মহাভারতের সেই ‘স্বর্গের সিঁড়ি’র খোঁজে

মহাভারতের সেই ‘স্বর্গের সিঁড়ি’-র খোঁজে

মহাভারতে মহাপ্রস্থানের যে পথে যুধিষ্ঠির গিয়েছিলেন সেই পথের খোঁজ ধরে আমরা যাব স্বর্গের সেই সিঁড়ি খুঁজতে। উত্তরাখণ্ড দেবভূমি। আর পাণ্ডবদের সেই পথ অনুসরণ করে এই উত্তরাখণ্ডের সতপন্থের পথে যাব আমরা। সতপন্থের পথে যাওয়ার আগে আমরা একটু মহাভারতের মহাপ্রস্থানের পথে পর্বটা একটু ঝালিয়ে নিই।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর যুধিষ্ঠিরের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকায় চলে গেলেন। ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে যদুবংশ ধ্বংসকাল শুরু হয়ে গেল। বলরাম যোগাসনে বসে দেহত্যাগ করলেন। গান্ধারীর অভিশাপ অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণও জরাব্যাধের তিরের আঘাতে দেহত্যাগ করলেন।

দারুক সারথির মাধ্যমে খবর পেয়ে অর্জুন দ্বারকায় পৌঁছোলেন। গিয়ে দেখলেন শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম দুই ভাই-ই দেহত্যাগ করেছেন। শ্রীকৃষ্ণের পারলৌকিক ক্রিয়া অর্জুন নিজে সম্পন্ন করলেন এবং হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেন।

আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও শ্রীকৃষ্ণের শোকে পাণ্ডবদের আর রাজ্য শাসনের কথা মনে ছিল না। যুধিষ্ঠিরের পরামর্শে সবাই ঠিক করলেন যে তাঁরা মহাপ্রস্হানে যাবেন। দ্রৌপদীর জেদে অগত্যা তাঁকেও সঙ্গে নিতে হল।

পরীক্ষিতের হাতে রাজ্যভার দিয়ে স্বর্গপথে রওনা হলেন পাণ্ডবরা। পূর্বমুখে তাঁরা অগ্রসর হলে অগ্নিদেব এসে পথ রোধ করে কিছু খাদ্য চাইলে অর্জুন তাঁর গাল্ডিব ধনুকসহ সব দিব্য অস্ত্র অগ্নিকে দিয়ে দিলেন।

তারপর একের পর এক বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, নদী অতিক্রম করে পাণ্ডবেরা মেঘনাদ পর্বতে গেলেন। সেখানে দানবদের যুদ্ধে পরাস্ত করে তাঁরা কেদার পর্বতে আরোহণ করলেন। তারপর উত্তরমুখে রওনা হলে পথে এক ভীষণা রাক্ষসী তাঁদের পথ আটকালে ভীম অবলীলাক্রমে রাক্ষসীকে নিপাত করেন। পাণ্ডবরা ভদ্রকালী পর্বতে এলে এখানকার কালীমূর্তি ভদ্রকালী যুধিষ্ঠিরকে বর প্রার্থনা করতে বললে যুধিষ্ঠির জোড়হাতে কালীর নিকট কলিকালে জাগ্রত থাকার বর চাইলে মা কালী বললেন, তথাস্তু।

এর পর তাঁরা হরিপর্বতে গেলে সেখানকার হিমশীতল পরিবেশে প্রচণ্ড ঠান্ডায় দ্রৌপদী কাহিল হয়ে পড়লেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দেহত্যাগ করলেন। ভীম তা দেখে যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করলেন, “কোন পাপে দ্রৌপদীর মৃত্যু হল?” ধর্মরাজ উত্তরে ভীমকে বললেন, “পঞ্চস্বামীর মধ্যে অর্জুনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বেশি থাকার পাপে দ্রৌপদীর মৃত্যু হল।”

আবার শুরু হল তাদের পথচলা। বদরিকাশ্রমে গিয়ে তাঁরা দেখা পেলেন দ্রোণপুত্র অমর অশ্বত্থামার। সেখানে কিছুকাল বিশ্রামের পর সহদেবের মৃত্যু হল। ভীম আবার যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করলেন, “জ্যোতিষীরূপে ভাই সহদেবের ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান সবই জানা ছিল। তাও সে কেন মারা গেল?”

উত্তরে যুধিষ্ঠির বললেন, “পাশা খেলায় আমাদের হার হবে জেনেও সে আমাদেরকে সাবধান করেনি। বারণাবতে আমাদের পুড়িয়ে মারা হবে জেনেও আমাদের সতর্ক করে দেয়নি—এই ছিল তার পাপ।”

এর পর তাঁরা গেলেন চন্দ্রকালী পর্বতে। সেখানে নকুলের মৃত্যু হল। পরবর্তী বিশ্রামস্হল নন্দীঘোষ পর্বতে অর্জুন দেহত্যাগ করলেন। ভীম জানতে চাইল নকুল আর অর্জুনের মৃত্যুর কারণ। প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠির বললেন-“কর্ণের সঙ্গে যখন আমার যুদ্ধ হয় তখন নকুল আমার কাছে ছিল। কিন্তু আমি যুদ্ধ করতে করতে দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম দেখেও আমার সাহায্যে সে অগ্রসর হয়নি। এই ছিল তার পাপ।” আর অর্জুনের পাপ হল-“সে আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসত দ্রৌপদীকে। আর সব কিছুকে ও হেয় জ্ঞান করত।”

চলতে চলতে এর পর সোমেশ্বর পর্বতে মৃত্যুবরণ করলেন ভীমসেন। হাহাকার করতে লাগলেন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। এক এক করে স্মরণ করতে লাগলেন ভীমের বীরত্ব কাহিনি। তারপর তাঁর মনে হল ভীম এতক্ষণ তাকে জিজ্ঞেসা করছিল কে কোন পাপে মারা গেল, কিন্তু ভীম কেন মারা গেল? অমনি ধর্মরাজের মনে পড়ল-পৃথিবীর যাবতীয় খাদ্যবস্তুর ওপর প্রচুর লোভ ছিল ভীমের। খাবার জিনিস দেখলে সে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারত না। খাবারের লোভই কাল হল ভীমের।

এবার ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির একা ধীরে ধীরে স্বর্গের পথে অগ্রসর হতে লাগলেন। আর তার সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল একটি কুকুর। গন্ধর্ব পর্বত আরোহণের সময় হিমালয়বাসী মুনি-ঋষিগণ এক এক করে দেখা করতে আসলে তিনি প্রত্যেককে প্রণাম করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করলেন।

এইভাবে চলতে চলতে স্বর্গের দ্বারদেশে উপনীত হলেন যুধিষ্ঠির। দ্বারপাল দেবরাজ ইন্দ্রকে সংবাদ দিলে ইন্দ্র রথ নিয়ে এলেন। কিন্তু দেবরাজের কি ইচ্ছা হল, তিনি একবার যুধিষ্ঠিরকে পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন। এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে তিনি যুধিষ্ঠিরের সামনে উপস্থিত হলেন।

কুকুরের রূপ ধরে ধর্ম ব্রাহ্মণকে কামড়াতে গেলে ব্রাহ্মণ হাতের লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে কুকুরটিকে প্রহার করলেন। তখন কুকুররূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে ব্রাহ্মণের প্রহার থেকে তাঁকে উদ্ধার করতে বললেন। তখন যুধিষ্ঠির হাতজোড় করে কুকুরটিকে না মারতে বলায় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের রাগ আরও বেড়ে গেল। ব্রাহ্মণ রেগে কুকুরটিকে বললেন, “আজ আমার হাত থেকে তোর পরিত্রাণ নাই।” যুধিষ্ঠির তখন কুকুরটির প্রাণভিক্ষা চেয়ে তার সঞ্চিত পুণ্যের অর্ধেক ব্রাহ্মণকে দান করলেন।

ব্রাহ্মণ আশ্চর্য হয়ে গেল যুধিষ্ঠিরের মহানুভবতা দেখে। যুধিষ্ঠির এও জানিয়ে দিলেন তিনি স্বর্গে গেলে তার সঙ্গে কুকুরটিও যাবে। কারণ হিসেবে যুধিষ্ঠির জানিয়ে দেন এই কুকুরটি শেষ অবধি তার সঙ্গে এসেছে। সে তার শরণাগত। তিনি তাকে ছাড়তে পারবেন না। যুধিষ্ঠির জানান কুকুরটির জন্য যদি তাকে মর্ত্যে থেকে যেতে হয়তো তিনি তার জন্যও প্রস্তুত। যুধিষ্ঠির ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, তখন ধর্ম নিজের রূপধারণ করল। নিজের পরিচয় দিলে যুধিষ্ঠির তৎক্ষণাৎ তাঁর চরণে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম জানালেন। ধর্ম বললেন, “বৎস তুমি আমার পুত্র। আমার ঔরসে কুন্তীর গর্ভে তোমার জন্ম।” ততক্ষণে পাশে দাঁড়ানো একজনের দিকে চেয়ে বললেন, “ইনি দেবরাজ ইন্দ্র। ইনি রথ নিয়ে এসেছেন তোমাকে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য। পদব্রজে অনেক ক্লেশ সহ্য করেছ তুমি। পুত্র, এবার রথে আরোহণ কর।” দেবরাজ ইন্দ্রের ইঙ্গিতে সারথি রথ নিয়ে এলে সকলে তাতে আরোহণ করে স্বর্গাভিমুখে অগ্রসর হলেন। স্বর্গপুরে বিরাট সংবর্ধনার মধ্যে যুধিষ্ঠিরকে স্বাগত জানানো হল।

সশরীরে একমাত্র যুধিষ্ঠিরই স্বর্গে গিয়েছিলেন। আমরা যুধিষ্ঠিরের পথ ধরেই হাঁটব। এখন স্বর্গের পথে যাওয়া যাক।

.

সেই চিরপরিচিত হরিদ্বার। হড় কি পৌরি ঘাটে সন্ধ্যারতি দেখে সেই রাতটা হরিদ্বারে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ুন বদ্রীনাথের পথে। হৃষীকেশ লছমনঝুলা, রামলা হয়ে একে একে পার হয়ে যান দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ। রুদ্রপ্রয়াগ থেকে রাস্তা দুভাগে ভাগ হয়ে যায়, একটি যাচ্ছে কেদারনাথের দিকে। অন্যটি বদ্রীনাথের দিকে। আমরা যাব বদ্রীনাথের পথে। এই পথে আপনাকে সবমিলিয়ে পার হতে হবে পাঁচটি প্রয়াগ। দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ ও শেষে বিষ্ণুপ্রয়াগ।

পঞ্চপ্রয়াগ অতিক্রম করতে করতে অলকানন্দার গা বেয়ে পৌঁছে যান বদ্রীনাথ। হরিদ্বার থেকে ঘণ্টা পাঁচেকের পথ। দূরত্ব জাতীয় সড়ক-৫৮ ধরে প্রায় ২৭৬ কিমি। হরিদ্বার-হৃষীকেশ-দেবপ্রয়াগ-শ্রীনগর-রুদ্রপ্রয়াগ-কর্ণপ্রয়াগ -চামোলি-গোপেশ্বর হয়ে জোশীমঠ। মাঝেমধ্যে শুধু একটু যাত্রাবিরতি। রাস্তার ধারে কিছু খেয়ে নিন। আপনি চাইলে জোশীমঠে একটা দিন থেকে যেতেও পারেন।

গাড়োয়াল হিমালয়ের কোলে উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার এক পবিত্র শহর জোশীমঠ। পাহাড়ি এই শহরটি সাগরপৃষ্ঠ থেকে ৬১৫০ ফুট উচ্চতায়। আগে অঞ্চলটির নাম ছিল জ্যোতির্মঠ। পরে লোকমুখে হয়ে যায় জোশীমঠ। জ্যোতির্মঠ হল ‘উত্তরামণ্য মঠ’ বা বলা যেতে পারে উত্তরের মঠ। আদি শঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত চার মঠের মধ্যে অন্যতম। আদি শঙ্করাচার্য ভারতের চারপ্রান্তে চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জোশীমঠ, পুরী, দ্বারকা ও শ্রীনগিরি।

আদি শঙ্করাচার্যের সনাতন নীতি মতে জ্যোতির্মঠ হল বেদের অথর্ববেদ’। কথিত আছে আদি গুরু শঙ্করাচার্য উত্তরাখণ্ড যাত্রাকালে প্রথম পৌঁছোন জোশীমঠ। শঙ্করাচার্যের আশ্রমের নামও তাই জ্যোতির্মঠ। এখানেই শঙ্করাচার্য ব্যাসমুণির বেদান্ত দর্শনের ওপর ভাষ্য দেন। এখান থেকেই শঙ্করাচার্য বদ্রীনারায়ণ ধাম দর্শনের জন্য রওনা হন। সেখানে পৌঁছে বদ্রীনারায়ণ শিলার ওপর মূর্তি এবং মন্দির স্থাপন করেন।

জোশীমঠ ব্যস্ত পাহাড়ি শহর। খুবই প্রাচীন শহর। কার্তিকেয় পুরাণেও জোশীমঠের উল্লেখ পাওয়া যায়। পার্বতীপুত্র কার্তিকের নামে এই শৈল শহরটির নাম ছিল কার্তিকেয়পুরা। ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন বৃক্ষ ‘কল্পবৃক্ষ’ গাছটিরও সন্ধান পাওয়া যায় এই জোশীমঠেই। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে ১২০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই কল্পবৃক্ষটি।

অলকানন্দা ও ধৌলিগঙ্গার অপরূপ মিলিত রূপ প্রকাশ পেয়েছে জোশীমঠে। চারপাশে হিমালয়ের উদাত্ত প্রকৃতি। সুউচ্চ গিরিশোভিত দৃশ্যপট আর নদীসংগমের দিকে তাকিয়ে শুধু অপার মুগ্ধতায় চেয়ে থাকা।

জোশীমঠে প্রচুর দেবদেবীর মন্দির, আছে। হনুমান, গৌরীশঙ্কর, গণেশ, সূর্য, নৌ-দেবীর মন্দির রয়েছে। অষ্টম শতকে নির্মিত আদি শঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত মঠটি উত্তর ভারতের প্রসিদ্ধ মঠ। এখানে বদ্রীনারায়ণ ও রাজেশ্বরী দেবীর মন্দিরও রয়েছে। অদূরে একটি পবিত্র গুহার সন্ধান পাওয়া যায়। কথিত আছে সেই গুহায় আদি শঙ্করাচার্য তপস্যা করতেন। ভগবান বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার তথা নরসিংহরূপী নারায়ণমূর্তি সংবলিত উল্লেখযোগ্য মন্দির নরসিমা মন্দির। শতাব্দী প্রাচীন মন্দির। এখানে নরসিমা ভগবানের মূর্তিটির দক্ষিণ হস্ত চুলের মতো সরু। জনশ্রুতি, এমন একটা সময় আসবে যখন সেটি ভেঙে বা নষ্ট হয়ে যাবে—তখন বদ্রীনাথের কাছে জয় বিজয় পর্বত দুটিও ধূলিসাৎ হবে এবং বদ্রীনাথধামের বদ্রীনারায়ণ মূর্তিটিও অদৃশ্য হয়ে যাবে বর্তমান মূল মন্দির থেকে। প্রবল তুষারপাত ও শৈত্যর দিনে যখন বদ্রীনারায়ণ মন্দির বন্ধ থাকে ছ’মাসের জন্য—সেই সময়টুকু এই নরসিংহ মন্দিরেই ভগবান বদ্রীনারায়ণের পুজো অনুষ্ঠিত হয়। জোশীমঠকে সেই জন্য বদ্রীনারায়ণের ‘শীতকালীন প্রার্থনাস্থলও’ বলা হয়ে থাকে।

স্থানীয় পুরোহিত ও ধর্মগুরু সম্প্রদায় মনে করেন, ভবিষ্যতে যখন বদ্রীনারায়ণ মন্দিরটি থাকবে না, তখন জোশীমঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে কালো কষ্টিপাথরে নির্মিত শালগ্রাম শিলার আদলে ‘ভবিষ্য বদ্রী’ হিসেবে পুন:প্রতিষ্ঠিত হবে। স্থানীয় জনগণের বিশ্বাস, বর্তমান কেদারধামের মূর্তিও একদিন অনুরূপ ভাবেই অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং ‘ভবিষ্য কেদার মন্দির’ নামে এই স্থানে পুনর্জন্ম হবে ছোটো এক শিবলিঙ্গ হিসেবে।

স্থানীয়রা হিন্দিতে কথা বললেও স্থানীয়দের উচ্চারণে গাড়োয়ালি টান রয়েছে। প্রচুর হোটেল, রিসর্ট, দোকানপাট, মন্দির নিয়ে জমজমাট জোশীমঠ। এখান থেকেই বদ্রীনাথধাম এবং গুরুগোবিন্দ ঘাটের ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার জাতীয় উদ্যানে যাওয়ার সড়কপথ। পাহাড় সংলগ্ন হোটেলগুলির অবস্থানও বেশ সুন্দর। প্রায় প্রতিটি হোটেলের ঘরের জানালা বা বারান্দা থেকেই হিমালয়ের চুড়ো দৃশ্যমান।

জোশীমঠ থেকে প্রায় মাইল দশেক দূরে আছে তপোবন। এই মনোরম অঞ্চলটির কথা অনেকেই জানেন না। প্রাকৃতিক একটি উষ্ণ প্রস্রবনও আছে সেখানে। তপোবনের সামনেই প্রবাহিত ধৌলিগঙ্গা। অসামান্য তার রূপ। এই পাহাড়ি শহরাঞ্চলগুলিতে কিছুটা বেশি সময় পর্যন্ত সূর্যালোক থাকে। তার পরই হঠাৎ করে নামে অন্ধকার। রাতের জোশীমঠ মায়াবী। দূরের জনপদের আলোগুলো জানান দেয় তার অস্তিত্বের রাতে জোশীমঠ একেবারে নিরালা নিঝুম এক চুপকথার শহর।

পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা ঘরবাড়ির ভেতর জ্বলা আলোগুলোকে জোনাকি বলে মনে হয়।

ভারতীয় সেনা ১৯৬২ সালের ইন্দো-চায়না যুদ্ধের সময় থেকেই বদরিকাশ্রম তথা এই পুরো গন্ধমাদন রেঞ্জের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন।

তীর্থমাহাত্ম্যের দিক থেকে বদ্রীনাথ সর্বশ্রেষ্ঠ। উত্তরাখণ্ডের চারধামের অন্যতম এই বদ্রীনাথ। বাকি তিনটি ধাম হল কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী ও যমুনেত্রী। উত্তরপ্রদেশের গাড়োয়াল জেলায় অবস্থিত বদ্রীবিশাল। কালো পাথরের তৈরি ভগবান বিষ্ণুর মূর্তি এখানে পদ্মাসনের ভঙ্গিতে রয়েছে। মন্দিরের সামনে দিয়ে বয়ে গিয়েছে অলকানন্দা ও পাশেই তপ্তকুণ্ড পঞ্চশীলা। অর্থাৎ নারদ, নৃসিংহ, বরাহ, গরুড়, ও মার্কণ্ডেয় এবং পঞ্চতীর্থ, যথা ঋষিগঙ্গা, কুর্মধারা, নারদকুণ্ড, প্রহ্লাদকুণ্ড ও তপ্তকুণ্ড মূল মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে। মন্দিরটি ১৫ মিটার উঁচু।

তবে বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলিতে এই মন্দিরের প্রধান দেবতা বদ্রীনাথের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার থেকে অনুমান করা হয় যে বৈদিক যুগে এই মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল। কয়েকটি উপাখ্যান অনুসারে, এই মন্দিরটি খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত একটি বৌদ্ধ ধর্মক্ষেত্র ছিল। নবম শতাব্দীতে আদি শঙ্কর এটিকে একটি হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করেন। এই মন্দিরের স্থাপত্য বৌদ্ধবিহারগুলির স্থাপত্যের অনুরূপ। মন্দিরের সুচিত্রিত প্রবেশদ্বারটিও বৌদ্ধ মন্দিরের একটি বৈশিষ্ট্য। তা দেখেই কেউ কেউ এই মত প্রকাশ করেছেন।

অন্য মতে, নবম শতাব্দীতে আদি শঙ্করই প্রথম বদ্রীনাথকে একটি তীর্থস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, ৮১৪ থেকে ৮২০ সাল পর্যন্ত ছ’বছর তিনি এই অঞ্চলে বাস করেছিলেন। বছরে ছ’মাস তিনি বদ্রীনাথে ও বাকি ছয়মাস কেদারনাথে থাকতেন। হিন্দুরা আরও মনে করে যে, বদ্রীনাথের মূর্তিটি তিনিই অলকানন্দা নদী থেকে উদ্ধার করে তপ্তকুণ্ড উষ্ণ প্রস্রবণের কাছের মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে, পারমার রাজা কনক পালের সাহায্যে আদিশঙ্কর এই অঞ্চলের সকল বৌদ্ধদের বিতাড়িত করেছিলেন। রাজার বংশধরেরা বংশানুক্রমে এই মন্দিরের দেখাশোনা করতেন এবং মন্দিরের খরচ নির্বাহের জন্য কয়েকটি গ্রাম দান করেছিলেন। মন্দিরের পথের গ্রামগুলি থেকে যে আয় হত তা দিয়ে তীর্থযাত্রীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হত। পারমার শাসকদের ‘বোলন্দা বদ্রীনাথ’ অর্থাৎ, ‘কথা-বলা বদ্রীনাথ’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তাদের অন্যান্য উপাধি ছিল ‘ধর্মবিভব’ ও ‘ধর্মরক্ষক শিরোমণি’।

বদ্রীনাথের সিংহাসনটি প্রধান দেবতার নামাঙ্কিত। ভক্তেরা মন্দিরে যাওয়ার আগে রাজার কাছে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত এই প্রথা চালু ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে গাড়ওয়ালের রাজা বদ্রীনাথের মূর্তিটি বর্তমান মন্দিরে সরিয়ে আনেন। গাড়ওয়াল রাজ্য দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলে বদ্রীনাথ মন্দির ব্রিটিশদের অধীনে আসে। তবে গাড়ওয়ালের রাজা মন্দিরের ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে যান।

প্রাচীনকাল থেকে এই মন্দিরটিকে বহুবার মেরামত করতে হয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে গাড়ওয়ালের রাজারা মন্দিরটিকে প্রসারিত করেন। ১৮০৩ সালের হিমালয়ের ভূমিকম্পে মন্দিরটি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর জয়পুরের রাজা এটিকে পুনর্নির্মাণ করেন। ২০০৬ সালে রাজ্য সরকার বদ্রীনাথ-সংলগ্ন এলাকায় কোনো রকম নির্মাণকাজ আইনত নিষিদ্ধ করে দেয়।

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, এই স্থানে বিষ্ণু ধ্যানে বসেছিলেন। হিমালয়ের একটি অঞ্চলে মাংসভুক সন্ন্যাসী ও অসাধু লোকজন বাস করত। এই স্থানটি তার থেকে দূরে ছিল বলে বিষ্ণু ধ্যানের জন্য এই স্থানটিকে নির্বাচিত করেন। ধ্যানের সময় বিষ্ণু এখানকার দারুণ শীত সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তার স্ত্রী লক্ষ্মী একটি বদ্রী গাছের আকারে তাকে রক্ষা করেন। লক্ষ্মীর ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু এই অঞ্চলের নাম দেন বদরিকাশ্রম। বিখ্যাত ব্রিটিশ গবেষক আটকিনসনের মতে, এই অঞ্চলে এক সময় একটি বদ্রী গাছের জঙ্গল ছিল। কিন্তু সেই জঙ্গল আজ আর দেখা যায় না। এই মন্দিরের বদ্রীনাথ-রূপী বিষ্ণুর মূর্তিটি পদ্মাসনে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। পুরাণ অনুসারে, এক ঋষি লক্ষ্মীকে বিষ্ণুর পদসেবা করতে দেখেন। তাই দেখে তিনি বিষ্ণুকে তিরস্কার করেছিলেন। সেই জন্য বিষ্ণু বদ্রীনাথে এসে দীর্ঘ সময় পদ্মাসনে বসে তপস্যা করেছিলেন।

বিষ্ণুপুরাণে বদ্রীনাথের উৎপত্তি সম্পর্কে আর একটি উপাখ্যান পাওয়া যায়। এই উপাখ্যান অনুসারে, রাজা ধর্মের দুই পুত্র ছিল-নর ও নারায়ণ। এঁরা হিমালয়ে পর্বতরূপ ধারণ করেছিলেন। তাঁরা ধর্মপ্রচারে জন্য এই স্থানকে নির্বাচিত করেন এবং হিমালয়ের বিভিন্ন বৃহৎ উপত্যকাগুলিকে বিবাহ করেছিলেন। আশ্রম স্থাপনের জন্য উপযুক্ত জায়গার অনুসন্ধানে এসে তাঁরা পঞ্চবদ্রীর অন্যান্য চার বদ্রীর সন্ধান পান। যেগুলি হল: বৃধা বা বৃধবদী, যোগবদ্রী, ধ্যানবদ্রী ও ভবিষ্যবস্ত্রী। অবশেষে তারা অলকানন্দা নদী পেরিয়ে উষ্ণ ও শীতল প্রস্রবণের সন্ধান পান এবং এই স্থানটির নামকরণ করেন বদ্রীবিশাল।

পঞ্চবদ্রী নামে পরিচিত পাঁচটি বিষ্ণু মন্দিরের একটি হল বদ্রীনাথ মন্দির। পঞ্চবদ্রী হল: বদ্রীনাথের বিশালবদ্রী, পাণ্ডুকেশ্বরের যোগধ্যান বদ্রী, সুবেনে জ্যোতির্মঠ থেকে ১৭ কিমি দূরে অবস্থিত ভবিষ্যবদ্রী, জ্যোতির্মঠ থেকে ৭ কিমি দূরে বৃধবদ্রী ও কর্ণপ্রয়াগ থেকে ১৭ কিমি দূরে আদিবদ্রী। বদ্রীনাথ মন্দির হিন্দুদের পবিত্রতম চারটি তীর্থ ‘চারধাম’-এর অন্যতম। চারধাম তীর্থগুলি হল রামেশ্বরম, বদ্রীনাথ, পুরী ও দ্বারকা। যদিও এই মন্দিরের আদি ইতিহাস স্পষ্ট জানা যায় না, তবু অদ্বৈতবাদীরা আদি শঙ্করকে চারধামের প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন। আদি শঙ্কর ভারতের চার প্রান্তে চারটি মঠ স্থাপন করার সময় যে চারটি মন্দিরকে মঠের নিকটবর্তী মন্দির হিসেবে নির্বাচিত করেন সেগুলি হল: উত্তরে বদ্রীনাথে বদ্রীনাথ মন্দির, পূর্বে পুরীতে জগন্নাথ মন্দির, পশ্চিমে দ্বারকায় দ্বারকাধীশ মন্দির ও দক্ষিণে শৃঙ্গেরীতে সারদাপীঠ মন্দির।

সম্প্রদায়গত ভাবে চারধাম মন্দিরগুলি শৈব ও বৈষ্ণবদের মধ্যে বিভক্ত হলেও, সকল সম্প্রদায়ের হিন্দুরা চারধাম মন্দিরগুলিতে তীর্থ করতে যান। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত বদ্রীনাথ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রীকে বলা হয় ‘ছোটো চারধাম’। বিংশ শতাব্দীতে মূল চারধাম থেকে এই তীর্থগুলিকে আলাদা করার জন্য ‘ছোটো’ শব্দটি যুক্ত হয়। আধুনিক কালে এই তীর্থগুলিতে তীর্থযাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া ও এগুলিকে ‘হিমালয়ের চারধাম’ নামেও চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা গিয়েছে।

ভারতের চার প্রান্তে অবস্থিত চারধাম মন্দিরগুলিতে জীবনে অন্তত একবার তীর্থ করতে যাওয়া হিন্দুরা পবিত্র কর্তব্য মনে করেন। প্রথাগতভাবে, এই তীর্থযাত্রা পূর্বদিকে পূরী থেকে শুরু হয় হয় এবং রামেশ্বর ও দ্বারকা হয়ে বদ্রীনাথে পৌঁছায়।

মন্দিরের ঠিক নীচে তপ্তকুণ্ড নামে একটি উষ্ণ গন্ধক প্রস্রবণ রয়েছে। এটির ঔষধিগুণ আছে বলে মনে করা হয়। অনেক তীর্থযাত্রী মনে করেন, মন্দিরে যাওয়ার আগে এই কুণ্ডে স্নান করা আবশ্যক। এই প্রস্রবণের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ৫৫ সে. (১৩১ ফা); অন্যদিকে প্রস্রবনের বাইরে এই অঞ্চলের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ১৭ সে. (৬৩ ফা)-এর নীচে থাকে

বদ্রীনাথ মন্দিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হয়। নাম, ‘মাতা মূর্তি কা মেলা’। গঙ্গার পৃথিবীর অবতরণকে উপলক্ষ্য করে এই উৎসব আয়োজিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, বদ্রীনাথের মা গঙ্গাকে পৃথিবীর জনসাধারণের কল্যাণের জন্য বারোটি শাখায় ভাগ করে দিয়েছিলেন। তারই সম্মানে এই উৎসব পালিত হয়। যে স্থানে এই নদী প্রবাহিত হয়েছিল, তাই পবিত্র বদ্রীনাথ ভূমি নামে পরিচিত হয়

জুন মাসে বদ্রীনাথ ও কেদারনাথ মন্দিরে বদ্রী-কেদার উৎসব আয়োজিত হয়। আটদিন-ব্যাপী এই উৎসবে সারা হিমাচলের বিখ্যাত শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন।

বদ্রীনাথ মন্দিরের নিত্যপুজোর অঙ্গ প্রতিদিন সকালে মহাভিষেক, অভিষেক, গীতা পাঠ ও ভগবদ্‌পুজো। সান্ধ্যপুজোর অঙ্গ গীতগোবিন্দ ও আরতি। অষ্টোত্তরম্ ও সহস্ৰনাম প্রভৃতি বৈদিক শাস্ত্রপাঠও সকল অনুষ্ঠানের অঙ্গ। আরতির পর বদ্রীনাথের মূর্তি থেকে সকল অলংকার সরিয়ে নিয়ে চন্দন লেপন করা হয়। পরদিন নির্মাল্য দর্শন অনুষ্ঠানের সময় সেই চন্দন ভক্তদের দেওয়া হয় প্রসাদ হিসেবে। সকল অনুষ্ঠানই ভক্তদের সামনে পালিত হয়। উল্লেখ্য, কোনো কোনো হিন্দু মন্দিরে এই প্রথা নেই। সেখানে কিছু কিছু অনুষ্ঠান লোকচক্ষুর অন্তরালে পালিত হয়।

সাধারণত মিষ্টি ও শুকনো পাতা ভক্তদের প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের মে মাস থেকে পঞ্চামৃত প্রসাদ দেওয়ার প্রথা চালু হয়েছে। এই প্রসাদ স্থানীয়ভাবে তৈরি হয় ও স্থানীয় বাঁশের ঝুড়িতে করে দেওয়া শুরু হয়।

অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বিজয়াদশমীর পর শীতকালের জন্য মন্দির বন্ধ হয়ে যায়। মন্দির বন্ধ হওয়ার দিন একটি ‘অখণ্ড জ্যোতি’ নামে একটি ঘৃতপ্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, যেটি ছয় মাস টানা জ্বলে। সেই দিন ভক্ত ও মন্দিরের আধিকারিকদের সামনে প্রধান পুরোহিত বিশেষ পুজো করেন। বদ্রীনাথের মূর্তিটিকে কাল্পনিকভাবে মন্দির থেকে ৬৩ কিমি দূরে জ্যোতির্মঠের নৃসিংহ মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয়। এপ্রিল মাসে বসন্তপঞ্চমী তিথিতে মন্দিরটি আবার খুলে দেওয়া হয়। তীর্থযাত্রীরা মন্দির খোলার দিন মন্দিরে উপস্থিত হন অখণ্ড-জ্যোতি প্রদীপটিকে দেখার জন্য।

হিন্দুরা যেসব মন্দিরে তাদের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে পারলৌকিক ক্রিয়া সারেন, বদ্রীনাথ মন্দির সেগুলির অন্যতম। ভক্তেরা গর্ভগৃহে বদ্রীনাথের মূর্তিটি পুজো করেন এবং অলকানন্দা নদীতে স্নান করেন। লোকবিশ্বাস অনুসারে, মন্দিরের পুকুরগুলিতে স্নান করলে পাপ দূর হয়।

বদ্রীনাথ মন্দির দর্শন সেরে এবার যাওয়া যাক ভারতের শেষ গ্রাম ‘মানা’-র উদ্দেশে। মানা থেকেই শুরু হবে হেঁটে ভ্রমণ। মানা, বদ্রীনাথ থেকে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরত্বে। অলকানন্দার ওপর দিয়ে লোহার সেতু অতিক্রম করে এগিয়ে গেলে বাঁ দিকে পড়বে নারায়ণ পর্বত, ডানদিকে নীচে অলকানন্দা, আর নদীর ওপারে নরপর্বত।

‘মানা’ সম্পর্কে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। ‘মানা’ ভারতের শেষ গ্রাম। এখানে প্রচুর ভ্রমণার্থী আসেন। যারা বদ্রীনাথ দর্শনে আসেন তাদের কম-বেশি সবাই মানা যান। ‘মানা’ গ্রাম হলেও এখানকার জনবসতি বেশ ঘিঞ্জি। এখানকার অলিগলি যে-কোনো ছোটো শৈল শহরকেই মনে করিয়ে দেবে। মিনি তিব্বত বলতে পারেন। আর একটু গেলেই পৌঁছে যাবেন তিব্বতে।

‘মানা’-র ওপর দিয়ে আরও একটু এগিয়ে গেলে পৌঁছোনো যায় মানা পাস’। আর এখানে দেখা যায় বেশ কিছু বুগিয়াল। বুগিয়াল শব্দবন্ধটি গাড়োয়াল ভাষায় প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। ‘বুগিয়াল’ শব্দটির অর্থ হল ‘পশুচারণ ক্ষেত্র’।

মানা পার হলেই শুরু তিব্বত, তাই সাধারণ মানুষ, ভ্রমণার্থীর পাশাপাশি ভারতীয় সৈন্যদের আনাগোনা মুহুর্মুহু চোখে পড়ে এখানে।

‘মানা’-তেই অলকানন্দার সঙ্গে মিলিত হয়েছে সরস্বতী নদী। দুটি নদীর রং দুরঙের। অলকানন্দার জল ঘোলা আর সরস্বতীর সবুজ। এই দুই নদীর মিলনস্থল কেশব প্রয়াগ ‘ নামে পরিচিত।

যে সরস্বতী এলাহাবাদের প্রয়াগে অন্তঃসলিলা সেই সরস্বতী এখানে খরস্রোতা। প্রয়াগে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে সরস্বতীর নাম এলেও সরস্বতীকে দেখতে পাওয়া যায় না। সেই সরস্বতী এখানে ভয়াবহ। সরস্বতী নদীর ভয়াবহ গর্জন শুনে আপনার ভয় লাগতে পারে। কথিত আছে, পাণ্ডবদের অস্তিম যাত্রাপথের ওপরেই এই সরস্বতী নদী পড়ে এবং এর ভয়াবহতা পাণ্ডবগণের মনে আশঙ্কার সৃষ্টি করে, তখন মধ্যম পাণ্ডব ভীম একটিমাত্র পাথরের সাহায্যে সেতু নির্মাণ করেন, যা ‘ভীমপুল’ নামে আজও তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। মানা গ্রাম থেকে বসুধারা জলপ্রপাতের চড়াই রাস্তার ওপরই আছে এই পুল। এই পুলের ওপর দিয়েই পাণ্ডবগণ স্বর্গের পথে এগিয়ে যান। এই পথে অ্যাডভেঞ্চারের আশায় অনেক ভ্রমণার্থী বসুধারা জলপ্রপাত দেখতে যান।

এই ‘মানা’ গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে মহাভারতের রচয়িতা ব্যাসদেবের গুহা দেখতে পাওয়া যায়, যা ‘ব্যাসগুফা’ নামে পরিচিত। এই গুহাতেই বসেই ব্যাসদেব পুরো মহাভারতের কথা বলে যান। এর ঠিক ১০০ মিটার দূরত্বে গণেশ গুহা। যেখানে বসে সিদ্ধিদাতা গণেশ মহাভারত লিখেছিলেন। গণেশগুম্ফা’ নামেও পরিচিত, মহাভারতের লেখনী রূপ প্রদান করেন এই জায়গায় বসে শুনলে একটু চমকে যেতে পারেন।

ব্যাসদেব তাঁর ব্যাসগুফাতেই নাকি বেদকে চার ভাগে ভাগ করেন, তাই তাঁর নাম হয় ‘বেদব্যাস’।

প্রাচীন মুনি-ঋষিদের অদ্ভুত নানারকম ক্ষমতা থাকত তা নানা জায়গায় আপনারা পড়ে থাকবেন, কিন্তু যত বিচিত্র ধরনের ম্যাজিক যদি দেখতে চান তাহলে আপনাকে এই পথে যেতে হবে তবে। তবে অত্যন্ত সন্তর্পণে পথ চলবেন, অবশ্যই চোখ কান খোলা রাখবেন।

সতপন্থ’-র সমগ্র পথ যেমন আপনাকে দেবে প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য, তেমনই শিখিয়ে দেবে জীবনের কঠিন সত্যকে। আপনার ছোট্ট একটা ভুল পদক্ষেপ হতে পারে জীবনের শেষ পদক্ষেপ। এই ভেবে স্বর্গারোহনের পথে পা বাড়াবেন। কোনো খারাপ চিন্তা, বৈষয়িক ভাবনা মন মধ্যে আনবেন না। পরমাত্মা স্মরণ করে বেরিয়ে পড়ুন।

প্রথমেই আমরা যাব ‘লক্ষ্মীবন’। অলকানন্দাকে বাম দিক দিয়ে রেখে হাঁটতে থাকুন। মানাপাস অলকানন্দার ডান দিকে পড়বে। মানা থেকে লক্ষ্মীবনের দূরত্ব কমবেশি ৯ কিলোমিটার। চারিদিকে গমের খেত, তার চারপাশ পাথরের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। দুদিকে একটানা পাঁচিলের মধ্যে দিয়ে সরু পথ। লাইন দিয়ে, প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ফ্রেমবন্দি করতে করতে আমরা এগিয়ে চলেছি।

কিছুটা দূর এগোনোর পর দেখতে পাবেন একটি ছোটো মন্দির। অলকানন্দার বামতীরে নির্জন স্থানে রয়েছে এই মন্দির। এই মন্দিরের দেবী একজন পাহাড়ি মাতা। দেবীমূর্তিটি অসাধারণ মন্দিরটিও দেখতে বেশ।

পুরাণ মতে এই দেবী ছিলেন দুই পর্বতভ্রাতা নর ও নারায়ণের জননী। ‘নর’ ও ‘নারায়ণ’ এই দুই ভাই তপস্যার জন্য নাকি গৃহত্যাগী হন। প্রচণ্ড উদ্‌বেগে মাতা যখন তাঁদের খুঁজতে আসেন, তাঁকে দেখে গৃহত্যাগী দুইভাই দুটি পর্বত হয়ে স্থানু হয়ে যান।

তখন মাতার দুঃখ দেখে এই স্থানে ঋষি নারায়ণ, মাতার বসবাসের সম্মতি দেন। সেই থেকেই একা মাতা এই নির্জন মন্দিরে অধিষ্ঠান করেন। আরও কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর রাস্তা ক্রমশ সরু হয়ে গিয়েছে। শুরু হয়েছে পাহাড়ি রাস্তার চড়াই-উতরাই খেলা। একটা বাঁক ঘোরার পর ডানদিকে অলকানন্দার অন্য দিকে অনেক দূরে চোখে পড়বে বসুধারা জলপ্রপাত।

বামদিকে পাহাড়, ডানে নীচে, অনেক নীচে বয়ে চলেছে অলকানন্দা। পাহাড়ের প্রান্ত দিয়ে খানিকটা উতরাই পার হয়ে কিছুটা দূর এগিয়ে যাওয়ার পর শুরু হবে পাথুরে চড়াই রাস্তা। ঝুরঝুরে বালিমাটি। আর ছোটো-বড়ো পাথরে ভরতি খাড়া রাস্তা।

ধীরে ধীরে সন্তর্পণে এগোবেন। এর মধ্যে বিভিন্ন পাহাড়ি পাখির ডাক শুনতে পাবেন। পরিবেশের সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। একটু দূর থেকেই চোখে পড়বে অলকানন্দার ওপর বিশাল আকারের হিমবাহ, ঠিক যেন বরফের পুল।

এগিয়ে চলুন হিমবাহের দিকে। অপূর্ব দৃশ্য, নারায়ণ পর্বত থেকে বরফের বিশাল আস্তরণ অলকানন্দায় মিশেছে, এ হল ‘ধান্য হিমবাহ’। এই আস্তরণ বহু প্রাচীন। বরফের মধ্যে মধ্যে উকি দিচ্ছে বিশাল আকারের পাথর। কত যুগ ধরে যে এই বরফ আর পাথর তাদের আস্তরণ সৃষ্টি করেছে, কে জানে!

হিমবাহের পুরো অংশটাই শক্ত নয়, মাঝে মাঝে ঝুরঝুরে বালিমাটির সঙ্গে বরফ গলে মিশে কাদা, আবার কোথাও কোথাও ফাটলও তৈরি হয়েছে।

এরই মধ্যে আমাদের গাইড দক্ষ পায়ে অতিক্রম করালেন ধান্য হিমবাহ। তারপর বেশ কিছুটা চড়াই উঠতেই চমক। বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, মধ্যে মধ্যে ছোটো ছোটো ঝোপ-’চামতোলি বুগিয়াল’, যা ঘাসতোলি বলেও পরিচিত।

বেশ কিছুক্ষণ পাথুরে রাস্তা, তারপর হিমবাহ অতিক্রমের পর সবুজ পরিবেশ মনকে বেশ ভালো করে দেবে।

বিশ্রাম নিয়ে নিন কিছুক্ষণ। সেখানে প্রতিটা পাহাড়ের সৌন্দর্য, প্রতিটি বাঁকের দৃশ্যপটের বদল, প্রতিটি বাঁকে নতুন কিছু আপনাকে মন্ত্রের মত টানবে। পথের শারীরিক দুর্বলতা নিমেষে ম্লান হয়ে যাবে। রাস্তার ডান দিকে বয়ে চলা অলকানন্দার ঠিক ওপারে দেখতে পাবেন বসুধারা জলপ্রপাত পুরাণ বলছে সেটি হল অষ্টবসুর তপস্যাক্ষেত্র। জলপ্রপাতের নীচে বরফের উঁচু ঢিবি।

প্রচণ্ড হওয়ার বেগ থাকায় জলপ্রপাতের সব জল নীচ পর্যন্ত পৌঁছোতে পারছে না। ধোঁয়ার আকারে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাতাসে। আবার হাঁটাপথ শুরু। বেশ কিছুক্ষণ পর অনেকটা সবুজ অংশ চোখে পড়বে। হাঁটার গতিটা একটু বেশি। তবে বেশিদূর যেতে হল না, আবার রুক্ষতা শুরু, গতি শ্লথ।

দিনে দিনে হাঁটতে শুরু করলে একটু বেলার দিকে পৌঁছে যাবেন লক্ষ্মীবন। সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১২,০০০ ফুট উচ্চতা। ‘লক্ষ্মীবন’ অঞ্চলে অলকানন্দার গতি খুব ধীর, জলও কম। বোঝা যায় হিমবাহের নীচ দিয়ে যাওয়ার সময় জলের পরিমাণ বেড়েছে। লক্ষ্মীদেবী নাকি এই লক্ষ্মীবনেই তপস্যা করেছিলেন। এই জায়গা সত্যিই তপস্যা করারই জায়গা। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকুন। থাকলে দেখবেন আপনার অশান্ত মন যথেষ্ট শান্তি লাভ করেছে। মন স্থির হয়েছে।

লক্ষ্মীবনের চারিদিক পাহাড়ে ঘেরা, নিস্তব্ধ এক সমতল সবুজক্ষেত্র। লক্ষ্মীবনের এক দিক ঢালু হয়ে অলকানন্দায় মিশেছে।

ওই ঢালে রয়েছে প্রচুর ভূর্জ গাছ। গুল্ম চরিত্রের এই গাছগুলোর আকার পরিণত আমগাছের মতো, কিন্তু কাণ্ডের ধর্ম পেয়ারার সঙ্গে মিলে যায়; অর্থাৎ, বাকল মোচনেই রেচন ত্যাগ। খয়েরি ছাল খুলে খুলে আছে, যেটি হল বিখ্যাত ভূর্জপত্র। যাতে পুরাকালে লেখা হত, পুঁথির পর পুথি তৈরি হত।

সেদিন বিশ্রাম নিন। এর পরের রাস্তা বেশ বিপদসংকুল, তবে এ রাস্তায় কিছু রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাও হয়েছে। দু-কিলোমিটার মত অতিক্রম করার পর ছোটো-বড়ো পাহাড়ে ঘেরা অঞ্চল -’বান ধার’। এখানে পাথর ঘেরা প্রকৃতিসৃষ্ট কয়েকটি গুহাও চোখে পড়বে।

আর একটু এগোতেই দেখতে পাবেন একটি পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে অবস্থিত একটি বিশাল পাথর। গাইডের কথা অনুযায়ী ওটা নাকি ‘ভীমের গদা’।

তারপর রাস্তা আরও বেশ চড়াই। অলকানন্দাকে আপনার ডান দিকে রেখে এবার আমাদের যেতে হবে নীলকণ্ঠ পর্বতকে বাঁ দিকে রেখে অর্ধ পরিক্রমা করে সতপন্থ হিমবাহ ধরে।

রাস্তা ক্রমশ বাম দিকে বাঁক নিচ্ছে। বাঁকের কাছে অন্য আর একটি হিমবাহ এসে সতপন্থ-র হিমবাহে মিশেছে—’ভগীরথ খড়্গা’। এই দুই হিমবাহ মানে, সতপন্থ ও ভগীরথ খড়্গ-এর সংগম তৈরি করেছে একটি নদী উপত্যকা। উপত্যকার নাম, ‘অলকাপুরী’।

কুবেরের নগরী অলকাপুরী। এই অলকাপুরী থেকেই অলকানন্দার উৎপত্তি বলা হয়। কালিদাসের মেঘদূতের চারটে লাইন একটু গুন গুন করে নিন। যদি কবিতা ভালোবাসেন।

এই ভগীরথ খড়্গা হিমবাহ ধরে যদি পাঁচ থেকে ছয় দিন ট্রেকিং করতে পারেন তো এই পথ ধরে পৌঁছে যেতে পারেন গোমুখ।

সামনেই নীলকণ্ঠ পর্বতের গা বেয়ে নেমে এসেছে অজস্র ঝর্না -’সহস্রধারা”।

সামনে যতদূর দৃষ্টি যাবে পর্বতজুড়ে শুধু একের পর এক জলধারা। মহাভারত অনুযায়ী, মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রাকালে পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যম পাণ্ডব অর্জুন তির দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন এই সহস্রধারা।

সারা বছর জলরাশির খামতি থাকে না, তবে বর্ষায় এর ভয়াবহতা মারাত্মক হয়ে যায়। আবার প্রচণ্ড ঠান্ডায় বরফ হয়ে যায়। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর লেখায় এই পথের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।

যাই হোক, এই জলপ্রপাতগুলির মধ্যে পাঁচটা বেশ বড়ো জলপ্রপাত। পুরাণ মতে এই পাঁচটি জলপ্রপাতকে একসঙ্গে ‘পঞ্চধারা তীর্থ’ বলা হয়। এই পঞ্চধারা ‘প্রভাস’, ‘পুষ্কর’, ‘গয়া’, ‘নৈমিষ’ ও ‘কুরুক্ষেত্র’ নামে পরিচিত। মহাদেবের নির্দেশে পঞ্চতীর্থের দেবতারা এখানে তপস্যা করেন। এগিয়ে চলুন সহস্রধারাকে বামে রেখে। কিছুটা এগিয়ে অল্প চড়াই পার হতেই শুরু পাথরের পথ। ডানদিকে দেখা মিলবে বিশাল হিমবাহ। অন্যদিকে ‘বালাকুন শৃঙ্গ’। বাঁ দিকে নীচে বয়ে চলেছে সহস্রধারার জলধারা।

অদ্ভুত এক রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলুন। পাহাড় আপনাকে শেখায় উদারতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মসংযম, সহাক্ষমতা, সহযোগিতা। আর তার পাশাপাশি দেখিয়ে দেয় হিংস্রতা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ বদল। এই আনন্দ আর কষ্টসহিষ্ণুতা এই দুই মিলেই জীবন।

প্রকৃতির সঙ্গে যেখানে পুরাণের হাতছানি, সেখানেই এমনিতেই আগ্রহ বাড়ে। আগে থেকে বিষয়গুলি জানা থাকলে জানার উৎসাহ বাড়ে। পাহাড়ি পথে বিচিত্র পরিবেশে হাঁটতে হাঁটতে আপনি অনেক কিছুর উপলব্ধির মধ্য দিয়ে যান। আর যদি একটু-আধটু পুরাণের জ্ঞান থাকে তো আপনি আলাদা একটা আমেজ পাবেন নিশ্চিত।

রাস্তার প্রায় কিলোমিটার দুয়েক যাওয়ার পর দেখা মিলবে গোলাকার একটি সবুজক্ষেত্র। এই সমতলভূমি অতিক্রম করলেই সামনে একটা বিশাল চড়াই। সেটা অতিক্রম করতেই প্রবল হওয়ার দাপট অনেকটা কনখল থেকে হৃষীকেশে প্রবেশ করার মতো। চারপাশের পর্বতশৃঙ্গগুলো বরফে মোড়া। পায়ের নীচে বরফ। কখনো কখনো সেই বরফের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে ক্ষীণ জল ধারা। বাঁক পেরোতেই গোলাকার সবুজ ঘাসে ঢাকা খেলার মাঠের মত জায়গা, নাম-’চক্রতীর্থ’। বোল্ডারে ভরতি, রুক্ষ এলাকার মাঝে সবুজের ছোঁয়া। আপনার পেছনে ‘বালাকুন’, বাঁয়ে ‘নীলকণ্ঠ’, আর সামনের ডানদিকে ‘চৌখাম্বা’। একটা উতরাই পেরিয়ে অসাধারণ একটা জায়গা। সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে। জায়গাটার নাম চক্রতীর্থ। পুরাণ ঘেঁটে জানা যায় মহাভারতের যুদ্ধ শেষে প্রয়োজন ফুরিয়েছে বলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সুদর্শন চক্র গেঁথে রেখেছিলেন এখানে।

চক্রতীর্থে ক্যাম্প করতে পারেন। তাঁবু খাটিয়ে ফেলুন। তাঁবু খাটানোর জন্য আগে জায়গা নির্বাচন করুন। পাহাড়ে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন-তখন পাহাড়ের গা বেয়ে পাথরখণ্ড, বরফখণ্ড নামতে পারে। আর অতি অবশ্যই আশেপাশে জলের উৎসটা একটু দেখে নেবে। জল এবং সমতলভূমি এই দুই-ই খুব দরকার।

চক্রতীর্থ সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১৫,০০০ ফুট উচ্চতায়। ঠান্ডাটা একটু বেশিই লাগবে। উপযুক্ত গরম জামাকাপড় নিয়ে যাবেন। না হলে কিন্তু বিপদে পড়বেন। এখান থেকে নীলকণ্ঠের যে রূপ আপনি দেখবেন তা অসাধারণ। চক্রতীর্থে যথেষ্ট ঠান্ডা। হাওয়ার তীব্রতা ব্যাপক। ভোর থেকেই তোড়জোড় শুরু করুন। তারপর ও নমঃ শিবায় বলে বেরিয়ে পড়ুন ‘সতপন্থের পথে। চক্রতীর্থ থেকে সতপন্থের দূরত্ব ৫ কিলোমিটার। তবে চড়াই রাস্তা এবং বেশ বিপজ্জনক। চক্রতীর্থ চারিদিকের পাহাড় দেখতে দেখতে বিপদসংকুল পথে কোনো মতে দুটো পা রাখার জায়গার পথ ধরে এগিয়ে চলুন। অনুমান প্রায় দুশো ফুটের খাড়াই রাস্তা। একটু এদিক-ওদিক হলেই সিধা নীচে। ভ্যানিশ! অনেক আগেই নীচে চক্রতীর্থকে ছেড়ে এগিয়ে চলা। সূর্যের আলোয় পাহাড়ের গায়ের বরফ চিকচিক করে উঠছে। ছোটো ছোটো পাথরখণ্ড একের পর এক সাজানো রয়েছে। এরকম সাজানো এক চিহ্ন থেকে আগের চিহ্ন ধরে এগিয়ে যেতে হবে। রাস্তা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। প্রচুর নড়বড়ে পাথর পাবেন যাত্রাপথে। শুনতে ৫ কিলোমিটার মনে হচ্ছে, কিন্তু পাঁচঘণ্টার মতো মনে

হবে। তুষারধ্বসের (avalanche) শব্দ শুনলে সতর্ক হয়ে যাবেন।

মেঘের মধ্য দিয়ে হাঁটার ফলে দিকভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা প্রবল। চৌখাম্বা ও নীলকণ্ঠের অবস্থান দেখে হাঁটুন। আবহাওয়া কুয়াশাচ্ছন্ন হলে হয় গাইডের কথা শুনে চলুন, না হলে মারাত্মক বিপদে পড়বেন। সঙ্গে অতি অবশ্যই কম্পাস রাখবেন। পারলে পুরো রুটের রুটম্যাপটি নিয়ে পড়াশোনা করে নিন। ডানদিক বামদিক প্রত্যেকটি স্থানের অবস্থান রাখুন নিজের নখদর্পণে। তা না হলে বেশ মুশকিল।

চড়াই-উতরাই মিশিয়ে পথ হাঁটতে হাঁটতে দেখবেন দিঘির ন্যায় জলাশয়। কোনটা বরফে ঢাকা কোনোটা আবার একটু-আধটু জলের অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছে। সামান্য বাঁক ফিরতেই চোখের সামনে ত্রিকোণাকার ‘সতপন্থ তাল’। ‘সত’ অর্থাৎ সত্য আর ‘পন্থ’ অর্থাৎ পথ ‘সত্যের পথ’। যে সত্যের পথ ধরে পাণ্ডবরা হেঁটেছিলেন, সেই পথ ধরে এযুগে আমারও হাঁটলাম। এক স্বর্গীয় অনুভূতি।

সতপন্থ তালের চারপাশই ঢালু। রয়েছে ‘মহাদেবে’-র একটি পাথরের ছোটো মন্দির, যার ভেতর অধিষ্ঠান করছে ‘শিবলিঙ্গ’, সঙ্গে ডুগডুগি বাঁধা ত্রিশূল। সতপন্থ তাল পাহাড় ঘেরা স্বচ্ছ জলের ত্রিকোণাকার জলাশয়।

স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী, এর তিন দিকে নাকি তিন ধ্যানরত দেবতার অধিষ্ঠান; ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। এঁরা বছরের একটি বিশেষ শুভদিনে এই জলাশয়ে স্নান সারেন। বলা হয়, সতপন্থ তালের জলে স্নান করলে নাকি যে-কোনো ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই জলে এমন কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া আছে যা আমাদের শরীরে আলাদা একটা বল এনে দেয়।

সতপন্থ তাল জনমানবশূন্য, তবে এই তালের অপর প্রান্তে পাথরের কুঠিতে থাকেন এক সন্ন্যাসী। কম কথা বলেন।

দিনে-রাতে তুষারপাত অবশ্যম্ভাবী। তাই তাঁবু ঠিক জায়গায় করবেন। তাপমাত্রা যথেষ্ট নীচের দিকে থাকবে, তাই নিজেকে যতটা সম্ভব প্রোটেকশনের মধ্যে রাখুন। তাঁবুর খুটি ঠিকমতো করে গাঁথবেন নচেৎ বিপদে পড়বেন।

সতপন্থ থেকে এবার আর এক বিপজ্জনক অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়ুন। তবে যার শরীরে কুলোবে না তাকে জোর দেবেন না। সতপন্থের স্বচ্ছজলে তাকিয়ে থাকুন। পারলে ধ্যান করুন কিছুটা সময়। ভালোলাগবে।

এবার বেরিয়ে পড়ুন দু-কিলোমিটার দূরের ‘সোমকুণ্ড আর সূর্যকুণ্ড দেখতে। যাত্রা শুরু ‘সোমকুণ্ড’-এর দিকে। সতপন্থ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক ধরে এগিয়ে চলুন। আপনার বামদিকে পড়বে নীলকণ্ঠ পর্বতের উত্তর-পশ্চিম পরিসর। ডানদিকে সতপন্থ হিমবাহ। আর অন্যপ্রান্তে বালাকুন পর্বতের দক্ষিণ-পশ্চিম পরিসর। এর অন্যদিকে আছে ভগীরথ খড়্গ হিমবাহ। চড়াই-উতরাই পার হয়ে ১৫,৮০০ ফুট উচ্চতায় সোমকুণ্ড। বৌদ্ধদের কিছু নিশানা পতাকা, স্তুপীকৃত পাথরখণ্ড দেখতে পাবেন।

এবার প্রাণভরে চারপাশে চোখ রাখুন। মেঘ কুয়াশা আর এক বিচিত্র স্বর্গীয় অনুভূতি। চোখের সামনে নীলকণ্ঠ ও চৌখাম্বার সংযোগস্থল। আপনি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবেন। আর আপনার মন বলবে স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে তো তা এখানেই। আপনি আর কিছুটা পথ গেলেই স্বর্গারোহণ। একটু ভেবে দেখুন মহাপ্রস্থানের পথে পাণ্ডবদের মধ্য থেকে যুধিষ্ঠির একমাত্র এই পথ ধরে সশরীরে স্বর্গে গেছিলেন। তারপর যুগের পর যুগ কত মানুষ এই পথ ধরে স্বর্গে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। বিপজ্জনক বিপদসংকুল পথে শুধুমাত্র স্বর্গপ্রাপ্তির আশায় কেউ কেউ ঝাঁপ দিয়েছেন সোজা এই পথ ধরে। মোক্ষলাভের আশায় ঈশ্বরের নাম করতে করতে কত সাধারণ মানুষ সাধু যোগী মহাত্মা এই পথে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন।

আপনার চোখের সামনে মহাভারতের সেই ‘স্বর্গদ্বার’। দূরে মেঘ কুয়াশায় ঢাকা এক অলৌকিক পথ। শিশির বাষ্প মেশা এক পথ দৃশ্যমান। মানস চক্ষে দেখা যাচ্ছে আবছা একটা সিঁড়ি। ওটাই কি তবে স্বর্গের সিঁড়ি। যুধিষ্ঠির নাকি এই সিঁড়ি পর্যন্তই গিয়েছিলেন, তারপর স্বর্গের রথ তাঁকে সশরীরে নিয়ে গেছিল স্বর্গে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *