অলৌকিক জ্ঞানগঞ্জ-শাম্ভালা-সাংগ্রি-লার গল্প

অলৌকিক জ্ঞানগঞ্জ-শাম্ভালা-সাংগ্রিলা-র গল্প

অ্যাডলফ হিটলারের ঘনিষ্ঠ শেন হেডেন চলেছেন তিব্বত। নাৎসি বাহিনীর গুপ্তচরেরাও হিমালয় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা একটা কিছু খুঁজছেন। হিমালয়ের সাধু সন্ত মহাত্মাদের কাছে নানান প্রশ্ন করছেন। সাধারণ মানুষদের ভয় দেখাচ্ছেন। কিন্তু কেউই নাৎসিদের মুখে আশার আলো ফোটাতে পারছেন না। কী খুঁজছে হিটলারের নাৎসি বাহিনী? শুনলে হয়তো অবাক লাগতে পারে নাৎসি বাহিনী হিমালয় জুড়ে খুঁজে চলেছিল জ্ঞানগঞ্জ।

জার্মান সর্বাধিনায়ক অ্যাডলফ হিটলার অতিন্দ্রীয়বাদে খুব বিশ্বাস করতেন। তিনি এক বৌদ্ধ লামার কাছে শুনেছিলেন জ্ঞানগঞ্জের কথা। এই জ্ঞানগঞ্জ বা শাম্ভালার খ্যাতি সম্পর্কে বেশ অবগত ছিলেন হিটলার।

শাম্ভালা নামক এই অলৌকিক দেশটি সম্পর্কে শুনে তাঁর বেশ আগ্রহ তৈরি হয় এবং তিনি এতটাই উৎসাহিত হন যে ডেকে পাঠান বিখ্যাত অভিযাত্রী শেন হেডিনকে। হিমালয়ে বেশ কয়েকবার অভিযানে পাঠানোর পর হেডেনকে সাহায্য করার জন্য হিটলার হিমালয় ও তিব্বতে শাম্ভালার সন্ধানে নাৎসি বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই রহস্যময় দেশের খোঁজ পাননি তিনি। হিটলারের কাছে জ্ঞানগঞ্জ অধরাই থেকে যায়।

কৈলাস সংলগ্ন সবচেয়ে রহস্যময় এবং মানুষের চোখে অদৃশ্য মঠ এই জ্ঞানগঞ্জ। কেউ কেউ বলেন জ্ঞানপীঠ। হিমালয় বিশেষজ্ঞদের কথায় হিমালয়ে অবস্থিত এই জ্ঞানগঞ্জ আশ্ৰম সাংগ্রিলা, শাম্ভালা এবং সিদ্ধাশ্রম নামেও পরিচিত। এই অলৌকিক স্থানটি সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে যে এখানে সবার ভাগ্যের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

হিমালয়ে অবস্থিত এই জায়গাটির সঠিক স্থান সম্পর্কে কেউ জানে না। শুধুমাত্র ভারতই নয়, তিব্বতেও এই স্থানটি বিখ্যাত। সাধু মহাত্মারা বলছেন, শুধুমাত্র সিদ্ধ পুরুষগণই সেখানে যেতে পারবেন। এখানে সাধারণ মানুষের যাওয়া সম্ভব নয়। সিদ্ধ পুরুষ অর্থাৎ যিনি দীর্ঘদিন সাধনার মধ্যে আছেন, সাধনার কোনো একটি পর্যায়ে সিদ্ধিলাভ করেছেন সেরকম মানুষজনই একমাত্র পৌঁছোতে পারবেন জ্ঞানগঞ্জ।

জ্ঞানগঞ্জ বড়ো অদ্ভুত জায়গা যেখানে কারওর মৃত্যু হয় না। সেখানে বসবাসকারী সিদ্ধ সন্ন্যাসীদের বয়স বাড়ে না। কালচক্র সেখানে গতিহীন। পুরো জ্ঞানগঞ্জই এক আশ্রম। যে আশ্রমে সময়কে স্থির করে দিয়েছেন সন্ন্যাসী মহর্ষি মহাতপা। যিনি সত্যযুগ থেকে অবস্হান করছেন রাজরাজেশ্বরী মঠে। মহর্ষি মহাতপা কলির শুরুতে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে ধ্যানমগ্ন হয়ে যান যাতে এই সৃষ্টি বজায় থাকে। তাঁর ওপর আশীর্বাদ ছিল ধ্যান করার জন্যে। যেদিকে তিনি যাবেন সেদিকে পথের সৃষ্টি হতে থাকবে। তিনি যেখানে ধ্যান করেছিলেন সেই স্থানের নাম মহাতপা বিল।

পুরাণে আছে মহাতপা বিলে আজও অনেক মহর্ষি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় রয়েছেন কীটপতঙ্গ রূপে, শৈবাল রূপে, বাদুড় রূপে কিংবা অন্য কোনো প্রাণী রূপে। মহাতপা বিলে গিয়ে ধ্যান করলে জন্মজন্মান্তরের চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। হিমালয়ের অনেক প্রবীণ সাধুর কথায়, “আজকের বারণাবতই অলৌকিক জ্ঞানগঞ্জ।”

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এর যেহেতু কোনো সঠিক অবস্থান নেই তাই স্যাটেলাইটেও এই স্থানটি দেখা যায় না। এই জায়গাটি কোনো বিশেষ ধর্ম বা সংস্কৃতির জন্য নয়।

জেমস হিলটনের বই ‘লস্ট হরাইজন, সাংগ্রি-লা হারানো রাজত্ব’ বইতে এই স্থানটির সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। রামায়ণ ও মহাভারতেও জ্ঞানগঞ্জের উল্লেখ রয়েছে। যেখানে এই স্থানের নাম দেওয়া রয়েছে সিদ্ধাশ্রম বলে।

আবার বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন ভগবান বুদ্ধ তাঁর জীবনের শেষ সময়ে কালচক্র সম্পর্কে জেনে গেছিলেন। তাই মৃত্যু আসন্ন জেনে তিনি যে সমস্ত ব্যক্তিদের জ্ঞান দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন রাজা সুচন্দ্র। তিনি যখন এই জ্ঞান নিয়ে তাঁর রাজ্যে ফিরে গিয়েছিলেন তখন থেকে তিব্বতে এই স্থানটি ‘শাম্ভালা’ নামে পরিচিত হয়।

এই স্থানটি আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কেন্দ্র। আধুনিক বিজ্ঞানের মতে বার্ধক্য একটি রোগ। ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, আমেরিকা, রাশিয়ার মতো দেশে, দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে যদি শরীরে নতুন কোষ নির্মিত হয় এবং অরগ্যানগুলি যদি সবসময় সুস্থ থাকে তাহলে মানুষ এক হাজার বছরেরও বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। যাঁরা ভারতীয় আধ্যাত্মবাদ নিয়ে গবেষণা করেন তারা মনে করেন সাধারণ এই জায়গাটি কোনো বিশেষ ধর্ম বা সংস্কৃতির জন্য নয় এখানে এক বিচিত্র পদ্ধতি অনুসরণ করা, যা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনার একেবারে বাইরে।

১৯৪২ সালে একজন ব্রিটিশ অফিসার এলপি ফ্রল এই জায়গাটির সম্পর্কে বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি একটি চিরকুট রেখে যান যেখানে তিনি লেখেন, জ্ঞানগঞ্জ আশ্রম তিব্বতের পশ্চিম অঞ্চল থেকে আনুমানিক ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই প্রাচীন আশ্রমটির সংস্কার ও নির্মাণ করেছিলেন পরমহংস জ্ঞানানন্দ। এর বেশি তথ্য তিনি দিয়ে যেতে পারেননি।

এবার আসি একটা বইয়ের কথায়। বইটির নাম ‘দ্য লস্ট HORIZON হরাইজন’, লেখকের নাম জেমস হিলটন। ১৯৩৩ সালে

ইংরেজ ঔপন্যাসিক জেমস হিলটনের উপন্যাস ‘লস্ট হরাইজন’ প্রকাশিত হয়। কী আছে এই লস্ট হরাইজন বইটিতে? বইটির কাহিনি শুরু হচ্ছে এভাবে, চারজন যাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ইংল্যান্ডের একটি ট্রাভেলস বিমান আকাশে ওড়ে। তারপর তা হঠাৎ করে রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়।

এদিকে অনেক খোঁজখবর করেও যখন হারানো বিমানটির কোনো হদিস মিলল না তখন সবাই ভাবল হয়তো বিমানটি চারজন যাত্রীসহ চিরতরেই হারিয়ে গেছে। অন্যদিকে তিব্বতের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়ে ভেঙে পড়ে বিমানটি। আফগানিস্তান-পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বে ও তিব্বতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের একটি দুর্গম ভ্যালি বা উপত্যকায় ওই চারজন গিয়ে পৌঁছোয়, চারজন যাত্রী অক্ষত থাকলেও মারা যায় পাইলট। যাত্রীরা জানতে পারে না তারা কোথায় এসে পৌঁছেছে। আর তারা এটাও বুঝতে পারেন না যে কত দূরে লোকালয় বা জনবসতি রয়েছে।

আহতরা কোনোভাবে বিমান থেকে বেরিয়ে হাঁটা শুরু করলেন। তাদের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয় এক বৌদ্ধ লামার। নাম চ্যাং। যাত্রীদের চ্যাং লামা নিয়ে যান একটি বৌদ্ধমঠ। যার নাম সাংগ্রি-লা।

যেখানে বসবাসকারী মানুষেরা সকলেই অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ জীবনের অধিকারী। যেখানে রয়েছে স্বর্ণখনির মতো মূল্যবান সম্পদের ভাণ্ডার। সাংগ্রি-লা-র বিশাল একটি লাইব্রেরিতে সঞ্চিত রয়েছে পৃথিবীর সকল যুগের সকল বিষয়ের আপ্ত জ্ঞান। সেখানে বসবাসকারী মানুষের মাঝে নেই কোনো দুঃখ-কষ্ট, রোগ-বালাই, শোক-তাপ, হিংসা-বিদ্বেষ। সকলে সুশৃঙ্খলভাবে একটি বৌদ্ধ মঠের প্রণীত নিয়ম-কানুন মেনে জীবন পরিচালিত করে, যার নাম সাংগ্রি-লা।

এই সাংগ্রি-লা পৃথিবীর মানুষের কাছে অদৃশ্য, শুধুমাত্র তারাই এর অবস্থান জানতে পারে যাদেরকে সেখানকার অধিবাসীরা নিজ উদ্যোগে সেখানে নিয়ে যায়। এটি এমন একটি পর্বতের কোলে অবস্থিত, যেটিকে এক লেখক বর্ণনা করেছেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর উঁচু পর্বত হিসেবে, যার নাম মাউন্ট কারাকাল। চারদিকের সুউচ্চ পর্বতমালা এই ছোট্ট উপত্যকাকে বাকি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।”

ধারণা করা হয়, সভ্য পৃথিবীতে একদিন এক মহাযুদ্ধ হবে। যে যুদ্ধে মানবসভ্যতার সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। আর সেদিন মানবসভ্যতার শেষ নিদর্শন হিসেবে সাংগ্রি-লা একমাত্র অঞ্চল হিসেবে পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকবে। সমগ্র পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধের উত্তাপ সাংগ্রি-লা-কে একেবারেই স্পর্শ করবে না। আর সেই স্থানটিই হবে পৃথিবীর মানুষের আশা ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল।

১৯৩৩ সালে জেমস হিলটনের এই উপন্যাস প্রকাশের পর পরই পাঠকদের কাছে ব্যাপক সমাদর ও জনপ্রিয়তা লাভ করে বইটি। চারিদিকে হই হই পড়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আশঙ্কার মাঝে এই উপন্যাসে বর্ণিত পৃথিবীর বুকে এরকম স্বর্গরূপ স্থানের উপস্থিতির ধারণা সমগ্র ইউরোপের পাঠককুলের মাঝে বিপুল সাড়া জাগিয়ে তোলে।

শুধু ইউরোপ, ইংল্যান্ড কিংবা জার্মানিই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটক—অভিযাত্রীরা বের হয়ে যান সাংগ্রি-লার খোঁজে। হিমালয় ও তিব্বত জুড়ে আলোড়ন পড়ে যায়। নানান দেশের অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের আখড়া হয়ে ওঠে হিমালয়। কিন্তু কেউই শাম্ভালার খোঁজ পাননি।

এখন প্রশ্ন হল, ঔপন্যাসিক জেমস হিলটন কি শুধুমাত্র নিজের কল্পনার জায়গা থেকে এই কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন? নাকি বাস্তবে কিছুটা হলেও তার এই কল্পনার ভিত্তি রয়েছে? আমরা এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।

‘শাম্ভালা’ পৃথিবীর বুকে রহস্যময় এক অঞ্চল। অনেকের চোখে শাম্ভালা হচ্ছে পৌরাণিক এবং ঐন্দ্রজালিক রহস্যে ঘেরা এক দেশ। সংস্কৃত শব্দ থেকে উদ্ভূত ‘শাম্ভালা’, যার অর্থ ‘শান্তিময় স্থান’। এশিয়ার মানুষের কাছে এটি শান্তালা, শাম্বাল্লা বা সাংগ্রি-লা নামে সর্বাধিক পরিচিত। অঞ্চলটিকে আগার্থা নামেও ডাকা হয়ে হয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ, যেমন—প্রাচীন কালচক্র তন্ত্রে কিংবা তিব্বতের বৌদ্ধধর্মের জ্যাংজুং সংস্কৃতির পুরোনো গ্রন্থেও এই শহরের নাম পাওয়া যায়।

বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে শাম্ভালা এক অপার রহস্যের নাম। কারও কাছে এটি নিষিদ্ধ ভূমি। কারও মতে এটি পবিত্র জমি, যেখানে প্রবাহিত হয় স্বর্গ থেকে নেমে আসা জলের স্রোতধারা। যে জল বড়োই পবিত্র। কারও মতে আবার এটি আধ্যাত্মিকতার পীঠস্থান। কারও মতে সাধনার উর্বর জমি। কেউ কেউ ভাবেন, এটি ঈশ্বরের আবাসভূমি। হিন্দুদের অনেকেই মনে করেন তাদের কাছে আর্যদের প্রতিষ্ঠিত পবিত্র রাজ্য এই শান্তালা। আবার চিনাদের কাছে এই রাজ্য ‘হেসি তিয়ান নামে পরিচিত। পশ্চিমা জগৎ শাম্ভালাকে চেনে ‘হোসি ওয়াং মু’ নামে।

জ্ঞানগঞ্জকে এককথায় অনেক পণ্ডিত জ্ঞানপীঠ বলে থাকেন। আগেই জানিয়েছি হিমালয়ে অবস্থিত এই ‘জ্ঞানগঞ্জ’ সাংগ্রি-লা, শান্তালা এবং সিদ্ধাশ্রম নামেও পরিচিত। অনুমান করা হয় এখানে সবার ভাগ্যের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হিমালয়ে অবস্থিত এই জায়গাটির সঠিক স্থান সম্পর্কে কেউ জানে না।

শুধুমাত্র ভারতেই নয়, তিব্বতেও এই স্থানটি বিখ্যাত। তিব্বতে এরকম রহস্যময়, পৃথিবীর দৃষ্টির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা একটি রাজ্যের উপস্থিতির ধারণাটি আজকের নয়। সম্রাট আকবর তার ধর্মদর্শন দিন-ই-এলাহি প্রতিষ্ঠার জন্য মতামত নেওয়ার লক্ষ্যে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা ধর্মের ধর্মশিক্ষায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিমন্ত্রণ করতেন। এদের মাঝে হিন্দু, যোগী, সন্ন্যাসী যেমন ছিলেন, তেমনি খ্রিস্টান যাজকেরাও ছিলেন। এরকমই একজন যাজক সেখানে একটি নিবন্ধের সন্ধান পান, যার সঙ্গে একটি মানচিত্র যুক্ত ছিল। মানচিত্রটি ছিল হিমালয়ের উত্তরের কোনো এক এলাকার, যাতে শুধুমাত্র মানস সরোবর ছাড়া আর কোনো কিছুই চিহ্নিত ছিল না। সেই নিবন্ধে দাবি করা হয়, মানচিত্রের ওই স্থানে খ্রিস্টানরা বসবাস করে।

এর দীর্ঘ সময় আর একজন পর্তুগিজ মিশনারি, যার নাম আন্তোনিও আন্দ্ৰাদে, মানচিত্রে বর্ণিত স্থানের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। তিনি যোগী ও তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে বহু কষ্টে হিমালয় পাড়ি দিয়ে অবশেষে এক অসম্ভব সুন্দর ও ধনী রাজ্যের সন্ধান লাভ করেন, কিন্তু সেটি শাম্ভালা নয়।

মহাযান বৌদ্ধ ধর্মানুসারীদের কাছে

কালচক্র বা কালাচক্র তন্ত্র একটি পরিচিত নাম।

এই মতবাদে একটি রাজ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়, যেটি ‘শাম্ভালা’ নামে পরিচিত। এই রাজ্য হিমালয়ের উত্তরে অবস্থিত একটি উপত্যকা। এর চারপাশে সুউচ্চ পর্বতমালা এমনভাবে একে বেষ্টন করে রেখেছে যেন ওপর থেকে দেখলে এ রাজ্যকে একটি পদ্মফুলের মতো দেখায়। এই দেশ মানস সরোবরের কাছেই অবস্থিত।

তিব্বতের বৌদ্ধধর্মের জ্যাংজুং সংস্কৃতির প্রাচীন পুথি থেকে জানা যায়, তিব্বতের বরফে ঢাকা পাহাড়গুলোর আড়ালে রহস্যময় শাম্ভালা নামক রাজ্যটি অবস্থিত, যেখানে জ্ঞানী রাজারা বৌদ্ধধর্মের গূঢ় শিক্ষাগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছেন। পৃথিবী যখন অন্যায়-অবিচার, লোভ-লালসা আর যুদ্ধ-বিগ্রহে জর্জরিত হয়ে পড়বে, ঠিক তখনই শাম্ভালা রাজ্যের রাজা এক বিরাট বাহিনী নিয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে নতুন যুগের সূচনা করবেন।

আবার প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, শাম্ভালার রাজা সুচন্দ্র একদা ভারতে এসে শাক্যমুনি বুদ্ধের কাছ থেকে কালচক্র তন্ত্র শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। বুদ্ধের নির্দেশ অনুযায়ী, তিনি বৌদ্ধধর্মের এই গোপন শিক্ষা শাম্ভালা রাজ্যে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে রক্ষা করে চলেছেন।

হিন্দু ধর্মের বিষ্ণুপুরাণেও উল্লেখ রয়েছে, বিষ্ণুর অবতার কল্কির জন্মস্থান এই শান্তালা।

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, শাম্ভালা পৃথিবীর বুকে এমন এক স্থান, যেখানে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ আত্মার ব্যক্তিরা বাস করে থাকেন। এটি স্বর্গীয় এক স্থান। প্রেম, ভালো বাসা আর জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত এই দেশ। এখানে কোনো কষ্ট নেই, জরা নেই। বয়স এখানে চিরদিনের মতো থমকে আছে। এই দেশে শুধুই আনন্দ, কোনো দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণার লেশমাত্র নেই। এখানকার অধিবাসীরা নানা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন। প্রযুক্তি, শিল্প, বিজ্ঞান—যে-কোনো বিষয়ের জ্ঞানে তারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

শাম্ভালা নিয়ে বৌদ্ধধর্মে এক ভবিষ্যদবাণী প্রচলিত রয়েছে, এই কল্পনগরীতে নাকি বত্রিশজন রাজা রয়েছেন। প্রত্যেক রাজা একশো বছর ধরে রাজ্যটি শাসনের দায়িত্বে থাকবেন। যখন তাদের শাসনকালের অবসান ঘটবে, ঠিক তখনই বাইরের পৃথিবী জুড়ে নানা অরাজকতার সৃষ্টি হবে। পাপে পূর্ণ হয়ে উঠবে এই ধরিত্রী। মানুষের লোভ-লালসা, আশা-আকাঙ্ক্ষা আকাশ ছোঁবে। যুদ্ধ, নৃশংসতা আর নিষ্ঠুরতায় এই পৃথিবীর মাটি রক্তিম বর্ণ ধারণ করবে।

পৃথিবীর সব নিষ্ঠুর এবং অন্ধকার জগতের মানুষরা এক শয়তান রাজার অধীনে একজোট হবে। আর ঠিক তখনই এই পাপিষ্ঠদের বিনাশ এবং পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বরফে ঢাকা পাহাড়ের কুয়াশা সরে গিয়ে শাম্ভালা আত্মপ্রকাশ করবে। যখন সেই শয়তান রাজার সৈন্যবাহিনী শাম্ভালার ওপর আক্রমণ চালাবে, বত্রিশতম শান্তালার রাজা রুদ্রন জাঁপো ভয়াবহ যুদ্ধে তাদের হারিয়ে দেবে। ধ্বংস হয়ে যাবে সেই রাজা আর তার অনুচরেরা।

তবে কালচক্রের ভবিষ্যদবাণীর সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের শিক্ষার একধরনের বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। বৌদ্ধধর্ম কোনো সহিংসতা পছন্দ করে না। তাই কালচক্রে যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে, অনেক বৌদ্ধ পণ্ডিতই মনে করেন কালচক্রে তা প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কালচক্রে যে রিপুগুলোর কারণে মানুষ তার মানবিক গুণাবলি হারিয়ে ফেলে, সেই রিপুগুলো দমনের কথাই বলা হয়েছে।

প্রেম আর অবারিত জ্ঞানের ভাণ্ডার, কুয়াশার চাদরে মোড়া রহস্যময় দেশ শাম্ভালার অবস্থান জানার জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বহু মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেরিয়েছেন। অনেক গবেষকের ধারণা, আলো-ছায়ায় মোড়া দুর্গম তিব্বতের প্রকৃতিতেই রয়েছে আশ্চর্য এই প্রহেলিকা।

এমনিতেই তিব্বতের নামটা শুনলে অনেকেই মনে করেন এ যেন কত রহস্যে ঘেরা দূরের কোনো দেশ। পাথরে আড়ালে কুয়াশায় ঢাকা দুর্গম বরফের প্রান্তর, আধো ছায়া বৌদ্ধগুহা, ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি, লামা সন্ন্যাসীদের গম্ভীর শিঙার আওয়াজ পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে অনবরত প্রতিধ্বনি তুলছে। তাই দেশটিকে নিয়ে অনেকেরই মনে একধরনের কুহেলিকা রয়েছে।

কিন্তু এখনও কোনো পণ্ডিত বা গবেষক সঠিকভাবে জানাতে পারেননি শান্তালার প্রকৃত অবস্থান। ধারণা করা হয়ে থাকে, ইউরেশিয়ার কোনো নির্জন উপত্যকায় বা তিব্বতের বরফে ঢাকা পাহাড়ের আড়ালেই নাকি রয়েছে এই রাজ্য।

তবে জ্যাংজুং সংস্কৃতি অনুসারে, পাঞ্জাবের শতদ্রু উপত্যকায় থাকতে পারে এই রাজ্য। আবার আধুনিক বৌদ্ধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাকলিয়ডগঞ্জে হিমালয়ের ধৌলাধর শিখরের কাছেপিঠেই পাওয়া যেতে পারে শাম্ভালা রাজ্যের অস্তিত্ব। আবার মঙ্গোলিয়ানদের ধারণা—সাইবেরিয়ার কোনো দুর্গম পাহাড়ের আড়ালেই রয়েছে এই রাজ্য। তবে শাম্ভালা নিয়ে তিব্বতিদের মধ্যে এমন এক গল্প প্রচলিত রয়েছে, যা থেকে শান্তালা সম্পর্কে একধরনের ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

শাম্ভালার খোঁজে তিব্বতের বিভিন্ন পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এক তরুণ। হঠাৎই একদিন বরফে ঢাকা নির্জন প্রান্তরে সেই তরুণের সঙ্গে দেখা হয় এক সন্ন্যাসীর। সন্ন্যাসী সেই তরুণের কাছে জানতে চান, কেন সে একাকী এই নির্জন প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে? তার উত্তরে তরুণটি জানায়, সে শাম্ভালা নামের শহরটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সন্ন্যাসী স্মিত হেসে তরুণটিকে জানায়, “বৃথাই শাম্ভালার খোঁজ করছ। তোমার মাঝেই রয়েছে সেই দেশ। শাম্ভালা মানে শান্তি। আর সেই শাস্তি রয়েছে তোমার মনে। প্রতিটি মানুষের অন্তরাত্মাই হল শাম্ভালা।”

আসলে মানুষের মাঝেই রয়েছে লোভ-লালসা আর যথেচ্ছ চাওয়া-পাওয়ার বাসনা। আর তা থেকেই জন্ম নেয় হিংসা, বিদ্বেষ, রেষারেষি, এমনকি একে অন্যকে হত্যার চেষ্টাও। তাই মানুষের বিবেক জাগ্রত করে ষড়রিপুকে দমন করতে পারলেই সেই মানুষের মাঝেই পাওয়া যায় শাম্ভালা নামের দেশটির অস্তিত্ব। এখন সে-কথা সবাই মানতে রাজি হয়। কিছু তো আছে জ্ঞানগঞ্জে, আর তা ভেবে সবাই বাস্তবসম্মত শাম্ভালাকে খুঁজে পেতে আরও বেশি তৎপর হয়ে ওঠে।

এ প্রসঙ্গে ১৯৮৫ সালে চতুর্দশ দালাইলামা বৌদ্ধগয়ায় এক ধর্মীয় আলোচনা সভায় বলেন, “শাম্ভালা সাধারণ কোনো দেশ নয়। বিশেষ আত্মিক ও কর্মযোগে পরিচালিত ব্যক্তিই তার সন্ধান পেতে পারে। এটি কোনো দৃশ্যমান দেশ নয়, যা আমরা সহজেই খুঁজে পেতে পারি। আমরা শুধু বলতে পারি যে, এটি একটি বিশুদ্ধ ভূমি, মানব রাজ্যের পরিশুদ্ধ জগৎ। সাংসারিক জীবনে ব্যস্ত একজন সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে সেখানে পৌঁছোনো সম্ভব নয়।”

পশ্চিমাদের চোখে শাম্ভালা নিয়ে রয়েছে অপার মুগ্ধতা। কালচক্রকে ঘিরে রচিত হওয়া নানা গল্পগাথা পশ্চিমা বিশ্বের গবেষক, পণ্ডিতদেরকে বারবার মোহিত করেছে। এছাড়া তিব্বত দেশটি নিষিদ্ধ ভূমি হওয়ায় পশ্চিমাদের কাছে তাই শান্তালা হয়ে উঠেছে কুয়াশাঘেরা রহস্যময় এক স্থান। তাদের ধারণা, শাম্ভালার সন্ধান পাওয়া গেলে পৃথিবীর অনেক অজানা তথ্যই জানা সম্ভব হবে। জোয়াও ক্যাবরাল এবং এস্তেভো ক্যাসেলা নামের দুই ক্যাথলিক মিশনারির কাছ থেকে পশ্চিমা বিশ্ব প্রথম শাম্ভালা সম্পর্কে জানতে পারেন। কিন্তু তারা প্রথমদিকে মনে করেছিলেন, চিনের আর একটি নামই হচ্ছে শাম্ভালা।

১৬২৭ সালে একদল গবেষক যখন তিব্বতের তাসিল হুন-পো-য় যান, সেখানকার মঠের প্রধান পাঞ্চেনলামার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তারা তাদের ভুল বুঝতে পারেন। ১৮৩৩ সালে সান্দর কোরোসি সিসমা নামের এক হাঙ্গেরিয়ান পণ্ডিত উত্তরের ৪৫ ডিগ্রি থেকে ৫০ ডিগ্রি অক্ষাংশের মধ্যে এই রহস্যময় অঞ্চলটির অবস্থান আছে বলে জানান। ঊনবিংশ শতাব্দীতে, থিওসফিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা হেলেনা পি ব্লাভ্যাস্কি শালাকে পৌরাণিক রাজ্য হিসেবে অভিহিত করেন।

সমগ্র শান্তালা উপত্যকা একটি অনিন্দ্যসুন্দর শ্বেতশুভ্র পর্বতের ছায়ায় অবস্থান করে। এই রাজ্যের রাজা স্বয়ং শাক্যমুনি বুদ্ধের কাছ থেকে মহাযান শিক্ষা লাভ করেন। এখানকার মানুষ যুদ্ধ বিগ্রহের সঙ্গে পরিচিত নয়। এখানে কোনো রোগ-শোক, মহামারি, অস্থিরতা, দুঃখ-দুর্দশা, হিংসার অস্তিত্ব নেই। এ রাজ্যের মানুষ পরম শান্তিতে মহান বুদ্ধের শিক্ষা ও দর্শন অনুযায়ী জীবনধারণ করে। সমগ্র পৃথিবীজুড়ে যখন বস্তুবাদী দর্শন আধ্যাত্মিকতাকে অপসারণ করবে, পৃথিবী যখন স্বেচ্ছাচারিতা ও সন্ত্রাসে পরিপূর্ণ হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হবে, তখন লোকচক্ষুর অন্তরালে কুয়াশায় ঢেকে থাকা শালা রাজ্যের ওপর থেকে কুয়াশার চাদর অপসারিত হবে; পৃথিবীবাসীর কাছে এ রাজ্য দৃশ্যমান হবে। এখান থেকেই শুরু হবে পরবর্তী শান্তিপূর্ণ পৃথিবী প্রতিষ্ঠার প্রয়াস।

কাজেই দেখা যায়, সাংগ্রি-লা নগরীর কাহিনি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও এই ধরনের নগরের উপস্থিতির ধারণাটি অনেক পুরাতন। এই কিছুদিন আগেও তিব্বত ছিল পৃথিবীর মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত নিষিদ্ধ এক দেশ; যে দেশের বহু স্থানে পরিচিত পৃথিবীর কোনো মানুষের পা পর্যন্ত পড়েনি। প্রাকৃতিক দুর্গমতা আর বৈরী পরিবেশের কারণে যে দেশের অনেক কিছুই ছিল আমাদের অজানা। তাই হয়তো আমরা প্রশ্ন করি, শাংগ্রি-লা কি সত্যিই আছে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা কেউ জানি না। আমরা শুধু এটুকু বলতে পারি, হানাহানি ও অশান্তির এ পৃথিবীতে শাংগ্রি-লা নগরের ভাবনা আমাদের ভবিষ্যতের এক শান্তিময় পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে শেখায়। তাই প্রশ্নটি বরং আমাদের এভাবে করা উচিত, ‘সাংগ্রি-লা কি নেই?’

শাম্ভালার কথা হচ্ছে যখন তখন বরফানি দাদাজির গল্প হবে না তাও আবার হয় নাকি। গল্পের শুরুয়াত এলাহাবাদ কুম্ভে। রাতে মেলা ঘুরছি। হাজারো টেন্টে নানান প্রবচন হচ্ছে। কোনো কোনো টেন্টে ঢুকে পড়ছি। দেখছি কী হচ্ছে। কুম্ভের এটাই মজা। সারা ভারতের আধ্যাত্মিক জগতের দিকপালদের আপনি পাবেন একজায়গায়।

অনেক নাগাবাবা ঘুরছেন দেখলাম এদিক-সেদিক। তা একজায়গায় বেশ ভিড়। একটা হোর্ডিংয়ে দেখলাম লেখা আছে বরফানি দাদাজির আখড়া। ঢুকে দেখলাম প্রচুর ভক্তমাঝে বসে আসেন এক প্রবীণ সাধু। বুঝলাম তিনিই দাদাজি। তার চরণতলে মৌমাছির মতো ভক্তরা বসে আছে। শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব নির্বিশেষে প্রচুর সাধক মহাত্মার ভিড় আখড়া জুড়ে। তাদের মধ্যে অনেক গুরুস্থানীয় প্রবীণ সাধুও রয়েছেন। গুরুরা অনেকেই শিষ্যদের উপদেশ দিতে ব্যস্ত। আর সেইসব গুরু ও সাধকদের গুরু দাদাজি বেশ কিছুটা দূরে সিংহাসনে ধ্যানে বসে আছেন। বিচিত্র পরিবেশ। কান পেতে দু-একজন শিষ্যের আলোচনা শুনে বুঝলাম, দাদাজি মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্র ও পবনপুত্র বজরঙ্গবলীর উপাসক। ইষ্টদেব মানেন ভগবান শিবকে।

উপস্থিত গুরু-শিষ্যদের আলোচনা শুনে বুঝলাম দাদাজির বয়স অনুমান করা যায় না। একশো কিনা তা নিয়ে দুজন গুরু-শিষ্যের মধ্যে জোর বচসা চলছে। তবে উনাকে দেখে বোঝা কঠিন যে উনার বেশ বয়স হয়েছে।

এক শিষ্যের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে শুনলাম দাদাজি নাকি জ্ঞানগঞ্জ গেছেন। আগ্রহ বাড়ল। শুনলাম দাদাজি তাঁর মূল্যবান অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন বই আকারে। আরও বেশ কিছু মানুষ এই দাদাজি মহারাজের নানা কথা তাঁদের বিভিন্ন বইয়েও স্থান দিয়েছেন।

শিষ্যের সঙ্গে আলাপ জমাতেই শুরু হল নানা প্রসঙ্গ। শিষ্যেকে জিজ্ঞেই করেই ফেললাম দাদাজির জ্ঞানগঞ্জের অভিজ্ঞতা নিয়ে সে কী কী জানে? শিষ্য জানাল, দাদাজি তাদের বিভিন্ন সময়ে জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে অনেক গল্প করেছেন যেমন, জ্ঞানগঞ্জ যাত্রাপথে দাদাজির কাছে বাবাজি মহারাজ, গণেশলামা ও ফুলেরীবাবা-তিনজনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তাঁরা একসময় যখন বুঝতে পারলেন দাদাজি আর বেশিদিন তাঁর স্থূলদেহ ধরে রাখতে পারবেন না তখন দাদাজিকে বেশ কিছু উপদেশ দিলেন তখন দাদাজি বললেন, “মৃত্যু হয় হোক, কিন্তু ইষ্টের ধ্যান ছাড়তে পারব না”। তখনই ফুলেরীবাবা দাদাজিকে উচ্চমার্গের একটি ধ্যানের কৌশল সম্পর্কে শিক্ষাদান করলেন। শিক্ষান্তে দাদাজিকে ধাক্কা মেরে একটি গর্তের ভেতর ফেলে দিলেন। সেখানেই দাদাজি ধ্যানস্থ হলেন। এইভাবে কতদিন, কত মাস, নাকি কত বৎসর কেটেছিল তা জানা যায় না। দাদাজির ধ্যানস্থ শরীর ধীরে ধীরে বরফে ঢেকে গেল। দেখতে দেখতে দাদাজির দেহকঙ্কাল কেবল চর্মদ্বারা আবৃত হয়ে পড়ল। দেহে মাংসের আর বিন্দুমাত্র চিহ্নমাত্র নাই। এমতাবস্থায় যখন দাদাজির দিন কাটছে তখন বাবাজি মহারাজ, গণেশলামা ও ফুলেরীবাবা—এই তিন সিদ্ধমহাত্মা দাদাজিকে বরফের স্তূপ থেকে উদ্ধার করেন। তারপর যোগবলে দাদাজির দেহে মাংসের সংযোজন করেন। তারা দাদাজির নামকরণ করলেন, ‘বরফানী’ নামে। সেই থেকে বরফানী নামটি প্রচলিত হয়ে গেল।

শুনলাম, আখড়ার এক মহাত্মা একবার জ্ঞানগঞ্জ ও তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন দাদাজির কাছে। দাদাজি সে-কথা শুনে তীক্ষ্ম দৃষ্টিপাত করেই চোখ বুজে কিছুক্ষণ পরে বলেছিলেন, “আমার স্বপ্নের মহা আশ্রম, ক্রিয়াযোগ ও সূর্যবিজ্ঞান চর্চার সিদ্ধপীঠ জ্ঞানগঞ্জ।” অসংখ্য মৃত্যুঞ্জয়ী সাধকের সাধনার ছটায় উদ্ভাসিত জ্ঞানগঞ্জ।

কিছুক্ষণের মধ্যে দাদাজির আর এক শিষ্য আমাদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, “দাদাজি আমাদের জ্ঞানগঞ্জের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি কীভাবে গেছেন, কোথায় থাকতেন সব বলেছেন দাদাজি। একেবারে ছবির মত তার বিবরণ।”

দাদাজি একবার বলেছিলেন, “ওই আশ্রমের সঠিক অবস্থানের পাশাপাশি আশ্রমে প্রবেশ করার জন্য কতগুলি গুহাপথ আছে। প্রতিটি গুহাপথের মুখ বরফের চাঁই দ্বারা এরূপ-ভাবে আবৃত যে বাইরের থেকে বুঝবার উপায় নাই। কিন্তু যিনি এ-বিষয়ে অবগত আছেন তিনি অতি সহজেই ওই গুহার মুখ উন্মোচন করিয়া ভেতরে প্রবেশ করিতে পারিবেন। জ্ঞানগঞ্জের এই গুহাগুলি রামগুহা, লক্ষণগুহা ইত্যাদি বিভিন্ন নামে নামাঙ্কিত।”

দাদাজির অন্য শিষ্য বললেন :

দাদাজি জ্ঞানগঞ্জের যে তিনজন সিদ্ধ সন্ন্যাসীর নাম অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে শ্রদ্ধাসহকারে সবার কাছে প্রকাশ করেন, তাদের মধ্যে আছেন ‘গণেশলামা’ – যিনি কায়াকল্প বিশারদ, দ্বিতীয়জন ‘ফুলেরীবাবা’ – যিনি দাদাজিকে ধ্যানের মাধ্যমে সমাধিতে উপনীত হইবার কৌশল শিখিয়েছিলেন। আর তৃতীয়জন হলেন ‘মহাবতার বাবাজি’ বা বাবাজি মহারাজ। যার সুযোগ্য শিষ্য ছিলেন যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী। শ্যামাচরণের গুরুদেব মহাবতার বাবা সারা হিমালয়ে প্রসিদ্ধ। তাঁর বয়স আন্দাজ করা যায় না। এছাড়া দাদাজি আরও একজনের নাম উল্লেখ করেছেন যার নাম ‘লেঘুরিয়াবাবা’। এই মহাত্মার সর্বাঙ্গ বড়ো বড়ো লোমে আবৃত হবার কারণে দূর থেকে তাঁকে দেখতে লাগত ভাল্লুকের ন্যায়। তাই জ্ঞানগঞ্জে তিনি লেখুরিয়াবাবা নামেই পরিচিত ছিলেন।

শিষ্যের কথায়, “সহস্র বৎসরকাল পরমায়ু ভোগকারী মহাযোগী গৌরীশঙ্কর মহারাজকে দাদাজি দেখেছেন কিনা, একবার কেউ একজন উনাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন। উনি শিশুর ন্যায় সরলতামাখা হাসি নিয়ে তাকে বলেছিলেন “ম্যায় উসিকা হি বেটা হুঁ। কেবল দেখা-হি নেহি, নর্মদামাইকী সাথ বাতচিত করতে হয়ে দেখা। উস্ দোনো কে বিচ পিতা অউর বেটিকা রিস্তা থা। হাজার সাল কি উমর মে নর্মদা কিনারে উসনে আপনা শরীর ত্যাগ দিয়া।”

দাদাজির শিষ্য বললেন, “জ্ঞানগঞ্জের অবস্থান থেকে আরম্ভ করে জ্ঞানগঞ্জের আশপাশের বর্ণনা সবই লিপিবদ্ধ করেছেন দাদাজি। অনেক সাধু-মহাত্মারা যখন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন “জ্ঞানগঞ্জ কাঁহা হো?” তখন তার উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তিব্বতের মানস-সরোবরে অবস্থিত কৈলাস পর্বত। ওই পর্বতের পেছনদিকে ঈশান কোণে বরফাবৃত তিন দিনের হাঁটা পথ। চারিদিকে একাধিক বরফমোড়াশৃঙ্গ। পর্বতে ঘেরা আছে চারপাশ। ২১,০০০ থেকে ২২,০০০ ফিট উচ্চতার মধ্যে অবস্থিত এই সিদ্ধাশ্রম, জ্ঞানগঞ্জ। যার এক দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই আছে পর্বতারোহীদের যাতায়াতের পথ। পর্বতদ্বারা ঘেরা এই সিদ্ধাশ্রমকে আরও সুরক্ষিত করবার জন্য পর্বতগুলির বাইরের দিকে বলয়াকার সৃষ্টি করা হয়েছে আধ কিলোমিটার চওড়া মায়া কুয়াশার পরিবেশ। কারও পক্ষে এসকল ভেদ করে সিদ্ধাশ্রমে পৌঁছোনো সম্ভব নয়। আশ্রমের ভেতরের পরিবেশ অতি মনোরম। যোগবলে আশ্রম প্রাঙ্গণে যেমন ঠান্ডার প্রাবল্য হ্রাস করা হয়েছে, তেমনি এক আরামদায়ক আবহাওয়া সৃষ্টি করা হয়েছে। সেখানে বরফদ্বারা নির্মিত দেবী রাজরাজেশ্বরী পূজিত হন। ১৪০০ বৎসর বয়স্ক মহাতপা মহারাজ নিজ হাতে এই মূর্তি বানান। এই মহাযোগীর ললাটচর্ম ঝুলে গেছে। দৃষ্টিপথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে সে-কারণে ওনারই ললাটের সঙ্গে একটি বস্ত্রখণ্ড দিয়ে সেই ললাটচর্ম বাঁধা থাকে।

দাদাজি জানাচ্ছেন, “জ্ঞানগঞ্জে এরা ছাড়াও আছেন আদি শক্তির অংশ ১৪০০ বছরের ও বেশিবয়স্কা “ক্ষেপাই মা”। পরনে তাঁর কালো মেঘরাশির ন্যায় নিজমস্তকের বিশাল কেশরাশি। সেই কেশরাশিতেই তাঁর সমস্ত শরীর আবৃত। কেবল চরণ-যুগল, হস্তদ্বয় ও মুখমণ্ডল অনাবৃত। যেন ষোড়শী তরুণী।”

শিষ্য জানাল, দাদাজি এই জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে খুব একটা বেশি বলেন না। তা একবার আমাদের কায়াকল্প কী এবং কোথায় কীভাবে করা হয় সে বিষয়ে বলেছিলেন দাদাজি। আমরা শুনেছিলাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো। দাদাজির কথায়, “জ্ঞানগঞ্জে একটি নদী আছে। জলের পরিবর্তে তাতে গন্ধক প্রবাহিত হয়। ওই নদীর পাড়ে জড়িবুটির সাহায্যে কায়াকল্পের ব্যবস্থা করা হয়। যিনি কায়াকল্প করতে ইচ্ছুক তাঁর সর্বাঙ্গে প্রথমে জড়িবুটির প্রলেপ দেওয়া হয়। দেহ ক্রমে প্রাণহীন অবস্থা প্রাপ্ত হয়। তিন দিন পর ওই দেহে পুনরায় প্রাণের সঞ্চার হয়, কিন্তু অবয়বগতভাবে সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে যায়।”

ক্রিয়াযোগ সম্পর্কেও আমাদের একবার বলেছিলেন দাদাজি। দাদাজির কথায়, “ক্রিয়াযোগের ১০টি ধাপ। খুবই কঠিন। এই যোগে সিদ্ধপুরুষ পার্থিব দেহকে অসংখ্য খণ্ডে বিভক্ত করে যেমন ছড়িয়ে দিতে সক্ষম, তেমনি সমস্ত খণ্ডগুলি একত্র করে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারেন তিনি। এসবই তাঁর করায়ত্ত।” দাদাজি বারে বারে জানিয়েছেন ক্রিয়াযোগের অনুশীলন বেশ কঠিন, তাই ক্রিয়াযোগ সম্পর্কে জানলেও ক্রিয়াযোগ মার্গে হাঁটার ইচ্ছা ত্যাগ করতে হয়।

শিষ্য বলল, যোগের আসল অর্থ কী তা নিয়েও দাদাজি বিশদ জানিয়েছেন। দাদাজির কথায়,যোগের আসল অর্থ মন্ত্র। তাহলে এই প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক যে আসন, প্রাণায়াম, মুদ্রা, নৌলি, ধৌতি, যম, নিয়ম এগুলি তাহলে কী আর মন্ত্র কোথায় পাওয়া যায়? দাদাজির কথায় মন্ত্র বলতে দুপ্রকার মন্ত্র বোঝায় একটি বীজমন্ত্র আর অন্যটি ঈশ্বরমন্ত্র। বীজমন্ত্র দেওয়ার আধিকার আছে একমাত্র শুরুর। আর সাধারণ মন্ত্র বা ঈশ্বরমন্ত্র যে-কোনো ভক্ত তার মতো করে জপতে পারে।

দাদাজির ধ্যান তখনও ভঙ্গ হয়নি। ভোর হয়ে আসছিল। সারারাত মেলা ঘুরে একটু ক্লান্তি আসছিল। তাই দাদাজির দুই শিষ্যকে প্রণাম জানিয়ে বেরিয়ে এলাম টেন্ট থেকে।

.

এবার আর এক মহাত্মার কথায় আসি, জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে আলোচনা করলে তাঁর নাম আসা স্বাভাবিক। জ্ঞানগঞ্জের সেই সাধকের নাম স্বামী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংস। পূর্বাশ্রমের নাম ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়।

বর্ধমানের বন্ডুলগ্রামে জন্ম ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়ের। যিনি পরবর্তীকালের যোগীরাজ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংস নামে পরিচিত হন। কৈশোরে তাঁকে কুকুরে কামড়ালে গ্রামে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় চন্দননগরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় চিকিৎসার জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাতেও কোনো উপকার না পাওয়ায় তিনি হুগলিতে যান। সেখানে একদিন দেখেন এক জটাজুটধারী সন্ন্যাসী নিরন্তর গঙ্গার জলে ডুবছেন এবং উঠছেন। সন্ন্যাসীর বেশ কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দেখতে পান ভোলানাথ। সেই সন্ন্যাসী নাকি জ্ঞানগঞ্জের সন্ন্যাসী। নাম, পরমহংস নীমানন্দ স্বামী। সন্ন্যাসী শুধুমাত্র স্পর্শ করে ভোলানাথকে সুস্থ করে দেন এবং কিছুদিনের মধ্যে তাঁকে এক অলৌকিক উপায়ে জ্ঞানগঞ্জে নিয়ে যান, যেখানে নীমানন্দের গুরু মহর্ষি মহাতপা, যাঁর বয়স ১২০০ বছরেরও অধিক, ভোলানাথকে দীক্ষাদান করেন এবং শিষ্যরূপে গ্রহণ করেন।

এক লেখক তাঁর লেখায় লিখছেন, এই স্থানটি এত গুপ্ত যে সুদীর্ঘকালেও চিন ব্রহ্মদেশ ও আসামের বারোজন ছাড়া আর কেউ এই স্থানের সন্ধান জানতনা। একজন গ্রিক পর্যটক তাঁর বইয়ে লিখেছেন যে এই মঠ বড়ো অদ্ভুত। এরকম স্থান পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। একে ‘হেভেন্ অন আর্থ’ বলা চলে। অন্যদিকে চিনাদের আগ্রহও কম নয় এই জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে। এর কথা বলেছেন চৈনিক ঐতিহাসিক ফেন গিলিয়ান। তিনি লিখছেন পর্বতবেষ্টিত একটি উপত্যকার মাঝে সাত-আট মাইল জুড়ে বিস্তৃত এই আশ্রম। যার চতুর্দিকে আছে জলপূর্ণ পরিখা। মাঝেমধ্যে তা বরফ হয়ে যায়। যাতায়াতের জন্য আছে একটি ধনুকের মতো সেতু। আশ্রমটি শিক্ষার ক্রম অনুসারে স্তরে স্তরে সাজানো। এখানে থাকেন ব্রহ্মচারী যুবক, ব্রহ্মচারিণী, বিজ্ঞান-শিক্ষার্থী এবং মহাশক্তিশালী সিদ্ধ পরমহংসগণ।”

ভারতীয় যোগমার্গে বিশুদ্ধানন্দ পরমহংসদেব এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর অসাধারণত্ব প্রকাশ পেয়েছে বিশেষ দুটি কারণে—এক দীর্ঘ কুড়ি বছরের নিরলস সাধনার দ্বারা কাশীতে নরমুণ্ডি আসনের প্রতিষ্ঠা এবং দ্বিতীয়ত সূর্যবিজ্ঞানের জন্য। সূর্যবিজ্ঞান বলতে কিন্তু আজকের সোলার সায়েন্স নয়। এই সূৰ্যবিজ্ঞান হল জগৎে প্রচলিত অতি প্রাচীন ব্রহ্মবিদ্যা এবং এই বিদ্যার দ্বারা করা যায় না, এমন কিছু জগতে প্রায় বিরল। বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি বিশুদ্ধানন্দ পরমহংসদেবের কাছে সূর্যবিজ্ঞানের প্রয়োগ দেখেছেন। তারা দেখেছেন কীভাবে তিনি এক বস্তুকে আর এক বস্তুতে রূপান্তরিত করছেন। গন্ধের দ্বারা বলে দিতে পারছেন ভবিষ্যৎ। একাধিক ঘটনা চাক্ষুষ দর্শন করে বহু লেখক সাংবাদিক সে-যুগের বিভিন্ন সমসাময়িক পত্রপত্রিকাতে এই বিষয়ে লেখালেখি করেন। পরমহংসদেবের ইচ্ছা ছিল একটি সূর্যবিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করবার, যার দ্বারা যে-কোনো রোগের নিরাময় সম্ভব হত। এই কাজে তিনি অনেকদূর এগিয়েও ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর গুরুদের হস্তক্ষেপে তাঁর প্রচেষ্টা অসফল হয়। নরমুক্তি আসনের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যও ছিল জগতের হিতসাধন। নরমুণ্ডি আসনের তত্ত্ব অতি গূঢ় এবং বহু বহু অসাধারণ শাস্ত্রবিদদেরও বোধের অগম্য। স্থূল দৃষ্টিতে বলা যায় যে শক্তিদেবীর কাছে নরমুণ্ডির আসনে বসে সকাম ও নিষ্কাম উভয় প্রকার কর্মজনিত প্রার্থনা করলে তাতে সফল হওয়া যায়।

বিশুদ্ধানন্দজীর জীবন ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখতে পাওয়া যায় যে তিনি যোগমার্গের এক পরিশ্রমী সাধক ছিলেন। তিনি বরাবরই তাঁর শিষ্যদেরও কর্মের ওপর জোর দিতে বলতেন। কর্ম বলতে যোগক্রিয়ার কথাই বলতেন। কর্ম ও কৃপা একে অপরকে আশ্রয় করে থাকে—এই হল শাস্ত্রের অভিমত। কিন্তু বিনা কর্মে কৃপার দেখা মেলে না। ‘অহৈতুকী’ নামে একধরনের কৃপার উল্লেখ আছেশাস্ত্রে কিন্তু তারও মূলে আছে কর্ম আছে। গুরু আদেশের অমান্যতায় বিশেষ দুর্গতি হয়। তাই বাবাজি আদেশের পরিবর্তে উপদেশ দিতেন। তাঁর মাতৃভক্তি ছিল অসাধারণ অতি বাল্যকালেই তিনি তাঁর পিতাকে হারিয়ে জননী মা রাজরাজেশ্বরী দেবীর স্নেহে ও মমতায় বড়ো হয়ে উঠতে থাকেন। বাবাজির চরিত্রের বহুবিধ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একদিকে যেমন ছিল তাঁর অসাধারণ মাতৃভক্তি, ঠিক তেমনই অন্যদিকে ছিল তাঁর গুরুবর্গের প্রতি আজীবন প্রতিটি আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলবার অনন্যসাধারণ প্রয়াস। জ্ঞানগঞ্জের এক অতি প্রাচীন মহাত্মা—মহর্ষি মহাতপা ছিলেন তাঁর দীক্ষাদাতা গুরু। মহর্ষি মহাতপার এক শিষ্য ভৃগুরামের তত্ত্বাবধানে বালক ভোলানাথের যোগশিক্ষা চলতে থাকে এবং জ্ঞানগঞ্জেরই অপর এক পরমহংস শ্রী শ্রী শ্যামানন্দ পরমহংসদেবের তত্ত্বাবধানে তাঁর সূর্যবিজ্ঞানের শিক্ষা চলতে থাকে।

বিশুদ্ধানন্দ তীর্থস্বামী অবস্থায় গার্হস্থ্যাশ্রমে প্রবেশ করেন। তারপরগুরু মহর্ষি মহাতপা পরমহংসদেবের নির্দেশে বিবাহ করে সংসারে মনোযোগ দেন। গুরুবর্গের নির্দেশানুসারে এইসময়ে তিনি সংসার প্রতিপালনের জন্যে চিকিৎসা এবং যাগজ্যোতিষের চর্চা করতেন। বাবাজি তাঁর যোগদৃষ্টিতে রোগের মূল সহজেই বুঝতে পারবার কারণে রোগীদের সকলেই নিরাময় লাভ করতেন। যেসব রোগীর বাঁচার উপায় ছিল, তাদের চিকিৎসার ভার তিনি গ্রহণ করতেন না। ‘যোগজ্যোতিষ’ জ্ঞানগঞ্জের বহুবিধ প্রদত্ত শিক্ষার মধ্যে একটি। নির্ভুলভাবে ভবিষ্যতের কথা বলে দেওয়া সম্ভব একমাত্র যোগজ্যোতিষের দ্বারা।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, তাঁর গুরু মহর্ষি মহাতপা, বাবাজিকে দীর্ঘ সাধনার অস্তে সংসার জীবনে প্রবেশ করতে আদেশ করেন ও সংসার প্রতিপালনের জন্য চিকিৎসা এবং যোগজ্যোতিষের চর্চা করতে বলেন।

এরকম একের পর এক সাধু যোগী মহাত্মা থেকে আধুনিক লেখক সাহিত্যিক অনেকেই যুগের পর যুগ ধরে এই জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার গোপনে ব্যবসাও ফেঁদেছেন। সাধুর বেশে জ্ঞানী মহাত্মা সাজিয়ে শাম্ভালার পথপ্রদর্শক সাজিয়ে ট্রাভেল ব্যাবসা চালাচ্ছেন। পাহাড়ের কর্পোরেট যোগী দামি জুতো দামি ঘড়ি পরে সাধক মহারাজ জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে যাচ্ছেন। সবাইকে তিনি গোপনে একই গল্প শোনান, “তিনি গেছেন। বড়ো দুর্গম সে পথ। সারাজীবনে কত কষ্টের ফল তার জ্ঞানগঞ্জদর্শন। উনি আপনাকে নিয়ে গিয়ে কৃতার্থ করছেন।”

তবে দীর্ঘ গবেষণার পর একটা বিষয় খুব স্পষ্ট যে জ্ঞানগঞ্জকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে একটা সময় একদল সাধুর আবির্ভাব হয়েছিল যাদের আদি গুরু ছিলেন মহাবতার বাবাজি আর তাকে ঘিরেই বিশুদ্ধানন্দ পরমহংস থেকে শ্যামাচরণ লাহিড়ী অনেকের নাম এসেছে। আশ্চর্যের বিষয় এই জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে চর্চাকারী সাধকদের বেশিরভাগজনই গৃহী সাধক

জ্ঞানগঞ্জ থেকে আরম্ভ করে এই স্থান নিয়ে চর্চাকারী সাধকগণ এবং তাঁদের সাধন পদ্ধতির পুরোটাই ধোঁয়াশায় ঘেরা। হিন্দু এবং বৌদ্ধদের কাছে তাই জ্ঞানগঞ্জ আজও এক অলৌকিক রহস্যে ঘেরা জগৎ। হয়তো তাই মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের সবার মনের মধ্যেই আছে জ্ঞানগঞ্জ। আত্মিক জ্ঞান, আধ্যাত্মিক জ্ঞানই আপনাকে আত্মোপলব্ধির দ্বারা পৌঁছে দিতে পারে জ্ঞানগঞ্জে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *