দ্য লিটল প্রিন্স – ২৫

অধ্যায় – পঁচিশ

কুয়া খোঁজে পাওয়ার পর কথকের  সাথে ছোট রাজপুত্র তার গ্রহে ফিরে যাবার ব্যাপারে কথা বলল।

ছোট রাজপুত্র বলল, “মানুষেরা একপ্রেস ট্রেনে চড়ে রাস্তায় বের হয় কিন্তু তারা কী খোঁজছে তারা তা জানে না। তারপর তারা ছুটে বেড়ায়, উত্তেজিত হয়ে ঘুরতে থাকে এবং ঘুরতেই থাকে।”

সে আরো যোগ করে, “অর্থহীন ঝামেলা!”

আমরা যে কুয়ার কাছে আসলাম তা সাধারন সাহারা মরুভূমির কুয়ার মত ছিল না। সাধারনত সাহারা মরুভূমির কুয়াগুলি হয় বালিতে একটা গর্তের মত। কিন্তু এই কুয়াটি হচ্ছে গ্রামের কুয়ার মত। কিন্তু আশেপাশে কোন গ্রাম ছিলো না, তাই আমার মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি।

আমি ছোট রাজপুত্রকে বললাম, “আশ্চর্যের ব্যাপার! সবকিছু যেন ব্যবহার করার জন্য তৈরী করা আছে, পুলি, রশি, বালতি…”

হে হাসলো, দড়িকে ধরে পুলিকে কাজ করানো শুরু করে দিল। দীর্ঘদিন বাতাসের স্পর্শ না পাওয়া বায়ুনির্দেশক যন্ত্রের মত শব্দ করে উঠল পুলি।

ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি শুনতে পেয়েছো? আমরা কুয়াটাকে জাগিয়ে তুলেছি এবং সে গান গাওয়া শুরু করেছে…”

আমি চাইছিলাম না সে দড়ি নেড়ে ক্লান্ত হোক। তাই বললাম, “এটা আমাকে ছেড়ে দাও। এটা তোমার জন্য খুব ভারী।”

আমি বালতিকে টেনে কুয়ার পাশে তোলে আনলাম। তোলে এনে খুশি এবং ক্লান্ত দুটোই হয়ে গেলাম একসাথে। পুলির গানটি আমার কানে বাজছিলো তখনো এবং আমি দেখতে পাচ্ছিলাম কুয়ার কম্পিত পানিতে সূর্যের আলো এখনো চকমক করছে।

ছোট রাজপুত্র বলল, “আমি এই পানির জন্য তৃষ্ণার্থ। আমাকে পান করার জন্য দাও কিছু।”

আমি বুঝতে পারলাম সে কী খোঁজছিলো।

আমি বালতিটাকে তার ঠোটের কাছে নিলাম। সে চোখ বন্ধ করে পানি পান করল। এটা ছিলো বিশেষ কোন উৎসবের আনন্দের মত। এই পানি অবশ্যই সাধারন খাদ্যের চেয়ে আলাদা কিছু। এর মিষ্টতা তারকাদীপ্ত আকাশের নিচে দীর্ঘ পথচলা, পুলির সঙ্গীত এবং আমার হাতের শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। এটা হৃদয়ের জন্য ভালো, উপহারের মত। আমি যখন ছোট বালক ছিলাম, ক্রিসমাস ট্রির বাতি, মধ্যরাতে মানুষের গান, হাসিমুখের কোমলতা –  আমি যেসব গিফট পেতাম সেগুলির মতই ঔজ্জ্বল্য বিকিরন করে হৃদয় ভরিয়ে দিত।

ছোট রাজপুত্র বলল, “তুমি যেখানে থাকো যেখানকার লোকেরা একই বাগানে পাঁচ হাজার গোলাপ উৎপন্ন করে এবং এর মধ্যে তারা যা খোঁজছে তা খোঁজে পায় না।”

আমি উত্তরে বললাম, “তা তারা খোঁজে পায় না।”

“এবং তারা যা খোঁজছে তা একটি মাত্র ফুলের মধ্যে কিংবা সামান্য পানির মধ্যে খোঁজে পাওয়া যেত।”

আমি বললাম, “হ্যা। ঠিক বলেছ।”

ছোট রাজপুত্র যোগ করল, “কিন্তু চোখেরা তো অন্ধ। একজনকে অবশ্যই হৃদয় দিয়ে খোঁজতে হবে…”

আমি পানি পান করলাম। শান্তভাবে নিঃশ্বাস নিলাম। সূর্যোদয়ের সময় মরুভূমির বালি মধুর মত দেখায়। এবং সেই মধুর রঙ আমাকে উৎফুল্ল করে তোলে। যা তারপরে আমাকে এক বিষাদের অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়।

ছোট রাজপুত্র আবার আমার পাশে বসতে বসতে বলল, “তুমি অবশ্যই তোমার কথা রাখবে।”

“কী কথা?”

“তুমি জানো…আমার ভেড়ার জন্য মুখবন্ধ তৈরি করে দেয়া- আমি ফুলের কাছে দায়বদ্ধ।”

“আমি আমার আঁকাগুলোর রাফ পকেট থেকে বের করলাম।” ছোট রাজপুত্র এগুলি দেখলো এবং হাসতে হাসতে বলল, “তোমার বাওবাবকে বাঁধাকপির মত লাগছে।”

“অহ!”

আমি আমার বাওবাবের জন্য গর্বিত ছিলাম!

“তোমার শেয়াল – তার কান কিছুটা শিং এর মত। তারা খুব লম্বা।”

এবং সে আবার হাসলো।

আমি বললাম, “এটা ঠিক না ছোট রাজপুত্র। আমি ছবি আঁকতে জানি না শুধুমাত্র ভিতর থেকে বোয়া কন্সট্রিকটর এবং বাইরে থেকে বোয়া কন্সট্রিকটর ছাড়া।”

সে বলল, “ঠিক আছে। কোন সমস্যা নেই। বাচ্চারা বুঝতে পারে।”

আমি পেনসিল দিয়ে একটি মুখবন্ধ আঁকলাম। এবং তাকে দিলাম।

আমি বললাম, “তোমার কিছু পরিকল্পনা আছে যা আমি জানি না।”

কিন্তু সে কোন উত্তর না দিয়ে আমাকে বলল, “তুমি আমার পৃথিবীতে অতর্কিত আগমন সম্পর্কে জানো, কাল তার এক বছর পূর্তি হবে।”

তারপর সামান্য নিরবতার পর সে আরো বলল, “আমি নেমে এসেছিলাম এখানেরই কাছাকাছি জায়গায়।”

তারপর হঠাৎ সে রক্তিম হয়ে গেল।  এবং আবারো কেন জানি না অদ্ভুত কষ্ট আমাকে ছুঁয়ে গেল। একটা প্রশ্ন আমার মাথায় আসলঃ

“তাহলে এটা কাকতালীয় ছিলো না- আমি যে তোমাকে একদিন সকালে চোখ খোলে দেখেছিলাম – এক সপ্তাহ আগে-মানববসতি থেকে হাজার মাইল দূরে তুমি একা একা পায়চারি করছিলে?”

ছোট রাজপুত্রের মুখ আবার রক্তিম হয়ে গেল।

এবং আমি কিছুটা দ্বিধান্বিত কন্ঠে যোগ করলাম, “সম্ভবত এটা তোমার এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে?”

ছোট রাজপুত্র আবার রক্তিম হয়ে গেল। কিন্তু সে কোন উত্তর দিলো না। কিন্তু কেউ এরকম রক্তিম হয়ে গেলে এ থেকে কী বোঝা যায় না যে উত্তরটা – “হ্যা”?

আমি বললাম, “অহ! আমি কিছুটা ভয় পাচ্ছি।”

কিন্তু সে আমাকে বাঁধা দিয়ে বলল,  “এখন তুমি কাজ শুরু করো। তোমার উচিত ইঞ্জিনের কাছে ফেরত যাওয়া। আমি এখানে অপেক্ষা করব। কাল সন্ধ্যায় ফিরে এসো।”

কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আমার শেয়ালের কথা মনে হল। কেউ যদি বন্ধুত্ব করে তাহলে থাকে কিছুটা কান্নার ঝুঁকি নিতে হয়।

অধ্যায় – ছাব্বিশ

ছোট রাজপুত্র সাপের সাথে কথা বলল, কথককে স্বান্তনা দিল এবং নিজের গ্রহে ফিরে গেল।

কুয়ার পাশে একটা ভাঙা দেয়াল ছিল। আমি যখন পরদিন সন্ধ্যায় কাজ শেষে ফিরে এলাম তখন দেখলাম ছোট রাজপুত্র ওই দেয়ালের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে। আমি শুনলাম সে বলছে- “তাহলে তোমার মনে নেই। এটা ঠিক জায়গা না।”

আরেকটি স্বর উত্তর দিল, “হ্যা হ্যা! এটা ঠিক দিন কিন্তু ঠিক জায়গা না।”

আমি দেয়ালের দিকে হাটতে শুরু করলাম। কিন্তু কিছুই দেখতে বা শুনতে পেলাম না। ছোট রাজপুত্র আবার ঐ স্বরকে উত্তরে বলল, “ঠিক! তুমি দেখবে বালিতে কোথায় আমার পায়ের চিহ্ন শুরু হয়েছে। তোমার কিছু করার নেই শুধু সে জায়গায় আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আমি আজ রাতেই সেখানে পৌছব।”

আমি দেয়াল থেকে মাত্র বিশ মিটার দূরে ছিলাম। কিন্তু তবুও কিছু দেখতে পেলাম না।

কিছুক্ষণ নিরবতার পর ছোট রাজপুত্র আবার বলল, “তোমার ভালো বিষ আছে? আমাকে দীর্ঘ সময় কষ্ঠের ভিতর দিয়ে যেতে হবে না তো?”

আমি আমার চলা থামালাম। এই কথা শোনে মনে হচ্ছিল আমার হৃদয় বিদীর্ন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তখনো কী ঘটছে আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।

ছোট রাজপুত্র ওই স্বরকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তাহলে এবার তুমি চলে যাও। আমি দেয়াল থেকে নামব।”

আমার চোখ এবার দেয়ালের নিচে চলে গেল। চোখ ওদিকে যাওয়ামাত্র আমি লাফিয়ে উঠলাম। আমার সামনে, ছোট রাজপুত্রের দিকে মুখ করে আছে বিষাক্ত হলুদ সাপ। যা মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে কাউকে মেরে ফেলতে পারে। আমি পকেটে হাত দিয়ে আমার রিভলবারটা বের করছিলাম যদিও, তবুও কয়েক পা পিছনে সরে গেলাম। কিন্তু আমি যে শব্দ করেছিলাম তাতেই সাপটি আস্তে আস্তে চলে যেতে শুরু করল।  কোন তাড়াহুড়া না করে, পাথরের সাথে মৃদু ধাতব কিছু শব্দ করে সাপটি আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল।

আমি দেয়ালে গেলাম। ছোট রাজপুত্রের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। আমি তার বাহুতে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, “এসবের মানে কী? তুমি কেন সাপের সাথে কথা বলছ?”

সে সবসময় যে মাফলার পড়ে থাকে আমি তা একটু খোলে ঢিলা করে দিলাম। তার কপাল পানি দিয়ে মুছে দিলাম এবং পান করার জন্য পানি দিলাম। তখন তাকে আর প্রশ্ন করতে আমার সাহস হল না। সে বেশ গম্ভীরভাবে আমার দিকে তাকাল এবং আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি বুঝতে পারছিলাম তার হৃদস্পন্দন। তার হৃতপিন্ড একটা রাইফেলের গুলি খেয়ে মরতে বসা পাখির মত স্পন্দিত হচ্ছিল…

“আমি খুশি যে তুমি তোমার ইঞ্জিন ঠিক করতে পেরেছ। এখন তুমি বাড়ি যেতে পারবে।”

“তুমি কীভাবে তা জানতে পারলে?”

আমি তাকে বলতে এসেছিলাম যে আমার কাজ সফল হয়েছে। আমি যেরকম কখনো ভাবতেও পারিনি ঠিক সেরকম ভাবে সফল হয়েছে।

সে আমার প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না কিন্তু আরো বলল, “আমিও বাড়ি যাচ্ছি।”

এবং দুঃখিতভাবে যোগ করল, “এটা অনেক দূরে এবং অনেক কঠিন।”

আমি বুঝতে পারছিলাম অস্বাভাবিক কিছু ঘটতে চলেছে। আমি তাকে ধরে রেখেছিলাম। যেন সে একটি ছোট বাচ্চা। মনে হচ্ছিল সে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যগ্রভাবে ছুটে চলেছে অতলস্পর্শী নরকের দিকে কিন্তু তাকে আমি ফেরাতে পারছি না।

তার দৃষ্টি ছিল গম্ভীর, যেন কেউ বহুদূরে হারিয়ে গেছে।

আমার কাছে তোমার ভেড়া আছে। ভেড়ার বাক্স আছে। ভেড়ার মুখবন্ধ আছে।

সে আমার দিকে তাকিয়ে দুঃখভরা হাসি হাসল।

আমি দীর্ঘসময় ধরে অপেক্ষা করে ছিলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম সে আস্তে আস্তে পুনরজ্জীবিত হচ্ছে যেন।

আমি তাকে বললাম, “প্রিয় ছোট্ট বন্ধু, তুমি ভয় পাচ্ছ।”

সে ভীত ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সে হালকা করে হাসল।

“আমি এই সন্ধ্যায় আরো বেশি ভয় পাবো।”

এই কথায় আবারো আমার মনে হল অপরিবর্তনীয় কোন ভয়ে আমি জমে যাচ্ছি। ছোট রাজপুত্রের হাসির শব্দ আমি আর কোনদিন শুনতে পারব না –এই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারব না মনে হচ্ছিল। আমার জন্য এই হাসি ছিল মরুভূমিতে বিশুদ্ধ পানির ফোয়ারার মত।

আমি বললাম, “ছোট্ট বন্ধু, আমি তোমার হাসি আবার শুনতে চাই।”

কিন্তু সে আমাকে বলল, “আজকে এক বছর পূর্ণ হবে। আমার তারাকে সেই জায়গায় দেখা যাবে যেখানে এক বছর আগে আমি এসে নেমেছিলাম।”

আমি বললাম, “ছোট্ট বন্ধু, আমাকে বলো এইসব দুঃস্বপ্ন- এই তারা, সাপের সাথে কথা বলা, নির্দিষ্ট জায়গা – সব দুঃস্বপ্ন।”

কিন্তু সে এর কোন উত্তর না দিয়ে আমাকে বলল, “যা গুরুত্বপূর্ন তা কখনো চোখে দেখা যায় না।”

“হ্যা। আমি তা জানি।”

“এটা ফুলের মতই। তুমি যদি কোন ফুলকে ভালোবাসো যা একটি তারায় বাস করে তাহলে রাতের আকাশ তোমার কাছে অনিন্দ্যসুন্দর হয়ে যাবে। প্রতিটি তারাই প্রস্ফুটিত ফুলের সম্ভার নিয়ে আবির্ভূত হবে তোমার কাছে।”

“হ্যা। আমি তা জানি।”

“এটা পানির মতই। পুলি, রশি এবং বালতির সাহায্যে যে পানি তুলে আমাকে তুমি পান করতে দিয়েছিলে – তা ছিলে গানের মত সুন্দর। তোমার জানো নিশ্চয়ই- কত সুন্দর ছিল!”

“হ্যা। জানি।”

“এবং রাতে তুমি আকাশের দিকে তাকাবে। আমি যেখানে থাকি সেখানে সব কিছু খুব ছোট ছোট। তাই আমি তোমাকে দেখাতে পারব না ঠিক কোথায় আমার তারাকে দেখা যাবে। তোমার জন্য আমার তারা হবে অসংখ্য তারকার মধ্যে যেকোন একটা। তাই তুমি স্বর্গের সব তারকাকেই দেখতে ভালোবাসবে। তারা সবাই হবে তোমার বন্ধু। এবং আমি তোমাকে একটি উপহার দেব।”

সে আবার হাসল।

“আহ ছোট রাজপুত্র! প্রিয় ছোট রাজপুত্র! আমি এই হাসির শব্দ ভালোবাসি।”

“এটাই আমার উপহার। এটা হবে আমরা যখন পানি খেয়েছিলাম ঠিক তখনকার মুহুর্তের মতই।”

“তুমি কী বলতে চাচ্ছো?”

সে বলল, “প্রত্যেক মানুষের তারকা আছে। কিন্তু প্রত্যেকের জন্য তা একই জিনিস না। যেমন – যারা ভ্রমনকারী তাদের জন্য তারকারা পথ প্রদর্শক। অন্য সাধারণ লোকদের কাছে তা আকাশের ক্ষুদ্র আলো ব্যতিত কিছুই নয়। পন্ডিতদের জন্য তারকাগুলি সমস্যা। আমার ব্যবসায়ী লোকটির জন্য এগুলি সম্পদ। কিন্তু সব তারকাই নিরব। তুমি – শুধুমাত্র তোমার হবে এইসব তারকাগুলি, তোমার মত করে।”

“তুমি ঠিক কী বলতে চাচ্ছো?”

“এই তারকাগুলোর যেকোন একটিতে আমি থাকবো। যেকোন একটিতে আমি হাসব। তখন সব তারয়াগুলি হেসে উঠবে। যখন তুমি রাতের আকাশে তাকাবে। তুমি …শুধুমাত্র তোমার তারকা থাকবে যেগুলি হাসতে পারে।”

সে আবার হাসল।

“এটা হবে যেন তারকার পরিবর্তে আমি তোমাকে অসংখ্য ঘন্টা দিলাম যেগুলি হাসতে পারে…”

সে আবার হাসল। কিন্তু দ্রুতই আবার গম্ভীর হয়ে গেল,

ছোট রাজপুত্র বলল, “আজ রাতে – তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো – এসো না।”

আমি বললাম, “আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।”

“আমাকে এরকম দেখাবে যে মনে হবে আমি কষ্ট পাচ্ছি। মনে হবে আমি মারা যাচ্ছি। এগুলি দেখতে তাই এসো না। এগুলো দেখার কোন মানে হয় না…”

“আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।”

সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।

“আমি তোমাকে বলছি শোনো- এটা সাপের জন্যও। সাপ ভয়ংকর প্রানী। সে মজা করার জন্য তোমাকেও কামড়ে দিতে পারে।”

“আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।”

কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে বলল, “এটাও সত্য যে দ্বিতীয় কামড় দেয়ার মত পর্যাপ্ত বিষ তাদের কাছে থাকে না।”

সেই রাতে আমি তাকে হাটতে বের হওয়ার সময় দেখলাম না। সে কোন শব্দ না করে আমার পাশ থেকে চলে গেল। যখন আমি অনেক খোঁজে তাকে দেখতে পেলাম তখন সে দ্রুত কিন্তু ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে। আমি তার পাশে গেলে সে শুধু বলল, “আহ! তুমি এখানে…”

সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল। আমাকে হাত ধরল। এবং বলল, “তোমার এখানে আসা ঠিক হয় নি। তুমি কষ্ট পাবে। আমাকে দেখে মনে হবে আমি মারা গেছি। কিন্তু সেটি আসলে সত্য না।”

আমি কিছু বললাম না।

“তুমি বুঝতে পারছ। আমার তারকা অনেক দূরে। আমি এই শরীর নিয়ে সেখানে যেতে পারব না। এটা অনেক ভারী।”

আমি কিছু বললাম না।

“কিন্তু এটি হবে একটি পুরনো পরিত্যক্ত খোলসের মত। পুরনো খোলক নিয়ে দুঃখ করার কিছু নেই।”

আমি কিছু বললাম না।

সে কিছুটা হতাশ হল। কিন্তু আরেকবার চেষ্টা করল, “তুমি জানো, এটা হবে খুব মজার। আমিও তারকাদের দিকে তাকাব। সব তারকাগুলোতে থাকবে মরিচাপড়া পুলি যুক্ত কুয়া। প্রতিটা গ্রহে থাকবে আমার পান করার জন্য নির্মল পানি…”

আমি কিছু বললাম না।

“তা হবে অসাধারন! তোমার থাকবে পাঁচ শত বিলিয়ন ছোট ঘন্টা এবং আমার থাকবে পাঁচ শত বিলিয়ন বিশুদ্ধ পানির ফোয়ারা।”

সে আর কিছুই বলছিল না। কারণ সে তখন কাঁদছিল।

“এই তো…আমাকে আমার মতো যেতে দাও…”

সে বসে পড়ল। কারণ সে ভয় পেয়েছিল। তারপর সে আবার বলল, “তুমি জানো আমার ফুলের কথা। আমি তার কাছে দায়বদ্ধ। সে খুব দূর্বল। সে খুব সহজ সরল। তার মাত্র চারটি কাঁটা আছে যেগুলি তাকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোন কাজেরই না।”

আমি আর দাঁড়াতে পারছিলাম না। তাই বসে পড়লাম।

“এই তো…এই সব কিছু।”

সে তখন দ্বিধাদন্দ্বে ভুগছিল। তারপর সে দাঁড়াল। এক পা বাড়াল। আমি নড়তে পারছিলাম না।

তার পায়ের গোড়ালির কাছে হলুদ আলো ঝলসে উঠল। সে নিস্পন্দ হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। সে কোন চিৎকার করল না। শান্তভাবে গাছ যেমন পড়ে ঠিক তেমনি পড়ে গেল। বালির জন্য কোন শব্দও হল না।

অধ্যায় – সাতাশ

বর্ননাকারীর পরের চিন্তা।

এখন এরপর আরো ছয় বছর চলে গেছে।

আমি এই গল্প বলিনি কাউকে। আমার পরিচিতরা আমাকে জীবিত ফিরতে দেখেই খুশি ছিল। আমি দুঃখিত ছিলাম। কিন্তু তাদের বললাম আমি ক্লান্ত।

এখন আমার দুঃখবোধ কমেছে কিছুটা। পুরোপুরি না অবশ্যই । কিন্তু আমি জানি সে তার গ্রহে ফিরে গিয়েছিল কারন ভোরে তার দেহ আমি দেখতে পাই নি। এটা খুব ভারী শরীর ছিল না। এবং রাতে আমি তারাদের শুনতে পছন্দ করি। এগুলি যেন পাঁচ শত মিলিয়ন ছোট ছোট ঘন্টা।

কিন্তু এখানে একটা বিষয় অসাধারন। যখন আমি ছোট রাজপুত্রের ভেড়ার জন্য মুখবন্ধ একেছিলাম তখন চামড়ায় হুক দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। সে কখনো তাই এটি তার ভেড়ার মুখে বাঁধতে পারবে না। তাই আমি এখন ভাবি তার গ্রহে কী হচ্ছে? ভেড়াটা মনে হয় তার ফুলটাকে খেয়ে ফেলেছে।

কিন্তু এক সময় আমি নিজেকে বলি, অবশ্যই না। ছোট রাজপুত্র প্রতি রাতে তার ফুলটিকে গ্লাস গ্লোবে দিয়ে ঢেকে রাখে। এবং সে তার ভেড়াকে সতর্কভাবে পাহাড়া দেয়। এই চিন্তায় আমার মন খুশি হয়ে উঠে। সকল তারকায় ছড়িয়ে পড়ে নির্মল হাসি।

কিন্তু অন্য সময় আমি ভাবি, কেউ হঠাৎ বেখেয়াল হয়ে যেতে পারে। এটা স্বাভাবিক। ছোট রাজপুত্র যদি কোন রাতে তার ফুলকে গ্লাস গ্লোব দিয়ে ঢাকতে ভুলে যায় এবং তার ভেড়া যদি কোন শব্দ না করে রাতে বেড়িয়ে পড়ে। তখন সব তারকাগুলি আমার জন্য হয়ে উঠে কান্নায় পরিপূর্ণ।

এটা আসলে একটা বড় রহস্য। আমার জন্য এবং তোমার জন্য যে রাজপুত্রকে ভালবাসো। এই মহাবিশ্বের কোন কিছু এর মত রহস্যপূর্ণ না-  আমরা জানিনা যে ভেড়াটিকে আমরা দেখিনি তা ফুলটাকে খেয়েছে কি না!

আকাশের দিকে তাকাও। নিজেকে জিজ্ঞেস করোঃ খেয়েছে কি না? ভেড়াটি ফুলটিকে খেয়েছে কি না? তুমি দেখতে পাবে কীভাবে সবকিছু পরিবর্তিত হয়।

এবং কোন বড় ব্যক্তি কখনোই বুঝতে পারবে না এটি কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমার কাছে এই ছবিটি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং সবচেয়ে দুঃখের ছবি। এটা শুরুর পৃষ্ঠার মতই। কিন্তু আমি আবার আঁকলাম তোমার স্মৃতিতে আবার তুলে দেয়ার জন্য। এইখান সেই জায়গা যেখানে প্রথম ছোট রাজপুত্র পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিল এবং এখান থেকেই সে অদৃশ্য হয়ে যায়।

এটা ভালোভাবে দেখে রাখো যাতে কোনদিন আফ্রিকান মরুভূমি ভ্রমণ করলে তুমি জায়গাটা চিনতে পারো। যদি তুমি এই জায়গায় আসো তাহলে দয়া করে তাড়াহুড়া করো না। কিছু সময়ের জন্য অপেক্ষা করো, ঠিক তারকাটির নিচে। তারপর যদি কোন ছোট্ট মানুষ আবির্ভূত হয় যে হাসে, যার সোনালী চুল,  এবং যে প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় না তাহলে তুমি চিনে নেবে সে আসলে কে। এটা যদি কখনো ঘটে তাহলে দয়া করে আমাকে স্বান্তনা দিও। আমাকে জানিও যে সে ফিরে এসেছে।

সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *