মেদিনীপুরের বাড়ি – শতদল

মেদিনীপুরের বাড়ি – শতদল

ভূতের ভয় বলে যে কথা আছে সেটা কোথায় খাটে? মানে কাদের বেলায় খাটে? যারা জানে ভূত নামক বস্তুটি আছে, যারা মনে করে ভূত ক্ষতি করে, যাদের ধারণা ভূত দেখতে কদাকার এবং অসীম ক্ষমতার অধিকারী, সাধারণত তাদেরই ভয় করে। কিন্তু ভূত যে কুরূপ, ক্ষতিকারী, অসীম ক্ষমতাশালী এসব তথ্য মানুষ জানল কোথা থেকে? ভূতের কোনো এনসাইক্লোপিডিয়া নেই, নেই কোনো স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান, কোনো অভিধান বা বংশতালিকা, গবেষণাগারেও পরীক্ষা করে দেখার উপায় নেই। তবে কি করে মানুষের ভূত-চিন্তা এল? তাদের চেহারা এবং প্রকৃতিই-বা মানুষ জানল কী করে? আমি ব্যাপারটা চিন্তা-ভাবনা করে এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, ভূত আছে কি নেই তা জানার আগেই দুষ্টু বা দুরন্ত ছেলেকে শান্ত করতে ‘ঐ জুজু ধরল’ বলে তাকে ভয় দেখানো হয়। তখনই তাকে বলে দেওয়া হয় জুজুকে কেমন দেখতে, সে কী পারে না পারে ইত্যাদি। ব্যস, শিশুমনে একটা ছবি এঁকে নিল। এই জুজুর ভয়ই পরবর্তী জীবনে তার ভূতের ভয়ে পরিণত হল। তাহলে দেখা যাচ্ছে অন্য লোকে ভূতের ভয় ঢুকিয়ে দেয়। বড়ো হয়ে কেউ কেউ সে ভয় কাটিয়ে ওঠে, কেউ পারে না। আমার নিজের কথা বলি— ছেলেবেলায় প্রথমে আমারও ভূতের ভয় ছিল। সেই ভয় ওই ছেলেবেলাতেই কী করে কাটিয়ে উঠেছিলাম সে-কথা বলি— একটু যখন বড়ো হয়েছি হঠাৎ একদিন মনে হল, নিত্যি ভূতের ভয় পুষে রাখার কোনো মানে হয় না। এস্পার-ওস্পার যাহোক একটা হয়ে যাক। এইরকম ভাব মনে উদয় হওয়ার পর থেকে যখন যেখানে ভূতের ভয় লেগেছে বা গা ছমছম করেছে অমনি চেষ্টা করেছি ভূত দেখার। সাধারণত ভয় করলে লোকে আপ্রাণ চেষ্টা করে যেন ভূত না দেখতে হয়। আমি কিন্তু ঠিক উলটোটাই করেছিলাম। ভেবেছিলাম ভূত দেখে প্রথমবার ভয় পেলেও বার কয়েক দেখলে অভ্যস্ত চোখে আর ভয় লাগবে না। বলাবাহুল্য, কোনো বারেই ভূতের দেখা পাইনি। ফলে সাহস বেড়ে গেল বা ভয় কেটে গেল, যাহোক হল একটা-কিছু। এবারে অন্য লোকের কথায় আসি- ভূত দেখেছেন অথচ ভয় করেন না এমন অনেকে আছেন। আমার পিতৃদেব এবং ছোড়দা বারকয়েক ভূত দেখেছেন, কিন্তু ভূতে ভয় ছিল না। যাঁদের বিশ্বাস করা যায় তাঁদের ওপর নির্ভর করা যায়। বিশ্বাসযোগ্য জনের কাছ থেকেই লোকে শিক্ষা নেয়। তাঁরা যা-ই বলুন সবই বিশ্বাস করতে হয়। ভূত সম্পর্কে আমি বাবা ও ছোড়দাকে বেশ অভিজ্ঞ মনে করতাম। তাঁদের কাছ থেকে জেনেশুনেই আমার সে-বিষয়ে জ্ঞান বেড়েছে। ভূত আছে বিশ্বাস করি এবং সেইসঙ্গে এও বিশ্বাস করি যে, ওপরওলা যেমন মানুষের ক্ষমতা বেঁধে দিয়েছেন তেমনি তিনি ভূতের ‘বেলাতেও করেছেন। অর্থাৎ ইচ্ছেমতো মানুষ সব কিছু করতে পারে না, ভূতও ইচ্ছেমতো সব কিছু করতে পারে না। আমাদের গ্রামের মণীন্দ্র তর্ক করে বলেছিল— না রে! তুই জানিস না, ওরা ইচ্ছে করলেই যা খুশি তাই করতে পারে।

তাই শুনে আমাদের গ্রামে সদ্য ঘটে যাওয়া খুনের ঘটনার উল্লেখ করে বলেছিলেন— অবনীদা স্ত্রী-ছেলেমেয়েকে ভালোবাসতেন কি না?

মণীন্দ্র উত্তরে বলেছিল— যথেষ্ট ভালোবাসতেন।

আমার প্রশ্ন- সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জন করার লোক ছিলেন কি না?

মণীন্দ্রের জবাব- হ্যাঁ।

আমার ফের প্রশ্ন— অবনীদা খুন হওয়াতে সংসারটা ভেসে গেল একথা সত্যি কি না?

মণীন্দ্র জোর দিয়ে বলল— তা তো গেলই। তার সঙ্গে ভূতের ক্ষমতার কী সম্বন্ধ?

আমি বলেছিলাম— আছে হে আছে। তার আগে আর একটা প্রশ্নের জবাব দাও। অবনীদার খুনি কি এখনও পর্যন্ত ধরা পড়েছে?

মণীন্দ্রর জবাব সঙ্গে সঙ্গে— না।

আমি বলেছিলাম— তবেই দ্যাখো, যে খুনের মতো জঘন্যতম অপরাধ করল, যে একটা সুন্দর সংসারকে ভাসিয়ে দিল, নিরপরাধ স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে অনাথ করে দিল, সে এখনও ধরাই পড়ল না, শাস্তিই পেল না। অথচ অবনীদা ইহলোক ছেড়ে প্রেতযোনী যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তো জানতে পারলেন কে খুনি। পারতেন না তাকে ধরিয়ে দিতে? আরও উদাহরণ আছে, আমরা তো খবরে পড়েছি খুন করে লেপকম্বল চাপা দিয়ে মৃতকে সাতদিন ধরে বাড়িতেই লুকিয়ে রেখে দিব্যি সকলে খাওয়া-দাওয়া করেছে, স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাত্রা করে গেছে। কিম্বা স্ত্রীকে খুন করে মৃতদেহ পাচার করতে না-পেরে সেটা মাটিতে পুঁতে রেখে আসামি দিনের-পর-দিন তার ওপর বিছানা পেতে শুয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে। এরকম ক্ষেত্রে কই কোনো সময়েই তো প্রেতাত্মা খুনিকে ভয়ও দেখায় না, ধরিয়েও দেয় না? আমার এইরকম সব মোক্ষম উদাহরণের সামনে মণীন্দ্র কাবু হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত সে আমার সঙ্গে একমত হয়েছিল যে ভূতের ক্ষমতাও সীমিত। আর সীমিত বলেই জ্ঞানী ব্যক্তিরা ভূতকে ভয় করেন না। বাড়িতে নিশ্চিত ভূত আছে জেনেও তাঁরা নির্ভয়ে থাকেন। এইরকম একটা ঘটনা বলব বলেই এত ভণিতা করতে হল। তার মানে মোটেই এই নয় যে সবাই আমার ঘটনা বিশ্বাস করুন। চন্দ্র-সূর্যের মতোই ধ্রুব সত্যি যে, কোনো ক্ষেত্রেই শতকরা একশোভাগ লোককে একদিকে আনা যায় না।

বাংলা ১৩৫০ সালে দেশজুড়ে প্রবল দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। ভারতের শাসনকর্তা তখন ব্রিটিশ। পৃথিবীতে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা। কবে যে যুদ্ধ শেষ হবে কেউ জানে না। ইংরেজের শত্রুপক্ষের একজন হল জাপান। আমি তখন নিতান্তই শিশু। কিন্তু তবু আমার বেশ মনে আছে— দেখতাম আকাশে লাল লাল জাপানি এরোপ্লেন। সর্বদা আতঙ্ক এই বুঝি বোম্বিং শুরু হল! ছোটোদের মুখে তখন একটা ছড়া ঘুরত। আমারও সেটা মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। ছড়াটা এইরকম—

সা রে গা মা পা ধা নি
বোম ফেলেছে জাপানি
বোমার ভেতর কেউটে সাপ
বৃটিশ বলে বাপরে বাপ!

আমি খুব ছোটো হলেও সেই সময়ের সব ব্যাপার মনে আছে। দেশে সমস্ত জিনিসের হাহাকার— চাল নেই, কয়লা নেই, চিনি নেই, নুন নেই, কেরোসিন নেই, পেট্রোল নেই, আরও কত কিছু নেই। কেবল নেই আর নেই। সব রেখে দেওয়া হয়েছে মিলিটারির জন্যে। জনসাধারণের দাম তখন কুকুর-বেড়ালের থেকে বেশি নয়। তারা থাকল বা না থাকল কিছু যায় আসে না। মিলিটারি এবং তাদের পরিবারই তখন সব। তাদের সুযোগ-সুবিধে দিতে হবে, ঠিক রাখতে হবে। তাদের আরামে না রাখলে লড়বে কে? বাজারে সামান্য যা-কিছু পাওয়া যেত বিশেষত খাদ্যদ্রব্য, তার এত দাম যে সাধারণের নাগালের বাইরে। ব্ল্যাক মার্কেট বা ‘কালোবাজার’ কথাটার জন্ম সেই সময়ে। যুদ্ধের সময়ে কালোবাজারি এক একটা টাকার কুমির হয়ে গেল। জনকয়েক মানুষের লোভ কীভাবে বিরাট সংখ্যক মানুষকে বিপন্ন করে দিল, বিপন্ন বললে ভুল হয়, ধ্বংস করে ছাড়ল ১৩৫০ সালের মন্বন্তর তার জ্বলন্ত উদাহরণ। প্রকৃতির ওপর কারুর হাত নেই। প্রাকৃতিক কারণে দুর্ভিক্ষকে তাই মুখ বুজে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। সেখানে কারুকে দোষ দেওয়ার নেই, দুঃখ নেই। কিন্তু অতি স্বার্থপর লোকের সৃষ্টি কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে যখন হাজার হাজার মানুষ মরে যায় তখন শিশু-বৃদ্ধ-স্ত্রীলোকের স্তূপাকার শবের দিকে তাকিয়ে দায়ী সেই মানুষ-পিশাচগুলোর ওপর অন্তর থেকে অভিশাপ আসে— ভগবান, প্রত্যেক জন্মে ওদের আবর্জনার কীট করে পাঠিও। যাই হোক, অন্য প্রসঙ্গে না গিয়ে যা বলছিলাম—

আমরা সেই দুর্ভিক্ষের সময়ে মেদিনীপুর শহরে। সবে কলকাতা থেকে এসেছি। বাবা ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। শালবনীতে এরোড্রোম তৈরি হচ্ছে। বাবাকে সেইজন্যে আসতে হয়েছে। তিনি যেখানেই পোস্টেড হতেন আমাদের সপরিবারে সেখানে নিয়ে যেতেন। কোয়ার্টার পাওয়া গেলে ভালো কথা, না গেলে বাড়ি ভাড়া করা হত। শালবনীর জঙ্গল সাফ করে ‘এয়ার বেস’ তৈরি হচ্ছে। সেখানে ফ্যামিলি কোয়ার্টারের কোনো প্রশ্ন নেই। কাছাকাছি সব থেকে বড়ো শহর মেদিনীপুরে বাড়িভাড়া করা হল। কলকাতা থেকে আমরা মেদিনীপুরে চলে এলাম। প্রথম দর্শনেই আমাদের সকলেরই বাড়িটাকে ভালো লাগল। লাল রঙের একতলা বাড়ি। বিরাট বাগান আছে পেছন দিকে, কুয়ো আছে বাগানে। ওই পাড়াতে এটাই সব থেকে বড়ো ও সুদৃশ্য বাড়ি। আমরা খুশি হলে হবে কি? পাড়ার লোক খুশি হতে দেবে না। কেউ কেউ এসে শুরু করলেন— আপনারা কোথা থেকে আসছেন?

দাদা বললেন— কলকাতা।

তাঁদের জবাব— তাই।

বুঝতে না পেরে হয়তো দাদা জিজ্ঞাসা করলেন— তাই মানে?

তাঁদের জবাব— স্থানীয় লোক হলে এ-বাড়িতে কখনোই আসতেন না। জেনে-শুনে কি লোকে বিপদে পড়ে?

দাদা অবাক হয়ে বলেন— কী বলছেন বুঝতে পারছি না তো?

তাঁদের উত্তর— থাকুন না, জানতে পারবেন।

দাদা তবু বলেন— যদি সে-রকম কিছু ব্যাপার থাকে বলে দিলে তো আমরা সাবধান হই!

পড়শীরা যেন কত দরদী! বললেন— না দাদা, আপনাদের সঙ্গে তো ছোটো ছেলেমেয়ে রয়েছে, বলে আর ভয় পাওয়াতে চাইছি না।

আমরা আসার দু-পাঁচ দিন পর থেকেই প্রতিবেশিনী মেয়ে-বউদের অনেকে মা আর দিদিদের সঙ্গে আলাপ করতে বাড়িতে আসতে লাগলেন। খোদ কলকাতায় বাস করে হয়তো এখন আমরা ধারণা করতে পারি না পাড়ায় নতুন পরিবার এলে যেচে গিয়ে আলাপ করা। মেলামেশার ধরন-ধারণ এখন পালটে গেছে। বাইরে ছোটো শহরে বা গ্রামে-গঞ্জে কিন্তু এখনও এ-রীতি আছে। যাই হোক, আলাপ-পরিচয় পর্ব শেষ হলে প্রায় সব প্রতিবেশিনীই বলে গেলেন— বাড়িটায় বাতাস আছে। ছোটো ছেলেমেয়েদের সাবধানে রাখবেন। সাধারণত যারা জানে না তারা মনে করবে ভালোই তো, বাড়ি গুমোট নয় বাতাস আছে। কিন্তু যারা জানে বাতাসের মানেটা এখানে কী, চোখ গোল গোল হয়ে যাবে। এ হল ভূতের বাতাস। সোজা কথায় বাড়িটায় ভূত আছে। তাই কেউ ভাড়া নেয় না। বাড়িটা খালি পড়ে থাকে। বাড়ির মধ্যে আমি সব থেকে ছোটো। আমার ওপরে দুজন দিদি। দিদি হলেও ছোটো ছোটো মেয়ে তারা। তার ওপরে দুই দাদা। তাঁরা যথেষ্ট বড়ো। অন্তত আমাদের মতো চট করে ভয় পাওয়ার বয়স নয়। বাড়িটায় যে ভূত আছে আমরা তিন ভাইবোন জানতাম না। আমি তো জানতাম না। আমার ওপরের দিদি দুজনও নিশ্চিত জানত না। যদি জানত তাহলে এক সময়ে নির্ঘাত প্রকাশ করে ফেলত। কারণ, আমাদের বয়সের তফাত খুব বেশি ছিল না এবং তিনজনে বাড়িতে সকল সময়ে খেলার সঙ্গী ছিলাম। ছেলেমানুষ আমরা পাছে ভয় পাই, তাই বড়োরা সাবধান থাকতেন। ওই বাড়ি ছাড়ার পর ব্যাপারটা শুনেছিলাম। তখনই শুনেছিলাম পাড়ার লোকরা আলাপ-পরিচয় করার সময়েই জানিয়েছিল ভূত আছে।

আমাদের ছোড়দা ভাইবোনদের পড়াতেন। কেউ পড়া না করলে বা পর পর ক-টা ভুল করলে হয় একবেলা খাওয়া বন্ধ, নয়তো অন্ধকার ঘরে (সে সময়ে সব বাড়িতে ইলেকট্রিক ছিল না। হ্যারিকেন লন্ঠন জ্বলত) দু-ঘণ্টা বন্দি করে রাখা হত। এ বিধান ছোড়দার। অন্য দাদা ঠিক এ রকম শাস্তি দিতেন না। একবেলা খেতে না-পাওয়া বা সন্ধেবেলা একলা অন্ধকার ঘরে বন্দি থাকা কোনোটাই আমার সহ্য হবে না। তাই মরি কি বাঁচি করে ছোড়দার পড়াটা ঠিক করে রাখতাম। সবচেয়ে বেশি শাস্তি পেত আমার এক দিদি। তার পড়া প্রায়ই মুখস্থ হত না। খাওয়া বন্ধের শাস্তি দিলে মা রাগ করতেন। তাই অন্ধকার ঘরে রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে রাখার শাস্তিটাই জুটত তার কপালে। সে-দিদির ভয়-ডর বলে কিছু ছিল না, ওই ছেলেবেলাতেও দুরন্ত ডাকাবুকো ছিল। কাজেই একলা অন্ধকার ঘরে বন্দি থাকাটা দিদি গ্রাহ্যই করত না। ভয়-ডর ছিল না বলে ওই দিদির একটা ডাকনাম ছিল ‘বোম্বেটে’। ওকে বাড়ির বারান্দার শেষ প্রান্তের একটা ঘরে কিছুক্ষণ বন্দি রাখা হত। বাড়িটায় ইলেকট্রিক ছিল না। আমাদের সব ঘরে কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বলত। কিন্তু ওই ঘরটা যেহেতু আমাদের ব্যবহার করার বিশেষ দরকার হত না, পড়েই থাকত, সেই জন্যে আলোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না সেখানে। জিনিসপত্তরও বিশেষ কিছু রাখা হত না। ফাঁকা অন্ধকার ঘরটা শাস্তি-ঘর হিসেবে চমৎকার! দিদিকে প্রায়ই বন্দি থাকতে হত সেখানে। মা কিন্তু ব্যাপারটাকে খুব অসন্তোষের চোখে দেখতেন। মাঝে মাঝে দেখতাম দাদাকে আড়ালে বকা-ঝকা করতেন। আমাদের সামনে বকতেন না কখনোই, পাছে আমাদের দাদাকে ভয় করা চলে যায়। আড়ালে বকার সময়ে দু- একবার আমি টের পেয়ে গিয়েছিলাম। পরে যখন জানতে পেরেছিলাম বাড়িটায় অশরীরীর চলাফেরা আছে তখন বুঝেছিলাম মার বকার কারণ। অবশ্য পাড়ার লোকের কাছে দাদাও তো শুনেছিলেন এ-কথা, তবুও কেন যে একটা ছোটো মেয়েকে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখতেন বুঝি না। আসলে এই দাদা খুব ডানপিটে ছিলেন, কিছুতে ভয়ডর ছিল না। কাজেই ভূতের ভয় গ্রাহ্য করতেন না। সবাইকে সেইরকম মনে করতেন। এই সব লোকের কাছে ভূত জব্দ। যারা ভয় পাত্তাই দেয় না তাদের কাছে ভূত একেবারে কেঁচো। দিদি বাড়িটায় ভয় আছে জানত না। কাজেই কোনো সময়েই ওর ভয় করত না। তবে আমরা ছোটোরা যখন খেলতাম বা গল্পটল্প করতাম তখন কথাপ্রসঙ্গে মাঝে মাঝে ওই দিদি বলত, জানিস, আমাকে ছোড়দা ঘরে বন্দি করে রেখে দেওয়ার সময়ে এক একবার মনে হয় ঘরের এক কোণে একটা বউ বসে আছে! আমরা ঠাট্টা করে বলতাম, তোর সঙ্গে খেলবে বলে বসে থাকে। দিদির এই ‘মনে হওয়া’র কথাটা একবার মা শুনতে পেয়েছিলেন। ব্যস! সত্যিকারের বকুনি সেদিন দিয়েছিলেন ছোড়দাকে। তারপর থেকে অন্ধকার ঘরে বন্দি থাকার শাস্তিটা উঠে গেল।

প্রকৃত ঘটনাটা কীভাবে কখন আমি জানলাম এবারে তা বলি— বাবা বদলি হয়ে যাচ্ছেন শিবগঞ্জ বলে একটা জায়গায়। আমরা সবাই মেদিনীপুর থেকে শিবগঞ্জ চলে যাচ্ছি। শেষ রাত্তিরে গাড়ি। শীতকালের ভোর চারটে শেষ রাত্তির ছাড়া আর কী? তখন ঘোড়ার গাড়ির খুব চল। সাধারণের যান হিসেবে ঘোড়ার গাড়িকে লোকে বেশ পছন্দ করত। ভাড়ার মোটরগাড়িও পাওয়া যেত, কিন্তু ঠিক এখনকার ট্যাক্সির পর্যায়ে পড়ত না। ফুরনে যেত তারা। তা ছাড়া তাদের মিটারও ছিল না। মিটারের চল তখনও হয়নি। ঘোড়ার গাড়ি বলে রাখা হয়েছিল। ঠিক সময়ে এসে গেল। আমাদের জিনিসপত্তর বাঁধাছাদা শেষ। এ-ঘর থেকে জিনিসগুলো এনে একটা ঘরে সব জড়ো করা হচ্ছে। বাবা শিবগঞ্জে আগেই চলে গেছেন অফিসের লোকের সঙ্গে। আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন দুই দাদা। হঠাৎ আমার মনে পড়ল আমার খেলনার ছোট্ট লাল রঙের মোটরগাড়িটা পাশের ঘরে জানলার কপাটের পেছনে রেখেছিলাম, তোলা হয়নি তো সেটা! একছুটে এসে হাজির হলাম সেই ঘরে। সে-ঘরে মোমবাতিটা ছোটো হয়ে জ্বলছিল তখনও। কাজেই জানলার কপাটের পেছন থেকে মোটরটা খুঁজে নিতে অসুবিধে হল না। ভাগ্যিস শেষ সময়ে মনে পড়েছিল! সব খেলনার মধ্যে আমার প্রিয় খেলনা মোটর। তখন জার্মানি ও জাপানি খেলনায় বাজার ভরতি ছিল। সে-সব খেলনার কী বাহার, আহা! এই টিনের লাল মোটরটা ছিল জাপানি, আমার বেজায় আদরের। এটাকে ভুলে ফেলে গেলে দারুণ কষ্ট হত। এই ঘরের পাশের ঘরটাই শাস্তি-ঘর। খেলনা নিয়ে চলে আসবার সময়ে শুনতে পেলাম মেয়েলি গলার কান্না। ভাবলাম যাবার মুখে দিদিদের কেউ হয়তো অন্যায় কিছু করেছে তাই শাস্তি-ঘরে আটক থেকে কাঁদছে। গ্রাহ্য না করে আবার আগের ঘরে চলে এলাম। ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মার কী বকুনি! — কেন কারুকে কিছু না বলে গিয়েছিলে? কোথায় গিয়েছিলে? দেখলাম ছোড়দাও আমার দিকে কট্‌ট্ করে চেয়ে আছেন। ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম— আমাকেও অন্ধকার শাস্তি-ঘরে পুরে না দেয়। মাকে বললাম, কোথায় গিয়েছিলাম, কেন গিয়েছিলাম। সেইসঙ্গে এও বললাম, দিদি শাস্তি-ঘরে কাঁদছে। একজন দিদিকেই বার বার শাস্তি-ঘরে যেতে হত। কিন্তু কোনোদিন তাকে কাঁদতে শুনিনি। মাকে তাই কান্নার খবরটা দিলাম। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু খবরটা দিয়ে বোকা হয়ে গেলাম। মা ধমকে বললেন— কাঁদুক গে! ওই তো দিদিরা! দেখলাম দুই দিদিই ঘরে রয়েছে। কে কাঁদছে তা হলে? ও নিয়ে আর মাথা ঘামালাম না। মা আর ছোড়দা গম্ভীর হয়ে একবার মুখ চাওয়াচায়ি করলেন। এমন সময়ে ছাদে একটা শব্দ শুনলাম। বাক্স টেনে নিয়ে গেলে যেমন শব্দ হয় সেইরকম। ছোড়দা হাতঘড়ি দেখে মাকে বললেন— সময়টা একই। এর মানেটা তখন বুঝতে পারিনি। পরে পেরেছিলাম। যথাসময়ে বলব। শব্দটা শুনে আমার মনে হয়েছিল হয়তো ছাদের কোনো জিনিস ঘোড়ার গাড়িওলাকে দিয়ে আর এক দাদা নামাবার ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘোড়ার গাড়িওলাদের নিয়ে দাদাকে সদর দরজার দিক থেকে আসতে দেখলাম। দাদা এসে বললেন— চলো চলো সব, আর দেরি কোরো না। সঙ্গের লোকদের বললেন— সামান উঠাও।

আমরা গাড়িতে এসে বসলাম। মালপত্তর তোলার পর গাড়ি ছাড়বে, এমন সময়ে একজন দিদি বলল— আরে! ট্রেনে জল খাওয়া হবে বলে যে গেলাসটা বার করে রেখেছিলাম সেটা যে ঘরেই পড়ে রইল! থামাও, থামাও গাড়ি।

মা তীব্র আপত্তি করে বললেন– থাক গে। একবার যখন সবাই দুগ্‌গা দুগ্‌গা বলে নিরাপদে বেরিয়ে এসেছি আর গেলাস আনতে যেতে হবে না।

তখন তো প্লাসটিক বা স্টেনলেস স্টিল বাসনের চল হয়নি, গেলাসটা ছিল কাঁসার। কাঁসার বাসনের দাম চিরকাল। তবুও মা আনতে দিলেন না।

আমাদের ঘোড়ার গাড়ি বাড়ির গলি ছাড়িয়ে বাঁক নেওয়া পর্যন্ত মা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সমানে ফেলে আসা বাড়িটার দিকে চেয়ে রইলেন। ছোড়দা মাকে হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, বাড়িটার জন্যে মন কেমন করছে? মা যেন চেতনা ফিরে পেয়ে বললেন— না রে! দেখছিলাম। দাদা জিজ্ঞাসা করলেন— কী দেখছিলে বলো তো?

মা বললেন— দেখছিলাম…, এখন সকলের সামনে বলতে মানা নেই, একটা ঘোমটা মাথায় দেওয়া বউ ছাদ থেকে ঝুঁকে দেখছিল। মুখটা ঘোমটার জন্যে দেখতে পাচ্ছিলাম না, তবুও বোঝা যাচ্ছিল, যতক্ষণ দেখতে পেলাম, আমাদের চলে যাওয়ার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে আছে।

ছোড়দা আক্ষেপ করে বললেন— ইস্! আমাকে একটু বললে না? একবারও দেখতে পেলাম না পেতনিটাকে। কেবল শব্দই শুনে গেলাম!

আমরা তিন ভাইবোন সেই প্রথম ঘোড়ার গাড়িতে জানতে পারলাম বাড়িটায় পেতনি ছিল। তখন আমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল— কেন অন্ধকার ঘরটায় বন্দি থাকার সময়ে দিদির মনে হত ঘরে আর একটা বউও আছে, কেন অন্ধকার ঘরে আটক থাকার শাস্তি দিলে দাদাকে মা বকাবকি করতেন, কেন ছাদে বাক্স টানার শব্দ শুনে মা আর ছোড়দা মুখ চাওয়াচায়ি করেছিলেন, আর কেনই-বা ছাদে ওই শব্দ শুনে ছোড়দা মাকে বলেছিলেন ‘সময়টা একই’। অর্থাৎ প্রত্যেকদিন শেষ রাতে ঠিক ওই সময়ে ছাদে ওই আওয়াজটা মা ও ছোড়দা শুনতেন।

মা-র কাছে পরে শুনেছিলাম যে, ওই বাড়ির মালিক ছিল একটা বউ। তাকে দেখাশোনা করার কেউ ছিল না। শেষদিকে সে একাই থাকত ওই বাড়িতে। সে নাকি ওই শাস্তি-ঘরেই মরে পড়ে ছিল তিন-চার দিন ধরে। কেউ জানতে পারেনি। শেষে পচা গন্ধ পেয়ে পাড়ার লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ঢুকে বউটার মৃতদেহ দেখতে পায়। আমাদের আগে আরও অনেকে ভাড়া এসেছে ওই বাড়িতে। কিন্তু কেউই নাকি তিন-চার দিনের বেশি টিকতে পারেনি। ভয় পেয়ে পালিয়েছে। আমরাই কেবল এক-দেড় মাস কাটিয়ে গেলাম।

[ নিশুতি রাতের মহাত্মা (নিউ বেঙ্গল প্রেস), ২০১৪ পুনর্মুদ্রণ (প্রথম প্রকাশকাল অজ্ঞাত) ]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *