আমার জ্যাঠামশায়েরা

আমার জ্যাঠামশায়েরা

আমাদের বাল্যকাল কেটেছে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পরিবেশে। এগুলোর প্রত্যেকটিরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল এবং প্রত্যেকটিই আমাদের কাঁচা মনে ছাপ ফেলেছিল। একদিকে ছিল পার্ক স্ট্রিটের বাসা। সেখানে ব্রাহ্মসমাজের নেতৃবৃন্দ বা ভারতের প্রায় সকল প্রদেশ থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় আন্দোলনের অতি উৎসাহী ভক্তগণ মহর্ষিকে শ্রদ্ধা জানাতে বা তাঁর সঙ্গে দার্শনিক বা ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করতে আসতেন। কী সম্ভ্রমের সঙ্গেই না তাঁর পায়ের ধুলো নিতে আমরা সে কক্ষটিতে যেতাম! সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় একই রকমের সম্ভ্রম নিয়ে উঁকি দিতাম বড় জ্যাঠু দ্বিজেন্দ্রনাথের[১] ঘরে। অনেক সময় তাঁর দরজা দিয়ে সারা বাড়ি কাঁপানো হাসির দমক বের হয়ে আসত। অমন দরাজ গলার হাসি শোনাও এক দারুণ অভিজ্ঞতা। সারাজীবন তিনি একান্তভাবে দর্শন চর্চায় নিবিষ্ট ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল কান্টের দর্শন আর বেদান্ত দর্শনের মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা। জাগতিক বিষয়ে তিনি ছিলেন মহর্ষির উল্টো— একেবারেই শিশুর মত সরল। প্রথম বয়সে তিনি অননুকরণীয় ভঙ্গিতে একটি অ্যালেগরিক্যাল কবিতা লিখেছিলেন, বাংলা সাহিত্যে যা ক্লাসিক হয়ে আছে। কিন্তু কাব্যচর্চা তাঁর ক্ষেত্র ছিল না। তিনি বিচরণ করে বেড়াতেন বুদ্ধির বিমূর্ত জগতে। ভোরবেলা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। ক্লান্ত হয়ে গেলে তিনটি পদ্ধতিতে আনন্দ খুঁজে পেতে চেষ্টা করতেন— গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে বসে যাওয়া, ভাঁজ করা কাগজ দিয়ে বাকসো বানানো অথবা স্যার ওয়াল্টার স্কটের রবিনসন ক্রুসো বা অন্য কোনো উপন্যাস পুনরায় পড়তে শুরু করা। এ উদাসী দার্শনিককে ঘিরে মজাদার অনেক গল্প প্রচলিত আছে। প্ৰতি সকালে টলস্টয়-মার্কা চেহারা নিয়ে তিন চাকার সাইকেলে চেপে তিনি জনাকীর্ণ পার্ক স্ট্রিটের রাস্তায় বের হতেন। তাঁকে দেখে কে কী ভাবছে সে বিষয়ে একেবারেই মাথা ঘামাতেন না। বেড়াতে বের হবার পোশাকও ছিল অদ্ভুত। পায়জামার উপর ডাবল কোট। তিনি প্রথম কোটটি উল্টো করে অর্থাৎ সামনের দিক পিছনে আর পিছনের দিক সামনে করে পরতেন। তাতে বুক ঢাকা পড়ত। দ্বিতীয় কোটটি স্বাভাবিকভাবে, অর্থাৎ সবাই যেভাবে পরে, সেভাবে পরতেন। বোতাম লাগানোর ঝামেলা এড়ানোর জন্য তিনি এ অদ্ভুত উপায় বের করেছিলেন! আরেকটি ঘটনার কথা বলি। একটি সুধী সমাবেশে পাঠ করার জন্য তিনি ‘সার সত্যের আলোচনা’ জাতীয় একটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। প্রবন্ধটি চূড়ান্ত করার আগে তা অন্যদের পড়ে শোনাতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু আশেপাশে কোনো শ্রোতা ছিল না। তখন এক বৃদ্ধ চাকরানিকে ধরে এনে সামনে বসিয়ে তিনি সুদীর্ঘ রচনাটি পড়লেন। ওরকম একটি দার্শনিক রচনার জন্য উপযুক্ত শ্রোতাই বটে, কেননা, কাজের লোকটি পড়ালেখাও জানত না! অনেক সময় তিনি বন্ধু এবং গুণগ্রাহীদেরকে দুপুর বা রাতের খাবারের দাওয়াত দিতেন। তাঁরা ক্ষুধার্ত পেটে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতেন কিন্তু খাবার আর আসে না। আসবে কী করে, আপনভোলা দ্বিজেন্দ্রনাথ যে খাবারের অর্ডার দিতেই ভুলে গেছেন! তারপরও তাঁদের প্রায় কেউই কিছু মনে করতেন না, কারণ পেট না ভরলেও রসালো ভাষা আর হাসির দমক মেশানো দ্বিজেন্দ্রনাথের তুখোড় আলাপচারিতায় নিশ্চিতভাবেই তাঁদের মন ভরে যেত। তিনি ছিলেন একজন দুর্লভ মানুষ, এক বিশেষ যুগের তৈরি মানুষ, যে যুগ সম্ভবত চিরকালের মত হারিয়ে গিয়েছে।

পিতামহ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ আর বড় জ্যাঠামশাই দ্বিজেন্দ্রনাথের বাড়ির প্রায় লাগোয়া বাড়িতেই বাস করতেন দ্বিতীয় জ্যাঠামশাই, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর জগৎ ছিল ভিন্ন আবহে গড়া। তাঁর স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী ছিলেন ‘ইঙ্গ-বঙ্গ সমাজ’ এর নেত্রী। ইংরেজি শিক্ষিত ভারতীয়রা এ সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁরা ছিলেন নিজেদের গোঁড়া আত্মীয়-স্বজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন। কোলকাতার যে অংশে ইউরোপিয়ানরা থাকত, তার কাছাকাছি বালিগঞ্জে ইঙ্গ-বঙ্গ সমাজের লোকজন বসতি স্থাপন করেছিলেন। বাসস্থানের নৈকট্য অবশ্য মনের দূরত্ব ঘোচাতে সাহায্য করেনি। ফলে এই শ্রেণির ভারতীয় ভদ্রলোকগণ তাঁদের নিজের দেশবাসী আর শাসকগোষ্ঠী, উভয়ের থেকেই বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তাঁদের জগৎ ছিল ছোট, কিন্তু আলাদা করে চোখে পড়ার মত। যদিও তাঁরা ইংরেজদের জীবনযাত্রা বেছে নিয়েছিলেন এবং তাঁদের চিন্তা-চেতনাও ছিল ইংরেজদের মতই, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে তাঁরা দেশপ্রেমিক ছিলেন না। সত্যি বলতে কী কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তার অস্তিত্ব এবং সমর্থনের জন্য এ সম্প্রদায়ের বুদ্ধিজীবীদের নিকট অনেকাংশে ঋণী। আমার জেঠিমার সংসারের দরজা এ শ্রেণির লোকদের জন্য সব সময় খোলা থাকত।

বাবার তখন একটি পাঙ্কিগাড়ি ছিল। সাদা-কালো ছোপ ছোপ দাগওয়ালা একটি বুড়ো মাদি ঘোড়া এটি টেনে নিয়ে যেত। প্রায় প্রত্যেক বিকেলেই তিনি এ গাড়িতে করে পার্ক স্ট্রিটে যেতেন। অনেক সময় আমরাও সঙ্গে থাকতাম। তবে আমি তখন এতই ছোট যে এ বাড়িতে ঘনঘন আসা লোকদের সান্নিধ্যে থেকেও তেমন কিছু অর্জন করা সম্ভব ছিল না। বিকেল শুরু হতো টেনিস খেলা আর চা দিয়ে, ক্রমে তা রাতের খাবার অবধি গড়াত। বাবা ফিরতেন গভীর রাতে, রাস্তাঘাট ততক্ষণে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। নির্জন রাস্তায় তাঁর ঘোড়ার খুরের ঢিমে-তেতালা শব্দ আর গ্যাস ল্যাম্পের আলো-ছায়া আমার শিশুমনে কত যে রূপকথার গল্প বুনত। অবশ্য চলতে চলতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতাম। বাবার গাড়ি আমাদের বাড়ির চিরপরিচিত লেনে প্রবেশ করলে মা জাগিয়ে দিতেন।

*

১. দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। জন্ম-১৮৪০, মৃত্যু-১৯২৬। স্বপ্নপ্রয়াণ নামক কাব্যগ্রন্থসহ কমপক্ষে ২৭টি গ্রন্থের রচয়িতা। গান্ধীজি তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। শান্তিনিকেতনে মুসলমান ছাত্র ভর্তির বিরোধী ছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *