ধর্মসূত্র

ধর্মসূত্রের মধ্যে দিয়ে আমরা একটি নুতন যুগে প্রবেশ করি। কারণ যদিও প্রত্যক্ষভাবে তা বেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক সাহিত্যের অংশ, তথাপি যজ্ঞানুষ্ঠানের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রথম তিনটি বর্ণ–ব্ৰাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের জীবনের চতুরাশ্রমকে (ব্ৰহ্মচৰ্য, গাৰ্হস্থ্য, বানপ্রন্থ ও যতি) কেন্দ্র করে সামাজিক জীবনধারার পরিচয় ধর্মসূত্রগুলিতে পাওয়া যায়। সামাঙ্গিক সামঞ্জস্য রচনা যদিও এদের প্রধান লক্ষ্য, তবু উপনিষদের পরে এই সমাজে বর্ণভেদ প্ৰথা ধীরে ধীরে কঠোরতর হয়ে উঠেছিল। বর্ণগুলির মধ্যে চলিষ্ণুতা ক্রমেই অতীতের বস্তু হয়ে পড়ছিল। পূর্ববর্তী যুগগুলিতে অসবর্ণ বিবাহের ফলে যেসমস্ত অসংখ্য নুতন মিশ্রবর্ণের উৎপত্তি হয়েছিল, তাদের জন্য সমাজে উপযুক্ত স্থান ও যথাযথ কর্তব্য, অধিকার ও অপরিহার্য দায়িত্ব নির্দেশ করা আবশ্যিক হয়ে পড়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যবর্তী কালে ভারতীয় সামাজিক জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্ৰহ করার পক্ষে ধর্মসূত্রগুলি আমাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল। এই যুগে জনসাধারণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে যে বিপুল পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল, তার নিম্নোক্ত নিদর্শনগুলি উল্লেখ করা যায় : লৌহনির্মিত অন্ত্র এবং কৃষি ও শিল্প সম্পর্কিত যন্ত্র ও উপকরণের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, বাণিজ্য, নগররাষ্ট্রের উদ্ভব। বণিকদের হাতে বিপুল সম্পদের কেন্দ্রীভবন, প্রাথমিক উৎপাদকদের ক্রমাগত দারিদ্র্যবৃদ্ধি, উৎপাদক ও উৎপন্ন দ্রব্যের ভোক্তার মধ্যে সুস্পষ্ট বিচ্ছেদ, শ্রেণীভেদ, কারুশিল্প ও কুটিরশিল্প-নির্ভর অর্থনীতিতে শূদ্রের বিপুল শোষণ এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং অংশত রাজনৈতিক শক্তি সেইসব ব্যক্তিদের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া, খনি ও খনিজ দ্রব্য যাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সশস্ত্র রক্ষীরূপে যারা বাণিজ্য শকটের অনুগমণ করত। অর্থাৎ সমাজের নূতন প্ৰভু ছিল নবোদগত বণিকশ্রেণী ও অভিজাতবর্গ, অর্থাৎ বিত্তবাণ ব্ৰাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য সম্প্রদায়। তিনটি আৰ্যবর্ণের পুরুষরা যেহেতু শক্তিশালী পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় স্বভাবত বিপুল ক্ষমতার অধিকারী ছিল তাই শূদ্র ও নারী ক্রমশ অধিকতর নিষ্পেষণের সম্মুখীন হল।

বিভিন্ন জাতির মধ্যে কয়েক শতাব্দীব্যাপী মিশ্রণ এবং সমস্ত প্রকার সম্ভাব্য পারস্পরিক বিনিময় ও সংযোগের মাধ্যমে বহু উপবর্ণের উৎখানের ফলে এমন একটা সময় উপস্থিত হল যখন বর্ণপ্ৰথা-শাসিত সমাজের সীমারেখা কতকটা স্পষ্ট হয়ে উঠল; ফলে সমস্ত নবোদ্ভূত বর্ণের সামাজিক অবস্থান ও কর্তব্য নির্দেশ করা সম্ভব হল। অনুরূপভাবে, গৃহস্থদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য অর্থাৎ নিয়মিত যজ্ঞ সম্পাদনের উপর বৈদিক সাহিত্যের অতি স্পষ্ট গুরুত্ব আরোপ এবং সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী বা ভ্ৰমমাণ যোগীদের প্রভাবে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী প্রক্রিয়ার মধ্যে সুদীর্ঘ দ্বন্দ্বমুখর সংগ্রামের পরে শেষপর্যন্ত আপোসের একটি পথ আবিষ্কৃত হল—অরণ্যে অবসর জীবনযাপন এবং ভ্ৰমমাণ সন্ন্যাসীর জীবনকে মানুষের জীবনের শেষ দুটি স্তররূপে স্বীকৃতি দেওয়া হল। এই পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পর কতকটা সামাজিক সামঞ্জস্য ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যার ফলে কোনোপ্রকার প্রধান প্রতিবন্ধক ছাড়াই সামাজিক জীবনের প্রবাহ অক্ষুন্ন থাকতে পারে। তবে এটা স্বীকার করা প্রয়োজন যে বিদ্রোহ বা আপোসবিরোধী মনোভাবের বিশেষ কোনো প্ৰমাণ যেহেতু আমাদের হাতে নেই, তাই আমরা এটাও ধরে নিতে পারি না যে এই সুদীর্ঘ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। বস্তুত এই যুগে বহু বৈদিশিক আক্রমণ, সামাজিক সংগঠনে অনেক নূতন উপাদানের আত্মীকরণ, বহু সামাজিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, পরস্পর-বিধবংসী ও পররাজ্য অধিকারের জন্য নগর ও রাষ্ট্র-মধ্যবর্তী যুদ্ধ ইত্যাদি আমরা লক্ষ্য করেছি; সুতরাং, বলাই বাহুল্য, যে এই যুগে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন ছিল সংঘাতে আকীর্ণ।

এ ধরনের সামাজিক দ্বন্দ্ৰকে নৃত্যুনতম পর্যায়ে হ্রাস করে আনাই ছিল ধর্ম সূত্রগুলির দায়িত্ব। এই পর্যায়েই কর্ম ও জন্মান্তরবাদের তত্ত্ব বিশেষ অভিব্যক্তি লাভ করল–এই দুটি অতুলনীয় মতবাদ সমস্ত প্রকার সামাজিক অসাম্যের চমৎকার ব্যাখ্যা দান করে সমাজে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল। এই যুগের ধর্ম ও দর্শন মৌল ভাবাদর্শগত ভিত্তি স্থাপন করার ফলে ধর্মসূত্রের রচয়িতারা উপযুক্ত নিয়ম প্রণয়ন করে সামাজিক বিধি ব্যবস্থাকে দৃঢপ্রতিষ্ঠা দিতে চাইলেন এবং সেই সঙ্গে বিভেদকামী শক্তিগুলিকে অধাৰ্মিক ও অসামাজিক আখ্যা দিয়ে চুৰ্ণ করে দিতে চাইলেন। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে অনুষ্ঠানগুলির সংখ্যাবৃদ্ধি এবং নুতন অৰ্চনাপদ্ধতি ও নূতন দেবতাদের প্রবর্তন রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে একই সূত্রে গ্রথিত—যা সেযুগের বিশিষ্ট চরিত্রলক্ষণ। নিঃসন্দেহে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সার্বভৌম কৌশলরূপে পুরোহিত ও অনুষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করতেন।

ধর্মসূত্রের বিধিসমূহের প্রকৃত ক্ষেত্র হল বিভিন্ন বর্ণ ও আশ্রমগুলি; তবে বাস্তবে এদের ক্ষেত্র আরো বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। ধর্মসূত্রগুলিতে শ্রৌতসূত্র ও গৃহ্যসূত্ৰপামহের প্রাগাবস্থান আভাসিত এবং প্রকৃতপক্ষে সেগুলি এদের সম্পূরক। ধর্মসূত্রে ব্যাখ্যা ‘ধর্ম কি, এই প্রশ্নের উত্তরে জৈমিনি তার মীমাংসা সূত্রে বলেছেন : ‘ধর্ম মানুষকে যথার্থ শ্রেয় আচরণে প্রণোদিত করে’, এবং এই শ্রেয় আচরণের তৎকালীন ভিত্তি ছিল বর্ণাশ্রম।

Share This