বাইরের ডাকে

বাইরের ডাকে

ঠিক সে সময় একটা সুযোগ এল। ভারতীয় ছাত্ররা যেন বিজ্ঞান ও শিল্প বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারে, সেজন্য তাদেরকে বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য একটা সমিতি গঠন করা হয়েছিল। বাবা শুনেছিলেন যে খুব তাড়াতাড়িই প্রথম ব্যাচের ছাত্ররা জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে রওয়ানা করবে। তিনি বললেন, আমিও যেন এই প্রথম দলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কৃষিবিদ্যা শিক্ষা করি।

১৯০৬ সালের এপ্রিল মাসের ৬ তারিখ বাংলার ১৬ জন তরুণের একটি দল শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে জাহাজে উঠল। গন্তব্য দূরপ্রাচ্য। দলটির সঙ্গে টাকা-পয়সা তেমন ছিল না। পাথেয় বলতে কেবল একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা কর্তৃক দেয়া সস্তার টিকিট, আর নানাজনের একগাদা প্ৰশংসাপত্র। মনে তখনও স্বদেশি আন্দোলনের রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সদ্য ফেরা সৈনিকের ভাব। চোখে বিদেশ থেকে আধুনিক শিল্প-কারখানার কলাকৌশল শিখে এসে ভারতের শিল্প-বাণিজ্যের পুনরুজ্জীবন ঘটানোর স্বপ্ন। কাজেই টাকার অভাব তাদের মানসিক উদ্যম আর সাহস দমাতে পারেনি। টাকা তো ছিলই না, এমনকি কোনো প্রাথমিক প্রশিক্ষণও ছিল না। বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা তো বলাই বাহুল্য। আমি আঠারোতে পা দিয়েছি। শান্তিনিকেতনে আমরা যেমন ধারায় অভ্যস্ত ছিলাম এ দলটি ছিল তা থেকে একেবারেই আলাদা এবং কিছুটা অদ্ভুত ধরনের। কিন্তু তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার কোনো কষ্ট হয়নি।

মালয় ও চীনের উপকূল ধরে ধরে আমাদের জাহাজ সপ্তাহ পাঁচেক পর জাপান পৌঁছল। সে সময় আমরা জাপানকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম। প্রত্যেক জাপানিকে বীর মনে করতাম। ভাবতাম, প্রাচ্য থেকে তারা ‘বিদেশি শয়তানের’ অপচ্ছায়া তাড়িয়েছে। তখন জাপানজুড়ে বিজয় উদযাপন চলছে। সে সময় সেখানে যেতে পেরে নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করছিলাম। এশিয়ার বিজয়ের এ গৌরবের সঙ্গে আমরাও একাত্ম ছিলাম। এই তো মাত্র কয় সপ্তাহ আগে শান্তিনিকেতনে রাশিয়ানদের ওপর জাপানের বিজয় উদযাপন করেছি। ফলে আগ্রহ নিয়েই টোকিওর বিজয় উৎসবে যোগ দিলাম। শত্রুপক্ষের কাছ থেকে দখল করা বন্দুক ও কামান দিয়ে সব পার্ক ও রাস্তার মোড় সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছিল। প্রতিদিনই আমরা এসব এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখতাম। জাপানিদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল যখন দেখলাম যে, ট্রামে উঠলে তারা বিশেষত বৃদ্ধ ও মহিলারা আমাদের বসার জন্য নিজেদের আসন ছেড়ে দিচ্ছে। গৌতম বুদ্ধ যেখানে জন্ম নিয়েছেন, আমরা সেই দেশের লোক, সে কারণেই তাদের এই সম্মান প্রদর্শন। এরকম একটি যুদ্ধজয়ের পর তো আত্মম্ভরিতা বেড়ে যাবার কথা। অথচ দেখলাম আধ্যাত্মিকতার ভাবাদর্শ। এ থেকে মনে হল এশিয়া বুঝি সত্যিই এক, সে দেশের মহান লেখক কাকুজো ওকাকুরার বক্তব্য তাহলে মিথ্যে নয়।

জাপান পর্যন্ত এসেই কিন্তু দলটির অনেকে মনে করল যথেষ্ট দূরে আসা গেছে, এবার থামা যাক। তাঁদের অভিযান এখানেই শেষ হল। শান্তিনিকেতন থেকে আসা আমরা দুজন সুদূরপিয়াসী। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে আমেরিকান কর্মকর্তাদের মন গলিয়ে সেদেশ অভিমুখী জাহাজে ওঠা গেল। তখন নিয়ম ছিল যে এশিয়া থেকে খুব সামান্যসংখ্যক অভিবাসীই পশ্চিম উপকূলে অবতরণ করতে পারত।[১] মার্কিন ডাক্তারের তখন কাজই ছিল কোনো-না-কোনো কারণ দেখিয়ে অতিরিক্ত লোকদেরকে বাতিল করা। প্রথমবার আমাকেও বাদ দেয়া হল, আমার নাকি চোখের অসুখ! ছুটলাম এক জাপানি ডাক্তারের কাছে। বাদ পড়ার কারণ শুনে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন যে তিনি এ রোগের একটা মোক্ষম দাওয়াই দিবেন, তবে সেটা চিকিৎসার জন্য নয়, বরং আমেরিকান ডাক্তারকে বোকা বানানোর জন্য। তিনি পরিসংখ্যানের নিয়ম খাটালেন। আমাকে বললেন যেন প্রতিদিনই ঐ ডাক্তারের সামনে গিয়ে লাইন ধরি। তাকে প্রতিদিনই হাজার হাজার লোককে পরীক্ষা করতে হতো। এত লোকের ভিড়ে কাউকে আলাদা করে মনে রাখা নিশ্চয়ই সম্ভব নয়। যে শতকরা দশজন সুযোগ পায়, তাদের দলে একদিন না একদিন ঠিকই ঢুকে যাব। ভাগ্য ভালো হলে দ্রুতই সেটা ঘটতে পারে। আমার ভাগ্য ভালোই ছিল। তৃতীয় দিনেই অনুমতি পেয়ে গেলাম।

তখনকার দিনে জাহাজের তৃতীয় শ্রেণিতে ভ্রমণ একটা অভিজ্ঞতাই বটে। আমাদের আটাশ জনকে ঠাসাঠাসি করে একটা কেবিনে ঢুকানো হল। ভিতরে একের উপর এক এভাবে পাঁচ তাকের খাট লাগানো। এটি শোবার ঘর, আবার খাওয়ারও ঘর। সেই গাদাগাদি ভিড়, সেই বিশ্রী আর নোংরা খাবার বর্ণনারও অযোগ্য। কিন্তু এগুলোই শেষ নয়। চূড়ান্ত যন্ত্রণা দিয়েছে সহযাত্রী আমেরিকানরা, যারা আমাদের কেবিনে উঠেছিল। কোনোরকম লিঙ্গবিচার না করে নারী-পুরুষ সবাইকে একই কেবিনে জায়গা দেয়া হয়েছিল। আমাদের সঙ্গে কয়েকজন জাপানিও যাচ্ছিল। খাবার টেবিলে একজন আমেরিকান সবসময় একই চেয়ারে বসত, যেন ওটা তার জন্যই নির্দিষ্ট করে রাখা। একদিন এক জাপানি ওটাতে বসতেই বিশালদেহী আমেরিকানটা তেড়ে এল। সে অকথ্য ভাষায় গালাগালি তো করলই, ছুরি বের করে লড়াইয়ে নামার চ্যালেঞ্জও করল। জাপানিটি দেখলাম কোনোরূপ উচ্চবাচ্য না করে নীরবে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল। তার এ পশ্চাদপসরণ দেখে আমরা মনে মনে খুব আঘাত পেলাম। অবশ্য এ দুঃখ দূর হতে সময় লাগল না। একটু পরেই জাপানিটি তার দেশি কয়েকজনকে নিয়ে জবাব দিতে হাজির হল। বলল, ইয়াংকি আর জাপানিরা সংখ্যায় সমান হয়েছে, এখন লড়াই হতে পারে। জাপানিরা প্রস্তুত! এভাবে এশিয়ার সম্মান রক্ষা পেল।

*

১. যুক্তরাষ্ট্রে জাপানি অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে সময় কড়াকড়ি আরোপ করেছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *