১. গৃহত্যাগ

গৃহত্যাগ

বিসিই ষষ্ঠ শতকের শেষ দিকে এক রাতে সিদ্ধার্থ গৌতম নামে এক যুবক হিমালয়ের পাদদেশে কাপিলাবাস্তুর আরামদায়ক বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসে পথে নামলেন।[১] আমাদের বলা হচ্ছে তাঁর বয়স ছিল ঊনত্রিশ বছর। কাপিলাবাস্তুর অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন তাঁর বাবা, গৌতম চাইতে পারেন এমন সমস্ত বিলাসিতা দিয়ে তাঁকে ঘিরে রেখেছিলেন তিনি। স্ত্রী ছিল তাঁর, আর মাত্র কয়েকদিন বয়সী একটা ছেলে। কিন্তু ছেলের জন্মের মুহূর্তে এতটুকু আনন্দ বোধ করেননি গৌতম। ছেলেকে তিনি রাহুলা বা ‘বাঁধন’ নামে ডেকেছেন; তাঁর বিশ্বাস ছিল শিশুটি তাঁকে ঘৃণিত হয়ে ওঠা জীবনধারার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলবে।[২] তিনি এক ‘সুপরিসর’ এবং ‘চকচকে খোলসের মতো পূর্ণাঙ্গ ও খাঁটি’ অস্তিত্বের প্রত্যাশী ছিলেন, কিন্তু তাঁর বাবার বাড়িটি অভিজাত, মার্জিত হলেও গৌতমের কাছে সংকীর্ণ, ‘গিজগিজে’ ও ‘ধূলিময়’ মনে হয়েছে। খুচরো কাজকর্ম ও অর্থহীন দায়দায়িত্ব সবকিছূ জীর্ণ করে রেখেছে। ক্রমবর্ধমানহারে নিজেকে এমন এক জীবনযাত্রার আকাঙ্ক্ষা বোধ করছেন বলে আবিষ্কার করছিলেন তিনি যার সঙ্গে সংসার ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। ভারতের সাধুরা যাকে ‘গৃহত্যাগ’[৩] বলেন। গাঙ্গেয় অববাহিকার উর্বর সমতলের প্রান্তবর্তী নিবিড় বিস্তীর্ণ বনভূমি হাজার হাজার নারী-পুরুষের আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল যারা তাদের মতে ‘পবিত্র জীবন’ (ব্রহ্মাচার্য্য)-এর সন্ধানে পরিবার ত্যাগ করেছিল। এই দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গৌতম!

সিদ্ধান্তটা রোমান্টিক ছিল। কিন্তু তাঁর ভালোবাসার পাত্রদের জন্যে দারুণ বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেটা। গৌতমের মা-বাবা, পরে স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি, আদরের সন্তানকে সাধুদের পোশাকে পরিণত হওয়া গেরুয়া জোব্বা গায়ে চাপিয়ে মাথা আর দাড়িগোঁফ কামাতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।[৪] কিন্তু আমাদের এও বলা হয়েছে যে, বিদায় নেওয়ার আগে ঘুমন্ত স্ত্রী ও ছেলেকে এক নজর দেখবেন বলে জন্যে লুকিয়ে ওপরতলায় ওঠেন তিনি, কিন্তু কোনও রকম বিদায় সম্ভাষণ ছাড়াই আবার সেখান থেকে সরে আসেন।[৫] যেন স্ত্রী থেকে যাবার জন্যে কাকুতি-মিনতি শুরু করলে আপন সিদ্ধান্তে অটল থাকার ব্যাপারে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারেননি। এটাই সমস্যার মূল। বনবাসী বহু সন্ন্যাসীর মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন যে, দুঃখ ও বেদনায় ভরপুর এক অস্তিত্বের সঙ্গে বন্দিকারী বস্তু ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কই তাঁকে যন্ত্রণা ও দুঃখের সাথে বেঁধে দিয়েছে। সন্ন্যাসীদের কেউ কেউ পচনশীল জিনিসের প্রতি আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে আত্মাকে টেনে নামানো মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে যাওয়া থেকে বিরত রাখা ‘ধুলিকণার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। নিজের বাড়িকে ‘ধূলিময়’ বর্ণনা করার সময় সম্ভবত এমন কিছুই বুঝিয়েছেন সিদ্ধার্থ। তাঁর বাবার বাড়ি মোটেই নোংরা ছিল না, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে টান সৃষ্টিকারী মানুষে ও তাঁর চোখে মূল্যবান জিনিসপত্রে ছিল পরিপূর্ণ ছিল। পবিত্রতায় বসবাস করতে চাইলে তাঁকে এইসব বাঁধন ছিন্ন করে মুক্ত হতেই হবে। একেবারে গোড়া থেকেই সিদ্ধার্থ গৌতম ধরে নিয়েছিলেন সাংসারিক জীবন আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে মানানসই নয়। এটা কেবল ভারতের অন্যান্য সাধুদের ধারণা ছিল না, বরং জেসাসও এমনটাই মনে করতেন। পরবর্তীকালে তিনি শিষ্যদের বলেছেন তাঁকে অনুসরণ করতে চাইলে অবশ্যই স্ত্রী-সন্তান ত্যাগ করতে হবে; পরিত্যাগ করতে হবে বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়দের।[৬]

সুতরাং আমাদের চলতি ‘পারিবারিক মূল্যবোধের’ বিশ্বাসের সঙ্গে একমত হতেন না গৌতম। পৃথিবীর অন্যান্য অংশে কুনফুসিয়াস (৫৫১-৪৭১) এবং সক্রেটিসের মতো তাঁর সমসাময়িক বা প্রায় সমসাময়িক ব্যক্তিরাও তাই। অবশ্যই সংসারি ছিলেন না তাঁরা, কিন্তু এই সময়কালে মানুষের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রধান ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। কেন এই প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা? পরবর্তী সময়ের বুদ্ধ ধর্মগ্রন্থসমূহ গৌতমের সংসার ত্যাগ ও তাঁর গৃহহীনতার পথে ‘অগ্রসর হওয়ার’ বিস্তারিত পৌরাণিক বিবরণ গড়ে তুলবে। বর্তমান অধ্যায়ের শেষ দিকে আমরা সেসব বিবেচনা করব। কিন্তু পালি লিপির প্রথম দিকের টেক্সটসমূহ তরুণের সিদ্ধান্তের প্রত্যক্ষ বর্ণনা তুলে ধরে। মানুষের জীবনের দিকে তাকিয়ে গৌতম কেবলই দুঃখ-কষ্টের এক করুণ চক্র দেখতে পেয়েছেন। জন্ম-যন্ত্রণা দিয়ে যার শুরু এবং যা অনিবার্যভাবে ‘জরা, অসুস্থতা, মৃত্যু, বিষাদ ও বিকৃতির’[৭] দিকে এগিয়ে যায়। এই সর্বজনীন নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম নন তিনি। এখন তিনি তরুণ, স্বাস্থ্যবান এবং সুদর্শন, কিন্তু যখনই আসন্ন ক্লেশের কথা ভাবতে যান, তারুণ্যের সমস্ত আনন্দ ও আস্থা তাঁকে ছেড়ে যায়। বিলাসী জীবনযাত্ৰা অর্থহীন, তুচ্ছ মনে হয়। জরাগ্রস্ত কোনও বৃদ্ধ পুরুষ বা ঘৃণ্য কোনও রোগে বিকৃত হয়ে যাওয়া কাউকে দেখে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে ওঠার অনুভূতি মানিয়ে উঠতে পারেন না। একই নিয়তি–কিংবা এর চেয়ে খারাপ কিছু–তাঁর ও তাঁর প্রিয়জনের উপর পতিত হবে।[৮] তাঁর বাবা-মা, শিশু-পুত্রসহ স্ত্রী, বন্ধুবান্ধব সবাই সমান নাজুক ও দুর্বল। ওদের আঁকড়ে ধরে ভালোবাসায় আকৃষ্ট হওয়ার সময় আবেগের সাথে এমন কিছুতে নিজেকে জড়াচ্ছেন যা কেবল দুঃখ বয়ে আনতে পারে। স্ত্রী সৌন্দর্য হারাবে, ছোট্ট রাহুলা আগামীকালই মারা যেতে পারে। মরণশীল, ক্ষণস্থায়ী বস্তুর মাঝে সুখের সন্ধান কেবল অযৌক্তিকই নয়: ভালোবাসার পাত্র ও নিজের জন্যে অপেক্ষমান দুঃখ-দুর্দশা বর্তমানের ওপর গভীর ছায়া ফেলেছে, এইসব সম্পর্কের সমস্ত আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।

কিন্তু জগতকে এমন বিবর্ণ রূপে কেন দেখেছেন গৌতম? মরণশীলতা জীবনের এমন এক সত্য যা সহ্য করা কঠিন। মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা একদিন মারা যেতে হবে জেনে জীবন ধারণ করে। বিলুপ্তির এই দর্শন নিয়ে চিন্তা করা সব সময়ই তার কাছে কঠিন ঠেকে। কেউ কেউ স্রেফ বালিতে মাথা লুকিয়ে জগতের দুঃখের কথা ভাবতে অস্বীকার যায়। কিন্তু এটা অবশ্যই সঠিক নয়, কারণ আমরা পুরোপুরি অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকলে জীবনের ট্র্যাজিডি বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রাচীন কাল থেকেই নারী-পুরুষ হতাশাব্যাঞ্জক ভিন্নরকম প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আমাদের অস্তিত্বের পরম অর্থ ও মূল্য আছে এমন একটা বোধের চর্চা করার জন্যে ধর্মের উৎপত্তি ঘটিয়েছিল। কিন্তু মাঝে মাঝে বিশ্বাসের মিথ ও অনুশীলনকে অবিশ্বাস্য ঠেকে। মানুষ তখন নিত্য নৈমিত্তিক জীবনের ক্লেশের ঊর্ধ্বে ওঠার জন্যে অন্য উপায়ের আশ্রয় নেয়: শিল্পকলা, সঙ্গীত, যৌনতা, খেলাধুলা কিংবা দর্শন। আমরা খুব সহজে হতাশ হয়ে পড়ি আবার আমরাই জীবন যে ভালো কিছু, নিজেদের মাঝে সেই আস্থা সৃষ্টিতে কঠোর পরিশ্রম করি, যদিও চারপাশে যন্ত্রণা, নিষ্ঠুরতা, অসুস্থতা আর অনাচারই দেখতে পাই কেবল। গৃহত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কেউ হয়তো ভাবতে পারে গৌতম বুদ্ধ জীবনের তিক্ত বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন; পরিণত হয়েছিলেন এক গভীর বিষণ্নতার শিকার।

কিন্তু ব্যাপারটা তেমন ছিল না। এক সাধারণ ভারতীয় গৃহের সাংসারিক জীবন নিয়ে প্রকৃতই মোহমুক্তি ঘটেছিল গৌতমের, কিন্তু তিনি খোদ জীবনের আশা হারাননি। বরং সম্পূর্ণ উল্টো। তিনি স্থির নিশ্চিত ছিলেন, অস্তিত্বের হেঁয়ালির একটা সমাধান আছে, তিনিই সেটা উদ্ধার করতে পারবেন। গৌতম ‘পেরেলিয়ান দর্শন’ নামে পরিচিত দর্শনের অনুসারী ছিলেন, কারণ প্রাক- আধুনিক পৃথিবীর সকল সংস্কৃতির মানুষের কাছে তা সুবিদিত ছিল।[৯] ঐ জাগতিক জীবন অনিবার্যভাবে নাজুক এবং মৃত্যুর ছায়ায় এর অবস্থান, কিন্তু তা সমগ্ৰ বাস্তবতাকে তুলে ধরে না। ধারণা করা হতো মর্ত্য জীবনের সমস্ত কিছুর আরও শক্তিশালী, ইতিবাচক স্বর্গীয় অনুকৃতি রয়েছে। এখানে আমাদের সব অভিজ্ঞতাই স্বর্গীয় বলয়ের একটা আদি রূপের অনুসরণ: দেবতাদের জগৎ হচ্ছে আদি নকশা, মানবীয় বাস্তবতা যার মলিন ছায়ামাত্র। এই ধারণা প্রাচীন বিশ্বের বেশির ভাগ সংস্কৃতির মিথোলজি, আচার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ তুলে ধরে এবং আমাদের কালের অধিকতর প্রথাগত সমাজকে প্রভাবিত করে চলেছে। আধুনিক বিশ্বে আমাদের পক্ষে এমন ধারণা উপলব্ধি করা কঠিন, কারণ একে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় প্রমাণ করা যাবে না; আমরা যাকে সত্যের জন্যে অনিবার্য মনে করি সেই যৌক্তিক অবলম্বনের ঘাটতি রয়েছে এর। কিন্তু এই মিথ সত্যিই আমাদের অপরিণত বোধ তুলে ধরে যে, জীবন অসম্পূর্ণ এবং এখানেই সব কিছু শেষ হতে পারে না; নিশ্চয়ই অন্য কোথাও আরও ভালো, পূর্ণাঙ্গ ও সন্তুষ্টিকর একটা কিছু আছে। নিবিড় ও আন্তরিক প্রতীক্ষা শেষে প্রায়শঃ মনে হয় আমাদের ঠিক নাগালের বাইরে কিছু একটা রয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ একটা পার্থক্যসহ এই বিশ্বাসের অংশীদার ছিলেন গৌতম। এই ‘একটা কিছু’ দেবতাদের স্বর্গীয় জগতে সীমাবদ্ধ, এটা বিশ্বাস করেননি তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দুঃখ-দুর্দশা, শোক ও যন্ত্রণা-ভরা মরণশীল এই জগতেই তিনি একে প্রদর্শনযোগ্য বাস্তবতায় পরিণত করতে পারবেন।

এভাবে নিজেকে যুক্তি দেখিয়েছেন তিনি, আমাদের জীবনে ‘জন্ম, জরা, অসুস্থতা, মৃত্যু, দুঃখ আর দুর্নীতি’ থাকলে এইসব দুঃখ-দুর্দশার ইতিবাচক প্রতিরূপ থাকতেও বাধ্য; সুতরাং অস্তিত্বের আরেকটি ধরণ আছে। সেটা আবিষ্কার করাই তাঁর কাজ। ‘ধরা যাক,’ বলেছেন তিনি, ‘আমি যদি অজাত, অজর, অসুখহীন, মৃত্যুহীন, দুঃখহীন, অবিকৃত ও এই বন্ধন হতে পরম মুক্তির সন্ধান শুরু করি?’ পরিপূর্ণ সন্তুষ্টিকর এই অবস্থাকে তিনি বললেন নিব্বানা (‘নির্বাপিত হওয়া’)।[১০] গৌতমের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আমরা যেভাবে ফুঁ দিয়ে অগ্নিশিখা নিভিয়ে দিই ঠিক তেমনি মানবাত্মার এত দুঃখ-কষ্টের কারণ আবেগ, সম্পর্ক ও মোহকে ‘নির্বাপিত’ করা সম্ভব। নিব্বানা লাভ অনেকটা আমরা জ্বর হতে সেরে ওঠার পর যেমন ‘ঠাণ্ডা’ অনুভব করি অনেকটা সেকরম: গৌতমের আমলে সম্পর্কিত বিশেষণ নিব্বুতা দৈনন্দিন খিঁচুনি বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ ছিল। তো গৌতম গৃহত্যাগ করছিলেন মানুষকে আক্রান্তকারী অসুস্থতার একটা প্রতিকারের খোঁজে যা নারী ও পুরুষকে অসুখে পূর্ণ করে রাখে। জীবনকে এমন হতাশাব্যঞ্জক ও দুঃসহ করে তোলা এই সর্বজনীন দুঃখদুর্দশা চিরকাল বয়ে বেড়ানো আমাদের নিয়তি নয়। আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা বর্তমানে ভ্রান্তিময় হলেও, আদিরূপের আইন অনুযায়ী অস্তিত্বের আরেকটা রূপ নিশ্চয়ই আছে যা ত্রুটিপূর্ণ ও ক্ষণস্থায়ী নয়। ‘এমন কিছু আছে যা সাধারণভাবে জন্ম নেয় না, যেটা সৃষ্টও নয় আবার যা অক্ষত থেকে যায়,’ পরবর্তী জীবনে জোর দিয়ে বলবেন গৌতম। ‘এর অস্তিত্ব না থাকলে, উদ্ধার পাওয়ার উপায় বের করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।’[১১]

আধুনিক কেউ তাঁর এমনি আনাড়ি আশাবাদে হাসতে পারেন, চিরকালীন আদিরূপের মিথকে সম্পূর্ণ আজগুবি মনে করতে পারেন। কিন্তু গৌতম দাবি করেছেন, উদ্ধারের পথ পেয়েছেন তিনি, সুতরাং নিব্বানার অস্তিত্ব ছিল। অবশ্য বহু ধর্মীয় ব্যক্তির মতো তিনি এই মহৌষধকে অতিপ্রাকৃত মনে করেননি। অন্য জগৎ হতে স্বর্গীয় সহায়তার ওপর নির্ভর করেননি তিনি। বরং তাঁর স্থির বিশ্বাস ছিল, নিব্বানা এমন একটা অবস্থা যা মানব সন্তানের পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। যে কোনও প্রকৃত সন্ধানীই এর দেখা পাবে। গৌতম বিশ্বাস করেছেন এই অসম্পূর্ণ জগতেই তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা পাবেন। দেবতাদের বার্তার অপেক্ষায় না থেকে উত্তরের খোঁজে নিজের মাঝে সন্ধান চালাবেন, মনের দূরতম কন্দরে ঢুকবেন এবং তাঁর সকল শারীরিক সম্পদ কাজে লাগাবেন। শিষ্যদের একই কাজ করতে বলবেন তিনি। জোর দিয়ে বলবেন, কেউ যেন তাঁর শিক্ষাকে জনশ্রুতি ধরে না নেয়। তাদের অবশ্যই নিজস্ব অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁর সমাধানের সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। নিজেদেরই বের করতে হবে যে, তাঁর পদ্ধতি ফল দেয়। দেবতাদের কাছ থেকে কোনও সাহায্য প্রত্যাশা করতে পারবে না তারা। দেবতাদের অস্তিত্ব আছে, বিশ্বাস করতেন গৌতম, কিন্তু তাঁদের ব্যাপারে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। এখানেও তাঁর সময় ও সংস্কৃতিরই মানুষ ছিলেন তিনি। ভারতীয় জনগণ অতীতে দেবতাদের পূজা করেছে: বনদেবতা ইন্দ্র; স্বর্গীয় শৃঙ্খলার রক্ষক বরুণ; অগ্নিদেবতা অগ্নি। কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ এইসব দেবতা অধিকাংশ চিন্তাশীল মানুষের ধর্মীয় সচেতনতা থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন। তাদেরকে ঠিক মূল্যহীন হিসাবে দেখা হতো না, কিন্তু পূজা-অর্চনার পাত্র হিসাবে অপর্যাপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন। মানুষ ক্রমবর্ধমান হারে সচেতন হয়ে উঠছিল যে, দেবতারা তাদের প্রকৃত ও যথার্থ সাহায্য করতে পারবেন না। তাঁদের সম্মানে প্রদত্ত উৎসর্গ আসলে মানবীয় দুর্দশা প্রশমিত করেনি। অধিক হারে নারী-পুরুষ পুরোপুরি নিজেদের ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল সৃষ্টি জগৎ নৈর্ব্যক্তিক আইনে শাসিত হয়, দেবতারাও যার অধীন। দেবতারা গৌতমকে নিব্বানার পথ দেখাতে পারবেন না, তাঁকে আপন প্রয়াসের ওপর নির্ভর করতে হবে।

সুতরাং নিব্বানা ক্রিশ্চানদের স্বর্গের মতো কোনও জায়গা নয় যেখানে মৃত্যুর পর বিশ্বাসীরা দল বেঁধে যাবে। প্রাচীন বিশ্বের খুবই অল্প সংখ্যক মানুষ এই পর্যায়ে আনন্দময় অমরত্বের আশা করত। প্রকৃতপক্ষে, গৌতমের আমলে ভারতীয় জনগণ বর্তমান যন্ত্রণাকর অস্তিত্বের নিগড়ে পুরোপুরি বন্দি মনে করছে নিজেদের। ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভকারী পুনর্জন্মের মতবাদ থেকে যেমনটা দেখতে পাই আমরা। মনে করা হতো যে, নারী বা পুরুষ মৃত্যুর পর তার বর্তমান জীবনের কর্মকাণ্ডের (কম্ম) মান দিয়ে নির্ধারিত এক নতুন রূপে পুনর্জন্ম নেবে। খারাপ কৰ্ম্ম’র মানে হবে আপনি ক্রীতদাস, জানোয়ার বা গাছ হিসাবে পুনর্জন্ম নেবেন; সুকৰ্ম্ম পরবর্তী কালে উন্নত অস্তিত্ব নিশ্চিত করবে: আপনি রাজা এমনকি দেবতা হিসাবেও পুনর্জন্ম লাভ করতে পারেন। কারণ কোনও একটি স্বর্গে পুনর্জন্ম লাভ করা সুখকর পরিসমাপ্তি নয়, কারণ ঐশ্বরিকতা অন্য যে কোনও অবস্থার চেয়ে অধিকতর স্থায়ী নয়। শেষ পর্যন্ত এমনকি দেবতারও তাঁকে স্বর্গীয় রূপ দানকারী সৎ কম্ম ফুরিয়ে যাবে, তিনি মারা যাবেন এবং পৃথিবীতে কম সুবিধাজনক অবস্থায় পুনর্জন্ম নেবেন। সুতরাং, সকল সত্তাই সামসারা (‘এগিয়ে নেওয়া’)র অন্তহীন চক্রে বাঁধা পড়ে আছে যা তাকে এক জীবন থেকে অন্য জীবনে ঠেলে দেয়। বহিরাগত কারও কাছে একে উদ্ভট তত্ত্ব মনে হয়, কিন্তু এটা দুঃখ-দুর্দশার সমস্যা সমাধানের সিরিয়াস প্রয়াস ছিল। একে প্রায়শঃই দুষ্টের পালনকারী ও ঘনঘন ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বলে মনে হওয়া ব্যক্তিরূপী ঈশ্বরকে মানুষের নিয়তি নির্ধারণের জন্যে দায়ী করার চেয়ে অন্তস্থভাবে অনেক বেশি সন্তোষজনক হিসাবে দেখা যেতে পারে। কম্মের বিধান সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক মেকানিজম যা ন্যায়সঙ্গতভাবে কারও প্রতি বৈষম্য ছাড়াই প্রযুক্ত হয়েছে। কিন্তু একের পর এক জীবন কাটানোর সম্ভাবনা উত্তর ভারতের অধিকাংশ মানুষের মতো গৌতমকেও আতঙ্কে পূর্ণ করে তুলেছিল।

এটা হয়তো বোঝা কঠিন। আজকাল আমাদের অনেকেই অনুভব করেন যে আমাদের জীবন অতি সংক্ষিপ্ত। নতুন করে জীবন শুরুর সুযোগ পেলে তাঁরা খুশি হবেন। কিন্তু গৌতম ও তাঁর সমসাময়িকদের পুনঃমৃত্যুর চেয়ে পুনর্জন্মের সম্ভাবনাই বেশি আতঙ্কের কারণ ছিল। জরাগ্রস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া সহ্য করা বা ক্রমাগত অসুস্থ হতে হতে ভীতিকর ও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর মোকাবিলা একবারই যথেষ্ট খারাপ ছিল, কিন্তু বারবার এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে বাধ্য হওয়াটা অসহনীয়, একেবারেই অর্থহীন মনে হয়েছে। মানুষকে সামসারা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে চূড়ান্ত মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যেই সে সময়ের অধিকাংশ ধর্মীয় সমাধান পরিকল্পিত হয়েছিল। নিব্বানার মুক্তি ছিল বোধের অতীত, কারণ তা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা হতে বহু দূরবর্তী ছিল। হতাশা, দুঃখ বা বেদনা নেই, আবার আমাদের নিয়ন্ত্রণের অতীত উপাদানে বাঁধা নয় এমন একটা জীবনধারা বর্ণনা করার বা চিন্তা করার মতো কোনও ভাষা নেই আমাদের। কিন্তু গৌতমের আমলের সাধুরা এই স্বাধীনতাকে প্রকৃত সম্ভাবনা বলে মেনে নিয়েছিলেন। পশ্চিমা জনগণ প্রায়ই ভারতীয় চিন্তাচেতনাকে নেতিবাচক ও নাস্তিবাদী বলে বর্ণনা করে থাকে। আসলে তা নয়। এটা ছিল শ্বাসরুদ্ধকরভাবে আশাবাদী। গৌতম পরিপূর্ণভাবে এর অংশীদার ছিলেন।

খাবারের জন্যে হাত পাতে এমন একজন যাযাবর সন্ন্যাসীর গেরুয়া বসন পরে গৌতম যখন পিতৃগৃহ ত্যাগ করলেন, তাঁর বিশ্বাস ছিল উত্তেজনাকর কোনও অ্যাডভেঞ্চার নেমেছেন তিনি। তিনি ‘প্রশন্ত পথে’র প্রলোভন ও ‘গৃহহীনতা’র উজ্জ্বল, নিখুঁত অবস্থা অনুভব করেছেন। এই সময় সকলেই ‘পবিত্র জীবন’কে মহান অনুসন্ধান বলে উল্লেখ করত। রাজা, বণিক ও সম্পদশালী পরিবারগুলো সমানভাবে এই ভিক্ষুদের সম্মান করত, তাদের খাওয়ানোর সুযোগ পেতে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামত। কেউ কেউ তাদের নিয়মিত পৃষ্ঠপোষক ও শিষ্যে পরিণত হয়েছিল। এটা কোনও উন্মাদনা ছিল না। ভারতীয় জনগণ অন্য যে কারও মতো বস্তুবাদী হতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিকতা সন্ধানকারীদের সম্মান দেখানোর সুপ্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে তাদের। তারা তাদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। তারপরও বিসিই ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দিকে গাঙ্গেয় এলাকায় বিশেষ একরকম তাগিদ ছিল। মানুষ গৃহত্যাগীদের দুর্বল সমাজ-ত্যাগী হিসাবে দেখেনি। ওই অঞ্চলে আধ্যাত্মিক সংঘাত চলছিল। গৌতমের অনুভূত বিভ্রান্তি ও বৈষম্যের ব্যাপকতা ছিল। সাধারণ মানুষ একটা নতুন ধর্মের প্রয়োজন সম্পর্কে মরিয়াভাবে সচেতন ছিল। এভাবে সন্ন্যাসী এমন এক অনুসন্ধানে লিপ্ত ছিলেন যা প্রায়শঃই নিজস্ব বিশাল ক্ষতির মাধ্যমে শিষ্যদের উপকারে আসবে। শক্তি, বল ও দক্ষতা বোঝাতে গৌতমকে প্রায়শঃই বীরত্বসূচক উপমায় বর্ণনা করা হয়। তাঁকে সিংহ, বাঘ ও হিংস্র হাতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তরুণ বয়সে তাঁকে ‘সুদর্শন অভিজাতজন, দুর্ধর্ষ সেনাদলের নেতা বা হস্তি বাহিনীর প্রধান’[১২] হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে। এই সন্ন্যাসীদের লোকে নারী-পুরুষকে দুঃখদুর্দশা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে আত্মার জগতে অভিযান চালানো অগ্রগামী হিসাবে দেখত। চলমান অস্থিরতার কারণে অনেকেই একজন বুদ্ধের আগমন আকাঙ্ক্ষা করত, এমন একজন যিনি ‘আলোকপ্রাপ্ত,’ মানুষের পূর্ণ সম্ভাবনায় ‘জাগ্রত’। যিনি আকস্মিকভাবে অচেনা ও নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠা এক জগতে শান্তির খোঁজ পেতে অন্যদের সাহায্য করতে পারবেন।

ভারতের জনগণ কেন জীবন সম্পর্কে এমন অস্বস্তিকর অনুভূতি লাভ করেছিল? এই অস্থিরতা কেবল উপ-মহাদেশেই সীমিত ছিল না, বরং সভ্য জগতের বেশ কিছু দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষকেও আক্রান্ত করেছিল। ক্রমবর্ধমান সংখ্যকের ধারণা জন্মেছিল যে, তাদের পূর্বসুরিদের অনুসৃত আধ্যাত্মিক অনুশীলন আর কাজে আসছে না। দার্শনিক ও ভাববাদী প্রতিভাবানরা সমাধান বের করার জন্যে ব্যাপক প্রয়াস পেয়েছিলেন। কোনও কোনও ইতিহাসবিদ মানবজাতির জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে এই সময়কালকে (৮০০ থেকে ২০০ বিসিই পর্যন্ত বিস্তৃত) ‘অ্যাক্সিয়াল যুগ’ বলে অভিহিত করেন। এই সময়ে বিকশিত সামাজিক মূল্যবোধ বর্তমান কালেও নারী-পুরুষকে পরিপুষ্ট করে চলেছে।[১৩] অষ্টম, সপ্তম ও ষষ্ঠ শতকের মহান হিব্রু পয়গম্বর, ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতাব্দীতে চীনের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সংস্কার সাধনকারী কনফুসিয়াস ও লাও সু; ষষ্ঠ শতকের ইরানি সাধু যরোস্ট্রার; এবং গ্রিকদের স্বয়ং-প্রমাণিত সত্য বলে মনে হওয়া বিষয়গুলোকে প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধকারী সক্রেটিস ও প্লেটোর (৪২৭-৩২৭) পাশপাশি অ্যাক্সিয়াল যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নক্ষত্রে পরিণত হবেন গৌতম। এই ব্যাপক পরিবর্তনে অংশগ্রহণকারীরা এক নয়া জমানার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছেন, তাঁরা কোনও কিছুই আর আগের মতো থাকবে না বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন।

অ্যাক্সিয়াল যুগ বর্তমানে আমাদের পরিচিত মানব জাতির সূচনা নির্দেশ করে। এই সময়কালে নারী-পুরুষ তাদের অস্তিত্ব, আপন প্রকৃতি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নজীরবিহীনভাবে সচেতন হয়ে উঠেছিল।[১৪] এক নিষ্ঠুর জগতে নিজেদের প্রবল অক্ষমতার অনুভূতি আপন সত্তার মাঝে সর্বোচ্চ লক্ষ্য ও পরম সত্যি সন্ধানে বাধ্য করেছে তাদের। সময়ের মহান সাধুরা মানুষকে জীবনের জ্বালা-যন্ত্রণার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, নিজেদের দুর্বলতার ঊর্ধ্বে ওঠার কৌশল ও ত্রুটিপূর্ণ জগতে শান্তিতে বসবাস করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। এই সময়ে গড়ে ওঠা নতুন ধর্মীয় ব্যবস্থাগুলো–চীনে তাওবাদ ও কুনফুসিয়াবাদ, ভারতে বুদ্ধ মতবাদ ও হিন্দু মতবাদ, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের একেশ্বরবাদ, ইউরোপের গ্রিক যুক্তিবাদ–সুস্পষ্ট পার্থক্য সত্ত্বেও মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। কেবল এই ব্যাপক পরিবর্তনে যোগ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন জাতি অগ্রগতি অর্জন ও ইতিহাসের অগ্রযাত্রায় শরিক হতে পেরেছিল।[১৫] কিন্তু এর ব্যাপক গুরুত্ব সত্ত্বেও অ্যাক্সিয়াল যুগ রহস্যময় রয়ে গেছে। মাত্র তিনটি প্রধান এলাকায়–চীন, ভারত ও ইরানে–আর পূর্ব ভূমধ্য মহাসাগরীয় এলাকায় তা শেকড় গেড়েছিল কেন কেউ জানে না, আমরা এর উদ্ভবের কারণও জানি না। কেন কেবল চীনা, ইরানি, ভারতীয়, ইহুদি ও গ্রিকরা এই নতুন দিগন্তের অভিজ্ঞতা পেয়েছিল এবং আলোকন ও মুক্তির নতুন এই অনুসন্ধান যোগ দিয়েছিল? বাবিলনবাসী ও মিশরিয়রাও মহান সভ্যতা গড়ে তুলেছিল, কিন্তু এই পরিচয়ে তারা অ্যাক্সিয়াল আদর্শ গড়ে তোলেনি। বেশ পরে নতুন মল্যবোধে যোগ দিয়েছে: অ্যাক্সিয়াল প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ইসলাম বা ক্রিশ্চান ধর্মে। কিন্তু অ্যাক্সিয়াল দেশগুলোয় অল্প সংখ্যক মানুষ নতুন সম্ভাবনার আভাস পেয়ে প্রাচীন প্রথা ভেঙে বেরিয়ে গেছে। তারা তাদের সত্তার গভীর কন্দরে পরিবর্তন সন্ধান করেছে, আধ্যাত্মিক জীবনে বৃহত্তর অন্তর্মুখীতা চেয়েছে আর স্বাভাবিক জাগতিক অবস্থা ও রীতির ঊর্ধ্বে এক বাস্তবতার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই কালপর্বের পর মনে করা হয়েছে যে, কেবল তাদের সীমার বাইরে পৌঁছানোর ভেতর দিয়ে মানব সন্তান পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারবে।

লিখিত ইতিহাসের সূচনা কেবল বিসিই ৩০০ শতাব্দীর দিকে। তার আগে পর্যন্ত মানুষ কীভাবে জীবন কাটাত, সমাজ সংগঠিত করত তার সামান্যই লিপিবদ্ধ দলিল রয়েছে আমাদের হাতে। কিন্তু মানুষ বরাবরই প্রাগৈতিহাসিক ২০,০০০ বছর কেমন ছিল কল্পনা করতে চেয়েছে। নিজেদের অভিজ্ঞতা আবাদ করতে চেয়েছে সেখানে। গোটা বিশ্বে, প্রতিটি সংস্কৃতির মিথোলজিতে এই প্রাচীন কালগুলো বর্ণিত হয়েছে, এগুলোর কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, কিন্তু স্বর্গ ও আদি বিপর্যয়ের কথা বলে এগুলো।[১৬] স্বর্ণযুগে, বলা হয়, দেবতারা মর্ত্যে মানুষের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বুক অভ জেনেসিসে বর্ণিত পশ্চিমের হারানো স্বর্গ গার্ডেন অভ ইডেনের কাহিনী তো টিপিক্যাল: কোনও এক কালে মানুষ ও স্বর্গের মাঝে কোনও বিভেদ ছিল না: সন্ধ্যার শীতল পরিবেশে উদ্যানে ঘুরে বেড়াতেন ঈশ্বর। মানুষ পরস্পর হতে বিচ্ছিন্ন ছিল না। আদম ও ইভ তাঁদের যৌনতা বা ভালো মন্দের পার্থক্য সম্পর্কে কিছু না জেনেই শান্তিতে বাস করতেন। আমাদের অধিকতর বিচ্ছিন্ন জীবনে এমন ঐক্য কল্পনা করা অসম্ভব। কিন্তু প্রায় সব সংস্কৃতিতেই এই আদি একতার মিথ দেখিয়েছে যে, মানবজাতি মানুষের জন্যে যথাযথ অবস্থা হিসাবে অনুভূত এক ধরনের শান্তি ও সমগ্রতার আকাঙ্ক্ষা অব্যাহত রেখেছে। আত্মসচেতনতার উন্মেষকে স্বর্গ হতে কষ্টকর পতন হিসাবে প্রত্যক্ষ করেছে তারা। হিব্রু বাইবেল এই সমগ্রতা ও সম্পূর্ণতাকে শালোম বলে: গৌতম নিব্বানার কথা বলে তার সন্ধানে গৃহ ছেড়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ অতীতে শান্তি ও পূর্ণতায় বসবাস করেছে, কিন্তু সে পথ বিস্মৃত হয়েছে তারা।

আমরা যেমন দেখেছি, গৌতম নিজের জীবন অর্থহীন ভেবেছেন। অ্যাক্সিয়াল দেশসমূহে আবির্ভূত আধ্যাত্মিকতার মৌল বিষয় ছিল জগতের কুটিলতা। এই পরিবর্তনে অংশগ্রহণকারীরা ঠিক গৌতমের মতো অস্থিরতা বোধ করেছে। অসহায়ত্বের একটা অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়েছে তারা, মরণশীলতার কারণে বিকারগ্রস্থ হয়ে গভীর আতঙ্কে জগৎ হতে বিচ্ছিন্ন বোধ করেছে।[১৮] বিভিন্নভাবে এই অস্থিরতা প্রকাশ করেছে তারা। গ্রিকরা জীবনকে ট্র্যাজিক মহাকাব্য হিসাবে দেখেছে, এমন এক নাটক যেখানে তারা ক্যাথারসিস ও মুক্তির সংগ্রাম করেছে। প্লেটো স্বর্গ হতে মানুষের বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন ও আমাদের বর্তমান অবস্থার ত্রুটি দূর করে শুভের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছেন। অষ্টম, সপ্তম ও ষষ্ঠ শতাব্দীর হিব্রু পয়গম্বরগণ ঈশ্বর হতে একই ধরনের দূরত্ব অনুভব করেছেন; তাঁদের রাজনৈতিক নির্বাসনকে আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রতীক মনে করেছেন। ইরানের যোরাস্ট্রারবাদীরা জীবনকে শুভ ও অশুভের সংঘাত হিসাবে দেখেছে; অন্যদিকে চীনে কনফুষিয়াস তাঁর দেশের পূর্বসুরিদের আদর্শ হতে বিচ্যুত হওয়ায় অন্ধকার কাল নেমে আসায় বিলাপ করেছেন। ভারতে গৌতম ও বনবাসী সন্ন্যাসীদের বিশ্বাস জেগেছিল যে, জীবন একটা দুঃখ; মূলত ‘কুটিল,’ যন্ত্রণা, দুঃখ ও বিষাদে পূর্ণ। পৃথিবী এক আতঙ্কময় স্থানে পরিণত হয়েছে। বুদ্ধদের ধর্মগ্রন্থ লোকে শহর ছেড়ে বনে যাবার পরবর্তী অভিজ্ঞতাকে ‘আতঙ্ক, ভয় ও শঙ্কা’র বলে উল্লেখ করেছে।’[১৯] প্রকৃতি হয়ে পড়েছিল দুর্বোধ্যরকম ভীতিকর, অনেকটা যেমন আদাম ও ইভের অপরাধ সংঘটনের পর প্রতিকূল হয়ে গিয়েছিল। বুনো প্রকৃতির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলবেন বলে গৃহ ত্যাগ করেননি গৌতম; লাগাতার ‘আতঙ্ক ও শঙ্কা’[২০] বোধ করেছেন তিনি। কাছেপিঠে কোনও হরিণ এলে বা হাওয়ায় পাতা দুলে উঠলেও, পরে স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি, চুল খাড়া হয়ে যেত তাঁর।

কী ঘটেছিল? অ্যাক্সিয়াল যুগের আধ্যাত্মিকতাকে ইন্ধন যোগানো বিষাদকে কেউই পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেননি। নিঃসন্দেহে নারী-পুরুষ আগেও কষ্ট ভোগ করেছে। আসলে এই সময়ের শত শত বছর আগের মিশর ও মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া প্রস্তরলিপিতে একইরকম মোহমুক্তির প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু তিনটি মূল অ্যাক্সিয়াল অঞ্চলে কেন দুঃখ-কষ্টের অভিজ্ঞতা এমন উত্তুঙ্গে পৌঁছেছিল? কোনও কোনও ইতিহাসবিদ এসব এলাকায় ইন্দো-ইউরোপিয় যাযাবর অশ্বারোহী বাহিনীর আগ্রাসনকে সাধারণ উপাদান মনে করেন। তৃতীয় সহস্রাব্দের শেষ নাগাদ এই আর্য গোত্রগুলো মধ্য এশিয়া ছেড়ে ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছে যায়। এরা বিসিই ১২০০ নাগাদ ভারত ও ইরানে থিতু হয়েছিল; দ্বিতীয় সহস্রাব্দ নাগাদ থিতু হয়েছিল চীনে। সঙ্গে করে বিশাল দিগন্ত ও অমিত সম্ভাবনার বোধ নিয়ে এসেছিল তারা। উন্নত জাতি হিসাবে এক করুণ রসের মহাকাব্যিক সচেতনতাবোধ গড়ে তুলেছিল। প্রাচীন আস্তাবল ও অধিকতর আদিম সমাজকে তারা প্রতিস্থাপিত করেছিল তবে সেটা কেবল প্রবল বিদ্বেষ আর বিপর্যয়ের কাল অতিক্রমের পরেই, যা অ্যাক্সিয়াল যুগের অস্থিরতার কারণ হতে পারে।[২১] কিন্তু ইহুদি ও তাদের পয়গম্বরদের এইসব আর্য অশ্বারোহীর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ ছিল না। হাজার বছর ধরে এই আগ্রাসনগুলো পরিচালিত হয়েছে, অথচ প্রধান অ্যাক্সিয়াল পরিবর্তনগুলো লক্ষণীয়ভাবে সমকালীন ছিল।

এছাড়াও, উদাহরণ স্বরূপ, ভারতে গড়ে ওঠা আর্যদের সংস্কৃতির সঙ্গে অ্যাক্সিয়াল যুগের কোনও মিল ছিল না। বিসিই ১,০০০ সাল নাগাদ আর্য গোত্রগুলো থিতু হয়ে উপমহাদেশের বেশিরভাগ এলাকাতেই সমাজ গড়ে তুলেছিল। ভারতীয় সমাজকে এমনভাবে তারা দমিত করেছিল যে এখন আর আমরা সিন্ধু উপত্যকার দেশীয় প্রাক-আর্য লোকজন সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতে পারি না। উৎসের গতিশীলতা সত্ত্বেও আর্য ভারত অ্যাক্সিয়াল-পূর্ব অধিকাংশ সংস্কৃতির মতো স্থবির ও রক্ষণশীল ছিল। সাধারণ মানুষকে সামন্ত বাদী ইউরোপে পরবর্তীকালে বিকশিত চারটি এস্টেটের অনুরূপ চারটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করেছিল তা: ব্রাহ্মণরা ছিলেন পুরোহিত গোষ্ঠী, কাল্টের দায়িত্ব ছিল তাঁদের: সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন তাঁরা; ক্ষত্রিয় যোদ্ধারা সরকার ও প্রতিরক্ষায় নিযোজিত ছিল; বৈশ্যরা ছিল কৃষিজীবী ও পশু পালনকারী, যারা অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখত; এবং সুদ্ররা ছিল দাস বা অস্পৃশ্য, আর্য ব্যবস্থায় মিশে যেতে অক্ষম ছিল তারা। গোড়াতে চারটি শ্রেণী উত্তরাধিকারীমূলক ছিল না। প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকলে দেশীয় ভারতীয়রা ক্ষত্রিয় রা ব্রাহ্মণ হতে পারত। কিন্তু গৌতমের সময় আসতে আসতে সমাজের স্তর বিন্যাস পবিত্র তাৎপর্য অর্জন করে, হয়ে ওঠে অপরিবর্তনীয়; কেননা একে সৃষ্টির আদি আদর্শ জগতের প্রতিবিম্ব মনে করা হতো।[২২] এক গোত্র হতে আরেক গোত্রে গিয়ে এই শৃঙ্খলা পরিবর্তনের কোনও সুযোগ ছিল না।

আর্য আধ্যাত্মিকতা স্থিতাবস্থা মেনে নেওয়ার ওপর নির্ভরশীল প্রাচীন, অ্যাক্সিয়াল যুগ পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর মতোই ছিল, জীবনের অর্থ নিয়ে আঁচ অনুমানের স্থান তেমন একটা ছিল না। পবিত্র সত্যকে সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় হিসাবে দেখেছে; অনুসন্ধান না করে বরং নিষ্ক্রিয়ভাবে গ্রহণ করা হতো তাকে। আর্যরা সোমা নামে মাদক চাষ করত। ব্রাহ্মণদের পরমানন্দময় ঘোরে পৌঁছে দিত তা, ওই অবস্থায় বেদ নামে পরিচিত অনুপ্রেরণাজাত সংস্কৃত টেক্সট ‘শুনতেন’ (শ্রুতি) তাঁরা।[২৩] এসব দেবতাদের মুখ নিঃসৃত মনে করা হতো না, বরং চিরন্তভাবে অস্তিত্বশীল ও সৃষ্টির মৌল নীতিমালার প্রতিফলন বলে ধারণা করা হতো। দেবতা ও মানব জীবনকে সমানভাবে পরিচালনাকারী একটি সর্বজনীন বিধিও প্রাচীন ধর্মগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। উপমহাদেশে লেখার প্রচলন না থাকায় বেদ লিখা হয়নি। ফলে ব্রাহ্মণদের দায়িত্ব ছিল এইসব চিরন্তন সত্য মুখস্থ করে প্রজন্ম পরম্পরায় সংরক্ষণ করা। উত্তরাধিকারের এই কাহিনী বাবা হতে পুত্রকে দান করা হতো, যেহেতু এই পবিত্র জ্ঞান মানুষকে জগৎকে পবিত্র করে তোলা ও টিকে থাকতে সক্ষম করা মৌল নীতি ব্রহ্মার সংস্পর্শে পৌঁছে দিত। শত শত বছরের পরিক্রমায় আদি আর্য গোত্রসমূহের ভাষা সংস্কৃত স্থানীয় কথ্য ভাষার কাছে হার মানে, ফলে তা ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য সবার কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে–প্রকৃতপক্ষে এটাই অনিবার্যভাবে ব্রাহ্মণদের ক্ষমতা ও মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সমগ্র জগতের অস্তিত্ব বজায় রাখে যে বেদ সেখানে উল্লেখিত উৎসর্গের উপাচার কেবল তাঁরাই জানতেন।

বলা হয়ে থাকে যে, সময়ের সূচনায় একজন রহস্যময় স্রষ্টা এক আদি উৎসর্গ সম্পন্ন করেছিলেন যা দেবতা, মানুষ ও গোটা সৃষ্টি জগতকে অস্তিত্ব দিয়েছে। আদি এই উৎসর্গই ব্রাহ্মণদের পশু বলীর অদিরূপ যা তাঁদের জীবন ও মৃত্যুর উপর ক্ষমতা দিয়েছিল। এমনকি দেবতারাও এই উৎসর্গের ওপর নির্ভরশীল; আচার ঠিক মতো পালন করা না হলে তাঁরাও কষ্টের শিকার হবেন। সুতরাং সমগ্র জীবন এইসব আচারকে ঘিরে আবর্তিত ছিল। ব্রাহ্মণরা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে স্পষ্টই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, কিন্তু ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। রাজা ও অভিজাতজনেরা উৎসর্গের ব্যয়ভার মেটাতেন, বৈশ্যরা শিকার হিসাবে পশু পালন করত। বৈদিক ধর্মে আগুনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। প্রকৃতির শক্তিসমূহের উপর মানুষের ক্ষমতাকে প্রতীকায়িত করত তা। ব্রাহ্মণরা মন্দিরে মন্দিরে সযত্নে তিনটি পবিত্র অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে রাখতেন। গৃহস্থরাও যার যার উনুনের প্রতি পারিবারিক আচারের ভেতর দিয়ে সম্মান দেখাত। প্রতি চান্দ্র মাসের এক চতুর্থাংশ (উপোসাথা) দিবসে পবিত্র আগুনের উদ্দেশ্যে বিশেষ অর্ঘ্য প্রদান করা হতো। উপোসাথার আগে ব্রাহ্মণ ও সাধারণ গৃহস্থরা একইভাবে উপবাস পালন করতেন, যৌনতা ও কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতেন, রাতে সতর্ক পাহারা দিতেন উনুন। উপবাসথা নামে পরিচিত পবিত্রক্ষণ ছিল সেটা, যখন দেবতারা আগুনের ধারে গৃহস্থ ও পরিবারের ‘পাশে অবস্থান’ করতেন।[২৪]

এভাবে বৈদিক ধর্মবিশ্বাস অ্যাক্সিয়াল-পূর্ব যুগের ধর্মের মতোই ছিল। এর উন্নতি বা পরিবর্তন ঘটেনিঃ একটি আদি আদর্শ ধরনের অনুগামী ছিল তা, ভিন্ন কিছুর প্রত্যাশা করেনি। কিছু বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল ছিল এটি যেগুলো ফলাফলের দিক থেকে জাদুকরী ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণকারী; অল্প কজনের জানা প্রাচীন নিগূঢ় উপকথা ভিত্তিক।[২৫] গভীরভাবে রক্ষণশীল এই আধ্যাত্মিকতা কালহীন ও অপরিবর্তনীয় বাস্তবতায় নিরাপত্তার সন্ধান করেছে। নতুন অ্যাক্সিয়াল যুগের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল তা। স্রেফ সক্রেটিসের কথা চিন্তা করাই যথেষ্ট, যত মহামহীমই হয়ে থাকুক না কেন, কখনওই প্রচলিত নিশ্চয়তাকে চূড়ান্ত মেনে নেননি তিনি। শ্রুতি বেদের মতো বাইরে থেকে জ্ঞান আহরণের বদলে প্রত্যেকেরই আপন সত্তার গভীরে সত্যের সন্ধান করা উচিত বলে মনে করতেন তিনি। সমস্ত কিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন সক্রেটিস। নিজস্ব বিভ্রান্তি দিয়ে আলোচনাকারীকে আক্রান্ত করতেন, কারণ বিভ্রান্তিই দার্শনিক অনুসন্ধানের সূচনা। হিব্রু পয়গম্বরগণ প্রাচীন ইসরায়েলের কিছু কিছু প্রাচীন পৌরাণিক নিশ্চয়তা উল্টে দিয়েছিলেন: ঈশ্বর আর আপনাআপনি মিশর থেকে যাত্রার সময়ের মতো মনোনীত জাতির সঙ্গে ছিলেন না। এবার তিনি জেন্টাইল জাতিগুলোকে ইহুদিদের শান্তি দেওয়ার জন্যে ব্যবহার করবেন, যাদের সবারই ন্যায় বিচার, সাম্য ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল। মুক্তি অর্জন ও টিকে থাকা বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। জাতির প্রত্যেকের হৃদয়ে এখন একটা নতুন আইন আর চুক্তি লিখিত থাকবে। ঈশ্বর উৎসর্গের চেয়ে বরং ক্ষমা ও সহানুভূতি দাবি করেছেন। অ্যাক্সিয়াল যুগ ব্যক্তি বিশেষের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছিল। আমরা যেমন দেখেছি, অ্যাক্সিয়াল-যুগের সাধু ও পয়গম্বরগণ যেদিকেই তাকিয়েছেন কেবল নির্বাসন, ট্র্যাজিডি ও দুঃখ প্ৰত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু তাঁরা যে সত্যের সন্ধান করেছেন তা নিষ্ঠুরতা, অবিচার ও রাজনৈতিক পরাজয় সত্ত্বেও স্বস্তি খুঁজে পেতে সক্ষম করে তুলেছে। আমাদের কেবল নিপীড়নকারী রাষ্ট্রের হাতে মৃত্যুদণ্ড লাভের সময় সক্রেটিসের আলোকময় স্থৈর্য্য স্মরণ করলেই চলবে। তারপরও ব্যক্তি দুঃখ ভোগ করবে, মারা যাবে: প্রাচীন জাদুমন্ত্র দিয়ে নিয়তি খণ্ডনের কোনও প্রয়াস ছিল না; কিন্তু নারী বা পুরুষ জীবনের ট্র্যাজিডির মাঝেও এমন ত্রুটিপূর্ণ একটা জগতে অস্তি ত্বের অর্থ যোগানো এক ধরনের শান্তি বোধ করতে পারবে।

জাদুকরী নিয়ন্ত্রণের বদলে নবীন ধর্মগুলো বরং অস্তস্থ গভীরতার সন্ধান করেছে। সাধুগণ আর বাহ্যিক নীতির অনুসরণে সন্তুষ্ট ছিলেন না, বরং কর্মকাণ্ডের পূর্ববর্তী গভীর মনস্তাত্তিক অন্তর্মুখীতা সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠেছিলেন। অসচেতন শক্তি ও ক্ষীণ উপলব্ধ সত্যিকে আলোয় তুলে ধরাটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সক্রেটিসের বেলায়, মানুষ ইতিমধ্যে সত্য জেনে গিয়েছিল, কিন্তু সেটা কেবল অন্তরের অস্পষ্ট স্মৃতি হিসাবে: তাদের এই জ্ঞান জাগিয়ে তোলার দরকার ছিল। প্রশ্ন তোলার দ্বান্দ্বিক উপায়ে পূর্ণ সজাগ হয়ে ওঠার প্রয়োজন ছিল। কনফুসিয়াস এতদিন পর্যন্ত নিশ্চিত ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে রয়ে যাওয়া তাঁর জাতির প্রাচীন রীতিনীতি পর্যালোচনা করেছেন। আদি ঔজ্জ্বল্যে পুন:স্থাপন করার জন্যে তারা সম্মানের সঙ্গে যেসব মূল্যবোধকে তুলে রেখেছে সেগুলোকে অবশ্যই সচেতনভাবে লালন করতে হবে। কনফুসিয়াস ইতিপূর্বে কেবল অনুভূত ধারণাকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন এবং ভাসাভাসা, প্রায় অবোধ্য জ্ঞানকে স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে চেয়েছেন। মানুষকে অবশ্যই নিজেকে পরীক্ষা করতে হবে, নিজের ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ করতে হবে এবং এভাবে জগতে সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা আবিষ্কার করতে হবে যা মৃত্যুর কারণে অর্থহীন হয়ে যায়নি। অ্যাক্সিয়াল সাধুগণ প্রাচীন মিথোলিজ পরীক্ষা করেছেন, সেগুলোর পুনর্ব্যাখ্যা দিয়েছেন, প্রাচীন সত্যকে আবশ্যকীয়ভাবে নৈতিক মাত্ৰা দান করেছেন। নৈতিকতা ধর্মের কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়। জাদুমন্ত্ৰ নয়, মানব জাতিকে নৈতিকতা দিয়ে নিজেকে জাগিয়ে তুলতে হবে এবং দায়িত্ব, নিজের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে হবে; আমাদের চারপাশে চেপে আসা অন্ধকার থেকে মুক্তির খোঁজ করতে হবে। অতীত সম্পর্কে সজাগ ছিলেন সাধুগণ, বিশ্বাস করতেন যে মানুষ অস্তিত্বের মৌল বিষয়গুলো ভুলে যাবার কারণেই জগৎ কঠিন হয়ে উঠেছে। সবারই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এমন এক পরম সত্তার–ঈশ্বর, নিব্বানা, তাও, ব্রহ্মা–অস্তিত্ব রয়েছে যা এই পৃথিবীর সমস্ত বিভ্রান্তির ঊর্ধ্বে এবং দৈনন্দিন জীবন যাপনের পরিস্থিতিতে তাঁকে সমন্বিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।

সবশেষে, ব্রাহ্মণদের মতো গোপন সত্যিকে নিজেদের মাঝে আঁকড়ে রাখার বদলে অ্যাক্সিয়াল-সাধুগণ তা বাইরে প্রচার করতে চেয়েছেন।[২৬] ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ সাধারণ মানুষের উদ্দেশে আবেগপ্রবণ হিতোপদেশ ও চমৎকার অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে বক্তব্য রাখতেন। যার সঙ্গে দেখা হতো তাকেই প্রশ্ন করতেন সক্রেটিস। সমাজ পরিবর্তনের প্রয়াসে ব্যাপকভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন কনফুসিয়াস। দরিদ্র, ক্ষুদ্র ও অভিজাতদের নির্দেশনা দিয়েছেন। এই সাধুরা তাঁদের তত্ত্বকে পরীক্ষা করতে ছিলেন বদ্ধপরিকর। ঐশীগ্রন্থ আর পুরোহিত সমাজের একচেটিয়া সম্পত্তি ছিল না বরং জনপদের কাছে নতুন ধর্মমত প্রচারের উপায়ে পরিণত হয়েছিল। গবেষণা ও বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছিল। যারা সত্য সন্ধানে সংগ্রাম করেছে তাদের কাছে সত্যকে বাস্তবতা প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল। আমরা দেখব, গৌতম কত নিবিড়ভাবে অ্যাক্সিয়াল যুগের মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন এবং কীভাবে মানবীয় টানাপোড়েন সহ্য করার জন্যে আপন অনন্যতা নিয়ে এসেছিলেন।

অবশ্য তিনি যখন কাপিলাবাস্তুর পিতৃগৃহ ত্যাগ করেন, ভারতে তখন অ্যাক্সিয়াল পরিবর্তনের পালা চলছিল। ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিতগণ উল্লেখ করেছেন যে, এই সমস্ত উদ্ভাবনমূলক আদর্শ রাজার এলাকায় সৃষ্টি হয়েছিল, বিসিই ষষ্ঠ শতকে যা নতুন ধরনের কেন্দ্রিকতা অর্জন করে।[২৭] রাজা ও মন্দিরের পুরোনো অংশীদারী হতে বণিকদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হচ্ছিল। এক নতুন ধরনের অর্থনীতি গড়ে তুলছিল তারা। তারা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে না পারলেও, এইসব সামাজিক পরিবর্তন নিশ্চিতভাবে আধ্যাত্মিক বিপ্লবে অবদান রেখেছে। বাজার অর্থনীতি স্থিতাবস্থাকে দুর্বল করেছে: বণিকরা আর অনুগতের মতো পুরোহিত ও অভিজাতদের মানতে পারছিল না। তাদের নিজের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, ব্যবসাক্ষেত্রে নিষ্ঠুর হবার জন্যে তৈরি থাকতে হয়েছে। এক নতুন নাগরিক শ্রেণী বিকাশ লাভ করছিল। নিজের হাতে ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল তারা। এরা ছিল শক্তিমান, সম্মুখবর্তী ও উচ্চাভিলাষী। নতুন উদীয়মান আধ্যাত্মিক রীতিনীতির সাথে স্পষ্টতই সঙ্গতিপূর্ণ। অন্যান্য অ্যাক্সিয়াল অঞ্চলের মতো উত্তর ভারতের গঙ্গা নদীর আশপাশের সমতল ভূমি গৌতমের জীবৎকালে এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ বহুদিন আগে আর্য আগ্রাসী বাহিনীর হাতে প্রতিষ্ঠিত আবশ্যিকভাবে গ্রাম্য সমাজ নতুন লৌহ-যুগের প্রযুক্তির কল্যাণে পরিবর্তিত হচ্ছিল, যা গভীর বন পরিষ্কার করে চাষাবাদের জন্যে নতুন জমিন বের করতে কৃষকদের সক্ষম করে তুলেছিল। বসতিকারীরা এই অঞ্চলে হাজির হওয়ায় তা ঘনবসতিপূর্ণ ও উচ্চ উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে। পর্যটকগণ প্রচুর ফল, শস্য, তিল, জওায়ার, গম, সস্য আর বার্লির বর্ণনা দিয়েছেন, স্থানীয় জনগণের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফলন হতো এসব ফলে তারা বিনিময় করতে পারত।[২৮] গাঙ্গেয় সমতল ইন্দো-সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। গৌতমের জীবৎকালে মহাদেশের অন্যান্য এলাকা সম্পর্কে সামান্যই জানতে পারি আমরা। ছয়টি মহানগরী শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়: সাবাস্তি, সাকেতা, কোসাম্বি, বারানসি, রাজাগহ ও চম্পা। নতুন বাণিজ্য পথের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল ওগুলো। নগরীগুলো ছিল উত্তেজনাকর জায়গা: সেগুলোর পথঘাট চমৎকাভাবে রঞ্জিত শকটে গিজগিজ করত, দূর-দূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসত সুবিশাল হাতির দল; ছিল জুয়া, থিয়েটার, নাচ, বেশ্যাবৃত্তি ও উচ্ছৃঙ্খল সরাইখানার জীবন। এসব আশপাশের গ্রামবাসীদের প্রবল আঘাত দিয়েছে। ভারতের সকল অংশের এবং সকল গোত্রের বণিকরা বাজারে জড়ো হতো; রাস্তাঘাটে নগর-কেন্দ্র, শহরতলীর বিলাসবহুল পার্কে নতুন দার্শনিক ধ্যানধারণা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা চলত। শহরগুলো নতুন মানুষ–বণিক, ব্যবসায়ী ও মহাজনদের দখলে ছিল–যারা আর সহজে প্রাচীন গোত্র ব্যবস্থায় খাপ খাচ্ছিল না। তারা ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের চ্যালেঞ্জ করতে যাচ্ছিল।[২৯] এসব ছিল অস্বস্তিকর, আবার উদ্দীপকও। শহরবাসীরা পরিবর্তনের ধার অনুভব করতে পারছিল।

অঞ্চলের রাজনৈতিক জীবনও বদলে গিয়েছিল। গাঙ্গেয় উপত্যকা মূলত ছোট ছোট কিছু রাজ্য ও অল্প কয়টি তথাকথিত প্রজাতন্ত্রের অধীনে শাসিত হতো, যেগুলো আদতে ছিল প্রাচীন ক্ল্যান ও গোত্রীয় ব্যবস্থাভিত্তিক গোষ্ঠী শাসন। প্রজাতন্ত্রগুলোর সবচেয়ে উত্তরের শাক্যয় জন্ম গ্রহণ করেন গৌতম। তাঁর বাবা শুদ্ধোদনা ছিলেন শাক্যের গোত্র ও তাদের পরিবার পরিচালনাকারী অভিজাত গোষ্ঠী সংঘের সদস্য। শাক্যবাসীরা নিদারুণ অহংকারী ও স্বনির্ভর ছিল। তাদের এলাকা বেশ দূরবর্তী ছিল বলে আর্য সংস্কৃতি কখনওই সেখানে শেকড় বিস্তার করতে পারেনি। তাদের গোত্র প্রথাও ছিল না। কিন্তু সময় বদলে যাচ্ছিল। শাক্যের রাজধানী কাপিলাবাস্তু ছিল নতুন বাণিজ্য পথগুলোর একটার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য-কেন্দ্র। বাইরের জগৎ প্রজাতন্ত্রকে আক্রমণ শুরু করার ফলে ক্রমে মূলধারায় যোগ দিচ্ছিল।[৩০] মল্লা, কোলিয়া, বিদেহা, নয়া ও বাজ্জি প্রজাতন্ত্রগুলোর মতো শাক্য দুটি নতুন রাজ্য কোসালা ও মগধের কাছে আক্রান্ত বোধ করছিল। এদুটি রাজ্য গাঙ্গেয় সমতলের দুর্বলতর ও প্রাচীন-পন্থী রাজ্যগুলোকে আগ্রাসী ও নির্মমভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছিল।

কোসালা ও মগধ পুরোনো প্রজাতন্ত্রেগুলোর চেয়ে ঢের দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছিল। পুরোনো রাজ্যগুলোয় লাগাতার অন্তর্দ্বন্দ্ব্ব ও গৃহবিবাদ লেগেই ছিল। আধুনিক এই রাজ্যগুলো আমলাতন্ত্র ও সেনাবাহিনীকে সুশৃঙ্খলিত করেছিল যারা সামগ্রিকভাবে গোত্রের কাছে নয়, কেবল রাজার প্রতিই আনুগত্য স্বীকার করত। এর মানে ছিল, প্রত্যেক রাজার নিজস্ব যুদ্ধ- মেশিন ছিল যেটা তাঁকে তাঁর রাজত্বে শৃঙ্খলা আরোপ ও আশপাশের এলাকা অধিকারের শক্তি যুগিয়েছে। আধুনিক এই রাজ্যগুলো নতুন বাণিজ্য পথগুলোও দক্ষতার সঙ্গে পাহারা দিতে সক্ষম ছিল। রাজ্যের অর্থনীতি যাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল সেই বণিকদের খুশি করেছিল এটা।[৩১] অঞ্চলটি নতুন ধরনের স্থিতিশীলতা ভোগ করলেও সেজন্যে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। নতুন সমাজের সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতায় অনেকেই অস্বস্তিতে ভুগছিল, যেখানে রাজারা জনগণের উপর তাঁদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারতেন, অর্থনীতি পরিচালিত হতো প্রলোভনে; মহাজন ও বণিকরা পরস্পরের সঙ্গে আগ্রাসী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকায় পরস্পরকে শিকারে পরিণত করত। প্রচলিত মূল্যবোধ যেন গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল, হারিয়ে যাচ্ছিল পরিচিত জীবন ধারা। সেই জায়গা দখল করে নেওয়া ব্যবস্থা ছিল ভীতিকর, অচেনা। জীবনকে অসংখ্য মানুষের কাছে বোঝা মনে হওয়াটা বিস্ময়কর ছিল না, সাধারণত ‘ভোগান্তি’ হিসাবে যার অনুবাদ করা হয়, তবে ‘অসন্তোষজনক’, ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ও ‘কুটিল’ জাতীয় শব্দেই যার অর্থ বেশি বোঝানো যায়।

এমনি পরিবর্তনশীল সমাজে প্রাচীন আর্য-ধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম ক্রমবর্ধমান হারে বেমানান হয়ে উঠছিল। প্রাচীন আচার প্রতিষ্ঠিত গ্রাম্য সমাজের উপযোগি ছিল, কিন্তু শহর-নগরের অধিকতর গতিশীল জগতে দুর্বহ ও সেকেলে মনে হতে শুরু করেছিল। অবিরাম চলার ওপর থাকায় বণিকেরা আগুন জ্বালিয়ে রাখতে পারত না, উপসোথা দিবসও পালন করতে পারত না। নতুন এই মানুষগুলো গোত্র প্রথায় ক্রমশঃ বেমানান হয়ে যাচ্ছিল বলে অনেকেরই তাদের একটা আধ্যাত্মিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়েছে। পশুপালন অর্থনীতির চালিকা শক্তি থাকার সময় পশু-বলী তাৎপর্যবহ ছিল, কিন্তু নতুন রাজ্যগুলো কৃষিজাত পণ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। পশু হয়ে উঠছিল দুষ্প্রাপ্য, ফলে বলী অপচয় ও নিষ্ঠুর ঠেকেছে-বর্তমানে জনজীবনকে বৈশিষ্ট্যায়িত করে তোলা সহিংসতার চড়া স্মারক। নাগরিক সমাজগুলো যখন নিজেদের উপর নির্ভরশীল স্বনির্মিত মানুষের প্রভাবে ছিল সেই সময় মানুষ ক্রমবর্ধমানহারে ব্রাহ্মণদের প্রাধান্যের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ও আধ্যাত্মিক নিয়তি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছে। তাছাড়া, পশু বলী কাজে আসেনি। ব্রাহ্মণরা যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে এইসব আচার অনুষ্ঠান (কম্ম ) মানুষের জন্যে ঐশ্বর্য ও বৈষয়িক সাফল্য এনে দেবে। কিন্তু প্রতিশ্রুত এইসব সুবিধা সাধারণত বাস্তবায়িত হতে পারেনি। নতুন অর্থনৈতিক পরিবেশে নগরবাসীরা সুবিধাজনক বিনিয়োগ বয়ে আনার মতো কাজে মনোনিবেশ করতে চেয়েছে।

বাজার অর্থনীতি প্রভাবিত আধুনিক রাজ্য ও শহরগুলো গাঙ্গেয় অঞ্চলের জাতিগুলোকে পরিবর্তনের হার সম্পর্কে দারুণ সজাগ করে তুলেছিল। নগরবাসীরা সমাজের দ্রুত বদলে যাওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল: এর অগ্রগতি পরিমাপ করতে পেরেছে তারা; বছরের পর বছর সবাই একই কাজ করে এমনি গ্রাম্য সমাজের পুনরাবৃত্তিমূলক ছন্দের চেয়ে একেবারে ভিন্ন একটা জীবন ধারার স্বাদ আস্বাদন করতে পারছিল তারা, যে সমাজ পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শহরের মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল যে, তাদের কর্মকাণ্ডের (কম্ম) দীর্ঘমেয়াদী পরিণাম রয়েছে যা তারা নিজেরা হয়তো দেখতে পাবে না কিন্তু ঠিকই বুঝতে পেরেছিল যে আগামী বংশধরদের তা প্রভাবিত করবে। অতি সাম্প্রতিক কালে উদ্ভুত পুনর্জন্মের মতবাদ দারুণ প্রাচীন বৈদিক ধর্মের চেয়ে চলমান বিশ্বে অধিকতর জুৎসই ছিল। কম্মের তত্ত্ব বলে যে, নিয়তির জন্যে দায়ী করার মতো কেউ নেই, আমাদের কর্মকাণ্ডই সুদূরবর্তী ভবিষ্যতে অনুরণন তুলবে। একথা ঠিক যে কম্ম মানুষকে ক্লান্তিকর সামসারার চক্র থেকে মুক্তি দেবে না, তবে সৎকম্ম মূল্যবান প্রতিদান বয়ে আনবে কেননা তা পরের জীবনে আরও বেশি উপভোগ্য অস্তিত্ব নিশ্চিত করবে। কয়েক প্রজন্ম আগেও পুনর্জন্মের মতবাদ দারুণ বিতর্কিত ছিল, অল্প কিছু লোকের জানা ছিল তা। কিন্তু গৌতমের সময়ে মানুষ যখন একেবারে নতুনভাবে কাজ ও কারণের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেছিল, তখন সবাই তা বিশ্বাস করেছে-এমনকি খোদ ব্রাহ্মণরাও।[৩২]

কিন্তু অন্যান্য অ্যাক্সিয়াল দেশের মতো উত্তর ভারতের জনগণ অন্যান্য ধর্মীয় ধ্যানধারণা ও আচার-আচরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিল যেগুলো তাদের পরিবর্তিত অবস্থায় বেশ প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। গৌতমের জন্মের অল্প আগে গাঙ্গেয় সমতলের পশ্চিম এলাকার একদল সন্ন্যাসী প্রাচীন বৈদিক ধর্ম বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গোপন বিপ্লব সংগঠিত করেছিলেন। তাঁরা এক ধারাবাহিক টেক্সট সৃষ্টি শুরু করেছিলেন যেগুলো গুরু থেকে শিষ্যের কাছে গোপনে হস্তাস্তরিত হতো। নতুন এই ধর্মগ্রন্থগুলোর নাম ছিল উপনিষদ, এ নামটি বিপ্লবাত্মক লোক-জ্ঞানের নিগূঢ় প্রকৃতির ওপর জোর দিয়েছে; কেননা তা সংস্কৃত উপ-নি-সাদ (নিকটে উপবেশন) হতে নেওয়া। উপনিষদগুলো বাহ্যত প্রাচীন বেদের উপর ভিত্তি করে রচিত হলেও সেগুলোকে পুনর্ব্যাখ্যা করে অধিকতর আধ্যাত্মিক ও অন্তর্গত তাৎপর্য দিয়েছে। এখানেই অ্যাক্সিয়াল যুগের অন্যতম প্রধান ধর্মমত বর্তমানে হিন্দুধর্ম নামে পরিচিত ধর্মের সূচনা স্থির হয়েছিল। সন্ন্যাসীদের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের লক্ষ্য ছিল মহাবিশ্বের নৈর্ব্যক্তিক মূল সুর এবং অস্তিত্বমান সমস্ত কিছুর উৎস ব্রহ্মার পরম সত্তা। কিন্তু ব্রহ্মা স্রেফ একজন দূরবর্তী ও দুর্ভেয় সত্তা নন; সর্বব্যাপী সত্তাও যা জীবিত সমস্ত কিছুকে আবৃত করে আছে। আসলে উপনিষদীয় অনুশীলনের কল্যাণে একজন শিক্ষাব্রতী আপন সত্তার গভীরে ব্রহ্মার উপস্থিতি দেখতে পাবে। ব্রাহ্মণদের শিক্ষানুযায়ী পশুবলীতে মুক্তি নিহিত নয়, বরং এই উপলব্ধিতে যে দেবতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ পরম, চিরন্তম সত্তা ব্রহ্মা মানুষের গভীরতম সত্তার (আত্মা) অনুরূপ।[৩৩]

আমরা যেমন দেখব, চিরন্তন ও পরম সত্তার ধারণা, গৌতমকে দারুণ পীড়া দেবে। এক অসাধারণ আত্ম-দর্শন ছিল এটা। কারও গভীরতম সত্তা ব্রহ্মার অনুরূপ, এই ধারণায় বিশ্বাস স্থাপন সাধুদের পবিত্র সম্ভাবনায় চমকপ্রদ বিশ্বাসের আচরণ ছিল। এই দর্শনের ধ্রুপদী প্রকাশ দেখা যায় প্রাথমিক চান্দোগ্যা উপনিষদে। ব্রাহ্মণ উদ্দালোকা তাঁর বৈদিক জ্ঞানে গর্বিত ছেলে শ্রেতাকেতুকে প্রাচীন ধর্মের সীমাবদ্ধতা দেখাতে চেয়েছিলেন, শ্রেতাকেতুকে একপাত্র পানিতে এক টুকরো লবণ মেশাতে বলেন তিনি। পরদিন সকালে দৃশ্যত লবণ অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু শ্রেতাকেতু যখন পানিতে চুমুক দিলো, দেখা গেল, লবণ দেখা না গেলেও সমস্ত পানিতে মিশে গেছে। ঠিক ব্রহ্মার মতো, ব্যাখ্যা করলেন উদ্দালোকা: তুমি দেখতে না পেলেও আছে। ‘সমগ্র বিশ্বের আপন সত্তা(আত্মা) হিসাবে এই প্রাণ সত্তা (ব্রহ্মা) রয়েছে। এটাই সত্তা, সেটাই তুমি শ্রেতাকেতু![৩৪] এটা আসলেই বিদ্রোহমূলক; আপনি যখন বুঝতে পারবেন যে, আপনিসহ সমস্ত কিছুতে পরম সত্তা আছেন, তখন আর অভিজাত পুরোহিত সমাজের প্রয়োজন থাকবে না। নিষ্ঠুর অর্থহীন পশুবলী ছাড়াই মানুষ আপন সত্তায় নিজেই পরমকে খুঁজে পাবে।

তবে ব্রাহ্মণদের প্রাচীন ধর্ম বিশ্বাস প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে উপনিষদের সাধুরা একাকী ছিলেন না। গাঙ্গেয় অঞ্চলের পূর্বাংশের বনচারী সন্ন্যাসী ও ভাববাদীরা উপনিষদের আধ্যাত্মিকতার সাথে পরিচিত ছিলেন না। তখনও তা পশ্চিম সমতলে গোপন নিগূঢ় ধর্মবিশ্বাস হিসাবে কেন্দ্রীভূত ছিল। অবশ্য নতুন ধারণার কিছু কিছু লোক পরম্পরায় প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল। পূর্ব-গাঙ্গেয় এলাকায় ব্রহ্মার কোনও আলোচনা ছিল না, বুদ্ধ ধর্মগ্রন্থে যাঁর কোনও উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু পরম নীতির একটি লোক ভাষ্য নতুন দেবতা ব্রহ্মার বিশ্বাসে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বলা হয়েছে, যিনি সর্বোচ্চ স্বর্গে বাস করেন। গৌতম ব্রাক্ষণের কথা শুনেছেন বলে মনে হয় না, তবে ব্রহ্মা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন তিনি, যিনি, আমরা দেখব, গৌতমের ব্যক্তি-নাটকে ভূমিকা রেখেছেন।[৩৫] গৌতম কাপিলাবাস্তু ত্যাগ করে পূর্বাঞ্চলের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। জীবনের বাকি সময় কোসালা, মগধ ও লাগোয়া প্রাচীন রাজ্যগুলোয় ভ্রমণ করে কাটিয়েছেন। এখানে প্রাচীন আর্য প্রথার আধ্যাত্মিক প্রত্যাখ্যান অধিকতর বাস্ত বধর্মী বাঁক নিয়েছিল। মানুষ পরম সত্তার প্রকৃতি নিয়ে অধিবিদ্যিক আঁচ- অনুমানের উৎসাহী ছিল না। ব্যক্তিগত মুক্তি নিয়ে অধিকতর চিন্তিত ছিল তারা। বনচারী-সাধুরা দুর্ভেয় ব্রহ্মা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না হয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু তাঁরা অন্তস্থ পরম সত্তা, আত্মাকে জানতে চেয়েছেন। এই চিরন্তন, সর্বব্যাপী নীতির নাগাল পাওয়ার নানান উপায় বের করছিলেন তাঁরা। সত্তার মতবাদ আকর্ষণীয় ছিল, কারণ জীবনের দুঃখ-কষ্ট হতে মুক্তি লাভ আয়ত্তের মধ্যেই রয়েছে বলেই বোঝানো হয়েছে এখানে, এজন্যে কোনও পুরোহিতের মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। এটা নতুন সমাজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং আত্ম-নির্ভরতার বিশ্বাসের সঙ্গে মানানসই ছিল। সন্ন্যাসী একবার আপন সত্তার সন্ধান লাভ করার পর এক গভীর স্তরে উপলব্ধি করবেন যে দুঃখ-কষ্ট ও মৃত্যুই মানবীয় অবস্থার শেষ কথা নয়। কিন্তু কেমন করে সন্ন্যাসী এই সত্তার দেখা পাবেন এবং সামসারার অর্থহীন চক্র হতে মুক্তি পাবেন? যদিও সত্তার অস্তিত্ব প্রতিটি মানুষের মাঝেই থাকার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সন্ন্যাসীরা তাঁর দেখা পাওয়া কঠিন বলে আবিষ্কার করেছেন।

পূর্ব-গাঙ্গেয় এলাকার আধ্যাত্মিকতা অনেক বেশি লোকানুবর্তী ছিল। পশ্চিমে উপনিষদীয় সাধুগণ তাঁদের মতবাদ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছিলেন: পুবে সাধারণ মানুষ আন্তরিকভাবে এইসব প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক করেছে।[৩৬] আমরা যেমন দেখেছি, তারা ভিক্ষু সন্ন্যাসীদের অর্থহীন পরজীবী হিসাবে নয় বরং বীরসুলভ অগ্রগামী হিসাবে দেখেছে। বিদ্রোহী হিসাবেও সম্মান দেখানো হয়েছে তাঁদের। উপনিষদীয় সাধুদের মতো সন্ন্যাসীরা প্রাচীন বৈদিক ধর্মকে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অনুসন্ধানের সূচনায় একজন নবীশ পাব্বজ্জ (যার অর্থ ‘সামনে গমন’) নামে পরিচিত অনুষ্ঠানে যোগ দেয়: এমন একজন মানুষে পরিণত হয় সে আক্ষরিক অর্থেই যে আর্য সমাজ হতে বের হয়ে গেছে। আচারের দাবি অনুযায়ী ত্যাগী গোত্রের সকল বাহ্যিক চিহ্ন খুলে ফেলে ও ব্যবহৃত তৈজসপত্র অগ্নিতে উৎসর্গ করে। এরপর থেকে তাকে বলা হবে সন্ন্যাসী (ধর্ম-ত্যাগী) এবং তার গেরুয়া পোশাক তার বিদ্রোহের প্রতাঁকে পরিণত হবে। তার গেরুয়া পোশাক বিদ্রোহের প্রতাঁকে পরিণত হবে। সবশেষে নব্য সন্ন্যাসী সম্ভবত অধিকতর অস্তস্থ ধর্ম বেছে নেওয়ার ঘোষণার উপায় হিসাবে আচরিক ও প্রতীকী ঢঙে পবিত্র অগ্নি গিলবে।[৩৭] ব্যবস্থার মেরুদণ্ড সংসারী মানুষের জীবন প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে পুরোনো পৃথিবীতে স্ব-অবস্থান স্বেচ্ছায় প্রত্যাখ্যান করেছে সে: বিবাহিত পুরুষ অর্থনীতি চালু রাখে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্ম দেয়, সকল গুরুত্বপূর্ণ উৎসর্গের ব্যয় মেটায় এবং সমাজের রাজনৈতিক জীবনের তত্ত্বাবধান করে। কিন্তু সন্ন্যাসীরা এইসব দায়িত্ব সরিয়ে রেখে এক ধরনের রেডিক্যাল মুক্তির সন্ধান করেন। তাঁরা গৃহের কাঠামোর স্থান ছেড়ে বুনো বনজঙ্গল বেছে নিয়েছেন: তাঁরা আর গোত্রের বিধিনিষেধের পাত্র নন, কোনওভাবেই জন্মগত দুর্ঘটনার কারণে কোনও কর্মকাণ্ড হতে বঞ্চিত নন। বণিকদের মতোই চলিষ্ণু ছিলেন তাঁরা, ইচ্ছামতো জগৎ ঘুরে বেড়াতে পারতেন। নিজের কাছে ছাড়া কারও কাছে জবাবদিহি করতে হতো না। সুতরাং, তাঁরাও বণিকদের মতো যুগের নতুন মানুষ ছিলেন, যাঁদের সমগ্র জীবনধারা সেই সময়কে বৈশিষ্ট্যায়িত করা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বর্ধিত বোধ প্রকাশ করেছে।

সুতরাং, গৃহত্যাগ করতে গিয়ে গৌতম অধিকতর প্রথাগত বা এমনকি প্রাচীন জীবন ধারার পক্ষে আধুনিক বিশ্ব ত্যাগ করছিলেন না (যেমনটা বর্তমানের সন্ন্যাসীরা করছেন বলে প্রায়শঃই ধারণা করা হয়), বরং পরিবর্তনের অগ্রসারিতে ছিলেন তিনি। অবশ্য তাঁর পরিবার এই দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার হবে এমনটা আশা করা যায় না। শাক্য রাজ্য এমন বিচ্ছিন্ন ছিল বলে নিম্নস্থ গাঙ্গেয় সমতলে বিকাশমান সমাজ হতে একেবারে আলাদা ছিল। আমরা যেমন দেখেছি, এমনকি বৈদিক সংস্কৃতিও আত্মীকরণ করতে পারেনি। শাক্যের অধিকাংশ মানুষের কাছে নতুন ধ্যান-ধারণা অচেনা মনে হয়ে থাকবে। তা সত্ত্বেও বনচারী সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহের সংবাদ নিঃসন্দেহে রাজ্যে পৌঁছেছিল; আলোড়িত করেছে তরুণ গৌতমকে। আমরা যেমন দেখেছি, পালি টেক্সট তাঁর গৃহত্যাগের সিদ্ধান্তের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়, তবে গৌতমের গৃহত্যাগের আরেকটি বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে যেটা কিনা পাব্বজ্জ্যের গভীরতম তাৎপর্য তুলে ধরে।[৩৮] নিদান কথার মতো কেবল পরবর্তী সময়ের পরিবর্ধিত জীবনীগুলোতেই এটা মেলে, যা সম্ভবত সিই পঞ্চম শতাব্দীতে লেখা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও আমরা এই কাহিনীটি পরবর্তী সময়ের বুদ্ধ রচনাবলীতে পেলেও পালি কিংবদন্তীসমূহের মতোই সমান প্রাচীন হতে পারে। কোনও কোনও পণ্ডিত বিশ্বাস করেন যে, পরবর্তী কালের এই ধারাবাহিক জীবনীগুলো গৌতমের মৃত্যুর মোটামুটি একশো বছর পরে পালি বিধান চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার সময় রচিত প্রাচীন বর্ণনার ভিত্তিতেই রচিত হয়েছিল। পালি কিংবদন্তীসমূহ নিশ্চিতভাবে এই কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত ছিল, কিন্তু সেগুলো একে গৌতম নয়, বরং তাঁর পূর্বসুরি, বুদ্ধ বিপাসির বলে বর্ণনা করেছে, যিনি পূর্ববর্তী কালে আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।[৩৯] সুতরাং কাহিনীটি আদর্শ ধরনের, সকল বুদ্ধের বেলায়ই প্রযোজ্য। এটা গৌতমের গৃহত্যাগের পালি ভাষ্যকে চ্যালেঞ্জ করেনি, আমাদের হিসাবে ঐতিহাসিকভাবে সঠিকও বোঝানো হয়নি। পরিবর্তে প্রবলভাবে পৌরাণিক এই কাহিনীটি স্বর্গীয় হস্তক্ষেপ ও জাদুময় ঘটনাবলীসহ পাবজ্জ্যের জটিল ঘটনার একটি বিকল্প ব্যাখ্যা তুলে ধরে। এটাই সকল বুদ্ধকে–গৌতম বিপাস্সির চেয়ে কম নন–তাঁদের অনুসন্ধানের সূচনায় করতে হবে; প্রকৃতপক্ষে আধ্যাত্মিক জীবনে পদার্পন করার সময় আলোক সন্ধানী প্রত্যেককে পরিবর্তনের এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। কাহিনীটি প্রায় অ্যাক্সিয়াল যুগ আধ্যাত্মিকতার নজীর। একজন মানুষ কেমন করে অ্যাক্সিয়াল-যুগের চাহিদা অনুযায়ী তার দর্শন সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন হয়ে ওঠে তাই দেখায়। মানুষ যখন দুঃখ-কষ্টের অনিবার্য বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে তখনই শুধু পুরোপুরি মানুষ হয়ে উঠতে শুরু করতে পারে। নিদান কথার কাহিনী প্রতীকী। এর সর্বজনীন প্রভাব রয়েছে, কারণ অজাগ্রত নারী-পুরুষ জীবনের দুঃখ-কষ্টকে উপেক্ষা করতে চায়; ভান করে যেন এর সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। এমন উপেক্ষা কেবল নিষ্ফলই নয় (কারণ কেউই জ্বালা-যন্ত্রণা হতে মুক্ত নয় এবং জীবনের এইসব সত্য সবসময়ই হামলা চালাবে), বরং বিপজ্জনকও। কেননা, মানুষকে তা এমন এক কুহকে বন্দি করে যা তার আধ্যাত্মিক বিকাশ ব্যাহত করে।

এভাবে নিদান কথা আমাদের বলছে, সিদ্ধার্থের যখন বয়স মাত্র পাঁচ দিন, তাঁর বাবা শুদ্ধোদোন একশোজন ব্রাহ্মণকে ভোজে আমন্ত্রণ জানান, যেন তাঁরা শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলবার জন্যে চিহ্নের খোঁজে দেহ পরীক্ষা করতে পারেন। আটজন ব্রাহ্মণ উপসংহারে পৌঁছলেন যে, শিশুটির সামনে রয়েছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, তিনি হয় একজন বুদ্ধে পরিণত হবেন, যিনি পরম আধ্যাত্মিক আলোকপ্রাপ্ত হয়েছেন, কিংবা হবেন সর্বজনীন রাজা, জনপ্রিয় কিংবদন্তীর নায়ক, যিনি, বলা হয়ে থাকে, জগৎ শাসন করবেন। তাঁর একটি বিশেষ স্বর্গীয় রথ থাকবে। তার চারটে চাকার প্রতিটি পৃথিবীর চারদিকে ঘুরবে। এই জগৎ- সম্রাট বিশাল সেনাদল নিয়ে স্বর্গে ঘূরে বেড়াবেন এবং ‘ন্যায়বিচারের চাকা ঘোরাবেন’, সমগ্র জগতে ন্যায় বিচার ও সঠিক ধারা প্রতিষ্ঠা করবেন। কোসালা ও মগধের নতুন রাজতন্ত্রের পরিষ্কার প্রভাব ছিল এই মিথে। গৌতমের সমগ্র জীবনে তাঁকে নিয়তির এই বিকল্পের মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিশ্ব-সম্রাটের (চক্কবত্তী) ইমেজ প্রতীকী বিকল্প-অহমে পরিণত হবে, শেষ পর্যন্ত তাঁর অর্জিত সমস্ত কিছুর বিপরীত চক্কবতী শক্তিমান হতে পারেন, তাঁর রাজত্ব জগতের জন্যে উপকারীও হতে পারে; কিন্তু আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে তিনি আলোকিত মানুষ নন, কেননা তার জীবন সম্পূর্ণভাবে শক্তির উপর নির্ভরশীল। কোন্দান্না নামে এক ব্রাহ্মণের বিশ্বাস ছিল, শিশু সিন্ধার্থ কখনওই চক্কবত্তী হবেন না, বরং তিনি গৃহস্থ মানুষের আরামদায়ক জীবন ত্যাগ করে অজ্ঞতা ও জগতের বিপর্যয় হতে উত্তীর্ণ হয়ে বুদ্ধে পরিণত হবেন।[৪০]

এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে খুশি ছিলেন না শুদ্ধোদোন। ছেলে যেন চক্কবত্তী না হয় সে ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি, যা তাঁর কাছে জগৎ অস্বীকারকারী সাধুর জীবনের চেয়ে ঢের বেশি কাঙ্ক্ষিত মনে হয়েছে। কোন্দান্না তাঁকে বলেছিলেন, সিদ্ধার্থ একদিন চারটি জিনিস দেখতে পাবেন–একজন জরাগ্রস্থ মানুষ, একজন রোগী, একটা মরদেহ এবং একজন সাধু–যা তাঁকে গৃহত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘বেরিয়ে যেতে’ অনুপ্রাণিত করবে। শুদ্ধোদোন তাই ছেলেকে এইসব অস্বস্তিকর দৃশ্য হতে আড়াল করার সিদ্ধান্ত নেন: বিপর্যয়কর দৃশ্য দূরে ঠেলে রাখার জন্যে প্রসাদের চারপাশে প্রহরা বসানো হয়েছিল। কার্যত বন্দিতে পরিণত হয়েছেন গৌতম। যদিও বিলাসীতার আপাত সুখী জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। গৌতমের প্রমোদ প্রাসাদ অস্বীকৃতি প্রকাশকারী মনের একটা জোরাল ইমেজ। আমরা যতক্ষণ আমাদের চারপাশে থেকে ঘিরে রাখা সর্বজনীন যন্ত্রণার থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে চাই, ততক্ষণ আমরা পরিণত ও আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টির অযোগ্য আমাদের এক অনুন্নত ভাষ্যে বন্দি হয়ে থাকি। তরুণ সিদ্ধার্থ এক ধরনের বিভ্রান্তিতে বাস করছিলেন, কেননা জগৎ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে প্রকৃত অবস্থার মিল ছিল না। পরবর্তী সময়ের বুদ্ধ ট্র্যাডিশন যাকে নিন্দা করবে শুদ্ধোদোন ঠিক সেই রকম একজন কর্তৃত্ব-পুরুষ। নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছেলের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন তিনি, তাঁকে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দিতে অস্বীকার গেছেন। এই জাতীয় নিপীড়ন কেবল আলোকনকেই ব্যাহত করতে পারে, কেননা এটা মানুষকে এমন এক সত্তায় আবদ্ধ করে যা সঠিক নয়; শিশুসুলভ অজাগ্রত অবস্থা।

কিন্তু দেবতাগণ হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁরা জানতেন গৌতমের বাবা মেনে নিতে অস্বীকার করলেও তিনি একজন বোধিসত্তা; বুদ্ধ হওয়াই যাঁর নিয়তি। অবশ্য দেবতারা গৌতমকে আলোকনের দিকে পরিচালিত করেননি, কারণ তাঁরাও সামসারায় বন্দি এবং মানুষের মতোই মুক্তি লাভের পথ শেখানোর জন্যে একজন বুদ্ধের প্রয়োজন ছিল তাঁদের। কিন্তু দেবতাগণ বোধিসত্তাকে অতি-প্রয়োজনীয় ধাক্কা দিতে পারতেন। তাঁর বয়স ঊনত্রিশ বছর হলে, তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে, যথেষ্ট দীর্ঘ সময় বোকার স্বর্গে বাস করেছেন গৌতম, তো তাঁরা তাঁদেরই একজনকে জরাগ্রস্ত মানুষের বেশে প্রমোদ-বাগিচায় পাঠালেন, শুদ্ধোদোনের প্রহরীদের ফাঁকি দেওয়ার জন্যে অলৌকিক ক্ষমতা কাজে লাগাতে পেরেছিলেন তিনি। বাগিচায় শকট চালানোর সময় এই বুদ্ধকে দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়লেন গৌতম। রথচালক চান্নাকে লোকটার কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলেন। চান্না ব্যাখ্যা করল, স্রেফ বুড়িয়ে গেছে সে: যারা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে তাদের সবাইকে এমনি ক্ষয়ে যেতে হবে। গভীর দুঃখ নিয়ে প্রাসাদে ফিরে গেলেন গৌতম।

ঘটনা জানতে পেরে পাহারা দ্বিগুণ করে দিলেন শুদ্ধোদোন। ছেলেকে ভিন্নমুখী করতে বিনোদনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন–কিন্তু কোনও লাভ হলো না। আরও দুটো উপলক্ষ্যে দেবতারা অসুস্থ ও শবদেহের রূপ ধরে গৌতমের সামনে হাজির হলেন। সবশেষে গৌতম ও চান্না সন্ন্যাসীর গেরুয়া পোশাক পরা এক দেবতার পাশ দিয়ে রথ চালিয়ে গেলেন। দেবতাদের অনুপ্রেরণায় চান্না গৌতমকে জানাল, এই মানুষটি জগৎ সংসার ত্যাগ করেছেন। তারপর এমন আবেগের সঙ্গে সন্ন্যাস জীবনের গুণ গাইল ফলে খুবই চিন্তিত মনে ঘরে ফিরে এলেন গৌতম। সে রাতে জেগে উঠে দেখলেন ওইদিন সন্ধ্যায় যারা তাঁর মনোরঞ্জনে ব্যস্ত ছিল সেই কবি আর নাচিয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। তাঁর শয্যার চারধারে সুন্দরী মেয়েরা আলুথালু হয়ে শুয়ে আছে: ‘কারও শরীর লালা- থুতুতে পিচ্ছিল, অন্যরা দাঁত কাটছে, ঘুমের ঘোরে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছে; কেউ কেউ আবার হাঁ করে ঘুমোচ্ছে।’ জগৎ সম্পর্কে গৌতমের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। ব্যতিক্রমহীনভাবে প্রতিটি সত্তার সামনে অপেক্ষমান ভোগান্তির ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠায় সবকিছু কুৎসিৎ মনে হলো তাঁর-অনাকর্ষণীয় বটে। জীবনের জ্বালা-যন্ত্রণাকে আড়াল করে রাখা পর্দা ছিঁড়ে পড়েছিল, জগৎ-সংসারকে মনে হয়েছে কষ্টের কারাগার, অর্থহীন। “কী অসহনীয়, শ্বাসরুদ্ধকর!’ চেঁচিয়ে উঠলেন গৌতম। লাফিয়ে বিছানা থেকে নামলেন তিনি, সেই রাতেই ‘অগ্রসর’ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।[৪১]

মানবীয় অবস্থার অনিবার্য অংশ দুঃখ-কষ্টকে দূরে রাখার চেষ্টা সবসময়ই প্রলুব্ধকারী, কিন্তু একবার আমাদের সৃষ্টি করা সতর্কতার প্রাচীর ভেঙে পড়লে আমরা আর জগতকে আগের মতো করে দেখতে পারি না। জীবন অর্থহীন মনে হয় এবং একজন অ্যাক্সিয়াল-যুগ অগ্রযাত্রী পুরোনো প্রচলিত ধরণ ভেঙে বের হয়ে আসতে নিজেকে বাধ্য মনে করবেন, এই যন্ত্রণার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার নতুন পথ বের করার চেষ্টা করবেন। কেবল মনের অন্তস্থ আশ্রয়ের সন্ধান পাবার পরই জীবন আবারও অর্থপূর্ণ ও মূল্যবান মনে হবে। গৌতম দুঃখকে তাঁর অন্তরে অনুপ্রবেশ করার সুযোগ দেওয়ার পরেই তাঁর জগৎ ভেঙে পড়েছে। আমাদের অনেকেই দুঃখ-কষ্টকে দূরে ঠেলে রাখার জন্যে চারপাশে যে দেয়াল তুলে রাখি তিনি সেই কঠিন আস্তরণকে ভেঙে ফেলেছেন। কিন্তু দুঃখ-কষ্টকে প্রবেশ করতে দেওয়ার পরেই তাঁর অনুসন্ধান শুরু হতে পেরেছে। বাড়ি ছাড়ার আগে স্ত্রী-সন্তানকে শেষ বারের মতো দেখবেন বলে পা টিপে টিপে ওপরে গিছেন তিনি, কিন্তু বিদায়ের কথা বলতে পারেননি। সবার অজান্তে প্রাসাদ ছেড়ে বের হয়ে গেছেন। কানসাকা নামের ঘোড়ায় চেপে শহরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর বিদায় রোধ করার জন্যে মরিয়া হয়ে লাগাম ধরে রাখে চান্না। তাঁকে বেরিয়ে যাবার সুযোগ দিতে নগর তোরণ খুলে দিলেন দেবতারা। কাপিলাবাস্তু ছাড়ার পর মাথা মুড়িয়ে গেরুয়া পোশাক পরলেন গৌতম। তারপর চান্না ও কানসাকাকে বাবার বাড়িতে ফেরত পাঠালেন। আরেকটি বুদ্ধ-কিংবদন্তীতে আমাদের বলা হচ্ছে, ঘোড়াটা দুঃখে মারা যায়, কিন্তু বুদ্ধের আলোকপ্রাপ্তিতে তার অবদানের পুরস্কার হিসাবে মহাবিশ্বের কোনও এক স্বর্গে দেবতা হিসাবে পুনর্জন্ম পেয়েছিল সে।

পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শুরু করার আগে গৌতমকে শেষবারের মতো আরেকটি প্রলোভনের মোকাবিলা করতে হয়েছে। এই জগতের প্রভু, পাপ, লোভ ও মৃত্যুর দেবতা মারা সহসা ভীতিকরভাবে তাঁর সামনে হাজির হলেন। ‘সন্ন্যাসী হয়ো না! জগৎ অস্বীকার করো না।’ মিনতি জানালেন মারা। আর মাত্র এক সপ্তাহ ঘরে থাকলেই চক্কবত্তী হয়ে যেতেন গৌতম, গোটা জগৎ শাসন করতে পারতেন। কত কিছু তিনি করতে পারবেন, ভাবুন। দয়ালু সরকারের সাহায্যে জীবনের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে পারবেন তিনি। এটা অবশ্য একটা সহজ বিকল্প ও বিভ্রান্তি ছিল, কারণ শক্তি দিয়ে দুঃখকে জয় করা যায় না। এক অনালোকিত সত্তার প্রস্তাবনা ছিল এটা। গৌতমের সমগ্র জীবনে মারা তাঁর অগ্রগতি ব্যাহত করার প্রয়াস পাবেন, তাঁর মর্যাদা হ্রাসের প্রয়াসে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করবেন। সে রাতে গৌতম অনায়াসে মারার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ক্রুদ্ধ দেবতা হাল ছাড়তে রাজি হননি। ‘তোমাকে আমি ধরব,’ আপনমনে ফিসফিস করে বলেছেন তিনি, ‘যখনই তোমার মনে নোংরা, ঘৃণিত বা বাজে চিন্তা খেলে যাবে।’ মুহূর্তের দুর্বলতায় ফাঁদে ফেলার জন্যে গৌতমকে ‘চিরস্থায়ী ছায়ার মতো’ অনুসরণ করে গেছেন তিনি।[৪২] গৌতম পরম আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার বহু পরেও মারার বিরুদ্ধে সতর্ক সজাগ থাকতে হয়েছে তাঁকে, সম্ভবত জাঙ্গীয় মনস্তাত্ত্বিকরা যাঁকে তাঁর ছায়া-সত্তা বলবেন, তিনি তাঁকে তুলে ধরছেন–যা আমাদের মুক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলা মনের সমস্ত অবচেতন উপাদান। আলোকপ্রাপ্তি কখনওই সহজ নয়। আমাদের পুরোনো সত্তাকে ত্যাগ করা ভীতিকর, কারণ কেমন করে বাঁচতে হয় সেটা জানার ওটাই আমাদের একমাত্র উপায়। অসন্তোষজনক হলেও আমরা পরিচিত জিনিস আঁকড়ে থাকতে চাই, কারণ আমরা অজানাকে ভয় পাই। কিন্তু গৌতমের বেছে নেওয়া পবিত্র জীবনের দাবি ছিল তিনি তাঁর ভালোবাসার সমস্ত কিছু ও তাঁর অপরিপক্ক ব্যক্তিত্বকে গঠনকারী সবকিছুকে ত্যাগ করবেন। প্রতিটি বাঁকে তিনি তাঁর ওই অংশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছেন (মারার মাধ্যমে প্রতীকায়িত) যা এই সামগ্রিক আত্ম-পরিত্যাগে কুঁকড়ে গেছে। মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকবার সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ের সন্ধান করছিলেন গৌতম এবং এই নতুন সত্তার জন্ম দেওয়ার জন্যে দীর্ঘমেয়াদী কঠিন পরিশ্রমের প্রয়োজন হবে। দক্ষতারও প্রয়োজন হবে। আলোকপ্রাপ্তিতে সাহায্য করতে পারবেন এমন একজন গুরুর খোঁজে নামলেন গৌতম।

***

তথ্যসূত্র

১. গৌতমের জন্ম ও ‘অগ্রসর হওয়া’র তারিখ এখন বিতর্কিত। পশ্চিমা পণ্ডিতগণ এক সময় অনুমান করেছিলেন যে, ৫৬৩ সাল নাগাদ জন্ম গ্রহণ করেছেন তিনি। সুতরাং, সে অনুযায়ী ৫৩৪-এর দিকে গৃহত্যাগ করে থাকবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পণ্ডিতগণ আভাস দিয়েছেন, ৪৫০ বিসিই নাগাদ গৌতম গৃহত্যাগ করে থাকতে পারেন। হেইনয বারচ্যান্ট, ‘দ্য ডেইট অভ বুদ্ধ রিকনসিডারড’, ইন্দোলোজিয়া টরিনেনসিন, ১০।

২. গৌতমের ছেলের নাম ছিল রাহুলা, সাধারণভাবে যা ‘বাঁধন’ হিসাবে অনুবাদ করা হয়। কোনও কোনও আধুনিক পণ্ডিত এই উদ্ভাবনকে প্ৰশ্ন সাপেক্ষ মনে করেছেন।

৩. মাজহিমা নিকয়া ৩৬.১০০।

৪. প্রাগুক্ত, ২৬, ৩৬, ৮৫, ১০০।

৫. জাতকা, ১: ৬২

৬. ল্যুক ৯: ৫৭-৬২; ১৪: ২৫-২৭; ১৮: ২৮-৩০।

৭. মাজহিমা নিকয়া, ২৬।

৮. আঙুত্তারা নিকয়া, ৩: ৩৮।

৯. মির্চা এলিয়াদ, দ্য মিথ অভ দ্য ইটারনাল রিটার্ন অর কসমস অ্যান্ড হিস্ট্রি, (অনু. উইলার্ড জে. ট্রাস্ক) প্রিন্সটন. এন জে, ১৯৫৪।

১০. মাজহিমা নিকয়া, ২৬

১১. উদনা, ৮: ৩।

১২. সুত্তা-নিপাতা, ৩: ১।

১৩. কার্ল জেস্পারস, দ্য অরিজিন অ্যান্ড গোল অভ হিস্ট্রি, অনু. মাইকেল বুলক, লন্ডন ১৯৫৩।

১৪. প্রাগুক্ত, ২-১২।

১৫. প্রাগুক্ত, ৭, ১৩।

১৬. প্রাগুক্ত, ২৮-৪৬।

১৭. জেনেসিস ২-৩।

১৮. জোসেফ ক্যাম্পবেল, অরিয়েন্টাল মিথলোজি, দ্য মাস্কস্ অভ গড, নিউ ইয়র্ক, ১৯৬২, ২১১-১৮।

১৯. বিনয়া: কুলাভাগ্য ৬: ৪; ৭: ১।

২০. মাজহিমা নিকয়া, ৪।

২১. আলফ্রেড ওয়েবার, কালচারজেশিকতে আলস কাল্পচারসাযিওলোজি, লেইডেন, ১৯৩৫; দাস ব্রাজিশচে আন্দ দাই জেসাচিশতে, হামবূৰ্গ, ১৯৪৩।

২২. রিচার্ড এফ, গমব্রিচ, থেরাভেদা বুদ্ধজম: আ সোশ্যাল হিস্ট্রি ফ্রম অ্যানেশেন্ট বেনারেস টু মডার্ন কলোম্বো, লন্ডন ও নিউ ইয়র্ক, ১৯৮৮, ৩৩-৫৯।

২৩. প্রাগুক্ত, ৩৩-৩৪; হারমান অলদেনবার্গ, দ্য বুদ্ধা: হিজ লাইফ, হিজ ডকট্রিন, হিজ অর্ডার (অনু. উইলিয়াম হোয়ে), লন্ডন, ১৮৮২, ১৯-২১, ৪৪-৪৮: ট্রেভর লিঙ, দ্য বুদ্ধা: বুড্ডিস্ট সিভিলাইজেশন ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড সিলোন, লন্ডন, ১৯৭৩, ৬৬-৬৭।

২৪. সুকুমার দত্ত, বুড্ডিস্ট মঙ্কস অ্যান্ড মনেস্টারিজ অভ ইন্ডিয়া, লন্ডন, ১৯৬২, ৭৩।

২৫. জেস্পারস, অরিজিন অ্যান্ড গোল, ৪৮-৪৯।

২৬. প্রাগুক্ত, ৫৫।

২৭. মার্শাল জি.এস. হজসন, দ্য ভেঞ্চার অভ ইসলাম, কনশিয়েন্স অ্যান্ড হিস্ট্রি ইন আ ওঅর্ল্ড সিভিলাইজেশন, ৩ খণ্ড, শিকাগো ও লন্ডন, ১৯৭৪, ১০৮-৩৫।

২৮. লিঙ, দ্য বুদ্ধা, ৩৮-৫৫; মাইকেল কারিথার্স, দ্য বুদ্ধা, অক্সফোর্ড ও নিউ ইয়র্ক, ১৯৮৩, ১৩-১৮; গমব্রিচ, থেরাভেদা বুদ্ধজম, ৫০-৫৯।

২৯. লিঙ, দ্য বুদ্ধা, ৪৮-৪৯।

৩০. গমব্রিচ, থেরাভেদা বুদ্ধজম, ৩৪৯-৫০; কারিথার্স, দ্য বুদ্ধা, ১২-১৪। ৩১. লিঙ, দ্য বুদ্ধা ৫৩-৬৩; মাইকেল এডোয়ার্ডস্, ইন দ্য ব্লোইং আউট অভ আ ফ্লেইম: দ্য ওঅর্ল্ড অভ দ্য বুদ্ধা অ্যান্ড দ্য ওঅর্ল্ড অভ ম্যান, লন্ডন, ১৯৭৬, ২৭-২৯।

৩২. রিচার্ড এফ. গমব্রিচ, হাউ বুদ্ধজম বিগান: দ্য কন্ডিশন্ড জেনেসিস অভ দ্য আর্লি টিচিংস, লন্ডন ও আটলান্টিক হাইল্যান্ডস্, এনজে. ১৯৯৬, ৩১-৩৩; থেরাভেদা বুদ্ধজম, ৪৬-৪৮; কারিথার্স, দ্য বুদ্ধা, ২৪-২৫; লিঙ, দ্য বুদ্ধা, ৪৭-৫২।

৩৩. লিঙ, দ্য বুদ্ধা, ৬৫-৬৬; অলদেনবার্গ, দ্য বুদ্ধা, ৪১-৪৪।

৩৪. চ্যান্দোগ্য উপনিষদ, ৬: ১৩।

৩৫. অলদেনবার্গ, দ্য বুদ্ধা, ৫৯-৬০।

৩৬. প্রাগুক্ত, ৬৪; ক্যাম্পবেল, অরিয়েন্টাল মিথলোজি: দ্য মাস্কস্ অভ গড, ১৯৭-৯৮।

৩৭. দত্ত, বুড্ডিস্ট মঙ্কস, ৩৮-৪০।

৩৮. জাতকা ১, ৫৪-৬৫, হেনরি ক্লার্ক ওয়ারেন’র বুদ্ধজম ইন ট্রান্সলেশন-এ, ক্যাম্ব্রিজ, ম্যাস, ১৯০০, ৪৮-৬৭।

৩৯. দিঘা নিকয়া ২: ২১-২৯।

৪০. জাতকা, ১: ৬১।

৪১. প্রাগুক্ত, ১: ৬৩।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *