২
মল্লিকা ম্যাডাম ডেকে পাঠিয়েছেন। ওনার কাছে যাবার নাম শুনলেই সেদিনের কথা মনে পড়ে। যাই হোক, কাচের দরজা ঠেলে সামনে গিয়ে দাঁড়াই, ‘ডেকেছিলেন?’ মোবাইল থেকে মুখ তুলেই ঝরঝর করে বলতে শুরু করলেন। আমায় যে ঘরে আসতে বলবেন সে হুঁশ নেই। ‘সেদিন কী হল? আমায় রাতে ফোন করে একটা আপডেট দেবার প্রয়োজন মনে করলে না?’ আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, ‘কোনদিন ম্যাডাম?’
— এই শোনো মিহির, দু-পয়সার কেরানির মতো আমায় সবসময় ম্যাডাম- ম্যাডাম কোরো না তো! মল্লিকা বলবে। ডিরেক্ট নাম ধরতে অসুবিধে হলে মল্লিকাদি বলবে।
-আচ্ছা ম্যাডাম। সরি মল্লিকাদি।
-সেদিন রেইকিতে কী হল?
-আমাদের দেখে তো ভালোই লাগল। বাড়ির রেটটা একটু বেশি বলছে। আজকে একটা মিটিং আছে অলোকদার সঙ্গে।
-কখন?
-সন্ধে সাতটার পর। অলোকদার অফিসে।
-তা এই কথাগুলো আমি জিজ্ঞেস করলে তারপর বলবে? এই তোমার রেসপন্সিবিলিটি?
-সরি। আমি এবার থেকে যা হবে সঙ্গে সঙ্গে আপডেট দেব।
-একদম। আরে আমাকেও তো বিজনেস হেডকে জানাতে হবে ব্যাপারগুলো। বাজেট তো আর তুমি অ্যাপ্রুভ করবে না।
— হুম। শিয়োর।
-যাও এবার।
এতদিনকার একটা লোক যে চলে গেল তা নিয়ে অফিসের দু-চারজন ছাড়া আর কেউ কথাই বলল না। ভীষণ খারাপ লাগল। আজ কিউসি রুমে অন্য লোক। আর কেউ ঘাড় ঘুরিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে হেসে বলবে না, ‘এই যে মিহির, প্রোমোগুলো একটু ভালো করে চেক করে কিউসি-তে পাঠাতে বল। দুটো ট্র্যাক বাজছে। দুটো বাজছে না। আমি এপিসোড দেখব না এইসব করব বলতো?’ মহীদার ধমকানোর মধ্যেও একটা পিতৃসুলভ স্নেহ ছিল। তেমন আর কেউ রইল না, যে হাত বাড়িয়ে নিশ্চিত বিপদের মুখ থেকে আমায় ছিনিয়ে নিয়ে আসবে। নিজের অজান্তেই জামার হাতার ওপর দিয়ে তাবিজটায় হাত বোলাচ্ছিলাম। আমি কিউসি-র দরজা খুলে আনমনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, খেয়ালই করিনি। এপিসোড চেক করতে করতে মিলন ডাকল, ‘কিছু বলবে মিহিরদা?’ চটক ভেঙে অপ্রস্তুত হয়ে ‘না না। কাজ করো। এমনি এসেছিলাম’ বলেই চলে যাই।
দেশপ্রিয় পার্কে প্রিয়া সিনেমার পাশের রাস্তা দিয়ে খানিকটা ভিতরে ঢুকলেই অলোক সাহার প্রোডাকশন হাউস। বাইরেটা বাহুল্যবর্জিত হলেও ভিতরটা বেশ ঝকঝকে। ঘরে ঘরে কাচের দরজা। দরজার কাচে নকশা করা। চকচক করছে উডেন পালিশের চেয়ার-টেবিল, দরজা-ফ্রেম। পুরো অফিসটাই এসি। দু-একজন সিরিয়াল স্টারকে এদিক-ওদিক থেকে বেরিয়ে যেতে দেখলাম। বেশ খানিকক্ষণ হয়ে গেছে আমাদের মিটিং শুরু হয়েছে। অলোকদা বললেন, ‘দেখো তোমার যা রিকোয়্যারমেন্ট আর প্রোমোর যা বাজেট তার মধ্যে হেব্বি ডিফারেন্স। বিজনেস হেডকে বলো, এইটুকু টাকা দিয়ে এই মহাযজ্ঞ সালটানো যাবে না।’ বলতে বলতে চাপদাড়িটা দু-হাতে চুলকে নিলেন অলোক সাহা। আমি একটু তেল দিয়েই বললাম, ‘আপনি চাইলে সব হবে দাদা। পারলে আপনিই পারবেন।’ অলোক দাড়ি আর গোঁফের ফাঁকে মুচকি হেসে বলল, ‘ভাই মিহির। সতেরো বছর ধরে এই ইন্ডাস্ট্রিতে ঘষটাচ্ছি ভাই। আমায় তেল মারা এত সহজ না।’ আমি হেসেই ফেললাম। আসলে এইরকম বাজেট-ফাজেট নিয়ে ঘষাঘষি এই প্রথম করছি। তাই হয়তো একটু আনপড়ের মতো তেলটা দিয়ে ফেলেছি। তেল মারারও একটা পদ্ধতি থাকে। অলোক সাহা বললেন, ‘দেখো তুমি তো নিজেই বাড়িটা দেখলে। বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বললে। ভাড়া কত বলল দেখলে তো! এত টাকা বাড়ি ভাড়া দিলে বাকি শুটিংয়ের কী হবে?’ অলোকদার কথা শেষ হতে না হতেই কাচের দরজা ঠেলে ঢুকে এল খুব চেনা এক বলিষ্ঠ পুরুষকণ্ঠ, ‘শুটিংয়ের বাড়ি ভাড়াও দিচ্ছ না কি হে?’ আমরা দুজনেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। যদিও আমার দাঁড়াবার কথা নয়। তবু, এত বড়ো একজন লেজেন্ড, এইটুকু সম্মান তো আশা করতেই পারেন। অভিনেতা মৃদুল বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তমকুমারের শেষের দিক থেকে অভিনয় করছেন চুটিয়ে। চারবার জাতীয় পুরস্কার, দুবার আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত। এছাড়া দেশি-বিদেশি আরও সম্মান তো আছেই। একেবারে অভিভূত হয়ে দরজার দিকে ছুটে গেলেন অলোকদা। ‘আরে কী সৌভাগ্য আমার! দাদা আপনি! এই কে আছিস? শশী, সুমিত। ‘
— আরে থামো থামো। সুগার, প্রেশার, কোলেস্টেরল, ইউরিক অ্যাসিড কী নেই শরীরে! এখন বাইরের কিছু খাওয়া মানে আমার কাছে বিষ খাওয়া।
বলতে বলতে নিজেই বসে পড়লেন ধপ করে। ঠিক আমার পাশের চেয়ারটায়। হঠাৎ আমার দিকে চেয়ে বলতে শুরু করলেন মৃদুলবাবু। ‘তা কী কাঁদুনি গাইছিল গো? ঢুকতে ঢুকতে শুনলাম কী যেন বাড়ি ভাড়া-ফাড়া…!’ আমি হাসলাম। তার মধ্যেই অলোকদাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘তা তুমি কি বাড়ি ভাড়াও দিচ্ছ নাকি?’ অলোকদা বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘না না আমার অত ক্ষমতা কোথায় দাদা?’ টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে মৃদুল বলে উঠলেন, ‘শোনো ছোকরা, আমার এক পা যমের বাড়িতে আর এক পা নিজের বাড়িতে। তাই বেশি কিছু বোঝাতে এসো না।’ কথাটা শেষ করেই দুম করে আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘শোনো বাপু, এই বদ লোকটার কথায় একদম বিশ্বাস করবে না। ও ইচ্ছে করলেই একখানা গোটা বাগানবাড়ি তোমায় ফ্রি-তে দিয়ে দিতে পারে।’ শুনে আমার চোখ যত না বড়ো হল, তার চেয়ে অলোকবাবু আরও বড়ো চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘এমা ছি ছি, এসব কী বলছেন মৃদুলদা।’ মৃদুলও ছাড়বার পাত্র নয়। অলোককে উদ্দেশ করে বললেন, ‘কেন? নলডুগারিতে অত বড়ো বাগানবাড়ি। বলো সে কতা! জানো হে ছোকরা।’ আমি একেবারে নতুন গল্প শোনার মতো চোখ-মুখ করে উৎসাহ দেখালাম। উনি বলে চললেন, ‘বনগাঁ থেকে ভিতরে নলডুগারি বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে গিয়ে শুধু বলবে, রায়বাবুদের বাগানবাড়ি যাব। ব্যস। এক কতায় লোকে দেখিয়ে দেবে।’ এক গাল হেসে বললাম, ‘ও মা তাই নাকি? আমাদের এই শুটিংয়ে বাগানবাড়িই তো চাই। অলোকদা এটা কিন্তু ঠিক হল না। বেমালুম লুকিয়ে গেলেন?’
— ধুর বাবা। ওর কথা ছাড়ো তো! উনি বরাবরের ফাজিল মানুষ। দেখে বুঝছ না?
মৃদুলবাবু খপ করে আমার হাতটা ধরে বললেন, ‘খোঁজ নাও মিথ্যে বলছি কিনা। বলেই গলার টোন পালটে অলোকদাকে বললেন, ‘ভায়া আরেকখানা অমন পিকনিক করো না। আহা! কী আনন্দই না করেছিলাম। বড়ো সাধ, মরার আগে আর-একবার ওই বাগানবাড়িতে পিকনিক করে আসি।’ ভ্রূ উঁচিয়ে অলোকদা বললেন, ‘আবার? ভেবে বলছেন তো?’ উত্তরে খানিক ব্যোমকে গিয়েও হো হো করে হেসে ওঠেন মৃদুলবাবু। বললেন, ‘উত্তমদার গানটা মনে আছে তো ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র? স্ক্যান্ডাল চাই বুঝলে, স্ক্যান্ডাল চাই ব্যাকগ্রাউন্ডে, নইলে সমাজে পুরুষ বলে পাবে না মান।’ বলেই আবার হা হা করে হেসে ওঠেন পঁয়ষট্টি-ঊর্ধ্ব মৃদুল। হাসি থামিয়ে নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে বললেন, ‘তারপর থেকেই কিন্তু লোকে আরও বেশি করে আমায় চিনল। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডটা তো তার পরেই। দাও না ভাই আর-একবার ব্যবস্থা…’ কথা শেষ করতে দিলেন না অলোকদা। মৃদুলবাবুর ওপর দিয়েই বলে উঠলেন, ‘আপনি যখন বলেছেন তখন শিওর অ্যারেঞ্জ করব মৃদুলদা। মুখে বললেন বটে, তবে চোখ-মুখ অলোকদার অন্য কথা বলছিল। বেশ বিব্রত হয়েছেন বোঝা যাচ্ছে। আমিও ওদের কথাবার্তার খুব একটা কিছু বুঝলাম না। সত্যি বলতে কী অতটা মনও দিইনি। আমার মাথায় ঘুরছিল শুটিং না হলে কী হবে। নতুন অফিসে প্রথম একটা বড়ো কাজ আমার। এটা হাত ফসকালে বছর শেষে ‘কে আর এ’-তে তো লবডঙ্কা জুটবে। ‘তবে ওই কথাই রইল’ বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন মৃদুলবাবু। খানিক চোখ বুজে মাথা চুলকে চিন্তা করে বললেন, ‘আলোক আলোক।’ ‘না দাদা, অলোক।’ বিনয়ের সঙ্গে বললেন বটে, তবে মৃদুলদা কানেও তুললেন না অলোকদার কথাটা। বরং সে-কথা ফুৎকারে উড়িয়ে বললেন, ‘ধুস! ও নাম তোমার সঙ্গে যায় না। আলোকটাই তোমার জন্য যথার্থ।’ ‘খুব শিগগিরি ব্যবস্থা করে জানাচ্ছি আপনাকে মৃদুলদা। মৃদুলের সঙ্গে নাম নিয়ে কথা না বাড়িয়ে অলোকদা তার কথাগুলো হুড়মুড় করে বলে গেলেন। আমি হাত জোড় করে প্রণাম জানালাম মৃদুলবাবুকে। উনি বেরিয়ে গেলেন। কী অমায়িক মজাদার লোক! এত বড়ো একজন স্টার, অথচ একটুও অহংকার নেই। ‘আচ্ছা উনি এসেছিলেন কেন?’ আমার কথা শুনে অলোকদা বললেন, ‘এমনিই। কোনও কারণ নেই। উনি এমনই। স্টার ইমেজটা মেনটেইন করেন না। এই যে প্রোডাকশন হাউস দেখছ, ছ’বছর আগে যখন এটা করবার কথা বলি দাদাকে, তখন উনি নিজে থেকে আমায় পাঁচ লাখ টাকা দেন। বলেন, ভালো করে ব্যাবসা করো। আমি কতবার দিতে চেয়েছি। একটা টাকাও উনি ফেরত নেননি।’
— এমন লোক পাওয়াও ভাগ্যের অলোকদা। সত্যিই আপনি ভাগ্যবান!
আনমনে কী যেন ভাবছিলেন। আমার কথা শুনে খানিক ভেবে বলেন, ‘হুম। তা তো ঠিকই।’ বলেই বললেন, ‘তা যাই হোক। তুমি কিন্তু বাজেটের ব্যাপারটা দেখো। এই বাজেটে…!’ তখন থেকেই আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। অলোকদার কথা সম্পূর্ণ না হতেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথাটা, ‘আচ্ছা অলোকদা, আপনি তো সাহা। তাহলে আপনাদের বাগানবাড়ির নাম রায়বাবুদের বাগানবাড়ি কেন?’ প্রশ্নটা করার পর কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে কারওর গলা শোনা গেল না। খানিক নিস্তব্ধতা ভর করেছিল ঘরে। তারপর ল্যাপটপের ডালাটা নিজের মুখের সামনে খুলে বললেন, ‘আসলে ওই বাড়ির মালিক ছিলেন রায়। ওদের থেকে আমার দাদু বাড়িটা কেনেন। ওই অঞ্চলে বাড়িটার এত নামডাক যে লোকে এক নামে চেনে। তা ছাড়া ওখানকার স্টপেজটাও বাড়িটার নামে। তাই আর চেঞ্জ করেননি। আমার দাদুর বন্ধুর ছিল কিনা বাড়িটা, তার স্মৃতিটা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিহির, ওই বাড়িতে কিছুতেই শুটিং হবে না।’
— আরে না না। আমি এমনিই বলছিলাম। বেড়াতে তো যাওয়াই যায়। কী?
অলোকদা কথা না বাড়িয়ে শুধু একটা লোক-দেখানি হাসি হাসল।
ফেরার পথে উবেরে আসতে আসতে মল্লিকাদিকে জানিয়ে দিলাম। এই বাজেটে শুটিং করতে পারবে না অলোকদা। সেই নিয়েও হাউমাউ চলল খানিকক্ষণ। তেমন একটা গায়ে মাখলাম না। ফোনটা রেখে ইমনদাকে একটা হোয়াটসঅ্যাপ করে রাখলাম, ‘কাল মনে করে এনো কিন্তু। ভুলো না।’ বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছোতে ফোনটা টিং করে উঠল। ইমনদা একটা থামস আপ সঙ্গে স্মাইলি পাঠিয়েছে।
বাড়ি গিয়ে মৃন্ময়ীকে মৃদুলের কথা জানাতেই একেবারে লাফিয়ে উঠল। খেতে খেতে এক গাল হাসি নিয়ে বলল, ‘বলছ কী গো! এই সেলফি নিয়েছ?’ আমার মুখটা ব্যাজার হয়ে গেল। আমার বউ এমন আদেখলে হবে ভাবতেও পারছি না। আমার কথায় মুখ বেঁকিয়ে মৃন্ময়ী বলল, ‘আদেখলের কী আছে? অত বড়ো একজন স্টার। দেখা হলে ছবি নেবে না?’
— তারপর! ফেসবুকে দিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি লাইক পাব তাই তো?
— উফফ্! সেলফি নিলেই এফবি-তে দিতে হবে কে বলল? এটা তো একটা অ্যাসেট বলো। ছোটোবেলায় আমাদের বাড়িতে একবার শুভেন্দু চ্যাটার্জি এসেছিলেন। কী লম্বা! কী সুন্দর দেখতে তখনও!
— তোমাদের বাড়িতে কেন? এই মাছটা দাও তো।
মৃন্ময়ী মাছের ঝোল রাখা পাত্রটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘শ্বশুরবাড়ির কোনও খবরটা তো রাখো না। বিজয়া ছাড়া একবার ফোন করে খবরও নাও না মানুষগুলোর।’
-ব্যস। শুরু হয়ে গেল? আসল কথাটা বললে বলো। নাইলে থামো।
মৃন্ময়ী দু-গ্রাস ভাত মুখে তুলে বলল, ‘আমার কাকা চাকরির পাশাপাশি এল আই সি করত। টলিউডের দু-তিনজনের এলআইসিও কাকা করেছিল। তার মধ্যে ওই শুভেন্দু চ্যাটার্জি ছিলেন।
— ও। তা কোলে চেপে ছবি নাওনি?
আমার ঠাট্টাটা হজম করেই বলল, ‘তখন তো আর মোবাইল ছিল না। থাকলে ঘাড়ে চেপে নিতাম।’
আমি হাসলাম। গিন্নিও কোনও এক গোপন খবর দেবার ভঙ্গিমাতে বলল, ‘আরও একজন ছিল।’ আমিও চোখ পাকিয়ে সিরিয়াস হয়ে গিন্নির চাপা গলাকে নকল করে বললাম, ‘উত্তমকুমার?’ সে বলল, ‘উঁহু। মৃদুল বন্দ্যোপাধ্যায়।’
— বলো কী?
-হুম।
— কিন্তু তোমার কাকা তো এখন আর কিছু…
— না। এখন আর করে না। বয়স কম হল?
কিছুটা ভাবুক হয়েই গিন্নি বলল, ‘ওই ঘটনাটা ঘটার পর থেকেই কাকার কাছে আর এলআইসি করে না মৃদুল। মানে শুনিনি কখনও। ‘ওই ঘটনা!’ ভ্রূ দুটো বিস্ময়ে কুঁচকে গেল আমার। মৃন্ময়ী বলল, ‘তখন আমি অনেক ছোটো। বাড়িতে সবাই এক টেবিলে বসে রাতে খাচ্ছে। তখন তো জয়েন্ট ফ্যামিলি। আমাদের ছোটোদের খাইয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ শুনি কাকা বলছে, মৃদুলবাবুকে নাকি পুলিশ অ্যারেস্ট বরেছে। কোনও এক অ্যাক্ট্রেস ওনার নামে কমপ্লেন করেছে। নাম মনে নেই। বলেছে যে মৃদুল নাকি ওনার সঙ্গে অসভ্যতা করেছে। জোর করে ফূর্তি করেছে। তখন তো আর এত কিছু বুঝি না। শুধু বুঝলাম, মৃদুল বেশ একটা গুরুতর অন্যায় করেছে বলে ওকে পুলিশে ধরেছে। পরে সিনেমার ম্যাগাজিন আর টিভিতেও খবরটা দেখেছিলাম। মহিলার ছবি বেরিয়েছিল। ওই বাড়িটার ছবিও দিয়েছিল। পরে শুনেছিলাম, বাড়ির মালিককে কোর্টে ডেকে পাঠিয়েছিল। তারও ছবি দিয়েছিল বোধহয়। এক নিশ্বাসে এতটা বলে থামল মৃন্ময়ী। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাড়ির মালিক মানে, কোন বাড়ি?’ গিন্নি বেশ রসিয়ে প্লাক করা ভ্রূ নাচিয়ে বলল, ‘হুঁ হুঁ! উনি যেখানে-সেখানে গিয়ে ফূর্তি করেননি। রীতিমতো একখানা বাগানবাড়ি ভাড়া করে কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন।’ আধখাওয়া মাছ পাতেই পড়ে রইল। মুখের গ্রাস নামিয়ে একেবারে পাথর হয়ে বসে রইলাম। সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ঘটে যাওয়া টুকরো মুহূর্তরা ঝলসে উঠল চোখের সামনে। তিলোত্তমার অশরীরী উৎপাতে বেমালুম ভুলে গেছিলাম। সত্যি বলতে অতটা গুরুত্ব দিইনি সেদিন মহীতোষদার কথায়। ওইদিন রাতে যখন রাণাঘাটে মহীতোষদার বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি তখন আমিই অনুরোধ করেছিলাম। বলেছিলাম, ‘তুমি আমার চেয়ে অনেক বেশি এই ইন্ডাস্ট্রিতে আছ মহীদা। অনেক মানুষকে চেনো। দেখো না, যদি বরেনের কোনও খবর বের করতে পার। সে এখন কী করে, কোথায় আছে। জানতে পারলে হয়তো সুবিধে হবে।’ মহীদা ঘাড় নেড়ে বলেছিল, ‘আচ্ছা দেখব। ওদের তো সেই একটা বাগানবাড়ি ছিল। উত্তর চব্বিশ পরগনার দিকে কোথায় যেন নামটা মনে নেই। সেখানে অভিনেতা মৃদুল বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি কোনও একজন নিউ-কামার অ্যাকট্রেসের সঙ্গে কেচ্ছা-কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়ে। ওই মহিলাই পুলিশে জানায়। মৃদুল গ্রেপ্তারও হয়। সে সূত্রেই বরেনকে কোর্টে ডেকে পাঠায়। কাগজে বেরোয় বরেনই নাকি মৃদুলের কাছে ওই মেয়েকে নিয়ে যায়। আর বাগানবাড়িটাও ওরই। তাই মৃদুলের সঙ্গে বরেনকে নিয়েও বেশ কিছুদিন টানা-হ্যাঁচড়া হয়। ওটার পর বরেনকে আর কেউ কাজ দিচ্ছিল না। শেষে আমাদের ওই প্রভাতি সংগীতে লাইটম্যান হিসেবে কাজ পায়। আলোটা খারাপ করত না।’ পরমুহূর্তেই আজকে অলোক সাহার অফিসে মৃদুলের বলা বাগানবাড়ির কথা, স্ক্যান্ডালের উল্লেখ মনে পড়ে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাংশু হয়ে যাওয়া অলোকের মুখটা। আর চলে যাবার সময় মৃদুল অলোককে কেন বলল যে অলোক নয় আলোক নামটাই ওর জন্য উপযুক্ত! বরেন তো শুটিংয়ের লাইট করত। তবে কী…! এদিকে মোটামুটি বরেনের সমসাময়িক অলোক সাহা। ইন্ডাস্ট্রিতে সতেরো বছর কাজ করছে, কিন্তু মাত্র ছ-বছর প্রোডাকশন হাউস খুলেছে। তাহলে এর আগে কী করত অলোক সাহা? মৃদুলের আর কোনও বাগানবাড়িতে কেচ্ছা আশা করি নেই। তা যদি না-ই থাকে তাহলে মহীদার কথায় রায়বাবুদের বাগানবাড়ির মালিক ছিল বরেন রায়। মৃদুল সেখানেই যায় আর কাণ্ড ঘটায়। তার মানে মৃদুলের সঙ্গে বরেনের যোগাযোগ ছিল। আর আজ মৃদুলবাবু যে বাগানবাড়ির কথা বলছিলেন তার মালিক অলোক সাহা এবং এই অলোকের কাছ থেকেই কোনও একসময় বাগানবাড়ি ভাড়া করেন মৃদুলবাবু। সব থেকে বড়ো কথা বনগাঁর নলডুগারি উত্তর চব্বিশ পরগনাতেই পড়ছে। সব কিছু মিলে গিয়েও শেষে গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছে। মানুষ দুটো তো সম্পূর্ণ আলাদা, অলোক সাহা আর বরেন রায়। মিল নেই তো কিছু। কিন্তু কেন মনে হচ্ছে, এই গোলকধাঁধায় এক গভীর অন্ত্যমিল আছে! মশারির মধ্যে শুয়েও ছটফট করছি। মৃন্ময়ী বলে, ‘কী গো? ঘুমোচ্ছ না কেন?’
-সায়নের নম্বর তোমার কাছে আছে?
দুম করে এমন প্রশ্ন করায় প্রথমটা একটু হকচকিয়ে যায় মৃন্ময়ী। জিজ্ঞেস করে, ‘কার?’ সিলিংয়ের দিকে চেয়ে আনমনে বলি, ‘সায়ন। মুনাইয়ের বর।’ ও বলল, ‘হ্যাঁ মোবাইলে সেভ আছে হয়তো। কিন্তু কেন? এত রাতে?’ আমি আর কথা না বাড়িয়ে বিছানা ছাড়ি। ছেলে ঘুমোয় বলে বিছানায় মোবাইল নিয়ে শোয় না মৃন্ময়ী। সাইলেন্ট করে টেবিলে রাখে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে বলি, ‘কী নামে সেভ করেছ? স্পেলিং কী?’ মৃন্ময়ী উঠে বসেছে। ধরা গলায় বলল, ‘সায়ন জামাই। এস এ ওয়াই এ.এন। কিন্তু হয়েছেটা কী? এত রাতে ফোন করবে নাকি?’ আমার মোবাইলে টাইপ করতে করতে বলি, ‘তুমি শুয়ে পড়ো।’ মৃন্ময়ী বলে, ‘কী যে করো না!’ ফোনটা কানে দিয়ে ডাইনিংয়ে চলে যাই।
পরের দিন সকালে অফিসে ঢুকতেই দেখি হইচই লেগে গেছে। হলটা কী? যা শুনলাম বা দেখলাম তাতে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। দেখি আমাদের অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট কানাইদা ফ্লোরের মধ্যে সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে আর থরথর করে কাঁপছে। চোখ দুটো লাল টকটকে। অনবরত চোখের জল গড়িয়ে মাটিতে পড়ছে। তাকে ঘিরে লোকের জটলা। চোখে মুখে জল দিচ্ছে সবাই। কেউ আবার সান্ত্বনা দিচ্ছে, কিছু হয়নি কানাই। ওঠ। একা ছিলিস, তাই ভয় পেয়েছিস। সব মনের ভুল।’ কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। অন্যান্য দিনের মতো আজও বেশ সকাল সকাল চলে এসেছিল কানাইদা। সবার আগে এসে ডেস্ক, দরজা, চেয়ার সব ঝাড়পোঁছ করে পরিষ্কার রাখা, এই নিত্যদিনের কাজ কানাইদার। অত্যন্ত সৎ আর অমায়িক মানুষ। গত বছর স্ত্রী গত হয়েছে ক্যানসারে। এখন একাই থাকে। এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তা যাই হোক, আজও নাকি চারপাশ সাফসুতরো করছিল এক মনে। মাঝেমধ্যে মুখ তুলে চারপাশের দেয়ালে চলতে থাকা টিভিগুলো দেখছিল। হঠাৎ দেখে, অ্যাক্টিভিটি এরিয়ার মুখেই যে টিভি সেখানে একটি মেয়ে বা মহিলা এলো চুলে পিছন কিরে বসে আছে। মেয়েটার মুখটা টিভির দিকে ছিল বলে কানাইদা দেখতে পায়নি। তাই ভাবে, পারমিতাদি, সুলগ্না বা অন্য কেউ এসেছে বোধহয়। অনেক সময় মিটিং থাকলে চলে আসি আমরা। কানাইদা পিছনের ডেস্ক মুছতে মুছতে প্রশ্ন করে, ‘দিদি যে আজ এত সকালে। মিটিং আছে?’ উত্তর মেলে না কোনও। ‘ও দিদি, চা-কফি কিছু খাবে নাকি গো? গোবিন্দ, বাবু কেউ তো আসেনি এখনও।’ আবারও উত্তর মেলে না কানাইদার প্রশ্নের। একটু খটকাই লাগে বয়স্ক মানুষটার। এ-অফিসে কানাইদার কথার উত্তর দেয় না এমন কেউ নেই। সকলেই কানাইদাকে ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে। পিছন থেকে ঠিক বুঝতেও পারছে না মেয়েটা কে! ছোটোখাটো চেহারাটা নিয়ে এক-পা দু-পা করে মেয়েটার দিকে এগোতেই দেখে মেয়েটি কানাইদার কাছ থেকে তার মুখ লুকিয়ে অ্যাক্টিভিটি এরিয়ার কাচের দেয়ালের দিকে চলে যাচ্ছে। কানাইদা আবার ডাকে, ‘ও দিদি, দিদি!’ পরক্ষণেই যে ঘটনাটি কানাইদার সামনে ঘটে তাতে কানাইদার হাত-পা অসাড় হয়ে যায়। কানাইদা স্পষ্ট দেখে মেয়েটি নিজের মনে হাঁটতে হাঁটতে ছাব্বিশ তলার কাচের দেয়াল দিয়ে হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেল। কথাগুলো বলতে বলতে কানাইদা যেদিকে আঙুল দেখাল সেদিকেই সেই পিলারের গায়ে রাখা পিতলের ঘটি। কানাইদার পাশে আমিও থপ করে ঘাড় নীচু করে বসে পড়লাম। নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হচ্ছিল। আমারই অতি সাহস আর পাকামির জন্য এই অতি সাধারণ নিপাট ভালো মানুষটার আজ এমন করুণ অবস্থা। তাও একটা প্রশ্ন করেই ফেলি, ‘কানাইদা, ওই মহিলা টিভিতে কী দেখছিল গো? মানে তখন কী চলছিল?’ খনখনে কাঁপা গলায় বলল, ‘গান। গানের পোগ্রাম।’ আমি বললাম, ‘প্রভাতি সংগীত?’ কানাইদা মাথাটাকে একবার ওপর-নীচে নাড়াল। বুঝতে অসুবিধে হল না যে তিলোত্তমা দেখতে এসেছিল যে তার গান বাজছে কিনা। না কি মিহিরের করা কাজ! কারণ যেটাই হোক, তিলোত্তমা এসেছিল এটা নিশ্চিত। বিজনেস হেড পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। দাঁত বের করে ফাজলামোর ছলে বলে উঠলেন, ‘প্রভাতি সংগীত আবার হিট। হাই টি আর পি আর কেউ আটকাতে পারবে না।’ মল্লিকাদি তাল ঠুকে ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ। ভূতে এসে গান শুনছে। ভাবুন কী রোমাঞ্চকর ব্যাপার!’ রাগে হাত মুঠো হয়ে এল। চোয়াল শক্ত হল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম তাও মুখ ফসকে একটা কথা বলেই ফেললাম, ‘একটু সিসিটিভি চেক করলে হয় না? এত বয়স্ক একটা লোক নিশ্চয়ই ভুল বকবে না।’ আমার কথায় অনেকেই সায় দিল। বিশেষ করে গোবিন্দ, বাবু এবং আরও যারা আমাদের জন্য অহোরাত্র কাজ করে চলেছে। ওরা ভয় পেয়ে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিজনেস হেড সম্রাটদা চাপে পড়ে বাধ্য হয় সিসিটিভি দেখার পারমিশন দিতে। সিসিটিভি-তে দেখা যায় কানাইদাকে কাজ করতে। কিন্তু অ্যাক্টিভিটি এরিয়ার দিকের সিসিটিভিটা চলতে চলতে খানিকক্ষণ পর দু-তিনবার ঝিরঝির এফেক্ট দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। ফরোয়ার্ড-রিওয়াইন্ড করেও লাভ হয় না। শুধু মাঝের একটা জায়গায় কোনও একটা মানুষের আবছা অবয়ব ধরা পড়ে। দেখা যায় সে হেঁটে অ্যাক্টিভিটি এরিয়া থেকে আমাদের কিউবিকলের দিকে আসছে। এটা অত্যন্ত সামান্য সময়ের দৃশ্য। কিন্তু তাতেই অফিসের লোকজনের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। কেনই-বা সিসিটিভি একটা সময়ের পর বন্ধ হয়ে যায়! আরও বেশ কিছুক্ষণ পর আবার নিজে থেকেই চলতে শুরু করে। তখন যথারীতি লোকের ছুটে যাওয়া, ব্যস্ততা সব ধরা পড়ে। বোঝা গেল, মোটামুটি সেদিনের মতো অফিসের কাজ সবারই চৌপাট। আমি চুপ করে রইলাম। কেন জানি না মনে হল, তিলোত্তমা হয়তো তার বীভৎস মুখটা কানাইদাকে দেখাতে চায়নি। ক্ষতি করতে চায়নি মানুষটার। ওর সঙ্গে কানাইদার তো কোনও শত্রুতা নেই। সম্রাটদা অথবা মল্লিকাদির মুখের বা মনের ভাব বোঝার সময় হয়নি আমার। কারণ আমি অলরেডি লেট করে ফেলেছিলাম। সায়নকে বলে রেখেছি দুপুর একটা নাগাদ যাব ওর থানায়। আমাদের অফিসটা ওর থানার আন্ডারেই পড়ে।
.
