০২. আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা

০২. আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা

জনসংযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হল ভয়। আমি এমন একজনকে জানি যিনি আমার ক্লাসে যোগ দেননি কারণ তাঁকে কথা বলতে হবে। পাঁচ বছর পরে অবশ্য তিনি যোগ দিয়ে পাঁচটা বছর নষ্ট হওয়ার জন্য দুঃখও করেন। আজ তিনি একজন বিখ্যাত বক্তা।

এমার্সন বলেছেন, পৃথিবীতে ভয়ের মত আর কিছু মানুষের ক্ষতি করে না। কথাটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, কারণ ১৯১২ সাল থেকে শিক্ষাদান করে এ অভিজ্ঞতা আমি সঞ্চয় করেছি।

স্ত্রী পুরুষকে জনগণের সামনে বক্তৃতা করা শেখাতে গিয়ে আমি ভয় দূর করার মধ্য দিয়ে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার পথ আবিষ্কার করেছি। এজন্য শুধু দরকার কয়েক সপ্তাহের অভ্যাস।

১. বক্তৃতার ভীতি সম্বন্ধে নানা ঘটনার খোঁজ রাখুন।

এক নম্বর ঘটনা :

বক্তৃতা সম্বন্ধে একমাত্র আপনিই ভীত নন। কলেজে পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা গেছে বক্তৃতার ক্লাসে শতকরা আশি কি নব্বই ভাগ ছাত্রেরই গোড়ায় এই ভয় থাকে। আমার আরও ধারণা বয়স্কদের ক্ষেত্রে এ ভয় শতকরা একশ ভাগ।

দুই নম্বর ঘটনা :

একটু মঞ্চভীতি থাকা কাজের হয়। আমাদের পারিপার্শ্বিকতা মেনে নেওয়ার জন্য প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতা তৈরি হওয়ার ব্যাপার থাকে। তাই যখন দেখবেন নাড়ীর গতি বেড়ে উঠে ঘামতে শুরু করেছেন, তাতে ভয় পাবেন না। আপনার শরীর বাইরের উত্তেজনায় কাজ করতে তৈরি। এই শারীরিক ব্যাপারটা একটা সীমানার মধ্যে থাকলে আপনি বেশ ভালোভাবেই পরিষ্কারভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় কথা বলে যেতে পারবেন।

তিন নম্বর ঘটনা :

বহু পেশাদার বক্তা আমাকে বলেছেন তারাও পুরোপুরি ভয়কে জয় করতে পারেন না। এ রকম অবস্থা প্রতিবার প্রথম কথা শুরুর সময় বেশ কিছুক্ষণ থেকে যায়। যে সব বক্তা বলেন ভয় বলে কোন প্রতিক্রিয়া তাদের হয় না তারা নেহাত বাচাল।

চার নম্বর ঘটনা :

জনতার সামনে বক্তৃতা করতে ভয় পাওয়ার কারণই হল আপনি একাজে অনভ্যস্ত। বেশির ভাগ মানুষেরই জন-সংযোগের অভিজ্ঞতা থাকে না তাই ভয় তাদের আঁকড়ে ধরে। শিক্ষানবীশদের কাছে এটা টেনিস খেলা বা গাড়ি চালানোর মত। এই ভয় কাটানোর একমাত্র পথই হল কেবল অভ্যাস চালিয়ে যাওয়া। দেখবেন বক্তৃতা ব্যাপারটা আনন্দের খনি হয়ে উঠতে পারে।

২. সঠিকভাবে নিজেকে তৈরি করুন।

মনে পড়ছে একবার বেশ ক’বছর আগে নিউইয়র্ক রোটারী ক্লাবের মধ্যাহ্নভোজে একজন নামী সরকারী অফিসার প্রধান বক্তা হিসেবে আসেন। আমরা সাগ্রাহ অপেক্ষায় ছিলাম তিনি কি বলেন শুনব। বলে।

প্রথমেই বুঝতে পারা গেল ভদ্রলোক তৈরি নন। প্রথমে তিনি মন থেকেই বলার চেষ্টা করলেন, তাতে ব্যর্থ হয়ে পকেট থেকে একতাড়া কাগজ বের করলেন। অবশ্য তাতেও সুবিধে হল না। যতই তিনি বলতে চেষ্টা করলেন ততই সব তাঁর গুলিয়ে যেতে লাগল। বারবার ক্ষমা চেয়ে তিনি কাঁপা ঠোঁটে কিছু বলতে চাইছিলেন। বেচারি ভয়ে একেবারে শুকিয়ে কাঠ, বোঝা যাচ্ছিল একদম তৈরি হয়ে আসেন নি। শেষ পর্যন্ত হতমান অবস্থায় তিনি বসে পড়লেন।

১৯১২ সাল থেকে প্রায় বছরে পাঁচ হাজার বক্তৃতা আমাকে তদারক করতে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে এভারেস্টের চূড়োর মতই একটা ব্যাপার মাথা তুলে আছে : একমাত্র তৈরি হয়ে আসা বক্তারাই আত্মবিশ্বাসী হন। দুর্বল অস্ত্র নিয়ে কেউ কিভাবে কোন ভয়ের দূর্গ জয় করা ভাবতে পারে? লিঙ্কন বলেছিলেন :”আমার বিশ্বাস কোন কিছু বলার না থাকলে বলতে গেলে অসোয়াস্তি না বোধ করে পারব না।”

ড্যানিয়েল ওয়েবন্টার বলেছিলেন অর্ধেক তৈরি হয়ে শ্রোতাদের সামনে যাওয়ার কথা ভাবলে মনে হয় অর্ধেক পোশাক পরে হাজির হয়েছি।

বক্তৃতার প্রতিটি শব্দ মুখস্থ করবেন না

‘ভালোভাবে তৈরী’ বলতে কি জানি বলছি বক্তৃতাটা একদম মনে গেঁথে রাখবেন? এ প্রশ্নের উত্তর দেব বেশ জোরালো ভাবে ‘না’ বলে। নিজেদের অহমিকাকে রক্ষা করতে আর পাছে শ্রোতাদের সামনে কথা ভুলে যান সেই কারণে বহু বক্তা মুখস্থ করার ফাঁদে পা দেন। কোন ভাবে এই নেশার বশীভূত হলে বক্তা বরাবরের মতই সময় নষ্ট করার মধ্যে আর মঞ্চে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থ হন।

আমেরিকার সংবাদ ঘোষকদের ডীন এইচ. ভি. ক্যাপ্টেনবর্ণ যখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন তিনি এক বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় যোগ দেন। জেন্টলম্যান, দি কিং’ নামে একটা ছোট গল্প তিনি বেছে নিয়ে প্রায় শ’খানেক বার রিহার্সাল দিয়ে সেটা একেবারে কণ্ঠস্থ করে রাখেন। প্রতিযোগিতার দিন তিনি সব ভুলে গেলেন। শুধু ভুলে যাননি, তাঁর মন একদম শূন্যতায় ভরে গেল। ভয়ে তিনি একেবারে আধমরা। হতাশায় মরীয়া হয়ে তিনি মন থেকেই গল্পটা বলে গেলেন। তাঁর অবাক লাগল যখন বিচারকরা তাঁকেই প্রথম পুরস্কার দিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কাল্টেনবর্ণ আর কখনও কোন বক্তৃতা মুখস্থ করেন নি। তার ঘোষক জীবনে সাফল্যের এটাই হল গোপন পথ। সামান্য কিছু নোট রেখে তিনি স্বাভাবিক ভাবেই, শ্রোতাদের সামনে কথা বলেন।

যে লোক আগে শিখে সেটা মুখস্থ করতে চান তিনি শুধু সময় আর শক্তিই ক্ষয় করেন আর এর পরিণতিতে আসে ব্যর্থতা। আমরা সারা জীবন ধরেই স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে কথা বলি। আমরা কথাগুলো আগে ভাবিনা, আমরা কেবল কিছু ধারণা করে রাখি, ব্যাস। আমাদের ধারণা স্পষ্ট হলে কথাগুলো স্বাভাবিক ভাবেই অবচেতনায় যেভাবে শ্বাস নিই সেইভাবেই এসে পড়ে।

এ ব্যাপারটি এমন কি উইনষ্টন চার্চিলকেও বেশ কঠিন পথে শিখতে হয়। তরুণ বয়সে চার্চিল তার বক্তৃতা লিখে মুখস্থ করতেন। এরপর একদিন যখন তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে মুখস্থ করা ভাষণ দিচ্ছিলেন আচমকা তার সব গোলমাল হয়ে গেল। তার মনে একবারে অন্ধকার নেমে এল। বেশ হতচকিত হয়ে, তিনি অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। শেষ কথাগুলো তিনি বারবার বলতে লাগলেন আবার সব গোলমাল হয়ে মুখ লাল করে, তিনি বসে পড়লেন। সেই থেকে শেষ অবধি উইনষ্টন চার্চিল কোনদিনই আর মুখস্থ করা বক্তৃতা করেন নি।

আমরা যদি আমাদের ভাষণ বা কথার প্রতিটি শব্দ আগে মুখস্থ করে রাখি তাহলে সম্ভবতঃ শ্রোতাদের মুখোমুখি হলেই তা ভুলে যাব। যদি ভুলে নাও যাই তাহলে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক ভাবেই তা বলে যাব। কেন? কারণ ওই বক্তৃতা আমাদের অন্তর থেকে আসবে না। আসবে স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে। লোকজনের সঙ্গে আমরা যখন একান্তে কথা বলি তখন আমরা ভাবি যা বলতে চাই, তারপর বলতে শুরু করলেই কথুলো আপনা আপনি বেরিয়ে আসে। সারা জীবনে সব সময় তাই করি আমরা। সেটা আজ বদলানোর দরকার কি? যদি আমরা আগে বক্তৃতা মুখস্থ করে রাখি তাহলে ভ্যান্স বুশনেলের অভিজ্ঞতাই আমাদের জুটবে।

ভ্যান্স প্যারীর বো আর্ট স্কুলের ছাত্র, পরে তিনি হন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান ইকুইটেবল লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানীর ভাইস প্রেসিডেন্ট। অনেক বছর আগে তাকে আহ্বান করা হয় সারা আমেরিকার দু হাজার বীমা সংক্রান্ত প্রতিনিধিদের সভায় ভাষণ দিতে। জীবন বীমার কাজে মাত্র দু’বছর থাকলেও তাঁকে বিশ মিনিট বলার আমন্ত্রণ জানানো হয়।

ভ্যান্স খুবই খুশি হলেন। ভাবলেন এতে তার সম্মান বাড়বে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি বক্তৃতাটা লিখে মুখস্থ করে রাখলেন। আয়নার সামনে অন্ততঃ চল্লিশবার তিনি রিহার্সালও দিলেন। মুখ চোখের ভঙ্গী, কায়দা সবই তাঁর নিখুঁত মনে হল।

যাই হোক, তিনি যখন বক্তৃতা দেবার জন্য মঞ্চে উঠলেন তখন প্রচণ্ড ভয় পেলেন। তিনি একইভাবে শুরু করলেন ‘এই অনুষ্ঠানে আমার কাজ হ’ল…।’ ব্যাস এখানেই তিনি সব ভুলে গেলেন। তিনি আবার গোড়া থেকে শুরু করার চেষ্টা করলেন। অনেক কসরৎ করে আবার এগিয়ে গেলেন। বারবার তিনবার তিনি এরকম করলেন : মঞ্চটা চার ফিট উঁচু ছিল আর পিছন দিকে কোন রেলিঙ ছিল না চারবারের মাথায় তিনি যেই পিছিয়ে এলেন, তখনই উল্টে পড়ে একদম অদৃশ্য হয়ে গেলেন। শ্রোতারা হেসে লুটোপুটি খেতে লাগলেন ব্যাপার দেখে। একজন শ্রোতা চেয়ার থেকে উঠে উল্টে পড়ে মেঝেয় গড়াগড়ি খেতে লাগলেন। জীবনবীমা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে কেউ এমন মজার দৃশ্য দেখে নি। এ ঘটনার সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হল শ্রোতারা ধরেই নিয়েছিলেন এটা এক ধরনের অভিনয়। প্রাচীন কর্মীরা এখনও এটা নিয়ে সরস আলোচনা করে থাকেন।

কিন্তু বেচারি বক্তা ভ্যান্স বুশনেলের কি হল? ভ্যান্স বুশনেল আমায় বলেছিলেন এই ঘটনা তার জীবনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি। তিনি এতই অপমানবোধ করেন যে পদত্যাগপত্র লিখে ফেলেন।

ভ্যান্স বুশনেলের উপরওয়ালারা তাঁকে বুঝিয়ে সুজিয়ে নিরস্ত করেন। তাঁরা তাঁর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে সাহায্য করলেন। পরে ভ্যান্স বুশনেল তাঁর প্রতিষ্ঠানে একজন দক্ষ বক্তা হয়ে ওঠেন। কিন্তু জীবনে তিনি আর বক্তৃতা মুখস্ত করেন নি। তার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জ্ঞানলাভ করি আসুন।

আমি অসংখ্য মানুষকে মুখস্থ করা ভাষণ শোনাতে দেখেছি। তবে এমন একজনকেও দেখিনি মুখস্থ করা ছেড়ে কেউ মানুষের মত আচরণ করে কথা বলেছেন। এটা করলেও তাঁকে মানবিক বলতে পারতাম। হয়তো এতে তার একটু অসুবিধা হত তবে তাতে কাজ হত।

লিঙ্কন একবার বলেছিলেন আমি কাউকে মুখস্থ করার উপদেশ শোনাতে দেখতে চাই না। আমি চাই সে খোলামেলা ভাবেই বক্তব্য রাখুক।’

নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেন, যুদ্ধ হল একটা শিল্পকলা এবং বিজ্ঞানও। আগে থেকে পরিকল্পনা না করলে তা ব্যর্থ হয়। বক্তৃতার ব্যাপারেও তাই। এটা অনেকটা ভ্রমণের মত। শুরু না করলে শেষ হয় না।

বক্তৃতার বিষয়বস্তু তৈরি করার কোন বাঁধা ধরা নিয়ম নেই।

এমন কোন ছক নেই যা সব রকম সমস্যার সমাধান করতে পারে। তবুও এমন একটা ব্যবস্থার কথা ডঃ রাসেল এইচ. কনওয়েল তার এভারস্ অব ডায়মণ্ড’ গ্রন্থে বলে গেছেন যা অনেকেরই কাজে লাগতে পারে।

কনওয়েল বলেছেন : ১। আপনারা জানা তথ্যগুলো গুছিয়ে বলুন। ২। এর ওপর আলোচনা করুন। ৩। এগুলো কাজে লাগাতে অনুরোধ করুন। এই পাঠক্রমে ছাত্ররা নিচের পদ্ধতি কার্যকর বলে অনুভব করেছেন ১। অন্যায় বা ভুল ধরিয়ে দিন। ২। প্রতিকারের পথটি দেখাতে চেষ্টা করুন। ৩। সহযোগিতার আবেদন রাখুন।

আরও কয়েকটি পদ্ধতি আছে। যেমন : ১। শ্রোতাদের আগ্রহী করে তুলুন। ২। তাদের বিশ্বাস অর্জন করুন। ৩। আপনার বক্তব্য রাখুন-শ্রোতাদের আপনার বক্তব্যের গুণাগুণ সম্বন্ধে অবহিত করুন। ৪। শ্রোতাদের কাছে এমনভাবে আবেদন রাখুন যাতে তারা উদ্বুদ্ধ হয়।

বন্ধুদের সঙ্গে রিহার্সেল দিন

যে বক্তব্য আপনি রাখতে চলেছেন সেটা ঠিক করে রেখেছেন তো? এটাই হল প্রথম ধাপ। যে বিষয়ে আপনি বলবেন মনস্থ করেছেন সুযোগ পেলেই প্রাত্যহিক জীবনে বন্ধুবান্ধব বা কর্মক্ষেত্রের সহযোগীদের সঙ্গে সেটা ঝালিয়ে নিন। এ এক নিখুঁত পদ্ধতি। এভাবে কথা বললে অন্য কারও কাছ থেকে নতুন কোন কিছু জানতেও পারেন, আর তা হবে অমূল্য।

সাফল্য সম্পর্কে আশাবাদী হন

বইয়ের গোড়াতেও এই বিষয় উল্লেখ করেছি। এটা অবশ্য করণীয়। কোন বিষয় বেছে নেওয়ার পর আপনাকে বিষয়ের মধ্যে একাত্ম হতে হবে। আপনার আচরণ এমন হবে যা ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বক্তাদের যুগযুগ ধরে প্রেরণা জুগিয়েছে। আপনার উদ্দেশ্যের উপর আশা রাখতে হবে।

মনে রাখবেন আপনার বক্তব্যের মাঝখানে কোন ব্যাকরণগত ভুল বা এ ধরনের ত্রুটি থাকলেও সেদিকে নজর দেবেন না। নিজের উপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখেই আপনার বক্তব্য শেষ করবেন। আপনার বক্তব্য শ্রোতাদের কতখানি আবিষ্ট রাখতে পারে সেটা দেখাই আপনার কর্তব্য। সাফল্য সম্পর্কে আশাবাদী হওয়াই আপনার প্রয়োজন। সেটাই করুন।

আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠুন

বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ প্রফেসর উইলিয়াম জেমস বলেছেন : ক্রিয়া অনুভূতিকে অনুসরণ করে চলে, কিন্তু বাস্তবে ক্রিয়া আর অনুভূতি একসঙ্গেই চলে। যা ইচ্ছার অনুবর্তী, তাই ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, আমরা পরোক্ষভাবে অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

‘অতএব মনে সাহস আনতে হলে আমাদের এখন ব্যবহার করতে হবে যাতে আমাদের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। আর এটা করলেই ভয় দূর হয়ে যাবে।’

আপনাকে তাই প্রফেসর জেমসের উপদেশ কাজে লাগাতে হবে। যখন শ্রোতাদের সামনে এসে সাহস আনতে চাইবেন তখন এমন ভাব করুন যেন কিছুই হয়নি। অবশ্য আপনি তৈরী না থাকলে পৃথিবীর সমস্ত ইচ্ছাশক্তিতেও কাজ হবে না। কিন্তু যদি কি বললেন জানা থাকে তাহলে বীর পদক্ষেপে এগিয়ে যান আর গভীরভাবে শ্বাস টেনে নিন। আসলে শ্রোতাদের মুখোমুখি হওয়ার আগে ত্রিশ সেকেণ্ড গভীর শ্বাস টানুন। অতিরিক্ত মাত্রার অক্সিজেন আপনাকে উজ্জীবিত করে মনে সাহস সঞ্চার করবে। এতে আপনার নার্ভাস ভাবটা চলে যাবে।

এবার শ্রোতাদের সামনে সটান দাঁড়িয়ে, যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে কথা আরম্ভ করুন। আপনার যদি মনে সন্দেহ থাকে এই দর্শন কোন কাজেই নয় তাহলে বলব আপনার ক্লাসের যে কোন সহপাঠির সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার পরেই আপনার মনের পরিবর্তন ঘটবে। যেহেতু আপনি তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না। আপনাকে বিখ্যাত একজন আমেরিকানের উপদেশ শুনতে বলছি। তিনি সাহসের প্রতীক। একদিন তিনি অতি ভীরু মানুষ ছিলেন, অথচ কালে কালে হয়ে ওঠেন অত্যন্ত সাহসী, বিশ্বস্ত, শ্রোতাদের প্রিয় মানুষ। তিনি হলেন আমেরিকার একদা প্রেসিডেন্ট থিয়োডোর রুজভেল্ট।

তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন : ছোটবেলায় আমি রুগ্ন ছিলাম। তরুণ বয়সেও আমি ছিলাম নার্ভাস আর কোন কাজে সাহস পেতাম না। আমাকে তাই প্রচুর পরিশ্রম করে শরীর আর মন তাজা করতে হয়। ছেলে বয়সে একটা বইতে পড়েছিলাম এক ব্রিটিশ যুদ্ধ জাহাজের ক্যাপ্টেন একজন নাবিককে কিভাবে নির্ভয় হতে হয় শেখাচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, প্রত্যেক মানুষ কাজ করতে গিয়ে ভীত হয়। তাকে যা করতে হবে তা হল ভয়ের কথা না ভেবে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এইভাবেই একদিন তাকে জয় করা সম্ভব হবে!

এই নীতির উপর নির্ভর করেই আমি এগিয়ে যাই। প্রথমে অনেক কিছুতেই আমার ভয় ছিল, গ্রিমলিভালুক থেকে বুনো ঘোড়া আর বন্দুকবাজ পর্যন্ত। কিন্তু ভয় পাবো না ভেবে এগিয়ে ক্রমে ভয় জয় করেছিলাম। ইচ্ছে করলেই যে কোন মানুষ এটা পারে।

জনসংযোগের ভীতি দূর করার মধ্যে এমন একটা কিছু আছে যা আমাদের প্রতিদিনের কাজে অদ্ভুত রকম প্রতিক্রিয়া জাগাতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ যারা গ্রহণ করতে পারেন তারাই শ্রেষ্ঠতর মানুষ। তারা যে কোন শ্রোতাদের জয় করার ফলে তাদের জীবন আনন্দময় আর পূর্ণতায় বিকশিত।

একজন বিক্রেতা লিখেছেন : ‘ক্লাসে কয়েকবার দাঁড়িয়ে বলার পর আমার মনে হল যে কোন কাউকেই সামলাতে পারি। একদিন সকালে ঘুরতে ঘুরতে বেশ কড়া একজন ক্রয় এজেন্টের সামনে হাজির হলাম। লোকটি না বসার আগেই সবার আগে আমার সব স্যাম্পেন তার ডেস্কে ছড়িয়ে দিলাম। তিনি এরপর আমাকে এমন বায়না দিলেন সারা জীবনেও যা পাইনি।’

এক গৃহকর্ত্রী আমায় বলেন আমি আমার বাড়িতে পড়শীদের নিমন্ত্রণ জানাতে ভয় পেতাম। কারণ কথাবার্তা চালাতে পারব না বলে আমার ভয় লাগতো। ক্লাসে যোগ দিয়ে বার কয়েক উঠে দাঁড়িয়ে কথা বলার পরে আমার সাহস বাড়ল। এরপর একদিন একটি পার্টি দিলাম। পার্টি দারুণ জমলো, আমি সকলকে চমৎকার মাতিয়ে রেখেছিলাম।’

আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আপনিও তা পারবেন। আপনিও দেখবেন জনসংযোগ আর বক্তৃতা করতে পারলে প্রতিদিনই ভয় জয় করে আপনি আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলছেন। এর ফলে প্রতিদিনের জীবনের নানা সমস্যা আর জটিলতা জয় করতে আপনার অসুবিধা থাকবে না। যে সমস্যা আগে দূর করা যায়নি তার সমাধান করে জীবন আপনার পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *