৩.১ জেল থেকে

তৃতীয় খণ্ড

০১.

জেল থেকে বেলা চারটেয় অভয় তার বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াল।

আকাশে একটু মেঘের আভাস। বাতাসও ভেজা-ভেজা, একটু জোরেই বইছে। সে দেখল, উঠোনে একটি ফরসা ছেলে মাটি মেখে আধবসা ভঙ্গিতে কী যেন হাতড়াচ্ছিল। অভয়কে দেখে তাকিয়ে রইল অচেনা চোখে।

একটি বছর পনরোর মেয়েও দাঁড়িয়েছিল দাওয়ার সামনে। স্বাস্থ্যবতী মেয়েটিও অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়েছিল। এমন সময়, পুকুরঘাটের দিক থেকে বালতি আর ন্যাতা হাতে উঠে এল ভামিনী। অভয়কে দেখেই তার হাত থেকে বালতি পড়ে গেল। এক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকেই, দাওয়ায় মুখ গুঁজে ডুকরে উঠল সে।

অভয় ছুটে এসে রুদ্ধ গলায় বলল, কী হয়েছে খুড়ি? নিমি কোথায়?

ভামিনী মাথা কুটতে লাগল দাওয়ায়। আর পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল।

ভামিনীর কান্নার মধ্যে কোনও কথা নেই। শুধু মাটিতে মুখ গোঁজা একটা বোবা গোঙানো চিৎকার করতে করতে দু হাত দিয়ে সে দাওয়ার মাটি খামচাতে লাগল।

অভয় ভামিনীর সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। মুখ খুলে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস করল না। সে যেন স্থির চোখে উৎকর্ণ হয়ে উঠল। গাঢ় অন্ধকার, দূরের কোনও এক নির্জন নির্বাসনের অভিশপ্ত মাঠ। সেই মাঠে যেন অভয় বসে আছে কালো আকাশটাকে মাথায় করে। প্রলয় কিংবা প্রত্যক্ষ মৃত্যুরই অতি স্তিমিত শব্দ বুঝি মহাকালের মন্দির থেকে ভেসে আসছে। তার বিশাল কাঁধে, বিস্তৃত বুকে সেই দূর-স্তিমিত শব্দের তরঙ্গ যেন লগ্ন-শেষের খেলায় কাঁপছে।

কাছে আসছে, বাড়ছে সেই শব্দ। কেন যেন চেনা-চেনা লাগছে শব্দটাকে। কোনওদিন কি শুনেছে অভয় সেই শব্দ? অতীতের কোনও অন্ধকার স্তব্ধ রাত্রে?

হ্যাঁ, শুনেছে। কিন্তু স্বীকার করতে চায়নি। বিশ্বাস করতে চায়নি। সভয়ে সে কানে আঙুল দিয়েছে। বধির হয়ে থাকতে চেয়েছে।

আজ আর কোনও ফাঁকি সইছে না। আজ আর চাপা রইল না। ভেজা-ভেজা বাতাসে, নানান যন্ত্র সঙ্গতের তরঙ্গের মধ্যে, সেই শব্দ ক্রমেই অস্ফুট থেকে ফুট হল। বিস্ময়-যন্ত্রণা-ভয়ের তীব্রতায় একটি বিচিত্র সুরের মতো শুনতে পেল, তুমি আমাকে একটুও ভালবাসনিকো?..তুমি আমাকে একটুও ভালবাসনিকো?

অভয় দাওয়ায় উঠে ঘরের মধ্যে গেল। যেখানে দাঁড়িয়ে নিমি কথাগুলি বলেছিল। আর সেই মুহূর্তেই সেই দূর শব্দ যেন আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো তীব্র হয়ে ভেঙে পড়ল, তবে আমি বাঁচতে চাইনে।…তবে আমি বাঁচতে চাইনে।…।

বড় ভয় পেয়েছিল অভয় একটা কথা ভাবতে। বুকে হাত রেখে লালন করেছিল একটি আশা। কেন ভয় পেয়েছিল, সে জানে না। কেন বুকে হাত দিয়ে ধরে রাখতে হয়েছিল আশা, জানে না। তার অচেনা অবচেতন মনের সেটা আপন লীলা। এখন সত্য এসে দুটি মিথ্যেকেই সরিয়ে নিয়েছে। নিমির মনস্কামনাই পূর্ণ হয়েছে। সে বাঁচতে চায়নি। যেখানটায় দাঁড়িয়ে শেষ কথা বলেছিল, সেখানটা চিরদিন শুন্য নিরালা থেকে যাবে।

তবু অভয় যেন নিশি পাওয়া মন্ত্র-পড়া মানুষের মতো সেই শূন্য জায়গাটার কাছে এগিয়ে গেল। একবার বুঝি ডাকতে চেষ্টা করল, নিমি!

বাইরে থেকে রিকশাওয়ালার গলার স্বর শোনা গেল, মালগুলোন কোথায় রাখব বলেন। আমার দেরি হচ্ছে।

অভয় আবার থমকে দাঁড়াল। ফিরে এল ঘরের বাইরে। কান্না নেই, দুঃখ নেই, কোনও সুরও বোধ হয় নেই তার গলায়। বলল, নামিয়ে দাও ভাই উঠোনে।

ভামিনীর কান্না তখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। ছেলেটিকে কোলে তুলে নেয়নি কেউ। সে মাটিতে উপুড় হয়ে হাত বাড়িয়ে যেন কী খুঁটছে। লালায় আর মাটিতে, কাদা মাখামাখি হয়েছে সারা মুখে। উপুড় হয়ে হাঁটু গাড়তে শিখেছে। বসতে শেখেনি এখনও। কোমরে বাঁধা ঘুনসি। তাতে একটি তামার ফুটো পয়সা বাঁধা। কারুর দিকে তার নজর নেই। সে আপন মনে মাটিতে চাপড়াচ্ছে। কী যেন দেখছে খুঁটে খুঁটে অভিনিবেশ সহকারে। তারপরেই সাঁতার দেবার ভঙ্গিতে, ছোট শরীর জুড়ে। তরঙ্গ তুলে দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলে উঠছে। যেন হঠাৎ বড় অবাক হচ্ছে। সহসা ভারী হাসি পেয়ে। যাচ্ছে তার।

সেই মেয়েটি তেমনি দাঁড়িয়েছিল দাওয়ার পাশে। যেন ভয়ে ও বিস্ময়ে দেখছিল অভয়কে। ইতিমধ্যে আরও কয়েকজন এসে দাঁড়িয়েছে উঠোনে। সকলেই পাড়ার বউ-ঝি। মালিপাড়ার অন্য মহলে সংবাদ যায়নি এখনও।

রিকশাওয়ালা ট্রাঙ্ক আর বিছানা এনে রাখল উঠোনে। অভয় তাকে পয়সা দিয়ে দিল। লোকটি সকলের দিকে একবার তাকিয়ে, মাথা নিচু করে চলে গেল।

সকলেই মনে মনে একটি কথাই ভাবছে, নিমি নেই। শব্দ শুধু শিশু গলার দুবোধ বাণীতে, গ গ গ…ভুঃ ভুঃ…আঁ আঁ গ।…

ভামিনী চোখের জল না মুছেই, সহসা আঁচল লুটিয়ে এসে, ছেলেটিকে দু-হাতে তুলে নিল। নিয়ে অভয়ের বুকের ওপর ফেলে দিয়ে, রুদ্ধ গলায় বলল, আমি কিছুটি বলতে পারব না। এটাকে জিজ্ঞেস করো, এই পুঁচকে রাক্ষসটাকে। ও সব জানে, সব জানে।

বলে ভামিনী, দাওয়ার ওপরেই দেয়ালে হেলান দিয়ে আবার বসে পড়ল।

অভয়ের বুকের মধ্যে একটি অসহ্য যন্ত্রণা যেন সাপের মতো মোচড় দিয়ে উঠল। তার বুক ভরে উঠল না। যেন জলের পাত্র মুখে নিল, তবু তার তৃষ্ণা মিটল না। তাই আরও আঁকড়ে ধরল। শিশুকে। দু চোখ মেলে তাকাল ছেলের মুখের দিকে। মনে হল, এ মুখ যেন তার চেনা। এই চোখ মুখ নাক, ওই চাউনি, এ তার দেখা। শুধু মনে পড়ে না, কবে দেখা হয়েছিল। কত যুগ। আগে। জন্মেরও আগে কিনা কে জানে। কিংবা কোনও এক জ্যোৎস্না-ভরা শঙ্খ-লাগা রাত্রের হাসিতে সে ফুটেছিল।

শিশুর গালের দু পাশে নরম মাংস আরও ফুলে উঠল। অভয়ের বুকের ওপর হাত দিয়ে ঠেলে, মুখ সরিয়ে নিয়ে এসে, বড় বড় চোখ করে তাকাল। যেন বড় অবাক হয়েছে অভয়ের এত বড় মুখখানি দেখে। দেখে একটু বিব্রত ভাবে একটি হাত মুখের কাছে নিয়ে এল। প্রথমে ভূতে খুঁটে দিল আঙুল দিয়ে। ঠোঁটের ওপর কচি কচি থাবা দিয়ে দু বার মারল আলতো করে। শব্দ করল গলা দিয়ে। তারপর সরু আঙুল ঢুকিয়ে দিল নাকের ফুটোয়। পর মুহূর্তেই দু পা দিয়ে অভয়ের বুকের ওপর ঠেলে পরিত্রাহি চিৎকার করে উঠল।

অভয় তাকে বুকে চেপে শান্ত করতে চাইল। বলল, কী হয়েছে, অ্যাঁ? কী হয়েছে?

নতুন গলা শুনে, শিশু আবার ফিরে তাকাল অভয়ের মুখের দিকে। এক মুহূর্ত দেখেই, তেমনি ভাবে ছটফটিয়ে উঠে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। একেবারে বেঁকে ঝুঁকে, দাওয়ার পাশে সেই মেয়েটির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

মেয়েটি হাত বাড়িয়ে নিতে যাচ্ছিল। ভামিনী বলে উঠল, না থাক নিসনি। ধরিসনি, ছুঁসনি। ওই কোলেই থাক ও। বলুক, রাক্ষস বলুক, ও কী জানে। কোথায় গেছে আমার মেয়ে, ও বলুক।

কিন্তু এই ছোট্ট মানুষটির পরাক্রমের কাছে পরাজিত হল অভয়। কিছুতেই কোলে রাখতে পারল না তাকে। হাত-পা ও গলা দিয়ে সে তার অনিচ্ছা ও প্রতিবাদ জানাতে লাগল। অভয় নিজেই এগিয়ে এসে, মেয়েটির হাতে তুলে দিল শিশুকে।

সজনেতলা থেকে বিশুর বউ বলে উঠল, আহা, এখনও চেনে না তো।

ভামিনী কান্না-ভরা গলায় ফিসফিস করে বলল, মা খেয়ে এসেছে ও, বাপ দিয়ে ওর কী দরকার?

কিন্তু শিশুর কান্না থামেনি তখনও। মেয়েটির কোলে গিয়েও ছটফট করতে লাগল। আর হাত বাড়াতে লাগল ভামিনীর দিকেই। মেয়েটি বলল, এই দেখ, দেখছ মাসি?

বলে দাওয়ায় উঠে ভামিনীর কাছে দিল। দিতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে কচি কচি মাড়ি দেখিয়ে হেসে উঠল। ভামিনীর কোল ধামসে, বুকের আঁচল টেনে খেলা জুড়ল।

অভয় ব্যথা-স্তব্ধ মন নিয়ে যেন পরম বিস্ময় দেখল। ভাবল, এই শিশুর ওপরেই খুড়ির এত রাগ। যে শিশু তাকে ছাড়া বুঝি কিছু জানে না। দেখে, তারও বুকের ভিতরটা যেন বড় খালি খালি লাগল। হাত বাড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করল বুকে। আর জেলখানায় পড়া কার কবিতার যেন একটি লাইনই বার বার মনে মনে বলতে লাগল সে, মোরে বহিবারে দাও শকতি! মোরে বহিবারে দাও শকতি।…

শক্তি চাই। নইলে কেমন করে সে এ বাড়িতে থাকবে। এ দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকবে এমন করে? কেমন করে ওই ঘরে ঢুকবে?

বাতাস ক্রমেই উতলা হল। বৃষ্টি বুঝি আর এল না। আকাশ যেন একটু পরিষ্কার হয়েই এল।

অভয় খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে বলল, খুড়ি, এবার বলো।

ভামিনী বলল, এই ভয়ই এতদিন করেছি গো, এই বলবার ভয়।

অভয় খুড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল। যেন মাটির মতো পড়ে আছে। ছেলেটা তছনছ করছে গায়ে পড়ে। ভূক্ষেপ নেই। চোখের জল শুকোয়নি ভামিনীর। কিন্তু এই এক বছরে, তার বয়স যেন অনেক বেড়ে গিয়েছে। তার যে পাকা চুল আছে, এটা কোনওদিন টের পায়নি অভয়। মুখেও বয়সের ছাপ পড়েছে। ঠোঁটের পাশে, চিবুকের ধারে ছুরিখানির ধার ক্ষয়ে গিয়েছে–মোটা হয়ে গিয়েছে। চোখে আর ঝিলিক নেই। বেলা বুঝি একেবারেই গিয়েছে খুড়ির।

অভয় বলল, ভয়ের কী আছে খুড়ি। ভয়ের কিছু নাই। একটুকু বলল শুনি।

যে-তিন চারজন এসেছিল, তারা উঠোনেরই আশে পাশে বসে রইল। গালে হাত দিয়ে তারা শুধু বসেই থাকবে। এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছে তারা। আজ তারা শোক প্রকাশ করতে এসেছে। সবাই মিলে শৈলদিদির জামাইকে সান্ত্বনা দেবে। অভয় যে এখন তাদের পাড়ার ইজ্জত। পাড়ায় একটা লোকের মতো লোক পেয়েছে তারা তাদের সারা জীবনে। পাড়ার আর দশটা পুরুষের মতো তো সে নয়।

ভামিনী চুপ করে আছে দেখে আবার বলল অভয়, খুড়ি, চুপ করে থেকো না। আমি বড় সাহস করে শুনতে চেয়েছি। একটুকুনি বলো তার কথা শুনি।

ভামিনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখের জল মুছল। বলল, বলব অভয়, সব বলব। পেথম থেকে বলব।

ততক্ষণে ক্ষুদে জীবটি সর্বগ্রাসী হাঁ দিয়ে ভামিনীর স্তন দখল করেছে। হাত পা ছোঁড়াও শান্ত হয়ে এসেছে তার। ভামিনীর যেন একটুও খেয়াল নেই, বিরক্তি নেই। সে বলল, তুমি জেলে চলে গেলে, নিমি ঠায় বসে রইল ঘরে। ডেকে ডেকে সাড়া পাই না। কদিন খালি বসেই থাকল। ও নিমি ওঠ। ও নিমি, চুল বাঁধবি আয়। সাড়া নেইকো মেয়ের। চুপচাপ বসে থাকে খালি। তারপরে খালি ছটফট। এই ঘরে, এই বাইরে। ক্ষণে বসে, ক্ষগে ওঠে। জিজ্ঞেস করি, কীলো নিমি, শরীর কি তোর অস্থির অস্থির করে? বলে, না! তারপরে কদিন খালি এক কথা। বলে, মাসি সোমসারে কেউ কারুর মুখ চেয়ে বসে নেই। মিছিমিছি মানুষ তবে এত আশা করে কেন গো? কেন? বলতে পারো? দেখো কেমন ড্যাং ড্যাং করে চলে গেল জেলে। আর আমি কত কথা ভাবছিলুম মনে মনে। মাসি রাগে আর ঘেন্নায় বাঁচি না। ইচ্ছা করে জেলখানায় ছুটে যাই ; জিজ্ঞেস করি, ইস! এত ছলনা? আমাকে একটুও ভালবাসনি?

আবার সেই কথা। আবার সেই ভয়ংকর কথারই প্রতিধ্বনি। অভয় সভয়ে ঘরের ভিতরে ফিরে তাকাল।

ভামিনী না থেমে বলে চলল, শুনে শুনে আমার রাগ হয়েছে। ও কী কথা। অ্যা? তোর ও কী কথা নিমি? কার বিষয়ে তুই কী কথা বলিস মুখপুড়ি। দূর হ–দূর হ। কিন্তু মেয়ের খালি ওই কথা। মাসি, সোমসারে কি ভালবাসা দেখিনি? একজন আমাকে ভালবাসত, সে আমার মা। মা মল, আর আমার কেউ নেই। কেউ নেই। এই খালি বলত। হাসত না। একটু হাসত না। কাঁদত না। কথাগুলোন বলত, বড় আস্তে, ঠায়ে ঠায়ে। আমার সহ্য হত না। তারপরে দেখলুম বড় রাগ মেয়ের। আর কী চোপা! ও নিমি খাবিনে? না খাব না। কেন? কেন খাব বল? কোন সুখে। সোমসারের ভড়কিবাজির মুখে নাথি মারতে ইচ্ছে করে। ও বাবা! চোখ যেন ধকধক করে জ্বলে নিমির। এদিকে পেটখানি তো এত বড় হয়ে উঠেছে। কী বলব অভয়। বলতে বলেছ। বলছি। প্রাণ শক্ত করো। তোমার চিঠি এয়েছে। পড়েছে, আর বলেছে, মিথ্যে মিথ্যে মিথ্যে। ছেড়ে গে চিঠি দে ভালবাসা জানাচ্ছে। ও সব জানি। পেটে যদি শঙ্কুর না থাকত, তা হলে দেখতুম। জিজ্ঞেস করেছি, অ্যা? দেখবি কী আবার? বলেছে, সাজতুম গো মাসি। হিমানী পাউডার মেখে, চোখে কাজল দিয়ে, বডিস এঁটে সিলকের শাড়ি বেলাউজ পরে, গিলটির গয়না পরে সাজতুম। কেন লো? কেন আবার? মন চায় তাই। রাজু মাসির বাড়িতে ঘর ভাড়া নিতুম, লোকজন নিয়ে ফুর্তি করতুম। মিনসেরা ভালবাসা উজাড় করে দিতে আসত। না চাইলেও পায়ে ধরে সাধত। আমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতুম ভালবাসা। গলায় যত ঝাঁজ, চোখে তত আগুন মেয়ের।

অভয়ের যেন নিশ্বাস পড়ে না। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিমির সেই জ্বলন্ত চোখ। অনুভব করে, প্রতিটি কথার আগুনের হলকা। এককালে রাগ হয়েছে অভয়ের। আজ রাগ হল না। আজ বুকের মোচড় বাড়ছে। প্রতিটি মোচড়ে আরও কঠিন পাকের কষুনি লাগছে। আজ আর ডেকে বুকে করে কিছু বোঝাবার নেই নিমিকে। নিমি জানত, জন্ম থেকে জানত, সে হবে মহারানি! ভালবাসার মহারানি!

কিন্তু মরণের আগে জেনে গিয়েছে, সে ছিল কাঙালি। বশংবদ প্রজার মতো কেউ এসে তার। পায়ে নিজেকে উজাড় করে দেয়নি। তার মনে হয়েছে, সে ভালবাসার বড় কাঙাল। তাই সে রাজুমাসির বারোবাসরে যেতে চেয়েছিল ছিটিয়ে ছড়িয়ে ভালবাসা ভোগ করবে বলে। যে জীবনকে নিমি ঘৃণা করত ভালবাসার আশায় সেই জীবনে যেতে চেয়েছিল সে। আজ নিমিকে বোঝাবার উপায় নেই, সেই ভীরু মহারানিকে যে, তার সিংহাসনে সে-ই অধিষ্ঠাত্রী ছিল। চির বশংবদ প্রজা তার রাজ্যে আজ বড় অসহায় হয়ে প্রবেশ করেছে।

ভামিনী বলেই চলেছে, আমার ভয় হয়েছে, রাগও হয়েছে। বলেছি, নোড়া দিয়ে তোর চোপা ভাঙব আমি নিমি এই বলে দিলুম। শৈলদিদি নেই বলে ভাবিসনে কি যে তোকে শাসন করবার কেউ নেই। যা মুখে আসে তাই বলবি তুই? লোকটা গে পড়ে রইল কোথায়, কোন গারখানার কুঠুরিতে। উনি যাচ্ছেন মেয়ে-পাড়ায় ভালবাসা খুঁজতে। ঝাটা মারি অমন কথায়।  বলেছে, ঝাঁটা মারো আর লাথি মারো, যা মন বলছে তা বলব। মাসি, যার ভরে না, সে জানে। এখন আমি কী সুখে বাঁচি? কেন বাঁচি মাসি? যেন কী কালে ছুবলেছে মেয়েকে। ইসপিসিয়ে নিসপিসিয়ে যায়। তারপরেই তো লাগল কাঁপুনি।

ভামিনীর গলায় যেন দূর আকাশের মেঘ ডেকে উঠল গুড়গুড় করে। সেই মেঘের শব্দ বাজল অভয়ের বুকেও। সে ভামিনীর মুখের দিকে ভীত উদ্দীপ্ত চোখে তাকিয়ে রইল।

ভামিনীর গলার স্বর চেপে এল। সে বলতে লাগল, কয়েকদিন আগে থাকতেই শরীর যেন নেতিয়ে ছিল মেয়ের। খালি ঘুসঘুসে ব্যথা। এ বায়ে বসে একবার, ও বায়ে বসে একবার। কীলো নিমি, কেমন বুঝিস? তেমন বুঝিস তো না হয় হাঁসপাতালে নে যাই চল। মুখে কথা নেই মেয়ের। ঘাড় নেড়ে বলে উঁহু। ওদিকে তোমার খুডোরও যেন ব্যথা উঠল। কারখানা কামাই করল। এদিকে বাড়িতেও থাকতে পারে না। বলে, ভয় করে গো ভামিনী। আমার বড় ভয় করে। তোর হয়নি, এক রকম বাঁচা গেছে, বুইলি! অভে ছোঁড়া এখন কী করছে জেলখানায় কে জানে। খালি প্যাচাল, আর মিছিমিছি ছুটোছুটি। তারপরে, আমি উঠোন ঝাঁট দিচ্ছি বিকেলে। তোমার খুড়ো গেছে বাজারে। নিমি বসেছেল দাওয়ায়।

দাওয়ার পাশে অল্প বয়সের মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, আর এই গিনি ছেলে রান্নাঘরের বারান্দায়। আচমকা চিৎকার করে উঠল নিমি। ঝাঁটা ফেলে ছুটে গেলুম। কী হয়েছে, নিমি, কী হয়েছে? জবাব নেই–যেন সামনে কী দেখেছে। খালি চিৎকার আঁ আঁ করে। হাত পা শক্ত। সারা শরীর কেঁপে দুমড়ে বেঁকে একশা। ও নিমি! ও নিমি, তোর কী হল? গিনি, শিগগির আয়, জলের ঝাপটা দে চোখে মুখে। শিগগির জলের ঝাপটা দে। দু হাতে আঁকড়ে ধরলুম। গিনি জল দিতে লাগল। কিন্তু মেয়ে যেন কী দেখেছে। ডুকরানি, কাঁপুনি! মিছে বলব না। মনে হল, কে এসে দাঁড়িয়েছে নিমির কাছে। তাকে চোখে দেখা যায় না। মন টের পায়। আর কী জোর তখন মেয়ের গায়ে! যেন ছিটকে চলে যাবে।…অনেকক্ষণ পর যেন নেতিয়ে পড়ল। শান্ত হল। গলার স্বর নেই। তোমার খুড়ো তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডেকে নিয়ে এল। ডাক্তার দেখে কী রোগের নাম করল জানিনে। ওষুধ দিলে ঠুচে করে। দিক। আমি তোমার খুড়োকে ডেকে বললুম, মিয়াজী পিরের দরগায় গে এক বারটি ফকির বাবাজিকে ডেকে নে এসো। আমার ভাল লাগছে না।…খানিক সোমায় যেতে না যেতে আবার তেমনি চিৎকার আর হাত পা খিচুনি। সারা রাত, সারাটা রাত থেকে থেকে খালি ওই রকম। কতক্ষণ যুঝবে? ফকির এল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। দেখে বলল, মেয়ের কোনও জিনিস আমাকে দাও। যা হোক মেয়ের নিজের জিনিস। চিরুনি, রুমাল, আলতার শিশি, সিঁন্দুর কৌটো, যা হোক। মিয়াজী পীরের ঘাটে গে বসি। লড়তে হবে। শমন এখন মাঝ দরিয়ায়। ওপারে যাবার আগে ফিরিয়ে আনা যায় কি না দেখি। সিন্দুর কৌটো নে চলে গেল ফকির। নিমির ওপর ছাড়া আমি অন্যদিকে চোখ ফেরাতে পারি না। ঘর ভরতি লোক। বিশুর বউ, চপলা মাসি, গিনি, ভব খুড়ো-কিন্তু কারুর দিকে চোখ ফেরাতে আমার ভয় করতে লাগল। আর সারারাত ওই রকম। সকলে কাঁটা হয়ে আছি। ভোরবেলার দিকে একটু যেন কমল। আর ফিসফিস করে যেন কী বলে। কী বলছিস নিমি, হ্যাঁ? কী বলছিস? চোখ মেলল। লাল চোখ, ঘোর ঘোর। চিনতে পারল না বলল, আমাকে একটু ভালবাসনিকো? একটু না?

অভয় শক্ত করে দু হাত দিয়ে বুক চেপে ধরল। বাতাসে যেন আবার ক্রমেই ঝড়ের লক্ষণ দেখা দিতে লাগল। আর বাতাসের ঝাপটায় কেবলি সেই ফিসফিসে স্বর।

ভামিনী বলে চলেছে, ওই এক কথা খালি। এক কথা ফিসফিস করে বলতে বলতে আবার চিৎকার আঁ আঁ আঁ..একটু না? একটু না? আবার ডাক্তার এল। এসেই বললে, হাঁসপাতালে পাঠাতে হবে এখুনি। আমি তো ফকিরের মুখ চেয়ে বসে। কোনও সংবাদ নেই তার। গাড়ি এল। হাঁসপাতালে গেলুম মেয়ে নে। মেয়ে তখন আমার ব্যথায় অজ্ঞান। বেলা দুকুর পর্যন্ত উথালিপাথালি ব্যথা। থেকে থেকে চিৎকার। হাসপাতালের দালান ফেটে যায়। বেলা দুটোয় এই রাক্ষস এল। তোমার জম্মিত, কিন্তু মা বসানো। এটার ট্যাঁ ট্যাঁ চিৎকার। ওদিকে মেয়ের সেই একই অবস্থা। সন্ধে নাগাদ একবার জ্ঞান হল। বেশ পোষ্কার চোখ, বড় শান্ত। মনে মনে বললুম, জয় বাবা মীয়াজীপির! হেই গো বাবা ফকির! তোমার লড়ায়ে জিত হোক বাবা, তোমার লড়ায়ে জিত হোক। তাড়াতাড়ি নিমির হাত নে রাক্ষসটার গায়ে তুলে দিলাম। নিমি বলল, এটা কী। মাসি? তোর ছেলে নিমি। তোর ছেলে হয়েছে যে। ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে চাইল। ঘাড়ে বুঝি ব্যথা, ফিরতে পারল না। আমি সেই মাংসের ড্যালাটাকে তুলে, চোখের সামনে নে এলুম। দেখল, দেখে আবাগির চোখ ফেটে জল পড়ল। আর সেই কাল হল, কাঁপুনি ধরল। কাঁপতে কাঁপতে আবার চিৎকার। চোখে ঘোর লাগল। আর কী ঘাড় দোলানি। মুখে এক বুলি। না না না না।…না তো না-ই। রইল না। রাত্রি আটটার সোমায় তো সবই শেষ।

ভামিনী থামল। চোখে আঁচল চেপে দেয়ালে হেলান দিয়ে কাঁপতে লাগল কান্নার বেগে। গিনিও চোখে আঁচল চেপেছে। উঠোনে যারা বসেছিল, তারা গালে হাত দিয়ে বসেই আছে। ভামিনীর কোলের ওপর অভয়ের মাতৃহীন ছেলে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।

কিন্তু অভয়ের কান্না পেল না। সে চারদিকে চোখ তুলে তাকাতে লাগল। সেই চাপা চুপিচুপি স্বর তার কানের পর্দায় বাজছে। কোথা থেকে বলছে নিমি? ঘরের ভিতর শেষ দেখা সেই জায়গাটায় গেল অভয়। কিন্তু পাথর সরল না তার বুক থেকে। কেঁদে জুড়নো হল না তার। তার হৃৎপিণ্ডের তালে তালে সেই কবিতার লাইনটি বাজতে লাগল, মোরে বহিবারে দাও শকতি। মোরে বহিবারে দাও শকতি।

.

০২.

আঘাত মানুষকে আচ্ছন্ন করে। অন্ধ করে। অভয় কিছুদিন যেন কেমন একটি অবোধ ঘোরের মধ্যে রইল। যদিও বাইরে থেকে সেটা ধরা পড়ল না। যারা এল, সকলের সঙ্গেই কথা বলল। সব রকম কথাই বলল। পাড়ায় এবং বাইরে যাওয়া-আসা করল। দেখা করল চেনাপরিচিতদের সঙ্গে। সে বুঝল, ভামিনী খুড়ির সাধ মেটে না তাকে যত্ন করে। খুড়ি তাকে দশ ব্যঞ্জনে রান্না করে খাওয়াল। শুধু আপন নয়, যেন বড় সম্মানীয় মানুষ অভয়। এত সয় না অভয়ের। তবু সে আরও চেয়ে খেল। ভামিনীর আয়োজিত সব আয়েশ ভোগ করল। যদিও তাতে সে অভ্যস্ত নয় কোনওদিন। শুধু একা ভামিনী নয়, সুরীনও তার সঙ্গে আছে। দু জনে যেন পাল্লা দিয়ে, অভয়ের খাওয়া-শোয়া বসার ত্রুটি দূর করতে ব্যস্ত! অন্য সময় হলে অভয় হেঁকে ডেকে এ ব্যবস্থাকে ভাঙত। এতে যে তার বড় অস্বস্তি। একেবারে অনভ্যস্ত। কিন্তু এখন সে খেয়াল করল না।

ছেলেটা আস্তে আস্তে চিনতে শিখল অভয়কে। যদিও ভরসা পুরোপুরি পেল না কাছে যাবার। আড়ষ্টতা থেকেই গেল। কারণ অভয়ের দিক থেকে তেমন কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। যেন। নতুন দেখা হয়নি এ ছেলের সঙ্গে। যেন জন্ম থেকে চেনা, তাই ভাব করার ব্যস্ততা নেই। ইচ্ছে। হলে আদর করে। কখনও বা সামনে বসে থাকে। ছেলে আপন মনে খেলা করে।

গিনি বলে মেয়েটি ভামিনীর কাজে কর্মে সব সময়েই প্রায় এ বাড়িতে থাকে। মেয়েটির নাকি বাপ-মা আছে বর্ধমানের কোন গ্রামে। কিন্তু খেতে দিতে পারে না। তাই এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে চলে এসেছে মালিপাড়ায়। এখানে নাকি ভাতের অভাব নেই। কিন্তু গতিক যে সুবিধের নয়, সে কথা বলেছে ভামিনী অভয়কে। সরাসরি দেহজীবিনীদের ঘরে যদিও গিনিকে পাঠানো হয়নি, আত্মীয়টির সেটাই ছিল আসল উদ্দেশ্য। যে রক্ষক, সেই ভক্ষক। অবিশ্যি লোকের কাছে বলছে, বিয়ে থা দেবে। যেন ছেলে ছড়াছড়ি যাচ্ছে গিনিকে বিয়ে করার জন্য। গ্রামে যার দুটি মোটা ভাতের সংস্থান হয়নি, মালিপাড়ায় যেন তার ভাত বাড়া থাকে। শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইলে হবে কী। পাড়ার লোকে জেনেছে। একে তাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যাওয়া। দশ রকম কাজের ফরমায়েশ করে, কেবলি গিনিকে রাজুবালাদের পাড়ায় পাঠানো। ইতিমধ্যে কে কে নাকি গিনির গায়ে হাত দিয়েছে। যেন হাঁসমুরগির ছানার ওপর শেয়ালের থাবা পড়েছে চুরি করে। প্রস্তাব করেছে নানা রকম। হেঁকে ডুকরে চিৎকার করে গিনি পাড়া মাথায় করেছে। আত্মীয় মামা। আর মামি বলেছে, ও চুড়িরও একটু বাড়াবাড়ি আছে। পাড়ার এক দল ঠোঁট উলটে হেসে চুপ করে থেকেছে। আর একদল বলাবলি না করে পারেনি। যারা পারেনি, তাদের মধ্যে প্রধান বোধহয় ভামিনী। সে নাকি বলেছে, অত ঢাক-ঢাক গুড়গুড় কীসের তা তো বুঝিনে বাপু। বেচবে, না হয় ভাড়া খাটাবে, এ রাজ্যে তার জন্য বাধা দেবার কে আছে? আইন আছে কাঁড়ি কাঁড়ি, রক্ষে করবার লোক নেই। তা বয়স তো মাত্তর চোদ্দো-পনেরো। দুটো বছর যাক–তা ছাড়া ও লাইনের আর এখন আছে কী? বেবুশ্যে বলে নাম কিনতে হল, এদিকে পেট ভরল না। বারো মাস রোগ। আর রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে চোর বাটপাড়ের রক্ষিতা হয়ে থাকতে হয়। ফরাসডাঙার বারোভারিরা কবে ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছে, চিরকাল কি তার গন্ধ থাকবে হাতে? এককালে নাকি তাদের দবদবা দেখে গৃহস্থদের বুক টাটিয়েছে। এখন কুকুরেও কাঁদে না। শরীর নিয়ে তো সেই মাছ বাজারের দরাদরি। তার জন্য এত লোভ, এত লালসা কীসের? কত বা পয়সার তূপ হবে। তাতে গিনির মামা মামির? মেয়েও পরী হুরি নয়। বয়সটা কাঁচা। তাই বা কদিন থাকবে? তার। চেয়ে লালন পালন করা। দেখো সত্যি সত্যি বিয়ে থা দিতে পারো কিনা। সংসারে এমন ছেলেও তো তাদের সমাজে আছে, একটি মেয়ে পেলে বর্তে যায়। এনে নিয়ে খেয়ে সংসার করতে পারে। বিয়ে না হোক, কারুর ঘর করতে লাগতে পারে। শকুনের আড্ডায় না পাঠালে নয় এখুনি?

তা ছাড়া গিনিকে বুঝি একটু ভালই বেসে ফেলেছে ভামিনী। মেয়েটিকে একেবারে হেজে পচে মরতে দিতে চায়নি। পরিষ্কার বলে দিয়েছে, না হয় আমারই পাত কুড়িয়ে খাবি গিনি। তেমন বুঝলে পালিয়ে আসবি এখানে। আধপেটা তো খেতে পাবি।

নিমি বেঁচে থাকতেই গিনিকে এই পরোয়ানা দিয়েছিল ভামিনী। নিমি মারা যাবার পর, গিনি ছাড়া একদণ্ড কাটতে চায় না তার। তবে সুরীন এ ঝঞ্ঝাট পোয়াতে চায়নি। প্রতিবেশীর সঙ্গে বিবাদ করতে চায়নি সে। মনে মনে যদিও অসহায় মেয়েটির জন্য কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু ভেবেছে, তার। কতটুকু ক্ষমতা আছে রক্ষা করবার।

কিন্তু হার মেনেছে ভামিনীর কাছে। এমন ভাবে হার মেনেছে যে তারপরে আর বিশেষ কথা বলতে পারেনি। গিনির মামাও চটকলেই কাজ করে সুরীনের সঙ্গে। একদিন বুঝি দশ কথা শুনিয়ে দিয়েছিল ভামিনীর নাম করে। গিনিকে কেন ভামিনী মামামামির বিরুদ্ধে বিষিয়ে দিচ্ছে? মায়ের। চেয়ে মাসির দরদ ভাল নয়।

কথাটা সত্যি। সুরীন একেবারে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছিল ভামিনীর সঙ্গে। বলেছিল, তোর এ সবে মাথা গলাবার দরকার কী? তুই ওকে রক্ষে করতে পারবি?

ভামিনী চুপ করে ছিল। সুরীনের রাগ তাতে কমেনি। বলেছিল, নিজেকে রক্ষে করতে পেরেছিলি তুই? তোকে রক্ষে করতে পেরেছিল কেউ?

কথাটা লেগেছিল ভামিনীর। সে একেবারে চুপ করে ছিল। তারপরে যখন সুরীন আবার তার রাগ ভাঙাতে গিয়ে, ভালভাবে বলতে গিয়েছিল, তখন ভামিনী বলেছিল, রক্ষে করবার ক্ষমতা নেই জানি। চেষ্টা করতে দোষ কী? একেবারে ও-লাইনে গিয়ে উঠলে, কী হাল হয়, তা তো জানি।

কী চেষ্টা করবি তুই শুনি?

ভামিনী তবু চুপ করে ছিল। তারপরে বলেছিল, গিনির সাত পাক ঘুরিয়ে বে হবে, তেমন কথা ভাবিনে। আমি নিজে যত মুখপুড়িই হই, তবু আমার মতন কপালও যদি ছুঁড়িটার হয়।

–তোর মতন কপাল?

 সুরীন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ভামিনীর দিকে। ভামিনী বলেছিল সলজ্জ ব্যথায়, সাত পাকের বে দেখেছি, লাইন কাকে বলে, তাও জেনেছি। জীবনে এক চিমটি পুণ্যি না থাকলে এমন মানুষ পেতুম?

সুরীন কেমন যেন হকচকিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, কার কথা বলছিস তুই?

সে কথার কোনও জবাব দেয়নি ভামিনী। তার চোখের কোণে জল দেখা দিয়েছিল। আপন মনে বলেছিল, বেবুশ্যের সুখ দূরের কথা, এর কাছে সাত পাকের বের কোনও দাম আছে? আমার যেন জমে জমো বে না হয়। মেয়েমানুষ হয়ে জমমে যেন আমি এমনটি চিরকাল পাই।

একটি ব্যথিত-আনন্দে ভরে উঠেছিল সুরীনের মনটা। কিন্তু মুখে বলেছিল, এ তুই আর আনতে কুড় আনলি। সব তাতেই তোর বেশি।

বলে কিন্তু ভামিনীর হাতখানি টেনে নিয়েছিল কোলের ওপর। ভামিনী বলেছিল, বেশি বেশি বলব কেন? রাজুর বাড়িতে ওই সুবালা ছুঁড়িটার কথা চিন্তা করো দিকিনি? কত বড় গেরস্থের মেয়ে ছিল, বে-থা সব হয়েছিল, তবু কপালে একটা ঠাঁই জুটল না। পেটে একটু আধটু বিদ্যেও আছে। আমাদের মতন আকাট নয়। মেয়েটা আজ ফেটে মরছে, জ্বলে মরছে। চোখের দিকে তাকাতে ভয় করে। যেন আগুন জ্বলছে অষ্টপোহর। ওখানে থাকতে পারছে না। পালাতে পারছে না। খালি মদ আর মদ। আমি তো বুঝি, কী চেয়েছিল ও?

তারপর সহসা সুরীনের কোলের ওপর থেকে হাতটি সরিয়ে এনে, তার পায়ে রেখে বলেছিল, গিনিকে তাড়িয়ে দেবার কথা তুমি বোলো না। মেয়েটা নিজের ইচ্ছেয় যত দিন আসে যায় আসুক।

সুরীন বলেছিল, আমি সবই বুঝি রে ভামি। কিন্তু লোকের সঙ্গে বিবাদে আমার বড় ভয়। নইলে, অন্যায্য তো তুই কিছু বলিসনি।

গিনির সম্পর্কে বলতে গিয়ে, এ সব কথাই ভামিনী অভয়কে বলেছিল। কিন্তু অভয় যেন স্তব্ধ সমুদ্র। তার ধোর কাটল না। ওপরের তরঙ্গটা তার ছদ্মবেশ মাত্র। সে বোঝ না বোঝা, শোনা না শোনার মতো ঘাড় নাড়ল। হুঁ হাঁ দিল। বলল, তাই তো খুড়ি, এ কী অবিচার সংসারে বলল দিকিনি।

যেন মুখস্থ করা কথা। ফিরে যদি ভামিনী জিজ্ঞেস করে, কী বিষয়ে অভয় এ কথা বলছে? অভয় বলতে পারবে না। অথচ গিনিকে রোজই দেখল অভয়। অভয়ের সামনে কাজকর্ম করে। কথাবার্তা বলে। একটু বুঝি কিশোরী-কৌতূহলেই, কখনও কখনও লুকিয়ে দেখে আড়াল থেকে। অভয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হলে পালায়। গিনি তার সঙ্গে ভাব করতে চায়, আরও ঘনিষ্ঠ হতে চায়।

কিন্তু অভয়ের সাড় হল না। কোনও সাড়া এল না তার ভিতর থেকে। ভিতর দুয়ারে আচ্ছন্নতা তাকে যেন অনুভূতিহীন করে রাখল।

রাজুবালা বুড়ি এল ছানিপড়া চোখ নিয়ে। এল মালিপাড়ার যাবৎ মেয়ে আর পুরুষেরা। এল না শুধু সুবালা। সে কথাও স্মরণে এল না অভয়ের। অথচ সে সকলের সঙ্গে কথা বলল। এমন কী, অনাথ এসে কত কথা বলল। বাইরে টেনে নিয়ে গেল। যদিও অনাথের কথার মধ্যে কী একটা অভিযোগ যেন ধ্বনিত হল অভয়ের বিরুদ্ধে। যে কারণে হয়তো গণেশ দেখা করল না অভয়ের সঙ্গে। কিন্তু অভয়ের সে সব খেয়াল রইল না।

তার ভিতরের পুঞ্জীভূত জমাট অন্ধকারের মধ্যে এক বিচিত্র মৌনতা। সে যে শক্তি চেয়েছিল, মোরে বহিবারে দাও শকতি সে কথা তার ভিতরের সব মৌনতার মধ্যে মিশে গিয়েছে। যে শক্তি সে চেয়েছিল, তা জীবনধারণের বাহ্যিক শক্তি নয়। অন্তরের ভিতরের শক্তি। কারণ নিমি তাকে অপরাধী করে গিয়েছে, সেটাই শুধু বড় কথা নয়। নিমি-হীন জীবন বইবারও শক্তি চাই।

মনে মনে অনেক বার জীবনের পিছন ফিরে তাকিয়েছে অভয়। পিতৃপরিচয়হীন, দেহোপজীবিনীর সন্তান। ভূমিহীন ক্রীতদাস। সে কেন অন্তরের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে ভিতরে ভিতরে এত অসহায় হয়ে পড়ে? নিমির ভালবাসা মুক্তি খোঁজার জটিল যুদ্ধে কেন টেনে আনল তাকে এ সংসার?

.

০৩.

স্তব্ধতার তুষারে প্রথম উত্তাপ এল বাহ্যিক দিক থেকেই। জীবন চৌধুরী বললেন, জীবনের ওঠানামায় পড়েছ বাবা। সোজা পথ তোমার হারিয়েছে। লড়, লড়ে যাও। পেটের ধান্দা তো আছে, সেইদিকের ব্যবস্থা দেখো। বেঁচে থেকে, কাজ করে যাও। অর্থাৎ গান তৈরি করো।

বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন চৌধুরী মশাই। এ জেলার মন্ত্রী-উপমন্ত্রী থেকে সকলেই মান্য করেন তাঁকে। শাসন ক্ষমতার মধ্যেও ছিলেন এ অঞ্চলের। কিন্তু সব ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন। এখন। বললেন, দেখো, আমি যে-দলের লোক, তাদের সঙ্গে আমার বনল না। নতুন দলে যাবার আর আমার বয়স নেই। সারা জীবন রাজনীতি করে এখন দেখছি কিছু সুখসর্বস্ব ভোগী মানুষ শাসনের ক্ষমতায় ক্ষেপে উঠেছে। তুমি দল করো, যা-ই করো, লড়ে যাও। একলা তো লড়া যায় না। কিন্তু আসল ক্ষমতা চাই। সে ক্ষমতা আশ্চর্য জিনিস। বক্তৃতা দেবার মতো জিনিস সেটা নয়। জানবে, রাজনৈতিক নেতা লোকটি কারখানার মাথার চিমনির মত। যাকে সব সময় সবখান। থেকে দেখা যায়। কিন্তু সে আসল নয়। যোগাযযাগটা আছে বটে সব কিছুর সঙ্গে, কিন্তু ভিতরটাই। সব। ওখানটাকে শক্তিশালী করতে হবে। লড়াই আমরা করেছি, জিত আমাদের হয়নি। কারণ ভিতরটা শক্ত হয়নি। ওই শক্তিটা চাই বাবা। তোমরা হচ্ছ সেই শক্তির বাহক। খুব গান বাঁধো, খাঁটি গান। এ ব্যবস্থাকে ভাঙো। বাইরে নয়, মানুষের ভিতরে শক্তি জোগাতে হবে।

এত সব কথা বুঝল না অভয়। কিন্তু অনুভব করল এই কথার অন্তর্নিহিত অর্থ। আর কানের কাছে বাজতে লাগল সবচেয়ে বেশি, পেটের ধান্দার কথা। তাই তো, এমন হাত পা গুটিয়ে বসে আছে কেমন করে অভয়। সংগ্রাম তাই স্মৃতির সঙ্গেও। নিমিকে ভোলা যাবে না। এ সংসার নিমিময় করতে হবে।

তার দৃষ্টি ফিরল আশে-পাশে। সহজ দৃষ্টি। দেখল, সে সুরীন খুডোর বোঝা হয়ে উঠেছে। যদিও সে বোঝা ভালবাসার। কিন্তু বোঝা তো ভালবাসারও ভাল নয়। ছেলেকে বুকে নিয়ে ভাবল, ওর খাওয়া-পরার দায় নিতে হবে। চাকরি তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এপারের চটকলে আর কোনও দিন চাকরি পাওয়াও যাবে না। যদি পাওয়া যায়, গঙ্গার ওপারে, অচেনা জায়গায় পাওয়া যেতে পারে।

শক্তি নিজেকেই আহরণ করতে হবে। কেউ দেবে না। নিজের সাহস থাকলে, অপরের সাহস সাহায্য করে।

অভয়ের পরিবর্তন সকলের চোখে পড়ল। তার হাসি কথাবার্তার ভাব বদলে গেল। তার গান শোনা গেল। ছেলের সঙ্গে ভাব হল খুব। গিনির সঙ্গে চোখাচোখি হলে গিনি লজ্জা পায়। পালায়। কিন্তু অভয় ডাকে। হেসে ঠাট্টা করে কথা বলে। রোজই কাজের ধান্দায় ওপারে যাতায়াত শুরু করল। কিন্তু ভরসা বড় কম। দুশ্চিন্তা বাড়তে লাগল।

ভামিনী একদিন একটি পশমি কাপড়ের ব্যাগ অভয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলল, দেখো কী আছে। তোমার বউ, শাশুড়ি এটি রেখে গেছে।

অভয় খুলে দেখল, প্রায় সাত আট ভরি সোনার অলঙ্কার। একটি বাঁধা রাখা হাত-ঘড়ি, গুটি তিনেক আংটি আর কানের দুল। খুচরো-খাচরা মিলিয়ে শতখানেক নগদ টাকা।

দেখে শুনে বুকের মধ্যে একটা ফিক ব্যথার মতো লাগলেও, সে যেন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তার যে এত আছে, এতখানি কেউ রেখে গিয়েছে জানত না।

সুরীন বলল, কাজ যদি না পাওয়া যায়, একটা দোকান টোকান খুলেই না হয় বসো। দু জনে মিলে দেখাশোনা করব।

অভয় বলল, দাঁড়াও খুড়ো, এত তাড়াতাড়ি হাল ছাড়লে হবে না। ওপারের নর্থ মিলে একটা কিছু হয়ে যেতে পারে।

ভামিনী বলল, কাজের ধান্দা করো, ক্ষতি নেই। দোকান একটা করলে, আখেরের কাজ হতে পারে। আমি আর তোমার খুড়ো, দু জনেই দেখাশোনা করতে পারব। আর বলছিলুম কী, ঘরটা তো বড্ড খা খা করছে। একটা বে থা—

অভয় হা হা করে হেসে উঠল। বলল, এটা মন্দ বলনি খুড়ি। পাত্রী কি তোমার গিনি?

-কেন, মেয়ে কি আমার খারাপ?

–না, খুব ভাল তোমার মেয়ে। কিন্তু নিয়মকানুন বলে তো একটা কথা আছে। আমি একটা আধবুড়ো ব্যাটাছেলে। ওইটুকুনি মেয়ে নিয়ে করব কী?

-ওইটুকুনি দেখলে?

 –বেশ, না হয় বড়ই হল। কিন্তু তুমি কি বিশ্বেস করো খুড়ি, আমি আবার বে করব?

–দোষ কী? আধবুড়ো বলল আর যা বলল, তুমি এখনও ছেলেমানুষ। নিমির জন্যে মন। আমারও টাটায়। সংসারের নিয়মকানুনগুলোন তো ছেড়ে কথা কয় না।

তবু অভয় খুব হাসল। হেসেই বলল, সংসারের নিয়মকানুনের কি এক দিকই আছে খুড়ি?

 তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, তোমার গিনির জন্য ছেলে দেখার ব্যবস্থা আমি করব।

এর পরে আর ভামিনী কিছু বলতে পারেনি। আর আশ্চর্য, এ সব কথা বলতে গিয়ে অভয়ের চোখের সামনে কেবলি সুবালার মুখ ভেসে উঠে ছিল। তার চেয়ে আশ্চর্যতম ব্যাপার, যত বারই। সুবালার কথা মনে পড়ল তত বারই মনে হল, নিমির মরণের মধ্যে কোথায় যেন সুবালার দায় রয়ে গিয়েছে। একটা চাপা বিদ্বেষ অভয়ের বুকের মধ্যে ফুটতে লাগল। সুবালা যেন একটি অদৃশ্য হাত দিয়ে নিমিকে মৃত্যুর হাতছানি দিয়েছিল।

তারপর আরও মনে পড়ল অভয়ের। পাড়ার সকল মেয়ে-পুরুষ এসেছে, সুবালা একদিনও আসেনি। এ সব কথাগুলিই মনে পড়ল, গিনির সঙ্গে বিয়ের কথায়। কেন আসেনি সুবালা? নিমি। মরেছে, তাই কি সুবালার প্রয়োজন ফুরিয়েছে? মনে যা-ই থাক, লোক-দেখানো দেখে যাওয়ার। কথাটুকুও সুবালার মনে পড়েনি নিশ্চয়। বারোবাসরে দেহ শুধু নয়, মন বিকিয়ে বসে আছে সে। মানুষের সব হারায়। নিজের বলতে তার সব শেষের ধন, মনটুকুই থাকে।

সুবালা সেটুকুও বিকিয়েছে। নিমির দুর্দশায় সবাই এসেছিল। সুবালা খোঁজও করেনি। সে খবরও শুনেছে অভয়। তাকেও দেখতে এল না। তাকে দেখতে আসাটা মালিপাড়ার সংসারে কোনও নিয়মের অঙ্গ নয়। কিন্তু সবাই এল। একজন এল না, এটা চোখে পড়ে। ভাবায়।

নিমির কি সবটুকুই ভুল ছিল? সুবালার ওপরে তার যত রাগ, যত আক্রোশ এবং ঘৃণা ছিল, সে-সবই কি একেবারে মিথ্যে? সুবালার কি কোনও দায় ছিল না?

না থাকলে, সুবালা সেটা প্রমাণ করত। করা উচিত ছিল।

এতগুলি কথা যে কেন মনে হল, অভয় বিচার করে দেখল না। শুধু সুবালার ওপর তার বিদ্বেষ বেড়ে উঠল। অত্যন্ত হীন মনে হল। এ সমাজে দেহ বিকানো দিয়ে ভাল মন্দ বিচার হয় না। পরস্পরের সঙ্গে ব্যবহার দিয়ে সেটা যাচাই হয়।

কীসের এত অহঙ্কার তার? নিমির মতো রূপ নেই তার। গুণ? থাকলেও তার পরিচয় পাওয়া যায়নি। এখন তো মদ ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। বাড়ি এবং পাড়ার প্রায় সব মেয়ের সঙ্গেই ঝগড়া। ঘরে লোক এলে নাকি দুর্ব্যবহার করে। গলা ফাটিয়ে মুখ খারাপ করে। সুবালার মাতলামি নাকি পাড়ার সকলের আলোচ্য। লোকে বলে রাজুবালার মতো ডাকসাইটে বাড়িওয়ালীর ভীমরতি না হলে, কবেই ওকে তাড়িয়ে দিত। একটা মেয়ের জন্য গোটা বাড়ির দুর্নাম। কিন্তু আশ্চর্য! রাজুবালার শাণিত শাসন সুবালার বেলায় যেন কেমন ভোঁতা! কেন? বাড়ির মেয়েদের বেচাল দেখলে রাজুবালা নিষ্ঠুরের মতো প্রহার পর্যন্ত করে। সুবালার বেলায় তার নিশ্চুপ অসহায় ভাব অন্য মেয়েদের বিক্ষুব্ধ করে। বিদ্বেষ বাড়ায়। এ কথা রাজুবালার চেয়ে আর কে বেশি জানে?

জেনেও সে অন্য মেয়েদের পরোয়া করে না, এইটি আশ্চর্য। কারণ রাজুবালা ডাকসাইটে বাড়িওয়ালী বটে। কিন্তু তার দেহোপজীবিনী জীবনের শেষ বয়সের পারানি কোনও একটি মেয়ের। হাতে নয়। তার নির্ভরতা সকলের ওপর। রাজুবালার নামকরা হাটে নিজেকে বিকিয়ে খাজনা দেওয়া ছাড়া আর তো কোনও সম্পর্ক নেই। বাড়িওয়ালীর হাতে আইন নেই।

তবে? রাজুবালার থেকেও আর একটি বড় শক্তি তা হলে আছে সুবালার মধ্যে। পাপের যে-শক্তি রাজুবালাকে তার শেষ বয়সে ভয় ধরিয়েছে।

সুবালাকে সে দেখল অজানা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন এক শয়তানের প্রতিমূর্তি। যার জেদ ক্ষমতা হিংস্রতা উজ্জ্বলতা কোনও বারণ মানে না। কাউকে মানে না।

আরও লক্ষণীয়, ভামিনী খুড়ি একবারও সুবালার নাম করেনি তার কাছে। অথচ সুবালার প্রতি তার কত টান, কত ভাব ভালবাসা ছিল।

ঘৃণার মধ্যেও বিবাগী হয়ে উঠল অভয়। সে কেন ভাবে সুবালার কথা। তার সামনের জীবনে, তার চলার পথে সুবালা কোনও তুচ্ছতার মধ্যেও পড়বে না। নিমিকে সুবালা হিংসা করত, সে কথা মনে রাখলেও নিমিকে আর কোনওদিন ফিরে পাওয়া যাবে না।

তার চেয়ে শুরু হোক জীবন। এই তো, আর এক বেশে নিমি তার কাছে রয়েছে। তার ছেলে। নিমির প্রতিমূর্তি। আঃ! ও যদি মেয়ে হত? যাকে যুবতী দেখেছিল, সেই নিমির শৈশব দেখতে পেত অভয়। নিজের হাতে মানুষ করত। বড় করত। তারপর একদিন বিয়ের কথা উঠত। তখন আসত এই অভয়েরই মতো কেউ। যার হৃদয়ের অধীশ্বরী হত অভয়ের মেয়ে।

সহসা বুকে বড় ঘা লাগে। ভয় পেয়ে চমকে ওঠে।

কারণ, এ বাড়িতে রোদ-বাতাস পরস্পর মাখামাখি করে যখন নিঃশব্দ ঘোর দুপুরগুলি উতলা হয়ে ওঠে, ঝি ঝি ডাকার সাড়া দিয়ে অন্ধকার নামে কিংবা উঠোনের সজনে গাছের ওপারে মালিপাড়া বস্তির চালা ডিঙিয়ে কপালে চাঁদের টিপ পরে আকাশ রহস্য করে হাসে, তখন সেই ক্ষুব্ধ আশাহত বিস্মিত গলার ফিসফিস শব্দ এখনও শোনা যায়। আমাকে একটু ভালবাসনিকো?…একটু ভালবাসনিকো?

এ কী আশ্চর্য অপরাধে এমন অসহায় মূঢ় করে রেখে গেছে নিমি!

শব্দ শোনা যায়। কিন্তু শুন্যতা ঘোচে না। শুন্যতাটুকু শুধু এক বিচিত্র ব্যাকুলতায় আবর্তিত হতে থাকে।

তখন ছেলেকে বুকের কাছে নিয়ে, মুখটি ধরে দেখতে ইচ্ছে করে। না-ই বা হল মেয়ে। এ ছেলেও নিমি-ই। বসানো নিমির মুখ। নিমির চোখ, নিমির ঠোঁট। এখনই ওর কচি গলার স্বরে, নিমির স্বর চেনা যায়। দুর্জয় রাগ, বর্বরের মতো পা দাপানি, আর ঠোঁট ফুলিয়ে মাথা দোলানি দেখলেই চেনা যায়, ও নিমির ছেলে।

অভয়ের সঙ্গে অপরিচয়ের আড়ষ্টতা গেছে। ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। ভামিনী সুরীন গিনি ছাড়িয়ে, তার জগৎ আর একটি মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। যে-মানুষটির বিশাল কালো চেহারাটিকে ক্ষুদ্র। জীবটি একটুও ভয় করে না আর। বরং অনেক বেশি আধিপত্য খাটায়। কারণ, কেমন করে যেন ও বুঝেছে, ওই বিরাট দেহ শুধু ওর চটকানো ধামসানোতে ধন্য হবার জন্যই আছে। কেমন করে যেন টের পেয়েছে, ওর রাগ সামলে আদর করার জন্য, ওর মনস্তুষ্টির জন্যই বিরাটকায় অভয় বুভুক্ষুর মতো হাত বাড়িয়ে আছে। থাকতেও হবে। না থাকলে কুরুক্ষেত্র। তখন দেখা দেবে দুর্জয় অভিমান। ওইটুকু শিশু, কোনও ছলাকলা ওর আয়ত্তে নেই। কিন্তু এমন করে, উপুড় হয়ে মুখ গুজবে মাটিতে, দেহের সব শক্তি দিয়ে এমন শক্ত হয়ে থাকবে আর জেদ করে ফুলে ফুলে কাঁদবে, তখন ওকে চিনতে একটুও কষ্ট হয় না।

ভামিনী খুড়ি অসহায় রাগে তখন অবুঝ ছেলেকে তার মায়ের খোটা দেয়, মায়ের ছাঁচ নয় খালি, গুণও গিজগিজ করছে ছেলের।

শিশু কী বোঝে কে জানে। মুখের দিকে তাকিয়ে সে কথা শোনে। শুনে, হাত দিয়ে মাটি খামচে দিয়ে কচি গলায় গর্জন করে, গদা! গুগদা!

ওই শব্দের অর্থ কী, কে জানে। কিন্তু সেটা যে প্রতিবাদসূচক, তাতে সন্দেহ নেই।

 ভামিনী খুড়ি বলে, দেখো, দেখো, দেখেছ?

অভয়ের বুকের মধ্যে ব্যথা ও আনন্দের এক উত্তাল ঢেউ ওঠে। ভাবে, এটা ওর রীতি। দশ মাস ধরে মাতৃগর্ভে প্রতিটি রক্ত বিন্দুর সঙ্গে এই রীতি ও আয়ত্ত করেছে। অভয় বুকে তুলে নেয় শিশুকে। ও শান্ত হয়।

আসলে এ শিশু ভালবাসার দাস। এ দাসত্ব ওর নিজের রীতি অনুযায়ী।

অভয় বলেছে, খুড়ি এ ছেলের নাম হবে নিরমল।

নামটা নানান ভাবে শোনা থাকলেও, এ ক্ষেত্রে ভামিনী না জিজ্ঞেস করে পারে না, কেন, এটা কী নাম?

কোনও ঠাকুর দেবতার নাম কি না, সেটাই ভামিনীর বিশেষ অনুসন্ধিৎসা।

–এটা? এটা হল তোমার একটা ভাল নাম। মানে যাতে ময়লা নেইকো। পবিত্র।

ভামিনীর কুঞ্চিত কপালের রেখায় একটি স্মৃতি হাতড়ানো জাল কেঁপে কেঁপে ওঠে। ঠোঁট টিপে এক মুহূর্ত ভেবে বলে, হ্যাঁ, ওর মার নামও তো নিরমলা ছিল। তা অত বড় নাম আর কে ডাকবে। সবাই নিমি নিমি করত।

একটা দীর্ঘশ্বাসের ঢেউয়ে, পুরনো স্মৃতির জোয়ারে অকস্মাৎ টাবুটুবু হয়ে ডুবে যায় ভামিনী। দৃষ্টি হারিয়ে যায় শুন্যে।

অভয় জিজ্ঞেস করে, কী হল খুড়ি?

ভামিনীর স্বর শোনা যায় অনেক বছরের পিছন থেকে, নিমির নামের কথা মনে পড়ছে। তোমার কথা শুনে মনে পড়ছে। গঙ্গার ওপার থেকে এক হাড়জ্বালানে বামুন আসত এ পাড়ায়। শৈলদিদি তো মেয়ে পেয়ে যেন চাঁদ হাতে পেয়েছিল। তবে, লোকে ভুল করেছিল। জানো তো বাবা, এ মালিপাড়াতে শরীরবেচুনি মেয়েমানুষের কলঙ্ক আছে। পেটের ছেলে নাকি খুন করে ফেলে। তা সে তো মিছে নয়। নিজের ছেলে, কোল থেকে শানে ফেলে দিয়েছে, এমনও হয়েছে। সদ্য জন্মানো ছেলে, বাঁচেনি। লোকে শুনেছে কোল থেকে পড়ে মরেছে।

অভয় শিউরে উঠে বলে, কেন খুড়ি?

–এমনিই তো জীবনটা অভয়। ছেলে দিয়ে কী হবে। পুষে, শত্তুর তৈয়ের করা। বড় হয়ে দশটা কথা বলবে। কাছে থেকে মাতাল হবে কি বদমাইশ হবে, ডাকাত হবে কি চোর হবে কে জানে? আর আখের? তাতেও কোনও কাজ দেবে না ছেলে। এখানে একটি মেয়ে থাকলেই সব চেয়ে বড় আখের। ডাকঘরে জমা রাখা টাকার মতন। মেয়েকে শিখিয়ে পড়িয়ে সময় মতো কাজে লাগালেই হল। সব সময় চোখে চোখে থাকবে। এখানে তাই মেয়ের কদর বেশি।

অভয় চুপ করে তাকিয়ে থাকে।

ভামিনী বলে, এখন দিন কাল বদলেছে। সবই যেন খোলাখুলি। লোকে পাপ করে। বে-আইনি কাজ করে। তাও খোলাখুলি। ছেলে বিক্রি আইনে নেই। তা দেখোগে, হাঁসপাতালে, হাতে হাতেই ছেলে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এখন আর মেরে ফেলে না বড় একটা। বিশ পঞ্চাশটা টাকা নিয়ে বরং ফিরে আসে। কিন্তু মেয়ে কেউ বেচবে না এ লাইনে। তাই বলছিলুম শৈলদিদিকে সকলে ভুল বুঝেছেল। ভেবেছেল, অমন একটি টুকটুকে মেয়ে, বড় জবর আখের পেয়ে শৈলবালার খুশি আর ধরে না। লোকে যে কত মিছিমিছি জিনিস ভাবে। শৈলদিদি মেয়েকে মালিপাড়ার ভেতরে ঢুকতে দিতে চাইত না। যা চেয়েছে, তাই করে গেছল। মুখে-ভাতের দিনে, সেও শৈলদিদি ঘটা করেই করেছেল, শৈলদিদির তখনকার বর নাম রেখেছেল নিরমলা। ওপারের সেই বামুনটাকে শৈলদিদি পাকা খাবার খাইয়েছেল। মিনসেটা বিটকেল হেসে বলেছেল, খাসা নাম রেখেছ শৈল। তোমার মেয়ের নাম নিরমলা হবে না তো আর কার মেয়ের নাম হবে? বড় হলে, মালিপাড়ায় এ মেয়ে নামের মজ্জাদা রাখবে বটে। মিনসের হাসিটা খারাপ লেগেছেল, কথাগুলোনের মানে বুঝতে পারিনিকো। তোমার কথায় আজ বুঝতে পারলুম, মিনসে ঠাট্টা করেছেল। করলে কী হবে। বামুনের কথা মিথ্যে হয়েছে।

বলে একটু চুপ করে থেকে আবার বলে ভামিনী, বেশ নাম রেখেছ অভয়। ওটাকে এবার থেকে আমি নিমে বলে ডাকব।

নিমে বলে ডাকবে?

 অভয় অস্বাভাবিক গলায় হেসে ওঠে।

নাঃ, সুবালার কথা মনে পড়ে লাভ কী? সে ভেসে যাক তার আপন স্রোতে। তাকে ঘৃণা করে অষ্টপ্রহর নিজের বুকে কাঁটা জাগিয়ে রেখে শুধু নিজেকে ছোট করা। বিশ্বসংসারে ঘৃণা করবার মতো কত বড় পাপ এবং অনিয়ম মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সুবালাকে সে তার মনের কোনও তুচ্ছতার মধ্যেই রাখবে না।

জীবনের টানা পোড়েনে তার বৃহৎ জগৎ রয়েছে বাইরে। যেখানে তার শত শত বন্ধু, অনাথ, গণেশবাবুরা রয়েছেন। গানের জন্য ডাক আসবে তার। কত বড় কাজ বাকি। এখানে রয়েছে।

প্রতিবেশীরা। খুড়ো খুড়ি আর নিরমল, নিমে।

.

০৪.

আর দেরি নয়। আর অনিশ্চিত ধান্ধা নয়। নিশ্চিত পদক্ষেপে প্রত্যক্ষ কিছু চাই। সুরীন কাকার ঘাড় থেকে নামাটা সবার আগে দরকার। পুরুষের ওটা সবচেয়ে বড় লজ্জা।

তাই হাতের কাছে যেটা সবচেয়ে সহজ, সেটাই তুলে নিল অভয়। সে দোকান খুলে বসল। মালিপাড়ার অভ্যন্তরে। বারোবাসরের তল্লাটে নয়। বিপরীত দিকে, মালিপাড়ার গৃহস্থ অংশের রাস্তা যেখানে বাঁক নিয়ে, দুমুখী হয়েছে গঙ্গার ঘাট ও বাজারের দিকে, সেখানেই ঘর পাওয়া গেল।

অল্প-স্বল্প জিনিসপত্র এনে মুদিদোকান খোলা হল। পূজো পার্বণের কোনও ত্রুটি রইল না। দিনক্ষণ ফাঁকি গেল না ভামিনীর চোখ থেকে। আর অভয়ের মনে হল, এ দোকানটি খুলে বসার জন্যই সে যেন এতদিন মুখিয়ে ছিল। তার অত্যুৎসাহে বাকি সকলের উৎসাহ চাপা পড়ে গেল প্রায়।

কেবল নবপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধিদাতাই বোধহয় তার শুড় বাঁকাল। ভু কোঁচকাল। ছোট ছোট চোখে অদ্ভুত হেসে বসে রইল টাটে।

জীবন চৌধুরীও হাসলেন। বললেন, তা মন্দ করনি। দেখি, কে টানে আর কার টান বেশি।

 কথাটা অভয় বুঝল না। কিন্তু এটা বুঝল, অনাথ খুড়োর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠেছে।

 দোকান বেশ জমে উঠল অভয়ের।

 হিসেবের কড়িতে কতখানি ব্যবসা জমে উঠল, সে হিসেব দেখবার অবসর রইল না। খরিদ্দার মেলাই। বেচা-কেনা চলল ভাল। দোকানের ভিড় সহজে কাটে না। লেনাদেনায় পয়সাটা অনবরত হাতে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়। দ্রব্যগুণ বলে একটা কথা আছে। নতুন একটা ছন্দ যেন বেজে উঠল। মশগুল হয়ে রইল অভয়।

সুরীন একটি লেখা এনে টাঙিয়ে দিয়েছে দোকানে, ধার চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। অভয় বলল, হা সব দোকানেই ওগুলোন লটকানো থাকে দেখেছি। দোকান করতে গেলে ওগুলোন টাঙাতে হয়, না?

সুরীন বলল, আলবত! তা নইলে পারবে কেন? যে সে এসে লুটেপুটে খাবে।

অভয় কী বুঝল, কে জানে। সে বলে উঠল, আসুক না কেউ একবার লুটেপুটে খেতে। দেখি একবার তার কেরামতিখানা।

সুরীনের মুখে তেমন তারিফ করার লক্ষণ দেখা গেল না।

মালিপাড়ার ভিতরে এতদিন কোনও দোকান ছিল না। সবাইকেই বড় রাস্তায় যেতে হত, না হয়তো বাজারে। এখন সকলেই আসে অভয়ের দোকানে। বড় রাস্তায় কিংবা বাজারে মেয়েদের যাতায়াতের অসুবিধে ছিল। বারোবাসরের মেয়েদের নয়–গৃহস্থদেরই। দৈনন্দিন জীবনধারণের টানে না গিয়ে উপায় ছিল না।

এখন পাড়ার মুখে একটি দোকান পেয়ে সব বেজায় খুশি। কেউ আসে নিমির বরের দোকানে। কেউ শৈলীর জামায়ের দোকানে।

সকালের প্রথম খদ্দেরদের মধ্যে ছোট ছোট ছেলেমেয়ের ভিড়ই বেশি। নাকে পোঁটা, উশকো-খুশকো চুল, বগলে তেলের শিশিওয়ালাদের হাঁকে-ডাকেই সকালবেলাটা জমে। তেল মশলার চেয়েও বাড়তি আধা পয়সার গুলি-লজেন্সের তাগাদাই বেশি। তার সঙ্গে রাংতা অথবা সাবানের ছবির ফাউটাও কম নয়। এদের মধ্যে যারা দু একজন চুপচাপ, বুঝতে হবে, তাদের ধারে নিতে পাঠানো হয়েছে। ভাগ্য তাদের প্রসন্ন থাকে সেদিনই, যেদিন ভামিনী অথবা গিনি দোকানে না থাকে। তা হলে, এক কথায় সওদা মেলে। অভয় বলে, তোর মাকে বলিস, পয়সাটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দিতে। নইলে দোকান চলবে না।

কিন্তু তার অভিভাবক সুরীনকাকার নির্দেশ দেওয়া আছে ভামিনীকে, একলা অভয় সব পেরে ওঠে না! কে কোনখান দিয়ে কোন জিনিসটা টেনে তুলে নেবে। তুমি না হয় গিনি, যখনই সময় পাবে, মাঝে মধ্যে গিয়ে দাঁড়াবে।

ভামিনী খুড়ি সেটা প্রায় কড়ায়গণ্ডায় মেনে চলবার চেষ্টা করে। ছেলে কোলে নিয়ে হয় ভামিনী নিজে, না হয় গিনি প্রায় সদাজাগ্রত প্রহরীর মতো দোকানে উপস্থিত থাকে। তখন আর এক কথায়। নয়। অভয় দু কথা বলে। ধমকায়, রোজ ধার চলবে না। এ কী দানছত্তর খুলে বসেছি? কত পাওনা হয়েছে জানিস? আরে বাবা! সাড়ে পনর আনা? আর তো দেওয়া যাবে না।

ভামিনী থাকলে বলে, তাই বা দিয়েছ কেন? এই যে সে-দিনে শুনলুম ওর ছ-আনা বাকি, আর ধার দেবে না? এর মধ্যে সাড়ে পনের আনা হল কী করে?

অভয় মুখ বিকৃত করে বলে, এরা লোক বড় খারাপ দেখছি। দেব দেব করে দেয় না। যদি বড় রাস্তার দোকানে যেতে হত, তা হলে?

কিন্তু ততক্ষণে জিনিস দেওয়া তার শুরু হয়ে যায়। বলে, আজ দিলুম, এই শেষ। এর পরে শোধ না হলে, আর পাই পয়সার কুটোগাছটিও পাবে না।

তখন আর অভয় কোনওদিকে ফিরে তাকায় না। আর একজনকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ভামিনী বলে, তবেই তোমার দ্বারা ব্যবসা হয়েছে। এ ঝাড়কে তো চেনো না। দুদিনে লাটে উঠিয়ে ছাড়বে।

অভয় বলে, ওঠালেই হল আর কি। বাড়িতে গিয়ে হামলা করব না?

 কিন্তু ভামিনী তাতে একটুও আশ্বস্ত হয় না। চোখে মুখে অবিশ্বাস ফুটে ওঠে। আর গিনি থাকলে সরাসরি রেগে ওঠে। বলে, সেই ধার দিলে অভয়দা?

চোখ পাকিয়ে তাকায় গিনি ধারের খদ্দেরের দিকে। বলে, তাকিয়ে দেখছিস কী রে মুখপোড়া? রোজ রোজ ধার নিতে আসতে লজ্জা করে না? যা ভাগ।

ভাগে, কিন্তু জিনিস নিয়ে। অভয় বলে, একবার দিলুম, আর দেব না, দেখে নিয়ো।

গিনি বলে, আমি গিয়ে তোমার খুড়িকে বলে দেব।

অভয় ঘাবড়ে উঠে বলে, দোহাই গিনি, খুড়িকে আর বোলো না।

তখন গিনি টিপে টিপে হাসে।

এর পরেই আসে বড়রা। অভয়ের মতে, সব শাশুড়িননদের দল। পাড়ার গেজেট এখন অভয়ের দোকানেই বসে। পাড়া এবং ঘরের সব সংবাদ এখন এখানেই পাওয়া যায়। গল্প বেশি ওরাই বলে, যাদের ধারে কাটতে হয়। কোনখান দিয়ে, কী আলোচনার মধ্যে যে এক সময় ধার দেওয়া হয়ে যায়, অভয় নিজেই টের পায় না। ব্যাপারটা প্রায় একটা স্নায়ু যুদ্ধের মতো। একজন ভাবে, কোনও রকমেই ধার দেব না। আর একজন ভাবে, যেমন করে তোক নিতেই হবে। নইলে চলবে না। রক্ষে এই যে, চোর কেউ নয়। অভয়ও পুলিশ নয়। একটা খেলা যেন।

শেষ বিচারে দেখা যায়, তারই জয়, যে বলেছে ছেলেটা আসবে এখুনি কারখানা ঠেঙিয়ে, বউটা ডাল ফুটিয়ে বসে আছে। এক ফোঁটা তেল নেই, একটি লঙ্কা মশলা নেই যে একটু ফোড়ন দিয়ে সাঁতলে দেবে। আজকের দিনটাও দাও জামাই।

অবশ্য, ভামিনী কিংবা গিনি থাকলে ঘরের অভাবের কথা কেউ বড় একটা তোলে না। জাদু জানে তারা, যারা ভামিনী আর গিনির কঠিন প্রহরী হৃদয় জয় করে চলে যায়।

সন্ধ্যার দিকটা প্রায় নিরঙ্কুশ পুরুষদের আসর। অভয়ের প্রায়ই রাত্রিটা ছুটি থাকে। সে কোনওদিন যায় ইউনিয়ন অফিসে। কোনওদিন দোকানেই থেকে যায়। সুরীন থাকে দোকান বন্ধ পর্যন্ত। সেজন্যেই সন্ধ্যাবেলাটা ধারে একেবারে বিক্রি বন্ধ।

সন্ধ্যাবেলা ছুটি মানেই গানের আসর। আর সেটা ইউনিয়ন অফিসেই। কিন্তু জেল থেকে ফেরার পর মাস তিনেকের মতো সবাই যেন অভয়কে ভুলে ছিল। দোকান খোলার পরেই গানের টানাটানি বাড়ল চারদিকে। খেয়াল নেই যে, টানাটানি ছিলই। তার নিজেরই সাড়া ছিল না। এখন তার নিজের বিশ্বাস, পেটের ভাবনা আর ভাবতে হবে না। দানা জোগাবার জন্যে দোকানটি একটি অক্ষয় যন্ত্র হিসেবে পাওয়া গেছে। ভাবল, যন্ত্রটা একবার যখন চলেছে, ওটার আর মৃত্যু নেই। সে তার নিজের স্রোতে চলবে।

শুধু নিজের আড্ডার নয়। ডাক এল তার দূর দূরান্ত থেকে। গঙ্গার এপারে ওপারে, কল কারখানার তল্লাটে তার গানের আসর প্রায় প্রত্যহ। সর্বত্রই কবি গান নয়। একক গানের আসরও বসে।

কোথাও কোথাও তার গান শ্লোগান হয়ে উঠল মজুরদের।

ওরে ভাই শোনরে মজুরদল।
ঐক্যবদ্ধ হও, নয় তো যাবে রসাতল।

গানের চেয়েও এ ধরনের কলি, গানের মধ্যে হাততালি দিয়ে ছড়া হিসেবেই বেশি বলে অভয়। সমসাময়িক ঘটনা, বর্তমান অবস্থার উপরে সে গান বাঁধল। তার উর্ধে নয়। সবাই গরম তেলেভাজার মতো লুফে নিতে লাগল তাকে। খবরের কাগজকে কেন্দ্র করে, ব্যঙ্গ বিদ্রূপের ছড়া কেটে বেড়াতে লাগল সে। সরকারি কেলেঙ্কারির কোনও সংবাদ পেলে তো কথাই নেই। যেদিন যেটা পায়, সেদিন সেইটিই তার গানের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

তাতে একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যায়। বিক্ষোভ সর্বত্র। ঘৃণা এবং বিদ্রূপ সকলের বুকে ও মনে। পৌরাণিক উপাখ্যানের চেয়ে সমসাময়িক বিষয়ে লোকে বেশি মেতে ওঠে। অভয়ের কথা ও গানে তাদের নিজস্ব অভিব্যক্তির রূপ দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সে যেখানে যায়, সেখানেই তার জয়।

এই প্রত্যহের পাঁচালির মধ্যে একটি বিষয় অভয় কখনও ভুলতে পারে না। যে আন্দোলনে সে জেলে গিয়েছিল, সে আন্দোলনের ভিতরের দুর্বলতা তাকে ভাবায়। সে দুর্বলতা হল, মানুষের। ভয়। ভয়, কারণ তারা ঐক্যবদ্ধ নয়। ঐক্যবদ্ধ নয়, কারণ তাদের অনেক সংশয় অবিশ্বাস। সংশয়। এবং অবিশ্বাসের কারণ, তারা ব্যর্থ হয়েছে অনেক বার।

কারণগুলি সব একটার সঙ্গে আর একটা জড়ানো। তাদের আলাদা করা যায় না। শেষ পর্যন্ত সব তর্কের ওপরে থাকে ঐক্য। একতা। তাই সব গানের শেষেই সেই পুরনো উপকথাটা তার উপসংহার। বুড়ো বাপ বলে, তোরা একত্র থাক। এই দ্যাখ, একটা লাঠি ভাঙে, কিন্তু চার লাঠি একত্র করলে ভাঙে না। ভাষার চেয়ে ভাবের জোয়ার বেশি অভয়ের। কথা সুন্দর করার থেকে, বলাটা সারতে চায় আগে। বলে,

ও ভাই কথা শোনো
ছাড় দু দু মনো,
চেয়ে দ্যাখ আপন বল।
ভাই গোছ বেঁধে চল্।

 সেই গত আন্দোলনের মতো যেন একটা উচ্ছ্বাসের জোয়ার এল। বিকেল থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত সময়টা আর নিজের বলে রইল না অভয়ের। অথচ সামনে কোনও আন্দোলনের প্রস্তুতি নেই। আপনি আপনি যেন একটি তরঙ্গ কোনও অদৃশ্য থেকে ফেনিলোচ্ছল হয়ে উঠতে লাগল।

অভয় নাচ আরম্ভ করল আসরে। অভিনয় করতে শুরু করল একলা একলা। যেন আপন রঙ্গে আত্মভোলা অভয়। এ এক বিচিত্র আত্মসম্মোহন, কীর্তনের আসরের ভাবোল্লাসের মত্ততা।

সকালবেলার দিকে দোকানের কেনাবেচা সারে নম নম করে। কিন্তু ভাবখানা করে যেন, ব্যবসাকে সে একটু এদিক ওদিক হতে দেবে না। তবে, সুরীন কিংবা ভামিনী দোকানের কথা তুললেই সে আর দশটা কথার তালে তালে এড়িয়ে যায়। বলে, আরে দোকানের কথা কী বলছ খুড়ি। ও দোকানকে কত বড় করে ফাঁদব, তুমি জানো না।

কিন্তু শান্তি ছিল না অভয়ের মনে। যারা তার সবচেয়ে আপন, যারা তাকে একদিন দশজনের সামনে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, সেই অনাথ গণেশবাবুরা যেন দূরে সরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে একটি কথা শুনে অভয় থমকে যায়। কারা নাকি বলছে, গুছিয়ে নিচ্ছে অভয়। চারদিকে কবি বলে নাম করেছে। জেলে গিয়ে দেশসেবক হয়েছে। বাজার যখন গরম, তখন সে বসেছে দোকান খুলে। ও সব চালাকি বুঝতে লোকের নাকি বেশিদিন লাগে না।

তাই নাকি? কে বলে ভাই–এ কথাগুলো?

-কেন, অনাথই বলে। গণেশবাবু বলেন।

 অথচ সামনে দাঁড়িয়ে কোনওদিন এ অভিযোগ কেউ করে না। বুকের মধ্যে রাগ ফুঁসতে থাকে। টনটনিয়ে ওঠে। গণেশবাবু নামটা সম্প্রতি একটা অশুভ ছায়ার মতো হয়ে উঠেছে। কিন্তু অনাথ-খুড়ো? সে কেন এড়িয়ে চলে? সে কেমন করে ওসব কথা বলে? আগের মতো তেমন অন্তরঙ্গ ভাবে মেশে না অনাথ। হাসে না। কিন্তু সামনাসামনি বকেঝকে গাল দিয়ে, কোনও অভিযোগও করে না।

এমনি কি এ সংসারটার নিয়ম? সোজা পথে কি সে কখনও চলে না? কেন? এত জটিল কুটিল সর্পিল কেন প্রতি পায়ে পায়ে?

তখন আর প্রত্যহের পাঁচালি গাইতে ভাল লাগে না। শুধু ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে ছড়া কেটে নাচতে ইচ্ছা করে না অনৈক্যতার আপন ঘরে। অনাথখুড়োকে নিয়ে সেটি তার প্রাণেরই ঘর। ঐক্যের কথা সে কাকে বলবে?

তবু সে নীরব থাকতে পারে না। অবহেলা করতে পারে না আর দশজনকে। নিজের জীবনের কথা ভাবলে মনে হয়, সময়ের প্রতীক্ষা করতে হবে। সময় তার চাকার ঘায়ে, একটা নিষ্ঠুর বেগে, এই বদ্ধ অবোধ দরজা ভাঙবে। সব জটিলতার নিরসন করবে।

এমনি সময় হঠাৎ এল কলকাতার চিঠি। পশ্চিমবঙ্গের সকল মানুষ তার কবিগান শুনবে। আরও লোক আসবে দেশ-বিদেশ থেকে। সারা দেশ থেকে আসবে অনেক কবিয়াল। পশ্চিমবঙ্গ লোক শিল্প সম্মেলন তাকে নিমন্ত্রণ করেছে। চিঠি এসেছে ইংরেজিতে।

চিঠিটি নিয়ে অভয় প্রথম গেল গণেশের কাছে। তাকে জিজ্ঞেস করল, কী করা উচিত?

গণেশ গম্ভীর গলায় বলল, এতে আমাদের কোনও লাভ নেই। আপনি ইচ্ছে করলে যেতে পারেন। ভাল গাইলে আপনার নাম হবে, এ পর্যন্ত। তবে এ সব হচ্ছে কলকাতার কিছু বড়লোকের ফ্যাশান, কোনও লাভ নেই।

কিন্তু অভয় স্থির করল, সে যাবে।

পশ্চিমবঙ্গ লোক-শিল্প সম্মেলনে যাওয়া স্থির করেও অভয়ের মনটা আড়ষ্ট হয়েই রইল। আসলে গণেশ যেহেতু আপত্তি করেছে, তৎক্ষণাৎ সে বিপরীত করণীয়টাই স্থির করেছে। কারণ গণেশকে সে আর বিশ্বাস করে না। গণেশ তাকে অকারণ বিদ্রূপ করেছে। হয়তো জেলে তার ত্রুটিবিচ্যুতি কিছু ঘটেছে। গণেশ তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। নিষ্ঠুর উপহাস করেছে তার সারল্যকে। কিছু বোঝাবার চেয়ে, সমালোচনা করেছে বেশি। সেটা যে গণেশের বোঝাবার অক্ষমতা, এটা অনুভব করেছে অভয়। কেন যেন বারে বারে তার মনে হয়েছে, গণেশের ভিতরে কোথায় একটি দূর্বল নীচ মনের মানুষ আছে। কিন্তু চুল চিরে তার ব্যাখ্যা করতে পারে না অভয়। তাই মুখ ফুটে কিছু বলবার অধিকার সে কখনওই অর্জন করতে পারে না। অথচ গণেশকে সে শ্রদ্ধা করেছে। তার অনুগত থাকতে চেয়েছে সব সময়। কারণ গণেশ তার নেতা। সে বিদ্বান, বুদ্ধিমান। কিন্তু গণেশ যেন অভয়কে তার সমকক্ষ ভেবেছে। তাই ভালবাসা থেকে অভয় বঞ্চিত।

বন্ধুত্ব যেখানে সহযোদ্ধার বন্ধন, সেখানে কি ভালবাসার দাম নেই? কিন্তু ভালবাসা যেখানে নেই, অভয়ের বিচারে সেখানে বন্ধুত্ব অচল। শামুক বন্দি মনের সঙ্গে জীবনের বাইরের কারবার চলে। ভিতরের লেন দেন অসম্ভব।

গণেশের কথাগুলি যেন লেবার-অফিসারের মতো। কোম্পানির লাভ থাক না থাক, আইন নেই যে সে একজন লোককে কোনও একটা নিজের অনিচ্ছার বিষয়ে আটক রাখতে পারে। তাই সম্মেলনে যাবার অনুমতি দিয়েছে। উপায় থাকলে কখনওই দিত না।

প্রাণ-খোলা কথা বলেনি গণেশ। রাগ চেপে বলেছে, সম্মেলনটা শুধু কলকাতার বড়লোকের খেয়াল। কিন্তু অভয় কলকাতার কয়েকজন বড়লোকের খেয়াল মেটাতে যেতে চায় না। মন-স্থির করেও তাই থমকে গেল সে। কী করবে ভেবে পেল না। অনাথ খুড়োকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। গণেশ যা বলেছে, সে তাই বলবে।

সংবাদ শুনে ইউনিয়নের মিস্তিরি বন্ধুরা সকলেই খুশি। বলল, আমাদের মান রাখা চাই অভয়। কিন্তু দাবির চেয়ে বিশ্বাস তাদের বেশি। তারা নিঃসন্দেহ, অভয় ফিরবে নতুন দিগ্বিজয় করে।

পরদিন সন্ধ্যাবেলা তবু একবার অনাথকে না বলে পারল না। জানে, অনাথ নিজে যেচে বলবে না কিছু। যদিও সে খবর পেয়েছে নিশ্চয়। সুরীন তো ইতিমধ্যে কোথাও জানাতে বাকি রাখেনি। তবে অভয়ের নিজের থেকে একবার এমনিতেও বলা উচিত।

জায়গার অভাব বলে ইউনিয়ন অফিস একাধারে শ্রমিকদের ক্লাব ও প্রাত্যহিক আলোচনার আসর। একদিকে যখন দরখাস্ত লেখা হতে থাকে, অন্যদিকে তখন গানের আসরও বসে যায়। সম্প্রতি আর একজন জুটেছে। এক বিহারি মুসলমান তাঁতি। সেও কবিয়াল। সে একা-একাই মুশেয়ারা আসর বসায়। অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে তার আদর বেশি। বিশেষ করে উর্দু জানা লোকদের কাছে সে রীতিমত সম্মানিত। কিন্তু তাকে প্রথম শুড়িখানা থেকে আবিষ্কার করেছিল অনাথখুড়ো।

নাম তার ইদ্রিস। শুড়িখানাই ছিল ইদ্রিসের গানের আসর। তখন সে ছিল অবিশ্বাসী, বিবাগী মানুষ।

অনাথের কাছেই শুনেছে অভয়, ইদ্রিস বিশ্বাস করত তিনটি জিনিস। ঘৃণ্য একটা তাঁতির নোকরি কারণ, পেটটা চালাতেই হবে। আর বিলাসপুরি কামিন–যেমন তেমন মেয়ে নয় তারা। দেহের এবং হাসির স্পর্ধায় যারা চটকল বাজারের অনুরাগের রক্ত কেনা-বেচা করে। যারা নিজেরা মাতে এবং মাতায়। মধ্য-ভারতের মাটি থেকে ওপড়ানো জীবনের শিকড়ের সঙ্গে যাদের মাটির তৃষ্ণা হয়েছে মরীচিকা। সারাটি দেহ নিয়ে প্রবাসের প্রত্যহ বেঁচে থাকা ছাড়া সব বিশ্বাস যাদের ছিন্ন হয়েছে। কাজ, ভোগ এবং মৃত্যুর সারল্যে যারা কুন্তির মতো সুর্য-উপাসনা ব্যতীতই, এক জনপদ থেকে আর এক জনপদে চলে যায় পরিচয়হীন সন্তান ফেলে। মায়ের নয়, শুধু মাত্র জীবনের অনুমতিতেই যারা পঞ্চ-স্বামীর সহবাসে লিপ্ত। ইদ্রিস যে সেই মেয়েদের গোলাম, এটা তার। তখনকার গানেই প্রচারিত। আর দারু। শরাব! যার আর এক নাম হারাম। ঘুরে ফিরে সেই কাজ, ভোগ এবং মৃত্যু। এর মধ্যে অবিশ্বাস্য যেটা, সেটা ইদ্রিসের সৃষ্টির ক্ষমতা। ওটা স্বতোৎসারিত অপ্রতিরোধ্য।

ঝাঁকড়া-চুলো রোগা লম্বা হাড়-চওড়া এই ইদ্রিসকে একদিন অনাথ মাতাল অবস্থায় নর্দমা থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তার ডেরায়। সেই শুরু। জাহান্নাম ছাড়া যার বুলি ছিল না, দোজখ বিনা যে গন্তব্য চিনত না, এখন সে বলে, অয় দোস্ত! চল বেহেস্ত, লড় লে বেহেস্ত। স্বর্গ আছে এবং সেটা লড়ে নেবার জায়গা, এটা এখন তার বিশ্বাস। আর সে স্বর্গ যে সুস্থ জীবনের প্রতিষ্ঠা, লড়াই যে একটা চেতনা এবং সাহসের সাধনা এটাই তার বচন।

এখানে ইদ্রিসের সংসার নেই। দেশে আছে বাপ মা ভাই বোন। এখন সে দেশে কিছু টাকা পাঠায়। যদিও হারাম শরাবটা পুরোপুরি ছাড়তে পারেনি। এখনও মাঝে মাঝে বিলাসপুরি কামিনের পিছু পিছু উধাও হয়ে যায়। কিন্তু পরিবর্তন লক্ষণীয়। শরাব খাবার সময় পাওয়া যায় না, কারণ একলা হবার অবসর নেই। সোনিয়া নামে যে বিলাসপুরি মেয়েটি কিছুদিন আগে নিজে থেকে এসে ইউনিয়নের মেম্বার হয়েছে, ইদ্রিসের উধাও হবার দরজাগুলি সব আড়াল পড়েছে তার হাতে।

তবে ইউনিয়নের ইজ্জত আগে। দশ রকম কথা বলে, ইউনিয়নের দুর্নাম দেবার লোকের অভাব নেই। অনাথের ভয় ছিল তাই সোনিয়াকে নিয়ে! সোনিয়ার কোথাও যাবার জায়গা নেই বলে ইদ্রিসের পিছনে পিছনে সে ইউনিয়নে এসে উঠেছে। সে যদি রোজ একলা আসতে আরম্ভ করত, তা হলে রক্ষে ছিল না। রটে যেত অনাথদের ইউনিয়নটা অওরত নিয়ে ফুর্তি করবার আসর হয়ে উঠেছে। তাই নির্দেশ ছিল, মেয়েদের সঙ্গে ছাড়া সোনিয়া একলা কোনওদিন আসবে না। এমনকী ইদ্রিসকে ডাকতেও নয়।

সোনিয়া সে নির্দেশ মেনে নিয়েছে। তাতে একটি বিষয়ে প্রমাণ হতে চলেছে। কাজ ভোগ। মৃত্যুর ঊর্ধে নতুন বিশ্বাসের আশ্বাস। ইদ্রিসের জীবনে শৃঙ্খলা এবং জীবন-যাপনের একটি নির্দিষ্ট নিয়মের আবিভাব।

এই ইদ্রিসের সঙ্গে অভয়ের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। কিন্তু একটু রেষারেষিও আছে। কিংবা সেটা রেষারেষি নয়, সৃষ্টির প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বোঝা যায়, তাদের ভাষা যদি এক হত, তবে কবির লড়াই রোজ এখানেই জমত।

এই জন্যেই অনাথখুড়ো বড়। সে ইদ্রিসের আবিষ্কতা। এই জন্যেই অনাথ নেতা। গণেশের সঙ্গে এইখানে অনাথের তফাত। এই অনাথ খুড়োকে কখনও ছোট ভাবতে পারবে না অভয়। তার বুকের মধ্যে মোচড়ায়, যখন সে দেখে, অনাথ তার সঙ্গে গম্ভীর হয়ে কথা বলছে। রাগে তার হাত-পা শক্ত হয়ে ওঠে। ইচ্ছে হয়, দুহাত দিয়ে অনাথের সর্বাঙ্গ ঝাঁকিয়ে নাড়িয়ে, একটা নোংরা মন্ত্রের আচ্ছন্নতা থেকে আসল মানুষটিকে বার করে নেয়। অনাথ বলুক, কী অপরাধ অভয়ের। যেন কী এক অকথিত গোপন অপরাধের বেড়াজালে অভয়কে সে বন্দি করে রেখেছে। অথচ অনাথ তার কোনও কারণ দেখাতে পারে না। ব্যাখ্যা করতে পারে না। পরের বুদ্ধি দিয়ে বিচার করছে। সেটা আরও অসহনীয়। গণেশের কেতাবি বিদ্যার কাছে দুর্বোধ্য বুদ্ধি ধার করে আজ অভয়কে বিচার করছে সে। অভয় অপরাধ করলে যার চুলের মুঠি ধরে শাসন করবার অধিকার রয়েছে, সে ভালবাসাটুকু কোথায় গেল? কেন যাবে, কী অপরাধে?

আজও ইদ্রিসের গানের আসর বসেছে। প্রকাণ্ড ঘরটায় একটি মাত্র হ্যারিকেন। নড়বড়ে টেবিলের ওপর, ফাটা চিমনি, কম্পিত শিখা, কালি ছড়ানো হ্যারিকেনটা এর ওর ধাক্কায় অনবরতই দোলে। সুদীর্ঘ গুহার মতো জানালাহীন ঘরটার কাঁচা মেঝেয় চাটাই পাতা। বিড়ির ধোঁয়ায়, খৈনির। ঝাঁজে বাতাস ভারী আর ঝাঁজালো।

লেখাপড়াজানা বাঙালি কর্মী, নিরীহ রোগা মানুষ সকলের বিজয়দাদার উশকো-খুশকো মাথাটি প্রায় হ্যারিকেনের সামনেই ঝুঁকে থাকে। সন্ধে থেকে তার দরখাস্ত লেখা কাজ। সম্মিলিত এবং ব্যক্তির, যার যত রকম অভাব অভিযোগ তাকে দিয়ে ইংরেজিতে লিখিয়ে নেওয়া হয়।

তার পাশেই বসেছিল অনাথ। অভয়কে দেখে কয়েকজন হই হই করে উঠল। ইদ্রিসও ডাকল গান গাইবার জন্যে।

কিন্তু অভয় গিয়ে দাঁড়াল অনাথের কাছে। অনাথ তাকিয়েছিল অভয়ের দিকেই। চোখে চোখ পড়তে সে মুখ ফিরিয়ে নিল।

অভয় বলল, খুড়ো একটা কথা ছিল।

অনাথ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, বলো।

 অভয়ের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। এক মুহূর্ত সে কথা বলতে পারল না। ভাবল, বলবে কি না। তারপরে বলল, একটু বাইরে চলো, কথা বলি।

যেন অনিচ্ছায় উঠল অনাথ। অভয়ের সঙ্গে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। অভয় সবে উচ্চারণ করেছে, কলকাতায়

অনাথ বলে উঠল, শুনেছি, মস্ত এক নামকরা জায়গায় তোমার ডাক পড়েছে।

রাগে এবং দুঃখে অভয়ের ভাবনা এলোমেলো হয়ে গেল। সে তাকাল অনাথের চোখে। অনাথ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। যেন বিব্রত হয়ে উঠল সে। অস্বস্তির ছায়া তার চোখে। সবটাই যেন জোর করে করছে।

অভয় বলল, যাব?

অনাথ বলল, না যাবার কী আছে। তোমার আরও নাম-ডাক হবে।

-সেটা কি দোষের?

 –দোষ কেন হবে।

–তবে?

তবে কী?

–তুমি আমার সঙ্গে এ রকম করছ কেন? এই মন ছাড়া-ছাড়া কথা, গুম খেয়ে যাওয়া। আমি কী করেছি?

সামনা সামনি, এমন স্পষ্ট করে আর কোনওদিন এ কথা জিজ্ঞেস করেনি। অস্বস্তিতে অনাথ হেসে ফেলল। হাসিটা তেমনি করুণ, সেই পুরনো কাছের মানুষটার মতো। বলল, কী আবার করবে।

অভয় বলল, তোমার ভাব দেখে মনে হয় যেন কোনও দোষ করেছি!

অনাথ আবার গম্ভীর হল। বলল, কই, দোষের কথা কিছু বলিনি তো। আর দোষ যদি কিছু হয়, তবে তা চিরদিন ঢাকা থাকবে না। জানাজানি হবেই।

অভয়ের মস্তিষ্কের উত্তাপ বাড়ল। বলল, তা হলে অপরাধ কিছু করেছি বলে?

-বললাম তো, অপরাধ করলে একদিন সবাই বলবে।

–কিন্তু, তোমার ভাব দেখে তো মনে হয়, যেন আমি চুরির দায়ে ধরা পড়েছি। তোমাকে বলতে হবে কী হয়েছে।

অনাথ তাকাল একবার অভয়ের দিকে। অভয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। চোখে তার রক্ত দেখা দিয়েছে।

অনাথের মতো মানুষের এ ক্ষেত্রে রেগে ওঠাই উচিত ছিল। কিন্তু সে যেন কেমন নির্জীবের মতো বলল, আজ থাক, যদি কিছু বলবার হয়, আর একদিন বলব।

অভয় বলে উঠল, তোমার ভাব দেখে আমার ঘেন্না করছে। গালে হাত দিয়ে বসে বসে মিছে কথা সাজাবে ভাবছ। তা সাজিয়ে।

কী বললি?

অনাথ মাথা তুলল। কঠিন হয়ে উঠল তার মুখ।

অভয় তার শেষ সীমায় পৌঁচেছে। ঘৃণায় এবং বিদ্রুপে সে দপদপিয়ে উঠল। বলল, তোমার মতো বাঁকা কথা তো বলিনি যে বুঝতে পারছ না। ন্যাকা নাকি? বলছি, তুমি ভয় পাচ্ছ সত্যি কথা বলতে।

ভয় পাচ্ছি?

–হ্যাঁ, তাই ঢাক-ঢাক গুড়গুড়। আমি দোকান করেছি, আখের গুছিয়ে নিচ্ছি, গান করে আর জেল খাটার দৌলতে, এ কথা তুমি বলনি লোকের কাছে?

অনাথ যেন সহসা কথা খুঁজে পেল না। কেমন একটা সঙ্কোচ তাকে নিভিয়ে দিতে লাগল। সে বলল, আমি বলিনি।

তবে গণেশবাবু বলেছে?

 –জানি না। তবে লোকেরা বলে।

 -কোন লোকেরা?

–তোমারই বন্ধু-বান্ধব।

 বোধহয় অনাথ বলেই, অভয়ের উত্তেজনা হাতে পায়ে রুদ্র হয়ে উঠছে না। সে চাপা গলায় গর্জে উঠল, বন্ধু নয়, যারা বলে, তাদের আমি শালা বলি, বুঝলে?

অনাথ ততক্ষণে ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে।

অভয় আবার বলে উঠল, যারা বলে মানুষের রক্ত তাদের গায়ে নেই। তাদের বলি আমি–শোরের বাচ্ছা!

অনাথ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, কাকে গাল দিচ্ছিস?

অভয় এগিয়ে বলল, সেই কুত্তাদের, যারা মিছে দুর্নাম দেয়।

গলার স্বর আর নিচু রইল না। ইতিমধ্যেই কয়েকজন বেরিয়ে এসে ভিড় করেছে। কৌতূহলীরা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে সকলেই।

কিন্তু অভয় আর দাঁড়াল না। সে সন্ধ্যাবেলার পথের ভিড়ে মিশিয়ে দিল নিজেকে। লোকের কাছ থেকে, নিজের কাছ থেকে পালাতে চাইল সে। রাগের সঙ্গে সঙ্গেই অন্যায় বোধটা তাকে রেহাই দিচ্ছিল না। যতই অসহায় রাগ বাড়ছিল, ততই নিজের অন্যায় বোধের ধিক্কার তীব্র হয়ে উঠছিল। তাই না পালিয়ে তার উপায় ছিল না। সে বুঝতে পারছিল, গালাগালগুলি সে অনাথ-খুড়োকেই দিয়েছে! তার অতি প্রিয়, শ্রদ্ধেয় পরমবন্ধুকে।

কিন্তু সেই বন্ধুর এ কেমন নিষ্ঠুরতা যে, সে তার নালিশ সরাসরি আনবে না। একদিকে সে গম্ভীর নির্বিকার। বিচারকের সন্দিগ্ধ অনুসন্ধিৎসু চোখে অভিযুক্ত করবে। অন্য দিকে অসহায় নির্জীব সঙ্কুচিত বিব্রত। কেন? এ ক্ষেত্রে, সময়ের প্রতীক্ষা ছাড়া বুঝি কোনও উপায় নেই। সময়ের ওষুধ ছাড়া এ রোগের আরোগ্য নেই। হয়তো অনাথের কথাই সত্যি, অপরাধ করলে একদিন সবাই বলবে। কিন্তু মন মানে না। অভয়ের নিজস্ব একটা চরিত্র, একটি মন আছে। তার পক্ষে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না আর।

নির্জন গঙ্গার ধারে এসে, মুহূর্ত দাঁড়াল অভয়। তরল আলকাতরার মতো চকচকে অন্ধকার গঙ্গা। কিন্তু তার ভাল লাগল না। আবার ফিরে গেল। নির্জনতা তার ভাল লাগছে না। সহ্য হচ্ছে না। সে বন্ধু চায়। সঙ্গ চায়! কাউকে সে বলতে চায় তার কথা। তার গান শোনাবার এত লোক আছে সংসারে। কিন্তু তার ভিতরের বয়সহীন মানুষটির হাসি কান্না-যন্ত্রণার কথা শোনবার। একটি লোক নেই। সেই কথাগুলি দিয়ে হয়তো গান হয়। কিন্তু সে কথাগুলি আসলে গানের চেয়ে। বড়। কারণ, গানের চেয়ে জীবন বড়।

আর অভয়ের যেটা জীবন চর্চা, সেখানেই শেল বিধিয়ে রেখেছে অনাথ। তার সহজ বিকাশের মাঝে একটা অদৃশ্য অজানিত খোঁচার মতো খটকা হেনে রেখেছে তার সকল মান্যের, সব গণ্যের যে প্রধান, সেই অনাথ।

আবার সে রাস্তায়, লোকের ভিড়ে ফিরে এল।

রাস্তায় লোকের ভিড়। এত লোক, এত যাওয়া আসা, এত কথা, এত হাসি। তবু নিজেকে একলা মনে হচ্ছে। কষ্ট একটা তীক্ষ্ণ শরের মতো সদ্যবিদ্ধ যন্ত্রণায় প্রতিটি পদক্ষেপে খোঁচাতে লাগল। সময় যত পার হল ততই কষ্ট বাড়ল। কে আছে? কার কাছে যাবে অভয়? রাস্তায় এত মুখ। অনেক চেনা মুখ ভেসে ভেসে উঠছে তার মধ্যে। চোখের বাইরেও আরও অনেক চেনা মুখ। ভেসে উঠছে। চোখের বাইরে সামনে, এই সব চেনা মুখেরা সকলেই ভাল। কেউ তাকে প্রত্যাখ্যান করবে না। বন্ধুত্ব এবং স্নেহ থেকে বঞ্চিত করে, দূর করে দেবে না। যতটুকু হাসি তাদের। আছে, কার্পণ্য করবে না সেটুকু দিতে।

কিন্তু অভয়ের মন সায় দেয় না। সাড়া দেয় না। এই কি তবে পাপ? যারা তার সান্নিধ্যে সম্পূর্ণ দ্বারমুক্ত আলোয় প্রকাশিত, তাদের সে তার বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে? সকলের কাছে কি তার যাবার কথা নয়? সবাই কি তার মনের কথা শোনার বন্ধু নয়? এই সব মুখেরা, সেই সব। মুখেরা? আকাশের অজস্র তারার মধ্যে যারা চেনা তারার মতো?

মন সায় দেয় না। সংসারে কতগুলি সীমারেখা টানা আছে। ইচ্ছে করলেই তাকে ভেদ করা যায় না। অভয়ের দরজা বন্ধ–ভিতরটা খা-খা করছে। তার বাইরে যারা উঠোন জুড়ে বসে আছে, তাদের সে নিজে বসিয়ে রাখেনি। ওই সীমারেখাটা তারা নিজেরা টেনেছে। তারা নিজেরা ওখানে বসেছে। কবাট লাগানো ভিতর দুয়ার তাদের চোখে পড়ে না। সেই দুয়ার ভেঙে তারা ভিতরে। আসে না। সেটা তাদের দোষ নয়। উঠোন জুড়ে বসেছে, সেই তাদের মহত্ত্ব।

আর সেই বন্ধ দুয়ার ভিতরটা খা-খা করছে। যেখানে অভয়ের লাজ লজ্জা নেই, মান-সম্রম নেই, কোনও দায়-দায়িত্বের চিন্তা নেই–আসলে সে উলঙ্গ, মহার্ঘ বেশে আবৃত। সেখানে সে শিশু, সেখানে সে বৃদ্ধ। তার পাপ এবং পুণ্য সেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা কাটাকাটি করে, যোঝে এবং লড়ে। তার সেই বন্ধ-দরজা-ভিতরটা নিঃসঙ্গ। সেই শূন্যতাকে পূর্ণ করে, এমন নিমিত্তের ভাগীদার কে আছে? সেই বন্ধু কে আছে, সেই সঙ্গী কে আছে, যাকে সে বলতে চায় তার কথা।

কেউ নেই। এই মুখেরা নয়, সেই মুখেরা নয়। কেউ নেই। একাকীত্বের চিন্তা যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দিল। সংসারে সব থাকতে এত অভাব!

.

০৫.

ক্রমে ভিড় সরে গেল। আলো দূরে চলে গেল। আবার সেই নির্জনতাই জমাট হয়ে উঠতে লাগল তাকে ঘিরে। পাশের বড় বড় বাড়িগুলি ঘনিয়ে রেখেছে অন্ধকার। রাস্তার বাতিগুলি নিষ্প্রভ।

একটি বাড়ি অভয়ের পরিচিত। সে দাঁড়াল। বড় বারান্দাওয়ালা এ বাড়ির দরজায় সে ইচ্ছে করেই এল কিনা, নিজেও সহসা ভেবে উঠতে পারল না। কিন্তু বারান্দায় উঠল সে স্বাভাবিক ভাবে। যেন এই তার গন্তব্য! ভিতরে আলো দেখা যায় জানালা দিয়ে। মানুষ দেখা যায় না। আস্তে দরজার কড়া নাড়ল অভয়।

ভিতর থেকে সাড়া এল–কে?

–আমি। আমি অভয়।

এসো এসো। দরজাটা জোরে ঠেলে দাও, খুলে যাবে।

 দরজা জোরে ঠেলল অভয়। জীবন চৌধুরী বসেছিলেন ইজি-চেয়ারে। সামনের টেবিলে নমিত বাতিদান। আলোর বৃত্ত ছোট হয়ে পড়েছে টেবিলের ওপরে। বাকি অংশে অস্পষ্ট প্রদোষ ছায়ায় ভরা। জীবন চৌধুরী যেন হাঁপাচ্ছিলেন। থেমে থেমে বললেন, এসো, আজই তোমার কাছে যাব ভাবছিলুম। শরীরটা তা হতে দিলে না। এসো, কাছে এসে এই চেয়ারে বসো।

চৌধুরী মশায়ের বাড়িতে প্রথম যেদিন এসেছিল, সেদিনই মাটিতে বসতে যাচ্ছিল অভয়। উনি তা দেননি। চেয়ারে বসল অভয়।

জীবন চৌধুরী বললেন, তুমি কোনও চিঠি পেয়েছ কলকাতা থেকে? লোকশিল্প সম্মেলনের চিঠি?

এই কথাই বলতে এসেছিল অভয়। চৌধুরী মশায়ের মতামত জানতে চাইছিল সে। বলল, পেয়েছি। সেই জন্যেই আপনার কাছে এলুম।

–বেশ করেছ। নইলে আমাকেই যেতে হত। অনেক দিন এদের সঙ্গে ছিলুম, তাই এখনও নতুন কমিটি পরামর্শ চায়। আমি তোমার নাম পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আমার কাছেও চিঠি এসেছে, তোমার সঙ্গে যেন যোগাযোগ করে সব বুঝিয়ে দিই। বুঝিয়ে দেবার কিছু নেই। তোমার চিঠিতে তারিখ দেওয়া আছে। তোমাকে তাঁরা আমন্ত্রণ করেছেন। তুমি তারিখের দিন গান গেয়ে আসবে! ঢোলক আর কাঁসি বাজাবার লোক তুমি ব্যবস্থা করবে। খরচ সব তাঁরাই দেবেন। গায়েন বায়েনের আলাদা আলাদা মজুরিও পাবে। সে সব দিক থেকে তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না।

জীবন চৌধুরী হাঁপাতে হাঁপাতে এতগুলি কথা বললেন। মাথা পেতে দিলেন ইজি-চেয়ারে। মোটা লেন্সের মধ্যে তাঁর চোখ দুটি অস্বাভাবিক বড় দেখায়। চোখ মেলে অভয়ের দিকে তাকালেন তিনি।

অভয় বুঝল, কলকাতার আহ্বান কার মারফত এসেছে। সে বলল, এনারা কারা?

 চৌধুরীমশাই অবাক হলেন। বললেন, এঁদের তুমি চিনবে না অভয়।

–এঁরা বুঝি কলকাতার সব বড় বড় লোক?

 অভয়ের গলায় যেন একটি প্রাক্-সিদ্ধান্তের প্রত্যয় ফুটল।

চৌধুরী দাঁতহীন চোপসানো ঠোঁটে হাসলেন। একটু হাঁপিয়ে নিয়ে বললেন, বড় বড় লোক কিনা। জানিনে। এই আমার মতো লোকেরাই আছেন। আমরা কি বড়লোক অভয়?

অভয় বলল, না, আমি টাকা পয়সাওয়ালা ধনী লোকেদের কথা বলছি। শুধু তাদের শখ মেটাতে আমার যেতে ইচ্ছা নাই চৌধুরীমশায়। আমার গান কেন মিছিমিছি ওঁরা শুনবেন?

জীবন চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। অভয়ের মনে হল, তাঁর গলার শিরগুলি ধরে যেন কেউ টানাটানি করছে। চোখ বুজে রয়েছেন। বললেন, এ সব কথা তোমাকে কে বুঝিয়েছে। অভয়? গণেশ?

অভয় মিথ্যে করে বলল, আজ্ঞে না।

–তুমি নিজে বুঝেছ? তবে তো বড় ভুল বুঝেছ অভয়। বাংলা দেশে কজন ধনী লোক আছে। হে? তাদের তো হাতে গোনা যায়। সেখানে গান শুনবে কলকাতা মফস্বলের হাজার হাজার লোক। সেখানে ধনী-দরিদ্রের বিচার কেন? তুমি তোমার মতো গান করবে। কারুর মুখ চেয়ে নয়। যার ভাল লাগবে না আসর ছেড়ে চলে যাবে। বাকি বিচারের ভার তুমি কেন নিচ্ছ?

প্রতিবাদের কথা খুঁজে পেল না অভয়। মাথা নিচু করে বসে রইল। জীবন চৌধুরী চোখ বন্ধ করতে পারছেন না। শ্বাসরুদ্ধ কষ্টে চোখ বুজতে চায় না। হাতের বই বুকে চেপে ধরে বললেন, আত্মসম্মানবোধ থাকা ভাল বাবা। কিন্তু মিথ্যে সম্মানের অহঙ্কার ভাল নয়।

অহঙ্কার? অভয় বলল, আমার কোনও অহঙ্কার নাই চৌধুরীমশাই?

–জানি। অপারগের অহঙ্কার থাকে। অক্ষমের থাকে। তুমি এর কোনওটাই নও। তোমার কেন মিথ্যে অহঙ্কার থাকবে? বাংলা দেশের লোক সমাদর করে তোমার গান শুনতে চেয়েছেন। তুমি তোমার ইচ্ছায় গাইবে। পরের ইচ্ছার দাস হয়ে যখন গাইবে, তখন তোমার সম্মান যাবে। এখানে তো তা নয়। আর, তুমি একলা নয়। বাংলাদেশের আরও অনেক কবিয়াল আসবেন, সকলেই গাইবেন। কয়েকজনের শখ মেটাবার কথা এখানে আসে না।

জীবন চৌধুরীর গলায় ঈষৎ ক্ষোভ ছিল। অসুস্থতার দরুনই হয়তো একটি অসহায় ব্যথার আভাস ছিল। অভয় বলল, আমার ভুল হয়েছে চৌধুরীমশায়।

জীবন চৌধুরী তবু বললেন, তুমিই তো গান বেঁধেছ, আমি এ জীবনের কূল পাই না। জীবন। তো ছোট নয়। তোমার আশে-পাশে মিত্রবন্ধু যারা আছে, তারা ছাড়াও সংসার ব্যাপক। আবদ্ধ থেকো না। আমি থেকেছি, তাই আমার মুক্তি হল না। এই দেখো, আজ একলা ঘরে অন্ধকারে চুপটি করে বসে আছি। আমার নিজের কাছেও কোনও সান্ত্বনা নেই। যা আমার করার কথা ছিল না, তাই করেছি জীবনভর। লোক-প্রিয় হয়েছি, কিন্তু সব দল ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে। মনের বিশ্বাস অনেক দিন গেছে। এখন শরীরে শক্তি নেই। গোটা জীবনটা শুন্য মনে হচ্ছে। এখন। আমার দৃষ্টি ছোট হয়ে আসছে। তার মানে মরণ ঘনিয়ে আসছে। শেষ দিনের ছায়াটা এগিয়ে আসছে।

নিজের বুকে কষ্ট থাকলে, অপরের কষ্ট বুকে এসে সহজে বাজে। শহরের সকলের শ্রদ্ধেয় জীবন চৌধুরীকে এত একলা, এত অসহায় কখনও মনে হয়নি অভয়ের। তাঁর কথাগুলি যেন কান্নার মতো। শোনাচ্ছে। তার নিজের বন্ধ-দরজার ভিতরের শূন্যতা আরও বিশাল হয়ে উঠছে। সে ডাক দিয়ে উঠল, চৌধুরীমশায়!

–অভয়!

 চৌধুরীমশাই সাড়া দিয়ে বললেন, আমার উচিত ছিল তোমার মতো গান বাঁধা। নয়তো বই লেখা। যাকে বলে সৃষ্টি। সেখানে আমি মুক্তি পেতুম, স্বাধীনতা পেতুম। সত্য আমার পক্ষে থাকত। রাজনীতি করতে গিয়ে কোনওটাই পাইনি। না পেরেছি পরের জন্য কিছু করতে নিজের জন্য।

জীবন চৌধুরীর বুক কাঁপিয়ে কাশি উথলে উঠল। তাঁর কষ্ট বেড়ে উঠল। অভয় নিজে দায়ি মনে করল এর জন্যে। কিন্তু অভয়কে বলতে গিয়ে তিনি নিজের কথা বলছেন।

অনেকক্ষণ ধরে হাঁপালেন চৌধুরী। বাড়ির ভিতর দিকের দরজা বন্ধ। ছোটখাট বাড়ি নয়। মস্ত বড় সেকালের মহলওয়ালা বাড়ি। কে কোথায় আছে, কিছু সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। অভয় উঠে। ইজি-চেয়ারের পাশে গিয়ে বলল, আপনার বুকে একটু হাত বুলিয়ে দেব?

জীবন চৌধুরী দ্রুত মাথা নাড়লেন। না না না, হাত বোলাতে হবে না অভয়। তুমি বসো। আমার কষ্ট কদিন ধরেই বেড়েছে। এ সহজে যাবার নয়। এ সবই সময়ের কারসাজি হে। সে জানান দিচ্ছে। সময় একদিন সকলেরই আসে। সে একদিন সবাইকেই টেনে নেয়। নিজের গোটা জীবনটার জন্য যদি এখন আসে মরতে হয়, তার চেয়ে হতভাগ্য আর কেউ নেই। এই দেখো গীতাখানি নিয়ে বসেছিলুম। আজ মনে মনে নিজের কথাই ভাবছিলুম খালি। তাই গীতাখানি নিয়ে বসেছিলুম। এখন রাজনীতিকদের কাছে এটা পুরনো হয়ে গেছে। আমি তো পুরনো লোক। আমার কাছে যায়নি। তামসিকতার সঙ্গে সংগ্রামের কথা আর এমন করে কোথাও বলা হয়েছে? শরীরে কষ্ট হচ্ছে, তাকে সহ্য করা যায়। কিন্তু মনের কষ্ট আরও বেশি যন্ত্রণাকর। তাই পড়ছিলুম। এমন সময়ে তুমি এলে। ভাল করেছ এসে। তোমার কথা শুনলে আমার নিজের কথা মনে হয়। আমি তোমাকে উপদেশ দিইনে। আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি। আবার বলি অভয়–দলের চেয়ে দেশ বড়। বোধহয়, তুমি যাকে ধনী বলল, আমি তাকে পাপী বলি। আমার কাছে ধনীদরিদ্রের প্রশ্ন নেই। আমার কাছে পাপপুণ্যের প্রশ্ন। তোমার বিশ্বাস যদি অটুট থাকে, সত্য যদি তোমার সঙ্গে থাকে, তুমি ভয় করবে কাকে? আর শিল্পীরাই হল সবচেয়ে স্বাধীন। সে জীবনের নির্দেশ মেনে চলে। তুমি জীবনের নির্দেশ মেনে চলো, এইটুকু আমি বলি। তখন দেখবে, মিথ্যে ভেদাভেদ ঘুচেছে। আর অন্যায় পাপ তোমাকে শত্রুর চোখে দেখছে।

চুপ করলেন চৌধুরী। হাঁপাতে লাগলেন তেমনি। তবু যেন শান্ত অচঞ্চল বিকারহীন স্থৈর্য লাভের চেষ্টা করছেন। নিঃশব্দ ঘরে শুধু তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে দেয়াল-ঘড়িটা তাল দিয়ে চলেছে। অভয়ও চুপ করে বসে রইল। চৌধুরীমশায়ের এতগুলি কথার মধ্যে শেষ কথাটিতে এসে তার মন ঠেকে রইল। জীবনের নির্দেশ কী? সে কোথা থেকে আসে? কেমন করে তার নির্দেশ বোঝা যায়? লোকশিল্পী সম্মেলনে যাওয়াটা এখন বাধাহীন মনে হচ্ছে। কিন্তু কীসের নির্দেশে সে অনাথকে অপমান করে এসেছে? তার বুকে তীক্ষ্ণ শরবিদ্ধ কষ্টটা জীবনের কোন নির্দেশে দূর হবে? সেই কষ্ট তো দূর হচ্ছে না। তার বন্ধ-দরজা ভিতরের শূন্যতা ঘোচে না। চৌধুরীমশায়ের কাছে এলে, জীবনের কতগুলি লক্ষ্য উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এখানে সে শ্রোতা, উপকৃত। কিন্তু তার নিজের কথা সে কাকে বলবে? সেই বন্ধু কোথায়, যে তার অব্যক্তকে ব্যক্ত করে দেবে সাহচর্য দিয়ে?

জীবন চৌধুরীকে অভয় শ্রদ্ধা করে, ভক্তি করে। অনাথকে ভালবাসে। একমাত্র অনাথখুড়োর কাছ থেকেই হয়তো জীবনের সেই নির্দেশ সে পেত। একমাত্র অনাথ তার নিজের ভিতর বাহির একাকার করে প্রকাশ করেছে অভয়ের কাছে। কিন্তু সেই মুক্ত মন থেকে অনাথ বিচ্যুত।

অতএব শুন্যতা থাকবে। নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া নিয়ে চলা ছাড়া উপায় নেই। একাকীত্বের এই কষ্টের সঙ্গে তাকে একলাই লড়তে হবে।

অভয় বলল, আমি তা হলে এখন যাই।

কী ভাবছিলেন জীবন চৌধুরী। সুপ্তোত্থিতের মতো ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, অ্যাঁ? হ্যাঁ, এসো। কাগজটা তুমি সই করে দিয়ে যেয়ো, আমি পাঠিয়ে দেব।

–আচ্ছা।

–আর যা তোমার ইচ্ছে, যা প্রাণ চায়, সেই গান ভাবো। মনপ্রাণ দিয়ে যা গাইবে, তাই লোকের ভাল লাগবে।

অভয় চুপ করে শুনল। তারপর বেরিয়ে এল। মনে মনে বলল, মন প্রাণ যা চেয়েছে, কে কবে তাকে গানে বাঁধতে পেরেছে? গোটা জীবনটা কী আশ্চর্য অমিলের সংমিশ্রণ। এত অমিলকে এক সূত্রে বাঁধা যায় না।

.

০৬.

অন্ধকার নিঝুমতা পেরিয়ে শহরের কেন্দ্রে ফিরে এল অভয়। বাড়ির পথ ধরতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল রাস্তায়। ইচ্ছে করল না। সেখানে ভামিনী ছেলে নিয়ে ঘুমোচ্ছে। গিনি রান্না করছে। দোকানে বসেছে সুরীনের জটলা। সেখানে যেতে ইচ্ছে করছে না। তবু পা দুটি চলতে আরম্ভ করল। যেন অভয় জানত না। খেয়াল করল না। মনে মনে সে তখনও যেন আশ্রয় সন্ধান করছে।

তারপর কখন সেই বড় বড় বাড়িগুলির ছায়ায় ছায়ায়, গলির মধ্যে বাঁক নিল অভয়, নিজেও জানতে পারল না। যেন চেনা, তবু এক অচেনা পরিবেশের মধ্যে এসে পড়েছে সে। কারা কানাকানি করছে। ফিসফাস শব্দ শোনা যাচ্ছে। অন্ধকার রহস্য দোলায় দুলছে।

মেয়েরা সরে দাঁড়াল। সেই মুহূর্তে বুকের মধ্যে ভয় ও যন্ত্রণার একটি যুগপৎ কাঁপুনিতে তাকে অবশ করে দিল। এ কীসের নির্দেশ? কোন নির্দেশ? কার নির্দেশে সে সুবালার বন্ধ দরজার দিকে চোখ তুলে তাকাল? এ কোথায় এসে উঠেছে সে?

অভয় দ্রুত ফিরতে গেল। একটা তীব্র কান্নার শব্দে আবার থমকে দাঁড়াল সে। যেন কোনও মেয়েকে কেউ মারছে গলা টিপে। সে আর্তনাদ করছে। ভয়ে এবং যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। অভয় উপরের দিকে ফিরে তাকাল আবার। শব্দটা ওপর থেকে আসছে।

নীচের একটা ঘরের দরজা খুলল কে শব্দ করে। ক্রুদ্ধ গলায় চিৎকার করে উঠল, এ সব কী? এ সবের মানে কী? এটা কি ভূতের বাড়ি না মেয়েমানুষের বাড়ি?

সঙ্গে সঙ্গে আরও দু তিনটি ঘরের দরজা খুলে গেল। নীচে এবং ওপরে, কয়েক ঘরেই মেয়েরা পণ্য রক্ষায় ব্যস্ত ছিল। হয়তো মেয়ে-গলার তীব্র আর্তনাদ শুনে সবাই দরজা খুলে বেরিয়ে আসত না। মোটা পুরুষ-গলার চিৎকারটা সবাইকে অবাক করেছে, কৌতূহলিত করেছে। যারা দরজায় দাঁড়িয়েছিল, তারাও ছুটে এল উঠোনে।

লোকটা তখনও বাজখাঁই গলায় চিৎকার করে চলেছে, কোথায় রাজুমাসি, ডাকো তাকে। রোজ রোজ এই এক ফ্যাচাং ভাল লাগে না। ট্যাকের কড়ি খরচ করে একটু জুড়োতে আসি, তার মধ্যে ও রকম থেকে থেকে পেতনির চিৎকার সহ্য হয় না।

একটি মেয়ে-গলার সমর্থন শোনা গেল, তাই না বটে। রোজ রোজ এ কী ধ্যালান্ বাপু। আচমকা শুনলে কার না বুক কেঁপে ওঠে।

দেখা গেল মেয়েরা সকলেই একমত। সকলেই ঘাড় নেড়ে সমর্থন করল কথাগুলি। আর একজন কে পুরুষ বলে উঠল, এই নিয়ে আমি তিন দিন শুনলুম। প্রথম দিন তো ভেবেছিলুম, কেউ কাউকে ছুরি টুরি মেরেছে। লক্ষ্মী বললে, কে নাকি একটা মেয়েমানুষ আছে দোতলায়, সুবালা বলে। সে মদ খেয়ে ও রকম করে।

সেই বাজখাঁই গলা আবার হেঁকে উঠল, মদ খাক, পাগল হোক কিংবা ডাইনিতে পাক, চেঁচিয়ে জানান দেবার কী আছে? এখানে দশজন আসে, দশের জায়গা। একজনের খেয়াল তো চলবে না। হয় ওকে তাড়াও–নয়তো বাকি মেয়েদের রাস্তা দেখতে বলল। বাড়ির কি কোনও অভাব আছে? আর্তনাদ তখন থেমে গেছে। সকলেরই দৃষ্টি দোতলার বন্ধ দরজাটার দিকে। কারণ, কথাগুলি আসলে সুবালার উদ্দেশেই। ওখানকার প্রতিক্রিয়াটাই সকলের লক্ষণীয়। কিন্তু বন্ধ-দরজার ভিতরে বাইরে একটি ভুতুড়ে স্তব্ধতা। কোনও সাড়া শব্দ নেই। এ স্তব্ধতায় সকলেই খুশি। এ বাড়ির মেয়ে নাদুর পাশেদাঁড়ানো সেই বাজখাঁই-গলা লোকটির প্রতি সকলেই সমীহ করে তাকাল। বোঝা যায়, লোকটি মদ খেয়েছে। কিন্তু মাত্রাধিক্য নয়। যদিও বেশ ঘোর আছে। তার পাশে অগোছালো নাদুকে, এ বারোস্বামীর জন্যে বেশ গরবিনী মনে হচ্ছে। তার ঠোঁটের হাসি আর মদ-আরক্ত চোখের ঘৃণা হানছে সুবালার বন্ধ দরজায়। এককালে নাদু রাজুবালার বাড়ির সেরা মেয়ে ছিল। সুবালা এসে ভেঙেছিল সেই অহঙ্কার। বাজখাই-গলা লোকটির এ নেতৃত্বের জন্য হয়তো নাদুই তাকে তাতিয়েছে। সুবালার প্রতি স্বয়ং বাড়িউলী রাজুবালার অবোধ্য দুর্বলতা তার অসহ্য। নাদু হয়তো তারই শোধ নিতে চাইছে।

রাজুবালা কখন ভিড়ের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, কেউ দেখতে পায়নি। অভয়ও না। কে একটা মাতাল মোটা গোঙা স্বরে বলে উঠল, কিন্তু ও সুবালা!

বাজখাঁই-গলা বলে উঠল, সুবালা হোক আর মহারানি হোক, বেশ্যাবাড়িরও একটা নিয়ম আছে। ধারে কারবার তো করতে আসিনি। রোজ রোজ এ কী রকম মরাকান্না বাবা! শোক হয়ে থাকে, গঙ্গার ধারে গিয়ে বসো।

কে একজন বলে উঠল, ভাতারের শোক নাকি?

সকলের মুখেই হাসি দেখা দিল। আবার স্তব্ধতা। দোতলার বন্ধ দরজাটা যেন নীচের এ কথাগুলির প্রতি উৎকর্ণ হয়ে আছে। যে যার ঘরে ও স্থানে ফিরে যাবার উদ্যোগ করল।

সহসা একটা ধাতব আঘাতের শব্দ শোনা গেল এবং পরমুহূর্তেই বিরাট কাচ ভেঙে পড়ার ভয়ংকর ঝনঝন শব্দে চমকে উঠল সকলে। আড়ষ্ট হয়ে ফিরে তাকাল দরজার দিকে। সেই মুহূর্তেই দরজায় একটা ভারী কিছু আছড়ে পড়ল যেন। দরজাটা ভীষণ শব্দে বেজে উঠল। আর উঠোনের কেউ কেউ ভয়ে পালাবার উদ্যোগ করল। ভাবল, সুবালা দরজা খুলে নেমে আসছে হয়তো। তারপরেই কাচ-ভাঙা গলার তীক্ষ্ণ হাসি, ঘরের মধ্যে দেয়ালে দেয়ালে বাজতে লাগল। বাজতে বাজতে, অতলে ডুবতে লাগল। যেন কেউ গলাটা টিপে ধরেছে।

রাজুবালা এগিয়ে এল। আশ্চর্য! রাজুবালা এসে অভয়ের পিঠে হাত দিল। অভয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হল তার। সেই অবয়ব এবং পাকা চুলের বাঁকা সিঁথি না থাকলে অভয় হয়তো চিনতে পারত না রাজুবালাকে। নুয়ে পড়া শরীর আর মুখের অজস্র হিজিবিজিতে অনাবিষ্কৃত লিপি। বসে বসে হয়তো মদ খাচ্ছিল সে। তাই চোখের মণি দুটি অচঞ্চল। সিসার গুলির মতো নিরেট এবং ভারী। তবু তাতে একটি অনুনয় ফুটে উঠল। সে ঠেলতে লাগল অভয়কে। প্রায় চুপিচুপি বলল, তুমি এসেছ জামাই? বাঁচিয়েছ, বাঁচিয়ে দিয়েছ আমাকে। যাও, একবার যাও তুমি।

বাজখাঁই-গলা তখন নীরব হয়ে গেছে। সকলেই নিশ্চুপ। অভয়কে পথ করে দিল সবাই। হাসিটা তখনও পাতাল থেকে যেন উঠছে। অভয় অবাক হয়ে বলল, কোথায় মাসি। আমি কোথায় যাব?

সকলের চোখ তখন অভয়ের দিকে। রাজুবালা বলল, ওই ঘরে। সুবলির ঘরে।

অভয় বলল, আমি?

হ্যাঁ বাবা, তুই।

অভয়ের হাত চেপে ধরল রাজুবালা। –আর কেউ গেলে হবে না। তোর দুটি হাতে ধরি বাবা জামাই, তুই যা। ছুঁড়ি তো পাগল নয়। কোনও ব্যায়োও নয়। ওর কথা কেউ বুঝবে না। কিন্তু আর উপায় নেই। এবার ওকে তাড়ানো ছাড়া আর আমার রাস্তা নেই। তুই যা জামাই, লক্ষ্মী বাবা আমার। সে তোকে কী চোখে দ্যাখে, আমি জানি। আমি রোজ সন্ধেয় তোর মুখ চেয়ে থাকি বাবা। বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আসব ভাবি। কিন্তু তুমি এখন মানী লোক বাবা। আমার বাড়িতে এলে যদি মান যায়, তাই ডাকিনি। আজ তোমার ঘাড়ে কে ভর করেছে, জানি না। আজ তুমি আপনি এসেছ। তুমি একবারটি যাও।

রাজুবালার তুই তুমি জ্ঞান নেই এখন। সে অভয়কে ঠেলতে লাগল।

অভয় বলল, রাজুমাসি, তুমি জানো না, আমাকে দেখলে সে হয়তো আরও খেপে যাবে। এতদিনের মধ্যে তোমরা সবাই কত বার বাড়িতে এসেছ গেছ, সে একবারও যায়নি।

হাসিটা তখন চাপা গোঙা স্বরে যেন দেয়াল ঘসছে। রাজুবালা বলল, তার কারণ আছে বাবা। সে আমি তোমাকে পরে বলব। তুমি এখন একবারটি গিয়ে দেখো, কী হয়।

একটি মেয়ে গলা শোনা গেল, হবে, ছাই হবে।

রাজুবালা ফিরে তাকাল না। অথচ তাকাবারই কথা। তার মুখের ওপর কথা বলার সাহস কারুর না থাকারই কথা। কিন্তু শাসনের সে অধিকার আজ শিথিল হয়ে গেছে। অভয় দেখল, রাজুবালা অসহায় চোখে তার দিকে চেয়ে আছে।

আবার বলল রাজুবালা–বাবা একটু। খেপেই যদি যায়, যাবে। তেমন কিছু করলে, তোকে আমি বলছি বাবা, তুই ওকে মেরে আধমরা করে ফেলে রেখে আসিস। কী করব! ওর কপালে এর পরে মার আর হাতে পায়ে বেড়ি ছাড়া কিছু নেই।

অভয় ফিরে তাকাল উপরের দিকে। পায়ে পায়ে অগ্রসর হল। সুবালার ঘরে সেই শেষ দিন আসার কথা তার মনে পড়ল। প্রায় মার-খাওয়া কুকুরের মতো নিজেকে বিতাড়িত মনে করেছিল সে। কিন্তু নিজের কথা সে ভোলেনি। তার ভিতরের সেই অন্ধকার প্রবৃত্তির কথা। তার আবর্তিত ঘোলা রক্তের ডহর কানা হয়ে উঠেছিল। সুবালা তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু পরে, সুবালার অনুতপ্ত আহ্বান শুনতে পেয়েছিল সে। তখন আর ফিরবার উপায় ছিল না। তখন সত্য জানা হয়ে গেছে।

আজ কেন এসেছিল অভয়? সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে পা ভারী হয়ে এল অভয়ের। আজ কেন এসেছিল সে? পাপ! একি পাপ নয়। নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায় এখানে কেন এসেছিল অভয় আজ? এই সেদিনও নিমিকে হারাবার দায় সে অনেকখানি সুবালার কাঁধে দিয়ে, তাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করেছিল। আর আজ সে এখানেই ছুটে এসেছিল। সব তা হলে মিথ্যে! নিজেকে চেনে না অভয়। নিজের কাছে সে অনাবিষ্কৃত। আর সে শ্রমিক-আন্দোলনের কথা বলে। সে গান বাঁধে। অপরের অন্যায়ের সন্ধানী সে। আর প্রবৃত্তি তার বুকের ভিতরে মিথ্যা এবং অনাচারের বাসা তৈরি করছে। নিমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল সে। সুবালার সান্নিধ্য আর একজন কেউ লালন। করছিল তার বুকের মধ্যে? নইলে সে কেন এসেছিল?

সুবালার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল অভয়। যাক। আপাতত সে এ সব ভাববে না। নিজের কাছে, আপন বিচার তার ভোলা রইল। সে যখন এসেছে, তখন একবার সুবালার মুখোমুখি হবে। সত্যর এই বোধ হয় নিয়ম। সুবালাকে যে সে একবার চোখে দেখতে চায়, তার বুকের ভিতরে সে সত্য এখন উজ্জীবিত, সচকিত, কৌতূহলিত।

অভয় ডাকল, সুবালা।

গোঙানি থেমে গেল ঘরের মধ্যে। নীচের উঠোনে রাজুবালার চাপা চাপা গলা শোনা গেল, যাও, তোমরা যে যার ঘরে যাও। এই আলতা, যা, দরজায় গিয়ে দাঁড়া। সন্ধে থেকে তো এমনি বসে আছিস।

নীচে একটা চাপা গুলতোনি উঠল। সবাই সরে যেতে লাগল। অভয় আবার ডাকল, সুবালা।

একটা ক্রুদ্ধ হুঙ্কার শোনা গেল, কে?

 বলতে বলতেই ধড়াম করে দরজা খুলে গেল। অভাবিত দৃশ্য ঘরের মধ্যে। অবর্ণনীয় অবস্থা সুবালার। কিন্তু স্বাভাবিক হতে চাইল অভয়। যেন অনেকদিনের আলাপির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, এমনি স্বাভাবিক গলায়, প্রায় হেসে বলল, চিনতে পারো?

সুবালার কালি-পড়া চোখ দুটিতে শ্লেষের ঝিলিক হানল। ঠোঁট দুটি উল্টে ঝুলে পড়ল প্রায়। অভয়ের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে দুলতে লাগল খানিকক্ষণ। হঠাৎ উপছানো গলায় বলল, চিনব না? তুমি শৈলদিদির জামাই, নিমির বর, মালিপাড়ার মানী স্বদেশি-জামাই তুমি। তুমি আমার সঙ্গে তবলা বাজিয়েছিলে। এক রাত্রের ফিরে-যাওয়া-নাগর তুমি আমার। তোমাকে চিনব না?

হিসহিস করে হেসে উঠল সুবালা। তার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। অভয় এক মুহূর্ত কোনও কথা খুঁজে পেল না। তার মাথা হেঁট হয়ে এল। সুবালার দিকে চোখ রাখতে পারছে না সে। খেপে ওঠারই লক্ষণ সুবালার ভাবে-ভঙ্গিতে। হয়তো, অপমানে মাথা নিচু করে চলে যাওয়া ছাড়া আর কিছু ঘটবে না। যদিও বোঝা যাচ্ছে, সুবালা জ্ঞানে নেই। মানুষ সে চিনতে পারে। কিন্তু মদ এবং মনের ভেসে-ওঠা অতলতা কাজ করছে এখনও। সে কোনদিকে ঝুঁকবে, কেউ বলতে পারে না। এখন সে ভিতর থেকে কথা বলছে। তার বাহ্য-সংবিৎ নেই।

সুবালা সারা শরীরে একটি মোচড় দিয়ে দুলে উঠল। হাত জোড় করে বলল, তা দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে এসো। যত্ন করে ঘরে তুলি তোমাকে, যত্ন করে নিয়ে যাই এসো।

অভয়ের সারা শরীর শক্ত হয়ে উঠল। নীচে একটি মেয়ে-গলায় হাসির নিক্কণ শোনা গেল। এখনই নীচে নেমে যাবে কিনা, ভাবল অভয়। দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো শেষ পর্যন্ত রাজুবালার কথাই সত্যি হবে। অভয় আঘাত করে বসবে সুবালাকে।

কিন্তু সে শান্ত গলায় বলল, ঢুকব কোথায়। ঘরের কী হাল করেছ, দেখেছ?

সুবালা হাত ঝটকা দিয়ে বলল, দেখেছি। তুমি এসো দিকিনি নাগর। বলে, হাত ধরে টানল অভয়ের। অভয় বাধা দিল না। সুবালা আবার দরজাটা বন্ধ করে দিল। দিয়ে, দরজাতেই হেলান দিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু সুবালার দিকে এখন আর ফিরে তাকানো যায় না। বাইরে থেকে তবু তাকানো যাচ্ছিল। বন্ধ-দরজা ঘরে সব পরিবেশ যেন বদলে গেল হঠাৎ। সুবালা আর তার ঘর। গোটা মেঝেটায় কাচ ছড়িয়ে পড়ে আছে। আলমারির মাঝের থাকের দুটো কাচ নেই। ছোট একটি চ্যাপ্টা মদের বোতল কয়েক টুকরো হয়ে ছড়ানো। পাশ বালিশটা ওয়াড়-খোলা অবস্থায়, মেঝেয় পড়ে আছে থ্যাতলানো মড়ার মতো। বিছানা চটকানো। শাড়িটা দলা পাকিয়ে পড়ে আছে বালিশের কাছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা ওপরের দিকে ফেরানো। ছাদের কড়ি-বরগার ছায়া পড়েছে। সেখানে। হয়তো সুবালা নিজের ছায়া দেখতে চায়নি বলেই ঘুরিয়ে দিয়েছে।

আর সুবালার গায়ে জামাটি পর্যন্ত নেই। শুধু বডিস আর সায়া তার গায়ে। খোঁপা হয়তো নিজেই খুলেছে। বিনুনিও অর্ধেক মুক্ত। মুখে নেই রঙের প্রলেপ। সন্ধ্যাবেলা সাজেনি হয়তো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা পা নাচাচ্ছে সুবালা। দু হাত পিছনে, দরজায় চেপে রেখেছে। তার সর্বাঙ্গ দুলছে। তার পশুর মতো শক্ত বলিষ্ঠ শরীর। বারোবাসরের জীবন তার দেহের ঔদ্ধত্য ভাঙতে পারেনি। নিটুট, আর নিষ্ঠুর মৃত্যুর মতো তার স্তনান্তরের ঈষৎ অবকাশের অন্ধকার। জীবিকার কশাঘাতের সঙ্গে বাজি ধরে দেহ অনমনীয়, অদমিত। তার প্রমত্ত মন দিয়ে গড়া ক্ষীণ কটিতট অধরা অকূল হয়ে উঠেছে নিতম্বে। নাচানো পায়ের তালে বিলুলিত জঘন আর মধ্য সমুদ্রের ঢেউয়ে উৎক্ষিপ্ত নিঃশব্দ জলস্তম্ভের মতো আভঙ্গ ঘন ঊরু।

অভয়ের রক্তের মধ্যে যেন একটা ক্ষিপ্ত মহিষ তার শাণিত কঠিন শিং নিয়ে পাশবিক শব্দে ছুটে আসতে লাগল। মিথ্যুক। মিথ্যাবাদী অভয়। নিজের মনের সত্য তার কল্পনা শুধু। বাস্তবে সবটাই এত ভয়ঙ্কর মিথ্যে? নিজের কাছে সে চিরকাল ধরে এত অপরিচিত! একেবারে দেউলিয়া হয়ে, রক্তের কাছে ঋণের তার শেষ মুচলেকা দিয়ে বসে আছে? সব আদর্শের আড়ালে, এই পাপ তার ভিতরে! নিমিকে সে তা হলে ভালবাসেনি? সংসারকে নিমি-ময় করার এই শেষ উপহাস তার বাকি ছিল?

সুবালা ঢুলুঢুলু চোখে তাকাল ঘাড় বাঁকিয়ে। বাসি-আলতা-পা তেমনি নাচতে লাগল। বলল, তারপর? আমার মানী স্বদেশি নাগর, এতদিনে মনে পড়ল?

হ্যাঁ, এমনি করে কথা বলুক সুবালা। ক্ষিপ্ত মহিষটার গায়ে তাতে চাবুক পড়ে। তার ঘোর ভাঙে, খোয়ারি কাটে। অভয় বলল, তা পড়ল। আলমারি ভেঙে, তছনছ করে, চেঁচিয়ে মেচিয়ে যা কাণ্ড করেছ, গোটা শহর এবার এ ঘরে আসবে।

এক মুহূর্ত সুবালার পা থামল। আবার নাচতে লাগল। বলল হ্যাঁ, রাজুমাসির অনেক ক্ষতি করেছি। মাইরি। এবার আমাকে তাড়িয়ে দেবে। কী করব বলল, বোতলটা হাঁটকে দেখি, এক ফোঁটা মাল নেই। সেই পরশু একটা লোক এসে এক বোতল ফাউ দিয়ে গেছল। আজ পর্যন্ত কেউ আর বোতল নিয়ে আসেনি।

অভয় যেন কথা বলতে পেয়ে, নিজের হাত থেকে বাঁচল। বলল, তা লোকে আসবে, বসবে, তবে তো। বোতল কি আর হাতে করে ঢুকবে।

–হ্যাঁ, আমার ঘরে তাই ঢুকতে হবে। পেটে না পড়লে আমি কানা। চোখেই দেখতে পাইনে, মাইরি বলছি।

বলতে বলতে হেসে উঠল। কাত হয়ে মুখটা গুঁজে দিল দরজায়।

অভয় বলল, পেটে পড়েও তো দেখতে পাচ্ছ না এখন।

ঘাড় ফেরাল সুবালা। গোটা শরীরটা যেন অভয়ের মুখোমুখি হল। বলল, মনের মতন পড়েনি। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি। এই তো তোমাকে দেখতে পাচ্ছি, আমার পুরনো নাগরকে। কিন্তু মান যাবে না তোমার?

দরজা ছেড়ে অভয়ের দিকে এক পা এগিয়ে এল সুবালা। তার বুকের সংক্ষিপ্ত আবরণটুকু যেন টলমল করছে। অভয় নিজের সঙ্গে শক্ত হয়ে যুঝতে লাগল। বলল, মান কি যাবার জিনিস সুবালা?

–তা বটে। তোমাদের মান যায় না।

বলতে বলতে দু হাত বাড়িয়ে অভয়কে ধরল সুবালা। জড়িয়ে জড়িয়ে বলল–তবে এতদিন এ পাড়ায় তোমাকে দেখিনি কেন নাগর?

অভয় শক্ত হল। আঘাত করে সরিয়ে দিতে উদ্যত হয়েও থমকে গেল সে। এখানে কেন এসে পড়েছিল অভয়? কার কাছে? কার কথা মনে করে? এ যে নিজের দুর্বলতায় ফুঁসছে সে। নিজের প্রতি উদ্যত আঘাত সে আর একজনকে করতে যাচ্ছে। নিজের ধিক্কার হানছে অপরকে। কিন্তু সুবালার এই অটুট শরীরটা ফাঁকি নয়, মিথ্যে নয়। এ অভঙ্গ অঙ্গ তার মনের চেয়ে সত্য রূপের। বিভাস।

সুবালা আবার বলল, সেই অনেককাল আগের একদিনের আজ শোধ দেব। আজ তোমাকে যত্ন করে নেব আমার কাছে, মাইরি!

অভয় গর্জন করে উঠতে চাইল। কিন্তু পুড়ছে সে। ক্ষয় হচ্ছে। সে তার সব লুকোচুরির শক্তি জড়ো করে ডাকল, সুবালা।

সুবালা প্রায় এলিয়ে পড়ল অভয়ের গায়ে। বলল, ভয় নেই, আজ তোর মিনি-মাগনা, সত্যি বলছি।

অভয় সামনের দেয়ালে ফিরে তাকাল। সে তার ঈশ্বরকে ডাকতেও ভুলে গেল। নিজের সঙ্গে একটা কঠিন শক্তি পরীক্ষায়, দাঁতে দাঁত চাপল। সুবালার দু হাত ধরে তাকে গায়ের কাছ থেকে সরিয়ে বলল–একটু হুঁশ করো সুবালা। জ্ঞানে এসো।

সুবালা নিজেই সরে দাঁড়াল একটু। একটা ভয়ংকর ভঙ্গিতে দুলতে লাগল সাপিনীর মতো। ঘাড় নেড়ে নেড়ে ঢুলু ঢুলু চোখে হেসে বলল, আজ আর মনে ধরছে না নাগরের? তবে তুই কী জন্যে এসেছিস আমার কাছে? মেয়েমানুষের কাছে অত বড় শরীরটা নিয়ে কী করতে এসেছিস অ্যাঁ?

সায়া ছেড়ে, কাঁচুলির মাঝখানটা ধরে টান দিল সুবালা। তার বুকের বাঁধ যেন ভাঙছে। অভয় আবার ডাকল, সুবালা।

সুবালা মাথাটা ঝাঁকিয়ে, ভ্রূ কুঁচকে তাকাল, হুঁ মজিসনি এখনও?

তারপর অস্ফুটে বিড়বিড় করল খানিকক্ষণ। আবার বলল, তবলা বাজাবি? গান করব আমি।

অভয় দরজার দিকে ফিরবার উদ্যোগ করেছিল। গানের কথা শুনে অনড় রইল। বলল, গাইবে? সত্যি?

–তুই বাজাবি তো?

বাজাব।

তবে গাইব।

বলে, সুবালা নিজেই উপুড় হয়ে খাটের তলায় ঢুকে গেল। টেনে টেনে মেঝের ওপর নিয়ে এল হারমোনিয়ম, বাঁয়া-তবলা। বাঁয়াটা গড়িয়ে গেল অনেকখানি। অভয় নিচু হয়ে ধরে ফেলল। সুবালা হারমোনিয়মটা দু হাতে বুকের কাছে তুলে, খাটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হারমোনিয়মের রিডগুলি আঘাত পেয়ে ঝনঝনিয়ে উঠল। তারপর বলল, আয়, খাটের ওপর আয়।

অভয় বাঁয়া-তবলা খাটের ওপর রেখে, আগে শাড়িটা হাতে তুলে নিল। কারণ, তখন আর সুবালার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। বলল, এ শাড়িটা পরে নাও।

সুবালা চোখ না তুলে, স্টপার টানতে টানতে বলল, অত আমার সময় নেই। গায়ে আমার কিছু রাখতে ইচ্ছেই করে না। তা আবার সায়ার উপর শাড়ি।

একটি পা সোজা মেলে দিয়ে, আর এক পা দিয়ে হারমোনিয়মটা পেঁচিয়ে ধরল সুবালা। তারপর রিডের ওপর তার আঙুল চলল। এই আর একটি সত্য। সুবালার দেহের মতোই। যত অসংবৃত উন্মত্তই হোক, হাত পড়ামাত্র যন্ত্র যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো বেজে উঠল। প্রথমে কাটা কাটা সুরে গজলের ঝংকার উঠল। পরমুহূর্তেই বেসুরো এলোমেলো ভাবে গজল থেমে গেল। আর একটা সুর বেজে উঠল। কিন্তু এত বিলম্বিত যে তাল কখনওই দিতে পারবে না অভয়। সুর তার চেনা। অচেনার মাঝামাঝি। সুবালা নিজে, আর এই গোটা ঘরের পরিবেশ, সুরের সঙ্গে মিলতে চাইল না। সুবালা হাসল। তাকাল অভয়ের দিকে। বলল, কেমন?

–ভাল।

কী সুর?

–জোনপুরী?

সুবালা ঘাড় নাড়ল, না। কিন্তু নাম বলল না। চড়া সুরে টেনে টেনে গাইল।

প্রদীপ নিভিয়া যায় সব আশা হায় মিলায় আঁধারে।
এখন নিজ অঙ্গে দেখি নিজ রঙ্গে কালের আঁচড়ে ॥

এ বিলম্বিত সুরের সঙ্গে তবলা সঙ্গত অসম্ভব নয় শুধু। অভয় স্থাণুর মতো বসে রইল। বাঁয়া-তবলার কথা ভুলে গেল সে। সুবালার রক্তাভ চক্ষু মুদ্রিত। চোখের পাতা দুটি তার অসম্ভব লাল দেখাচ্ছে। হয়তো মদের মাত্রাধিক্যেই, তার ঠোঁট কুঁচকে বিকৃত হয়ে উঠেছে। কিন্তু গানের শ্বাসরুদ্ধ বিলম্বিত সুরে ও কথায় সুবালার সব মালিন্য কোথায় অদৃশ্য হল। সন্দেহ হল, সুবালা কাঁদছে।

কিন্তু তার চোখে জল নেই। না থাক। সুবালার যে-বেশবাস অশ্লীল মনে হচ্ছিল, গানের সঙ্গে তা যেন একাত্ম হয়ে গেল। তার বসবার ভঙ্গিতে, প্রতি মুহূর্তে যে একটি রুদ্ধশ্বাস ভয়-ধরানো অবস্থা ছিল, সুর তাকে গ্রাস করল। কথা তাকে আবরণ দিল। অবিকৃত, আরও উচ্চ গলায় সে গাইল,

চিনিতে নারি আর, বুঝিতে পারি শুধু আপন হৃদয়।
পাষাণ সম লাগে এ হৃদয়েরি ভার চাহি বরাভয় ॥
রেখ না দাঁড়ায়ে লহ তোমার গোপন গহন গভীরে।
প্রদীপ নিভিয়া যায়…

গান শেষ হল। শুরু হল আবার। সুবালার গলার শির ফুলতে ফুলতে তার গাল বেয়ে, চোখের। কোল বেয়ে, কপালে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এ তার স্বাভাবিক অবস্থায় গান নয়। তাই কেবলই পুনরাবৃত্তি। পুনরাবৃত্তি কেবলই গোপন গহন গভীরে যাবার। নিঃশেষে লয়ের, হারাবার। সুবালার চোখে জল নেই। কিন্তু সে যেন চিৎকার করে কাঁদছে। এও যেন সুবালার দেহের মতো সত্য। সুবালা মুক্তি চায়।

আবার, আজ আবার সেই বহুকাল আগের এক রাত্রের নতমাথা পদাহত-বিতাড়িত বলে নিজেকে মনে হচ্ছে অভয়ের। রাজুবালার অনুরোধ এখন মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে। এ ঘরের ভাঙাচোরা বিশৃঙ্খল অবস্থা যেন সত্য নয়। আসোয়ারী সুর সত্য। মৃত্যুর আকুতি সত্য। সুবালার কোথাও ফাঁকি নেই। মিথ্যা শুধু অভয়ের মধ্যে। মিথ্যাচার তার নিজের সঙ্গে।

সে উঠতে গেল। গান থেমে গেল সুবালার। তার ছিঁড়ে যাওয়ার মতো স্তব্ধ হল তার গলা। বাইরে কাদের পায়ের শব্দ শোনা গেল। যারা শুনতে এসেছিল, তারা সরে পড়ছে হয়তো। সুবালা হারমোনিয়মের ওপর কনুই রেখে, গালে হাত দিয়ে তাকাবার চেষ্টা করল অভয়ের দিকে। কিন্তু তার চোখের পাতা অসম্ভব ভারী। খুলতে চাইছে না। বলল, চলে যাচ্ছ নাগর?

গলার স্বরে আর তার মত্ত উল্লাস ফুটছে না। চাপা পড়া শুকনো স্বর ধীর-গতি করাতের মতো শোনাল। বলল, কোথায় যাবে? তোমার নিমি তো নেই।

হাসিতে ফুলে ফুলে উঠল সুবালা। থুথু জমে, সাদা দেখাচ্ছে তার ঠোঁটের কশ। অভয় নেমে দাঁড়াল। পালাবার সময় এসেছে তার। সুবালা দ্বিতীয় বার মুখ খোলবার আগে চলে যেতে হবে তাকে।

সুবালা যেন হাসতে হাসতে বলল, মরবার আগে এসেছিল তোমার নিমি। আমার কাছে এসেছিল।

অভয়ের পা অবশ হয়ে গেল। অনড় নিশ্চল সে। সুবালা শুকনো চাপা পড়া গলায় বলল, নিমি আমাকে বললে, রাক্ষুসী, তোর এ কী মায়া রাক্ষুসী, আমাকে না দিতিস, তোর ধরে রাখতে কী। হয়েছিল। একে বলে মেয়েমানুষ বুঝলে হে নাগর। আমি কাউকে ধরিনি, ছাড়িওনি বাবা। আমি হেসে তাড়িয়ে দিয়েছিলুম নিমিকে। নেঙোবাই ছুঁড়ির আমার পেছুতে লাগতে এসেছিল। সেই ঘেন্নায় তোমাকে দেখতেও যাইনি। তুমি জেল থেকে এলে। পাড়া ঝেটিয়ে তোমাকে দেখতে গেল। আমি যাইনি। শেষে সবাই ভাববে, তালে আছি।

আবার ফুলে ফুলে হাসল সুবালা। উপুড় হয়ে এলিয়ে পড়ল হারমোনিয়মের ওপর। বেণী তার পিঠের পাশ দিয়ে এলিয়ে পড়েছে। হারমোনিয়মে জড়ে পড়া মুখ থেকে তার গলার স্বর বেরিয়ে আসতে লাগল–বেশ্যারা কাউকে ধরেও না ছাড়েও না। তার সবাই আপন সবাই পর কী বলো অ্যাঁ। যখন যার, তখন তার। তবে হ্যাঁ, আমি বাপু একটু সুখী। মনের মতন নাগর না হলে আমার ঘরে তুলতে ইচ্ছে করে না। বলে, মনের মতনটি হয়নি বলে আমার সাতপাকে বাঁধা সোয়ামি ছেড়ে চলে এসেছিলুম।

আবার হাসতে লাগল। তারপর সহসা মাথা তুলল। ভ্রূকুটি করে তাকাল অভয়ের দিকে। ঠোঁট কুঁচকে বলল, ও, তুমি কি ভেবেছ আমার ব্যায়রাম আছে? তাই থাকলে না?

দু হাত ঊর্ধ্বে তুলে বলল, এই দেখো, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নাও। কোথাও রোগ নেই আমার। তা, তোমার নিমিটা আমার জ্বালায় জ্বলল, তাই একটু শোধ দিতে চাইলুম। আচ্ছা, বলল তো, নিমি তোমাকে কেন সন্দেহ করত? তুমি কি আমাকে মনে মনে…

সুবালা মোটা শুকনো গলায় হেসে উঠল। অভয়ের বুকের মধ্যে কাঁপছে। যে ক্ষিপ্ত মহিষ তার রক্তের মধ্যে দাপাচ্ছিল, সে অনেকক্ষণ মরেছে। অক্ষমের মতো মাথা খুঁড়ে সে অনেকক্ষণ ঘাড় মটকে লুটিয়ে পড়েছে। সে বলি প্রত্যক্ষ হয়নি। সুবালার দেহের প্রতীক প্রতিমার পায়ে মনের অন্ধকারে সে নিহত হয়েছে। এখন শুধু সংশয়ের জ্বালা। সুবালাও সেই কথার বিন্দুতে এসে। থেমেছে। তবে কি তাই? সে কি মনে মনে তাই চেয়েছিল? সেই চাওয়া কি তার সব ভাসিয়ে, আজ এখানে টেনে নিয়ে এসেছিল। আশ্চর্য! আজ এখানে আসার সঙ্গে সারাদিনের ভাবনা-চিন্তার কোনও যোগাযোগ নেই। তবে?

এখন নয়। এ ভাবনা এ মুহূর্তে নয়। তার সারা জীবনের এই একটি প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হবে তাকে।

সুবালা আবার বলে উঠল, তা বলে আমাকে? একটা বেশ্যাকে? নিমির বর হয়ে? দূর দূর দূর!

যেন অভয়কে দূর দূর করে উঠল সুবালা। এ তার প্রাপ্য ছিল। তার কল্পনার শূন্য ঝাঁপিতে সাপ ছিল এ সত্য প্রকাশ হয়ে পড়েছে। তবু তাকে মুখ খুলতে হবে। সুবালাকে দুটি কথা বলতে হবে। আর সে কথা এখন তার নিজের কাছে ভান মাত্র। সে বলল, কিন্তু এ ভাবে তুমি আর কতদিন চালাবে? এটা ব্যবসার বাড়ি।

সুবালা একটা অবর্ণনীয় বিভঙ্গে কাত হয়ে পড়ল। হাত চাপা দিল চোখের ওপর। বলল, জানি। মাসিকে তো বলি। যে অঙ্গ পচে গেছে, তাকে বাদ দাও মাসি। মাসি তাড়ায় না যে।

–কোথায় পচেছে? তোমার রূপ আছে, বয়স আছে।

–মন গো মন! মন পচেছে। আমার মন!

একটি নিশ্বাস ফেলতে গিয়ে সুবালা সহসা ফুঁপিয়ে উঠল। ফিসফিস করে বলে উঠল। আমি কী করব? আমার ঘর ভাল লাগেনি। আমার শরীর বেচতে ভাল লাগে না। আমি কী করব? আমার মরতে ভয় করে। আমি কী করব?

যেন ফ্রক-পরা একটি ছোট মেয়ে কাঁদছে। দু হাত বাড়িয়ে অগ্রসর হতে ইচ্ছে করল অভয়ের। কিন্তু তার সাহস হল না। তার নিজের সঙ্গে নিজের পরিচয় নেই। তার ইচ্ছের সঙ্গে আপন হাতের পরিচয় নেই। সে দেখল, সুবালা নিশ্চুপ। এলিয়ে পড়ে আছে অচৈতন্য ভাবে। সে পিছন ফিরে ঘরের দরজা খুলল। দেখল রাজুবালা দাঁড়িয়ে।

রাজুবালা কোনও কথা না বলে আগে ঘরে ঢুকে দেখল সব। তারপর শাড়ি নিয়ে ঢেকে দিল সুবালাকে। দিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখল সুবালাকে একবার।

অভয় সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল। পিছন থেকে ডাকল রাজুবালা, শোনো জামাই।

অভয় দাঁড়াল। উঠোনটা তখন খালি। বাড়িটার ঘরে ঘরে বন্ধ দরজায় গুলতানির শব্দ। রাজুবালা অভয়ের সামনে এসে বলল, ওকে দিয়ে ব্যবসা যে আর চলবে, মনে হয় না।

অভয় কোনও জবাব খুঁজে পেল না। রাজুবালা আবার বলল, বলো তো জামাই, ওকে কি তোমার পাগল মনে হল?

অভয় বলল, এ রকম পাগল তো আর দেখিনি মাসি।

–সেই তো কথা বাবা। সবাই ওকে তাড়িয়ে দিতে চায়। ব্যবসা করতে গেলে, দেওয়াই উচিত। কিন্তু সব কি মানা যায়? এ লাইনে মেয়েদের জীবনে একবার এ রকম সময় আসে। আবার চলেও যায়। খাওয়া-পরার ভয়ের গুঁতোয় চলে যায়। আমি জানি আমারও এক সময়ে এ রকম হয়েছিল। লোচন ঘোষ বাঁচিয়ে দিয়েছিল আমাকে। সে আমার সঙ্গে গাইত। কিন্তু সুবলির খাওয়া-পরার ভয় নেই। শুকিয়ে মরার ভয় নেই। ও যে আর ব্যবসা করতে পারবে, মনে হয় না। কী পেলুম? এই ভাবনা। কী পেলুম? এ জীবনটা নিয়ে কী করছি? এ সব চিন্তা মাথার ঘায়ের মতো। তাদের শান্তি নেই। কিন্তু কী বলব! এখন ওকে কে আদর করে বুকে নিয়ে সোহাগ করবে? দিন রাত খোশামোদ করতে হবে, খেসমত খাটতে হবে। তাও ব্যাটাছেলে হওয়া চাই। কিন্তু কোনওদিন কাছে যেতে চাইবে না। যে দিন ওর মর্জি হবে, শুধু সেদিন। তা এমন লোক কোথায় পাব আমি? যে লোক ওকে নিয়ে সারাক্ষণ থাকবে?

অভয় মাথা নিচু করে শুনল। কিন্তু কোনও জবাব দিল না। হয় তো রাজুবালার কথায় ইঙ্গিত ছিল। সে বলল, মাসি যাচ্ছি।

এসো বাবা। সময় পেলে একটু-আধটু এসো। তোমার কত নাম ধাম, কিন্তু আমরা তোমার পর নই কিন্তু। তোমার নাম হলে আমাদের বুক ফোলে।

অভয় বলল, জানি মাসি।

সে বেরিয়ে গেল এবং তৎক্ষণাৎ তার বুকের মধ্যে যন্ত্রণা একটা কাঁটার মতো বিদ্ধ হল। সেই সন্ধ্যাবেলার মতোই। অভয়ের কত নাম! তার গৌরবে, অপরের গৌরব! মিথ্যে! সব মিথ্যে হয়ে গেছে আজ তার নিজের কাছে। কী ভাবে এর প্রায়শ্চিত্ত হবে? কেমন করে! তার ভিতরের পাপের সঙ্গে সে কী দিয়ে যুঝবে? তার বাইরেটা এক। ভিতরটা আর এক। সে অবিশ্বাসী। মিথ্যুক। তবে কোথায় দাঁড়িয়ে সে বাঁচছে? দশ জনের সঙ্গে চলছে, ফিরছে, কথা বলছে?

একদিন রাত্রে যেটাকে ভুল মনে হয়েছিল, আজ দেখা গেল, সেটা শতপাকে জড়ানো। নিজের সঙ্গে অপরিচয়ের দুঃসহ ব্যথা নিয়ে, বাড়িতে এসে পৌঁছুল সে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *