সিক্রেট পরমানু মিশন ‘নন্দাদেবী’

সিক্রেট পরমাণু মিশন ‘নন্দাদেবী’

১৯৬৪-এর ১৬ অক্টোবর। পিপলস রিপাবলিক অফ চায়নার চেয়ারম্যান মাও সে তুং খুব উত্তেজিত হয়ে আছেন। কিন্তু নিজের স্বভাব মতোই গম্ভীর হয়ে তার সামনের বড়ো টিভি পর্দার দিকে তাকিয়ে আছেন। সব ঠিকঠাক থাকলে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চায়না বিশ্বের শক্তিধর দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। আর তাতে ঘুম ছুটে যাবে আমেরিকার মত কিছু শক্তিধর দেশের। কিছুক্ষণের মধ্যে টিভির ঘড়িতে শুরু হল উলটো কাউন্ট ডাউন। দশ… নয়… আট…

দুম….

তাকলামাকান ও কুমতাগ মরুভূমির মাঝে দুরূহ প্রাকৃতিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ‘নপ নর’ নিউক্লিয়ার টেস্ট বেস ক্যাম্পে সফলভাবে বিস্ফোরিত হল চায়নার প্রথম পারমাণবিক বোমা। চায়না পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় সবচেয়ে অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেল আমেরিকা। কোড-৫৯৬ নামে পরিচিত চায়নার এই পারমাণবিক পরীক্ষা সম্পর্কে আগাম কোন গোয়েন্দা তথ্য জানতে না পারায় সকলের মাথায় চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। গোপন তথ্য পাওয়ার মতো স্যাটেলাইট সিস্টেম তখনও ততটা কার্যকরী হয়ে ওঠেনি। আমেরিকার সরকার উচ্চ মহল থেকে যে-কোনো উপায়ে চায়নার গুপ্ত পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর খবরদারি করার একটি কার্যকরী স্পাই নেটওয়ার্ক তৈরি করার জন্য সিআইএ-কে কঠরভাবে নির্দেশ দিল।

১৯৬৪ সালের এই ঘটনার ঠিক একবছর আগে ১৯৬৩ সাল নাগাদ আমেরিকা এভারেস্ট অভিযানে একটি দল পাঠিয়েছিল। ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মত এভারেস্ট আরোহণ করা সেই দলের সদস্য বিখ্যাত ফোটোগ্রাফার ও পর্বতারোহী ব্যারি বিশপ হিমালয় অভিযান সেরে দেশে ফিরেছে। ইউ এস এয়ারফোর্সের চিফ অফ স্টাফ কার্টিস লিমে হিমালয়ের গল্প শোনার জন্য নিজের কোয়ার্টারে ডেকে পাঠায় ব্যারিকে। ব্যারি হিমালয়ের সৌন্দর্য আর বিস্ময়কর নানা অভিজ্ঞতার কথা বলা শুরু করল। সেখানকার মানুষ, তাদের সহজ সরল জীবনযাত্রা, হিমালয়ের সুউচ্চ চূড়া থেকে পশ্চিম তিব্বতের বিস্তীর্ণ মালভূমিকে যে কতটা অদ্ভুত আর সুন্দর দেখায় এসবই একমনে বলে যাচ্ছিল ব্যারি। লিমে গল্প শুনতে শুনতে ফোন লাগাল কোনো এক আধিকারিককে। তার মাথায় এমন কিছু একটা বিষয় তখন খেলে গেছে, যা ব্যারি জানে না।

এর ঠিক একবছর পরের ঘটনা, ১৯৬৫ সালে ইন্ডিয়ান নেভির অফিসার মনমোহন সিং কোহলি আর কিছুদিন পরেই ৯ জনের একটি দলকে নিয়ে এভারেস্ট অভিযানে যাবে। এর আগে দুবার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। ভারতীয় অভিযাত্রীদের তাই খুব মন খারাপ। আগের দুটি অভিযানেও কোহলি ছিল। কিন্তু দলনেতার গুরুদায়িত্ব নিয়ে এবারই প্রথম সে অভিযানে যাচ্ছে। আমেরিকা থেকে ব্যারি পৌঁছে যায় কোহলির কাছে। সে কোহলিকে সিকিমের জেমু গ্লেসিয়ারে নিয়ে যেতে চায়। ব্যারির এই আবদার শুনে একপ্রকার অবাক হল কোহলি। কারণ ব্যারি জানে যে কোহলি এভারেস্ট এক্সপেডিশনে যাচ্ছে এবং তা দেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কোহলি আঁচ করতে পারে কিছু একটা মাস্টারপ্ল্যানের ছক কষা হচ্ছে।

যথারীতি কোহলির নেতৃত্বে এভারেস্ট অভিযান হল। কোহলির নেতৃত্বে টিম সফল হল। চতুর্থতম দেশ হিসেবে ভারতের নাম উঠল এভারেস্ট শিখরে। অ্যাভিয়েশন রিসার্চ সেন্টার বা ‘আর্ক’-এর ফার্স্ট ডিরেক্টর রামেশ্বর নাথ ডেকে পাঠালেন কোহলিকে। আর বললেন, “এখন উল্লাস করার মতো সময় নেই তোমার। তোমার জন্য নতুন একটা মিশন অপেক্ষা করছে! আর এবারের মিশনটি অত্যন্ত গোপনীয় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ।”

হেড কোয়ার্টারে দীর্ঘক্ষণ মিটিং চলল কোহলির সঙ্গে রামেশ্বরের। রামেশ্বর জানাল, “সি আই এ এবং ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো একসঙ্গে একটি মিশন হাতে নিয়েছে এবং মিশনটির দলনেতা বানানো হয়েছে কোহলিকে। ভারতের প্রতিবেশী দেশ চিনের পারমাণবিক দুরভিসন্ধির ওপর নজরদারি করার জন্যে একটি অত্যাধুনিক যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনা করছে আমেরিকা। কোহলি এবং তার পর্বতারোহী টিমকে সেই যন্ত্রটি নিয়ে যেতে হবে।”

এবার একটু বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দেওয়া যাক। ভিয়েতনামের যুদ্ধের লজ্জাজনক পরিস্থিতির পর চিনের উত্থানে আমেরিকান গোয়েন্দাদের তথ্য সংগ্রহে বিশেষ সুবিধা হচ্ছিল না। ততদিনে চিনও নিজের শক্তি জাহির করতে শুরু করেছে।

১৯৬৪ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার সহায়তায় চিনও পারমাণবিক বোমার নাগাল পেয়ে যায়। এতে সবচেয়ে আতঙ্কিত হয় ভারত। যে সময়ে চিনের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আসে, তার ঠিক দুবছর আগে ঘটে গেছে ভারত-চিন যুদ্ধ। যুদ্ধে পরাজয়ের ক্ষত তখনও সেরে ওঠেনি ভারতের। ভারতের সীমান্ত-ঘেঁষা চিনের পারমাণবিক পরীক্ষা ভারতের জন্য যথেষ্ট দুশ্চিন্তার কারণ ছিল।

অন্যদিকে চিনের উত্থান আমেরিকার জন্য ছিল বেশ চাপের। যে সময় চিন পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালাচ্ছে, তখন পুঁজিবাদের অভিভাবক হিসেবে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত রাশিয়া। সোভিয়েত রাশিয়ার হাত ধরে চিনের উত্থানকে আমেরিকা ভালো ভাবে নিতে পারছিল না।

ষাটের দশকের শুরুতেই আমেরিকা বিভিন্ন গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে জানতে পারে, চিন সোভিয়েত রাশিয়ার সহায়তায় পারমাণবিক বোমা বানানোর ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে। সিআইএ-র একটি তার বার্তায় জানা যায়, ১৯৫৯ সালের অক্টোবরেই চিন লোপনরে নিউক্লিয়ার টেস্ট বেস স্থাপন করে। উদ্দেশ্য নিউক্লিয়ার ডিভাইসের পরীক্ষা চালানো। নজরদারি চালানোর জন্য চিনের ওপর দিয়ে ইউ-টু বিমানের ফ্লাইট বেশ বিপজ্জনক। তাই আমেরিকা চিন্তা করে, যদি হিমালয় পর্বতমালার কোনো একটার ওপর নজরদারি চালানোর জন্য কোনো যন্ত্র স্থাপন করা যায়, তাহলে অনেক তথ্য পাওয়া সম্ভব।

রাজনীতি ও ঐতিহাসিক শত্রুতার কারণে আমেরিকা ও ভারত দুই দেশের কাছেই চিনের এই পারমাণবিক পরীক্ষা নজরদারির মধ্যে আনার তাড়া ছিল। এ লক্ষ্যে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হল। অনেক চিন্তাভাবনা, তর্ক-বিতর্কের পর সেই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন সিআইএ-কে গোপন মিশন চালানোর অনুমতি দিলেন। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থের দিকটি বড়ো করে দেখা হল।

চিনের ওপর নজরদারির আর একটি উপায় ছিল তা হল স্যাটেলাইট। এরকম যন্ত্র দিয়ে অনেক ওপর থেকে নজরদারিতে আমেরিকা বেশ দক্ষ। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের সে সময়ে আমেরিকার প্রায় সব উন্নত স্যাটেলাইটই সোভিয়েত রাশিয়ার উপর মোতায়েন করা ছিল। যেসব স্যাটেলাইট বাকি ছিল আমেরিকার হাতে, সেসব দিয়ে আদতে চিনের ওপর পূর্ণ নজরদারি চালানো সম্ভব ছিল না আমেরিকার পক্ষে। তাই নজরদারি চালানোর মতো যন্ত্র পর্বতে স্থাপন করার পক্ষেই ছিল আমেরিকা।

অনেক তর্ক-বিতর্ক শেষে নন্দদেবী পর্বতের চূড়াকে নির্ধারণ করা হল। সেই পর্বত, যেখান থেকে বিখ্যাত গঙ্গা নদীর উৎপত্তি ঘটেছে। স্থানীয়দের কাছে এই পাহাড় খুবই পবিত্র স্থান হিসেবে পরিগণিত। এই স্থানটির ভৌগোলিক গুরুত্বও অনেক। নন্দাদেবী পাহাড়ের উত্তরে চিন, দক্ষিণে ভারত এবং পশ্চিমে পাকিস্তান। এখান থেকে চিনের পারমাণবিক মিসাইল পরীক্ষার ঘাঁটিও খুব বেশি দূরে নয়। এখান থেকে নজরদারি চালানোতে বেশি বেগ পেতে হবে না। চিনা গোয়েন্দারা এত দুর্গম অঞ্চল থেকে তাদের ওপর কেউ নজরদারি চালাতে পারে-এটি মাথায়ও আনবে না। তাই সবদিক বিবেচনা করে নন্দাদেবী ছিল নজরদারি চালানোর এবং ডিভাইস স্থাপনের একেবারে আদর্শ জায়গা।

পরিবেশগত অবশ্য কিছু সমস্যা ছিল। এই পর্বত ভারতের সবচেয়ে উঁচু পর্বতগুলোর মধ্যে একটি। তার সঙ্গে তাপমাত্রাও খুবই কম। আর তুষার-ঝড়ের ভয় তো আছেই। চূড়ায় ওঠা বেশ কষ্টসাধ্য।

ভারতের তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো এবং আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-কে দায়িত্ব দিয়েছিল মিশন বাস্তবায়নের জন্য। ভারতের চার জন ও আমেরিকার নয় জন, মোট তেরোজন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পর্বতারোহী নিয়ে নজরদারির ডিভাইস স্থাপনের জন্য টিম গঠন করা হল। অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হল ভারতের ক্যাপটেন মনমোহন সিং কোহলিকে। ক্যাপটেন এমএস কোহলিকে বাদ দিয়ে বাকি সদস্যদের পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখা হল।

দুই দেশের সদস্যদের নিয়ে গড়া এই টিমকে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া হল আমেরিকার আলাস্কার। সিআইএ-র বিশেষ চার্টার্ড বিমানে তাদের বিশ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতার ম্যাককিনলি পাহাড়ে শুরু হল ট্রেনিং। ‘গা গরম’ করার পর তাদেরকে চূড়ান্ত মিশনের জন্য প্রস্তুত করা হল।

নন্দদেবীতে আরোহণ করা মোটেও সহজ নয় তা দু-দেশের সেনা আধিকারিকরা জানতেন। চিন সীমান্তের ৭৮১৬ মিটারের এই পর্বতটি মানুষের ধৈর্যের ও কষ্টের চরমতম পরীক্ষা নিতে পারে। এর চূড়ায় ওঠা তো অনেক পরের ব্যাপার। পর্বতটির পাদদেশে পৌঁছোনোর জন্যও কঠিন অধ্যবসায় প্রয়োজন। নন্দাদেবী পর্বতচূড়াটিকে চারপাশ থেকে আরও বেশ কিছু দুরূহ পর্বত দুর্গের মতো ঘিরে রয়েছে। যা এই পর্বতটির পাদদেশে পৌঁছোনো আরও বেশি কঠিন করে দেয়। নন্দাদেবীর কাছে পৌঁছোনোর একমাত্র সম্ভাব্য পথ হল ঋষিগঙ্গা গিরিসংকট, যার পথ লতা নামের এক গ্রাম থেকে শুরু হয়। পৃথিবীর অন্যতম খাড়া পর্বতগুলোর মধ্যে একটি হওয়ায় এখানে অত্যন্ত অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদেরও চূড়ায় আরোহণে ব্যর্থতার উদাহরণ আছে প্রচুর। নন্দাদেবী পর্বতটিকে স্থানীয়রা দেবী হিসেবে পুজো করে। বেশ কয়েকটি মন্দিরও রয়েছে পর্বতটিকে উৎসর্গ করে। ধর্মীয় মতে, এই পর্বতে আরোহণ করা পর্বতটিকে অপবিত্র করার নামান্তর। এমন একটি অভিযানে যাবার মতো পর্যাপ্ত কুলি কিংবা শেরপা পাওয়া যাবে কিনা এমন অজস্র বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে দু-দেশের মধ্যে।

নজরদারি চালানোর যে ডিভাইসটি বানানো হয়, সেটির মোট ওজন ছিল ৫৬ কেজি। ৮-১০ ফুট উচ্চতার একটি অ্যান্টেনাও ছিল তার সঙ্গে। আর ছিল দুটি ট্রান্সিভার সেট।

পুরো ডিভাইসটি আসলে ছিল একটি সেন্সর, যেগুলি পারমাণবিক মিসাইল পরীক্ষার পর ভেসে আসা ওয়েভগুলি ধরতে পারবে। আর সেন্সরটিতে নিরবচ্ছিন্ন শক্তি সরবরাহের জন্য নিউক্লিয়ার জেনারেটর বা SNAP তৈরি করে রাখা হয়েছিল। জেনারেটরে প্লুটোনিয়াম-২৩৮-এর নিউক্লিয়ার ক্যাপসুল ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের ব্যবস্থা ছিল। পারমাণবিক পরীক্ষার ফলে উদ্ভূত ‘রেডিয়ো টেলিমেট্রি সিগন্যাল’ ধরার সক্ষমতা ছিল ডিভাইসটির। আমেরিকার ও ভারতের এই যৌথ অপারেশন ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ।

.

১৯৬৫ সালের ১৮ অক্টোবর মিশন শুরু হল।

সিআইএ’র বিশেষ বিমানে আমেরিকান দলটি ভারতে এসে পৌঁছোল। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার খাতিরে স্বাভাবিকভাবেই দলের প্রতিটি সদস্যের নাম-পরিচয়, পেশা এমনকি বসবাসের ঠিকানাও ভিন্ন ছিল। তাদের কেউই ভারতে অবস্থানকালীন সময়ে তাদের আসল নাম বা পরিচয় প্রকাশ করেনি।

বর্ষা শেষ হয়ে এলে কোহলির নেতৃত্বে সবাই নন্দাদেবীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল। রাশিয়ার তৈরি একটি হেলিকপ্টারে করে সমস্ত সাজসরঞ্জাম ও অভিযানের সকল সদস্য ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার গৌচারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত একটি এয়ারফিল্ডে ল্যান্ড করল। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করেই তাদের নন্দাদেবী স্যাংচুয়ারির মধ্যে নামিয়ে দেয়া হল। শুরু হল মিশন নন্দাদেবী।

সবাই নিরাপদেই নন্দাদেবীর পাদদেশে পৌঁছে গেল। বেস ক্যাম্প সেট করে কোহলী সিদ্ধান্ত নিল আরও ওপরে উঠার। শুরু হল দীর্ঘ বিপদসংকুল এক অভিযান। উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার জন্য সবাইকে নির্দিষ্ট উচ্চতা পর পর থামতে নির্দেশ দিলেন কোহলি। যার জেরে অনেকটাই সময় চলে যাচ্ছিল। আবার সে বছরের ক্লাইম্বিং সিজন শেষ হতেও খুব বেশিদিন ছিল না।

কষ্টকর এই অভিযানে সবাই যার যার রসদ সে নিজেই বহন করছিল। মিশনের ব্যাপারে যত কম মানুষ জানবে ততই ভালো এটাই ছিল ওপর মহলের নির্দেশ। সে-কারণে তেমন কোনো শেরপা বা পোর্টার রাখেনি তারা। কেবল যে সেন্সরটি স্থাপন করার জন্য এই কষ্টকর অভিযান, সেটির জেনারেটরটি বহন করার জন্য কিছু শেরপাকে নেওয়া হয়েছিল।

জেনারেটরটি ছিল নিউক্লিয়ার পাওয়ারড। ফুয়েল হিসেবে তাতে ছিল রেডিয়ো অ্যাকটিভ প্লুটোনিয়াম রড। একবার বসানো হলে জেনারেটরটি টানা দুবছর ধরে চল্লিশ ওয়াটের সমতুল্য পাওয়ার সাপ্লাই দিয়ে যাবে। এর অফিসিয়ালি নাম ছিল-SNAP 19C, System for Nuclear Auxiliary Power ।

রেডিয়ো অ্যাকটিভ প্লুটোনিয়াম তার নিজস্ব ধর্ম বজায় রেখে অবিরাম তাপ নির্গত করতে থাকে এবং যারা এটি বহন করত তারা একপ্রকার স্বস্তি নিয়েই কাজটি করত এটা থেকে নির্গত তাপের কারণে। কিন্তু সহজ সরল শেরপারা জানত না তারা যেটা পিঠে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এরকম একটা জিনিস হিরোশিমাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

শেরপারা না জানলেও এই পরিকল্পনা যাদের মাথা থেকে বের হয়েছিল তারা সবই জানত। যে কারণে তারা অভিযাত্রী দলের সবাইকে সাদা রঙের একটুকরো কাপড়ের মতো গাইগার ফেব্রিক দিয়েছিল, যা সবাই নিজ নিজ জামায় লাগিয়ে রাখত। এটি ছিল একধরনের নির্দেশক। কোনো প্রকার রেডিয়েশন লিক করলে সঙ্গে সঙ্গে টুকরোটি রং পরিবর্তন করে ফেলবে। যদিও কোহলির কড়া আদেশ ছিল কেউ যেন জেনারেটরটি টানা চার ঘণ্টার উপর একনাগাড়ে বহন না করে।

দীর্ঘ কষ্টকর ও মৃত্যুসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে কোহলি ও তার দল ১৮ অক্টোবর নন্দাদেবীর চব্বিশ হাজার ফুট উচ্চতায় তাদের ক্যাম্প ফোর স্থাপন করে। আর এক-দেড় হাজার ফুট উঠলেই অর্ধেক কাজ তাদের শেষ হয়ে যাবে। তারপর শুধু সেন্সরটি জায়গা মতো বসিয়ে আরও একটি সফল অভিযান শেষ করে তারা সকলে বাড়ির পথ ধরবে। দীর্ঘদিন পর অবশেষে হয়তো মিলবে কাঙ্ক্ষিত বিশ্রাম।

কিন্তু তাদের নিয়ে প্রকৃতির বোধহয় ভিন্ন ইচ্ছা ছিল। এতদিনের সুন্দর ঝকঝকে আবহাওয়া যেন চোখের পলকে কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। মেঘমুক্ত ঝকঝকে নীল আকাশ নিমেষেই ঢেকে গেল ভয়ংকর কালো মেঘে। সেইসঙ্গে শুরু হল প্রবল তুষারঝড়।

কোহলি ও তার দল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চব্বিশ হাজার ফুট ওপরে রয়েছে। এই উচ্চতায় সামান্য ঝুঁকিও মৃত্যু ডেকে আনবে যে-কোনো সময়। দলনেতা হিসেবে কোহলি যাই করুক তা তাকে অনেক ভেবে চিন্তে করতে হবে। তার সামনে তখন দুটি পথ খোলা আছে। হয় সবার ও নিজের জীবনের পরোয়া না করে সামনে এগিয়ে যাওয়া, নয়তো প্রাণ বাঁচাতে নীচে নামতে শুরু করা। এই উচ্চতায় আবহাওয়ার মতিগতি সম্পর্কে কেউ কখনোই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না। এরকম ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে সামিট দেওয়া আর নিজ হাতে নিজের কবর খোঁড়া একই কথা। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় যে তার টিম সামিট করে সেন্সরটি স্থাপন করতে পারবে, তাও এই পরিস্থিতিতে তাদের নীচে নিরাপদে ফেরাটা বেশ চাপের। আর তার ফলাফল নিশ্চিত মৃত্যু।

অনেক চিন্তা করে কোহলি এই অভিযান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার কাছে অভিযানের থেকে মানুষের জীবনের মূল্য বেশি। সবদিক বিবেচনা করে কোহলি জেনারেটর এবং বাকি যন্ত্রপাতি সব কিছু ক্যাম্প ফোরেই রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক বোমাটিকে ঘাড়ে করে শুধু শুধু টেনে নীচে নামানোর কোনো অর্থ নেই তা কোহলি বুঝলেন। কোহলি তার দলকে জানালেন, সামনের সিজনে আবার তারা এসে সব ঠিক করবে আর যন্ত্রটি স্থাপন করবে নন্দাদেবীর চূড়ায়।

পর্বতারোহী টিমের পুরো পরিকল্পনা ধাক্কা খেল প্রকৃতির এহেন নির্মম আচরণে। আমেরিকা ও ভারত এতবড়ো প্রজেক্ট অসফল হওয়ায় বেশ হতাশ হল।

কোহলি ফিরে এসে আধিকারিকদের জানালেন, প্রতিটি মুহূর্তেই বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে আসছিল। পর্বতারোহী টিমের ক্যাপটেন হিসেবে আমার সামনে দুটো রাস্তা খোলা ছিল—হয় পুরো টিমের এখানে অবস্থান করা। নাহলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া। নতুবা ফিরে যেতে হবে বেস ক্যাম্পে। আমি পুরো টিমকে নিয়ে বেস-ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

ফিরে আসার সময় নিউক্লিয়ার জেনারেটর ও সেন্সর-সমেত পুরো ডিভাইসটি পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রাখে কোহলির দল। তাদের প্রত্যাশা ছিল ঝড়ো আবহাওয়া শেষ হওয়ার পর পুনরায় আরোহণের পর সেন্সর ও স্ন্যাপ জেনারেটর খুঁজে কাজ শুরু করবেন।

.

১৯৬৬ সালের বসন্তে আবার মিশন শুরু করা হয়। পরের বছর নন্দাদেবীর অসম্পূর্ণ মিশনের ভার আবারও এসে পড়ে কোহলির ওপর। গতবারের সদস্যদের মধ্যে থেকে কয়েকজনকে নিয়ে কোহলি ছোটো একটি টিম গঠন করলেন। তবে এবার টিমে নতুন সদস্য বলতে কেবল একজন আমেরিকান নিউক্লিয়ার এক্সপার্ট। গতবছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ভারত ও আমেরিকা এটা বেশ ভালোভাবেই বুঝে গিয়েছিল যে নন্দাদেবী ক্লাইম্ব করা শুধু যে কঠিন তা নয়, এটি খুব বেশি বিপজ্জনক। তারা এটাও বুঝতে পেরেছিল যে সেন্সরটি তারা অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার কোনো পর্বত চূড়ায় বসিয়েও তাদের স্বার্থ হাসিল করতে পারবে। কোহলির এবারের মিশনটি ছিল তাই সেন্সর ও জেনারেটরটি নন্দাদেবীর ওপরে ক্যাম্প ফোর থেকে নামিয়ে এনে পাশের আর একটি অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার পর্বত নন্দা কোর্ট চূড়ায় স্থাপন করা।

বেস ক্যাম্প পর্যন্ত নতুন মিশনটি কোহলি ও তার টিমের জন্য তেমন কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু কোহলির পুরো দুনিয়া বদলে গেল ক্যাম্প ফোর-এ পৌঁছোনোর পর ক্যাম্প ফোর-এ পৌঁছে কোহলি হতভম্ব হয়ে দেখল ডিভাইসগুলো যেখানে তারা যত্ন করে নিরাপদে রেখে গিয়েছিল, সেখানে সেগুলি নেই। আশপাশের সমস্ত এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও কিছুই পাওয়া গেল না। এত বড়ো বড়ো যন্ত্রপাতিগুলো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। এই নিয়ে কেউ টু শব্দটি পর্যন্ত করল না। এই খবরটি যদি মিডিয়ায় চলে যায় তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। তাই ওপর মহল থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল। এই অভিযানের প্রতিটি সদস্য প্রচণ্ড রকম মানসিক চাপে ভুগতে লাগল। অজানা এক আশঙ্কায় প্রত্যেকে ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

কোহলির টিম কোনোভাবেই সেই সেন্সর ও নিউক্লিয়ার জেনারেটর খুঁজে পাচ্ছিল না। বরফের স্তরের নীচে কোথায় সেই সেন্সর ও জেনারেটর আছে, যাকে শত চেষ্টার পরও পাওয়া যায়নি। সেই তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়াম-২৩৮ সমৃদ্ধ জেনারেটর ও সেন্সর খোঁজার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও অভিযান চালানো হয়েছে, কিন্তু কোনো কূল-কিনারা পাওয়া যায়নি।

১৯৬৭ সালে আর একটি নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সেন্সর ডিভাইস ভারতে নিয়ে যায় নন্দাদেবীর পাশের চূড়া নন্দা কোটে বসানোর জন্য। কোহলি এবং আরও কিছু ভারতীয় পর্বতারোহীর সহায়তায় তারা এবার সফলভাবেই তাদের ডিভাইসটি বসিয়ে আসে মাউন্ট নন্দা কোটের চূড়ায়। কিন্তু তারা এই নজরদারি বেশিদিন বজায় রাখতে পারেনি। বিভিন্ন কারণে এক বছর পরেই ১৯৬৮ সালে আমেরিকা আবারও ভারতের সহায়তায় ডিভাইসটি ফিরিয়ে আনতে যায়। ভারতীয় পর্বতারোহী এইচ.সি.এস. রাওয়াতের নেতৃত্বে টিমটি নন্দা কোটের চূড়ায় পৌঁছে এমন এক দৃশ্য দেখতে পায়, যা দেখার জন্যে দলের সদস্যদের কেউ প্রস্তুত ছিল না।

যেখানে তারা যন্ত্রটি স্থাপন করে গিয়েছিল, সেখানে গিয়ে সবাই দেখল যন্ত্রটির কিছুই সেখানে নেই। এ যেন ‘৬৬ সালের অভিযান নতুন করে ফিরে আসল। তবে ওপর থেকে দেখে রাওয়াতের মনে হচ্ছিল ডিভাইসটা হয়তো বরফের নীচে চলে গিয়েছে। কয়েক ফিট বরফ খুঁড়তেই এক অবিশ্বাস্য দৃশ্যের দেখা পেল সবাই। দেখে মনে হচ্ছিল নন্দা কোটের গম্বুজ আকৃতির চূড়ায় জমে থাকা বরফের মধ্যে কেউ যেন নিখুঁত পরিমাপে গোল একটি গুহা-সদৃশ তৈরি করে রেখেছে। আর সেই বৃত্তাকার গুহার কেন্দ্রে যেন সম্রাটের মত বসে রয়েছে উত্তপ্ত জেনারেটরটি। জেনারেটর থেকে অবিরাম নির্গত হওয়া তাপের কারণে চারিদিকের ৮ ফিট বরফ গলে নিঁখুত একটি গোলকের আকৃতি নিয়েছে। তারা গুহাটির সুন্দর একটি নাম দিয়ে দিল-’ক্যাথেড্রাল ইন দ্য আইস’।

.

১৯৬৮ সালে আমেরিকা এই ত্রুটিপূর্ণ ডিভাইসটি নিজেদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং হারিয়ে যাওয়া ডিভাইসটি পরিবেশের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে কি না তা নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখার জন্য ভারত ৮ম ইন্দো-তিব্বতিয়ান বর্ডার পুলিশ ব্যাটালিয়নকে তপোবনে নিয়োজিত করে।

এই তপোবন বেশ অদ্ভুত জায়গা। ঋষিগঙ্গা তীরবর্তী এই স্থানে ছিল কোহলির ব্যাটালিয়ন। যা পরবর্তীকালে নন্দাদেবী ব্যাটালিয়ন নামে পরিচিত হয়। তারা নিয়মিত তেজস্ক্রিয়তা খুঁজে পাওয়ার জন্য ঋষি-গঙ্গার জল নিয়ে পরীক্ষা করত। তখন থেকেই মূলত নন্দাদেবী স্যাংচুয়ারিতে সকল প্রকার পর্বতাভিযান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পরবর্তীকালে ১৯৮৮ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক নন্দাদেবী স্যাংচুয়ারিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

সেদিন থেকে আজ অবধি অনেক দিন পার হয়ে গেছে, কিন্তু আজও কেউ জানে না সেই জেনারেটরটির কী হয়েছিল! কোথায় হারিয়ে গেল সেই জেনারেটরটি। অনেক অভিযান হয় পরে হারানো জেনারেটরটি খুঁজে পেতে। অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয় নন্দাদেবীতে। খোঁজা হয়েছে তেজস্ক্রিয়তার চিহ্ন। কিন্তু আশানুরূপ কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

.

এবার একটু ভাবুন, নন্দাদেবী অভিযানে হারিয়ে যাওয়া সেই আড়িপাতা যন্ত্রগুলোর কী হল? আজও সেই তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়াম রডগুলোকে নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে নন্দাদেবী। হয়তো কোনোদিন হিমবাহ থেকে বেড়িয়ে এসে গঙ্গায় ভেসে উঠবে তেজস্ক্রিয় যন্ত্রটি। আবার হয়তো কোনোদিনই পাওয়া যাবে না। চায়না বা পাকিস্তানের কমান্ডোরা এসে চুরি করে নেয়নি তো যন্ত্রটি! প্লুটোপিয়াম ক্যাপসুলটি কোথায় আছে এখন? মাত্র ৫০ বছর হয়েছে। আরও ৮৫০ বছর ধরে এই ক্যাপসুল থেকে তেজস্ক্রিয়তা বের হতে থাকবে। আমাদের বোকামির ফলে পুরো হিমালয় দূষিত হয়ে যায়নি তো?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *