৫
কলিং বেলটা বাজাতে গিয়েও হাতটা থেমে যাচ্ছিল। লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম। কে জানে এখনও ঘুম থেকে উঠেছেন কি না! এদিকে আমি চলে এলাম! ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতেই বেলটা টিপে দিলাম। দু-বার বাজাতেই দরজা খুললেন স্বয়ং নীলাম্বর ব্যানার্জি। ওনার মুখ দেখেই বুঝলাম বেশ অবাক হয়েছেন আমায় এত সকালে দেখে। তাই উনি কিছু বলার আগেই আমি দু-হাত জড়ো করে বললাম, ‘ক্ষমা করবেন নীলাম্বরবাবু। জানি খুব অসভ্যতা করে ফেললাম। কিন্তু নিরুপায় হয়েই আর কী!’ ‘আরে দাঁড়ান দাঁড়ান হয়েছেটা কী? ভিতরে আসুন।’ ফতুয়া আর লুঙ্গি পরা মানুষটা আমায় সোফায় বসালেন। তারপর নিজে বসে বললেন, ‘খুব ভয় পেয়েছেন না?’ চোখের নিমেষে আমার মনটা পড়ে ফেললেন উনি। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘সেটাও আপনি বুঝতে পারলেন?’ হেসে বললেন, ‘নইলে কী আর এত সকালে আমার বাড়িতে আসতেন?’ লজ্জায় মুখ নামিয়ে বললাম, ‘এক্সট্রিমলি সরি। বড্ড বিপদে ফেললাম আপনাকে।’
-রাখুন তো। সরির কী আছে আর বিপদেরই বা কী হল? একলা মানুষ থাকি। আরেকটু পরে সোমা এসে রান্নাবাড়ি করে ঘরদোর সাফাই করে দিয়ে যাবে। এই তো সংসার আমার। তার আবার অসুবিধে!
— একা কেন? বিয়ে-থা করেননি?
-সে এককালে করেছিলুম। তা তিনি তো ক্যানসার বাঁধিয়ে ড্যাং ড্যাং করতে করতে চলে গেলেন। ছেলেপুলে নেই। ওয়ারিশ বলতে একজনই। আমার ভাইয়ের ছেলে বিপ্রনাথ। বাদ দিন আমার কথা। আপনার হলটা কী? রাতে তো ঘুমোননি!
— আর ঘুম! বেঁচে যে আছি এ-ই চোদ্দো গুষ্টির ভাগ্য।
-আচ্ছা দাঁড়ান। আমি একটু আসছি। এসে সব কথা শুনব।
ভিতরে চলে গেলেন নীলাম্বর। সোফায় বসেই এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে একটু দেখে নিলাম। দরজার মাথায় মা ভবতারিণীর ছবি। দেয়ালের একটা হুকে ঝুলছে চারটে বিভিন্ন রকম রুদ্রাক্ষের মালা। ভিতরে যাবার দরজার মাথায় কাঠের ক্রেনে বাঁধানো একটা ছবি। তাতে উর্দু শব্দের অক্ষরের মতো কীসব যেন লেখা। কৌতূহল নিয়ে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘাড় তুলে লেখার ভাষা বোঝার চেষ্টা করলাম। কখন যে সামনে এসে নীলাম্বর আমার খেয়াল করছিলেন বুঝতে পারিনি। ওনার কথায় চটক ভাঙল, ‘কী দেখছেন? সুকুমার রায়ের হ য ব র ল?’
— তাহলে তো আমি চিনতে পারতাম। কিন্তু এই ছবির এক বর্ণও এ বাবা! আপনি চা আনলেন কেন? কথা বলতে বলতেই খেয়াল হল ওনার হাতে চিনামাটির শৌখিন কেটলি, চিনির পাত্র ও দুটো বাহারি কাপ-ডিশ। আর-একটা প্লেটে বিস্কিট। সোফার সামনের টেবিলে ট্রে-টা রাখতে রাখতে বললেন, ‘রোজ সকালে আমিই চা করি আর রসিয়ে রসিয়ে পেপার পড়তে পড়তে খাই। খারাপ বানাই না কিন্তু। খেয়ে দেখো।’ আমি আরও লজ্জায় পড়লাম। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যে উনি আমায় কখনও ‘আপনি’ করে বলছেন, আবার কখনও বা ‘তুমি’। ওনার মধ্যে হয়তো এখনও এ নিয়ে অসুবিধে আছে। কী জানি! চায়ের প্লেটটা হাতে তুলে বললাম, ‘ওগুলো তো উইচ ক্র্যাফট তাই না?’ সবে চায়ে চুমুকটা দিতে যাবেন, আমার কথা শুনে চশমার ভিতর থেকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালেন, ‘তুমি জানো নাকি এসব?’
— না না। আসলে হরর ফিল্মে দেখেছি। কিন্তু পড়তে পারি না। আপনার বাড়িতেও এরকম কেউ ছিল নাকি? চুমুক দিয়ে বললেন, ‘কে উইচ? সাধ্য আছে? দিয়ে রেখেছি যাতে ভুল করেও যদি ঢুকে পড়ে তাহলে ওই লেখাটা দেখলে কেটে পড়বে।’
— আর সেই ডাকিনী যদি নিরক্ষর হয়?
হা হা করে হেসে উঠে বললেন, ‘তাহলে মরবে!’ আরও দু-তিনটে চুমুক খেয়ে চায়ের কাপটা টেবিলে রাখলেন। বললেন, ‘এবার তোমার কথা বলো। কিছু হয়েছে?’ এতক্ষণ বেশ একটা হালকা মেজাজে চলে গেছিলাম। এখন আবার মনে পড়তেই মুখ, মন দুটোই ভারী হয়ে গেল। বললাম, ‘তিলোত্তমাকে খুন করেছিল বরেন। কাল পুলিশের চাপে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।’ উনি বললেন, ‘ডিটেলসে বলো। কীভাবে? কেন? কোথায়?’ সব খুলে একে একে বললাম। ঘাড় গোঁজ করে মাটির দিকে একমনে চেয়ে শুনলেন নীলাম্বর। শুনে বললেন, ‘তার মানে তেরো নম্বর ফ্লোরে মোট তিনটে জিনিস আছে।’
-মানে?
উনি বললেন, ‘সব বলছি। আর কিছু হয়েছে?’ আমি ঘাড় নেড়ে জানালাম আমার তাবিজ হারিয়ে যাবার কথা। বললাম, ‘নিশ্চয়ই সন্ধেবেলার আগেই আমার তাবিজ হাত থেকে খুলে গেছিল। তাই ওই প্রেত’… বলতে গিয়েও বুকটা হিম হয়ে গেল। কথা পালটে বললাম, ‘তাই অমন ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সায়নের গাড়িটা না এলে তো মরেই যেতাম।’ ‘লবডঙ্কা বুঝেছ’! নীলাম্বর বললেন। আমি বললাম, ‘তাহলে?’ নীলাম্বর বললেন, ‘ওই তাবিজ তখনও তোমার গায়ে ছিল বলেই তুমি আজ আমার সামনে বসে আছ। ওই মহা মৃত্যুঞ্জয় তাবিজ ছিল বলেই প্রেতাত্মা তোমায় শুধু মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে দৌড় করিয়েছিল। যাতে কোনও একটা অন্য অ্যাক্সিডেন্টে তুমি মরে যাও। কারণ ও শত চেষ্টা করলেও তোমায় ছুঁতে পারত না। ওই গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগেই হয়তো তাবিজটা পড়ে গেছে কোথাও।’
— তাই হবে তাহলে। মহীতোষদা বলেছিল, ওই তাবিজের কাজ ফুরোলে নিজে থেকেই চলে যাবে।
— ঠিক বলেছিলেন।
— তাহলে তো আরও বিপদ। আমায় বাঁচাবে কে? এখন সবে খুনি ধরা পড়েছে। কিন্তু তিলোত্তমা তো এর বিন্দুবিসর্গ জানে না। তাকে কীভাবে জানানো হবে?
— এটার জন্যই তোমায় আমি ডেকে পাঠিয়েছি মিহির।
মনে হল যেন আশার আলো দেখতে পেলাম। নীলাম্বর আমাকে তার স্টাডিরুমে নিয়ে গেলেন। বইয়ে ঠাসা একটা ঘর। ইচ্ছে করলেই এখানে বেশ কয়েকটা ভূত একসঙ্গে লুকিয়ে থাকতে পারে। তবে ঘরটা ঝকঝকে পরিষ্কার। নীলাম্বর মানুষটা নিজে বেশ শৌখিন আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চেয়ারে বসলাম। সামনে টেবিল। উলটোদিকে আমার মুখোমুখি বসলেন নীলাম্বর। বলতে শুরু করলেন। ‘কাল যখন তেরো নম্বর ফ্লোরে ঢুকলাম তখন একটা পোড়া পোড়া গন্ধ নাকে আসে।’
— এজ্যাক্টলি! আমিও পেয়েছি আমাদের পঁচিশ নম্বর ফ্লোরে।
-কেন জানো?
-না।
-আত্মা যদি শুভ হয়, মানে ভালো হয় তাহলে হয় কোনও গন্ধ বেরোয় না আর নয়তো ভালো গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু আত্মা যদি অশুভ হয়, পাপাত্মা হয় তাহলে তার উপস্থিতিতে ওই পোড়া গন্ধ বেরোয়।
আমি অবাক হয়ে যাই। ‘তিলোত্তমা অশুভ আত্মা! কিন্তু কেন? আমি তো তার কোনও দোষ দেখি না।’
— তোমার কাছ থেকে যা শুনলাম তাতে এটাই দাঁড়ায় যে তিলোত্তমা খুব অসুখী অবস্থায় মারা যায়। মিহিরের প্রতি প্রচণ্ড রাগ, ঘৃণা, বিতৃষ্ণা নিয়ে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিলোত্তমা বেঁচে ছিল। বরেনের কথা অনুযায়ী তিলোত্তমা মিহিরকে ভাগ করতে পারত না। কে বলতে পারে, তিলোত্তমা হয়তো শেষ মুহূর্তে ভেবেইছিল যে মিহিরকে শেষ করে দেবে। আর তারপর নিজেকেও।
-তার জন্য ওর আত্মা অশুভ হয়ে গেল?
না মিহির। তার জন্য নয়। তিলোত্তমার আত্মা অশুভ হয়েছে মিহির চ্যাটার্জিকে খুন করে। এক, সে নিজে চোখে দেখেছিল যে তার প্রেমিক আর-একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে, আর দুই, এটা আমার অনুমান যে মৃত্যুর আগের মুহূর্তে সে মিহিরকেই দেখে। অন্ধকারে আশা করি সে বোঝেনি যে মিহির নয়, তাকে ঠ্যালা মেরেছে অন্য কেউ। তাই মরার পর অদ্ভুত রহস্যজনকভাবে তিলোত্তমা তার প্রেমিককে শেষ করে দেয়।
— তাহলে তো মিহিরের আত্মা এখন ওর কাছেই আছে।
এবার নীলাম্বর হাসেন। বলেন, ‘মানুষ মরলেই এক লোকে তাদের গতি হয় না। মৃত্যু অনুযায়ী তাদের নানান লোক পরিক্রমা করতে হয়। তিলোত্তমা হয়তো ভেবেছিল যে এইভাবে মিহিরকে শেষ করে তাকে কাছে পাবে। কিন্তু আমি নিশ্চিত সেটা হয়নি। মিহিরের আত্মার খোঁজ সে এখনও করছে।
— তাহলে আমার পিছনে পড়ে আছে কেন? ও কি বুঝতে পারছে না যে আমি মিহির চ্যাটার্জি নই?
নীলাম্বর আমার মুখের কাছে মুখ এনে বলল, ‘আমিও সেটাই ভাবছিলাম। কিন্তু তোমার মুখ থেকে বরেনের সাক্ষ্য শুনে অন্য কথা মনে হচ্ছে।’
— কী কথা?
বরেন কী বলেছে মনে করো। তিলোত্তমা তাকে বলেছিল, মিহির আমার। মিহির শুধুই আমার। মিহিরের নামের পাশে একমাত্র তিলোত্তমা নামটাই থাকবে। যে কাড়তে আসবে আমি তার শেষ দেখে ছাড়ব। অর্থাৎ তার মধ্যে একটা হিংস্রভাব, একটা নেগেটিভিটি এমনিতেই গ্রো করেছিল। তার ওপর মিহির নামটার প্রতি ওর একটা নেশা, ওর একটা আকর্ষণ বা মোহ ওকে আরও মরিয়া করে তোলে। ওর চিন্তাভাবনা মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ওই মিহির নামেই আটকে ছিল। তাই তো ওর নাগালের মধ্যে যে মিহির আসবে ও তাকেই কাছে টানার চেষ্টা করবে। এইরকম নামের প্রতি দুর্বলতা কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যেও দেখা যায়। এটা এক ধরনের মানসিক অসুখ। বলা ভালো, মনের সীমাবদ্ধতা। খেয়াল করে দেখবে এই ধরনের মানুষেরা একটু জেদি হয়। যেটা চাই, সেটা চাই-ই। যতই দুর্লভ হোক। আসলে পৃথিবীতে আমরা কেউই কিন্তু পুরোপুরি মানসিকভাবে সুস্থ নই মিহির। কোনও না কোনও অসুখ আমাদের মনের ঘরে ঘাপটি মেরে থাকে। পরিবেশ, পরিস্থিতি তাকে জাগিয়ে তোলে।
এতদিন জানতাম এই পৃথিবীতে প্রেমই একমাত্র উপায় সুস্থভাবে, ভালোভাবে বেঁচে থাকবার। কিন্তু সেও যে এমন ভয়ানক ভৌতিক হয়ে উঠতে পারে, কল্পনাতেও ছিল না। আতঙ্ক ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করি, ‘এখন উপায়?’ নীলাম্বর বলতে শুরু করেন। ‘উপায় খুঁজতেই কাল আমার ওখানে যাওয়া। পোড়া গন্ধের উৎস খুঁজতে খুঁজতে আমি পৌঁছে যাই একটা লম্বা বাক্সের কাছে, যেটা তুমি দেখেছিলে। যেতে যেতে খুব ভালো করে উপলব্ধি করতে পারি ওই গুমোট ফ্লোরে ঝড়ের বেগে কেউ নিশ্বাস নিচ্ছে। হু হু করে হাওয়ার শব্দ ক্রমাগত বাড়তে থাকে আমার কানের কাছে। আসলে ওটা ছিল তিলোত্তমার প্রেতের রাগে ফোঁসার শব্দ। ইচ্ছে করলেই তো আর আমার সে মারতে পারবে না, তাই আরও রাগে জ্বলছিল। তবে হ্যাঁ, ঝড়ের বেগে উড়িয়ে যেখানে-সেখানে ফেলে দিতে পারত। কিন্তু প্রথমে সেটা সে করেনি, কারণ আমি সম্পূর্ণ অচেনা তার কাছে। কেন এসেছি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। যেই দেখল আমি বাক্সটার দিকে হাত বাড়িয়েছি, অমনি বিকট বীভৎস রূপ ধরে তেড়ে এল হাওয়ার বেগে। মোবাইলের আলোয় হঠাৎ দেখে আমিও একটু নড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সরিনি। বাক্সটার ওপর হাত রাখতেই এক ঝটকায় আমায় উড়িয়ে নিয়ে ফেলল দূরে। কোথায় পড়লাম কিছু বুঝলাম না। কীসে লেগে যে আমার হাতটা ছড়ে গেল তা দেখার সময় তখন পাইনি।’
বলেই হাত উলটে দেখালেন নীলাম্বর। দেখলাম হাতের মাঝখান থেকে কনুই পর্যন্ত একেবারে ঘষটে গেছে। আমার মেরুদণ্ডের ওপর কে যেন বরফ-জল ঢেলে দিল। নীলাম্বর বললেন, ‘আমি চিৎকার করে বললাম, কে তুই? কী চাস? সে রাগে ফুঁসতে ফুসতে বলল, মিহির, মিহির! তারপরেই খলখল করে হাসতে হাসতে সেই প্রেতমূর্তি আমার চারপাশে ঘুরতে থাকে। বলতে থাকল, এক যুগ হয়ে গেল ওর জন্যই বসে আছি। বুঝতে অসুবিধে হল না যে তিলোত্তমার প্রেত এই এক যুগ ধরে অপেক্ষা করে তার রাগ দশগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। তাই তার শক্তিও বেড়েছে দশগুণ। নইলে আমার মুখে ডাকিনীবিদ্যার মন্ত্র থাকতেও সে কী করে আমায় উড়িয়ে ফেলল? কিন্তু আমায় জানতেই হবে ওই বাক্সে কী আছে? কেন ওটা ও আগলে বসে থাকে? দু-বার ঢোঁক গিলে জানতে চাইলাম যে ওই বাক্সে কী আছে? দেখলাম আমায় ঘিরে হাওয়ায় ভেসে ঘুরে বেড়ানো বন্ধ করে দিল। আমার চোখে চোখ রেখে খ্যানখ্যানে গলায় বলল, আমার প্রাণ। বুঝলাম না ঠিক। তারপরেই বলল, কিন্তু তোর প্রাণ যে আর থাকবে না। আমার আর মিহিরের মাঝে তুই এসেছিস না, শেষ করে দেব তোকে। শেষ করে দেব। বলতে বলতে এগিয়ে আসতে থাকে আমার দিকে। আর কোনও উপায় না পেয়ে জামার ভিতর থেকে বের করে নিজের বুকের ওপর ঝুলিয়ে দিই এই লকেট।’ কথা বলতে বলতেই ফতুয়ার নীচ থেকে বের করেন রুদ্রাক্ষের মালায় গাঁথা চাঁদমালার মতো একটা ধাতব লকেট। আমি চেয়ার থেকে উঠে ওনার কাছে গিয়ে ভালো করে দেখি সাতটা গোল ধাতব লকেট একটা মালায় গাঁথা। আমি প্রশ্ন করার আগেই উনি বলে ওঠেন, ‘এর নাম কুলকুণ্ডলিনী।’ নামটা শুনেছি। বিস্তারিত জানতাম না। নীলাম্বরই নীচের লকেট থেকে আঙুল দিয়ে একে একে নাম বলতে বলতে ওপরের লকেট পর্যন্ত পৌঁছোন। একেবারে নীচেরটা মূলাধার চক্র, তার ওপরেরটা স্বাধিষ্ঠান চক্র, এর ওপর মণিপুর চক্র, অনাহত চক্র, বিশুদ্ধ চক্র, আজন চক্র এবং সবশেষে সহস্ররা চক্র। এই সাতচক্র আমাদের প্রত্যেকের শরীরের মধ্যে থাকে। যার বীজমন্ত্র ওম। এই সাতটি চক্রের আলো এবং ওম-ধ্বনি ওই প্রেত সহ্য করতে পারেনি। প্রচণ্ড চিৎকার করে আমার শরীরের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। আর সেই সুযোগে আমিও বেরিয়ে আসি।’ একটা বড়োসড়ো নিশ্বাস নিয়ে আমি চেয়ারে বসে পড়ি। বললাম, ‘আপনি তাহলে জানতে পারলেন না কী আছে ওই বাক্সে!’
— তিলোত্তমার কথায় একটা আন্দাজ করেছিলাম। বাড়ি ফিরে তোমার দেওয়া নম্বরে ফোন করে তিলোত্তমার মায়ের কাছ থেকে যা শুনলাম তাতে আমার আন্দাজটা সঠিকই মনে হচ্ছে।
— ফোন করেছিলেন? কী বলল?
প্রথমে তো এ-বিষয়ে কথাই বলতে চাইছিলেন না। তারপর ডিটেলসে বলতে অবাক হলেন। কেঁদে ফেললেন। বললেন বিচার করে আর কী হবে? আমার আমন তো আর ফিরে আসবে না!
— আমন!
— তিলোত্তমার ডাকনাম।
— আপনি ঠিক কী জানতে চেয়েছিলেন?
-আমি জানতে চেয়েছিলাম তিলোত্তমার দাহকার্য সব ঠিকঠাক হয়েছিল কি না! তা উনি বললেন, হ্যাঁ। দাহ ঠিকঠাকই হয়। তবে শুনেছিলাম, আমনের খুড়তুতো ভাই যখন অস্থি ভাসাতে যায় তখন অস্থির কলশটা অদ্ভুতভাবে উধাও হয়ে যায়।
— মানে! এ আবার হয় নাকি?
আমার কথা শুনে চশমার ওপর দিয়ে কটমট করে চেয়ে গলার স্বর খানিকটা খ্যাকখ্যাকে করে বলেন, ‘কখনও মানুষের শরীর কোনও অবলম্বন ছাড়া শূন্যে ঝুলতে দেখেছ?’ আমি ঘাড় নেড়ে না বলি। উনি বলেন, ‘কিন্তু সেটাও তো হয়েছে তোমার বাড়িতেই। এটা যদি হতে পারে, তাহলে অস্থি উধাও হবে না কেন?’ সেদিনের সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠতেই শরীরটা কেঁপে উঠল। নীলাম্বর বললেন, ‘আমার শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল, তিলোত্তমার শরীর যদি দাহ হয়ে থাকে তাহলে কীসের জোরে ও নিজের চেহারা ধরে আসছে? আজ বুঝলাম, উধাও হয়ে যাওয়া অস্থি ওই বাক্সেই আগলে রাখা আছে, যাতে শরীর ধরতে তিলোত্তমার অসুবিধে না হয়।’
— ভূত তো যখন-তখন যার-তার ঘাড়ে চেপে আসতে পারে। তাহলে এত কষ্ট করার দরকার কী?
— মিস্টার মিহির সরখেল, একটা আত্মার অন্য শরীর ধরে আসতে কতটা কষ্ট হয় জানেন!
এই মেরেছে! খুব ভুল বলে ফেলেছি নির্ঘাত। এতক্ষণ ‘তুমি’ করে বলছিলেন। এবার আবার ‘আপনি’ বলতে শুরু করেছেন। তিনি তাঁর মতো বলে চললেন, ‘আত্মা কখনোই যার-তার ঘাড়ে চাপতে পারে না।’
— তবে?
-অশুভ বা খারাপ আত্মা, যারা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে, এমন কোনও আত্মা সবসময় নেগেটিভ এনার্জি আছে এমন কোনো শরীর খোঁজে। যে মানুষ যত নেগেটিভ ভাবে, নেগেটিভ কাজ করে, সেইসব খারাপ আত্মা তাদের শরীরে ভর করে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করে। তাই সবসময় বলা হয় কখনও নেগেটিভ কিছু ভেব না। ভালো ভাব তাহলেই ভালো হবে। নেগেটিভ ভাবলেই তোমার চিত্ত দুর্বল হয়ে পড়বে আর সেই সুযোগে পৃথিবীর সব খারাপ শক্তি তোমাকে তাদের করায়ত্ত করে ফেলবে।
এই কথা শুনেই শম্পার কথা মনে হল। শম্পা মেয়েটা এমনি ভালোই। কিন্তু দিনরাত কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকে। ফোন করলে খ্যাকখ্যাক করে কথা বলে। আর চারপাশের যত খুন, ডাকাতি, রাহাজানি, অপঘাতে মৃত্যু এইসব খবর নিয়ে আলোচনা করতে ভালোবাসে। কখনও খুব আনন্দের বা খুশির খবর কিছু শুনিনি ওর মুখ থেকে।
হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে আমার চটক ভাঙে। নীলাম্বর বললেন, ‘অয়, ন-টা বাজিয়ে মহারানি এলেন। কখন যে জলখাবার খাব! একটু বোসো। আসছি।’ নীলাম্বর দরজা খোলবার জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। একা হয়ে যাওয়াতে আমি একটু জড়োসড়ো হয়ে বসি। ঠিক তখনই বুক কাঁপিয়ে ফোনটা বেজে ওঠে। এত সকালে সায়ন! ‘হ্যাঁ সায়ন, বলো।’
— বলছি দাদাভাই, আজ আমায় একটু অফিসের স্পটটা দেখাতে পারো?
-কোন স্পট?
-যেখানে তিলোত্তমা খুন হয়েছিল। আসলে অপরাধীকে ধরে ফেললাম, অথচ অপরাধের জায়গাটাকেই চোখে দেখলাম না এরকম তো এর আগে হয়নি। তাই আর কী!
সায়ন একটু হাসল। ওকে বললাম, ‘আজ আমি অফিস যাব না। এখন নীলাম্বরবাবুর কাছে এসেছি। তবে অসুবিধে নেই। বিজনেস হেডের পারমিশন নিয়ে রাখছি। আর সেদিন যে ভদ্রলোকটি আমার সঙ্গে থানায় গেছিল…।’ সায়ন বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ইমনকল্যাণ সামথিং।’
— হ্যাঁ ইমনকল্যাণ মজুমদার। ওকে বলে রাখছি। তোমায় সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে। প্রবলেম হলে কল কোরো। যদিও প্রবলেম কিছু নেই।
সায়নের ফোনটা রেখে প্রথমে সম্রাটদা এবং তারপর ইমনদাকে ফোন করে স্পট দেখার ব্যবস্থাটা পাকা করলাম। তারপর ইমনদাকে বরেনের সব কথা বলছি তখনই ঘরে ঢুকে এলেন নীলাম্বরবাবু। কাশতে কাশতে এসে চেয়ারে বসলেন। আমি ফোনটা কেটে টেবিলের ওপরেই রাখলাম। কোনও প্রশ্ন ছাড়াই নীলাম্বর বলতে শুরু করলেন, ‘শোনো মিহির।’ আমি এবার একটু সোজা হয়ে বসলাম। উনি বললেন, ‘আমি রেখে ঢেকে কথা বলতে পারি না। আমার মনে হয় তাতে আরও বিপদ বাড়ে।’ নিজের অজান্তেই মুখটাকে খানিক আমার বাঁ-দিকে বেঁকিয়ে ডান-কানটাকে নীলাম্বরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এ-কথা কেন বলছেন?’ বললেন, ‘তোমার শিয়রে সংক্রান্তি।’
-অর্থাৎ?
— এক যুগ ধরে তিলোত্তমার আত্মা কারও প্রতীক্ষায় আছে। এক যুগ ধরে মৃত্যুর পরেও সে নিজের দেহ ধারণ করে থাকার কষ্ট সহ্য করছে। এই কষ্ট, এই অপেক্ষা ওকে আরও ভয়ানক করে তুলেছে। এখানে আমি বা আমরা কেউই তেমন কিছু করতে পারব না।
মনে হল আমার মাথার ওপর গোটা প্রেতলোক ভেঙে পড়ল। কী বলছেন নীলাম্বরবাবু! শেষ মুহূর্তে এসে আপনি হাল ছেড়ে দিচ্ছেন!’
— আহা! হাল ছাড়ছি তোমায় কখন বললাম?
— এই যে বললেন আপনি কিছু করতে পারবেন না! এত তন্ত্রমন্ত্র সব বিফলে?
— মিহির, তন্ত্রমন্ত্রে যদি সব কিছু হত তাহলে পৃথিবীটা তন্ত্রের বশীভূত হত। কিন্তু সেটা নয় ভাই। তুমি যাকে তন্ত্রমন্ত্র বলছ সেটা একটা রাস্তা। যে রাস্তা তোমায় সমাধানের পথে চলতে সাহায্য করবে। মন্ত্র কিন্তু একটা সাইন্স। এই মন্ত্রের দ্বারা গোটা পৃথিবীকে হিল করা হয়। একটার পর একটা অক্ষর জুড়ে শব্দ তৈরি করে যে ধ্বনি তৈরি হয় তার চুম্বকীয় তরঙ্গ সবসময় আমাদের চারপাশে থাকে। যেটা দেখা যায় না। যাক গে যাক, এই মুহূর্তে শুধু এত কিছু বলে তোমায় বিভ্রান্ত করতে চাই না, একটাই কথা বলব, এই যুদ্ধ তোমাকেই লড়তে হবে। আমি বা আমার টিম ঢাল, তরোয়াল নিয়ে থাকব ঠিকই, কিন্তু আসল লড়াইটা তোমার।
কথাটা শুরু হতে ঠিক যতটা মেরুদণ্ড শক্ত করে সোজা হয়ে বসেছিলাম, এই মুহূর্তে ঠিক ততটাই নেতিয়ে পড়লাম। নীলাম্বর সেটা বুঝতে পেরে বললেন, ‘এই মুহূর্তে যে কোনও খারাপ আত্মা তোমার ওপর ভর করতে পারে মিহির।’ দেহের শিরায় যেন সহসা বিদ্যুৎ খেলে গেল। কাল সায়ন বরেনকে হাজতে পুরে ইলেকট্রিক শক দিচ্ছিল আর আজ নীলাম্বর তার বাড়িতে ডেকে আমায় শকের পর শক দিয়ে চলেছেন। ‘কী বলছেন আপনি! আমি এবার মরেই যাব।’
— এটাই হল ব্যাপার। তোমার চিত্ত এই মুহূর্তে সবচেয়ে দুর্বল হয়ে আছে। তুমি যতই ভালোমানুষ হও, তোমার আত্মা যতই পিওর হোক, এই অবস্থায় তোমার মনের জোর জিরো, জাস্ট শূন্য। অর্থাৎ, অশুভ আত্মার আঁতুড়ঘর।
হতাশ হয়ে বললাম, ‘কী করতে হবে আমায়?’ নীলাম্বর বললেন, ‘তিলোত্তমা তোমায় চায়। তাই ওর ভালোবাসার মানুষ হয়ে তোমাকেই ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। একা। আমরা কেউ থাকব না সেখানে। এটা যদি না পারো তাহলে তুমি শুধু একাই মরবে না। মরবে আরও মিহির, তোমার অফিসের আরও অসহায় মানুষ। বিপদে পড়বে তোমার স্ত্রী আর তোমার একমাত্র ছেলে।’ নীলাম্বরবাবুর শেষের দুটো কথা আমাকে যেন হতাশার অন্তরাল থেকে টেনে বার করে আছড়ে মাটিতে ফেলে দিল। সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো ছাড়া আর উপায় নেই, আমি নেশাগ্রস্তের মতো কালাম, ‘কবে ওর সামনে যেতে হবে?’ নীলাম্বর বললেন, ‘তোমার জন্মদিনের দিন।’ আমি অবাক হয়ে তাকালাম। নীলাম্বর মুচকি হেসে বললেন, ‘মানে মিহির চ্যাটার্জির জন্মদিনের দিন। চব্বিশে বৈশাখ। অর্থাৎ আগামীকাল। তেরো নম্বর ফ্লোর। চোখ বুজে একটা বড়ো নিশ্বাস নিয়ে নিলাম। নীলাম্বরের কাজের মেয়েটা থালা ভরতি লুচি আর সাদা আলুর তরকারি এনে সামনে রেখে দিল। খাবারের দিকে তাকিয়ে একটাই কথা মনে হল, ‘এই আমার জীবনের শেষ খাওয়া।’
গতকাল পর্যন্ত কোথাও যেতে হলে রাস্তায় বেরিয়ে আমি চট করে ট্যাক্সি বা ক্যাব নিতাম না। কারণ তখন আমার মাথায় বাকি জীবনের হিসেব-নিকেশ কাজ করত। কত আনা খরচা করব আর ক’আনা জমাব। কিন্তু এই মুহূর্তে জীবনটাই যখন মাত্র একদিনে এসে ঠেকেছে তখন আজ আমি রাজা। কোন গানে যেন আছে, ‘এল সময় রাজার মতো!’ যাক, ক্যাবে চেপেই বেলঘরিয়া চলে গেলাম। আমার শ্বশুরবাড়ি। মৃন্ময়ী তো আকাশ থেকে পড়ে আর কী! তারপর ভেবে নেয় বউকে না দেখে আমিও হাঁকিয়ে উঠেছিলাম, তাই আগের মতো সারপ্রাইজ ভিজিট দিয়ে প্রেমটাকে একটু রিচার্জ করে নিলাম। শাশুড়ি-মা দেখলাম আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে আর মিচকি মিচকি হাসছে। মৃন্ময়ীর হাবেভাবে এক অন্যরকম পরিবর্তন দেখলাম। অন্য সময় সে এ-ঘর ও-ঘর হেঁটে-চলেই বেড়াত। কিন্তু আমায় হঠাৎ পেয়ে যেন সে হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। পরির মতো অদৃশ্য ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে। দেড় বছরের ছোটো ছেলেটা দু-হাত তুলে আধো আধো স্বরে ‘বাবা বাবা’ বলে একবার করে আসছে আর ধরতে গেলেই দৌড়ে পালাচ্ছে। আবার খানিক বাদে ছোট্ট দুটো পায়ে হেলতে দুলতে এসে ‘বাবা’ বলে ডেকে আমার কোলে মাথা রেখে গড়াগড়ি দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এটা ওর খেলা। নিজের মনেই হেসে যাচ্ছি। শ্বশুরমশাই দেখলাম তড়িঘড়ি ভরদুপুরে বাজারে ছুটলেন। ভাবলাম বাধা দিই। কিন্তু মুখ ফুটে বেরোল না। মৃন্ময়ী কখনও শরবত, কখনও নিমকি, কখনও আবার তরমুজ কেটে দিয়ে যাচ্ছে। কেন জানি না, আজ আমার ঠোঁটে অকারণেই হাসি লেগে আছে। কেবল মনে হচ্ছে, আর মাত্র একটা দিন। তারপরেই আমার মায়া কাটানোর পালা। প্রত্যেকটা মুহূর্ত যেন আমার কাছে অতিরিক্ত রঙিন হয়ে উঠছিল। রাতের দিকে মনে হতে থাকল, কেন এলাম বউ-ছেলের কাছে? অবান্তর মায়া বাড়িয়ে কোনও লাভ আছে কি? খুব ভুল করেছি। সারাদিনে মৃন্ময়ী অন্তত বার সাতেক প্রশ্ন করে ফেলেছে আমায়, ‘হ্যাঁ গো, কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ? সব ঠিক আছে তো? নাকি সেই আত্মার ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করছ!’ আমি একটারও সঠিক জবাব দিতে পারিনি। দেওয়া সম্ভব নয়। যতই জানি যে আমি হয়তো আর বাঁচব না, তবু আমাকে ওই মৃত্যুর গহ্বরে ঢুকতে গেলে একটু তো সাহস বুকে বেঁধে ঢুকতে হবে। নইলে যে যেতেই পারব না। নীলাম্বর বলেছেন, রাত বারোটার পর যেতে। ইংরেজি মতে বারোটার পর হলে মিহিরের জন্মদিনের পরের দিন হয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু বাংলার তারিখ মনে রেখে এগোনো হচ্ছে, তাই যতক্ষণ না পরের দিনের সূর্যোদয় হচ্ছে ততক্ষণ চব্বিশে বৈশাখই থাকবে। ঢোকার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত নীলাম্বর নাকি আমায় পথ দেখাবে। তারপর আমার একার লড়াই।
চব্বিশে বৈশাখের সকাল। সায়ন ফোন করে বলল, গতকাল ইমনদা ঘটনাস্থলটা ভালো করে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। এদিকে বরেনের ফাইল রেডি হচ্ছে। সোমবারের মধ্যে কোর্টে প্রোডিউস করা হবে। সাক্ষী হিসেবে ইমনকল্যাণ, মধু আর ঝিমলিকে কোর্টে তোলা হবে। আর আমাকে অবশ্যই থাকতে হবে। শুনে হেসে বললাম, ‘নিশ্চয়ই। বেঁচে থাকলে আমি নিশ্চয়ই কোর্টে যাব।’
— ধ্যাৎ, কী সব বলছ!
সায়নকে সব খুলে বললাম। শুনে হতবাক। ও বলল, আমি চাইলে ও আজ রাতে ওই মৃত্যুপুরীতে আমার সঙ্গী হতে পারে। আমি জানালাম, আমাকে একাই সেখানে যেতে হবে। নীলাম্বরের নির্দেশ। নইলে তিলোত্তমা নাকি আরও খেপে গিয়ে সবার প্রাণ নিয়ে নেবে। সায়ন আর কিছু বলল না। আমি বললাম, ‘তবে আমার একটা জিনিস চাই। সেটা একমাত্র তুমিই দিতে পারবে।’ সায়ন জানতে চাইল জিনিসটা কী? গলা চেপে অনেকটা ফিশফিশ করে বললাম সায়নকে।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর মৃন্ময়ীকে বললাম, সন্ধেবেলা আমি বেরিয়ে যাব। রাতে অফিসে স্পেশাল ডিউটি আছে। সামনেই লঞ্চ প্রোমো। ওর সন্দেহ হল। সন্দেহটা আরও বাড়ল যখন মৃন্ময়ীকে আমার কোথায় পাসবই আছে, কোন অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে, কোথায় কোন ফিক্সড ডিপোজিট আছে এইসব বোঝাতে বসি। সে তো নাছোড়। কেন হঠাৎ এসব বলছি সেটা মৃন্ময়ী জানবেই। ‘আসলে আমায় যে কোনও সময়েই শুটিংয়ের জন্য নতুন জায়গার রেইকিতে যেতে হতে পারে। তাই বলে রাখছি। যদি সে-সময় কিছু দরকার পড়ে তুমি নিজেই সব করতে পারবে।’ বলেই মনে পড়ে কাল থেকে বরেনের কথাটাই বলা হয়নি। নিজেকে একটু বেশি উৎফুল্ল করে মুখে হাসি এনে বরেনের গল্পটা বলতে শুরু করি। ব্যাপারটা খানিক হালকা হলেও বুঝতে পারি মৃন্ময়ী তখনও মনের কোণে খটকা নিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে নীলাম্বরের সঙ্গে বেশ কিছুবার কথা হয়। ঠিক কীভাবে কখন ঢুকতে হবে সেটা বারবার করে পাখি পড়ার মতো করে বুঝিয়ে দেন। আর প্রত্যেকবারেই একটা কথা বলতে থাকেন, ‘ভয়কে জয় করো মিহির। মনকে শক্ত করো। তোমার আত্মাকে বিশ্বাস করাও যে তুমি তিলোত্তমাকে সবটা বুঝিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে।’ উনিও বলে গেলেন, আমিও শুনে গেলাম। রাত যত বাড়ল, তীব্র চোরা শীতের মতো ভিতর থেকে ভয়টা আরও চাগাড় দিয়ে উঠল। নীলাম্বরের কথা মতো অফিস যাবার পথে গড়িয়াহাট থেকে একটা চুনে হলুদ পাঞ্জাবি কিনি, যাতে মেরুন দিয়ে নকশা করা। তিলোত্তমার পাঞ্জাবি আমি দেখিনি। যা শুনেছি তাতে সেরকম কাছাকাছি কিছু একটা কিনে নিই। আমায় মিহির হয়ে উঠতেই হবে। তিলোত্তমার মিহির। মৃন্ময়ী পেট পুরে খাইয়েছে আজ। সঙ্গে শাশুড়ির আদর-যত্ন। আজ রাতে আর খেতে হবে না। খাবার অবস্থাতেও নেই। রাত দশটা নাগাদ নিজের অফিসে গেলাম। সেখানেই শার্ট খুলে পাঞ্জাবিটা গলিয়ে নিলাম। কালো জিনসের প্যান্ট পরাই ছিল। অফিসটা খাঁ-খাঁ করছিল। রিসেপশনের লোক আর কিউসি-তে একজন ছাড়া আর কেউ নেই। জানি না এই অফিসে আর ফিরে আসতে পারব কি না। অ্যাক্টিভিটি এরিয়াতে সেই পিতলের ঘটিটার কাছে একবার গিয়ে দাঁড়ালাম। থমথমে নিস্তব্ধতায় চুপ করে মুখে লাল কাপড়ের কুলুপ এঁটে আছে। আজ ওর মহাপ্রতীক্ষার অবসান। বেশ খানিকক্ষণ ওইখানে দাঁড়িয়ে রইলাম। কাচের মধ্যে দিয়ে বাইরে রাতবাতি জ্বলা শহরটাকে দেখে নিলাম শেষবারের মতো। আশ্চর্য লাগল, আজ আমায় চমকে দিয়ে ক্যারমের আলোটা জ্বলে উঠল না। ক্যারমের স্ট্রাইকারের শব্দও হল না। এর পর সারা অফিসের কোথাও পোড়া গন্ধটা পাওয়া গেল না। তবে কি তিলোত্তমা জেনে গেছে যে আজ আমি ওর কাছে যাব ওই তেরো নম্বর ফ্লোরে! ভাবতেই কোথা থেকে একটা গরম হাওয়া এসি ফ্লোরটায় আমায় ছুঁয়ে বয়ে গেল। দমবন্ধ হলেও আজ ফেরার রাস্তা নেই। আমায় ঢুকতেই হবে ওই প্রেতপুরীর অন্ধকারে। এক-পা দু-পা করে এগিয়ে চলেছি মধ্যরাতের দিকে আর মাথার ভিতর থেকে, চেতনার অন্ধকার থেকে কারা যেন দৈববাণীর মতো বলে চলেছে, ‘ভয় পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিবি না। ভয়ের মুখোমুখি হবি। দেখবি বিপদ কেটে গেছে।’ আবার বলল, ‘ভয়কে জয় করো। তাহলে তুমিও বাঁচবে আর অন্যান্যদেরও বাঁচাতে পারবে।’ ‘আত্মাকে জাগিয়ে রাখো। দুর্বল হয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে ফেলো না। তাহলে ও তোমায় বাঁচতে দেবে না। ও তোমায় চায়। কাছে ডাকছে। শুনতে পাচ্ছোওওওওও…’ কথাটা ভেসে গেল অনেক দূর পর্যন্ত। কথাগুলোকে ধরতে চাইলাম, কিন্তু আলোর গতিবেগে ওরা সবাই হারিয়ে গেল নিকষ অন্ধকারে। আরে! আমি তো চোখ খুলেই আছি! তাহলে কিছু দেখতে পাচ্ছি না কেন? আমার বাঁ-দিক দিয়ে একটা আলোর ঝিলিক আসছে ভেবে তাকাতেই দেখি বন্ধ দরজার আড়াল থেকে লিফটটা নীচে নেমে গেল। মোহাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে ফিরতেই বুঝলাম কেউ যেন আমায় কথাচ্ছলে ঘুম পাড়িয়ে মৃত্যুর কোলে সঁপে দিয়ে গেল। হ্যাঁ, আমি এখন তেরো নম্বর ফ্লোরে। মনে হতেই সারা শরীর দিয়ে চাঙড়-চাঙড় বরফ মাথা থেকে পা পর্যন্ত নেমে গেল। এর আগে আমি না বুঝে এসেছিলাম। কিন্তু এখন তো প্রায় পুরোটাই বুঝে পা রেখেছি পরপারের আঙিনায়। ছোটোবেলায় মা বলত, তুমি যদি দোষ না করো ভগবান তোমায় ঠিক রক্ষা করবে। মনে হতেই একটু যেন জোর পেলাম। কিন্তু সেও তো তুষের আগুনের মতো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। নাহ্! কতক্ষণ আর লিফটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকব! আর কোনও লিফট আসবে না আমায় নিতে, যতই বোতাম টিপি। এগোলাম একটু একটু করে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোবাইলের আলো জ্বালতেই হবে। নইলে চলতে পারব না। পকেট থেকে মোবাইল বের করতেই খেয়াল হল নীলাম্বর বলেছিলেন তেরো নম্বরে ঢোকার আগে একবার ফোন করতে। সে তো বেমালুম ভুলে গেছি। এখন আর ফোন করার অবকাশ নেই। নীলাম্বর পইপই করে বলে দিয়েছেন ফোনটাকে ফ্লাইট মোডে রাখতে। এইসময় আর অন্য কোনও শব্দ এলে আমার মন বিভ্রান্ত হতে পারে। এমনকি সে-ও অসন্তুষ্ট হয়ে মারণরূপ নেবে। এখন একমাত্র একটাই শব্দ বাজবে। তিলোত্তমার গান। যাতে ঢাকা পড়ে যাবে আমার পায়ের চটির মশমশ শব্দ। ফ্লোরে আরও একটা দরজা ঠেলে ঢুকতে হয়। ঠেলতেই ক্যাচ করে একটা শব্দ হল। ভাবলাম, এই বুঝি রাক্ষসীটার ঘুম ভেঙে গেল! গুমোট গন্ধে নাক বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু কই পোড়া গন্ধ তো পাচ্ছি না। তবে কি সে নেই এ চত্বরে? ভেবে দেখলাম এসব বুঝে আমার কাজ নেই। মোদ্দা কথা তিলোত্তমাকে আমায় সব জানাতে হবে। যেভাবেই হোক। যে মোবাইলে আলো জ্বেলেছিলাম সেই মোবাইলেই আমার আঙুলের চাপে বাজতে শুরু করল তিলোত্তমার গাওয়া গান, ‘যুগে যুগে বুঝি আমায় চেয়েছিল সে, সেই যেন মোর পথের ধারে রয়েছে বসে।’ এই মুহূর্তে এই গানটা যেন আমারই গান হয়ে উঠেছে। আমি যেন এক যুগ ধরে অপেক্ষা করে গেছি এই দিনটায় তার দেখা পাব বলে। রবীন্দ্রনাথ কি ভেবেছিলেন এই গান শুনেও কারও গা ছমছম করতে পারে? হাড় হিম হয়ে যেতে পারে? কেউ মৃত্যুভয়ে জড়সড়ো হয়ে যেতে পারে? অথবা এই গান চালিয়ে কেউ কখনও তার মরণকে আহ্বান করতে পারে? নিশ্চয়ই না।
গানের সঙ্গে কাঁপা কাঁপা পা ফেলে দরজা দিয়ে ঢুকে ডানদিকে এগিয়ে যাই। আশেপাশে মোবাইলের আলোয় শুধু সিমেন্টের তৈরি রংহীন পিলার এক যুগের ধুলো গায়ে মেখে প্রেতমূর্তি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে-দূরে কয়েকটা টিনের বাক্স। বহুদিন খালি পড়ে থাকা জায়গায় নিদেনপক্ষে দু-একটা পায়রা বা বাদুড়ের বাস থাকে। কিন্তু এই তেরো নম্বর ফ্লোরে একটা প্রাণেরও চিহ্ন নেই। আলো- অন্ধকারে আমায় ঘিরে মৃত্যুর ছায়ামূর্তিরা যেন খলখল করে নেচে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ মনে হল পিছন থেকে কেউ যেন সরে গেল। আলো ফেলতেই শূন্য সব। গানটা প্রথম অন্তরা পেরিয়ে সঞ্চারীতে ঢুকেছে, ‘আজ ওই চাঁদের বরণ হবে আলোর সংগীতে, রাতের মুখের আঁধারখানি খুলবে ইঙ্গিতে।’ পোড়া গন্ধটা এইবার পাচ্ছি। নিজেই একবার আলো নিয়ে গোল করে ঘুরে গেলাম। কারওর দেখা পেলাম না। কিন্তু বুঝতে পারছি যে আমার গায়ের লোমে কারও উষ্ণ নিশ্বাস এসে লাগছে। সজাগ হয়ে উঠেছে লোমকূপ। মেরুদণ্ড শক্ত হয়ে গেল হঠাৎ। অমন মড়ার মতো শীতল হাত কার? কে আমার পিঠে হাত বুলিয়ে গেল? মনকে বোঝালাম, এর জন্যই তো এসেছি। তাহলে আর ভয় পেয়ে কী লাভ? ঘাড়টাকে শক্ত করে পিছনে ঘুরতেই দেখি কেউ নেই। কোথায় এসে পড়েছি বুঝতে পারছি না। বরেন তিলোত্তমাকে এই ফ্লোরে এনেই নকল মিহিরকে দেখায়। ওর কথায় জায়গাটার যেরকম বর্ণনা শুনেছিলাম এ কি সেই জায়গা? ওই তো ফ্লোরের দুটো দেয়াল গিয়ে একটা কোণে মিলেছে। সেদিন আমি এদিকে আসিনি তো! তাহলে আজ এসে পড়লাম কী করে? এই কোণেই কি তবে মিহিরের পাঞ্জাবি পরে মধু শা আর ঝিমলি অভিনয় করছিল? হয়তো। এদিকে তিলোত্তমার গান শেষের অন্তরা ছুঁল। ‘শুক্ল রাতের সেই আলোকে দেখা হবে এক পলকে, সব আবরণ যাবে যে খসে। সেই যেন মোর…।’ মোবাইলের আলোটা এবার একটা জায়গায় আটকে গেল। দেখলাম দূর থেকে একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে আমার দিকে। মুখের মাংসপেশিগুলো থরথর করে কাঁপছে। চোখে জ্বালা ধরিয়ে নেমে আসছে অঝোর জল। হাতের মুঠোয় ধরে রাখা মোবাইলের আলো দুর্যোগ রাতের বিদ্যুতের মতো কাঁপতে কাঁপতে ঝলকাচ্ছে। আর শুধু একবার চোখের পাতা ফেলার অপেক্ষা। চোখ খুললেই দেখব এই মুহূর্তের ছায়ামূর্তি বদলে গেছে সর্বাঙ্গে কাচের টুকরো গাঁথা রক্তাক্ত বীভৎস ডাকিনী মূর্তিতে। কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে একবার চোখের পাতা ফেললাম। ঠিক তারপরেই যা দেখলাম তাতে ভয় পাব, না অবাক হব বুঝতে পারলাম না। কই সেই ডাকিনী মূর্তি? কোথায় তার ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত শরীর? এ তো সেই রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে চলা প্রভাতি সংগীতের তিলোত্তমা! মাথার মাঝে সিঁথি কাটা। খোঁপায় সাদা ফুলের মালা। পরনে প্লিট করে পরা অপূর্ব সেই ঢাকাই শাড়ি। দু-চোখে তার শুক্লরাতের জ্যোৎস্না অশ্রু হয়ে গলে পড়ছে মোমের মতো দুটো গাল বেয়ে। ঠোঁটের কোণে না-বলতে পারা কত কথা তিরতির করে পাহাড়ি নদীর মতো কাঁপছে। হাতে সেই চুনি, রুবি, মুক্তো বসানো বাহারি চুড়ি। ফরসা গলায় সরু চেনে ঝুলছে ‘মিহির’ নামের লকেট। এমন মেয়েকে ভয় কেন পাব? সে যেন আমার চোখ টেনে ধরে আছে। অস্ফুটে বলে চলেছে, ‘মিহির, মিহির, তুমি এসেছ?’ গানটা শেষ হয়ে আরও একটা গান শুরু হয়েছে। তিলোত্তমারই গাওয়া, ‘কে উঠে ডাকি মম বক্ষনীড়ে থাকি’। তিলোত্তমা তখন আমার বুকের কাছে। দু-হাতে জড়িয়ে ধরে আমার বুকে মাথা রাখে সে। তারপরেই মুখ তুলে বলে, ‘জন্মদিনের উপহারটা তোমার পছন্দ হয়েছে?’ আমি কী বলব সেটা ভাবছিলাম। তার মাঝেই তিলোত্তমা বলল, ‘পছন্দ না হলে বলো, পালটে দেব।’ ‘না না, কী যে বলো! এত ভালো একটা উপহার। খুব, খুব পছন্দ হয়েছে। এই দেখো আমি করেছি!’ মোহাচ্ছন্নের মতো কথাগুলো আওড়ে গেলাম। দেখলাম, তিলোত্তমা আমার বুকে-পেটে পাঞ্জাবির ওপর দিয়ে হাত বোলাচ্ছে। প্রেত, নাকি ছায়ামানবী! কে তিলোত্তমা? ভয় করছে না কেন আমার? আমার কেন মনে হচ্ছে তিলোত্তমার মৃত্যুটা মিথ্যে, এটাই সত্যি! আমিও কি তবে ওর প্রেমে পড়ে যাচ্ছি? আমার শরীরের ওপরেই তিলোত্তমার সোহাগি হাতটা থেমে গেল। চোখ তুলে তাকাল সে। ওর চোখে খুশির জল ছলছল করছিল। দু-হাত দিয়ে আমার মাথা থেকে গাল পর্যন্ত বুলিয়ে প্রশ্ন করল, ‘তুমি ভালোবাসো তো আমায়? সত্যি করে বলো! এবার গলাটা শুকিয়ে এল। বুঝতে পারলাম না, মিহির যে সত্যিই তিলুকে ভালোবাসত সেটা জানাবার এটাই সঠিক সময় কি না! তাও বললাম, ‘তোমায় ছাড়া আর কেউ মিহিরের জীবনে নেই তিলু। বিশ্বাস কর।’ কথাগুলো বলার পরেই বুঝতে পারলাম আমার গালের ওপর থাকা তিলোত্তমার সোহাগ মাখা হাতের আঙুলগুলোতে কিছু একটা পরিবর্তন হচ্ছে। গাল থেকে গলার পাশ দিয়ে জলের মতো কী যেন গড়িয়ে পড়ছে! তিলু কিন্তু আমার দিকে প্রেমে পরিপূর্ণ চোখে একভাবে চেয়ে আছে। ফিশফিশে গলায় সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘সত্যি মিহির! আরেকবার বলো।’ এবার আমার শরীরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হতে থাকে। তাও বলি, ‘হ্যাঁ তিলু। সত্যি!’ কথাটা শেষ হতেই আমার চোখের একদম কাছে মেলে ধরা তিলোত্তমার জল ভরা চোখ দুটো নিমেষে পালটে বিস্ফারিত হিংস্র হয়ে রক্তবর্ণ ধারণ করে। তার থেকে অশ্রুর মতো অনর্গল গড়িয়ে পড়তে থাকে রক্তের ধারা। ওর হাত দুটো গাল থেকে নেমে পাঞ্জাবির কলার সমেত আমার গলা চেপে ধরে। চোখের পলকে পালটে যায় তিলোত্তমার সর্বশরীর। খোঁপা করা চুলগুলো অন্ধকারে কখন যে খুলে অজস্র সাপিনির মতো এলোমেলো হয়ে উড়ছে বুঝতে পারিনি। গলা চেপে ধরে বলে, ‘তাহলে কেন ঠকালে? কেন ঠকালে আমায় বলো।’ বিচ্ছিরি খ্যানখ্যানে গলায় চিৎকার করে ওঠে। সারা গায়ে কাচের টুকরোগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমি বুঝতে পারি আমার পা আর মাটিতে নেই। শূন্যে ভাসছি। পিছনে দেয়ালও নেই। আমার সঙ্গে ভেসে আছে তিলোত্তমাও। গায়ে শাড়ি নেই। রয়েছে চাপচাপ রক্ত মাখা সেই সাদা পোশাক। রক্তমাখা রাক্ষসীর মতো দাঁতগুলো মুখের চামড়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়ছে। চামড়াগুলো নিজে থেকে কচরমচর শব্দ করে গুটিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ঘিরে ওই বদ্ধ ঘরেই বয়ে চলেছে ঝড়। আর সেই রাক্ষসী বলে চলেছে, ‘আমি তোকে বাঁচতে দেব না। কিছুতেই না।’ এবার অনেক কষ্টে আমার মুখ খুলল। ধরা গলায় প্রচণ্ড ভয় নিয়ে প্রাণপণে চিৎকার করলাম, ‘আমি তোমার মিহির নই। বিশ্বাস করো। আমি মিহির সরখেল, মিহির চ্যাটার্জি নই।’ সে আরও দ্বিগুণ আর্তনাদ করে আমায় শূন্য থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, ‘মিথ্যে কথাআআআ।’ আমি ছিটকে পড়লাম দূরে। গলার নলি নড়ছে না আর। মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়াতে বুকে আর হাতে বেশ চোট লাগল। মোবাইলটা আলো জ্বলা অবস্থাতেই দূরে ছিটকে পড়ল। গানটা বন্ধ হয়ে গেল। পিছন ফিরতেই দেখি সেই ভয়ংকরী প্রেতাত্মা সর্বশক্তি দিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উড়ে আসছে। প্রায় আমার বুকের ওপর এসে পড়েছে। ওর হাতটা সোজা আমার গলা তাক করে চলেও এসেছে, অমনি ঘটে গেল আজব ঘটনা। তিলোত্তমার আত্মা বুক ফাটানো চিৎকার করে আমার ওপর থেকে উড়ে গিয়ে পড়ল দূরে মাটিতে। আমি কিছু বোঝার আগেই কানে এল গম্ভীর গলায় মন্ত্রোচ্চারণ। ফট ফট করে জ্বলে উঠল তিনটে আগুনরঙা হলুদ আলো। দেখলাম, আমার থেকে বেশ খানিকটা তফাতে রক্তবস্ত্র পরে বসে আছে তিন তান্ত্রিক। মাঝখানে নীলাম্বর। তার দুই পাশে দুই শাগরেদ। দেখে মনে হল ওরা যেন আগে থেকেই ওদের আসন স্থির করে নিয়েছিল। নীলাম্বরের হাতে কমণ্ডলু, গায়ে তার ওম লেখা। পাশে ত্রিশূল। ওনার এলো গা। চাদরের মতো দুই কাঁধের ওপর ফেলা রক্তবস্ত্র। নিম্নাঙ্গে লাল রঙের ধুতি। বুকে ঝুলছে সেই কুলকুণ্ডলিনীর লকেট। সঙ্গে আরও দুটো রুদ্রাক্ষের মালা। সঙ্গী দুই ছেলেরও একই সাজ। এই ফ্লোরে বিদ্যুতের কোনও ব্যবস্থা নেই দেখে কোথা থেকে তিনখানা ব্যাটারিচালিত আলো নিয়ে এসেছে। মাটি থেকে সেই আলো ওদের মুখে পড়ে তিনজনকে আরও অলৌকিক করে তুলেছে। চোখ কপালে তুলে এক মনে নীলাম্বর মন্ত্র পড়ে চলেছে। উলটোদিকে তিলোত্তমার আত্মা মাটি থেকে আবার শূন্যে উঠে গজরাচ্ছে। নীলাম্বরের এক শাগরেদ আমায় ইশারায় ডাকছে দেখে আমি কোনওরকমে নিজেকে ঘষটাতে ঘষটাতে এগিয়ে নিয়ে যাই। কিন্তু হঠাৎ বুঝি অসম্ভব জোরালো একটা হাওয়া আমাকে উলটোদিকে টানতে শুরু করেছে। ঘাড় ফিরিয়ে দেখি হাওয়ার তোড় তিলোত্তমার দিকে আমায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বিকট করালী এবার মরণ কামড় দেবার জন্য প্রস্তুত। আমি প্রাণপণে নিজের শরীরটাকে সেই ঝড়ের টান থেকে ছাড়াবার চেষ্টা করি। এইবার ফাঁকা ফ্লোরে গমগম করে গর্জে ওঠে নীলাম্বরের গলা, ‘ওকে ছেড়ে দে তিলোত্তমা। আর পাপ বাড়াস না তুই।’ তিলোত্তমা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। ইতিমধ্যে অবস্থা বেগতিক বুঝে একটি ছেলে উঠে এসে চিৎকার করে মন্ত্রপাঠ করতে শুরু করে। তিলোত্তমা আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তার সঙ্গে যুঝতে থাকে। তাকেও হাওয়ার তোড়ে ওড়াবার চেষ্টা করাতেই আমার ওপর থেকে ঝড়ের প্রকোপ সরে যায়। সেই ফাঁকে উঠে কোনওরকমে দৌড়ে আসি নীলাম্বরের কাছে। সেখান থেকে বসেই দেখি ছেলেটি আর পেরে উঠছে না তিলোত্তমার প্রেতের সঙ্গে। এবার নীলাম্বর উঠে কমণ্ডলুর জল ছিটিয়ে দেয় তিলোত্তমাকে উদ্দেশ করে। ছেলেটা পড়ে যায়। তিলোত্তমাও আবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সেই কমণ্ডলুর জল দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে থাকা তিলোত্তমার চারপাশে গণ্ডি কেটে দেয়। নীলাম্বর তর্জন করে বলে, ‘আয়, এবার দেখি কার শক্তি বেশি! সাহস থাকে তো টপকা এই গণ্ডি।’ বলে খড়ম খটখটিয়ে ফিরে আসে স্বস্থানে। দুটো ছেলেই নিরন্তর মন্ত্র পড়ে চলেছে। একজনের হাতে পুথি, আর-একজনের হাতে রুদ্রাক্ষ। জপের মালার মতো গুনছে সে। তিলোত্তমা গলায় ঘড়ঘড়ে শব্দ করে রাগে ছটফট করছে। মুখে তার একটাই কথা, ‘ছেড়ে দে, ছেড়ে দে আমায়। মিহিরকে আমি নিজে হাতে খুন করব। ও আমায় বাঁচতে দেয়নি। আমায় ঠকিয়েছে। আমি ছাড়ব না।’ নীলাম্বর গম্ভীর গলায় প্রথমে কিছুটা শান্ত হয়ে বলে, ‘শান্ত হ তুই। শান্ত হ।’ কিন্তু সেই প্ৰেত চুল ঝাঁকিয়ে হাত-পা ছুড়ে মাটিতে আছাড়িপিছাড়ি খেতে থাকে আর গর্জন করতে থাকে। কানে তালা পড়ে যাবার উপক্রম। আমি তখনও ভয়ে কাঁপছি। নীলাম্বর এবার ধমকের সুরে বলে ওঠে, ‘থামবি তুই? তুই যা জানিস সব ভুল জানিস। মিহির তোকে খুন করেনি। মিহির তোকে পাগলের মতো ভালোবাসত।’ ভালোবাসার কথা শুনে আমাদের চমকে দিয়ে এক্কেবারে শান্ত হয়ে যায় তিলোত্তমার আত্মা। হিসহিসে সরু গলায় নিজেই বলে ওঠে, ‘ভালোবাসত! ভালোবাসত!’ বলেই খ্যাকখ্যাঁক করে শরীর দুলিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠল সে। পরক্ষণেই কথায় ধারালো অস্ত্রে শান দেবার মতো শব্দ করে বলে, ‘মিথ্যে কথা। সব মিথ্যে কথা।’ ‘না তিলোত্তমা। কোনওটা মিথ্যে নয়।’ আমার গলা শুনে চোখ তুলে তাকায়। স্পষ্ট দেখলাম এক যুগের ঘৃণা উগরে দিচ্ছে সে। আমি বললাম, ‘বিশ্বাস করো মিহির তোমায় ঠকায়নি। তোমার আর মিহিরের প্রেম একটা শয়তান কুচক্রী লোকের শিকারে শেষ হয়ে যায়। আর সেই শয়তান কে জানো?’ তিলোত্তমা ঘাড়-মুখ বেঁকিয়ে হিলহিলে দৃষ্টি নিয়ে আমার কথায় মনোনিবেশ করে। রাগে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, ‘কে?’
— বরেন। বরেন রায়।
তিলোত্তমা এতক্ষণ সামনের দিকে ঝুঁকে বসে ছিল। এবার সে সোজা হয়ে বসে। আমি বলতে শুরু করি। ‘তুমি ওর ভালোবাসা অস্বীকার করেছিলে। সেই রাগে মিহিরের হলুদ পাঞ্জাবি চুরি করে অন্য একজনকে পরায়। তারপর ছক করে তোমায় এই ফ্লোরে নিয়ে এসে দেখায় যে তোমার মিহির অন্য মেয়ের সঙ্গে নোংরামি করছে।’ এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিলোত্তমার আত্মা ‘হ্যাঃ’ বলে মুখে শব্দ করে ঘেন্না উগরে দেয়। আমি বলে চলি, ‘তুমি মেয়েটার মুখে মিহির নামটা আর তিলোত্তমা নামটা শুনেছিলে। আর লোকটার গায়ে তোমার পাঞ্জাবি দেখেছিলে। কিন্তু মিহিরের মুখ দেখেছিলে কি?’ সে রক্তাক্ত মুখটা একবার ঝাঁকায়। আমি বলি, ‘তাহলে? কী করে বুঝলে ওটা মিহির ছিল? অন্য একটা লোককে ভাড়া করে বরেন তোমার কেনা পাঞ্জাবিটা পরিয়েছিল। যাতে পিছন থেকে দেখলে তুমি তাকে মিহির বলেই ভাব। তারপর তোমাকে বরেন বলে যে সেদিন ও দেশের বাড়ি যাচ্ছে। কিন্তু সে যায়নি। সে ঘাপটি মেরে বসে ছিল শুটিং ফ্লোরে। একটা সময়ে তুমি সেই ফ্লোরে যাও। বাইরের পিলারের দিকে শব্দ হয়। সেটা ভিতরে লুকিয়ে থেকে বরেনই করে, যাতে তুমি ওই জায়গায় গিয়ে কোনওভাবে দাঁড়াও। তুমি করলেও তাই। এর পর মিহির ফ্লোরে ঢুকে তোমার কাছে এগিয়ে যায়। তোমাকে তিলু বলে ডাকে। তুমি ঘুরে দাঁড়াতে যাও আর ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকারে দেয়ালের আড়াল থেকে একটা লোহার রড বা সেইরকম কিছু একটা দিয়ে তোমার পেটে খোঁচা মারে। তুমি টাল সামলাতে না পেরে ছাব্বিশ তলা থেকে নীচে পড়ে যাও এতে তুমি ভাবলে মিহির তোমায় কিছু দিয়ে খোঁচা মেরেছে। তাই তো তিলোত্তমা?’ সে মাথা ঝাঁকিয়ে উন্মাদের মতো খেপে যাওয়া স্বরে বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মিহিরই আমায় মেরেছে। ওর পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে চেয়েছে। কেন ঠকাল সে আমায়? কেন’? আর্তনাদে চারপাশের কাচগুলো ঝনঝন করে কেঁপে উঠল। তারপর আমাদের দিকে সরাসরি ভয়ংকর চোখে তাকিয়ে বলল, ‘মিহিরকে বাঁচাতে এসেছিস না তোরা? মিথ্যে গল্প বানাচ্ছিস।’ আমি চিৎকার করে উঠি, ‘না, এর এক বর্ণও মিথ্যে নয়। এক্ষুনি প্রমাণ করে দিচ্ছি।’ বলেই মোবাইলটা হাতে নিয়ে সায়নের পাঠানো অডিয়োটা চালিয়ে দিই। সেখানে বরেনের স্বকণ্ঠে স্বীকারোক্তি বাজতে থাকে। গণ্ডির মধ্যে বসেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে কান বাড়িয়ে শুনতে থাকে তিলোত্তমা। বরেনের বলা কথাগুলো শুনতে শুনতে ঝড়ের মতো শোঁ-শোঁ শব্দ করে হাঁফাতে থাকে সে। বুঝতে পারি ভিতর ভিতর সে খেপে উঠছে। আমার ভয় করতে থাকে। কী জানি এই খেপে ওঠা আমাদের জন্য কোনও বিপদ ডেকে আনবে না তো? অডিয়োটা বন্ধ হলে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করি, ‘চিনতে পারলে বরেন রায়ের গলা?’ আগুন রঙের আলোয় দেখি সে পাগলের মতো ঘাড় নাড়ছে আর ঘড়ঘড়ে শব্দ করে মাথা নেড়ে আমার কথায় সম্মতি জানাচ্ছে। তারপরেই নিজের কপাল চাপড়াতে থাকে তিলোত্তমা। হাউমাউ স্বরে চিৎকার করে বুক ফাটিয়ে কাঁদতে থাকে সে। নিজেকে নানারকমভাবে আঘাত করতে থাকে। নীলাম্বর চোখ বুজে মাথাটা নামিয়ে নেয়। বোঝা যায় অনুশোচনায় মরে যাচ্ছে তিলোত্তমা। হঠাৎ আমরা সবাই দেখি আধো অন্ধকারে তিলোত্তমার ওই বীভৎস রূপটা পালটে গেছে। সেই সাদা পোশাক পরা সাধারণ প্রেমিকা তিলোত্তমা নিজেকে অন্ধকারে গুটিয়ে কাঁদছে আর বলছে, ‘ভুল। ভুল করেছি আমি। পাপ করেছি আমি।’ নীলাম্বর বলেন, ‘হ্যাঁ। তুই না জেনে পাপ করেছিস। শুধুমাত্র সন্দেহের বশে খুন করেছিস মিহিরকে।’ নীলাম্বরের দিকে জলভরা অগ্নিবরণ মেঘের মতো চোখ তুলে চেয়ে রইল তিলোত্তমা। নীলাম্বর আরও বলল, ‘শুধুমাত্র প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে তুই এই অসহায় ছেলে মিহিরের জীবন নিয়ে খেলা শুরু করেছিস। সেদিন শম্পাকে মেরে ফেলতে গিয়েছিলি। তিলোত্তমা একবার আমার দিকে চায়। দু-চোখের জলে কি তার ক্ষমা চাওয়ার আর্তি আছে! ভাবতে ভাবতেই নীলাম্বর বলে ওঠে, ‘এক যুগ অপেক্ষা করেছিস তুই। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি মিহির যে লোকেই থাকুক, তার সঙ্গে যেন তোর একবার সাক্ষাৎ হয়। এবার তুই এই কষ্টের শরীর থেকে মুক্তি পা। আমি সেই ব্যবস্থা করব।’ কথাটা শেষ হতে না হতেই আবার সেই আগের সর্বনাশী রাক্ষসী মূর্তি ধরে তিলোত্তমা আদিভৌতিক কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘না। আমি চাই না মুক্তি।’ নীলাম্বর অবাক। আমরা সবাই হতচকিত। কী বলছে তিলোত্তমা। নীলাম্বর প্রশ্ন করে, ‘কেন চাস না?’ সে ঘাড়-মুখ বেঁকিয়ে দাঁতে দাঁত চিপে বলে, ‘মিহিরকে মেরে যে পাপ করেছি, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব বরেনকে শেষ করে। ওর রক্ত খাব আমি।’ আমরা সবাই চমকে উঠি। আমিই বলি, ‘বরেন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। ওর শাস্তি হবে।’ এ-কথা শুনে তিলোত্তমা আরও খেপে উঠে শূন্যে দাঁড়িয়ে পড়ে। বলে, ‘আমি নিজের হাতে শাস্তি দেব। নইলে শান্ত হব না। কিছুতেই না।’ নীলাম্বর গলা নামিয়ে আমার কানে বলে, ‘আর সময় নেই মিহির, তুমি সেই বাক্সটা খুঁজে বের করো। এইদিকে কোথাও একটা আছে।’ বলে আঙুল দেখিয়ে নির্দেশ করে। আমি চোখের ইশারায় তিলোত্তমাকে দেখাই। তিনি বলেন, ‘ওই জলের গণ্ডি ছেড়ে এক্ষুনি ও বেরোতে পারবে না। তবে শক্তি দেখাতেই পারে। যাও আর দেরি কোরো না।’ তিলোত্তমা তর্জন-গর্জন করেই চলেছে। তার মধ্যেই আমি উঠে যাই। প্রথমে আমার মোবাইলটা তুলে অন্ধকারে খুঁজতে থাকি লম্বা বাক্সটা। তিলোত্তমা ‘না’ বলে চিৎকার করে ওঠে। নীলাম্বরও চিৎকার করে চোখের মণি মাথার দিকে তুলে নির্দেশ দিতে থাকে আমায়, ‘সোজা যাও মিহির। আরও এগোও। এবার ডানহাত দেখো। দেখতে পেলে?’ চোখে পড়ল বাক্সটা। দৌড়ে গিয়ে হামলে পড়তেই বাক্সটা আমায় ঠেলে ফেলে আপনা থেকেই দ্রুতবেগে ছিটকে গিয়ে পড়ে একেবারে তিলোত্তমার পায়ের নীচে গণ্ডির বাইরে। নীলাম্বর ধমকে ওঠেন, ‘জেদ করিস না তিলোত্তমা। মুক্তি নে। আর পাপ বাড়াস না তোর।’’না না না, বরেনের রক্তে স্নান না করে আমি মুক্তি চাই না’, প্রেতিনী হাউমাউ করে প্রতিবাদ করে ওঠে। আরও বলে, ‘আমায় বাধা দিলে তোদের সবকটাকে মেরে ফেলব।’
— মিহির তুমি যাও। বের করে আনো ওর ভিতরে যা আছে।
নীলাম্বরের কথা শুনে ছুটে যাই বাক্সের দিকে। ঢাকনাটার দিকে সবে হাত বাড়িয়েছি, অমনি প্রবল এক শক্তি আমার হাত দুটোকে আটকে দেয়। বাক্সটা ঘড়ঘড় শব্দে আবার সরে যায় অন্যদিকে। এবার নীলাম্বরের নির্দেশে দৌড়ে আসে দুই অল্পবয়স্ক শাগরেদ। লম্বা বাক্সটাকে দু-দিক দিয়ে গায়ের জোরে আটকে দেয় ওরা। প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে যায় ওদের গায়ের রক্তবস্ত্র। ঠিকমতো তাকাতেও পারছি না কেউ। ফ্লোরের মধ্যে ফাঁকা টিনের বাক্স থেকে শুরু করে আর যা যা ছিল সব শূন্যে উঠে ওলটপালট করতে থাকে। যেন টর্নেডোর মধ্যে আমরা আপ্রাণ বাঁচার চেষ্টা করছি। ওপাশে নীলাম্বর বজ্রকণ্ঠে সুর করে পাঠ করে চলেছেন কালীস্তব, চামুণ্ডামন্ত্র। ঝড়ের দাপটে চারপাশে একটা টিনের সঙ্গে আর-একটা টিন লেগে ঠং ঠং ধ্বনি তুলছে। যেন প্রেতলোকের পিশাচেরা বড়ো বড়ো করতাল বাজিয়ে মন্ত্রের সঙ্গে উত্তাল হয়ে নেচে বেড়াচ্ছে। চারপাশের কাচের ঘেরাটোপ ঝনঝন করে কেঁপে চলেছে। তারাও যেন তাদের সর্বশক্তি এক করে অন্দরের এই মহাপ্রলয়কে বুক দিয়ে আগলাচ্ছে। নিজের দেহটাকে ঘষে ঘষে বাক্সের কাছে নিয়ে যাই। চোখের সামনে দিয়ে এত কিছু উড়ে চলেছে যে ঠিক মতো চোখ খুলে রাখা ভীষণ কষ্টের। এরই মধ্যে দুচোখের পাতা অল্প খুলে বাক্সের ডালাটা তুলতে যাই। মনে হল, কয়েক লক্ষ গুণ ভারী শরীর নিয়ে কোনও পিশাচ বসে আছে সেই ডালার ওপর। দুটো ছেলে শরীর ও মনের শক্তি এক করে দু-হাতে ধরে রাখছে কফিনের মতো লম্বা বাক্সটাকে। মৃন্ময়ী, বুবাই, মহীতোষদা, সায়ন সকলের মুখ এক ঝলকে ভেসে উঠল চোখের সামনে। ওরা যেন করুণ মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এক যুগ ধরে এই বাক্সের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ওদের ভালো-মন্দ, জীবন-মরণ। কানের কাছে এসে মহীতোষদার মতো গলা করে কে যেন বলল, ‘বাক্সটা তোকে খুলতেই হবে মিহির। একমাত্র তুই-ই পারবি এই কাজ করতে। খুলে ফেল, উন্মুক্ত করে দে গুপ্ত রহস্যের ভৌতিক মায়াজাল।’ পায়ের পাতায় চাপ দিয়ে শরীরটাকে ঠেলে দিলাম সামনের দিকে। এবার আমার পুরো শরীর ও মনের শক্তি গিয়ে জমা হয়েছে দুটো হাতের তালুতে। তিলোত্তমার অশুভ শক্তির প্রতিকূলে গিয়ে ঝড়ের দাপটকে উপেক্ষা করে ধীরে ধীরে খুলে ফেলি বাক্সের ডালাটা। জানি না কোথা থেকে এত শক্তি পেলাম! হয়তো নীলাম্বরের মন্ত্রোচ্চারণের ফল! বাক্সের ঢাকনা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তিলোত্তমার পৈশাচিক চিৎকারে গোটা প্রেতলোক যেন ফেটে পড়ল। কোথা থেকে একটা ফাঁকা টিন এসে দড়াম করে লাগল আমার কপালে। চোখটা একটুর জন্য বেঁচে গেল। কবজির উলটোদিক দিয়ে কপাল মুছতেই দেখি রক্তের দাগ। কিন্তু সেদিকে অতটা গুরুত্ব দেবার সময় বা ইচ্ছে হল না আমার। যা দেখলাম তাতে কপালের ব্যথাটাও ভুলে গেলাম। লাল শালু মোড়া একটা মাটির কলশ, তারই মাঝে ভস্মের স্তূপ। পাশেই মিহিরের জন্য কেনা সেই চুনে হলুদ পাঞ্জাবি, যাতে মেরুন রঙের নকশা। এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। ঝড়টা আরও প্রবল আকার নিল। নীলাম্বর মন্ত্রোচ্চারণ থামাতেই আমার সামনে থাকা একটি ছেলে সেই মন্ত্র আওড়াতে শুরু করল।
নীলাম্বর চিৎকার করে বলল, ‘মিহির, ওই অস্থি-কলশ নিয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ো। বাইরে আমার দুটো ছেলে আছে। ওদের সঙ্গে গঙ্গায় গিয়ে ভাসিয়ে দাও। ঊষাকালের মধ্যে ভাসাতে হবে। ভোর হয়ে গেলে সর্বনাশ হবে।’ তিলোত্তমা আর্তনাদ করে ছটফট করতে থাকে আর বলতে থাকে, ‘না না। কিছুতেই না। মরবি, মরবি তোরা! কেউ বাঁচবি না!’ আমি পাঞ্জাবিটা হাতে তুলে দেখাতেই নীলাম্বর বলে, ‘ওটাও ভাসিয়ে দাও।’ এর পর কলশটাকে পাঞ্জাবিতে জড়িয়ে বুকের কাছে জাপটে ধরে টলতে টলতে বেরিয়ে যাচ্ছি। নীলাম্বর আবার বললেন, ‘ঊষাকে ভোর হতে দিয়ো না মিহির, তাহলে আমরা সবাই মরে যাব। তাড়াতাড়ি যাও।’ অন্ধকারে পথ হাতড়ে কোনওরকমে লিফটের কাছে আসি। আমার পিছনে তেড়ে আসে ঝড়ের দাপট। কাশতে থাকি। দু-তিনবার বোতাম টিপতে লিফট এসে থামে। একেবারে হুমড়ি খেয়ে তার মধ্যে পড়ি। দরজা বন্ধ হয়। অলৌকিক ঝড়ের কিছু অংশ লিফটে ঢুকলেও বেশিরভাগটাই দরজার সামনে এসে দু-তিনবার দমাদ্দম ধাক্কা দিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। আমি নীচে নেমে আসি। লিফট থেকে বেরোতেই দুটো ছেলে আমার নাম ধরে ডাকে। এদের সেদিন আমি নীলাম্বরের অফিসে দেখেছি। আমি আতঙ্কে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বলে ফেলি, ‘গঙ্গা, গঙ্গায় চলো এক্ষুনি।’ ওরা গাড়ি নিয়েই অপেক্ষা করছিল। সিটে বসতেই ড্রাইভার ছুটল গঙ্গার উদ্দেশে। ঊষাকাল হতে আর মাত্র পনেরো মিনিট বাকি। সল্টলেক থেকে গাড়িটা ঠিক কোনদিকে ছুটল জানি না। আমি আধো-চেতন আধো-অবচেতনে বসে রইলাম। গাড়িতে যেতে যেতে শুনলাম, কাল এসে নীলাম্বর জায়গাটা ভালো করে পরিদর্শন করে গেছিলেন। যাতে আমি মিহির সেজে গান শুনিয়ে তিলোত্তমাকে সাইকোলজিক্যালি বশ করে রাখতে পারি। তিলোত্তমা যখনই তার মিহিরকে দেখবে, নিজের গান শুনতে পাবে, তখন তার মন শুধুমাত্র সেইদিকেই থাকবে। অন্য কোনও কিছুর উপস্থিতি তার নজরে পড়বে না। আর কোনও শব্দও সে শুনতে পাবে না। আর সেই সুযোগে ওনারা নিজেদের জায়গা করে মন্ত্রপাঠ শুরু করতে পারবেন। ‘আর কতক্ষণ বাকি?’ আমার কথা শুনে একটি ছেলে বলে, ‘এই আট মিনিট মতো। আমি ভয় পেয়ে বলি, ‘সর্বনাশ! এতক্ষণ ওই ভয়ংকর অশুভ আত্মাকে আটকে রাখতে না পারলে তো…! ‘
— হুম! সত্যিই সর্বনাশ। কমণ্ডলুর জল ওম মন্ত্রে শুদ্ধ করা। কিন্তু গণ্ডি থাকলেও এখন ওকে সেই ঘটের জল ছিটিয়েই আত্মাকে আটকে রাখতে হবে। সেই জল একবার ফুরিয়ে গেলে বা ঊষাকাল চলে গেলে এই আত্মাকে ধরে রাখা যাবে না। ওকে যারা বাধা দিয়েছে সবাইকে শেষ করে দেবে। আসলে নীলাম্বরবাবু আপনার এই কেসটায় একটু রিস্কই নিয়ে ফেলেছেন।
-কেন?
— এই ধরনের আত্মাকে জব্দ করতে পারেন একমাত্র অঘোরী তন্ত্রসাধকরা। নীলাম্বরবাবু তো অঘোরী নন। আমরা বলেছিলাম ওনাকে। কিন্তু কীসব যেন ভেবে উনি কাজটা হাতে নিলেন।
তিলোত্তমার অস্থি-কলশটাকে বুকে চেপে ধরে রাখতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছিল, এই কলশে যেন আমারই প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে। আজ তাকে বাঁচাতেই ছুটে চলেছি। ঘড়ির কাঁটা বলছে আর মাত্র এক মিনিট। এর মধ্যেই গাড়িটা থামে গঙ্গার ঘাটে। আমি কলশ নিয়ে কোনওরকমে ছুটে নামতে যাই। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন আমায় টেনে ধরে। ফিরে দেখি আমার পাঞ্জাবির পকেটের সঙ্গে দরজার হাতলটা আটকে গেছে। ওদিকে ছেলেদুটো ডাকছে। ‘আর সময় নেই মিহিরবাবু। এটাই ঊষাকাল।’ আমি এক টান মেরে পাঞ্জাবির পকেটটা ছাড়িয়ে নিই হাতল থেকে। কিছুটা ছিঁড়ে যায়। বড়ো বড়ো পা ফেলে নামতে থাকি ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে। ওদিকে জানি না কী হচ্ছে। ফোন করে খবর নেওয়ার উপায় নেই। মরে পচে থাকলেও ওই ফ্লোর থেকে লাশ বের করা সম্ভব নয় কারও। গঙ্গাজলে ধিকি ধিকি আগুনের মতো চলকে উঠেছে ঊষার আলো। ঘন তামাটে রং। ঊষাকালের এক্কেবারে শেষ লগ্নে জলের ওপর ঘাটের শেষ সিঁড়িতে আমার পা পড়ে। কলশের মুখের লাল শালু খুলে দিলাম। অন্ধকারের গর্ভে সদ্য জন্ম নেওয়া কাঁচা সোনার আলোকে সাক্ষী রেখে তিলোত্তমার অস্থিভস্ম ঢেলে দিলাম মা গঙ্গার বুকে। ভাসিয়ে দিলাম মিহিরের পাঞ্জাবি। তারপর আটকে রাখা নিশ্বাসটা ছেড়ে ক্লান্ত চোখে দেখি, গঙ্গার আলতো ঢেউয়ের দোলায় তিলোত্তমার অস্থিভস্ম গাঞ্জাবির গায়ে লেগেই ভাসছে। ভেসে যাচ্ছে অনন্তলোকের উদ্দেশে। এতদিনে বোধহয় মিহির পেল তিলোত্তমার উপহার আর তিলোত্তমা পেল তার প্রেমিকের আশ্রয়। ঊষাকাল ফরসা হল। দেখা দিলেন দিনমণি। কোথা থেকে যেন মাইকে গান বেজে উঠল, ‘চিরসখা হে, ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না।’ গানটা কানে আসতেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথাটা, ‘আজ পঁচিশে বৈশাখ!’ পাশের ছেলেটা শান্ত গলায় বলল, ‘হ্যাঁ’।
মাটির কলশটা ভাসতে ভাসতে দূরে গিয়ে মিলিয়ে গেল। চরাচর ভেসে যাচ্ছে নতুন আলোয়। মনে বড়ো প্রশান্তি অনুভব করলাম। হঠাৎ পাশের ছেলেটির ফোনটা বেজে উঠল। আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘স্যার ফোন করেছেন।’’নীলাম্বরবাবু!’ বলেই ঝট করে ফোনটা কানে দিয়ে উদ্বেগ নিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ বলুন’। উনি বললেন, ঊষাকালের শেষ লগ্নে ঘটির জল যখন প্রায় শেষ, আস্তে আস্তে ওর শক্তিক্ষয় হয়ে বেড়ে উঠছিল তিলোত্তমার প্রেতশক্তি, ঠিক তখনই ওই কালো কাচগুলো থেকে আলো ঢুকতে শুরু করে ভৌতিক ফ্লোরটায়। কাচগুলো থেকে সরে যায় কালো আস্তরণ। ওটা কোনও রং ছিল না। ছিল প্রেতশক্তির কুহকীমায়া। কাচগুলো সাদা রঙের। যত আলো আসতে থাকে ততই হাওয়ার মধ্যে মিলিয়ে যেতে থাকে তিলোত্তমার প্রেতমূর্তি। যেতে যেতেও সে একটাই নাম বলে যাচ্ছিল, মিহির, মিহির আর মিহির। আমার চোখটা কি ভিজে উঠল? দিনের ফুটফুটে আলোয় হঠাৎ ঝাপসা দেখছি কেন চারপাশ? বাঁ হাতের দুটো আঙুল দু-চোখের ওপর দিয়ে কচলে নাকের মাঝে চেপে ধরলাম। এবার একটু স্পষ্ট দেখছি। একটু হেসে নীলাম্বরবাবুকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ‘আজ শুধু আপনার জন্যই তেরো নম্বর ফ্লোরের অশুভ বদনাম ঘুচল।’ তিনিও ফোনের ওপার থেকে হাসলেন। বললেন, ‘কী জানো মিহির, সবই আমাদের মনের ভাবনা আর বলার ওপর নির্ভর করে। অদ্ভুত শব্দে যেমন ভূত আছে, তেমনি অশুভ শব্দেও শুভ আছে। তুমি যতক্ষণ ইংরেজিতে বলছ বা ভাবছ তেরো নম্বর ফ্লোর, ততক্ষণ সেটা আনলাকি বা অশুভ। কিন্তু যেই তুমি বাংলায় বলবে, চোদ্দো তলা, তখনই কিন্তু আনলাকি থার্টিন হয়ে যাবে ফর্টিন। অর্থাৎ এই তেরোর গেরোতেই চোদ্দো লুকিয়ে ছিল। অশুভর মধ্যে যেমন শুভ লুকিয়ে থাকে! শুধু খুঁজে নিতে হবে তাকে। আচ্ছা রাখি গো। সব মিটে গেলে এসো একবার।’ বলেই ফোনটা কেটে দিলেন। কত সহজ করে সত্যিটা বলে দিলেন নীলাম্বরবাবু। অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম গঙ্গার জল মেশা দিগন্তের দিকে চেয়ে। একটু আগেই যে দিগন্ত মসিমাখা অন্ধকারে ঢেকে ছিল, এখন সেই দিগন্তই কেমন রবির আলোয় ঝলমল করছে। হঠাৎ মনে পড়ল, আরে আমার পুরোনো মোবাইলটা তো ওই ফ্লোরেই পড়ে আছে। একবার যাব! এখন তো আর ভয়ের কিছু নেই!
ছেলেদুটোই আমায় নামিয়ে দিল। আশ্বাসও দিল, ‘আর এখন কিছু নেই। যেতে পারেন।’ আমিও লিফটে উঠলাম। গলায়, পাঞ্জাবির কলারে তিলোত্তমার হাতের রক্তচিহ্ন। কপালে ক্ষত। শরীরের নানা জায়গায় বিগত কালরাত্রির সুস্পষ্ট ছাপ। কেউ দেখলে নির্ঘাত ভাববে সাতসকালে কাউকে খুন করে এসেছি। সবে সকাল সাতটা। কয়েকজন যাতায়াত করছে মাত্র। ওই যাদের নাইট ডিউটি ছিল তারা ফিরছে, বা যাদের মর্নিং শিফট আছে তারা আসছে। তেরো নম্বরের সামনে এসে লিফটের দরজা খুলতেই চমকে গেলাম। বিশ্বাসই করতে পারছি না এটা সেই জায়গা, যেটা আজ ভোররাত পর্যন্তও মৃত্যুপুরী ছিল। এতদিনের অপরিষ্কার জায়গা বলে কাচের ওপর থেকে কালো দাগ গেলেও ময়লায় সাদা কাচ ধূসর হয়ে আছে। ভিতরের দরজা ঠেলে ঢুকে গেলাম অনায়াসে। অন্যান্য দিনের মতো আজকেও দরজার মাথায় লাগানো কলকবজার জন্য তেরো নম্বর ফ্লোরের দরজাটা ক্যাঁচ শব্দে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। বদ্ধ জায়গার গুমোট গন্ধ ছাড়া আর কোনও গন্ধ নেই। ওই তো সেই কফিনের মতো লম্বা বাক্সটা। ডালাটা খোলা। এখন একদম খালি। আলো ঢোকার পর বোঝা যাচ্ছে ঠিক কত বড়ো এই ফ্লোরটা। মাটির দিকে দেখতে দেখতে এগোতে থাকি। ফোনটা কোথায় পড়েছিল তাও গুলিয়ে গেছে। মিনিট পাঁচেক খোঁজার পর হঠাৎ মনে হল, দূরে কী যেন একটা পড়ে আছে। কাছে যেতেই হারানিধি খুঁজে পাই। এই তো সেই আমার ফোন! ঝট করে নীচু হয়ে ফোনটা হাতে তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াই। মুহূর্তে মনে পড়ে গেল, মহীতোষদার সঙ্গে আমার গিন্নির ফোনে হওয়া কথা। ওটা তিলোত্তমাই ছিল আর এই ফোনেই সে কথা বলেছিল। অশুভ যদি কিছু এখনও থেকে থাকে এই ফোনের মধ্যে তাহলে তো…! ভাবতে ভাবতেই হাওদা খাঁ-খাঁ ফ্লোরটায় দড়াম করে এক পিলে চমকানো শব্দ। কেউ যেন দরজার ভারী পাল্লা দুটোকে হাতির শক্তিতে ঠেলে বন্ধ করে দিল। তারপর সব চুপ। আশ্চর্য! বন্ধ দরজা আবার বন্ধ হল তাও এমন বিকট শব্দ করে! তবে কী আবার কেউ এল এই প্রাণশূন্য মহলে!
গল্প শেষ। ঘটনা নয়।।

Just Awasome A novel . I was stopped the last line , The story is over. Not the event. . And It was a earlynight , When i read this and Guess what happen in Later night .
Awsm horror novel ! ..