১
ভূতের নেশা অনেকটা ড্রাগের নেশার মতো। প্রথমে মাথায় চাপে। তারপর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর প্রতি মুহূর্তে যেন কোনো অলৌকিক ভৌতিক ক্রিয়াকর্মের দিকে টেনে নিয়ে চলে। ছাড়তে চাইলেও ছাড়ে না। মাথা ভারী হয়ে আসে। বদ্ধ লাগে। তবু ভূতের চারপাশেই আনাগোনা করি। নাকি, ভূতেরা আমার চারপাশে!
না না, আমায় ভূতে পায়নি। আসলে ইদানীং অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আমি আর আমার গিন্নি বছর দেড়েকের ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে ল্যাপটপ খুলে বসি। মধ্যরাত পর্যন্ত ভূতের সিনেমা দেখি। আমি ভূতে বেশ ভয় পাই। কিন্তু কেন জানি না ওই ভয়টাই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি। শুধু দেখেও কি ক্ষান্ত হই? কী হল! কেন হল! এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখে ঘুম নেমে আসে টেরই পাই না। আজকাল একটা জিনিস বেশ বুঝতে পারি। অনেক রাতে যখন মশারি তুলে মাটিতে নামি বাথরুমে যাব বলে তখন আমার সঙ্গে আরও একজন ওই একইভাবে নামে। তার ছায়া-কায়া কিছুই নেই। শুধু অনুভব আছে। ‘আরও ভূতের সিনেমা দেখো, এবার দেখবে তোমার সঙ্গে সে ভূতও অফিস যাচ্ছে,’ গিন্নি ঠাট্টা করে বলে। আমিও মুখ বেঁকিয়ে হেসে বলি, ‘ইশশশ! একবার যদি তাকে দেখতে পেতাম।’
এই মাস তিনেক হল আমি একটা নতুন চ্যানেলে জয়েন করেছি। ক্রিয়েটিভ কিছু ভেবে স্ক্রিপ্ট তৈরি করা এবং সেটা শুটিং করে কিছু একটা খাড়া করানো আমার কাজ। সল্টলেকের অফিস পাড়ায় একটা আখাম্বা বিল্ডিংয়ের টপে মানে পঁচিশ নম্বর ফ্লোরে আমার নতুন অফিস। উঠলে নামতে ইচ্ছে করে না আর নামলে ওঠার কথা ভাবলেই গায়ে জ্বর আসে। প্রথম যেদিন এই অফিসে জয়েন করি সেদিন একটু তাড়াতাড়িই চলে আসি। লোকজন তখনও অফিসে আসা শুরু করেনি। লং ড্রাইভের লিফটে উঠতে উঠতে হাজার একটা ভাবনা আমার মাথায় ভিড় করে আসে। নতুন অফিস কেমন হবে, সব কাজ ঠিকঠাক করে সামলাতে পারব তো? বসের সুনজরে না এলে বছর শেষে ইনক্রিমেন্টটা শিয়োর ঝুলবে। যার পোশাকি কর্পোরেট নাম ‘কে আর এ’। এসব হাবিজাবি ভাবনার মাঝে লিফটটা থামে। আমিও কেমন একটা ঘোরের মধ্যে লিফট থেকে বেরিয়ে দু-তিন পা এগিয়ে যাই। ঠিক তখনই খেয়াল হয় দিনের বেলাতেও ফ্লোরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। আর কিছু ভাবার সময় পাইনি। পেছন থেকে কেউ যেন সড়াৎ করে টেনে আবার লিফটে ঢুকিয়ে দিল আমায়। দেখলাম তিন-চার রকম পাথরের আংটি পরা একটা হাত প্রায় দশ-বারোবার লিফটের দরজা বন্ধ হবার বোতামটাকে পরপর টিপে দিল। মুখ তুলে তাকালাম লোকটার দিকে। মাথায় টাক। ঘাড়ের কাছে কয়েক গাছি চুল বরমাল্যের মতো গজিয়ে আছে। চশমার গোল ফ্রেমের ওপার থেকে দুটো বড়ো বড়ো চোখ আমায় যেন বলল, ‘কী করছিলে ভায়া? কোথায় যাচ্ছিলে?’ এবার যেন পুরোপুরি সংবিৎ ফেরে আমার। পাশের লোকটাকে মানুষ বলেই মনে হল। ততক্ষণে লিফট উঠতে শুরু করেছে। ‘আসলে আমি অন্যমনস্ক হয়ে নেমে যাচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম টোয়েন্টি ফিফথ ফ্লোর এসে গেছে।’ বেশ সংকোচ নিয়েই বললাম।
-আজ জয়েন করছ? গম্ভীর গলায় বলল লোকটা।
-হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কী করে…
টেকো মাঝবয়সি লোকটা বলল, আসলে পনেরো বছরে তোমায় এ-তল্লাটে দেখিনি তো। তাই আর কী! তুমি বললাম বলে কিছু মনে করলে না তো?
-আরে না না। আপনিও কি এই চ্যানেলেই?
ডোনাল্ড ডাকের মতো চাপা ঠোঁটে হেসে ঢক করে ঘাড় নাড়লেন লোকটি আর বললেন, ‘কিউ সি-তে আছি। স্টুডিয়ো অপারেশন হেড মহীতোষ বিশ্বাস।’
স্বভাবতই আমিও হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে পরিচয় দিলাম, ‘ক্রিয়েটিভ প্রোমোশনে জয়েন করেছি, মিহির সরখেল।’ ‘মিহির!’ নিজের মনেই আওড়ে নিলেন নামটা। একটু হাসলেনও। তারপরেই বললেন, ‘যাক। অ্যাদ্দিনে এই বাবুদের চত্বরে একখানা বাঙালি এল।’ অবাক হয়ে গেলাম মহীতোষবাবুর কথা শুনে। ‘বাঙালি এল মানে? আমি যতদূর জানি এখানে তো অনেক বাঙালি আছে। আর চ্যানেলটাও বাংলা!’
-কই রে ভাই! সবাই তো ওই নামেই বাঙালি। হাই-হ্যালো আর এবিসিডি ছাড়া কথাই কইতে জানে না। তবু তুমি হাত জোড় করে পেন্নাম করলে। এসব তো এখন ইতিহাস।
লিফটটা ঘটাং করে থেমে গেল। দরজার পাশে লাল আলোয় লেখা টোয়েন্টি ফাইভ। নেমে কার্ড পাঞ্চ করে রিসেপশনে দাঁড়িয়ে মহীতোষবাবু বললেন, ‘তোমার রাস্তা ওদিকে।’ হেসে বললাম, ‘দেখা হচ্ছে।’ মহীতোষ বললেন, ‘হতে বাধ্য। চুলোচুলিও লাগল বলে।’
একটু হাসলাম। বেশ রসিক লোক। ওনার সান্নিধ্যে নতুন অফিসের ভয়টা অনেকটাই জয় করে ফেলেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ-ই উনি কাছে ডেকে ফিশফিশ করে বলে বসলেন, ‘ও হো, শোনো। যদি চা-টা খেতে নীচে নামো কখনও একটু সজাগ থেকো। হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে আবার ওই তেরো নম্বর ফ্লোরে যেন ঢুকে যেয়ো না।’
— তেরো নম্বর! মানে?
আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
— একটু আগেই পঁচিশ তলা ভেবে যে ফ্লোরে তুমি ঢুকে যাচ্ছিলে, ওটা থার্টি ফ্লোর। কেউ যায় না ওখানে। চলি।
রঙিন পাথরে ঠাসা হাতের আঙুলগুলো আমার মুখের সামনে নেড়ে দিয়ে কাচের দরজাটা ফাঁক করে গটগটিয়ে ঢুকে গেলেন মহীতোষ। তারপর তিনমাস কেটে গেল। মহীতোষবাবু এখন মহীতোযদা। আর আমি ‘মিহির শোনো’ থেকে ‘এই নিহির শোন’— এই সম্বোধনে এসে পৌঁছেছি। আর কখনও ভুল করেও তেরো নম্বরে নামিনি। কিন্তু অদ্ভুতভাবেই খুব একটা লোকের ভিড় না থাকলে লিফটটা একবার করে ওই তেরো নম্বরে থামে। আমি খানিক কুঁকড়ে যাই। ভাবি, এই বুঝি কেউ উঠল। কিন্তু কেউই ওঠে না। শুধু একরাশ অন্ধকার এসে লিফটের দরজার কাছে থাকে থাকে। কিছু পরে দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। লিফট নামতে বা উঠাতে শুরু করে।
সেদিন সকাল থেকেই মেঘলা। এই বুঝি এল, বুঝি এল করেও বৃষ্টি আসে না। অফিসেও কাজের চাপ বেড়েছে। ফস করে টি আর পি-টা পড়তেই হোমরা-চোমরা মাথাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সেদিন রাতে যে আর বাড়ি ফেরা হবে না তা বেশ ভালোই বুঝতে পারলাম। গিন্নিকে জানাতে হবে। আমার ডেস্কের পেছনেই সবচেয়ে বড়ো কনফারেন্স রুম। মাঝখানে বিশাল টেবিল। তাকে ঘিরে খান কুড়ি চেয়ার। সারা অফিসের মতো এই রুমের শেষেও কাচের দেয়াল। সেখানে চোখ পাতলে বিশাল এক ঝিল চোখে পড়ে। সেই ঘরে ঢুকে মোবাইলে গিন্নিকে ধরলাম। জানালাম। যথারীতি উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল, ‘সাবধানে থেকো। সময়মতো খেয়ো। আর পারলে রাতে একটা ক্যাব ধরে চলে এসো।’ কথার মাঝে দু-বার মেঘ ডেকে উঠল। আমি গিন্নির গলা কানে নিয়ে বিশাল ফাঁকা কনফারেন্সে হেঁটে বেড়াচ্ছি। কাচের মোটা দরজার বাইরে ব্যস্ত অফিস ছুটে চলেছে।
খটাং।
একটা শব্দ হল। তৎক্ষণাৎ পিছনে চাইলাম। কিচ্ছু চোখে পড়ল না। অনেক সময় এসি চলতে শুরু করলে নানারকম শব্দ হয়। কিন্তু না। এই ঘরের এসি তো বাইরে থেকে চালানো সম্ভব নয়। তবে? কিছু পড়ল? ঘাড় নীচু করে টেবিলের তলায় দেখলাম। লক্ষ করার মতো কিছু দেখতে পেলাম না। মাথা তুলতেই দেখলাম আমি যেদিকে দাঁড়িয়ে আছি ঠিক তার উলটোদিকে টেবিলের কোণের চেয়ারটা বেঁকে পাশের চেয়ারের গায়ে লেগে আছে। গিন্নি কত কিছু বলে চলেছে আর আমি ভেবে চলেছি অন্য কথা। একটু আগেই তো সব চেয়ারগুলো সাজানো ছিল। কোনও মানুষ চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলে যেমন করে চেয়ারটা বেঁকে থাকে এও ঠিক তেমনি করেই বেঁকে আছে।
— কী গো! যা বলছি শুনছ?
গিন্নির কথায় ভাবনা ভাঙে। ‘হুম, শোনো, আমার একটা মিটিং আছে। রাখছি এখন। রাতে ফোন করব।’ ফোনটা কেটে ঘরটা ছেড়ে বেরোতে যাব, অমনি শব্দ করে ঘরের এসিটা চলতে শুরু করল। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল আমার। ঠিক সাত-আট হাত দূরত্বে টেবিলের ওপর পড়ে আছে এসি-র রিমোট। হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়েই দরজার ক্যাঁচ শব্দের সঙ্গে ডাকটা ভেসে এল, ‘মিহির’! আঁতকে উঠলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পারমিতা। এমনিতেই একটু চড়া গলায় কথা বলেন এই মহিলা। তেমনভাবেই বলে চললেন, ‘সারা অফিস খুঁজে যাচ্ছি। ফোনেও এনগেজ। আড়াইটে থেকে মিটিং। কোথায় থাকিস? চল, বিজনেস হেড ডাকছেন।’
— হুম। একটা ফোনে ছিলাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের রিসেপশনিস্ট পাণ্ডেদা দুজন লোক নিয়ে কনফারেন্স রুমে এলেন। ওদের এসি দুটো দেখিয়ে বললেন, ‘এই যে এই দুটো এসি। তিনদিন ধরে চলছে না। আপনাদের তো পাত্তাই পাওয়া যায় না!’
আমি রীতিমতো থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সত্যি তো, কোনও এসি চলছে না ওই ঘরের।
.
বাইরে মুষলবৃষ্টিতে ভিজছে রাতবাতিগুলো। আমাদের কাচের পৃথিবী শান্ত হয়েছে। প্রায় লোকশূন্য। এত বড়ো হাওদা অফিসটা যেন গিলতে আসছে। একজন এডিটর, একজন সাউন্ডের লোক, কিউসি-তে একমনে কাজ করতে থাকা মহীতোষদা আর রিসেপশনে রাতের পাহারাদার ছাড়া আর একজনও নেই অফিসে। সেই মুহূর্তে আমার তেমন কিছু আর করার ছিল না অবজারভেশন ছাড়া। তাই ক্যান্টিন থেকে একটা চা বানিয়ে ফাঁকা অফিসে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছোই অ্যাক্টিভিটি এরিয়াতে। এটা একটা চেয়ার-টেবিল ছাড়া ফাঁকা জায়গা। সিলিং থেকে ক্যারমবোর্ডের ওপর বড়ো গোল লাইটটা ঝুলছে। অর্ধেকের বেশি কিউবিকলগুলো অন্ধকার। আমার ডেস্কের কাছে যে আলোটা জ্বলছে তার কিছু কিরণ ত্যারচাভাবে এসে পড়েছে অ্যাক্টিভিটি এরিয়াতে। তিন-চার পা দূরে একটা বড়ো কালো চেয়ার। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হলে লোকজন ওখানে এসে আরাম করে বসে। একটা সুইচ টিপলেই সর্বাঙ্গ কাঁপতে থাকে আর মেশিন আপনা-আপনি হাত-পা টিপে দেয়। আর রয়েছে টেবিল টেনিসের একটা নীল রঙের বোর্ড। কাচের দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়াই। আমার তিলোত্তমাকে বড়ো মায়াবী লাগে এখান থেকে। কাচের গা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অঝোর জলের ধারা। এমন বৃষ্টি হলে আমি ঘরের একটা জানলা খুলে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আর আমার শরীর জুড়ে খেলে বেড়াত বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা হাওয়ারা। জুড়িয়ে যেত মন আর শরীর। আবেশে চোখ বুজে আসত। এখনও তেমনই হল। এক পশলা ঠান্ডা হাওয়া আমার মাথার চুল, কাঁধ থেকে পিঠ ছুঁয়ে পায়ের দিকে নেমে গেল।
সে কী! হাওয়া কোথা থেকে এল! চারপাশ তো কাচে ঢাকা! মনে হওয়াতেই এক ঝটকায় পিছন ফিরলাম। শরীর আমার যেটুকু জুড়িয়েছিল এখন তার চেয়ে দ্বিগুণ গরম হয়ে গেল। কোনও হাওয়া কোথাও নেই। দমবন্ধ লাগছে। মাথাটা ঘোরাতে গিয়ে নজর গেল একটা পিলারের দিকে। পিলারের আড়ালে বাইরের দিক করে ঘটির মতো কী যেন একটা রাখা। কাছে গেলাম। দেখি একটা পিতলের ঘটি, যার মুখটা লাল কাপড়ে বাঁধা। আশ্চর্য! এতদিন হয়ে গেল এটা তো চোখে পড়েনি! গায়ে কিছু লেখা বা আঁকা আছে, যেটা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। মুখটাকে আরও একটু ঘটির কাছে নিয়ে যেতেই বিশ্রী একটা পোড়া গন্ধ নাকের ভিতর দিয়ে একেবারে গলায় চলে গেল মনে হল। সঙ্গে সঙ্গে গররর গররর শব্দ শুরু হল। ওই আরাম-কেদারার দিকে চোখ পড়তেই দেখি সেটা থরথর করে কাঁপছে আর নিজে থেকে পিঠে হেলান দেওয়ার অংশটা উঠে যাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই এলিয়ে পড়ছে। চেয়ারের পিছনের দিকে ছিলাম বলে ঠিক ঠাওর করতে পারলাম না কেউ এসে বসল কি না। বিলম্ব না করে চুপিচুপি এগিয়ে যাই চেয়ারটার দিকে। কিছুটা এগোতেই থমকে যাই। চেয়ারে কেউ বসেনি। তাহলে সুইচ কে টিপল। এটার কি অটোমেটিক কোনও ব্যাপার আছে! কী জানি বাবা! মুখ বাড়িয়ে দেখি সুইচটা অন করা। চায়ের কাপটা হাতে নিয়েই সুইচ অফ করি। আরাম-কেদারার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক এর পরেই পিলে কাঁপিয়ে চড়াত করে একটা শব্দ। খুব দ্রুততার সঙ্গে পিছনে তাকাতে গিয়ে কাপ থেকে চলকে হাতের ওপর গরম চা পড়ে। কিন্তু সেদিকে খেয়াল করার মন নেই। কারণ চোখের ওপর ঘটে গেছে বা ঘটে চলেছে এক বিস্ময়কর কাণ্ড! দেখি ক্যারমবোর্ডের ওপরের আলোটা জ্বলে উঠেছে। ক্যারমের ঘুঁটিগুলো যদি বোর্ডের মাঝে জড়ো করে কেউ স্ট্রাইকার চালায় তাহলে যেমন চড়াত করে শব্দ হয় এই শব্দটাও ঠিক তেমনই। এবার গলা শুকিয়ে আসছে। তবু আমায় ক্যারমের কাছে যেতেই হবে, কারণ পালাতে গেলে ওকে পাশ কাটিয়েই যেতে হবে। নাহ্, ক্যারমের ওপর কোনও ঘুঁটি ছিল না। স্ট্রাইকারও নয়। শুধু একটা কালো ঘুটি পকেটের কাছে গিয়ে আটকে ছিল। চোখের সামনে সেটাও কোনওরকম টোকা ছাড়া টকাস করে নিজে থেকে পড়ে গেল। আমি আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে কিউবিকল পেরিয়ে এডিটের দিকে যাচ্ছি, এমন সময় শুনি আমারই নাম ধরে কোনও এক মহিলা যেন ডেকে চলেছে। কে ডাকছে সেটা দেখার মতো অবস্থাতেই ছিলাম না আমি। কারণ সেই ডাকটা আমায় যেন তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ। ভেবেছিলাম এডিটে ঢুকব। কিন্তু অদ্ভুতভাবে আমি কিউসি রুমে ঢুকে পড়লাম। মহীতোষদা এক মনে এপিসোড দেখছিল। সে-ও খানিক ভড়কে বলল, ‘হল টা কী! এই মিহির! হাঁফাচ্ছিস কেন?’
কিছুক্ষণের অলৌকিক ক্লান্তিতে মহীতোষদার পাশের চেয়ারেই শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে পড়লাম। সব শুনে মহীতোষদা থমকে গেল। বলল, ‘কাল আসুক ওই হারামজাদা ইমন। নিশ্চয়ই ও তোকে আষাঢ়ে গল্প শুনিয়েছে আর তার ফলশ্রুতি এই!’ ইমন এই চ্যানেলের সবচেয়ে পুরোনো এডিটর। ও সেদিন বাড়ি চলে গেছিল।
— কীসের আষাঢ়ে গল্প? কই, কেউ তো কিছু বলেনি আমায়!
মহীতোষদা কিছু একটা বলতে গিয়েও গলা খাঁকিয়ে থেমে গেল। শুধু বলল, ‘এর আগে কখনও নাইট ডিউটি করেছিস?’ আমি ঘাড় নেড়ে না বললাম। ও বলল, ‘ওইটাই হল আসল কারণ। সারাদিন খাটাখাটনি গেছে। তার ওপর রাত জাগছিস। তাই অমন ভ্রম হচ্ছে তোর। পাত্তা দিস না। কেউ যদি তোকে ডাকে তাহলে পিছন থেকে ডাকবে কেন? সামনে এসে ডাকবে। দরকার থাকলে দেখা করে যাবে তোর সঙ্গে। যদিও সেই প্রয়োজনটা না হলেই ভালো হয়।’ শেষের কথাগুলো রহস্যের মতো ঠেকল। আমি এই কথার মানে জিজ্ঞেস করাতে বলল, ‘ও কিছু না। এখন যা দিকিনি। চটপট কাজ সেরে বাড়ি যা।’ সেদিন রাত তিনটের পর বাড়ি ফিরেছি। ঘুম হয়নি। খালি এপাশ আর ওপাশ করেছি। ভ্রম! সব কিছুই ভ্রম! এমনও হয় না কি!
পরের দিন আর অফিস যাইনি। মাথাটা ঝিমঝিম করেছে সারাদিন। গিন্নিকে লুকিয়ে দু-একটা সিগারেটও টেনে ফেলেছি। এমনিতে বড়ো একটা খাই না। একদিন বাদে ত ফিসে গিয়ে নিজের জায়গায় বসে কাজ করছি। সেই সময় ক্রিয়েটিভ হেড মল্লিকা ম্যাডামের আবির্ভাব ঠিক আমার পিছনটিতে। খুব বেশিদিন আসেননি। আমার সঙ্গে কথাও হয়েছে হাতে গুনে। ‘হেলো!’ সুরেলা আহ্বান শুনে রিভলভিং চেয়ার ঘুরিয়ে দাঁড়াতে যাব অমনি উনি আমায় বসিয়ে দিলেন। ‘কাজ ছেড়ে ওঠার দরকার নেই। আমি জাস্ট বলতে এসেছি আজ ঠিক সন্ধে সাড়ে সাতটায় তোমার সঙ্গে আমি একটু বসব আমাদের আপকামিং প্রোজেক্টের প্রমোশন নিয়ে ব্যাক কনফারেন্স রুমে।
— ওকে ম্যাম।
-কাজ করো।
বলেই বললেন, ‘তোমার নামটা যেন কী?’
অদ্ভুত! আমার সঙ্গে মিটিং করবে অথচ আমার নামটাই খেয়াল নেই! আসলে ছোটোখাটো মানুষদের নাম-ধাম মনে রাখলে নিজেকে ঠিক হাইফাই প্রমাণ করা যায় না। তাই এই ন্যাকামির অবতারণা। যাই হোক, বিরক্ত লাগলেও বস্ বলে কথা। সবিনয়ে বললাম, ‘মিহির সরখেল।’
-হোয়াট আ লাভলি নেম! মিহির!
পৃথিবীর যত প্রেম আছে এই একটা লাইনে যেন মহিলাটির গলা দিয়ে বেরিয়ে এল। তাও নাকি এই অধমের নিতান্ত সাধারণ থেকে সাধারণতর নাম শুনে। অবাক লাগলেও খানিক গদগদ ভাবও এল আমার মধ্যে। এই প্রথম কোনও মেয়ে আমার নাম শুনে এমন রিপ্লাই দিল। দাঁত বের করে থ্যাঙ্ক ইউ জানালাম। তারপর যথারীতি রিভলভিং চেয়ারটাকে আগের পদ্ধতিতেই ঘুরিয়ে আমার ডেস্কের দিকে ফিরতে যাব, অমনি আমার চোখ আটকে গেল একটা জায়গায়। আমার চেয়ার থেকে অন্তত তিরিশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে মল্লিকা ম্যাডাম হেসে হেসে কথা বলছেন আর-এক কলিগের সঙ্গে। ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকের ভিতরটা। এক সেকেন্ডও হয়নি আমার ধন্যবাদ জ্ঞাপনের। এর মধ্যে চোখের ওপর কী করে এমন একখানা অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেল! আমার পাশে কেউই নেই। আমি তাহলে কার সঙ্গে কথা বললাম। আমার উলটোদিকেই বসে বোধিসত্ত্ব। সে কানে হেডফোন গুঁজে সিনেমা দেখছে। তাকে ঠ্যালা দিয়ে ডাকলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এক্ষুনি মল্লিকা ম্যাডাম এখানে ছিলেন তো?’ সে ভ্রূ দুটো কুঁচকে বলল, ‘কই না তো!’ আমি আবার বললাম, ‘কী বলছিস! এই তো ছিলেন!’
-অত বড়ো চেহারা নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বললে বুঝতে পারব না! হেডফোন কানে ছিল ঠিকই। কিন্তু তাতে উপস্থিতিটা তো আর মিথ্যে হয়ে যায় না।
বোধিসত্ত্বের কথায় যুক্তি আছে। অমন মোটাসোটা এক মহিলা পাশে দাঁড়ালে চোখ না তুলেও যে কেউ ওঁর উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত হতে পারে।
— আচ্ছা, ব্যাক কনফারেন্স রুমটা কোথায়?
বোধিসত্ত্ব ঠোঁট ওলটাল। আমাদের খাবার এনে দেয় গোবিন্দদা, টেবিল সাফ করে কানাইদা, আই টি-র কাজকর্ম সামলায় অনির্বাণ আর ছন্দক, কেউ দিতে পারল না ব্যাক কনফারেন্স রুমের হদিস। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? নাকি, ভূতের সিনেমা দেখার কুফল এগুলো? মাথায় এল সেই পিতলের ঘটির কথা। সকালের আলোয় একবার দেখব ভেবেছিলাম। তালেগোলে ভুলে গেছি।
সত্যিই পিতলের ঘটির গায়ে কীসব হিজিবিজি লেখা। একেবারে ফস্ করে বাঁ-হাত দিয়ে ঘটিটা তুলে নিলাম। লেখার পাঠোদ্ধার করার খানিক চেষ্টাও করলাম। কিন্তু মাথামুণ্ডু কিসসু বুঝলাম না। মাথা তুলে ঘটিটাকে নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরিয়ে দিতে গিয়েই ছিটকে গেলাম। অজান্তেই চিৎকার করে উঠলাম। ঘটিটা হাত থেকে পড়ে মুখের কাপড়টা খুলে গেল। আমি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছি। ভিতর থেকে দু-তিনজন দৌড়ে এল। ঘটিটা মাটিতে মুখ থুবড়ে আছে দেখে তারাও বেশ চমকে গেল। কানের কাছে এসে ঘষঘষে গলায় কে যেন বলল, ‘এটা না করলেই পারতিস।’ চমকে উঠে দেখি ইমনদা।
— কে… কেন?
-কী দরকার ছিল ওটাতে হাত দেবার?
.
নীচের দোকান থেকে দুখানা স্যান্ডউইচ অর্ডার দিয়ে খাচ্ছিলাম আমি আর ইমনদা। বেলা বেড়েছে। অদ্ভুত ঘটনার চোটে পেটে এতক্ষণ যে দামামা বাজছিল তা খেয়ালই করিনি। ইমনদা তো সুযোগ পেয়ে একচোট নিল। ‘তোদের মতো অল্পবয়সি ছেলেদের অসুবিধেটা কোথায় জানিস? তোরা বড়ো পোঁয়াপাকা। ওই যে কথায় বলে, সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়। তোর হয়েছে তাই। চারপাশে এত কিছু হাত দেবার আছে, তুই সেসব না ধরে ধরতে গেলি ওই ঘটখানাকে!’
— কী আছে কী ওই ঘটে? প্রশ্নটা করেই ফেললাম।
মুখের কাছে মুখ এনে রহস্য করে বলল, ‘বোঝোনি?’ আমি নিজেকে খানিক আড়াল রেখেই উত্তর দিলাম, ‘কী… কী বুঝব?’
— ওই ঘট তোর হাত থেকে পড়ে গেল কেন?
-পড়ে… পড়ে গেল! এমনিই!
ইমনদা কিছু কি বুঝল? জানি না। শুধু বলল, ‘বলতে না চাইলে বলিস না। বললে তোরই ভালো হত!’ আমি গলায় একটু জোর এনেই বললাম, ‘বিশেষ কিছু না গো। অদ্ভুতভাবেই পড়ে গেল আর কী!’
— অদ-ভু-ত ভাবে! অদ্ভুতেও ভূত আছে ভায়া।
— অ্যাঁ?
আমাকে আঁতকে উঠতে দেখে খানিকটা নকল হাসি হেসে ইমনদা বলে, ‘না এমনি বললাম। নে চল। সেই পঁচিশ তলায় ঠেঙিয়ে উঠতে হবে তো।’ ইংরেজির সঙ্গে বাংলা মিশে গেলে এই হয়। খুব সাধারণ কথায় আমরা কত কিছু ভুল বলি। কিন্তু চট করে সবাই সেটা ধরতে পারে না বা ধরলেও ‘লোকে ওটাই বলে’ এই কথা ভেবে নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে নিই। পঁচিশ নম্বর ফ্লোর কখনোই পঁচিশ তলা নয়। সেটা ছাব্বিশ তলা। যাই হোক, আমিও দ্বিতীয় শ্রেণির লোকের মতো চুপ থাকলাম। সত্যি বলতে কী, সে মুহূর্তে আমার মাথাতেও এত বিশ্লেষণ আসেনি। লিফটে আমি, ইমনদা আর দুটো মেয়ে। সেভেন্থ ফ্লোরে দুজন মেয়ে বেরিয়ে গেল। আমার মাথায় ঘুরেই চলেছে ইমনদার কথা, ‘অদ্ভুতেও ভূত আছে ভায়া।’ এরা অনেক কিছু জানে। আমি নিশ্চিত। কিন্তু কিছু বলছে না। কিন্তু কী জানে? কী আছে এই অফিসে? ইতিমধ্যেই দরজার পাশে লাল আলোয় লেখা টু ফাইভ। নেমে গেলাম। ইমনদা আমার পিছনে। আমি ভাবছি সেই কথা। ইমনদাকে বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না যে ওই ঘটটা রাখার সময় আমি স্পষ্ট দেখলাম পিলারের গায়ে আটকে আছে রক্তাক্ত একটা হাত। কাটা কিনা জানি না। পিলারের উলটোদিক থেকে কেউ হাত বাড়ালেও ওরকম লাগতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত, ওই রক্তাক্ত হাতটা অবশ্যই কোনও মেয়ের। কারণ হাতে একটা রংবেরঙের পাথর বসানো সুন্দর চুড়ি ছিল। ভাবতে ভাবতে খেয়ালই নেই কখন কার্ড পাঞ্চ করে ভিতরে চলে এসেছি। হঠাৎ মনে হল লুকিয়ে লাভ নেই। ইমনদাকে বলেই দিই। ‘ইমনদা’ বলে পিছন ফিরতেই দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন বিরাট হাঁ-করে রয়েছে আমার দিকে। ইমনদা কেন, কেউই নেই! আঁতকে উঠে উলটোদিকে ঘুরলাম। চোখে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না। এক নিমেষে অফিসের সব আলো এমন করে নিভিয়ে দিল কে! ‘পাণ্ডেদা, পাণ্ডেদা! ইমনদা! পারমিতাদি, বোধিসত্ত্ব!’ যার যার নাম মনে এল সব্বার নাম ধরে চিৎকার করে ডাকলাম। কেউ সাড়া দিচ্ছে না কেন? সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়েই চলেছি আমি। কোথাও কিছু বাধা নেই। পায়ে একটা কী যেন ঠেকল! পকেট হাতড়ে কোনওরকমে মোবাইলটা বের করলাম। অন্ধকারে আনতাবড়ি টেপাটিপি করার পর হট করে ফ্ল্যাশ লাইটটা জ্বলে উঠল। হায় ভগবান। এটা তো আমার অফিস নয়। এ কোথায় এলাম আমি? দরজাই বা কোনদিকে? আলোতে যতটুকু বুঝলাম, এটা একটা বিশাল ফাঁকা বহুদিন পড়ে থাকা ফ্লোর। কোনও মানুষের বাস নেই এখানে। ধুলোতে কাশি আসছে। লিফট কোথায়? সিঁড়ি? কিচ্ছু নেই হতে পারে না কি! পাগলের মতো এপাশ-ওপাশ মাথা ঝাঁকাচ্ছি। গলার কাছে ড্যালা পাকিয়ে আসছে এক জন্মের কান্না। কাঁদতে পারছি না। এখনও ডাকছি কাউকে। কিন্তু সেই ডাক শুধু আমার অন্তরাত্মাই শুনছে। কারণ কণ্ঠ ছাড়িয়ে ভয়ার্ত শব্দগুলোর বাইরে আসার শক্তি নেই। কে যেন গলাটা চেপে ধরেছে আমার। মোবাইলের আলোটা আমার সঙ্গে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ মনে হল, আমার হাতের মোবাইলটা একদিকে আর তার আলোটা আর-একদিকে থমকে গেছে। সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। থরথর করে কাঁপছে। মন বলছে কিছু না কিছু দেখতে পাব। কিন্তু চোখ বলছে, না, কিছু দেখতে চাই না। মোবাইলের আলোটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির হয়ে আছে। চোখ কচলে ভালো করে দেখি দূরে একটা লম্বা কাঠের বাক্স যেন দেখা যাচ্ছে। বাক্সটা মাটিতে শোয়ানো। পালাবার পথ নেই। তাই জীবনের সব শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম ওই বাক্সটার দিকে। এই জনশূন্য পুরীতে কীসের বাক্স ওটা? মোটামুটি কাছেই চলে এসেছি বাক্সটার। খানিক তফাতে সামনের দিকে ঝুঁকে যেই দেখতে গেছি, অমনি এক রক্তমাখা ক্ষতবিক্ষত মহিলা আচম্বিতে মুখ তোলে। ওই যন্ত্রণাময় মুখেও সবকটা দাঁত বের করে হা হা করে হাসছে সে। তখনও রক্ত ঝরছে তার। ভয়ানক খুশির অট্টহাসি হাসছে। খাঁ-খাঁ মহলটার দেয়ালগুলোতে সেই হাসির শব্দ যেন লুটিয়ে লুটিয়ে পড়তে থাকে। ওই বীভৎস মহিলা বাক্সটার পাশে বসে ক্ষতবিক্ষত রক্তমাখা হাতটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। এ তো সেই চুড়ি পরা হাত! উন্মাদের মতো দৌড়েছিলাম তারপর। গলা চিরে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কতগুলো আলো দূর থেকে পাক খেতে খেতে আমার সামনে এসে পড়ে। তারপর শরীরের সব শক্তি একত্রিত করে বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকু সম্বল করে ওই আলোগুলোর ওপর আমি সজোরে এক থাবা বসাই। ব্যস! তারপর আর কিচ্ছু মনে নেই আমার।
যখন জ্ঞান ফিরল, ঝাপসা চোখে দেখলাম, আমার মাথার কাছে কলিগরা ভিড় করেছে। পাশেই গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে ডাক্তার। কিছুটা দূরত্বে পাণ্ডেদা মহীতোষদার গালে কী যেন লাগিয়ে দিচ্ছে।
— আপনি ঠিক আছেন তো মিহির? আর ইউ ওকে?
শুধু ঘাড় নাড়লাম। কথা বলার ক্ষমতা নেই। আমার চোখদুটো তখন শুধু মহীতোষদার ওই রহস্যময় চোখ দুটো থেকে অনেক কিছু জানার ও শোনার অপেক্ষায় চেয়ে আছে। মাথাটা তখনও ঘুরছিল। কানে ভেসে আসছিল ইমনদার গলা। কাকে যেন বলছে, ‘আরে মিহির তো আমার সঙ্গেই লিফটে ছিল। আমি হোয়াটসঅ্যাপ চেক করছিলাম। হঠাৎ দেখি মিহির নেই। আর লিফটটাও তখন সবে থার্টিং ফ্লোর ছেড়ে ওপরে উঠছে। আমি আর কোনওদিকে না তাকিয়ে সোজা মহীতোষদাকে বললাম। তারপর পাণ্ডেদা আর শিশিরকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দুজন সোজা থার্টিং ফ্লোর। প্রথমে তো সব ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ শুনি প্রচণ্ড চিৎকার করতে করতে একজন ছুটে আসছে। গলা শুনে বুঝলাম মিহির। ও পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে এসে দড়াম করে হাত চালাল। মহীতোষদার গালে গিয়ে লাগল। তারপরেই মিহির সেন্সলেস।’ আমি আর-একবার কৃতজ্ঞতা আর লজ্জা নিয়ে মহীতোষদার দিকে তাকালাম। সে-ও হেসে হালকা করে মাথা নাড়িয়ে বোঝাতে চেষ্টা করল যে তার কিচ্ছু হয়নি। আরও লজ্জায় গুটিয়ে গেলাম। কে যেন ওখানে উপস্থিত আমাদের বিজনেস হেডকে বলল, ‘এবার ওই তেরো নম্বর ফ্লোরের কিছু একটা করুন স্যার। বিল্ডিং কমিটিকে জানান।
— কী বলব? ওখানে ভূত আছে? আর সেই ভূত আর কোনও তলায় কারও ক্ষতি না করে পঁচিশ তলায় এসে বিশেষ একজনের ঘাড় মটকাচ্ছে? যতসব ননসেন্স। কী না কী দেখেছে মিহির। সেই দেখে ভয় পেয়েছে।
ভিতরটা রাগে ফেটে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল ওই মহিলা একবার এসে বিজনেস হেডকে দেখা দিক। দেখব তখন, অমন ইস্তিরি করা প্যান্ট কেমন শুকনো থাকে। এর পর সাতদিনের ছুটি দিয়েছিল কোম্পানি। বলেছিল, একদম সুস্থ হয়ে তারপর আসতে। অফিসের দুজন কলিগ যখন বাড়ি বয়ে দিয়ে গেল আমায় তখন খেয়াল হল, আমার মোবাইলটা নেই। সে তো ওই তেরো নম্বর ফ্লোরে আলো জ্বালতে বের করেছিলাম। তারপর ওই কাণ্ড! তার মানে ওই তেরো নম্বর ফ্লোরেই তিনি মুখ বুজে পড়ে রয়েছেন। গিন্নি শুনেই বলল, ‘গেছে, গেছে আপদ গেছে। খবরদার ওই মোবাইল খুঁজে আনার দরকার নেই। সুস্থ হয়ে একটা নতুন মোবাইল কিনে একদম নতুন নম্বর নেবে তুমি।’
-কেন? নতুন নম্বর নেব কেন? ওই পেতনি কি নম্বর জেনে ফোন করবে?
গিন্নি অবাক হয়ে বলল, ‘পেতনি! মানে মহিলা!’
এতদিনেও আমি কাউকে ভৌতিক কাণ্ডের কিছু বলিনি। কলিগরাও জেনে গেল যে ওই ভূত বা আত্মা যেই হোক, সে একজন মহিলা। একটা গুজব ছিলই। আজ সেটা প্রমাণিত হল। তবে ডিটেলসে কাউকে কিছু জানাইনি। কারণ এই দুনিয়ায় তিল থেকে তাল হতে দু-মিনিটও লাগে না। সাতদিন বাড়ি ছিলাম। রাতে ঘুমোতে পারিনি। ঘুমটা গভীর হলেই মল্লিকা ম্যাডামের গোল বড়ো টিপ পরা মুখটা ভেসে উঠত আর সঙ্গে শুনতে পেতাম সেই কথা, ‘মিহির! হোয়াট আ লাভলি নেম!’ যেন কোটি কোটি মৌমাছির চাক ভেঙে কেউ মধু জড়ো করেছিল ওই কথাতে। অমন খ্যারখেরে গলাও মধুময় হয়ে উঠেছিল। এছাড়া অবিশ্যি আর কোনও উৎপাত ছিল না।
হপ্তাখানেক বাদে অফিসে জয়েন করতেই একটা শকিং নিউজ শুনলাম। আমার নতুন নম্বরটা কাউকে দেওয়া হয়নি বলে অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। সেদিন গিয়ে শুনি মহীতোষদাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য। অপরাধ, চুরি। গোটা ব্ৰহ্মাণ্ডটা ওলট-পালট হয়ে গেল এক মুহূর্তে। মন বারবার বলে এ অসম্ভব! এ অসম্ভব! মহীতোষদার জুনিয়রের কাছ থেকে শুনলাম চ্যানেল একটা ডিসিশন নিয়েছে যে দশ-বারো বছর আগের একটা গানের অনুষ্ঠান রিপিট টেলিকাস্ট করবে। সেই শুনে মহীতোষদা নাকি প্রচণ্ড আপত্তি করে। কিন্তু সে আপত্তিতে কেউ কান দেয়নি। এমনকি মহীতোষদা হেড অফিসে ওপরমহলকে এই অনুষ্ঠান যাতে না চালানো হয় সেই মর্মে একটা মেলও করে। স্বভাবতই এতে কলকাতার ওপরমহলের বিরাগভাজন হয়।
-আর তাই মিথ্যে চুরির দায়ে ওনাকে এই শাস্তি তাই তো?
আমার কথা শুনে পীযূষ বলে, ‘না গো মিহিরদা। আমাদের লাইব্রেরি থেকে ওই প্রোগ্রামের চারটে এপিসোডের ক্যাসেট মহীতোষদা সরিয়ে নেয়। এপিসোড নম্বর কুড়ি থেকে তেইশ।
-কী বলছিস। কেন?
-কেন জানি না, বারবার জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও মহীতোষদা মুখ খোলেনি। সবাই বলেছে, মহীতোষদা, এতে তোমার চাকরি চলে যেতে পারে। প্লিজ বলো। প্রতিবারই এক কথা, ওই এপিসোডগুলো খারাপ। খুব খারাপ। ওই চারটে এপিসোড চালালে অফিসের ক্ষতি হবে। আমি পনেরো বছর যে অফিসের নুন খেয়েছি সেই অফিসের ক্ষতি কী করে করি বলতো? অদ্ভুত যুক্তি!
অদ্ভুত শব্দটা যেন একটু বেশিই কানে এসে লাগল। আমায় একটু অন্যমনস্ক দেখে পীযূষ বলল, ‘কী ভাবছ মিহিরদা?’ ‘হুঁ! না কিছু না।’ নিজের ভাবনা এড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোরা দেখেছিস এপিসোডগুলো?’
পীযূষ মাথা নেড়ে না বলল।
— আর প্রমাণ?
— সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে। আসলে প্রতিটা এপিসোডই ডিজিটাইজ করতে হবে। তাই আমাদের দায়িত্ব ছিল সবকটা বের করে ডিজিটাইজ করতে দেওয়া। সেই মতো কাজও শুরু হয়েছিল। একদিন রাত্রে মহীতোষদা অফিসে এসেছিল। সেদিন ওর নাইট শিফট ছিল না। আমরা ছিলাম। আমি তো এই ঘরে বসেই কাজ করছিলাম। আমার সঙ্গে দেখাও করেনি। পরে সিকিউরিটির কাছ থেকে শুনলাম যে মহীতোষদা এসেছিল। এর পর যখন ওই চারটে এপিসোড পাওয়া যাচ্ছে না, তখন সবাই মিলে কিছু একটা সন্দেহ করে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে। আর সেখানেই সবটা দেখা যায়। মহীতোষদাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, ওই চারটে এপিসোড ডিজিটাইজ করতে নিয়ে গেছিল ল্যাবে। কিন্তু করা যায়নি। নষ্ট হয়ে গেছে। ল্যাবে খোঁজ নিতে জানা যায় মহীতোষদা অন্য এপিসোড নিয়ে গেছিল। ওই চারটে দেয়নি। পরে মহীতোষদার কাছ থেকে ওই চারটে এপিসোডের ক্যাসেট নিয়ে দেখা যায় রিলগুলোর ওপর কোনও কেমিক্যাল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সব নষ্ট।
এপিসোডে কী এমন ছিল? ঠিক কতটা খারাপ ছিল যে সেটা চালালে চ্যানেলের ক্ষতি হবে! কেন? মাথাটার বাঁ-দিকটা খুব ব্যথা করছে। মাইগ্রেনটা কি আবার ফিরে এল? উফ! কিছু মিলছে না। অফিসটাকে রীতিমতো গোলকধাঁধা মনে হচ্ছে। কিউসি রুম থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নাকে এল সেই পোড়া পোড়া বিশ্রী গন্ধটা। করিডোরের শেষ মাথায় গ্রাফিক্স রুম। তার আগেই একটা খাঁজ মতন জায়গা আছে। সেখানে দেয়াল জুড়ে কাভার্ড করা। দরকারি ফাইল-টাইল থাকে। সেইখানেই একটা দরজা। এতদিন খেয়াল করলেও পাত্তা দিইনি। কিন্তু সেদিন বিশ্রী গন্ধটার উৎস খুঁজতে খুঁজতে সেই বন্ধ দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। কাঠের দরজার মাঝখানে ছোটো কালো কাচে ঢাকা অংশ, যার ওপর চোখ পাতলে ওপারের জগৎ সম্পর্কে বোঝার উপায় নেই। এপার দিয়ে কেউ হাঁটাচলা করলে ওই কাচটার ওপর ছায়া পড়ে। মনে হয় ওপার দিয়ে কেউ হেঁটে গেল। বেশ একটা ভৌতিক অনুভূতি হয়। আমারও তেমনই হল। মনে হল, কেউ এসে দাঁড়াল আমার মুখোমুখি। চট করে পিছন ফিরে চেয়ে দেখি কেউ নেই। মুখ ফেরাতে সে ছায়াও নেই।
— কিছু চাই স্যার?
চমকে উঠলাম। নাহ্। কোনও আত্মা নয়। শিশির। অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট। আমি বললাম, ‘না লাগবে না কিছু। আচ্ছা শিশির, এই পাশটায় কী আছে?’
-কিচ্ছু না স্যার। পুরোটাই ফাঁকা। ওপাশেও আমাদের অফিসের একটা পার্ট হবার কথা ছিল। কিন্তু কেন হয়নি তা জানি না স্যার।
— তুমি গেছ ওদিকে?
— একবার। মেন্টেনেন্সের কাজ হচ্ছিল তখন। ওই কতগুলো সিমেন্টের পিলার আর চারপাশটা পুরোটাই খালি। সরি, চারপাশ নয় স্যার। এই দরজার ঠিক উলটোদিকে দেয়াল করা আছে। আর ওই দেয়ালে কীসব মন্ত্র লেখা।
— মন্ত্র? কী মন্ত্ৰ?
-বাংলায় নয় স্যার। পড়তে পারিনি।
-কেন লেখা জানো কিছু?
-লোকে তো কত কিছু বলে স্যার। ওসব আমি বিশ্বাস করি না।
-কীসব?
বলে ওখান থেকে নাকি কার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। নানারকম শব্দ হয়। আসলে স্যার এই জায়গাটায় এখন অফিস হয়েছে ঠিকই। আমার বাপ-ঠাকুরদার কাছে শুনেছি এখানে নাকি খুন করে ফেলে যেত। অফিসের এই পিছনদিকটায় ঝিল তো!
— ও। আর পোড়া গন্ধ?
শিশির অবাক হয়ে বলল, ‘আপনিও পান?’
— হ্যাঁ। কেন আর কে পেয়েছে?
— সেদিন সাউন্ডের আবিরদা বলছিলেন। আমি তো বললাম, অনেক এসি চলে। হয়তো তার থেকেই। আপনার কি অন্য কিছু মনে হয় স্যার?
— না না। অন্য আর কী মনে হবে?
— স্যার একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— হ্যাঁ বলো।
-আপনি তেরো নম্বর ফ্লোরে কি কাউকে দেখেছিলেন?
আমায় একটু ইতস্তত করতে দেখে শিশির বলল, ‘না মানে সবাই বলাবলি করছিল তাই।’ নিজের মধ্যে গম্ভীরভাব এনে বললাম, ‘কী বলছিল?’ শিশিরও একটু কিন্তু-কিন্তু করে বলল, ‘বলছে আপনি নাকি ভূত দেখেছেন।’ গাল ফুলিয়ে ওর ভূত বলার ধরন শুনে কেন জানি না আমার হাসিই পেল। বললাম, ‘ভূত মানে কী জানো শিশির?’ শিশির শুধু বোকার মতো এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়াল।
-ভূত মানে যা ঘটে গেছে। মানে অতীত। যা আর কোনও দিনও ফিরবে না। অতীতকে ভয় পেয়ে লাভ নেই। কারণ অতীতকে দেখাই যায় না।
বলে চলে গেলাম। শিশির কী ভাবল কী জানি। কিন্তু আমি বুঝলাম না এইসব ভারী ভারী জ্ঞানবাক্য আমি কোন বিশ্বাসে বললাম। আমিও তো ভূতে ভয় পেতাম পেতাম। তার মানে পাস্ট টেন্স? নিজেকেই প্রশ্ন করলাম বার কয়েক। সেদিনকার ঘটনা কি তাহলে আমায় ভিতর ভিতর সাহসী করে তুলল?
দম করে থাক্কা লাগল একটা। আমি রীতিমতো টলে গেলাম। ‘আবির তুমি! এভাবে দৌড়োচ্ছিলে কেন?’
সাউন্ডের আবির হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘সরি সরি মিহিরদা।’ বলেই প্রায় ছুটে নিজের ঘরে চলে গেল। হলটা কী আবিরের! জানতেই হবে। ঘরে গিয়ে আচ্ছাসে চেপে ধরলাম। আবির যা বলল তাতে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। ক্যান্টিনের পাশে অফিসের স্মোকিং জোন। ওখানে রং দূরে থাক, চুনকামও হয়নি। ওই জায়গাটা দেখলে মনে হয় অফিসটা সবে তৈরি হয়েছে। কিন্তু আদৌ তা নয়। সেই জায়গাতেই আবির একা দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। বাইরের পৃথিবীতে গোধূলির কনে-দেখা আলো। সন্ধে নামবে-নামবে করছে। হঠাৎ একটা গোঙানির শব্দ আবিরের কানে আসে। একটু মনোযোগ দিতেই আবির বোঝে এ কোনও অসুস্থতার গোঙানি নয়। রাগে হুংকার দিতে না পেরে কেউ গরগর করছে। যতবারই সে সিগারেটে টান দেয়, ততবারই সেই গজরানোর শব্দটা বাড়তে থাকে। আর শব্দটা আসছিল ছাদের দিক থেকে। একটু অন্যরকম মনে হলেও কট্টর কমিউনিস্ট আবির এক-পা এক-পা করে ছাদে উঠতে থাকে। সিঁড়ির চাতালে উঠে ওপর দিকে চাইতেই আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে যায় আবিরের। সে দেখে একটা রক্তাক্ত হাত দেয়ালের গায়ে আটকে ঝুলছে। ওখানেই সিগারেট ফেলে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে নেমে আসে আবির। তারপরেই আমার সঙ্গে ধাক্কা।
কথাগুলো বলতে বলতে আবির এখনও হাঁফাচ্ছে। আমি সন্দিগ্ধ চোখে প্রশ্ন করি, ‘আর কিছু দেখেছিলে?’ দু-হাতের আড়াল থেকে ঘর্মাক্ত লাল মুখটা তুলে চোখ দুটো ভয়ানক করে বলে, ‘একটা চুড়ি। নানা রঙের পাথর বসানো। সুন্দর দেখতে।’ বুঝলাম, আমার সেদিনের দেখাটা নিছক ভ্রম ছিল না।
মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে সাতদিন ছুটি মানে অনেক। তাই যেদিন জয়েন করলাম সেদিন যেন মাথার ওপর কাজের পাহাড় ভেঙে পড়ল। অফিসে ঢুকতে না ঢুকতেই নতুন প্রোগ্রাম লঞ্চের কাজ শুরু। প্রথমে স্ক্রিপ্ট ভেবে লেখা, তারপর তাতে হাজারবার চেঞ্জ করে অ্যাপ্রুভাল নেওয়া। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রোডাকশন হাউসের সঙ্গে বাজেট নিয়ে মিটিং। সেটা ফিক্সড হলে রেইকি করতে বেরোনো। রেইকি করা মানে শুটিংয়ের জন্য উপযুক্ত জায়গা দেখে স্থির করে আসা। সেই সপ্তাহের শনিবারেই একটা প্রোডাকশন হাউসের মালিকের সঙ্গে গিয়েছিলাম রাণাঘাটের একটু ভিতরে একটা বাড়ি দেখতে। আমার আর অলোকবাবু, মানে প্রোডাকশনের মালিকের বেশ পছন্দ হল বাড়িটা। অলোকবাবু অতি সজ্জন। অন্তত কয়েকদিনের আলাপে সেরকমই মনে হল। নইলে চট করে কোনও মালিক আজকাল এইরকম রেইকিতে আসে না। গাল ভরতি মোটা কাঁচা-পাকা চাপ দাড়ি। চোখে হাইপাওয়ারের চশমা। ব্যাকব্রাশ করা চুল। একটা চোখ একটু ঘোলাটে। কোনও প্রবলেম আছে মনে হয়। আমাদের কাজ সারতে সারতে বিকেল হয়ে গেল। ফেরার জন্য এবার গাড়িতে উঠব আমরা। অলোকবাবু প্রথমে উঠে গেলেন। থমকে গেলাম আমি। মনে হল অনেকদিন মানুষটার কোনও খোঁজ নেওয়া হয়নি। কেমন আছে একটু দেখেই আসি। ‘কী হল মিহির, উঠুন।’
— না অলোকদা। আপনি এগিয়ে যান।
-সে কী? আরও কিছু বাকি আছে নাকি? তাহলে বলুন আমিও থাকি।
-না না। আসলে আমাদের অফিসের একজন এখানেই থাকেন। ভাবছি তাকে একবার দেখে আসব। অনেকদিন খবর নেই।
— ও। বলেন তো আমিও যেতে পারি। একসঙ্গেই ফিরব না হয়!
— না না থ্যাঙ্ক ইউ। আমি একাই ফিরতে পারব।
আমার কিন্তু কোনও অসুবিধে নেই মিহির।
-না না। আসলে আমার একটু পার্সোনাল দরকার আছে মহীতোষদার সঙ্গে।
-কে? কার সঙ্গে?
ভ্রূ কুঁচকে অলোকবাবু প্রশ্ন করলেন। আমি আবারও নামটা বললাম। শোনার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ির আধো অন্ধকারে অলোকবাবুর মুখটা কেমন যেন পালটে গেল। আর অপেক্ষা না করে বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনি যান। চলো রঘুবীর।’
আমি বললাম, ‘রাতে ফোনে কথা বলছি।’ অলোকবাবু একটু সৌজন্যমূলক হুম ছুড়ে দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে চলে গেলেন। কী জানি, আমার কথায় কিছু মনে করলেন কিনা! আমি আর সাত-পাঁচ না ভেবে একটা রিকশা নিলাম। রিকশায় উঠেই গিন্নিকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম ফিরতে রাত হবে।
আশেপাশের বাড়ি থেকে সন্ধের শাঁখ বাজছে। আমি রিকশা থেকে নামলাম। একতলা বড়ো বাড়ি। ছোটো লোহার গেট পেরিয়ে কলিং বেল টিপলাম। মহীতোষদাই দরজা খুলল। খুলেই বলল, ‘এত দেরি করলি কেন? সন্ধে নেমে গেল যে!’ আমি উত্তর দিতে পারলাম না। মনে হল, মহীতোষদা যেন জানতই আমি আসব। অবাক লাগল। ঘরে নিয়ে গেল। যাবার পথে চোখে পড়ল একটা বড়ো ঠাকুরঘর। সেখানে বিশাল সিংহাসনে সাজানো কত ঠাকুর। ঘরে গিয়ে বসলাম। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটা মেয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত দিয়ে গেল। সামনের দেয়ালে স্ত্রীর ছবিতে মালা দেওয়া। ‘বউদি চলে গেছেন কতদিন হল?’ আমিই কথাটা শুরু করলাম। চশমার ফাঁক দিয়ে একবার স্ত্রীর ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঋতু তখন সবে গ্র্যাজুয়েট হয়েছে। তা বছর আটেক তো বটেই।’ ‘ও’ বলে থেমে গেলাম। তার মানে মেয়ের বয়স এখন প্রায় উনত্রিশ। দেখে বোঝার উপায় নেই। আর কোনও কথা না বাড়িয়ে মহীতোষদার হাত দুটো ধরে বলেই ফেললাম, ‘আমি জানি তুমি চুরি করোনি। সারা অফিস আজও বিশ্বাস করে তুমি চুরি করতে পারো না। তাহলে কেন এই মৌনতা? কেন সত্যি কথাটা বলছ না?’ মুখে অভিমান জমা করে মহীতোষদা বলল, ‘এর আগে তো জানতে চাসনি! আজ আমি ডাকলাম বলে জানতে চাইছিস?’
— ডাকলে! মানে!
-বাঃ! আজ সকালেই তো ফোন করেছিলাম তোকে। ভেবেছিলাম শনিবার তুই বাড়িতেই থাকবি। কিন্তু দেখলাম তোর বউ ফোন ধরল।
আমার কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ। বললাম, ‘মৃন্ময়ী ফোন ধরেছে?’ মহীতোষদা জোরের সঙ্গে বলল, ‘হ্যাঁ। ও-ই তো বলল যে তুই নাকি একটু বেরিয়েছিস! তা ভাবলাম দোকান-টোকান গেছিস বুঝি। তাই তোর বউকেই বললাম যে, তোকে বলে দিতে, তুই যেন আজকেই আমার বাড়ি আসিস। ঠিকানাও বললাম। সেই দেখেই তো এলি না কি?’ বাইরে সন্ধে নেমে গেছে। ঝিঁঝির ডাক শোনা যাচ্ছে, নাকি কানের ভিতরটা ভোঁ-ভোঁ করছে! ‘একটু আগেও মৃন্ময়ীর সঙ্গে কথা হল। ও তো কিছু বলল না! তা ছাড়া আমার নতুন নম্বর তুমি পেলে কোথা থেকে?’
— নতুন নম্বর! আমি তো তোর আগের নম্বরেই… মানে আমার কাছে সেই প্রথম থেকেই যেটা ছিল।
— না মহীতোষদা। সেই নম্বর, সেই ফোন হয়তো এখনও তেরো নম্বর ফ্লোরেই…
আমার কথা শেষ হবার আগেই মহীতোষদা আতঙ্কে বলে উঠল, ‘সর্বনাশ!’!!
— কী হয়েছে? কীসের সর্বনাশ? প্লিজ একটু খোলসা করে বলবে? আমি আর এত হেঁয়ালি নিতে পারছি না দাদা। ঘরে কোনও উজ্জ্বল আলো জ্বলছিল না। একটা হলুদ রঙের আলো জ্বলছিল মাত্র। সে আলোতেই স্পষ্ট বুঝলাম মহীতোষদার গা থেকে ঘাম ভাঙতে শুরু করেছে। দাদা নিজেই উঠে গেল। রেগুলেটর ঘুরিয়ে পাখা বাড়াল। তারপর নিজের বালিশের তলা থেকে দুটো ডিভিডি বের করে আমার হাতে দিল। বলল, ‘এগুলো দেখিস।’
— কীসের ডিভিডি এগুলো?
আমার প্রশ্ন শুনে খানিক মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেই আমার হাত থেকে একটা ডিভিডি নিয়ে মুখের দিকে চেয়ে বলল, ‘চালাচ্ছি। দেখ কিছু চিনতে পারিস কি না।’
বাড়ির বাইরে ঘন অন্ধকার। মফস্সলের দিকে বলে একটু চুপচাপ। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যেই সিল্যুয়েটে বসে থাকা একটা মেয়ে গান ধরল, রক্তকরবীর গান, ‘যুগে যুগে বুঝি আমায় চেয়েছিল সে, সেই যেন মোর পথের ধারে রয়েছে বসে…।’ মিউজিক শুরু হতেই সুরেলা কণ্ঠের সঙ্গে সামনে এল তার মুখ। খোঁপায় ফুল জড়ানো। ফরসা। পানপাতার মতো মুখের গড়ন। আঁকা ভ্রূ-র মাঝখানে ডাগর দুটো চোখ। পাতলা ঠোঁট দুটোর মাঝে বাঁধানো দাঁতের সারি হাসিটাকে যেন আরও মোহময়ী করে তুলেছে। ক্যামেরা ঘুরে চলেছে। কখনও তার ঘিয়ে শাড়িতে লাল-হলুদ-সবুজ ঢাকাই কাজের পাশ থেকে, কখনও বা ঠোঁট আর চোখের ক্লোজ আপে তার প্রেমের রবীন্দ্রসংগীতের মোহমাধুরী ছড়িয়ে পড়ছে। ‘শুক্লরাতে সেই আলোকে দেখা হবে এক পলকে, সব আবরণ যাবে যে খসে। সেই যেন মোর পথের ধারে রয়েছে বসে।’ গান শুনতে শুনতেই আনমনে বললাম, ‘কোথাও একটা দেখেছি এনাকে।’ মহীতোষদা গম্ভীর গলায় বলে উঠল, ‘তিলু। তিলোত্তমা মজুমদার।’ গানটা প্রায় শেষের দিকে। হঠাৎ একটা শটে চোখ আটকে গেল। মহীতোষদাকে তড়িঘড়ি থামাতে বললাম। পজ করল ওই শটে। ক্যামেরাটা পাশের তবলা থেকে প্যান করে গায়িকার হাতের কাছে যেতেই আমি আঁতকে উঠি। ‘এই তো, এই তো সেই রঙিন পাথর বসানো চুড়ি! আমি আর আবির এইটাই দেখেছি।’ ‘তুই আর আবির।’ মহীতোষদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আমার আর আবিরের দেখা দেয়ালে ঝুলে থাকা সেই রক্তাক্ত হাতটার কথা বলি। মাথা নীচু করে দাদা বলল, ‘সব বুজরুকি। সব শালা বুজরুকি। খালি টাকা খেঁচার ধান্দা!
-না মহীতোষদা বুজরুকি নয়। সত্যি বলছি।
আগুপিছু না ভেবে মরিয়া হয়ে বলে উঠি আমি। দাদা আমায় থামিয়ে বলে, ‘তোরা নোস। তোরা আর কী বুজরুকি করবি! তোরা তো শিকার মাত্র।’ একের পর এক রহস্য দানা বেঁধেই চলেছে মহীতোষদার কথায়। আমি সত্যিই আর নিতে পারছিলাম না। আমি স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারছিলাম কেউ যেন আমাদের চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। অল্প আলোয় কারও ছায়া চোখে পড়ে কিনা সেটাই দেখবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তেমন লক্ষণীয় কিছু দেখলাম না। ‘এর সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক দাদা? একটু বলুন না। বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘর করি। আমারও ভয় লাগে।’ ধমকে উঠল মহীতোষদা, ‘খবরদার না। একদম নয়। একটা কথা মনে রাখিস। যত ভয় পাবি তত তুই একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবি। আর ভয়কে যত ফেস করবি, ভয়ের মুখোমুখি হবি, ততই জানবি কেউ তোর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।’ জানলার বাইরে আলো-ছায়ায় কিছু যেন নড়ে উঠল।
— কে? কে ওখানে?
মহীতোষদা দুম করে পর্দা সরিয়ে দেখল কিছু নেই। আমিই বললাম, ‘না না। আমারই ভুল। হাওয়ায় গাছটা নড়ে উঠল বোধহয়।’ মহীতোষদা বিছানায় এসে বসল। আমি বললাম, ‘আচ্ছা মহীতোষদা, এই মহিলার সঙ্গে আমার শত্রুতা কোথায়? আমি তো ওকে চিনিও না।’ খাটের গায়ে হেলান দিয়ে একটু রিল্যাক্স হয়ে দাদা বলল, ‘তোর শত্রু কে জানিস?’
— কে?
-তোর নাম।
-মানে?
— প্রথমদিন লিফটে যখন তোর নাম শুনি তখনই আমার ভিতর ভিতর খচখচ করেছিল। সেই অস্বস্তিটা আরও বাড়ল যখন তুই পঁচিশ ভেবে তেরো নম্বর ফ্লোরে চলে যাচ্ছিলি। তখনই বুঝেছিলাম। ও ঠিক তোর নাম শুনেছে। তাই তোকে টানছে। এবার থেকে রোজ তোকে টানার চেষ্টা করবে।
— ও মানে?
— তিলোত্তমা।
— অ্যাঁ?
‘আজ থেকে বছর পনেরো আগের কথা।’ মহীতোষদা বলতে শুরু করল।
— আমি আর তিলোত্তমা একসঙ্গে জয়েন করি এই চ্যানেলে। আমি তখন ইন হাউস শুটিং সুপারভাইজার।
টেকনিক্যাল চেকও করতে হত। আর তিলু, মানে তিলোত্তমা কপি রাইটার ছিল। ভারি মিঠে হাত ছিল মেয়েটার। অফিসের কেউ জানতই না তিলোত্তমার গানের কথা। একদিন অফিস ফাঁকা হয়ে গেছে। প্রায় সকলেই চলে গেছে। থাকার মধ্যে আমি আর দু-তিনজন। হঠাৎ শুনি কোথা থেকে একটা মেয়ের গলায় গান ভেসে আসছে। রবীন্দ্রসংগীত। বড়ো মায়াবী সেই সুর। তা সেই সুরের উৎস খুঁজতে খুঁজতে এক জায়গায় পৌঁছোই। কিউসি রুমের পাশেই একটা বন্ধ দরজা আছে। আজ সেটা বন্ধ কিন্তু তখন ওটা খোলাই থাকত। অফিসের পিছনদিকের ওই দরজা দিয়ে ঢুকলেই একটা বিশাল ফ্লোর। একটা পাশে দেয়াল গাঁথা। বাকি দু-পাশে প্লাইয়ের নকল দেয়াল তুলে স্টুডিয়ো বানানো হয়েছিল। ওখানেই ইন হাউস শুটিং হত প্রভাতি সংগীতের।
মহীতোষদা বলে চলেছে। ডুবে যাচ্ছে অতীতে। আমি যেন সিনেমার মতো নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি সব। শুনতে পাচ্ছি মিঠে গলার গান, ‘কে উঠে ডাকি মম বক্ষনীড়ে থাকি।’ খুব অল্পশ্রুত রবীন্দ্রসংগীত। ওই ফাঁকা ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শুটিংয়ের সরঞ্জাম। সেসব ফেলে সোজা ফ্লোরের শেষ মাথায় যেখানে সিমেন্টের দেয়াল গাঁথা সেইখানের বড়ো জানলাটা খুলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুই ছায়ামূর্তি। মেয়েটা তিলোত্তমা। ও-ই গান গাইছে এক মনে। বাইরে থেকে জ্যোৎস্নার আলো এসে উছলে পড়েছে তিলুর মুখে। আর ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক পুরুষ। মহীতোষদা এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ কীসে যেন পা লেগে শব্দ হয়। গান থামিয়ে চমকে তাকায় তিলু। বলে ওঠে, ‘কে?’ মহীতোষ গলা খাঁকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দেয়, ‘আমি রে তিলু। সরি, তোদের রসভঙ্গ করে দিলাম।’ খোলা চুল মুখের এপাশ থেকে ওপাশে নিয়ে তিলোত্তমা বলল, ‘আরে না না ধুর! দেখো না মিহিরের যত অদ্ভুতুড়ে আবদার। চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে ওকে গান শোনাতে হবে।’ ছদ্মহাসি হেসে মহীতোষ বলে, ‘আহা তা বেশ তো। এত ভালো গলা তোর। আচ্ছা মিহির…!’
‘হ্যাঁ মহীতোষদা’… মিহিরের গায়ের চাপা রঙে চাঁদের আলো পড়ে বেশ প্রেমিক-প্রেমিক লাগছে। মাথায় ঘন চুলে ছোটো ছোটো ঢেউ। মহীতোষ বলে, ‘আমাদের এই প্রভাতি সংগীতে তিলুকে দিয়ে ক-খানা গান গাওয়ালে কেমন হয়?’ —তুমি আবার শুরু করলে! মিহির এসব একদম কানে নিয়ো না তো। মহীতোষদার যত পাগলামি।’ তিলোত্তমা লজ্জা মেশানো ছদ্ম রাগ দেখাল। মিহির মহীতোষের তালে তাল দিল। হালে পানি না পেয়ে তিলু বলল, ‘বেশ। আমি করব। তবে একটাই শর্ত। আমার এপিসোডে ক্যামেরা কোনও অ্যাসিস্ট্যান্ট করবে না। করবে স্বয়ং চিফ ক্যামেরা পার্সন মিস্টার মিহির চ্যাটার্জি।’
সেই শুরু। শুটিং হল পরপর চারটে এপিসোডের। প্রশংসাও পেল খুব। শুটিংয়ের ক্রু মেম্বারদের মধ্যে অনেকেই তিলোত্তমার ফ্যান হয়ে গেল। তাদের মধ্যে কেউ আবার বিশেষ ভক্ত হবার চেষ্টাও করল। কিন্তু তিলু তাদের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয়নি। তার মনপ্রাণ জুড়ে ছিল শুধু একজনই, মিহির। মহীতোষ যেহেতু শুটিং সুপারভাইজার তার পারমিশন ছাড়া ক্যামেরাম্যান কোথাও যেতে পারবে না। তাই তিলু আলাদা করে কতদিন আদুরে গলায় আবদার করেছে মহীতোষকে যাতে মিহিরকে একটু ছেড়ে দেয়। হয় সিনেমা, নয়তো গঙ্গার ঘাটে হাওয়া খেতে যাবে ওরা। মহীতোষ মজা করে বলত, ‘আমার চাকরি গেলে খাওয়াবি তো?’ তখন তিলু মহীতোযকে জড়িয়ে ধরে গেয়ে উঠত, ‘এমন বন্ধু আর কে আছে? তোমার মতো মিস্টার। কখনও বা ডার্লিং, কভু তুমি…।’ বাকি গান গাইবার আগে মহীতোষ বলে উঠত, ‘জুতো খুলে ক্যালাব। দূর হ। পাঁচটার মধ্যে ফিরবি। নইলে জবাবদিহি করতে হবে।’
তিলু ‘ওকে স্যার’ বলে স্যালুট ঠুকল। মহীতোষ হঠাৎ বলল, ‘এই দাঁড়া দাঁড়া।’
-আবার কী হল মহীদা?
— তোর হাতটা দেখি। বলেই তিলুর ডানহাতটা টেনে দেখল ফরসা হাতে নানান রংচঙে পাথরে ঝলকাচ্ছে একটা সুন্দর চুড়ি। চশমার ওপর চোখ তুলে মহীতোষ বলল, ‘এটা কবে হল?’ তিলুও গলা ফুলিয়ে বলল, ‘এই তুমি এপিসোড দেখো বসে বসে! আমার ফার্স্ট এপিসোড থেকেই তো এটা পরে আছি। দেখোইনি!’
— তা কে দিল?
লজ্জা পেয়ে শরীরটাকে দুলিয়ে তিলু বলল, ‘ও।’
— ও!
খানিকটা তিলুকে ভেঙিয়েই মহীতোষ কথাটা বলল। তিলুর হাসি দেখে গম্ভীর হয়ে মহীতোষ জানাল, ‘মোটেই ভালো কাজ করেনি তোমার ও।’
— কেন?
-সারা দুনিয়ায় দেওয়ার মতো কিছু পেল না? শেষে কিনা চুনি, রুবি, মুক্তো এইসব পাথর বসানো চুড়ি?
— তাতে কী?
-সব পাথর সবার জন্য নয় তিলু। পারলে ওটা ভালোবেসে চুমু খেয়ে সিন্দুকে ভুলে রেখো।
তিলোত্তমা মুখ ব্যাজার করে বলল, ‘ও নো মহীদা। আবার শুরু করলে জ্যোতি চর্চা? যতসব ভুলভাল। শোনো, যত খারাপই হোক, মনে সাচ্চা প্রেম থাকলে সব খারাপ ভালো হয়ে যায়। আর এটা আমায় মিহির দিয়েছে। মিহির। ওর দেওয়া একটা রুমাল ও যদি আমার সঙ্গে থাকে তাহলে মনে হয় মিহিরই আমার সঙ্গে আছে। আরও একটা জিনিস আছে।’
শেষ কথাগুলো গলা চেপে বলল তিলু। বলেই চুড়িদারের ওড়নাটা গলার কাছ থেকে নামাল। মহীতোষ দেখল, তিলোত্তমার গলায় সোনার চেনে ঝলমল করছে মিহিরের নাম লেখা সোনার লকেট। মহীতোষ হালকা হাসল। তিলুর মাথায় আশীর্বাদের হাত রেখে খানিকটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। আবেগ চেপে রেখেই বলল, ‘যাহ, পালা এখন।’ তিলোত্তমা খুশিতে খানিক লাফিয়ে উঠে বেরিয়ে গেল। দরজাটা দম করে বন্ধ হল।
অতীতের নিস্তব্ধতাকে খান-খান করে ভেজানো দরজা ঠেলে ঢুকে এল ঋতু। আমরা দু-জনেই চমকে উঠেছিলাম। আসলে আমাদের দিনগুলো কেমন যেন আতঙ্কে কাটছে। ঋতুর হাতে প্লেট ভরতি মিষ্টি আর শিঙাড়া।
— ওরে বাবা এত কী?
আমার কথা শুনে মহীতোষদা বলল, ‘খা খা। ঋতু খুব ভালো শিঙাড়া ভাজে।
— ও তাই নাকি! তাহলে তো নিশ্চয়ই খাব।
মুখে খাব বললাম বটে, কিন্তু আমি জানি গলা দিয়ে কিচ্ছু নামবে না আমার মৃদু হেসে ঋতু বিদায় নিল। সন্ধে এখন রাতের দিকে গড়াচ্ছে। কথা শেষ হতে দেরি হলে রাতের ট্রেনটা মিস করব। এমনিতে খুব একটা চিনি না এদিকটা। তাই আর অন্য কথায় না গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলাম, ‘মিহিরও কি আমাদের চ্যানেলেই কাজ করত? ‘
চোখ থেকে চশমাটা খুলে বিছানায় রেখে মহীতোষদা বলল, ‘বলতে পারিস। আসলে তখন কিছু প্রোগ্রাম ইন-হাউসই হত। তাই কিছু ক্যামেরাম্যান, লাইটের লোকজনকে চ্যানেল রেখেছিল। তবে কন্ট্রাক্টে।’
— মিহিরের কেমন বয়স ছিল?
— তিরিশ-বত্রিশ হবে।
— আর তিলোত্তমা?
— ছাব্বিশ-সাতাশ।
— ভালোই তো চলছিল সব।
-হুম। তোর মতো, আর সবাইয়ের মতো আমিও সব ভালো দেখতে গিয়ে কালোর দিকটা দেখতে পাইনি।
— মানে?
সেদিন প্রভাতি সংগীতের একশো পর্ব চেক করছিল মহীতোষ। ঝরনার মতো উচ্ছল আনন্দ নিয়ে ঘরে ঢুকে এল তিলু, ‘এই যে ভণ্ড জ্যোতিষ।’ মহীতোষ তিলুর দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘না জ্বালিয়ে কী বলতে এসেছিস সেটা বলে দূর হ।’ নহীতোষের চেয়ারটাকে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল তিলু। ‘উফ, এবার না আমি তোর নামে বসের কাছে কমপ্লেন করব। দিন দিন বাচাল হয়ে যাচ্ছিস। কী হয়েছে কী?’ খেপে গিয়ে বললেও মহীতোষের কথাগুলোকে তিলু পাত্তাও দিল না। বরং একটা চিরকুট হাতে ধরিয়ে বলল, ‘একটু করে দেবে গো? আমার জন্য না। শিলিগুড়ি থেকে বাবা-মায়ের কড়া হুকুম। নইলে বিয়ে ক্যানসেল।’ চিরকুট খুলে মহীতোষ দেখে তিলোতনা আর মিহিরের নাম, জন্মের তারিখ সব লেখা আছে। ‘প্রেম-ট্রেম করে যোটক বিচার? এর কোনও মানে হয়?’ মহীতোষের কথায় বেশ খুশিই হয় তিলু। সে বলে, ‘সেটা বাবা-মাকে কে বোঝাবে?’
— এর পর যদি উলটো-সিধে কিছু বেরোয় তখন! না না। এ আমার দ্বারা হবে না।
— মহীদা প্লিজ। তুমি ছাড়া আর কাউকে আমি ভরসা করতে পারব না। এটা তুমি করে দাও। তোমার সাম্মানিক নিয়েই তুমি করো।
— ব্যাপারটা সাম্মানিকের নয় তিলু। আচ্ছা ধর, যদি বুঝি তোদের বিয়ের কোনও যোগই নেই, তাহলে কী করবি? বিয়ে করবি না?
তিলুর মুখটা কঠিন হয়ে যায়। চোখদুটো আরও প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে। সে বলে, তুমি শুধু এটা বিচার করে দাও। যা হবে তাই বোলো। আমি বাবা-মাকে যা বলার বলে দিয়েছি।’
— কী বলেছিস?
— কপালে আমার যাই লেখা থাকুক, মিহিরকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। আর মিহির অন্য কারও সঙ্গে সংসার করবে এটা আমি হতে দেব না।
তিলোত্তমার ধনুক ভাঙা পণ মহীতোষের কাজটাকে আরও কঠিন করে দিল। মুখে কিছু বলল না। শুধু বলল, ‘দেখছি। হলে জানাব।’
তিলু মহীতোষের দুটো হাত ধরে আবার সেই আগের মতো উচ্ছল সুরে বলে ওঠে, ‘বাঁচালে ভণ্ড জ্যোতিষ। চুমু চুমু। যাই এখন। ওদিকে চারখানা ক্যাপশন ভাবতে হবে।’ তিলু বিদায় নিল। মাঝে শুধু পাঁচ সেকেন্ডের ব্যবধান। তিলুর ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল মহীতোষ। হঠাৎ তার কাঁধে হাত রাখল একজন। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল মহীতোষ, ‘বরেন! কিছু হয়েছে নাকি শুটিংয়ে?’ সরু ফ্রেমের চশমাটা চোখ থেকে নামিয়ে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে একটু চোখ কচলে বলল, ‘না না। ওদিকে সব ঠিক আছে।’ অবাক মহীতোষ মনিটরের দিকে ফিরল। বলল, ‘তবে! হঠাৎ আমার কাছে এলে! কোনও দরকার?’
— তোমাকেই এখন আমার সবথেকে বেশি দরকার মহীদা।
-আধঘণ্টার মধ্যে প্রভাতি সংগীতের এই একশো পর্ব ছাড়তে হবে আমায়। যা বলার একটু তাড়াতাড়ি বলো বরেন। তা ছাড়া শুটিং চলছে। এখুনি লাইট চেঞ্জ করতে হবে। তুমি ফ্লোর ছেড়ে…
কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মহীতোষের কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল, ‘বরেন রায় কাজে ফাঁকি দেয় না মহীদা।’ মহীতোষ যেন একটু থমকাল। গলা চেপে বলল, ‘কী হয়েছে কী?’ এর পরেই বরেন যে কথাটা ফস করে বলে বসল তাতে মহীতোষ কিছুটা ব্যোমকে গেল। বরেন বলল, ‘ওই যোটক বিচারটা করবে না তুমি।’
— মানে?
-তিলোত্তমাকে আমি ভালোবাসি। বিশ্বাস করো। পাগলের মতো ভালোবাসি। ফাজলামি করছ নাকি?
-না মহীদা। আই অ্যাম সিরিয়াস।
-তিলু জানে?
-জানে। তবে স্বীকার করে না। কিন্তু এসব নিয়ে ভেব না তুমি। আমাদের ব্যাপারটা ঠিক সালটে নেব।
মহীতোষের ভ্রূ কুঁচকে গেল বরেনের ‘সালটে নেব’ শব্দটা শুনে। খানিক রেগেই বলল, ‘এ কী মাল কেনাবেচা নিয়ে গণ্ডগোল নাকি? সালটে নেব! ছিঃ!’
— বলছি না তুমি এ-ব্যাপারে ঢুকো না। তিলু ঠিক বুঝবে।
-ও মিহিরকে পাগলের মতো ভালোবাসে। আর যতদূর বুঝেছি মিহিরও তিলুকে…। তা ছাড়া ওদের মধ্যে বিয়ের কথা হচ্ছে।
— ওটাই তো বলছি। ওই যোটক বিচারে তুমি কিছু একটা বলে ভয় দেখিয়ে দাও। তাহলে ওরা আর…
— শাট আপ।
মহীতোষ থামিয়ে দিল। বলল, ‘আড়ি পেতে যখন এতটা শুনেছ, তখন এটাও নিশ্চয়ই শুনেছ যে তিলু মিহিরের সম্পর্কে কী বলেছে? ওরা কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচবে না। আর আমিও মিথ্যে কথা বলতে পারব না।’ বলেই রিভলভিং চেয়ারটাকে গায়ের জোরে মনিটরের দিকে ঘুরিয়ে বললাম, ‘এবার বিদেয় হও।’
— মহীদা প্লিজ তুমি….
বরেনের কথার ওপর দিয়ে মনিটরটা সশব্দে চলতে শুরু করে। বরেনের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
খালি গায়ে গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ঝুলিয়ে নিজের বাড়ির ঠাকুরঘরে বসে ছক আঁকতে থাকে মহীতোষ। খুব ভালো করে মেলায়। মাঝে চশমাটা খুলে চোখ দুটো ভালো করে মুছে আবার দেখতে শুরু করে। ভ্রূ দুটো কুঁচকে যায় মহীতোষের। তারপর সামনে সিংহাসনে রাখা নানান ঠাকুরের ছবি ও বিগ্রহের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলে ওঠে, ‘ঠাকুর!’ ঢোক গেলে মহীতোষ।।
তারপর একদিন…
প্রভাতি সংগীতের শুটিং চলছে। এক গায়িকা গান গেয়ে চলেছে, ‘এ সুখ ধরণীতে কেবলই চাহ নিতে, জানো না হবে দিতে আপনায়। সুখের ছায়া ফেলি কখন যাবে চলি, বরিবে সাধ করি বেদনায়।’ ট্রলিতে ক্যামেরা। ভিউ ফাইন্ডারে মিহিরের চোখ। গান শেষ হতেই পুরুষ পরিচালকের গলার ওপর ছাপিয়ে যায় তিলোত্তমার গলা। চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘কাআআআআট। সবাই চমকে ওঠে আলোর উলটোদিকে থাকা তিলুকে দেখে। হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে আলোর মধ্যে এসে দাঁড়ায় তিলোত্তমা। মনিটরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বরেন খেয়াল করে তিলুকে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মহীতোষ বলে ওঠে, ‘দেখো মেয়ের কাণ্ড। কী যে করিস তিলু।’ পাশ থেকে ডিরেক্টর বলে, ‘অসুবিধে নেই মহীতোষদা। আজকে পরের আর্টিস্ট ক্যানসেল হয়েছে। পেট খারাপ।’ তিলু সানন্দে বলে ওঠে, ‘ভাগ্যিস।’ বলেই দু-তিন পা মিহিরের দিকে এগিয়ে যায় তিলু। ইতিমধ্যে উপস্থিত আর্টিস্ট পাশ দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যায়। হাতে ঝোলানো প্যাকেটটা মিহিরের দিকে বাড়িয়ে সকলের সামনে বলে ওঠে, ‘হ্যাপি বার্থ ডে মিহির।’ সবাই হোওওও করে চিৎকার করে ওঠে। হাততালি দেয়। শুভেচ্ছা জানায় মিহিরকে। দুরে দাঁড়িয়ে আনমনে মিহির আর তিলোত্তমার খুশি মুখদুটো দেখতে থাকে মহীতোষ। ওদিকে বরেনের কানের কাছে কালো মতো লোকটা বলে, ‘আদিখ্যেতা দেখেছেন স্যার। যেন সুচিত্রা সেন উত্তমকুমারকে উইশ করছে।’ বরেন কোনও কথা না বলে কঠিন দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকায়। তারপর মহীতোষের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু কিছু বলে না। মহীতোষ কিছু একটা আঁচ করতে পারে। চাপা গলায় বরেনকে বলে, ‘রাজযোটক।’ বরেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে যায়। ওদিকে তিলুর দেওয়া উপহারটা অন্য একজন খুলে ফেলে সকলের সামনে। চুনে হলুদের ওপর মেরুন দিয়ে কাজ করা অপূর্ব একটা পাঞ্জাবি। তিলু লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মিহিরকে জিজ্ঞেস করে, ‘পছন্দ?’ মিহির বলে, ‘এই সারপ্রাইজের জন্যই কাল রাত বারোটার পর থেকে কোনও যোগাযোগ নেই তাই তো?’ তিলু একটু আহ্লাদি ভাব এনে চোখ টেপে। মহীতোষ ফ্লোর থেকে বেরিয়ে যায়।
‘যোটক বিচারে কী দেখেছিলে তুমি?’ আমার কথায় চটক ভাঙে মহীতোষদার। অতীতের কবর খুঁড়তে খুঁড়তে কোন অতলে যেন তলিয়ে গিয়েছিল মানুষটা। থতোমতো খেয়ে বলল, ‘বরেনকে মিথ্যে বলেছিলাম। আমি চাইনি বরেনের সঙ্গে তিলুর বিয়ে হোক। শিক্ষাদীক্ষা, কালচার সবেতে আলাদা ছিল বরেন আর তিলু। তা ছাড়া তখন বরেন কী যেন একটা ভুলভাল কেসে ফেঁসেও ছিল। কিন্তু সত্যি কথাটা তিলুকেও জানাতে পারিনি। সেই সময়টাই পাইনি।’
— কী সেই সত্যি?
-মনের মিল থাকলেও এই বিয়েতে বিশাল বাধা পেয়েছিলাম। অসম্ভব ছিল মিহির আর তিলুর বিয়ে।
— কেন? খারাপ কিছু…
-গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ঠিক ছিল না। তবে এই সময় আমি আর-একটা ভুল করেছিলাম। ওদের পুরো ছকটাই আমার কাছে ছিল, কিন্তু আমি শুধু ওদের বিয়েটাই দেখেছিলাম। আর অন্য কিছু দেখিনি। দেখলে হয়তো সেদিন অত বড়ো সর্বনাশটা না-ও ঘটতে পারত। অন্ততপক্ষে আমি একটা চেষ্টা করতে পারতাম আটকাবার। যদিও ভবিতব্যকে তো আর বদলানো যায় না। উফ, সেদিনের কথা ভাবলেও আমার গা শিউরে ওঠে।
— কোন দিন?
-ওই মিহিরের জন্মদিনের দিনই। সেদিন আমার শরীরটা ভালো লাগছিল না। তাই আর রাত করিনি। তখন কটা হবে? সাতটা বেজে গেছে। সঠিক সময়টা মনে নেই। বয়স হচ্ছে, সব গুলিয়ে যাচ্ছে। তা যাই হোক, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আমি সবে আমার ঘর থেকে বেরিয়েছি, দেখি তিলু ব্যাক কনফারেন্সের দিকে যাচ্ছে।
‘ব্যাক কনফারেন্স?’ মহীতোযদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে উদ্গ্রীব হয়ে বলে উঠি। দাদা মুখে একটু হাসি নিয়ে বলে, ‘ওই যেটা শুটিং ফ্লোর ছিল অফিসের, ওটাকেই আমি আর তিলু তামাশা করে ব্যাক কনফারেন্স বলতাম। অফিসের পিছনদিকটায় কিনা, তাই। শুটিং না থাকলে বা প্যাক আপের পর ওটাই ছিল তিলোত্তমা আর মিহিরের প্রেম করার জায়গা। চোখের সামনে একবালকে দেখলাম মল্লিকা ম্যাডাম আমায় বলছেন, ‘আজ ঠিক সন্ধে সাড়ে সাতটায় তোমার সঙ্গে আমি একটু বসব… ব্যাক কনফারেন্স রুমে।’ মল্লিকা ম্যাডামের গলার শব্দগুলো এখন কেমন ঘোলাটে ঘোলাটে লাগছে।
‘মিহির, মিহির… এই মিহির!’ শরীরটা ঝাঁকিয়ে উঠতেই মহীতোযদার দিকে ফিরি ‘কী ভাবছিস?’ মহীতোষদার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে বলি, ‘কিছু না, তুমি বলো।’ মহীতোষদা বলতে শুরু করলে আমার চোখে যেন অতীতের জলছবিগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মহীতোষের মুখোমুখি তিলু। ‘কী রে তিলু বাড়ি যাসনি?’ কথা বলল না তিলু। মুখটা থমথমে। চোখদুটো ফোলা। ‘শরীর খারাপ নাকি? কেমন যেন লাগছে তোকে!’ মহীতোষের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিলু বলল, ‘বাড়ি যাচ্ছ?’
— হুম। শরীরটা ঠিক জুতের লাগছে না। তাই…
তিলু যেন কেমন অন্য জগৎ থেকে উত্তর দিল, ‘যাও।’ বলেই ব্যাক কনফারেন্স রুম, মানে শুটিং ফ্লোরের ভিতর ঢুকে গেল। মহীতোষ ভাবছিল, তিলু এই বুঝি যোটক বিচারের ফলাফল জানতে চাইবে। কিন্তু সেটা তিলুর মনে নেই দেখে তৎক্ষণাৎ সেই স্থান ছেড়ে লিফটে আসে। সত্যিটা বলতে তারও কষ্ট হচ্ছে। পঁচিশ নম্বর ফ্লোর থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামতে-উঠতে বেশ সময় নেয় লিফটগুলো। দুটোতেই নীচে নামার বোতাম টিপে রেখেছে। এবার দেখা যাক কোনটা আগে আসে। তার ওপর এই সময়ে বেশ ভিড় থাকে। যদিও এই বিল্ডিংয়ে এখনও সব তলায় অফিস বসেনি। দু-তিনটে ফ্লোর এখনও ফাঁকা। মহীতোষ একটা লিফটে উঠতেই দেখল উলটোদিকের লিফট থেকে বেরোল মিহির। মহীতোষ হাসিমুখে আঙুল দেখিয়ে মিহিরকে জানিয়ে দিল তিলোত্তমার সন্ধান। মিহিরও এক গাল হেসে হাত নেড়ে বিদায় জানাল মহীতোষকে। এক- এক করে প্রায় সব কটা ফ্লোরে থামতে থামতে অবশেষে গ্রাউন্ড ফ্লোরে থামল লিফট। যে ফ্লোরে অফিস নেই কিন্তু অফিস তৈরির কাজ চলছে সেইখান থেকেও লোক উঠল। নীচে পৌঁছে রীতিমতো ক্লান্ত মহীতোষ। কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরোতেই তার কানে এল প্রচুর লোকের গুঞ্জন। কিছু মানুষ আবার ছুটে একটা নির্দিষ্ট দিকে যাচ্ছে। মহীতোষও কী হয়েছে দেখার জন্য সন্দিগ্ধ মনে এগোল। যতই কাছে এগোতে থাকল ততই লোকের ‘হায় হায়, ইশশ কী অবস্থা’ এইরকম সব টুকরো কথা কানের কাছে প্রকট হতে থাকল। ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই মহীতোষের মনে হল তার হৃৎপিণ্ডটাকে কেউ যেন একটা বিশাল ভারী পাথর দিয়ে থেঁতলে দিল। চশমার আড়াল থেকে ঝরঝর জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। মহীতোষ বুঝতে পারল সে শরীরের ভার ধরে না রাখতে পেরে মাটিতে বসে পড়েছে। ভিড়ের মধ্যে থেকে বেশ কিছু লোক তাকে একটানা বলে যাচ্ছে, ‘কী হল আপনার? আপনি কি একে চেনেন? কেউ হয় আপনার? শরীর খারাপ লাগছে?’ সব কথাগুলো যেন মহীতোষের ঘাড়ে, মাথায় উঠে দাপাদাপি করছে। অনেক কষ্টে ভয়ার্ত স্বর গলা দিয়ে বেরিয়ে এল মহীতোষের, ‘তিলু! তিলু!’
মহীতোষের সামনেই থেতলে যাওয়া রক্তাক্ত শরীর নিয়ে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছে তিলোত্তমা। নিথর চোখ দুটো বড়ো করে খোলা ওপরের দিকে। পঁচিশ নম্বর ফ্লোরে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে যেন দেখছে সে। হাতে নানা রঙের পাথর বসানো চুড়ির ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। ওপর থেকে পড়বার সময় তিনতলার কাচের টেরেস মতো জায়গাটা ভেঙে নীচে পড়েছে সে। তাই শরীরটাও ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। শরীরের মাংসে কোথাও কোথাও টুকরো টুকরো কাচ গেঁথে আছে তিলুর। মহীতোষ জ্ঞান হারায়।
মহীতোষদাকে দেখে মনে হল, এই বারো-তেরো বছর পরেও ক্ষতবিক্ষত অতীতটা কাচের টুকরোর মতোই তার মনে গেঁথে ছিল। আমায় বলতে বলতে এখন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে সেই যন্ত্রণা। মহীতোষদার বুকে হাত বুলিয়ে বললাম, ‘কষ্ট হলে আর বলতে হবে না তোমায়।’ সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত ধরে দু-চোখে অজানা ভয় নিয়ে বলে উঠল, ‘না না। বলতে হবে। তোকে জানতেই হবে। শরীরের যা অবস্থা এখন না বললে কী জানি আর বলার সময় পাব কি না।’
— কী যা তা কথা বলছ? কী-ই বা এমন বয়স হয়েছে তোমার! রিটায়ার করতে এখনও বছর দেড়েক বাকি আছে মহীতোষদা।
দাদা ‘হুঁঃ’ করে হেসে ওঠে। তাতে শরীরটাও খানিক নড়ে। বলে, ‘জীবনের রিটায়ারমেন্ট কখন হবে কেউ বলতে পারে রে? চিন্তা শুধু একটাই। মেয়েটার বিয়ে দিতে পারলাম না এখনও। আমি চলে গেলে একা একা কী করবে কে জানে! ‘ আমি এবার ছদ্ম রাগ দেখিয়ে হালকা ধমকালাম, ‘ফালতু বোকো না তো! সত্তর বছরের বুড়োর মতো কথা বলছ। তোমায় খুব শিগগিরি চাকরি জয়েন করতে হবে। আমি সে ব্যবস্থা করব।’ চোখ দুটোকে কুঁচকে হেসে আমার মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে বলে, ‘পাগল ছেলে!’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস। নিজেই বলে ওঠে, ‘মিহিরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আসলে ঘটনার সময় ও একাই ওই ফ্লোরে ছিল। প্রথমে ভাবা হচ্ছিল সুইসাইড। কিন্তু কারণটা কী কেউ বুঝতেই পারছিল না। সকালেই অত আনন্দ করল মেয়েটা। হঠাৎ সন্ধেবেলা কী এমন হল যে তিলুকে আত্মহত্যা করতে হল? যদিও চিৎ হয়ে নীচে পড়েছিল, তাই পুলিশ প্রথমেই সন্দেহ করেছিল যে এটা মার্ডার। পোস্টমর্টেমে প্রমাণিতও হল তাই। খুন হয়েছে তিলোত্তমা। নিশ্চয়ই কেউ ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করিনি মিহির অমন কাজ করেছে। আজও করি না।’
— তাহলে করবেটা কে? ওখানে তো শুধু মিহিরই ছিল বললে।
মহীতোষদা নীরবে ঘাড় নেড়ে হাত উলটোয়। বুঝলাম তিলুর মৃত্যুটা আজও ওঁর কাছে ধোঁয়াশা। চুপ থেকে বলল, ‘এর পর যদি কিছু থাকে তাহলে সেটা একমাত্র একজনই জানে।’ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে?’ মহীদা বলল, ‘বরেন। বরেন রায়।’
-ও খুন করবে! ও কি খুব রগচটা ছিল?
‘না না। আমি তা বলছি না।’ খানিকটা হালকা হয়ে কথাটা বলে মহীতোষদা। ‘কোনও প্রমাণ বা ক্লু কিছুই নেই আমার কাছে।’
— বরেন এখন কোথায় মহীতোষদা?
-জানি না রে। ওর ব্যাপারে গত দশ বছরে কেউ কিছু আমায় বলতে পারেনি। একটা জলজ্যান্ত মানুষ কপ্পুরের মতো ভ্যানিশ হয়ে গেল। তিলু চলে যাওয়ার পর একদিন শুধু আমায় ফোন করেছিল বরেন। বলেছিল, সে যে তিলোত্তমাকে ভালোবাসত সেটা যেন আমি কাউকে না বলি। ভালোবাসাকে যখন পেলামই না তখন বেফালতু পুলিশের ঝামেলায় জড়িয়ে কী লাভ! বলেই ফ্যাচফ্যাচ করে ফোনে কেঁদে ফেলে। আমি আবার সান্ত্বনা দিয়ে বলি যে কাউকে কিচ্ছু বলব না।
— তুমিও চেপে গেলে পুলিশের কাছে?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু অফিসে মিথ্যে বললে কেন? কেন বললে যে এই চারটে এপিসোড খারাপ! চললে নাকি অফিসের বদনাম হবে! আর কেনই বা ওই ক্যাসেটগুলোর রিল কেমিক্যাল দিয়ে পুড়িয়ে দিলে?
মহীতোষদা বলে, ‘তিলু মারা যাওয়ার পর মিহিরকে নিয়ে পুলিশ অনেক টানাহ্যাঁচড়া করে। প্রায় মাস ছয়েক পর মিহিরের বিরুদ্ধে তেমন কোনও প্রমাণ জোগাড় করতে না পেরে পুলিশ ছেড়ে দেয় ওকে। ওর কেরিয়ারটা নষ্ট হয়ে যায়। তারপর একদিন খবর পাই মিহির নাকি আত্মহত্যা করেছে। মানে পুলিশ তাই বলেছিল। বাথরুমে ঢুকে ঘটনাটা ঘটিয়েছে। মিহিরের গলায় একটা লাল দাগও পাওয়া যায়। কিন্তু অদ্ভুত কাণ্ড জানিস! ওদের বাথরুমে গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলার কোনও জায়গা ছিল না। স্পট থেকে কোনও দড়িও পাওয়া যায়নি। আর বিষও খায়নি। তাহলে মরল কীসে? ওর বাড়ির লোক বলেছিল, জেল থেকে আসার পর সারাদিন ঘরেই নিজেকে বন্ধ করে রাখত মিহির। আর খুব ভয় পেত। খালি বলত, ও আমায় মেরে ফেলবে। ও আমায় শেষ করে দেবে। কেমন যেন পাগল-পাগল হয়ে গিয়েছিল।
-বুঝলাম। কিন্তু এর সঙ্গে এপিসোডগুলোর কী সম্পর্ক বুঝলাম না।
মহীতোষদা বিছানা ছেড়ে উঠে চশমাটা চোখে দিয়ে খোলা জানলার পাশে গেল। বাইরের দিকে এদিক-ওদিক দেখল। তারপর কী মনে হওয়াতে জানলার কপাট দুটো বন্ধ করে ছিটকিনি দিয়ে দিল। ঘরের বাকি জানলাগুলো বন্ধই ছিল। খাটে এসে বসে বলল, ‘প্রভাতি সংগীত একশো কুড়ি পর্বে বন্ধ হয়ে যায়। চ্যানেল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। কেন জানিস?’ আমি মাথা নেড়ে না বললাম। মহীতোষদা বলল, ‘ওই ফ্লোরে আর কেউ গান গাইবার, শুটিং করার সাহস করতে পারেনি। তিলু চলে যাবার পর থেকেই ওই ফ্লোরটাতে নানান ভৌতিক কাণ্ড হতে থাকে। দুজন গায়িকা শুটিং করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। একজনের গলা দিয়ে রক্ত উঠে আসে। একদিন গোটা একটা এপিসোডের রাশ নিজে থেকেই ডিলিট হয়ে যায়। তখন সকলেই কানাঘুষো শুরু করে দেয় যে ওই ফ্লোরে ভূত আছে। কেউ কেউ নাকি তিলুকেও দেখতে পেয়েছে। এতেও যখন চ্যানেল শুটিং বন্ধ করছে না, তখন একদিন শুটিং চলাকালীন একজন তবলিয়ার মাথায় ভারী লাইট ভেঙে পড়ে। তবলিয়াকে বাঁচানো যায়নি। বাড়ির লোক এসে চ্যানেলে তুমুল হুজ্জোত করে। হেডঅফিসে খবর যায়। বন্ধ হয়ে যায় প্রভাতি সংগীতের মতো জনপ্রিয় একটা অনুষ্ঠান। অফিসের ভিতরেও নানা ভৌতিক কাণ্ডের কথা চালু হয়ে যায়। ম্যানেজমেন্ট বাধ্য হয় এক তান্ত্রিক ও তার কিছু শাগরেদকে ডেকে পুজোপাঠ করাতে। ওরাই ওই ফ্লোরের দেয়ালে কীসব মন্ত্রতন্ত্র পড়ে হাবিজাবি লিখে যায়। আর তোর হাত লেগে যে ঘটটা উলটে পড়ে, ওটা রেখে যায়। বলেছিল, ওই ফ্লোরে যেন আর কিছু না-করা হয়, কেউ না যায়। আর এই ঘটে যেন কেউ কখনও হাত না দেয়। আরও একটা কথা জোরের সঙ্গে বলে। এই অফিসে তিলোত্তমার কোনও চিহ্ন রাখা যাবে না। তাহলে সমূহ বিপদ হবে। সেই থেকে বন্ধ হয়ে যায় তিলোত্তমা আর মিহিরের ব্যাক কনফারেন্স রুম। যতই তুমি মন্ত্র পড়ো, অতৃপ্ত আত্মা কি অত সহজে ছাড়ে রে? কিছুকাল ঘুমিয়ে থাকতে পারে। একেবারে যায় না।’ আমি যেন ঘোরের মধ্যেই বলে উঠি, ‘তাহলে পঁচিশ নম্বর ফ্লোর ছেড়ে কেন তেরো নম্বর ফ্লোরটাকেই বাছল তিলোত্তমা?’ ‘মানে?’ এবার মহীতোষদার অবাক হবার পালা। স্বাভাবিক। সেদিন আমি ঠিক কী দেখেছিলাম কাউকেই বলিনি। তবে মহীতোষদাকে কিছু না লুকিয়ে সব বলে দিলাম। আরও বললাম, ‘মৃত্যুর দিন তিলোত্তমার গায়ে একটা সাদা রঙের পোশাক ছিল তাই তো?’ মহীতোষদা অবাক হয়ে বলল, ‘সেটা তো তোকে আমি বলিনি। তুই কী করে জানলি?’ আমি গম্ভীর গলায় বললাম, ‘ওই অন্ধকারেও রক্তমাখা শরীরটা যখন আমার সামনে এসেছিল তখন তার গায়ে মনে হয় সাদা জামাই দেখেছিলাম।’
— ও আমার বাড়িতেও ওই পোশাকেই এসেছিল।
মহীদা বলে ওঠে।
— তোমার বাড়িতে কবে এসেছিল?
-মিহিরের মৃত্যুর মাসখানেক পর।
চমকে উঠি, ‘মানে?’ মহীতোষদা বলতে শুরু করে।
সেদিন মহীতোষ সবে সন্ধ্যাহ্নিক সেরে ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়েছে। হাতে কমণ্ডলু। গলায় রুদ্রাক্ষ। খালি গা। কোমরের নীচ থেকে লাল রঙের ধুতি। বেরিয়েই দেখে ঋতু দাঁড়িয়ে। মহীতোষ বলে, ‘কী রে মা, কিছু বলবি?’ আলো অন্ধকারে ঘাড় নাড়ে ঋতু। তারপর হাত বাড়িয়ে একটা চিরকুট বাবার হাতে দিয়ে বলে, ‘এটা একটু দেখে দেবে?’ ‘কী এটা?’ মহীতোষ চিরকুটটা খুলেই দেখে তাতে রক্ত দিয়ে তিলোত্তমা আর মিহিরের নাম আর জন্মতারিখ লেখা। মুহূর্তে মুখ তুলে মেয়ের দিকে তাকায়। দেখে মেয়ে নয়। ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে করুণ চোখে তিলোত্তমা তাকিয়ে আছে মহীতোষের দিকে। ভয়ে ছিটকে তিন-চার হাত পিছিয়ে যায় সে। আতঙ্কে কাঁপতে থাকে মহীতোষ। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাই কোনওভাবেই অশরীরী বলা যাবে না তাকে। মহীতোষের গলা দিয়ে একটা কথা বেরিয়ে আসে, ‘কী… কী চাস তুই?’ তিলোত্তমা বলে, ‘আমার গানগুলো একটু বাজাবে? কতদিন শুনি না। মিহিরের জন্যই গেয়েছিলাম। গানগুলো শুনলে মনে হবে আমি মিহিরের কাছেই আছি।’ এরপর গলায় আরও রহস্য জড়ো করে তিলোত্তমার আত্মা বলে, ‘মহীদাআআআআ…।’ মহীতোষ আধা-জ্ঞান আধা-অজ্ঞান অবস্থায় দেয়ালের গায়ে নিজেকে আটকে রেখে বলে, ‘দূর হ। দূর হ হতচ্ছাড়ি।’ আর সময় দেয়নি তিলোত্তমার আত্মা। সেই নানা রঙের পাথরের চুড়ি পরা রক্তাক্ত ভয়ানক হাত মহীতোষের মুখের কাছে আচমকা বাড়িয়ে দিয়ে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলে ওঠে, ‘গানগুলো দাআআআআও।’ হাতে রাখা পুজোর কমণ্ডলুটা দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মহীতোষ ছুড়ে মারে তিলোত্তমার দিকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মহীতোষ
দড়াম করে শব্দ হয়। চমকে উঠি আমরা। দেখি একটু আগেই যে জানলাটা বন্ধ করে এসেছিল মহীতোষদা, সেটাই খুলে গেছে। ছিটকিনিটা মাটিতে এসে পড়েছে আমাদের পায়ের কাছে। বাইরে সামান্য হাওয়া বইছে। জবা গাছটা সেই হাওয়ায় একবার জানলার ওপর ঝুঁকছে, আবার পিছনের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। হট করে দেখলে মনে হবে কেউ যেন জানলা দিয়ে ঘরের ভিতর মুখ বাড়িয়ে আবার লুকিয়ে পড়ছে। ঝড়বাদলও নেই। তাহলে ছিটকিনিটা ভাঙল কোন শক্তিতে? মহীদা বলল, ‘এবার বুঝলি তো মিহির, কেন আমি গানগুলো অফিসে বাজাতে চাইনি। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোড়া হলি তুই। সেই একই নাম! গত বারো বছরে একটা মিহিরও চাকরি করেনি এই চ্যানেলে। আমি কী আর জানতাম না যে সিসিটিভি আছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি কোনও কথা না ভেবে সবাইকে বাঁচাতে এটা করতে বাধ্য হয়েছি। কারণ আমি জানি, ও আছে। ও এখানেই কোথাও আছে। ও আমাদের অফিসেও আসে। শুধু অমঙ্গল করতে পারে না।’
— কিন্তু মহীদা, তুমি তো তিলোত্তমার গানগুলো নষ্ট না করে ডিভিডি করে রেখেছ, কেন?
অল্প আলোতেও বুঝলাম মহীদার চোখ ভারী হয়ে এসেছে। ধরা গলায় বলল, ভালোবাসা। মোহ। অন্তরের টান। তিলুকেও। তোকেও।’ ঝাপসা চোখেই দু-হাতে জড়িয়ে ধরলাম মহীদাকে। কিন্তু মহীদা পরক্ষণেই আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল, আর মায়া বাড়াস না। সরে যা।’ বলেই দরজার দিকে যেতে গিয়ে ফিরে চাইল, ‘একটু বোস। আসছি।’ উকি মেরে দেখলাম মহীদা ঠাকুরঘরে ঢুকে গেল। এই ঘরটা যে খুব বড়ো তা নয়। তবু একা বসে থাকতে গা-টা যেন ছমছম করে উঠল। ‘ঈশ্বরে বিশ্বাস করিস তো?’ বলতে বলতে মিনিটখানেক পর মহীতোষদা ঘরে আসে। হাতে একটা তাবিজ। বললাম, ‘তা তো করিই কিন্তু এটা কী?’
-জামাটা একটু খোল দিকি। ডান-হাতটা দে।
‘কী এটা?’ আমার আমতা আমতা করা দেখে বলে, ‘তোর কোনও ক্ষতি করব না রে হতচ্ছাড়া। এটা মহা মৃত্যুঞ্জয় তাবিজ।’ ডান-বাহুতে বাঁধতে বাঁধতে বলল, ‘এটা কখনও খুলবি না। যাই হয়ে যাক। এটা থাকলে কোনও অশুভ শক্তি তোর শরীরের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। তোর ওপর ভর করতেও পারবে না।’ আমি শান্ত গলায় বলি, ‘তোমার তিলু তো অশুভ নয় মহীদা। ও ভালোবেসে মরেছে। ওকে যে মেরেছে সে অশুভ। ও ভালোবাসা না পেয়ে অতৃপ্ত।’ তাবিজে গিঁটের পর গিঁট দিতে দিতে মহীদা বলল, ‘মিহিরকে কে মারল?’ মৃত্যুর সঙ্গে নিজের নামটা শুনে প্রথমটা একটু থমকালাম। তারপর মহীদাই বলল, ‘সরখেল নয়, চ্যাটার্জি।’ আটকে থাকা নিশ্বাসটা ছেড়ে বললাম, ‘তার মানে তোমার মনে হয়…।’ ‘মনে হয় না। আমার বিশ্বাস, মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে তাবিজে শেষ গিঁটটা দিতে দিতে মহীদা বলে উঠল। আর ঠিক তখনই আমার চোখের সামনে মহীদার চোখে থাকা চশমার একটা কাচ চড়চড় করে ফেটে গেল। দুজনেই থমকে গেলাম। চোখ থেকে চশমা খুলে মহীদা একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘এই তাবিজটা তোর হাতে ততদিনই থাকবে যতদিন এটার কাজ থাকবে। কাজ ফুরিয়ে গেলে তাবিজটা নিজে থেকেই খুলে যাবে। এবার যা। রাত সাড়ে ন-টা বাজে। এক্ষুনি বেরিয়ে পড়। দশটা বারোর ট্রেনটা পেয়ে যাবি। আর শোন, ওই ডিভিডি দুটো একবার শুনে বা না শুনলেও ক্ষতি নেই, নষ্ট করে ফেলিস। এ গান আর কোথাও যেন না বাজে।’
ঝড়াং ঝড়াং করে রাতের নিস্তব্ধতাকে চুরমার করে ফাঁকা ট্রেনটা যখন ছুটে যাচ্ছিল তখন মহীদার বলা শেষ কথাগুলো বারবার মনে হচ্ছিল, ‘এ গান আর কোথাও যেন না বাজে।’ আর ততই কে যেন আমার কানের কাছে এসে চির প্রতীক্ষিত প্রেমিকার মতো গেয়ে যাচ্ছিল, যুগে যুগে বুঝি আমায় চেয়েছিল সে, সেই যেন মোর পথের ধারে রয়েছে বসে।’
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় বারোটা বেজে গেছিল। শারীরিক আর মানসিক ক্লান্তিতে আর কিচ্ছু ভালো লাগছিল না। মশারির মধ্যে আমার দেড় বছরের ছেলেটাকে ঘুমোতে দেখে মনটা একটু শান্ত হল। মৃন্ময়ী এক গ্লাস জল নিয়ে এল। অভিযোগের সুরে বলল, ‘কালকের একটা বাজারও আনোনি। ওরা এলে কী খেতে দেব?’ দু-ঢোঁক জল গিলে থমকে গেলাম। ‘কারা এলে?’ আমার কথা শুনে মৃন্ময়ী চোখ পাকিয়ে বলল, ‘কারা এলে মানে? কাল মুনাই আর সায়ন আসছে আমাদের বাড়ি। গত পরশুই তো বললাম। কাল রাতেও কথা হল। বেমালুম ভুলে গেলে?
সত্যি আমার আর কিছু মনে থাকছে না। এত কাজের চাপ। ভেবেছিলাম নতুন অফিসে মন দিয়ে কাজ করব। সামনে লঞ্চ প্রোমোর শুটিং। মাঝখান থেকে এই তিলোত্তমা এসে…! হঠাৎ মনে পড়ল আমার ব্যাগের মধ্যে থাকা দুটো ডিভিডির কথা। গিন্নির হাতে জলের গ্লাস ধরিয়ে ব্যাগ থেকে ওই ডিভিডি দুটো বের করে আমার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিলাম। ‘কী গো, বাজার- দোকানের কী হবে?’ জামা খুলতে খুলতেই বললাম, কাল সক্কাল সক্কাল সেরে নেব।’
— দেখো তো পমফ্রেট মাছ পাও কিনা।
— ভাত, ডাল, মাটন আর একটা তরকারি, এই তো কথা হয়েছিল তোমার সঙ্গে। এর মধ্যে আবার পমফ্রেট! দাম কত জানো? তার ওপর মাটন, সাতশো টাকা কিলো।
-আমি যদ্দুর জানি, তোমার বোন আর তার বর পমফ্রেট খুব ভালোবাসে। এবার তোমার ব্যাপার।
বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মৃন্ময়ী।
রাত তিনটে বাজতে চলেছে। ঘুমটা ভেঙে গেল। বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। উঠব কী উঠব না করে অনেকক্ষণ চেপে আছি। আর থাকা যাচ্ছে না। মৃন্ময়ী ছেলেকে জড়িয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং পেরিয়ে বাথরুম। ডাইনিংয়ে পাঁচ ওয়াটের একটা এলইডি জ্বলছে। অ্যাকোয়ারিয়ামের আলোতে বেশ একটা মায়াবী-মায়াবী ভাব। কাজ সেরে ফ্ল্যাশটা টেনে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। ঘরের দরজার দিকে এগোচ্ছি। হঠাৎ কিছু একটা যেন কানে এল। দাঁড়ালাম। এপাশ-ওপাশ কিচ্ছু নেই। দেয়ালঘড়িতে তিনটে বেজে এক। একমাত্র সেখানেই টিকটিক করে শব্দ হচ্ছে আর অ্যাকোয়ারিয়ামের জলে বুদবুদের শব্দ। মুখ ফিরিয়ে ঘরের দরজার দিকে এগোতেই থমকে গেলাম। স্পষ্ট বুঝলাম, এটা কোনও শব্দ নয়। কে যেন ফিশফিশে গলায় ডাকছে আমায়, ‘মিহিইইইইর!’ এবার চমকে গেলাম। পিছন ফেরার সাহস হচ্ছে না। এবার পরিষ্কার শুনলাম সেই মিহি কণ্ঠ আমায় বলছে, ‘কেন ঠকালে মিহির?’ সর্বনাশের মুখে যখন দাঁড়িয়েই পড়েছি তখন পিছন ফিরে নিজেকে লুকোনো যাবে না। শরীরটাকে এক ঝটকায় পিছনের দিকে ফিরিয়ে দেখি অ্যাকোয়ারিয়ামের রংবেরঙের আলোয় স্পষ্ট তার রক্তাক্ত মুখ। গায়ের সাদা ঘাগরার মতো পোশাকে চাপ চাপ রক্ত। চোখ দুটো জ্বলছে। হিম হয়ে গেলাম। সে বলে চলল আর আমার দিকে এগোতে থাকল, ‘আমার কাছ থেকে তোমায় যে কেড়ে নেবে তাকে শেষ করে দেব। তোমাকেও ছাড়ব না। কেন ঠকালে আমায়? কেন?’ দাঁতে দাঁত চিপে বলছে আর ভয়ংকর থেকে আরও ভয়ানক হয়ে এগিয়ে আসছে তিলোত্তমা! হঠাৎ উধাও হয়ে গেল সে। নিমেষের জন্য জায়গাটা পুরোপুরি শূন্য হয়ে গেল। তারপর একদম আমার মুখের সামনে আকস্মিক ঝলসে উঠে চিৎকার করে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল, ‘গানগুলো দাআআআআআও।’ আমিও ভয় পেয়ে আর্তনাদ করে উঠলাম। দড়াম করে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে এল মৃন্ময়ী। চোখে-মুখে তারও আতঙ্ক। রীতিমতো কাঁদছে আর ভয়ে থরথর করে কাঁপতে-কাঁপতে আমাকে বলছে, ‘তুমি শিগগিরি চলো। ভয়ংকর কাণ্ড হয়েছে। মশারি ছেড়ে বেরোও না গো।’ এতক্ষণে অনুভব করলাম, আমি আমার বিছানাতেই আছি। সারা গা ঘামে ভিজে গেছে। জানলা দিয়ে সকালের আলোটাও ঘরে ঢুকে এসেছে। পাশে ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটা হইচই শুনে উঠে কাঁদতে শুরু করেছে। মৃন্ময়ী ছেলেকে কোলে নিয়ে রীতিমতো খেপে গিয়ে বলল, ‘তুমি যাবে, নাকি বিছানাতেই থাকবে?’ মৃন্ময়ীর সঙ্গে ডাইনিংয়ে গিয়ে দেখি সত্যিই ভয়ংকর কাণ্ড। অ্যাকোয়ারিয়ামের জল টকটকে লাল। কে যেন রক্ত ঢেলে দিয়েছে। জলের ওপর দিকে সব কটা মাছ মরে ভেসে উঠেছে। ‘এসব কী করে হল বলো তো?’ মৃন্ময়ীর গলাটা ধরে গেছে। কী বলব মৃন্ময়ীকে? সারাদিন ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে একা থাকে। একজন আয়া আছে। কিন্তু সে তো আপন কেউ নয়। এর পর সব কিছু বললে বেচারি ভয়ে হয়তো মরেই যাবে। কিন্তু কাল রাতে সে যা বলে গেল তার পরে তো… নাহ্! আমি আর ভাবতে পারছি না। অ্যাকোয়ারিয়ামের সব জল পাশের ড্রেন দিয়ে বয়ে গেল। সঙ্গে ভেসে গেল মরা মাছগুলো। বেলা বেড়ে চলেছে। বাজার করে ফিরে দেখি মৃন্ময়ী থম মেরে বসে আকাশ-পাতাল কী যেন ভাবছে। ‘বাজারটা রান্নাঘরে রেখেছি।’ এর উত্তরে মৃন্ময়ী বলল, ‘শোনো, তুমি বরং অন্য চাকরি দেখো। ঠিক কিছু না কিছু জুটে যাবে।’
— আমি পালালেও সে আমায় ছাড়বে না মৃন্ময়ী।
মুখ ফসকেই কথাগুলো বেরিয়ে গেল। ‘সে মানে ওই পেতনি?’ মৃন্ময়ীর কথার আর কোনও উত্তর না দিয়ে বললাম, ‘পমফ্রেটটা কিন্তু কমেই পেলাম জানো। মাটনও সাড়ে ছশো-র মতো নিল।’
— কথা ঘুরিয়ো না। বলো না সে কে? তুমি চিনতে তাকে?
মৃন্ময়ীর মাথা থেকে গালে হাত বুলিয়ে বললাম, ‘সব বলব। তবে এখন নয়। রান্নাঘরে যাও। ওরা তো এসে পড়বে।’
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। ‘হ্যাঁ বলো ইমনদা।’
— সরি ভাই, রোববার সকালে তোকে না জ্বালিয়ে পারলাম না।
-আরে বলোই না।
-একটা খুব খারাপ খবর আছে।
-খারাপ খবর! মানে?
-মহীতোষদা আর নেই।
-হোয়াট? কী বলছ এসব?
আমার উত্তেজনা দেখে মৃন্ময়ী খাট ছেড়ে নেমে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। ইমনদা বলল, ‘ঘুমের মধ্যেই। ডাক্তার সাসপেক্ট করছে সেরিব্রাল। তবে…’
— তবে? কী তবে?
-সকালে মেয়ে ঘরে ঢুকে দেখেছে, প্লাস ডাক্তার এসেও দেখেছে। মহীতোষদার চোখ দুটো খোলা ছিল। মানে মানুষ ভয় পেলে যেরকম চোখ- মুখ হয় তেমন হয়েছিল মহীতোষদার মুখটা।
আমি যেন মৃত্যুর সময়টা চোখের সামনে দেখতে পেলাম হঠাৎ করে। তাও জিজ্ঞেস করলাম, ‘ক-টা নাগাদ হয়েছে কিছু বলছে?’
— ডাক্তার যখন এসেছে তখনও গা-হাত পা অত ঠান্ডা হয়নি। বলছে ভোর রাতের দিকে।
-তিনটে নাগাদ?
আমার মুখ দিয়ে কেউ বলিয়ে দিল এই কথাটা। ইমনদাও সায় দিল। জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কি যাবি?’ আমি বললাম, ‘না গো। বাড়িতে গেস্ট আসবে। আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা রেখে মৃন্ময়ীকে খবরটা দিলাম। আমার কাঁধ থেকে হাতের দিকে মৃন্ময়ীর হাতটা নেমে এসে থেমে গেল, ‘এটা কী?’ বললাম, ‘মহা মৃত্যুঞ্জয় তাবিজ। কালকেই মহীতোষদা আমার হাতে বেঁধে দিয়েছে। আর বলেছে এটা আমার হাতে থাকলে কোনও অশুভ শক্তি, অশরীরী আত্মা আমায় স্পর্শ করতে পারবে না।’ মৃন্ময়ী চমকে উঠল। বুঝলাম, কোনও এক অজানা আশঙ্কা ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে ওকে। আমি সাহস দিয়ে বললাম, ‘ভয় নেই। কিচ্ছু হবে না আমার।’ মুখে বললাম। কিন্তু মন বলছে অন্য কথা। কিছুতেই বুঝতে পারছি না তিলোত্তমার আত্মা ওই কথাটা বলল কেন? ‘কেন ঠকালে আমায়?’ মিহির কি তবে তিলোত্তমাকে ঠকিয়েছিল? আর সেটা ও জেনে ফেলেছিল বলে খুন করে দিল?
ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে সায়ন বলল, ‘খুন করা অত সহজ নয় দাদাভাই। খুন সবাই করতে পারে না।’ দুপুরে খেয়েদেয়ে ছাদে আমি আর সায়ন গল্প করছিলাম। মৃন্ময়ীর ঘ্যানঘ্যানানির চোটে সায়নকে সব কথা বলতে হয়েছে। সায়ন বিধাননগর থানার ওসি। তাই মৃন্ময়ীর ধারণা ও সব ঠিক করে দেবে। একদিকে ভালোই হয়েছে। নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে এই শরীর আর অশরীরীর দুনিয়ায় আমার সঙ্গে আরও একজনকে তো পেলাম। আকাশের দিকে গোল গোল ধোঁয়া ছেড়ে সায়নের কথায় সায় দিলাম। সায়ন বলল, ‘আমার পড়াশোনা আর অভিজ্ঞতা বলছে এই গল্পটা এত সহজ নয়। যদিও এসব ভূতপ্রেতে আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই, তবে তোমার কিছু কিছু ঘটনা অদ্ভুত লাগছে। অ্যাকোয়ারিয়াম, তেরো নম্বর ফ্লোর! আচ্ছা, তোমার এই প্রেমকাহিনিতে তো কোথাও তেরো নম্বর ফ্লোর নেই। তাহলে এটা এল কোত্থেকে?’
— রহস্য রে ভাই, সবই রহস্য! নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে। মহীদাও চলে গেল আচমকা। আর শুধু আমি তো নই, আমাদের অফিসের আবির, সে-ও তো কাটা হাত দেখেছে। তাহলে?
— দেখো চারপাশে যা ভূতের গুজব ছড়িয়ে আছে তোমাদের অফিসে, তাতে কারও কিছু কল্পনা করে ভয় পাওয়াটা অসম্ভব নয়।
আমি শুধু চুপ করে ঘাড় নাড়লাম। কারণ আমার হিসেব মিলছে না। ছাদের আলসেতে হেলান দিয়ে বলেই ফেললাম, ‘যত ভাবছি এসবের থেকে দূরে থাকব, তত যেন নিশির ডাকের মতো শুনতে পাচ্ছি অতলে তলিয়ে যাওয়ার ডাক। কাউকে বোঝাতে পারছি না। এবার কার কাছে যাব এর ক্লু খুঁজতে? কে পথ দেখাবে আমায়?’ সায়ন পরিবেশটাকে হালকা করতে দু-কলি গেয়ে উঠল, ‘পথ আমারে সেই দেখাবে যে আমারে চায়, আমি অভয় মনে ছাড়ব তরী, এই শুধু মোর দায় গো এই শুধু মোর দায়।’
— বা বাহ্! ভগ্নীপোত শুধু শালাকেই গান শোনাবে! আর বউদিটা যে ভালোমন্দ রেঁধে খাওয়াল তার বেলা লবডঙ্কা। ছেলেকে কোলে নিয়ে মৃন্ময়ী আর বোন মুনাই ছাদে এল। সায়ন ওদের নিয়ে হাত ধরে ঘুরে ঘুরে ঠাট্টার ছলে আবার গাইতে শুরু করল। ‘দিন ফুরালে জানি জানি, পৌঁছে ঘাটে দেবে আনি, আমার দুঃখদিনের রক্তকমল তোমার করুণ পায়ে।’ আমিই গানটা থামিয়ে দিলাম। বললাম, ‘কী গাইলে, কী গাইলে?’ সায়ন ভড়কে গেল। বলল, ‘রবীন্দ্রসংগীত।’
-আরে না না। গানটা কোথা থেকে শুরু করলে আর একবার করো।
খানিক ভেবে আবার গাইল ‘পথ আমারে সেই দেখাবে যে আমারে চায়, আমি অভয় মনে…’
— ব্যস, ব্যস।
আমি থামিয়ে দিলাম সায়নকে। মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল আমার। ‘আচ্ছা সায়ন, সত্যিই এমন হচ্ছে না তো, যে আমায় চায় সে-ই আমায় পথ দেখিয়ে দিচ্ছে নানান ভাবে! আমিই ধরতে পারছি না!’ সায়নের ভ্রূ কুঁচকে গেল। বোন আর বউয়ের মুখের ভাব ঠিক কী ছিল আমি দেখিনি। কারণ তখন আমার মাথায় ঘূর্ণিঝড় চলছে। তিলোত্তমা এর আগে যাদের যতবার দেখা দিয়েছে ততবার হয় গান চেয়েছে, নয়তো মিহিরের নাম ধরে ডেকেছে। আমাকেই কেবল বলল, ‘কেন ঠকালে মিহির?’ কেন বলল? আরও কি কিছু বলতে চায় সে? নাকি কিছু জানতে চায়? মিহিরকে যদি তিলোত্তমাই খুন করে থাকে তাহলে তো ওর প্রতিশোধ নেওয়া হয়ে গেছে। তবে কেন আজও মিহির নামের মানুষকেই খোঁজে? দুনিয়ায় তো এত মিহির আছে, কই তাদের তো কিছু করে না! শুধু এই চ্যানেলেই যে মিহির চাকরি করবে তাদেরই ক্ষতি করবে? মাথার মধ্যে অজস্র প্রশ্ন উন্মাদের মতো ঘুরতেই থাকে। মন যেন বারবার একটা উপসংহারেই উপনীত হয়, প্রেম আর পাপ, এর মাঝে আরও গভীর কোনও গল্প আছে। নিশ্চয়ই আছে। আর আমাকে সেটা খুঁজে বের করতেই হবে। নইলে ধ্বংস হয়ে যাবে সব। তা ছাড়া এর থেকে পালাবার পথ আমার আর নেই।
লোকের ভিড়ে ঠাসা সোমবারের লিফট। প্রতিটা ফ্লোরে ধাক্কা খেতে খেতে উঠছে। তেরো নম্বর ফ্লোরে এসে লিফটটা দাঁড়াল। লোকের ভিড় থাকলে খুব একটা দাঁড়াত বলে শুনিনি। কিন্তু আজ দাঁড়াল। সবার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। বুকের ভিতরটা ধুকপুক করে উঠল। এক অবাঙালি মেয়ে বলল, ‘আরে ইস ফ্লোর মে রুকা হ্যায় কিঁউ? বটন ভি তো দাবায়া নেহি কিসি নে! কোই হ্যায় ক্যায়া?’ চুলে স্পাইক করা চিমসে মতন ছেলেটা দাঁতগুলো বের করে বলল, শায়দ হ্যায়। পর উও দিখতা নেহি।’
— চুপ রহো শালে।
-ক্যায়া ডর গয়ে।
— উফফ রোহণ। শাট আপ।
লিফটের মধ্যে বাকি লোকেরা হাসল এদের কথা শুনে। কেবল গম্ভীর পাথর-মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।
ইমনদা একমনে এডিট করছিল। পাশে গিয়ে বসতেই বলল, ‘কী ভাই! বলো!’ আমি বললাম, ‘কাল গিয়েছিলে?’
ইমনদা শুধু ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। আর জানাল, মেয়েটা খুব কাঁদছিল। একদম একা হয়ে গেল। ‘আর কিছু দেখলে?’
অনেক কৌতূহল নিয়ে যে প্রশ্নটা করেছি তা ইমনদা বেশ বুঝতে পারল। বলল, ‘ডাক্তার নরমাল ডেথই বলছে।’ আমি কি একটু হতাশ হলাম! কী জানি! আমার কাঁধে হাত রেখে ইমনদা বলল, ‘একটা কথা বলি মিহির। এসব নিয়ে তুমি আর ভেব না। কাজে মন দাও।’
-তাই তো চেয়েছিলাম ইমনদা। কিন্তু সে আর হল কই? আমি না চাইলেও সে যে আমায় চাইছে খালি। ইমনদার কপালে ভাঁজ। গতকালের সব কথা জানালাম। মহীতোষদার বলা কথাগুলোও ছোটো করে বললাম। শুনে ইমনদা বলে ফেলল, ‘মহীতোষদা কি বুঝতে পেরেছিল যে ওর দিন ফুরিয়ে এসেছে।’
— হয়তো! নইলে চোখের সামনে ঘরের মধ্যে ওইরকম চড়চড় করে চশমার কাচ ভাঙে নাকি?
এর পর একটা দীর্ঘশ্বাসের বিরতি। তারপরেই বললাম, ‘আচ্ছা ইমনদা, আমায় একটা হেলপ করতে পারবে?’
— বলো।
-বরেন রায়ের কোনও ছবি জোগাড় করে দিতে পারবে?
-বরেন রায়! ধুস! ও কি কোনও সেলিব্রেটি নাকি? একটা চুনোপুঁটি লাইটম্যান ছিল। ওর আন্ডারে দু-তিনজন কাজ করত এই যা।
— আমায় দাও না। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে বরেনের কাছে গেলে কিছু একটা কু পাব। তুমি তো প্রভাতি সংগীত এডিট করতে। তোমার কাছে কিছু নেই?
ইমনদা চুপ করে গেল। খানিকক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘আচ্ছা, দেখবখন।’
-আরও একটা হেলপ চাই তোমার।
চোখগুলো গোল্লা করে ইমনদা বলল, ‘আবার কী?’
.
