প্রথম দেখায় আমেরিকা

প্রথম দেখায় আমেরিকা

তৃতীয় শ্রেণির যাত্রীদের জন্য জাহাজের ডেকে একটা ছোট জায়গা নির্দিষ্ট করা ছিল। তরতাজা বাতাসের ছোঁয়া নিতে দ্বিতীয় দিন সেখানে উঠলাম। কিন্তু যে অবজ্ঞার দৃষ্টি নিয়ে প্রথম শ্রেণির যাত্রীরা আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল তা সহ্য করতে পারলাম না। মনের ক্ষত ঢাকতে তাড়াতাড়ি কেবিনে ফিরে এলাম। এর পর আর একদিনও ওখানে উঠিনি। সৌভাগ্যবশত আমার সঙ্গে প্রফেসর মোহিতচন্দ্র সেন সম্পাদিত বাবার নির্বাচিত রচনা ছিল। রওয়ানা করার কিছুদিন আগেই এটা প্রকাশিত হয়েছিল। আমরা এটা এতবার পড়লাম যে জাহাজ তীরে ভিড়তে ভিড়তে প্রায় প্রতিটি লাইনই মুখস্থ হয়ে গেল। বেশ কয়েকদিন পর অন্য যাত্রীদের হাবভাব দেখে বুঝলাম যে দুর্ভাগ্যের রাত পার হয়েছে, যাত্রা শেষ হতে চলেছে। নোঙর করার আগের সন্ধ্যায় বাঁধাছাঁদার কাজ শেষ করে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম কি আর আসে? পরের সকালেই সান ফ্রান্সিসকো নামব—মন সে উত্তেজনায় কাঁপছে। অন্ধকার তখনও কাটেনি। আমরা ডেক-এ বেরিয়ে এলাম। জাহাজ যেদিকে চলেছে সেদিকে মুখ করে দিগন্তের দিকে নিবিষ্ট চোখে তাকিয়ে থাকলাম। চমৎকার একটি সকাল এল। এমন বর্ণচ্ছটার সকাল বুঝি কেবল প্রশান্ত মহাসাগরেই সম্ভব। এরই মধ্যে দেখতে পেলাম জাহাজের সকল অফিসার যার যার বায়নোকুলার চোখে দিয়ে তীরের দিকে কী যেন দেখছে। জাহাজজুড়ে অলক্ষুণে নীরবতা নেমে এল। তারপর ফিসফাস, কানাকানি। আরও শক্তিশালী বায়নোকুলার নিয়ে আসা হল। আবার দীর্ঘ নীরবতা। ডেকের উপরে যে যাত্রীরা ছিল, তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। মনে আশঙ্কার ছায়া। হঠাৎ একপাশে কাৎ হয়ে জাহাজ ঘুরে গেল। তারপর আমরা কিছুক্ষণ আগের রহস্য বুঝতে পারলাম। অজগরের মত কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়ার মেঘ আকাশের সীমানা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তার ফাঁকে ফাঁকে মাত্র কয়েকটা আকাশচুম্বী অট্টালিকার মাথা চোখে পড়ছে। বিখ্যাত গোল্ডেন গেটের কাছে জাহাজ থামল। কিন্তু সকল শহরের রানী বলা হয় যাকে, এ তো তার প্রবেশদ্বার নয়, এ যে নরকতুল্য ধ্বংসস্তূপের দরজা। যেখানে একসময় সান ফ্রান্সিসকো শহর দাঁড়িয়েছিল, তা যেন এক মৃত্যুর প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে। চারদিকে অগ্নিদগ্ধ লাশ আর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া রাস্তায় বিভ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত প্রাণীর ভিড়। সান ফ্রান্সিসকোর ভূমিকম্প এভাবেই আমাদেরকে দেখা দিল, এভাবেই চেনাল শহর পুড়িয়ে দেয়া আগুনের রূপ।[১] সমস্ত জাহাজ জুড়ে আতঙ্কের হিম স্রোত বয়ে গেল। তখনও ওয়্যারলেস আবিষ্কার হয়নি। এই ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে জাহাজের কেউই কোনো খবর পায়নি। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একজনকে লেখা একটি প্রশংসাপত্র সম্বল করে সাগর পাড়ি দেয়া দুই তরুণকে আমেরিকা এভাবেই অভ্যর্থনা জানাল। তখনও জানি না যে আগের রাতে ভূমিকম্পে বার্কলে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে।

ক্যাপ্টেনের অনুমতি নিয়ে আরও তিনদিন আমরা জাহাজে থাকলাম। কেউ একজন আমাদেরকে বলেছিল যে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগটি খুব ভালো। শিকাগো ইলিনয় রাজ্যে অবস্থিত। আমরা ভাবলাম যে বিশ্ববিদ্যালয়টি হয়ত সেখান থেকে বেশি দূরে হবে না। জাহাজ থেকে নেমে শিকাগোর ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে গেলাম। ট্রেনগুলো তখন ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর আশ্রয়সন্ধানী মানুষদেরকে মূল ভূখণ্ডের ভিতরের দিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কাজে ব্যস্ত ছিল। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের লম্বা লাইনে কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর দুটি বার্থ পাওয়া গেল। ট্রেন চলতে শুরু করার পর দেখলাম উপরের বার্থে এক আহত মহিলা শুয়ে। রাতে তিনি মারা গেলেন। লাশ সরিয়ে নেয়া হল। সকালে পার্বত্য এলাকায় পৌঁছে প্রবল তুষারঝড়ের মুখোমুখি হলাম। রেললাইন বরফে ঢেকে যাওয়ায় ট্রেন আটকা পড়ে গেল। যাত্রীরা নিচে নেমে বরফের বল বানিয়ে খেলতে শুরু করল। কয়েক ঘণ্টা পর ড্রাইভার বাঁশি বাজিয়ে ট্রেনে ওঠার সঙ্কেত দিলেন। বরফ-কাটা ইঞ্জিন এসে লাইন পরিষ্কার করে দিলে পুনরায় যাত্রা শুরু হল।

শিকাগো পৌঁছে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের খোঁজ করলাম। দুজনে পরামর্শ করে ওয়াইএমসিএ অর্থাৎ ইয়াং মেনস ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোশিয়েশন-এর সচিব বরাবর টেলিগ্রাম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম এবং টেলিগ্রাফ অফিসে গেলাম। লিখলাম যে ইন্ডিয়া থেকে আমরা দুজন ছাত্র আজই এসেছি। আমাদেরকে নেয়ার জন্য দয়া করে কাউকে পাঠান। কাউন্টারের মেয়েটিকে বার্তাটি দিলাম। নিজেদের বুদ্ধিতে নিজেরাই খুশি হলাম। সেখানে নিশ্চয়ই ওয়াইএমসিএ আছে আর ওয়াইএমসিএ থাকলে এর একজন সেক্রেটারি থাকবেন, এ তো জানা কথা। কিন্তু হায়! সে প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ এল না। কয়েকদিন পর আমরা সেক্রেটারির দেখা ঠিকই পেয়েছিলাম। তিনিও আমাদের টেলিগ্রাম পেয়েছিলেন। তাতে ইন্ডিয়া নয়, ইন্ডিয়ানার দুজন ছাত্রের কথা লেখা ছিল। টেলিগ্রাফ অফিসের যে মেয়েটিকে আমরা বার্তাটি দিয়েছিলাম, পৃথিবীতে যে ইন্ডিয়া নামের কোনো জায়গা আছে তা বোধহয় তিনি জানতেন না। কাজেই তিনি ভুল শোধরানোর সুযোগ নষ্ট করলেন না। ‘ইন্ডিয়া’র বদলে ‘ইন্ডিয়ানা’ করে দিলেন। ‘ইন্ডিয়ানা’ শিকাগোর নিকটবর্তী। ওয়াইএমসিএ’র সেক্রেটারি সে টেলিগ্রাম পেলেও পাশের প্রদেশ থেকে আসা ছাত্রদের অভ্যর্থনা জানাতে কাউকে স্টেশনে পাঠানোর দরকার মনে করলেন না।

*

১. ১৯০৬ সালের ১৮ এপ্রিল এ ভূমিকম্প হয়। প্রায় তিন হাজার লোক মারা যায় আর শহরটির প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ ধ্বংস হয়ে যায়। তবে ধ্বংসযজ্ঞের ৯০ ভাগই হয় অগ্নিকাণ্ডের কারণে। ভূমিকম্পের পরবর্তী চার দিন চার রাত শহরের নানা স্থানে আগুন জ্বলে। প্ৰথম তিনদিনে জ্বলা ৩০টির মত আগুনে প্রায় ২৫ হাজার দালান পুড়ে যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *