৪
থানায় নিয়ে যাওয়ার পর আলাদা ঘরে সায়ন অনেকক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে। আমাকে বসানো হয়েছিল পাশের একটা ঘরে। যাতে ওদের কথাবার্তা সব শুনতে পাই আমি। সায়ন জিজ্ঞেস করে, ‘ঠিক কতটা ভালোবাসতেন তিলোত্তমাকে?
— মিথ্যে কথা। আমার সঙ্গে তেমন কথাই হত না তিলোত্তমার।
— তাতে কী? কথা না হলে কি ভালোবাসা যায় না?
-না। আমি ভালোবাসতাম না।
-মিথ্যে বলছেন।
-মিথ্যে বলছি না। ওরকম একটা অহংকারী মেয়েকে আমি কেন ভালোবাসতে যাব?
এবার একটু গলা চড়ায় বরেন। সায়ন খুব স্বাভাবিক স্বরেই বলে, ‘সে কী? এই তো বললেন যে আপনি তেমন একটা কথা বলতেন না তিলোত্তমার সঙ্গে। তাহলে ও অহংকারী কিনা সেটা জানলেন কী করে? উত্তর দেওয়ার ভঙ্গিমা শুনে বুঝি যে বরেন ফাঁপরে পড়েছে। তুতলিয়ে বলে, ‘ওই, ওটাই তো। কথাই বলত না আমার সাথে। চ্যানেলে চাকরি করা সুন্দরী মেয়ে, অত ভালো গান গায়। সে কেন আমার সঙ্গে কথা বলবে?’
-তার মানে আপনি অনেকবার কথা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু তিলোত্তমা আপনাকে পাত্তা দেয়নি। তাই আপনার ওর ওপর এত রাগ।
এক দমে বলে যায় সায়ন। ‘কে, কে বলল রাগ? আপনার মনগড়া কথাগুলো আমার মুখে বসাবেন না ইন্সপেক্টর।’
— ওকে। তার মানে আপনি ভালোবাসতেন না!
-না বললাম তো।
-অবশ্য আপনার পুরোনো ছবিতে যা কেল্টেপানা (বরেনকে উত্তেজিত করতে এই বিশেষণ) চেহারা দেখলাম তাতে তিলোত্তমার মতো মেয়ের নজর না পড়ারই কথা।
সায়নের হাবভাব যা দেখি বা কথা বলার ভঙ্গিমা যতটুকু বুঝেছি তাতে এই সময় সায়ন আড়চোখে অবশ্যই বরেনের মুখ দেখেছিল। কারণ কথাটা বলার পর দু-সেকেন্ডের বিরতি ছিল। এর পর সায়ন আবার শুরু করে, ‘বিশেষ করে মিহিরের মতো অমন সুপুরুষ যেখানে আছে।’ ‘হ্যাট শালা!’ বরেনের গলায় এই কথাটা শোনার সঙ্গে কাঠের টেবিলে একটা লাথি মারার শব্দ পাই। বরেন বলে, ‘সুপুরুষ! আপনি দেখেছিলেন নাকি মিহিরকে? ধনী বাপের কোলের ছেলে হলে আমার চুলেও অমন ঢেউ খেলত। কেলটে রঙেও জেল্লা আসত।’
— তাই নাকি? যাদের আস্ত একটা বাগানবাড়ি আছে তারা ধনী নয় বলছেন?
-শুধু বাগানবাড়িটাই দেখছেন। তার পিছনের ইতিহাসটা তো জানেন না। দাদু অনেক ধার দেনা করে ওই বাড়িটা কেনেন। বড়োলোক হবার সাধ ছিল তার। সেই দেনা আমার বাবাকে দিয়ে যেতে হয় সারা জীবন। বাড়িটা নানা অনুষ্ঠানে ভাড়া দিয়ে যা টাকা আসত সেটা দেনা মেটাতেই চলে যেত। দাদুর মতো চালবাজির ধাত পেয়েছিল বাবা। উনি কোথাও চাকরি করবেন না। কোনওরকমে টিউশন করে নিজের উচ্চ মাধ্যমিকটা পাশ করি। এর পর টালিগঞ্জ-এর লাইট বয়ে দেওয়া, তার ব্যাগ বয়ে দেওয়া চলতেই থাকত। সেই করতে করতেই লাইট করা শিখি। আস্তে আস্তে কাজও পেয়ে যাই। হুঁঃ! মিহিরের মতো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালে আরও কত কিছু করে ফেলতে পারতাম।
-ঠিক কথা। আর ক্যামেরা? শুনেছি মিহির নাকি ফাটাফাটি ক্যামেরা করত? লাইট।
-লাইট। সব লাইটের খেলা। শালা আমি ফাটিয়ে লাইট না করলে হত অমন ছবি? সব লোকে ছবি দেখত। ক্যামেরাম্যানের গুণ গাইত। কিন্তু ওই ছবিগুলো কী করে হত তা কেউ দেখত না।
পাশের ঘর থেকে বসে বরেনের আপশোশে কালি হয়ে যাওয়া মুখটা দেখতে পেয়েছিলাম। সময় না দিয়ে বরেনের পায়ে আরও একটু নুন ছিটিয়ে সায়ন বলল, ‘মিহির যেমন বলত আপনি তো তেমনই লাইট করতেন বরেনবাবু।’ বরেন সায়নের সুর নকল করে বলল, ‘তাই নাকি? তা এই খবরটা আপনাকে কে দিল স্যার? ওই দু-দিনের ছোঁড়া মিহির সরখেল?’ খেয়েছে রে। শুনেই আমি মেরুদণ্ড সোজা করে বসি। এমনিতে ভালোই বুঝছিলাম যে মনে মনে আমার ওপর রাগে ফেটে পড়ছিল ধরেন ওরফে অলোক সাহা। এইবার সেটা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে। বরেন দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ‘ও জানেটা কী? ছিল ও তখন? কেবল গল্প শুনে বক্তিমে আওড়ালে হবে?’
-গল্প শুনে? কার কাছ থেকে কীসের গল্প?
খপ করে কথার ল্যাজটা পাকড়ে নেয় সায়ন। বরেন সব রাগ উগরে দিয়ে বলতে থাকে, ‘তিলোত্তমা, মিহিরের ভালোবাসার এত কথা জানল কী করে ও? ওই মহীতোষ যদি না…’ বলেই বরেন চুপ। সায়ন বলল, ‘মহীতোযই যে মিহিরকে এসব বলেছে জানলেন কী করে? তার মানে মহীতো সব জানত আর সেটা আপনি জানতেন তাই তো?’ গলা চেপে নিজেকে ঢেকে বরেন বলে, ‘হ্যাঁ জানব তো বটেই। তিলোত্তমা তো ওই বুড়োটার প্যায়ারের ছিল। তাই মিহিরের সঙ্গে ওর প্রেম একমাত্র মহীতোষই জানত।’
-শাক দিয়ে মাছ ঢাকবেন না বরেনবাবু। তিলোত্তমা আর মিহিরের ভালোবাসা সবাই জানত। ওদের প্রেম যথেষ্ট খোলামেলা ছিল।
বরেন ধাক্কা খেয়ে বলে, ‘হ্যাঁ তো?’ সায়ন বলে, ‘তাহলে এমন আর কোন ভালোবাসার কথা, যা শুধু মহীতোযই জানত? বলুন। কী হল বলুন?’ খেপে উঠেছে সায়ন। ‘সবাইকে শালা গান্ডু ভেবেছেন? যা বলবেন তাই বিশ্বাস করবে? বাংলায় একটা কথা আছে জানেন তো বরেন রায়, অতি চালাকের গলায় দড়ি। বলুন আর কোন ভালোবাসার কথা জানত শুধু মহীতোষ?’ ফাঁকা ঘরে সায়নের ধমকটা প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। এর পর খানিকক্ষণের নীরবতা। তারপর খুব নীচু স্বরে বরেন বলতে শুরু করে। ‘হ্যাঁ। আমি খুব ভালোবাসতাম তিলোত্তমাকে। বলেওছিলাম ওকে। সামনাসামনি। ওর গান শুনেই প্রেমে পড়ি।’
-ও রূপটা কোনও ফ্যাক্টর ছিল না?
-ছিল। ওর দিকে একবার তাকালে চট করে চোখ ফেরানো যেত না। তিলোত্তমাও বুঝতে পারত যে আমি ওকে ভালোবাসি। একদিন বলেই ফেললাম। ও বলল, ও মিহিরকে ভালোবাসে। অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবে না। আমি বোঝালাম। তবু বুঝল না শালা। ব্যস…।
-আপনিও ঝোপ বুঝে কোপ মেরে দিলেন?
সায়নের এই কথায় বরেন দপ করে জ্বলে ওঠে, ‘না আমি মারিনি। বিশ্বাস করুন।’
-কী মারেননি?
— তিলোত্তমাকে।
-কে মেরেছে?
— মিহির। মিহিরই মেরেছে।
-আপনি দেখেছেন?
-অ্যাঁ। না না দেখিনি।
তাহলে মিহির মেরেছে কী করে বললেন? মিহির তো প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যায়।
— আসলে মিহির খুব খারাপ ছেলে ছিল। বাজে চরিত্রের।
-তাই?
-হ্যাঁ। আমি জানতাম। প্রথমে তিলোত্তমাকে বলেছিলাম। বিশ্বাস করেনি। একদিন হাতেনাতে দেখিয়ে দিই।
— মানে?
পাশের ঘরে বসে আমিও অবাক হয়ে যাই। এ কোন নতুন রহস্যের দ্বার উদ্ঘাটন হতে চলেছে! সায়ন বলে, ‘খোলসা করে বলুন বরেনবাবু। তাতে আখেরে আপনারই লাভ।’ বরেন বলতে শুরু করে, ‘সেদিন মিহিরের জন্মদিন ছিল। শুটিংয়ে সবার সামনে মিহিরকে একটা দারুণ পাঞ্জাবি গিফট করে তিলোত্তমা। সেদিন একটু তাড়াতাড়ি প্যাক আপ হয়ে যায়। মিহির তিলোত্তমাকে বলে ওর একটা কী কাজ আছে। সেই কাজ সেরে মিহির অফিসেই আসবে। আমার সন্দেহ হয়। তাই মিহিরকে আমি ফলো করি। আমার টিমের লোক জানিয়েছিল যে সে নাকি দেখেছে ওই বিল্ডিংয়েরই অন্য একটা ফ্লোরের আর- একটি মেয়ের সঙ্গে মিহিরকে ঘুরতে। রবীন্দ্র সরোবর লেকের কাছে ওর বাড়ি। মিহির সেখানেও দেখা করত। তা সেদিন দেখলাম মিহির অফিস থেকে বেরিয়ে ওই মেয়েটার সঙ্গে একটা গিফট শপে ঢুকল। আমি বেশ কিছুক্ষণ নজর রেখেছিলাম। কিন্তু তারপর কখন যে বেরিয়ে গেছে খেয়াল করিনি। তখন বেলা তিনটে বেজে গেছে। লাঞ্চ টাইম মোটামুটি ওভার। ঠিক তখনই একটা ভয়ানক খবর পেলাম। সত্যি কথা বলতে কী এরকমই একটা কিছুর অপেক্ষা করছিলাম। আমিও ছুটে যাই তিলোত্তমার কাছে। ও তখন নিজের ডেস্কেই ছিল। সে-সময় অফিসের এত কড়াকড়ি নিয়ম ছিল না। আমরা যারা কন্ট্রাক্টে ছিলাম তারা সহজেই ভিতরে চলে যেতে পারতাম। তিলোত্তমাকে বলি, দেখতে চাও মিহিরের আসল রূপ? চলো আমার সাথে। প্রথমে আসতে চায়নি। তারপর জোর দিয়ে বলার পর আমার সঙ্গে আসে। নেমে আসি তেরো নম্বর ফ্লোরে। তখনও ওই ফ্লোরটা ফাঁকাই ছিল। এখন কেউ এসেছে কিনা জানি না। লিফট থেকে নেমে পা টিপে টিপে ভিতরের দরজাটা খুলি।’
পাশের ঘর থেকে যতটা সম্ভব কান খাড়া করে আমি শুনছি। বরেন রায় এখন আমার কাছে রহস্যের গোপন ঘরের চাবি। সে বলেই চলেছে আর আমি চোখ বুজে তিলোত্তমার চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি। তিলোত্তমা ভিতরের দরজাটা খুলে ডানদিকে যাচ্ছে। পিছনে বরেন। এপাশ-ওপাশ কেউ নেই। মিস্তিরিদের কতগুলো জিনিসপত্র রাখা। দু-তিনটে বাক্স আর কিছু ফাঁকা বা ভরতি টিন। বরেনের দেখানো পথে যত এগোচ্ছে তিলোত্তমা তত যেন কারওর ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ পাচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু খিলখিল হাসি। একটা জায়গায় গিয়ে উঁকি মারে তিলোত্তমা আর বরেন। ফ্লোরের কোণের দিকে অন্ধকার মতো জায়গাটায় তাকাতেই তিলোত্তমা চমকে ওঠে। দেখে, সকালেই যে চুনে হলুদের ওপর মেরুন রঙে নকশা করা পাঞ্জাবিটা দিয়েছিল মিহিরকে জন্মদিন উপলক্ষ্যে সেইটা পরেই ফ্লোরের কোণে তিলোত্তমার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটা অন্য এক অচেনা মেয়ের শরীর থেকে তার যৌবন শুষে নিচ্ছে। প্রথমে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়নি যে এটা তারই মিহির। কিন্তু একের পর এক ভেসে আসা কথায় বিশ্বাস না করে আর উপায় নেই। এলোচুলে মেয়েটির মুখ বোঝা যাচ্ছে না। দু-হাতে খামচে ধরে আছে মিহিরের পিঠের পাঞ্জাবি। মেয়েটির খামচে ধরা আঙুলগুলোর ফাঁক দিয়ে এলোমেলো ভঙ্গিমাতে নেমে এসেছে তিলোত্তমার সাধের চুনে হলুদ পাঞ্জাবির মেরুন রঙের নকশা। দূর থেকে মেরুন রংটাকে কালো লাগছে তিলোত্তমার। থেকে থেকে মিহিরের ঠোঁটের কাছে নিজের গলা বিলিয়ে শীৎকার তুলে বলে উঠছে সেই মেয়ে, আর না মিহির। আর না। আবার পরে। তিলোত্তমা জানলে কিন্তু আস্ত রাখবে না।’ বলেই যৌনখুশির হাসিতে সাপিনির মতো যেন আরও জড়িয়ে ধরছে মিহিরকে। কিন্তু মিহিরের বিরাম নেই। তিলোত্তমার পেট থেকে বুক ফুঁড়ে গলা চিরে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে। তিলোত্তমা ওখানে দাঁড়িয়েই সিদ্ধান্ত নেয় এবার আর্তনাদে ফেটে পড়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। ঠিক তখনই বরেন তিলোত্তমার মুখ চেপে পিছন দিকে ঘষটাতে ঘষটাতে নিয়ে আসে। বঁটির কাছে নিয়ে যাওয়া মুরগি যেমন গলাটা মোচড়াবার আগে ছটফট করে ওঠে, বরেনের বাহুবন্ধনে তিলোত্তমাও তেমন করেই সর্বশক্তি দিয়ে নিজের হাত-পা সমেত সমগ্র শরীরটাকে ঝটকাতে থাকে। লিফটের কাছে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তিলোত্তমা। বরেন হাঁটু মুড়ে বসে বলে, ‘পাগল হয়েছ! কী করতে যাচ্ছিলে? দেখলে তো মিহির কেমন ছেলে! এর পর তোমায় যদি সব জেনে যাবার জন্য খুন করে?’ তিলোত্তমা অঝোর নয়নে কাঁদতে কাঁদতে গোঙায় আর সব কূল হারিয়ে অকূলে ভেসে যেতে যেতে বরেনের দিকে মুখ তুলে তাকায়। এও কি সম্ভব! এই কি তার সাদাসিধে ভালোমানুষ মিহির! বরেন চট করে চোখের জল মুছিয়ে দেয় তিলোত্তমার। বলে, ‘ওঠো। ওঠো তিলোত্তমা। এখান থেকে চলো এক্ষুনি। কেউ যেন কিচ্ছু না বুঝতে পারে। লিফট এসে গেছে, চলো।’ তিলোত্তমা অন্তরের সব শক্তি একত্রিত করে ওপরের ঠোঁটের সঙ্গে নীচের ঠোঁটটাকে আটকে রাখে। নইলে একটু ফাঁক পেলেই আর্তনাদের কালবৈশাখী বেরিয়ে পড়বে সর্বনাশী রূপ ধরে।
তারপর বরেন তিলোত্তমাকে নিয়ে খানিকক্ষণের জন্য পালায় এক নির্জন জায়গায়। সেখানে গিয়ে এক ফোঁটা কাঁদেনি তিলোত্তমা। শুধু ফুঁপিয়েছে আর ফুঁপিয়েছে। রক্তাক্ত চোখ থেকে নীরবে বেরিয়ে এসেছে জলের ধারা। তখন কেউ যদি সেই অশ্রু মুছিয়ে দিতে যেত তাহলে হয়তো সে বুঝতে পারত চোখের জলেও ছ্যাঁকা লাগে। বেশ খানিকক্ষণ পরে বরেন বলে, ‘খাবে কিছু? কোল্ড ড্রিংকস?’ তিলোত্তমার শরীরটা অভিমানে, রাগে ফুলছে। ঘন ঘন দুটো ঠোঁটের মাঝখান দিয়ে গরম নিশ্বাস ছাড়ছে। ‘সরি তিলোত্তমা। আমি চাইনি তুমি আঘাত পাও। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল সত্যিটা তোমার সামনে আসাটা খুব জরুরি। জানি আমি তোমার যোগ্য নই। মিহিরের মতো অত পয়সাওলা ঘরের ছেলে নই আমি। কিন্তু তোমায় কষ্টে রাখব না বিশ্বাস করো। অন্তত মিহিরের মতো ঠকাব না।’ বরেন এতক্ষণে খেয়াল করে তিলোত্তমা বাঁ-হাতের আঙুল দিয়ে ডান হাতে পরে থাকা রঙিন পাথরের চুড়িটাকে জোরে জোরে ঘোরাচ্ছে। ‘এখনও পরে আছ? খুলে ফেলো ওই ঠগবাজের উপহার।’ বহুক্ষণ পর এইবার তিলোত্তমা তার রক্তচক্ষু তুলে বরেনের দিকে তাকায়। চোয়াল চেপে বলে, ‘মিহির আমার। মিহির শুধুই আমার। মিহিরের নামের পাশে একমাত্র তিলোত্তমা নামটাই থাকবে। যে কাড়তে আসবে আমি তার শেষ দেখে ছাড়ব।’ বরেনের বুকটা ধড়াস করে ওঠে। তিলোত্তমার মুখের দুপাশে এলোমেলো হয়ে আছে মাথার চুল। কেঁদে চোখের কাজল লেপটে গেছে গালে। দুটো চোখের সাদা অংশ ঈশান কোণে জমে থাকা মেঘের মতো রক্তবর্ণ। বিকেলের নরম আলোয় অমন সুন্দরী একটা মেয়েকেও যে অমাবস্যা রাতের প্রেতমূর্তি লাগতে পারে তা বরেন কল্পনাও করেনি। হঠাৎ করে তিলোত্তমার মোবাইলটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনের ওপর মিহিরের নাম। একবার, দুবার, তিনবার। ফোন তোলে না তিলোত্তমা। মেসেজ করে মিহির। ‘বিজি আছ? আজ সন্ধে সাড়ে সাতটায় ব্যাক কনফারেন্সে থেকো। আমি আসব। কথা আছে।’বরেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, ‘হুঁঃ! কী আর বলবে? দেখো হয়তো…।’ কথা শেষ হবার আগেই তিলোত্তমা বলে ওঠে, ‘আজকে আমি বলব। জিজ্ঞেস করব, কেন ঠকালে আমায়? কেন? কত স্বপ্ন দেখেছিলাম, একটা সন্ধে সেজে উঠবে হাজার হাজার আলোয়। মিহিরের শ্যুট করা আমার গানগুলো একটা বড়ো স্ক্রিনে বাজবে। অতিথিরা হাঁ করে দেখবে মিহিরের ক্যামেরা। শুনবে আমার গাওয়া গান। আর ঢোকার মুখটাতেই আলো দিয়ে লেখা থাকবে ‘তিলোত্তমা ওয়েডস মিহির।’ হাজার হাজার আলোর মধ্যে ঝলমল করবে দুটো নাম! বরেন, এই দুটো নাম পৃথিবীর কোনও শক্তি আলাদা করতে পারবে না। তুমি দেখে নিয়ো।’ কেউ না। শেষের কথাগুলো আহত সাপিনির মতো বলে চলে তিলোত্তমা। হতাশ হয়ে বরেন বলে, ‘এখনও স্বপ্ন দেখো?’
-হ্যাঁ দেখি। আমি দেখি।
কথাটা বলেই ফুঁপিয়ে ওঠে তিলোত্তমা। বরেন ঘাড় নীচু করে বলে, ‘আমায় একটু বেরিয়ে যেতে হবে তিলোত্তমা। আজ সন্ধের ট্রেনে আমি দেশের বাড়ি চলে যাব। কী হল জানিয়ো। অবশ্য যদি বন্ধু বলে মনে করো।
তারপর আমি আর কিচ্ছু জানি না বিশ্বাস করুন। পরের দিন তিলোত্তমার খবরটা পাই আমার দলের একজনের কাছ থেকে। আসলে মাঝরাতে আমি মোবাইল অফ করে দিই তো!’ বরেন পাশের ঘরে কথা শেষ করে। সায়ন বলে, ‘একটা মানুষ একটা মেয়েকে ঠকাতে পারে। একের বেশি নারীসঙ্গও করতে পারে। কিন্তু তাই বলে খুন! অত সহজ নয় বরেনবাবু।’
-অত কিছু দেখার, শোনার পরেও যে বলতে পারে মিহির আমার, মিহিরকে কেউ আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না, সে কি আত্মহত্যা করতে পারে সায়নবাবু? সেটা কি আপনার মনে হয়?
বরেনের কথায় সায়ন একটু ভেবে বলে, ‘কেসটা যখন রিওপেন হয়েছে তখন আসল ঘটনাটা বেরোবেই বরেনবাবু। আজ থেকে বারো বছর আগেই সল্ভ হয়ে যেত যদি না আপনি মহীতোষবাবুকে আপনাদের প্রেমের কথাটা পুলিশকে জানাতে বারণ করতেন। যাই হোক, আজকের মতো আপনার ছুটি। তবে একটা কথা, এই কেস চলাকালীন শহর ছেড়ে, নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবেন না। গেলেও আমাদের পারমিশন নিয়ে। মনে থাকবে?’ বরেন বোধহয় ঘাড় নেড়ে উত্তর দিয়েছে, তাই আর কোনও কথা শুনতে পেলাম না।
বরেন বেরিয়ে গেল। আমি বসে আছি সায়নের মুখোমুখি। টেবিলের ওপারে এসে সবে বসেছে দীর্ঘ বাক্যালাপের পর! ওকে একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আমি নিজেই বলে উঠলাম, ‘এখন বুঝতে পারছি, তিলোত্তমার আত্মা কেন আমায় বলেছিল ওই কথাটা, ‘কেন ঠকালে আমায়’! সায়ন একটু ছটফট করে বলে উঠল, ‘তাহলে খুনটা কি মিহিরই! আচ্ছা দাদাভাই, তোমাদের অফিসে আর কেউ সেই সময়কার নেই?’
-মহীতোষদা ছিলেন। তা সে তো আর…! আর একজন আছে। ইমনদা। যে আমাকে বরেনের ছবি দিয়েছে।
— ওকেও থানায় ডাকতে হবে।
কথাটা শেষ হতেই পাশের কোনও একটা ঘর থেকে সায়নের ডাক পড়ে। ডাকের ধরন শুনে বুঝলাম, বেশ জরুরি তলব। সায়ন ছুটল পাশের ঘরে। আমার আগ বাড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে বসেই রইলাম। মিনিট পাঁচেক পর ছুটে ঘরে ঢোকে সায়ন। টেবিল থেকে টুপি আর রুলটা তুলে আমায় বলে, ‘আমাদের এক্ষুনি বেরোতে হবে দাদাভাই।’ আমি হতভম্ব হয়ে বলি, ‘কোথায় যাব?’ সায়ন জানায় আমাকে নেওয়া যাবে না। এই অভিযানে আমার নাকি বিপদ হতে পারে। যাবার আগে পিঠ চাপড়ে বলে গেল, ‘পিকচার আভি তো শুরু হুয়া হ্যায় দাদাভাই। বহুত কুছ বাকি হ্যায়।’ আমি কিছু বোঝার আগেই দলবল নিয়ে হুড়মুড় করে সব বেরিয়ে পড়ে। আমার যে ঠিক কী করা উচিত তা বুঝতে পারলাম না। শুধু বুঝলাম, একটা ঝড় শুরু হয়েছে আর আমি বা আমরা তার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছোতে চলেছি। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করতেই . চমকে উঠি। চোদ্দোটা মিসড কল। এতক্ষণ তো এটার কথা মনেই ছিল না। সাইলেন্ট করে রেখেছিলাম। স্ক্রিন আনলক করে দেখি দশটা কল ইমনদা, দুটো আমাদের বিজনেস হেড সম্রাটদা এবং দুটো মৃন্ময়ী। কাকে ছেড়ে কাকে ধরি? মনে মনে স্থির করলাম পরপর আসা যাক। প্রথম কল ছিল ইমনদার। তাই তাকেই আগে কল করি। ‘কী রে ভাই? কোথায় ছিলিস সকাল থেকে? এদিকে তো রই-রই কাণ্ড’। উত্তেজনায় হ্যালোটাও বলেনি ইমনদা। ফোন ধরেই এক নিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে গেল। আরও বলল, ‘সম্রাটদা তোকে খুঁজছিল।’
— হ্যাঁ আমাকেও ফোন করেছে দেখলাম। কী হয়েছেটা কী? আমি তো আজ ছুটিতে।
কিছুটা গলা চেপে ইমনদা বলল, ‘আরে আজকেও তো সেম কাণ্ড। কানাইদা তো ছুটিতে। ওই ঘটনার পর অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’
-তাই না কি? তারপর?
-সেই জায়গায় গোবিন্দদা এসেছিল আজ সকালে।
-গোবিন্দদাও কি…!
— হ্যাঁ। একদম। হুবহু একই জিনিস দেখেছে। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। সিকিউরিটি দেখেছে। ওরা তো সব থার্ড পার্টির আন্ডারে আমাদের অফিসে কাজ করে। ব্যস! সবাই মিলে খেপে গিয়ে ওদের কোম্পানিকে জানিয়েছে। ওখান থেকে লোক এসে সম্রাটদাকে ধরেছে। বলছে এসব যখন হয়েছে তখন উনি কেন কোনও স্টেপ নেননি? আর ওদেরই বা কেন খবর দেননি? বিজনেস হেড হয়ে এটা কি অ্যাডমিনকে বলে ব্যবস্থা করা যেত না? অ্যাডমিনের মাধবীকেও উত্তাল ঝেড়েছে সব। এতদিন ধরে গোবিন্দদারা বলে যাচ্ছে, কিন্তু মাধবী নাকি কোনও স্টেপ নেয়নি। তারপরেই দেখি সম্রাটদা তোর খোঁজ করছেন। তুই একবার ফোন কর ভাই।
— হুমম! যা হয় ভালোর জন্যই হয় ইমনদা
-মানে?
স্বাভাবিক। এই সময় আমার মুখে এমন কথা শুনে ইমনকল্যাণ থ। বললাম, এদিকে তিলোত্তমার মার্ডার কেস রিওপেন করেছে পুলিশ। ঘটে গেছে আরও ঘটনা। ঠিক কী ঘটেছে বললাম না। শুধু বললাম দেখা হলে সামনাসামনি বলছি। এখন একবার সম্রাটদাকে ফোন করাটা খুব জরুরি।
বাধ্য হলাম থানা থেকে বেরোতে। কী জানি কোন কাজে আছে, তাই আর ফোন না করে সায়নকে হোয়াটসঅ্যাপ করে রাখলাম। এটাও বললাম আবার ফিরব থানায়। সবে সেক্টর ফাইভের অটোটা ছেড়েছে, দেখলাম সায়ন রিপ্লাই করেছে, ‘অবশ্যই ফিরো। খুব দরকার।’ আকাশে মে মাসের কাঠফাটা রোদ। কিন্তু আমার চোখে গোটা দুনিয়াটাই আগাপাশতলা রহস্যের মেঘে ঢাকা। সম্রাটদার সামনে যখন বসে আছি তখন খেয়াল করি এই প্রথম ওর মুখে চোখে গভীর চিন্তার ছাপ। সকালের ঘটনার জন্যই আমার জরুরি তলব। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর উনি বললেন, ‘আমি কী করব, কোথায় যাব? এইসব ভূতুড়ে কাণ্ড তো আর মুম্বাইতে জানানো যায় না। ব্যাপারটা কী হচ্ছে আর কেনই বা হচ্ছে একমাত্র তুমিই জানো। অন্তত অফিসের সবার তাই ধারণা।’ আমি খুব ঠান্ডা মাথায় বলি, ‘সম্রাটদা, একটা কথা এই মুহূর্তে আপনি মাথায় রাখুন। এই পরিস্থিতি থেকে বেরোতে গেলে আমি যা করছি বা যা করব তাতে আপনার সহযোগিতা ভীষণ জরুরি।’
-কীভাবে?
আমি বললাম, ‘গোটা ঘটনা এক্ষুনি বলা সম্ভব না। শুধু এটুকু জেনে রাখুন, আজ থেকে বারো বছর আগে এই অফিসে একটা মা…’ বলেও থেমে যাই। নিজেকে সামলে আবার বলতে শুরু করি, ‘একটা দুর্ঘটনা ঘটে, যেটা আত্মহত্যা না খুন সেটা জানা যায়নি। এই যে একটা মেয়ে অশরীরী হয়ে দেখা দিচ্ছে এটা মনের ভুল নয়। এই মেয়েটিকে ঘিরেই রহস্যের জাল। আর এর কেন্দ্রবিন্দু আমি।’ ‘আমি’ শব্দটা শুনে চেয়ারে এলিয়ে থাকা সম্রাটদার ভারী শরীরটা সটান হয়ে বসে, ‘তুমি! মানে!’
-আমি মানে অনেক কিছু। ওই মেয়েটার আত্মা আমাকে খুঁজতেই আসে। প্রভাতি সংগীতের যে চারটে এপিসোড নষ্ট হয়ে গেছে, সেই চারটেতে এই মেয়েটিরই গান ছিল। রোজ সকালে ওই অনুষ্ঠানে সে নিজেকে খুঁজতে আসে।
— হোয়াট? মিহির, এটা কি হরর ফিল্মের গল্প নাকি?
-ধরে নিন তাই। আপনাকে এই মুহূর্তে সব কথা বলা যাবে না, আর বললেও আপনি বুঝবেন না। শুধু এটুকু জানুন, এতে শুধু এই অফিস নয়, আমি এবং আমার স্ত্রী ও আমার দেড় বছরের বাচ্চাটাও মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছি। আপনি সাহায্য না করলে অনেক মৃত্যু ঘটবে চোখের সামনে, যার জন্যে দায়ী হবেন আপনি।
আমি নিজেও যেন আমার কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কী করে এমন রসালো ভয়ংকর রহস্য করে কথা বললাম? হয়তো এই অবস্থাই আমাকে দিয়ে বলাল। যাই হোক, বুঝলাম সম্রাটদা এসির মধ্যে বসেও ঘামছেন। থম মেরে বসেই বললেন, ‘আমায় কী করতে হবে?’ এইটারই অপেক্ষায় ছিলাম। সুযোগের সদ্ব্যবহার করলাম। বাইরে রিসেপশনে বেশ কিছুক্ষণ হল নীলাম্বরবাবু বসে আছেন। ইমনদার মুখে সব শুনেই স্থির করি আজই সম্রাটদার কাছ থেকে পারমিশন আদায় করে কাজ সেরে ফেলতে হবে। থানা থেকেই ফোন করি নীলাম্বরবাবুকে।
সম্রাটদার পারমিশনে খোলা হল বারো বছরের বন্ধ দরজা। মাঝে মেন্টেনেন্সের কাজ ছাড়া যাতে হাত পড়েনি কখনও। উৎসুক মানুষের চোখ যে দরজার কাছে এসে থমকে গেছে, এত বছর ধরে কল্পনা করেছে ওপারে থাকা একটা ভৌতিক জগতের, আমি, সম্রাটদা, ইমনদা আর নীলাম্বর ব্যানার্জি বাদে আর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হল না মিহির আর তিলোত্তমার প্রেমযাপনের ব্যাক কনফারেন্স রুমে। ভিতরটায় কেমন একটা গুমোট গন্ধ। দরজার উলটোদিকের মন্ত্র লেখা দেয়ালের জানলাটা কত বছর হল নিজেদের বন্ধ করে রেখেছে। আর যে কেউ জ্যোৎস্নার আলোয় মুখ পেতে গান গায় না তার প্রেমিককে শুনিয়ে। উলটোদিকের এই দেয়ালটা ছাড়া বাকি দু-পাশে সাদা কাচের দেয়াল। তাই তেরো নম্বর ফ্লোরের মতো ঘুটঘুটে অন্ধকার নয়। ওই ফ্লোরটায় হঠাৎ কালো কাচ দিয়ে যে কে ঢাকল কে জানে? কাচের দেয়ালের দিকে মেঝে থেকে ফুট তিনেক সিমেন্টের দেয়াল গাঁথা। নীলাম্বর বললেন, ‘বারো বছর আগে এই মেঝের দেয়ালটা ছিল না নিশ্চয়ই।’ ইমনদা উত্তর দিল, ‘না। তখন কাচের দেয়ালটাও ছিল না। একেবারে ন্যাড়া।’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন নীলাম্বর। ইমনদা নিজে থেকেই বলল, কাচের দেয়ালগুলোর দিকে আর আমাদের অফিসের দিকে, মানে যেদিক দিয়ে আমরা এলাম সেদিকের দেয়ালের অর্ধেক অংশ প্লাই দিয়ে ঢাকা হয়েছিল। শুটিংয়ের জন্য একটা নকল ঘর করা হয়েছিল। ভিতরে শুটিং হত। ‘বাইরের সাউন্ড আসত না?’ নীলাম্বর জিজ্ঞাসা করলেন। ইমনদা বলল, ‘তখন এ-তল্লাটে এত অফিস ছিল না। তাই আওয়াজও কম ছিল। তার ওপর পঁচিশ তলায় পাখির ডাক ছাড়া খুব একটা কিছু শোনা যেত না।’ মাটিতে কী যেন দেখতে দেখতে নীলাম্বর বললেন, ‘ছাব্বিশ তলা।’ আমরা সেকেন্ডের জন্য থেমে গেলাম। নীলাম্বরই মাটির দিক থেকে মুখ তুলে হেসে বললেন, ‘পঁচিশ নম্বর ফ্লোর মানে ছাব্বিশ তলা।’ ইমনদা একটু লজ্জার হাসি হাসল। পুরো ফ্লোরটা ঘুরে দেয়ালে লেখা মন্ত্রগুলো দেখে গলায় রহস্য এনে বললেন, ‘বারো বছরের মন্ত্র। ধুলো পড়ে গেছে।’ ঠিক বুঝলাম না উনি কী বলতে চাইলেন। সম্রাটদা এতক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বললেন, ‘আচ্ছা, এখানে ভূতের কোনও চিহ্ন পেলেন?’ নীলাম্বর মনোযোগ দিয়ে চারপাশ দেখতে দেখতে বললেন, ‘হুমমম!’ সম্রাটদা চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায়?’ইমনদাও স্থির। নীলাম্বর উলটোদিকে চেয়েই বললেন, ‘আপনার পাশে। চোখের পাতা পড়ারও সময় দিলেন না সম্রাটদা। তড়াক করে এক লাফে নীলাম্বরের গায়ের কাছে। এবার নীলাম্বর তাকালেন। তাকিয়েই হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘আরে মশাই কত লোকে সাধ্য সাধনা করেও ভূতের দেখা পায় না। অবিশ্যি মিহির সরখেল আর আপনাদের অফিসের কিছু লোকজনের ক্ষেত্রে এই কথা খাটে না।’ সম্রাটদার চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু বেচারা! গেট আউট বলার ক্ষমতাও নেই এখন। আমি মনে মনে বেশ খুশিই হলাম। কানাইদা যখন মাটিতে পড়ে অমন থরথর করে কাঁপছিল তখন ব্যাটা রসিকতা করে অনেক কথা বলেছিল। এমন ভাব দেখিয়েছিল যেন ভূত ওনার পুত। নীলাম্বরবাবু সেই ভাবের হাঁড়ি একদম ফাটিয়ে দিলেন। হঠাৎ নীলাম্বরকে দেখলাম অদ্ভুত কাণ্ড করতে। নিজের লকেট সমেত রুদ্রাক্ষ পরা হাতটা মুখের সামনে নিয়ে কী যেন বিড়বিড় করলেন। তারপরেই আমাদের চোখের সামনে নিজের দু-চোখ বন্ধ করে পিছন দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। পৌঁছে গেলেন দরজার কাছে। সেখান থেকে হঠাৎ সামনের দিকে খানিক লুকিয়ে দৌড়োবার ভঙ্গিমা করে দরজা বরাবর সোজা এসেই ডানদিকে মানে তিলোত্তমা যেদিক দিয়ে পড়েছে সেদিকে ঘুরে গেলেন। তারপর আবার নিজের শরীরটাকে বেশ খানিকটা নীচু করে লুকিয়ে দৌড়ে এক জায়গায় গিয়ে ঘাপটি মেরে বসলেন। নীলাম্বরকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাকে চালনা করছে। ইমনদা অবাক হয়ে আমায় ঠ্যালা মারল। আমি দুটো কাঁধ তুলে ঘাড় নাড়লাম। আমারও কিছু মাথায় ঢুকছে না। এর পরেই নীলাম্বর আবার ওই একইরকমভাবে দরজার কাছে গেলেন। তারপর খুব সাধারণভাবেই হেঁটে ঢুকে এপাশ-ওপাশ তাকালেন। যদিও দুটো চোখই তার বন্ধ ছিল। তারপর দু-পা পিছু হটে আমাদের অফিসের দিকের দেয়াল ঘেঁষে সোজা কাচের দেয়ালের দিকে গিয়ে দাঁড়ালেন। সম্রাটদা হাঁ করে দেখছেন। হয়তো ভাবছেন নীলাম্বর এমন করেই ভূত ধরেন বুঝি। সত্যিই এবার অবাক হবার পালা নীলাম্বর আবারও দরজার কাছ থেকে চোখ বন্ধ করে দু-পা ঢুকেই ডানদিকে ঘাড় ঘোরান। তারপর এগোতে থাকেন কাচের দেয়ালের দিকে। কিছু পা এগিয়ে ঝট করে দৌড়ে কাচের দেয়ালের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে যান। কিন্তু নিজেই পিলার ধরে সামলে নেন। আমি, ইমনদা, সম্রাটদা তিনজনেই ‘এইইইই’ বলে আঁতকে উঠে ছুটে যেতে যাই নীলাম্বরের দিকে। কারণ এখনও পড়লে বেশ বড়ো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু নীলাম্বর সামলে নেওয়াতে আমরাও নিজেদের থামিয়ে দিই। নীলাম্বর হাঁফাতে হাঁফাতে আমাদের দিকে ফেরেন। কাচের দেয়াল দিয়ে আসা দিনের আলো আর ভিতরের অন্ধকারে দেখি নীলাম্বরের চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নীলাম্বর এগিয়ে আসেন। আমরাও এগিয়ে যাই। ‘নীলাম্বরবাবু, নীলাম্বরবাবু’, দু-বার ডেকে থেমে যাই। খেয়াল করি নীলাম্বরের চোখ দুটো আবার তার স্বাভাবিক রং ফিরে পাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে নীলাম্বরের ওপর দিয়ে যেন এক বড়ো ঝড় বয়ে গেছে চোখের নিমেষে। ‘কী হয়েছে নীলাম্বরবাবু?’ এবার ইমনদা প্রশ্ন করল। জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে নিতে নীলাম্বর বললেন, ‘বড়ো ভয়ানক সে দৃশ্য। সাংঘাতিক ধুরন্ধর সেই মানুষ!’ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে নীলাম্বর বললেন, ‘একজন নয়, দুজন নয়, তিনজন ছিল এখানে। গ্রহণ ছিল সেদিন। কেউ জানত না।’ ‘মানে তিলোত্তমা আর মিহির ছাড়া আরও একজন?’ আমার কথায় শুধু হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নেড়ে জবাব দেন নীলাম্বর। আমি ভাবতে থাকি। বুঝতে পারি পাশ থেকে আস্তে আস্তে সরে গেল ইমনদা। সম্রাটদা জানতে চাইল, ‘এরা কারা? কাদের কথা বলা হচ্ছে জানতে পারি?’ দূরে আমাদের দিক থেকে পিছন ফিরে ইমনদা বলল, ‘তিলোত্তমা। এই অফিসেই চাকরি করত। খুব ভালো গান গাইত। মিহির ছিল এই চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান। আরেকজন ছিল লাইটম্যান। বরেন রায়।’ আমি হাত ধরে ইমনদাকে আমাদের দিকে ঘুরিয়ে নিই। বলি, হঠাৎ বরেনের কথা বললে কেন?’ ইমনদা চুপ। কী গো বলো, বরেনের কথা তুললে কেন?’ আবার বলাতে ইমনদা যেন কোন সুদূর অতীতে ডুব দিয়ে বলল, ‘জানিস মিহির, সেদিন আমি একটা জিনিস দেখেছিলাম।’
-কী দেখেছিলে?
আমার মতোই সম্রাট আর নীলাম্বর হাঁ করে শুনতে থাকে ইমনদার কথা। ইমনদা বলে, ‘আমি তখন বাথরুমে। ওখান থেকেই হঠাৎ গোলযোগের আওয়াজ পাই। ঠিক বুঝতে পারি না। তারপর মিনিট পাঁচেক বাদে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি অফিস ফাঁকা। তখন সুবোধদা বলে একজন আমাদের চা-টা দিতেন। উনি আমায় দেখে বলেন, ‘ইমনদা, আপনি নীচে যাননি?’ আমি অবাক হয়ে বলি, ‘না, আমি বাথরুমে ছিলাম। কিন্তু কী হয়েছে বলো তো? খুব হইচই শুনছিলাম। আর সব গেলই বা কোথায়? সুবোধদা বলল, ‘আমাদের তিলোত্তমা দিদি গো, ওপর থেকে সে-ই নীচে পড়ে গেছে।’ আমার তো শুনে হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছিল। আমি আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে আমার ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম মোবাইলটা নিতে। ঘরে ঢুকতে যাব হঠাৎ মনে হল কে যেন আমাদের এই করিডোরের সামনে দিয়ে এপাশ থেকে ওপাশ, মানে এই শুটিং ফ্লোরের দিক থেকে দৌড়ে লিফটের দিকে গেল। আগু-পিছু কিছু না ভেবে আমিও দৌড়োলাম। দেখলাম, মাথা থেকে আপাদমস্তক কালো চাদর ঢাকা দিয়ে কে যেন ছুটে যাচ্ছে। লিফটের দিকে গেল না, গেল সিঁড়ির দিকে। আমার খুব সন্দেহ হল। একে মে-মাসের গরম, তার ওপর অমন কালো চাদরে ঢেকে ঘাপটি মেরে চোরের মতো পালাচ্ছে কেন? আমি একটাও কথা বলিনি। কিন্তু শেষমেশ লোকটার গোপনীয়তা রক্ষা হয়নি। যেই সিঁড়ির দিকের ভারী দরজাটা খানিকটা খুলে বেরোতে গেছে অমনি দরজার হাতলে লেগে চাদরের আড়াল সরে যায়। মুখটা দেখতে পাই। সাইড ফেস। সে আর কোনওদিকে না তাকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে যায়। আমি কাউকে বলিনি এ-কথা। একটা সময় নিজেও ভুলে গেছিলাম। কিন্তু আজ নীলাম্বরবাবুর কথা শুনে….।’’কে ছিল লোকটা? চেনো তুমি তাকে?’ আমার কথা শুনে ঘাড় নেড়ে ইমনদা বলল, ‘লাইটম্যান বরেন রায়।’ আমার সন্দেহই ঠিক। রীতিমতো হাতের পাখি বেরিয়ে যাবার আপশোশে গলা চেপে সমগ্র উত্তেজনা একত্র করে বলে উঠলাম, তখন কেন পুলিশকে বলোনি? কেন বলোনি?’ ইমনদা মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, ‘তখন ইন্ডাস্ট্রিতে আমি নতুন। কী বলতে কী বলব! হয়তো না বুঝেই কারও ক্ষতি করে ফেলব। অথবা বরেনের যা কীর্তিকলাপ শুনেছি তাতে অলরেডি ও একটা পুলিশের কেসে ফেঁসে ছিল। আমাদের ধারণাই ছিল বরেন ভালো লোক নয়। তারপর আমি বলেছি শুনে সে যদি কিছু করে? আসলে আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম রে! বিশ্বাস কর। এই কথাটা মহীতোষদাকেও বলিনি। এমনকি তুই যখন বরেনের ছবি নিলি আমার কাছ থেকে, ওর সম্পর্কে খোঁজখবর করছিস তখনও আমার একটু আপত্তি ছিল। একেই ভৌতিক সমস্যায় ফেঁসে আছিস, তার ওপর এইসব খুনখারাপির মধ্যে নিজেকে কেন জড়াবি ভেবে আমি কিছু বলতে চাইনি।’ ইমনদা আমার হাতটা ধরে কথাগুলো বলে। আমি বললাম, ‘এতদিন বলোনি ঠিক আছে। কিন্তু আজ তোমায় বলতে হবে এই কথাগুলো ভ্রূ কুঁচকে ইমনদা বলে, ‘কাকে?’
— পুলিশকে।
চমকে ওঠে আমার কথা শুনে। আমার হাতটা ছেড়ে দেয়। আমি এবার ইমনদার হাত ধরে আশ্বাস দিয়ে বলি, ‘ভয় পেয়ো না। তোমার কোনও ক্ষতি হবে না। বিধাননগর থানার ওসি আমার ভগ্নীপোত। তুমি নিশ্চিত্ত থাকো।’ ব্যাক কনফারেন্সের দরজা আবার বন্ধ হয়ে যায়। নীলাম্বর জানান যে খুব শিগগিরি এর একটা বিহিত করতে হবে, নইলে তোমাদের অফিসে ওর যাওয়া-আসা বন্ধ হবে না। সম্রাটদাকে বলেন, ‘প্রভাতি সংগীতের রি-টেলিকাস্ট বন্ধ করতে হবে আপনাকে।’ সে তো শুনেই কপাল চাপড়ে ফেলে। হেড অফিসে কী বলবে? ভূতের জন্য প্রোগ্রাম বন্ধ! এটা কখনও সম্ভব! ‘সে আপনি কী বলবেন আপনার ব্যাপার। এটা বন্ধ না হলে আরও ক্ষতি হবে। যদি না দু-তিনদিনের মধ্যে এর কোনও সুরাহা করা যায়!’ কথাগুলো বলেই নীলাম্বর বললেন, ‘তেরো নম্বরে যাব একবার।’ শুনেই পিলে চমকে গেল। আমার মুখ দেখে উনি বললেন, ‘তোমায় যেতে হবে না মিহির। আমি একা যাব। ‘অসম্ভব। জেনেশুনে আমি কিছুতেই ওই মৃত্যুপুরীতে আপনাকে ছেড়ে দিতে পারি না।’ লিফটের বোতাম টিপে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘মিহির আমার ঠাকুরদা ছিলেন অঘোরী সাধক। বাবা তন্ত্রশিক্ষা করেছিলেন, তবে অঘোরী হতে পারেননি। চানওনি। আমিও বাবার কাছ থেকে এবং আমার গুরুর কাছ থেকে তন্ত্রশিক্ষা করেছি। প্রেতলোকে আমার বেশ জানাশোনা আছে।’ শেষের কথাগুলো হেসে বললেও আমি যেন কিছুতেই ভরসা পাচ্ছিলাম না। উনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তিলোত্তমার মৃত্যুর দিনই তো মিহিরের জন্মদিন ছিল তাই না?’
— হ্যাঁ।
— ডেটটা মনে আছে?
ইমনদা বলল, ‘চব্বিশে বৈশাখ’। বাংলা তারিখ শুনে নীলাম্বর আর আমি ইমনদার দিকে তাকালাম। চট করে তো কেউ বাংলা তারিখ মনে রাখে না! ইমনদা বলে, ‘আসলে পরের দিন পঁচিশে বৈশাখ ছিল বলেই ডেটটা মনে আছে। তিলোত্তমার প্রোগ্রাম ছিল রবীন্দ্রসদনে।’ ‘চব্বিশে বৈশাখ মানে মে মাসের আট কিংবা নয় তারিখ। আজকে মে মাসের ছয়! আজ বাইশে বৈশাখ! মানে শিয়রে সংক্রান্তি!’ নিজের মনেই আওড়ালেন নীলাম্বর। লিফটটা এসে তেরোতে থামল। উনি অনায়াসে ঢুকে গেলেন সেই প্রেত-অন্ধকারে। বললেন, ‘আমার জন্য ভেব না। দরকার পড়লে আমিই থানায় গিয়ে একবার দেখা দিয়ে আসব।’ আমি আর ইমনদা চলে গেলাম থানার উদ্দেশে। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধে হব-হব। থানার সামনে অটো থেকে নামছি আর ঠিক তখনই সায়নের ফোন। ফোনটা না ধরেই ঢুকে গেলাম থানায়। আমাদের দেখেই সায়ন বলল, ‘ঠিক সময়ে এসেছ। চলো আবার ইন্টারোগেট করতে হবে।’ বলেই ইমনদার দিকে তাকাল। আমি ইমনদার পরিচয়টা নিয়ে বললাম, ‘ইমনদা আজ একটা দারুণ খবর দিল এই কেসের ব্যাপারে।’ ‘তাই নাকি? শুনি কেমন!’ বলে আবার নিজের সিটে বসে বসে পড়ল সায়ন। সবটা শুনে হাসল। বলল, ‘আপনিও চলুন।’ ইমনদা তো ভয়েই মরে গেল। ইন্সপেক্টর, আমার যা বলার তা তো সব বললাম। আবার আলাদা করে ঘরে ঢুকিয়ে ইন্টারোগেট! এই মিহির…।’ ইমনকল্যাণের থরহরি কম্প অবস্থা বুঝে সায়ন হাসতে হাসতে বলল, ‘আরে দাদা আপনাকে ইন্টারোগেট করব না। মধু শা নামে এক ব্যক্তিকে একটু আগে আমরা গ্রেপ্তার করে এনেছি। ইন্টারোগেশনটা তার হবে। আপনি আর দাদাভাই, মানে মিহির সরখেল ঠিক তার পাশের ঘরে বসে সব শুনবেন আর অবাআআআআক হয়ে যাবেন। চলুন। সময় নেই।’
আমার আর ইমনদার কান খাড়া। সায়ন শুরু করল। ‘এবার বলুন তো, বরেনের সঙ্গে কদ্দিন?’ গমগমে গলাটা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, ‘কীসের স্যার?’
-বাবা! ভাজা মাছটা তো উলটে খেতে পারেন না দেখছি! তাহলে আমাদের দেখে পালাচ্ছিলেন কেন?
— ভয়ে, ভয়ে। পুলিশ তো আপনারা, তাই।
-এক থাপ্পড় মারব। পুলিশ কি ভূত না পেতনি যে সাধারণ মানুষ ভয় পাবে? আপনি ভয় পেলেন কেন? কী সম্পর্ক বরেনের সঙ্গে আপনার?
-বরেন কে?
— ন্যাকাচণ্ডী! বরেন হল অলোক সাহা। প্রোডিউসার। বারো বছর আগে যে লাইটম্যান ছিল। মনে পড়ছে?
সায়নের নাটুকে গলার কথাগুলো শুনে ইমনদা তো অবাক। ফিশফিশ করে আমার কানে বলল, ‘কী বলছে রে?’
আমি ঠোঁটে আঙুল দিলাম। ইমনদা চুপ। ওপার থেকে ভেসে আসছে মধু শা-র গলা। ‘বিশ্বাস করুন স্যার। ওসব সম্পর্ক-টম্পর্ক কিছু না। আমি একটা সময়ে অ্যাক্টিং করব বলে ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলাম। বরেন বলেছিল সুযোগ করে দেবে। সেই সূত্রেই চিনতাম। আর কিছু না।’ শান্ত গলায় সায়ন বলে, ‘আচ্ছা। কোথায় অ্যাক্টিং করেছিলেন? তেমন বিশেষ কিছু না স্যার। ওই তখন পাইলট এপিসোড হত। সেখানেই ছুটকো-ছাটকা পার্ট।
-বরেন, মানে অলোক সাহার সঙ্গে এখন আর যোগাযোগ আছে?
— না স্যার। কোনও যোগাযোগ নেই।
-কেন?
— ও কোনও কাজই দিতে পারল না।
— একদম যোগাযোগ নেই?
— না স্যার। সত্যি বলছি।
— ঠিক কথা। সত্যিই তো আপনি সত্যি বলছেন। পাকড়াশিইইই…
সায়ন হাঁক দিল। তারপর একটা লোহার দরজা খোলার আওয়াজ। বুঝলাম একটা লোক ঢুকে আবার বেরিয়ে গেল। সায়নকে বলতে শুনলাম, ‘এটা শুনুন তো মিস্টার মধু শা।’ বলেই একটা অডিয়ো বাজতে শুরু করল। প্রথমে একটা ভোজপুরি গান শোনা গেল। তারপরেই মোটা মতো গলা, ‘হ্যাঁ, বরেনদা বলো।’ উলটোদিক থেকে একটা খিস্তি উড়ে গেল। ‘বানচোদ! কতবার বলেছি এই নামে ডাকবি না।’ আবার উলটোদিকের মোটা গলা, ‘সরি বস। আসলে পুরোনো অভ্যেস, কী করব?’
— দশ বছরেও পালটাল না!
— বললাম তো সরি। অলোকদা, বলো।
-মধু। আমাদের মাথায় কিন্তু খাঁড়া ঝুলছে।
-মানে?
— এইমাত্র আমি থানা থেকে বেরোলাম। তিলোত্তমার কেসটা মনে আছে?
— তিলোত্তমা! (একটু ভেবে) ওওওও! তোমার জানেমন?
লাথ খাবি শালা! জানেমন না হাতি! ঢেমনিটা মরেও শান্তি নেই।
— কেন হয়েছেটা কী?
— পুলিশ আবার কেস রি-ওপেন করেছে।
— সে কী! হঠাৎ!
— ওই চ্যানেলের একটা ছোঁড়া। ওরও নাম মিহির। মিহির সরখেল। তার কী চুলকুনি জেগেছে কী জানি, সেও এসবের মধ্যে আছে।
— বুঝলাম না বরে…অলোকদা!
-বেশি বুঝে কাজ নেই। পুলিশ আমায় ডেকেছিল। প্রচুর জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়েছে। আমি ভুজুং-ভাজুং দিয়ে ব্যাপারটা সালটেছি। তবু সাবধানের মার নেই। কী খুঁড়তে কী বেরিয়ে পড়ে। এই কেসে তুইও তো আছিস, তাই তোকে জানালাম।
-আমি আছি? কীভাবে?
— ও শালা! কীভাবে মনে নেই?
-অলোকদা, আমি শুধু তোমার কথায় ঝিমলির সঙ্গে অ্যাক্টিং করেছিলাম। ব্যস! মেয়েটা যে খুন হয়ে যাবে কে জানত? তা ছাড়া আমি তো সত্যিই কিছু জানি না আর। এসবের মধ্যে আমায় টেনো না প্লিজ।
— টানছি না। শুধু তোকে জানিয়ে রাখলাম। যদি কোনওভাবে তোকে ধরে তাহলে জাস্ট ঢপ মেরে বেরিয়ে যাবি। বুদ্ধি করে বলবি।
খট। একটা শব্দ হয়। বুঝলাম অডিয়ো রেকর্ডার বন্ধ হল। তারপরেই মধু শা-র হাউমাউ কান্না। ‘আমি কিচ্ছু করিনি স্যার। আমি কিচ্ছু জানি না। মা কসম! আমায় বরেন শুধু বলেছিল একটা অ্যাক্টিং করতে হবে স্যার। মা কসম!’ সায়ন ধমক দিয়ে থামাল মধুকে। সায়ন অভিনয়ের ব্যাপারটা জানতে চাইল। মধু বলতে শুরু করল। ‘আমি অনেকদিন ধরেই বরেনের পিছন পিছন ঘুরছিলাম। ইচ্ছে ছিল অ্যাক্টর হব। ওর সঙ্গে কিছু শুটিং দেখতেও যেতাম। প্রভাতি সংগীতেও গেছিলাম দু-তিনদিন। হঠাৎ একদিন বরেন আমায় ফোন করল। বলল, তোকে আজকেই একটা অ্যাক্টিং করতে হবে। আমি বললাম কোথায়? কোন সিরিয়ালে? বলল, সিরিয়ালে নয়। একেবারে রিয়েল অ্যাক্টিং। আমি বললাম, মানে? ও বলল, একটা মেয়ের শরীরকে ভালোবাসতে হবে। লজ্জা পেলে চলবে না। মেয়েটা আমি ঠিক করে দেব। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বরেন গম্ভীর হয়ে বলল, এই অভিনয়টা সালটে দিতে পারলে যেটার পাইলট শ্যুট করেছিলি সেটাতে কাজ বাঁধা। অবশ্য এটার জন্যেও টাকা পাবি। লেখাপড়া ছেড়ে তিন বছর ধরে টালিগঞ্জ পাড়ায় ঘুরছিলাম। জুতোর সুকতলা খসে গেছিল। আমিও মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। হ্যাঁ বলে দিলাম। শুধু জিজ্ঞেস করলাম, কস্টিউম কী হবে? বরেন বলল, ওটা আমি দেব। তুই শুধু একটা কালো জিন্স পরে চলে আয়। পৌনে তিনটের মধ্যে ঢুকে যাবি। এক মিনিটও দেরি হলে অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেব। আমি বললাম, না না দেরি হবে না। আমি এখুনি যাচ্ছি। আড়াইটের মধ্যে সল্টলেক পৌঁছে যাই। ঝিমলির সঙ্গে আলাপ করিয়ে আমাদের তেরো নম্বর ফ্লোরে নিয়ে যায়। তারপর একটা হলুদ রঙের পাঞ্জাবি দিয়ে সেটা পরে নিতে বলল। আমাদের বুঝিয়ে দিল ঠিক কী করতে হবে। বারবার বলল, কোনওভাবে আমার মুখ যেন দেখা না যায়। আর আমি যেন কোনও কথা না বলি। কেবল ঝিমলি ডায়লগ বলবে। আর ও যখন আমায় মিস কল দেবে তখন অ্যাক্টিং শুরু করতে হবে। বরেনের কথামতোই কাজ হল। বিশ্বাস করুন স্যার, আমি তখনও জানতাম না ঠিক কেন, কী কারণে এই অভিনয়। সব কাজ হয়ে যাবার পর…।’ মধুকে থামিয়ে সায়ন বলল, ‘ঠিক কী কাজ করলেন আপনি?’ তারপর মধুও চুপ। সায়ন আবার বলল, ‘কী হল? কী কাজ করলেন ডিটেলসে বলুন। মধু আমতা আমতা করে বলল, ‘ওই ঝিমলির সারা শরীরে চুমু খেলাম। সেক্স করার অ্যাক্টিং করলাম।’
— হুমম! ঝিমলি রাজি হল?
-হুমম। এর আগে আমি ঝিমলিকে চিনতাম না। সেদিনই আলাপ। ঝিমলি ও জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করত। ওকেও আমার মতো একই কথা বলেছিল।
-ঝিমলি বলেছিল এ-কথা?
— হ্যাঁ।
— তিলোত্তমার খুন হবার খবরটা কখন শুনলেন?
— রাতে। বরেনদাই বলল।
— বরেন বলল! ফোন করে?
— না না। ফোন কেন করবে? বরেন তো সে রাতে আমার বাড়িতেই ছিল।
কী! আপনার বাড়িতে! তার মানে দেশের বাড়ি যায়নি সে রাতে?
দেশের বাড়ি! নাহ্! বরেনদা তো রাত আটটার পর আমার বাড়িতে এল। রাতে একসঙ্গে একটু মদ খাচ্ছিলাম। তখন কে যেন ফোন করে বরেনদাকে জানাল খবরটা।
— হুমম! বরেনের সাথে কিছু ছিল?
-সাথে! (একটু ভেবে) ওই একটা কালো চাদর।
পাশের ঘর থেকে এই কথা শুনেই ইমনদা আমার দিকে চাইল। ইমনের দেখা যে এক্কেবারে সত্যি তা এবার হাতেনাতে প্রমাণ হল। সায়নের প্রশ্ন চলতে থাকে, ‘মে মাসের গরমে চাদর! আপনি কিছু জিজ্ঞেস করেননি? এই চাদরটা কেন?’
— করেছিলাম। বলল, তোদের যদি লুকিয়ে পালাতে হয় তাই এনেছিলাম। – ক-টা চাদর ছিল?
— একটাই।
— বাহ্! দুজন মানুষকে ফিট করল আর চাদর আনল একটা?
— তাই তো! এত ভেবে দেখিনি স্যার।
— বুঝলাম। ঢপের কেত্তন মারাতে বরেন রায়ের জুড়ি নেই। আচ্ছা, ঝিমলি এখন কী করে? কোথায় আছে জানেন?
— হাউস ওয়াইফ। আমার বাড়িতেই থাকে।
-হোয়াট!
— ঝিমলিকে আমি পরে বিয়ে করি।
— ফাক!
.
শব্দটা উচ্চারণ করেই খুব দ্রুততার সঙ্গে একটা হাঁক পাড়ে। ‘পাকড়াশিইইইই’।
এর পরেই লোহার গেট খোলার শব্দ হয়। মধু চিৎকার করে অনুরোধ করতে থাকে, ‘স্যার। ঝিমলি কিছু করেনি স্যার। ওকে অ্যারেস্ট করবেন না। প্লিজ স্যার।’ মধুর কথা শুনে বুঝি সায়ন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। আমরাও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসি। দেখি পাকড়াশিকে সায়ন বলছে মধুকে হেফাজতে রাখতে। আর এক্ষুনি দুটো ফোর্স রেডি করতে। চারজন মহিলা কনস্টেবল দিয়ে একটা পুলিশ ফোর্স মধু শা-র বাড়ি থেকে ওর ওয়াইফকে তুলবে আর আর-একটা সায়নের সঙ্গে যাবে বরেনকে বরণ করতে। কুইক। আমাদের দেখতে পেয়ে সায়ন বলে, ‘শুনলে তো সব। আজ রাতেই ধামাকা হবে এক চোট।’ কথাটা বলতে বলতে একটা ঘরে ঢুকে যায় সায়ন। আমরাও পিছু নিই। সেই ঘরে তিন-চারজন হেডফোন কানে দিয়ে বসে। সায়ন তাদের জিজ্ঞেস করে, আর কিছু পেলে তোমরা? বরেন আর কাকে ফোন করল?’ একজন বলল, ‘ওর প্রোডাকশানের লোকের সঙ্গে দু-তিনবার কথা হয়। আর ওর বাড়ি থেকে দুবার ফোন আসে। একবার ওর মেয়ে। আরেকবার স্ত্রী।’ ‘তার মানে পাখি এখনও খাঁচাতেই আছে’, নিজের মনে বলেই গলা তুলে ফোর্স রেডি হয়েছে কিনা তার খবর নেয়। একজন হঠাৎ বলল, ‘ও স্যার, একদম ভুলেই গেছিলাম। তিলোত্তমার বাড়ির নম্বর। মোবাইল।’ আমি একেবারে হামলে পড়লাম, ‘পেয়েছেন?’ ‘হ্যাঁ। তিলোত্তমার নম্বরটাই এখন ওর মা ইউজ করেন।’ এত কিছুর চক্করে আমি ভুলেই গেছিলাম নীলাম্বরের কথা। সে যে মৃত্যুপুরীতে ঢুকেছিল, বেরিয়েছে কি আদৌ? সায়ন বলল, ‘ইমনবাবু আপনি বাড়ি যেতে পারেন। তবে প্লিজ এই মুহূর্তে স্টেশন লিভ করবেন না। বুঝতেই পারছেন। ‘ ‘না না চিন্তা নেই। অফিসে যা চাপ তাতে স্টেশন লিভ করার কোনও জায়গা নেই’, ইমনদার কথা শুনে সায়ন ধন্যবাদ জানাল। ইতিমধ্যে পাকড়াশি ফোর্স রেডি হওয়ার খবর জানিয়ে গেল। সায়ন বলল, ‘দাদাভাই, তুমিও বাড়ি যাও। যা হবে আমি তোমায় আপডেট দেব।’
— না সায়ন। সবটা জানলাম আর শেষটুকু বাকি রাখব কেন? আমি থানাতেই থাকব। আমি নিজে কানে শুনতে চাই বরেন আর ঠিক কী কী করে তার ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়েছে।
সায়ন আমার কথা শুনে আর বাধা দিল না বা কথাও বাড়াল না। একটু হেসে ওর ডান হাতটা দিয়ে আমার বাঁ-হাতটা জোরে চেপে শরীরটাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে গেল, ও যেন এই স্পিরিটটাই আশা করেছিল। ভালোই হল। বাড়িতে একা ভূতের ভয়ে রাত কাটানোর থেকে এই ভালো। সর্বক্ষণ পুলিশের নজরে নজরে থাকব। সায়ন বেরিয়ে গেল। আমার হাতে তিলোত্তমার মায়ের নম্বর। আমিই যোগাযোগ করব, নাকি নীলাম্বরকে দিয়ে দেব! পরে ভাবলাম বারবার একই জিনিস নিয়ে ফোন করলে তিলোত্তমার বাড়ির লোক বিরক্ত হতে পারেন। আর যাই হোক, মেয়েকে তো আর ফেরত দিতে পারব না। তাই যে চেয়েছিলেন তাঁকে দেওয়াই ভালো। ভাবতেই নীলাম্বরকে ফোন করি। ফোন বেজে যায়। আমি একটু চিন্তিত হয়ে পড়ি। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ করলাম, ‘দাদা আপনি ঠিক আছেন?’ মিনিট দশেক কেটে যায়। কোনও উত্তর নেই। আমি ইষ্টনাম জপছি। কী হল রে বাবা। অত তন্ত্রমন্ত্রও কি ফেল মেরে গেল নাকি? ভাবতে ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠল। হ্যালো বলতে ভুলে গেছিলাম। সোজা প্রশ্ন, ‘আপনি কোথায় নীলাম্বরবাবু?’ ‘রাস্তায় ছিলাম। ফোনটা শুনতে পাইনি। এই সবে বাড়ি ঢুকলাম।’ ওনার গলাটা শুনে খুব ক্লান্ত লাগছে। আমি তাও জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি ঠিক আছেন তো?’
— হ্যাঁ। আমার আর কী হবে? তোমার কাজ কতদূর?
-এখনও থানাতেই আছি। মনে হচ্ছে আজ রাতেই কিছু একটা কূলকিনারা হবে।
শুনে ক্লান্ত গলাতেই খুশি এনে বলে উঠলেন, ‘বাহ্! তাই যেন হয়। আজকেই কিছু একটা হওয়া খুব জরুরি মিহির। নইলে আর সামলানো যাবে না।
— এ-কথা কেন বললেন?
-ফোনে এত কিছু বলা যাবে না। কাল সকালে আমি বাড়িতেই থাকব। বেলার দিকে একবার অবশ্যই এসো। অ্যাড্রেসটা টেক্সট করে দিচ্ছি।
কথায় কথায় ভুলেই গেছিলাম তিলোত্তমার মায়ের ফোন নম্বরের কথা। নীলাম্বরবাবুকে বলতেই উনি যেন আরও চনমনে হয়ে বললেন, ‘এ-কথা এতক্ষণ বলোনি? দাও দাও।’ বললাম আমি হোয়াটসঅ্যাপ করছি। ফোনটা কেটে নম্বরটা পাঠিয়ে দিই। যা বুঝছি কালকেও আমায় ছুটি নিতে হবে। তবে এবার আর কেউ কোনও সমস্যা করবে না। স্বয়ং বিজনেস হেড আমার সঙ্গে আছেন। এই রে! খেয়ালই করিনি। মৃন্ময়ীর একটা হোয়াটসঅ্যাপ এসে পড়ে আছে। সে লিখেছে, ‘আমি আর বুবাই বেঁচে আছি। তোমার প্রেমিকা পেতনি এখনও আমাদের ঘাড় মটকায়নি। মটকালে খবর পাবে। সময় থাকলে এসো তখন। বাই।’ পড়ে নিজের মনেই হেসে ফেলি। সকালে দুবার মিসড কল দেখেও সারাদিনে ফোন করার সময় পাইনি। আমার শ্বশুরবাড়ির আকাশে ঠিক কত পরিমাণ মেঘ জমেছে তা বুঝতে আর বাকি রইল না। থানা থেকে রাস্তায় বেরিয়ে মৃন্ময়ীকে ফোন করি। ওপার থেকে প্রথম যে কথাটা ভেসে আসে তা হল, ‘দরকার ছিল না কষ্ট করে ফোন করার। একটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিলেই হত। ‘
— এই, এই রাগ কোরো না প্লিজ।
-না না। রাগ করতে যাব কেন? তোমার কাজ আর তুমি এই নিয়েই তোমার জগৎ। সেখানে আমরা কোথায়?
— আমি এখন থানায় মৃন্ময়ী।
— কেন?
-আজ আর বাড়ি ফিরব বলে মনে হচ্ছে না। রাতটা থানাতেই কাটবে।
-ঠিক বুঝলাম না।
এর পর সকাল থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একে একে বলি। দেখলাম মৃন্ময়ীর গলা নরম হয়ে তাতে কিছু ভয় ধরেছে। সে বলল, ‘তুমি কি থানার মধ্যে থেকেই আমায় ফোন করছ?’
— না রাস্তায়।
— থানার ভিতরে যাও।
-কেন?
-বলছি যাও না। আর শোনো, রাতে খালি পেটে থেকো না। গ্যাসের ব্যথা শুরু হলে সামলাবার কেউ নেই।
আমি একটু ঠাট্টাই করে বললাম, ‘কে বলেছে কেউ নেই?’ তিনি ফোনের ওপার থেকে সন্দিগ্ধ হয়ে বললেন, ‘কে আছে?’
— কেন? আমার পেতনি-প্রেমিকা তিলোত্তমা।
কথাটা মজার ছলে বলার সঙ্গে সঙ্গেই সারা গায়ে যেন একটা শিরশিরে বাতাস বয়ে গেল। শরীরের লোমগুলো আপনা থেকেই খাড়া হয়ে উঠল। ফোনের ওপার থেকে মৃন্ময়ীর গলায় ভেসে এল ‘রাম রাম রাম রাম।’ তারপরেই ধমক। ‘ফালতু না বকে এক্ষুনি থানার ভিতরে যাও।’ আমিও ফোনটা কেটে কী মনে হল, একটু এদিক-ওদিক চাইলাম। স্ট্রিট লাইটের আলোয় রাস্তার দিকে তাকাতেই বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠল। এপাশ দেখলাম, ওপাশ দেখলাম। চারপাশে গোল করে ঘুরেও দেখলাম। যত দেখলাম ততই গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। পিচ রাস্তায় কোথাও আমার ছায়া পড়েনি। নীলাম্বর যেন আমার কানের কাছে এসে বললেন, ‘সে তোমার পিছনেই আছে। তাই কোথাও তোমার ছায়া খুঁজে পাবে না।’ মনের ভিতর থেকে আবার কে যেন বলল, ‘পালাও! পালাও মিহির!’ আমি সঙ্গে সঙ্গে দৌড়োতে শুরু করি। মৃন্ময়ীর সঙ্গে কথা বলেছি প্রায় আধঘণ্টা তো হয়েছেই। কী জানি থানা থেকে ঠিক কতদূর চলে এসেছি। চোখের সামনে থানার কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না তো! মাঝখানে ডিভাইডার। তার দু-পাশে ত্রিফলা লাগানো পিচের সড়ক। ঘড়িতে রাত সাড়ে আটটা। এখনই রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেল কী করে? একটাও লোক নেই! অবাক লাগছে। কানের পাশ দিয়ে চোখের জলের মতো গড়িয়ে পড়ছে ঘাম। জামার ভিতর স্যান্ডো গেঞ্জিটা ভিজে সপসপ করছে। আমি দৌড়োচ্ছি। রাস্তা হারিয়ে ফেললাম নাকি? একজন লোককেও দেখতে পাচ্ছি না যে জিজ্ঞেস করব থানাটা কোথায়? এখানকার স্ট্রিট লাইটগুলোও নিভে গেছে। দূরে বেশ অন্ধকার। আমি খুব ভালো বুঝতে পারছি আমার পিছনে আরও একজনের ছায়া ধেয়ে আসছে। না না আমার মতো সে দৌড়োচ্ছে না। হাওয়ার মতো ভেসে চলে আসছে অনায়াসে। খুব ভুল করেছি থানা থেকে বেরিয়ে। খুব ভয় করছে। হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে। বুকের ভিতর ফুসফুসটা যেন পাথরের মতো শক্ত হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ আধো অন্ধকারে মনে হল দূরে ফুটপাথে কেউ যেন বসে আছে। লুঙ্গি পরা পুরুষমানুষ। শেষ নিশ্বাসটুকু বুকের কাছে ধরে রেখে হাঁফাতে হাঁফাতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাদা, থানাটা কোনদিকে? বিধাননগর থানা।’ সে ঘাড় নীচু করেই ঘষঘষে গলায় বলল, ‘জানি না’, তারপর যে অভিমুখে ছুটছিলাম, ঘাড় নীচু রেখেই সেদিকে হাত তুলে আঙুল দেখিয়ে লোকটা বলে ওঠে, ‘তবে শ্মশানটা ওদিকে।’ বলেই হাওয়ার বেগে মুখ তুলে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে লোকটা। আধো অন্ধকারে দেখি লোকটার চোখ বলে কিছু নেই। মুখ থেকে দলা দলা পোড়া চামড়া ঝুলছে। চোখের নিমেষে হাতে তুলে নিল একটা বড়ো পাথর। তারপর সেটাকে মাথার ওপর তুলে আমাকে মারার জন্য তেড়ে এল। আমি উন্মাদের মতো দিগ্ বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ওই শ্মশানের দিকেই ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে দৌড়োতে থাকি। লোকটাও কান ফাটানো চিৎকার করতে করতে আমার পিছনে দৌড়োতে থাকে। তার গলায় ছিল মৃত্যুর উল্লাস। হাতের কাছে বলি পাওয়ার চরম উন্মাদনা। মনে হচ্ছিল ওই পাথরে আমার মাথা থেঁতলে সে রক্ত আর ঘিলু পান করবে। কতটা রাস্তা দৌড়েছিলাম জানি না। বেশ কয়েকটা অন্ধকার গা ছমছমে বাঁক পেরিয়ে গেছি ইতিমধ্যে। ভালোই বুঝতে গারছি ওই পিশাচটা নারকীয় চিৎকার করতে করতে ধেয়ে আসছে আমার দিকে। হঠাৎ চোখে পড়তে লাগল সামনে থেকে ধেয়ে আসা দুটো আলোর বিন্দু। খুব দ্রুত বিন্দু দুটো বড়ো হতে লাগল। আমার শরীর আর বশে ছিল না। তাই আর নিজেকে থামানোর চেষ্টা করিনি। চেষ্টা করেও পারছিলাম না। পেছনে ছুটে আসছিল সাক্ষাৎ যম। একটা সময় ওই দুটো বিন্দুর আলোয় ঝলসে গেল দুটো চোখ। লোকটার চিৎকারে মিশে গেল এক যন্ত্রের শব্দ। আমি গিয়ে ধাক্কা খেলাম কোনও এক লোহার শরীরের সঙ্গে। বুকে ধাক্কা খেলাম জোরে। পড়লাম মুখ থুবড়ে। তারপর আর কিছু মনে নেই আমার।
অ… ই… ওয়া… ঠওওও… দাআআ… ভাইই… এমনি করেই আমার চেতনার চারপাশে কিছু অক্ষরের মণ্ডল শব্দ তৈরি করে গোল গোল হয়ে বাজছিল। অবচেতনের অতল থেকে যত জেগে উঠছিলাম ততই ক্ৰমে অক্ষরগুলো গোটা গোটা শব্দ হচ্ছিল। ‘দাদাভাই, দাদাভাই ওঠো। কী হয়েছিল তোমার? দাদাভাই।’ সায়ন একটানা ডেকে যাচ্ছিল। চোখের পাতায় ছিটে লাগছিল ঠান্ডা জলের। আলতো আলতো করে চোখ মেলে চাইলাম। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা। শরীরটাকে ভেঙে উঠতে গিয়ে বুঝলাম বুকের পাঁজরে বেশ ব্যথা। কষ্ট করে উঠে বসে দেখলাম আমি থানার মধ্যেই আছি। আমায় ঘিরে পাকড়াশি, দাসবাবু, কয়েকজন কনস্টেবল আর সায়ন। সায়ন কত কী জিজ্ঞেস করে যাচ্ছিল আমায়। কিন্তু আমার প্রথম কথাই ছিল, ‘বরেন। বরেন কোথায়?’ সায়ন ফিক করে হেসে বলে, ‘যাতে মাতাল তালে ঠিক। তুমি আমার গাড়ির সামনে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে। এক্ষুনি তো আমায় জেলে ঢোকানোর ব্যবস্থা করছিলে। আর তুমি বরেনের খোঁজ করছ?’ আমি নেশাতুর গলায় বললাম, ‘ওই জানোয়ারটার জন্যই তো আমি তোমার গাড়ির তলায় যাচ্ছিলাম সায়ন।’ ফাজলামো ভরা মুখটা এক নিমেষে পালটে গেল সায়নের। জিজ্ঞেস করল, ‘মানে?’ ‘সে আমায় তাড়া করেছিল। আমায় বাঁচতে দেবে না সায়ন। যতক্ষণ না সব ঘটনা পরিষ্কার হবে ততক্ষণ তারও কোনও ব্যবস্থা করা যাবে না। প্লিজ বলো বরেনের কী হল। ও কোথায়?
— লক আপে। শুধু বরেন নয়। ঝিমলিকেও তুলে আনা হয়েছে। এক্ষুনি জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে।
আমার আর তর সইল না। আমি নিজে থেকে ‘চলো চলো’ বলে শরীরটাকে কাঠের বেঞ্চ থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। সায়ন জোর করে বসিয়ে দিল। বলল, ‘সকাল থেকে তোমার খাওয়া হয়নি। শরীর খুব দুর্বল। আগে এটা খেয়ে নাও।’ দেখি ভাত, ডাল, তরকারি আর ডিমের ঝোল এনে হাজির করেছে সায়ন। লজ্জা পেয়ে বলেই ফেললাম, ‘তুমি কি পাগল হলে সায়ন? এই খাবার আমার গলা দিয়ে নামবে ভেবেছ?’ না নামলেও নামাতে হবে। কারণ সবার আগে তোমায় সুস্থ থাকতে হবে। এই বিশাল যজ্ঞের তুমিই কিন্তু কর্ণধার দাদাভাই। তুমি অসুস্থ হলে সব ঘেঁটে যাবে। সায়নের কথাগুলোর মধ্যে যুক্তি ছিল। তার চেয়েও বেশি ছিল স্নেহের শাসন। ভালো লাগল। আজকালকার দিনে এমন ছেলে দেখাই যায় না। মুনাইটা ভাগ্যবান। চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে রীতিমতো গোগ্রাসে গিলে নিলাম ওই এক থালা ভাত। সায়নও রুটি আর তরকারি খেল। তারপর আমার জন্য বরাদ্দ হওয়া সেই গুপ্তঘরে গিয়ে বসলাম। শরীরটা চেয়ারে এলিয়ে রইল। কেবল শক্ত আর সজাগ হয়ে রইল কান দু-খানা। পাশের ঘরে যেই লোহার গেটটা খোলার শব্দ হল অমনি গর্জে উঠল বরেন রায়, ‘এই শালা শুয়োরের বাচ্চা! ওসি হয়েছিস ঢ্যামনা? তোদের মতো কত ওসির পোঁদে লাথ মেরে বদলি করিয়েছি জানিস?’ এর পরেই সপাটে একটা চড়ের শব্দ। এবার সায়নের পালা, ‘তোদের মতো কত হারামির দাঁতের পাটি খলখলে করে দিয়েছি জানিস?’ তারপর শুধু বরেনের শ্বাস নেবার শব্দ। সায়ন এবার শান্ত হয়ে বলল, ‘কী ভেবেছিস? ফিলিম্ ইন্ডাস্ট্রির এক ছিলিম প্রোডিউসার হয়ে তুই-ই একা ডায়লগ ঝাড়তে পারিস? যাই হোক, এই মাঝ রাত্তিরে তোর সাথে ডায়লগবাজি করার মতো সময় নেই। সরাসরি বল তো, খুনটা কীভাবে করলি?’
— চোপ শালা। আমি যে খুন করেছি তার কী প্রমাণ আছে?
-অনেএএএএক। নানা লোকের সাক্ষ্য, তোর ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে বলা। তা ছাড়া মধু শা-তো বললই…
— মধু শা? কে সে?
গলার স্বরে বরেনের চমকের আভাস। সায়ন বলল, ‘চিনিস না?’
— না।
আবার একটা সপাটে চড়। বরেন তড়পে ওঠে লেখার অযোগ্য ভাষায়। আবার পালটা চড়। পাশের ঘরে বসে ভীষণ ইচ্ছে করছিল একবার স্বচক্ষে দেখি। কিন্তু সে উপায় নেই। অগত্যা জমজমাট শ্রুতিনাটকেই মনোনিবেশ করি। এর পর আর একটাও কথা বলে না সায়ন। আবার সেই অডিয়োটা শোনায়, যেখানে বরেন থানা থেকে বেরিয়ে মধুর সঙ্গে কথা বলে। অডিয়োটা শোনার পর বরেনের গলা শোনা যায়, তবে সেটা আগের মতো ততটা উগ্র নয়। সে বলে, ‘এতে কী প্রমাণ হয়? আমি খুন করেছি?’ সায়ন বলে, ‘এতে প্রমাণ হয় যে তিলোত্তমা আর মিহিরের এগেনস্টে তুই, বরেন রায়, একটা বিশাল বড়ো জাল পেতেছিলি। মধু শা আর তার বর্তমান স্ত্রী ঝিমলিকে দিয়ে মিথ্যে অভিনয় করিয়েছিলি। কেন করিয়েছিলি? ওদের প্রেম ভাঙার জন্য। কিন্তু দেখলি, প্রেমটা ভাঙল না। বরং তিলোত্তমা তোকে বলল, মিহির শুধু ওর। ও মিহিরকে ছাড়া বাঁচবে না। আর মিহিরকে কারুর হতেও দেবে না। তখন তুই ভালোই বুঝে যাস যে তিলোত্তমা এ জীবনে আর তোর হবে না। ঝগড়া করে হোক, মারপিট করে হোক, ভালোবেসে হোক তিলোত্তমা ঠিক মিহিরের সঙ্গে থাকবে। তাই তো আজ থেকে বারো বছর আগে এক চব্বিশে বৈশাখ বিকেলে তুই দেশের বাড়ি যাবার মিথ্যে কথা বলে কেটে পড়লি তিলোত্তমাকে একা ফেলে। যে তিলোত্তমাকে এত ভালোবাসতিস…।’ কথা শেষ করতে না দিয়েই গর্জে ওঠে বরেন, ‘না মিথ্যে না। আমি দেশের বাড়িতেই গেছিলাম।’ এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে গলার নলি চিরে বেরিয়ে এল বরেনের আর্ত চিৎকার। বুঝলাম এবার রুলের বাড়ি পড়ল বেচারার গায়ে। সায়ন দাঁতে দাঁত চিপে ধমকে বলল, ‘একের পর এক মিথ্যে, একের পর এক মিথ্যে!’ সায়ন কি বরেনের চুলের মুঠি ধরে এক্সট্রা ডোজ দিচ্ছে! যাই দিক, এইরকম শয়তানের জন্য এটা কিছুই না। আরও খানকতক দুমদাম চলল পাশের ঘরে। বরেন পেটের ভিতর থেকে শব্দ বের করে বলল, ‘মধু, মধু, মধুর বাড়ি ছিলাম আমি।’
— সে তো রাত আটটার পর। তার আগে কোথায় ছিলিস?
-তার আগে… তার আগে!
-মিথ্যে বললে মারব কানের গোড়ায়।
সায়নের তড়পানিতে বরেন বলল, ‘খাবার, খাবার খুঁজছিলাম। খাবার কিনে নিয়ে গেছিলাম মধুর বাড়ি। তারপর হোটেলে এত ভিড় যে ওই…।’ বরেনের কথা শেষ করতে না দিয়েই সায়ন গলা তুলে ডাকল, ‘বিনোওওওদ’। সঙ্গে সঙ্গে একটা সুইচের শব্দ আর বরেনের চিল-চিৎকার। এর সঙ্গে ভেসে এল বৈদ্যুতিক তারে প্রবাহিত হওয়া বিদ্যুতের চিড়চিড় শব্দ। ইলেকট্রিক শক দেওয়া হচ্ছে বরেন রায়কে। কয়েক সেকেন্ড পরেই থেমে গেল। সায়ন বলল, ‘সত্যিটা নিজে থেকে স্বীকার করবি, নাকি আরও শক খাবার শখ আছে?’ গোঙাচ্ছে বরেন। রাগে, যন্ত্রণায়। তবুও বলে, ‘আমি সত্যি বলছি। খাবার নিয়ে গেছিলাম।’’বিনোওওওদ’ বলে সায়নের হাঁক। আবারও বরেনের চিল-চিৎকার। বরেন যতই ধুরন্ধর অপরাধী হোক, এর আগে কখনও সরাসরি তার অপরাধের এমন সাজা ভোগ করেনি। তাই তার গায়ে দাগি আসামির দাগ পড়েনি। সে কত আর কষ্ট নিতে পারবে? দু-বার শকের পরেই বলে যে আমাদের চ্যানেলের শুটিং ফ্লোরেই ছিল সে। আমি এবার একটু সোজা হয়ে বসি। বরেন হয়তো এবার সব স্বীকার করবে এই আশায়। সায়ন জিজ্ঞাসা করে, ‘তার মানে ওই ঘটনাস্থলেই তুই ছিলি?’
— হ্যাঁ।
— সঙ্গে কী ছিল?
-কিছু না।
-কোনও ব্যাগ বা জামাকাপড় কিছু ছিল না?
— না।
— মানে তুই একেবারে খালি হাতে ঘটনাস্থলে গেলি!
— হ্যাঁ।
— তিলোত্তমা জানত?
— কী?
-এই যে তুই ওখানেই ছিলি।
— না। আমি স্টুডিয়োর মধ্যে দেয়ালের পাশে বিভিন্ন জিনিসের আড়ালে ছিলাম তিলোত্তমা কেন, মিহিরেরও আমায় দেখা সম্ভব ছিল না।
— কেন?
চ্যানেলের ভিতর থেকে শুটিং ফ্লোরের যে এন্ট্রান্স, সেই দরজা পার করে আরও বড়ো একটা দরজা ছিল। দু-পাশ থেকে মোটা প্লাইয়ের দেয়াল এসে একটা জায়গায় শেষ হয়ে গেছিল। ওই মাঝখানটায় একটা স্লাইডিং দরজার মতো ছিল। শুটিং শুরু হলে বন্ধ করে দেওয়া হত। ওই একটা ঘরের মধ্যে ঘর হলে যেমন হয়, ঠিক তেমনি। আমি ঢুকে সোজা গিয়ে ডানদিকে স্টুডিয়োর কোনায় চুপ করে বসে থাকি।
— কেন?
তখনও আশা ছিল তিলোত্তমা মিহিরের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দেবে। ওদের মধ্যে কী কথা হয় সেটা শুনব বলে ঘাপটি মেরে বসে থাকি। তারপর তিলোত্তমা ঢোকে সাড়ে সাতটা নাগাদ। স্টুডিয়োর ভিতরে আসে। আমি দেখলাম, আমায় দেখতে পেলে মুশকিল হয়ে যাবে। তখন ওখানে বসেই বাইরের পিলারটায় একটা শব্দ করি। দেখলাম…
সায়ন ঝপ করে বরেনের কথা ধরে বলে উঠল, ‘এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড। তুই বসে ছিলি ভিতরে। বাইরের পিলারে আওয়াজ করলি কী করে?’ বরেন বলল, ‘শুটিংয়ের সব দেয়ালই ইচ্ছেমতো সরানো যায়। ওইভাবেই তৈরি করা হয়।’
— মানে তুই আগে থেকেই একটা দেয়াল সরিয়ে রেখেছিলি যাতে দেয়ালের ওপারে তোর হাত পৌঁছোয়। তাই তো? বরেন আমতা আমতা করে বলে ‘হ্যাঁ মানে ওইরকম।’ ‘ওইরকম মানেটা কী? দেয়াল সরিয়েছিলি, না সরাসনি?’
সায়ন এখন ধমকধামক ছাড়া বরেনের সঙ্গে কথাই বলছে না। বরেনও ইলেকট্রিক শকের ভয়ে দ্রুততার সঙ্গে বলে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ সরিয়েছিলাম।’
— কোন দেয়ালটা সরিয়েছিলি? দেয়ালের ওপারে কী ছিল?
-(একটু চুপ) পিলার।
— আর?
আর কিছু না। তখন ন্যাড়া ফ্লোর ছিল।
— বাহ্! মানে প্রিপারেশনটা জোরদার ছিল।
— বরেন বেশ ভয় পেয়েই বলে, ‘কীসের প্রিপারেশন?’
— সেটা তোর না বুঝলেও হবে। বাকিটা বল। তিলোত্তমা তোর করা শব্দ শুনে পিলারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল?
-হুম। তখন সাড়ে সাতটা বেজে গিয়েছিল।
-অন্ধকারে ঘড়িও দেখেছিলি?
— না মানে মিহির ওই সময়েই আসবে বলেছিল তো। তাই।
— মিহির এল?
— হ্যাঁ। ওদের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়। কথা কাটাকাটি হতেই মিহির তিলোত্তমাকে ঠ্যালা মারে। এক ধাক্কায় তিলোত্তমা নীচে পড়ে যায়।
— তারপর?
— তারপর… তারপর মিহির চিৎকার করে ওঠে।
— মিহির তোকে দেখতে পায়নি?
-না। সেটা সম্ভব ছিল না। একে অন্ধকার, তার ওপর আমি দেয়ালের আড়ালে নানা জিনিসের খাঁজে লুকিয়ে ছিলাম।
— মিহিরের চিৎকার শুনে লোক এল?
— হ্যাঁ। কয়েকজন এল। মিহিরের সঙ্গে সবাই নীচে দৌড়োল।
— আর তুই? ওখানে বসেই রইলি?
— না না। আমি গেলাম তো। তবে সবাই যাবার পর।
— লুকিয়ে লুকিয়ে?
— না। লুকোব কেন?
— লিফটে করে নীচে গেলি তাই তো?
— হ্যাঁ।
পাশের ঘরে বসেই মনে হচ্ছিল গিয়ে এক থাবড়া মারি হারামজাদাকে। একের পর এক মিথ্যে কথা বলে চলেছে। কিন্তু সায়ন কিছু বলছে না। মিথ্যে বলছে জেনেও নিজেকে সামলে নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে। এবারও তাই করল, ‘আচ্ছা বরেন। তুই নীচে গেলি। অথচ কেউ, মানে অফিসের কেউ তোকে দেখতে পেল না। তুই পুলিশের কাছে বলেছিলি যে ওখানে তুই ছিলিস না।’ ‘ভয়ে, ভয়ে। ভয়ে বলেছিলাম বিশ্বাস করুন।’ বরেনের কথা শুনে সায়ন হেসেই ফেলল, ‘বাওআ! এই তো খিস্তির বন্যা বইয়ে দিচ্ছিলি। এখন আবার সম্মান দিচ্ছিস যে বড়ো! ভয় পেলি নাকি! যাক ভালো কথা, এবার তাহলে আমিও তোকে সম্মান দিই। আচ্ছা, একটা কথা বলুন বরেনবাবু, আপনার কি সেই সময় জ্বর হয়েছিল বা কোনওভাবে অসুস্থ ছিলেন? যদিও অসুস্থ থাকলে সকাল থেকে শুটিং করা, বুদ্ধি খাটিয়ে ষড়যন্ত্রের স্ক্রিপ্ট তৈরি করে লোককে ভাড়া করে সেক্সুয়াল অ্যাক্টিং করানো, তিলোত্তমার কান ভাঙানো, খুন করা…।’
বরেন খেপে উঠে বলে, ‘খুন করিনি আমি।’
— সরি সরি। মাই মিসটেক। দেয়াল সরিয়ে খুন করা দেখে ফেলা। শরীর খারাপ থাকলে এই এত কিছু সম্ভব হত না। তবু, কোনও শরীর খারাপ ছিল আপনার?
কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে বরেনের মুখ দিয়ে ‘না’ শব্দটা বেরিয়ে আসে। সায়নও ফস করে বলে, ‘তাহলে তো মে মাসের ওই পেছন ফাটা গরমে আপনার শীত লাগার কোনও কারণ থাকতে পারে না! তাই তো?’
— আপনি ঠিক কী বলছেন আমি কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না ইন্সপেক্টর। সেদিন কালো চাদর জড়িয়ে কী করছিলেন?
-মানে?
-এ কী বরেন রায়, আপনার চোখ মুখ এরকম পালটে গেল কেন? মনে হচ্ছে এই কালো চাদরের কথাটা একদম ভুলে মেরে দিয়েছিলেন! তাই না?
বরেন তড়পে উঠে বলে, ‘কে বলেছে কালো চাদর ছিল? মধু? ‘
— শুধু মধু নয়। চ্যানেলের আরও একজন তিলোত্তমা পড়ে যাবার প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট পর আপনাকে কালো চাদর মুড়ি দিয়ে শুটিং ফ্লোর থেকে চোরের মতো পালাতে দেখেছে। আর আপনি লিফটে নয়, সিঁড়ি দিয়ে নেমে পালান। কারণ লিফটে সিসিটিভি ছিল আর রিসেপশন ছিল ফাঁকা। এমনকি সারা অফিসে দু-একজন কাজের লোক ছাড়া আর কেউ ছিল না। কারণ সবাই তখন তিলোত্তমার লাশ দেখতে নীচে গেছে। তাই কারুর দেখার প্রশ্নই ওঠে না আপনাকে। আর এই সুযোগে পালাতে গিয়ে দরজার হাতলে লেগে চাদর সরে গিয়ে আপনার মুখটা বেরিয়ে যায়। আর সেই চাদর নিয়েই আপনি রাত আটটার পর মধুর বাড়িতে যান।
— মিথ্যে কথা। ডাঁহা মিথ্যে। কেউ দেখেনি আমায়। কেউ দেখতে পারে না। সব বানানো আপনার
রাগে ফুটছে বরেন। চিৎকার করে তার কথার সত্যতা প্রমাণ করতে সে মরিয়া। এর পরেই একের পর এক দমাদ্দম রুলের বাড়ি। বরেনের গলার আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারছি যে গায়ে-হাতে-পায়ে বেশ কিছু রক্তাক্ত কালশিটে ফেলে দিয়েছে সায়ন। হাঁফাতে হাঁফাতে সায়ন বলছে, ‘তিলোত্তমাকে তুই মেরেছিস বরেন! তুই!’ ঘড়ঘড়ে যন্ত্রণাজর্জর গলা দিয়ে বরেন তখনও বলে চলেছে, ‘না। মিথ্যে কথা। আমি মারিনি।’ সায়ন বলে, ‘আর মিথ্যে কথা বলে লাভ নেই বরেন। সব সত্যি আমি জানি। মধু সব বলেছে আমায়।’ ওই ভাঙা মার খাওয়া শরীরেই চমকানো স্বরে বরেন বলে ওঠে, ‘কী! কী বলেছে হারামজাদা?’
— বলেছে তুই তিলোত্তমাকে প্ল্যান করে মেরেছিস। রাতে মদ খেতে খেতে নেশার ঘোরে সব মধুকে বলে ফেলেছিলি।
বরেন ফুঁসে ওঠে, ‘না। এ হতে পারে না। আমি কাউকে কিছু বলিনি। ও মিথ্যে বলছে।’
-মিথ্যে তুই বলছিস স্কাউড্রেল! তোর বাঁচার আর কোনও উপায় নেই বরেন। সত্যিটা বল নইলে ইলেকট্রিক শক আর রুলের বাড়ি খেয়ে আজ এখানেই তোর ভবলীলা সাঙ্গ হবে। বলে ফেল। নইলে কোর্টে মধু সব স্বীকার করবে। তোর বিরুদ্ধে একের পর এক লোক সাক্ষ্য দিলে তুই বাঁচতে পারবি?
— বেইমান! বেইমান!
বরেনের কথায় চুপ করে যায় সায়ন। বরেন নিজের মনেই বলে, ‘যাকে এতদিন মাইনে দিয়ে পুষলাম সেই মধু কি না!’ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সায়ন বলল, রায়বাবুদের বাগানবাড়ির দেখভাল শেষ দশ বছর মধু শা-ই করত তাই না বরেন?’ বরেন বোধহয় ঘাড় নাড়ে। মুখে কোনও উত্তর দেয় না। এটা আমারও জানা ছিল না। যাই হোক, এবার আসল কথাটা বল। ঠিক কীভাবে খুন করলি? কীভাবেই বা তিলোত্তমার দেওয়া পাঞ্জাবিটা চুরি করলি? দেখ তুই যদি অপরাধ না করতিস তাহলে মহীতোষকে বলতিস না যে তোর প্রেমের কথাটা পুলিশ যেন জানতে না পারে। লুকিয়ে খুন করবি বলেই তিলোত্তমাকে দেশের বাড়ি যাবার গল্প দিস। তারপর কালো চাদরে নিজেকে ঢেকে ঘটনাটা ঘটার অত পরে লিফটে না গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামিল। আর লুকিয়ে কথা শোনার জন্য দেয়াল সরিয়ে ফাঁক করবার প্রয়োজন হয় না। সেটা আড়ালে বসেই শোনা যায়। তুই চেয়েছিলি তিলোত্তমা যেন ফ্লোরের একদম ধারেই দাঁড়ায়। যাতে মারতে সুবিধে হয়। তাই শব্দ করে তিলোত্তমাকে ধারে পাঠাস। এছাড়া তোর নাম বদল, এক গাল দাড়ির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলা এবং চোখে নকল লেল। লাগানো, পুলিশকে মিথ্যে বলা, মধুর সঙ্গে তোর ফোনালাপ ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই এত কিছু কোর্টে তোর বিরুদ্ধে বললে, আর দুজন সাক্ষীরও প্রয়োজন হবে না। এমনিতেই শ্রীঘরে চলে যাবি। এর ওপর আবার রায়বাবুদের বাগানবাড়ি নিয়ে অভিনেতা নূরুলের কেস ঝুলে আছে। সেটাকেও যদি উসকে দেওয়া যায়। উফ্! জাস্ট ভাবতে পারছি না! বল! বল! যত লুকোবি তত ক্যালানি খাবি। তবু নিজে মুখে দোষ স্বীকার করলে সাজা কিছুটা কম হলেও হতে পারে।’ সত্যি, পুলিশকে কত কিছু মাথায় রাখতে হয় একসঙ্গে! এক দমে যে কী করে এত কিছু মনে রেখে বলে গেল সায়ন! হঠাৎ শুনি ক্যাচক্যাঁচ করে কান্নার আওয়াজ। বরেন কাঁদছে। সেই কান্না জড়ানো গলাতেই বলতে শুরু করে বরেন। তিলোত্তমার সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি যে ও আমার কিছুতেই হবে না। সেই রাগে পুরো ব্যবস্থাটা করি। মিহিরের জন্মদিনে আমার দেখিয়ে দেখিয়ে নিহিরকে পাঞ্জাবি দেয় তিলোত্তমা। ও জানত, আমি ওকে ভালোবাসি। তবু ইচ্ছে করে আমার দেখিয়ে সকলের সামনে মিহিরকে জন্মদিনের উইশ করে আদিখ্যেতা দেখায়। আমি ভালোই বুঝতে পারছিলাম, ও আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে এই কাজটা করেছিল। মাথায় আগুন জ্বলে গিয়ে হল। হাতের কাছে সুযোগও এসে গেল। মিহির তিলুকে বলল ওর কী একটা কাজ আছে। বেরিয়ে যাবে। তিলোত্তমাও অফিসের ভিতর চলে গেল। দেখলাম নানান কথা বলতে বলতে তাড়াহুড়ো করে মিহির ফ্লোর ছেড়ে বেরিয়ে গেল একটু পরেই। আমরা সব লাইট-টাইট গোছাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি পাঞ্জাবিটা ওখানেই পড়ে আছে। মিহির ভুলে গেছে। সবার চোখের আড়ালে পাঞ্জাবিটার ওপর একটা কালো কাপড় ফেলে দিলাম। তারপর সেটাকে নিয়ে আমার ব্যাগে করে বেরিয়ে গেলাম। নীচে চা খেতে খেতে পুরো ছকটা সাজিয়ে মধু আর ঝিমলিকে ফোন করি। তারপর তো যা হয়েছে সব জানেন। বিকেলে তিলোত্তমাকে দেশের বাড়ি যাবার কথা বলে চলে আসি। ও ঢোকার আগেই আমি শুটিং ফ্লোরে পৌঁছে যাই। চাদরটা আমার কতুয়ার তলায় লুকোনো ছিল। তাই সন্দেহ করার মতো কিছু ছিল না। তখন আমাদের অবাধ যাতায়াত ছিল শুটিং ফ্লোরে। যদি কেউ দেখে তাহলে ভাববে শুটিংয়ের কোনও কাজেই এসেছি হয়তো। যে প্লাই দুটোর মাঝে স্লাইডিং ডোর ছিল সেই দুটো প্লাইয়ের দেয়াল অন্য দুটোর চেয়ে হাইটে ছোটো ছিল। হালকাও। স্টুডিয়ো ছোটো-বড়ো করার সুবিধের জন্য ওরকম বানানো হয়েছিল। সবার আগে আমি ঢুকেই ডানদিকের ছোটো দেয়ালটা সরাই। এতে বেশ খানিকটা ফাঁক হয়ে যায়। যার মধ্যে দিয়ে একটা হাত গলানো যায় সহজেই। তারপর হাঁটু মুড়ে বাক্স-প্যাঁটরার আড়ালে বসে পড়ি। বরেনের কথার সঙ্গে সঙ্গে নীলাম্বরের সেদিনের চোখ বুজে হাঁটা-চলা করার মিল খুঁজে পাই। তন্ত্র সাধনার জোরে ঘটনার দিন ঠিক কে কীভাবে এসেছিল সেটা বুঝতে পেরেছিল। নীলাম্বরও তাই প্রথমে বরেনের মতো দরজা দিয়ে ঢুকে ডানদিকে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে পড়ে। বরেন বলতে থাকে। আর আমি মনে মনে মেলাতে থাকি। বরেনের করা পিলারের আঘাত শুনে তিলোত্তমা ফ্লোরের এক্কেবারে কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্তেই ঢোকে মিহির। তিলোত্তমাকে দেখতে পায়। বাইরের দিকে মুখ করে সে দাঁড়িয়ে। এক মনে সন্ধের অন্ধকার দেখছে তার তিলু। তিলোত্তমার অর্ধেক শরীর দেখতে পায় মিহির। অর্ধেকটা দেয়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। ওদিকে বরেন দেখে তিলোত্তমার শরীরের অর্ধেকটা তার প্রায় হাতের নাগালে। পিছনে অন্ধকার, তাই কোনওভাবেই তিলোত্তমার চোখে পড়বে না বরেন। খানিকটা কাছে এগিয়ে আসে মিহির। সেই মুহূর্তে বরেন আর মিহিরের মাঝে মাত্র একটা দেয়াল, যার মাথায় অর্থাৎ দেয়ালটা যে বিন্দুতে শেষ হয়েছে সেখানে দাঁড়িয়ে তিলোত্তমা। তার শরীরের ডানদিক মিহিরের দিকে আর বাঁ-দিক বরেনের দিকে। মিহিরের গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে আদর মাখা সুরেলা ডাক, ‘তিলুউউউ’! শোনামাত্রই তিলোত্তমা ডানদিক দিয়ে ঘুরে তাকাতে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে লোহার একটা ভারী লম্বা দণ্ড দিয়ে তিলোত্তমার পেটের কাছে খোঁচা মারে বরেন। হাতও লাগাতে হয় না। টাল সামলাতে না পেরে সন্ধের অন্ধকার থেকে মৃত্যুর অতল আঁধারে চিৎ হয়ে তলিয়ে যেতে থাকে তিলোত্তমা। পড়ে যেতে যেতে মুখে শুধু একটাই নাম নিয়েছিল, ‘মিহিইইইইইর’। মিহিরও চিৎকার করে উঠেছিল, ‘তিলুউউউউউউউ’। মিহিরের ডাক ফুরোতেই তিনতলার বাইরে কাচের চাতাল ভেঙে ক্ষতবিক্ষত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে থেঁতলে যায় তিলোত্তমার শরীর। মিহির বুঝল তিলোত্তমা টাল সামলাতে পারেনি। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তিলু জেনে গেল পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে অন্ধকারে মরণ-খোঁচা দিল তার প্রেমিক মিহির। আর বরেন ভাবল, নিজের হাতে রক্ত না মেখেও কী চমৎকার একটা প্রতিশোধ নিয়ে ফেলল সে। মিহিরের ডাক শুনে কয়েকটা লোক আসতেই হুড়মুড় করে তারা নীচে নামার জন্য বেরিয়ে গেল। আর কারও শুটিং ফ্লোরে আসার কোনও কারণ নেই। এর পর কালো চাদরের আবডালে খুনে-অন্ধকারে বসে রইল বরেন রায়। বাইরের চ্যাঁচামেচি হালকা হতেই পাখি ফুড়ুৎ। ‘পুরোটায় ভুল শুধু একটাই করেছিলাম’ বরেন বলে। সায়ন জিজ্ঞাসা করে ‘কী সেটা?’
-ওই পাঞ্জাবিটা আর তেরো নম্বর ফ্লোর থেকে আনা হয়নি।
সব শুনতে শুনতে কখন যেন আমার চোখ ভারী আর ঝাপসা হয়ে এসেছে। তিলোত্তমার নাম মনে পড়তেই একটু আগেও হাত-পা পেটের ভিতর সেঁধিয়ে আসছিল। কিন্তু এখন যেন খুব কষ্ট হচ্ছে ওর জন্য। মিহিরের জন্য। এক হিংসুটে দৈত্য নির্মমভাবে তার দু-হাতের তালুতে দলে পিষে শেষ করে দিল সদ্য ফুটে ওঠার দুটো ফুলকে। একে অপরকে গন্ধ বিলোবার সময়টুকু তারা পেল না। কানে এল সায়নের কথা। সে বলল, ‘আমি চাই তোর মতো নরকের কীটের যেন কখনও ফাঁসি না হয়। যতদিন বাঁচবি ততদিন যেন হাজতের অন্ধকারে দগ্ধে পচে বেঁচে থাকিস শুয়োরের বাচ্চা!’ বলেই বুট খটখটিয়ে কিছুটা হেঁটে গেল। তারপর বলল, ‘শোন রে গান্ডু, বাপেরও বাপ আছে জানিস তো? খুনটা কীভাবে হয়েছিল মধু এখনও জানে না। কারণ, সেই রাতে মদ খেয়ে তুই মধুকে খুনের বিষয়ে কিচ্ছু বলিসনি। তাই মধুও আমাদের খুনের ব্যাপারে কোনও কথা বলেনি। তুই যেমন একের পর এক গল্প দিচ্ছিলি, আমিও তেমন টুক করে এক লাইনের একটা গল্প বানিয়ে ফেললাম। আর সেই গপ্পোর ফাঁদে মিষ্টি করে তুই পা দিলি। আমরাও তোর বয়ান রেকর্ড করে নিলাম, যাতে কোর্টে গিয়ে আর না ঝোলাতে পারিস। এবার মর।’ ঘটাং করে লোহার দরজা খুলে বন্ধ হয়ে গেল। বরেন আর্তনাদে চিৎকার করে খিস্তির বন্যা বইয়ে দিল। বাইরে গিয়ে সায়নকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। অবশ চোখ দুটো থেকে কখন যে জল বেরিয়ে এল বুঝতে পারলাম না। সায়ন লজ্জা পেয়ে বলল, ‘ধ্যাত, কী গো তুমি!’ ধরা গলায় আমি বলেই ফেললাম, ‘আমারও অবাক লাগছিল, মধুর বয়ান তো আমিও শুনেছি। কই কোথাও তো বরেন যে খুন করেছে সেরকম কিছু বলেনি! পরে বুঝলাম সব।’ হ্যা হ্যা করে হেসে সায়ন বলল, ‘তাহলে পুলিশের চাকরি গেলেও ক্ষতি নেই। স্ক্রিপ্ট লেখার চাকরিটা বাঁধা, কী বলো?’ সারাদিনের ধকল, ভৌতিক কাণ্ড আর আমার অ্যাক্সিডেন্টের পরেও রাত দুটোর সময় যে অমন খ্যালখ্যাল করে হাসতে পারব তা কখনও ভাবিনি।
বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে রাত তিনটে বেজে গেল। সায়ন পৌঁছে দিয়ে গেল। বারবার বলছিল আজ বাড়ি না ফিরে ওদের বাড়ি যেতে। কিন্তু আমিই রাজি হলাম না। যতই হোক ওটা মুনাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ি আছে। এত রাতে গিয়ে আবার অযথা উৎপাত বাঁধানো! বাড়িটা শুনশান। অন্য সময় হলে মৃন্ময়ী এসে দরজা খুলে দিত। হাত-পা ধোয়ার জন্য গামছাটা বারান্দা থেকে তুলে হাতে ধরিয়ে দিত। আজ সব নিজেকেই করতে হল। অফিসে যতই চাপ থাকুক, বাড়িতে এসে ছেলেটার মুখটা দেখলে শরীর, মন সব আপনা থেকেই জুড়িয়ে যেত। এখন শাওয়ারের ঠান্ডা জলে শরীরের তাপ জুড়োনো ছাড়া আর উপায় নেই। তাই করলাম। কিন্তু গামছা দিয়ে গা মোছার সময়েই চমকে উঠলাম। কী সব্বোনাশ! মহা মৃত্যুঞ্জয় তাবিজটা গেল কোথায়? ডানহাত তো খালি! বাথরুম তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। প্রতিটা বালতি ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলাম। জলের তোড়ে ভেসে গেলেও ড্রেনের জালির মুখে গিয়ে ঠিক আটকাত। অত বড়ো চৌকো মতো জিনিসটা কোনওভাবে জালি ভেদ করে চলে যেতে পারবে না। তাহলে কি জামা খোলার সময় খুলে পড়ল? হতে পারে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে জামা ঝেড়ে, প্যান্ট ঝেড়ে, পকেট হাতড়ে ভালো করে খুঁজলাম। ঘরের মেঝে, বিছানা, বারান্দা সব জায়গা দেখলাম। স্নান করেও গলগল করে ঘামছি। কান-মাথা গরম হয়ে উঠেছে। কিন্তু নাহ্। তাবিজ কোথাও নেই। তবে কি সেই রাস্তাতেই খুলে পড়ল? কিংবা হয়তো পুলিশের জিপের ধাক্কায় যখন অজ্ঞান হলাম তখনই…। আর ভাবতে পারছি না। বুকটা বেশ ধুকপুক করছে। আজ রাতে যদি সে আসে! কী করে রুখব তাকে? মহীতোষদা বলেছিল, তাবিজের কাজ ফুরোলে সে নাকি আপনা থেকেই খুলে পড়বে। তবে কি তাবিজের কাজ শেষ হয়ে গেছে? আমার মৃত্যুর দিন কি ঘনিয়ে এল! হে ভগবান! সায়নের কথা শুনে মুনাইয়ের বাড়ি কেন গেলাম না! শুনেছি, রাত তিনটের সময়েই প্রেতলোক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ঘরের বন্ধ দরজার বাইরেই কি দাঁড়িয়ে আছে সে? না না। আজ রাতে আর ঘুম হবে না। আপাতত আজ রাতের মতো রক্ষা পাবার একটাই পথ। ভাবামাত্রই মোবাইলে নেট কানেক্ট করে ইউটিউব চালালাম। সেখানেই বাজতে থাকল ‘ওম ধ্বনি।’ মোবাইলটাকে পাশে রেখে পিঠে বালিশ দিয়ে শরীরটাকে এলিয়ে দিলাম। ধীরে ধীরে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল পবিত্র মায়াময় মন্ত্রোচ্চারণ। ভিতর ভিতর অদ্ভুত জোর অনুভব করলাম। ভয়টা আস্তে আস্তে কাটতে থাকল রাতের অন্ধকারের মতো। ধীরে ধীরে ডেকে উঠল ভোরের প্রথম পাখি। জানলার কাচ দিয়ে অল্প আলো এসে ঘরটাকে কিছুটা আলোকিত করেছে। হঠাৎ নাকটা সুড়সুড় করে উঠতেই ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘড়িতে তখন ছ-টাও বাজেনি। দেখলাম ফোনটা চলতে চলতে চার্জ ফুরিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমোব, কিন্তু তাবিজের চিন্তাটা আমায় ভিতর থেকে ঠেলে একেবারে দাঁড় করিয়ে দিল। ফোনটা চার্জে দিলাম।
