বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন

বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন

আমরা তখনও ছোট, জোড়াসাঁকোতেই থাকি। ১৮৯৭ সালের বড় ভূমিকম্পটি হল। স্মরণাতীতকালে এতবড় ভূমিকম্প আর হয়নি। কোলকাতাজুড়ে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল। সেদিন আমাদের বাড়িতে কোনো পুরুষ ছিল না। মহিলা ও ছোটরা খুবই ভয় পেয়েছিলাম। সে বছর নাটোরে কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নাটোরের মহারাজা আমাদের পরিবারের বিশেষ বন্ধু ছিলেন। তিনিই ছিলেন নাটোরে সম্মেলন করার উদ্যোক্তা। তাঁর আমন্ত্রণে আমাদের বাড়ির পুরুষরা সবাই নাটোর চলে গিয়েছিল। আমাদের ঘরটি ছিল দোতলায়। ভূমিকম্পে ঘরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা নিচতলায় আশ্রয় নেই। মা আঘাত পেয়েছিলেন, তার ওপর বাবার কোনো খবর না পাওয়ায় তাঁর দুশ্চিন্তা বাড়ছিল। নাটোরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কয়েক দিন বাবার হালহকিকত জানা যায়নি। অবশেষে সপ্তাহখানেক পর বাবা ও অন্যরা ফিরলেন। তাঁরা সেখানকার বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা জানালেন। ভূমিকম্প নিশ্চয়ই কোলকাতার তুলনায় নাটোরে আরও জোরে আঘাত হেনে থাকবে।

বহু দিন পরে সম্মেলনটির কথা বাবা আমাকে বলেছিলেন। একটা ঘটনা বলা দরকার। সে সময় কংগ্রেসের সকল সভা ইংরেজিতে হতো। জাতীয় আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিতেন তাঁদের প্রায় সবাই ইংল্যান্ডে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং ইংরেজি ভাষায় তাঁদের প্রভূত দখল ছিল। ডব্লিউ. সি. ব্যানার্জি, ফিরোজশাহ মেহতা, জি. কে. গোখেল, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, রাসবিহারী ঘোষ, লালমোহন ঘোষ, আনন্দমোহন বসু প্রমুখ ছিলেন প্রথম শ্রেণির বক্তা। সকলেই তাঁদের ইংরেজি বক্তৃতার প্রশংসা করতেন। কংগ্রেসের মূল অধিবেশনে ইংরেজির ব্যবহার নিয়ে বাবার আপত্তি ছিল না, কিন্তু তিনি চাইতেন যে প্রাদেশিক অধিবেশনগুলো যেন সে সে প্রদেশের ভাষায় অনুষ্ঠিত হয়। বাবা, জ্যাঠামশাই সত্যেন্দ্রনাথ, নাটোরের মহারাজা এবং অন্য কয়েকজন দলবদ্ধ হয়ে সম্মেলনে প্রস্তাব তুললেন যে প্রাদেশিক সম্মেলন যেন বাংলা ভাষাতেই হয়। নেতারা এর তীব্র প্রতিবাদ করলেন। তারা কেউই বাংলায় বক্তৃতা দিতে পারতেন না। অবশেষে বাবা বললেন যে তিনি ইংরেজি বক্তৃতার তাৎক্ষণিক অনুবাদ করে দেবেন। এ প্রস্তাব সবাই মেনে নিল। অত্যন্ত কঠিন কিন্তু উল্লেখযোগ্য এ কাজটি বাবা করেছিলেন সম্মেলনের প্রথম দিন। ভূমিকম্পের কারণে পরদিন আর সম্মেলন হয়নি। সভা ভেঙে যাবার আগে ডব্লিউ. সি. ব্যানার্জি বাবাকে এ বলে খোঁচা মারলেন, “রবি বাবু, আপনার ভাষা অতি চমৎকার। কিন্তু আপনার কি মনে হয় এ দেশের চাষা-ভুষোরা আমাদের ইংরেজির চেয়ে আপনার এ বাংলা বেশি বুঝবে?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *