৬. উপসংহার

ষষ্ঠ অধ্যায় – উপসংহার

প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে আমি যথাক্রমে ভারতীয় জ্ঞানবিদ্যা, চার্বাক জ্ঞানবিদ্যা, পাশ্চাত্য জ্ঞানবিদ্যা ও হিউমের জ্ঞানবিদ্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। এরপর, পঞ্চম অধ্যায়ে চার্বাক ও হিউমের জ্ঞানবিদ্যার তুলনামূলক আলোচনা করেছি। প্রথম অধ্যায়ে ভারতীয় জ্ঞানবিদ্যা, বিশেষ করে, ভারতীয় প্রমাণতত্ত্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে গিয়ে এটা দেখেছি যে, মীমাংসা, বেদান্ত, ন্যায়, সাংখ্য, যোগ, বৈশেষিক, বৌদ্ধ ও জৈন এই আটটি সম্প্রদায়ই তাঁদের জ্ঞানবিদ্যায় প্রত্যক্ষ ও অনুমানকে প্রমাণ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। যার ফলে এসব দার্শনিক সম্প্রদায়কে জ্ঞানোৎপত্তিসংক্রান্ত মতবাদের দিক থেকে পাশ্চাত্য দার্শনিকদের মতো বিশুদ্ধ বুদ্ধিবাদী বা বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে চার্বাক জ্ঞানবিদ্যার আলোচনায় দেখা যায়, চার্বাক দার্শনিকগণ জ্ঞানবিদ্যার দিক থেকে উল্লিখিত আটটি সম্প্রদায় থেকে ভিন্নধর্মী এবং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি ধারার সূচনা করেছেন। তাঁরা জ্ঞানোৎপত্তিসংক্রান্ত মতবাদ হিসেবে বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতার কথা আপোষহীনভাবে ঘোষণা করে ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষকেই একমাত্র প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করেন। শুধু জ্ঞানবিদ্যার ক্ষেত্রে নয়, অধিবিদ্যার দিক থেকে তাঁরা বিশুদ্ধ জড়বাদ, আত্মা সম্পর্কিত মতবাদের ক্ষেত্রে দেহাত্মবাদ, জড় ও চেতনার উৎপত্তিসম্পর্কিত ব্যাখ্যায় স্বভাববাদ বা প্রকৃতিবাদ, কার্যকারণের ব্যাখ্যায় আকস্মিকতাবাদ, মোক্ষের ক্ষেত্রে ইহলোকবাদ ও জাগতিকতাবাদ এবং নীতিবিদ্যার দিক থেকে দৃঢ়ভাবে সুখবাদকে সমর্থন করেছেন। দর্শনের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের অনুসারিত তত্ত্বে প্রত্যক্ষবাদী জ্ঞানবিদ্যার সমর্থন খুঁজে পাওয়া যায়। অন্য আটটি ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে অধ্যাত্মবাদের প্রতি যে সমর্থন পরিলক্ষিত হয় চার্বাক দর্শন এর ব্যতিক্রম। সাম্প্রতিককালের দার্শনিক চিন্তার বিচার বিশ্লেষণে তাঁদের অভিজ্ঞতাবাদ ত্রুটিমুক্ত ও সন্তোষজনক মতবাদ না হলেও একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, চার্বাক দার্শনিকগণ দর্শনের ইতিহাসে অভিজ্ঞতাবাদী ধারার প্রবর্তক। শুধু তাই নয়, চার্বাকগণ তাঁদের অন্যান্য দার্শনিক মতবাদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাবাদের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষার যে প্রয়াস পেয়েছেন তা অনেক পাশ্চাত্য অভিজ্ঞতাবাদী চিন্তায় অনুপস্থিত।

তৃতীয় অধ্যায়ে পাশ্চাত্য জ্ঞানবিদ্যার ইতিহাসের আলোচনায় প্রধানত দুটি জ্ঞানবিদ্যাগত ধারার পরিচয় পাওয়া যায়। অভিজ্ঞতাবাদ ও বুদ্ধিবাদ। অভিজ্ঞতাবাদী ধারাটি সোফিস্টদের হাতে জন্মলাভ করে। সোফিস্টদের অভিজ্ঞতাবাদী আলোচনার মধ্যে দিয়েই পাশ্চাত্য জ্ঞানবিদ্যার আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীকালে এপিকিউয়িস-জেনো-একুইনাস-বেকন-লক-বার্কলে প্রমুখের দার্শনিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে এই ধারা হিউমের দর্শনে বিশেষ স্থান লাভ করে। পাশ্চাত্য জ্ঞানবিদ্যার এই ধারাটি যেন ভিন্ন আঙ্গিক ও প্রেক্ষাপটে চার্বাক অভিজ্ঞতাবাদেরই অনুরণন।

চতুর্থ অধ্যায়ে হিউমের জ্ঞানবিদ্যার আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, তিনি উপর্যুক্ত পাশ্চাত্য অভিজ্ঞতাবাদী ধারারই প্রতিনিধিত্ব করেন এবং বিভিন্ন দিক থেকে বৃহত্তর পরিসরে একে ত্রুটিমুক্ত, সংশোধিত ও উন্নত করে পূর্ণাঙ্গ ও সঙ্গতিপূর্ণ রূপ দিতে প্রয়াসী হন। তাঁর এই প্রয়াসের ফলে পাশ্চাত্য অভিজ্ঞতাবাদ সুসঙ্গত রূপলাভ করে। তাঁর পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতাবাদী লক ও বার্কলের দ্রব্যের ধারণা তাঁর দ্বারা অস্বীকৃত হয়। আত্মা সম্পর্কিত শাশ্বত-ধারণা মতবাদ তাঁর অভিজ্ঞতাবাদী ব্যাখ্যায় পুঞ্জবাদে রূপ নেয়, কার্যকারণের আবিশ্যক সম্পর্কের ধারণার স্থলে আকস্মিক বা সম্ভাব্য সম্পর্কের ধারণা প্রতিস্থাপিত হয় এবং অভিজ্ঞতাবাদের চরম পরিণতি হিসেবে সংশয়বাদের উদ্ভব হয়। এভাবেই হিউম তাঁর ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞতাবাদের সর্বশেষ গন্তব্য নির্ধারণের চেষ্টা করেন।

চার্বাক ও হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে পঞ্চম অধ্যায়ে, চার্বাক ও হিউমের জ্ঞানবিদ্যার তুলনামূলক সমীক্ষায়। এখানে উভয় অভিজ্ঞতাবাদের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বিচার করতে গিয়ে মনে হয়, হিউম যেন চার্বাক প্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞতাবাদেরই আধুনিক রূপকার। সমসাময়িক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এই মতবাদ থেকে অসঙ্গতিপূর্ণ উপাদানগুলোকে বর্জন করে অভিজ্ঞতাবাদকে সঙ্গতিপূর্ণ পরিণতি দানের প্রয়াস নিয়ে হিউম যেন তাঁর উপর ইতিহাসের অর্পিত দায়িত্বই পালন করেছেন।

হিউম প্রত্যক্ষভাবে চার্বাক দর্শনের সাথে পরিচিত ছিলেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। কারণ, তিনি তাঁর লেখায় কোথাও চার্বাকদের কথা উল্লেখ করেন নি। তবে তিনি যে চার্বাক প্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞতাবাদী ধারার আধুনিক যুগের একজন প্রতিনিধি তা পঞ্চম অধ্যায়ের আলোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে। এছাড়া, এই আলোচনা থেকে আমরা এটাও দেখতে পেয়েছি যে, অভিজ্ঞতাবাদের সাথে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের উন্নতির প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে।

এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত পাঁচটি অধ্যায়ের উপর্যুক্ত সারসংক্ষেপ থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, দর্শনের ইতিহাসের অভিজ্ঞতাবাদী ধারা একটি শক্তিশালী জ্ঞানবিদ্যাগত ধারা। খ্রিস্টপূর্ব সাতশত অব্দেরও আগে প্রাচ্য দর্শনের ইতিহাসে চার্বাক দার্শনিকগণ যে ধারাটির সূচনা করেছিলেন বিজ্ঞানের উন্নতির বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আঠারো শতকের ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক লক, বার্কলে এবং শেষ পর্যন্ত হিউমের দর্শনে এসে সে ধারাটি চরম রূপ লাভ করে। হিউমের দর্শনে অভিজ্ঞতাবাদের চরম বিকাশ একদিকে যেমন জ্ঞানবিদ্যার ইতিহাসকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপিত করেছে, অন্যদিকে তা একটি শক্তিশালী ধারা হিসেবে পরবর্তী দার্শনিক মতবাদগুলোকেও প্রভাবিত করেছে। হিউম পরবর্তীকালেও এই ধারার প্রভাব দর্শনের ইতিহাসে প্রবাহমান থাকে, এবং এর প্রভাবে অনেক নতুন দার্শনিক চিন্তার উদ্ভব হয়। বিশ শতক পর্যন্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মতবাদই হিউমের দর্শনকে সরাসরি উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কোনো কোনো মতবাদ হিউমের দর্শন থেকে উপাদান সংগ্রহ করে তাঁদের দার্শনিক চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেছে, আবার কোনো কোনো মতবাদে হিউমের মতবাদকে খণ্ডনের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর Histary of Western Philosophy গ্রন্থের সপ্তদশ অধ্যায়ে হিউম সম্পর্কিত আলোচনা প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন, হিউম পরবর্তী অধিবিদদের প্রিয় অবসর বিনোদন ছিল হিউমকে খণ্ডন করা। তবে তাঁদের এই হিউম-খণ্ডন কখনই সন্তোষজনক ছিল না।

হিউম-পরবর্তী উল্লেখযোগ্য দার্শনিক ধারার ক্ষেত্রে বিচারবাদ, উপযোগবাদ, যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ, প্রয়োগবাদ, রূপতত্ত্ব বা অবভাসবাদ এবং বিশ্লেষণী দার্শনিক মতবাদ অন্যতম। এসব মতবাদের উপর হিউমের দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান।

জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট হিউম পরবর্তী দার্শনিকদের মধ্যে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। জ্ঞানবিদ্যার ক্ষেত্রে হিউমের অবদান কান্টের দর্শনে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। কান্টের Critique of Pure Reason ১৮৮১ সালে, অর্থাৎ হিউমের মৃত্যুর মাত্র পাঁচ বছর পর প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থকে রাসেল কান্টের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বলেন। এই গ্রন্থে কান্ট তাঁর পূর্ববর্তী বুদ্ধিবাদী ও অভিজ্ঞতাবাদী জ্ঞানবিদ্যাগত মতবাদের সমন্বয় সাধন করে বিচারবাদী মতবাদ দেন। কান্ট প্রথম জীবনে ভলফ ও লাইবনিজের বুদ্ধিবাদী মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। হিউমের রচনা থেকে তিনি বুদ্ধিবাদের বিচারবিযুক্তবাদিতা সম্পর্কে সচেতন হন। তাই তিনি নিজেই একথা স্বীকার করেছেন যে, হিউম তাঁকে বুদ্ধিবাদের বিচারবিযুক্তবাদী নিদ্রা থেকে জাগিয়েছেন।[১] জ্ঞানের উপাদান যে অভিজ্ঞতাজাত তা তিনি হিউমের কাছ থেকেই অবগত হন। তিনি তাঁর উপরিলিখিত গ্রন্থের শুরুতেই একথা স্বীকার করেন যে, আমাদের সকল জ্ঞানই অভিজ্ঞতা থেকে শুরু হয়, এক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নাই।[২] এখানেই তাঁর উপর হিউমের প্রভাব লক্ষণীয়। কিন্তু তিনি হিউমকে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করেননি। বরং তাঁর গ্রন্থের মূল উদ্দেশ্য ছিল একথা প্রমাণ করা যে, যদিও আমাদের কোনো জ্ঞানই অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করতে পারে না তবুও এর একটি অংশ অভিজ্ঞতাপূর্ব। এই অংশটিকে অভিজ্ঞতা থেকে আরোহাত্মকভাবে পাওয়া যায় না।[৩] জ্ঞানের এই অংশটিই আকারগত অর্থাৎ বুদ্ধিলব্ধ, এবং এর জন্যই জ্ঞান সার্বিক ও অনিবার্য হতে পারে। সুতরাং কান্ট বুদ্ধিবাদের বিচারবিযুক্ততা থেকে মুক্ত হয়ে হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের জ্ঞানোৎপত্তি সংক্রান্ত অংশটুকু গ্রহণ করেন। কিন্তু সংশয়বাদকে বর্জন করে জ্ঞানের নিশ্চয়তা ও অনিবার্যতা প্রত্যয়নে প্ৰয়াসী হন।

শুধু জ্ঞানোৎপত্তির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার গুরুত্বের স্বীকৃতিই নয়, আরো কিছু বিষয়ে কান্ট হিউমের মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। হিউম জ্ঞানের বিষয়কে ধারণার সম্বন্ধ ও বাস্তব বিষয়, এই দুটি ভাগে ভাগ করেন। কান্টও অবধারণকে বিশ্লেষণী ও সংশ্লেষণী, এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। এই দুই প্রকার অবধারণ ছাড়াও কান্ট অবধারণকে অভিজ্ঞতাজাত এবং অভিজ্ঞতাপূর্ব এ দুই ভাগে বিভক্ত করেন।[৪] অবধারণের এই বিভক্তিকরণে কান্টের উপর হিউমের প্রভাব সুস্পষ্ট। কান্টের ভাষায় হিউমের অবস্থাটি ছিল এরকম : সব অবধারণ হয় অভিজ্ঞতাজাত সংশ্লেষক হবে, যাকে হিউম তথ্যগত বিষয় বলেছেন, না হয় অভিজ্ঞতাপূর্ব বিশ্লেষক হবে, যাকে হিউম ধারণার সম্বন্ধ বলেছেন। কিন্তু কান্টের মতে, এ ছাড়াও তৃতীয় আরেক প্রকার অবধারণ রয়েছে, যাদের মধ্যে হিউমের বর্ণিত উভয় প্রকার অবধারণের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এর নাম অভিজ্ঞতাপূর্ব সংশ্লেষক অবধারণ।[৫] এরূপ অবধারণকে স্বীকার করেই কান্ট সার্বিক ও অনিবার্য জ্ঞান সম্ভব করে তোলেন। কিন্তু হিউম এসব অবধারণকে স্বীকার করেননি।

এভাবেই কান্ট হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের প্রাথমিক উপাদান অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করে এবং তাঁর জ্ঞানবিদ্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশয়বাদকে বর্জন করে অভিজ্ঞতাজাত জ্ঞানকে সার্বিক ও অনিবার্যতার স্তরে উন্নীত করে বিচারবাদী মতবাদ দেন। তাঁর বিচারবাদ যদিও হিউমের প্রতি চ্যালেঞ্জ তবুও তা হিউমের অভিজ্ঞতাবাদকে উপেক্ষা করতে পারেনি। বরং তা হিউমের মতবাদ থেকে প্রাথমিক উপাদান সংগ্রহ করেছে। অনেক দার্শনিক একথা মনে করেন যে, হিউম জ্ঞানবিদ্যার ক্ষেত্রে যে সমস্যা রেখে যান কান্ট তাঁর পূর্বোক্ত গ্রন্থে সে সমস্যার সমাধান দিতে পেরেছেন। কিন্তু রাসেল এ মতের সাথে একমত নন। তাঁর মতে, জার্মান দার্শনিক ধারা বিশেষত কান্ট ও হেগেলের দর্শন, হিউম-পূর্ব বুদ্ধিবাদী ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছে যাকে হিউমের যুক্তি দ্বারা খণ্ডন করা যায়।

হিউম-পরবর্তী অন্যতম দার্শনিক ধারা হলো উপযোগবাদ। আধুনিক ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে উনিশ শতকে এই ধারাটি গড়ে ওঠে। উপযোগবাদের অন্যতম প্রবক্তা বেনথাম নীতিদর্শনের একজন সংস্কারক। নীতিদর্শনের ক্ষেত্রে তিনিই দৃঢ়ভাবে অভিজ্ঞতাবাদী ও বিশ্লেষণী ধারার প্রবর্তন করেন। তাঁর দার্শনিক মতবাদের প্রেক্ষাপট জুড়ে আছে হিউমের দার্শনিক মতবাদ। বেনথাম হিউমকে তাঁর একজন শিক্ষক হিসেবে গণ্য করেন। কারণ, নীতিদর্শনের ক্ষেত্রে উপযোগনীতি কথাটি সর্বপ্রথম হিউমই ব্যবহার করেন। এজন্য বেনথাম তাঁর The Fragments on Government নামক গ্রন্থে হিউমকে প্রশংসা করেছেন। এ একথাও বলা হয়ে থাকে যে, ইংল্যান্ডে হিউমের Enquiry গ্রন্থই ছিল উপযোগবাদী শতাব্দীর সূচনা।[৮] বেনথাম বিভিন্ন দিক থেকে হিউমের দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।’ তিনি নিজেই একথা বলেছেন যে, হিউমের Treatise তাঁকে নীতিদর্শনের ক্ষেত্রে প্রতারিত ব্যক্তিকে প্রকৃত অবস্থা অনুধাবনে সাহায্যকারীর মতো সহায়তা করেছে।[১০] বেনথামের অনুসারী প্রখ্যাত উপযোগবাদী জেমস মিলও হিউমের মতোই অভিজ্ঞতার ভূমিকা স্বীকার করে অতীন্দ্রিয় ‘আমি’র অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। তিনিও হিউমের সাথে এ বিষয়ে একমত যে, অবধারণ ক্রিয়া ও প্রত্যক্ষণ ক্রিয়া থেকে পৃথক করার মতো স্বতন্ত্রভাবে অস্তিত্বশীল কোনো ‘আমি’কে খুঁজে পাওয়া যায় না। এছাড়া, তিনিও হিউমের মতোই জানাকে প্রত্যক্ষণ ক্রিয়া বা জ্ঞান ক্রিয়া থেকে আলাদা কিছু বলে মনে করেন না। তবে এক্ষেত্রে জেমস মিল হিউমের ব্যাখ্যা থেকে এগিয়ে গিয়ে আত্মসত্তাকে অভিজ্ঞতায় অনুভূত একটি গুণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যেখানে হিউম একে শুধু প্রত্যক্ষণের সমষ্টি বলেছিলেন।

বেনথামের ছাত্র ও জেমস মিলের পুত্র জন স্টুয়ার্ট মিল জ্ঞানোৎপত্তিসংক্রান্ত মতবাদ, বহির্জগৎ সম্পর্কিত ধারণা এবং অনুষঙ্গবাদী ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হিউমকে অনুসরণ করেন।[১১] হিউমের মতোই তিনি অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র সংবেদনের অনুক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মিলের মতে, স্থায়ী আত্মার ধারণা হলো অনুভূতির একটি স্থায়ী সম্ভাবনায় বিশ্বাস। এই বিশ্বাস স্মৃতি ও কল্পনা থেকে অনুসঙ্গ নিয়মের সাহায্যে গঠিত হয়। বহির্জগৎ সম্পর্কেও একই কথা সত্য। কারণ, কোনো প্রত্যক্ষ প্রতীতি বা স্বজ্ঞার মাধ্যমে আমরা বহির্জগৎ সম্পর্কিত জ্ঞান পাই না। যাকে আমরা বাহ্যজগতের জ্ঞান বলি তা মূলত অনুষঙ্গ নিয়ম নির্ভর একটি বিশ্বাস যা সংবেদনের স্থায়ী সম্ভাবনা ছাড়া আর কিছুই নয়। এককথায়, তিনি হিউমের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকে অনুসরণ করেই বাহ্যজগৎকে সংবেদনের স্থায়ী সম্ভাবনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তবে, আরোহানুমান সম্পর্কিত প্রশ্নে মিল হিউমকে অনুসরণ করেননি। মিল আরোহ অনুমানের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন। তিনি গাণিতিক সত্যকে অভিজ্ঞতার অত্যন্ত উচ্চস্তরের নিশ্চিত সাধারণীকরণ হিসেবে আখ্যায়িত করে একে আরোহের উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। তাই তাঁর কাছে হিউম স্বীকৃত ধারণার সম্বন্ধের প্রয়োজন ছিল না। কারণ, তিনি যৌক্তিক ও গাণিতিক আবশ্যকতাকে মনস্তাত্ত্বিক বলে মনে করতেন।

হিউম-পরবর্তী অভিজ্ঞতাবাদী ধারার উপরও হিউমের প্রভাব সুস্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতকের অভিজ্ঞতাবাদী ও উপযোগবাদী দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের উপর হিউমের প্রভাব পূর্বে আলোচিত হয়েছে। তিনি সরাসরি হিউমের ঐতিহ্যকে অনুসরণ করেন।[১২] বিশ শতকের অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণও হিউম নির্দেশিত গণিত ও যুক্তিবিদ্যার আবশ্যিক সত্য এবং বাস্তব ঘটনার পর্যবেক্ষণগত সত্যের ব্যবধানকে সাধারণভাবে গ্রহণ করেন। অর্থাৎ তাঁরা মিলকে প্রত্যাখ্যান ও হিউমকে গ্রহণ করেন।[১৩] তাঁরা সকলেই একথা মনে করেন যে, আবশ্যিকতা শুধুমাত্র যুক্তিবিদ্যা ও গণিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এছাড়া আর সবকিছুই সম্ভাব্য। এসব অভিজ্ঞতাবাদীর মধ্যে যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীরা অন্যতম।

হিউম-পরবর্তী দর্শনে অধিবিদ্যাগত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দুটি দার্শনিক ধারার অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। একটি ধারা হিউমের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত অধিবিদ্যাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াসী হয় এবং হিউমকে খণ্ডন করার চেষ্টা করে। অন্য ধারাটি সরাসরি হিউমের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে তাঁর অভিজ্ঞতাবাদকে গ্রহণ করে, এবং অধিবিদ্যাগত প্রশ্নে হিউমের অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে। শেষোক্ত ধারায় গড়ে ওঠা অন্যতম দার্শনিক মতবাদ যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ, যার উপর হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের সর্বাপেক্ষা বেশি প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয়। মূলত ১৯২৮ সালের দিকে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভিয়েনা-চক্র নামক দার্শনিক গোষ্ঠীই যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের প্রবক্তা। পাশ্চাত্য দর্শনের কোনো কোনো ঐতিহাসিক বেকন, হবস, লক, বার্কলে, হিউম, ম্যাক, রাসেল, যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদী দার্শনিকগণ এবং কোঁতেকে এই ধারার চিন্তাবিদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।[১৪] ঐতিহাসিক স্যামুয়েল স্টাফ-এর মতে, যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীগণ যে মতবাদকে যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ বলেছেন সে মতবাদে নতুন যুক্তিবিদ্যাগত কৌশল এবং হিউমের অভিজ্ঞতাবাদী মনোভাবের সমন্বয় ঘটেছে মাত্র।[১৫] বি. আর. এসও যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীদের উপর হিউমের প্রভাবকে স্বীকার করেন। তবে তাঁর মতে, হিউমের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীরা যৌক্তিক বিশ্লেষণ যোগ করেছেন।[১৬] হিউমের প্রখ্যাত ভাষ্যকার এন্টনি ফ্লু হিউমকে যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীদের ভাবগত পিতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।[১৭] বিশ্লেষণী দার্শনিক আর্মসনও যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীদের উপর হিউমের স্পষ্ট প্রভাব নির্দেশ করেছেন।[১৮] তাঁর মতে, হিউমের ধারণা সম্পর্কিত মতবাদ অর্থ সংক্রান্ত প্রদর্শী সংজ্ঞার (ostensive definition) ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ একটি শব্দ যে অর্থ নির্দেশ করে তা প্রদর্শনের মাধ্যমে সে শব্দের অর্থ জানার প্রতি ইঙ্গিত করে। কারণ, হিউমের মতবাদে ধারণার অর্থ ইন্দ্রিয়ছাপের মাধ্যমে জানতে হয়। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীদের যাচাইনীতি হিউমের জ্ঞানবিদ্যাগত প্রদর্শী সংজ্ঞারই অনুরূপ পুনর্বিন্যাস। এ প্রসঙ্গে আর্মসনের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি হিউম ও যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের সাদৃশ্য দেখানোর জন্য তাঁর বক্তব্যকে নিম্নরূপে উপস্থাপিত করেন :

হিউম : পুরাতন অভিজ্ঞতাবাদী, অধিবিদ্যাগত মত : সকল বস্তুই ইন্দ্ৰিয়প্রদত্ত।
যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদী : নতুন অভিজ্ঞতাবাদী, অধিবিদ্যাগত মত : সকল তথ্যই ইন্দ্ৰিয়প্রদত্ত।
পুরাতন অভিজ্ঞতাবাদী : জ্ঞানবিদ্যাগত মত : সকল অর্থপূর্ণ শব্দই হলো ইন্দ্রিয়প্রদত্ত বস্তুর নাম।
নতুন অভিজ্ঞতাবাদী : জ্ঞানবিদ্যাগত মত : সকল অর্থপূর্ণ বাক্যই হলো ইন্দ্রিয়জাত তথ্যের বর্ণনা।

যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীগণ অর্থপূর্ণ বচনকে সংশ্লেষক বা অভিজ্ঞতাজাত এবং বিশ্লেষক বা অভিজ্ঞতাপূর্ব বা পুনরুক্তিমূলক এই দুই ভাগে ভাগ করেন। তাঁদের মতে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বচন এবং নিত্যব্যবহার্য তথ্যগত বচনই প্রথম শ্রেণির বচন। অর্থাৎ এগুলো অভিজ্ঞতাজাত। অন্যদিকে, গণিতের বচন অভিজ্ঞতাপূর্ব বা বিশ্লেষণাত্মক। তাঁদের এই বিভাজনের সঙ্গে হিউমের ধারণার সম্বন্ধ ও তথ্যগত বিষয়ের অনুরূপতা লক্ষ করা যায়। বিশেষত, হিউমের পরবর্তীকালে অভিজ্ঞতাজাত ও অভিজ্ঞতাপূর্ব জ্ঞানের মধ্যে স্পষ্ট বিজ্ঞানের যে ধারা লক্ষিত হয় হিউমের হাতেই এই ধারার সূচনা—একথা অস্বীকার করার উপায় নাই

যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীগণ কেবল হিউমের অভিজ্ঞতাবাদ নয় বরং তাঁর অধিবিদ্যা দ্বারাও গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তবে এ সম্পর্কে তাঁরা হিউমের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যৌক্তিক বিশ্লেষণকে আরোপ করেন। হিউম ধারণার সম্বন্ধ ও তথ্যগত বিষয় এই দুই প্রকার বচনের বাইরে যেসব বচন আছে সেগুলোকে কূটতর্ক এবং অধ্যাস বলেছেন। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীগণও প্রায় একই কথা বলেন। তবে তাঁরা কূটতর্ক এবং অধ্যাস-এর স্থলে অর্থহীন কথাটি ব্যবহার করেন।[১৯]

যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ শেষ পর্যন্ত দুটি ধারায় প্রবাহিত হয়। একটির প্রতিনিধিত্ব করেন রুডলফ কারনাপ, অন্যটির প্রতিনিধিত্ব করেন এ. জে. এয়ার। কারনাপের হাতে প্রত্যক্ষবাদ প্রত্যক্ষ সম্পর্কে জড়বাদী ও মন সম্পর্কে শারীরবৃত্তীয় ধারণার দিকে অগ্রসর হয়। এয়ারের ধারাটি প্রত্যক্ষ ও মন উভয় ক্ষেত্রেই ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাবাদকে অনুসরণ করে। তবে, কারনাপ ও এয়ার নির্দেশিত এই উভয় ধারাই ভ্রান্তির ঝুঁকি থেকে মুক্ত সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞানের সম্ভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ উভয় মতবাদের ক্ষেত্রেই হিউমের সংশয়বাদের স্বীকৃতি দেখা যায়।[২০]

এয়ার নিজেই হিউমের মতবাদের সাথে যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের সাদৃশ্য নির্ণয় করেছেন। হিউম পরিমাণ বা সংখ্যা সম্পর্কিত বিমূর্ত চিন্তন এবং বাস্তব বিষয় বা অস্তিত্ব সম্পর্কিত পরীক্ষণমূলক চিন্তন—এই দুই শ্রেণির গ্রন্থ ছাড়া অন্যান্য সকল গ্রন্থকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পরামর্শ দেন। কারণ, এগুলো কূটতর্ক ও ভ্রান্তিমূলক ছাড়া আর কিছুই নয়।[২১] এয়ার তাঁর Language, Truth and logic গ্রন্থে হিউমের এই উক্তিকে উদ্ধৃত করেন। তাঁর মতে, হিউমের এই উক্তি যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীদের পরখনীতির, অর্থাৎ যে বাক্য আকারগত সত্য বচন প্ৰকাশ করে না বা কোনো অভিজ্ঞতাপূর্ব প্রকল্প প্রকাশ করে না সে বাক্য অর্থহীন—এই নীতির অলংকারপূর্ণ প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।[২২]

বিশ শতকের দার্শনিক আন্দোলনের অতি পরিচিত নাম যৌক্তিক বিশ্লেষণী দর্শন বা যৌক্তিক পরমাণুবাদের অন্যতম প্রতিনিধি ব্রিটিশ দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন। তাঁর রচনা থেকেই যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ কেন্দ্রীয় উপকরণ লাভ করে। ভিটগেনস্টাইনের দর্শনের উপরও হিউমের দর্শনের যথেষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তিনি তাঁর Tractatus Logico Philosophicus গ্রন্থে অর্থপূর্ণ বচনকে মৌলিক ও যৌক্তিক এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করেন। মৌলিক বচন জগৎসংক্রান্ত এবং যৌক্তিক বচন পুনরুক্তিমূলক।[২৩] এই দুই শ্রেণির বচন ছাড়া অন্য কোনো বচন অর্থপূর্ণ নয় বলে তিনি অধিবিদ্যক বচনকে অর্থপূর্ণ বচন নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি অধিবিদ্যক বচনকে ভাষার অপব্যবহার বলে মনে করেন।

ভিটগেনস্টাইনের মৌলিক ও যৌক্তিক বচন হিউমের তথ্যগত ও ধারণার সম্বন্ধমূলক বিষয়ের অনুরূপ। এছাড়া, হিউম যে মানদণ্ডে আধিবিদ্যক বচনকে কূটতর্ক ও অধ্যাসমূলক বলেছেন ভিটাগেনস্টাইন একই মানদণ্ডে এই সব বচনকে ভাষার অপব্যবহার বলেন। ভিটগেনস্টাইন তাঁর Tractatus-এর উপসংহারে বলেন, যেসব বিষয়ে আমাদের বলার কিছু নেই সেসব বিষয়ে আমাদের নীরব থাকাই শ্রেয়। তাঁর বক্তব্য একদিকে যেমন ভাষার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে অন্যদিকে তা অধিবিদ্যা সংক্রান্ত আলোচনার অসারতাকেই নির্দেশ করে। কিন্তু হিউম যখন এ প্রসঙ্গে বলেন, যে গ্রন্থ বিমূর্ত ধারণা বা তথ্যগত বিষয় সম্পর্কিত পরীক্ষামূলক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করে না সে গ্রন্থকে আগুনে ছুড়ে ফেলে দাও, কারণ, তা কূটতর্ক ও অধ্যাসমূলক, তখন তাঁকে ভিটগেনস্টাইনের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর বলে মনে হয়। ভিয়েনা সার্কেল বিশ শতকে হিউমের এই অভিজ্ঞতাবাদী নীতিরই উত্তরাধিকার বহন করে।[২৪] ভিটগেনস্টাইনের মতে, একমাত্র গাণিতিক সমীকরণ বা পুনরুক্তিতেই অনিবার্যতা পাওয়া যায়। কিন্তু গাণিতিক সমীকরণ বা পুনরুক্তি জগৎ সম্পর্কে কিছু বলে না। সুতরাং জগতে অনিবার্যতা নাই। যুক্তিবিদ্যা ছাড়া সবকিছুই আকস্মিক।[২৫] জগৎ সম্পর্কিত তাঁর আকস্মিকতাবাদে হিউমের সংশয়বাদের প্রভাব স্পষ্ট।

ভিটগেনস্টাইন যে মৌলিক বচনের কথা বলেন তাঁর সাথে হিউমের সরল ইন্দ্রিয়ছাপের মিল দেখা যায়। মৌলিক বচন সরলতম এবং অবিশ্লেষণযোগ্য। মৌলিক বচনের অর্থ জগতের সাথে তাদের সম্পর্কের মধ্যে নিহিত থাকে। সকল যথার্থ বচনই মৌলিক বচনের সত্যাপেক্ষক। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীরা এই যথার্থ বচনকেই অভিজ্ঞতায় যাচাইযোগ্য বলেছেন। ভিটনেস্টাইন ও যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীদের যথার্থ বচনের মানদণ্ডকে হিউমের—প্রতিটি যথার্থ ধারণাই অনুরূপ ইন্দ্রিয়ছাপের অনুলিপি—এই নীতির ভিন্ন প্রকাশ বলে মনে হয়। আমসনও এই বিষয়টিকে সমর্থন করেন। তিনি বলেন যে, অভিজ্ঞতার বিষয়বস্তু বা চরম বিশেষ হিসেবে হিউমের ইন্দ্রিয়ছাপকে যদি তাঁর অধিবিদ্যাগত মত বলে গণ্য করা হয় তবে হিউমের ইন্দ্রিয় প্রদত্ত তথ্যের স্থলে ইন্দ্রিয় প্রদত্ত বিশেষকে প্রতিস্থাপিত করে যৌক্তিক পরমাণুবাদী ভিটগেনস্টাইন হিউমের মতেরই ভাষ্য দান করেছেন।[২৬] আর্মসন এই কথা স্পষ্টতই বলেছেন যে, একদিক থেকে বিচার করলে যৌক্তিক পরমাণুবাদ নতুন কিছু নয়। হিউমের সূত্র থেকে যৌক্তিক পরমাণুবাদীদের খুব একটা পার্থক্য নেই।[২৭]

ভিটগেনস্টাইনের দর্শনের ভাষ্যকার ও ভিটগেনস্টাইন বিশেষজ্ঞ জর্জ পিচার হিউম ও ভিটগেনস্টাইনের দর্শনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাদৃশ্য লক্ষ করেন। তাঁর মতে, ভিটগেনস্টাইন তাঁর মতবাদে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেন যার উদ্দেশ্য হলো জটিল বিষয়কে সরলীকৃত করা। হিউম তাঁর Enquiry গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলেন যে, যখন আমরা আমাদের চিন্তা বা ধারণাকে বিশ্লেষণ করি, তা যতই জটিল হোক না কেন, সব সময়ই এগুলো সে সব সরল ধারণায় বিশ্লিষ্ট হয় যেসব সরল ধারণা পূর্ববর্তী অনুভূতি বা মনোভাবের অনুলিপি। হিউমের ধারণা সম্পর্কিত এই বক্তব্যে জটিল বিষয়কে সরলীকরণের ব্যাপারটি লক্ষিত হয়।[২৮]

অহাদ সম্পর্কে দর্শনে যে সাধারণ দ্বৈতবাদী ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে তা হলো, অনুভবকারী বা আত্মা এবং অনুভূত বস্তুর দ্বৈতবাদ। ভিটগেনস্টাইন এই ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, আমরা সকল অভিজ্ঞতালব্ধ বস্তুকে পাই, এর ধারক কোনো আত্মাকে পাই না।[২৯] যদিও তিনি নিজে এই ধারণাটি শোপেনহাওয়ারের কাছ থেকে নিয়েছেন বলে মনে করেন তবুও আধুনিক যুগে হিউমই এই ধারণার প্রবক্তা।[৩০] ভিটগেনস্টাইন শব্দের অর্থ সম্পর্কিত প্রয়োগ তত্ত্বের (Use Theory) কথা বলেছেন। গিলবার্ট রাইলের মতে, এ মতবাদের ব্যবহার হিউমের কারণের ব্যাখ্যায় দেখা যায়। হিউম যখন কারণকে ব্যাখ্যা করেছেন তখন তিনি ‘কারণ’ শব্দটি সম্পর্কে প্রশ্ন করেননি, বরং প্রশ্ন করেছেন ‘কারণ’ শব্দটির ব্যবহার বা প্রয়োগ সম্পর্কে।[৩১]

ভিটগেনস্টাইনের Tractatus ও Philosophical Investigation এর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের পার্থক্য থাকলেও যেসব বিষয়ে সাদৃশ্য লক্ষ করা যায় তার মধ্যে ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা এবং বৌদ্ধিকভাবে কী বলা যেতে পারে এবং কী বলা যায় না সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অন্যতম। এই কাজ করতে গিয়ে ভিটগেনস্টাইন মূলত তাঁর নিজস্ব ধরনে আধুনিক ব্রিটিশ দার্শনিক লক, বার্কলে, হিউমের চিন্তারই প্রতিনিধিত্ব করেছেন।[৩২] এ ছাড়াও একথা বলা অসঙ্গত হবে না যে, হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের প্রয়োজনীয়তা যৌক্তিক পরমাণুবাদী দার্শনিকগণ বারবার অনুভব করেন। কারণ, ভিটগেনস্টাইনের মতে, যৌক্তিক পরামাণুবাদ অনুসারে একটি বচন তখনই অর্থপূর্ণ হয় যদি এবং কেবল যদি বচনটি পরমাণুগত তথ্যের অনুরূপ হয়। পরমাণুগত তথ্যের অনুরূপতা পরীক্ষার উপায় হলো হিউমের অভিজ্ঞতাবাদ। কারণ, হিউমের মতে, আমাদের ইন্দ্রিয় কেবল বিশেষ বস্তুর অভিজ্ঞতা পায়।[৩৩]

বর্তমান শতকে আমেরিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি অন্যতম দার্শনিক আন্দোলন প্রয়োগবাদ। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ও অস্তিত্ববাদকে যেমন ইউরোপের দার্শনিক মত হিসেবে গণ্য করা হয় প্রয়োগবাদ তেমনি আমেরিকার নিজস্ব মৌলিক দার্শনিক মতবাদ। এ মতবাদের মাধ্যমে মার্কিন দার্শনিক চিন্তা প্রথমবারের মতো পরিপক্বতা লাভ করে এবং চিন্তার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের প্রভাবমুক্ত বলে দাবি করতে পারে।[৩৪] কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, উইলিয়াম জেমস, চার্লস সেন্ডার্স পার্স এবং জন ডিউই—প্রয়োগবাদের এই তিনজন অন্যতম প্রবক্তা হিউমের দর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁরা হিউমের দর্শন থেকে তাঁদের চিন্তার উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন।

প্রয়োগবাদীদের মধ্যে জেমসকেই হিউমের কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী বলা যায়। জেমস প্রশ্নাতীতভাবে জন লক প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক গোষ্ঠীর অনুসারী ছিলেন। তিনি কান্টীয় দর্শনের বিচারবাদী ও ভাববাদী ধারার বিরোধিতা করে হিউমের জ্ঞানবিদ্যাগত ধারাকে গ্রহণ করেন। তাঁর মতে, হিউমের অভিজ্ঞতাবাদী সূত্র যথার্থভাবে প্রয়োগ করেই হিউমের দর্শনের ত্রুটি নিরসন করা যায়। এর জন্য কান্টীয় পদ্ধতি গ্রহণ নিষ্প্রয়োজন। তাই জেমস মৌলিক অভিজ্ঞতাবাদের মাধ্যমে হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের ত্রুটি নিরসন করেন।[৩৫] জেমস এ কথা স্বীকার করেন যে, জ্ঞানের ক্ষেত্রে পরীক্ষণাত্মক পদ্ধতির ব্যবহারই হিউমের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। এটাই তাঁর বন্ধুদের কাছে তাঁর সার্থকতা ও শত্রুদের কাছে তাঁর ব্যর্থতার চাবিকাঠি।[৩৬]

জেমস হিউমের মতো ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাকে তাঁর জ্ঞানতত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তিনি হিউমের সাথে এ বিষয়েও একমত যে, কেবল বিশেষ বস্তুরই অভিজ্ঞতা হয়। তবে তিনি হিউমের সমালোচক টি. এইচ. গ্রিনের৩৭] সাথে একমত হয়ে বলেন যে, এই সব বিশিষ্ট বস্তু যদি একটি সংযুক্ত পদ্ধতিতে পরস্পর বিজড়িত না হয় তবে অস্তিত্বের জ্ঞান থাকবে না। এখানেই হিউমের ব্যর্থতা। এ কারণেই জেমস ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাবাদীদের মতো অভিজ্ঞতার আধেয়কে আনবিক স্বভাবের মনে করেন না। তাঁর মতে, অভিজ্ঞতা পরস্পর বিচ্ছিন্ন আনবিক উপাদান নয় বরং একটি প্রবাহমান নিরবচ্ছিন্ন ব্যাপার যার মধ্যে কোনো ফাঁক নেই। এখানেই হিউমের সাথে জেমস-এর পার্থক্য।

লক, বার্কলে ও হিউম প্রত্যেকেই অভিজ্ঞতার আধেয়কে অভিজ্ঞতা বা ক্রিয়া থেকে আলাদা করে অস্তিত্বের জ্ঞান সম্পর্কিত সমস্যার সৃষ্টি করেছেন। জেমস তাঁর মৌলিক অভিজ্ঞতাবাদে অভিজ্ঞতার আধেয়কে অভিজ্ঞতা প্রক্রিয়া থেকে পৃথক না করে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, আধেয় ক্রিয়া দ্বারা আবৃত্ত।[৩৮] জেমস মনে করেন যে, কান্ট ও তাঁর অনুসারী গ্রিন হিউমের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে গ্রিন হিউমের সাথে একমত যে, অনুভূতি তাঁদের নিজেদের সম্পর্ককে বহন করে না। তাই কান্ট ও গ্রিনের মতে এটি বুদ্ধির কাজ। কিন্তু জেমস এ বিষয়ে কান্ট ও গ্রিনের মতানুসারী নন। বরং তিনি অভিজ্ঞতার প্রতি হিউমের আস্থাকে সমর্থন করেন এবং অনুভূতি ও সম্বন্ধের দ্বন্দ্বকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করেন।[৩৯] তাঁর মতে, অনুভূতিই এই সম্বন্ধকে বহন করে। জেমস তাঁর মৌলিক অভিজ্ঞতাবাদে তথ্যবিষয়ক কোনো সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে গণ্য করেন না, যার উপর হিউমের সংশয়বাদের প্রভাব স্পষ্ট বলে মনে হয়। এছাড়া তিনি যখন জড়, আত্মা, দেহ, মন, বিষয়, বিষয়ী প্রভৃতি বিমূর্ত ধারণাকে মৌলিক অভিজ্ঞতার সাহায্যে বোঝা বা প্রতিপাদন করা অসম্ভব বলেন তখন তাঁর উপর হিউমের চরম অভিজ্ঞতাবাদের প্রভাব লক্ষিত হয়। সর্বোপরি, জেমস হিউমের মতবাদ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, অনবধানতা জনিত ত্রুটি, কোনো কোনো বিষয়কে বাদ দেওয়া এবং অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও হিউমের মতবাদ অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ।[৪০] তাঁর এই স্বীকৃতিসূচক মন্তব্য থেকে তাঁর কাছে হিউমের গ্রহণযোগ্যতাই প্রতীয়মান হয়।

জেমসের মতো অন্য দুজন আমেরিকান প্রয়োগবাদী দার্শনিক সি. এস. পার্স ও জন ডিউই–এর মতবাদের উপরও হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কান্টের ছাত্র হিসেবেই পার্স দর্শনের জগতে প্রবেশ করেন এবং কান্টের কাছ থেকে তিনি দর্শনের জন্য পরিকল্পিত কাঠামো মতবাদ (Architectonic Theory) অর্জন করেন যা জ্ঞানকে যুক্তিবিদ্যা ও অন্যান্য জ্ঞান—এই দুটি ভাগে বিভক্ত করে।[৪১] এই বিভাজনের উপর হিউমের প্রভাব লক্ষিত হয়। এছাড়া, হিউমের মতো পার্সও মনে করেন, বাস্তব বিষয় সম্পর্কে প্রতিপাদনমূলক জ্ঞান থাকতে পারে না।[৪২] পার্সও হিউমের মতো প্রত্যক্ষকে জ্ঞানের ক্ষেত্রে সচেতনতার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করেন, যদিও তিনি প্রত্যক্ষকেই জ্ঞান বলেননি।

ডিউইর প্রয়োগবাদী মতবাদকে করণবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর করণবাদের মূলভিত্তি অভিজ্ঞতা। তিনি জীবনকে অভিজ্ঞতার অনুক্রম হিসেবে বিচার করেন এবং ব্যক্তির স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতাকে জীবনের প্রাথমিক ঐক্য হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর এই মতবাদেও হিউমের প্রভাব লক্ষিত হয়।[৪৩] হিউমের মতো ডিউই বলেন, অভিজ্ঞতার বাইরে চিন্তার নিজস্ব কোনো সত্তা নেই। অভিজ্ঞতার অন্তরালে কোনো স্বাধীন ও অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষ সত্তা থাকতে পারে— একথা হিউমের মতো ডিউইও অস্বীকার করেন।

বিশ শতকে রূপতত্ত্ব বা অবভাসবিদ্যা নামে যে দার্শনিক মতবাদ প্রতিষ্ঠালাভ করে তার উপরও হিউমের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এই মতবাদের মূল প্রবক্তা হিসেবে জার্মান দার্শনিক এডমণ্ড হুসের্ল-এর নাম উল্লেখযোগ্য। তবে ফ্রেঞ্চ ব্রেন্টানো এবং এলেক্সিয়াস মেইনঙ-এর দর্শনেও অবভাসবিদ্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মেইনঙ-এর শিক্ষক ব্রেন্টানো হিউমের Treatise গ্রন্থের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি তাঁর Psychology From an Empirical Standpoint (১৮৭৮) নামক গ্রন্থে হিউমের মতো মনোবিজ্ঞানকে সকল বিজ্ঞানের প্রথম বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করেন।[৪৪] ব্রেন্টানোর ছাত্র অভিজ্ঞতাবাদী মেইনঙও হিউমের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি নিজেকে হিউমের শিষ্য বলে মনে করতেন।[৪৫] ব্রেন্টানোই তাঁকে এই পথ দেখিয়েছেন। মেইনঙ হিউমের বিমূর্ত ধারণা ও সম্বন্ধের বিশ্লেষণের উপর বিশেষ মনোযোগ দেন। হিউম যে অর্থে মনোবিজ্ঞানী ছিলেন মেইনঙকেও ঠিক সেই অর্থে মনোবিজ্ঞানী বলা যায়। হিউমের মতোই তিনি সম্বন্ধ ও সার্বিকতাকে মনের ক্রিয়া বলে মনে করেন।

হুসের্ল ১৮৮৪] থেকে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হিউম ও জন স্টুয়ার্ট মিলের উপর ব্রেন্টানোর বক্তৃতা শুনেন।[৪৬] হুসের্ল Ideas for a Pure Phenomenology and Phenomenological Philosophy গ্রন্থে যে অবভাসবাদী মতবাদ প্রদান করেন তাঁর উপর হিউমের প্রভাব স্পষ্ট। হর্সেল নিজেই একথা স্বীকার করেছেন যে, হিউমের দর্শনে রূপতত্ত্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে।[৪৭] হুসের্ল-এর অবভাসবাদ অনুসারে প্রকৃতপক্ষে বস্তুর যতটুকু দেখা যায় তার বেশি কখনও দেখার বা উপলব্ধির চেষ্টা করা হয় না। হিউমও বাহ্য বস্তুর অস্তিত্বের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষের প্রাথমিক উপাদান ইন্দ্রিয়ছাপের বাইরে যেতে রাজি নন। হুসের্ল নিজেই হিউমের মতের মধ্যে অবভাসবাদের বীজ খুঁজে পান। তাঁর মতে, প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষণের সময় সারসত্তাকে বা ধারণাকেই দেখে, বিশেষ বস্তুকে নয়।

অভিজ্ঞতাবাদীদের—মানুষ বিশেষ বস্তুকে দেখে—এই ধারণাকে হুসের্ল খণ্ডন করেন এবং একে স্পষ্ট অনুমান হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি মনে করেন, হিউম যখন প্রত্যক্ষণক্রিয়ার কথা বলেন তখন তা মূলত সারধর্মকেই নির্দেশ করে।[৪৮] কারণ, হিউম যখন দেখা, স্মরণ করা, কল্পনা করা, ইত্যাদি মানসিক ক্রিয়ার কথা বলেন তখন তিনি কোনো অস্তিত্বশীল বা অনস্তিত্বশীল বিশেষ প্রাকৃতিক বস্তুকে নির্দেশ করেননি। তিনি প্রত্যক্ষকে ইন্দ্ৰিয়ছাপ হিসেবে বর্ণনা করেন, জড়বস্তুর গুণাবলির পর্যবেক্ষণ হিসেবে নয়। এভাবে হিউম এমন একটি পদ্ধতিতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে দেখাতে চান যা প্রতিটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তের চেয়ে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন। হুসের্লের মতে, হিউম আসলে এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষণ ক্রিয়ার সারধর্মের প্রতিই মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তিনি অভিজ্ঞতাবাদী মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতিতে এগিয়ে গিয়ে কেইস হিস্ট্রি বা তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ বা অন্তর্দর্শনের কথা বলেননি, বরং তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রত্যক্ষণ ক্রিয়ার সারধর্মকে উপলব্ধি করা। এর বেশি বা কম কিছু নয়। এটিই অবভাসবাদের মূল কথা।[৪৯]

বিশ শতকের গোড়ার দিকে প্রধানত ব্রিটিশ দার্শনিকদের চিন্তাকে ভিত্তি করে বিশ্লেষণী দর্শন বা ভাষাগত দর্শন নামে যে দার্শনিক আন্দোলন অধিকতর পরিচিতি লাভ করে তাও হিউমের কাছে বিশেষভাবে ঋণী। কেবল ধরন বা পদ্ধতির ক্ষেত্রে নয়, দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও বটে।[৫০] প্রাচীনকালে প্লেটো, সক্রেটিস যেমন সাহস, দয়া, ন্যায়পরতা, ইত্যাদি সম্পর্কিত উক্তি বিশ্লেষণ করেছেন আধুনিক যুগে হিউমও তেমনি কারণ সম্পর্কিত উক্তিকে বিশ্লেষণ করেন।[৫১] বিশ্লেষণী দার্শনিকগণ বিশ শতকে শব্দ, ও ধারণাবলির অর্থ স্পষ্টায়নের জন্য ভাষার যৌক্তিক বিশ্লেষণের কথাই বলেছেন যা হিউমের বিশ্লেষণ থেকে পৃথক কিছু নয়। হিউম কারণ, আত্মা, ইত্যাদি শব্দের বিশ্লেষণ করে মূলত এসব ধারণার অর্থ স্পষ্টায়নের কাজই করেছেন। কোনো যুক্তিতেই আমরা বস্তুর অস্তিত্বশীলতাকে বিশ্বাসযোগ্য ও যুক্তিগ্রাহ্য বলে জানতে পারি না।

বিশ্লেষণী দার্শনিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ব্রিটিশ দার্শনিক মূর এবং রাসেলের দার্শনিক মতবাদেও হিউমের দর্শনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। মূর জ্ঞানবিদ্যাগত দিক থেকে অভিজ্ঞতাবাদের সমর্থক ছিলেন। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে সকল জ্ঞানকেই তিনি পর্যবেক্ষণ নির্ভর বলে মনে করেন। যদিও তিনি হিউম প্রমুখ অভিজ্ঞতাবাদীদের সাথে সম্পূর্ণ একমত হতে পারেননি তবুও তাঁর “Four Forms of Scepticism” শীর্ষক বক্তৃতায় একথা বলেন যে, আমরা সাদৃশ্যমূলক বা আরোহাত্মক কোনো যুক্তিতেই বস্তুর অস্তিত্বশীলতাকে বিশ্বাসযোগ্য বা যুক্তিগ্রাহ্য বলে জানতে পারি না।[৫২] তাঁর এই বক্তব্যের ক্ষেত্রে তিনি হিউমের বাহ্য জগৎ সম্পর্কিত মতকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।

ভাষা বিশ্লেষণের উপর গুরুত্ব দেওয়ায় বর্তমান শতকের দর্শনকে বিপ্লবাত্মক দর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু জে. জি. ওয়ারনকের মতে, রাসেল ও মূর কোনো নতুন বিপ্লবাত্মক পথ আবিষ্কার করেননি। তাঁরা পুরাতন পথেরই প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর মতে, তাঁদের দর্শনের সঙ্গে হিউম এবং মিলের দর্শনের যথেষ্ট সম্পর্ক আছে। তাছাড়া, ওয়ারনক একথা মনে করেন যে, অধিবিদ্যাগত বাকপটুতার অনুপস্থিতির জন্য কোনো কৃতিত্ব থাকলে তা আজকের বিশ্লেষণী দর্শনের নয়, বরং দেড়শত বছর আগের ব্রিটিশ দার্শনিক হিউমের।[৫৩]

বিশ শতকের দার্শনিক রাসেল এবং মূর বর্হিজগতের জ্ঞান প্রসঙ্গে ইন্দ্রিয় উপাত্তের কথা বলেছেন। বিশ্লেষণী দর্শনের প্রখ্যাত ভাষ্যকার বি. আর. এসের মতে, রাসেল ও মূর-এর ব্যবহৃত ‘ইন্দ্ৰিয় উপাত্ত’ কথাটি নতুন হলেও চিন্তার এই ধারাটি নতুন নয়, বরং বহু পুরাতন। সতেরো ও আঠারো শতকে লক, বার্কলে ও হিউমের দর্শনে এরূপ চিন্তা দেখতে পাওয়া যায় তাঁরা ইন্দ্রিয় উপাত্তকে অন্য নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, বার্কলে ও হিউম ইন্দ্রিয় উপাত্ত সম্পর্কিত যে সমস্যার সৃষ্টি করেছিলেন মূর তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করার মাধ্যমে এ সমস্যারই সমাধান দিতে সচেষ্ট হয়েছেন।[৫৪]

রাসেল হিউমের মতো কঠোর অভিজ্ঞতাবাদী ছিলেন বলে মনে হয় না। কারণ, তিনি একথা বলেছেন যে, অভিজ্ঞতাতিরিক্ত জ্ঞান কীভাবে অর্জন করা যায় তা ব্যাখ্যা করায় যথেষ্ট জটিলতা থাকলেও যে মতবাদ এই ধরনের জ্ঞানকে অস্বীকার করে সে মতবাদ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।[৫৫] কিন্তু রাসেল যখন বলেন, পৃথিবীতে যা অস্তিত্বশীল তার জ্ঞান, যদি প্ৰত্যক্ষণ বা স্মৃতির মাধ্যমে জ্ঞাত ঘটনাবলিকে সরাসরি প্রতিপাদন না করে তবে, সে সব আশ্রয়বাক্য থেকে অনুমিত হবে যার একটি আশ্রয়বাক্য অন্ততপক্ষে প্রত্যক্ষণ বা স্মৃতির মাধ্যমে জ্ঞাত,৫৬] তখন তাঁর উপর হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া, রাসেল কোনো বস্তুর অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাপূর্ব কোনো পদ্ধতি আছে বলে মনে করেন না। তিনি মনে করেন, যুক্তিবিদ্যা ও গণিতের ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য মতবাদের সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই।[৫৭] তাঁর এই চিন্তায় হিউমের ইন্দ্রিয়ছাপ ও ধারণা মতবাদ এবং সংশয়বাদের প্রভাব দেখা যায়।

হিউম অর্থের মানদণ্ড প্রণয়ন করতে গিয়ে বলেন যে, কোনো ধারণা সম্পর্কে সন্দেহ দেখা দিলে কোন ইন্দ্ৰিয়ছাপ থেকে এই ধারণার উৎপত্তি তা খুঁজে বের করতে হবে। ধারণার অনুরূপ ইন্দ্ৰিয়ছাপ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলে এই ধারণাকে অর্থহীন মনে করতে হবে। রাসেল তাঁর The Problems of Philosophy গ্রন্থে যে সূত্র প্রণয়ন করেন তার সাথে হিউমের সূত্রের সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। রাসেল বলেন, যে সব বচন আমাদের বোধগম্য হয় সেগুলোর প্রত্যেকটি এমন সব উপাদান দ্বারা গঠিত যে সব উপাদানের সঙ্গে আমরা পরিচিত।[৫৮] জন পাসমোরের মতে, রাসেল লক বার্কলে স্বীকৃত দ্রব্যের ধারণাকে বর্জন করে বিরামহীন বস্তুর কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর লক্ষ্য ছিল বৈজ্ঞানিক অনুমানকে সম্ভব করার জন্য গ্রহণযোগ্য সূত্রাবলি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেওয়া, যার সাথে হিউমের দর্শনের সাধারণ নিয়মাবলির যথেষ্ট মিল দেখা যায়।[৫৯] এছাড়া, পাসমোর এও বলেন যে, দর্শনের সারসত্তা মনস্তাত্ত্বিক—এই ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাবাদী ধারণাকে রাসেল প্রথম দিকে যদিও পরিত্যাগ করেছেন তবুও তাঁর শেষের দিকের রচনায় মনস্তত্ত্বকে পুনর্গঠিত করার একটি প্রবণতা দেখা যায়। এই প্রবণতার মধ্যে হিউমের কাছে প্রত্যাগমনের মনোভাব পরিলক্ষিত হয়।[৬০]

শুধু দর্শনের ক্ষেত্রেই নয়, বিশ শতকের বিজ্ঞানও হিউমের কাছ থেকে তার উপাদান সংগ্রহ করেছে বলে মনে হয়। প্রখ্যাত আপেক্ষিকতাবাদী আইনস্টাইন স্বীকার করেন, হিউমের রচনা দ্বারা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।[৬১] আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদী কার্যকারণতত্ত্বকে হিউমের আকস্মিকতাবাদী কার্যকারণ তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বলে মনে করা যায়। এছাড়া, বিশ শতকের বিজ্ঞানের দার্শনিক পটভূমি নির্মাণের ক্ষেত্রে হিউমের অভিজ্ঞতাবাদী দর্শন যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।[৬২]

হিউম-পরবর্তী দর্শনের ধারাগুলোর মধ্যে হিউমকে গ্রহণ, বর্জন ও তাঁর প্রভাব, সবকিছু মিলিয়ে একথা সুস্পষ্ট যে, চার্বাক অভিজ্ঞতাবাদের আধুনিক রূপকার ডেভিড হিউম পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিজ্ঞতাবাদকে নবরূপ দান করেন। তাঁর অবদানের কারণেই তাঁর দর্শনের, আরো ব্যাপক অর্থে বলা যায়, চার্বাকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞতাবাদী জ্ঞানবিদ্যাগত ধারার সুদূরপ্রসারী প্রভাব দর্শনের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত বিদ্যমান।

সুতরাং বলা যায়, খ্রিস্টপূর্ব সাত শতকের আগে প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক চার্বাকদের হাতে যে অভিজ্ঞতাবাদী চিন্তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় সে চিন্তার ধারাই যেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্য ও দেশ-কালের সীমা অতিক্রম করে বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন দেশের দার্শনিকদের চিন্তাধারাকে আশ্রয় করে ইতিহাসের গতির সাথে তাল মিলিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। এই প্রবাহের ক্ষেত্রে সমসাময়িক দেশ-কাল, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি এবং আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব এই ধারাটিকে প্রভাবিত করে। তাই এর গতি সব সময় ঊর্ধ্বগামী সরলরেখার মতো ছিল না, বরং ছিল উঁচুনিচু। এমনকি কখনো কখনো (যেমন মধ্যযুগে) এই প্রবাহে ছেদ পড়তেও দেখা যায়। সমসাময়িক আর্থ-সামজিক অবস্থাই এর কারণ।

আঠারো শতক মূলত পাশ্চাত্যে বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির যুগ। এই সময়ের ব্রিটিশ দার্শনিক হিউম চার্বাক প্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞতাবাদী জ্ঞানবিদ্যাগত ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। চার্বাকদের মতবাদের সময়োপযোগী উন্নতি সাধন করে তিনি যেন ইতিহাস নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিজ্ঞানের প্রভাবে অভিজ্ঞতাবাদের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তথা পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার করেন। এছাড়া, তিনি অভিজ্ঞতাবাদ থেকে যাবতীয় অসঙ্গতি নিরসনেও প্রয়াসী হন। এর ফলে তাঁর হাতে আধুনিক অভিজ্ঞতাবাদ চরম পরিণতি লাভ করে। হিউমই একথা প্রমাণ করেন যে, চার্বাকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং প্রাচীন-মধ্য-আধুনিক যুগের দার্শনিকদের চিন্তাস্রোতের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত অভিজ্ঞতাবাদের চরম পরিণতি হলো সংশয়বাদ। তাঁর এই অবদানের জন্যই পরবর্তীকালে দার্শনিকদের কাছে তাঁর দ্বারা উদ্ভূত জ্ঞানবিদ্যাগত প্রশ্ন একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়। হিউম-পরবর্তী দার্শনিকগণ তাঁদের জ্ঞানবিদ্যাগত আলোচনায় হিউম নির্দেশিত সংশয়বাদের একটি সঙ্গতিপূর্ণ সমাধান খুঁজে পেতে চেষ্টা করেন। উনিশ ও বিশ শতকের অভিজ্ঞতাবাদ, বিচারবাদ, যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ, প্রয়োগবাদ, রূপতত্ত্ব বা অবভাসবাদ, বিশ্লেষণী দর্শন, এমনকি বিশ শতকের আপেক্ষিকতাবাদী বৈজ্ঞানিক মতবাদও হিউমের দ্বারা উত্থাপিত জ্ঞানবিদ্যাগত প্রশ্নকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে সক্ষম হয়নি।

এ থেকে বলা যায়, জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত সমস্যার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা হলো দর্শন। দর্শনের ধারাবাহিক ইতিহাস আছে। এক বিশেষ আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানুষের চিন্তা চেতনার বিকাশের বিশেষ পর্যায়ে দর্শনের ইতিহাসের সূচনা হয়। অতপর দেশ, কাল, জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, ইত্যাদির গণ্ডি অতিক্রম করে জগৎ জীবন সম্পর্কিত সমস্যার দার্শনিক ব্যাখ্যা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে চলে। দার্শনিক চিন্তার এই ধারাবাহিকতার কারণেই প্রাচ্যের চার্বাক দার্শনিকদের উত্থাপিত জ্ঞানবিদ্যাগত সমস্যার আলোচনায় মনোযোগী হয়েছেন আড়াই হাজার বছর পরবর্তী পাশ্চাত্য দার্শনিক ডেভিড হিউম। একই দার্শনিক সমস্যার চার্বাক ও হিউম প্রদত্ত দুটি ব্যাখ্যায় যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে তার মূল নিহিত রয়েছে তাঁদের আর্থ- সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির মধ্যে।

দার্শনিক সমস্যা ও এর সমাধান প্রচেষ্টাকে কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা দৃঢ়ভাবে সীমাবদ্ধ করা সঙ্গত বলে মনে হয় না। ভারতীয় দার্শনিক, পাশ্চাত্য দার্শনিক, ইত্যাদি নামে ভৌগোলিকভাবে দার্শনিক গোষ্ঠীকে চিহ্নিত ও সীমাবদ্ধ করা গেলেও তাঁদের আলোচিত সমস্যা ও এর সমাধান প্রচেষ্টাকে তথা দার্শনিক মতবাদকে দেশকালের সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যাবে না। বরং এর উপর দেশ-কাল ও ভৌগোলকি গণ্ডিভেদে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক চিন্তার ইতিহাস ও তাঁদের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব খুঁজে পাওয়া যাবে। কোনো স্থানিক ও কালিক গণ্ডির মধ্যে এই প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকে না। এখানেই দর্শনের ইতিহাসের বিশেষত্ব। কোনো দার্শনিক মতবাদকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করতে হলে ভৌগোলিক গণ্ডি তথা স্থান-কালের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে ওঠে সে মতবাদকে ও তার প্রেক্ষাপটকে বিচার করাই হবে যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি।

তথ্যপঞ্জি

১. কান্ট বলেন : I radily confess, the reminder of David Hume was what many years ago first broke my dogmatic slumber and gave my researches in the field of speculative philosophy quite a different direction. : Immanual Kant: Kant’s Prolegomena. Introduction, in the Prolegomena and Metaphysical Foundations of Natural Science. Tr. by Ernest Belfort Bax. London, George Bell and Sons. 1883. পৃ. 8।

২. Immanual Kant: Critique of Pure Reason, Tr. by J.M.D. Mieklejohn, London, Everyman’s library, 1943. পৃ. ২৫। কান্ট বলেছেন, but though all our knowledge begins with experience, it by no means follows, that all arises out of experience.

৩. B. Russell : History of Western Philosophy, London, George Allen & Unwin Ltd., 1965, পৃ. ৬৭৯।

৪. অভিজ্ঞতাপূর্ব ও অভিজ্ঞতাজাত এবং সংশ্লেষণী ও বিশ্লেষণী অবধারণের জন্য কান্টের Critique., পূর্বোক্ত, যথাক্রমে পৃ. ২৫-২৬] এবং ৩০-৩২ দ্রষ্টব্য।

৫. আমিনুল ইসলাম : আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ২য় প্রকাশ, ১৯৮৪, পৃ. ৩১৭–১৮।

৬. B. Russell : History., পূর্বোক্ত, পৃ. ৬৪৬।

৭. Elie Halevy : The Growth of Philosophic Radicalism, Boston, The Bacon Press. 1960. পৃ. ১১।

৮. পূর্বোক্ত, পৃ. ৫।

৯. বেনথামের উপর হিউমের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণের জন্য পূর্বোক্ত গ্রন্থের, বিশেষত, পৃ. ৪৬, ৪৭, ৭৪, ৮৮] ও ১৬২ দ্রষ্টব্য।

10. Samual Enoch Stumpf: Socrates to Sartre, New York, McGrow-Hill Book Co. 1975, পৃ. ৩৫২।

১১. বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন, আমিনুল ইসলাম : সমকালীন পাশ্চাত্য দর্শন, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৮২, পৃ. ১২৫-১৩৩।

১২. Paul Edwards (ed): Encyclopedia of Philosophy. Vol. 2, New York. Macmillan Publishing Co., 1972. পৃ. 50৩।

১৩. পূর্বোক্ত।

১৪. Samual Enoch Stumpf Socrates to Sartre, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৪৯। তুলনীয়, D. M. Datta : The Chief Current of Contemporary Philosophy, 3rd ed., Calcutta, Calcutta University, 1970, পৃ. ৩৬৪।

১৫. Samual Enoch Stumpf Socrates to Sartre, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৩৬-৩৭।

১৬. Barry R. Gross: Analytic Philosophy, New Delhi. Oxford and IBH Publishing Co., 1981. পৃ. ১০৮।

১৭. Antony Flew : Hume’s Philosophy of Belief, London, Routledge and Kegan Paul Ltd., 1961, পৃ. ১৫, দৃষ্টান্তের জন্য A. J. Ayer, Language, Truth and Logic, 2nd ed. London, Victor Gollancz Ltd., 1946, পৃ. ৫৪-৫৫ দ্রষ্টব্য।

১৮. J.O. Urmson : Philosophical Analysis, London, Oxford University Press, 1976, পৃ. ১০৮।

১৯. Barry R. Gross: Analytic Philosophy, পূর্বোক্ত, পৃ. ১০৯।

২০. John Passmore: A Hundred Years of Philosophy, New york, Penguin Books Ltd, 1978, পৃ. ৩৯৩।

২১. David Hume : Enquiry., পূর্বোক্ত, দ্বাদশ অধ্যায়, পূর্বোক্ত, দ্বাদশ অধ্যায়, অংশ তিন দ্রষ্টব্য।

২২. A. J. Ayer : Language, Truth and Logic, 2nd ed. পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৪]

২৩. L. Wittgenstein : Tractatus Logico – Philosophicus. Tr. By C. K. Ogden. London, Routledge and Kegan paul, 1922, 4.21 ও 4.46।

২৪. Samuel Enoch Stumpf: Socrates to Sartre, পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৩৩।

২৫. L. Wittgenstein : Tractatus, পূর্বোক্ত ৬.৩।

২৬. J. O. Urmson : Philosophical Analysis, পৃ. ১০৮।

২৭. পূর্বোক্ত, পৃ. ৮৯।

২৮. George Pitcher : The Philosophy of Wittgenstein, New Delhi, Prentice-Hal of Indian Private Limited, 1972. পৃ. ৪২-৪৩।

২৯. L. Wittgenstein : Tractatus, পূর্বোক্ত, পৃ. ২২৭।

৩০. George Pitcher : The Philosophy of Wittgenstein, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪৭।

৩১. G. Ryle : “Ordinary Language”, Philosophical Review, 1953, পৃ. ১৭১, উদ্ধৃত, R. B. Gross : Analytic Philosophy, পূর্বোক্ত, পৃ. ২২৭।

৩২. George Pitcher. The Philosophy of Wittgenstein., পূর্বোক্ত, পৃ. ৩২

৩৩. Samuel Enoch Stumpf Socrates to Sartre, পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৩৬।

৩৪. আমিনুল ইসলাম : সমকালীন পাশ্চাত্য দর্শন, পূর্বোক্ত, পৃ. ২২।

৩৫. বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন, R. B. Perry: The Thought and Character of William James, Vol. I, London, Oxford University Press, 1935, পৃ. ৫৪৩-৫৭০।

৩৬. পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৫০।

৩৭. T. H. Green & T. H. Gross, A Treatise of Human Nature, etc, 1874 এর ভূমিকায় গ্রিন হিউমের সমালোচনা করেন।

৩৮. R. B. Perry : The Thought and Character, পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৬৯-৭০।

৩৯. পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৬৮।

৪০. পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৫২।

৪১. Paul Edwards (ed) : Encyclopedia of Philosophy, Vol. 5 পূর্বোক্ত, পৃ. ৭৫।

৪২. D. M. Datta : The Chief Current of Contemporary Philosophy, পূর্বোক্ত পৃ. ৩৯৭।

৪৩. পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৮১।

৪৪. John Passmore: A Hundred Years of Philosophy, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭৮।

৪৫. Marie – Luise Schubert Kalsi : Mainong’s Theory of Knowledge, Dordrecht. Martinus Nijhoff Publishers. 1987. পৃ. ৩, তুলনীয় পৃ. ১৬

৪৬. Samual Enoch Stumpf: Socrates to Sartre পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৬৮।

৪৭. Edmund Husserl: Formal and Transcendental Logic, by Dorion Cairns. The Hague, Martinus Nijhoff of 1969. পৃ. ১০০।

৪৮. John Passmore : A Hundred Years of Philosophy, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৮৮।

৪৯. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৮৯।

৫০. Barry R. Gross: Analytic Philosophy, পূর্বোক্ত, পৃ. ১০।

৫১. J. O. Urmson : Philosophical Analysis, পূর্বোক্ত, পৃ. ৪১।

৫২. Paul Edward (ed.): Encyclopedia of Philosophy. Vol. 5. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৮৮।

৫৩. G. J. Warnock : English Philosophy Since 1900, Oxford University press. 1969, পৃ. ১১-১২।

৫৪. Barry R. Gross : Analytic Philosophy, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫-২৬।

৫৫. বার্ট্রান্ড রাসেল : আমার দার্শনিক চিন্তার ক্রমবিকাশ, রশীদুল আলম অনূদিত, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৯০, পৃ. ১৯২।

৫৬. পূর্বোক্ত, পৃ. ১১৩।

৫৭. পূর্বোক্ত।

৫৮. B. Russell : The Problems of Philosophy, 16th imp, London, Oxford University Press, 1936. পৃ. ৯১।

৫৯. John Passmore : A Hundred Years of Philosophy, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৩৯।

৬০. পূর্বোক্ত, পৃ. ২১৪।

৬১. John Passmore: A Hundred Years of Philosophy, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৩১।

৬২. বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন, এ.এম.হারুন-অর রশীদ : বিজ্ঞান ও দর্শন, ঢাকা, বাংলা একাডেমী,

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

৬. উপসংহার

৬. উপসংহার

পরিচ্ছেদ – ছয় : উপসংহার

গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের অটল অস্তিত্ব

সুপ্রাচীন কাল থেকে বর্তমান শতক পর্যন্ত গুপ্তবিদ্যাচর্চার প্রতিষ্ঠান সমূহ যে অতিশয় দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখে গুপ্তক্রিয়াকর্মের প্রচার ও প্রসার সমানে চালিয়ে আসছে ভারতীয় জনজীবনের নানান পরিস্থিতির মধ্যে থেকে, তা যথাসাধ্য দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে গ্রন্থের আগের পরিচ্ছেদগুলিতে। মেদিনীপুর জেলার যে প্রত্যন্ত অঞ্চলটিকে পরীক্ষা নিরীক্ষার উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল সেই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে জনসংখ্যার কাঠামোও (population structure) বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়; গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠতা ও আদান প্রদানের বিভিন্ন দিক নিয়েও যথেষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এই সব বিষয়ের গভীরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে গিয়েই জানা যায় যে, সমাজের বহুবিধ কঠোর সমস্যার সমাধান ও বিশেষ ধরণের কতকগুলি সামাজিক চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যেই এতদঞ্চলের এক গোষ্ঠীর মানুষ গুপ্তবিদ্যায় পারদর্শী গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। তারা যথেষ্ট সতর্কতা ও গোপনীয়তার সঙ্গে রহস্যজনক নানান ঘটনা ও নানান রোগব্যাধি সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করতে থাকে। তার ফলে গুপ্ত প্রতিষ্ঠানগত নির্দিষ্ট কিছু আচার আচরণ রীতিনীতি পালনের প্রয়োজনীতা দেখা দেয়। এইসব রীতিনীতি ব্যতীত মানুষের দুর্ভাগ্যের প্রতিকার যে কিছুতেই সম্ভব নয়, সে বিশ্বাস গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সদস্যের মনের গভীরে স্থায়ী বাসা বাঁধে। তাই গুপ্তপ্রতিষ্ঠান মাত্রেই সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে এসেছিল অনেক আশা, অনেক আকাঙ্খা। তাছাড়া মানুষ যখনই কোন জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়ে তার সমাধান করতে পারে নি তখনই সে সুসমন্বয়ের নিদারুণ অভাব বোধ করেছে; মানসিক দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে নিজেকে একেবারেই অসহায় বলে ধরে নিয়েছে। এমত অবস্থায় গুপ্ত কর্মকাণ্ডের নানান আচার আচরণ বিধি বিধান ইত্যাদি অনুসরণ করা তার কাছে প্রয়োজন বলে বোধ হওয়া খুবই স্বাভাবিক; সেই সঙ্গে মনের দিক থেকেও সে যথেষ্ট পরিতৃপ্তি লাভ করে গুপ্তক্রিয়ার অনুশীলন করে। সুতরাং গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব যে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘটিয়েছে সে কথা কেউ অস্বীকার করতে পারে না; এই প্রতিষ্ঠান যে মানব সংস্কৃতির সামগ্রিক রূপরেখারই এক ক্ষুদ্র অংশ তাও আমাদের স্বীকার না করে উপায় নেই।

প্রাচীন মানুষের স্কুল সাংস্কৃতিক জীবনে নানা ধরণের ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকর্ম যে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বসেছিল তাতে কোনরকম সন্দেহের অবকাশ নেই। আধুনিক সভ্যতার বিভিন্ন দিকের শ্রী ও শ্রীবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে হয়ে থাকলেও যাদুভিত্তিক ক্রিয়াকর্মের প্রতি সাধারণ মানুষের যে বিশ্বাস, যে নির্ভরতা, তা মোটেই হ্রাস পায়নি। যাদুকরেরা যে গ্রামীণ সমাজের নানান ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করে থাকে তার প্রমাণ আজ যথেষ্টই মেলে। সমাজের ও ব্যক্তি বিশেষের এক এক রকম জটিল সমস্যার সমাধানে যাদুকরদেরই এগিয়ে আসতে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে। তারা যাদুমন্ত্র প্রয়োগ করে, ঝাড়ফুঁক ও গণনার সাহায্যে গ্রাম্য মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনের কত জ্বালা যন্ত্রণার যে উপশম করে তা বলে শেষ করার নয়। ভবিষ্যৎ বক্তার ভূমিকাতে বলতে গেলে, যাদুকরেরাই একচ্ছত্র অধিপতি। যাদুকরেরা তাদের এই প্রাধান্য বজায় রাখার জন্যে সাধারণ গ্রাম্য মানুষের আস্থা অর্জন করার জন্যে তাদের বহুরকমের ভেল্কি দেখাতে হয়, কূট কৌশলের আশ্রয় নিতে হয় পেশাদার গ্রাম্য যাদুকরদের। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কত রকুমের ধর্মীয় অনুষ্ঠান যে গ্রামে গ্রামে যাদুকরদের পৌরোহিত্যে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে তার কোন হিসেব বোধহয় যাদুকরদের কাছেও পাওয়া যাবে না। আবার ঐ সমস্ত অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মে এমন কিছু উপাদান সংগৃহীত হয়ে থাকে যা নাকি সাধারণ গ্রামবাসীদের সহজ সরল দৃষ্টিতে ঘোর বিস্ময়ের সৃষ্টি না করেই পারে না; লম্বা চওড়া মন্ত্রপাঠের বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি ও ভাবভঙ্গি দেখিয়েও অজ্ঞ মানুষের মনে চমক লাগায় কুশলী যাদুকরেরা। বিভিন্ন রোগের রোগীদের তাদের যাদু চিকিৎসার পদ্ধতি প্রয়োগের সময় তারা অলৌকিক ভাব ফুটিয়ে তোলার জন্যে নানারকমের অভিনয় করে। রোগীদের ঘরে উপস্থিত লোকজনের মনে রহস্যের উদ্রেক করাই হল তাদের প্রধান লক্ষ্য। এই কারণেই সমাজে তারা বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী হয়। অন্য সব মানুষের তুলনায় সুযোগ সুবিধা অনেক বেশী ভোগ করে। অবশ্য এই সমস্ত কলা কৌশল আয়ত্ত করার জন্যে তাদের অনেক রকম ভাবে কৃচ্ছতা সাধন করতেও হয়। কারণ তা না হলে অতি প্রাকৃত শক্তির আক্রমণে আক্রান্ত মানুষের দুঃখ দুর্দশা রোগ ব্যাধি নিরাময় করার ক্ষমতা অর্জন করা যায় না বলেই গুপ্তবিদ্যার বিধান।

কালের নিয়মে আবার দেখা যায় যে, ব্রাহ্মণ পুরোহিত সম্প্রদায়ের মধ্যেও গুপ্তবিদ্যার কিছু কিছু বিষয়ের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। সার্বজনীন ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠান ইত্যাদির পৌরোহিত্যের দায়দায়িত্ব যাদুকরদের হাত থেকে ব্রাহ্মণদের হাতে এসেছে। আজও অনেক ব্রাহ্মণ পুরোহিতকে ভবিষ্যৎ কথন বা ডিভিনিশনের চর্চায় নানান ধরণের গুপ্তাচারে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়। ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের ওপর একদিকে যেমন দেবদেবীর সন্তুষ্টি বিধানের গুরু দায়িত্ব ন্যস্ত হয় অন্য আর একদিকে তেমনি নানারকমের মাদুলি, কবচ ইত্যাদির শুদ্ধিকরণ ও ধারণ করানোর দায়িত্বও গ্রহণ করে থাকে পুরোহিতরাই। সেই সঙ্গে ভূত প্রেত বা যে কোন অশুভ শক্তির কোপদৃষ্টি থেকে যজমানদের জীবন নিরাপদ করার জন্যে ঝাড়ফুঁক যাগযজ্ঞ ইত্যাদি ক্রিয়াকর্মের সম্পাদনাও করতে হয় পুরুত ঠাকুরকেই।

সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকেই মনে করে যে, অশুভ আত্মার কোপদৃষ্টির ফলেই শরীরে নানা রকমের ব্যাধির সৃষ্টি হয়। এই সমস্ত দুর্বল চিত্ত লোকেরাই বিশ্বাস করে যে, সারা পৃথিবীতে অহরহ ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন প্রকৃতির অসংখ্য বিদেহী আত্মা বা স্পিরিট। এদের মধ্যে আছে কিছু সংখ্যক ইষ্টকারী (bcnevolent) আত্মা বা শক্তি, এবং বাদবাকি সমস্তই হল অনিষ্টকারী (malevolent) বা দুরাত্মা। এই সব দুরাত্মাদের শান্ত রাখার উদ্দেশ্যে নানারকমের যাগযজ্ঞ, বলি, নৈবেদ্য, মন্ত্রতন্ত্র, স্তবস্তুতি ইত্যাদির প্রচলন করতে হয়েছে অনিবার্যভাবেই। বহুকাল ধরেই ব্রাহ্মণ পুরোহিতেরা এই সমস্ত ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করে আসছে অনিষ্টকর আত্মাদের খুশী রাখতে– যাতে তারা অনিষ্ট না করে। মাত্র কিছুদিন আগে পশ্চিম বঙ্গে বিভিন্ন রোগের ধারণা ও চিকিৎসা সম্পর্কে লেখা একখানি প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে, পশ্চিম বাংলার অধিকাংশ মানুষের ধারণা অনুযায়ী মেয়াদী বা দীর্ঘস্থায়ী, রোগভোগ, পাগলামি স্নায়বিক দৌর্বল্য অবসাদ বা বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি সৃষ্টির মূলে হল অপদেবতার আক্রোশ। তাই এই সমস্ত রোগ কোন ডাক্তারি চিকিৎসায় সারানো যায় না। মন্দিরের পূজারী ব্রাহ্মণ পুরোহিতরাই কেবল এই সব রোগ নিরাময়ের বিধান দিতে পারে। সেইজন্যে কলকাতা মহানগরীর চারদিক ঘিরে কালীঘাট তারকেশ্বর, ঘুটিয়ারী শরিফ, হাতিয়ারা পীর শরিফ প্রভৃতি হিন্দু ও মুসলমানের পীঠস্থানে হাজার হাজার মানুষ যায় হিন্দু পুরোহিত ও মুসলমান মৌলবীদের কাছ থেকে বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের তাবিজ কবচ ইত্যাদি নিয়ে আসতে।

পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যা সীমান্তে চন্দনেশ্বর শিবের এক প্রাচীন মন্দির আছে। মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ খুবই জাগ্রত বলে জানা যায়। তাই উভয় প্রদেশের বহু মানুষ আসে শিবের পুজো করতে, রোগ মুক্তির মানত করতে। সেই মন্দিরে পূজারী ঠাকুরের আশীর্বাদ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় বিধান সাক্ষাৎ চন্দনেশ্বরের আশীবাদ ও বিধান বলেই গ্রহণ করে। ভক্তের হয়ে পুরুত ঠাকুর শিবের কাছে মানত করে প্রথমে পুজো দেন। তারপর ফলমূল বেলপাতা ইত্যাদি সাজিয়ে প্রসাদ বিতরণ করে এক এক রকমের মাদুলি ও কবচ প্রস্তুত করার এক এক রকম মূল্য গ্রহণ করেন। সময় সময় ভক্ত যজমানের অর্থদানের ক্ষমতা অনুসারেও মাদুলির মূল্য নির্ধারিত হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি গ্রামাঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশী মানুষ মনে করে যে, অধিকাংশ শিশুই ডাইনীর নজর লেগে রোগাক্রান্ত হয়। একেই আবার কোন কোন গ্রামে আঞ্চলিক ভাষায় ‘বাতাস লাগা’ বলা হয়। অর্থাৎ ডাইনীদের চোখের বিষাক্ত দৃষ্টি হাওয়ায় উড়ে বেড়ায় বিষাক্ত পোকা মাকড়ের মত; আর ঐ হাওয়া লেগেই বাচ্চাদের মধ্যে যত রোগবাগের সৃষ্টি। আবার যখনই কেউ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছে তখনই তার চিকিৎসা করার ভার পড়ে যে কোন একজন নামকরা গ্রাম্য ডাকিনী চিকিৎসকের ওপর। কারণ ডাইনীর বাণ মারার জন্যে যে ব্যক্তি পক্ষাঘাত গ্রস্ত হয়েছে সে ব্যক্তিকে ডাকিনী চিকিৎসকই একমাত্র ভাল করতে পারে। আজও তাই বহু গ্রামে ডাকিনী চিকিৎসকদের যথেষ্ট বোলবলা লক্ষ্য করা গেছে। তবে ক্ষেত্র বিশেষে এই সমস্ত ধ্যানধারণা বা বিশ্বাসের পরিবর্তন যে একেবারে হচ্ছে না তাও নয়।

আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা ও শারীর বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সুস্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষের সচেতনতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞান সম্মত চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্যে রোগ ব্যাধি জ্বালা যন্ত্রণার উপশম ও নিরাময় যেমন সহজ হয়েছে তেমনি রোগব্যাধির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও জন্মেছে ভালোমত। কিন্তু তাই বলে যে অতিপ্রাকৃত শক্তি বিষয়ক বিচিত্র ধ্যান ধারণা লোকের মন থেকে মুছে গেছে তা মোটেও নয়। বেশ কিছু সংখ্যক মানুষের মনে গুপ্তচিকিৎসা সংক্রান্ত কলাকৌশল, কার্যকারণ ইত্যাদি সম্পৰ্কীয় বিশ্বাসে কোন চিড় ধরেনি। সেজন্যে নানান রোগে গুপ্তচিকিৎসা পদ্ধতির বিবিধ প্রয়োগ গ্রামে গঞ্জে আজও অব্যাহত। এই দেশে যখন শিল্পের প্রসার ও শহরের সভ্যতার বিকাশ ঘটেনি তখন প্রায় সমস্ত মানুষই যাদুচিকিৎসার ওপর ষোল আনা নির্ভর করে থাকত। গ্রাম ঘরের বহু মানুষ আজও এই প্রাচীন চিকিৎসায় পুরোপুরি আস্থা রাখে। রোগ ব্যাধি নিরাময়ের ব্যাপারে এই সব মানুষ একজন প্রকৃত চিকিৎসকের চেয়ে একজন গুপ্তবিদ্যাচর্চাকারী যাদুকর বা চিকিৎসককেই বেশী বিশ্বাস করে। অবশ্য এইরকম বিশ্বাসের মূলে দুটো কারণও আছে। সে কারণ দুটো হল, একদিকে চরম দারিদ্র্য অন্য আর একদিকে গুপ্তবিদ্যাচর্চাকারী তথা গুণিন বা ওঝা রোজাদের বিভিন্ন রকমের পরামর্শ বা সুপারিশ। ভারতের লক্ষ লক্ষ গ্রাম্য মানুষ কঠোর দারিদ্র্যের মধ্যে কালাতিপাত করে। এই সমস্ত দীনদরিদ্র মানুষের পক্ষে কোন শিক্ষিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই তাদের বাধ্য হয়েই যাদু চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হয়; ঐ চিকিৎসক তাদের রোগ নিরাময়ের মাদুলি কবচ ইত্যাদি যা কিছু ধারণ করার পরামর্শ দেয় দুচার পয়সার বিনিময়ে তারা তাই শিরোধার্য করে পরম বিশ্বাসের সঙ্গে।

গ্রামের যারা গরীব, অজ্ঞ, অশিক্ষিত মানুষ তারা তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে তেমন কোন চিন্তাভাবনা করে না। এরা ডাক্তার কবিরাজের কাছে যাওয়ার চাইতে রোজা, ওঝা বা অকালটিস্টদের পরামর্শ নেওয়াই অধিকতর শ্রেয় মনে করে। তাদের এই মনোভাবের মূলে আছে বাস্তু সংস্থানের সমস্যাও প্রাকৃতিক পরিবেশের নানান ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব। আর এই প্রভাবের ফলেই প্রাচীন গুপ্ত চিকিৎসার পরম্পরতা সমানেই পুষ্টি লাভ করে চলেছে কিছু কিছু পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে, ভারতীয় গ্রামীন সমাজের বিভিন্ন স্তরে।

দেবদেবী সম্পর্কে মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন যে বিভিন্ন দিক থেকে ঘটে থাকে তা নিয়ে গ্রন্থকার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর একখানি ইংরিজী গ্রন্থে। সুতরাং এই যে বিশ্বাস তা কিন্তু আজকের নয়। এ বিশ্বাস নতুন করে আজ আমাদের মনে বাসা বাঁধেনিঃ এ বিশ্বাসের ধারা চলে আসছে। কোন সেই অজ্ঞাত অতীতের অন্ধকার যুগ থেকে।

অতিপ্রাকৃত সম্পর্কে যে বিশ্বাস তাও চলে আসছে নানারকম ভাবে সুপ্রাচীন কাল থেকেই। আর তা না এসেও উপায় নেই। কারণ প্রাকৃতিক ও অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কাছে মানুষ আজও যে একেবারে অসহায়, দুর্বল।

.

ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধ

জাতি প্রথার বন্ধনে বাঁধা যে সমাজ তা গড়ে উঠেছে উচ্চ ও নিম্ন এই দুই বর্ণের মানুষকে নিয়ে। উচ্চবর্ণের মানুষ পেয়েছে ধর্মীয় ক্রিয়াকর্ম সম্পাদনের পূর্ণ অধিকার এবং তাদেরই নির্দেশিত পথে চলতে হবে নিম্নবর্ণের মানুষকে। জাতিপ্রথার বন্ধনে বন্ধনযুক্ত ভারতীয় সমাজের বুকে ছ্যুৎ-অচ্ছ্যুতের যে ঘৃণ্য ধারণা তা কঠিন জগদ্দল পাথরের মতই চেপে বসে আছে। এই ধারণাই উচ্চ ও নিম্নবর্ণের মানুষের মধ্যে এক বিরাট ব্যবধানের সৃষ্টি করেছে। উভয়বর্ণের মানুষের মধ্যে ভাব ভালোবাসার পারস্পরিক আদানপ্রদানের সম্পকের পরিবর্তে বৈরীভাবের বীজ বপন করেছে; জাগিয়ে তুলেছে ঘৃণা ও বিদ্বেষ। ফলে, উচ্চ ও নিম্নবর্ণের মানুষ কোনদিনই একে অপরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিলে যেতে পারে নি। তবে কালের বিবর্তনে দেখা যায় যে, নিম্নবর্ণের মানুষ তাদের কর্মজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চ বর্ণের মানুষের মত সমান সফলতা অর্জন করেছে। দক্ষতা ও পারদর্শীতার প্রমাণ দিয়েছে সমানভাবে, এমন কি যাদুভিত্তিক ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্যের প্রমাণ ও যথেষ্টই রেখেছে। [Man’s changing relationship with Gods, Goddesses in Socio-Cultural Profile of Frontier Bengil 1976, Bhowmick P K] ভেল্কী পুরুত হিসেবে বহু নিম্নবর্ণের মানুষ উচ্চ সম্প্রদায়ের সুশিক্ষিত সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসকদের মতই বিভিন্ন রকমের জটিল রোগ নিরাময়ে কৃতিত্ব দেখিয়েছে। এই ভাবেই নিম্নবর্ণের মানুষ জাতিপ্রথাগত বাধা নিষেধের প্রাচীর লঙ্ঘণ করে গণতান্ত্রিকভাবে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবোধের যে পরিচয় রেখে চলেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

কালে কালে আরো লক্ষ্য করা যায় যে, প্রচলিত জাতি প্রথা (Varna system) সংক্রান্ত বিধিবিধান ও বাধা নিষেধের কঠোরতাকে শিথিল করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বহু সাধু সন্ন্যাসী ও সমদশীর (অর্থাৎ যাদের দৃষ্টিতে মানুষ মাত্রেই সমান) এগিয়ে আসে, এরা ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্রের জায়গায় তীর্থ, আশ্রম, বন, অরণ্য, গিরি, পর্বত, সাগর, সরস্বতী, ভারতী ও পুরী নামে সন্ন্যাস ধর্মের দশটি অনুশাসনের (ten orders of sannyasa) প্রবর্তন করে। এই সব সাধুসন্তরা তথা সন্ন্যাস মার্গের এচারকদের প্রত্যক্ষ প্রভাবে উচ্চ ও নিম্নবর্ণের মানুষের মধ্যে যে ভেদাভেদের কঠোরতা ছিল তা অনেকাংশে শিথিল হয়ে যায়। পরে গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের যারা প্রধান প্রচারক, অর্থাৎ যারা গুণিন ও ওঝা বলে পরিচিত ছিল, তারা নানারকমের ক্রিয়াকর্ম সম্পাদনের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করে অব্রাহ্মণদের যথাযযাগ্য মর্যাদা দানের কথা বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রচার করতে থাকে।

এখন তন্ত্রশাস্ত্র সম্পর্কেও এখানে দুচার কথা বলতে হচ্ছে। তন্ত্রের প্রসঙ্গ আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয়ের অর্ন্তভুক্ত না হলেও এটুকু বলতে বাধা নেই যে, ভারতীয় তান্ত্রিকরা এমন বহু ক্রিয়াকর্ম আচার অনুষ্ঠানের সম্পাদনা করে থাকেন যেগুলি উচ্চবর্ণের মানুষের দৃষ্টিতে রীতিমত অসামাজিক ও রুচি বিরুদ্ধ বলেই গণ্য হয়। তান্ত্রিকদের ঐ সমস্ত ক্রিয়াকর্ম আচার ইত্যাদি অতিশয় গোপনীয়তার সঙ্গে পালিত ও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে তন্ত্রের বিধান অনুযায়ী। প্রকৃতির দিক থেকে ঐ সমস্ত তন্ত্রাচারের সঙ্গে অকালটিস্টদের গুপ্ত ক্রিয়াকর্মের, খুব যে একটা পার্থক্য নেই সে কথা সচ্ছন্দে বলা যায়। কালের গতিকে আবার গোড়া পুরোহিত সম্প্রদায়ের বিভিন্ন রকমের আচার বিচার অনুষ্ঠান ইত্যাদি গুপ্ত বিদ্যাচর্চাকারীদের আচার অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সমানভাবে চলতে থাকে, এ ব্যাপার লক্ষ্য করা সত্বেও সমাজের তরফ থেকে এর বিরুদ্ধে কোনরকম প্রতিবাদ উঠতে দেখা যায় নি। তার ফলে গুপ্তবিদ্যা সংক্রান্ত বহু রকমের ক্রিয়াকর্ম খুব সহজেও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সমস্ত মানুষই প্রচলিত গুপ্তবিদ্যার প্রভাবে যারপর নাই প্রভাবিত হতে থাকে। বিভিন্ন জাতের মানুষেব জাতপাতের ভেদাভেদ ও নানারকমের বাধানিষেধের যে ধারাবাহিকতা চলে আসছিল তা ক্রমেই মুছে যেতে থাকে। প্রায় সকল সম্প্রদায়ের মানুষই রহস্যবিদ্যা বা অকালটিজমে তালিম নিতে শুরু করে এক একটি গুপ্ত প্রতিষ্ঠানে, বর্ণবৈষম্যের কথা একেবারে ভুলে গিয়ে। সবার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য এক ও অভিন্ন, আর তা হল গুপ্তবিদ্যার কলাকৌশল অর্জন করা, গুপ্ত ক্রিয়ার পারদর্শিতা লাভ করা। লক্ষণীয় যে, নিম্নবর্ণের কোন ব্যক্তি যদি গুপ্তবিদ্যা প্রয়োগে বিশেষ কৃতিত্বের প্রমাণ দিতে পারে তাহলে উচ্চ মানুষ তাকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করতে একটুও দ্বিধা করবে না, ইতঃস্তত করবে না।

.

সংস্কৃতি সঙ্গম

ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় জাতি প্রথাই যে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ বৃদ্ধি করে আসছে। বংশানুক্রমিক ভাবে তা আমাদের অজ্ঞাত নয়। এই ভেদাভেদের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার দুরুণই মানুষের মনে শ্রেষ্ঠত্ববোধ ও হীনতাবোধের সৃষ্টি হয় তার অজ্ঞাতসারেই। এই রকমের মানসিকবোধের মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন ব্যক্তির কর্মজীবনের নানান দিকের প্রতিফলন ঘটে অন্য আর এক দিকে তেমনি ব্যক্তির সামাজিক জীবনের চিন্তা, ভাবনা, রুচি, ধর্ম, বিশ্বাস, অবিশ্বাস ইত্যাদিরও বহিপ্রকাশ ঘটে থাকে। তারই ফলে বিভিন্ন রূপের দেবদেবীও বিভিন্ন প্রকারের অলৌকিক শক্তি সম্পর্কীয় ধ্যান ধারণা ও বিশ্বাসের প্রচলন হয়ে এসেছে আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে। আর আমাদের দেশের অধিকাংশ গ্রামের মানুষ পৌরাণিক দেবদেবীর সঙ্গে মৈত্রী বন্ধনে একরকম আবদ্ধ বলেই নিজেদের মনে করে, অন্তরের সঙ্গে তা বিশ্বাসও করে। এই বিশ্বাসের জোরেই কালে কালে গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন রকমের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঞ্চলিক সংস্কৃতি (Parochial cultures), আর এই সমস্ত সংস্কৃতির মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের ধর্মবিশ্বাসের বিভিন্নতা ফুটে ওঠে স্বাভাবিক ভাবেই। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাম, লক্ষণ, সীতা, হনুমান প্রভৃতি নামের মাহাত্ম্য ভারতীয় গ্রামীণ সমাজেই বিশেষভাবে ছড়িয়ে আছে। গ্রামের মানুষরা তাই বিশ্বাস করে যে, রাম নামের মাহাত্ম এতই জোরালো যে মুখে এই নাম উচ্চারণ করা মাত্র ভূত প্রেত দৈত্য দানব দূরে সরে যায়। এই পৌরাণিক বীরপুরুষরা যেহেতু সাধারণ মানুষের পরম শুভার্থী, পরম বন্ধু সেহেতু তারা লোকচক্ষের অন্তরালে থেকেও তাদের প্রিয় লোকজনকে সদা সর্বদা রক্ষে করেন। সাধারণ মানুষের এই জাতীয় চিন্তা ভাবনা থেকেই পৌরাণিক বীরপুরুষেরা দেবতার মর্যাদা ও মহিমা লাভ। করেছেন। এইভাবেই এক অলৌকিক জগতের সঙ্গে মানুষের এক অদৃশ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে একটা দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যেতে পারে।

বছর কয়েক আগে মেদিনীপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত উপজাতি অধ্যুষিত একটি গ্রামে গবেষণার কাজে যেতে হয়েছিল গ্রন্থকারকে।

ঐ গ্রামের বেশীর ভাগ অধিবাসী হল খৃষ্টান উপজাতি (tribal christians)। এবং বাকি অন্যান্য আদিম গোষ্ঠীর মানুষ যারা তাদের সর্বপ্রাণবাদী (animist tribals) নামে চিহ্নিত করা যায়। কারণ এরা বিশ্বাস করে যে, প্রকৃতির যে কোন বস্তু বা ঘটনাই হোক না কেন, তা চালিত হচ্ছে অদৃশ্য এক প্রাণ শক্তির সাহায্যে। এক কথায় বলা যেতে পারে যে, প্রাকৃতিক বস্তুমাত্রই জীবন্ত, প্রাণবন্ত। এক সময় এক মাঝ বয়সী পুরুষ কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। সে একটু একটু করে মৃত্যুর পথে এগিয়ে যেতে থাকে। বাপের এই অবস্থা দেখে তার ছেলেরা এক নামকরা ডাকিনী চিকিৎসকের ডেরায় গিয়ে হাজির হয়। উক্ত সাঁওতাল চিকিৎসক ভবিষ্যৎ কথনের গুপ্তক্রিয়ার প্রয়োগ করে জানায় যে, ভয়ানক হিংস্র এক অশুভ শক্তি তাদের বাবাকে ভর করে আছে অনেক দিন থেকে। সহরের কোন ডাক্তারই যে তাদের বাবাকে বাঁচাতে পারবে না সে কথাও সে বলে দেয়। কথাটা অবশ্য ডাকিনী-চিকিৎসক মিথ্যা বলেনি। কারণ শহরের জনা দুয়েক বড় বড় ডাক্তার অনেক রকম চিকিৎসাই করেছে। কিন্তু সুরাহা কিছুই হয় নি। তাই শেষমেষ ঐ ডাকিনী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয় ছেলেদের। তবে ঐ রোগীকে বাঁচাতে হলে প্রথমেই তাকে ধর্মান্তরিত করতে হবে। উপজাতিধর্ম ত্যাগ করে রোগী যদি খৃষ্টধর্মে দীক্ষা নেয়, তাহলে সে এই ডাকিনী-চিকিৎসকের চিকিৎসায় আস্তে আস্তে ভালো হয়ে উঠবে। খৃষ্ট ধর্ম যেহেতু উপজাতি ধর্ম বিশ্বাসের তুলনায় অনেক বেশী উৎকৃষ্ট ও শক্তিশালী সেহেতু খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে ঐ অশুভ শক্তি রোগীকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে। এতদ অঞ্চলের সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষকে যে সমস্ত দুষ্ট ভূত সাধারণত ভর করে থাকে, সে সমস্ত দুষ্ট শক্তি খৃষ্টান সাহেবদের কাছে ঘেঁষতে পারে না বলেই সাঁওতাল গুণিন বা ডাকিনী চিকিৎসকেঁদের ধ্রুব বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের ফলেই হয়ত উপজাতি খৃষ্টানদের সংখ্যা ক্রমশই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

যাই হোক, রোগ শয্যায় শুয়ে শুয়েই সেই মাহালী ভদ্রলোক ডাকিনী-চিকিৎসকের নির্দেশমত ঘন্টা কয়েকের মধ্যে স্থানীয় এক গীর্জার ফাদারের কাছ থেকে খৃষ্টধর্মে দীক্ষা নেয়। বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার, খৃষ্টান হবার পরের দিন থেকেই সে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে এবং কিছুদিনের মধ্যেই সে সাধারণ একজন লোকের চাইতে অনেক বেশী সুস্থ ও সবল হয়ে ওঠে। এই ঘটনা থেকে এটাই স্পষ্ট যে ডাকিনী-চিকিৎসকের নির্ভুল গণনায় সাধারণ মানুষের আস্থা হয়েছিল গভীর থেকে গভীরতর। খৃষ্টানের দেহ যে উপজাতি সম্প্রদায়ের অশরীরী দুষ্ট শক্তির চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী তারও হাতে হাতে প্রমাণ মেলে। তাই এই অঞ্চলের উপজাতিরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির তুলনায় শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতি অনেক অনেক বেশী উন্নত ও প্রভাবশালী। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত পৌরাণিক দেবদেবী রাম লক্ষ্মণ সীতা হনুমান প্রভৃতি যে চিরন্তন শক্তির আধার তাও একবাক্যে স্বীকার করে এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। এই রকম ধ্যান ধারণা বা বিশ্বাসের মধ্যে দিয়েই অনুন্নত সংস্কৃতির সঙ্গে উন্নত সংস্কৃতির সংমিশ্রণ সমস্ত যুগেই ঘটে থাকে; অনুন্নত সংস্কৃতি সব সময়ই উন্নত সংস্কৃতির প্রাধান্য বিনীতভাবে স্বীকার করে নেয়। প্রত্যেক দেশের মানুষই যে তার নিজের দেশের সংস্কৃতিকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, তার সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে মিশিয়ে দেয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তা সত্বেও আবার যুগের পরিবর্তনে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনে, দেশীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনেক কিছুর অভাব পরিলক্ষিত হয়। বহুকালের প্রচলিত সাংস্কৃতিক প্রথায় দেশীয় মানুষজন (indigenous people) যখন নানারকমের দুর্বলতা লক্ষ্য করে তখন তারা ভিন্ন সংস্কৃতির নানান উপাদান একটু একটু করে গ্রহণ করতে থাকে নিজেদের প্রয়োজন মত। এইভাবেই এক অঞ্চলের সংস্কৃতি বা কৃষ্টির সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটে চলেছে দিনের পর দিন। এরই ফলে এক এক অঞ্চলে এক এক রকমের সংস্কৃতির মিলন ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

ভারতীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য যে অতি বিচিত্র তা উল্লিখিত ঘটনার বিবরণ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতীয় সংস্কৃতির সব থেকে লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য হল এক দিকে ভারতীয় সংস্কৃতির নমণীয়তা ও অন্য আর এক দিকে তার সহজাত সৃজণী ক্ষমতা বা দক্ষতা। এই দুই বৈশিষ্ট্যের বলেই ভারতীয় সংস্কৃতি অন্যান্য নানান সংস্কৃতির এক মহা মিলন তীর্থে পরিণত হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন সংস্কৃতির ক্রমবিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি যে শুধু এগিয়ে এসেছে, শক্তি সঞ্চয় করেছে তা নয়, বরং ছোট বড় উন্নত অনুন্নত সকল শ্রেণীর মানুষকে আপন করে নিয়েই ভারতীয় সংস্কৃতি প্রবহমান। আর ঠিক এই কারণেই ভারতের মানুষ মাত্রেই সহ অবস্থানের নীতি ও আদর্শে চিরকালই পরম আস্থাশীল। এই মহান দেশে নানান ধর্ম, নানান বিশ্বাস, নানান সংস্কৃতি পাশাপাশি থেকেই ভারতবাসীকে দিয়েছে মানসিক ধীরতা এবং সমতা বা সমদর্শনের এক মহান আদর্শ (Supreme idealism of equanimity)। সুতরাং এই আদর্শের আবহাওয়ায় যে কোন রকমের বিচিত্র ধ্যান ধারণা, বা যে কোন রকমের অদ্ভুত বিষয়ের গোপন চর্চাই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে হঠাৎ করে সোচ্চার হওয়া কখনই সম্ভব হয় না; আবার ঐ সমস্ত বিষয়ের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকাও কি সবার পক্ষে সম্ভব : আর তা সম্ভব হয় নি বলেই আমাদের এই দেশের প্রায় সর্বত্রই গুপ্তবিদ্যার পাঠ ও অনুশীলন সমানেই চলেছে এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে আসছে। তাই এ কথা স্বচ্ছন্দে বলা যায় যে, এখানে যখনই কোন না কোন গুপ্তবিদ্যার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে তখনই তা কিছু সংখ্যক মানুষের মনে অনেক আশা জাগিয়েছে, গোপন ইচ্ছা বা কামনা বাসনা পূরণে গুপ্তক্রিয়া প্রক্রিয়া সহায়ক হয়েছে। সুতরাং গুপ্তকলাবিদ্যার ব্যবহারিক উপযোগিতার কথা যে বহু মানুষের মনে বিশেষভাবে একদিন গেঁথে গিয়ে থাকবে, তাতে তো আ হবার কিছু নেই। তারপর থেকেই গুপ্তবিদ্যা বিষয়ক নানান ধ্যান ধারণার প্রচার প্রসারও চর্চা ব্যাপক ভাবেই চলে আসছে। দেশের কিছু কিছু গুণী জ্ঞানী ব্যক্তি গুপ্ত কলা বিদ্যার নানান দিক নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানোর জন্যেও অনুপ্রাণিত হয়েছেন বিভিন্নভাবে। তারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বলেই ভারতীয় ভেষজ, আয়ুর্বেদ, জ্যোতিষ, মনস্তত্ব, যোগ, সম্মোহন ও রহস্যবিদ্যার ক্রমবৃদ্ধিও সম্ভব হয়েছে। এটাই তাই বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ভারতের বিভিন্ন আবহাওয়া ও পরিবেশে নানান সংস্কৃতি সংমিশ্রণ হয়ে এসেছে যুগ যুগান্তর ধরে। বহু পরিবর্তন ও বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আসতে হলেও ভারতীয় সংস্কৃতির জটিল প্রবাহ কোন সময়ই বাধাগ্রস্ত হয়নি, আর তা না হওয়ায় এক এক রকম ভাবে এক এক রকম সংস্কৃতির স্বরূপ, আজও প্রকাশ পাচ্ছে।

.

মন: গুপ্তবিদ্যা ও ধর্ম

আমরা আগেই দেখেছি যে, গুণিন তার গোনগাঁথা ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে বহু রকমের রোগ বালাই থেকে মানুষকে সারিয়ে তোলে এবং এব্যাপারে যে সমস্ত ক্রিয়াকর্ম আচার অনুষ্ঠান করে থাকে সে সমস্তই হল এক এক রকমের গুপ্ত প্রক্রিয়া। সেজন্যে গুণিন মাত্রেই কোন না কোন গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকে। গুপ্ত ক্রিয়াকর্মে তার যা কিছু বিশ্বাস সেগুলি তা তার ঘনিষ্ঠ ও অনুগত লোকজনের মধ্যেও অনুপ্রবেশ করে খুব তাড়াতাড়ি। এক্ষেত্রে মনস্তত্বের দিকটাই সব থেকে বেশী লক্ষণীয়। কারণ এটা দেখা যায় যে, গুপ্তবিদ্যার আবহাওয়ায় যে সব অঞ্চলের মানুষ ছেলেবেলা থেকে বসবাস করে আসছে তাদের মনের জগৎটাও সেইভাবে গড়ে ওঠে। তারা যেমন করে বিভিন্ন প্রকারের আবেগ বা অনুভূতির সঙ্গে মনকে খাপ খাইয়ে নিতে অভ্যস্ত হয়, ঠিক সেই ভাবে তৈরী হয়ে যায় তাদের মনোগত বিশ্বাসের এক এক রকম কাঠামো বা আদব (belief patterns)। এই সব প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরীব মানুষের প্রাত্যহিক জীবন যাত্রার পথে অভাব, অনটন, দুঃখ-দুর্দশা, রোগ-ভোগ, আপদ-বিপদ, মহামারি, সামাজিক পরিবেশ ও বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি বিষয় গভীরভাবে লক্ষ্য করাই ছিল গ্রন্থাকারের প্রধান উদ্দেশ্য। কারণ এই বিষয়গুলিই নানারকম রহস্যজনক ঘটনার প্রতি মানুষের মনকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। এই প্রভাবের ফলে সাধারণ মানুষের মনে যে ধারণা বা বিশ্বাস জন্মায় তা হল, গুপ্তক্রিয়া কর্মের সাহায্যে রহস্যসৃষ্টিকারী অদৃশ্য শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সাধ্যাতীত নয়। রহস্যজনক প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নানান প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে মানুষ এক দিকে যেমন নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে আর এক দিকে তেমনি গুপ্তক্রিয়াকর্ম-বিষয়ক প্রচলিত বিশ্বাসের ধারাকে আঁকড়ে থাকতে বদ্ধপরিকর হয়েছে বংশাবলীর ঐতিহ্যগত ধারা হিসেবে। তাই একের পর এক গুপ্তপ্রতিষ্ঠান মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার মূলেও লক্ষ্য করা যায় দুষ্টশক্তির সম্পর্কে গ্রামগঞ্জের লোকের মধ্যে বংশানুক্রমিকভাবে প্রচলিত বিভিন্ন ধরণের কথা ও কাহিনী। আবার ঐ সব গল্পকথাকে ভিত্তি করেই এক এক অঞ্চলের মানুষের মনে ব্যাধি সৃষ্টিকারী এক এক জাতের দুষ্টশক্তির ধারণা জন্মেছে, এবং তাদের নামকরণ ও হয়েছে ধারণা অনুপাতে। অতএব নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, দুষ্টশক্তির প্রতিরোধ কল্পে যে সমস্ত গুপ্তপ্রতিষ্ঠানে গুপ্তকলাবিদ্যা শিক্ষার পাঠ আরম্ভ হয়েছিল তা বাইরের প্রচলিত কোন বিধিবদ্ধ পাঠক্রম অনুসরণ করে নয়– তার আরম্ভ হয়েছিল প্রাচীন মানুষের সহজাত ধারণা বা প্রবৃত্তি থেকে। গুপ্তকলা কৌশল চর্চা প্রাচীন মানুষের জীবনের সঙ্গে এমনভাবেই মিশে গিয়েছিল যে তাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোন প্রশ্নই ওঠে না। তাই প্রাচীন মানুষের জাগতিক ও সামাজিক ধ্যান ধারণা, বিশ্বাস ইত্যাদির যে বহিপ্রকাশ ঘটে তাও গুপ্তক্রিয়াকর্ম সম্পাদনার মধ্যে দিয়েই ঘটেছিল।

মেদিনীপুর জেলার যে সমস্ত অঞ্চলের কথা বিবৃত হয়েছে সেসব অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি নারী পুরুষই মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে, অশুভ শক্তির আক্রোশের ফলে মানুষের দেহে যে সমস্ত দুরারোগ্য ব্যাধির উৎপত্তি হয়, তা সারিয়ে তুলতে হলে গুপ্তক্রিয়াকর্মের চর্চা ও প্রয়োগ একান্তই প্রয়োজন। এখানে বিচারবুদ্ধি, যুক্তিতর্কের যেমন কোন অবকাশ নেই তেমনি কার্যকারণ নীতির প্রশ্ন তুলতে যাওয়াও একেবারে অবান্তর। শুধু একটা কথাই মেনে নিতে হয় যে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মনে অশুভ শক্তি সম্পর্কে যে ধারণা চেপে বসে আছে তাকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এ ধারণা শুধুমাত্র একটা মনগড়া ধারণাই নয়, এ হল তাদের এক চিরন্তন সত্যের প্রতি অচল বিশ্বাস। তাদের এই বিশ্বাসের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর একদিন যে সব গল্প গড়ে ওঠে, তা যে গল্প হয়েই লোকের মুখে মুখে ঘুরছে ফিরছে তা নয় বরং এই সমস্ত গল্পকাহিনী তাদের সমাজ ও সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের হৃদয় জুড়ে টিকে আছে, জীবন্ত হয়ে আছে।

রোগ ব্যাধি আকস্মিক দুর্ঘটনা ইত্যাদির কারণ অনুসন্ধানের ব্যাপারে বুদ্ধি যুক্তির তুলনায় আধিদৈবিক অর্থাৎ ভূত প্রেত দৈত্য দানব সংক্রান্ত চিন্তাই যে সাধারণ মানুষকে অনেক বেশী মাত্রায় পেয়ে বসে তা এখানে একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেই পরিষ্কার বোঝা যাবে।

গোবিন্দ ঘোষ নামে এক ঠিকাদার সরকারী বন বিভাগের কাছ থেকে প্রায়ই এক একটি জঙ্গল ঠিকে নিত এবং প্রচুর পরিমান কাঠ বিক্রয় করে যথেষ্ট অর্থশালী হয়ে উঠেছিল অল্পদিনেই। খপুর রেল স্টেশনের কাছে হোট একটা বাড়ীতে সে সাধারণভাবে বাস করত। চাল চলন ও কথাবার্তায় তার কোন অহংকার ছিল না। কুলি মজুররাও তাকে যথেষ্ট ভালোবাসত। এমনি একবার বেশ কিছু কাঠুরিয়া সঙ্গে নিয়ে সে এক জঙ্গলে যায় গাছ কাটাতে। ঐ জঙ্গলের মধ্যে অনেক দিনের পুরোন মস্ত বড় একটা মহুয়া গাছ (Basia lalifolia) ছিল; ঐ গাছটি কাটার কথা বলতেই গোবিন্দের মজুরের আপত্তি জানায়। কারণ তারা বিশ্বাস করে যে, ঐ গাছই বরাম (Baram) নামে মহা জাগ্রত বন দেবতার স্থায়ী আবাস। বনের কাছাকাছি যে সব মানুষ মাটির ঘরে বাস করে তাদের মধ্যে অনেকেই ছুটে এসে ঐ মহুয়া গাছের গায়ে আঘাত হানতে বারণ করে। তারা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয় যে, ঐ গাছ যে কাটবে তার সর্বনাশ হবে। একের পর এক বিপদ আসবে। দুর্ঘটনা ঘটতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুও হতে পারে। কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু গোবিন্দ এসব অন্ধ কুসংস্কার বলে কর্ণপাত না করে নিজেই কুড়ুল চালিয়ে গাছটিকে ধরাশায়ী করল। বেশ মোটা অর্থ উপার্জন করে ঐ গাছটি বিক্রী করে। কিন্তু পুরো একটা মাসও ভালোয় ভালোয় কাটলো না, নানান অশান্তিতে গোবিন্দ অস্থির হয়ে উঠল। তার সুস্থ সবল বাবার মৃত্যু ঘটলো। পরিবারের কয়েকজন হঠাৎ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। একদিন রাত্রে তার বাড়ীতে আগুন লাগে, ধানের মরাই পুড়ে একেবারে ছাই। এই অবস্থায় গোবিন্দ যে কি করবে না করবে তা বুঝে উঠতে নাচার। পাগলের মত এদিক ওদিক অকারণে ছুটে বেড়ায়। শেষকালে গোবিন্দ তার আত্মীয় পরিজনের উপদেশমত দাঁতন গ্রামের এক নামকরা ওঝা বা সখার ডেরায় গিয়ে উপস্থিত হয়, ত্রিশ মাইল পথ পায়ে হেঁটে। গোবিন্দকে দেখা মাত্র সখা তাকে একটা ছাগল বলি দিয়ে বন দেবতা বরামকে উৎসর্গ করার পরামর্শ দেয়। পরের দিন সকাল হতে না হতে ছাগলের মাংস পেতলের থালায় সাজিয়ে সেই মহুয়া গাছের গুঁড়ির কাছে সে যে রেখে আসে তা বলা বাহুল্য; বন থেকে বেরিয়ে এসেই গোবিন্দর মন একেবারে হালকা হয়ে যায়। বাড়ীর যারা বিছানায় পড়ে ছিল তারা দুচার দিনের মধ্যেই সেরে ওঠে।

এই ঘটনার বিবরণ থেকে এটাই বুঝে নিতে হয় যে, ব্যক্তি মানুষের জীবনে সময় সময় এমন এক একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটে থাকে যার ব্যাখ্যা ঐ ব্যক্তির পক্ষেও দেওয়া সম্ভব হয় না। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত যে সমস্ত ঘটনা ঘটে তা প্রায় সব সময়ই আমাদের বিচার বুদ্ধির বাইরে। কোন এক ব্যক্তি কেন যে এক বিশেষ মুহূর্তে মারা যায় তা কেউই বলতে পারে না। মানুষের প্রকৃতির মধ্যে যুক্তি ও অযুক্তি এই দুরকম উপাদানই (logical and non logical elements) বর্তমান। তাই কেউ যখন বিচার বুদ্ধি বিবেচনা হারিয়ে ফেলে সে তখন আবেগের আশ্রয়ে নিজেকে ধরে রাখে। যে কোন রকমের একটা অস্বস্তিকর অবস্থা বা পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য মানুষ হয়ে ওঠে আবেগ প্রবণ; বিচার বুদ্ধিহীন আবেগের মধ্যে দিয়েই সে নিজেকে বিপদমুক্ত করার পথ খোঁজে। আর এটাই হল মানুষের প্রকৃতি। মানসিক ও দৈহিক ধৈর্য ও স্থৈর্য বজায় রাখার জন্যে ব্যক্তি যখন তার মনের বিশ্বাস অনুযায়ী কোন না কোন একটা অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত শক্তিকে আধার বা অবলম্বন করার প্রয়াসী হয়, তখনই সে দ্বারস্থ হয় গুণিন বা ওঝার; যাতে নাকি ঐ গুণিন তার অভীষ্ট সিদ্ধি করার পথ বাতলে দিয়ে তাকে নিশ্চিন্ত করতে পারে। আমাদের দেশের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলেই কেবল নয়, ভারতবর্ষব্যাপী গুপ্তবিদ্যাচর্চার নিমিত্ত নানারকমের প্রতিষ্ঠান যে গড়ে উঠেছে, তার পেছনে আছে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন রকমের অলৌকিক ঘটনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ভারতের অন্যান্য প্রদেশের সাধারণ জন মানসে অতিপ্রাকৃত জগৎ সম্পৰ্কীয় বিচিত্র ধ্যান ধারণার সৃষ্টি অকারণে হয়নি, হয়েছে এমন কিছু বিস্ময়কর ঘটনার মধ্যে দিয়ে বাস্তবে যার ব্যাখ্যা মেলা ভার। তাই ঐ সমস্ত ঘটনার উৎসস্থল হিসেবে অতিপ্রাকৃত জগতের কথাই মনে এসেছে। তবে অতিপ্রাকৃত জগৎ যে শুধুমাত্র অশরীরী শক্তিকে নিয়ে সীমাবদ্ধ তা নয়, বরং নানান দেবদেবী ও ঈশ্বরের রাজ্য অবধি এর সীমানা বিস্তৃত হয়ে আছে। আর সেই জন্যেই আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষ তথা মহাত্মারা অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন মুনি ঋষিরা যেমন আমাদের কাছ থেকে অন্তরের ভক্তি অর্ঘ্য পেয়ে এসেছেন, তেমনি আবার ইষ্ট অনিষ্ট অতিপ্রাকৃত শক্তির এক এক রকম আধার বা প্রতীক হিসেবে কিছু কিছু গাছপালা বন উপবনও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়ে আসছে। দেবতা ও অপদেবতা, উভয়ের আবাসস্থল মানুষ নির্ধারণ করেছে মঙ্গল ও অমঙ্গলের ধারণা অনুসারেই।

ভারতবর্ষময় যে সমস্ত মঠ, মন্দির, গুরুদ্বার, দরগা, থান, পীঠস্থান ছড়িয়ে আছে সেগুলি থেকে বিভিন্ন রকমের জলপড়া, চালপড়া, নুনপড়া, তাবিজ, কবচ, মাদুলি ইত্যাদি দেওয়া হয় হাজার হাজার মানুষকে। পরম বিশ্বাসের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নারীপুরুষ নির্বিশেষে ঐ গুলি ধারণ করে। রোগ ব্যাধি, দুঃখ দুর্দশার হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়ে সুখ শান্তি ও সৌভাগ্যের মুখ দেখার আশাতেই মানুষ এসব জিনিষ নির্বিচারে আজও ধারণ করে পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে। এসব ব্যাপারে সাধারণ মানুষের যে বিশ্বাস তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েই এসেছে। এই লোক-বিশ্বাসই (Folk belief) যে লোকধর্মে (Folk religion) পরিণত হয়েছে তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। এই লোক বিশ্বাস বা ধর্মকে হাতিয়ার করেই পাশ্চাত্য দুনিয়ার কিছু সংখ্যক কৃট, ধূর্ত ও স্বার্থান্বেষী যাজক বা পুরোহিত নানারকমের ভেলকি বা ভোজবাজি দেখিয়ে দৈববাণী বা ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ (devine oracles) শুনিয়ে ধর্মভীরু জনগণের কাছে নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতা জাহির করে। ক্রমে সমাজ জীবনের নানান জটিল সমস্যা সমাধানের অমোঘ উপায় হিসেবে গুপ্ত ক্রিয়াকৌশলের প্রয়োগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সাধারণ মানুষের অনেক জিজ্ঞাসা, তাদের গোপন অন্তরের অনেক ব্যাকুল বাসনা পূরণের পথ প্রশস্ত হবে বলেই গুপ্ত ক্রিয়া কলাপের আসর জমে উঠতে থাকে পাশ্চাত্যের প্রতিটি দেশে যাজকীয় কূট কৌশলে।

.

গুপ্ত বিদ্যার প্রতি আসক্তি

কামনা, বাসনা, ভয়, আশঙ্কা, উদ্বেগ, হিংসা, দ্বেষ, অর্থলিপ্সা, অনুশোচনা, আত্মসাৎ করার ইচ্ছা ইত্যাদি হল মানুষের প্রায় জন্মগত বা সহজাত বৈশিষ্ট্য (almost innate features of man) এবং এগুলির পরিপূর্ণ চরিতার্থতা কখনই সম্ভব নয়। এই সব প্রবৃত্তির তাড়নাই মানুষকে চিরকাল ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায় ও বেড়াবে দিক থেকে দিকে। যেসব মানুষের মধ্যে এইসব প্রবৃত্তির আধিক্য ঘটে তারা উচ্চতর নৈতিক আদর্শের পথ চলতে একেবারেই অপরাগ বা অক্ষম। এরাই গূঢ় বা রহস্যমূলক ক্রিয়াকর্ম, আচার আচরণে হয় আসক্ত। এক কথায়, অকালটিজম ও এসোটেরিক কালটকে এরাই ধরে রাখে, স্থায়িত্ব দান করে। গুপ্তাচারের প্রথাকে এইসব লোকেরা বাঁচিয়ে রাখতে চায় প্রথমত তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করার জন্য; আর দ্বিতীয়ত অনিষ্টকারী বা অশুভ শক্তির অদৃশ্য দাপট থেকে নিজেদের জীবন নিরাপদ করার জন্যে। একদা ভারতীয় ঋষি তথা জ্ঞান তপস্বীরা উদাত্ত কণ্ঠে শুনিয়ে ছিলেন যে, আদর্শ জীবন যাপন করার জন্যে প্রকৃত সুখ ও শান্তি পাবার জন্যে “ত্যাগের দ্বারা ভোগ” (enjoy by Renunciation) কর। কিন্তু এই মহান নির্দেশ বাস্তবে পালিত হয় নি বললেই হয়। সাধারণ মানুষ এই জড় জীবনের চিন্তা ভাবনা ও চাওয়া পাওয়ার মধ্যেই নিজেদের অহরহ ডুবিয়ে রাখতে চেয়েছে। আর তা রেখেছে। তাই এই আধুনিক জীবনযাত্রার পথে উচ্চতর নৈতিক আদর্শ ও শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা দেখার জন্য এখনো দীর্ঘ কাল প্রতীক্ষায় থাকতে হবে; সেজন্য সর্বস্তরের মানুষের অন্তরে নৈতিক চেতনা উদ্ভূত না হওয়া পর্যন্ত গুপ্তবিদ্যাচর্চার প্রতিষ্ঠানের অবলুপ্তিও সম্ভব নয় এই দেশের মাটি থেকে। তবে ভারতবর্ষের অধিকাংশ মানুষ যদি বিজ্ঞান সচেতনতা লাভ করে তাহলেও আমরা অন্তত আশা করতে পারি যে, গুপ্তবিদ্যাচর্চার গুপ্ত সমিতি বা প্রতিষ্ঠান সমূহের ভিত নড়ে উঠবে এবং আস্তে আস্তে অবলুপ্তির পথে যেতে থাকবে। এ প্রসঙ্গে আমাদের আরো একটা কথা বলার আছে। তা হল, জন সাধারণের মনে যদি হতাশার সৃষ্টি না হত, বিরুদ্ধাচারণ করার মত যদি কোন কারণ খুঁজে না পেত, অর্থের লালসা ও কলহ বিবাদের উত্তাপ বা সেরকম কোন উদ্বেগ যদি না থাকত; সেই সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের রোগ ব্যাধি চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ও শিক্ষাদীক্ষার সব রকম সুযোগ সুবিধে যদি দেওয়া যেত, তাহলে গুপ্তবিদ্যা প্রসারের পথও যে অচিরে রুদ্ধ হয়ে যেত তা এক রকম নিশ্চিন্ত ভাবেই বলা যায়। উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গ্রামের মানুষ যদি নৈতিক বিচারবুদ্ধির অধিকারী হবার সুযোগ পেত তাহলে তারা বুঝতে পারতো যে, গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা হল অকাজের শিক্ষা। এর কোন মূল্য নেই। গুপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের রোগব্যাধি সারানোর জন্যে যে সমস্ত গাছ গাছড়া জড়িবুটি ব্যবহার করার শিক্ষা দেয় তাতে হাতুড়ে বৈদ্যগিরি করা ছাড়া জীবনে ভালো কিছু করা যায় না। তাদের এই বাস্তব উপলব্ধির ফলে গুপ্তপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব আপনা থেকেই মুছে যেত। কিন্তু বর্তমানে এই আশাপূরণের কোন লক্ষণই যেহেতু দেখা যাচ্ছে না সেহেতু গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে সমস্ত ক্রিয়াকর্মের গোপনচর্চা বা অনুশীলন হয়ে থাকে, সেগুলির প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের তেমন কোন নড়চড় হবে না। আমরা মনে করি, শুধু গ্রামগঞ্জের সিধাসাদা অশিক্ষিত লোকেরাই যে গুপ্তক্রিয়া কর্ম আচার অনুষ্ঠানে আসক্ত হতে থাকবে তা মোটেও নয়, শহরাঞ্চলের বহু উচ্চশিক্ষিত বাস্তব বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকেও গুপ্তবিদ্যাচর্চার বিচিত্র কলাকৌশল আকর্ষণ করবে সমানভাবেই।

এছাড়াও আরো একটা কারণে গুপ্ত প্রতিষ্ঠান ভারতে সক্রিয় থাকবে বলেই গ্রন্থকারের ধারণা। ভারতবর্ষ হল অতীন্দ্রিয়বাদী ও গুপ্তবিদ্যাচর্চাকারীর দেশ। গূঢ় রহস্যাদিচর্চা ও সম্মোহন বিদ্যার প্রথম পীঠস্থান হিসেবে ভারত ভূমির প্রসিদ্ধি আছে বিশ্বের দরবারে। আজও অগণিত মানুষের গূঢ় রহস্যচর্চার প্রতি সশঙ্ক মনোভাব ও বিশ্বাসের দরুণ এই উপমহাদেশের আকাশ বাতাস যে ভাবে পরিপূর্ণ হয়ে আছে তাতে আমাদের পক্ষে এরকম প্রত্যাশা করা খুবই কঠিন যে, ভারতের মাটি থেকে গুপ্তবিদ্যার কলাকেন্দ্র সমূহ একদিন বিদায় নেবে এবং গুপ্তবিদ্যার প্রতি যে অনুরাগ, যে আসক্তি, তাও অচিরে লোপ পাবে।

Rivers, WH R (1924)– Medicine, Magic and Religion (London)

.

References

Basak, R. G. (1964) Kautilyer Arthasāstra (in Bengali). Calcutta.

Basam, A. L. (1963) The Wonder that was India. Calcutta.

Barnal, J. D. (1964) Science in History. London.

Bhattacharya, N. (1963) Atharva Vede Bhāratiya Samskriti.

Bhowmick, P. K. (1963) The Lodhas of West Bengal. Calcutta.
(1969) Changing Societies in Frontier Tracts of West Bengal. Bulletin of thc Ramkrishna Mission Institute of Culturc. Calcutta.
(1969) Occupational Mobility and Caste Structure in Bengal. Calcutta.
(1973) Functioning Secret Institutions Journal of Social Research Vol. XVI, No.2. Ranchi
(1975) Socio-Cultural Profile of Frontier Bengal, Calcutta.

Bose N. K. (1967) Culture and Society in India. Bombay

Elwin V. (1939) Thc Baiga. London.

Evans-Pritchard, E. E. (1937) Witchcraft, Oracles and Magic among the Azande. Oxford.

Fortes, M. (1949) The Web of Kinship among the Talensi, London.

Fordhan, F. (1956) An Introduction of Jung’s Psycho logy, Palican Book.

Fuchs, S. (1960) The Gond and the Bhumia of Eastern Mandla, Bombay.

Gupta, R. K. (1960) Witchcraft Murders in Duars, Man in India, Ranchi.

Haddon, A. C. (1921) Magic and Fetishism. London.

Hastings, J. (ed) (1964) Encycopaedia of Religion and Ethics. New York.

Hutton, J. H. (1963) Caste in India, Oxford.

(1968) Sama Naga. Oxford

Hutton, W. (1932) Primitive Secret Societics. New York.

Leuva, K. K. (1963) The Asura. New Delhi.

Macfarlane, A. (1970) Witchcraft in Tudor and Stuart England. London.

Marwick M. (ed) (1958) The Continuance of Witchcraft Beliefs in Africa in Transition.

(1970) Witchcraft and Sorcery. Penguin.

Malinowski, B. (1922) Argonauts of the Western Pacific. London.

Mayer, P. (1954) Witches. Graham.

Middleton, J. and Winter, E. H. (ed) (1963) Witchcraft and Sorcery in East Africa. London.

Nath, Y. V.S (1960) Bhils of Ratanmal. Boroda.

Radhakrishnan, S. (1967) Religion in a Changing World. London.

Rivers, W. H. R. (1906) The Todas. Macmillan.

Roy, S.C. (1912) The Mundas and Their Cuntry. Ranchi

(1928) Oraon Religion and Customs. Ranchi

(1935) Hill Bhuiyas of Orissa. Ranchi

Roy, R. C. (1937) The Kharias, Ranchi.

Seligman, E. R. ed. (1959) Encyclopaedia of Social Sciences, New York.

Thomas, K. (1971) Religion and thc Declinc of Magic. London.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *