চৌধুরীবাড়ির অয়েলপেন্টিং – অশোক বসু

চৌধুরীবাড়ির অয়েলপেন্টিং – অশোক বসু

আমার বন্ধু মানিকের সঙ্গে গিয়েছিলাম ওর দেশের বাড়ি সেই গোকুলগঞ্জ। জমিজমার কী একটা গণ্ডগোলের ব্যাপার ছিল। মানিকের এক মেসো সেখানে থাকেন। তাঁর কাছেই উঠেছিলাম।

জমির সমস্যা মিটতে মিটতে দিন তিনেক লেগে গেল। পরের দিন ফিরব। ট্রেন সন্ধে সাতটায়। তাও গোকুলগঞ্জ থেকে এক ঘণ্টা বাসে। বিশ-পঁচিশ মিনিট রিকশায় গেলে তবে রেল স্টেশন। সন্ধের মুখে আমরা যখন স্টেশনে এসে পৌঁছোলাম, তখন চারদিক রাতের মতো অন্ধকার হয়ে এসেছে। সময়টা ভরা বর্ষার। সকাল থেকেই আকাশে কালো মেঘ এখন- তখন করছিল। আমরাও স্টেশনে পৌঁছোলাম, বৃষ্টিও নামল।

বেশি পয়সা দেব বলে রিকশাচালককে স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে যেতে রাজি করিয়েছিলাম। ভাড়া পেয়েই সে ওই বৃষ্টি আর অন্ধকারের মধ্যেই রিকশা ছুটিয়ে ফিরে গেল।

আসল অসুবিধেটা কী অপেক্ষা করছে, তখনও জানতাম না। জানলাম, স্টেশনে এসে। বৃষ্টি না হয় মানা গেল। বর্ষার মাসে বৃষ্টি তো হবেই। অসুবিধেয় পড়লাম, মাথা বাঁচানোর জন্য প্ল্যাটফর্মে কোনো টিনের শেড নেই বলে। স্টেশনে ঘর বলতে পাশাপাশি দেড়খানা ঘর। একটা স্টেশনমাস্টারের, অর্ধেকটা বোধ হয় টিকিট কাটার জন্য। আগেকার দিনে বাংলা সিনেমায় যেমন দেখা যেত— কৃষ্ণচূড়া কিংবা অন্য কোনো বড়ো গাছের নীচে লাল রঙের স্টেশনঘর, কুচিপাথরের একটুখানি প্ল্যাটফর্ম, চারদিকে জনবসতিহীন ফাঁকা মাঠ, ঠিক সেইরকম। প্যাসেঞ্জার বলতে আমি আর মানিক, সাকুল্যে এই দুজন। বৃষ্টি বেশ জোরেই পড়ছিল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়েই স্টেশনমাস্টারের ঘরে ঢুকে পড়লাম। এদিকে ইলেকট্রিক লাইট এখনও আসেনি। স্টেশনমাস্টারের ঘরে হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে! দুজন মানুষকে ঘরে দেখলাম বসে থাকতে। পোশাক দেখে বুঝলাম, একজন স্টেশনমাস্টার, অন্যজন স্টেশনমাস্টারের স্টাফ-টাফ কেউ হবে।

স্টেশনমাস্টার কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমাদের দেখলেন। সুটপ্যান্টপরা শহুরে যাত্রী এই স্টেশন দিয়ে খুব বেশি যাতায়াত করে না বোধ হয়! মানিক তাঁকে বলল, ‘খুব বৃষ্টি হচ্ছে তো, বাইরে থাকলে ভিজে যাব, তাই। আমরা সাতটার ট্রেনটা ধরব।’

স্টেশনমাস্টার বললেন, ‘কী বললেন, সাতটার ট্রেন ধরবেন?

মানিক রুমাল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘পাবেন না। শুধু সাতটার ট্রেন কেন, আপ-ডাউন কোনো ট্রেনই কাল সকালের আগে পাবেন না।’

‘সে কী! ট্রেন পাব না? ‘

‘না, লাইন বন্ধ। আগের স্টেশনে একটা গুডস ট্রেন ডিরেলড হয়েছে।’

মানিক আমার দিকে তাকাল। বুঝলাম, আতান্তরে পড়ে গিয়েছি। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। ট্রেন না পেলে এই দুর্যোগে কোথায় কাটাব, কে জানে! মানিকও বহু বছর দেশছাড়া। এদিককার কিছুই এখন সে জানে না। গোকুলগঞ্জে যে ফিরে যাব, তারও উপায় নেই। যে রিকশায় এসেছিলাম, সেটাও ফিরে গিয়েছে। তা ছাড়া রাতে নাকি এদিকে বাসও চলে না।

মানিক বলল, ‘ভারি মুশকিল হল তো। এই বৃষ্টিতে সারারাত থাকব কোথায়? কী করব?’

স্টেশনমাস্টার বললেন, ‘সে তো বুঝতেই পারছি। স্টেশনঘরে যে থাকবেন, দেখতেই পাচ্ছেন কেমন স্টেশন। থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই।’

দ্বিতীয় লোকটি এতক্ষণ কথাবার্তা শুনছিলেন। এবার বললেন, ‘একটা কাজ করতে পারেন। আধ মাইল দূরে চৌধুরীদের একটা পুরোনো বাড়ি আছে। কেউ থাকে না। ওই বুড়ো ভবানীখুড়োই দেখাশোনা করেন। দেখুন, তাঁকে বলে-কয়ে, যদি কোনো ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। আমিই না হয় সঙ্গে গিয়ে বাড়িটা দেখিয়ে দেব। ভবানীখুড়োকেও বলব। বৃষ্টিটা থামুক। আপনাদের সঙ্গে তো ছাতাও দেখছি না।’

স্টেশনমাস্টার বললেন, ‘ব্রিজমোহন ঠিক কথাই বলছে। ওই বাড়িতে থাকতে পারেন। বাড়িটার অবশ্য বদনাম আছে। তা, আপনারা ইয়ং ম্যান, ওসব ভূতুড়ে গালগপ্পো বিশ্বাস করবেন কেন?’

একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল। শুধু বৃষ্টিই থামল না, মেঘও সরে গেল। আকাশে চাঁদ দেখা গেল। চৌধুরীবাড়িতেই থাকা ঠিক করে আমরা ব্যাগ হাতে করে চললাম ব্রিজমোহনের পিছুপিছু। আলাপ-পরিচয়ে জানলাম, ব্রিজমোহন স্টেশনের টিকিটবাবু। বিহারের লোক, কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই পশ্চিমবাংলায় আছেন। কথাবার্তায় আলাপী, ভালোমানুষই মনে হল। বাংলা বলেন বাঙালিদের মতোই।

তিথিটা সম্ভবত কৃষ্ণপক্ষের শেষের দিকের। বৃষ্টিভেজা মেঠোপথ চাঁদের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। ব্রিজমোহনের হাতে টর্চ ছিল, কিন্তু জ্বালানোর কোনো দরকারই হল না।

জল-কাদার রাস্তা পার হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা চৌধুরীদের সেই বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। এত রাস্তা পার হলাম, কিন্তু পথে একটা লোকেরও দেখা পেলাম না। এখানে কেউ থাকে না নাকি?

রাস্তার ঠিক পাশেই একটা পুরোনো একতলা বাড়ি। সময়ের ভাঙাগড়ায় অনেক কিছুই পুরোনো, ঝুরঝুরে হয়ে গেলেও বাড়িটা এখনও ভেঙে পড়েনি। বট অশথ শেকড় ছড়ালেও বাড়ির ছাদ-দেওয়াল অটুট আছে। আশপাশে আর কোনো ঘরবাড়ি চোখে পড়ল না। এককালে হয়তো ঘরবাড়ি ছিল, এখন নেই। চাঁদের আলোয় যত দূর দেখা গেল, বহু দূর ছড়ানো জনহীন ধু-ধু প্রান্তর ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না।

আমি আবার বাড়িটার দিকে তাকালাম। তাকাতেই বুকের মধ্যে ছাঁৎ করে উঠল। মনে হল, বাড়িটা যেন হিংস্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি মানিকের গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম।

ব্রিজমোহন বেশ জোরে ডাক দিলেন, ‘ভবানীখুড়ো, ও ভবানীখুড়ো!’

বাড়ির ভিতর থেকে ঘড়ঘড়ে গলায় উত্তর এল, ‘কে?’

‘আমি গো, আমি,’ বললেন ব্রিজমোহন

একটু পরেই লন্ঠন হাতে বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ মানুষ। একমুখ সাদা গোঁফ দাড়ি, উলোঝুলো চুল, কোটরাগত চোখ, ভগ্নস্বাস্থ্য, শীতল, স্থবির মুখ। ভাঙাচোরা বিবর্ণ, বাড়ির সঙ্গে ভবানীখুড়োকে বেশ মিলিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল। তিনি লন্ঠনটা তুলে ধরে ব্রিজমোহনকে দেখলেন, দেখলেন আমাদেরও। তারপর থমথমে গলায় বললেন, ‘এরা?’

কেমন যেন বহু দূর থেকে ভেসে এল তাঁর গলার স্বর!

ব্রিজমোহন বললেন, ‘খুড়ো, তোমার বাড়িতে এক রাতের জন্য এই দুজনকে একটু আশ্রয় দিতে হয় যে। খুব মুশকিলে পড়েছেন এঁরা। সেই গোকুলগঞ্জ থেকে ট্রেন ধরতে স্টেশনে এসেছিলেন, কিন্তু তা আজ পাওয়া যাবে না। এই বৃষ্টিবাদলায় কোথায় যাবেন! কী, থাকা যাবে তো?’ ভবানীখুড়ো সামান্য সময় চুপ করে থেকে বললেন, ‘যাবে।’

প্রথম থেকেই লক্ষ করেছিলাম, ভবানীখুড়ো কম কথা বলেন। যেটুকু দরকার, শুধু সেটুকুই বলেন।

বাড়িতে ইলেকট্রিক লাইট নেই। মানিক বলল, ‘আমাদের কাছে টর্চ আছে। মোমবাতি কিনতে পাওয়া যাবে এখানে?

ব্রিজমোহন বললেন, ‘এখানে আধ ক্রোশের মধ্যে কোনো দোকান নেই। খুড়োর কাছে অবশ্য দু-একটা মোমবাতি থাকতে পারে। কী খুড়ো, আছে তো?’

ভবানীখুড়ো বললেন, ‘আছে।’

মানিক বলতে গেল, ‘দামটা অবশ্য আমরা…

তাকে থামিয়ে দিয়ে ভবানীখুড়ো বললেন, ‘দাম লাগবে না।’

ব্রিজমোহনের আর থাকার দরকার ছিল না। বললেন, ‘আমি তা হলে স্টেশনে ফিরে যাই। রেলের অফিসাররা আসতে পারেন। আগের স্টেশনে মালগাড়ি উলটে গিয়েছে যখন!’

আমি আর মানিক হাত তুলে ব্রিজমোহনকে জানালাম, ‘ঠিক আছে।’

‘আসুন,’ ভবানীখুড়ো বললেন। আমাদের নিয়ে গেলেন একটা ঘরে। লন্ঠন উঁচিয়ে দেখালেন। ঘরটা বেশ বড়োই। একটা তক্তপোশ রয়েছে ঘরের এক পাশে, উপরে শতরঞ্চি পাতা। মোটামুটি পরিষ্কার ঘর। ঘরের দেওয়ালে দেখলাম, একটা অয়েল পেন্টিং টাঙানো আছে। লণ্ঠনের অল্প আলোতেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল একজন খুব অল্প বয়সের মেয়ের একটি শাড়িপরা ছবি। হাসিহাসি মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন জীবন্ত ছবি আগে কখনো দেখিনি। মনে হল, এখনই যেন কথা বলে উঠবে।

তখনই আমাদের চমকে দিয়ে আকাশে কড়কড় শব্দ করে ঝিলিক দিল বিদ্যুৎ। মেঘ আবার জমতে শুরু করেছে। রাতে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হবে।

মানিক বলল, ‘ঠিক আছে খুড়ো। এই ঘরেই তক্তপোশের উপর রাতটা দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারব। আমাদের সঙ্গে খাবারও আছে। আসার সময় মাসি দিয়েছে, ট্রেনে খাওয়ার জন্য। জলও আছে এক বোতল।

ভবানীখুড়ো বললেন, ‘মোমবাতি?’

‘ও, হ্যাঁ, মোমবাতি। থাকলে একটা দিতে পারেন।’

ভবানীখুড়ো লণ্ঠনটা ঘরের মেঝেয় রেখে, অন্ধকারে চলে গেলেন মোমবাতি আনতে।

আমি বললাম, ‘লোকটা কেমন! ঠিক তোর-আমার মতো এই জগতের কোনো মানুষ নন যেন! এই জনমানবহীন জায়গায় এমন একটা পোড়োবাড়িতে কীসের জন্য একা একা পড়ে আছেন, কে জানে?’

মানিক বলল, ‘চৌধুরীরা বোধ হয় এই অঞ্চলের জমিদার-টমিদার ধরনের কেউ ছিলেন এককালে। এখন জমিও নেই, জমিদারও নেই। লোকজন যারা থাকত, তারাও চলে গিয়েছে অন্য জায়গায়। পড়ে আছে শুধু এই বাড়িটা। ভবানীখুড়ো বোধ হয় বাড়িটার কেয়ারটেকার।’

ভবানীখুড়ো মোমবাতি নিয়ে এলেন। উনি নিঃশব্দে আসেন, নিঃশব্দে যান। পায়ের শব্দ পাওয়া যায় না। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘরের মেঝেয় রেখে বললেন, ‘আমি আসি।’

কিন্তু যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ‘রাতটা সাবধানে থাকবেন।’ মানিক বলল, ‘কেন বলুন তো?’

ভবানীখুড়ো লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘বিদেশ-বিভুঁইয়ে সাবধানে থাকাই উচিত।’

ভবানীখুড়ো চলে যাচ্ছিলেন। কী মনে হল, বললাম, ‘আচ্ছা, দেওয়ালের ওই ছবিটা কার?’

ভবানীখুড়ো দাঁড়িয়ে পড়লেন। কাঁপা-কাঁপা মুখে ছবিটার দিকে তাকালেন। একটু সময় তাকিয়েই রইলেন। তারপর চোখ নামিয়ে শীতল গলায় শুধু বললেন, ‘ও হল টুসকি।’

বলে আর দাঁড়ালেন না। লন্ঠন হাতে তাড়াতাড়ি চলে গেলেন।

ভবানীখুড়োর আচরণটা অদ্ভুত ঠেকল। আমি মানিকের দিকে তাকালাম। দেখলাম, সে-ও অবাক হয়ে ভবানীখুড়োর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে আছে।

বললাম, ‘লোকটা অদ্ভুত ধরনের। ছবিটার কথা বলতে কেমন যেন হয়ে গেলেন।’

মানিক বলল, ‘এরকম জায়গায়, এরকম বাড়িতে অদ্ভুত মানুষ ছাড়া আর কাকে পাবি বল? বাদ দে তো। ওসব ভেবে কী লাভ? আমাদের দরকার রাতের মতো একটা আশ্রয়। পেয়ে গিয়েছি, ব্যস। সকাল হলেই তো চলে যাব।

বাইরে তখন রাত আরও নিঝুম হয়ে এসেছে। মাঝে-মাঝে আকাশে মেঘের ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ঘরে মোমবাতির ক্ষীণ আলোর শিখা থরথর করে কাঁপছে। এখনই বুঝি নিভে যাবে। চারপাশে কোনো জনমানুষের সাড়া নেই। শুধু আমরা দু-জনেই যেন প্রেতপুরীতে জেগে আছি।

একটু পরেই আবার শুরু হল বৃষ্টি। সেইসঙ্গে হাওয়া। মোমবাতিটা প্ৰায় ফুরিয়ে এসেছে। খানিক পরেই নিভে যাবে। হাতঘড়িতে সময় দেখলাম। পনেরো মিনিট বাকি আছে দশটা বাজতে। গাঁ-গঞ্জের হিসাবে অনেক রাত। আমাদের আর কিছুই করার ছিল না। সঙ্গের খাবার খেয়ে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। ব্যাগ দুটো মাথার নীচে থাকল বালিশের মতো করে।

কতক্ষণ শুয়ে ছিলাম জানি না। চোখেও ঘুম জড়িয়ে এসেছিল। মানিকের কথায় তন্দ্রা কেটে গেল।

‘বিকাশ, বিকাশ, দেখ! অদ্ভুত ব্যাপার!’

মোমবাতি তখন শেষ হয়ে নিভে গিয়েছে। ঘরের মধ্যে ঘোর অন্ধকার। বাইরে বৃষ্টি আর হাওয়ার শব্দ। মনে হল, মানিক বিছানার উপর উঠে বসে আছে।

বললাম, ‘কী হয়েছে? কী দেখব?

মানিক বলল, ‘দেওয়ালের ছবিটার দিকে দেখ। অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।’

ছবিটার দিকে তাকিয়েই ভয়ানক চমকে উঠলাম। এ কী অবিশ্বাস্য ব্যাপার! অন্ধকার ঘরে আর কিছু দেখা না গেলেও ছবিটা কিন্তু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এতটাই পরিষ্কার, যেন দিনের আলোয় ছবিটা দেখছি। তেমনই উজ্জ্বল, তেমনই স্পষ্ট। চারধার অন্ধকার, শুধু ছবির জায়গায় অন্ধকার নেই। এ কেমন করে সম্ভব!

মানিক বরাবরই যথেষ্ট সাহসী ছেলে। কিন্তু সে-ও দেখলাম এমন অবিশ্বাস্য ঘটনায় যথেষ্ট ঘাবড়ে গিয়েছে। বলল, ‘ছবির দিকে তাকানোর দরকার নেই। আয়, দু-জনে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি। রাত কেটে যাবে এক সময়।’

তখনই দূরে কোথায় একটা কুকুর কান্নার মতো করে ডেকে উঠল। কিছুক্ষণ সেই ডাকটা একটানা চলতেই থাকল। তারপর আস্তে আস্তে বৃষ্টি আর হাওয়ার শব্দের মধ্যে ডাকটা মিশে গেল এক সময়। ঘরের সামনে দিয়ে কী যেন একটা ছুটে গেল। শিয়াল-কুকুর হবে।

আমি আর মানিক পাশাপাশি শুয়ে ছিলাম। ঘুমনো তো যাবে না। চোখ বন্ধ করে কোনোমতে রাতটা কাটিয়ে দেওয়া আর কী। যে দিকের দেওয়ালে ছবিটা, আমরা পাশ ফিরে তার উলটো দিকে মুখ রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলাম।

বাইরে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। দুর্যোগের রাত আস্তে আস্তে গভীর হচ্ছে। এক অপার্থিব পরিবেশে আমরা বিনিদ্র হয়ে শুয়ে থাকলাম।

তখন অনেক রাত। মানিককে ফিসফিস করে বলতে শুনলাম, ‘ঘরের মধ্যে কেউ আছে। নিশ্চয়ই আছে। হেঁটে চলে যাচ্ছে কোনো মহিলা। আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছি।’

আমি কান খাড়া করে শুয়ে রইলাম। প্রথমে কিছু না বুঝলেও একটু পরেই টের পেলাম। হ্যাঁ, আমরা দুজন ছাড়া আর-একজন কেউ আছে এই ঘরে। খসখস করে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হচ্ছে। শাড়ি পরে চললে যেমন শব্দ হয়, সেরকম। শুধু শব্দ নয়, অন্যরকম একটা গন্ধও ভাসছে এই ঘরে! যেন কোনো অজানা লোকের কাছ থেকে ভেসে আসছে গন্ধটা।

কী মনে হল, আমি ছবিটার দিকে তাকালাম। আর তাকাতেই অবাক হয়ে গেলাম। কী আশ্চর্য, ছবিটা তো আর দেখা যাচ্ছে না। সব কিছুর মতো ছবিটাও অন্ধকার ঘরের দৃষ্টির অগোচর হয়ে আছে। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে এল। তবে কি ওই ছবির সঙ্গে এই ঘরে কারও থাকার কোনো সম্পর্ক আছে!

বললাম, ‘মানিক, দেখ, দেখ, ছবিটা কিন্তু অন্ধকারে আর দেখা যাচ্ছে না।’

মানিক ছবিটার দিকে তাকাল। বুঝলাম, সে-ও ছবিটা দেখতে পাচ্ছে না। কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, ‘অদ্ভুত ব্যাপার তো! দাঁড়া টর্চ জ্বালিয়ে দেখি।

তখনই খিলখিল করে মেয়েলি হাসির শব্দ শোনা গেল। কে যেন দৌড়ে গেল দরজার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে মানিকের টর্চ জ্বলে উঠল। দরজা খুলে যে এইমাত্র বাইরে গেল, তার শাড়ির আঁচলের প্রান্তটা নিমেষের জন্য দেখা গেল। অবিকল একই শাড়ি, ছবির মেয়েটা যে শাড়ি পরে আছে!

মানিকের টর্চের আলো এবার এসে পড়ল ছবিটার উপর। এ কী। ছবি কোথায়? একটা সাদা কাগজ শুধু ছবির ফ্রেমে আটকানো রয়েছে। কোনো ছবি নেই।

টর্চ নিভিয়ে আমরা দু-জনে ঘেঁষাঘেঁষি করে হিম হয়ে বিছানায় বসে রইলাম।

সারারাত অবশ্য আর কোনো ভৌতিক ব্যাপার ঘটল না।

ভোরের আলো ফুটতেই এক মুহূর্ত দেরি না করে ব্যাগ নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম চৌধুরীবাড়ি থেকে। যাওয়ার সময় ভবানীখুড়োকে বলে যাওয়াও হল না। কাছেপিঠে কোথাও দেখলাম না তাঁকে। মনে হল, তখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। কিন্তু তাঁর জন্য তো আর দেরি করা চলে না। সকালের ট্রেনটা ধরতেই হবে।

তখন আর বৃষ্টি নেই। যদিও আকাশ মেঘে ঢেকে আছে। আধমাইল রাস্তা হনহন করে হেঁটে সকাল-সকালই স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।

স্টেশনমাস্টার স্টেশনেই ছিলেন। আমাদের দেখে বললেন, ‘এই যে, আসুন, আসুন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাদের ট্রেন এসে যাবে। লাইন ক্লিয়ার হয়ে গিয়েছে। বসুন, চা খান।

টেবিলের উপর একটা বড়ো ফ্লাস্ক ছিল। সেখান থেকে দুটো কাপে চা ঢেলে আমাদের দিলেন। সকালে গরম গরম চা খেয়ে ভালোই লাগল।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মানিক বলল, ‘চৌধুরীবাড়ির ব্যাপারস্যাপার কী বলুন তো? অদ্ভুত অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে দেখলাম কাল রাতে।’

স্টেশনমাস্টার বললেন, ‘বলব, বলব। বলব বলেই তো আপনাদের বসতে বললাম। আপনারা তো দিব্যি একটা রাত কাটিয়ে এলেন। কিন্তু রাতে থাকা তো দূরের কথা, দিনের বেলাতেও কেউ পা দেয় না ওই বাড়িতে।’

আমি বললাম, ‘কেন বলুন তো?’

‘সে অনেক কথা। যতটুকু জানি, বলছি।’

স্টেশনমাস্টার ডিবে থেকে একটিপ নস্যি নিয়ে নাকে দিলেন। রুমাল দিয়ে নাক মুছলেন। তারপর আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, ‘তা হলে শুনুন।’

স্টেশনমাস্টার যা বললেন, তা এরকম—

অনেক বছর আগে চৌধুরীরা ওই অঞ্চলের সম্পন্ন জোতদার ছিলেন। কিন্তু পর পর কয়েক বছর ভয়ানক অজন্মা হওয়ায় তাঁরা জমিজমা ছেড়ে চলে যান। থেকে গেলেন শুধু তাঁদের এক বংশধর ভবানী চৌধুরী, যাঁকে সবাই এখন ভবানীখুড়ো বলে চেনে। তিনি গেলেন না শুধু একটা কারণে, নিজের একমাত্র সন্তান আদরের কন্যা টুসকির জন্য। অকালে স্ত্রী গত হওয়ার পর ভবানীখুড়ো ওই মেয়েকে নিয়েই থাকতেন। হাসিখুশি, চঞ্চল। দেখতেও খুব সুন্দর ছিল টুসকি। তো, এই মেয়ের যখন বিয়ের বয়স হল, পাত্রের খোঁজখবর চলছে, এমন সময় একদিন বাড়ির বাগানে সাপে কামড়াল টুসকিকে। আর, তাতেই তার মৃত্যু হল। মৃত্যুর এই আঘাতকে মেনে নিতে পারলেন না ভবানীখুড়ো। কোথাও গেলেন না। আদরের মেয়ের স্মৃতি আগলে পড়ে রইলেন এই বাড়িতে। কেমন যেন পাগল-পাগল হয়ে গেলেন মানুষটা। ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করেন না। বাইরে বের হন না। বাড়ির মধ্যে প্রেতগ্রস্তের মতো গুম মেরে বসে থাকেন।

‘ঘটনা কি শুধু এই?’

মানিকের প্রশ্নে স্টেশনমাস্টার মাথা নাড়লেন, ‘না, ঘটনা শুধু এই নয়, আর-একটু আছে। সেটাই আসল। নিশ্চয়ই দেখেছেন, টুসকির একটা ছবি আছে চৌধুরীবাড়ির একটা ঘরে। লোকে বলে, প্রত্যেক বছর আষাঢ় মাসের সাতাশ তারিখে সেই ছবি নাকি জীবন্ত হয়ে ওঠে। গভীর রাতে ছবি থেকে নেমে আসে টুসকি। একটা আশ্চর্যের ব্যাপার, সেই রাতে নাকি কালঘুম নেমে আসে ভবানীখুড়োর চোখে। অনেক চেষ্টা করেও জেগে থাকতে পারেন না। অনেক বেলা পর্যন্ত নাকি অঘোরে ঘুমোন! শোনা কথা সব, সত্যি-মিথ্যে বলতে পারব না। তবে, ওই দিনই, সাতাশ আষাঢ় টুসকিকে সাপে কেটেছিল।’

চকিতে একটা কথা মনে এল। বললাম, ‘কাল বাংলা মাসের কত তারিখ ছিল?’

অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে স্টেশনমাস্টার বললেন, ‘সাতাশ। আষাঢ় মাসের সাতাশ তারিখ। নিন, তৈরি হয়ে নিন। আপনাদের ট্রেন এখনই এসে যাবে।’

[ আনন্দমেলা, মার্চ ২০০৬]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *