অধ্যায় – দশ
ছোট রাজপুত্র রাজার দেখা পেল।
ছোট রাজপুত্র তাকে প্রতিবেশী গ্রহাণু যেমন ৩২৫, ৩২৬, ৩২৭, ৩২৮, ৩২৯ এবং ৩৩০ এ গেল। সে জ্ঞাণ অর্জনের জন্য প্রত্যেকটিতে ভ্রমণ করা শুরু করেছিল। প্রথমটিতে থাকতেন একজন রাজা। রক্তবর্নের রাজকীয় লম্বা পোষাক পরিহিত অবস্থায় তিনি তার সাধারন কিন্তু মহিমান্বিত সিংহাসনে বসা ছিলেন।

“আহ! এই তো একটি সাবজেক্ট!” বলে ছোট রাজপুত্রকে দেখামাত্রই তিনি চিৎকার করে উঠলেন।
ছোট রাজপুত্র মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞেস করল, কীভাবে সে আমাকে প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলল?
ছোট রাজপুত্র জানত না কীভাবে পৃথিবী রাজাদের জন্য সহজ হয়ে গেছে। তাদের কাছে প্রতিটি মানুষই এক একটা সাবজেক্ট
“সামনে আসো বৎস, যাতে তোমাকে আমি আরো ভালোভাবে দেখতে পারি।” রাজা শেষপর্যন্ত কারো ‘রাজা’ হওয়ার গর্বে গর্বিত ছিলেন
ছোট রাজপুত্র চারপাশে বসার মত কোন জায়গা আছে কি না দেখতে লাগল। কিন্তু সমস্ত জায়গা ছিল ঠাসা এবং রাজার লম্বা পোষাকের অংশে পরিপূর্ণ। তাই ছোট রাজপুত্র দাঁড়িয়ে রইল। সে ছিল খুব ক্লান্ত তাই হাই তুলল
রাজা বললেন, “একজন রাজার সামনে হাই তোলা শিষ্টাচার পরিপন্থি কাজ। তবু, তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।”
ছোট রাজপুত্র লজ্জিত ভাবে বলল, “আমি আটকাতে পারি নি। আসলে আমি অনেক ক্লান্ত, লম্বা ভ্রমণ করে এসেছি…”
রাজা বললেন, “আহ! তাহলে ঠিক আছে। আদেশ করছি, আরো হাই তোল। আমি অনেকদিন কারো হাই তোলা দেখি না। হাই তোলা দেখাও এখন আমার উৎসাহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আদেশ করছি। হাই তোল। আবার হাই তোল এখন।”
ছোট রাজপুত্র এবার পুরোপুরি লজ্জিত হয়ে বিড় বিড় করে বলল, “এটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে…আমি পারবো না আর…”
“হুম! হুম! তাহলে আমি তোমাকে আদেশ করছি কোন এক সময় তুমি হাই তুলবে…অন্য কোন সময় –”
রাজাকে কিছুটা বিরক্ত মনে হল।
রাজারা এইজন্যই যে লোকজন তার আদেশ মান্য করবে। কোন অবাধ্যতা সহ্য করবেন না। তিনি একজন শক্তিশালী রাজা। তিনি যেহেতু একজন ভাল মানুষ ছিলেন তাই তার আদেশ গুলিও হত যুক্তিসংগত।
তিনি উদাহরণ স্বরুপ বলবেন, আমি যদি কোন সেনাপতিকে আদেশ দেই নিজেকে সামুদ্রিক পাখিতে পরিণত হতে, এবং সেনাপতি যদি আমার কথা না শোনে, তাহলে সেটা সেনাপতির দোষ না, দোষ আমার।
“আমি কি বসতে পারি?” ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল।
“আমি তোমাকে বসতে আদেশ করছি –” বললেন রাজা। এবং তার রাজকীয় পোষাকের কিছু ভাঁজ করলেন।
ছোট রাজপুত্র ভাবছিল, “গ্রহটা খুব ছোট। তাহলে এই রাজা কীসের উপর রাজত্ব করেন?”
সে বলল, “স্যার! আমি কি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে পারি?”
রাজা বললেন, “আমি তোমাকে আদেশ করছি আমাকে প্রশ্ন করতে।”
“স্যার …আপনি কীসের উপর রাজত্ব করেন?”
মহিমান্বিত সরলতার সাথে রাজা উত্তর দিলেন, “সব কিছুর উপরে।”
“সবকিছুর উপরে?”
রাজা তার গ্রহ, আশপাশের গ্রহ এবং তারাদের প্রতি ইঙ্গিত করলেন।
“এই সব কিছুর উপরে?” ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল।
“হ্যা। এই সব কিছুর উপরে।”
আমার শাসন শুধু যে অসীম তাই না, এটা সার্বজনীনও।
“তারাগুলো আপনার আদেশ মানে?”
“অবশ্যই মানে। ঠিকঠাক মত মানে। আমি তাদের অবাধ্যতা করতে দেই না।” রাজা উত্তর দিলেন।
এই রকম ক্ষমতা ছোট রাজপুত্রের কাছে ছিল অদ্ভুত ব্যাপার। তার যদি এরকম ক্ষমতা থাকত তাহলে সে সুর্যাস্ত দেখতে পারত, দিনে ৪৪ বার না, ৭২ বা তার ও বেশি, হয়ত ১০০ বা ২০০ বার, চেয়ার না সরিয়েই। ছোট রাজপুত্রের তার পরিত্যাগ করে আসা গ্রহটার কথা মনে পড়ল এবং তার খারাপ লাগল। সে সাহস সঞ্চার করে রাজাকে বলল,
“আমি সূর্যাস্ত দেখতে চাই। দয়া করে সূর্যকে বলুন অস্ত যেতে…”
“আমি যদি কোন সেনাপতিকে বলি ফুল থেকে ফুলে প্রজাপতির মত উড়ে যেতে অথবা একটি ট্রাজিক নাটক লিখে ফেলতে অথবা নিজেকে সামুদ্রিক পাখিতে পরিণত করতে এবং সেনাপতি যদি আমার আদেশ মানতে না পারে তাহলে দোষটা কার হবে? আমার না সেনাপতি?” রাজা প্রশ্ন করলেন।
“আপনার।” ছোট রাজপুত্র দৃঢ়ভাবে উত্তর দিল।
“ঠিক। একজনকে সেই কাজই দিতে হবে যা সে করতে পারবে। তুমি যদি তোমার মানুষদের বলো সমুদ্রে গিয়ে ঝাঁপ দিতে তাহলে তারা জেগে উঠবে এবং তোমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। আমার অধিকার আছে বাধ্যতা পাওয়ার কারণ আমার আদেশ গুলো যুক্তিসংগত।”
“কিন্তু আমার সূর্যাস্ত?” ছোট রাজপুত্র কোন কিছু চাইলে বা জিজ্ঞেস করলে তা সহজে ভুলে না।
“তুমি তোমার সূর্যাস্ত দেখতে পাবে। আমি আদেশ দিয়ে দেব। কিন্তু আমার রাজত্বের বিজ্ঞান মতে সূর্যাস্তের জন্য কিছু শর্তের প্রয়োজন আছে। শর্ত গুলো পূরণ হলেই তুমি সূর্যাস্ত দেখতে পাবে।”
“এটা কখন হবে?” ছোট রাজপুত্র প্রশ্ন করল।
“হুম! হুম!” শব্দ করে রাজা মোটা বর্ষ পঞ্জি দেখে বললেন, “হুম! হুম! এটা হবে আজ সন্ধ্যা ৮ টা ২০ মিনিটে। তখন তুমি দেখতে পাবে আমার আদেশ কীভাবে মানা হয়।”
ছোট রাজপুত্র হাই তুলল। তার হারানো সূর্যাস্তের জন্য তার দুঃখ হল। সে কিছুটা বিরক্তও হতে শুরু করেছিল।
“আমার এখানে করার কিছু নেই। আমি বরং আমার পথেই চলে যাই”, সে রাজাকে বলল।
“না যেও না।” গর্বিত রাজা বললেন, “আমি তোমাকে মন্ত্রী বানাব।”
“কীসের মন্ত্রী?”
“বিচারমন্ত্রী।”
“কিন্তু এখানে বিচার করার ত কেউ নেই।”
“আমরা জানি না। আমি আমার রাজ্যের পুরোটা ঘুরে দেখি নি। আমি অনেক বৃদ্ধ। আমাকে বয়ে নেওয়ারও কিছু নেই। এবং হাঁটলে আমি ক্লান্ত হয়ে যাই।”
“অহ! আমি দেখেছি চারপাশ।” ছোট রাজপুত্র আবার মাথা ঘুরিয়ে দেখে নিল। এদিকেও কিছু নেই, ওদিকও নেই কিছুই।
রাজা বললেন, “তাহলে তুমি নিজেকে বিচার করবে। এটি সব থেকে কঠিন কাজ। নিজেকে বিচার করা অন্যকে বিচার করার থেকে অনেক বেশি কঠিন। তুমি যদি নিজেকে সত্যিকার ভাবে বিচার করতে সক্ষপম হও, তাহলে তুমি সত্যিকার অর্থেই একজন প্রজ্ঞাবান লোক।দ
“হ্যা। কিন্তু আমি যেকোন জায়গা থেকে নিজেকে বিচার করতে পারি। নিজেকে বিচার করার জন্য আমার এই গ্রহে থাকতে হবে না।” ছোট রাজপুত্র বলল।
“হুম ! হুম! আমার কাছে ভাল কিছু কারণ আছে এটা বিশ্বাস করার যে এই গ্রহে একটি বৃদ্ধ ইঁদুর আছে। আমি তার শব্দ শুনেছি রাতে। তুমি এই বৃদ্ধ ইঁদুরকে বিচার করতে পারবে। সময় সময় তুমি তাকে মৃত্যুদন্ড দিবে। তাই তার জীবন তোমার বিচারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কিন্তু আবার তুমি তাকে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে ক্ষমা করে দিবে, মিতব্যয়ীতার জন্য। কারণ আমাদের তো একটাই মাত্র ইঁদুর আছে।”
“আমি কাউকে মৃত্যদণ্ড দিতে পছন্দ করি না। আমি এখন আমার নিজের পথে যাচ্ছি।” ছোট রাজপুত্র বলল।
রাজা বললেন, “না।”
ছোট রাজপুত্র ঐ গ্রহ ছেড়ে আসার সমস্ত আয়জোন শেষ করে ফেলেছিল এবং বৃদ্ধ রাজার মনে কষ্ট দেয়ার ইচ্ছে তার ছিল না।
“মহামান্য, আপনি যদি চান আমি আপনার আদেশ মান্য করি তাহলে আমাকেও যুক্তিসংগত আদেশ দিন। যেমন- আদেশ দিন এক মিনিটের মধ্যে এই গ্রহ ছেড়ে চলে যেতে।”
রাজা কোন উত্তর দিলেন না।
ছোট রাজপুত্র এক মুহুর্তের জন্য দ্বিধায় ছিল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে গ্রহ ত্যাগ করল।
রাজা চিৎকার করে বললেন, “আমি তোমাকে আমার রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করলাম।”
তার ছিল চমৎকার কর্তৃত্ব ক্ষমতা।
ছোট রাজপুত্র ভ্রমণ করতে করতে নিজেকেই বলল, “বড়’রা – আসলেই অদ্ভুত!”
অধ্যায় – এগারো
ছোট রাজপুত্র অহংকারী লোকটিকে দেখতে গেল।
দ্বিতীয় গ্রহতে বাস করত একজন অহংকারী লোক।
“আরে! একজন ভক্ত দেখছি আমাকে দেখতে এসেছে –“ সে ছোট রাজপুত্রকে দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠল।
অহংকারী লোকটির কাছে সব মানুষই তার ভক্ত বা প্রশংসাকারী।
“শুভ সকাল। আপনি বেশ অদ্ভুত হ্যাট পড়ে আছেন।” ছোট রাজপুত্র বলল।
“এটা স্যালুট হ্যাট। যখন মানুষ আমার নামে জয়ধ্বনি করে তখন এটি স্যালুট দিতে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু আফসোস কেউ কখনো এদিক দিয়ে যায় না।”
“তাই?” বলল ছোট রাজপুত্র। অহংকারী লোকটি আসলে কী নিয়ে বলছিল তা ছোট রাজপুত্র ঠিকমত বুঝতে পারছিল না।
“হাততালি দাও।” অহংকারী লোকটি এবার আদেশের সুরে বলল।
ছোট রাজপুত্র হাততালি দিল। অহংকারী লোকটি বিনয়ী স্যালুটে তার হ্যাট তুলল।
“এটি রাজা’র থেকে বেশি উপভোগ্য।” ছোট রাজপুত্র বলল নিজেকে। সে আবার হাততালি দিতে শুরু করল। অহংকারী লোকটি আবার হ্যাট তুলে স্যালুট দিল।
পাঁচ মিনিট এইরকম চলার পরে ছোট রাজপুত্র একঘেয়েমিতায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
“তাহলে হ্যাটকে আবার নিচে ফিরিয়ে আনতে কী করতে হবে?” সে জিজ্ঞেস করল।
কিন্তু অহংকারী লোকটি তার কথা শুনল না। অহংকারী লোকেরা কখনো প্রশংসা ছাড়া কোন কথা শুনে না।
“তুমি কি সত্যি আমাকে দেখে মুগ্ধভাবে প্রসংশা করছ?” সে ছোট রাজপুত্রকে কে জিজ্ঞেস করল।
ছোট রাজপুত্র বলল, “মুগ্ধভাবে প্রশংসা কী জিনিস?”
“মুগ্ধভাবে প্রশংসা বলতে বুঝায় তুমি স্বীকৃতি দিচ্ছো যে আমি সবচেয়ে সুদর্শন, সবচেয়ে সুসজ্জিত পোশাকে, আমি সবচেয়ে বুদ্ধিমান, এবং এই গ্রহের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।”
“কিন্তু তোমার গ্রহে তুমিই তো একমাত্র মানুষ!”
“আমাকে দয়া করো। মুগ্ধভাবে আমার প্রশংসা করো।”
ছোট রাজপুত্র কাঁধ সামান্য ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি তোমার প্রশংসা করছি। কিন্তু এতে কী এমন আছে যা তোমাকে এত আকৃষ্ট করে?”
তারপর ছোট রাজপুত্র চলে গেল।
সে তার ভ্রমন চালিয়ে যেতে যেতে নিজে নিজেই বলল, “বড়রা অবশ্যই খুব অদ্ভুত।”
অধ্যায় – বারো
ছোট রাজপুত্র মাতালের সাথে দেখা করল।
তারপরের গ্রহে বাস করত একজন মাতাল। এটি ছিল খুব ছোট একটি স্বাক্ষাৎ, কিন্তু তা ছোট রাজপুত্রকে গভীর বিষন্নতায় নিমগ্ন করে ফেলল।
“তুমি এখানে কী করছ?” সে মাতালকে জিজ্ঞেস করল। মাতালটি নিরবে বসে ছিল কিছু খালি মদের বোতল এবং অনেক পূর্ন বোতল সামনে নিয়ে।
“আমি মদ পান করছি,” মাতালটি বিষাদমাখা কন্ঠে উত্তর দিল।
“কেন তুমি মদ্যপান করছ?” জানতে চাইল ছোট রাজপুত্র।
মাতার উত্তর দিল, “যাতে আমি ভুলে থাকতে পারি।”
ছোট রাজপুত্র মাতাল লোকটির জন্য দুঃখবোধ করছিল। সে জিজ্ঞেস করল, “কী ভুলে থাকতে?”
মাতালটি মাথা দুলিয়ে বলল, “ভুলে থাকতে যে আমি লজ্জিত ছিলাম।”
ছোট রাজপুত্র চাইছিল লোকটিকে সাহায্য করতে। সে আবার জিজ্ঞেস করল, “কী জন্য লজ্জিত?”
“মদ পানের জন্য লজ্জিত…” বলে মাতালটি কথা বলা বন্ধ করল এবং নিজেকে দুর্ভেদ্য নিরবতার মধ্যে নিমগ্ন করে ফেলল।
ছোট রাজপুত্র ঠিকমত বুঝতে না পেরে এক ধরনের ধাঁধার ভেতর থাকতে থাকতই সেখান থেকে চলে গেল।
সে তার ভ্রমন চালিয়ে নিতে নিতে নিজে নিজেই বলল, “বড়রা আসলে খুব, খুব অদ্ভুত!”
অধ্যায় – তেরো
ছোট রাজপুত্র ব্যবসায়ীর সাথে দেখা করল।
চতুর্থ গ্রহটির মালিক ছিল একজন ব্যবসায়ী। সে এতই ব্যস্ত ছিল যে ছোট রাজপুত্র পৌছানোর পর মাথা তুলেও দেখল না।
ছোট রাজপুত্র বলল, “শুভ সকাল। আপনার সিগারেট নিভে গেছে।”
“তিন আর দুইয়ে পাঁচ। পাঁচ আর সাথে বারো। বারো আর তিনে পনের। পনের আর সাতে বাইশ। বাইশ আর ছয়ে আটাশ। আমার নতুন করে জ্বালানোর সময় নেই। ছাব্বিশ আর পাঁচে একত্রিশ। দারুণ! তারপর এতে হয় পাঁচশত এক মিলিয়ন, ছয়শত বাইশ হাজার, সাতশত একত্রিশ।”
ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “কী পাঁচশত মিলিয়ন?”
“এহ! তুমি এখনো এখানে? পাঁচশত এক মিলিয়ন – আমি থামতে পারবো না- অনেক কাজ বাকী। আমি অতি গুরুত্বপূর্ন কাজে ব্যস্ত। বাজে বকার সময় আমার নেই। দুই আর পাঁচ মিলে সাত……”
ছোট রাজপুত্র কোন প্রশ্ন করলে উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত থামে না। সে আবার জিজ্ঞেস করল, “পাঁচশত এক মিলিয়ন কী?”
ব্যবসায়ী লোকটি তার মাথা তুলে তাকাল।
সে বলা শুরু করল, “এই গ্রহে আমি চুয়ান্ন বছর ধরে আছি। এর মাঝে এ পর্যন্ত তিনবার মাত্র বিরক্ত হয়েছি কাজে। প্রথমবার, বাইশ বছর আগে কোত্থেকে যেন একটা হাঁস এসে পড়ল। ভয়ংকর শব্দে মুখরিত করে তুলল এবং সে শব্দগুলো অনুরণিত হচ্ছিল চারপাশে। আমি তখন আমার যোগে চারটা ভুল করেছিলাম। দ্বিতীয়বার, এগারো বছর আগে আমি পেশির ব্যথায় আক্রান্ত হলাম। তখন কাজে ব্যঘাত ঘটল। আমি ব্যায়াম করি না। অযথা নষ্ট করার মত সময় আমার নেই। এবং তৃতীয়বারটা হচ্ছে এখন। তো আমি যা বলছিলাম, পাঁচশত এক মিলিয়ন…
“কী পাঁচশত এক মিলিয়ন?”
ব্যবসায়ী লোকটি তখন বুঝতে পারল উত্তর না দেয়া পর্যন্ত তার শান্তিতে থাকার কোন উপায় নেই।
সে উত্তর দিল, “ওই সমস্ত ছোট বস্তুগুলো। যেগুলো আকাশে মাঝে মাঝে দেখা যায়।”
“মাছি?”
“না। ওই চকচকে বস্তুগুলো।”
“মৌমাছি?”
“অহ! না। ঐ ছোট চকচকে সোনালী বস্তুগুলো। যা দেখে অলস ব্যক্তিরা স্বপ্ন দেখে। আমার স্বপ্ন দেখার সময় নেই। আমি অতি গুরুত্বপূর্ন কাজে ব্যস্ত।”
“আপনি কি তারাদের কথা বলছেন?”
“হ্যা। ঠিক তাই। তারা।”
“আপনি এই পাঁচশত মিলিয়ন তারাদের দিয়ে কী করবেন?”
“পাঁচশত এক মিলিয়ন, ছয়শত বাইশ হাজার, সাতশত একত্রিশ। আমি গুরুত্বপূর্ন কাজের ব্যাপারে সতর্ক। আমার সংখ্যাটা সঠিক।”
“আচ্ছা, আপনি এই তারাদের দিয়ে কী করবেন?”
“আমি এগুলো দিয়ে কী করব?”
“হ্যা।”
“কিছু করব না। এগুলো আমার।”
“আপনি তারাদের মালিক?”
“হ্যা।”
“কিন্তু আমি একজন রাজা দেখেছি যিনি……”
“রাজারা কোন কিছুর মালিক হয় না। তারা শুধুমাত্র শাসন করে। এগুলো খুব জটিল বিষয়।”
“তারাদের মালিক হয়ে আপনার লাভটা কী হয়?”
“এটি আমাকে ধনী হতে সাহায্য করে।”
“ধনী হলে কী হয়?”
“এটি আমার জন্য নতুন কোন তারা আবিষ্কৃত হলে তা কেনা সম্ভব করে তোলে।”
ছোট রাজপুত্র নিজের মনেই বলল, “এই লোক কিছুটা সেই দূর্ভাগা মাতালটার মত।”
কিন্তু তবুও তার কিছু প্রশ্ন বাকী রয়েছিল।
সে জিজ্ঞেস করল, “একজন কীভাবে তারাদের মালিক হতে পারে?”
“তারাগুলো কার?” ব্যবসায়ী লোকটি রাগান্বিত হয়ে প্রশ্ন করে বসল।
“আমি জানি না। কারো নয়।”
“তাহলে এগুলো আমার। কারণ সর্বপ্রথম আমিই এগুলো নিয়ে চিন্তা করেছি।”
“শুধু এই কারণেই?”
“অবশ্যই। যখন তুমি কোন হীরার টুকরা পাবে যার মালিক কেউ না, এটা হয়ে যাবে তোমার। যখন তুমি কোন দ্বীপ আবিষ্কার করবে যার মালিক কেউ না এটা হয়ে যাবে তোমার। যখন তুমি কোন আইডিয়া পাবে যা আগে কেউ ভাবে নি, এটা তুমি প্যাটেন্ট করবে এবং তা হয়ে যাবে তোমার। তাই আমার ক্ষেত্রেও, তারাগুলো আমার, কারণ আমার আগে কেউ তারাগুলোকে নিজের করে নেয়ার চিন্তা করে নি।”
“হ্যা। তা ঠিক। কিন্তু আপনি এগুলি দিয়ে কী করবেন?
“আমি তাদের তদারকি করি। আমি তাদের গুনি এবং বার বার গুনি। এটা কঠিন কাজ। কিন্তু আমি এমন মানুষ গুরুত্বপূর্ন কাজে প্রাকৃতিকভাবেই আগ্রহী।”
ছোট রাজপুত্র তখনো উত্তরে সন্তুষ্ট ছিল না।
“যদি আমার কোন স্কার্ফ থাকে আমি সেটা গলায় নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারি। আমার যদি কোন ফুল থাকে সেটা আমি ছিঁড়ে সাথে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আপনি তো আকাশ থেকে তারাগুলিকে ছিঁড়ে আনতে পারবেন না…”
“না। কিন্তু আমি তাদের ব্যাংকে জমা রাখতে পারি।”
“এর মানে কী?”
“এর অর্থ হল আমি একটি কাগজে আমার তারাদের সংখ্যা লিখে তারা ড্রয়ারে তালাবদ্ধ করে রাখি।”
“শুধু এই?”
ব্যবসায়ী উত্তর দিল, “এটাই যথেষ্ট।”
ছোট রাজপুত্র ভাবল, “এটা উপভোগ্য। কিছুটা কাব্যিক। কিন্তু এর তো কোন গুরুত্ব নেই।”
আসলে মুল ব্যাপার হল, ছোট রাজপুত্রের চিন্তাগুলি বড়দের চেয়ে ভিন্ন ছিল।
ছোট রাজপুত্র ব্যবসায়ীর সাথে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে থাকল, “আমার একটি ফুল আছে। আমি তাতে প্রতিদিন পানি দেই। আমার তিনটি আগ্নেয়গিরি আছে। আমি প্রতি সপ্তাহে এগুলি পরিস্কার করি। (আমি মৃত আগ্নেয়গিরিটাও পরিস্কার করি। কারণ কী ঘটবে কিছুই বলা যায় না।) এগুলি হচ্ছে আমার আগ্নেয়গিরি এবং ফুলের ব্যবহার। কিন্তু আপনার তারাদের ত কোন ব্যবহার নেই…”
ব্যবসায়ী লোকটি কিছু বলতে মুখ খুলল কিন্তু বলার মত কিছুই খুঁজে পেল না।
এবং ছোট রাজপুত্র চলে গেল।
সে তার ভ্রমনে চলতে চলতে নিজেকেই বল, “বড়রা আসলে অস্বাভাবিকও।”
অধ্যায় – চৌদ্দ
ছোট রাজপুত্র দীপপ্রজ্বলক লোকটির সাথে দেখা করল।
পঞ্চম গ্রহটা ছিল অদ্ভুত। গ্রহগুলির মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে ছোট। তাতে একটা রাস্তার বাতি এবং একজন দীপপ্রজ্বলকের থাকার মত জায়গা ছিল। দীপপ্রজ্বলক হল যে বাতি জ্বালানো-নিভানোর দায়িত্বে ছিল সে। ছোট রাজপুত্র চিন্তা করে কোন ব্যাখায় যেতে পারল না এখানে মহাকাশের কোন একটি অংশে, কোন একটি গ্রহে যেখানে কোন মানুষ নেই, কোন বাড়ি নেই, সেখানে বাতি এবং সেই বাতি জ্বালানোর লোকের কী দরকার।
কিন্তু তবুও সে নিজেকে বলল, এটা মনে হতে পারে অযৌক্তিক এবং হাস্যকর। কিন্তু এই লোকটি সেই রাজা,অহংকারী লোক, মাতাল এবং ব্যবসায়ীর মত হাস্যকর না। কারণ তার কাজের সামান্য হলেও কিছু অর্থ আছে। যখন সে বাতি জ্বালায় তখন যেন সে নতুন একটি তারা বা ফুলকে জীবিত করল। যখন সে বাতিটি নিভিয়ে ফেলে তখন যেন সে তারা বা ফুলকে ঘুম পাড়িয়ে দিল। তাই এটি একটি সুন্দর পেশা। এবং সুন্দর বলেই তা সত্যি কাজের।
যখন সে গ্রহে পৌছল, সম্মানের সাথে দীপপ্রজ্বলককে স্যালুট দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“শুভ সকাল। আপনি কেন আপনার বাতিটাকে নিভিয়ে ফেললেন?”
“কারণ ওগুলো নিয়ম।। শুভ সকাল।” দীপ প্রজ্বলক উত্তর দিল।
“কী নিয়ম?”
“এই যেমন আমি বাতিটা নিভিয়ে ফেললাম। শুভ সন্ধ্যা।”
এবং সে আবার বাতি জ্বালাল।
“কিন্তু তাহলে তুমি আবার কেন বাতি জ্বালালে এখন?”
“ওগুলো নিয়ম।” উত্তর দিল দীপ প্রজ্বলক।
ছোট রাজপুত্র বলল, “আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”
“এখানে বুঝার কিছু নেই। নিয়ম তো নিয়মই। শুভ সকাল।”
সে আবার বাতি নিভিয়ে ফেলল।
সে লাল লাল বর্গাকার ডিজাইনে সাজানো একটি রুমাল দিয়ে তার কপাল মুছল।
“আমি একটি ভয়ংকর পেশায় আছি। আগে যাও ব্যাপারটি যুক্তিযুক্ত ছিল। আমি সন্ধ্যায় বাতি জ্বালাতাম আর সকালে নিভাতাম। আমি বিশ্রামের জন্য পুরো দিন এবং ঘুমানোর জন্য পুরো রাত পেতাম।”
“কিন্তু এরপর নিয়মগুলি কি বদলে গেছে?”
দীপপ্রজ্বলক উত্তর দিল, “না। নিয়মের কোন পরিবর্তন হয় নি। আসলে এটা একটা দূর্ভাগ্য! বছরের আবর্তনে এখন গ্রহে দ্রুত সময় যাচ্ছে। কিন্তু নিয়মের কোন পরিবর্তন হয় নি।”
“তাহলে কী?” ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল।
“তাহলে- এখন গ্রহ প্রতি মিনিটে একবার আবর্তন করছে। তাই আমার এক সেকেন্ড অবকাশ নেই। প্রতি মিনিটে আমাকে বাতি জ্বালাতে নেভাতে হয়।”
“এটা খুব মজার! এখানে দিন মাত্র এক মিনিটের।”
“এটা মোটেও মজার কিছু না। এই যে আমরা কথা বলছি এর মাঝে একমাস চলে গেছে।” বলল দীপ প্রজ্বলক।
“একমাস?”
“হ্যা, একমাস। ত্রিশ মিনিট, ত্রিশ দিন। শুভ সন্ধ্যা।”
সে আবার বাতি জ্বালাল।
ছোট রাজপুত্র তাকে দেখছিল এবং তার মনে হচ্ছিল নিয়মের প্রতি অতি বিশ্বস্ত এই বাতিজ্বালক লোকটাকে সে পছন্দ করে। তার ফেলে আসা দিনের সেইসব সূর্যাস্তের কথা মনে হল, যখন সে চেয়ার ঘুরিয়েই সূর্যাস্ত দেখতে পারত। সে তার এই বন্ধুকে সাহায্য করতে চাইল।
ছোট রাজপুত্র বলল, “আমি তোমাকে একটা উপায়ের কথা বলতে পারি যাতে যখন ইচ্ছা তুমি বিশ্রাম নিতে পারো।”
“আমি সব সময় বিশ্রাম নিতে চাই,” উত্তর দিল বাতিজ্বালক।
একজন মানুষের পক্ষে একই সাথে বিশ্বস্ত এবং অলস হওয়া সম্ভব।
ছোট রাজপুত্র ব্যাখ্যা করতে শুরু করল কীভাবে সে বিশ্রাম নিতে পারে তা,
“তোমার গ্রহ খুব ছোট। মাত্র তিন পা হেটেই তুমি পুরোটা ভ্রমণ করতে পারবে। সবসময় সূর্যালোকে থাকতে হলে তোমাকে ধীরে হাটতে হবে। যখন তুমি বিশ্রাম নিতে চাইবে তখন হাটবে।– তাহলে তুমি যতক্ষণ চাও ততক্ষণই দিন থাকবে।”
বাতিজ্বালক উত্তরে বলল, “এটা আমাকে বিশেষ সাহায্য করতে পারবে না। আমি জীবনে একটা জিনিসই ভালোবাসি এবং তা হচ্ছে ঘুম।”
“তাহলে তুমি দূর্ভাগ্যবান,” ছোট রাজপুত্র বলল।
উত্তরে বাতিজ্বালক বলল, “আসলেই আমি দূর্ভাগা। শুভ সকাল।”
সে বাতি নিভিয়ে ফেলল।
ছোট রাজপুত্র তার ভ্রমণ চালিয়ে যেতে যেতে নিজেকে বলল, “এই লোকটি আসলে সেই রাজা, অহংকারী, মাতাল এবং ব্যবসায়ীর অপব্যবহারের স্বীকার হবে। যাইহোক, তাকে আমার ওদের মত হাস্যকর মনে হয় নি। সম্ভবত এই কারণে যে সে শুধু নিজের কথাটাই ভাবছে না।”
সে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং বলল, “এদের মধ্যে এই লোকটিই একমাত্র যাকে আমি বন্ধু বানাতে পারি। কিন্তু তার গ্রহটি আসলেই খুব ছোট। এখানে দুজনের জায়গা হবে না…”
যা ছোট রাজপুত্র স্বীকার করতে সাহস করে নি তা হল গ্রহটি ছাড়তে তার খুব খারাপ লাগছিল -এর প্রধান কারণ এটি দিনে ১৪৪০ বার সূর্যাস্তে ধন্য হয়।
অধ্যায় -পনের
ছোট রাজপুত্র ভূগোলবিদের সাথে দেখা করল।
ষষ্ট গ্রহটা তার আগেরটা থেকে প্রায় দশগুণ বড় ছিল। সেখানে থাকতেন একজন ভদ্রলোক যিনি বড় বড় বই লিখতেন।
ছোট রাজপুত্রকে আসতে দেখে তিনি বলে উঠলেন, “আরে! এই তো একজন অনুসন্ধানকারী!”
ছোট রাজপুত্র টেবিলে বসল এবং ছোট ছোট কিছু নিঃশ্বাস ফেলল। সে ইতিমধ্যেই অনেক জায়গা ভ্রমণ করে ফেলেছে!
ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কোথা থেকে এসেছ?”
“এই বড় বইটা কী? আপনি কী করছেন?” ছোট রাজপুত্র পালটা প্রশ্ন করল।
ভদ্রলোক উত্তরে বললেন, “আমি একজন ভূগোলবিদ।”
ছোট রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “ভূগোলবিদ কী?”
ভূগোলবিদ হচ্ছেন একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যিনি পাহাড়, নদী, সাগর, শহর, মরুভূমি ইত্যাদির অবস্থান জানেন।
এটা খুব ভাল। এখানে শেষ পর্যন্ত একজন লোক পাওয়া গেল যার সত্যিকারের কোন পেশা আছে। ছোট রাজপুত্র ভূগোলবিদের গ্রহের আশপাশে তাকিয়ে দেখল। এটি ছিল তার দেখা সবচেয়ে অসাধারণ এবং মহিমান্বিত গ্রহ।
ছোট রাজপুত্র বলল, “আপনার গ্রহটি অনেক সুন্দর। এতে কোন সমুদ্র আছে?”
ভূগোলবিদ উত্তর দিলেন, “আমি বলতে পারবো না।”
“অহ! তাহলে কি কোন পাহাড় আছে?”
ভূগোলবিদ উত্তর দিলেন, “আমি বলতে পারবো না।”
“তাহলে কোন শহর, নদী, অথবা মরুভূমি?”
“আমি এগুলোও বলতে পারবো না।”
“কিন্তু আপনি তো একজন ভূগোলবিদ!”
ভূগোলবিদ উত্তরে বললেন, “ঠিক বলেছ। আমি একজন অনুসন্ধানকারী না। আমার গ্রহে একজনও অনুসন্ধানকারী নেই। এটা ভূগোলবিদের কাজ না গিয়ে নদী, পাহাড়, সমুদ্র, মরুভূমি গোনে দেখা। ভূগোলবিদ এর চেয়ে বরং আলস্যে বসে থাকবেন। তিনি কখনো তার ডেস্ক ছেড়ে যান না। কিন্তু তিনি তার এই অধ্যয়নে অনুসন্ধানকারীর সাহায্য নেন। তিনি তাদের প্রশ্ন করেন। তারা তাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার সাপেক্ষে যা উত্তর দেয় তিনি তা লিখে রাখেন। এবং যদি কোন অনুসন্ধানকারী বর্নিত কোন ঘটনা কৌতুহল উদ্দীপক হয় তাহলে তিনি ঐ অনুসন্ধানকারীর নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে তদন্তের আদেশ দেন।”
“এটা কেন?”
“কারণ একজন অনুসন্ধানকারী যে মিথ্যা কথা বলে সে ভূগোলবিদের বইয়ে ভয়াবহ বিপর্জয় ডেকে আনতে পারে। ঠিক তেমনি একজন মদ্যপ অনুসন্ধানকারীও পারে।”
“কিন্তু এটা কেন হয়?” ছোট রাজপুত্র প্রশ্ন করল।
“কারণ নেশাগ্রস্ত লোক এক জিনিসের জায়গায় দুইটা জিনিস দেখে। এক্ষেত্রে দেখা যাবে ওর কথা শোনে ভূগোলবিদ একটা পাহাড়ের জায়গায় দুইটা লিখে বসে আছেন।”
ছোট রাজপুত্র বলল, “আমি এরকম একজনকে চিনি। যে আপনার খারাপ অনুসন্ধানকারী হতে পারে।”
“হ্যা। এটা খুব সম্ভব। অনুসন্ধানকারীর নৈতিক চরিত্রের তদন্তের পর তার আবিষ্কার নিয়ে আরেকটি তদন্তের আদেশ দিতে হয়।”
“কেউ কি গিয়ে ঐ আবিষ্কার দেখে আসে?”
“না। সেটা খুব জটিল হয়ে পড়ে। এজন্য আবিষ্কারের প্রমাণ আনলেই চলে। যেমন কেউ যদি কোন বড় পাহাড়ের কথা বলে তাহলে তার সেই পাহাড়ের একটা বড় পাথর আনলেই হবে।”
ভূগোলবিদ হঠাৎ উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি অনেক দূর থেকে এসেছ। তুমি একজন অনুসন্ধানকারী। তুমি আমাকে তোমার গ্রহ সম্পর্কে বলতে পারো।”
ভূগোলবিদ তার বড় রেজিস্টার খাতা বের করে পেনসিলে ধার দিতে শুরু করলেন। প্রথমে অনুসন্ধানকারীদের বর্ননা পেনসিলে লেখা হয়। তারপর প্রমাণের অপেক্ষা করা হয়। ঠিকঠাক মত প্রমাণ অনুসন্ধানকারী হাজির করতে পারলে তবেই তা কলমের সাহায্যে লেখা হয়।
আশাব্যঞ্জক দৃষ্টিতে ছোট রাজপুত্রের দিকে তাকিয়ে ভূগোলবিদ বললেন, “বলো।”
ছোট রাজপুত্র বলা শুরু করল, “আসলে যেখানে আমি থাকতাম ওটা বেশ সুন্দর গ্রহ না। এটা খুব ছোট ছিল। আমার তিনটা আগ্নেয়গিরি ছিল। দুইটা সক্রিয় এবং একটা মৃত। মৃত হলেও সামনে কী ঘটবে তা তো কেউ জানে না।”
ভূগোলবিদও বললেন, “সামনে কী ঘটবে তা কেউ জানে না।”
“আমার একটি ফুলও আছে।”
“আমরা ফুল রেকর্ড করি না,” ভূগোলবিদ উত্তর দিলেন।
“এটা কেন? আমার গ্রহের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস ছিল ঐ ফুলটি!”
ভূগোলবিদ উত্তর দিলেন, “আমরা ওগুলো রেকর্ড করি না। এগুলো হচ্ছে ক্ষণজন্মা।”
“ক্ষণজন্মা – মানে কী?”
ভূগোলবিদ উত্তরে বললেন, “ভূগোল হচ্ছে, এমন কিছু বই যাতে আমরা শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ন জিনিসগুলো লিখে রাখি। যেগুলো কখনো পুরনো হয় না। একটা পাহাড় সাধারনত তার জায়গা পরিবর্তন করে না, একটা সমুদ্র পানিশূন্য হয়ে পড়ে না। আমরা শাশ্বত জিনিসগুলো নিয়েই লিখি।”
ছোট রাজপুত্র বাধা দিয়ে বলল, “কিন্তু মৃত আগ্নেয়গিরি সক্রিয় হতে পারে! আর ক্ষণজন্মা মানে কী?”
ভূগোলবিদ বললেন, “আগ্নেয়গিরি জীবিত বা মৃত হোক, দুটোই আমাদের কাছে সমান। আমাদের কাছে মুল ব্যাপার পাহাড়। এটি পরিবর্তিত হয় না।”
ছোট রাজপুত্র যে তার জীবনে কোন প্রশ্ন করে উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত থামে নি, পুনরায় প্রশ্ন করল, “কিন্তু ক্ষণজন্মা মানে কী?”
“এর অর্থ যা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাবার বিপদের মধ্যে আছে।”
“আমার ফুল কি দ্রুত অদৃশ্য হবার বিপদের মধ্যে আছে?”
“অবশ্যই।”
“আমার ফুল ক্ষণজন্মা।” ছোট রাজপুত্র নিজে নিজে বলল। “তার মাত্র চারটি কাঁটা আছে নিজেকে রক্ষা করতে। এবং আমি তাকে একা গ্রহে ফেলে এলাম!”
এই প্রথম সময় ছোট রাজপুত্রের অনুশোচনা হল। কিন্তু সে সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি আমাকে কোন জায়গা ভ্রমণ করার জন্য উপদেশ দিতে চান এখন?”
ভূগোলবিদ উত্তর দিলেন, “পৃথিবী নামক গ্রহে যাও। এর বেশ সুনাম আছে।”
এবং ছোট রাজপুত্র তার ফুলের কথা ভাবতে ভাবতে চলে গেল।
