১১. ফুটবল খেলার মাঠে শিবরাম চক্রবর্তী ও বিশ্বপতি চৌধুরী

ফুটবল খেলার মাঠে দুজন সাহিত্যিককে আমরা আবিষ্কার করি। শিবরাম চক্রবর্তী সেন্টারের কাছে গ্যালারির প্রথম ধাপে ধাড়াতোকে টেনে আনতে দেরি হত না আমাদের দশচক্রে গোলগাল নধরকান্তি চেহারা, লম্বা চুল পিছনের দিকে ওলটানো। সমস্তটা উপস্থিতি রসে-হাশ্যে সমুজ্জল। তার মধ্যে শ্লেষ আছে কিন্তু দ্বেষ নেইসে সরসতা সরলতারই অন্য নাম। ভারতীতে অদ্ভুত কত গুলো ছোট গল্প লিখে অস্বাভাবিক খ্যাতি অর্জন করেছে, আর তার কবিতাও স্পষ্টস্পর্শ প্রেমের কবিতা—আর সে-প্রেম একটু জরো হলেও জল-বার্তিখাওয়া প্রেম নয়। শিবরামের সত্যিকারের আবির্ভাব হয় তার একান্ত নাটিকায়—যেদিন তারা কথা বলবে আজকালকার গণসাহিত্যের নিতুল পূর্বগামী। সেই স্তব্ধতার দেশে বেশি দিন না থেকে শিবরাম চলে এল উল-উচ্ছল মুখরতার দেশে। কলহাস্যের মুখরতা। শিবরাম হাসির গল্পে কায়েমী বাসা বাঁধলে। বাসা যেমন পাকা, স্বত্ব তেমনি উঁচুদরের।

হাসির প্রাণবন্ত প্রস্রবণ এই শিবরাম। সব চেয়ে সুন্দর, সবাইকে যখন সে হাসায় তখন সেই সঙ্গে সঙ্গে নিজেও সে হাসে এবং সবাই চেয়ে বেশি হাসে। আর, হাসলে তাকে অত্যন্ত সুন্দর দেখায়। গালে কমনীয় টোল পড়ে কিনা জানি না, কিন্তু তার মন যে কী অগাধ নির্মল, তার পরিচ্ছন্ন ছায়া তার মুখের উপর ভেসে ওঠে। পরকে নিয়ে হয়ত হাসছে তবু সর্বক্ষণ সেই পরের উপর তার পরম মমতা! শিবরামের কোনো দল নেই ও নেই। তার হাসির হাওয়া জন্যে প্রত্যেকের হৃদয়ে উন্মুক্ত নিমন্ত্রণ। শিবরামই বোধ হয় একমাত্র লোক যে লেখক হয়েও অন্যের লেখার অবিমিশ্র প্রশংসা করতে পারে। আর সে-প্রশংসায় এতটুকু ফাঁক বা ফাঁকি রাখে না। আজকালকার দিনে লেখক, লেখক হিসেবে যত না হোক, সমালোচক হিসেবে বেশি বুদ্ধিমান। তাই অন্য লেখককে পরিপূর্ণ প্রশংসা করতে তার মন ছোট হয়ে আসে। হয়ত ভাবে, অন্যকে প্রশংসা। করলে নিজেই ছোট হয়ে গেলাম। আর যদি বা প্রশংসা করতে হয় এমন কটা কিন্তু আর যদি এনে ঢোকাতে হবে যাতে বোঝা যাবে লেখক হিসাবে তুমি বড় হলেও বোদ্ধা হিসেবে আমি আরো বড়। মানে প্রশংসা করতে হলে শেষ পর্যন্ত আমিই যেন জিতি, পাঠকেরা আমাকেই যেন প্রশংসা করে। বুদ্ধির সঙ্গে এমন সংকীর্ণ আপোষ নেই শিবরামের। যদি কোনো লেখা তার মনে ধরে সে মন মাতিয়ে প্রশংসা করবে। আর প্রশংসা করবে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, নিজের জন্যে এতটুকু সুখ-সুবিধে না রেখে। এই প্রশংসায় তার নিজের বাজার উঠে গেল কিনা তার দিকে না তাকিয়ে। যতদূর দেখেছি, শিবরামই তাদের মধ্যে এক নম্বর, যারা লেখক হয়েও অন্য লোকের লেখা পড়ে, ঠিকঠাক মনে রাখে ও গায়ে পড়ে ভালো লেখার সুখ্যাতি করে বেঁড়ায়।

কিন্তু এক বিষয়ে সে নিদারুণ গভীর। অন্তত সে-সব দিনে থাকত। হাইকোর্টের আদিম বিভাগে কি এক মহাকায় মোকদ্দমা হচ্ছে তার ফলাফল নিয়ে। অবিশ্যি অফল নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই, কেননা অফলে যেমনটি আছে তেমনটিই থাকবে-মুক্তারামবাবুর ব্রিটে মেসে সেই তারামে শোওয়া আর কারাম ভক্ষণ—এ তার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু ফল হলেই বিপদ। তখন নাকি অর্ধেক বা আর সেই সঙ্গে আস্ত একটি অর্ধাঙ্গিনী জুটে যাবার ভয়। মোমায় যে ফল হয় নি তা শিবরামকে দেখলেই বোঝা যায়। কেননা এখনো সে ঐ একই, আছে, দেড় হয়নি; আর মুক্তির আরামে আছেও সেই মুক্তারামবাবুর মেসে। সারা জীবনে যে একবারও বাসা বদল করে না সে নিঃসন্দেহ খাঁটি লোক।

মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে, আর শিবরামের মুখে চলেছে শব্দের খেলা। কুমার হয়তো একটা ভুল পাশ দিলে, অমনি বলে উঠল। কুমার; কিংবা গোষ্ঠর সঙ্গে প্রবল ধাক্কা লেগে ছিটকে পড়ল বিপদের খেলোয়াড়, অমনি বলে উঠল : এ বাবা, শুধু গোষ্ঠ নয়—গোন্ত। মাঠের বাইরেও এমনি খেলা চালাত অবিরাম। জুৎসই একটা নাম পেলেই হল—শত্রু-মিত্র আসে যায় না কিছু। নিজের নামের মধ্যে কি মজার pun রয়েছে শুধু সেই সম্বন্ধেই উদাসীন।

আরেক আবিষ্কার আমাদের বিশুদা-বিশ্বপতি চৌধুরী। একখানা বই লিখে যে বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছে। ঘরের ডাক-এর কথা বলছি—খেলার মাঠেও তার সেই ঘরের ডাক, হৃদয়ের ডাক। সহজেই আমাদের দলের মধ্যে এসে দাঁড়াত আর হাসাত অসম্ভব উচ্চ গ্রামে। হাত অথচ নিজে এতটুকু হাসত না-মুখ-চোখ নিদারুণ নিলিপ্ত ও গভীর করে রাখত। সমস্ত হাসির মধ্যে বিস্তার সেই গাভীটাই সব চেয়ে বেশি হাস্যোদ্দীপক। শিবরাম শুধু বক্তা, কিন্তু বিশুদা অভিনেতা। শিবরামের গল্প বাস্তব কি বিশুদার গল্প একদম বানানো। অথচ, এ যে বানানো তা তার চেহারা দেখে কারু সন্দেহ করার সাধ্য নেই। বরং মনে হবে, এ যেন সদ্য-সদ্য ঘটেছে আর বিশুদা স্বয়ং প্রত্যক্ষদর্শী। এমন নিষ্ঠুর ও নিখুত তার গাম্ভীর্য। উদ্দাম কল্পনার এমন মৌলিক গল্প রচনার মধ্যেও বাহাদুরি আছে। আর সব চেযে কেরামতি হচ্ছে, সে-গল্প বলতে গিয়ে নিজে এতটুকু না-হাসা। মনে হয়, এ যেন মোহনবাগান গোল দেবার পর গো–ল না বলা। শুনলে হয়তো সবাই আশ্চর্য হবে, মোহনবাগান গোল দেয়ার পরেও বিশুদা গম্ভীর থেকেছে।

তার গাম্ভীর্যটাই কত বড় হাসির ব্যাপার, একদিনের একটা ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে। খেলার শেষে মাঠ পেরিয়ে বাড়ি ফিরছি, সঙ্গে বিশুদা। সেদিন মোহনবাগান হেরে গেছে যেন কার সঙ্গে, সকলের মন-মেজাজ অত্যন্ত কুৎসিত। বিশুদা যেমন-কে-তেমন গম্ভীর। কতদূর এগোতেই সামনে দেখি কতকগুলো ছোকরা দুই দলে ভিন্ন হয়ে গিয়ে একে-অন্যকে নৃশংসভাবে গালাগাল করছে। আর এমন সে গালাগাল যে কালাকাল মানছে না। তার মানে, একাল নিয়ে তত নয়, যত পূর্বপুরুষদের কাল নিয়ে তাদের মতান্তর। প্রথম দলের দিকে এগিয়ে গেল বিশুদা। স্বাভাবিক শান্ত গলায় বললে, কি বাবা, গালাগাল দিচ্ছ কেন? বলেই বলা-কওয়া নেই কতকগুলি চান্ত গালাগাল বিশুদা তাদের লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল। তারা একদম ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল—কে এই লোক! পরমুহূর্তেই অপর দলকে লক্ষ্য করে বিশুদা বললে, সব ভদ্রলোকের ছেলে তোমরা, গালাগাল করবে কেন? বলেই ওদেবর দিকে কতকগুলো গালাগাল ঝাড়লে। প্রথম দল তেড়ে এল বিশুদার দিকে : আপনি কে মশাই আমাদের গালাগাল দেন? দ্বিতীয় দলও মারমুখো। আপনি গালাগাল করবার কে? আপনাকে কি আমরা চিনি, না, দেখেছি? দেখতে দেখতে দু দল একত্র হয়ে বিশুদাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হল। বিশুদার গম্ভীর মুখে দুষ্টু একটু হাসি। করজোড় করে বললে, বাবারা, আর কেন? যে ভাবেই হোত, দু দলকে মিলিয়ে দিয়েছি তোত। যাও বাবার বাড়ি যাও। এমনি একত্র হয়ে থাক—মাঠের খেলায় দেশের খেলায় সব খেলায় জিততে পারবে। আমার শুধু মিলিয়ে দেওয়া কথা। নইলে, আমি কেউ না।

ছেলে দল শুদ্ধু হেসে উঠল। বিশুদার ধোপে কোথাও যায় এতটুকু ঝগড়াঝাটি রইল না।

বিশ্বপতি আর শিবরাম কল্লোলে হয়তো কোনোদিন লেখেনি কিন্তু দু জনেই কল্লোলের বন্ধু ছিল নিঃসংশয়। মনোভঙ্গির দিক থেকে শিবরাম তো বিশেষ সমগোত্র। কিন্তু এমন একজন লোক আছে যে আপাতদৃশ্যে কল্লোলের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও প্রকৃতপক্ষে কল্লোলের স্বজনসুহৃদ। সে কাশীর সুরেশ চক্রবর্তী—উত্তরার উত্তরসাধক।

আমরা তার নাম রেখেছিলাম চটপটি। ছোছাটখাটো মানুষটি, মুখে অনর্গল কথা, যেন তপ্ত খোলায় চড়বড় করে খই ফুটছে—একদও এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে নারাজ, হাতে-পায়ে অসামান্য কাজকে সংক্ষিপ্ত করার অসম্ভব ক্ষিপ্রতা। এক কথায় অদম্য কর্মশক্তির অন্য প্রতিমান। একদিন কল্লোলের কনওয়ালিশ স্ট্রিটের দোকানে এসে উপস্থিত—সেই সর্বত্রগামী পবিত্রর সঙ্গে। কি ব্যাপার? প্রবাসী বাঙালিদের তরফ থেকে দুর লক্ষ্ণৌ থেকে মাসিকপত্রিকা বের করা হয়েছে—চাই কল্লোলের সহযোগ। সম্পাদক কে? সম্পাদক লক্ষৌর সার্থকনামা ব্যারিস্টার-এ পি সেন-মানে, অতুলপ্রসাদ সেন আর প্রথিতযশা প্রফেসর রাধাকমল মুখোপাধ্যায়। তবে তো এ মশাই প্রৌঢ়পন্থী কাগজ, এর সঙ্গে আমাদের মিশ খাবে কি করে? আমরা যে আধুনিক, অমল হোমের প্রশস্তি-অনুসারে অতি-আধুনিক। আমরা যে উগ্বজ্বলন্ত নবীন।

কোনো দ্বিধা নেই। উত্তরা নিরুত্তর থাকবে না তোমাদের তারুণ্যের বাণীতে। যেমন আমি, সুরেশ চক্রবর্তী, ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের বন্ধুর ডাকে নিমেষেই সাড়া দিয়ে উঠেছি। কে তোমাদের পথ আটকাবে, কে মুখ ফিরিয়ে নেবে অস্বীকারে? আর যা আন্দাজ করেছ তা নয়। অতুলপ্রসাদ অবিশ্যি ভালোমানুষ, বাংলা সাহিত্যের হালচাল সম্বন্ধে বিশেষ ওয়াকিবহাল নন। মোটা আয়ের এ্যাকটিস, তাই নিয়ে মেতে থাকেন। যখন এক-আধটু সময় পান, হালকা গান বাঁধেন। (হালকা মানে গড়ন-পিটনটা হালকা, কিন্তু সে গভীরসঞ্চারী। সে সোজা হৃদয়ের থেকে উঠেছে বলেই বোঝা যায় তার হৃদয়ও কত গভীর আর কত গাঢ়।) তিনি শুধু নাম দিয়েই খালাস। প্রবাসী বাঙালির উন্নতি চান, আর তার মতে উন্নতির প্রথম সোপানেই মাতৃভাষায় একখানি পত্রিকা দরকার। তাকে তোমরা বিশেষ ধোবো না। আর রাধাকমল? বয়সে তিনি প্রবীণ হলেও জেনে রাখখ, তিনি সাহিত্য-প্রগতিতে বিশ্বাসী, নতুন লেখকদের সমর্থনে উদ্যতা। তাকে আপন লোক মনে কোনো। আর অত উচ্চদৃষ্টি কেন? সামনে এই বেঞ্চিতে যে সশরীরে বসে আছি আমি, তাকে দেখ। যে আসল কর্ণধার, যে মূলকারক।

সুরেশ চক্রবর্তী কি করে এল সাহিত্যে, কবে কখন কি লিখল, বা আদৌ কিছু লিখেছে কিনা, প্রশ্ন করার কথাই কারু মনে হল না। সাহিত্যে তার আবির্ভাবটা এত স্বভাবসিদ্ধ। সাহিত্য তার প্রাণ, আর সাহিত্যিকরা তার প্রাণের প্রাণ। সব সাহিত্য আর সাহিত্যিকের খবর-অখবর তার নখদর্পণে। সে যে বিশেষ করে অতি-আধুনিকদের নিমন্ত্রণ করেছে এতেই তো প্রমাণ হচ্ছে তার উদার ও অগ্রসর সাহিত্যবুদ্ধির। যদিও কাশীতে সে থাকে, আসল কাশীবাস তো সৎসঙ্গে। আমাদের যখন ডাকছে, বললাম সুরেশকে, তার কাশীবাস এতদিনে সফল হল।

শেষকালে কাশীপ্রাপ্তি না ঘটে। আমাদের মধ্যে থেকে কে টিপ্পনি কাটলে।

না, তেরোশ বত্রিশে যে উত্তরা বেরিয়েছিল তা এখনো টিকে আছে। কল্লোলে-কালিকলম-প্রগতি আর নেই, কিন্তু উত্তরা এখনো চলছে। এ শুধু একটা আশ্চর্য অনুষ্ঠান নয়, সুরেশ চক্রবর্তীই একটা আশ্চর্য প্রতিষ্ঠান। মুহিত্যের কত হাওয়া-বদল হল, কত উত্থান-পতন, কল্লোল যুগ কিন্তু সুরেশের নড়চড় নেই, বিচ্ছেদ-বিরাম নেই। ঝড়ের রাতেও নির্ভীক দীপস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে উপেক্ষিত নিঃসঙ্গতায়।

উত্তরার দুজন নিজস্ব লেখক ছিল; যদিও তারা মার্কামারা নন, মননে-চিন্তনে তারা তর্কাতীত আধুনিক, আর আধুনিক মানেই প্রগতিপন্থী। প্রগতি মানে প্রচলিত মতানুগত না হওয়া। দুজনেই পণ্ডিত, শিক্ষাদাতা; কিন্তু শুনতে যেমন জবড়জং শোনাচ্ছে, তাদের মনে ও কলমে কিন্তু একটুকুও জং ধরেনি। রূপালি রোদে ঝিলিক-মারা ইস্পাতের মত তাতে যেমন বুদ্ধির ধার তেমনি ভাবের জেল্লা। এক হচ্ছেন লক্ষ্ণৌর ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আর হচ্ছেন কাশীর মহেন্দ্র রায। একজন বাক্যকুশল, আরেকজন সুমিতাক্ষর। কিন্তু দুজনেই আসর-জমানো মজলিসী লোক—আধুনিকতার পৃষ্ঠপোষক। একে একে সবাই তাই ভিড়ে গেলাম সে-আসরে। নজরুল, জগদীশ গুপ্ত, শৈলজা, প্রেমেন, প্রবোধ, বুদ্ধদেব, অজিত। ঝকঝকে কাগজে ঝরঝরে ছাপা-উত্তর। সাজসজ্জায়ও উত্তমা। সবাইরই মন টানল।

সব চেয়ে বড় ঘটনা, সাহিত্যের এই আধুনিকতা প্রথম প্রকাশ্য অভিনন্দন পায় এই প্রবাসী উত্তরায়। সেই উদ্যোগ-উদ্ভবের গোড়াতেই। আর, স্বয়ং রাধাকমলের লেখনীতে। দুঃসাহসিক আন্তরিকতায় তার সমস্ত প্রবন্ধটা অত্যন্ত স্পষ্ট ও সত্য শোনাল। শুধু ভাবের নবীনতাই নয়, ভাষার সজীবতাকেও তিনি প্রশংসা করলেন। চারিদিকে হৈ-চৈ পড়ে গেল। আমরা মেতে উঠলাম আর আমাদের বিরুদ্ধ দল তেতে উঠল। যার শক্তি আছে তার শক্তও আছে। শত্রুতাটা হচ্ছে শক্তিপূজার নৈবেদ্য। আমাদের নিন্দা করার মানেই হচ্ছে আমাদের বন্দনা করা।

মোহিতলালকে আমরা আধুনিকতার পুরোধা মনে করতাম। এক কথায়, তিনিই ছিলেন আধুনিকোত্তম। মনে হয়, যজন-যাজনের পাঠ আমরা তার কাছে থেকেই প্রথম নিয়েছিলাম। আধুনিকতা যে অর্থে বলিষ্ঠতা, সত্যভাষিতা বা সংস্কাররাহিত্য তা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম তার কবিতায়। তিনি জানতেন না আমরা তাঁর কবিতার কত বড় ভক্ত ছিলাম, তার কত কবিতার লাইন আমাদের মুখস্ত ছিল।

হে প্রাণ-সাগর! তোমাতে সকল প্রাণের নদী
পেয়েছে বিরাম, পথের প্লাবন-বিবোধ রাধি!
হে মহামৌনি, গহন তোমার চেতনতলে
মহাবুভুক্ষাবারণ তৃপ্তি-মন্ত্র জ্বলে!
ধন্বন্তরি! মন্বন্তর-মন্থ-শেষ–
তব করে হেরি অমৃতভাণ্ড-অবিদ্বেষ?

কিংবা

পাপ কোথা নাই-গাহিয়াছে ঋষি, অমৃতের সন্তান–
গেয়েছিল আলো বায়ু নদীজল তরুলতা-মধুমান!
প্রেম দিয়ে হেথা শোধন-করা যে কামনার সোমরস,
সে রস বিরস হতে পারে কভু? হবে তার অপযশ?

ফুটপাতের উপর গ্যাসপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি যখন আমাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কবিতা পড়িয়ে শোনাতেন তখন আবৃত্তির বিহবলতায় তার দুই চোখ বুজে যেত। আমরা কে শুনছি বা না শুনছি, বুঝছি বা না বুঝছি, এটা রাস্তা না বাড়ি, সে-সব সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ছিল, তিনি যে তদশতচিত্তে আবৃত্তি করতে পারছেন সেইটেই তার বড় কথা। কিন্তু যদি মুহূর্তমাত্র চোখ মেলে দেখতেন সামনে, দেখতে পেতেন আমাদের মুখে লেশমাত্র বিরক্তি নেই, বরং ভক্তির নম্রতায় সমস্ত মুখ-চোখ গদগদ হয়ে উঠেছে। স্থান ও সময়ের সীমাবোধ সম্বন্ধে তিনি কিঞ্চিৎ উদাসীন হলেও তার কবিতার চিত্তহারিতা সম্বন্ধে আমরা বিন্দুমাত্র সন্দিহান ছিলাম না।

তিনি নিজেও সেটা বুঝতেন নিশ্চয়। তাই একদিন পরমপ্রত্যাশিতের মত এলেন আমাদের আস্তানায়, শোপেনাওয়ার-এর উদ্দেশে লেখা তার বিখ্যাত কবিতা পান্থ সঙ্গে নিয়ে। সেই কবিতা আধুনিকতায় দেদীপ্যমান। কল্লোলে বেরিয়েছিল তেরোশ বত্রিশের ভাদ্র সংখ্যায়। আর এ কবিতা বের করতে পারে কল্লোল ছাড়া আর কোনো কাগজ তখন ছিল না বাংলাদেশে।

সুন্দরী সে প্রকৃতিরে জানি আমি মিথ্যা সনাতনী!
সত্যেরে চাহি না তবু, সুন্দরের করি আরাধনা–
কটাক্ষ-ঈক্ষণ তার–হৃদয়ের বিশল্যকরণী। স্ব
স্বপনের মণিহারে হেরি তার সীমন্ত-রচনা!
নিপুণা নটিনী নাচে, অঙ্গে অঙ্গে অপূর্ব লাবণি!
স্বর্ণপাত্রে সুধারস, না সে বিষ?—কে করে শোচনা!
পান করি সুনির্ভয়ে, মুচকি হাসে যবে ললিত-লোচনা!

জানিতে চাহি না আমি কামনার শেষ কোথা আছে,
ব্যথায় বিবশ, তবু হোম কবি জালি কামানল!–
এ দেহ ইন্ধন তায়—সেই সুখ! নেত্রে মোর নাচে
উলঙ্গিনী ছিন্নমস্তা! পাত্রে ঢালি লোহিত গরল!
মৃত্যু ভৃত্যরূপে আসি ভয়ে-ভয়ে পরসাদ যাচে!
মুহূর্তের মধু লুটি—ছিন্ন করি হৃদ্‌পদ্মদল!
যামিনীর ডাকিনীরা তাই হেরি একসাথে হাসে খলখল!

চিনি বটে যৌবনের পুরোহিত প্ৰেম-দেবতারে,–
নারীরূপা প্রকৃতিরে ভালোবেসে বক্ষে লই টানি;
অনন্তরহস্যময়ী স্বপ্নসখী চির-অচেনারে
মনে হয় চিনি যেন-এ বিশ্বের সেই ঠাকুরানী।
নেত্র তার মৃত্যু-নীল।—অধরের হাসির বিথারে
বিস্মরণী রশ্মিরাগ! কটিতলে জন্ম-রাজধানী।
উরসের অগ্নিগিরি সৃষ্টির উত্তাপ-উৎস!–জানি তাহা জানি।

অবিস্মরণীয় কবিতা। বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব ঐশ্বর্য। তারপর তার প্রেতপুরী বেয়োয় অগ্রহায়ণের কল্লোলে।

হেরি উরসের যুগ্ম যৌবনমঞ্জরী
যে-অনল সর্ব-অঙ্গে শিরায় সঞ্চরি
মৰ্ম্ম গ্রন্থি মোর
দাহ করি গড়ে পুনঃ সোহাগের স্নেহ-হেম ডোর–
সে-অনল পরশের আশে
মোর মত দেথি তারা ঘুরে ঘুবে আশে তব পাশে।

বিলোল কবরী আর নীবিবন্ধু মাঝে
পেলব বঙ্কিম ঠাঁই যেথা যত রাজে–
খুঁজিয়া লয়েছে তারা সর্ব-অগ্রে ব্যগ্র জনে-জনে,
অতনুর তনু-তীর্থে–লাবণ্যের লীলা নিকেতনে।

যত কিছু আদর-সোহাগ
শেষ করে গেছে তার! মোর অনুরাগ,
চুম্বন আশ্লেষ—সে যে তাহাদেরি পুরাতন রীতি,
বহুকৃত প্রণয়ের হীন অনুকৃতি…
আজি এ নিশায়—
মনে হয়, তারা সব রহিয়াছে ঘেরিয়া তোমায়!
তোমার প্রণয়ী, মোর সতীর্থ যে তারা!
যত কিছু পান করি রূপরসধারা–
তারা পান করিয়াছে আগে।
সর্বশেষ ভাগে
তাদেরি প্রসাদ যেন ভুঞ্জিতেছি হায়!
নাহি হেন ফুল-ফল কামনার কল্প-লতিকায়,
যার পরে পড়ে নাই আর কারো দর্শনের দাগ,
—আর কেহ হরে নাই যাহার পরাগ।
ওগো কাম-বধূ!
বল, বল, অনুচ্ছিষ্ট আছে আর এতটুকু মধু?
রেখেছ কি আমার লাগিয়া সযতনে
মনোমঞ্জুষায় তব পীরিতির অরূপরতনে?

আমারো মিটেছে সাধ
চিত্তে মোর নামিছে বহুজনতৃপ্তি-অবসাদ।
তাই যবে চাই তোমাপানে–
দেখি ওই অনাবৃত দেহের শ্মশানে।
প্রতি ঠাঁই আছে কোনো কামনার সদ্য বলিদান!

চুম্বনের চিতাভস্ম, অনজের অঙ্গার-নিশান!
বাঁধিবারে যাই বাহুপাশে
অমনি নয়নে মোর কত মৌনী ছায়ামূর্তি ভাসে।

দিকে দিকে প্রেতের প্রহরা!
ওগো নারী, অনিন্দিত কান্তি তব!–মরি মরি রূপের পসরা!
তবু মনে হয়
ও সুন্দর স্বর্গখানি প্রেতের আলয়!
কামনা-অঙ্কুশ-ঘাতে যেই পুনঃ হইনু বিকল
অমনি বাহুতে কারা পরায় শিকল!
তীব্র সুখ-শিহরণে ফুকারিয়া উঠি যবে মৃদু আর্তনাদে–
নীরব নিশীথে কারা হাহারে উচ্চকণ্ঠে কাঁদে।

মোহিতলালও এলেন উত্তরায়—এলেন আমাদের পুনরাবর্তী হয়ে। কল্লোলের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরাও সরগরম হয়ে উঠল। কিন্তু কত দিন যেতে-না-যেতে কেমন বৈসুর ধরল বাজনায়! মতে বা মনে কোন অমিল নেই, তবু কেন কে জানে, মোহিতলাল বেঁকে দাঁড়ালেনকল্লোলের দল ছেড়ে চলে গেলেন পলের দলে। শুনেছি, সুরেশকে লিখে পাঠালেন, কল্লোলের দলের যে সব লেখক তোমার কাগজে লেখে তাদের সংব যদি না ত্যাগ করে তবে আমি আর উত্তরা। লিখব না! সুরেশ মেনে নিতে চাইল না এ সর্ত। ফলে, মোহিতলাল বর্জন করলেন উত্তরা। সুরেশ আরো দুর্দম হয়ে উঠল। এত প্রখ্য যেন সইল না অতুলপ্রসাদের। তিনি সরে দাঁড়ালেন। তবু সুরেশ অবিচ্যুত। রাধাকমল আছেন, যিনি সাহিত্যে অশ্লীলতা নামক প্রবন্ধে রায় দিয়েছেন আধুনিকতার স্বপক্ষে। কিন্তু অবশেষে রাধাকমলও বিযুক্ত হলেন। সুরেশ, একা পড়ল। তবু সে দমল না, পিছু হটল না। প্রতিজ্ঞার পতাকা খাড়া করে রাখল।

তবু, কেন জানি না–কল্লোলের সঙ্গে শুধু কালি কলমের নামটাই লোকে জুড়ে দেয়-উত্তরার কথা দিব্যি ভুলে থাকে। এ বোধ হয় শুধু অনুপ্রাসের খাতিরে। নইলে, একই লেখকদল এই তিন কাগজে সমানে লিখেছে—সমান স্বাধীনতায়। কালি-কলমের মত উত্তরাও এই আধুনিক ভাবের তলধারক ছিল। বরং কালি-কলমের আগে আবির্ভাব হয়েছিল উত্তরা। কালি-কলমের জন্মের পিছনে হয়তো খানিকটা বিক্ষোভ ছিল, কিন্তু উত্তরায় শুধু সৃজন-সুখের মহোল্লাস। কল্লোল–কালি-কলমের বহু অসম্পূর্ণ কাজ উত্তরা করে দিয়েছে। যেমন আবো বহু পরে করেছে পূর্বাশা।

নিজে লেখেনি, অকণ্টক সূযোগ থাকলেও কোনদিন প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি নিজের সাহিত্যিক অহমিকা, অবিচল নিষ্ঠায় সাহিত্যের তোপন করেছে, প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে শুধু সাহিত্যিকের কীর্তি। এ চিরসংগ্রামশীল দুর্জয় ব্যক্তিত্বকে কি বলে অভিহিত করব? সুরেশকে নিশ্চয় সাহিত্যিক বলব না, বলব সাহিত্যের শক্তিপ্ত ভাস্কর। রূপদক্ষ কারুকার।

মোহিতলালের মত যতীন্দ্রনাথ সেন গুপ্তও আমাদের আরাধনীর ছিলেন—ভাবের আধুনিকতার দিক থেকে যতীন্দ্রনাথের দুঃখবাদ বাংলাসাহিত্যে এক অভিনব অভিমত। আমারে তদানীন্তন মনোভাবের সঙ্গে চমৎকার মিলে গিয়েছিল। দুঃখের মধ্যে কাব্যের যে বিলাস আছে সেই বিলাসে আমরা মশগুল ছিলাম। তাই নৈরাশ্যের দিনে ক্ষণে-ক্ষণে আবৃত্তি করতাম মরীচিক। এমনি টুকরো-টুকরো লাইন :

চেরাপুঞ্জির থেকে
একখানি মেঘ ধার দিতে পার গোবি-সাহারার বুকে?
তুমি শালগ্রাম শিলা
শোয়া-বসা যার সকলি সমান, তারে নিয়ে রাসলীলা!
মরণে কে হবে সাথী,
প্রেম ও ধর্ম জাগিতে পারে না বারোটার বেশী রাতি!
মিছে দিন যায় বয়ে
উপরে ও নীচে ঘুমের তুলসী—এই শালগ্রাম হয়ে।
চারিদিক দেখে চারিদিক ঠেকে বুঝিয়াছি আমি ভাই,
নাকে শাঁক বেঁধে ঘুম দেওয়া ছাড়া অন্য উপায় নাই।
ঝিম ঝিম নিশ্চিন্ত–
নাকের ডগায় মশাটা মশাই আস্তে উড়িয়ে দিন ত।

যতীন্দ্রনাথও নিমন্ত্রণ নিয়েছিলেন কল্লোলের। যতদূর মনে পড়ে তার প্রথম কবিতা বেরোয় কল্লোলের দ্বিতীয় বছরে মাঘমাসে। কবিতার নাম অন্ধকার:

নিদ্রিতা জননীবক্ষে সুপ্তোখিত শিশু
খেলা করে লয়ে কণ্ঠহার।
কোন মহাশিশু ক্রীড়ামুখে
তব বুকে
ঘুরাইছে জ্যোতিৰ্ম্মালা বিশ্ব শৃঙ্খলার?
অন্ধকার, মহা অন্ধকার!

এর পরে আরো কয়েকটি কবিতা তিনি লিখেছিলেন-তার মধ্যে তার রেল-ঘুমটা উল্লেখযোগ্য। চলন্ত ট্রেনের অনুসরণ করে কবিতার ছন্দ বাঁধা হয়েছিল। সত্যেন দত্তের পালকি বা চরকার কবিতার মত। আমাদের কাছে কেমন কৃত্রিম মনে হয়েছিল, কেমন আন্তরিকতাবজিত। মনে আছে, প্রমথ চৌধুরীকে পড়িয়ে শোনানো হয়েছিল কবিতাটা। তিনি বলেছিলেন, মরীচিকার কবির কোনো কবিতাই অপাঙক্তেয় হতে পারে না! এর মোটে বছর খানেক আগে মরীচিকা বেরিযেছে। একখানা ছোট কবিতার বইয়ে এরি মধ্যে যতীন্দ্রনাথ বিদগ্ধজনমনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

যতীন্দ্রনাথের মিতা যতীন্দ্রমোহন বাগচিও কি তাই না এসে পারেন কল্লোলে? আর তিনি এলেন, ভাবতে অদ্ভুত লাগছে, একেবারে মদিরযৌবনের বেশে, কবিতার নামও যৌবন-চাঞ্চল্য।

সহজ স্বচ্ছন্দ মনোরথ–
ভুটিয়া যুবতী চলে পথ।

টসেটসে রস-ভরপুর
আপেলের মত মুখ
আপেলের মত বুক
পরিপূর্ণ প্রবল প্রচুর
যৌবনের রসে ভরপুর।
মেঘ ডাকে কড় কড়
বুঝিবা আসিবে ঝড়,
তিলেক নাহিক ভর তাতে।
উঘারি বুকের বাস
পূরায় মনের আশ
উরস পরশ করি হাতে,
অজানা ব্যথায় সুমধুর
সেথা বুঝি করে গুরগুর।
যুবতী একেলা পথ চলে
পাশের পলাশ বনে
কেন চায় ক্ষণে-ক্ষণে
আবেশে চরণ যেন টলে
পায়ে-পায়ে বাধিয়া উপলে।
আপনার মনে যায়
আপনার মনে গায়
তবু কেন আন-পানে টান!
করিতে রসের সৃষ্টি
চাই কি দশের দৃষ্টি?
স্বরূপ জানেন ভগবান!

কল্লোলের যৌবন-চাঞ্চল্য তা হলে খালি কল্লোলেরই একচেটে নয়!

না, কি কল্লোলের সুর আরো উচ্চরোলে বাধা? তার চাঞ্চল্য আরো বেগবান? তার যাত্রা আরো দুরান্বেষী?

বৃন্তবন্ধহারা
যাব উদ্দামের পথে, যাব আনন্দিত সর্বনাশে,
বিবৃষ্টি মেঘসাথে, সৃষ্টিছড়া ঝড়ের বাতাসে,
যাব, যেথা শঙ্করের টলমল চরণ-পাতনে
জাহ্নবী তরঙ্গমমুখরিত তাণ্ডব-মাতনে
গেছে উড়ে জটাভ্রষ্ট ধুতুরার ছিন্নভিন্ন দল,
কক্ষচ্যুত ধূমকেতু লক্ষ্যহারা প্রলয়-উজ্জল
আত্মঘাতমদমত্ত আপনারে দীর্ণ কীর্ণ করে
নির্মম উল্লাসবেগে, খণ্ড খণ্ড উল্কাপিণ্ড ঝরে,
কণ্টকিয়া তোলে ছায়াপথ—

তাই কি চলেছি আমরা?

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *