ঋণ শোধ – গৌরী দে

ঋণ শোধ – গৌরী দে

মিহির বিজ্ঞানের ছাত্র। কোনো অলৌকিক ব্যাপারে সে বিশ্বাসী নয়। কিন্তু একটা ব্যাপার তাকে বড়ো অস্থির করে তুলেছে। আজ ক-দিন ধরে রাত্তিরে ঘুমোলেই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে ক্রমান্বয়ে। ছোটোবেলায় ‘নিশিডাকা’র গল্প শুনেছিল মিহির। এ কি সেই নিশির ডাক? নিজের মনেই হেসে ওঠে মিহির। সব তার অবচেতন মনের প্রতিক্রিয়া। এর বাইরে কিছু আছে বলে তার বিশ্বাস হয় না। কিন্তু এক-আধদিন নয়, প্রায় দশদিন ধরে চলছে এসব। মিহির কাউকে না জানিয়ে একজন মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে দেখা করে। তাকে জানতে হবে এমন কেন হচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানী ডা. জয়ন্ত দত্ত সব শুনে একটু চুপ করে কী যেন ভাবলেন। তারপর নানারকম প্রশ্ন করতে লাগলেন মিহিরকে। শেষে রায় দিলেন, ক-দিনের জন্যে একটু বাইরে কোথাও ঘুরে আসুন। দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে।

সেই রাতেই মিহির ক্লাবে গিয়ে কথাটা পাড়ল। বলল, সামনে পৌষমেলা, চল শান্তিনিকেতনে ঘুরে আসি।

নেচে উঠল প্রবাল, স্বপন, অলকেশ— রাজি। কিন্তু ওখানে তো এখন সব ভরতি, উঠব কোথায়?

মিহির ভ্রূ নাচিয়ে বলে, সেটা আমার দায়িত্ব। ওখানে আমার মামাতো ভাইয়ের বাড়ি আছে। খুব বড়ো বাড়ি। গিয়ে উঠতে পারলে দারুণ মজা।

অলকেশ বলে, কিন্তু আর তো মাত্র তিন দিন হাতে রয়েছে, খবর পাঠাবি কী করে?

মিহির বলল, নো প্রবলেম, আমি আজই জানিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমার একটা শর্ত ছিল।

তিন বন্ধু বেশ শঙ্কিত হয়ে ওঠে। বলে, কী শর্ত?

ট্রেন কিংবা বাসে নয়, আমরা যাব সাইকেল চালিয়ে। কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন রীতিমতো লোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চার হবে। দেখ রাজি তো বেরিয়ে পড়ি কালই। নয়তো ছেড়ে দাও।

কলকাতা থেকে সাইকেলে অতটা রাস্তা, মিহির বলে কী! বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ চুপ। তারপর হঠাৎ নীরবতা ডেঙে কথা বলে স্বপন। বলে, ঠিক আছে আমি রাজি।

অলকেশ স্বপনের দিকে তাকিয়ে বলল, যাওয়া যায় কিন্তু থামতে থামতে। দিনে বারো ঘণ্টার বেশি কিছুতেই সাইকেল চালানো হবে না।

প্রবাল হাতে গুনে গুনে হিসেব করে বলল, ঠিক। ভোর ছ-টা থেকে বারোটা পর্যন্ত চালাবার পর দু-ঘণ্টা রেস্ট। তারপর আবার দুটো থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চালিয়ে কোনো হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন আবার…।

মিহির বলল, আমিও তাই বলতুম, তবে আমার মনে হয় একনাগাড়ে ছ-ঘণ্টাও অনেক। এই ছ-ঘণ্টায় অন্তত তিন বার থামা উচিত।

প্রবাল বলল, সেটা অবস্থা বুঝে, কোথায় কীরকম জায়গা বা গ্রাম পাব, তার ওপর নির্ভর করবে।

মিহির জোর গলায় বলে ওঠে, তাহলে আর দেরি নয়, কালই ভোর ছ-টায় স্টার্ট।

পরদিনই বেরিয়ে পড়ল ওরা। সন্ধে গড়িয়ে রাত হতে চলল। রাতের মতো থামতে হয়। সামনে দুটো পথ দু-দিকে বেঁকে গেছে। কোনটা কোথায় গেছে কে তা জানে! প্রবাল বলল, আমার মনে হয় বাঁ-দিকেরটা গ্রামের দিকে গেছে।

সবাই বলল, হতে পারে। চল না একটু এগিয়ে দেখা যাক।

ওরা বাঁ-দিকের রাস্তায় ঢুকে পড়ল। মিহির ছিল একদম পেছনে, আশ্চর্য, হাজার চেষ্টা করেও সে বাঁ-দিকে বেঁকতে পারল না। বন্ধুদের চিৎকার করে ডাকতে গেল, স্বর বেরোলো না। সাইকেলের প্যাডেল থেকে সে পা সরিয়ে নিল।

কিন্তু এ কী ব্যাপার! তার সাইকেল ডান দিকে বেঁকে ছুটছে, বিদ্যুৎ গতিতে। সমস্ত শক্তি হারিয়ে পাথরের মতো বসে রইল মিহির সাইকেলের ওপর নিজেকে ছেড়ে দিয়ে। চলছে তো চলছেই। অনেকক্ষণ পরে মিহির দেখল সাইকেলটা এসে একটা কুঁড়ে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।

মিহিরের সামনে দাঁড়িয়ে এক শননুড়ি বুড়ি। কত বয়স দেখলে বোঝা যায় না। হাতে একটা প্রদীপ, তার ক্ষীণ আলোয় বুড়ির মুখটাও ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। বুড়ি বলল, এসো, তোমার জন্যে কবে থেকে বসে আছি বাবা, এবার আমায় মুক্তি দাও।

মিহির অবাক হয়ে বলল, আপনি কে? আমি তো আপনাকে চিনতে পারছি না। বুড়ি বলল, সব বলব, তুমি আগে ঘরে এসে বোসো।

মিহির ছটফট করে উঠল। বলল, বসব? সেকী? আমার বন্ধুরা যে আমায় খুজছে। আমার জন্যে ওরা অপেক্ষা করে থাকরে যে।

বুড়ি উত্তর দিল, আর আমি? আমি যে কতকাল ধরে অপেক্ষা করে আছি এই দিনটার জন্যে! আমি তোমার কাছে মুক্তি চাই বাবা।

মিহির বিরক্ত হয়ে বলল, তখন থেকে কী মুক্তি মুক্তি করছেন? আমি মুক্তি দেব কী করে!

বুড়ি কোনো কথা না বলে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। মিহির পালাতে গেল, পারল না। কে যেন তাকে টানতে টানতে ঘরের মধ্যে নিয়ে গেল।

আধো অন্ধকার ঘর। মিহির দেখল মাটিতে একটা আসন পাতা। আসনের সামনে থালায় কত রকমের ফল সাজানো। পাশে এক গেলাস শরবত। বুড়ি আসন দেখিয়ে বলল, তুমি ক্লান্ত। আগে খাও তারপর সব বলছি।

মিহিরের পেটে সত্যিই আগুন জ্বলছিল। খাবার দেখে সে নিজেকে সামলাতে পারল না। আসনে বসে পড়ে গোগ্রাসে খেতে লাগল। তারপর খাওয়া শেষ হতে- না-হতেই ক্লান্তিতে শুয়ে পড়ল পাশেই রাখা বালিশ আর মাদুরের ওপর।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে কে জানে! হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতে মিহির দেখল, অন্ধকার হালকা হয়ে এসেছে, ভোর হতে আর দেরি নেই। সেই আলো-আঁধারিতে সামনে তাকাতেই চমকে উঠল সে। একটা অবয়ব। বুড়িটা ঠায় বসে আছে, ঘরের প্রদীপ কখন নিভে গেছে। ধড়ফড় করে উঠে বসল মিহির। মুখটা ভয়ে শুকিয়ে গেল। এ সে কোথায় এসে পড়ল! বুড়ি একদৃষ্টে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে সব লক্ষ করছিল। এবার সে বলল, ভয় পেও না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব বলে আনিনি। তোমাদের একটা গচ্ছিত ধন আছে আমার কাছে। সেটা তোমার হাতে দিয়ে ঋণমুক্ত হতে চাই বাবা। তুমি নিয়ে আমায় মুক্তি দাও।

মিহির অবাক হয়ে বলল, আপনি কোনো ভুল করছেন না তো!

বুড়ি মিহিরের কথার কোনো উত্তর দিল না। নিজের মনে বলতে লাগল, তখন আমার বয়স কম। একটা নার্সিং হোমে নার্সের কাজ করে সংসার চালাই। বাড়িতে একমাত্র আপনার জন আমার বাবা, তাও অসুস্থ। একদিন ওই নার্সিং হোমে তোমার মা ভরতি হলেন। তুমি হলে। তোমার বাবা নার্সিং হোমের মালিকের সঙ্গে কথা বলে তোমাকে দেখাশোনা করার জন্যে আমাকে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে এলেন। একটা বছর তোমাকে বুকে জড়িয়ে কাটিয়েছি। মাঝে মাঝে ছুটি নিয়ে বাড়ি এসে বাবাকে দেখে যেতাম। হাতে দুটো পয়সা এল। বাবাকে ভালো করে চিকিৎসা করাব বলে কলকাতায় নিয়ে এলাম। সাহেব ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার দেখে-শুনে বললেন ছোট্ট একটা অপারেশান করলে বাবা ভালো হয়ে যাবেন। কিন্তু এর জন্যে চাই হাজার পাঁচেক টাকা। তোমার বাবা ছিলেন খুব রাশভারী। টাকার কথা বলতে ভয় হল। কী করবো ভাবছি এমন সময় দেখলাম, তোমার বাবা পাঁচ হাজার টাকা এনে তোমার মায়ের কাছে দিয়ে বললেন, সাবধানে রাখো। এটা খোকার অন্নপ্রাশনের টাকা।

টাকাটা তোমার মা তাড়াতাড়িতে আলমারিতে না তুলে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিলেন। আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না। ভাবলাম হাতের লক্ষ্মী কেন পায়ে ঠেলি। চাইলে অত নাও দিতে পারে। আবার ভাবলাম এ তো চুরি। ছিঃ! শেষ পর্যন্ত আমি চোর বদনামের ভাগি হব? কিন্তু আশ্চর্য, বার বার মন থেকে কে যেন বলতে লাগল, না না, এ তো চুরি নয়, প্রয়োজনে নেওয়া। ক-দিন পরে তো পুরো টাকাই শোধ দিয়ে দেব।

দুপুরবেলা চুপি চুপি টাকা নিয়ে পালিয়ে এলাম। আমি যা বলেই মনকে সান্ত্বনা দিই না কেন, না বলে নেওয়া তো চুরিই। টাকা নিয়ে ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে হারালাম। এ টাকা বাবা ছুঁলেনও না। আমি এতবড়ো অন্যায় করে আর ফিরে যেতে পারলাম না। টাকাটা একটা কাপড়ে মুড়ে তুলে রাখলাম। রোজ ভাবতাম কী করে ফেরত দেওয়া যায় ওটা।

ভাবতে ভাবতেই কেটে গেল কতগুলো বছর। হঠাৎ একদিন গ্রামে ওলাওঠা হল। ঘরকে ঘর উজাড় করে দিল। আমারও দিন শেষ হয়ে গেল। অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে টাকাটাকে আগলে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। ইতিমধ্যে তোমার বাবা-মা দু- জনেই মারা গেলেন, যার টাকা তাকে দিতে পারলাম না। অপেক্ষা কবে রইলাম করে তুমি আসবে। সোজাসুজি যাবার ক্ষমতা থাকলেও, টাকা ফেলে যেতে পারতাম না। তাই স্বপ্নে তোমায় টানতে লাগলাম।

মিহির বলল, মা-বাবা ছাড়া একথা আর কে জানে?

বুড়ি হাসল, বলল, যাচাই করে নেবে? বেশ তো। তোমাদের বাড়িতে যে অল্পবয়সি দারোয়ান ছিল, সে এখন বুড়ো হয়েছে, সে ব্যাপারটা জানে। তবে আমিই নিয়েছি একথা ভাবতে পারেনি। বুড়ি মিহিরের হাতে শতচ্ছিন্ন একটা কাপড়ের পুঁটুলি দিয়ে বলল, বলো, এর দায়িত্ব আমি গ্রহণ করলাম।

মিহির সেটা হাত পেতে নিতেই বুড়ি অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মিহির সবিস্ময়ে দেখল সে রাস্তার ধারে শুয়ে আছে, পাশে পড়ে তার উলটোনো সাইকেল। প্রথমটা কিছুই বোধগম্য হল না তার। তারপর মনে পড়তে লাগল ধীরে ধীরে। তখনও সূর্য ওঠেনি। মিহির ভাবল তাহলে কি সবটাই স্বপ্ন! অথচ বন্ধুদের কী হল! গা ঝেড়ে সাইকেলটা তুলতে গিয়ে হাতে লাগল সেই ছেঁড়া ময়লা পুটুলিটা। মিহির খুলে দেখল পুরোনো খবরের কাগজে মোড়া পুরো পাঁচ হাজারই রয়েছে।

একটা ব্যাপার তার খুব আশ্চর্য লাগছে। সে এমন একটা জায়গায় কী করে এল! লোক নেই জন নেই এ কেমন জায়গা! সাইকেলে চেপে মিহির উলটো দিকে চলল। ওর মনে আছে একটা মোড়ের মাথায় রাস্তাটা দু-ভাগ হয়ে গিয়েছিল। ওখান থেকেই বন্ধুদের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি। কিন্তু অনেকক্ষণ কেটে গেল, রোদের তেজটাও প্রখর হচ্ছে, সেই মোড়টা আর আসে না। আরও খানিকটা যাবার পর কিছু লোকের বসতি পাওয়া গেল। মিহির খানিকটা আশ্বস্ত হল। সামনেই একটা চায়ের দোকানের ছাউনির তলায় বসেছিল কয়েক জন লোক। মিহির তাদের কাছে গিয়ে বলল, দেখুন, কাল আমরা চার বন্ধু সাইকেলে করে একসঙ্গে আসছিলাম। পথে একটা বাঁক পড়ল, আমি ওদের থেকে আলাদা হয়ে পড়লাম। তারপর আর ওদের দেখতে পাচ্ছি না। এরকম কয়েক জনকে আপনারা কি দেখেছেন?

চায়ের দোকানে একজন অল্পবয়সি ছেলে ছিল। সে বলল, কাল রাত্তিরে তিনজন লোক সাইকেল চড়ে এসেছিল। আমার দোকানে চা খেল। ওরা বলাবলি করছিল ওদের একজনকে খুঁজে পাচ্ছে না…

ছেলেটিকে প্রায় থামিয়ে দিয়ে মিহির ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে, আমি… আমিই সে! ওরা কোনদিকে গেছে কিছু বলতে পারো ভাই?

ছেলেটি বলল, ঠিক জানি না। তবে ওদের বলতে শুনেছিলাম আজ ভোরে ওরা আপনার জন্যে রাস্তাতেই অপেক্ষা করবে। মনে হয় ওরা অপেক্ষা করে করে চলে গেছে।

একজন বয়স্ক লোক বলে ওঠে, তাহলে ওঁরা এগিয়েই গেছেন, তা আপনারা যাচ্ছিলেন কোথায়?

শান্তিনিকেতন… সাইকেলে, বলল মিহির।

বয়স্ক লোকটা বলল, এখানে তো হারাবার মতো ভিড়ভাট্টা নেই। তবে হারালেন কী করে?

মিহির সাইকেল থামিয়ে বসল। বলল, একটু চা দেবে ভাই, গলাটা শুকিয়ে গেছে। তারপর বয়স্ক মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল, একটা মোড় পর্যন্ত একসঙ্গেই তো ছিলাম। ওরা ঘুরল বাঁয়ে, আমার সাইকেল আমাকে নিয়ে ছোটাল ডান দিকে।

লোকগুলো মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর বয়স্ক মানুষটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ঈশ্বরের অনেক কৃপা আপনি আস্ত ফিরে এসেছেন।

কেন? একথা বললেন কেন? মিহির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।

ওরা বলল, আপনি যে রাস্তার কথা বললেন, দশ বছর আগে ওইরকম বাঁকের পাশ দিয়ে ডান দিকে ঘুরলেই ছিল হরিনারায়ণপুর। ছোট্ট একটা গ্রাম। প্রায় সব ঘরেই খেটে খাওয়া মানুষের বাস ছিল। এদের স্ত্রী-পুরুষ সব কলকাতা যেত চাকরি করতে। হঠাৎ একদিন ওলাওঠায় গ্রামটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। সেই থেকে…. ওরা চুপ করে যেতেই, মিহির উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করে, বলুন, আমায় শুনতে হবেই।

ওরা বলতে লাগল, সেই থেকে ওই রাস্তা দিয়ে কেউ যায় না। আর গেলেও ফিরে আসতে পারে না প্রাণ নিয়ে।

মিহির বিংশ শতাব্দীর ছেলে, বিজ্ঞানের ছাত্র। যুক্তি-তর্কের আড়াল সরিয়ে সত্যকে উদ্ঘাটন করা তার কাজ। মৃত্যুর পরের অস্তিত্ব সে স্বীকার করে না। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে তার মনের কোণে জমা হয়েছে সন্দেহের কালো মেঘ। পাঁচ হাজার টাকার অস্তিত্ব সে অস্বীকার করতে পারছে না। সমস্ত ব্যাপারটা যাচিয়ে না দেখলে সে শাস্তিও পাবে না।

মিহির সাইকেলে চড়ে বসল। একনাগাড়ে ঘণ্টা তিনেক চালাবার পর সে যে গ্রামে এসে পৌঁছোল, তাকে গ্রাম না বলে ছোটোখাটো শহর বলা চলে। অন্য বন্ধুরা এখানেই অপেক্ষা করছিল। মিহিরকে উদ্ভ্রান্তের মতো আসতে দেখে ওরা এগিয়ে এল। মিহিরের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে খুঁজছে কোথাও যদি একটা ফোনের ব্যবস্থা থাকে। ওকে জানতেই হবে এর শেষ কোথায়। বন্ধুরা ওকে অনেক বুঝিয়ে নিয়ে এল শান্তিনিকেতনে।

সন্ধে গড়িয়ে রাত নামছে। মিহিরের কলকাতার বাড়িতে ফোন বেজে উঠল। বুড়ো দারোয়ান ছুটে এল ফোন ধরতে।

হ্যালো!

কে রামদীন?

হ্যাঁ সাব—।

শোনো রামদীন, সত্যি কথা বলো। আমার জন্যে একজন আয়া রাখা হয়েছিল ছোটোবেলায়, তোমার মনে আছে?

জি, আছে।

সে কি টাকা চুরি করেছিল?

ওদিক থেকে কোনো উত্তর নেই। অস্থির হয়ে মিহির চেঁচিয়ে উঠল, কী হল তাড়াতাড়ি বলো—

গড়গড় করে বলে যায় রামদীন। তার তখন অল্প বয়েস। সবে মিহিরদের বাড়িতে ঢুকেছে। হঠাৎ একদিন খুব হইহই। কর্তামার ঘর থেকে পাঁচ হাজার টাকা চুরি গেছে। সেইসঙ্গে খোকাবাবুর জন্যে রাখা আয়াটাও নিরুদ্দেশ। অনেক খোঁজখবরের পর অবশেষে সকলেই স্বীকার করল এ কাজ ওই আয়ারই। তবে সবটাই আন্দাজ। প্রমাণ নেই। তাই হঠাৎ কাউকে সন্দেহ করে চোর প্রমাণ করা যায় না।

মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্বে মিহিরের কোনোদিন আস্থা ছিল না। আজকের ঘটনা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে গেল। তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিশ্বাসের এই দ্বন্দ্ব তাকে এবার নতুন করে ভাবিয়ে তুলল।

[ শারদীয়া শুকতারা, ১৪০৬ (১৯৯৯) ]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *