ননীবালাদের পিকনিক – শ্যামল দত্তচৌধুরী

ননীবালাদের পিকনিক – শ্যামল দত্তচৌধুরী

নতুন বাড়িতে যেদিন এসেছিলাম সেই রাতেরই ঘটনা। দিদি আর আমি একই ঘরে শুয়েছি। লাগোয়া একটা ছোট্ট ঘর আছে। দিদির ইচ্ছে ওটাকে পড়ার ঘর করবে, আমাকে ঢুকতে দেবে না। দিদি খুব গার্ডিয়ানি ফলায় আমার উপর।

রাতে দুজনে ঘুমোচ্ছি। হঠাৎ দুম করে খুলে গেল পাশের ঘরের দরজাটা। বাতাসের ঝাপটা নেই, কিছু না, যতবারই দরজাটা ভেজানো হয় বার বার সশব্দে খুলে যায়। ওই ঘরে খুটখাট আওয়াজ, পদশব্দ। দীর্ঘনিশ্বাস। ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিল। দিদির ভরডর নেই। একবার সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে ঘরটা ঘুরে দেখে এল। আমি কাঁপা-কাঁপা গলায় বললাম, ‘কী দেখলি রে?’

‘কিছু না,’ গম্ভীর গলায় দিদির উত্তর, ‘ইঁদুর-টিদুর হবে।’

মফস্সলে একটা পুরোনো একতলা বাড়ি কিনে বাবা ধীরে-ধীরে বাসযোগ্য করে নিয়েছেন। অবশেষে শুভদিন দেখে ঠাম্মাকে নিয়ে সতীনাথ নস্কর লেনের ভাড়াবাড়ি ছেড়ে আমরা, চলে এসেছি এখানে। কিন্তু প্রথম রাতেই ওই কাণ্ড! দিদি ভুরু কুঁচকে বলল, ‘কাউকে বলবি না যেন।’

দিদি পড়ে ক্লাস নাইনে, আমি ফাইভে। একই স্কুলে। এই বাড়ি থেকে আমাদের স্কুল অনেকটা দূর হয়ে গিয়েছে। আমরা দুই বোনে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ি সকালে সাতটার মধ্যে।

দিদি ওর পড়ার টেবিল আর বই, খাতাপত্র সাজিয়ে নিয়েছে পাশের ছোটো ঘরটায়। সেই রাতেও ওই ঘরে চলাফেরার শব্দ, নানারকম আওয়াজ। সকালে দেখা গেল দিদির বই, খাতা, রিপোর্ট বুক সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে আছে। দিদি বলল, ‘নাহ সুমি, এবার অ্যাকশন নিতে হবে। সাহস বেড়ে যাচ্ছে…’

আমি বললাম, ‘কার? আমার ভয় করছে রে দিদি, কী হবে?’

‘চুপ, কেউ যেন জানতে না পারে।

দিদির কথা অমান্য করব অত সাহস আমার নেই। আমার ভয় মনে- মনেই চেপে রাখলাম। বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় দিদি আমাকে চুপিচুপি বলল, ‘প্রিয়াঙ্কা বলেছে ওই ঘরটায় আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

জলখাবার খেয়ে দিদি পাশের ঘরটায় গিয়ে শুনিয়ে-শুনিয়ে বলতে লাগল, ‘এই ঘর আমার। আমি এখানেই থাকব, লেখাপড়া করব। আমি ছাড়া এই ঘরে কারও রাইট নেই। কেউ ফালতু বিরক্ত করার চেষ্টা করলে আমি কিন্তু সহ্য করব না। আমি পুলিশের ডি এস পি রামানুজ পালকে চিনি। খুব কড়া লোক, মনে থাকে যেন।

রামানুজ পাল আসলে প্রিয়াঙ্কার বড়োমামার নাম। প্রিয়াঙ্কা দিদিকে বলেছে, সাধারণ মানুষের মতোই পুলিশকে ভূতেরাও নাকি ভয় পায়।

দিদির সাহস আছে বটে। কিছুতেই ঘরটার দখল ছাড়ল না। আমাকে একলা ফেলে পাশের ঘরটায় রাতে বিছানা করে ঘুমোল। তারপর ধীরে- ধীরে উৎপাত কমে গিয়েছিল। মাঝে-মাঝে আমাদের চোখের সামনেই একটা বাচ্চা মেয়ে দেওয়াল থেকে বেরিয়ে এসে উলটো দিকের দেওয়ালে প্রবেশ করতে। তার বয়স আট-ন বছর। আগেকার দিনের মেয়েদের মতো ওর পরনে ডুরে খাটো শাড়ি, আঁচল গুঁজে রাখে কোমরে। গোলগাল অবয়ব, যদিও অস্পষ্ট। দেখতে লাগে যেন পাকা গিন্নি। কখনো তার দুর্বল ক্ষীণস্বর শুনতে পেতাম। সে আমাকে ‘সুমি’ নামে ধরে ডাকত আর কেন জানি না, দিদিকে ডাকত ‘মা’। দিদি ওর নাম দিয়েছিল ননীবালা। মেয়েটা আমাদের আর বিরক্ত করত না। একলা একলা ঘরের মধ্যে খেলে বেড়াত। ওকে আমরা আমাদেরই একজন বলে মেনে নিয়েছিলাম।

তারপর কেটে গিয়েছে আঠারোটা বছর। ঠাম্মা পরলোকে। বাবার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক, তার চার বছর পরে মা-ও চলে গেলেন। দিদি এখন কলেজে পড়ায়। বছরদুয়েক আগে অনুপদাকে বিয়ে করেছে। আমি এস এস সি পাশ করে স্কুলে পড়াই। ননীবালার কিন্তু বয়স বাড়েনি। এখনও সেই ডুরে শাড়ি পরে ঘরে এক্কাদোক্কা খেলে।

একবার দিদি আর অনুপদা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাড়ি বিক্রি করে দেবে। শহরের কাছাকাছি ফ্ল্যাট কিনবে। অনুপদার অফিস বেশ দূর হয়ে যাচ্ছিল। যাতায়াতে খুব কষ্ট। তারপর দালালরা যাওয়া-আসা শুরু করল। মাঝেসাঝে খরিদ্দার নিয়ে আসে। তখন এক নতুন উপদ্রব শুরু হল।

এক ভদ্রলোক আর তাঁর স্ত্রী এসেছেন বাড়ি দেখতে। দিদি তখন ছিল না বাড়িতে। অনুপদা তাদের নিয়ে ঘরগুলো ঘুরে-ঘুরে দেখাচ্ছিল। রান্নাঘরে ঢুকতেই মেঝেয় চাপ-চাপ টাটকা রক্ত, একটা বাচ্চা মেয়ের রক্তমাখা পায়ের ছাপ চলে গিয়েছে শোবার ঘর পর্যন্ত। মহিলা আঁতকে উঠেছেন, ‘ওরে বাবা, এসব কী?

তারপর স্বামীর হাত ধরে টানতে টানতে একদম বাড়ির বাইরে। অনুপদা কিছুই বুঝতে পারেনি। এত রক্ত হঠাৎ এল কোথা থেকে। আমি গিয়েছিলাম পাড়ায় টুকিদের বাড়িতে। বাড়ি ফিরে দেখলাম অনুপদা কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা মুখ করে বারান্দায় বসে আছে।

অনুপদা ননীবালার কথা জানে না। দিদি আর আমি বহু বছর ননীবালার সঙ্গে বাস করে ওকে আমাদের ফ্যামিলির একজন ভাবি। বিশেষ করে, মা-বাবা চলে যাওয়ার পরে ননীবালাই ছিল আমাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার। দিদি অনুপদাকে কখনো ননীবালার কথা বলেনি। হয়তো ওকে যদি অনুপদা আমাদের মতো মেনে নিতে না পারে, সেই ভয়ে। তাই ব্যাপারস্যাপার কী ঘটছে অনুপদা কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না।

দিদি আমাকে আড়ালে ডেকে বলল, ‘এই বাড়িতে অন্য লোক এসে থাকে বোধ হয় পছন্দ নয় ননীবালার। ও চায় না আমরা চলে যাই। তুই রাতে ওকে একটু বুঝিয়ে বলিস তো সুমি।’

রাতে অনেকবার ওকে ডাকাডাকি করলাম। ননীবালা এল না সামনে। তারপর ঘুমিয়ে পড়েছি। আচমকা ঘুম ভাঙল জোরে একটা আওয়াজে। পাশের ছোটো ঘরটা আজকাল বন্ধই পড়ে থাকে। সপাটে দরজা খুলে গেল। ননীবালা এসেছে। মেয়ের অভিমান হয়েছিল বোধ হয়। হওয়াই স্বাভাবিক, ওকে না জানিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম যে!

আদর করে ডাকলাম, ‘ননীবালা, আমার কাছে আয় রে। তোর সঙ্গে কথা আছে।’

পাশের ঘরে হঠাৎ যেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ধুপধাপ জিনিস পড়ছে, ভাঙছে। আমি সুইচ জ্বালতেই টিউবলাইট দু-বার দপদপ করে ভেঙে পড়ল ঝমঝম শব্দে। আমি বললাম, ‘ও ননীবালা, একটু শান্ত হ প্লিজ। বোঝার চেষ্টা কর।

কিন্তু কে শোনে আমার কথা। সমস্ত রাত লণ্ডভণ্ড করে একসময় ননীবালা কোথায় চলে গেল। দিদিকে বললাম, ‘খুব রেগে গিয়েছে ও। আমার কোনো কথা কানে তুলছে না।’

পরদিন অনুপদা বলে গিয়েছে দেরি হবে ফিরতে। দিদি এল আমার ঘরে, তারপর শুরু হল সাধ্যসাধনা। ননীবালাকে ডেকে-ডেকে হয়রান। অনেকক্ষণ পরে ননীবালার হঠাৎ দেওয়াল ফুঁড়ে আবির্ভাব। কোমরে গোঁজা ডুরে শাড়ির আঁচল। মুখ আবছা, কিন্তু থমথমে। দিদি বলল, ‘তুই রাগ করেছিস? এই বাড়ি বিক্রি করে আমরা চলে যাব ভেবেছিলাম। তোর বুঝি মত নেই?’

ননীবালা কোমরে দু-হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। অত্যন্ত ক্ষীণ স্বর শোনা গেল, ‘মা…’

দিদি একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘বেশ। তুই যখন চাস না, তখন থাক। অনুপকে আমি বুঝিয়ে বলব। আর দুষ্টুমি করবি না তো?’

বাড়ি বেচে নতুন ফ্ল্যাটে চলে যাওয়া আর হল না আমাদের। ননীবালা আবার আগের মতো লক্ষ্মী মেয়ে। ঘরে যাওয়া-আসা করে, নিজের মনে খেলে। দিদি আর অনুপদা চার বছরের জন্য যাবে আমেরিকা। আমি দিদিকে বললাম, ‘যাও তোমরা, এমন সুযোগ ক-জন পায়? ননীবালা আর আমি আছি, কোনো চিন্তা কোরো না।’ একদিন ওরা চলে গেল।

দিদি নিয়মিত আমাকে ফোন করে। মানদাদি সকাল-সকাল কাজ সেরে চলে যায়। আবার আসে বিকেলে। এই বাড়িতে নাকি তার গা ছমছম করে। কখনো-সখনো ননীবালা আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসু সুরে বলে, ‘মা?’

আমি বলি, ‘দিদি বেড়াতে গিয়েছে, আসবে ক-দিন পরে। তোর ভয় কী, আমি তো আছি।’ বাতাসে মিলিয়ে যায় ননীবালা।

ওকে বলেছি, ‘কক্ষনও মানদাদির সামনে আসিস না যেন। ও কাজ ছেড়ে চলে গেলে আমার কী হবে বল তো?’

ননীবালা বুঝদার মেয়ে। সমস্যাটা তক্ষুনি বুঝে গিয়েছিল।

একটা পুরোনো বাড়িতে আমি একলা মেয়ে থাকি। সঙ্গে আবার একফালি জমি। শনির দৃষ্টি এড়িয়ে কি থাকা যায়? স্টেশন রোডের এক প্রোমোটার লালুবাবু একদিন উপস্থিত। তার সঙ্গে দুজন শাগরেদ। আমার বন্ধু টুকির কাকা তাদের একজন। ওরকম চেহারার লোক দেখলে আমার কেমন ভয়-ভয় করে।

দিদি-অনুপদার সঙ্গে কথা না বলে আমি কিছু বলতে পারব না। এইসব কারণ দেখিয়ে সময় চাইলাম। ওরা নিজেরাই এঘর-ওঘর ঘুরে দেখতে লাগল। অচেনা কেউ আমার ঘরে ঢুকলে আমার ভালো লাগে না, তবু ভয়ে আপত্তি জানাতে পারলাম না। ভাগ্যিস মানদাদি গ্যাঁট হয়ে সারাক্ষণ আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল।

লালুবাবু বলে গেল, ‘এক মাস সময় দিলাম। আবার আসব।’

রাতে ফোনে সব শুনে দিদি, অনুপদা দারুণ ভয় পেয়ে গেল।

প্রথমবার লোকগুলো এসেছিল দিনের বেলা। এবার এল রাতে। মানদাদি চলে যাওয়ার পরে। দরজার বাইরে লালুবাবুর গলা, ‘দোরটা যে একবার খুলতে হবে দিদিভাই, দরকারি কথা আছে।’

ভিতর থেকে আমি যথাসাধ্য দৃঢ়স্বরে বললাম, ‘আসছে রবিবার সকালের দিকে আসুন। তখন দিদির ফোন আসবে।

লালুবাবুর গলা কঠিন হল, ‘দরজা খোল, নইলে ভাঙতে হবে!’

দরজা একটুখানি ফাঁক করতেই ওরা ঠেলে ঢুকে পড়ল। টুকির কাকা বলল, ‘টাইম ইজ আপ। ভালো দর পাচ্ছিস সুমি, বাড়ি খালি করে দে।’

লালুবাবুর অন্য চেলাটার হাতে ভোজালি চকচক করছে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।

কোনো রকমে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, ‘এই বাড়িতে আমি একা থাকি না, একটা ছোটো বোন আছে আমার। ও বাড়ি বিক্রি করতে চায় না।’

টুকির কাকা ধমকে উঠল, ‘মিথ্যে কথা! তোর ছোটো বোন! ডাক তাকে, এক্ষুনি ডাক।

আমি অসহায় গলায় ডাকলাম, ‘ননীবালা, ওরে ননীবালা, এদিকে একবার আয় তো। এরা বাড়ি কিনতে এসেছে।’

লোকগুলো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। হঠাৎ একজন আঁক করে উঠল। ডাইনিং টেবিলের নীচে ননীবালা রান্নাবাটি খেলছে। যেন রীতিমতো চড়ুইভাতি। ওরই বয়সি আরও সাতটা মেয়ে, কেউ লম্বা ফ্রক, কেউ শাড়ি পরেছে। ননীবালাকে ঘিরে রান্নার জোগাড় চলছে। আর খিলখিল করে হাসছে সকলে…

আমি নিজেই অবাক। ওদের তো আগে কখনো দেখিনি। ননীবালা ওর সখীদের ডেকে এনেছে নাকি? ওরা ছোটাছুটি করে লুকোচুরি খেলছে ঘরে। লালুবাবুর দল পায়ে-পায়ে পিছু হটছিল। হঠাৎ ঘরের ছাদ থেকে ওদের মাথায় টপটপ রক্ত পড়তে লাগল। ওরা ঊর্ধ্বশ্বাসে দে দৌড়!

রাতে দিদির ফোন এসেছিল। হাসতে হাসতে বলে দিলাম, ‘আমার ননীবালা থাকতে কাকে ভয়? তোরা চিন্তা করিস না রে দিদি…’

[ আনন্দমেলা, ৫ নভেম্বর ২০১৫ ]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *