দাবিদার – ১

এক

দীর্ঘ, ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দিয়ে নিউ মেক্সিকো থেকে এসেছে জন উইলিয়ামস।

ওকে আর ওর পিঙ্গল-বর্ণ ঘোড়াটা দেখলেই যে-কেউ বুঝবে, মোটেই আরামদায়ক ছিল না সে-যাত্ৰা।

দু’জনের মধ্যে ঘোড়ার অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভাল চলবার পথে পেট পুরে ঘাস খেয়েছে।

কিন্তু দিনের পর দিন অভুক্ত থাকতে হয়েছে তার মালিককে।

বলতে গেলে, যাত্রাপথে রানশ কিংবা কেবিন ছিলই না।

সিক্সগান বা রাইফেলের আওতায় পেয়েছে সামান্য কয়েকটি হরিণ, ভালুক কিংবা খরগোশ। বেশির ভাগ সময় অনাহারে থেকে প্রায় কঙ্কালসার হয়ে উঠেছে ও। আর দীর্ঘ এ ভ্রমণ প্রতিটি পেশিতে ধরিয়ে দিয়েছে খিঁচ, ব্যথায় টনটন করছে গা।

অবশ্য এ নরক যন্ত্রণার অবসান ঘটতে চলেছে। কারণ, গোটা সকাল জুড়েই সার্কেল ইউ রানশের চিহ্ন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জন উইলিয়ামসের চোখে। বিস্তৃত উপত্যকায় কাঠের তৈরি কিছু বাড়ি আর গোটা তিনেক করাল নজরে এসেছে ওর। এর মধ্যে একটা করালে কিছু ঘোড়াকে ট্রেনিং দিতে দেখেছে।

ওটাই নিশ্চয়ই সার্কেল ইউ রানশ।

এতটা রাস্তা পাড়ি দিয়ে এই জায়গার খোঁজেই এসেছে জন উইলিয়ামস। তবে এখুনি রানশের দিকে রওনা হলো না। পাইন গাছে ছাওয়া ঢালে ঘোড়াটার লাগাম টেনে ধরল। স্যাডল হর্নে তুলে দিল এক পা। মাথার হ্যাট একপাশে ঠেলে দিয়ে পকেট থেকে বের করল তামাক আর মেকিংস। সময় নিয়ে সিগারেট বানিয়ে ধরাল।

জনের বয়স সাতাশ। চওড়া কিনারাঅলা সমতল টুপি দিয়ে ঢাকা মাথা ভর্তি রুক্ষ, বাদামি চুল। রোদে পোড়া, ফুটকি বোঝাই চেহারা প্রথম দর্শনে ইণ্ডিয়ানদের মত লাগে। প্রায় ভোঁতা নাক, মুখখানা চওড়া, আবছা হাসি যেন সব সময় ফুটে থাকে। ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালে উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হবে না ওর। ফ্লানেল শার্ট ও রংচটা জিনসে দশটা সাধারণ পাঞ্চার থেকে ওকে আলাদা করবার জো নেই-শুধু ওই চোখ জোড়া ছাড়া।

জনের দিকে তাকালে সবার আগে ওর চোখ দুটোই নজর কাড়ে। ঘন ভুরুর নীচে চোখ জোড়া আশ্চর্য নীল। শীতল, বুদ্ধিদীপ্ত ও নিষ্ঠুর।

এ মুহূর্তে ও তাকিয়ে আছে সার্কেল ইউ-র ঘোড়ার করালের দিকে।

ওখানে একটা ডান ঘোড়া এই মাত্র তার আরোহীকে পিঠ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।

লোকটা হাঁচড়ে পাঁচড়ে সিধে হয়ে ঝেড়ে দৌড় দিল কাঠের বেড়ার দিকে।

ঘোড়াটা তেড়ে গেল তার পিছন-পিছন।

এই বুঝি চাপা পড়ল লোকটা ঘোড়ার পায়ের নীচে!

শিরদাঁড়া টানটান হয়ে গেল জনের।

না, একদম শেষ মুহূর্তে রক্ষা পেল লাল শার্ট পরা লোকটা, লাফ দিয়ে বেড়া টপকাল।

তাল সামলাতে না পেরে বেড়ার গায়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ল ডান।

জোরাল সংঘর্ষের শব্দ পাহাড়ের উপর থেকেও শুনতে পেল জন।

তবে পরের দৃশ্য দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠল। সামনে ঝুঁকে এল সে। অপলক চোখে দেখছে-লাল শার্ট এক দৌড়ে গিয়ে ঢুকেছে পাশের এক বাঙ্কহাউসে।

একটু পরেই বেরিয়ে এল, হাতে রাইফেল।

স্যাডল হর্ন থেকে পা সরিয়ে রেকাবে ঢোকাল জন। ঘোড়ার মাথা টেনে ধরল। পেটে মৃদু খোঁচা দিতেই ইঙ্গিত পেয়ে পা বেয়ে নামতে লাগল প্রভুভক্ত জানোয়ার।

মাত্র কয়েক কদম এগিয়েছে জন, দেখল, করালের বেড়ার উঁচু রেইলিং-এ এসে দাঁড়িয়েছে লাল শার্ট।

এনক্লোজারের মধ্যে বৃত্তাকারে ঘুরছে ডান, লোকটাকে দেখতে পেল। চিঁহি-চিঁহি করে ডেকে উঠে পিছিয়ে গেল। তারপর আবারও লাল শার্টকে লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে।

ঘোড়াটাকে খুব কাছে আসার সুযোগ দিল লাল শার্ট, তারপর গর্জে উঠল তার হাতের রাইফেল।

শক্তিশালী বুলেটের ধাক্কায় ঘুরে গেল ডান, চরকির মত ঘুরেই দড়াম করে পড়ে গেল মাটিতে। বার কয়েক পা ছুঁড়ে নিথর হয়ে গেল। মারা গেছে।

রক্ত চুষতে শুরু করেছে শুকনো জমিন।

সন্তুষ্ট চিত্তে মাথা দোলাল লাল শার্ট, চেম্বারে আরেকটা গুলি ভরে লাফিয়ে নামল বেড়া থেকে। লম্বা কদমে চলল বাঙ্কহাউসে। তার পিছু নিল কয়েকজন পাঞ্চার। তারা এতক্ষণ অশ্ব-নিধন পর্ব উপভোগ করছিল।

মৃত ঘোড়ার স্যাডল খুলে নিতে করালে ঢুকল এক পাঞ্চার। কপালে ভাঁজ পড়ল জন উইলিয়ামসের।

খুনি ঘোড়াটা উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। এ ধরনের জানোয়ারকে হত্যা করা ছাড়া উপায় থাকে না।

কিন্তু একটু আগের ঘটনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ও। ওর কাছে মনে হচ্ছে, এ যেন এক অশুভ সঙ্কেত।

ও জানে, খুনে হয়ে জন্মায় না কোনও ঘোড়া, তাকে হত্যাকারী হিসাবে তৈরি করে মানুষ তাদের চরম নিষ্ঠুরতা দিয়ে 1 সার্কেল ইউ-র ওই ঘোড়াটার ক্ষেত্রেও হয়তো তেমনই ঘটেছে।

ওটাকে খুনে করেছে কেউ।

দুই

ঘোড়া ও মানুষের অন্যায্য লড়াই শেষে বাড়ির ভিতর গিয়ে ঢুকেছে সবাই।

রানশ ইয়ার্ডে কাউকে দেখল না জন। অবশ্য একটু যাওয়ার পর দু’জনকে দেখল দূরের এক করালে।

রানশহাউসের পাশ থেকে সরিয়ে নিচ্ছে তারা ঘোড়ার লাশ। জনকে দেখে কৌতূহল নিয়ে চাইল।

তবে তাদেরকে পাত্তা দিল না জন। সার্কেল ইউ-র লে-

আউটে চোখ বোলাতে ব্যস্ত।

বিশাল রানশ সার্কেল ইউ।

দালানগুলো বড়। ভাল ভাবে মেরামত করা করালগুলো। সব কিছুতেই রঙের পোঁচ পড়েছে।

এখানে আসার পথে বেশ কিছু গবাদি পশু দেখেছে ও। হেরিফোর্ড ও শর্টহর্নের সঙ্কর প্রজাতির গরু। তাগড়া, শক্তিশালী, পেশিবহুল-উন্নত জাতের।

বহু ধনী রানশারের কাছেও এমন স্টক নেই।

এ রানশ যে চালায়, সে ব্যবসা বোঝে—ভাবল জন। অতি ভ্রমণে ক্লান্ত, আড়ষ্ট শরীর নিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল ও। বাড়ির সামনের হিচর‍্যাকে বাঁধল ঘোড়ার লাগাম। সিঁড়ি বেয়ে উঠছে বারান্দায়, উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল ওর।

পেটের ভিতর যেন ফড়ফড় করে উড়ছে প্রজাপতি।

এই ক্ষণের জন্যই অপেক্ষা করছিল এতদিন। বড় হবার পরে ক্লিনটনদের কাছে গল্প শুনেছিল। এরপর থেকে শুরু হয় প্রতীক্ষার পালা-কবে আসবে ও এখানে। তবে এখানে পৌঁছার আগ পর্যন্ত উপলব্ধি করেনি, ভিতরে ভিতরে এতটা ব্যাকুল ছিল। উপলব্ধি করেনি, এ জায়গা ওর জন্য আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

‘হ্যালো, কেউ আছ?’ গলা শুকিয়ে গেছে জনের।

তবে ওর কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যাবার আগেই ঠাস করে খুলে গেল দরজা। ওর শুষ্ক কণ্ঠের কথার জন্য নয়, বুটের শব্দ পেয়েই বোধ হয় দরজা খুলেছে ঘরের বাসিন্দা।

দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে সেই লাল শার্ট। কিছুক্ষণ আগে গুলি করে মেরেছে যে ডান ঘোড়াটাকে।

লোকটা বিশালদেহী। জনের চেয়ে উচ্চতায় দু’এক ইঞ্চি বেশিই হবে। বয়স বছর পাঁচেক বেশি। দৈহিক কাঠামো অনেক চওড়া। লোকটা বৃষস্কন্ধ, মাথাটা মোষের মতই প্রকাণ্ড। কপালের উপর ঝুলছে ঘন কালো চুলের গোছা। জনের ভ্রমণ- বিপর্যস্ত চেহারা দেখে সরু হলো ঝোপের মত কালো ভুরুর নীচে চোখ জোড়া।

‘কী চাই?’ কর্কশ, গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল লাল জামা।

প্রথম দর্শনে লোকটাকে অপছন্দ হলো জনের। তবু গলায় মোলায়েম স্বর ফুটিয়ে বলল, ‘আমি মিস্টার মরিস উইলিয়ামসের কাছে এসেছি।’

দরজার কবাটে হেলান দিল লাল শার্ট। ভাবলেশশূন্য চেহারা। কুঁচকে রাখায় তার চোখ এখন স্রেফ এক জোড়া সরু ফাটল।

জবাব দিতে ইচ্ছা করেই সময় নিল সে। অবশেষে বলল, ‘সে এখানে নেই।’

শীতল ভয় জাগল জনের বুকে। শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে নিয়ে জানতে চাইল, ‘কোথায় সে? কখন ফিরবে?’

লাল শার্টের মুখটা একটু কুঁচকে গেল। ‘সে আর ফিরবে না।’

অপলক চোখে লোকটাকে দেখছে জন। নীরবতা ভেঙে নরম সুরে জানতে চাইল, ‘আর ফিরবে না মানে?’

সিধে হলো লাল জামা। ‘মানে হলো, সে মারা গেছে। তিন দিন আগে আমরা তাকে কবর দিয়েছি।’

তিন

কথাটা শুনে একটা হাহাকার জেগে উঠল জন উইলিয়ামসের বুকের ভিতর, ওখানে যেন মস্ত শূন্যতা। ভীষণ হতাশ বোধ করছে। এতগুলো বছর পরে, এতদিনের প্রতীক্ষা শেষে, এত আশা নিয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে আসার পরে শেষপর্যন্ত কি না শুনতে হলো এ কথা!

জায়গায় স্রেফ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ও। লাল শার্টের দিকে ফাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে। বুকের ভিতর উথলে ওঠা শোক আর হতাশা দমন করতে চাইছে।

‘আমিই এখন এ রানশ চালাই,’ যেন অনেক দূর থেকে কথা বলল লাল জামা। পকেট থেকে বের করল তামাক। ‘আর আমাদের বাড়তি লোকের দরকার নেই। বানভাসী ভবঘুরেদের এখানে কোনও সুবিধা হবে না। এক ঘণ্টা পরে খেতে বসবে কর্মচারীরা। খেয়ে-দেয়ে বিদায় হও।’ স্যাক খুলে সামান্য তামাক রাখল সে সিগারেট পেপারে, তারপর শলাটা তৈরি করে দু’সারি দাঁতের ফাঁকে ঝুলিয়ে মনোযোগ দিল সামনের লোকটার উপর।

জনের ইচ্ছা করছে এক ঘুসিতে ব্যাটার মুখ থেকে সিগারেট ফেলে দেয়, কিন্তু শান্ত গলায় বলল, ‘আমি বানে ভেসে আসা কোনও ভবঘুরে নই। ‘

ওর কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, চমকে গিয়ে জনের মুখের দিকে তাকাল লাল শার্ট। আগন্তুকের চাউনি দেখে অজান্তেই দেয়ালে হেলান দেয়া আয়েশী ভঙ্গি থেকে সটান হয়ে গেল। শার্টের পকেটে রেখে দিল টোবাকো স্যাকটা।

‘তা হলে তুমি কে?’ শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল লাল জামা।

ফোঁস করে লম্বা শ্বাস ফেলল জন। ‘আমি মরিস উইলিয়ামসের ছেলে,’ জবাব দিল।

অস্বস্তিকর নীরবতা নামল দু’জনের মধ্যে। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা।

মনে হলো, থমকে গেছে সময়।

কয়েক মুহূর্ত পর মুখ থেকে সিগারেট নামাল লাল শার্ট। ঘোঁৎ করে বলল, ‘কী নাম তোমার?’

‘আমার নাম জন উইলিয়ামস,’ জবাব দিল জন। এক মুহূর্ত পর বলল, ‘নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, তোমার পরিচয় জানার অধিকার রাখি?’

মুখ কুঁচকে গেল লাল শার্টের। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আমার পরিচয় জানার অধিকার…তোমার? না, তা নেই, বন্ধু। তোমার আষাঢ়ে গল্প বিশ্বাস করিনি। সার্কেল ইউ থেকে কেটে পড়ার জন্য পুরো দুই মিনিট সময় দিলাম তোমাকে।’

‘চলে যাওয়ার জন্য এখানে আসিনি,’ মেজাজ সামলে রেখে বলল জন। ‘এসেছিলাম বাবাকে দেখতে। এখন তুমি বলছ সে মারা গেছে। কিন্তু আরও কিছু তথ্য আমাকে জানতে হবে। যেমন-বাবা কীভাবে মারা গেল, আর তুমিই বা কে…’

জনের কথা শেষ হওয়ার আগেই লাল শার্টের পিছনে দোরগোড়ায় এসে হাজির হলো একজন। ‘ঘটনা কী, বার্ট?’

‘ঘটনা কিছুই না, পিছনে না তাকিয়েই বলল বার্ট। ‘এদিকটা আমি একাই সামাল দিতে পারব।’

‘কিন্তু আমি জানতে চাই, কী ঘটছে,’ বলল তরুণ। সামনে বাড়তে শুরু করেছে।

বাধ্য হয়ে তাকে জায়গা ছাড়ল বার্ট।

সতর্ক হয়ে উঠেছে জন। তবে তরুণকে দেখে পেশিতে ঢিল পড়ল ওর।

বয়স বড় জোর ষোলো-সতেরো হবে এই ছেলের। মাঝারি উচ্চতা। কোমরের হোলস্টারে মস্ত কোল্ট। একটু কুঁজো হয়ে গেছে ওটার ওজনের ভারে। চোখ দুটো ওর অবিকল জনের মত-গভীর নীল ও মায়াময়, অবশ্য ভাসা-ভাসা।

‘কে তুমি?’ জনকে আপাদমস্তক দেখল ছেলেটা। ‘কী চাও, মিস্টার?’

‘আগে কয়েকটা কথা জানতে চাই,’ মৃদু গলায় বলল জন। ‘জানতে চাই মরিস উইলিয়ামসের কী হয়েছে। শুনলাম তোমরা নাকি তাকে এ সপ্তাহেই কবর দিয়েছ?’

‘একটু আগে উদ্ভট একটা কথা বলেছ তুমি,’ বলল ছেলেটি, ‘সত্যিই যদি ঠিক শুনে থাকি…’

‘ঠিকই শুনেছ,’ বলল জন। ‘আমি জন উইলিয়ামস, মরিস লিয়ামসের ছেলে,’ একটু-একটু কাঁপছে ওর কণ্ঠ। বুকে তৈরি হচ্ছে বেদনা ও হতাশার ঘূর্ণি। ‘বহু পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি বাবার সাথে দেখা করতে। আর তোমরা এখন বলছ…

বদলে গেল ছেলেটার চেহারার ভাব, স্থির দৃষ্টিতে চাইল জনের দিকে।

জনও দেখছে তাকে।

‘আরে…’ বলল ছেলেটা, মুখে হাসি ফুটল। ‘বার্ট, বাবা না বলেছিল…’

‘চোপ!’ ঘেউ করে উঠল বার্ট। ‘বাড়তি কোনও কথা বলবে না!’ মস্তানির ভঙ্গিতে এক কদম সামনে বাড়ল সে, দাঁড়িয়ে গেল জনের মুখোমুখি। কর্কশ গলায় বলল, ‘ঠিক আছে, বন্ধু, আমি বার্ট অ্যান্ড্রিউ। আর এ আমার সৎ-ভাই পিটার উইলিয়ামস। …কী মতলবে এসেছ, বুঝতে পারছি না। তবে মতলব যা-ই হোক, কোনও লাভ হবে না। আমাকে আর পিটারকে সার্কেল ইউ রানশের মালিকানা সমান ভাগে ভাগ করে দিয়ে গেছে মরিস উইলিয়ামস। আর তুমি এসেছ বানোয়াট গল্প নিয়ে। বলছ…’

‘এক মিনিট, বার্ট,’ বলল পিটার।

‘আহ, তোমাকে না বললাম চুপ থাকতে!’ হুঙ্কার ছাড়ল বার্ট। ‘আমি দেখছি ব্যাপারটা।’ জনের নাকের কাছে নিজের নাক নিয়ে গেল সে। ‘এক মিনিট সময় দিলাম তোমাকে, কেটে পড়ো এখান থেকে। আবারও যদি সার্কেল ইউ-র আশপাশে দেখি, শরীরের একটা হাড্ডিও আস্ত থাকবে না।’ ঘোঁৎ করে বিদঘুটে শব্দ করল নাক দিয়ে।

আর সহ্য হলো না জনের, পিছিয়ে গেল এক কদম, নিজেও সচেতন নয় যে নড়ে উঠেছে ওর হাত। বিদ্যুৎঝলকের মত সিক্সগান উদয় হলো হাতে। ঝট করে অস্ত্রটা তাক করল বার্ট অ্যান্ড্রিউর পেট লক্ষ্য করে।

‘সর্বনাশ!’ সশব্দে শ্বাস টানল পিটার। ‘আগে কখনও এমন ড্র দেখিনি!

‘তোমাদের বকবক শুনে আমি ক্লান্ত,’ থমথমে স্বরে বলল জন। ‘ফালতু গল্প করতে বা শুনতে এখানে আসিনি। শোনো, অ্যান্ড্রিউ, একবার এ কাগজের উপর নজর বুলিয়ে নাও।’ বাঁ হাতে শার্টের পকেট হাতড়ে কোঁচকানো একটা খাম বের করল জন, বাড়িয়ে দিল ওটা অ্যান্ড্রিউর দিকে।

খামের দিকে তাকাল একবার অ্যান্ড্রিউ, তারপর চোখ ফেরাল জনের দিকে। হাত বাড়িয়ে নিল খামটা। কর্কশ গলায় বলল, ‘এর ভিতর কী আছে, জানি না। তবে যা-ই থাক, তাতে কোনও লাভ হবে না তোমার।’

‘আমি পড়ে শোনাচ্ছি,’ বলে অ্যান্ড্রিউর কাছ থেকে খামটা নিল তরুণ। খাম থেকে বেরুল ভাঁজ করা এক টুকরো কাগজ। ওটার উপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে সৎ-ভাইয়ের দিকে চাইল পিটার। ‘বাবার হাতের লেখা!’

নাক দিয়ে আবারও বিশ্রী ঘোঁৎ শব্দ করল বার্ট অ্যান্ড্রিউ।

পিটার পড়তে শুরু করেছে:

প্রিয় বাছা, তুমি হাঁটতে শুরু করবার আগেই ওই এলাকা ছেড়ে এসেছি, কিন্তু কত ভালবাসি তোমাকে, তুমি জানো না।

ক্লিনটনরা না বললে হয়তো জানতেও না, তুমি আসলে আমার ছেলে।

চিঠি থেকে চোখ তুলে জনের কাছে জানতে চাইল পিটার, ‘ক্লিনটনরা কে?’

‘ওরা কোকোসের হর্সহেড ক্রসিং-এর বড় এক বাথানের মালিক,’ সংক্ষেপে সারল জন। ‘ওরাই মানুষ করেছে আমাকে।’ সিক্সগানের নল তাক করে রেখেছে ও বার্টের বুকে, সামান্যতম ঢিল পড়েনি সতর্কতায়।

মোটেও নড়ছে না বার্ট। আগন্তুকের তরফ থেকে যখন-তখন গুলি আসতে পারে।

আবারও চিঠি পড়তে লাগল পিটার:

তোমার প্রতি যে অবহেলা করেছি, তার কোনও অজুহাত এখন আর দেখিয়ে লাভ নেই। যুদ্ধ শেষে যখন বাড়ি ফিরি, লুইযিয়ানায় তখন আমাদের সহায়-সম্পত্তি বলতে তেমন কিছুই ছিল না। বাধ্য হয়ে সামান্য কয়েকটা ঘোড়া ও গরু নিয়ে যাত্ৰা করলাম টেক্সাসের দিকে।

কিন্তু হর্সহেড ক্রসিং-এর কাছে আমাদের উপর হামলা করল কোমাঞ্চিরা।

ওই লড়াইয়ে তোমার মা মারা গেল, ওর সাথে আরও অনেকে।

আমি তোমাকে নিয়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেলাম। আমার পায়ে তখন গেঁথে আছে কোমাঞ্চিদের তীর।

এর পরের কথা খুব মনে নেই আমার। শুধু মনে আছে, ক্লিনটনদের বাথানে কীভাবে যেন পৌঁছে গেলাম আমরা।

রয় আর বেনিটা ক্লিনটন খুব ভাল মানুষ।

তোমার মায়ের শোকে তখন আমার পাগল দশা-ওকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসতাম।

ক্লিনটনদের সাথে ছিলাম দুই মাস।

কোমাঞ্চিদের সাথে সদ্ভাব গড়ে উঠেছিল ওদের। তাই ওখানে খুব সমস্যা হয়নি আমার।

তবে মন টিকল না ওই বাথানে। তোমার মায়ের শোক কিছুতেই সামলে উঠতে পারলাম না। বারবার মনে হচ্ছিল অন্য কোথাও চলে যাওয়া উচিত, দূরে কোথাও গিয়ে নতুন কিছু করা উচিত।

ওদেশে মা ছাড়া দুধের বাচ্চা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সেজন্য ক্লিনটনদের কাছে তোমাকে রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কথা দিয়েছিলাম আবারও ফিরব। কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা রাখতে পারিনি।

কেন পারিনি, তা ব্যাখ্যা করা কঠিন। তোমার মায়ের কথা সারাক্ষণই মনে পড়ত। আর তোমাকে দেখলেই ওর স্মৃতি আরও কষ্ট দিত আমাকে।

কলোরাডোয় যাওয়ার পথে খনিতে কাজ করে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। তা দিয়ে কিনে ফেললাম একটা রানশ।

ওটার নাম সার্কেল ইউ, বেণ্ট’স ক্রসিং শহরের খুব কাছে ফ্লেচার’স হোল-এ খামারবাড়ি।

কয়েক বছর এ রানশের পিছনে অমানুষিক পরিশ্রম করলাম। তোমার কথা ভাবার সময়ই পাইনি তখন। তারপর একদিন চিঠি লিখলাম ক্লিনটনদের।

কিন্তু ওরা তখন কোথায় যেন চলে গেছে।

তখন আর সন্ধান পাইনি।

ওদেরকে খোঁজাখুঁজির সময় আমার পরিচয় হলো ভার্জিনিয়া অ্যান্ড্রিউর সাথে।

ভার্জিনিয়া আমার দ্বিতীয় স্ত্রী, তোমার সৎ-মা। প্রথম স্বামীর ঔরসে ওর একটা ছেলে আছে। আর বিয়ের পরে সে আমাকে উপহার দিল তোমার সৎ-ভাই পিটারকে।

চমৎকার মেয়ে ছিল তোমার সৎ-মা। তবে তার কিছু আচরণ একটু অদ্ভুত ছিল।

তোমার কথা তাকে কখনও বলিনি। সে ব্যাখ্যা দিতে গেলে অনেক দীর্ঘ হবে এ চিঠি। তবে বলতে এখন লজ্জাই লাগছে, আমি আর খোঁজাখুঁজি করিনি তোমাকে। বন্ধ করে দিয়েছিলাম অনুসন্ধান।

ভার্জিনিয়া এখন আর বেঁচে নেই।

ডাক্তার বলেছে আমারও আয়ু নেই বেশিদিন।

খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছি।

কিছু একটা বাসা বেঁধেছে শরীরে। ক্রমেই আকারে বড় হয়ে খেয়ে ফেলছে আমাকে।

ডাক্তাররা বলেছে, ওই জিনিস অপারেশনের অসাধ্য।

হয়তো কালই মারা যাব না আমি, তবে খুব বেশিদিন বেঁচেও থাকব না।

শুনেছি, লিঙ্কন কাউন্টিতে জন উইলিয়ামস নামে এক লোক আছে। এ চিঠি আমি এক রাইডারকে দেব। সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জন উইলিয়ামসকে খুঁজে বের করে চিঠি পৌঁছে দেবে তার হাতে।

তুমি যদি সেই জন উইলিয়ামস হও, তোমাকেই যদি ক্লিনটন দম্পতি মানুষ করে থাকে, তো তুমিই আমার সেই সন্তান, যাকে ছেলেবেলায় ফেলে এসেছিলাম। তোমার সাথে যে আচরণ আমি করেছি, তাতে ক্ষমা পাবার আশা করি না। কিন্তু তুমি যদি এখানে আসো, তো বাবা হিসেবে ছেলের যোগ্য স্বীকৃতি দেব আমি তোমায়। ভাইদের সাথে তোমার পরিচয় হবে, ওদের সাথে মিলেমিশে চালাবে এই রানশ-এটাই আমি চাই।

সবাই এ রানশের ভাগ পাবে।

তুমি এলে উইল করে সবার ভাগ বুঝিয়ে দেব আমি। আমি আর বড় জোর তিন-চার মাস বাঁচব।

এতসব কাজ সারার জন্য সময়টা যথেষ্ট নয়।

তবুও বেঁচে থাকার চেষ্টা করব। যদি তার আগেই মরে যাই, সেজন্য বলে রাখছি: আমার প্রথম স্ত্রীর ছেলে জন উইলিয়ামস আমার স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পাবে। এ চিঠি কোর্টে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করতে পারবে সে।

জন, প্লিজ, দয়া করে বাড়ি ফিরে এসো।

তোমাকে আমি খুবই ভালবাসি।

ইতি,

তোমার বাবা, মরিস উইলিয়ামস।

চিঠি পড়া শেষ করেছে পিটার, পোর্চে নেমে এসেছে পিন পতন নীরবতা।

সংক্ষিপ্ত নৈঃশব্দ ভেঙে খেঁকিয়ে উঠল বার্ট, ‘এমন আষাঢ়ে গল্প বাপের জন্মে শুনিনি!’

সৎ-ভাইয়ের দিকে ফিরল পিটার। ‘না, বার্ট, আষাঢ়ে গল্প নয়। বাবা বলেছিল…’

‘ভীমরতিতে ধরেছিল বুড়োকে!’ দাঁতে দাঁত ঘষল বার্ট। ‘সে তো নিজের নাম পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিল। স্মৃতি পুরোপুরি লোপ পেয়েছে মরার দু’মাস আগে।’ জনের দিকে তাকাল আগুন চোখে।

এর সাহস আছে, মনে মনে স্বীকার করল জন। রিভলভারের নলের সামনে একটুও ভয় পায়নি।

‘মিস্টার, তোমার ফালতু গল্প আর ভুয়া চিঠি নিয়ে বিদায় হও, নইলে…’ বলতে শুরু করেছিল বার্ট, কিন্তু থামতে হলো তাকে।

‘বার্ট,’ সৎ-ভাইকে বাধা দিল পিটার। ‘তোমাকে তো বললাম, এটা বাবার হাতের লেখা। আর ওর চোখ দেখো। একদম বাবার চোখের মত…’

এ কথা শুনে অধৈর্য ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল বার্ট। ‘কারও কথাই শুনবার দরকার পড়ে না আমার। আর এই জোচ্চোরের কথা বিশ্বাস করার তো প্রশ্নই ওঠে না। …সাবধান করে দিচ্ছি তোমাকে, পিটার, বারবার বড়দের কথার মধ্যে কথা বলতে এসো না!’ জনের দিকে কঠোর চোখে তাকাল সে। ‘তুমি যে-ই হও, গ্রাহ্য করি না আমি। চিঠি তোমার কাছে থাকুক বা না থাকুক, সার্কেল ইউ-র এক কণা জমিও আমি দিচ্ছি না তোমাকে! ভাগ পাবে না গরুরও! এ রানশের অর্ধেকের মালিক আমি, আর সেই অর্ধেকে কাউকে ভাগ বসাতে দেব না! এবার আপসে এখান থেকে যাবে, নাকি লাথি দিয়ে পাছার ছাল তুলে সীমানার বাইরে ফেলে দিয়ে আসব?’

‘চেষ্টা করে দেখো,’ কর্কশ শোনাল জনের কণ্ঠ, যেন করাত দিয়ে কাটছে লোহা। ‘বাবা কীভাবে মারা গেল, আমি জানতে চাই। জানতে চাই, আমার ব্যাপারে সে কী বলে গেছে। আর আমি…’

ওর কথা শেষ হলো না, তার আগেই পিছন থেকে শান্ত স্বরে বলল কেউ, ‘সিক্সগানটা ফেলে চুপচাপ দাঁড়াও, মিস্টার!’

বরফের মূর্তির মত জমে গেল জন।

আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিল, ভুলেই গিয়েছিল সার্কেল ইউ-র অন্যদের কথা। বিশেষ করে সেই দুই পাঞ্চার, যারা ওকে কৌতূহলী চোখে দেখেছিল, তাদের কথা ভুলে যাওয়া মোটেই উচিত হয়নি।

এখন শিরদাঁড়ায় খোঁচা দিচ্ছে রিভলভারের লোহার নল।

‘চমৎকার, ক্লাইড,’ বলল বার্ট অ্যান্ড্রিউ, মুখে কুটিল হাসি। একপাশে সরে গিয়ে জনের পিস্তলটা নেয়ার জন্য হাত বাড়াল।

পিঠে আরও একটা জোর খোঁচা খেয়ে অস্ত্রটা না দিয়ে উপায় থাকল না জনের।

‘এবার?’ কর্কশ স্বরে হাসল বার্ট, চোখের তারায় চকচক করছে বিজয়ের উল্লাস। জিভ দিয়ে চেটে নিল ঠোঁট। ‘আমার রানশে এসে আমাকেই হুমকি, না? …ওর উপর চোখ রাখো, ক্লাইড। নড়লেই দেরি না করে গুলি করবে।’ জনের সিক্সগান পিটারের হাতে গুঁজে দিল সে, ফাঁক করে দাঁড়াল পা। ‘হারামজাদাকে এবার জন্মের শিক্ষা দেব!’

কিছু বুঝবার আগেই বার্টের প্রচণ্ড ঘুসি নামল জনের মুখে। জোর ওই আঘাতে হুড়মুড় করে পিছিয়ে গেল ও। সর্ষে ফুল দেখছে চোখে। কানে ঝনঝন শব্দ।

আরও পিছিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু আরেকটা ঘুসি নামল চোয়ালের উপর।

তাল সামলাতে না পেরে পোর্চ থেকে উঠোনের ধুলোয় ধুপ করে পড়ল জন। চিত হয়ে পড়েছে, কনুইয়ে ভর দিয়ে উঁচু হলো। জলদি উঠে দাঁড়াতে হবে-নইলে কপালে খারাবি আছে ওর।

ঝাপসা দৃষ্টি একটু পরিষ্কার হতেই দেখল, পিছনে রিভলভার হাতে এক লোক-হাসছে খ্যাক খ্যাক করে।

পোর্চের দিকে চাইল জন, আর তখনই হাসতে হাসতে বারান্দা থেকে ওর উপর লাফিয়ে পড়ল বার্ট।

শত্রুর পাঁজরের হাড় ভেঙে দিতে চাইছে লোকটা!

মাথা এখনও বনবন করে ঘুরছে, তারই ফাঁকে চট করে একপাশে শরীর গড়িয়ে দিল জন।

ওর কপাল ভাল, এক ফুট দূরে ধুপ করে সবুট নামল বার্ট অ্যান্ড্রিউ। পরক্ষণে সামনে বেড়েই হামলে পড়ল জনের উপর। শার্টের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে মাটি থেকে টেনে তুলল ওকে

‘আরে, কী হচ্ছে, বার্ট!’ বারান্দা থেকে চেঁচাল পিটার। ‘সমান সুযোগ দাও ওকে!’

‘সুযোগ? জাহান্নামে যাক শালা!’ খেঁকিয়ে উঠল বার্ট। বাম হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ভয়ানক এক চড় কষাল জনের মুখে।

শক্ত হাতের ওজনদার চড় খেয়ে মাথাটা যেন বিস্ফোরিত হলো জনের। হাড়ে হাড়ে টের পেল, লোকটার গায়ে ষাঁড়ের শক্তি।

তৃতীয় ঘুসিটা প্রায় অজ্ঞান করে দিল ওকে। শরীরে কোনও শক্তি পাচ্ছে না। পরের কয়েক সেকেণ্ড শুধু বুঝল, একটার পর একটা ঘুসি নামছে ওর বুক-মুখ-পেটে।

শরীর অবশ। ব্যথা আর টের পাচ্ছে না জন। প্রতিটা ঘুসির সঙ্গে এপাশ-ওপাশ দুলছে ওর মাথা।

অবশ্য, দু’মিনিট পর বার্ট ওর কলার ছেড়ে দিতেই টের পেল, ফিরতে শুরু করেছে কষ্টকর ব্যথার বোধ। নানান জায়গায় টনটন করছে ফুলে ওঠা মাংসপেশি! ধুলোর মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল জন।

‘বার্ট!’ পিটারের কণ্ঠ শুনল, যেন অনেক দূর থেকে আসছে। এবার জনকে লাথাতে শুরু করল বার্ট।

বুটের শক্ত ডগা খোঁচা মারছে জনের পাঁজরে। খচখচ করে লাগছে বুকের ভিতর। তীক্ষ্ণ ব্যথার ঝিলিক সারা শরীরে।

আবারও গড়িয়ে সরতে চাইল জন, বার কয়েক দু’হাতে ঠেকাতে চাইল লাথি। কিন্তু এরই ভিতর হারিয়েছে সমস্ত শক্তি।

ওকে মেরে ফেলছে লোকটা!

প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই। কিছুই ঠাহর করতে পারছে না চোখে। যন্ত্রণায় বন্ধ হয়ে আসছে শ্বাস।

‘ঈশ্বরের দোহাই, থামো!’ চিৎকার করে বলল পিটার।

মাথার কাছে ধস্তাধস্তির শব্দ শুনল জন।

পিটার নিশ্চয়ই বার্টকে টেনে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে।

আর লাথি পড়ছে না জনের বুক-পেটে।

ধুলোর ভিতর হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে চাইল জন, মুখ থেকে বেরুল চাপা গোঙানি। মুখ হাঁ করে গিলতে চাইছে বাতাস। অক্সিজেনের অভাবে ফেটে যেতে চাইছে বুক।

খুব আস্তে আস্তে একটু একটু করে পরিষ্কার হলো ওর মাথা। মুখের সামনে, জন দেখল, বার্ট অ্যান্ড্রিউর বুটজুতো।

দুই বুটের ডগা ভেজা ওর শরীরের রক্ত!

ওকে লাথাতে স্পারও ব্যবহার করেছে বার্ট!

জন টের পেল, একেবারেই চলছে না ওর মগজ, ভোঁতা ব্যথার কুয়াশা ঘিরে ধরেছে ওকে। আবছা শুনল বার্ট অ্যান্ড্রিউর গলা: ‘ঠিক আছে, হারামজাদা ভবঘুরে! উঠে দাঁড়া, শালা!’

শক্তিশালী দুই হাতে জনকে হ্যাঁচকা টানে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল বার্ট। পরক্ষণে জোর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল ঘোড়ার হিচর‍্যাকের উপর। ‘ঘোড়ায় ওঠ, শালা! ভাগ! অল্পের উপর দিয়ে ছেড়ে দিলাম তোকে! আবারও বেয়াদবি করলে মাফ পাবি না! শালা! এটা তো সামান্য নমুনা…আবার যদি এদিকে দেখি, হাড়গোড় ভেঙে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু বানিয়ে দেব।’

ঘোর লাগছে জনের, ঝিমঝিম করছে মাথা।

তবুও একবার হোলস্টারের উপর ছোবল দিল ওর হাত।

ওখানে কোনও অস্ত্র নেই।

‘সিক্সগান ফেরত পাবি না।’ কর্কশ স্বরে হাসল বার্ট। ‘ওঠ, শালা, ঘোড়ার পিঠে! …ক্লাইড, একে ঘোড়ার পিঠে তুলে দাও! নিজে থেকে ওঠার শক্তি নেই ওর।’

অস্ত্র হাতে সার্কেল ইউ পাঞ্চার এগিয়ে এল।

জনকে দু’হাতে ধরে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিল সে। ‘ভাগো!’

স্যাডলে আলুর বস্তার মত পড়ে রইল জন। রক্তাক্ত, ফোলা এবং ক্ষতবিক্ষত মুখ তুলতে পারছে না।

ওর হাতে ঘোড়ার লাগাম গুঁজে দিল কেউ।

এক মুহূর্ত পর ঘোড়ার পাছায় পড়ল সজোরে থাবড়া। লাফ দিয়ে ছুটতে শুরু করল জানোয়ারটা।

ওটার প্রতি পদক্ষেপে ব্যথার বিষ ছড়িয়ে পড়ল জনের গায়ে। কেশর চেপে ধরে কোনওমতে সেঁটে রইল পিঠে।

ঝড়ের গতিতে সার্কেল ইউ-র উঠোন পেরোল ঘোড়া। প্রতি কদম ফেলার সঙ্গে ঝাঁকি খাচ্ছে জন, তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে শরীর জুড়ে।

তবে একই সঙ্গে ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে আসছে মাথাটা।

একসময় সোজা হয়ে বসল সে, চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে প্রভুভক্ত জানোয়ারকে নির্দেশ দিল কোথায় যেতে হবে।

আজ সকালে পাহাড়ে যে খাড়া ঢাল বেয়ে নেমে এসেছিল, ওদিকেই চলেছে।

শীঘ্রি সার্কেল ইউ পিছনে ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে পাহাড় বেয়ে উঠতে লাগল ঘোড়া।

কিছুক্ষণ পর পাহাড়ের উপর উঠে এল জন। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরেছে। প্রচণ্ড ব্যথায় এখনও ঝনঝন করছে সব হাড়। তবে শরীরের চেয়ে মানসিক আঘাত পেয়েছে অনেক বেশি।

পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে সবুজ বনানী। ওদিকে সার্কেল ইউ। শিশুদের খেলনা বাড়ি-ঘরের মত ছড়ানো-ছিটানো দালান। এত উপর থেকে ছোট দেখাচ্ছে।

রানশের উঠোনের মাঝে সচল এক লাল ফুটকি।

ওটা বার্ট অ্যান্ড্রিউ।

দাঁতে দাঁত ঘষল জন উইলিয়ামস। ‘আবারও ফিরব আমি, বার্ট,’ বিড়বিড় করে বলল। ‘আমার শেষ কথা এখনও শোনোনি তুমি।’ বুক ভরে দম নিতে চাইল, খচখচ করছে পাঁজরের ব্যথা।

মনে মনে বলল, ‘ওই জমির তিন ভাগের এক ভাগ আমার। জমি বা সম্পত্তি নিয়ে মাথা-ব্যথা ছিল না- বাবার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলাম শুধু। কিন্তু আজ থেকে ভাবব ওই সম্পত্তি নিয়ে। ওই জমি জিতে নেব আমি। যেভাবে হোক মালিক হব। আজ তুমি যা করলে, তার ফল ভোগ করতে হবে তোমাকে, বার্ট অ্যান্ড্রিউ। এর শোধ না নিয়ে ছাড়ব না আমি!’

লাগাম ধরে টান দিল জন, স্পার দিয়ে স্পর্শ করল ঘোড়ার পেট, রওনা হয়ে গেল সবুজ অরণ্যের দিকে।

চার

ওর ঘুম ভাঙল বাজ পাখির তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনে, চোখ মেলে চাইল জন উইলিয়ামস। বনে খোলা এক জায়গায় ক্যাম্প করেছে।

মাথার অনেক উপরের আকাশে চক্কর কাটছে এক বাজ পাখি।

চারদিকে ঝলমলে আলো। কখন যেন সকাল হয়ে গেছে। ধড়মড় করে উঠে বসল জন। কণ্ঠ চিরে বেরুল গোঙানি। শরীরের যন্ত্রণা কমেনি। গোটা দেহ ক্ষত-বিক্ষত। এমন ব্যথা, যেন দুরমুশ করা হয়েছে হাড়গোড়-মাংস।

মনে পড়ল গতকালের সমস্ত ঘটনা।

ক্রোধ ও অপমানে শক্ত হয়ে উঠল চোয়াল, সরু হয়ে গেল চোখের চাউনি।

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল জন। ব্যথায় কুঁচকে গেল মুখ। পা সামনে বাড়াতেই যেন আদর করে দেহে হাত বুলিয়ে দিল সূর্যের উত্তপ্ত রশ্মি। কয়েক পা হাঁটার পরে বুঝল, সামান্য কমেছে ব্যথা।

ফাঁকা জায়গায় এক কোণে দাঁড়িয়ে ঘাস খাচ্ছে ওর ঘোড়াটা। পাশ দিয়ে গেছে সঙ্কীর্ণ নদী। টগবগ করে ছুটেছে নীচের দিকে।

গায়ের জামা খুলে ফেলল জন।

ভাল খাবারের অভাবে শীর্ণকায় সে, তবে দেহে রয়েছে ওর বাবার মতই থোকা থোকা শক্ত পেশি। সব এখন কালশিটে পড়ে গেছে মারের চোটে

বুকের পাঁজর টিপে দেখল জন।

নাহ্, কোনও হাড় ভাঙেনি।

নদীতে নেমে পড়ল ও। কোমর-পানিতে।

বরফ ঠাণ্ডা পানি যেন কামড় বসাল গায়ে।

ভাল করে গা ধুয়ে নিল জন।

নদী থেকে উঠে গা-টা মোছার পরে একটু ভাল বোধ হলো। শরীরের ব্যথাও অনেকটা দূর হয়েছে।

গায়ে জামা চড়াল জন।

খিদেয় চোঁ-চোঁ করছে পেট। গত দু’দিন সামান্য দানাপানিও পড়েনি পেটে। এমনই খিদে, শারীরিক ব্যথার কথা ভুলে যেতে শুরু করেছে।

কী করবে এবার, ভাবছে ও।

একটা কথা মনে পড়তে সামান্য হাসল। প্রায় নড়লই না ওর ঠোঁট।

ওর সিক্সগান কেড়ে নিয়েছে বার্ট, অ্যান্ড্রিউ, কিন্তু মস্ত ভুল করেছে সে। স্যাডল থেকে সরিয়ে ফেলেনি উইনচেস্টার কারবাইনটা। খাপের ভিতর রয়ে গেছে ওটা।

আরও একবার সামান্য হাসল জন।

খুলে রাখা স্যাডল, ব্ল্যাঙ্কেট আর খাপ সহ রাইফেল নিয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ঘোড়ার দিকে এগোল ও। ঘোড়ায় সাজ পরিয়ে নিল কয়েক মিনিটে, তারপর বিশ্বস্ত জানোয়ারটার পিঠে উঠে রওনা হয়ে গেল নির্দিষ্ট এক জায়গা লক্ষ্য করে।

সার্কেল ইউ-তে অভাব নেই গবাদি পশুর।

সামান্য দূরের এক নিচু ক্যানিয়নে ঢুকবার পরই কাঙ্ক্ষিত জিনিস পেয়ে গেল-ঝোপঝাড়ের ভিতর ঘাস খাচ্ছে কয়েকটি গরু।

একটা গাভীর সঙ্গে রয়েছে মোটাসোটা শাবক।

গত রাতে বনের ভিতর দিয়ে বহু পথ পাড়ি দিলেও সার্কেল ইউ-র এলাকা থেকে আসলে অনেক দূরে সরে যেতে পারেনি জন। এখন অনুমান করল, ওই রানশহাউস কয়েক মাইল দূরে। আর এর মানেই, এখন গুলি ছুঁড়লেও ওদিকে যাবে না আওয়াজ।

ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ল জন। লক্ষ্যভেদ করতেও সময় লাগল না, মগজে গুলি নিয়ে মরল স্বাস্থ্যবান বাছুরটা।

রক্তের বোটকা গন্ধ এড়াতে ছুটে ভাগল অন্য গরুগুলো। এবার স্যাডল থেকে রশি নিয়ে মৃত বাছুরের পা বাঁধল জন। লাশটাকে টেনে নিয়ে চলল উঁচু জমি লক্ষ্য করে। পঞ্চাশ গজ যাওয়ার পর থামল, ওখানে ঘোড়া রেখে ছাড়িয়ে নিল বাছুরের চামড়া। দেরি হলো না দক্ষ হাতে বড় এক খণ্ড মাংস কেটে নিতে।

শুকনো কাঠ ও পাতা এদিকে দুষ্প্রাপ্য নয়, ওগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আগুন জ্বালতেও বেগ পেতে হলো না জনের। খেয়াল রাখল, যেন বেশি তৈরি না হয় ধোঁয়া।

আগুনে মাংস ঝলসানোর ফাঁকে স্যাডলব্যাগ থেকে ব্র্যাণ্ডিং আয়ার্ন নিল ও, রাখল ওটা জ্বলন্ত কয়লার বুকে। কিছুক্ষণ পর আয়ার্ন টকটকে লাল হতেই দুটো কাঠি ব্যবহার করে গনগনে কয়লা থেকে তুলে নিল ওটা। চলে গেল সদ্য ছাড়ানো চামড়ার কাছে। এবার যা করল, সেজন্য কয়েকবার আগুনে গরম করতে হলো আয়ার্ন।

ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে স্টেক।

নিঃশব্দে খাবারে মন দিল জন। পেটে যখন এক তিল জায়গা রইল না, থামল-মস্ত ঢেকুর তুলল তৃপ্তির।

মরা বাছুরের কাছে ফিরল জন। লাশটার গা থেকে তিন ভাগের এক ভাগ মাংস কেটে আলাদা করল। চামড়ারও এক- তৃতীয়াংশ কেটে নিল। চামড়ার ভিতর তিন ভাগের এক ভাগ মাংস পুরে নিয়ে রক্তাক্ত বাণ্ডিলটা ছুঁড়ে ফেলল গভীর খাদে।

লাশের অন্য অংশ খোলা জমিতেই থাকল-দূর থেকেও চোখে পড়ে।

শীঘ্রি হাজির হবে শকুন, কাক ও শেয়াল।

নিশ্চিত ভাবেই বাছুরের মড়া খুঁজে পাবে সার্কেল ইউ রাইডাররা।

কাজ শেষে একটা গাছে ঝুলিয়ে দিল অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ চামড়া। তারপর ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ল জন। সূর্যের অবস্থান নিরীক্ষণ করে, অনুমানে রওনা দিল, বেণ্ট’স ক্রসিং শহর অভিমুখে।

ওর পিছনে বাতাসে উড়তে লাগল রক্তমাখা কাঁচা চামড়াটা। আগুনে পোড়ানো লোহার আংটা দিয়ে চামড়ার রোমশ অংশে যে কথাগুলো লিখেছে জন, মোটামুটি বোঝা যায় তা:

২/৩ তোমাদের-১/৩ আমার -জন।

বার্ট অ্যান্ড্রিউ, জানে জন, সহজেই বুঝে নেবে এটা তার, বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *