দ্য লিটল প্রিন্স – ২০

অধ্যায় – বিশ

ছোট রাজপুত্র একটি গোলাপ ফুলের বাগান আবিষ্কার করল।

দীর্ঘ সময় বালি, পাথর এবং তুষার পেরিয়ে হাটতে হাটতে একসময় ছোট রাজপুত্র একটি রাস্তার দেখা পেল। প্রতিটি রাস্তাই মানুষের ঘরের দিকে যায়।

“শুভ সকাল,” সে ফুলগুলিকে বলল।

সে একরাশ ফুটন্ত গোলাপ ফুলে পূর্ন বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

গোলাপেরাও উত্তরে জানাল, “শুভ সকাল।

ছোট রাজপুত্র তাদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। তারা সবাই ঠিক তার ফুলটির মতই দেখতে।

অবাক হয়ে বজ্রাহতের মত সে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কারা?”

ফুলেরা উত্তরে বলল, “আমরা গোলাপ।”

ছোট রাজপুত্রের খুব মন খারাপ হল। তার ফুল তাকে বলেছিলো, “সেই এই রকম একমাত্র ফুল এই মহাবিশ্বে। কিন্তু এখানে একটিমাত্র বাগানেই আছে তার মত পাঁচ হাজার ফুল!”

“এটা দেখতে পেলে সে খুব বিরক্ত হত। হয়ত খুব কাশত শব্দ করে-  যেন তার খুব ঠান্ডা লেগেছে। সে এমন ভাব করত যে সে কাশিতে মারা যাচ্ছে। সে এরকম করত যাতে কেউ তাকে নিয়ে হাসতে না পারে। তারপর আমাকে ভান করতে হত, সেবা করার। সেবা করে তাকে সুস্থ করার। এবং যদি আমি তা না করতাম তাহলে হয়ত সত্যিই সে মরে যেত…”

তারপর ছোট রাজপুত্র নিজের ভাবনায় ফিরে গেল, “আমি ভাবতাম আমার একটি ফুল আছে যা এই মহাবিশ্বে মাত্র একটিই। কিন্তু আসলে সেটি একটি সাধারণ গোলাপ। একটি সাধারন গোলাপ, তিনটি আগ্নেয়গিরি যা আমার হাটুর কাছে পড়ত, এর মাঝে একটি হয়ত চিরজীবনের জন্য মরে গেছে…এই এগুলি আমাকে খুব মহান একজন রাজপুত্র বানায় না।”

সে ঘাসে শুয়ে পড়ল এবং কাঁদতে লাগল।

অধ্যায়- একুশ

ছোট রাজপুত্রের সাথে শেয়ালের বন্ধুত্ব হল।

এরপর শেয়ালের আবির্ভাব।

শেয়াল বলল, “শুভ সকাল।”

ছোট রাজপুত্র যদিও ঘাড় ঘুরিয়ে কাউকে দেখতে পেল না তবুও শান্তভাবে বলল, “শুভ সকাল।”

“আমি এখানে। এই আপেল গাছের নিচে।” কন্ঠস্বরটি বলল।

ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে? তুমি তো দেখতে বেশ সুন্দর!”

শেয়াল বলল, “আমি শেয়াল।”

ছোট রাজপুত্র প্রস্তাব করল, “আসো আমার সাথে খেলবে। আমার খুব মন খারাপ।”

“আমি তোমার সাথে খেলতে পারবো না। আমি পোষা শেয়াল না।” শেয়াল উত্তরে জানাল।

ছোট রাজপুত্র বলল,  “ঠিক আছে। ক্ষমা করো আমাকে।”

তারপর কিছুক্ষণ পরে সে জিজ্ঞেস করল, “ ‘পোষা’ জিনিসটা কী?”

শেয়াল জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে থাকো না। এখানে কী খুঁজছ?”

ছোট রাজপুত্র বলল, “আমি মানুষ খুজছি। কিন্তু এই “পোষা”  মানে কী?”

শেয়াল বলল, “মানুষ! তাদের বন্দুক আছে, তারা শিকার করে। খুব বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। তারা মোরগও পালন করে। এটাতেই তাদের একমাত্র আগ্রহ। তুমি কি মোরগের খোঁজ করছ?”

ছোট রাজপুত্র উত্তরে বলল, “না। আমি বন্ধু খোঁজছি। কিন্তু এই “পোষা”  শব্দের মানেটা কী?”

শেয়াল বলল, “এটা এমন একটা শব্দ যাকে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় না। এটার অর্থ হতে পারে কোন ধরনের বন্ধন তৈরী করা।”

“বন্ধন তৈরী করা?”

“এরমকই।“ শেয়াল বলতে থাকল, “যেমন ধরো আমার কাছে এখন পর্যন্ত তুমি একজন ছোট বালক। হাজার হাজার ছোট বালকের মত আরো একজন ছোট বালক। তোমাকে আমার কোন দরকার নেই। এবং তোমার ক্ষেত্রে, তোমারও আমাকে কোন দরকার নেই। আমি তোমার কাছে হাজার হাজার সাধারন শেয়ালের মত একটা সামান্য শেয়াল। কিন্তু তুমি যদি আমার সাথে বন্ধন তৈরী করো, তাহলে আমাদের একে অপরকে দরকার হবে। আমার কাছে তুমি হবে সারা পৃথিবীর মধ্যে অদ্বিতীয় একজন। এবং তোমার কাছে আমিও হব ইউনিক একজন।”

“আমি কিছুটা বুঝতে শুরু করেছি। একটি ফুল আছে…আমার মনে হয় সে আমাকে পোষ মানিয়ে ফেলেছে…” ছোট রাজপুত্র বলল।

শেয়াল বলল, “হ্যা। এটা সম্ভব। পৃথিবীতে অনেক ধরনের ব্যাপারই ঘটে।”

ছোট রাজপুত্র বলল, “কিন্তু সেটি পৃথিবীতে নয়।”

শেয়ালকে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় এবং কৌতুহলী মনে হল।

“অন্য কোন গ্রহে?”

“হ্যা।”

“সেই গ্রহে শিকারীরা আছে?”

“না।”

“আহ! দারুণ! মুরগী আছে?”

“না।”

“কোনকিছুই নিঁখুত না।” শেয়াল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

কিন্তু সে তার চিন্তায় ফিরে এল।

শেয়াল বলতে থাকল, “আমার জীবন একঘেয়ে। আমি মোরগ শিকার করি, মানুষেরা আমাকে শিকার করে। প্রতিটি মোরগ একইরকম, প্রতিটি মানুষ একইরকম। তাই, আমি কিছুটা বিরক্ত। কিন্তু তুমি আমাকে পোষ মানালে এটা হবে, যেন নতুন সূর্যোদয়ে আলোকিত হলো আমার জীবন। আমি তোমার পায়ের আওয়াজ অন্য পায়ের আওয়াজের চেয়ে আলাদাভাবে চিনতে পারবো। অন্য পায়ের আওয়াজগুলো আমাকে দ্রুত মাটির নিচে গর্তে লুকাতে বাধ্য করে। কিন্তু তোমার পায়ের আওয়াজ হবে সঙ্গীতের মত যা আমাকে টেনে নিয়ে আসবে গর্ত থেকে। এবং ঐ যে অদূরে শস্য ক্ষেত দেখা যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছো? আমি পাউরুটি খাই না। এগুলো আমার কোন কাজেই লাগে না। এই গমক্ষেতের আমার কোন দরকারই নেই। দুঃখজনক। কিন্তু তোমার চুলের রঙ সোনার মত। চিন্তা করে দেখো, যখন তুমি আমাকে পোষ মানাবে, তখন কী হবে! এই যে সোনালী রঙের শস্যক্ষেত, তা আমাকে তোমার কথা মনে করিয়ে দিবে। এবং  বাতাসের সাথে গম ক্ষেতের আন্দোলন দেখে ভালো লাগবে।”

শেয়াল অনেকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ছোট রাজপুত্রের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল, “দয়া করে আমাকে পোষ মানাও।”

ছোট রাজপুত্র বলল, “আমি খুব চাই। কিন্তু আমার সময় খুব কম। আমার অনেক কিছু বুঝতে হবে।”

শেয়াল বলল, “কেউ সে জিনিসই বুঝতে পারে যা সে বশে আনতে পারে বা যার সাথে তার বন্ধুত্ব হয়। মানুষের কোন কিছু বুঝার সময় নেই। তারা দোকান থেকে তৈরী করা জিনিস কেনে। কিন্তু এমন কোন দোকান নেই যেখান থেকে বন্ধুত্ব কেনা যায়, তাই মানুষের এখন কোন বন্ধু নেই। তুমি যদি একজন বন্ধু চাও, আমাকে পোষ মানাও।”

“পোষ মানাতে হলে আমাকে কী করতে হবে?” ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল।

শেয়াল উত্তরে বলল, “তোমাকে খুব ধৈর্যশীল হতে হবে। প্রথমে আমার থেকে কিছুটা দূরত্বে তুমি বসবে। এখনকার মতই। ঐ ঘাসের মধ্যে। আমি তোমার দিকে চোখের কোনা দিয়ে তাকাব। এবং তুমি কিছু বলবে না। কথাই হচ্ছে সমস্ত ভুল বুঝাবুঝির কারণ। তারপর থেকে প্রতিদিন তুমি একটু একটু করে আমার কাছে বসবে…”

তারপরের দিন ছোট রাজপুত্র ফিরে এল।

শেয়াল বলল, “প্রতিদিন তুমি যদি একই সময়ে আসো তাহলে ভালো হয়। উদাহরণস্বরুপ, যদি তুমি বিকেল চারটায় আসো প্রতিদিন, তাহলে বিকেল তিনটা থেকেই আমি খুশি হতে শুরু করব। যত চারটা বাজতে থাকবে ততই আমি আরো খুশি হতে থাকবো। চারটায় আমি দুশ্চিন্তা এবং খুশিতে প্রায় লাফাতে শুরু করে দেব। আমি তোমাকে দেখাতে পারব আমি কত খুশি। কিন্তু তুমি যদি যেকোন সময় আসো তাহলে আমি বুঝতে পারবো না ঠিক কখন আমার হৃদয় তোমাকে অভ্যর্থনা জানাতে যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই উচিত সঠিক আচার অনুষ্ঠান পালন করা।”

ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “আচার কী?”

শেয়াল উত্তরে বলল, “এটা প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় এমন একটা ব্যাপার। এটা হচ্ছে এমন জিনিস যা একদিনকে অন্যদিনের থেকে, এক ঘন্টাকে অন্য ঘন্টার থেকে আলাদা করে দেয়। উদাহরন হিসেবে বলি, একটি আচার আছে, আমার শিকারীদের মাঝে। প্রতি বৃহস্পতিবারে তারা গ্রামের মেয়েদের নিয়ে নাচানাচি করে। তাই বৃহস্পতিবার আমার জন্য অসাধারণ একটা দিন। আমি সেদিন যতদূর ইচ্ছা আঙুরক্ষেতে ঘুরে বেড়াতে পারি। কিন্তু যদি শিকারীরা যেকোন দিন নাচত তাহলে প্রতিদিনই হত একইরকম। আমি কোন অবসর পেতাম না।”

ছোট রাজপুত্র শেয়ালকে পোষ মানাল। এবং যখন তার প্রস্থানের সময় ঘনিয়ে আসল শেয়াল বলল, “আমার কান্না পাচ্ছে। আমি কাঁদবো।”

ছোট রাজপুত্র বলল, “এটা তোমার দোষ। আমি তোমার কোন ক্ষতি করতে চাই নি। তুমিই চেয়েছিলে আমি তোমাকে পোষ মানাই।”

শেয়াল বলল, “হ্যা। তা ঠিক।”

ছোট রাজপুত্র বলল, “কিন্তু এখন তুমি কাঁদতে যাচ্ছো!”

শেয়াল বলল, “হ্যা। তাও ঠিক।”

“সুতরাং এতে তোমার ভালো কিছুই হল না।”

শেয়াল বলল, “না। এটা আমার অনেক ভালো করেছে। ঐ শস্যক্ষেতের সোনালী রঙের জন্য।” সে আরো যোগ করল, “যাও এবং ঐ ফুলগুলোর দিকে আবার তাকাও। তুমি বুঝতে পারবে তোমার ফুলটি পৃথিবীতে ইউনিক। তারপর এসো আমার কাছে বিদায় বলতে। আমি তোমাকে একটি গোপন উপহার দেব।”

ছোট রাজপুত্র গোলাপগুলিকে দেখতে গেল আবার।

সে ফুলদের বলল, “তোমরা আমার গোলাপ ফুলের মত না। তোমরা আসলে এখনো কিছুই না। তোমরা কারো সাথে বন্ধুত্ব করো নি, কেউ তোমাদের সাথে বন্ধুত্ব করে নি। আমি আমার শেয়ালকে প্রথম যখন দেখেছিলাম তখন সে যেরকম ছিল তোমরা সেরকমই। সে ছিল শত সহস্র সাধারন শেয়ালের মত একটা শেয়াল। কিন্তু এখন আমি তাকে আমার বন্ধু বানিয়ে ফেলেছি। এখন আমার কাছে সারা পৃথিবীর মধ্যে সে ইউনিক।”

ফুলেরা বেশ লজ্জা পেল।

“তোমরা সুন্দর কিন্তু শূন্য,” ছোট রাজপুত্র বলতে থাকল, “কেউ তোমাদের জন্য মরতে চাইবে না। এটা ঠিক যে একজন সাধারন পথচারী ভাবতে পারে আমার ফুলটি ঠিক তোমাদের মত। কিন্তু আমার ফুল তার নিজের কাছে তোমাদের মত শত সহস্র ফুলের থেকে সে উত্তম, কারণ সে সেই ফুল যাকে আমি নিজ হাতে পানি দিয়েছি, আমি গ্লাস গ্লোব দিয়ে থাকে ঢেকেছি, আমি তাকে পর্দা দিয়ে ছায়া দিয়েছি, তার জন্য আমি শুয়োপোকাকে মেরেছি (দু একটি বাদে যাতে তারা প্রজাপতি হতে পারে), আমি শুনেছি তাকে যখন সে অভিযোগ করেছে, অহংকারে আত্মহারা হয়েছে অথবা যখন সে কিছুই বলে নি। কারণ সে আমার গোলাপ।”

এরপর ছোট রাজপুত্র শেয়ালের কাছে ফিরে গেল।

গিয়ে বলল, “বিদায়।”

শেয়াল বলল, “বিদায়। এবং আমার গোপন কথাটি হল, একটি সহজ গোপন কথা – একমাত্র হৃদয় ব্যবহার করেই কেউ সঠিক ভাবে দেখতে পারে, যা খুবই দরকারী তা চোখে দেখা যায় না।”

ছোট রাজপুত্র সাথে সাথে বলল, “যা খুবই দরকারী তা চোখে দেখা যায় না,” যাতে সে কথাটা মনে রাখতে পারে।

“যে সময় তুমি তোমার গোলাপের জন্য ব্যয় করেছিলে তাই তোমার গোলাপকে এত গুরুত্বপুর্ন করে তুলেছে।”

ছোট রাজপুত্র বলল, “যে সময় আমি আমার গোলাপের জন্য ব্যয় করেছি… যাতে সে নিশ্চিতভাবে আমার স্মৃতিতে থাকে।”

শেয়াল বলল,” মানুষ এই সত্য ভুলে গেছে। তুমি ভুলে যেও না। তুমি যাদের সাথে বন্ধুত্ব করেছ তাদের কাছে তুমি চিরজীবন দায়বদ্ধ। তুমি তোমার গোলাপের কাছে দায়বদ্ধ।”

ছোট রাজপুত্র বলল, “আমি আমার গোলাপের প্রতি দায়বদ্ধ, যাতে আমি তাকে অবশ্যই মনে রাখতে পারি।”

অধ্যায় – বাইশ

ছোট রাজপুত্রের সাথে রেলওয়ে সুইচম্যানের স্বাক্ষাত।

ছোট রাজপুত্র বলল, “শুভ সকাল।“

রেলওয়ে সুইচম্যান উত্তরে বলল, “শুভ সকাল।”

ছোট রাজপুতর বলল, “আপনি এখানে কী করেন?”

“আমি রেলগাড়িকে এক লাইন থেকে অন্য লাইনে চালনা করি। কখনো ডানে, কখনো বামে।”

একটি দারুণ আলোতে উজ্জ্বল রেলগাড়ি সুইচম্যানের কেবিনে তুমুল গর্জনে ছুটে এল।

ছোট রাজপুতর বলল, “তারা খুব তাড়াহুড়ায় আছে। তারা কী খুঁজছে?”

সুইচম্যান জানাল, “রেল ইঞ্জিনের ইঞ্জিনিয়ারও জানে না।”

দ্বিতীয় আরেকটি রেলগাড়ি আলোকোজ্জ্বল হয়ে অন্যদিক থেকে ছুটে এল।

“তারা কি ফিরে আসছে?” ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল।

“এগুলো একটা গাড়ি নয়। এটা একটা একচেঞ্জ।” সুইচম্যান উত্তর দিল।

ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “তারা যেখানে আছে সেখান নিয়ে কি তারা সন্তুষ্ট না?”

সুইচম্যান বলল, “কেউই তার নিজের জায়গা নিয়ে সন্তুষ্ট না।”

এরপর তারা তৃতীয় আলোকোজ্জ্বল রেলগাড়ি আসার শব্দ শুনতে পেল।

ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “তারা কি প্রথম ভ্রমণকারীদের অনুসরন করছে?”

সুইচম্যান বলল, “তারা কাউকেই অনুসরণ করছে না। তারা ওখানে ঘুমিয়ে আছে। যারা ঘুমায় নি তারা হাই তুলছে। শুধুমাত্র ছোট ছোট বাচ্চারা জানালাতে নাক লাগিয়ে বাইরে দেখছে।”

ছোট রাজপুত্র বলল, “শুধুমাত্র বাচ্চারা জানে তারা কী খোঁজছে। তারা যখন একটি ছেঁড়া পুতুল নিয়ে সময় নষ্ট করে এবং এটিই তখন তাদের কাছে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে যায়। কেউ তা কেড়ে নিলে তারা কান্না জুড়ে দেয়।”

সুইচম্যান বলল, “তারা ভাগ্যবান।”

অধ্যায় – তেইশ

ছোট রাজপুত্রের সাথে দোকানদারের স্বাক্ষাত হল।

“শুভ সকাল,” ছোট রাজপুত্র বলল।

দোকানদার উত্তরে বলল, “শুভ সকাল।”

এই দোকানদার কিছু ঔষধের বড়ি বিক্রি করছিল যা তৃষ্ণা নিবারণ করে। সপ্তাহে একটা খেলে পুরো সপ্তাহে কোন তৃষ্ণা জাগবে না।

“আপনি এগুলি কেন বিক্রি করছেন?” ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল।

দোকানদার বলল, “কারণ এগুলো প্রচুর সময় বাঁচায়। বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে দেখেছেন এগুলো প্রতি সপ্তাহে তোমার ৫৩ মিনিট সময় বাঁচাবে।”

“এই ৫৩ মিনিটে আমি কী করব?”

“যা তোমার ইচ্ছা…”

ছোট রাজপুত্র নিজেকে বলল, “আমি যদি ৫৩ মিনিট সময় পাই যা ইচ্ছা করার জন্য তাহলে আমি চাইব বিশুদ্ধ পানির ফোয়ারার ভেতর দিয়ে হেটে এই অবসর সময় কাটাতে।”

অধ্যায় – চব্বিশ

পিপাসার্ত হয়ে ছোট রাজপুত্র এবং কথক মরুভূমিতে একটি কুয়া খোঁজতে লাগল।

এটা ছিল দূর্ঘটনায় মরুভূমিতে এসে পড়ার পর অষ্টম দিন। আমি ছোট রাজপুত্রের কাছ থেকে যখন দোকানদারের গল্প শুনছিলাম তখন পান করছিলাম আমার সাথে থাকা পানির শেষ ফোঁটা।

“আহ! তোমার স্মৃতিগুলো দারুণ। কিন্তু এখনো আমি আমার প্লেন ঠিক করতে পারলাম না। আমার পান করার মত কোন পানিও নেই আর। তাই তোমার মত বিশুদ্ধ পানির ফোয়ারার ভেতর দিয়ে হাটতে পারলে আমিও খুশি হতাম।”

ছোট রাজপুত্র বলতে শুরু করল, “আমার বন্ধু শেয়ালটি…”

“প্রিয় ছোট্ট বন্ধু, শেয়ালের কথায় এখানে কোন কাজ হবে না।”

“কেনো?”

“কারণ আমি পিপাসায় মরতে বসেছি।”

সে আমার কথা বুঝতে পারল না এবং বলল, “একটা বন্ধু থাকা একটা ভাল ব্যাপার। যদি কেউ মরতে বসে তবুও। শেয়ালকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে আমি গর্বিত।”

আমি মনে মনে ভাবলাম, তার বিপদ সম্পর্কে কোন ধারনাই নেই। সে কখনো ক্ষুধার্ত বা পিপাসার্ত হয় না। তার শুধু দরকার হয় একটু সূর্যের আলো।

কিন্তু সে আমার দিকে ধীরভাবে তাকাল এবং বলল, “আমি তৃষ্ণার্থ। চলো একটা কুয়া খোঁজে বের করি।”

আমি একটা ক্লান্ত অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুললাম। মরুভূমিতে হঠাৎ করে কুয়া খোঁজা হাস্যকর একটা ব্যাপার। কিন্তু তবুও আমরা হাটতে শুরু করলাম।

যখন আমরা ক্লান্তিভরা মন নিয়ে অনেকক্ষন নিঃশব্দে হাটছিলাম তখন একসময় অন্ধকার নেমে এল। এবং দেখা দিল উজ্জ্বল তারকারাজি। তৃষ্ণা আমাকে জ্বরভাবাপন্ন করে তুলেছিল। আমি আকাশের তারাদের দিকে তাকালাম। মনে হল এগুলি যেন স্বপ্নে দেখছি। ছোট রাজপুত্রের শেষ বলা কিছু কথা আমার মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছিলঃ

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম তারপরে, “তাহলে তুমিও পিপাসার্ত?”

সে আমার প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর দেয় নি। শুধু বলেছিলো, “পানি হৃদয়ের জন্যও ভালো হবে…”

আমি তার উত্তর বুঝতে পারছিলাম না। তবুও কিছু বললাম না। কারণ আমার বেশ ভালোমতই জানা ছিল তাকে জেরা করা অসম্ভব।

সে ক্লান্ত ছিল এবং বসে পড়ল। আমিও তার পাশে বসলাম। কিছুক্ষণ নিরবতার পর সে আবার কথা বলল, “তারাগুলো সুন্দর একটা ফুলের জন্য, যাকে দেখা যাবে না…”

আমি উত্তর দিলাম, “ঠিক।” এবং আর কোন কিছু না বলে আমি বালির ঢালের দিকে তাকালাম যা চাদের আলোয় সম্প্রসারিত হয়ে গেছে আমাদের সামনে।

ছোট রাজপুত্র বলল, “মরুভূমিটা সুন্দর।”

এটা ছিল সত্যি কথা। আমি সব সময় মরুভূমিকে ভালোবেসেছি। কেউ একজন মরুভূমির বালিতে বসে থাকলে কিছু দেখেনা, কিছু শুনে না। তবুও নিরবতা কিছু স্পন্দন সৃষ্টি করে, মৃদু ঔজ্জ্বল্য ছড়ায়।

ছোট রাজপুত্র বলল, “যা মরুভূমিকে সুন্দর করেছে তা হলো কোথাও না কোথাও এটি পানির কুয়া লুকিয়ে রাখে…”

আমি মরুভূমির বালিতে প্রতিবিম্বের প্রকৃত অর্থ হঠাৎ বুঝতে পেরে অবাক হয়ে গেলাম। যখন আমি ছোট ছিলাম তখন একটি পুরনো বাড়িতে থাকতাম। কিংবদন্তি অনুযায়ী প্রচলিত একটা ধারনা ছিল যে ঐ বাড়িতে গুপ্তধন লুকানো আছে। কিন্তু কেউ জানতো না কীভাবে সে গুপ্তধন খোঁজে পাওয়া যাবে। মনে হয় কেউ কোনদিন সে চেষ্টাও করে নি। কিন্তু সেই কিংবদন্তি আমার বাড়িতে এক ধরনের জাদুময়তা ছুঁড়ে দিয়েছিল যেন। আমার বাড়ি তার হৃদয়ের গভীরে এক গুপ্ত কথা লুকিয়ে রেখেছিল…

আমি ছোট রাজপুত্রকে বললাম, “হ্যা। এই তারা, মরুভূমি কিংবা বাড়িকে সৌন্দর্য দিয়েছে এমন কিছু, যা চোখে দেখা যায় না।”

সে বলল, “আমি আনন্দিত যে তুমি আমার শেয়ালের সাথে একমত হয়েছ।”

ছোট রাজপুত্র ঘুমিয়ে পড়লে আমি তাকে কোলে নিয়ে হাটতে শুরু করলাম। আমি ভেতরে ভেতরে নিজেকে আন্দোলিত অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি যেন হালকা একটি গুপ্তধন নিয়ে হাটছি। আমার মনে হচ্ছিল এর চেয়ে হালকা কিছু আর নেই পৃথিবীতে। আমি তার ম্লান কপালের দিকে তাকালাম, তার চোখ বন্ধ, তার চুলগুলি বাতাসে কাঁপছিল। আমি নিজেকে বললাম, “আমি যা দেখছি তা একটি খোলক মাত্র। যা গুরুত্বপূর্ন তা চোখে দেখা যায় না…”

তার ঠোট একটি সংশয়ী অর্ধ হাসিতে কিছুটা নড়ে উঠলে আমি আবার নিজেকে বললাম, “আমাকে যে জিনিসটা এই ছোট রাজপুত্রের ব্যাপারে বেশি আন্দোলিত করেছে তা হল একটা ফুলের প্রতি তার বিশ্বস্থতা। একটি গোলাপের ছবি যা তার সমস্তটার ভেতর দিয়ে বাতির শিখার মত জ্বলজ্বল করে, যখন সে ঘুমিয়ে থাকে তখনো…”

এবং তাকে তখনো আমার হালকা মনে হচ্ছিল। আমি অনুভব করলাম তাকে রক্ষা করতে চাই আমি, যেন সে একটি আগুনের শিখা যা বাতাস এলেই নিভে যাবে।

যেহেতু আমি হাঁটছিলাম তাই ভোরের দিকে একটি কুয়া পেলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *