মহাদেবের পুনর্জন্ম হয় যে মন্দিরে

মহাদেবের পুনর্জন্ম হয় যে মন্দিরে 

ভারতে আরও একটি এমন গ্রাম রয়েছে, যেখানে কৃপাদৃষ্টি রয়েছে স্বয়ং মহাদেবের। তিনি নাকি সর্বদাই বিরাজমান কুলুর ‘বিজলি মহাদেব’ মন্দিরে। কথিত, কুলান্ত নামে এক দানব একবার মাথান গ্রাম ভাসিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সাপের রূপ ধরে আটকে দেয় বিপাশা নদীর গতিপথ। কুলান্তের কুকীর্তি মহাদেব বুঝতে পেরে তাকে মারতে উদ্যত হন। বেশ খানিকক্ষণ যুদ্ধ হওয়ার পরে মারা যায় দানব এবং তার সাপের দেহ পরিবর্তিত হয় এক বিশালাকার পাহাড়ে, নাম হয় কুলু। 

আর এই কুলুতেই এক সময়ে তৈরি হয় মহাদেবের মন্দির, যা কুলু থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার ট্রেক করলেই পৌঁছোনো যায়। মন্দিরটির ঠিক সামনের দিকেই রয়েছে ৬০ ফুট লম্বা একটি কাঠের পোল। সেখানেই অথবা শিবলিঙ্গের উপরেই বজ্রপাত হয়। তারপরই ভেঙে যায় সেই শিবলিঙ্গ। শোনা যায় স্বয়ং মহাদেবের নির্দেশেই মন্দিরের এক বিশেষ পুজোরী ওই বিচূর্ণ হওয়া শিবলিঙ্গের টুকরোগুলো অতি যত্ন সহকারে মূল শিবলিঙ্গের সঙ্গে মাখন বা ঘি ও ছাতুদিয়ে এক মিশ্রণ বানিয়ে তাকে জুড়ে দেন। আর আশ্চর্যভাবে মাসখানেকের মধ্যেই সেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া মূর্তি পুনরায় আগের চেহারায় ফিরে আসে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি কে বলা হয় পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া। স্থানীয়দের বিশ্বাস, গ্রাম ও গ্রামবাসীদের বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচাতে মহাদেব নিজের ওপরেই প্রকৃতির এই কোপ বহন করেন। 

বিজলি মহাদেবের মন্দির পৌঁছোতে হয় ১০০০ সিঁড়ি চড়ে। সেখান থেকে কুলু ও পার্বতী উপত্যকার সৌন্দর্য দেখা যায় সম্পূর্ণ ভাবে। 

হিমাচলপ্রদেশের কুলু উপত্যকায় দেবাদিদেব শিবের এই মন্দিরে রাখা আছে লিঙ্গরূপী শিবের একটি মূর্তি। সেই লিঙ্গটিকে ঘিরেই রহস্য। বলা হয়, এখানকার শিবলিঙ্গটির মাথায় আকাশ থেকে বাজ পড়ে। ফলে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় লিঙ্গরূপী মহাদেব। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এই ঘটনা প্রতি ১২ বছর অন্তর হয়ে থাকে। তবে তাজ্জবের বিষয় হল বিচূর্ণ হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই সেই ভেঙে যাওয়া শিবলিঙ্গ এক অদ্ভুত পদ্ধতিতে জুড়ে গিয়ে পুনরায় আগের চেহারায় ফিরে আসে। তখন দেখলে বোঝার উপায় থাকে না যে এটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। 

এই অদ্ভুত ঘটনাটি প্রথম কবে হয়েছিল তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারে না। এই মন্দিরটির বিদ্যুৎ এবং মহাদেবের নামের সঙ্গে মিল রেখে রাখা হয়েছিল। আর বিদ্যুৎ বা বিজলীর সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই এর নাম হয়ে যায় বিজলী মহাদেব । 

বিজলি মহাদেবের প্রভাব। অনেকে আবার মন্দিরটিকে বিজলেশ্বর শিবধামও বলে থাকেন। কুল উপত্যাকার বাসিন্দারা মনে করেন, মহাদের কখনোই চান না বজ্রপাতের ফলে কুল উপত্যাকার জনবসতি পশুপাখি এবং প্রকৃতির উপর কোনরকম ক্ষতি হোক। তাই সকলের প্রাণ রক্ষা করতেই দেবাদিদেব নিজের মাথায় সমস্ত বজ্রপাত টেনে নেন। এই অঞ্চলের সমস্ত গৌরবময় কাহিনি এই মন্দিরটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। 

অন্য দিক থেকে দেখতে গেলে পৌরাণিক মতে কুলুর ইতিহাস পড়লে জানা যায় মহাভারতে উল্লেখিত কুলন্ত ভূমিই হল বর্তমানের কুলু। অতীতের ন্যায় কুলু এখনও ‘দেবভূমি’ বা ‘ভ্যালি অফ গডস’ নামে পরিচিত। এই এলাকার মানুষেরা আরও মনে করেন কুলস্ত ভূমিতে দেব-দেবীদের অবিরাম যাতায়াত ছিল। বিভিন্ন মুনি-ঋষিরা এখানে এসে বসবাস করতেন। অনেকেই নিজেদের সেই বিশিষ্ট মুনি ঋষিদের বংশধর বলে মনে করেন। 

১২ বছর অন্তর অন্তর এই বজ্রপাতের পেছনে একটি পুরনো কাহিনি আছে যা শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে আপনার। পৌরাণিক কাহিনিতে বলা হয়ে থাকে প্রাচীন কুলন্ত ভূমিতে কুলাত নামক এক রাক্ষসের বসবাস ছিল। সেই রাক্ষস নিজের মৃত্যুর আগে ব্যাস নদীর উপত্যকাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। সেই মতন নিজের শক্তি বলে সে একটি দীর্ঘকায় অজগরের রূপ ধারণ করে কুণ্ডলী পাকিয়ে সেই নদীতে শুয়ে থাকে। যাতে নদীর জল চলাচল করতে না পেরে আটকে যায় এবং নদীর উপকূলীয় অঞ্চল বন্যায় ভেসে যায়। ঘটনাচক্রে সেটাই হল, সমস্ত প্রাণীকুল বন্যার কবলে পড়ে আর্তনাদ শুরু করে। সেই সময় দেবাদিদের ধ্যানে ছিলেন। ভক্তদের হাহুতাশভরা আর্তনাদ শুনে মহাদেবের ধ্যান ভঙ্গ হয়। তিনি কুলাত রাক্ষসের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করলে উপত্যকাটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেত, তাই তিনি একটি ছলনার আশ্রয় নেন। মহাদেব প্রথমে কুলাতের বিশ্বাস অর্জন করেন। তারপর নদী বক্ষে শুয়ে থাকা অজগররূপী কুলাতের কানের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, “তোমার লেজে আগুন ধরে গিয়েছে গো অজগর। “শিবের এই কথাটি শুনামাত্রই কুলাত পেছন ফিরে নিজের লেজের দিকে তাকায়। ঠিক তখনই মহাদেব নিজের ত্রিশূল দিয়ে আঘাত করেন কুলাতের মাথায়। সেই আঘাতে মৃত্যু হয়। আর তার পরেই কুলারের সেই অজগররূপী দেহ পর্বতে পরিণত হয়। 

কুলাতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার ফলে মহাদেব নিজের উপরের ক্ষুব্ধ হন। নিজেকে গ্লানিমুক্ত করতে মহাদেব ইন্দ্রদেবকে নির্দেশ দেন তিনি যেন প্রতি ১২ বছর অন্তর এই একই স্থানে তার লিঙ্গরূপী বিগ্রহের ওপর বজ্রপাত করেন। সেই থেকেই আজও ১২ বছর পর পর বিজলি মহাদেব মন্দিরের শিবলিঙ্গ বজ্রপাতের ফলে ভেঙে যায়। কুলুর বাসিন্দাদের প্রবল বিশ্বাস সমস্ত কুলু উপত্যকাটাই কুলাতের শরীর থেকে তৈরি। 

পৌরাণিক কাহিনিটি বিশ্বাস করবেন কিনা তা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিষয় কিন্তু বাজ পড়ার বিষয়টি একেবারেই সত্যি। আপনি নিজের চোখে দেখেও আসতে পারেন হিমাচলপ্রদেশের কুলু উপত্যকার এই মন্দিরটি ঘুরে। আর যারা ট্রেকে যান তাদেরও জন্য ভালো গন্তব্য হতে পারে এই মন্দির। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *