড়েই ছবিটি একেবারে বদলে দিয়েছেন।’ ফ্রলফ উত্তর দেন : ‘শিল্প আঁচড় থেকেই জন্মায়।‘ বক্তৃতার ব্যাপারটাও তাই।

ইংরেজদের পার্লামেন্টের বিষয়ে একটা প্রাচীন প্রবাদ চালু আছে। সেটা হল কোন বিষয়ে নয়, সব কিছু নির্ভর করে একজন বক্তা কিভাবে সেটা বলেন তার উপর। বহুবছর আগে কথাটা বলেন কুইন্টিলিয়ান, ইংল্যাণ্ড যখন রোমের উপনিবেশ ছিল।

বিখ্যাত হেনরী ফোর্ড বলেছিলেন, সমস্ত ফোর্ডরা একই রকম, অথচ কোন দুজন ফোর্ড এক নয়। সূর্যের আলোয় প্রতিটি নতুন জীবনই নতুন কিছু।এর আগে এমন কিছু ছিল না, আর ভবিষ্যতেও হবে না। প্রত্যেক তরুণের তাই উচিত অন্যের চেয়ে আলাদা করে নিজেকে চিহ্নিত করতে। একজনের মধ্যে যে বিদ্যুৎ স্পর্শ আছে তাকে জাগিয়ে তোলার মধ্য দিয়েই তার গুরুত্ব প্রকাশ পায়।

জনসংযোগ আর বক্তৃতার ব্যাপারেও কথাটা প্রযোজ্য। আপনার মত আর কোন মানুষ নেই। কোটি কোটি মানুষের হাত, পা, নাক, চোখ, মুখ থাকে,অথচ তাদের কাউকেই আপনার মত দেখতে নয়। স্বাভাবিক ভঙ্গীতে আপনি যখন বক্তব্য রাখবেন অন্য কেউই আপনার মত পারবে না।

স্যার অলিভার লজ একজন আদর্শ বক্তা ছিলেন। তাঁর বিশেষত্ব ছিল টাক মাথা আর দাড়ি। অথচ তিনি লয়েড জর্জকে নকল করার চেষ্টা করলে কিছুতেই বিখ্যাত হতে পারতেন না।

আব্রাহাম লিঙ্কন আর সিনেটের স্টিফেন এ, ডগলাস ছিলেন দুটি আলাদা চরিত্র আর বৈশিষ্ট্যের মানুষ। ১৮৫৮ সালে আমেরিকায় তাদের মধ্যেই বোধ হয় সবচেয়ে বিখ্যাত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।

ডগলাস ছিলেন একজন সংস্কৃতি সম্পন্ন মানুষ। লিঙ্কন ছিলেন একদম বিপরীত। ডগলাসের ভাবভঙ্গী ছিল রুচিপূর্ণ। লিঙ্কনের মোটেও তা নয়। ডগলাসের মধ্যে কোন রকম রসাল ভাব থাকতো না, অথচ লিঙ্কন ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রসজ্ঞ বক্তা। ডগলাস কদাচিত হাসতেন। লিঙ্কন কথায় কথায় হেসে উদাহরণ রাখতেন, ডগলাস দ্রুত চিন্তা করতেন আর লিঙ্কনের মনের গতি ছিল অতি বীর।

অথচ এ ধরণের বিভিন্নতা আর বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও দুজনেই হয়ে উঠেছিলেন শ্রোতাদের কাছে একান্ত প্রিয় বক্তা। দুজনের প্রত্যেকেই নিজের বৈশিষ্ট্য দিয়ে শ্রোতার মন জয় করেন, কেউ কাউকে নকল করেন নি।

৩. শ্রোতাদের সঙ্গে কথা বলা

হাজার হাজার মানুষ যেমনভাবে কথা বলে সেই বিশেষ ভঙ্গী নিয় একটা উদাহরণ দিই আসুন। একবার আমি সুইজারল্যান্ড এলাকায় আল্পস পর্বতের কাছে মুরেন গ্রীষ্মবাসে ছিলাম। আমি লণ্ডনের কোন প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত এক হোটেলে ছিলাম, আর তারা সাধারণতঃ লণ্ডন থেকে অতিথিদের জন্য কিছু কিছু বক্তৃতা পাঠাত। এদের মধ্যে একজন ছিলেন নামকরা ঔপন্যাসিক। তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘উপন্যাসের ভবিষ্যত’। ঔপন্যাসিক ভদ্রমহিলা স্বীকার করেছিলেন লেখাটা সম্বন্ধে তাঁর কোন ধারণাই নেই-ওটা বলতে তার কোন রকম আগ্রহও নেই। যাই হোক লিখিত বক্তৃতাটায় একবার চোখ বুলিয়ে তিনি কিছু নোট করে নিলেন তারপর শ্রোতাদের সামনে উঠে দাঁড়ালেন। এবার শ্রোতাদের সম্পূর্ণ অগ্রআহ্য করে তাদের দিকে একদম না তাকিয়ে তিনি কখনও তার হাতের কাগজে, কখনও বা মেঝের দিকে, কখনও বা শ্রোতাদের মাথার উপর দিকে তাকিয়ে প্রাগৈতিহাসিক এক ভঙ্গীতে কি যে বলে গেলেন কে জানে?

ব্যাপার হল এটা বক্তৃতা দেবার কোন পদ্ধতিই নয়। এ হল স্বগতোক্তি, এর মধ্যে যোগাযোগের কোনরকম চিহ্নই থাকে না। অথচ ভাল বক্তৃতায় সেটাই প্রধান প্রয়োজন। এটা হল সংযোগ স্থাপন। শ্রোতাদের বোঝাতে হবে যে তাদের কাছে একটা যোগসূত্র রাখা হচ্ছে–বক্তার সঙ্গে তাদের হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন করা চাই। যে বক্তৃতার কথা বললাম, এরকম বক্তৃতা গোবি মরুভূমির জনশূন্য প্রান্তরেই যদি দেওয়া যায় কোন জীবন্ত মানুষের সামনে, তার কোন দাম থাকে না।

কথা বলার কায়দার উপর নানা রকম সব বাজে কথা অনেকই বলেছেন। নানা রকম আইন কানুনের বেড়াজালেও তা ঢাকা। সব ব্যাপারটাই হাস্যকর। বিক্রয় প্রতিনিধিরা এ ধরণের নানা বই পাঠাগারগুলোয় হাতড়ে বেড়িয়েছেন, যার সবগুলোই বাজে।

বিশ শতকের পর এই ধরণের নানা স্কুল গজিয়ে উঠেছে। এর সবই আধুনিকতার সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি

মার্ক টোয়েন যখন একবার নেভাদা মাইনিং স্কুলে একটা বক্তৃতা শেষ করেন তখন শ্রোতাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে : এটাই কি আপনার স্বাভাবিক বক্তৃতার স্বর?

শ্রোতারা ঠিক এটাই চান : আপনার স্বাভাবিক স্বর। এ ধরনের স্বাভাবিক স্বর লাভ করা যায় একমাত্র অনুশীলন কারা মধ্য দিয়ে। যখন অনুশীলন চালাবেন তখন মাঝে মাঝেই থেমে নিজেকে প্রশ্ন করবেন : ‘শোন হে! কিছু ভুল হল নাকি? ঠিক করে নাও।’ এবার শ্রোতাদের মধ্যে মনে মনে কাউকে বেছে নিয়ে তার সঙ্গে কাল্পনিক কথাবার্তা বলতে থাকুন। মনে ভাববেন যে আপনাকে কোন প্রশ্ন করেছে। আর আপনি তার উত্তর দিচ্ছেন। সে প্রশ্ন যে কোন রকমই হতে পারে।

স্যার অলিভার লজ নামে একজন বক্তাকে পরমাণু ও পৃথিবী সম্পর্কে বলতে বলেছিলাম। তিনি তার কথায় মগ্ন, একাত্ম হয়ে ছিলেন। এইভাবেই বক্তৃতায় আপনাকে একাত্ম হতে হবে।

শ্রোতাদের সামনে এমনভাবে বক্তৃতা করবেন না যাতে শ্রোতারা বুঝতে পারেন আপনি আগে থেকে বক্তৃতাটা নিখুঁত তৈরি করে এসেছেন। স্বাভাবিক ভাবে আপনার কথা হতে হবে যাতে শ্রোতারা আদৌ বুঝতে না পারেন এ বক্তৃতা আপনার পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তৈরি। একজন সত্যিকার ভাল বক্তা এ রকম করবেন না।

৪. আপনার কথায় মনপ্রাণ সঁপে দিন

প্রচেষ্টা আর আগ্রহ আপনার সাহায্যে আসবে। কোন লোক যখন তার আবেগের অনুসারী হয় তখন তার প্রকৃত সত্ত্বা নিজের উপরে এসে যায়। আবেগের উত্তাপ সমস্ত রকম বাধা দূর করে দেয়। বক্তা কাজ করেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তিনি কথা বলেন স্বাভাবিকভাবে।

অতএব শেষ দিকে এই স্বর প্রমোশন ব্যাপারটা যা দাঁড়ায় তাহলে আপনার মনপ্রাণ সঁপে দেওয়া।

ডীন ব্রাউন একবার তাঁর লণ্ডনে দেয়া বক্তৃতায় বলেছিলেন, আমার একজন বন্ধু একবার কোন গির্জার অনুষ্ঠানে লণ্ডনে যেভাবে চমৎকার বর্ণনা দিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন তা কোনদিনই ভুলব না। সেই বন্ধুর নাম জর্জ ম্যাকডোনা। হিব্রুর একাদশ পরিচ্ছেদ পাঠ করার পর সে যেভাবে বিশ্বাস সম্বন্ধে বক্তব্য রাখল তাতে অবাক না হয়ে পারিনি। তার সমস্ত মন আর হৃদয় সে ঢেলে দিয়েছিল।

আসল রহস্য হল এটাই–সমস্ত হৃদয় সমর্পণ করা। তাসত্বেও বলব কথাটার যেন কোন মানে হয় না তাই বুঝি জনপ্রিয়ও নয়। সাধারণ বক্তারা চায় সহজ কোন নিয়ম বা কাজের পদ্ধতি।

এডমাণ্ড বার্ক চমৎকার যুক্তিগ্রাহ্য আর ভাষায় লালিত্য মেশানো সব বক্তৃতা রচনা করেছিলেন যে, সেসব আজও ক্লাসিক বলে সব কলেজে পড়ানো হয়। অথচ বার্ক বক্তা হিসেবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ ছিলেন। তাঁর ওই অপূর্ব বক্তৃতা তিনি নিজে শোনাতে পারতেন না। তাই হাউস অব কমন্স সভায় তাঁর নাম হয় সান্ধ্যভোজের ঘন্টা। বার্ক কথা বলতে উঠলেই অন্য সব সদস্যরা কাশতে শুরু করতেন আবার কেউ কেউ বেশ আরাম করে বসে ঝিমুতে আরম্ভ করতেন।

ভাষা ও ব্যাকরণ সম্বন্ধে অবহিত হোন

মার্ক টোয়েন কিভাবে চমৎকার ভাষা আয়ত্ত্ব করেছিলেন জানেন? অল্প বয়সে তিনি মিশোরী থেকে নেভাদা পর্যন্ত ধীরগতির যানবাহনে ঘুরে বেড়াতেন। এইভাবে বেড়ানোর সময় বেশি মালপত্র নেওয়া সম্ভব হত না। তাসত্ত্বেও মার্কটোয়েন সঙ্গে রাখতেন একখানা ওয়েবস্টারের বিশাল অভিধান। এর কারণ তিনি নিজের ভাষাজ্ঞান নির্ভুল করে তুলতে চাইলেন।

অভিধান পাঠ করা পিট আর লর্ড চ্যাথামেরও নেশা ছিল। তাঁরা অভিধানের প্রতিটি পৃষ্ঠা প্রায় কণ্ঠস্ত করে ফেলেছিলেন। প্রতিটি খ্যাতনামা লেখক আর বক্তাও তাই করেন।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ইংরাজী ভাষায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা তিনি আমেরিকার তরফে করেছিলেন তাঁর সেই লেখা, সাহিত্যে চিরস্থায়ী হওয়ার যোগ্য। কিভাবে তিনি ভাষায় পারদর্শী হন তিনি নিজেই তা লিখে গেছেন :

‘আমার বাবা কখনও বাড়িতে ভুল উচ্চারণ বরদাস্ত করতেন না। কারও কোন ভুল হলেই তা সংশোধন করে দিতেন। কথাবার্তা বলার সময় তিনি আমাদের নতুন শব্দ প্রয়োগে উৎসাহ দিতেন আর তা মনে রাখতে বলতেন।’

বক্তাকে তাই তার ভাষাজ্ঞান বাড়ানোয় নজর দিতেই হবে। অভিধান তাকে প্রভূত সাহায্য করতে পারবে।

৫. কণ্ঠস্বর দৃঢ় নমনীয় করে তুলুন

আমরা যখন শ্রোতাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের বক্তব্য তাদের কাছে পেশ করি তখন আমরা সাধারণভাবে কাজে লাগাই আমাদের কণ্ঠস্বর আর শরীরিক অনেক কিছু। আমরা কাঁধ নাচাই, হাত নাড়তে থাকি। ভূ তুলি, কণ্ঠস্বরও ওঠানামা করাই, কখনও ধীরে কখনও দ্রুতলয়ে কথা বলে যাই। এসবের প্রয়োজন বক্তব্যের সঙ্গে তাল মিলিয়েই করতে হয়। তবে মনে রাখা দরকার এ সবই হল আসল কোন কারণ নয়। কণ্ঠস্বরে যে দোলা লাগে, তা ওঠানামা করে। এসবই হল আবেগের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে–মানসিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। এই কারণেই যে বিষয় সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল সেই বিষয় নিয়ে বক্তব্য রাখা দরকার। এই কারণেই আমরা সেই বিষয় নিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে একাত্ম হতে আগ্রহ বোধ করি।

যেহেতু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সকলেই যৌবনের স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা আর দৃপ্ততা বাড়াতে থাকি, তখনই প্রয়োজন হতে থাকে কণ্ঠস্বরের উপর নির্ভরশীলতা। এটা দরকার শ্রোতাবৃন্দের সঙ্গে সংযোগ ধারাটি বজায় রাখার জন্যই।

একটা কথা এ বইয়ের পাঠকদের জেনে রাখা দরকার। তা হল, আমরা হয়তো স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের কণ্ঠস্বর জোরে বা আস্তে করতে থাকি। এর ফলে আমরা অসতর্ক হয়ে পড়ি। এই কারণেই এ বইয়ে বলতে চেয়েছি যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাব বজায় রেখে বক্তব্য রাখতে। এজন্য দরকার স্বভাবসিদ্ধ পথে আমাদের ধ্যানধারণা প্রকাশ করতে চাওয়া। কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, স্বরগ্রাম, গতি ইত্যাদির নিরীখে নিজেকে তৈরি করা ব্যাপারটা ভারি চমৎকার একটা পথ। এটা করা যায় একটা টেপ রেকর্ডারের সাহায্য নিয়ে। এছাড়াও করা যায় বন্ধু বান্ধবদের সাহায্য নিয়ে। যদি কোন অভিজ্ঞ লোকের সাহায্য এ ব্যাপারে পাওয়া যায় তাহলে তো কোন প্রশ্নই নেই। শুধু বই পড়ে এবিষয়ে অভিজ্ঞতালাভ সম্ভব হয় না-এজন্য দরকার অভ্যাসও, না হলে শ্রোতাদের সামনে সমস্যায় পড়তে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *