তেরো নম্বর ফ্লোর – ৩

‘ইমনদা এনেছ?’

ঘাড় নাড়ল। ব্যাগ থেকে বার করে দিল একটা পেন-ড্রাইভ, দুটো ডিভিডি আর একটা পুরোনো ছবি। ‘গানগুলো বাড়িতে জোরে চালাওনি তো?’ আমার কথা শুনে ইমনদা হাসল, বলল ‘না। তবে আমাকে তো শুনতেই হয়েছে। নইলে ভিডিয়ো থেকে এক্সট্র্যাক্ট করব কী করে? শুনতে শুনতে গা-টা ছমছম করে উঠছিল। কোনও কারণ নেই। সবকটাই রবীন্দ্রসংগীত। রবিঠাকুরের গান শুনে এর আগে আমি কেন, কেউ কখনও ভয় পেয়েছে কিনা জানি না। ওই সত্যজিৎ রায়ের মণিহারা ছাড়া।’

— কিছু টের পেয়েছ?

— দু-একবার ঘাড় ঘুরিয়ে এপাশ-ওপাশ দেখলাম। তারপর নিজেই হেসে ফেললাম। যাই হোক, এই পেন-ড্রাইভে তিলুর গানগুলো আছে। এটা তোর ডিভিডি। আর এই তোর ছবি।

ভালো করে দেখলাম ছবিটা। বললাম, ‘এ তো শুটিংয়ের সময় মনে হচ্ছে!’

— হুম। যেদিন একশো পর্ব শ্যুট চলছিল, সেদিন। চ্যানেল থেকে কেক কাটা হয়। সুকান্ত ক্যামেরাম্যান ছিল। মানে স্টিল ক্যামেরা। ও-ই তুলে দিয়েছিল।

ইমনদা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘আমাকে তো চিনতেই পারছিস। আমার পাশে মধুরা, সেদিনের শিল্পী। এটা বিকাশ, প্রোডাকশন কন্ট্রোলার। আর এই হল বরেন রায়।’ চোখের কাছে এনে দেখলাম ছবিটা। যদি কিছুটা মেলাতে পারি। দেখলাম চোখে চশমা ছাড়া তেমন কিছু একটা বোঝা যাচ্ছে না। অলোকদার হাই পাওয়ারের মোটা গ্লাসের চশমা। একটা চোখ ছাই রঙের। কিন্তু বরেনের চোখে সরু ফ্রেমের চশমা এবং একই রঙের দুটো চোখের মণি। একটু হতাশই হলাম। ‘ছবিটা আমার কাছে রাখতে পারি? কাজ হলে দিয়ে দেব।’ ইমনদা বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। রাখ। কিন্তু একটা কথা বল, হাত ধুয়ে বরেনের পেছনেই কেন পড়লি তুই? মানে ওকে কেন সন্দেহ হয় তোর?’ ‘জানি না গো। প্রচুর জট পাকিয়ে আছে সবটায়’ আনমনে ছবিটা দেখতে দেখতেই কথাগুলো বলে গেলাম। ইমনদা জিজ্ঞেস করল, ‘তিলোত্তমার আত্মা কি বরেনের নাম বলেছে?’ ছবি থেকে চোখ তুলে বললাম, ‘না না। সে তো শুধু আমায় চায়। কী ক্ষতি করেছি তার কে জানে?’

— একটা কথা বলি।

-বলো।

-নিজের নামটা পালটে ফেল। আমাদের আগের যে প্রোগ্রামিং হেড ছিল সে তো তার গুষ্টিশুদ্ধুর নাম পালটে ফেলল। এমনকি পদবিও। লোকের বিশ্বাস তার পরেই তার উন্নতি। কিছু মাস বাদেই বম্বে চলে গেল। তুইও তেমন একটা কিছু করে ফেল।

ইমনদার এই কথায় আমি মনে মনে যেন আরও জোর পেলাম। বলেই ফেললাম, ‘এমনও হয় বলো?’

— হ্যাঁ। হবে না কেন? করে ফেল ভাই। এই আগুন নিয়ে আর খেলিস না। আমি আর আগুন নিয়ে কোথায় খেললাম ইমনদা? আগুনই তো আমায় নিয়ে খেলছে। আসি গো। বলেই বেরিয়ে গেলাম।

আমার সব সন্দেহ সায়নের কাছে গিয়ে উগরে দিলাম। ওই রায়বাবুদের বাগানবাড়ির খোঁজ নিতে বললাম। ও বলল, ‘দেখছি। বিএলআর ও অফিস থেকে আশা করি সব তথ্যই পেয়ে যাব। তবে দুটো দিন সময় লাগবে।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা। আরও একটা উপকার চাই ভাই।’ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল সায়ন, ‘এত হেজিটেড কেন করছ? বলো না!’ আমি ইমনদার দেওয়া ছবিটা সায়নকে দিলাম। সঙ্গে মোবাইলে রাখা অলোকের ছবি। দেখিয়ে বললাম, ‘তোমরা যে আর্টিস্টকে দিয়ে ছবি আঁকাও, তাকে একবার এই ছবি দুটো দিয়ে দেখতে বলবে যে এরা দুজন এক না আলাদা?’ ছবিটা হাতে নিয়ে বলল, ‘এর মধ্যে বরেন কে?’

— যে ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে, ও।

মুখের কাছে আমার মোবাইলটা ধরে বলল, ‘আর এই অলোক সাহা?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। ফেসবুক থেকে পেলাম। শুধু ওই দাড়িছাড়া মুখে দাড়ি এঁকে আর অন্যান্য কীসব ভাবে তোমরা যেন বোঝো। আমি তো অত জানি না। যদি একটু দেখো তাহলে আরও নিশ্চিত হওয়া যায় আর কী।’

সায়ন হাঁক পাড়ল, ‘দাসবাবু! দাসবাবু!’ ছিপছিপে কালো মতো এক লোক ছুটে এল, ‘স্যার ডাকছিলেন?’ সায়ন ছবিটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা একটু স্ক্যান করে রাখুন তো। আর-একটা প্রিন্ট আউটও।’ আমি ফস করে বললাম, ‘দুটো। আমারও একটা লাগবে।’

— আচ্ছা। তাহলে দুটো। চটপট।

-ওকে স্যার।

লোকটা ঘাড় নেড়ে চলে গেল। আমি একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলব কী বলব না করেও বলে ফেললাম, ‘জানি খুব জ্বালাচ্ছি তোমাকে। তবু…।’ সায়ন বেশ গম্ভীর হয়েই বলে, ‘দাদাভাই, তুমি যদি এত হেজিটেড করো তাহলে কিন্তু আমারও খারাপ লাগবে।’ ‘আসলে সায়ন আমি এর আগে এমন পরিস্থিতিতে তো পড়িনি। কোনওদিন পড়ব কল্পনাও করিনি। তাই এইসবের খোঁজ ঠিক জানি না। ভূতের সিনেমায় দেখেছি। এই কথাটা বলাতে সায়ন ঠোঁটের কোণে একটু রহস্যময় হাসি এনে গভীর কিছু শুনবে ভেবে মুখটাকে টেবিলের ওপার থেকে এগিয়ে আনে আমার দিকে। বলে ‘কী দেখেছ?’ কাঁচুমাচু হয়ে বলি, ‘ওই ভূত-প্রেতের সঙ্গে যারা কথা বলে, শুধুমাত্র তান্ত্রিক নয় কিন্তু মানে ওদের কী যেন বলে! মানে ‘রাজ’ সিনেমার আশুতোষ রানা।’ সায়ন হেসেই ফেলল, বলল, ‘বুঝলাম। এগজ্যাক্ট ওরকম কাউকে এখানে আমিও চিনি না। তবে কলকাতায় একটা টিম কাজ করে, যারা নিজেদের প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর বলে।’

— হ্যাঁ হ্যাঁ ও-ই।

আমার উৎসাহ দেখে সায়ন বলল, ‘তুমি কি এখন ভূতের সঙ্গে কথা বলতে চাইছ?’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘কে আর যেচে ভূতের সঙ্গে গল্প করতে চায় বলো!’ ‘তাও আবার প্রেমিকা ভূত’, বলেই হা হা করে হেসে ওঠে সায়ন। ইতিমধ্যে ছবি স্ক্যান করে প্রিন্ট আউট দিয়ে যায় লোকটা।

সেদিন বিকেলেই সায়ন ফোন করে। বলে যে, প্যারানরমাল সোসাইটি যেখানে, সেদিকে আজ একবার ওকে যেতে হবে। ওদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে রেখেছে। আমি যেন আজকেই ওর সঙ্গে যাই। তাহলে সায়নও সঙ্গে থাকতে পারবে। আমি তো এক পায়ে খাড়া। যথারীতি নির্ধারিত সময়ের আগেই প্যারানরমাল সোসাইটির অফিসে যাই। সঙ্গে পুলিশ, তাই আলাদা খাতির। বাইরে সন্ধে নেমে গেছে। আসার সময় দু-তিনবার মেঘের গর্জনও কানে এল। মেঘ করেছে বেশ। কালবৈশাখী না শুরু হয়ে যায়! ওখানে চারজন ছেলে ছিল। বয়স বেশি না। আমারই মতন মনে হল। সমস্যার কথাটা ওদের যতটা সম্ভব খুলে বলি। সরাসরি এমন আত্মার সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে শুনে চারমূর্তি বেশ অবাক। একজন বলেই ফেলল, ‘বাপ রে। এ তো বেশ ভয়ানক!’ ‘ওই কারণেই তো আপনাদের কাছে আসা। আমি আর পথ খুঁজে পাচ্ছি না ভাই।’ আমার কথা শুনে একজন বললেন, ‘চিন্তা নেই। আমাদের স্যার এক্ষুনি এসে পড়বেন। আশা করি উনি…।’ কথাটা পুরো না হতেই চেম্বারের দরজা খোলার শব্দ হয়। ঢুকে আসেন দীর্ঘদেহী, ঈষৎ পৃথুল এক মধ্যবয়সি লোক। পরনে শার্ট-প্যান্ট। শার্টের ওপরের খোলা বোতামের পাশ দিয়ে গলার রুদ্রাক্ষটা দেখা যাচ্ছে। চোখে রিমলেস চশমা। ঢুকেই সরাসরি আমার চোখে চোখ। চারজনের মধ্যে একজন বলতে শুরু করে, ‘স্যার উনিই মিহির সরখেল। আর উনি বিধাননগর থানার ওসি মিস্টার…।’ হাত তুলে ছেলেটিকে থামিয়ে দেন নীলাম্বর ব্যানার্জি অর্থাৎ এই টিমের হেড। হাত তুলতেই খেয়াল করলাম ওর হাতেও রুদ্রাক্ষ আর সঙ্গে একটা লকেট মতো ঝুলছে। অদ্ভুত লাগছে ওর চাউনি। ঘরে ঢোকার থেকে এক মুহূর্তের জন্য আমার চোখ থেকে চোখ সরাচ্ছেন না। আমি একটু অপ্রস্তুত হয়েই হাত তুলে নমস্কার জানাই নীলাম্বর ভ্রূ দুটো কুঁচকে বলেন, ‘বাড়িতে কে কে আছেন?’ ‘স্ত্রী আর দেড় বছরের ছেলে।’ শুনে আরও ভ্রূ কুঁচকে যায় ওনার। বলেন, ‘ব্যস! এই মুহূর্তে মাত্ৰ দুজন? ‘

-না। এখন ওরা ছাড়াও শম্পা আছে। ছেলের আয়া।

বাইরের আকাশের মেঘ যেন নীলাম্বরের চোখে ঘনিয়ে এল। বলল, ‘নিজের একটা আপাত-সুরক্ষা তো করেছেন। কিন্তু বাড়িতে যারা আছেন তাদের সুরক্ষার কী হবে?’ আমি ভয় পেয়ে বললাম, ‘মানে?’ সায়নও যেন একটু নড়েচড়ে উঠল। বাইরে বাজ পড়ল। নীলাম্বর বললেন, ‘এক্ষুনি ওয়াইফকে ফোন করুন। জিজ্ঞেস করুন কী করছেন উনি আর বাড়িতে ঠিক কী অবস্থা?’ আতঙ্ক যেন আমার পিছু ছাড়ছে না। এখানে এলাম শান্তি পাব বলে। কিন্তু সেখানেও সাসপেন্স। ‘কী হল, করুন করুন’, ধমকে উঠলেন নীলাম্বর। আমি ঝট করে মৃন্ময়ীকে ফোন করলাম। খানিক বাজার পর মৃন্ময়ী ফোন তুলল। ‘হ্যাঁ বলো।’ বেশ শান্ত গলা। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করছ?’

-কী আর করব! ছেলের খাবার বানাচ্ছি। আজ ভাবলাম একটু ভেজিটেবিল স্যুপ দিই।

নীলাম্বর ইশারায় ফোনটাকে স্পিকারে দিতে বললেন। মৃন্ময়ী বলল, ‘তুমি কোথায়? এই শোনো, খুব বৃষ্টি আসছে। ওই শোনো মেঘ ডাকছে গো। তুমি না তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসো। দেরি কোরো না। শম্পাকেও ভাবছি ছেড়ে দেব। আটটা অব্দি থাকতে হবে না। বেচারি আটকে পড়লে মুশকিল।’

নীলাম্বর ব্যানার্জি আমার কানের কাছে এসে বললেন, ‘ওই গোঁ গোঁ শব্দটা কীসের?’ আমিও সেটাই আওড়ালাম মৃন্ময়ীর কানে। শুনে মৃন্ময়ী বলল, ‘শব্দ! কোথায়? মেঘ ডাকছে তো। আর ওই গ্যাস জ্বলছে হয়তো তার শব্দ।’ নীলাম্বর ব্যানার্জি একবার না-সূচক ঘাড় নাড়লেন। আবার কানের কাছে বললেন, ‘বলে দিন ভয় পেলে ওম বলতে।’ এইটা শুনেই আমি হকচকিয়ে যাই। উনি আমায় সামলে মৃন্ময়ীকে কথাটা বলতে বলেন। ওদিকে মৃন্ময়ী আমার নীরবতা শুনে হ্যালো, হ্যালো করে চলেছে। আমি বললাম, ‘শোনো না মৃন্ময়ী, আমি এখুনি বেরোচ্ছি অফিস থেকে। কাজ হয়ে গেছে। পৌঁছে যাব ঘণ্টাখানেকে।

— আচ্ছা।

— বলছি এর মধ্যে তুমি যদি ভয় পাও তাহলে ওম মন্ত্র উচ্চারণ কোরো।

— ভয়! ভয় কেন পাব?

মৃন্ময়ী কিছুটা ঘাবড়ে গেছে বোঝা গেল। আমি সামলে নিয়ে বললাম, ‘আরে না না। বাইরে এরকম ওয়েদার। তুমি একা থাকবে। তাই বললাম। ও খুব ধীরে, মনে হল আনমনা হয়ে বলল, ‘আচ্ছা। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।’

— হ্যাঁ হ্যাঁ আমি এক্ষুনি আসছি।

ফোনটা কেটে গেল। সায়ন বলল, ‘ঠিক কী হচ্ছে একটু বলবেন প্লিজ!’ সীলাম্বর বললেন, ‘হয়নি। তবে হবার সমূহ সম্ভাবনা। এক্ষুনি আপনার বাড়ি চলুন। আমিও যাব।’ আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারজনকে বললেন, ‘তোমরা এখানেই থাকো। … আমি ডাকলে আসবে। মনে হয় না লাগবে। তাও।

— ওকে স্যার।

সায়নের জিপে করেই আমরা ছুটলাম বাড়ির দিকে। হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে ধুকপুক করছে যে তার শব্দ বোধহয় বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছে। বৃষ্টি এসে গেল মাঝপথে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঝড়। টেনশন চাপতে না পেরে নীলাম্বরকে প্রশ্নটা করেই ফেললাম, ‘সত্যি করে বলুন না, আপনি ঠিক কী বুঝছেন? ওদের কোনও ক্ষতি হবে না তো?’ নীলাম্বর কথার জবাব দিলেন না। রাস্তার আলো- অন্ধকারে যেটুকু মুখটা দেখতে পেলাম তাতে মনে হল, উনি কোনও মন্ত্র বা কিছু বিড়বিড় করে বলে চলেছেন। এতে আমার ভয়, আতঙ্ক সব যেন একসঙ্গে বেড়ে গেল। বুঝতে পারলাম আমার হাত দুটো অস্বাভাবিক শীতলতায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। মৃন্ময়ীকে ফোন করব? হ্যাঁ করেই ফেলি। ভেবে সবেমাত্র পকেট থেকে ফোনটা বের করেছি হাতে। অমনি নীলাম্বর আমার হাত চেপে ধরলেন। আলো-আঁধারে তার বিস্ফারিত রক্তনেত্র সরাসরি আমার চোখের দিকে চেয়ে আছে। সায়নও অদ্ভুতভাবে বারুদ্ধ। তবে ও যে খুব ভয়ে ছিল তা নয়। নীলাম্বরের কীর্তিকলাপে কিছুটা হতবাক, এই যা। জিপটা প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। পাড়াতে ঢুকেই বুঝেছি কারেন্ট নেই। মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে। তার মধ্যে আলোর কণামাত্র নেই। বাইরে থেকে বাড়িটাকে ভয়ানক থমথমে লাগছে। মোবাইলের আলো জ্বেলেই বাইরের লোহার গেট পেরিয়ে ঢুকে এলাম। কেবল নীলাম্বর একখানা টর্চ নিয়ে এসেছেন। কখন যে নিলেন তা খেয়ালও করিনি। বারান্দার গেটটা বন্ধই ছিল। সেটা খুলে ঢুকতে ঢুকতেই মৃন্ময়ীর নাম ধরে ডাকি। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। কারও সাড়াশব্দ নেই। সায়ন বলল, ‘তোমাদের ইনভার্টার ছিল না দাদাভাই?’ প্রচণ্ড ভয়ে খুব দ্রুতবেগে বলি, ‘হ্যাঁ আছে তো। মৃন্ময়ী, মৃন্ময়ী!’সায়ন ডাকে, ‘বউদি, বউদি!’ ভিতর থেকে কাঠের দরজাটা বন্ধ। অথচ কারও সাড়া নেই। নীলাম্বর শুধু কী যেন গন্ধ শুঁকছে। একটা সময় বলে উঠল, ‘সময় নেই। দরজা ভাঙুন।’ সারা জীবনের কান্না যেন ফেটে বেরোতে চাইছে। হে ভগবান! এ কী দিন দেখাচ্ছ তুমি? আমি আর সায়ন গায়ের জোরে চার-পাঁচবার ধাক্কা দিতেই ভিতর থেকে ছিটকিনিটা খুলে যায়। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমার বাচ্চাটাই বা কই? এত আওয়াজেও তার ঘুম ভাঙল না! যে যার মতো এদিক-ওদিক আলো ফেলছিলাম। ঘরের দিকে যেতে গিয়ে প্রথম হোঁচট খেলাম আমিই। আমার পায়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে থাকা শরীরটা নড়ে উঠল। মোবাইলের আলো আর একটা খোলা জানলা দিয়ে ঢুকে আসা বাইরের বিদ্যুতের আলোয় দেখি মৃন্ময়ী পড়ে আছে পায়ের কাছে। হাঁটু মুড়ে মৃন্ময়ীর কাছে বসতেই সায়ন বিছানায় খুঁজে পেল ছেলেটাকে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে। এমন ঘুম সে আগে কখনও ঘুমোয়নি। টর্চের আলো টেবিলে পড়তেই জলের জগটা হাতে তুলে নিলেন নীলাম্বর। সায়ন আমার ছেলেটাকে জাগাবার চেষ্টা করছিলই। তারপর নীলাম্বর একটু জল ছিটিয়ে দিলেন। ছেলেটা পরিত্রাহি চিৎকার করে কেঁদে উঠল। মৃন্ময়ী তখনও অচেতন। দু-চারবার জল আর টর্চের চড়া আলোয় অচৈতন্য অবস্থা থেকে হালকা চোখ খুলতেই আতঙ্কে আর্তনাদ করে ওঠে মৃন্ময়ী। আমি সামলাই। ও চিনতে পারে। তারপর হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘বুবাই, বুবাই। আমরা বুবাইকে মৃন্ময়ীর কোলে দিতেই দু-হাত দিয়ে জাপটে ধরে। অন্ধকারে মৃন্ময়ীর চোখ দুটো যেন জ্বলছে। ‘ভয় নেই মৃন্ময়ী। আমরা এসে পড়েছি। এই দেখো সায়নও এসেছে।’ কাকে যে কথাগুলো বলছি জানি না। সে ছেলেকে জাপটে ধরে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। আরেকজন কোথায়?’ নীলাম্বরের কথায় আমি আর সায়ন তাকাই। ‘আরেকজন কে?’ সায়ন বলে। আমি অস্ফুটে বলি, ‘শম্পা!’ ‘আগে আলো জ্বালাবার ব্যবস্থা করুন মিহিরবাবু।’ নীলাম্বরের কথা শুনে সায়নকে মৃন্ময়ীর কাছে বসিয়ে রেখে আমি ছুটে যাই ইনভার্টারের দিকে। মোবাইলের আলোয় দেখি ইনভার্টারের সুইচটা কে যেন বন্ধ করে রেখেছিল। সেটা টিপে দিতেই ঘরের আলো-পাখা চলতে শুরু করে। আমি সবে পিছন ঘুরে ঘরের দিকে তাকিয়েছি, মনে হল কড়কড় করে ঘরের ভিতর প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল। ভীষণ ভয়ে আমি ছিটকে দেয়ালের গায়ে সিঁটিয়ে যাই। মুখে শুধু সায়নের নাম ধরে চিৎকার করে উঠি। নীলাম্বর বড়ো বড়ো পা ফেলে এগিয়ে যান ঘরের দিকে। সায়ন ঝট করে পেছন ফেরে। দেখে ঠিক ওর পিছনের দেয়ালে খোলা জানলার ওপরে সিলিংয়ের সঙ্গে ঘাড় বেঁকিয়ে সাক্ষাৎ প্রেতমূর্তির মতো আটকে আছে শম্পার দেহ। চোখে-মুখে রক্তের দাগ। যেন এক ভয়ংকরী করালবদনা রাক্ষসী এই মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে গিলে খাবে সবাইকে। নীলাম্বর ডান হাতটাকে শম্পার দিকে তাক করে চিৎকার করে ওঠেন, ‘ওঁ হ্রীং ক্লিং চামুণ্ডায়ৈ নমঃ।’ চোখের নিমেষে শম্পার শরীরটাকে কেউ যেন ওপর থেকে ঠেলে ফেলে দেয়। নীলাম্বর লুফে নিতে যান শরীরটাকে। ভৌতিক দেহটা নীলাম্বরের ঘাড়ে এসে পড়ে। টলে যান তিনি। সায়ন সামলে নেয়। আমার শরীরটাও যেন একটু একটু করে অসাড় মায়া ছেড়ে বেরোচ্ছে। অদ্ভুত লাগল মৃন্ময়ীকে দেখে। তার থেকে তিন-চার হাত দূরেই যে এমন একটা ভয়ংকর অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেল সেদিকে যেন কোনও হুঁশ নেই তার। আসতে আসতে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে শম্পার শরীরটাকে মাটিতে শোয়ালেন নীলাম্বর আর সায়ন। আমি মৃন্ময়ীর পাশে গিয়ে বসি। জিজ্ঞেস করি, ‘বেঁচে আছে?’ নীলাম্বর বললেন, ‘এখনও। মাটিতে পড়ে গেলে শম্পার আত্মা তার শরীর ত্যাগ করত। কিন্তু মা রক্ষা করেছেন।’ মৃন্ময়ী ছেলেকে কোলে নিয়েই ঘোরের মধ্যে বলে ওঠে, ‘ও শম্পা নয়।’ অকস্মাৎ এমন কথায় সবাই মৃন্ময়ীর দিকে তাকাই। মৃন্ময়ী বলে, ‘ও রাক্ষসী। ও রাক্ষসী। আমার ছেলেটাকে খেতে এসেছিল! আমার ছেলেটাকে খেতে এসেছিল!’ বলেই আমার জামাটা খামচে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে। আমি সান্ত্বনা দিই। সাহস জোগায় সায়ন। মৃন্ময়ী কেঁদেই চলে। ওদিকে মন্ত্র পড়ে শম্পার জ্ঞান ফেরান নীলাম্বর ব্যানার্জি। শম্পা গোঙাতে থাকে। গোঙানির শব্দটা মানুষের নয়। যেন কোনও পরলোকের প্রাণ রাগে গরগর করছে। নীলাম্বর বলতে থাকেন, শম্পা, শম্পা। শম্পা জেগে ওঠো। তুমি শম্পা। শম্পা তোমার নাম। জেগে ওঠো শম্পা। তুমি বেঁচে আছো!’ গোঙানির শব্দটা ধীরে ধীরে পালটে যায়। চোখ খোলে। ঠোঁট নাড়িয়ে বলে ওঠে উফ কী কষ্ট!’ নীলাম্বর এতক্ষণে মাটিতে তার শরীরটাকে ছেড়ে দিয়ে শান্তিতে বসলেন। একটু পরে শম্পাও চোখ মেলে তাকাল। পূর্ণ জ্ঞান ফিরিয়ে শম্পার মুখের রক্ত মোছানো হল। কাজটা নীলাম্বরই করলেন। মৃন্ময়ী এখনও একটু একটু ভয় পাচ্ছে ওর কাছে যেতে। বড়ো নখ দিয়ে মনের সুখে শম্পার মুখটাকে আঁচড়ে দিয়ে গেছে সে। সে মানে তিলোত্তমা। আমি নিশ্চিত। নীলাম্বর শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করেন, ‘এবার বলুন তো ঠিক কী ঘটেছিল?’ শম্পা একরাশ জিজ্ঞাস্য নিয়ে মুখ তুলে বলে, ‘আমি কিছু জানি না। শুধু বুঝতে পারলাম, শরীরটা আমার ভারী হয়ে আসছে। একটু পরেই শুরু হল ব্যথা। সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। তারপর আমি আর…’ বলে না-সূচক ঘাড় নাড়ল। ছেলেকে কোলে শুইয়ে বোতলে করে দুধ খাওয়াতে-খাওয়াতে মৃন্ময়ী বলতে শুরু করল শম্পার না-বলা কথাগুলো।

তখন বাইরে ঝড় উঠেছে। আমার ফোনটা কেটেই গ্যাস থেকে ভেজিটেবিল স্যুপটা একটা বাটিতে ঢেলে ফুঁ দিতে দিতে ঘরে যায় মৃন্ময়ী। গিয়ে দেখে সবকটা জানলা খোলা। এলোমেলো পর্দা উড়ছে। দু-একটা কপাট দুমদাম শব্দ করে একে অপরের ঘাড়ে পড়ছে আর খুলে যাচ্ছে। এরই মাঝে বিছানায় বসে শম্পা ছেলেটাকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছে আর গান শোনাচ্ছে। এত ঝড়েও জানলাগুলো বন্ধ করেনি দেখে গলায় খানিকটা রাগ এনেই মৃন্ময়ী বলল, ‘এ কী শম্পা! ঝড় উঠেছে আর তুমি একটা জানলাও বন্ধ করোনি? পাল্লাগুলো দড়াম দড়াম করে পড়ছে। ভেঙে যাবে তো!’ বুবাই হওয়ার পর থেকে শম্পা আছে। এতটা বোধবুদ্ধিহীনের মতো কাজ শম্পা ঘটায়নি কখনও। এমনকি মৃন্ময়ী এতগুলো কথা বলে যাওয়ার পরও শম্পার কোনও হেলদোল নেই। সে মৃন্ময়ীর দিকে পেছন ফিরে ছেলেকে দুলিয়ে যাচ্ছে আর গান গেয়ে যাচ্ছে। এবার মৃন্ময়ী গলাটা একটু তুলেই বলে, ‘কী গো শম্পা! আমি যে এতগুলো কথা বলে যাচ্ছি শুনছ না? জানলাগুলো দাও শিগগিরি। ছেলেটার ঠান্ডা লেগে যাবে তো!’ বলতে বলতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। শম্পা, কানে কথা যাচ্ছে তোমার? বালিশ-বিছানা ভিজে যাবে তো সব।’ মৃন্ময়ী যতটা গলার জোরে এই কথাগুলো বলে, তার থেকে দশগুণ জোরে আওয়াজ করে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে জানলাগুলো দড়াম দড়াম করে একে একে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি ঘরের দরজাটাও আর খোলা থাকে না। ব্যস, সব চুপ। বাইরে বাজ পড়ছে। ঘরে নিস্তব্ধতা। শম্পা আর গাইছে না। ওর কোলে ছেলেটাও ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে। কিন্তু এমন ভূতুড়ে কাণ্ড দেখে গলা শুকিয়ে আসে মৃন্ময়ীর। চারপাশে রহস্য জমা হয় মেঘের মতো। মৃন্ময়ী ঢোক গিলে শান্ত গলায় বলে, শম্পা! এই শম্পা! তাকাও আমার দিকে। জানলাগুলো বন্ধ হয়ে গেল কী করে? শম্পা!’ মৃন্ময়ীর মনে হচ্ছে শম্পা যেন রাগে ফুঁসছে। গোঁ গোঁ করে গা-ছমছমে একটা শব্দ বন্ধ ঘরের দেয়ালে গোল গোল করে ঘুরছে। মৃন্ময়ী শম্পার কাঁধে হাত রেখে মুখ দেখার অভিপ্রায়ে একটু ঝুঁকতেই হাওয়ার বেগে মুখ ফেরায় শম্পা। আঁতকে উঠে কয়েক পা পিছিয়ে যায় মৃন্ময়ী। শম্পার শরীরে এ কে? এ তো শম্পা নয়! সারা মুখে রক্তের দাগ। ভয়ংকর রাক্ষসীর মতো দেখতে কেউ শম্পার শরীরটাকে গ্রাস করেছে। রাগে ফুঁসছে সে। ‘কে তুমি?’ মৃন্ময়ী চিৎকার করে ওঠে। চোখের পলকে শম্পাকে গিলে খাওয়া প্রেতাত্মা ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরে গিয়ে শূন্যে ঝুলে দাঁড়িয়ে পড়ে। কোলে আমার ছেলে বুবাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। রাগে গরগর করে সে বলতে থাকে, ‘মিহিরের জীবনে তুই কে? কে তুই? দূর হয়ে যা। ওকে আমার হাতে ছেড়ে দে। নইলে কেউ বাঁচবি না। মিহির শুধু আমার।’ থরথর করে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মৃন্ময়ী জবাব দেয়, ‘ফিরিয়ে দাও আমার ছেলেকে। ফিরিয়ে দাও। নইলে লোক ডাকব আমি।’ এই কথা শুনে সেই ভয়ংকর দর্শন সর্বনাশী দেয়াল ফাটিয়ে হাসতে থাকে। তারপর রক্তমাখা হাতে ঘুমন্ত বুবাইয়ের ঘাড় ধরে ওপর থেকে ঝুলিয়ে দেয়। আঁতকে ওঠে মৃন্ময়ী। মানুষ গলায় দড়ি দিয়ে ঝুললে যেমন ভয়ংকর দেখতে লাগে, বুবাইকে ঠিক তেমনই লাগছে। ডুকরে কেঁদে ওঠে মৃন্ময়ী। চিৎকার করতে যায়। কিন্তু পারে না। ততক্ষণে সেই রাক্ষসীর রক্তাক্ত ডান হাতটা বিশাল আকার নিয়ে চোখের পলকে মৃন্ময়ীর গলা টিপে ধরেছে। সঙ্গে সঙ্গে শরীরটা অসম্ভব ভারী হয়ে বেঁকে দুমড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে সে। মৃন্ময়ী খেয়াল করে ওই ভয়ংকর হাতটায় নানা রঙের পাথর বসানো একটা সুন্দর চুড়ি। অনেক কষ্টে মৃন্ময়ীর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ‘ওম’ ধ্বনি। আর্তনাদ করে মৃন্ময়ীর গলা থেকে হাত সরিয়ে নেয় প্রেতাত্মা। মৃন্ময়ীর চোখ প্রায় বুজে আসছে। তবু সে জীবনের সব শক্তি এক করে শেষবারের মতো বলে ওঠে, ‘ওম!’ বলেই চেতনা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে। চেতনা হারাতে হারাতেও মৃন্ময়ী শুনতে পায় প্রচণ্ড আর্ত চিৎকারে ফেটে পড়ছে ওই রাক্ষসী। তারপর আর কিছু জানে না সে।

নীলাম্বর হাতের মুঠোটা শক্ত করে কপালে ঠুকতে থাকে। নিজের মনেই বলেন, ‘আর একটু দেরি হলে সব শেষ হয়ে যেত। সে এতটাই হিংস্র আর ভয়ানক হয়ে উঠেছে যে এই বাড়ি ছেড়ে যাবার পরেও যতক্ষণ অন্ধকার ছিল ততক্ষণ তার কালো প্রেতশক্তি এই বাড়িটাকে ঘিরে ছিল। সেই শক্তির জেরেই শম্পা দেয়ালে কোনও অবলম্বন ছাড়াই আটকে ছিল।’ ‘আমি বাড়ি যাব।’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল শম্পা। নীলাম্বর বলল, ‘খবরদার না। আজ রাতে কেউ বেরোবে না এ-বাড়ি ছেড়ে। আমি ও যাব না।’ পুলিশ হয়েও সায়ন প্রায় বাদ্ধ। ও শুধু একটাই কথা বলল, ‘পুলিশ হয়ে এসব আমি মানতে পারি না। বিশ্বাসও করতাম না। কিন্তু আজ যা চোখের সামনে দেখলাম তাতে…।’ নীলাম্বর চশমার ওপর দিয়ে চোখ তুলে বললেন, ‘সায়নবাবু, মহামায়ার জগতে সবই মায়া। আপনি যে বিশ্বাস করতেন না সেটাও তাঁর মায়া ছিল। আর এখন যে আপনার চোখের সামনে অবিশ্বাস্য এক ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেন সেটাও তাঁরই মায়া।’’এর থেকে বেরোনোর রাস্তা কী নীলাম্বরবাবু?’ সায়নের কথায় হাসলেন নীলাম্বর ব্যানার্জি। বললেন, ‘মায়ের জগতে অশুভ শক্তি যখন এত ভয়ানক হয়ে উঠতে পেরেছে, তখন শুভ শক্তিও তার প্রকাশ ঘটাবে। ঘটাবেই। নইলে এতদিন মিহিরবাবু তো আসেননি আমার কাছে। আজ কেন এলেন? মায়ের নির্দেশ ছাড়া, ভবিতব্য ছাড়া এ কি সম্ভব?’ শম্পা হাঁটু মুড়ে খাটের ওপর বসে ছিল। মুখটা হাঁটুর আড়ালে নিয়ে গুমরে কেঁদে ওঠে। শম্পার মাথায় হাত রেখে বাবার স্নেহে নীলাম্বর বলেন, ‘ভয় নেই রে মা। আমি তো আছি। বিশ্বাস রাখ। আর কিচ্ছু হবে না।’ ওই খোলা জানলা দিয়েই বোধহয় বেরিয়ে গেছে তিলোত্তমার আত্মা। বাইরে চোখ পড়তেই দেখলাম ঝড় থেমে গেছে। স্ট্রিট লাইটের আলোয় বৃষ্টিটা ঝিরঝির করে পড়ে চলেছে। তার মানে কারেন্ট এসে গেছে।

সেদিন সত্যিই আর কিছু হয়নি। নীলাম্বর ফোন করে ওই চারটে ছেলেকে বাড়ি চলে যেতে বলেন। সায়নও মুনাইকে ফোন করে জানিয়ে দেয় আজ সে এই বাড়িতে থাকছে। পরের দিন সকালে নীলাম্বর বললেন, আমি যেন বউ আর ছেলেকে কিছুদিনের জন্য অন্য কোথাও রেখে আসি এবং আমাকে ওদের থেকে আলাদা থাকতে হবে। কারণ এই বাড়িটার ওপর ওই প্রেতের ছায়া আছে। তা ছাড়া আমার সঙ্গে মৃন্ময়ী বা আমার ছেলে থাকলে তিলোত্তমার সহ্য হবে না। এইসবের কারণেই ওদের জন্য এই বাড়িটা সেফ নয়। ‘কিন্তু কতদিন?’ আমার কথায় নীলাম্বর বললেন, ‘যতদিন না এই সমস্যা মেটে।’

-আদৌ কি মিটবে?

-নীলাম্বর বাঁড়ুজ্যের ওপর এখনও বিশ্বাস না হলে অন্য পথ দেখতে পারেন। আমি হাত জোড় করে বললাম, ‘রাগ করবেন না। আমার মাথার ঠিক নেই। আসলে কেমন পাগল-পাগল লাগছে। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। তাই বলে ফেলেছি।’ শুনে বললেন, সন্ধেবেলায় উনি একটা জিনিস দেবেন, সেটা ওনার অফিসে গিয়ে আমি যেন নিয়ে আসি। কথামতো তাই করলাম। উনি মৃন্ময়ী, বুবাই আর সায়নের জন্য একটা করে লাল সুতোয় বাঁধা রুদ্রাক্ষ দিলেন। বললেন, প্রতিদিন স্নান করে ওই রুদ্রাক্ষ দুই হাতের তালুর মাঝে রেখে হাত জড়ো করে তিনবার ‘ওম নমঃ শিবায়’ বলতে। বুবাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু গায়ে বাঁধা থাকলেই যথেষ্ট। কারণ পাঁচ বছরের নীচে শিশুদের নাকি স্বয়ং ঈশ্বর রক্ষা করেন। শুনে আমি একটু নিশ্চিন্ত হই। উনি বললেন, আমায় একবার আপনাদের অফিসে যেতে হবে। ওই ব্যাক কনফারেন্স আর তেরো নম্বর ফ্লোরটা দেখতে হবে।’ এবার বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। অফিসে বললে থোড়ি আমায় পারমিশন দেবে! নীলাম্বরকে বললাম, ‘দুটোই খুব শক্ত ব্যাপার। আমাদের অফিসের পিছনের ফ্লোরটা যদিও দেখতে পারেন, কিন্তু তেরো নম্বর ফ্লোরে আপনি কতটা কী করতে পারবেন জানি না। আসলে অন্য কিছু না, আমি নিজে ভুক্তভোগী। ওই ফ্লোরে সাক্ষাৎ মৃত্যু ওঁত পেতে আছে। আপনাকে তো বললাম, কী ভয়ানক সেই মূর্তি।’

-চিন্তা নেই। চামুণ্ডা রক্ষা করবেন। আমাদের হিন্দুদের যে এত মন্ত্রতন্ত্র তা তো এমনি নয় মিহিরবাবু। আমার খটকা লাগছে শুধু একটাই। যে কোনও স্পিরিট মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে কোনও একটা মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে। কাল আপনার বাড়িতে সেই মাধ্যম ছিল শম্পা। অথচ আপনি বলছেন ওকে তিলোত্তমার রূপেই দেখেছেন। শুধু বীভৎস, তাই তো?

আমি ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললাম। নীলাম্বর জানতে চাইলেন, ‘তিলোত্তমার মৃত্যুর পর দাহ কোথায় হয়? কলকাতায়, নাকি শিলিগুড়িতে?’

— এই রে তা তো জানি না। এক সেকেন্ড।

বলেই মোবাইলে ইমনদাকে ধরি। নীলাম্বরকে জানাই, ইমনদা হয়তো বলতে পারবে। চট করে নীলাম্বর বলেন, ‘তিলোত্তমার বাড়ির কারুর কনট্যাক্ট আছে কিনা জানবেন।’ ইমনদা ফোন ধরতেই জিজ্ঞেস করি। সে বলে, কলকাতাতেই দাহ হয়। ক্যাওড়াতলায়। তবে তার বাড়ির কারও কন্ট্যাক্ট নম্বর নেই ইমনদার কাছে। ফোনটা রেখেই হঠাৎ মনে হল সায়নের কথা। ও তো বিধাননগর থানাতেই আছে। আর এই কেসটাও এই থানার আন্ডারেই। মৃত্যুর ডেট আর সালটা বললে সায়ন হয়তো খোঁজ লাগিয়ে বলে দিতে পারে কারও নম্বর। সব শুনে সায়ন বলল, দেখছি। পুরোনো রেকর্ড খুঁজতে সময় লাগবে। তবে একটা জিনিস মাথায় ঢুকছিল না। দাহ কোথায় হয়েছিল সেটা জেনে কী হবে! নীলাম্বর বললেন, ‘শরীর যদি দাহ হয়েই থাকে তাহলে তিলোত্তমা ওই শরীরটাকে মাধ্যম করছে কী করে?’ আমি থ হয়ে বসে থাকি। মাথায় মৃত্যু-ভূত আর রহস্যের যে প্রশ্নবিচিত্রা ছিল তাতে এবার আরও একটা প্রশ্ন যোগ হল। আমি বললাম, ‘মিহির যদি খুন করে তিলোত্তমাকে তাহলে তো মিহিরকে খুন করে সে তার প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছে। শুধুমাত্র মিহির নামের জন্য আমার পিছনে কেন পড়ে আছে?’ নীলাম্বর চেয়ার ছেড়ে উঠে বইয়ের র‍্যাকে বই খুঁজতে খুঁজতে বলেন, ‘এটা নির্ভর করে বেশ কিছু ব্যাপারের ওপর। এক, তার যদি এই নামের প্রতি ভয়ংকর রকমের দুর্বলতা থাকে তাহলে এই নামের মানুষ পেলেই সে কাছে আসতে চাইবে। দুই, মৃত্যুর আগের মুহূর্তে তার মনের অবস্থা কী ছিল! সে কাকে সবচেয়ে ভালোবাসত, কাকে এড়িয়ে চলত, কাকে বেশি ঘৃণা করত, কেন ঘৃণা করত! এই এত কিছুর ওপর এটা ডিপেন্ড করে।’

— অর্থাৎ সে কোন মানসিক পরিস্থিতিতে মারা গেছে! তার ভাবনা, চিন্তা সব সেখানেই থেমে গেছে! আমার কথায় সায় দেন নীলাম্বর, ‘একদম ঠিক।’

— তাহলে তো তার মৃত্যুরহস্যের কিনারা আগে করতে হবে।

— একদমই তাই। আর সেটা খুব শিগগিরি। নইলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে

— যাবে।

— আচ্ছা, সে তার গান কেন শুনতে চায়?

কারণ ওই গানগুলোর সঙ্গে তার প্রেমিক মিহির জড়িয়ে আছে।

আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলি, ‘নীলাম্বরবাবু, আমাকে কোনও পাগলা গারদের ঠিকানা দিতে পারেন?’

হো হো করে হেসে উঠে নীলাম্বর বলেন, ‘ওখানে গেলেও আপনার নিস্তার নেই মিহিরবাবু। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আপনার পিছনে তিলোত্তমার কালো ছায়া।’ চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে পিছনে তাকাই। নীলাম্বর বলেন, ‘আরে বসুন বসুন। ওই ছায়া আপনি দেখতে পাবেন না। এমনিতেই অনেকটা সময় কেটে গেছে। তার ওপর সে আপনাকে ছুঁতে পারছে না। আপনি যেমন পাগল হয়ে যাচ্ছেন, সেও তেমনই পাগল হয়ে গেছে। এখন ও মরিয়া ওর হিসেব মেলাতে। বারো বছর হয়ে গেল তিলোত্তমার মৃত্যুর। মানে এক যুগ। অতৃপ্ত আত্মা এক যুগ পর একটা মিহিরকে পেয়েছে। অত সহজে ছেড়ে দেবে? আমার গণনা যদি ঠিক হয় তাহলে খুব শিগগিরি আপনাকে আরও বড়ো একটা পরীক্ষা দিতে হবে মিহিরবাবু।’ আমি এবার রেগেই গেলাম। ‘কী চান আপনি? আমাকে ভয় দেখাতে? এই জন্য আপনার কাছে এসেছি? আমার পিছনে তিলোত্তমা থাকলে আমি বুঝতে পারব না? অদ্ভুত তো?’ বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে রেখেই নীলাম্বর বললেন, ‘বেশ। এই ঘরে যেরকম আলো জ্বলছে তাতে আপনার পিছনের দেয়ালে আপনার ছায়া পড়ার কথা। নিজেই খুঁজে দেখুন এই ঘরের কোথাও আপনার ছায়া খুঁজে পান কি না!’ ছমছম করে উঠল সারা গা। অনেক কষ্ট করে ঘাড়টাকে বেঁকিয়ে আবার পিছনে তাকালাম। দেখলাম সারা দেয়ালটাই কালো হয়ে আছে। কোনও মানুষের ছায়া তো দূর, অন্য কিছুরও কোনও ছায়া খুঁজে পেলাম না। তারপর এপাশ-ওপাশ সবখানেই দেখলাম। নাহ্! কোখাও আমার ছায়া নেই। ঘরে মানুষের ছায়া বলতে একটাই, নীলাম্বর ব্যানার্জির। মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল। নীলাম্বরের সামনেই শরীরটা আমার অসাড় হয়ে এল। ভালোই বুঝতে পারলাম, আমি ভৌতিক রহস্যের ভারে কুঁজো হয়ে গেছি।

মৃন্ময়ীকে তার বাপের বাড়িতে রেখে এসেছি একটা দিন কেটে গেছে। সেদিন রাতে খেয়ে দেয়ে সবে শুতে যাব, ফোনটা বেজে উঠল। সায়ন ফোন করেছে। অনেক কথা বলে গেল। সব শুনে বুকের ওপর চাপা ভয়টায় একটু যেন স্বস্তির বাতাস লাগল। কেন, তা ঠিক বলতে পারি না। শুধু বুঝলাম, আমরা ঠিক রাস্তাতেই এগোচ্ছি। পরের দিন শরীর খারাপের অজুহাতে ছুটি নিলাম অফিস থেকে। ছুটি না দিলেও নিতে আমাকে হতই। ওইদিনটা এই একযুগ ধরে চলা ভৌতিক রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল। অন্তত আমার কাছে। সেদিন সারা রাত ঘুম হয়নি। পরের দিনের উত্তেজনায় পেটের ভিতরটা কেবল গুড়গুড় করছিল। সায়ন আমায় নিতে চাইছিল না। আমিই জোর করলাম। যুদ্ধে যখন নেমেইছি তখন মুখ লুকিয়ে লাভ নেই। তা ছাড়া এখন সবসময় মহীতোষদার বলা কথাটা আমার মাথায় ঘুরপাক খায়, ‘ভয়কে যত ফেস করবি, ভয়ের মুখোমুখি হবি, ততই জানবি কেউ তোর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।’

দুধসাদা দোতলা বাড়িটার গায়ে চকচকে কারুকাজে খোদাই করা বাড়ির নাম, ‘সাহা ভিলা।’ দু-তিনবার বেল বাজাতেই ভিতর থেকে দরজাটা খুলে গেল। কাজের মহিলাটির মুখ দেখে বোঝাই গেল বেশ চমকে গেছে। আসলে আমি তো একা নই, পুলিশ ও আছে সঙ্গে। সায়ন আর নিতাই পুরকায়স্থ। নিতাইবাবু ভবানীপুর থানার ওসি। সায়ন কাজের মেয়েটিকে বলল, ‘অলোকবাবুকে ডেকে দাও।’ সে একটু আমতা আমতা করে বলল, ‘দাদাবাবু?’ ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, উনি বাড়িতেই আছেন। ডাকো।’ বলে আর আসুন, বসুনের অপেক্ষা না করে সটান বাহারি ঘরটায় ঢুকে যাই আমরা। কাজের মহিলাটিও পরপরিয়ে অন্দরে পালায়। বাড়িটা বেশ বড়ো। রীতিমতো বারমহল আর অন্দরমহলে ভাগ করা। শুনতে পাই কাজের মহিলাটি ‘দাদাবাবুউউউউ, দাদাবাবুউউউউ’ করে হাঁকছে। এই সময়ে ঘরের মধ্যে চোখে যা পড়ল তা প্রায় শকুনের দৃষ্টি দিয়ে আমি আর সায়ন ভালো করে পরখ করে নিলাম। দামি সোফা, পাশেই ঝাড়লণ্ঠনের মতো টেবিল ল্যাম্প। সেখানে মিলনরত এক নারী-পুরুষের মূর্তি। দেয়ালে একটা বাঘের মুখোশ। উলটোদিকের দেয়ালে একটা বিশাল ছবিতে অলোক সাহা ও তার পরিবার। সায়ন আমার কানের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘একটাই মেয়ে?’

— হুম। কার্শিয়াং-এ স্কুলে পড়ে। সেদিন মিটিংয়েই বলছিলেন।

বলতে বলতেই অলোকদা এসে হাজির। ‘কী ব্যাপার? আমার বাড়িতে পুলিশ?’ আমাদের সবার চোখ অলোকের দিকে। পরনে ফতুয়া আর ঢিলেঢালা রঙিন পাজামা। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। সায়ন বলল, ‘বসতে পারি?’ অলোক সোফার দিকে হাত দেখিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ বসুন।’ আমার শরীর সবে সোফা ছুঁয়েছে, অলোকদা বললেন, ‘তা মিহির, তোমাদের চ্যানেল কি প্রোমোর বাজেট নিয়ে কথা বলতে বাড়িতে পুলিশ পাঠায়?’’না না ব্যাপারটা…’ আমার কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সায়ন বলল, ‘বিধাননগর থানা থেকে আসছি, ওসি সায়ন মল্লিক।’ সঙ্গে সঙ্গে অলোকদা বলতে শুরু করলেন, ‘বাট আমার বাড়িটা তো…।’ প্রশ্ন শেষ না হতেই উত্তর দিল সায়ন বলল, ‘জানি। ওই জন্যই নিতাইবাবুকে সঙ্গে আনা। উনি আপনাদের ভবানীপুর থানার ওসি।’

অলোকের মুখের কথাটার জন্য সায়ন যে তৈরিই ছিল তা অলোক বুঝলেন। সায়ন অলোককে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলল, ‘ছবিটা কবেকার?’ সায়নের চোখের ইশারায় অলোক বুঝতে পারল যে দেয়ালে টাঙানো বউ ও মেয়ের সঙ্গে যে ছবি, তার কথাই জিজ্ঞেস করছে। অলোকদা বললেন, ‘এই পাঁচ মাস আগের। কেন?’ সায়ন উত্তর না দিয়ে আবার প্রশ্ন করল, ‘আপনার চোখে এত পাওয়ার, তা সত্ত্বেও লেন্স পরেন কেন?’

অলোকদা এই প্রশ্নটার জন্য তৈরি ছিলেন না। আমতা আমতা করে বললেন, ‘মানে? লেন্স কোথায়?’

— আপনার চোখে। ছাই রঙের যেটা।

গম্ভীর হয়ে অলোক জানালেন, ‘ওটা লেন্স নয়। চোখে অপারেশন হওয়ার পর থেকে ওটা ওরকম হয়ে গেছে।’

— ও হো! ছানি?

-না রেটিনায় একটা প্রবলেম ছিল। কিন্তু কী ব্যাপার বলুন তো? আপনারা কি আমার চোখের খবর নিতে এসেছেন?

সায়ন আবার পালটা প্রশ্ন করল, ‘কতদিন আগে অপারেশন হয়েছিল?’ সায়নের এইসব প্রশ্ন করার মানেটা যে কী আমার মাথায় ঢুকছে না। আর অলোকের ওটা লেন্স সেটা সায়ন জানল বা বুঝল কী করে? অলোকদা এবার বেশ অস্বস্তিতে পড়েছেন। খানিক চটে গিয়েই আমায় বললেন, ‘মিহির এসব হচ্ছে কী? চ্যানেল থেকে কি এবার পুলিশ পাঠিয়ে ভয় দেখিয়ে অল্প বাজেটে কাজ করাবে? হোয়াট দ্য…’ পরের কথাটা বলতে গিয়ে থামলেন অলোক সাহা। এখানে আমার কিছু বলার নেই আর বলার সময়টাও দিল না সায়ন। বলল, ‘এটা তো সাধারণ কথা অলোকবাবু। এতে চটে যাবার কোনও কারণ আছে কি?’ নিতাই তাল ঠোকে, ‘উনি যা জিজ্ঞেস করছেন বলুন।’ অলোক বসে বসে নিজের শরীরটাকে বিরক্তির সঙ্গে একবার দুলিয়ে বলেন, ‘সাড়ে পাঁচ বছর।’ ‘ওওওও’! দু-সেকেন্ড নির্বাক থেকে পরক্ষণেই একটা বোম ফেলল সায়ন। জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে এই পাঁচ মাস আগের ছবিতে আপনার দুটো চোখের রং একই হয়ে গেল কী করে অলোকবাবু?’ ঘরের মধ্যে যারা ছিলাম তারা সবাই প্রায় নতুন করে ছবির দিকে তাকালাম। আমি উত্তেজনায় উঠে গেলাম ছবিটার কাছে। ঠিক তো! ক্লোজ শটের ছবি। চোখ দুটো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। একদম একই রং। বরং চোখের হাই পাওয়ারের গ্লাসটা অলোকের চোখের মণিদুটোকে আরও বড়ো করে ছবিতে প্রকাশ করেছে। বাপ রে! একেই বলে পুলিশের চোখ। অলোক সত্যিটাকে ঢাকার জন্য ফিকির শুরু করেন। বলেন, ‘ছবিতে ধরা পড়েনি। কিন্তু ছিল। বোঝা যাচ্ছে না।’ এবার আমি হাল ধরি। বলেই ফেলি, ‘অসম্ভব অলোকদা। এত ক্লোজ শটের ছবি, তার ওপর আপনার চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এটা ডিএসএলআর-এ তোলা। নইলে এত বিশাল করে বাঁধানো যেত না। আপনার কাঁচা-পাকা চুলের ডিটেলিং কী চমৎকার ধরা পড়েছে আর আপনার চোখের দু-রকম রং ধরা পড়ল না?’ প্রচণ্ড রাগে তড়াক করে লাফিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান অলোক সাহা। গর্জে ওঠেন, ‘আমি কিন্তু এবার আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব। বাড়ি বয়ে এসে কোনও কারণ ছাড়া আমাকে হ্যারাস করার জন্য।’নিতাই ধমকে ওঠে, ‘বসুন। বসুন বলছি। নইলে পুলিশের সঙ্গে অসহযোগিতার জন্য আপনাকে আমরা অ্যারেস্ট করব।’ আঙুল তুলে বলে ওঠেন অলোক, ‘আমাকে আপনারা চেনেন না। প্রয়োজন হলে…।’ সায়নের গলা অলোকের গলার ওপর দিয়ে বলে ওঠে, ‘চিনতেই এসেছি আর এসেই খানিকটা মুখোশ খুলেছি। আর বাকিটাও খুলে ফেলব।’

— হোয়াট? আপনি কিন্তু আমায় ইনসাল্ট করছেন!

গলাটা এতটাই ওপরে করে ফেলেছিলেন অলোক যে হাই পিচে গিয়ে গলাটা ক্র্যাক করে যায়। সামনের টেবিলের ওপর সায়ন হাতে থাকা রুলের বাড়ি দিয়ে বলে ওঠে, ‘বসুন। বসুন বলছি।’ অগত্যা সোফায় বসা ছাড়া গত্যন্তর নেই অলোকের। চিৎকার শুনে অলোকের স্ত্রী ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ান। গলায় উৎকণ্ঠা, ‘কী হল? কী হয়েছে? হ্যাঁ গো!’

— তুমি আবার এলে কী করতে? ভিতরে যাও তো!

খেঁকিয়ে উঠলেন অলোক। ছাপোষা মহিলাটি বললেন, ‘ভাবলাম কোনও ঝামেলা কিছু…।’ বউয়ের কথা থামিয়ে অলোকদা বলেন, ‘হলেও আমি সালটে নেব। তুমি ঘরে যাও।’

‘সালটে নেব’ শব্দটা শুনেই আমি আর সায়ন একে অপরের দিকে চাই। মহীদার বলা সব কথাই সায়ন জানে, তাই বুঝতে আর কোনও অসুবিধে হয় না যে আমরা ঠিক জায়গাতেই এসেছি। অলোকের বউ ভিতরে যেতে সায়ন ঠোটটা একটু বেঁকিয়ে হেসে বলে, ‘আপনি খুব ভালো সালটাতে পারেন না সব কিছু?’ অলোক এবার বেশ গম্ভীর। গলাটাকে মন্দ্রসপ্তকে নামিয়ে বলেন, ‘বুঝলাম না।’

— আমরাও বুঝঝি না জানেন। ওই জন্যই আপনার বাড়িতে আসা। বারো-তেরো বছর আগেও এরকম‍ই কিছু আপনি সালটাতে চেয়েছিলেন। পেরেওছিলেন। ঠিক কীভাবে সেটাই জানতে চাই।

— মিস্টার সায়ন মল্লিক। আমার হাতে প্রচুর কাজ। আমায় এক্ষুনি বেরোতে হবে। যা বলার পরিষ্কার করে খোলসা করে বলুন।

দাঁতে দাঁত চিপে বলে গেলেন অলোক।

— সত্যি আপনি খুব বিজি মানুষ। আচ্ছা, আপনার আর সময় নষ্ট না করিয়ে একে একে আসি তাহলে। মিস্টার অলোক সাহা একটা কথা বলুন তো, নলডুগারির রায়বাবুদের বাগানবাড়ি আপনার তো? মানে মালিক আপনি তো?

বাগানবাড়ির নাম উঠতেই অলোক আমার দিকে একবার শ্যেনদৃষ্টিতে তাকায়। তারপর বলেন, ‘মিহিরকে তো সবই বললাম সেদিন। কী মিহির বলো।’ আমি বললাম, আরেকবার ওদের বলুন। আমার সব মনে নেই।’ হালে পানি না পেয়ে অলোক আমায় বলা একই কথা রিপিট করে। সায়ন জানতে চায়, ‘ঠিক কতদিন আগে ওই বাড়ি আপনারা কেনেন?

— বছর এগারো।

-বাহ্! আজ অবিশ্যি আপনার সঙ্গে আমাদের প্রথম আলাপটাই মিথ্যে দিয়ে শুরু করেছিলেন। তাই—

-আমি সত্যি কথাই বলছি।

মুখের ওপর বলেন অলোক সাহা।

— হ্যাঁ জানি তো। অলোক সাহা আজ থেকে ঠিক এগারো বছর আগেই এই রায়বাবুদের বাগানবাড়ির মালিক হন।

কিন্তু তার আগে বাড়িটা কার ছিল?

— রায়দের। যাদের নামে বাড়ি।

-অলোকবাবু, আমি এতটাও গাধা নই যে এই সাধারণ কথাটা বুঝব না। আমি জানতে চাইছি নাম কী ছিল? অলোক গলাটা খাঁকায় একবার। তারপর বলেন, ‘ওই কৃষ্ণমোহন রায়’! ‘কৃষ্ণমোহন রায়! আপনি তাঁর কাছ থেকেই এটা কেনেন?’ আমতা আমতা করে অলোক জবাব দেন, ‘না ঠিক তাঁর কাছ থেকে না।’ নিতাই তড়পে ওঠে, চ্যাংড়ামো হচ্ছে? আপনার কাজ আছে আর আমরা কী এখানে গল্পপাঠের আসর করতে এসেছি? সরাসরি বলুন, কার কাছ থেকে কিনেছেন?’ অলোক এবার ঘাবড়ে গিয়ে তুতলে বলে, ‘ব-বরেন রায়। সায়নও বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে, ‘কৃষ্ণমোহন রায়ের নাতি।’ অলোক যেন চমকে ওঠে। তারপর ওপর-নীচে হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নাড়ে। ‘এবার কি জানতে পারি আপনার দাদুর নাম কী ছিল?’ সায়নের কথায় খুব শান্ত হয়ে নিপাট ভালোমানুষের মতো অলোক বলেন, ইন্সপেক্টর আমি কি জানতে পারি আমার ঠিকুজিকুষ্ঠি নিয়ে আপনারা ঠিক কোন কাজে লাগাবেন!’ সায়ন বলে, ‘নিশ্চয়ই। আমাদের বলতে হবে না। আপনি নিজেই বুঝে যাবেন। বা অলরেডি খানিক আন্দাজ করে ফেলেছেন। শুধু নিশ্চিত হতে পারছেন না।’

— কী, কীসের আন্দাজ।

-আগে শুনি আপনার দাদুর নাম।

সোফায় বসেই মাথাটা নামিয়ে ফেলেন অলোক। বুঝতে পারেন আর বেশি ধানাই-পানাই করে লাভ নেই। বলেন, ‘কৃষ্ণমোহন। কৃষ্ণমোহন রায়। বাকিটা সায়ন বলে, ‘তাঁরই নাতি বরেন রায় ওরফে আজকের ব্যস্ততম মানুষ শ্রী অলোক সাহা।’

— হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। তাতে কী? তাতে কী? এরকম তো কত মানুষ আকছার নামধাম পালটাচ্ছে। তাতে কী প্রমাণ হয়?

এক নিশ্বাসে গড়গড় করে বলে ওঠে বরেন ওরফে অলোক সাহা। সায়ন ততোধিক নরম সুরে বলে, ‘কী প্রমাণের কথা বলছেন বলুন তো অলোক, থুড়ি বরেনবাবু? আমরা তো কিছু বলিনি।’ ‘তাহলে কেন এসব কথা উঠছে ইন্সপেক্টর?’ বরেনের কথায় নিতাই বলে ওঠে, ‘আচ্ছা অলোকবাবু, কী এমন ঘটল যে আপনাকে গোটা পরিবারের নামধাম, পদবি সব পালটাতে হল? বরেন ওরফে অলোক বলে, ‘এক জ্যোতিষী বলেছিল। বলেছিল যে নামধাম পালটালে আমার উন্নতি হবে। আরও কাজ পাবেন।’ কেউ কিছু প্রশ্ন করার আগেই বলে ওঠে অলোক, ‘উনি আট বছর হল মারা গেছেন। ওনার আর কোনও খবর আমি জানি না। ওনার সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন করবেন না।’

— বেশ। জ্যোতিষী বলল আর আপনি নামধাম, পদবি সব পালটে ফেললেন আজ থেকে ঠিক এগারো বছর আগে, মানে তিলোত্তমার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে!

সায়নের কথাটা তিরের মতো গিয়ে বিধল বরেনের বুকে। খেপে গিয়ে বলে ওঠে বরেন, কী বলছেন কী? তিলোত্তমার মৃত্যুর সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?’

— আপনি চেনেন তিলোত্তমাকে? অবশ্য চিনবেনই তো। ভালোবাসতেন যে!

-শাট আপ ইন্সপেক্টর। আপনি এবার বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন।

-ইউ শাট আপ করেন রায়।

ধমকে উঠলেন নিতাইবাবু। সায়ন থমথমে গলায় বলল, ‘কুল, কুল, বরেন রায়। নিতাইবাবু, অযথা কেন উত্তেজিত হচ্ছেন? একবার ভাবুন তো, আপনার সামনে কবর ফুঁড়ে এক প্রেতাত্মা এসে দাঁড়িয়েছে। সে তার মৃত্যুর হিসেব মেলাতে চাইছে এবার। আপনি কি শান্ত থাকতে পারবেন? তাহলে বরেন রায় কী করে শান্ত থাকবেন?’ প্রবল উত্তেজনায় সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে বরেন। এবার নিতাইবাবুর হাতে থাকা একটা কাগজের গোছা নিজের হাতে নিয়ে সায়নও সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সেটা খুলে বরেনের সামনে মেলে ধরে। সে জানায়, ‘বিএলআর ও অফিসে গেলেই এটা পাওয়া যায়। একে সার্চিং কপি বলে। এখানে বরেন রায় কবে অলোক সাহা হল এবং রায়বাবুদের বাগানবাড়ির মালিক হল সব ডিটেলস লেখা। মানুষ দুটো যে একই তাও এখানে স্পষ্ট লেখা আছে বরেন রায় ওরফে অলোক সাহা। পুলিশ এটুকু খুঁজে পাবে না, অ্যাঁ? বেকার বেকার কতগুলো মিথ্যে কথা বলে আমাদের সময় নষ্ট করছিলেন। আর নাম পালটেছেন ভালো কথা। এতে লুকোবার কী কারণ ছিল? চোখের রং, গালের দাড়ি এইসব বেশভূষাই বা কেন? ডাল মে কুছ তো কালা হ্যায়। তাই না বরেন রায়?’ সায়নকে যত দেখছি তত অবাক হচ্ছি। এই কি আমাদের বাড়ির জামাই? এইটুকু বয়সেই রীতিমতো দুদে পুলিশের মতো কথা বলছে, হাবভাব করছে! এইজন্যই এত অল্প বয়সে পরপর প্রোমোশন পেয়ে একেবারে ওসি। আচ্ছা, মুনাই কি তার স্বামীর এমন রূপ দেখেছে কখনও? বরেনের উদ্দেশে সায়ন আরও বলে, ‘দাঁড়িয়ে পড়ে ভালোই করেছেন। এখন আপনাকে আমার সঙ্গে থানায় যেতে হবে।’

— মানে?

সায়ন এবার গম্ভীর হয়ে বলে, ‘তিলোত্তমা মৃত্যুর কেসটা রিওপেন হয়েছে বরেন রায়।’ কথাটা শুনতেই বরেনের গলার নলিটা একটু ওঠানামা করে। বুঝতে পারি বরেন ঢোঁক গিলল। শুকনো গলাতেই বলল, ‘এর জন্য আমায় কেন থানায় যেতে হবে?’

-কারণ আমরা জানতে পেরেছি আপনি তিলোত্তমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতেন।

— কে বলেছে?

— সেটা থানায় গেলেই জানতে পারবেন। তা ছাড়া কেসটা যখন রিওপেন হয়েছে তখন আমরা শুধু আপনাকেই নয়, প্রভাতি সংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব। তবে সেটা আপনাকে দিয়ে শুরু হবে। কারণ, একের পর এক মিথ্যে বলে যাওয়া, ভেক ধরে ঘুরে বেড়ানো এবং হঠাৎ করে ইন্ডাস্ট্রি থেকে উবে গিয়ে নামধাম পালটে পুনরাগমন! জানতে হবে না এর কারণ কী! সত্যিই আপনার সঙ্গে তিলোত্তমার মৃত্যুরহস্যের কোনও সংযোগ আছে কি না! আর শুনুন, আমরা আপনাকে থানায় ডেকে পাঠাচ্ছি। এখনও কিন্তু অ্যারেস্ট করছি না বরেনবাবু। বেশি ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করলে… চলুন।

সায়নের ধমক খেয়েও নিজের জায়গা ছেড়ে নড়ছিল না বরেন। শুধু একটা নিশ্বাস ফেলল। সায়ন কটমট করে তাকাতে সুড়সুড় করে বাইরে গিয়ে পুলিশের গাড়িতে উঠল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *