স্বপ্নবাসবদত্তা – ষষ্ঠ অঙ্ক
(কঞ্চুকীর প্রবেশ)
কঞ্চুকী—এই কাঞ্চন তোরণদ্বারে কে আছে?
(প্রতিহারীর প্রবেশ)
প্রতিহারী—আমি বিজয়া! কী করতে বলুন।
কঞ্চুকী—আর্যে, বৎসরাজ্য ফিরে পাওয়ায় রাজা এখন সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী! ওঁকে গিয়ে বল, মহাসেনের প্রেরিত কঞ্চুকী আর মহিষী অঙ্গারবর্তীর প্রেরিত বসুন্ধরা দ্বারদেশে উপস্থিত, বসুন্ধরা বাসবদত্তার ধাত্রী!
প্রতিহারী—কিন্তু সামান্য দ্বারপালিকার পক্ষে এই স্থান বা সময় যোগ্য নয়।
কঞ্চুকী—কেন?
প্রতিহারী—শুনুন, আজ সূর্যামুখ প্রাসাদে কোনো এক ব্যক্তি বীণা বাজিয়েছিল। শুনে প্রভু বলেছিলেন—যেন ঘোষবতীর সুর শুনতে পাচ্ছি!
কঞ্চুকী—তারপর?
প্রতিহারী—তারপর সেখানে গিয়ে সেই ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা হল—এ বীণা তুমি কোথায় পেলে? সে বলল – এই বীণা আমি নর্মদা তীরে এক কুর্চ্চলতার ঝোপে কুড়িয়ে পেয়েছি, যদি দরকার থাকে তো আপনি নিন। বীণা আনা হলে পর তাকে কোলে নিয়ে প্রভু মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। মূর্ছা ভাবার পরে অশ্রু কণ্ঠে তিনি বললেন—‘ঘোষবতী! তোমাকে আমি পেলাম কিন্তু তাকে তো দেখতে পেলাম না!’ আর্য! এই কারণেই বলছিলাম, এটা এসব কথা জানাবার সময় নয়, কেমন করে জানাব?
কঞ্চুকী—তুমি সব জানাও, এই ব্যাপার নিয়েই ওদের আসা।
প্রতিহারী—আচ্ছা, আমি বলছি। এই যে প্রভু সূর্যামুখ প্রাসাদ থেকে নেমে আসছেন, আমিও এইখানেই আমার কথা নিবেদন করি।
কঞ্চুকী—আর্যে, তাই হোক।
(উভয়ের প্রস্থান)
মিশ্র বিষ্কম্ভক
(তারপর রাজা ও বিদূষকের প্রবেশ)
রাজা—হে বীণে! তোমার ধ্বনি কত শ্রুতিমধুর! আগে তুমি দেবীর স্তনে ও জঘনে লীন হয়ে থাকতে, পরে তুমি বিহগগণের ধূলিতে ধূসরিত হয়ে কেমন করে নির্জন অরণ্যে বাস করেছিলে? তুমি নিশ্চয়ই হৃদয়হীনা ঘোষবতী! সেই প্রিয়ার শ্রোণিদেশের সমুদ্বহন, পার্শ্বদেশের নিপীড়ন, বক্ষের সুখকর আলিঙ্গন—এই বিরহে আমার উদ্দেশ্যে তার বিলাপ, বাদনের মধ্যে মধ্যে তার হাস্যমধুর উক্তিগুলো কিছু তুমি স্মরণ করছ না!
বিদূষক—আপনি আর এখন এভাবে শোক প্রকাশ করবেন না।
রাজা—না, না সখে, ও কথা বোলো না! আমার চিরসুপ্ত কামনা আবার এই বীণার সুরে জেগে উঠেছে। ঘোষবর্তী যার প্রিয়তমা সেই দেবীকে যে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। বসন্তক! শিল্পীর কাছ থেকে তুমি ঘোষবতীকে নতুন তার দিয়ে বাঁধিয়ে নিয়ে এস—দেরি না হয়।
বিদূষক—আপনার যেমন আদেশ। (বীণা নিয়ে প্রস্থান)
(প্রতিহারীর প্রবেশ)
প্রতিহারী—প্রভুর জয় হোক। মহাসেনের কাছ থেকে রৈভ্যগোত্রীয় কঞ্চুকী আর মহিষী অঙ্গারবতীর কাছ থেকে বাসবদত্তার ধাত্রী বসুন্ধরা এসেছেন।
রাজা—তাহলে পদ্মাবতীকে সংবাদ দাও।
প্রতিহারী—যে আজ্ঞে। (প্রস্থান)
(পদ্মাবতী ও প্রতিহারীর প্রবেশ)
প্রতিহারী—আসুন, এইদিকে আসুন!
রাজা—পদ্মাবতী। মহাসেনের কাছ থেকে কঞ্চুকী আর মহিষী অঙ্গারবর্তীর কাছ থেকে বাসবদত্তার ধাত্রী বসুন্ধরা এসেছেন এ সংবাদ তুমি শুনেছ কি?
পদ্মাবতী—আর্যপুত্র, আত্মীয়দের কুশলসংবাদ আমিও শুনতে ইচ্ছুক!
রাজা—তুমি ঠিকই বলেছ, ‘বাসবদত্তার স্বজন আমারও স্বজন!’ এখানে বস তুমি! একি, বসছ না কেন?
পদ্মাবতী—আমার সঙ্গে বসেই কি আপনি এঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন? রাজা—কেন, তাতে দোষ কী?
পদ্মাবতী—আপনি আবার বিবাহ করেছেন, তাতে উদাসীনতা প্রকাশ পাবে না কি?
রাজা—যারা স্ত্রী-দর্শন করবার যোগ্য তাদের তা থেকে বঞ্চিত রাখলে অনেক দোষের কথা হবে। তুমি বস।
পদ্মাবতী—আপনার যেমন আদেশ! (আসনে উপবেশন করলেন) আর্যপুত্র, পিতামাতা কী বলবেন তা ভেবেই আমি ব্যাকুল হয়ে পড়েছি।
রাজা—সে কথা সত্য পদ্মাবতী! ওঁরা কী বলবেন তা ভেবে আমিও শঙ্কিত; আমি তাদের কন্যাকে অপহরণ করে এনেছিলাম, কিন্তু তাকে রক্ষা করতে পারিনি ভাগ্যের বিড়ম্বনায় আমি গুরুজনের মর্যাদা লঙ্ঘন করেছি। আমি পিতার নিকট অপরাধী পুত্রের মতোই শঙ্কিত।
পদ্মাবতী—সময় এলে কিছুই রক্ষা করা যায় না।
প্রতিহারী—কঞ্চুকী আর ধাত্রী দ্বারদেশে অপেক্ষা করছেন।
(প্রতিহারীর প্রবেশ)
রাজা—যাও, প্রবেশ করতে বল।
প্রতিহারী—প্রভুর যেমন আদেশ। (প্রস্থান)
(কঞ্চুকী, ধাত্রী বসুন্ধরা ও প্রতিহারীর প্রবেশ
কঞ্চুকী—কুটুম্বের রাজ্যে এসে আনন্দ হচ্ছে আবার রাজকন্যার মৃত্যুর কথা ভেবে বিষাদে মন আচ্ছন্ন হচ্ছে। হায়, দেবী যদি বেঁচে থাকতেন, না হয় বৎসরাজের রাজ্য শত্রুর অধিকারেই থাকত!
প্রতিহারী—এই আমাদের প্রভু। আর্য! আপনি এগিয়ে আসুন।
কঞ্চুকী―(এগিয়ে এসে) আর্যপুত্রের জয় হোক্।
ধাত্রী—প্রভুর জয় হে ক্!
রাজা—(সসম্মানে) পৃথিবীর রাজগণের উত্থান ও পতনের যিনি প্রভু, আমার আকাঙ্ক্ষিত আত্মীয়, সেই রাজার কুশল তো?
কঞ্চুকী—হ্যাঁ, মহাসেনের কুশল। তিনিও এখানকার সর্বাঙ্গীণ কুশল প্রশ্ন করেছেন। রাজা—(আসন থেকে ওঠে) মহাসেনের কী আদেশ?
কঞ্চুকী—বৈদেহী পুত্রের যোগ্য আচরণই বটে! তবে আপনাকে আসনে বসেই মহাসেনের কথা শুনতে হবে।
রাজা—মহাসেনের যেমন আদেশ। (আসনে বসলেন )
কঞ্চুকী—খুবই ভাগ্যের কথা, শত্রু যে রাজ্য জয় করেছিল আপনি আবার তা অধিকার করেছেন। কারণ যারা অবসন্ন বা শক্তিহীন তাদের কখনো উৎসাহ থাকে না। যারা উৎসাহী তারাই রাজ্যলক্ষ্মী ভোগ করে থাকেন।
রাজা—আর্য! সবই মহাসেনের প্রভাবে সম্ভব হয়েছে! আগে শত্রুর হাতে পরাজিত হয়ে আমি তাঁর পুত্রদের সঙ্গে সমভাবে লালিত হয়েছি। তাঁর কন্যাকে বলপূর্বক হরণ করেছি, কিন্তু রক্ষা করতে পারিনি। কন্যার নিধনসংবাদ শুনেও তিনি আমার প্রতি স্নেহশীল। আমি যে রাজ্য ফিরে পেয়েছি তার কারণও তিনিই।
কঞ্চুকী—মহাসেনের সংবাদ বলেছি। মহিষীর সংবাদ ইনি বলবেন।
রাজা—হায় মাতঃ যিনি ষোড়শ পত্নীগণের২২ মধ্যে জ্যেষ্ঠা, পবিত্রা ও নগরদেবতা স্বরূপিণী, আমার প্রবাসদুঃখে কাতর সেই মাতৃদেবীর কুশল তো?
ধাত্রী—মহিষী কুশলেই আছেন, তিনি আপনার সর্বাঙ্গীণ কুশল জিজ্ঞাসা করেছেন। রাজা—সর্বাঙ্গীণ কুশল? হায় মাতঃ, এই তো কুশলের নমুনা।
ধাত্রী—প্রভু, আপনি অধিক সন্তপ্ত হবেন না।
কঞ্চুকী—আর্যপুত্র, আপনি ধৈর্য ধারণ করুন! আপনার এত অনুকম্পা! মনে হয়, মহাসেনের কন্যা মরেও মরেননি। কিন্তু মৃত্যুকালে কে কাকে রক্ষা করতে পারে? রজ্জু ছিন্ন হলে কে আর ঘট ধরে রাখতে পারে? সংসার ও বন এই দুইয়ের এই তো সমান ধর্ম, যে কালে তাদের ছেদনও চলতে থাকে, আবার উদ্ভবও হতে থাকে।
রাজা—আর্য! ও কথা বলবেন না! মহাসেনের কন্যা আমার শিষ্যা, আমার প্রিয়তমা মহিষী জন্মান্তরেও কি আমি তাকে ভুলে থাকতে পারব?
ধাত্রী—মহিষী বলেছেন, বাসবদত্তা আর নেই। আমার বা মহাসেনের কাছে যেমন গোপালক ও পালক তুমিও তেমনি প্রথম থেকেই আমাদের অভিপ্রেত জামাতা! তাই তোমাকে উজ্জয়িনীতে নিয়ে এসেছিলাম এবং অগ্নিসাক্ষী না করেই বীণাশিক্ষার ছলে বাসবদত্তাকে দিয়েছিলাম—নিজের চঞ্চলতাহেতু বিবাহমঙ্গল শেষ না করেই তুমি এসেছিলে। আমরা কিন্তু চিত্রফলকে তোমার ও বাসবদত্তার প্রতিকৃতি অঙ্কিত করে বিবাহকর্ম সম্পন্ন করেছিলাম। সেই চিত্রকফলক তোমার কাছে পাঠাচ্ছি, তা দেখে শান্ত হতে চেষ্টা করো। রাজা—এসব কথা অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ, মহিষীরই যোগ্য কথা! শত রাজ্যলাভের চেয়ে এই কথা আমার কাছে অধিক প্রিয়। কেননা, আমি অপরাধী হলেও তিনি তাঁর স্নেহ থেকে আমাকে বঞ্চিত করেননি।
পদ্মাবতী—আর্য! চিত্রাঙ্কিত গুরুজনকে অভিবাদন জানাব!
ধাত্রী—এই যে দেখুন।
(ফলকের আবরণ খুলে দিলেন)
পদ্মাবতী—(দেখে স্বগত) এ কী। এ চিত্র যে আর্যা আবন্তিকার মতোই। (প্রকাশ্যে) আর্যপুত্র এই চিত্র কি আবন্তিকার বলে মনে হয়?
রাজা–এত সাদৃশ্য যে মনে হয় তিনিই। হায় কি কষ্ট। এই স্নিগ্ধ বর্ণের এই দারুণ বিপর্যয় কেমন করে ঘটল, অগ্নিদেব কেমন করে এই রূপমাধুরী কলঙ্কিত করলেন।
পদ্মাবতী—আর্যপুত্রের প্রতিকৃতি দেখলে সব বুঝতে পারব।
ধাত্রী—এই দেখুন।
পদ্মাবতী—(দেখে) হ্যাঁ, আর্যপুত্রের চিত্র সন্দেহ নেই, আর এটিই আবন্তিকার তুল্য!
রাজা—দেবী! চিত্রদর্শনের পর থেকেই তোমাকে উৎফুল্ল এবং উৎকণ্ঠিত দেখছি। ব্যাপার কী?
পদ্মাবতী—এই প্রতিকৃতির আদর্শ এইখানেই আছেন।
রাজা—কী? বাসবদত্তার?
পদ্মাবতী—হ্যাঁ।
রাজা—তাহলে তাকে নিয়ে এস।
পদ্মাবতী—আর্যপুত্র, আমি যখন কুমারী ছিলাম, তখন এক ব্রাহ্মণ একে আমার কাছে গচ্ছিত রেখে গিয়েছিলেন, বলেছিলেন ‘আমার ভগিনী’। এঁর স্বামী প্রবাসে আছেন, ইনি পরপুরুষ দর্শন করেন না। তাই, আমার সঙ্গে এলেই বুঝে নেবেন তাকেই নিয়ে এসেছি।—তিনি যদি ব্রাহ্মণের ভগিনী হন, তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কেউ হবেন। সংসারে রূপের সাদৃশ্য তো আছেই।
(প্রতিহারীর প্রবেশ)
প্রতিহারী—প্রভুর জয় হোক। উজ্জয়িনীর এক ব্রাহ্মণ এসে বলছেন—আমি মহিষীর হস্তে আমার ভগিনীকে গচ্ছিত রেখেছি। তিনি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন।
রাজা—পদ্মাবতী, ইনিই কি সেই ব্রাহ্মণ?
পদ্মাবতী—হয়তো তাই!
রাজা—অন্তঃপুরের শিষ্টাচারের সঙ্গে সেই ব্রাহ্মণকে নিয়ে এস।
(প্রস্থান)
প্রতিহারী—যে আজ্ঞে!
রাজা—পদ্মাবতী! তুমি যাও, তাকে নিয়ে এস।
পদ্মাবতী—আর্যপুত্রের আদেশ নিশ্চয়ই পালন করব।
(প্রস্থান)
(যৌগন্ধরায়ণ ও প্রতিহারীর প্রবেশ)
যৌগন্ধরায়ণ—(স্বগত) রাজার কল্যাণের জন্য রাজমহিষীকে লুকিয়ে রেখে হিতকর জেনেই আমি সব কাজ করেছি। এখন আমার কাজ শেষ হয়েছে কিন্তু রাজা কী বলবেন তাই ভেবে আমার মন শঙ্কিত হয়ে উঠেছে।
প্রতিহারী—এই যে প্রভু! এগিয়ে চলুন।
(যৌগন্ধরায়ণ এগিয়ে এলেন)
যৌগন্ধরায়ণ—আপনার জয় হোক!
রাজা—(স্বগত) এ স্বর যে আগে কোথায় শুনেছি বলে মনে হচ্ছে! (প্রকাশ্যে) ব্রাহ্মণ! আপনি কি আপনার ভগিনীকে পদ্মাবতীর হস্তে গচ্ছিত রেখেছিলেন? যৌগন্ধরায়ণ—হ্যাঁ।
রাজা—তাহলে অবিলম্বে এঁর ভগিনীকে নিয়ে এস।
প্রতিহারী—প্রভুর যেমন আদেশ।
(প্রস্থান)
(পদ্মাবতী, আবন্তিকা ও প্রতিহারীর প্রবেশ)
পদ্মাবতী—আসুন আর্যে, একটি প্রিয় সংবাদ আপনাকে দিচ্ছি।
আবন্তিকা–কী?
পদ্মাবতী—আপনার ভ্রাতা এসেছেন।
আবন্তিকা—এখনও মনে রেখেছেন, আমার সৌভাগ্য!
পদ্মাবতী—(এগিয়ে এসে) আর্যপুত্রের জয় হোক! এই সেই গচ্ছিতা!
রাজা—পদ্মাবতী! গচ্ছিত বস্তু ফিরিয়ে দাও; হ্যাঁ, সাক্ষী রেখেই ফিরিয়ে দিতে হবে। এ বিষয়ে আর্য রৈভ্য এবং মাননীয়া বসুন্ধরা রইলেন, বিচারালয়ের কাজ ওদের দিয়েই চলবে।
পদ্মাবতী—আর্যা, একে গ্রহণ করুন!
(ধাত্রী আবন্তিকাকে লক্ষ করলেন—তারপর বলে উঠলেন)
ধাত্রী—এ কী! এ যে প্রভুপত্নী বাসবদত্তা!
রাজা—কী! মহাসেনের পুত্রী? দেবী, পদ্মাবতীর সঙ্গে অন্তঃপুরে যাও!
যৌগন্ধরায়ণ—না, না, অন্তঃপুরে প্রবেশ করা চলবে না। ইনি যে আমার ভগিনী।
রাজা—আপনি কী বলছেন? ইনি যে মহাসেনের কন্যা!
যৌগন্ধরায়ণ—রাজন্, আপনি ভরতবংশে জন্মগ্রহণ করেছেন! আপনি বিনীত জ্ঞানবান্, শুচি ও রাজধর্মের গুরু! বলপূর্বক হরণ আপনার অনুচিত।
রাজা—বেশ, আমি রূপের সাদৃশ্য পরীক্ষা করে দেখব! মুখের আবরণ খুলে দাও।
(আবরণ উন্মোচিত হল )
যৌগন্ধরায়ণ—প্রভুর জয় হোক্!
বাসবদত্তা—আর্যপুত্রের জয় হোক!
রাজা—কী আশ্চর্য! এ যে যৌগন্ধরায়ণ—আর ইনি মহাসেনপুত্রী! একি সত্য না স্বপ্ন? আবার তাকে আমি দেখতে পাচ্ছি! সেই স্বপ্নকালে একে দেখেও আমি বঞ্চিত হয়েছিলাম।
যৌগন্ধরায়ণ—প্রভু, দেবীকে সরিয়ে নিয়েছিলাম, আপনার কাছে আমি অপরাধী। আমাকে ক্ষমা করুন। (চরণে প্রণত হলেন : রাজা তাকে উঠিয়ে বললেন)
রাজা—মিথ্যা উন্মাদের অভিনয়ে, যুদ্ধ বলে, শাস্ত্রীর মন্ত্রণা কৌশলে তুমি যে নৈপুণ্য দেখিয়েছ, বিপদসাগরে মজ্জমান হয়ে আমরা তার ফলেই তো বেঁচে গিয়েছি! যৌগন্ধরায়ণ—আমরা স্বামীভাগ্যের অনুগামী মাত্র।
পদ্মাবতী—ইনিই তবে আর্যা! সখীজনের মতো ব্যবহার করে আচার অতিক্রম করেছি। তাই নতমস্তকে প্রসন্ন করছি। (চরণে প্রণত হলেন)
বাসবদত্তা—(পদ্মাবতীকে উঠিয়ে) ওঠো, অবিধবে ওঠো। আমি তোমার কাছে যৌগন্ধরায়ণের ভগিনীরূপে নির্দিষ্ট হয়েছিলাম, এই দেহটাই অপরাধী।
পদ্মাবতী— আমি অনুগৃহীতা।
রাজা—বয়স্য যৌগন্ধরায়ণ! কোন বুদ্ধিতে দেবীকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছিলে?
যৌগন্ধরায়ণ—উদ্দেশ্য—কৌশাম্বী রাজ্যের রক্ষা।
রাজা—আর পদ্মাবতীর হস্তে তাকে গচ্ছিত রাখার কারণ?
যৌগন্ধরায়ণ—পুষ্পকভদ্র প্রভৃতি দৈবজ্ঞগণ ভবিষ্যদ্বাণী২৫ করেছিলেন। ইনি মহারাজের মহিষী হবেন!
রাজা—রুমন্বান্ এসব কথা জানত?
যৌগন্ধরায়ণ—সবাই একথা জানত।
রাজা—ওহ্! রুমন্বান্ কী শঠ!
যৌগন্ধরায়ণ—মহাসেনপুত্রীর কুশল সংবাদ জানাবার জন্য আর্য রৈভ্য এবং বসুন্ধরা আজই ফিরে যান।
রাজা—না, না—আমরা সবাই পদ্মাবতীকে নিয়ে সেখানে যাব।
যৌগন্ধরায়ণ—আপনার যেমন ইচ্ছে।
(ভরত বাক্য)
আমাদের রাজসিংহ সাগর পর্যন্ত বিস্তৃতা হিমালয়-বিন্ধ্যাকুণ্ডলা একচ্ছত্রা এই মহী শাসন করিতে থাকুন।
(ষষ্ঠ অঙ্ক সমাপ্ত )
‘স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটক সমাপ্ত’