গৃহ্যসূত্রের উৎস

একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিক দিয়ে গৃহ্যসূত্রগুলি ব্রাহ্মণ সাহিত্য ও অথর্ববেদ থেকে প্রত্যক্ষভাবে উদ্ভব হয়েছে। আর শ্রৌতসূত্রগুলি উদ্ভূত হয়েছে শুধু ব্ৰাহ্মণ সাহিত্য থেকে। অথর্ববেদ সম্পর্কিত আলোচনায় আমরা দেখেছি যে তা অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও আদর্শগত বাতাবরণ সৃষ্ট হয়েছিল; একদিকে ছিল তিনটি বেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রয়োগবিধি-জনিত একমুখী সংস্কৃতি এবং অন্যদিকে অথর্ববেদ—যা কিছু মৌলিক উপায়ে ত্রয়ীর তুলনায় শুধুমাত্র ভিন্ন ছিল না, সম্পূর্ণ বিরোধিতাও করেছিল। পরবর্তীকালে অথর্ববেদের স্বীকৃতিলাভের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই ধারায় প্রচলিত গৃহ্য অনুষ্ঠানসমূহের প্রবল উপস্থিতি। সামূহিক শ্রৌত অনুষ্ঠানগুলিকে কেন্দ্র করে সামাজিক জীবন সম্পূর্ণত গড়ে উঠেছিল; জনসাধারণ তাদের পারিবারিক, গাৰ্হস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবনযাপনে বহুবিধ বাধাবিয়ের সম্মুখীন হত-ব্ৰাহ্মণ সাহিত্য বা শ্রৌতসূত্রগুলি দিয়ে যাদের পুরোপুরি সমাধান করা যেত না। এইসব ক্ষেত্রে জিকরি প্রয়োজনসমূহ ছিল নিতান্ত বাস্তব ও পৌনঃপুনিক; এইগুলি অবস্থার উন্নতি সাধন, শাস্তিবিধান, প্রেতবিতাড়ন ও আশীৰ্বাদ প্ৰাপ্তির জন্য উপযুক্ত আনুষ্ঠানিক প্ৰতিবিধান অনিবাৰ্য করে তুলেছিল। অথর্ববেদ তার ব্যবস্থা করেছিল; সুদূর অতীত কাল থেকে বৈদিক ধর্মের পশ্চাৎপটে অথর্ববেদীয় পুরোহিতেরা সক্রিয় ছিলেন এবং জনসাধারণের বিপদে পড়ে তাদের শরণাপন্ন হতেন। তারপর ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ক্রমোন্নতিশীল ক্ষুদ্র রাজ্যের প্রধানরা প্রতিবেশী রাজাদের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত হওয়ার জন্য ঐন্দ্ৰজালিক প্রতিরক্ষার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। প্রাচীনতর ধর্মে এধরনের সুরক্ষার ব্যবস্থা খুব কমই ছিল; তাই অথর্ববেদীয় পুরোহিত যখন উদ্যোগী হলেন, তাকে রাজপুরোহিতরূপে নিয়োগ করা হল এবং কালক্রমে তার গোষ্ঠী ও মতবাদ বিলম্বিত স্বীকৃতি লাভ করল। এই স্বীকৃতি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত অনিচ্ছা! সত্ত্বেই দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু রাজপুরোহিত রূপে অথর্ববেদীয় পুরোহিত যেহেতু একটি নক্ষতাসম্পন্ন অবস্থান থেকে দরকষাকষি করতে সমর্থ ছিলেন। তাই তিনি আপন অধিকার অর্জন করে নিলেন। তার জয়ের স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে : সমগ্ৰ যজ্ঞদক্ষিণার অর্ধেক অংশ একা ব্ৰহ্মার প্রাপ্য, বাকি অর্ধেক হােতা, উদগাতা ও অধিবৰ্ষর। অন্যভাবে বলা যায়, অন্য তিনজন পুরোহিত একত্রে যা লাভ করতেন, ব্ৰহ্মাশ্রেণীর পুরোহিত একই তা পেয়ে যেতেন। অথর্ববেদীয় পুরোহিতের ক্ষমতার অপর বাস্তব উৎস নিহিত ছিল গাৰ্হস্থ্য ক্ষেত্রে তাঁর বিপুল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে—সেখানে তাঁর মতবাদ ও ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকলাপ অবিসংবাদী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। সমগ্ৰ সূত্রসাহিত্য যেহেতু পরবর্তীকালে রচিত, গৃহ্যসূত্রগুলিতে শুধুমাত্র অথর্ববেদের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির জয় প্রতিফলিত হয় নি, অন্যান্য বেদের শাখাগুলিতেও তার অন্তর্ভুক্তি প্রমাণিত হয়েছে। অথর্ববেদের পরিগ্রহণের পশ্চাতে রয়েছে লোকায়ত ধর্মের স্বীকৃতি অর্থাৎ নিজস্ব দেবতা, আচার অনুষ্ঠান, প্ৰত্নকথা ও বিশ্বাসসহ লঘু ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্তি। তাই এখানে আমরা বহু-সংখ্যক অপরিচিত অর্ধদেবতা, উপদেবতা, দানব ও পিশাচ প্রভৃতির সম্মুখীন হই, কেননা লোকায়ত ধর্ম মূলত এদের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসময়ে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহের উল্লেখ আমরা লক্ষ্য করি–হস্তরেখা-বিচার, সর্ববিধ ভবিষ্যৎ-কথন, জ্যোতির্বিদ্যা অর্থাৎ অন্তরিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বস্তুসমূহ থেকে আহৃত শুভাশুভ গণনা, স্বপ্নবিশ্লেষণ করে আসন্ন ঘটনার পূর্বাভাস নির্ণয়, বস্ত্রে মুষিকদংশনের ফলে উদ্ভূত চিহ্ন ব্যাখ্যা করে ভবিষ্যদবাণী, অগ্নির উদ্দেশ্যে যজ্ঞ, বহুবিধ দেবতার প্রতি অৰ্পিত অৰ্ঘ্য, শুভাশুভ স্থান নিরাপণ, প্ৰেত-সঞ্চালন, সৰ্প নিয়ন্ত্রণ বিদ্যা, প্ৰেত্যাবিষ্ট বালিকার মাধ্যমে দেবতাদের পরামর্শ গ্ৰহণ, পরামদেবতার উপাসনা, ব্ৰতপালন ও মন্ত্রোচ্চারণ দ্বারা সন্তান-উৎপাদনের শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস ইত্যাদি।

এই পর্যায়ে জনপ্রিয় ধর্মের মধ্যে বৃহৎ ও লঘু ঐতিহ্যের যে বিচিত্র সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়, তার সম্ভাব্য কারণ এই যে, দুটি ধারার মধ্যে পরস্পর অভিমুখীনতা সর্বদা অব্যাহত ছিল। তাই দীর্ঘ-নিকায়ের মহাসময়সুত্তান্ত অংশে পৃথিবী ও বিশাল পর্বতসমূহের আত্মা, দিকসমূহের চারজন অধিপতি, গন্ধৰ্ব, নাগ, গরুঢ়, দানব এবং ব্ৰহ্মা, পরমাত্মা ও সনৎকুমার উল্লিখিত। ‘বেদাঙ্গ’গুলিতে বিদেহী আত্মার উপাসনা অধিকতর প্রকট; কারণ আদিম মানুষের মানসিকতায় বিশ্বজগৎ বৈরিতাকামী মন্দ আত্মার পরিপূর্ণ যারা নিয়ত মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও সুখ আক্রমণ এবং ধ্বংস করতে উদ্যত। তাই বহুদূর পর্যন্ত গৃহ্য অনুষ্ঠানগুলি আপাত-দৃষ্টিতে নেতিবাচক, মুখ্যত অমঙ্গল দূর করাই এগুলির উদ্দেশ্য।

শৌতি ও গৃহ্য অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে বিপুল অংশ এক সাধারণ বৃত্তের অন্তর্গত; যেমন অগ্নিহোত্র, দর্শপূৰ্ণমাস, পিণ্ডপিতৃ যজ্ঞ এবং কিছু কিছু চাতুর্মাস্য অনুষ্ঠান উভয়বিধ গ্রন্থেই আলোচিত হয়েছে। এর থেকে অনুমান করা যায় যে কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি মাত্র কল্পসূত্রই প্রচলিত ছিল; পরবর্তীকালে অনুষ্ঠানসমূহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিষয়বস্তুর প্রকৃতি অনুযায়ী রচনাকে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়েছিল। তিনটি যজ্ঞাপ্লির প্রয়োগদ্বারাও নির্ধারিত হত–কোন বিষয় কোন শাখার অন্তর্ভুক্ত হবে; শ্রৌত যাগে যেহেতু এই তিনটি অগ্নিরই প্রয়োজন ছিল, তাই এই তিনটির যে কোনো একটি অগ্নিদ্বারা অনুষ্ঠিত যে কোনো যজ্ঞ প্ৰাচীনতম শ্রৌতসূত্র গুলিতে আলোচিত হয়েছিল এবং ফলত প্রত্যেকটি গৃহ্য অনুষ্ঠান তার অন্তর্ভুক্ত হল। ব্ৰাহ্মণ গ্রন্থগুলিতে এমন কিছু বিষয় সন্নিবিষ্ট হয়েছে যা গৃহ্যসূত্রগুলির পক্ষে উপযোগী; স্পষ্টত এর কারণ এই যে, সে সময় কোনো পৃথক সূত্র সাহিত্যের অস্তিত্ব ছিল না–গৃহ্যসূত্রের তো কোনো প্রশ্নই উঠে না। উপনয়ন, গার্হ্যপত্য অগ্নির প্রতিষ্ঠা, বিবাহ, মৃত্যু ও মরণোত্তর শ্ৰাদ্ধাদি এসবই মূলত গৃহ্যানুষ্ঠান—এগুলি ব্ৰাহ্মণ গ্রন্থগুলিতেও আলোচিত হয়েছে। যখন পৃথক শ্রেণীর রচনারূপে সূত্রগুলিতে আলোচিত হয়েছে। যখন পৃথক শ্রেণীর রচনারূপে সূত্রগুলি রচিত হতে লাগল, তখনো যে মিশ্র বিষয়বস্তুনির্ভর একটি সূত্র ছিল—তা আপস্তম্ব সূত্র থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়। এই গ্রন্থের প্রথম চৌদ্দটি অধ্যায়ে শ্রৌতসূত্রটি গঠিত; তারপর যথাক্রমে পরিভাষা ও গৃহসূত্রের মন্ত্রপাঠ অংশ পাওয়া যায়; শেষ দুটি অধ্যায়ে ধর্ম ও শুদ্ধৰ সূত্রগুলি গঠিত হয়েছে। এর থেকে আমরা কল্পসূত্র সাহিত্যের স্পষ্ট ঐতিহাসিক স্তর সম্পর্কে অবহিত হই; এর প্রাথমিক স্তরে প্রতি শাখা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিল।

সামূহিক বৈদিক যজ্ঞে তিনটি অগ্নি প্রয়োজনীয় ছিল-আহবনীয়, দক্ষিণা ও গাৰ্হাপত্য–মোটামুটিভাবে এগুলি দেবতা, পিতৃপুরুষ ও মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এদের মধ্যে শুধুমাত্ৰ গাৰ্হাপত্য অগ্নি গৃহ্য অনুষ্ঠানগুলিতে ব্যবহৃত হয়। শতপথ ব্ৰাহ্মণের একটি দেবকাহিনীতে। ইড়া বা শ্রৌত যাগের যজ্ঞীয় হব্যের উৎস বর্ণিত হয়েছে। এটা যেহেতু মনু কর্তৃক নিবেদিত প্ৰথম পাক যজ্ঞে উদ্ভূত হয়েছিল, তাই কোনো পাক যজ্ঞে ইড়া নেই। প্রকৃতপক্ষে এই অনুপস্থিতি সামূহিক ও গাৰ্হস্থ্য অনুষ্ঠানগুলির প্রধান প্রতীকী পার্থক্যকে সূচিত করছে। এদিক দিয়ে এই শেষোক্ত অনুষ্ঠানগুলি প্রাচীনতর ও অধিকতর সর্বজনীন–সম্ভবত ইড়া আবিষ্কৃত হওয়ার পূর্বে কোনও সময়ে এর উদ্ভব হয়েছিল।

%d bloggers like this: