তৃতীয় পর্ব : দমকা বাতাস – ৫

অধ্যায় পাঁচ

১৫ অক্টোবর, সোমবার

ইশ! এসব যদি দুঃস্বপ্ন হতো, প্রত্যেক সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ভাবে আসাকাওয়া। কাছাকাছি রেন্ট-এ-কারে ফোন করে জানাল, রিজার্ভ করা কারটা পূর্বেই ঠিক করা শিডিউল মোতাবেক-ই নেবে ও। ওদের ফাইলে ওর রিজার্ভেশনের ব্যাপারে আগে থেকেই লেখা ছিল। রূঢ় বাস্তবতাময় আরেকটা দিনের শুরু।

একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে। জানার চেষ্টা করতে হবে ভিডিওটা সম্প্রচারের উৎসের ব্যাপারে। ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটারের সাহায্য টেলিভিশন ফ্রিকোয়েন্সিতে অনুপ্রবেশ ঘটানো খুবই কঠিন। প্রচুর অভিজ্ঞ ও মডিফাইড কোনো ইউনিট এই ব্যাপারটা ঘটিয়েছে, বুঝতে পারল আসাকাওয়া। আর টেপের দৃশ্যগুলোও ছিল একেবারে পরিষ্কার, কোনো ঝামেলা ছিল না ওতে। এর মানে সিগন্যালটা নিশ্চয়ই খুব শক্তিশালী আর জায়গাটার কাছাকাছি কোথাও। আরও তথ্য পেলে, কোন জায়গা থেকে জিনিসটা সম্প্রচারিত হয়েছে সেটা হয়তো খুঁজে বের করতে পারবে আসাকাওয়া। এইভাবেই একেবারে সম্প্রচারের উৎসের কাছে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু একটা ব্যাপার তাকে মেনে নিতেই হচ্ছে, সেটা হলো, ট্রান্সমিশন ঘটেছিল ভিলা লগ কেবিনের টেলিভিশনে। ফলে, ওকে যা করতে হবে সেটা হলো ওখানকার আশপাশের জায়গাটায় চিরুনী অভিযান চালানো। এটা করতে কত সময় লাগবে কোনো ধারণাই নেই ওর। তিনদিনের জন্য জামাকাপড় ব্যাগে ভরে নিয়েছে ও। অবশ্যই এর থেকে বেশিদিন লাগবে না।

একে অপরের দিকে তাকাল আসাকাওয়া আর শিজু। তবে ভিডিওর ব্যাপারে কিছু বলল না শিজু। গতরাতে বলার মতো ভালো কোনো মিথ্যে মাথাতে আসেনি আসাকাওয়ার। ফলে ভিডিওর এক সপ্তাহের ভেতরে মারা যাওয়ার ভবিষ্যৎবাণীর ব্যাপারে ধোঁয়াশা রেখেই তাকে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিয়েছিল ও। শিজুর ক্ষেত্রে, মনে হয় সে কিছু একটা বুঝে ভয় পেয়েছে, আবার ব্যাপারটা তার কাছে অস্পষ্ট থেকে গেছে বলেও মনে হলো কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে সে। বরাবরের মতো আসাকাওয়াকে প্রশ্ন না করে হয়তো নিজেই কিছু একটা ধরে নিয়ে মুখ বন্ধ রেখেছে শিজু। সে কী ধরে নিয়েছে সেটা জানা নেই আসাকাওয়ার। তবে যেটাই ধরুক না কেন, সেটা প্রশমিত করতে পারেনি তার অস্বস্তিকে। সকালবেলা প্রতিদিনের মতো টিভিতে মর্নিং সোপ অপেরা দেখছিল শিজু। সূক্ষ্ম একটা আওয়াজেও সংবেদনশীল মনে হয়েছে তাকে। বেশ কয়েকবার নড়েচড়ে উঠেছে নিজের জায়গা থেকে।

“এই ব্যাপারে কোনো কথা হবে না, ঠিক আছে? কোনো উত্তর নেই আমার কাছে। আমাকে সামলাতে দাও ব্যাপারটা।” স্ত্রীর উদ্বিগ্নতা কমানোর জন্য এরচেয়ে বেশি কিছু বলতে পারেনি আসাকাওয়া।

বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় বেজে উঠল ফোন। ফোন করেছে রুজি।

“দুর্দান্ত একটা ব্যাপার আবিষ্কার করেছি। আমি তোমার মনোভাব জানতে চাচ্ছি এই ব্যাপারে।” উত্তেজনার আভাস ছিল রুজির কণ্ঠে।

“ফোনে বললে হয় না? আমি রেন্টাল কারের ওখানে যাচ্ছি।”

“রেন্টাল কার?”

“তুমি তো বলেছিল সম্প্রচারের উৎস খুঁজে বের করার জন্য।”

“ঠিক, ঠিক। শোনো, ওটা আপাতত একপাশে সরিয়ে রেখে আমার এখানে চলে এসো। হয়তো অ্যান্টেনার খোঁজে নাও যেতে হতে পারে তোমাকে। এই পুরো ব্যাপারটা হয়তো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।”

তবুও ভাড়া করা কারটা নিতে চাইল আসাকাওয়া। এটাতে করেই রুজির ওখানে যাবে। দরকার পড়লে সেখানে থেকেই কার নিয়ে রওনা দেয়া যাবে সাউথ হ্যাকনে।

রুজির বাড়ির সামনের সাইডওয়াকে গাড়ি থামাল আসাকাওয়া।

“ঢুকে পড়ো। দরজা খোলা!”

ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল আসাকাওয়া। “তো কী এমন আবিষ্কার করে ফেলেছ?” জোর দিয়ে বলল আসাকাওয়া।

“এত তাড়াহুড়া কিসের?” মেঝেতে পা ছড়িয়ে যেখানে বসে রয়েছে সেখানে থেকেই বলল রুজি

“এত ভং না ধরে দ্রুত বল, কী খুঁজে পেলে।“

“রিল্যাক্স। শান্ত হও।”

“কীভাবে শান্ত হবো? বলে ফেল দ্রুত।”

একমুহূর্ত হা করে থেকে ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করল রুজি, “সমস্যা কী? কিছু ঘটেছে?”

মেঝের মাঝখানে হাঁটুতে হাত রেখে বসে পড়ল আসাকাওয়া। “আমার বউ… আমার বউ আর বাচ্চা ঐ বালের ভিডিওটা দেখে বসে আছে।”

“আচ্ছা, ভয়ানক ব্যাপার-স্যাপার। শুনে খারাপ লাগল।” আসাকাওয়া নিজেকে সামলে নেয়ার আগ পর্যন্ত ওর দিকে তাকিয়ে থাকল রুজি। হাঁচি দিয়ে জোরে নাক টানলো আসাকাওয়া।

“আচ্ছা, ওদেরও বাঁচাতে চাও তুমি, ঠিক?”

বাচ্চাদের মতো মাথা নেড়ে সায় জানালো আসাকাওয়া।

“আচ্ছা, প্রথমে যা করা লাগবে, সেটা হলো মাথা ঠান্ডা রাখা। নাহলে আমি তোমাকে আমার চূড়ান্ত ধারণা বোঝাতে পারব না। আমি এভিডেন্সটা দেখাব তোমাকে। দেখি এভিডেন্স দেখে কী বুঝতে পারো তুমি। এজন্যই মাথা ঠান্ডা রাখা প্রয়োজন এখন। উত্তেজিত থাকলে চলবে না।”

“বুঝতে পেরেছি,” মৃদুস্বরে বলল আসাকাওয়া।

“যাও, হাতমুখ ধুয়ে, ফ্রেশ হয়ে এসে বসো।”

রুজির সামনে দ্বিধাহীনভাবে কাঁদতেও পারে আসাকাওয়া। রুজির সামনে সেসব আবেগও প্রকাশ করা সম্ভব, যেগুলো এমনকি স্ত্রীর সামনেও

প্রকাশ করতে পারবে না ও।

তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল আসাকাওয়া। একটা কাগজ ওর দিকে বাড়িয়ে দিল রুজি। কাগজে সাধারণ একটা চার্ট আঁকানো

১. ইন্ট্রো ৮৩ সেকেন্ড (০) বিমূর্ত

২. লাল তরল ৪৯ (০) বিমূর্ত

৩. মাউন্ট মিহারা ৫৫ (১১) বাস্তব

৪. মাউন্ট মিহারার উদ্গীরণ ৩২ (৬) বাস্তব

৫. শব্দ ‘পর্বত’ ৫৬ (০) বিমূর্ত

৬. ডাইস ১০৩ (০) বিমূর্ত

৭. বৃদ্ধা মহিলা ১১১ (০) বিমূর্ত

৮. সদ্যজাত শিশু ১২৫ (৩৩) বাস্তব

৯. অনেকগুলো চেহারা ১১৭ (০) বিমূর্ত

১০. পুরানো টিভি ১৪১ (৩৫) বাস্তব

১১. একজন ব্যক্তির চেহারা ১৮৬ (৪৪) বাস্তব

১২. সমাপ্তি ১৩২ (০) বিমূর্ত

তালিকাটা দেখে বোঝা যাচ্ছে একটা ব্যাপার।

ভিডিওর দৃশ্যগুলো প্রত্যেকটা আলাদাভাবে লিখেছে রুজি।

“গতরাতে হঠাৎ করেই মাথায় আসল আইডিয়াটা। দেখতেই পাচ্ছ কী সেটা, তাই না? ভিডিওতে বারোটা দৃশ্য রয়েছে। আমি প্রত্যেকটা দৃশ্যকে একটা নম্বর ও একটা নাম দিয়েছি। নামের পরের নম্বরটা হচ্ছে দৃশ্যের দৈর্ঘ্য, সেকেন্ড এককে। এই নম্বরের পরের ব্র্যাকেটের নম্বরটা- বুঝতে পারছ? এই নম্বরটা হচ্ছে ঐ দৃশ্যে কতবার স্ক্রিন আঁধার হয়ে গিয়েছে সেটা।”

সংশয়ে ভরে গেছে আসাকাওয়ার অভিব্যক্তি।

“গতকাল তুমি চলে যাওয়ার পর বাচ্চার দৃশ্যটার পাশাপাশি বাকিগুলোও খতিয়ে দেখেছি আমি। দেখতে চাচ্ছিলাম বাকি দৃশ্যগুলো ও এরকম হুটহাট অন্ধকার হয়ে যায় নাকি। আর, আমার আশঙ্কা অনুযায়ী, দৃশ্য ৩, ৪, ৮, ১০, ১১ তে ঘটেছে ব্যাপারটা।“

পরের লাইনে লেখা ‘বাস্তব’, ‘বিমূর্ত’, এর মানে কী দাঁড়ায়?”

“বিস্তারিত বলতে গেলে, বারোটা দৃশ্যকে আমরা এই দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে পারি। বিমূর্ত দৃশ্যগুলো হলো যেগুলো দেখতে মনের অভ্যন্তরে ঘটেছে বলে মনে হয়, এককথায় বলা যায় কোনো মানসিক অবস্থার দৃশ্য ওগুলো। আর বাস্তব বলতে, দৃশ্যের ভেতরকার যেসব জিনিসের অস্তিত্ব বাস্তব দুনিয়াতে রয়েছে ওগুলো। মানে যেগুলো স্বচোখে দেখেই চেনা যায় আরকি। এভাবেই দুইভাগে ভাগ করেছি আমি।”

এক সেকেন্ড থামল রুজি।

“চার্টের দিকে তাকাও এখন। কিছু লক্ষ করছো?”

“ভিডিওতে কালো পর্দা শুধু বাস্তব দৃশ্যগুলোর ওপরেই নেমে এসেছে।”

“ঠিক। একেবারে ঠিক বলেছো। মাথায় রাখো বিষয়টা।”

“রুজি, বিরক্তিকর হয়ে যাচ্ছে এটা ধীরেধীরে। ভনিতা না করে দ্রুত বলো, কী পেয়েছো তুমি। এসবের অর্থ কী?”

“দাঁড়াও, দাঁড়াও, ধৈর্য ধরো। মাঝেমধ্যে সরাসরি উত্তর দিয়ে দিলে একজনের অনুমান দক্ষতার সুবিচার করা হয়ে ওঠে না। আমার অনুমান অলরেডি আমাকে একটা অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। আর আমার মাথায় এখন যা আছে সেটা হলো, ঐ অনুসিদ্ধান্ত ধরে যেকোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যায় উপনীত হতে পারবো। ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশনেও এমনটাই হয়, ঠিক না? যখন কাউকে তোমার অপরাধী বলে মনে হবে, তখন দেখবে সব এভিডেন্সগুলোও সেই অপরাধীর বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। যাইহোক, অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে সময় নষ্ট করার মতো বিলাসিতা এই মুহূর্তে করা যাবে না। আমি তোমাকে আমার অনুসিদ্ধান্তের ব্যাকআপ হিসেবে চাচ্ছি। এজন্যই তোমাকে এভিডেন্স দেখিয়ে পরীক্ষা করতে চাচ্ছি, তোমার অনুমান আমার অনুমানের সাথে মিলে কিনা।”

“আচ্ছা, আচ্ছা। বলো।”

“ঠিক আছে। স্ক্রিনে কালো পর্দা নেমে এসেছে শুধুমাত্র বাস্তব দৃশ্যগুলো দেখানোর সময়। এটুকু ধরতে পেরেছি আমরা। এখন, প্রথমবার ভিডিওটা দেখার সময় যে অনুভূতি হয়েছিল সেখানে নিয়ে যাও তোমার মনোযোগ। আমরা সদ্যজাত বাচ্চার দৃশ্যটার ব্যাপারে আলোচনা করেছিলাম গতকাল। এছাড়া আর কিছু কি রয়েছে ওরকম? অনেকগুলো মানুষের চেহারার দৃশ্যে?”

রিমোট দিয়ে দৃশ্যটা বের করল রুজি।

“ভালোভাবে, সময় নিয়ে দেখ দৃশ্যটা।”

অসংখ্য চেহারার দেয়াল ধীরেধীরে পিছে হটছে দৃশ্যটিতে। আস্তে আস্তে বাড়ছে চেহারা সংখ্যা, শত থেকে হাজার-হাজার। ভালোভাবে দেখলে প্রত্যেকটা চেহারা আলাদা লাগে। একেবারে বাস্তবিক মনে হয়।

“এটা দেখে কী অনুভূতি হচ্ছে তোমার?”

“মনে হচ্ছে কোনো না কোনোভাবে ভর্ৎসনা করা হচ্ছে আমাকে। মনে হচ্ছে আমাকে মিথ্যেবাদী, ভণ্ড বলে গালি দিচ্ছে।”

“ঠিক, দৃশ্যটা দেখে আমারও একই কথা মনে হয়েছে। অথবা বলা যায়, অন্তত আমার অনুভূতিও কিছুটা তোমার মতোই।”

নিজের স্নায়ু ধরে রেখে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করল আসাকাওয়া। স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানার অপেক্ষায় রয়েছে রুজি।

“ঠিক আছে?” আবারও জিজ্ঞেস করল রুজি।

মাথা নাড়ল আসাকাওয়া। “ভালো কিছু নয় এটা। কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।”

“আচ্ছা, আমার মতো তোমারও যদি এটা নিয়ে ভাবার জন্য অখণ্ড অবসর থাকত তবে তুমিও ধরতে পারতে জিনিসটা। দেখো, আমরা দুজনেই ভেবেছি, ভিডিওটা ধারণ করা হয়েছে টিভি ক্যামেরায়। অন্য কথায়, লেন্সযুক্ত মেশিনে তাই। না?”

“এরকম কিছু নয়?”

“আচ্ছা, তাহলে স্ক্রিনে দৃশ্যের মধ্যে হুটহাট কালো পর্দাটা নামছে কীভাবে?”

ফ্রেম বাই ফ্রেম ধরে ভিডিওর দৃশ্যগুলো টেনে নিয়ে যাচ্ছে রুজি, স্ক্রিন কালো না হওয়া পর্যন্ত। কালো হয়ে থাকল ভিডিওর তিন থেকে চারটা ফ্রেম। একেকটা ফ্রেম ত্রিশ সেকেন্ডের মতো হলে, অন্ধকার পর্দা স্থায়ী হয়েছে দশ সেকেন্ডের মতো।

“এটা শুধু বাস্তব দৃশ্যগুলোতে ঘটেছে, কিন্তু বিমূর্তগুলোতে নয়। কেন? স্ক্রিনে ভালোভাবে লক্ষ করো, পুরোপুরি অন্ধকারও নয় কিন্তু।”

স্ক্রিনের আরও কাছাকাছি নিজের চেহারা নিয়ে গেল আসাকাওয়া। অবশ্যই পুরোপুরি কালো নয় এটা। অন্ধকারের মধ্যে হালকা ম্লান সাদার ছাপ লক্ষ করা যায় ভালোমত দেখলে।

“আবছা ছায়া। এখানে যা দেখতে পাচ্ছি আমরা, সেটা হলো কারো দৃষ্টিশক্তির অস্তিত্ব। আর এটা দেখার সময় একধরনের অকপট অনুভূতি হচ্ছে না তোমার? মনে হচ্ছে না নিজেই উপলব্ধি করছো দৃশ্যগুলো?”

আসাকাওয়ার দিকে তাকিয়ে একবার চোখ টিপল রুজি।

“আহ?” বিড়বিড় করে বলল রুজি। “এটা কি চোখের পলক নাকি?”

“একদম ঠিক। আমি কি ভুল বললাম? ভেবে দেখলেই বুঝবে, এটাই সঙ্গত। কিছু জিনিস আমরা নিজের চোখে দেখতে পাই, আর কিছু জিনিস দেখি মনের আয়নায়। আর এসব যেহেতু রেটিনার ভেতর দিয়ে যায় না, সেহেতু চোখের পলকও দরকার হয় না। কিন্তু যেসব আমরা চোখ দিয়ে দেখি, লাইটের ওপর ভিত্তি করেই সেসব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। রেটিনাতে গিয়ে আঘাত করে এই লাইট। আর রেটিনা যাতে শুষ্ক না হয়ে যায় এজন্য মনের অজান্তেই পলক ফেলি আমরা। ঐ কালো পর্দাটা হলো পলক ফেলার সেই মুহূর্ত।”

আরেকবার বমি বমি ভাব হলো আসাকাওয়ার। প্রথমবার ভিডিওটা দেখেই বাথরুমে দৌড় দিয়েছিল ও। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি আরও বিশ্রী। সবকিছু বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে মুখ দিয়ে। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্ৰণ করতে পারছে না নিজের অস্বস্তি। কোনো যন্ত্র দ্বারা রেকর্ড হয়নি ভিডিওটা। একজন মানুষের দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ, স্পর্শ। এই পঞ্চইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ধারণ করা হয়েছে এই ভিডিও। ভিডিওর এই কাঁপুনি, এই আতঙ্ক এসবই একজন মানুষের ইন্দ্রিয় অঙ্গের অনুভূতি। ভিডিওটা দেখার সময় আসাকাওয়ার অনুভূতি হয়েছে এসব ঘটছে ওর মধ্যেই।

হাত দিয়ে বারবার মোছার পরেও ঘেমে যাচ্ছে ওর কপাল।

“তুমি কি জানো- হেই, শুনছো তুমি? বিরল কয়েকজন বাদ দিলে, একজন মানুষ মিনিটে গড়ে বিশ বার চোখের পলক ফেলে। আর মহিলারা মিনিটে গড়ে পনেরো বার। এর মানে হচ্ছে, সম্ভবত কোনো মহিলা এই দৃশ্য ধারণ করেছে।”

কিছুই কানে যাচ্ছে না আসাকাওয়ার।

“হেহেহে। কী হলো? দেখে মনে হচ্ছে তুমি এখানেই মরে ভূত। এত ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন তোমাকে।” হেসে বলল রুজি। “ব্যাপারটা একটু পজেটিভলি ভাব। আমরা একধাপ হলেও সমাধানের দিকে এগোতে পেরেছি। এসব দৃশ্য যদি কোনো ব্যক্তির ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ধারণ করা হয়ে থাকে, তবে ধাঁধার সমাধান নিশ্চয়ই ঐ ব্যক্তির সাথেই সম্পৃক্ত। অন্যভাবে বললে: হয়তো সে আমাদের দিয়ে কিছু করাতে চায়।”

নিজের যুক্তিবোধ সাময়িকভাবে হারিয়ে ফেলল আসাকাওয়া। রুজির বলা কথাগুলো ওর কানে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এসবের অর্থ পৌছাচ্ছে না ওর মস্তিষ্কে।

“যেভাবেই হোক, আমরা এখন জানি, কি করতে হবে আমাদের। আমাদের খুঁজে বের করতে হবে ব্যক্তিটা কে বা কে ছিল সে। আমার মতে, বর্তমানে আর জীবিত নেই সে। এরপর আমাদের তার ইচ্ছার কথা জানতে হবে। কী কারণে তার আত্মা অতৃপ্ত, সেটা। আর এটাই হলো সেই সমাধান, যা করলে আমরা বেঁচে থাকতে পারবো।”

আসাকাওয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল রুজি। যেন বলতে চাচ্ছে, “কি! কেমন দিলাম।”

তিন নম্বর টোকিও-ইয়োকাহামা ফ্রিওয়ে ছাড়িয়ে ইয়োকাহামা ইয়াকুশা রোডের দিকে এগোচ্ছে আসাকাওয়া। প্যাসেঞ্জার সিটে বসে শান্তির ঘুম দিয়েছে রুজি। দুপুর দুটো বাজে। কিন্তু একফোঁটাও খিদে পায়নি আসাকাওয়ার।

রুজিকে ডাকার জন্য হাত বাড়াল আসাকাওয়া, কিন্তু পরমুহূর্তেই হাত সরিয়ে নিল ও। এখনও গন্তব্যে পৌঁছায়নি ওরা। এমনকি আসাকাওয়া জানে না ওদের গন্তব্য কোথায়। ওকে কামাকুরার দিকে যেতে বলেই ঘুম দিয়েছে রুজি। কোথায় যাচ্ছে আর কেন-ই বা যাচ্ছে, জানা নেই আসাকাওয়ার। এজন্য নার্ভাস ও খিটখিটে বোধ করছে ও।

দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছিল রুজি। বলেছিল গাড়িতে উঠেই কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে সব ব্যাখ্যা করবে। কিন্তু গাড়িতে চড়েই বলল রুজি, “গতকাল সারারাত ঘুমাইনি। এখন ঘুমাবো। কামাকুরা আসার আগ পর্যন্ত ডাকবে না।” এরপরই ঘুমিয়ে পড়ে সে।

ইয়োকাহামা-ইয়াকুশা রোড পেরিয়ে কানাজাওয়া রোডে উঠল আসাকাওয়া। এখান থেকে কামাকুরা স্টেশন মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের পথ। প্রায় দুই ঘণ্টার মতো ঘুমিয়েছে রুজি।

“চলে এসেছি আমরা,” তাকে ঝাঁকিয়ে বলল আসাকাওয়া। বেড়ালের মতো শরীর মোচড় দিল রুজি। হাতের উল্টো পাশ দিয়ে চোখ ঘষল সে। কিছুক্ষণ দ্রুতবেগে মাথা ঝাঁকাল, ঠোঁট কেঁপে উঠল তার।

“আহহ, কত সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, বাল…”

“আমরা করবো টা কী এখন?”

ঠিকমত উঠে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রুজি। বোঝার চেষ্টা করল কোথায় ওরা এখন। “এই রাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে যাও। হ্যাচিম্যান মন্দিরের গেটের কাছে গিয়ে বামে মোড় নিয়ে থামবে।” সিটেই আবারও হেলে বসে বলল রুজি, “দেখি স্বপ্নের শেষাংশটা এখনো ধরা যায় কিনা, যদি কিছু মনে না করো তুমি।”

“দেখো, আমরা কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওখানে পৌঁছে যাব। এখনও সময় আছে, খুলে বলো আসলে করছিটা কী আমরা।”

“ওখানে যাওয়ার পর নিজেই বুঝতে পারবে,” বলল রুজি। এরপর ড্যাশবোর্ড-এ পা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল আবারও।“

বামে মোড় নিয়ে থামল আসাকাওয়া। সামনে একটা পুরানো দুইতলা বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে। ওখানে লেখা, “তেতসুজো মিউরা মেমোরিয়াল হল।”

পার্কিং লটে গাড়ি নিয়ে গিয়ে রাখো,” সামান্য চোখ খুলে বলল রুজি ১ সন্তুষ্টির ছাপ তার চেহারায়। নাক দেখে মনে হলো পারফিউমের ঘ্রাণ নিচ্ছে সে।

“ধন্যবাদ তোমাকে, স্বপ্নটা শেষ করতে পারলাম আরকি।”

“কিসের স্বপ্ন ছিল,” স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে বলল আসাকাওয়া।

“কী মনে হয় তোমার? আমি আসলে উড়ছিলাম। স্বপ্নে ওড়া আমার পছন্দের কাজ।” জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট চেটে বলল রুজি। খুশি দেখাচ্ছে তাকে।

তেতসুজো মেমোরিয়াল হল মরুভূমির মতো ফাঁকা। গ্রাউন্ড হলের বিশাল ফাঁকা স্পেসের দেয়ালে টানানো ফ্রেমে বাঁধাই করা ছবি ও ডকুমেন্ট। একেবারে মাঝামাঝি দেয়ালে ঝোলানো জীবদ্দশায় মিউরার সাফল্যের আউটলাইন। লোকটা আসলে কে, এসব পড়ার পরেই বুঝল আসাকাওয়া।

“এক্সকিউজ মি! কেউ আছেন এখানে?” চিৎকার করে বলল রুজি। জবাব পাওয়া গেল না কোনো।

দুবছর আগে, ৭২ বছর বয়সে মারা গেছেন তেতসুজো মিউরা। ইয়োকোদা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর পদ থেকে অবসরপ্রাপ্ত তিনি। পদার্থবিদ্যার প্রফেসর ছিলেন তেতসুজো মিউরা। থিওরি অব ম্যাটার আর স্ট্যাটিস্টিক্যাল ডায়নামিক্সে বিশেষজ্ঞ। কিন্তু এই মেমোরিয়াল হল তার পদার্থবিদ্যার জ্ঞানের ফলাফল নয়। এটা গঠিত হয়েছে তার অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপারে সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশনের কারণে। দেয়ালের সার্টিফিকেট সাক্ষ্য দিচ্ছে, তার থিওরি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। যদিও এই ব্যাপারে মনোযোগ দিয়েছেন খুবই নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ। এমনকি এই লোকের ব্যাপারে কখনো শোনেনি আসাকাওয়াও। এই লোকের থিওরি-ই বা কী? উত্তরটা জানার জন্য ডিসপ্লে কেস আর দেয়ালে টানানো কাগজপত্র দেখতে লাগল আসাকাওয়া।

“চিন্তার নিজস্ব শক্তি রয়েছে, আর এই শক্তি…” পড়ার সময় পাশের রুম থেকে প্রতিধ্বনি শুনল ও। সিঁড়ি দিয়ে কারোর নেমে আসার শব্দ। খুলে গেল দরজা। উঁকি দিল গোঁফওয়ালা একজন লোক। বয়স চল্লিশোর্ধ। লোকটার কাছে গিয়ে নিজের বিজনেস কার্ড উঁচিয়ে ধরল রুজি। তাকে অনুসরণ করে বুক পকেটে রাখা কার্ড হোল্ডার থেকে নিজের কার্ডও বের করল আসাকাওয়া।

“আমি তাকাইয়ামা, ফুকুজাওয়া ইউনিভার্সিটিতে আছি।” নম্রস্বরে কথা বলছে রুজি। তার কণ্ঠস্বরের এই কোমলতা দেখে অবাক হলো আসাকাওয়া। নিজের কার্ডও উঁচিয়ে ধরল ও। একজন অধ্যাপক ও একজন রিপোর্টারকে একসাথে দেখে যেন সংশয়ে পড়ে গেল লোকটা।

“কোনো সমস্যা না থাকলে একটা ব্যাপারে আপনার সাথে একটু পরামর্শ করতাম।”

“কোন ব্যাপারে?” সতর্কতার সাথে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল লোকটা।

“প্রসঙ্গত, আমার একবার প্রয়াত প্রফেসর তেতসুজো মিউরার সাথে দেখা করার সৌভাগ্য হয়েছিল।”

মনে হলো, কোনো কারণে এই কথা শুনে স্বস্তি পেল লোকটা। স্বস্তির ছাপ তার অভিব্যক্তিতে। তিনটা ফোল্ডিং চেয়ার এনে সামনাসামনি সেট করল সে।

“তাই নাকি? দয়া করে বসুন।”

“প্রায় তিন বছর আগের ঘটনা…হ্যাঁ, এটাই, তার মৃত্যুর তিন বছর আগের ঘটনা এটা। আমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে সায়েন্টিফিক মেথডের ওপর লেকচার দিতে বলা হয়। তখনই ভাবলাম, এই সুযোগে প্রফেসরের মতবাদটা জেনে নেয়া যাক…”

“এখানেই এসেছিলেন? এই বাড়িতেই?”

“জ্বি। প্রফেসর তাকাসুকা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের।’ নামটা শুনে অবশেষে হাসল লোকটা। বুঝতে পেরেছে সে, অতিথির সাথে কোনো একটা ব্যাপারে মিল রয়েছে তার। ওরা দুজন আমার পক্ষের-ই লোক, আমাকে কোনোরকম হেনস্তা করতে আসেনি ওরা, ভাবল লোকটা।

“ওহ আচ্ছা, দুঃখিত আসলে।

আমার নাম তেতসুয়াকি মিউরা। দুঃখিত, বিজনেস কার্ড দেখে একটু কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম আরকি।”

“আপনি নিশ্চয়ই প্রফেসরের…”

“হ্যাঁ, আমি তার একমাত্র সন্তান। যদিও খুব কমই তার নামটার ভার বহন করতে পেরেছি।”

“তাই নাকি? আমার জানা ছিল না প্রফেসরের দুর্দান্ত একজন সন্তান রয়েছেন।”

রুজির নিজের থেকেও দশ বছরের একজনকে ‘দুর্দান্ত একজন সন্তান’ বলা শুনে কোনোমতে নিজের হাসি আটকাল আসাকাওয়া।

সংক্ষেপে সবকিছু ওদেরকে ঘুরিয়ে দেখাল তেতসুয়াকি মিউরা। তার পিতার কিছু ছাত্র, পিতার মৃত্যুর পর একত্রিত হয়ে বাড়িটা উন্মুক্ত করে দিয়েছে পাবলিকের জন্য। সেইসাথে রক্ষণাবেক্ষণ করছে প্রফেসরের সব সংগ্রহ। যেমনটা তেতসুয়াকি বলল, তার পিতার ইচ্ছানুযায়ী একজন ভালো রিসার্চার হতে পারেনি ঠিকই। কিন্তু মেমোরিয়াল হল যে লটে অবস্থিত, সেই লটের শেষ প্রান্তে একটা রেঁস্তোরা খুলে বসেছে সে। ওটা সামলাতেই নিজেকে নিয়োজিত করেছে তেতসুয়াকি।

“আসলে এখানে বসে আমি তার সম্পদ আর রেপুটেশন দুই-ই শোষণ করছি। যেমনটা বললাম, তার যোগ্য সন্তান হতে পারিনি আমি।” লজ্জা মেশানো হাসি হাসল তেতসুয়াকি। হাইস্কুল থেকে এক্সকার্শনে আসা অতিথিরা-ই মূলত তার রেঁস্তোরার গ্রাহক। মূলত স্কুলের বায়োলজি ও ফিজিক্স ক্লাব থেকে আসে এরা। তবে সেইসাথে প্যারাসাইকোলজি নিয়ে রিসার্চকারী কয়েকটা গ্রুপের কথাও উল্লেখ করল সে। বলা যায়, ছাত্রছাত্রীদের টেনে আনার টোপ হিসেবে কাজ করে এই মেমোরিয়াল হল।

“যাইহোক…” সোজা হয়ে বসে সরাসরি প্রসঙ্গে আসার চেষ্টা করল রুজি।

“ওহ, দুঃখিত। মনে হয় এসব প্যাচাল পেড়ে আপনাদের বিরক্ত করে তুলছি। তো বলুন, কী মনে করে এসেছেন এখানে?”

দেখে মনে হচ্ছে বিজ্ঞানের ব্যাপারে খুব বেশি প্রতিভা নেই তেতসুয়াকির। সে এক ব্যবসায়ী ব্যতীত কিছুই নয়, যে কোনোমতে মানিয়ে নিয়েছে এই পরিস্থিতির সাথে। রুজি লোকটাকে খুব ছোট নজরে দেখছে, এই ব্যাপারে নিশ্চিত আসাকাওয়া।

“সত্যি বলতে একজনের খোঁজ করছি আমরা।”

“কার?”

“আসলে নামটা জানা নেই আমাদের। এজন্যেই এসেছি এখানে।”

“সম্ভবত বুঝতে পারছি না আপনার কথা,” তেতসুয়াকিকে বিভ্রান্ত দেখাল। অতিথিদের আরেকটু খোলাসা হতে বলছে সে, বোঝা গেল তার চেহারা দেখেই।

“আমরা এটাও নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবো না, ঐ ব্যক্তি আদৌও বেঁচে আছে নাকি নেই। শুধু এটুকু স্পষ্ট, এই লোকের এমন কোনো ক্ষমতা রয়েছে যা সাধারণ মানুষের থাকে না।”

তেতসুয়াকির ভাব লক্ষ করার জন্য থামল রুজি। মনে হচ্ছে রুজির কথা ধরতে পেরেছে সে।

“সম্ভবত এই ধরনের তথ্য উপাত্তের জাপানের সেরা সংগ্রাহক ছিলেন আপনার বাবা। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন নেটওয়ার্ক আর কানেকশন ব্যবহার করে পুরো জাপানজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী মানুষের তালিকা বানিয়েছেন। তিনি তথ্যগুলো সংরক্ষণ করেছেন বলে জানিয়েছিলেন আমাকে।”

মেঘ জমল তেতসুয়াকির চেহারায়। অবশ্যই ওরা একটা মাত্র নামের জন্য সব রেকর্ড-পত্র ঘেঁটে দেখবে না। “হ্যাঁ, অবশ্যই ফাইলগুলো সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু ওগুলো সংখ্যায় প্রচুর। আর ওখানকার অনেক মানুষই ভুয়া।” আবারও সব ফাইল এলোমেলো করে ঘেঁটে দেখার কথা ভেবে ফ্যাকাশে হয়ে গেল তেতসুয়াকির চেহারা। তার পিতার ডজনখানেক ছাত্র মিলে মাসখানেক সময় নিয়ে সাজিয়ে রেখেছে ওগুলো। মৃত পিতার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কিছু অনিশ্চিত কেস ফাইলও রাখা লেগেছে সেখানে। এতে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে ফাইলের স্তুপ।

“আপনার সমস্যা সৃষ্টি করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। আপনি পারমিশন দিলে আমরা দুজন মিলেই খুঁজে দেখবো।”

“ওপর তলার আর্কাইভে রাখা আছে ওগুলো। প্রথমে এক নজর ওগুলোকে দেখতে চাইবেন সম্ভবত?” উঠে দাঁড়িয়েছে তেতসুয়াকি। মুখে সহজে বলতে পারছে দুজন মিলে খুঁজবে, কেননা ওদের কোনো ধারণা নেই কতগুলো ফাইল রয়েছে ওখানে। একবার ফাইলগুলো দূর থেকে দেখার পর নিশ্চিত বুঝতে পারবে ব্যাপারটা অত সহজ না, ভাবল তেতসুয়াকি মিউরা দ্বিতীয় তলায় ওদের নিয়ে গেল সে। ওপরের সিঁড়ির শেষপ্রান্তেই আর্কাইভ। আর্কাইভ রুমের সিলিং অনেক উঁচু। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল ওরা। ঘরের ভেতরে মুখোমুখি দুটো বুক কেইস। একেকটার সাতটা করে শেলফ। প্রত্যেকটি ফাইল বুকে চল্লিশটা প্যারানর্মাল কেস ও ম্যাটেরিয়াল দিয়ে সাজানো। প্রথম দেখায় মনে হয় থরে থরে সাজানো বইয়ের পাহাড়। রুজির প্রতিক্রিয়া খেয়াল করল না আসাকাওয়া। এতগুলো ফাইল দেখে ওর নিজেরই মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়

এগুলো সব ঘেঁটে দেখতে গেলে, এই বদ্ধ ঘরের মধ্যে মরে পড়ে থাকা লাগবে আমাদের। অন্য কোনো উপায় আছে নিশ্চয়ই! ভাবল আসাকাওয়া।

অবিচল থেকে জিজ্ঞেস করল রুজি, “কিছু মনে না করলে আমরা দেখতে চাই একটু।”

“আচ্ছা দেখুন।” কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দাঁড়িয়ে থেকে ওদেরকে দেখল তেতসুয়াকি। কিছুটা আশ্চর্য ও কিছুটা কৌতূহলের ছাপ তার চেহারায়। কী খুঁজবে ওরা সেটা দেখতে চাচ্ছে সে। কিন্তু মনে হলো ব্যাপারটা ওদের হাতেই ছেড়ে দিল তেতসুয়াকি। “আমার কিছু কাজ আছে,” বলে চলে গেল সে।

একা হওয়ার পর রুজির দিকে তাকিয়ে বলল আসাকাওয়া, “আমাকে বলবে একটু, আসলে কী করছি আমরা?” ভরাট কণ্ঠে বলল আসাকাওয়া। এতগুলো ফাইল দেখে এখনও কাঁধ ঝুলে রয়েছে ওর। মেমোরিয়াল হলে প্রবেশের পর এবারই প্রথম মুখ ফুটে কথা বের হলো ওর। সাল অনুযায়ী ক্রমানুসারে সাজানো ফাইলগুলো। ১৯৫৬ তে শুরু ১৯৮৮ তে শেষ। ঐ বছরই মারা গিয়েছেন মিউরা। তার ৩২ বছরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে ছেদ টেনেছে মৃত্যু।

“আমাদের হাতে বেশি সময় নাই। আমি ১৯৫৬ দিয়ে শুরু করব তুমি ১৯৬০।”

একটি ফাইল বের করে ধীরেসুস্থে উল্টাতে লাগল আসাকাওয়া। প্রত্যেক পৃষ্ঠাতেই লাগানো একটা করে ছবি ও একটা কাগজ। কাগজে নাম ঠিকানা ও বিবরণ লেখা।

“কী খুঁজব আমি?”

“নাম, ঠিকানায় নজর দাও। আমরা এমন কোনো মহিলাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করব যার ঠিকানা ইজু ওশিমা আইল্যান্ড।”

একজন মহিলা?” মাথা উঁচু করে জিজ্ঞেস করল আসাকাওয়া।

“ভিডিওর বৃদ্ধার কথা ভাবো। সে বলেছিল কেউ একজন মেয়ে বাচ্চার জন্ম দিবে। তোমার কি মনে হয় সে কোনো পুরুষের কথা বলেছে?”

রুজির কথাই ঠিক। পুরুষ গর্ভধারণ করতে পারে না।

খোঁজ শুরু করল ওরা। খুবই সাধারণ উপায়ে খোঁজ আরকি। আসাকাওয়া জিজ্ঞেস করল ফাইলগুলো এখানে থাকার সম্ভাবনা কী, ব্যাখ্যা করল রুজি।

অতিপ্রাকৃত ব্যাপার স্যাপারে আগ্রহী ছিলেন প্রফেসর মিউরা। অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার ব্যাপারে নিরীক্ষা শুরু করেন ‘৫০ সালের দিকে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব স্থাপন করার মতো শক্ত কোনো ফলাফল পাননি তিনি। অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিরা সহজেই যা করতে পারত, সেটা অডিয়েন্সের সামনে করতে ব্যর্থ হয়। এই ক্ষমতার প্রদর্শনের জন্য প্রয়োজন অখণ্ড মনোযোগের। প্রফেসর মিউরা এমন একজন ব্যক্তিকে খুঁজছিলেন যে যেকোনো সময়, যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের অতিলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে। তার মনে হয়েছিল এত জন সাক্ষীর সামনে ঐ ব্যক্তি ব্যর্থ হলে লোকে ভণ্ড বলবে মিউরাকে। তবে মিউরা বিশ্বাস করতেন তার জানাশোনার বাইরেও অনেক রয়েছে অতিপ্রাকৃত শক্তিধর মানুষ। অতএব তাদের খোঁজেই বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কীভাবে করেছিলেন তিনি এই কাজটা? সবাইকে তো তিনি তাদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার ব্যাপারে সাক্ষাৎকার নিতে পারেননি। ফলে একটি পদ্ধতি ভেবে বের করেন তিনি। যারা মনে করে তাদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা রয়েছে ওদের সবাইকে সিল করা প্যাকেটে করে একটা ফিল্ম পাঠাতেন মিউরা। কল্পনাশক্তি দিয়ে ওখানে ওদের কোনো প্যাটার্ন বা ইমেজ প্রিন্ট করে আবারও তার কাছে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিতেন তিনি। এভাবেই দুরদূরান্তের মানুষদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার পরীক্ষা নিতেন মিউরা। সাইকিক ফটোগ্রাফি হল অতিপ্রাকৃত বা অতিলৌকিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মৌলিক দক্ষতা। ১৯৫৬ সালে পুরো দেশের আনাচে কানাচে থেকে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা সম্পন্ন নিয়োগ করতে শুরু করেন তিনি। এক্ষেত্রে সহায়তা নিয়েছিলেন সাবেক ছাত্রদের। বিশেষ করে যারা জড়িত ছিল পত্রিকা ও মিডিয়ার সাথে। এই সাবেক ছাত্ররা সৃষ্টি করে একটা নেটওয়ার্ক। যার মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নজরে পড়লেই রিপোর্ট যেত প্রফেসরের কাছে। অপরদিকে, ফিল্মের মাধ্যমে জানা যায়, অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার দাবী জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে খুব বেশি হলে সর্বোচ্চ দশজনের রয়েছে এই ক্ষমতা। বাকিরা দক্ষতার সাথে ফিল্মটা বদল করে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এভাবেই বাদ দেয়া গেছে ভুয়া দাবি জানানোদের। তবে বেশ কিছু কেসের ব্যাপারে সংশয়ে ছিলেন মিউরা। একারণে সরাসরি বাতিলের খাতায় ফেলতে পারেননি ওগুলোকে। এখানেই ফাইল করে রেখে দিয়েছেন। যা এখন পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আসাকাওয়ার সামনে। মিউরা এই প্রজেক্ট আরম্ভ করার পর দিনে দিনে উন্নতি হয়েছে নেটওয়ার্কটা, সেইসাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও বেড়েছে তার শিক্ষার্থীদের। তার মৃত্যুর আগপর্যন্ত জমা হয়েছে ফাইলের পর ফাইল।

“ওহ আচ্ছা,” বিড়বিড় করল আসাকাওয়া। “এই তাহলে তার কালেকশনের অর্থ। কিন্তু যাকে খুঁজছি তার নাম কীভাবে জানবে তুমি?”

“নির্দিষ্টভাবে বলতে পারবো না অবশ্যই। কিন্তু এখানে সেটা থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। যাকে খুঁজছি তার ক্ষমতার দিকে একবার ভাবো। তুমিও জানো খুব কম সংখ্যক মানুষ-ই সাইকিক ফটো সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এরচেয়েও কম সংখ্যক অতিলৌকিক ক্ষমতাধর মানুষ সেটাকে কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই টেলিভিশন নেটওয়ার্কে প্রেরণ করতে পারে। এটা খুবই উচ্চতর ক্ষমতা। এরকম ক্ষমতা সম্পন্ন কেউ চাইলেও আড়ালে থাকতে পারে না। আমার মনে হয় না মিউরার নেটওয়ার্ক এরকম কাউকে হাত ফসকে যেতে দিয়েছে।”

এখানে থাকার সম্ভাবনা জোরালো, মানতেই হলো আসাকাওয়াকে। কাজে আরও মনোযোগ দিল ও।

“যাইহোক, ১৯৬০ এ কিসের খোঁজ করব আমি?” হঠাৎ করে তাকিয়ে বলল আসাকাওয়া।

“ভিডিও দৃশ্যে দেখা টেলিভিশনের কথা মনে আছে? ওটা অনেকটা পুরানো মডেলের। ৫০ থেকে ৬০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের।”

“কিন্তু এর মানে এই নয় যে …”

“থামো। আমরা সম্ভাব্যতা নিয়ে কথা বলছি এখানে, ঠিক কিনা?”

বিরক্ত হওয়ার জন্য নিজেকেই গালি দিল আসাকাওয়া। সময় সীমিত কিন্তু ফাইল সংখ্যা প্রচুর। এই পরিস্থিতিতে শান্ত থাকাই অস্বাভাবিক।

ঠিক সেই মুহূর্তেই হাতে ধরা ফাইলে ‘ইজু ওশিমা’ শব্দটা নজরে পড়ল আসাকাওয়ার।

“হেই, একটা পেয়েছি!” আনন্দের সাথে চিৎকার করে উঠল ও। অবাক হয়ে ঘুরে তাকিয়েছে রুজি। দেখছে ফাইলের দিকে

মোতরনাচি, ইজু ওশিমা। তরুকো সুচিদা, বয়স ৩৭। পোস্টমার্ক ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬০। সাদা-কালো একটা ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড কালো। বিবরণে লেখা: সাবজেক্ট এটা পাঠিয়েছে নোটসমেত। ক্রস শেপড ইমেজ। নকল হওয়ার কোনো ট্রেস পাওয়া যায়নি।

“এটার ব্যাপারে কী বলবে?” উত্তেজনায় কাঁপছে আসাকাওয়া। অপেক্ষায় রয়েছে রুজির প্রতিক্রিয়ার।

এটাও একটা সম্ভাবনা। নাম ও ঠিকানা লিখে রাখো।” আবারও কাজে মনোযোগ দিল রুজি। এত দ্রুত কিছু একটা খুঁজে পেয়ে তুলনামূলক ভালো বোধ হচ্ছে আসাকাওয়ার। কিন্তু একইসাথে রুজির এরকম শীতল প্রতিক্রিয়ার কারণে একটু অসন্তুষ্ট ও।

কেটে গেল আরও দুই ঘণ্টা। ইজু ওশিমা থেকে আর কাউকে পাওয়া গেল না। বেশিরভাগ-ই টোকিওর আশপাশের অথবা কান্ত অঞ্চলের। তেতসুয়াকি এসে চায়ের অফার করে গেছে ওদের। সেইসাথে কিছু ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য। ফাইলের মধ্যে সময়ের সাথে সাথে ধীরগতিতে হাত চলছে ওদের। ঘণ্টা দুয়েক ধরে কাজ করছে কিন্তু একটা বছরের ফাইল-ই দেখা শেষ হয়নি।

অবশেষে কোনোরকমভাবে ১৯৬০ সাল দেখা শেষ হলো আসাকাওয়ার। ১৯৬১ সালের ফাইলে হাত দেয়ার আগে রুজির দিকে তাকাল আসাকাওয়া। মেঝেতে পা ছড়িয়ে

পা ছড়িয়ে বসে আছে রুজি। অভিব্যক্তিহীনভাবে ফাইলে মুখ ডুবিয়ে রয়েছে রুজি। শালায় ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি? তার দিকে হাত বাড়াল আসাকাওয়া। গোঙিয়ে উঠল সে।

“ভাই, ভয়ানক ক্ষিদা লেগেছে, মরে যাবো ক্ষুধার জ্বালায়। বাইরে থেকে কিছু খাবার আর ওলং টি কিনে আনো গিয়ে, ভাই আমার। আর আজকে সন্ধ্যার জন্য ‘লা পিতে পেনসন স্য’তে একটা রিজার্ভেশনের ব্যবস্থা কর।”

“এটা আবার কী বাল?”

এই আবাসিক হোটেল কাম রেঁস্তোরা ঐ ব্যাটা চালায়।”

“জানি। কিন্তু ওখানে তোমার সাথে থাকতে যাবো কেন?”

“তুমি ছাড়া আর কে থাকবে?”

“ঐ হোটেলে বসে সময় কাটানোর সময় আমাদের হাতে নেই।“

“এখনও যদি খোঁজ পাওয়া যায় তবে কোনোভাবেই এইমুহূর্তে ইজু ওশিমায় রওয়ানা দিতে পারব না আমরা। আজকে কোথাও যাওয়া সম্ভব না। আজকে রাতে ভালোভাবে ঘুমিয়ে এনার্জি বাঁচিয়ে আগামীকাল রওয়ানা দেয়ায় ভালো হবে না?”

হোটেলের রুজির সাথে রাত কাটাতে হবে বলে অবর্ণনীয় অস্বস্তিতে মন ছেয়ে গেল আসাকাওয়ার। কিন্তু করার কিছুই নেই। হাল ছেড়ে দিয়ে খাবার আনতে আর তেতসুয়াকিকে রাতে হোটেলে থাকার কথা জানাতে গেল ও। এরপর নাস্তা সেরে ওলং টি খেল রুজি আর আসাকাওয়া। সন্ধ্যা সাতটা বাজে। সামান্য বিরতি নিয়েছে ওরা।

হাত ও কাঁধ ধরে গিয়েছে আসাকাওয়ার। চোখও জ্বলছে। চশমা খুলে ফেলল ও। এরপর ফাইলগুলো চেহারার কাছাকাছি এমনভাবে ধরল যেন চাইলেই কামড়ে খেয়ে ফেলতে পারবে। সম্পূর্ণ মনোযোগ প্রয়োগ করতে চাইছে ও। নাহলে কিছু নজর এড়িয়ে যেতে পারে। আরও ক্লান্তিবোধ হলো ওর।

রাত নয়টা নাগাদ আর্কাইভের নীরবতা ভাঙল কর্কশ স্বরে। “অবশেষে পাইছি! তাহলে এখানেই লুকিয়ে ছিল সে।”

ফাইলটা দেখার তাড়না বোধ করল আসাকাওয়া। চশমা পরে রুজির পাশে বসে ফাইলে নজর দিল ও। সেখানে লেখা: ইজু ওশিমা, সাসিকিজি। সাদাকো, ইয়ামামুরা। বয়স ১০। এনভেলপ পোস্ট করা হয়েছে ২৯ আগস্ট ১৯৫৮। সাবজেক্ট নিজেই পাঠিয়েছে এটা নোটসমেত। ফিল্মে নিজেই কল্পনাশক্তি দিয়ে লিখেছে এটা। নিঃসন্দেহে আসল সে।

সাথে একটি ছবি আটকানো। লেখা রয়েছে… ইয়ামা,… “পর্বত”, ব্যাকগ্রাউন্ড কালো। এই অক্ষরগুলো আগে কোথাও দেখেছে আসাকাওয়া।

“এটা…এটাই ওটা।” কেঁপে উঠল ওর কণ্ঠস্বর। ভিডিওতে মাউন্ট মিহারার উদ্গীরণের দৃশ্যে দেখানোর সময় একবারের জন্য ভেসে উঠেছিল ‘পর্বত’ লেখা অক্ষর। ওটা দেখতে ছিল ঠিক এটার মতোই। শুধু তাই-ই নয় ভিডিওর ভেতরকার টেলিভিশনে ভেসে উঠেছিল ‘সাডা’ শব্দটা। ঐ শব্দের অক্ষরও এটার মতোই। এই মহিলার নাম হলো সাদাকো ইয়ামামুরা।

“কী মনে হয় তোমার?” জিজ্ঞেস করল রুজি।

“কোনো সন্দেহ-ই নাই। এটাই।”

অবশেষে আশার আলো দেখতে পেল আসাকাওয়া। হঠাৎ-ই, মনে হতে লাগল, হয়তো… সম্ভবত ওরা হারাতে পারবে ডেডলাইনকে।

অধ্যায় ছয়

বুধবার, ১৬ অক্টোবর

সকাল ১০:১৫ বাজে। একটা হাইস্পিড প্যাসেঞ্জার বোটে করে আতামি পোর্ট ছেড়েছে রুজি ও আসাকাওয়া। মেইনল্যান্ড আর ওশিমায় নিয়মিত ফেরি যাতায়াত করে না। ফলে আতামি কোরাকুয়ান হোটেলের পাশের লটে গাড়ি পার্ক করেই চলে আসতে হয়েছে ওদের। গাড়ির চাবি এখনও আসাকাওয়ার বাম হাতে।

এক ঘণ্টার মধ্যে ওশিমায় পৌঁছানোর কথা ওদের। ঝড়ো বাতাস বইছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে। বেশিরভাগ প্যাসেঞ্জার-ই ডেকে না বেরিয়ে বসে রয়েছে নিজেদের সিটের ওপর। তাড়াহুড়োর কারণে টিকেট কেনার আগে কিছুই চেক করে দেখেনি রুজি ও আসাকাওয়া। তবে মনে হচ্ছে ধেয়ে আসবে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। ঢেউগুলো পাহাড়সম আর স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি দুলছে বোট।

কফির ক্যানে চুমুক দিয়ে পুরো ঘটনাচক্র মনে মনে ভাবার চেষ্টা করছে আসাকাওয়া।

সবকিছু ঘেঁটে এতদূর পৌঁছানোর কারণে নিজেদের অভিনন্দন জানাবে নাকি সাদাকো ইয়ামুরার ব্যাপারে কিছু না জেনেই দ্রুত ওশিমা আইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য নিজেদের গালি দেবে, ভেবে পেল না ও। ভিডিওর কালো পর্দা আসলে একজনের চোখের পলক ফেলার মুহূর্ত, শুধুমাত্র এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এতদূর এগোনো। দৃশ্যগুলো ধারণ করা হয়েছে কোনো ব্যক্তির পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে, কোনো মেশিনে নয়। স্বাভবিকভাবেই ঐ ব্যক্তি তার সকল শক্তি দিয়ে ফোকাস করেছিল বি-৪ কেবিনের ভিডিও ডেকে, রেকর্ডিংয়ের সময়। ফলে সাইকিক কোনো ফটো নয়, সৃষ্টি হয়েছে সাইকিক ভিডিও। নিশ্চিতভাবেই অসীম পরিমাণের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা এটা। রুজির মতে, এই ধরনের মানুষের নাম যেভাবেই হোক না কেন, ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে না। তবে নামটা সাদাকো ইয়ামুরা, আর সে-ই মূল কালপ্রিট কিনা এই ব্যাপারে নিশ্চিত নয় ওরা। শুধুই একজন সাসপেক্ট এই মহিলা।

উত্তাল হয়ে রয়েছে সমুদ্র। ভয়াবহভাবে দুলছে বোট। মনের মধ্যে অজানা আশঙ্কা অনুভব করল আসাকাওয়া। হয়তো ওশিমা যাওয়া খুব একটা ভালো হচ্ছে না। যদি ঘূর্ণিঝড়ে আটকা পড়ে আইল্যান্ড থেকে ফিরতে না পারে ওরা তবে? কে বাঁচাবে ওর বউ বাচ্চাকে? দরজায় কড়া নাড়ছে ডেডলাইন। আগামী পরশু রাত ১০:০৪ এ। কফি ক্যানে হাত উষ্ণ করে নিজের সিটে গিয়ে বসল আসাকাওয়া।

“আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝলে যে কোনো মানুষের পক্ষে এরকম কিছু করা সম্ভব।”

“তোমার বিশ্বাস করা না করায় কিচ্ছু যায় আসে না এখন, বুঝলে?” ওশিমার ম্যাপ থেকে নজর না সরিয়েই বলল রুজি। “যাইহোক, এটা একদম তোমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ক্রমাগত পরিবর্তনশীল একটা ঘটনার ছোট্ট অংশ-ই দেখতে পাচ্ছি আমরা।”

হাঁটুর ওপর ম্যাপটা রাখল রুজি।

“বিগ ব্যাংয়ের ব্যাপারে তো জানো, তাই না?

ওদের বিশ্বাস এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে, বিশ বিলিয়ন বছর আগে। আমি গাণিতিক উপায়ে মহাবিশ্বের গঠন ব্যাখ্যা করতে পারবো। এর আদি থেকে বর্তমান পর্যন্ত। পুরোটাই একটা ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন। পৃথিবীর বেশিরভাগ অবস্থা ডিফারেশনিয়াল ইকুয়েশনের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব। এটা ব্যবহার করে জানা সম্ভব একশো মিলিয়ন বা দশ বিলিয়ন বছর আগে কেমন ছিল পৃথিবী। এমনকি মহাবিস্ফোরণের দশ সেকেন্ড পরের অবস্থাও জানা যাবে। কিন্তু, কিন্তু। যতই পেছনে ফিরে যান অথবা যেভাবেই এর অবস্থা প্রকাশ করার চেষ্টা করি না কেন, কিচ্ছু যায় আসে না। কারণ একেবারে ‘শূন্যে’ মানে মহাবিস্ফোরণের একেবারে আগমুহূর্তে অবস্থা কেমন ছিল সেটা কখনোই জানতে পারবো না আমরা। আর এখানে আরেকটা ব্যাপার, আমাদের এই মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? ক্রমেই মহাবিশ্বের সঙ্কোচন নাকি প্রসারণ, কোনটা ঘটছে? দেখো, পৃথিবীর আদি ও অন্ত সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই আমাদের। শুধু এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থাগুলোই বুঝতে পারি আমরা। আর জীবনটা হলো এটাই বন্ধু।”

আসাকাওয়ার বাহুতে খোঁচা দিল রুজি।

“আমার মনে হয় তোমার কথা-ই ঠিক। ফটো অ্যালবাম দেখে ধারণা করা সম্ভব তিনবছর বয়সে অথবা জন্মের পর দেখতে কেমন ছিলাম আমি।”

“বুঝতে পারছো তাহলে? কিন্তু জন্মের আগে কেমন ছিলে সেটা ধারণা করা সম্ভব নয়। আবার মৃত্যুর পর কী হবে সেটাও জানিনা আমরা।”

“মৃত্যুর পর? যখন মরে যাবে তখন তোমার জন্য সব শেষ। চিরতরে হারিয়ে যাবে তুমি, এটাই। তাই না?”

“শালা, কখনো মরে দেখেছ নাকি?”

“নাহ,” ব্যগ্রতার সাথে মাথা দোলাল আসাকাওয়া।

“তাহলে তো জানা সম্ভব না, তাই না? মৃত্যুর পর কোথায় যাবে সেটা জানা তোমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”

“তুমি কি বলতে চাচ্ছ, আত্মা বলে সত্যি কিছু রয়েছে?”

“দেখো, শুধু বলতে পারি, আমি কিছুই জানিনা। মহাবিশ্বের প্রাণের সৃষ্টির কথা উঠলে, আত্মার অস্তিত্বের ব্যাপারটাও কিন্তু সহজ হয়ে যায়। মর্ডান নিউক্লিয়ার বায়োলজিস্টদের ফাঁকা বুলিগুলো খুব একটা বাস্তবধর্মী শোনায় না। ওদের মতে ‘বিশটা ভিন্ন ধরনের অ্যামিনো এসিড অল্প অল্প করে একটা পাত্রে মিশিয়ে ওতে বৈদ্যুতিক শক্তি প্রেরণ করলেই প্রাণসঞ্চারের ভীত সৃষ্টি হয়।’ আর ওরা সত্যি আশা করে এমনটা বিশ্বাস করবো আমরা? আমরা ঈশ্বরের সন্তান, এই তত্ত্বটা হজম করা অন্তত এর চেয়ে সহজ। আমার মতে সম্পূর্ণ আলাদা একটা এনার্জি জড়িত ছিল সৃষ্টির শুরুতে। অনেকটা আমাদের ইচ্ছা শক্তির মতো।”

মনে হলো আসাকাওয়ার কিছুটা কাছাকাছি এগিয়ে এসেছে রুজি। হঠাৎ করেই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল সে। “যাইহোক, লক্ষ না করে পারিনি, মেমোরিয়াল হলে প্রফেসরের ‘শিল্পসম্ভার’ বেশ খুঁটিয়ে দেখছিলে দেখলাম। ইন্টারেস্টিং কিছু পেলে?”

কথাটা শুনে মনে পড়ল আসাকাওয়ার কিছু একটা পড়ছিল ও। …কল্পনার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। আর ঐ ক্ষমতা…”

“সম্ভবত ওখানে চিন্তাশক্তির ব্যাপারে বলা ছিল কিছু একটা।”

“কী সেটা?”

“পড়ে শেষ করার সময় পাইনি।”

হেহে, খুব খারাপ। একটা ভালো জিনিস পড়া শুরু করেছিলে কেবল। প্রফেসরের কথাবার্তা যা অন্যদের চমকিত করত, ওগুলো শুনলে হাসি পেত আমার। বৃদ্ধ যা বলতে চেয়েছিল সেটা হলো, চিন্তা-ই হলো জীবনের গঠন, স্বতন্ত্র শক্তি রয়েছে চিন্তার।”

“হুহ? বলতে চাচ্ছ আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনা জীবন দান করতে পারে?”

“সেটা নির্ভর করছে চিন্তার ব্যাপ্তির ওপর।”

“যাইহোক, বেশ জটিল একটা তত্ত্ব এইটা।”

“অবশ্যই। তবে একই ধরনের আইডিয়া উত্থাপন করা হয়েছিল খ্রিষ্টের জন্মেরও আগে। মনে হয় সেটাকে সৃষ্টির ভিন্ন এক থিওরি হিসেবেও ধরা যায়।”

এতদূর বলার পর মনে হলো এই প্রসঙ্গে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে রুজি। আবারও ম্যাপে নজর দিল সে।

রুজির কথা বেশিরভাগ-ই ধরতে পেরেছে আসাকাওয়া। কিন্তু খুব একটা মেলাতে পারল না ও।

আমরা যেটার মুখোমুখি হতে চলেছি হয়তো সেটার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। তবে এটা বাস্তব। যেহেতু এটা বাস্তব সেহেতু বাস্তবিকই এর মুখোমুখি হতে হবে আমাদের, এমনকি এর ফলাফল ও প্রভাব না জানা সত্ত্বেও। এইমুহূর্তে আমাদের শুধুমাত্র ধাঁধার সমাধান খুঁজে নিজেদের পিঠ বাঁচানোয় মনোযোগ দেয়া লাগবে। অতিপ্রাকৃত ব্যাপার স্যাপারের রহস্য উদ্ঘাটনের চাইতে এটাই বেশি জরুরি। ভাবল আসাকাওয়া।

হয়তো যুক্তি আছে রুজির কথায়। কিন্তু আসাকাওয়ার প্রয়োজন, স্পষ্ট জবাব। যতই পথ অতিক্রান্ত হচ্ছে ততই বাজেভাবে কাঁপছে বোট। দুশ্চিন্তা হচ্ছে আসাকাওয়ার, সমুদ্রক্লান্তি পেয়ে না বসে ওকে। যতই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে ততই বুকের মধ্যে একধরনের চিনচিনে অনুভূতি হচ্ছে ওর। হঠাৎ করেই মাথা উঁচু করে বাইরে তাকাল রুজি। সমুদ্রে চলছে ধূসর কালো ঢেউয়ের পাগলা নাচন। দূরে বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে আইল্যান্ড।

“বুঝলে আসাকাওয়া, একটা ব্যাপার খোঁচাচ্ছে আমাকে।”

“কী?”

“যে চারজন পোলাপাইন লগ কেবিনে ছিল, ওরা সমাধানটা অনুসরণ করল না কেন?”

আবারও একই প্রশ্ন।

“ব্যাপারটা স্পষ্ট নয় কী? ওরা বিশ্বাস-ই করেনি ভিডিওটা।”

“আচ্ছা, আমিও এমনটাই ভেবেছি। সমাধান মিশিয়ে প্র্যাংক বানিয়েছে ওরা ভিডিওটা। কিন্তু স্কুললাইফে ট্র্যাক টিমের সাথে একটা ট্রিপের কথা মনে পড়ছে আমার। একদিন মাঝরাতে সাইতো ঘরে ঢুকে মরাকান্না জুড়ে দিল। সাইতোর কথা মনে আছে তোমার, তাই না? যাইহোক, ওরকম কান্নার কোনো কারণ ছিল না। আমরা টিমে বারোজন ছিলাম। আর এক ঘরেই ঘুমাচ্ছিলাম সবাই। আর বোকাচোদায় দৌড়ে এসে, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চিৎকার জুড়ে দিল! ‘ভূত দেখেছি আমি!’ বলল সে। বাথরুমের দরজা খোলার পর ট্র্যাশ ক্যানের পাশে একটা মেয়েকে নাকি কাঁদতে দেখেছে সে। এখন বলো, এটা শুনে বাকিদের প্রতিক্রিয়া কী হবে?”

“সম্ভবত ওদের অর্ধেক বিশ্বাস করবে, বাকি অর্ধেক হেসে উড়িয়ে দেবে।”

মাথা ঝাঁকাল রুজি। “হরর মুভিতে বা টিভিতে এরকম হয়। শুরুতে কেউ সিরিয়াসলি নেয় না। পরে একে একে বিশ্বাস করতে থাকে, ঠিক কিনা? কিন্তু বাস্তব জীবনে ঠিক উলটো। প্রত্যেকে বিশ্বাস করেছিল তার কথায়। দশজনের সবাই। আর ঐ দশজন ভীতু ছিল বলে নয়। অন্য কোনো গ্রুপের সাথে ট্রাই করে দেখলেও ফলাফল একই পাবে। ভয়ের একটা মৌলিক ভিত্তি রয়েছে প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই। এটা প্রবৃত্তিগত।”

“তাহলে তোমার মতে ঐ চারজনের ভিডিওটা বিশ্বাস না করাটা অদ্ভুত।”

রুজির কথা শুনে নিজের মেয়ের চেহারা মনে পড়ল আসাকাওয়ার। দৈত্যের মুখোশ দেখে তার কান্নার সময়কার চেহারা। দৈত্যের মুখোশ যে ভয়ঙ্কর কিছু এটা বাচ্চা জানল কীভাবে সেটা ভেবে কতটা অবাক হয়েছিল, মনে পড়ল ওর।

“হুম, যাইহোক, ভিডিওর দৃশ্যগুলো ওরকম কোনো বর্ণনা নেই। সম্ভবত তেমন একটা ভয় পায়নি ওরা। আমার মতে ভিডিওটা অবিশ্বাস করাও সম্ভব। কিন্তু একটুও কি অস্বস্তিতে ছিল না ঐ চারজন? অবিশ্বাস করলেও এমন কোনো সমাধান, বলা হয়েছে যেটা জীবন বাঁচাবে, সেটা কি একবারের জন্যেও কেউ ট্রাই করে দেখবে না? একজনের হলেও তো চেষ্টা করে দেখা উচিত ছিল। মানে বলতে চাচ্ছি বেশি সাহস না দেখিয়ে টোকিওতে ফিরে কেউ একজন তো চুপিসারে হলেও সমাধানটা মানার চেষ্টা করতে পারত।”

খারাপ অনুভূতি বেড়ে গেল আসাকাওয়ার। নিজেও একই জিনিস ভেবেছে ও। যদি সমাধানটা অসম্ভব কিছু হয়ে থাকে তবে?

“ফলে, মনে হয় সমাধানটা এমন কিছু ছিল যা ওদের পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। নিজেদেরকে মনকে ওভাবেই বুঝিয়েছিল ওরা, আর বিশ্বাস করেনি ব্যাপারটায়..” একটা উদাহরণ মনে পড়ল আসাকাওয়ার। এমন নয়তো, কোনো মহিলা খুন হয়েছে আর জীবিত কাউকে উদ্ধার করার জন্য কোনো বার্তা রেখে গিয়েছে? তাকে উদ্ধারের পর হয়তো মৃত মহিলার আত্মার শান্তি হবে।

“হেহে। আমি জানি কী ভাবছো। কেসটা এরকম কিছু হলে কী করবে তাই তো?”

সমাধান যদি হয় কাউকে খুন করা, তবে কী করবে ও, নিজেকেই জিজ্ঞেস করল আসাকাওয়া। নিজের জীবন বাঁচাতে কোনো অচেনা ব্যক্তিকে খুন করতে সক্ষম হবে ও?

যদি এমন কিছুই হয়ে থাকে সমাধানটা, তবে ওদের দুজনের মধ্যে সেটা পালন করবে কে? ক্রোধের সাথে মাথা ঝাঁকাল আসাকাওয়া।

ফালতু চিন্তা বাদ দাও। প্রার্থনা করো যেন সাদাকো ইয়ামামুরার শেষ ইচ্ছা যেন সাধারণ মানুষের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হয়, ভাবল আসাকাওয়া। আইল্যান্ড স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখন বোট থেকে। ক্রমেই এগিয়ে আসছে মোতোমাচি হারবারের ডক।

“শোনো রুজি, একটা সাহায্য লাগত আমার।” কোমল স্বরে বলল আসাকাওয়া।

“কী?”

“যদি আমি সময়মত কাজটা না করতে পারি..যদি…” কোনোভাবেই মৃত্যু শব্দটাও উচ্চারণ করতে পারল না ও। “তুমি যদি পরেরদিনও সমাধানটা বের করতে পারো…তাহলে তুমি কি…আমার স্ত্রী ও বাচ্চাকে…”

ওকে থামিয়ে দিল রুজি। “অবশ্যই। এটা আমার হাতে ছেড়ে দাও।

ভাবী ও ভাতিজিকে বাঁচানো আমার দায়িত্ব।”

নিজের একটা বিজনেস কার্ড বের করে পিছনে একটা ফোন নম্বর লিখল আসাকাওয়া। “সমস্যাটা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমি ওদেরকে আশিকাগায় ওর বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। এটা ওখানকার নম্বর। ভুলে যাওয়ার আগেই দিয়ে রাখি তোমাকে।”

না দেখেই কার্ডটা পকেটে ভরে রাখল রুজি

তখনই ঘোষণা আসল বোট কিছুক্ষণের মধ্যেই ওশিমা আইল্যান্ডের মোতোমাচিতে ডক করবে। নেমেই স্ত্রীকে কল করে বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য রাজি করানোর কথা ভাবল আসাকাওয়া। জানা নেই কখন টোকিওতে ফিরতে পারবে ও। কে জানে? হয়তো ওশিমাতেই ফুরিয়ে যাবে ওর সময়। পরিবারকে একা ফেলে মারা যাওয়ার কথা আর ভাবতে পারল না ও।

নামার পর রুজি জিজ্ঞেস করল, “আসাকাওয়া, বউ বাচ্চা থাকাটা কি আসলেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ?”

এরকম প্রশ্ন আশা করা যায় না রুজির কাছ থেকে। জবাব দেয়ার সময় না হেসে পারল না আসাকাওয়া। “একদিন নিজেই এই প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবে।”

কিন্তু আসাকাওয়ার মনে হয় না, পরিবার নিয়ে স্বাভাবিকভাবে সংসার করার ক্ষমতা রুজির আছে।

অধ্যায় সাত

আতামির জাহাজঘাটের থেকে ওশিমা ডকের বাতাস বেশি শক্তিশালী। মাথার ওপরে মেঘ ভেসে যাচ্ছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। হাঁটার সময় টের পাওয়া যাচ্ছে ঢেউয়ের চোটে কংক্রিটের জেটির কাঁপন। বৃষ্টির বেগ খুব বেশি নয়। তবে ঝড়ো বাতাসের কারণে বৃষ্টির ছাট মুখে এসে লাগছে আসাকাওয়ার। দুজনের কারো সঙ্গেই নেই ছাতা। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দ্রুত হেঁটে চলেছে দুজন। যেন তাড়াতাড়ি পার হওয়া যায় সমুদ্রপ্রান্তের জেটি।

প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে রেখেছে দ্বীপবাসী। ওদের লক্ষ্য জাহাজ থেকে নামা যাত্রীদের মধ্যে রেন্টাল কার কিংবা হোটেলের জন্য কাস্টমার সংগ্রহ। ওদের জন্য যার আসার কথা মাথা উঁচিয়ে তাকে খুঁজতে লাগল আসাকাওয়া। আতামির বোট হারবারে যাওয়ার আগে নিজের অফিস থেকে ওদের ওশিমা শাখার ফোন নম্বর যোগাড় করেছে আসাকাওয়া। হায়াৎসু নামের একজন সহকারীকে বলা হয়েছে ওদেরকে সাহায্য করার জন্য। কোনো জাতীয় সংবাদ সংস্থার-ই সম্পূর্ণ ব্যুরো নেই ওশিমাতে। স্থানীয় কাউকে নিযুক্ত করা হয় সংবাদ সংগ্রহের জন্য। ঐ স্থানীয় ব্যক্তি খোঁজ রাখে ওশিমার যাবতীয় দৈনন্দিন ঘটনাবলির ওপর। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানতে পারলেই রিপোর্ট করে দেয় সেন্ট্রাল অফিসে। আইল্যান্ডের যেকোনো রিপোর্টারের দায়ভার তাদের-ই। ওশিমায় আসার আগে ডেইলি নিউজের হয়েই কাজ করত হায়াৎসু। শুধু ওশিমা নয়, ইজু চেইনের আরও সাতটা আইল্যান্ড তার অধীনে। এই সবকটা অঞ্চল থেকে খবর সংগ্রহ করে সে। কিছু ঘটলে হেড অফিস থেকে লোক পাঠানোর জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই প্রতিবেদন করে পাঠিয়ে দেয় হায়াৎসু। আইল্যান্ডজুড়েই ভালো নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ আছে হায়াৎসুর। এর সাহায্য পেলে লাভ-ই হবে আসাকাওয়ার তদন্তকাজে।

ফোনেও আসাকাওয়ার অনুরোধ শুনে বেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে সে। জেটিতে-ই দেখা করার কথা ছিল ওদের। যেহেতু ওদের কখনো দেখা হয়নি, সেকারণে তাকে নিজের বর্ণনা দিয়েছে আসাকাওয়া। বলেছে সাথে থাকবে একজন বন্ধু।

পিছন থেকে একজনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল ও।

“এক্সকিউজ মি, আপনি মিস্টার আসাকাওয়া?”

“জ্বি।”

“আমি হায়াৎসু। ওশিমা আইল্যান্ডের সংবাদদাতা।” ছাতা উঁচিয়ে বন্ধুসুলভ হাসি হাসল সে।

“দুঃখিত, এত তাড়াহুড়োয় ফেলতে হলো আপনাকে। আপনার সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ।”

হায়াৎসুর গাড়ির কাছে যাওয়ার সময় রুজির সাথে পরিচয় করিয়ে দিল তাকে। বাতাসের জোর এত বেশি, গাড়িতে ওঠার আগ পর্যন্ত কোনো কথাই বলতে পারল না ওরা। ছোটখাটো একটা গাড়ি, কিন্তু ভেতরটা প্রশস্ত। সামনে বসল আসাকাওয়া, পেছনে রুজি।

“সরাসরি তাকাশি ইয়ামামুরার বাড়ি যাচ্ছি আমরা?” স্টিয়ারিং হুইলে দুই হাত রেখেই জিজ্ঞেস করল হায়াৎসু। তার বয়স ষাটের মতো। মাথাভর্তি চুল। যদিও চুলগুলো ধূসর।

“তাহলে এরইমধ্যে সাদাকো ইয়ামামুরার পরিবারের খোঁজ পেয়ে গেছেন?” এই নামের একজনের ব্যাপারে খোঁজ নিতে আসছে, ফোনে তাকে জানিয়েছিল আসাকাওয়া।

“এটা মফস্বল এলাকা। যখনই বলেছেন সাসিকিজির ইয়ামামুরা নামের কাউকে খুঁজছেন, তখনই বুঝে গেছি কার কথা বলছেন। ইয়ামামুরা একজন জেলে। গ্রীষ্মকালে যে নিজের বাড়ি ভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে সে। কী মনে হয়? রাতের মধ্যেই তার ওখানে পৌছে দেবো আপনাদের। রাতটা আমার এখানেও কাটাতে পারতেন। তবে আমার থাকার জায়গাটা ছোট। আপনাদের- ই কষ্ট হতো থাকতে।” হাসল হায়াৎসু। সে ও তার স্ত্রী একসাথে থাকে। একদমই বাড়িয়ে বলেনি সে। দুজন অতিথি রাখার মতো ঘর নেই তার।

রুজির দিকে তাকাল আসাকাওয়া।

“আমার কোনো সমস্যা নেই।”

সাসিকিজির দিকে এগিয়ে গেল হায়াৎসুর ছোট্ট গাড়িটা। জায়গাটা দ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত। যতটুকু পারা যায় গতি বাড়িয়ে চলছে গাড়িটা। আইল্যান্ড ঘিরে থাকা রিংরোড বেশ সরু। যত দ্রুত এগোনো যায়, ততই উত্তম। রাস্তাতে যে কয়টা গাড়ি ওরা ক্রস করল ওগুলোর বেশিরভাগ-ই ছোটখাটো। একসময় গাড়ির জানালা দিয়ে ডানপাশে চোখে পড়ল শুধুই সমুদ্র। বাতাস বাড়ার সাথে সাথে ঢেউয়ের আওয়াজও পরিবর্তন হচ্ছে। কালো মেঘ প্রতিফলিত হচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠে। ফলে অন্ধকার দেখাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ। সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ। মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ না চমকালে আকাশ ও সমুদ্রের সীমানা আলাদা করা কঠিন হতো। বলা যেত না কোথায় সমুদ্রের শুরু আর আকাশের শেষ অথবা কোথায় আকাশের শুরু আর সমুদ্রের শেষ। যত দূরে চোখ যায় ততই মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা শোনা গেল রেডিওতে। আরও যেন কালো হয়ে উঠল আকাশ। রাস্তার ডানে ঘুরে ক্যামেলিয়া গাছে মোড়ানো একটি টানেলে ঢুকল ওদের গাড়ি। ক্যামেলিয়ার শিকড় দেখা যাচ্ছে মাটিতে। দীর্ঘকাল বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে মাটি ক্ষয় হয়ে গিয়েছে কয়েক জায়গায়। এখন আবার বৃষ্টিতে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে রয়েছে মাটি। আসাকাওয়ার মনে হলো কোনো দৈত্যের পেটের মধ্যে দিয়ে যাত্রা করছে ওরা।

“সামনেই সাসাকিজি,” বলল হায়াৎসু। “কিন্তু মনে হয় না সাদাকো ইয়ামুরা নামক মহিলা ওখানে আর থাকে। তাকাশি ইয়ামামুরার কাছে বিস্তারিত জানতে পারবেন। যতদূর শুনেছি এই লোকটা তার মায়ের আত্মীয়।”

“সাদাকোর বয়স কত হতে পারে এখন?” জিজ্ঞেস করল আসাকাওয়া। কিছুক্ষণ ধরেই রুজি ঝিম মেরে পড়ে আছে ব্যাকসিটে। উচ্চারণ করছে না একটা শব্দও।

“উমম। কখনো দেখা হয়নি আমার তার সাথে। তবে যদি বেঁচে থাকে তাহলে তার বয়স বিয়াল্লিশ তেতাল্লিশ হবে।”

যদি বেঁচে থাকে? হায়াৎসু এই বাক্য ব্যবহার করল কেন ভাবছে আসাকাওয়া। তাহলে কি হারিয়ে গিয়েছে সাদাকো ইয়ামামুরা? হঠাৎ-ই সংশয়পূর্ণ হয়ে উঠল আসাকাওয়ার মন। যদি দেখা যায় এতদূর পাড়ি দিয়ে ওশিমায় এসে ওরা এমন কারো খোঁজ করছে যে কিনা লাপাত্তা, তাহলে কী হবে? পুরো ব্যাপারটাই কোনো কানাগলি নয় তো?

অবশেষে গাড়িটা এসে থামল একটি পুরোনো বাড়ির সামনে। একটা সাইনবোর্ডে লেখা ‘ইয়ামামুরা ম্যানর’। বাড়িটা এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে সেখান থেকে দেখা যায় সমুদ্রের দৃশ্য। নিঃসন্দেহে আবহাওয়া ভালো থাকলে উপভোগ করা যায় নৈসর্গিক দৃশ্য। দূরে ত্রিভুজাকার আইল্যান্ড চোখে পড়ল ওদের। তোশিমা আইল্যান্ড ওটা।

“ওয়েদার ভালো থাকলে এখান থেকেই নিযিমা, শিকিনিযিমা এমনকি কোজুশিমা আইল্যান্ডও দেখতে পাবেন এখান থেকে।” দক্ষিণ দিকে নির্দেশ করে গর্বভরে বলল হায়াৎসু।

অধ্যায় আট

“তদন্ত? কী তদন্ত করবো এই মহিলার ব্যাপারে?”

১৯৬৫ সালে নাটকের দলে যোগ দেয় সে। পঁচিশ বছর আগে। গালভরে জানিয়েছে ইয়াশিনো। বছরখানেক পর একজন ক্রিমিনালকে ট্রেস করা ও কঠিন। কিন্তু পঁচিশ বছর পর?

“যা যা বের করতে পারো, সবই জানা লাগবে আমাদের। এই মহিলা কী ধরনের জীবনযাপন করত আমরা জানতে চাই। বর্তমানে সে কী করে আর কী চায়, সেটাও।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইয়াশিনো। এরপর কাঁধ ও কানের মাঝে ফোনটা চেপে, ডেস্ক ড্রয়ার থেকে নোটপ্যাড বের করল সে।

…আর সেইসময় তার বয়স কত ছিল?”

“আঠারো। সে ওশিমা হাইস্কুল থেকে পাস করে বেরিয়ে সরাসরি চলে যায় টোকিওতে। সেখানে গিয়ে যোগ দেয় একটা থিয়েটার দলে। দলটার নাম ‘উড্ডয়ন থিয়েটার সঙ্ঘ’।”

“ওশিমা?” লেখা বন্ধ করে ভ্রু কুচকালো ইয়াশিনো। “আচ্ছা কোথায় থেকে কল দিচ্ছ তুমি?”

“ইজু ওশিমা আইল্যান্ডের সাসিকিজি নামের এক জায়গা থেকে।”

“কবে ফিরে আসার প্ল্যান করছো?”

“যত তাড়াতাড়ি পারা যায়।”

“বুঝতে পারছ, ওদিকে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আভাস দেয়া হয়েছে?”

অবশ্যই এটা না জানার কোনো কারণ নেই আসাকাওয়ার। এর মাঝেই দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা অবাস্তব ঠেকছে ইয়াশিনোর। অবাক হতে শুরু করেছে সে।

একরাত পরেই ‘ডেডলাইন’। এখনও ওশিমাতে রয়েছে আসাকাওয়া। কে জানে, হয়তো বেরোতে পারবে না এখানে থেকে।

“বাজে আবহাওয়ার ব্যাপারে কোনো ট্র্যাভেল গাইডের কাছে কিছু জেনেছ?”

এখনও খুব বেশি বিস্তারিত জানেনা আসাকাওয়া।

“আমি নিশ্চিত না, তবে যে অবস্থা দেখছি, মনে হচ্ছে সব ফ্লাইট আর সমুদ্র যাত্রা ক্যান্সেল করা হবে।”

সাদাকো ইয়ামুরার তথ্য বের করতেই ব্যস্ত ছিল আসাকাওয়া। ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপারে খবর নেয়ার সময়ই পায়নি ও। ওশিমায় পা রেখেই বাজে একটা অনুভূতি হয়েছিল ওর। এখন দেখা দিয়েছে এই দ্বীপেই আটকা পড়ার সম্ভাবনা। ভিতরে একটা তাড়না অনুভব করল আসাকাওয়া। রিসিভার হাতে রেখেই নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ও।

“হেই, হেই, দুশ্চিন্তা কোরো না, এখনও কিছু ক্যান্সেল করেনি ওরা। ইতিবাচক কণ্ঠস্বরে কথা বলার চেষ্টা করল ইয়াশিনো। প্রসঙ্গ বদলাল সে। “তো এই মহিলা… সাদাকো ইয়ামামুরা। আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত তার সব ইতিহাস চেক করে দেখলে?”

“কমবেশি,” জবাব দিল আসাকাওয়া। বাতাস আর ঢেউয়ের শব্দে সতর্ক হয়ে উঠেছে ও।

“শুধু এটুকুই না, তাই না? উড্ডয়ন থিয়েটার গ্রুপের ভেতরের তথ্যও জেনেছ তুমি।”

“নাহ, শুধু এটুকুই। সাদাকো ইয়ামামুরা, ১৯৪৭ সালে ইজু ওশিমা আইল্যান্ডের সাসিকিজিতে জন্মগ্রহণ করে। শিযুকু ইয়ামামুরা… হেই নামটা লিখে রাখো শিযুকু ইয়ামামুরা। ৪৭ সালে তার বয়স ছিল বাইশ। সে তার সদ্যজাত বাচ্চাকে তার দাদির কাছে রেখে টোকিও চলে যায়।”

“বাচ্চাটকে আইল্যান্ডেই রেখে চলে গিয়েছিল কেন সে?”

“একজন লোক ছিল। এর নামটাও নোট করো। হিহাচিরো ইকুমা। সেই সময় তিনি সাইকিয়াট্রির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ছিলেন। তিনি শিযুকু ইয়ামামুরার প্রমিকও।

“এর মানে সাদাকো শিযুকু আর হিহাচিরোর সন্তান?”

“যদিও এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ পাইনি। তবুও এটাই ধরে নেয়া যায়।”

“ওরা বিবাহিত ছিল না, তাই না?”

“একেবারে ঠিক। হিহাচিরোর অলরেডি একটা পরিবার ছিল।”

তাহলে অবৈধ একটা সম্পর্ক ছিল এইটা। পেন্সিল মুখে দিল ইয়াশিনো।

“আচ্ছা শুনছি, বলে যাও।”

“১৯৫০ সালে, তিনবছরের মধ্যে প্রথমবার শিযুকু নিজের শহরে ফিরে আসে। মেয়ে সাদাকোর সাথে দেখা করে সে। কিছুদিন থাকে সেখানে। কিন্তু ঐ বছরের শেষদিকে আবারও চলে যায় সে। এবার সাদাকোকে সাথে নিয়ে। পরবর্তী পাঁচ বছরে কেউই জানতে পারেনি কোথায় আছে বা কী করছে সাদাকো ও শিযুকু। কিন্তু পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে, এখানে বাস করা শিযুকুর এক আত্মীয় একটা গুজব শোনে। সেটা হলো, কিছু একটা করে বিখ্যাত হয়ে গেছে শিযুকু।”

“কেন সে এরকম কিছুর সাথে জড়িত হতে যাবে?”

“সেটা অস্পষ্ট। ঐ আত্মীয় নাকি উড়ো খবর হিসেবে শুনতে পেয়েছিল শিযুকুর ব্যাপারে। তাকে যখন আমার কার্ড দিলাম, তখন সে বলে, ‘আপনি যেহেতু রিপোর্টার, আপনি আমার চেয়ে ভালো জানবেন।’ তার কথার ধরন দেখে মনে হচ্ছিল ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ এর ভেতরের কোনো একসময় শিযুকু আর সাদাকো মিডিয়াতে আলোড়ন তোলার মতো কিছু করে ফেলেছে। কিন্তু মেইনল্যান্ড থেকে খুব সহজে আইল্যান্ডে খবর পৌঁছে না…”

“তো তুমি এখন আমাকে ওদের খবরে আসার ইতিহাস ও কারণ চেক করে দেখতে বলছো?”

“এই তো ধরতে পেরেছ।”

“আরে বোকা। এটা তো স্বাভাবিক।“

“আরও কিছু আছে। ৫৬ সালে আইল্যান্ডে ফিরে আসে শিযুকু। সাথে সাদাকোও ছিল। তাকে এতই চিন্তিত দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল আলাদা কোনো ব্যক্তি সে। জবাব দেয়নি আত্মীয়’র একটা প্রশ্নেরও। অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিল সে। এরপর একদিন মাউন্ট মিহারার আগ্নেয়গিরিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে শিযুকু। সেসময় তার বয়স ছিল একত্রিশ।”

“তাহলে শিযুকু সুইসাইড কেন করেছে এটাও জানতে হবে।“

“যদি পারো তবে।” রিসিভার ধরে রেখেই মাথা নিচু করল আসাকাওয়া। যদি এই আইল্যান্ডে-ই আটকা পড়ে ও তবে ইয়াশিনো-ই শেষ ভরসা। এখানে রুজি আর ও একত্রে আসার জন্য আফসোস হচ্ছে ওর। সাসিকিজিতে এসে সহজেই তদন্ত করতে পারত রুজি। টোকিওতে বসে রুজির যোগাযোগের অপেক্ষায় থাকা সবথেকে বিচক্ষণ হতো। আর এরপর ইয়াশিনোর সাথে দলবেঁধে একত্রে কাজে নামতে পারত।

“ঠিক আছে যতদূর পারি করছি। কিন্তু এখানে লোকবল একটু কম আজকে।”

“আমি ওগুরিকে কল করে তোমার ওখানে লোক পাঠাতে বলছি।”

“সেটা দারুণ হয়।”

মুখে বলল ঠিকই ও, তবে কাজটা করতে পারবে কিনা নিশ্চিত নয় আসাকাওয়া। লোকবল কম থাকা নিয়ে সবসময় অভিযোগ করে ওগুরি। এরকম কিছুর জন্য সে লোক দিবে কিনা সন্দেহ।

“তাহলে মহিলা আত্মহত্যা করে আর সাদাকো থেকে যায় সাসিকিজিতেই। ওর মায়ের আত্মীয় দেখাশোনা করে তার। ঐ আত্মীয় এখন নিজের বাড়ি ভাড়া দিয়ে উপার্জন করে।” ও আর রুজি এখন সেখানেই রয়েছে, এটা বলতে লেগেছিল আসাকাওয়া। পরে সিদ্ধান্ত নিল, বলাটা অপ্রয়োজনীয়।

“পরের বছর, সাদাকো ফোর্থ গ্রেডে পড়ার সময় মাউন্ট মিহারার উদ্গীরণের ভবিষ্যৎবাণী করে স্কুলে বিখ্যাত হয়ে যায়। বুঝতে পারলে? মাউন্ট মিহারার উদ্গীরণ ঘটেছিল ১৯৫৭ তে। যেদিন সাদাকো ভবিষ্যৎবাণী করে তার পরদিনই।”

“ইম্প্রেসিভ ব্যাপার স্যাপার। এরকম একটা মহিলা থাকলে তো ভূমিকম্প কো অর্ডিনেটিং কমিটি’র দরকার-ই পড়ত না।”

ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হওয়ার কারণে আইল্যান্ড জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তার নামডাক। তখনই প্রফেসর মিউরার নেটওয়ার্কের নজরে আসে সে। কিন্তু এতসব ইয়াশিনোকে ব্যাখ্যা করার দরকার নেই, ভাবল আসাকাওয়া। কী হবে তার এত ডিটেইলস জেনে।

“দ্বীপবাসীরা সাদাকোর কাছে আসা আরম্ভ করে, নিজেদের ভবিষ্যৎ জানার জন্য। কিন্তু প্রত্যেকের অনুরোধ ফিরিয়ে দেয় সে। দাবি করে, এরকম কোনো ক্ষমতা নেই তার।”

“ভদ্রতার খাতিরে?”

“কে জানে? এরপর হাইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে টোকিওতে যাত্রা করে সে। টোকিওতে যাওয়ার জন্য যেন তর সইছিল না তার। যে আত্মীয় তার দেখাশোনা করত সে মাত্র একটা পোস্টকার্ড পেয়েছিল তার কাছে থেকে। সেখানে লেখা ছিল, সে টেস্ট পাস করে উড্ডয়ন থিয়েটার গ্রুপে চান্স পেয়েছে। এরপর তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আইল্যান্ডের একজনও জানেনা কোথায় সে অথবা বর্তমানে কী অবস্থা তার।“

“অন্যভাবে বলতে গেলে, আমাদের হাতে একমাত্র ব্লু হলো, যে ট্রেস সে ফেলে গেছে সেটাই। উড্ডয়ন থিয়েটার গ্রুপ।”

“আমারও এমনটাই মনে হয়।”

“আচ্ছা, আমি একবার বলি, দেখো ঠিক আছে কিনা। আমাকে যা যা খুঁজে বের করতে হবে: কেন খবরে এসেছিল শিযুকু ইয়ামামুরা, কেন আত্মহত্যা করেছিল সে, কোথায় তার মেয়ে চলে গিয়েছিল আর আঠারো বছর বয়সে থিয়েটার দলে যোগ দেয়ার পরের ঘটনা। এককথায়, মা আর মেয়ের সকল তথ্য। এই দুইটা বিষয়-ই।”

“ঠিক।”

“কোনটা আগে দেখবো?”

“হুহ?”

“জিজ্ঞেস করছি মা নাকি মেয়ে, কারটা আগে খতিয়ে দেখব। তোমার হাতে তো বেশি সময় নেই।”

স্পষ্টতই যেটা বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করছে বর্তমানে সেটাই, মানে সাদাকো।

“মেয়ের ব্যাপারটা নিয়ে শুরু করতে পারবে?”

“ঠিক আছে। সম্ভবত আগামীকাল প্রথমে গিয়ে উড্ডয়ন থিয়েটার গ্রুপে ঢুঁ মারবো।”

ঘড়ির দিকে তাকাল আসাকাওয়া। সন্ধ্যা ছটা বেজে পার হয়েছে কেবল। রিহার্সাল শেষ হতে হয়তো এখনও অনেক দেরি।

“ইয়াশিনো, আগামীকাল না। বলছি, আজকেই গিয়ে দেখো।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালকা মাথা নাড়ল ইয়াশিনো। “দেখো আসাকাওয়া, এখন আমার নিজেরও কাজ করতে হবে। কখনো ভেবে দেখেছ আমার ব্যাপারটা? পাহাড়সম কাজ বাকি আমার। সকালের আগে লিখে শেষ করতে হবে সব। এমনকি আগামীকাল সকালেও একটু…” বলা থামিয়ে দিল ইয়াশিনো। তার মনে হলো আরেকটু বেশি বললেই সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয়া হবে আসাকাওয়াকে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সবসময় সেরা কেয়ারটা নেয়ার চেষ্টা করে সে।

“প্লিজ, হাতজোড় করছি, আগামী পরশু আমার ডেডলাইন।” কীভাবে এই লাইনে কাজ আদায় করে নিতে হয় জানা আছে ওর। আর তাকে জোর দিতে রাজি হলো না আসাকাওয়া। এইমুহূর্তে ইয়োশিনোর সিদ্ধান্ত জানার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই ওর।

“কিন্তু…আচ্ছা যাইহোক, আজকে রাতের মধ্যেই চেষ্টা করছি। কথা দিতে পারছি না, বলে রাখলাম।”

“ধন্যবাদ, আমি কৃতজ্ঞ।” বো করে ফোন রাখতে ধরল আসাকাওয়া।

“হেই, এক সেকেন্ড দাঁড়াও। একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার জিজ্ঞেস করা হয়নি এখনও।”

“কী সেটা?”

“ভিডিওতে যা দেখেছো সেটার সাথে সাদাকো ইয়ামামুরার সম্ভাব্য সম্পর্ক কী?”

থেমে গেল আসাকাওয়া। “আমি বললেও হয়তো বিশ্বাস করবে না।”

“বলো তো আগে।”

“কোনো ভিডিও ক্যামেরা দ্বারা রেকর্ড হয়নি ওসব।” কিছুক্ষণ থেমে থাকল আসাকাওয়া। ব্যাপারটা হজম করার সময় দিল ইয়াশিনোর মস্তিষ্ককে। “ঐ দৃশ্যগুলো রেকর্ড হয়েছে সাদাকোর চোখ আর কল্পনার মাধ্যমে। একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠেছে, যেসব কারো দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।”

“হু?” একমুহূর্তের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়ল ইয়াশিনো।

“দেখলে, বলেছিলাম না বিশ্বাস হবে না।”

“তোমার মতে ওগুলো সাইকিক ফটো?”

“এই শব্দ দ্বারাও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না ওসব। সে এমন কিছু ঘটিয়েছে যার ফলে ওসব দৃশ্য টিভি টিউব পর্যন্ত ধারণ করেছে। সে দৃশ্যগুলোকে টিভিতে প্রেরণ করার ক্ষমতা রাখে।”

“সে প্রডাকশন এজেন্সি নাকি?” নিজের কৌতুকে নিজেই হাসল ইয়াশিনো। রাগল না আসাকাওয়া। কেন কৌতুক করছে, সেটা বুঝছে আসাকাওয়া। বন্ধুর নির্মল হাসি চুপচাপ শুনল ও।

রাত ৯:৪০ মিনিট। মারুনোচি সাবওয়ে লাইনের ইয়োৎসুয়া স্টেশনের সিঁড়িতে পা রেখেছে ইয়াশিনো। দমকা হাওয়ায়, মাথার হ্যাট উড়ে যাওয়ার জোগাড়। দুই হাত দিয়েই সামলাতে হলো হ্যাটটা। আশপাশে ফায়ার স্টেশন আছে কিনা দেখল সে। যাতে ল্যান্ডমার্ক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একেবারে কোনায় দেখা যাচ্ছে সেটা। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌঁছাল সে।

সাইডওয়াকে ঝুলছে একটা সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা উড্ডয়ন থিয়েটার সঙ্ঘ। এর পাশেই কয়েকটা সিঁড়ি। যা বেয়ে পৌঁছানো যায় বেজমেন্ট-এ। সেখান থেকে ভেসে আসছে কমবয়সী তরুণ তরুণীর কোলাহলের আওয়াজ। শোনা যাচ্ছে আবৃত্তি ও গানও। সম্ভবত সামনে কোনো শো আছে ওদের। এজন্য হয়তো দিনের ট্রেন চলাচল বন্ধ না হওয়ার আগ পর্যন্ত রিহার্সেলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওরা। এটা বুঝতে আর্ট রিপোর্টার হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদন করে ইয়াশিনো। মানতেই হচ্ছে থিয়েটারের রিহার্সাল রুমে তদন্তে যেতে একটু অস্বস্তি লাগছে তার।

বেজমেন্টে নামার সিঁড়ি স্টিলের তৈরি। আওয়াজ সৃষ্টি হলো প্রত্যেক পদক্ষেপেই। যদি থিয়েটার কোম্পানির কাছে সাদাকো ইয়ামুরার ব্যাপারে কোনো তথ্য না থাকে, তবে আসাকাওয়ার সকল আশা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আবারও অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাবে ও।

উড্ডয়ন থিয়েটার গ্রুপ স্থাপিত হয় ১৯৫৭ তে। সাদাকো ইয়ামামুরা যোগদান করে ১৯৬৫ সালে। মাত্র চারজন ফাউন্ডিং মেম্বার এখনও এর সাথে জড়িত। একজনের নাম উচিমুরা। চিত্রনাট্যকার ও ডিরেক্টর। গ্রুপের মুখপাত্র সে।

একজন তরুণ ইন্টার্নকে নিজের কার্ড দেখিয়ে উচিমুরাকে ডেকে দেয়ার জন্য বলল ইয়াশিনো।

“ডেইলি নিউজ থেকে একজন আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে স্যার।” নাটকীয় ভঙ্গিমায় ডিরেক্টরকে বলল ইন্টার্ন। দেয়ালের কাছাকাছি বসে সবার পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করছিল ডিরেক্টর। অবাক হয়ে ঘুরে তাকাল উচিমুরা। প্রেস থেকে লোক এসেছে শোনার পর, হেসে ইয়াশিনোর দিকে তাকাল সে। প্রেস ও মিডিয়াকে সাদরে গ্রহণ করে থিয়েটার কোম্পানিগুলো। পত্রিকার শিল্প সংস্কৃতি পাতায় সামান্য একটা আর্টিকেল ও বাড়িয়ে দেয় ওদের টিকেট বিক্রি। শো উদ্বোধনের সপ্তাহখানেক আগে হয়তো রিহার্সেল দেখতে এসেছে রিপোর্টার, এমনটাই ভেবেছে সে। আগে কখনো ওদের কর্মকাণ্ডে নজর দেয়নি ডেইলি নিউজ। ফলে মনে মনে খুশিই হয়েছে উচিমুরা। সুযোগটার পুরোপুরি সদ্য ব্যবহার করতে চাইল সে। কিন্তু ইয়াশিনোর আসল উদ্দেশ্য জানতে পেরেই সকল কৌতূহল উবে গেল তার। হঠাৎ করেই ব্যস্ততা দেখাতে আরম্ভ করল উচিমুরা। হলের চারদিকে তাকাল সে। প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সী, ছোটখাটো গড়নের একজন অভিনেতাকে দেখতে পেয়ে খনখনে কণ্ঠে ডাকল, “শিন এদিকে।” হয়তো বয়স্ক অভিনেতাদের সাথে এভাবেই কথা বলে সে অথবা তার কণ্ঠস্বর-ই এরকম নারীসুলভ। উচিমুরার বকের মতো লম্বা হাত-পা দেখে অস্বস্তি লাগল পেশিবহুল ইয়াশিনোর। লোকটা অন্যরকম, ভাবল সে।

“শিন, দ্বিতীয় দৃশ্যের আগে তোমাকে দরকার নেই। এখানে এসে এই লোকটার সাথে একটু কথা বলো। সাদাকো ইয়ামামুরার ব্যাপারে। মনে আছে তোমার? ঐ যে অদ্ভুতুড়ে মেয়েটা।”

শিনের কণ্ঠস্বর আগেও শুনেছে ইয়াশিনো। বিদেশি ওয়েস্টার্ন মুভিগুলোতে জাপানি ভাষায় কণ্ঠ দেয় শিন। মঞ্চের থেকে ভয়েস অ্যাক্টর হিসেবেই বেশি পরিচিত শিন আরিমা। নাটকের দলের অন্যতম পুরানো সদস্য সে।

“সাদাকো ইয়ামামুরা?” টাক মাথা চুলকাল আরিমা। অর্ধ শতাব্দী আগের কোনো স্মৃতি হাতরাচ্ছে সে। “ওহ, ঐ সাদাকো ইয়ামামুরা।” মুখ বিকৃত করে বলল শিন আরিমা। মনে হলো যেন নামটা কোনো প্রভাব ফেলেছে তার ওপর।

“মনে আছে? তাহলে আমি রিহার্সাল করাই এখানে। তুমি উনাকে আমার রুমে নিয়ে গিয়ে বসো।”

হালকা বো করে স্টেজের অভিনেতাদের দিকে এগিয়ে গেল উচিমুরা। পূর্বের স্থানে পৌছেই আবারও পুরোদস্তুর ডিরেক্টর বনে গেল সে।

“প্রেসিডেন্ট’ সাইনবোর্ড টানানো একটা দরজা খুলে লেদারের সোফা দেখিয়ে আরিমা বলল, “ওখানে বসুন।”

এটা যদি প্রেসিডেন্টের অফিস হয়, তবে ধরে নিতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে চালিত হয় এই নাট্যদল। স্টেজের ঐ ডিরেক্টর-ই সিইও, এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

“তো এই ঝড়ের মধ্যে কী মনে করে?” রিহার্সেলের কারণে ঘামে ভিজে লাল হয়ে গিয়েছে আরিমার চেহারা। কিন্তু ধরে রেখেছে হাস্যোজ্জ্বল একটা ভাব। দেখে মনে হয়েছে, কথোপকথনের সময় অযথা প্রশ্ন করা ডিরেক্টরের অভ্যাস। কিন্তু আরিমা ঠিক উল্টো। উল্টো প্রশ্ন না করে সুন্দরভাবে জবাব দেবে আপনার সব প্রশ্নের। ইন্টারভিউ সহজ হবে নাকি কঠিন সেটা অনেকটা নির্ভর করে সাবজেক্টের ব্যক্তিত্বের ওপরেও।

“আপনার এত ব্যস্ততার মধ্যে আপনাকে বিরক্ত করতে হচ্ছে বলে সত্যিই দুঃখিত।” বসে নোটপ্যাডের দিকে তাকাল ইয়াশিনো। ডান হাতে কলম ধরা অবস্থায় তার ভঙ্গি ঠিক আছে বলেই মনে হলো।

“এই সময়ে এসে সাদাকো ইয়ামামুরার নাম শুনবো আশাই করিনি। বহুদিন আগের ঘটনা তো।”

তরুণ বয়সের স্মৃতি হাতড়াতে লাগল আরিমা। সত্যি ঐ সময়টা মিস করে সে। তখনকার দিনে বর্তমানের মতো বাণিজ্যিক নাট্যদল ছিল না। বন্ধুর সাথে মিলে নাট্যদল বানিয়েছিল সে।

“মিস্টার আরিমা, একটু আগে যখন তার নামটা উচ্চারণ করলেন তখন বললেন ‘ঐ সাদাকো ইয়ামামুরা।’ এর মানে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন?”

“ঐ মেয়েটার কথা আরকি- দাঁড়ান, আসলে বোঝাতে চেয়েছি তার দলে যোগ দেয়ার সময়ের কথা। আমরা তখন সবেমাত্র কয়েক বছর হল দল গঠন করেছি। কোম্পানিটা কেবল উঠে দাঁড়াতে আরম্ভ করেছে। কমবয়সী অনেকেই সেসময় যোগ দিতে চাইত। যাইহোক, সাদাকো ছিল অদ্ভুত।”

“কোন দিক থেকে অদ্ভুত ছিল সে?”

“হুমম।” চোয়ালে হাত রেখে কিছুক্ষণ ভাবল আরিমা। হয়তো ভাবছে কেন মেয়েটাকে তার অদ্ভুত মনে হতো।

“নির্দিষ্ট করে বলার মতো কিছু কি ছিল তার, এমন কিছুটা যা চোখে লাগে?”

“নাহ, এমনিতে তাকে দেখতে সাধারণ একটা মেয়ে বলেই মনে হতো। একটু লম্বা, কিন্তু শান্তশিষ্ট। সবসময় একা থাকত সে।”

“একা?”

“ইন্টার্নরা সাধারণত একে অপরের বেশ ক্লোজ হয়ে থাকে। কিন্তু সে কখনো অন্যদের সাথে মিশত না।”

প্রত্যেক গ্রুপেই এরকম কেউ না কেউ থাকে। একা থাকার কারণেই সে অদ্ভুত, এমনটা ভাবা কঠিন।

“বলতে গেলে, এককথায় তাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?”

“এককথায়? উমমম। ভুতুড়ে। এমনটাই বলতে হবে।” কোনো ইতস্তত না করেই তাকে ‘ভুতুড়ে’ আখ্যা দিল সে। আর উচিমুরা বলেছিল ‘অদ্ভুতুড়ে’। আঠারো বছর বয়সী একটা মেয়েকে সবাই এভাবে আখ্যা দিচ্ছে ভেবে খারাপ লাগল ইয়াশিনোর। মেয়েটার অদ্ভুতুড়ে অবয়ব ভাসতে শুরু করল তার কল্পনায়।

“কী এমন দেখে তাকে আপনার ভুতুড়ে মনে হয়েছিল?”

কয়েক মুহূর্ত ধরে ভাবতে লাগল আরিমা। সাধারণ কোনো ইন্টার্ন-এর স্মৃতি বড়জোর এক বছরের মধ্যেই মুছে যাওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘ পঁচিশ বছর পরও কারো কথা মনে থাকা মানে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। কোনো কিছু একটা খোঁচাচ্ছে আরিমার মনের ভেতরে। কোনো কিছু নিশ্চিত ঘটেছিল, এমন কোনো কিছু যা নামটা মনে রাখতে বাধ্য করেছে ওদেরকে।

“ওহ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। এই ঘরেই ঘটেছিল ঘটনাটা।” ঘরের চারদিকে তাকাল আরিমা। ঘটনাটা একেবারে স্পষ্ট মনে পড়েছে তার। এমনকি মনে হলো, সেই সময় এই ঘরের ফার্নিচার কীভাবে সাজানো ছিল সেটাও মনে করতে পারছে সে।

“দেখুন, একেবারে শুরু থেকেই আমরা এই জায়গাতেই রিহার্সাল করি। তবে তখন জায়গাটা ছোট ছিল। এই ঘরটা তখনও মেইন অফিস হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। ওখানে লকার ছিল, আর ঠিক এইখানে ছিল একটা গ্লাস ডিভাইডার। আর সেখানে থাকত একটা টিভি। এখন অবশ্য অন্য একটা নেয়া হয়েছে।” বিভিন্ন দিক আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলতে থাকল আরিমা।

“টিভি?” চোখ সরু করে বলল ইয়াশিনো। পেনটা ঠিক মতন ধরল সে।

“হ্যাঁ, পুরানো সাদা কালো টিভি।”

“আচ্ছা। তো কী ঘটেছিল?” বলার জন্য তাকে তাড়া দিল ইয়াশিনো ১ “তখন কেবলই রিহার্সেল শেষ হয়েছে। সবাই বাড়ি চলে গিয়েছিল। আমার বলা সংলাপ নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলাম না আমি। এজন্য এখানে এসে পার্টটা নিজে নিজেই আরেকবার করতে চাচ্ছিলাম। ওখানে গিয়ে দেখি…” দরজার দিকে দেখিয়ে বলল আরিমা। “আমি ওখানে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতরকার গ্লাসের ভিতর দিয়ে দেখলাম টিভি স্ক্রিনে আলো জ্বলছে। ভাবলাম, কেউ হয়তো টিভি দেখছে। বলে রাখি, ভুল ভেবেছিলাম না কিন্তু। ডিভাইডারের অপর প্রান্ত থেকে দেখছিলাম বলে টিভিতে কী চলছিল সেটা বুঝতে পারিনি। কিন্তু সাদা কালো লাইট ক্রমাগত জ্বলতে দেখছিলাম টিভি স্ক্রিনে। কোনো সাউন্ড ছিল না। রুমটাতে ডিমলাইট জ্বলছিল শুধু। আমি ডিভাইডার পেরিয়ে ওপারে গেলাম। ভাবছিলাম টিভির ওখানে কে। চেহারাটা দেখতে চাচ্ছিলাম আরকি। টিভির সামনে ছিল সাদাকো ইয়ামামুরা। কিন্তু আমি যখন ডিভাইডার পেরিয়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, কিছুই দেখতে পেলাম না স্ক্রিনে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, টিভি বন্ধ করে দিয়েছে সে। অন্তত সেই মুহূর্তে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিল না আমার। কিন্তু…”

কথা চালিয়ে যেতে অনিচ্ছুক দেখাল আরিমাকে।

“প্লিজ, বলতে থাকুন।“

“আমি তার সাথে কথা বললাম। তাকে বললাম, ‘ট্রেন বন্ধ হওয়ার আগেই বাড়ি ফেরা উচিত তোমার।’ এরপর ডেস্কল্যাম্প জ্বালাতে চাইলাম। কিন্তু জ্বলল না সেটা। তাকিয়ে দেখলাম, প্লাগ দেয়া হয়নি। প্লাগ দেয়ার জন্য নিচু হয়ে দেখলাম টেলিভিশনেও প্লাগ দেয়া নেই।”

স্মৃতিটা মনে করে যেন এইমুহূর্তে শীতল স্রোত বয়ে গেল আরিমার মেরুদণ্ড দিয়ে। সেসময় মেঝেতে প্লাগটা পড়ে থাকতে দেখে যেমনটা অনুভূত হয়েছিল ঠিক ওরকম।

এইমুহূর্তে যা শুনল সেটা নিশ্চিত হতে চাচ্ছে ইয়াশিনো।

“তাহলে প্লাগ না দেয়া সত্ত্বেও টিভিটা চলছিল?”

“ঠিক। আপনাকে বলেই ফেলি, এটা দেখেই কেঁপে উঠেছিলাম। কিছু না ভেবেই মাথা উঁচু করে সাদাকোর দিকে তাকালাম আমি। আনপ্লাগড় টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে কী করছে সে? তখন আমার চোখের দিকে না তাকিয়ে স্থির দৃষ্টিতে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। ঠোঁটে ঝুলছিল সামান্য হাসি।”

মনে হলো সেদিনকার ক্ষুদ্রতম ডিটেইলও মনে আছে আরিমার। ঘটনাটা নিশ্চিত বেশ বড় রকমের প্রভাব ফেলেছিল তার মনে।

“কাউকে এই ঘটনা জানিয়েছিলেন আপনি?”

“অবশ্যই। উচি, মানে উচিমুরাকে জানিয়েছিলাম এটা। মানে ডিরেক্টর, যার সাথে একটু আগে দেখা হয়েছে আপনার। শিগেমোরিকেও বলেছিলাম।”

“মিস্টার শিগেমোরি?”

“সে-ই এখানকার আসল প্রতিষ্ঠাতা। উচিমুরা আসলে আমাদের দ্বিতীয় লিডার।”

“ওহ। তো মিস্টার শিগেমোরির প্রতিক্রিয়া কী ছিল আপনার ঘটনা শুনে?”

সে তখন মাহ-জং নাটকটা নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু শোনার পর অভিভূত হয়েছিল। সে সবসময়ই নারীদের প্রতি দুর্বল ছিল। সম্ভবত সাদাকোর ওপরও নজর ছিল তার। তাকে নিজের করে নেয়ার প্ল্যানও ছিল সম্ভবত। এরপর ঐ সন্ধ্যায়, কিছু কথাবার্তার পর সে জানায়, ‘আজ রাতে সাদাকোর অ্যাপার্টমেন্টে ঝড় তুলবো।’ কী করবো বুঝতে পারছিলাম না আমরা। মাতাল অবস্থায় ছিল সে। অতটা গুরুত্বও দিইনি তার কথার। আবার ফেলেও দিতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর সবাই বাড়ি ফিরে যায়। একা ছিল শিগেমোরি। কিন্তু ঐ রাতে সত্যি সে সাদাকোর অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিল কিনা জানা নেই আমাদের। কারণ পরেরদিন রিহার্সেলে শিগামোরিকে দেখে একজন সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তি মনে হচ্ছিল। ফ্যাকাশে আর নীরব হয়ে গিয়েছিল সে। চেয়ারে বসে একটা কথাও উচ্চারণ করেনি।

ওখানে বসেই মারা যায় সে, ঘুমিয়ে পড়ার মতো করে।”

চমকে উঠে তার দিকে তাকাল ইয়াশিনো, “মৃত্যুর কারণ কী ছিল?”

“কার্ডিয়াক প্যারালাইসিস। আজকালকার দিনে যেটাকে ‘হঠাৎ হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু’ বলা হয়। প্রিমিয়ারের জন্য কঠোর পরিশ্রম করছিল সে। মনে হয় চাপ আর নিতে পারেনি সে।”

“তাহলে সাদাকো আর শিগেমোরির মধ্যে কিছু হয়েছিল কিনা সেটা কেউ জানে না?”

নড করল আরিমা। ধরতে পেরেছে ইয়াশিনো।

“এরপর কী হলো সাদাকোর?”

“ইস্তফা দেয় সে। সম্ভবত এক থেকে দুই বছর ছিল সে এখানে।“

“এরপর সে কী করল, মানে ইস্তফা দেয়ার পরে?”

“সম্ভবত এই ব্যাপারে আপনাকে আর সাহায্য করতে পারব না আমি।”

“নাট্যদল ছাড়ার পর বেশিরভাগ মানুষ কী করে?”

“যারা সত্যিই অন্তপ্রাণ ওরা অন্য কোনো দলে যোগ দেয়ার চেষ্টা চালায়।”

“আপনার কী মনে হয়? সাদাকো ইয়ামামুরাও একই কাজ করেছে?”

“প্রতিভাবান একজন মেয়ে ছিল সে। অভিনয় দক্ষতাও খারাপ ছিল না তার। কিন্তু তার ব্যক্তিত্বে সামান্য খুঁত ছিল। মানে বলতে চাচ্ছি, এই কাজে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক বড় একটা ব্যাপার। আমার মনে হয় না এটার সাথে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা ছিল তার।”

“তাহলে বলতে চাচ্ছেন সে চিরতরে-ই থিয়েটারের দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে?”

“আসলে এমনটাও বলতে চাইনি।”

“এমন কেউ রয়েছে যে জানে কী হয়েছে সাদাকো ইয়ামামুরার?”

“সম্ভবত তার মতন আরেকজন ইন্টার্ন ছিল সেসময়।”

“তার নাম ঠিকানা আছে আপনার কাছে?”

“একটু দাঁড়ান,” উঠে দাঁড়িয়ে দেয়ালের সাথে লাগানো শেলফের কাছে গেল আরিমা। শেলফের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বাঁধাই করা ফাইল রাখা। একটা ফাইল বের করল সে। ফাইলে রাখা আছে আবেদনকারীদের পোর্টফোলিও। থিয়েটারে ভর্তিপরীক্ষা দেয়ার আগে ওগুলো জমা দিতে হয় প্রার্থীদের।

“সাদাকো সহ ১৯৬৫ সালে আটজন ইন্টার্ন যোগ দেয় এখানে।” সবার পোর্টফোলিও বাতাসে দোলাল সে।

“দেখতে পারি ওগুলো?”

“হ্যাঁ, দেখুন।”

প্রত্যেকটা পোর্টফোলিওতে দুটো করে ছবি সংযুক্ত। একটা ছবিতে পুরো বডি আরেকটাতে শুধু মাথা। সাদাকো ইয়ামামুরার পোর্টফোলিও বের করল ইয়াশিনো। তার ছবির দিকে তাকাল সে।

“আপনি কিছুক্ষণ আগে না বললেন মেয়েটা ভুতুড়ে?” সংশয়ে পড়ে গেছে ইয়াশিনো। আরিমার ব্যাখ্যা শুনে সাদাকোর চেহারা যা কল্পনা করেছিল আর ছবিতে যা দেখছে, দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। “ভুতুড়ে? মজা করলেন নাকি আমার সাথে? এত সুন্দর চেহারা জীবনেও দেখিনি আমি।”

কেন ‘এত সুন্দর চেহারা’ বাক্যংশ উচ্চারণ করল সেটা ভাবছে ইয়াশিনো। বলতে গেলে সাদাকোর চেহারার বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক-ই। কিন্তু নারীসুলভ গোলগাল ভাবটা তার মধ্যে নেই। কিন্তু পুরো দেহের ছবিটা দেখে বুঝল, সাদাকোর কোমর আর গোড়ালি পুরোপুরি নারীসুলভ। সুন্দরী ছিল সে, আর এখন, পঁচিশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও তাকে ‘ভুতুড়ে’ অথবা ‘অদ্ভুতুড়ে’ হিসেবে স্মৃতিতে ধরে রেখেছে এরা। অথচ এদের মনে রাখা উচিত ছিল, ‘ঐ সুন্দরী মেয়েটা’ হিসেবে।

“অদ্ভুতুড়ে’ শব্দটা সাদাকোর সুশ্রী মুখাবয়বকে আড়াল করে দিয়েছে, এটা ভাবতেই আলাদা একধরনের কৌতূহল জেগে উঠল ইয়াশিনোর মাঝে।

অধ্যায় নয়

১৭ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার

ওমতেসানদো আর আয়মাদরি রোডের ইন্টারসেকশনে দাঁড়িয়ে আবারও নিজের নোটবুক বের করল ইয়াশিনো। ৬-১, মিনামি আয়োমা, সুগিয়ামা লজিং। পঁচিশ বছর পূর্বে এটাই ছিল সাদাকোর ঠিকানা। ঠিকানাটা দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে সে। ঠিকানা অনুসরণ করেই ওমতেসানদোতে মোড় নিয়েছে ইয়াশিনো। নিশ্চিতভাবেই ৬-১ হচ্ছে নেযু মিউজিয়ামের বিপরীত পার্শ্বে অবস্থিত। শহরের অন্যতম অভিজাত মার্কেট ওদিকেই। যেমনটা ভেবেছিল, ঠিক সেরকমই, লাল ইটের তৈরি একটা কন্ডো-ই হচ্ছে সুগিয়ামা লজিং।

ইয়ার্কি পেয়েছো নাকি? কীভাবে ভাবলে পঁচিশ বছর পর এসেও ঐ মহিলার ট্র্যাক পাবে? নিজেকেই জিজ্ঞেস করল সে।

তার একমাত্র আশা হচ্ছে আরেকজন মহিলা, যে ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দিয়েছিল সাদাকোর সাথে। যে সাতজন ঐ বছর থিয়েটারে যোগ দিয়েছে, তাদের মধ্যে মাত্র চারজনের যোগাযোগের ঠিকানা বের করতে পেরেছে ইয়াশিনো। যদি এদের মধ্যে কেউই সাদাকোর ব্যাপারে না জেনে থাকে, তবে মাঠেই মারা যাবে ট্রেইলটা। আর এমনটাই ঘটবে বলে মনে হচ্ছে ইয়াশিনোর। ঘড়ির দিকে তাকাল সে। সকাল এগারোটা বাজে। নিকটবর্তী স্টেশনারি শপে ইজু ওশিমা ব্যুরোয় ফ্যাক্স করার জন্য নেমেছে সে। এতক্ষণ পর্যন্ত যা জানতে পেরেছে, সবকিছু আসাকাওয়াকে জানানোর প্রয়োজনবোধ করেছে ইয়াশিনো। ঠিক এইসময় ব্যুরোতে-ই রয়েছে রুজি আর আসাকাওয়া। ব্যুরো বলতে হায়াৎসুর বাড়ি।

“আরে আসাকাওয়া, শান্ত হও তো।” চিৎকার করে বলল রুজি। ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে সে। “উদ্বিগ্ন হয়ে কোনো লাভ নাই ভাই, বুঝতেই পারছো।”

ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ সংকেত ভেসে আসছে রেডিও থেকে: বাতাসের বেগ থাকবে সর্বোচ্চ, সেইসাথে বাতাসে উচ্চচাপ লক্ষ করা যাবে। উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিক থেকে বইবে ঝড়ো হাওয়া, সেইসাথে প্রবলবেগে বৃষ্টি।

আবহাওয়া বার্তা শুনে আরও বিগড়ে গেল আসাকাওয়ার মাথা। এইমুহূর্তে ঘূর্ণিঝড় ২১ অবস্থান করছে কেপ ওমেজাকি থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে সাগরের কেন্দ্রে। প্রায় ঘণ্টায় বিশ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসছে উত্তর-উত্তরপূর্ব দিক বরাবর। প্রতি সেকেন্ডে চল্লিশ মিটার বেগে। এই গতিতে ধেয়ে আসলে সন্ধ্যা নাগাদ ওশিমার দক্ষিণে আঘাত হানবে এই ঘূর্ণিঝড়। খুব বেশি হলে আগামীকাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে, উড়োজাহাজ ও নৌ চলাচল বন্ধ হওয়ার আগেই। অন্তত এমনই ধারণা হায়াৎসুর।

“সে বলছে, বৃহস্পতিবার!” উত্তেজিত হয়ে উঠেছে আসাকাওয়া।

আমার ডেডলাইন আগামীকাল রাত দশটা। বালের ঘূর্ণিঝড়! তাড়াতাড়ি বয়ে যা, অথবা পুরা দুনিয়া লণ্ডভণ্ড করে ফেল, মনে মনে ভাবল আসাকাওয়া।

“কখনো প্লেন বা বোট ধরে এই আইল্যান্ড থেকে বেরোতে পারবো কে জানে!” কারও ওপর নিজের মেজাজ দেখাতে ইচ্ছা হচ্ছে আসাকাওয়ার। কিন্তু জানেনা কার ওপর দেখাবে মেজাজ।

এখানে আমার আসা উচিত-ই হয়নি। সারাজীবন আফসোস করতে হবে। এমনকি এটাও জানিনা কোথায় থেকে আফসোস করা আরম্ভ করব। আমার ভিডিওটা দেখাই উচিত ছিল না, তোমাকো ওশি আর সুইশি আইওয়াতার ব্যাপারে মাথা ঘামানোও উচিত হয়নি। বড় কথা, কেন যে ঐদিন ক্যাবে চড়তে গেলাম…বাল আমার, মনে মনে গালি দিল আসাকাওয়া।

“কীভাবে শান্ত থাকা লাগে জানোনা নাকি? মিস্টার হায়াৎসুকে দোষ দিয়ে কী লাভ?” অপ্রত্যাশিতভাবে, ভদ্রতার সাথে আসাকাওয়ার বাহুতে হাত রাখল রুজি। “হয়তো ভিডিওর ধাঁধার সমাধান শুধুমাত্র এই আইল্যান্ডে-ই করা সম্ভব, এভাবে ভাবো ব্যাপারটা। সূক্ষ্ম হলেও এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ঐ পোলাপাইন সমাধান করার চেষ্টা করেনি কেন? হয়তো ওদের কাছে ওশিমা আসার মতো পয়সা ছিল না। এটাও কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য। ঐ কালো মেঘের আড়ালেই হয়তো লুকিয়ে আছে ভালো কিছুর আভাস। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করো এই কথাটা, দেখবে একটু হলেও শান্ত লাগবে।”

“শুধুমাত্র সমাধানটা বের করতে পারলেই শান্তি আসবে!” রুজির হাত সরিয়ে বলল আসাকাওয়া। হায়াৎসু আর তার স্ত্রী ফুমিকোকে দৃষ্টি বিনিময় হতে দেখল আসাকাওয়া। কেন যেন ওর মনে হলো হাসছে ওরা।

দুজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক ছুটছে ধাঁধার সমাধানের পেছনে।

“এতে হাসির কী আছে?” ওদের দিকে তেড়ে যেতে লেগেছিল আসাকাওয়া। কোনোমতে তাকে আটকাল রুজি। আগের থেকেও শক্ত করে ওর বাহু আঁকড়ে টেনে ধরেছে সে।

“ছেড়ে দাও। নিজের এনার্জি নষ্ট করছো তুমি।”

আসাকাওয়ার বিরক্তি দেখে ঘূর্ণিঝড়ের জন্য ট্রান্সপোর্ট বন্ধ হওয়ার কথা ভেবে খারাপ লাগল হায়াৎসুর। অথবা সম্ভবত খারাপ আবহাওয়ার কারণে দুজন ব্যক্তির ভুগতে হচ্ছে দেখে সমব্যথী হলো সে। আসাকাওয়ার প্রজেক্টের সফলতা কামনা করল হায়াৎসু। টোকিও থেকে একটা ফ্যাক্স আসার কথা। কিন্তু অপেক্ষা বাড়ার সাথে উদ্বিগ্নতাও বাড়ছে আসাকাওয়ার। পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করল হায়াৎসু।

“সামনে কী ব্যাপারে তদন্ত করে দেখবেন?”

“আসলে…

“কাছাকাছি-ই শিযুকু ইয়ামামুরার ছোটবেলার এক বন্ধু থাকে। আপনারা চাইলে তাকে ডেকে আনব। দেখেন কী বলে সে। আশা করি এই দুর্যোগে মাছ ধরতে বেরোয়নি ঐ বৃদ্ধ। ঘরে হুদাই বসে আছে হয়তো। এসে আপনাদের সাথে আলাপ করতে সমস্যা হওয়ার কথা না তার।”

আসাকাওয়াকে এই মুহূর্তে কিছুতে ব্যস্ত রাখলে ওর ভাবনা কমবে, ভাবল হায়াৎসু। “তার বয়স সত্তুরের মতো। জানিনা কতটা ভালোভাবে আপনাদের প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে সে। তবে অপেক্ষা করার থেকে কিছু করা অন্তত ভালো।”

“ঠিক আছে…

পুরোপুরি জবাবের অপেক্ষায় না থেকেই রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে ডাকল হায়াৎসু: “শুনছো, জেনের বাড়িতে খবর দাও। তাকে এখানে আসতে বলো।”

যেমনটা হায়াৎসু বলেছিল, ওদের সাথে কথা বলে খুশিই হয়েছে জেঞ্জি। মনে হলো শিযুকু ইয়ামামুরাকে নিয়ে আলাপের চেয়ে আনন্দের কিছু নেই তার জন্য। তার বয়স আটষট্টি বছর, শিযুকুর থেকে তিন বছর বেশি। শিযুকুর ছোটবেলার খেলার সাথী ছিল সে, প্রথম ভালোবাসাও। এই বিষয়ে কথা বলার সময় মনে হলো হয়তো এখনও তার স্মৃতি স্পষ্ট অথবা শোনানোর মতো দর্শক পেয়ে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে তার মাঝে। জেঞ্জির ক্ষেত্রে, শিযুকুকে নিয়ে কথা বলা মানে নিজের শৈশব নিয়ে কথা বলা।

তার অসংলগ্ন কথাবার্তা থেকে খুব কমই জানতে পারল রুজি আর আসাকাওয়া। বেশিরভাগ-ই শিযুকুকে নিয়ে আবেগী কথাবার্তা। কিন্তু এই বৃদ্ধের কথায় ভরসা করা ছাড়া উপায়ও নেই ওদের। জীবনের সুন্দর ব্যাপারগুলোর ওপর স্মৃতি সবসময়ই দায়বদ্ধ। আর বৃদ্ধের এসব স্মৃতি চল্লিশ বছরের পুরনো। হয়তো অন্য কারো সাথে শিযুকুকে গুলিয়েও ফেলতে পারে সে। যাইহোক, প্রথম প্রেম স্পেশাল নাও হতে পারে কারোর জন্য। তাই বলে একজনের সাথে অপরজনকে গুলিয়ে ফেলার কথা নয়।

.

অতটা বাকপটুও নয় জেঞ্জি। বেশ কয়েকবার সংশয়পূর্ণ অভিব্যক্তিও প্রকাশ করল সে। দ্রুতই তার কথা শুনে ক্লান্ত হয়ে পড়ল আসাকাওয়া। কিন্তু এরপর জেঞ্জি এমন একটা কথা বলল, যা শুনে নড়েচড়ে বসল রুজি ও আসাকাওয়া।

“সম্ভবত একটা ব্যাপার বদলে দিয়েছিল শিযুকুকে। পাথরের একটা যোগী মূর্তি। যেটা আমরা সমুদ্র থেকে পেয়েছিলাম। পূর্ণিমা ছিল ঐ রাতে…” বৃদ্ধের মতে, শিযুকুর ক্ষমতার উৎস কোনো না কোনোভাবে সমুদ্র আর পূর্ণিমার সাথে সম্পৃক্ত। আর যে রাতে এটা ঘটেছিল, সেসময় জেঞ্জি ছিল তার পাশে। নৌকা বইছিল সে। ১৯৪৬ সালের দিককার কথা। গ্রীষ্মের শেষের দিকে। তখন শিযুকুর বয়স ছিল একুশ আর জেঞ্জির চব্বিশ।

প্রচুর গরম পড়েছিল সেবার। এমনকি স্বস্তি পাওয়া যেত না রাতের বেলাও। চুয়াল্লিশ বছর আগেকার কথা বলছে জেঞ্জি। কিন্তু কথা বলার ধরন শুনে মনে হচ্ছে গতরাতের ঘটনা।

ভ্যাপসা গরমের সন্ধ্যায়, নিজের বোটের ফ্রন্ট পোর্চে বসে হাওয়া খাচ্ছিল জেঞ্জি। আকাশের পূর্ণিমার চাঁদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল সমুদ্রের পানিতে। বাড়ি থেকে দৌড়ে এসে এই নীরবতা ভেঙেছিল শিযুকু। জেঞ্জির সামনে দাঁড়িয়ে, তার বাহু ঝাঁকিয়ে বলে উঠেছিল সে: “জেন নৌকা রেডি করো। চলো মাছ ধরবো আজকে।” এখন কেন, জিজ্ঞেস করেছিল জেঞ্জি। শিযুকু শুধু বলেছিল, “এরকম চাঁদনি আরেকটা পাবো না কোনোদিন।” সম্মোহিতের মতো বসে থেকে কথাটা শুনেছিল জেঞ্জি। আর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল আইল্যান্ডের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটার দিকে।

“বোকার মতো তাকিয়ে না থেকে, দ্রুত করো।” উঠে না দাঁড়ানো পর্যন্ত জেঞ্জির কলার ধরে টানাটানি করল শিযুকু। শিযুকুর জোরাজুরি ও মন রাখতে ভালোমতোই অভ্যস্ত ছিল জেঞ্জি, কোনোমতে বলল সে, “এই সময়ে কী ধরতে যাবো?”

সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে শান্তস্বরে বলেছিল শিযুকু, “যোগীর মূর্তি।”

ভ্রু কুঁচকে আর আফসোসের সাথে সেদিন সকালেই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছিল শিযুকু। কিছু সামরিক সৈন্য পাথরের নির্মিত যোগীর মূর্তি ছুড়ে ফেলেছে সাগরে।

আইল্যান্ডের মাঝামাঝি, পূর্বে দিকে রয়েছে একটা বিচ। যা যোগী বিচ নামে পরিচিত। ওখানকার একটা খাদ’কে বলা হয় যোগীর গুহা। ওখানেই ছিল একটা পাথরের মূর্তি। নাম ‘এন নো ওজোনো, বিখ্যাত বুদ্ধ যোগীর মূর্তি। ৬৯৯ খ্রিষ্টাব্দে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এটাকে। ব্যাপক প্রজ্ঞা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল ওজোনো। দীর্ঘদিনের নিয়মতান্ত্রিক চর্চার ফলে অকাল্ট আর গুপ্তচর্চায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বলা হয়ে থাকে, নিজ ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে ঈশ্বর ও শয়তানকে আহবান করতে পারতেন তিনি। কিন্তু ওজোনো শক্তিশালী ভবিষ্যৎবাণীর ক্ষমতার কারণে দুনিয়া জুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল তার শত্রু। ফলাফল অপরাধী হিসেবে আখ্যা পেতে হয় ওজোনোকে। সমাজ ও জাতির শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়ে ইজু ওশিমায় নিষিদ্ধ করা হয় তাকে। এটা প্রায় তেরোশ বছর আগেকার ঘটনা। নিষিদ্ধ হওয়ার পর একটি ছোট্ট গুহায় স্বনির্বাসনে যায় ওজোনো। শুরু করে আরও কঠোর নিয়মতান্ত্রিক সাধনা। ওখানকার মানুষদের মাছ ধরা ও ফসল ফলানো শিখিয়েছিলেন তিনি। ফলে ঐ অঞ্চলের মানুষের যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা আদায় করতে সক্ষম হন ওজোনো।

অবশেষে তাকে ক্ষমা করে আবারও অনুমতি দেয়া হয় মেইনল্যান্ডে ফেরার। ফিরে এসে তিনি ‘সুগেনদো সন্ন্যাসী ঐতিহ্য’ নামক সংস্থা গঠন করেন। তিন বছর আইল্যান্ডে কাটানোর জন্য মনস্থির করেন তিনি। কিন্তু কথিত আছে অথবা কিংবদন্তি অনুযায়ী বলা হয়ে থাকে এক লোহার খড়মের সাহায্য উড়ে মাউন্ট ফুজিতে চলে যান তিনি। এখনও এন নো ওজোনোকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে দ্বীপবাসী। এমনকি যোগীর ঐ গুহাকেও পবিত্র স্থানের মর্যাদা দেয়া হয়। যোগী উৎসব নামক একটা বিশেষ দিন পালিত হয়ে থাকে প্রত্যেক বছরের ১৫ জুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিনতো ও বুদ্ধ ধর্মের নীতি অনুযায়ী এন নো ওজোনোর মূর্তি গুহা থেকে বের করে ছুড়ে ফেলে সাগরে। ঘটনাক্রমে ওজোনোর একনিষ্ঠ ভক্ত শিযুকুর নজরে পড়ে সেটা। একটা বৃহৎ পাথরের আড়ালে সাবধানে লুকিয়ে আমেরিকান প্যাট্রোল বোট থেকে মূর্তিটি ছুড়ে ফেলতে দেখে সে। ঠিক কোথায় ফেলা হয়েছে সেটা ভালোমতন খেয়াল করে শিযুকু।

ওরা এখন যোগীর মূর্তির সন্ধানে নৌকা নিয়ে বেরুবে, এটা শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনি জেঞ্জি। নিঃসন্দেহে ভালো জেলে সে। পেশিবহুল। কিন্তু ভারী পাথরের মূর্তি টেনে তোলার কথা কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু কোনোভাবেই শিযুকুকে হতাশ করতে চায় না সে। নৌকা ভাসায় জেঞ্জি। ভাবে শিযুকুকে তার প্রতি ঋণী করার এটাই সুযোগ। আর সত্যি বলতে, চাঁদনি রাতে, নৌকায় শুধু ওরা দুজন, দুনিয়াতে এর থেকে সুন্দর কিছু আর হয় না।

যোগী বিচে আগুন ধরিয়েছিল ওরা। দিকনির্দেশক হিসেবে। এরপর এগিয়ে যেতে থাকল গভীর সাগরের দিকে। সাগরের পরিবেশ, গভীরতা, কোথায় কোন মাছ পাওয়া যায় এসব ব্যাপারে অবগত ছিল দুজনই। কিন্তু তখন ছিল রাত। আর চাঁদ যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, সমুদ্রের পানির উপরিভাগ ছাড়া আশপাশে কোথাও ছিল না এর আলো। কীভাবে শিযুকু মূর্তিটি খুঁজে পাবে, জানা ছিল না জেঞ্জির। দাঁড় টানার সময় জিজ্ঞেস করেছিল সে। কিন্তু কোনো জবাব দেয়নি শিযুকু। চুপ থেকে বিচের আগুনের দিকে একবার তাকিয়ে নিজেদের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করল শুধু। বিচের জ্বলন্ত আগুনের দিকে দেখলে সহজেই সাগরের মাঝে যেকেউ নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাবে। সেইসাথে দূরত্বও আন্দাজ করা সম্ভব। প্রায় কয়েকশ মিটার দূরত্বে এসে চিৎকার করে উঠল শিকু, “থামো এখানে।

দৌড়ে বোটের স্টার্নের কাছে গিয়ে, ঝুঁকে সমুদ্রের কালো পানিতে চোখ বুলাতে লাগল শিযুকু। “অন্যপাশে গিয়ে দেখো।” জেঞ্জিকে আদেশ করল সে। জেঞ্জি ধারণা করতে পারল কী করতে চলেছে শিযুকু। বুক কেঁপে উঠল তার। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরনের কিমোনো খুলে ফেলল শিযুকু। শরীর থেকে পোশাক খুলে ফেলার শব্দে হুঁশ ফেরে জেঞ্জির। যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছে সে। তখনই শুনতে পেল পানিতে ঝাঁপ দেয়ার শব্দ। পানির ঝাঁপটা কাঁধে এসে লাগতেই ঘুরে তাকায় সে। দেখতে পায় সাগরের পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে শিযুকু। তার লম্বা চুল ন্যাকড়া দিয়ে বাঁধা, দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছে দড়ির একটা প্রান্ত। কোনোমতে দুইবার বড় নিশ্বাস নিয়ে পানির গভীরে ডাইভ দিল সে।

কতবার পানির তলা থেকে মাথা উঁচিয়ে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করেছিল শিযুকু? শেষবার যখন শ্বাস নিতে মাথা তুলেছিল, তখন দাঁতের সাথে দড়ি কামড়ে রেখেছিল না সে। “দড়ি দ্রুত মূর্তির সাথে বেঁধে ফেলেছি। এগিয়ে এসে টানতে থাক।” কাঁপা কাঁপা স্বরে বলেছিল সে।

বোটের প্রান্তে গিয়ে শরীর বাঁকিয়ে দড়ি ধরে টানছিল জেন। মুহূর্তের মধ্যেই উঠে এসে কিমোনো পরে নিয়েছিল শিযুকু। এরপর মূর্তিটা উঠাতে হাত লাগিয়েছিল জেঞ্জির সাথে। মূর্তিটা ওঠানোর পর সেটা নৌকার মাঝামাঝি রেখেছিল ওরা। তারপর রওয়ানা দিয়েছিল তীরের উদ্দেশ্যে। ফেরার পথে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি কেউ। নৌকার পরিবেশে এমন কিছু ছিল, যা ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সকল জিজ্ঞাসা। কীভাবে শিযুকু অন্ধকারের মধ্যেও সাগরের গভীর জলে মূর্তির অবস্থান চিহ্নিত করতে পেরেছিল সেটা রহস্য-ই বটে। ঘটনার তিনদিন পরে শিযুকুকে জিজ্ঞেস করতে পেরেছিল জেঞ্জি। শিযুকু জবাবে বলেছিল, যোগীর চোখের আলো সাগর তলায় পথ দেখিয়েছে ওকে। যোগী মূর্তির সবুজাভ দৃষ্টি। যে কিনা ঈশ্বর ও শয়তান উভয়েরই আহ্বানকারী। সাগরের গভীরে জ্বলজ্বল করছিল মূর্তিটির দৃষ্টি…এমনটাই বলেছিল শিযুকু। এরপর শারীরিক অস্বস্তিবোধ করতে শুরু করে শিযুকু। এর আগে সামান্য মাথাব্যথাও করত না তার। কিন্তু এই ঘটনার পর। প্রায়ই অসহ্য রকমের মাথা যন্ত্রণা করত। সেইসাথে কল্পনায় এমন সব জিনিস ভেসে উঠত যা আগে কখনোই দেখেনি সে। আর যেসব দৃশ্য তার কল্পনায় ভেসে উঠত, সেসব দ্রুতই রূপ নিত বাস্তবে। কয়েকটা ব্যাপারে তার কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিল জেঞ্জি। ভবিষ্যতের এসব দৃশ্য কল্পনায় ভেসে ওঠার সাথে সম্ভবত একধরনের সুগন্ধ অনুভব করত শিযুকু। বিয়ের পর মেইনল্যান্ডের ওদাওয়ারা-ই চলে গিয়েছিল জেঞ্জির বড়বোন। সেখানেই মৃত্যুবরণ করে সে। কিন্তু তার মৃত্যুর আগেই, সেই দৃশ্য ভেসে উঠেছিল শিযুকুর কল্পনায়। ব্যাপারটা এমন নয় যে, সচেতন অবস্থায় ভবিষ্যৎবাণী করতে পারত সে। কোনো সংযোগ বা লক্ষণ ছাড়াই, অবচেতন মনে, হুটহাট দৃশ্যগুলো ভেসে উঠত তার কল্পনায়। একারণে কখনো কেউ শিযুকুর কাছে ভবিষ্যৎবাণী শুনতে চাইলে ফিরিয়ে দিত তাকে। পরের বছর টোকিওতে চলে যায় শিযুকু। যদিও যেতে বাঁধা দিয়েছিল জেঞ্জি। তবে লাভ হয়নি। টোকিওতে হিহাচিরো ইকুমার সাথে পরিচয় হয় শিযুকুর। ইকুমার সন্তান গর্ভে ধারণ করে সে। এরপর ঐ বছরের শেষে আবার নিজ শহরে ফিরে এসে মেয়ে সন্তান জন্ম দেয় শিযুকু। নাম রাখে সাদাকো।

জেঞ্জির কাহিনি কখন শেষ হবে জানা নেই ওদের। এই ঘটনার দশবছর পর মাউন্ট মিহারায় ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করে শিযুকু। আর জেঞ্জি যেভাবে ঘটনাটা বলল, মনে হলো এর জন্য ইকুমাকে দায়ী করে সে। যেহেতু প্রেমে জেঞ্জির প্রতিদ্বন্দ্বী ইকুমা, সেহেতু তার এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক। কিন্তু জেঞ্জির এই অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত আর থাকেনি।

যাইহোক, জেঞ্জির গল্প থেকে যা জানা গেল, ভবিষ্যৎবাণীর ক্ষমতা ছিল সাদাকোর মা শিযুকুর। আর সম্ভবত এই ক্ষমতার উৎস ছিল এন নো ওজোমার পাথুরে মূর্তি।

সিগন্যাল দিল ফ্যাক্স মেশিন। সাদাকো ইয়ামামুরার চেহারার ছবি প্রিন্ট আউট হলো সেখানে থেকে। উড্ডয়ন থিয়েটার গ্রুপ থেকে এটা পেয়েছে ইয়াশিনো। অদ্ভুতভাবে নড়েচড়ে উঠল আসাকাওয়া। প্রথমবারের মত মেয়েটার চেহারা দেখছে ও। যদিও খুবই স্বল্প সময়ের জন্য অনুভব করেছিল তার মতো একই অনুভূতি, তার দৃষ্টিতেই দেখেছিল কিছু দৃশ্য। সকালের আবছা পবিত্র আলোয় প্রেমিকার চেহারা দেখার মতোই মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। দুর্যোগের উত্তেজনাকর এক রাত কাটানোর পর অবশেষে বুঝতে পারল সাদাকো দেখতে কেমন।

যদিও ব্যাপারটা অদ্ভুত, তবুও তার কাছে অসহ্য ঠেকছে চেহারাটা। অবশ্য ওর জন্য এমনটাই স্বাভাবিক। ফ্যাক্সের মাধ্যমে আসার কারণে সামান্য ঝাপসা হয়ে গিয়েছে ছবিটা। তারপরও সাদাকোর বিমোহিত রূপ কোনো অংশে কমেনি।

“অত্যন্ত সুন্দরী দেখছি সে, তাই না?” বলল রুজি। হুট করেই মেই তাকানোর কথা মনে হলো আসাকাওয়ার। যদি এই দুজনের মধ্যে তুলনা করা হয় তবে নিঃসন্দেহে সাদাকো হাজারগুণে মেইয়ের থেকে সুন্দরী। কিন্তু মেইয়ের থেকে আসা সুবাস আরও বেশি শক্তিশালী। তাহলে সাদাকোর ‘অদ্ভুতুড়ে’ বৈশিষ্ট্য কী? ছবি দেখে তো ওরকম কিছুই আঁচ করা যাচ্ছে না। সাদাকো এমন কিছু ক্ষমতা ছিল যা থাকে না সাধারণ মানুষের। আর নিশ্চয়ই সেই ক্ষমতা প্রভাব ফেলেছে তার আশেপাশের মানুষদের ওপর।

ফ্যাক্সের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় শিযুকু ইয়ামামুরার ব্যাপারে তথ্যের সারাংশ। জেঞ্জির গল্প যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেখানেই শুরু হয়েছে ওটা।

১৯৪৭ সালে নিজের শহর সাসিকিজি ছেড়ে টোকিওর উদ্দেশ্য রওয়ানা দেয় শিযুকু। সেখানে অতিরিক্ত মাথা যন্ত্রণার কারণে জ্ঞান হারালে হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে। একজন ডাক্তারের মাধ্যমে হিহাচিরো ইকুমার সাথে পরিচয় হয় তার। তাইদো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইক্রিয়াট্রির প্রফেসর ইকুমা। সেসময় হিপনোটিজম ও এর সম্পর্কিত বিষয়বস্তু নিয়ে গবেষণা করছিলেন ইকুমা। শিযুকুর ক্ষমতার ব্যাপারে জানতে পেরে তার ওপর আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যা পেয়েছিলেন সেটা এক ধাক্কায় বদলে দেয় তার রিসার্চের গতিপথ। এরপরই অতিপ্রাকৃত শক্তি নিয়ে কাজ করতে আরম্ভ করেন ইকুমা। শিযুকুকে বানান তার রিসার্চের সাবজেক্ট। খুব দ্রুতই ওদের সম্পর্ক চলে যায় রিসার্চার-সাবজেক্টের ঊর্ধ্বে। পরিবার থাকা সত্ত্বেও শিযুকুর প্রতি প্রেমের অনুভূতি হয় ইকুমার। ঐ বছরের শেষে গর্ভধারণ করে শিযুকু। দুনিয়ার চোখে ধূলো দিয়ে আবারও আইল্যান্ডে ফিরে আসে সে। এখানেই জন্ম হয় সাদাকোর। এরপরই সাদাকোকে সাসিকিজিতে রেখেই আবারও টোকিওতে ফিরে যায় শিযুকু। তিন বছর পর আবারও ফিরে আসে সন্তানের কাছে। আত্মহত্যার আগ পর্যন্ত একবারও চোখের আড়াল হতে দেয়নি সাদাকোকে।

১৯৫০ এর শুরুর দিকে হিহাচিরো ইকুমা আর শিযুকু ইয়ামামুরার সম্পর্ক উঠে আসে পত্রিকা আর সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের শিরোনামে। অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল এই দুজন। প্রথমে শিযুকুর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার ব্যাপারে বিশ্বাস করেছিল পাবলিক। কেননা ইকুমা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা প্রফেসর। তার কথা তো ফেলনা নয়। এমনকি মিডিয়াও কমবেশি আলোকপাত করছিল শিযুকুর ওপর। তারপরও এই সব দাবি ভুয়া বলে সন্দেহ প্রকাশ করে হাতেগোনা কিছু মানুষ। আর যখন কোনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ সংগঠন কোনো কিছুর ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে, সেসময় একটু হলেও সরে যায় মানুষের আস্থা।

শিযুকুর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ছিল প্রধানত ইএসপি সম্পর্কিত। যেমন দিব্যদৃষ্টি, সাইকিক ফটোগ্রাফ তৈরির দক্ষতা। অন্তর্শক্তির কোনো দক্ষতা কখনো দেখাতে পারেনি সে। অন্তর্শক্তি হলো কোনো বস্তু না স্পর্শ করেই ঐ বস্তুকে নাড়ানোর ক্ষমতা। ম্যাগাজিনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ফিল্মকে কপালের কাছে ধরে সেই ফিল্মে নির্দিষ্ট কোনো ডিজাইন প্রিন্ট করতে পারত সে। শতবারের মধ্যে শতবার-ই অজানা কোনো ফিলোর ইমেজ চিহ্নিত করার ক্ষমতাও ছিল তার। আরেকটা ম্যাগাজিনের মতে, শিযুকুর সবকিছু ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই না। তাদের ধারণা ছিল, কোনো জাদুকরকে ট্রেনিং করালে সেও এসব কাজ করতে পারবে।

এরপরই শুরু হয় শিযুকুর দুর্ভাগ্য। ১৯৫৪ সালে দ্বিতীয় বাচ্চার জন্ম দেয় সে। কিন্তু বাচ্চাটা অসুস্থ অবস্থায় জন্ম নেয়। জন্মের চারমাসের মাথায় মারা যায় বাচ্চাটা। ছেলে বাচ্চা ছিল সেটা। সেসময় সাদাকোর বয়স সাত। সদ্য জন্ম নেয়া ছোট ভাইয়ের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই মমতা জন্মেছিল তার।

পরের বছর, মানে ১৯৫৫ সালে মিডিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে বসে ইকুমা। শিযুকুর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা প্রদর্শনের চ্যালেঞ্জ। প্রথমে রাজি হয়েছিল না শিযুকু। তার দাবি ছিল এতগুলো দর্শকের সামনে কোনেভাবেই মনোযোগ ও ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ সম্ভব নয় তার পক্ষে। কিন্তু ইকুমা ছিল নাছোড়বান্দা। মিডিয়ার কাছে কোনোভাবেই প্রতারক তকমা পেতে চাচ্ছিলেন না তিনি। আর সরাসরি সবার সামনে শিযুকুর ক্ষমতা প্রদর্শনের চেয়ে নিজেকে প্রমাণের ভালো উপায় জানা ছিল না তার।

নির্ধারিত দিতে অনিচ্ছার সাথে ল্যাব থিয়েটারের ডায়াসে উঠে দাঁড়ায় শিযুকু। শখানেক গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব আর প্রেসের লোকজন উপস্থিত ছিল দর্শক সারিতে। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিল সে। অতএব মনোযোগ দেয়া কঠিন ছিল তার পক্ষে। পরীক্ষাটা ছিল খুবই সাধারণ। তাকে শুধু কন্টেইনারে আটকানো এক জোড়া ডাইসের সংখ্যা চিহ্নিত করতে হতো। যদি স্বাভাবিকভাবেই নিজের ক্ষমতার ব্যবহার করত তবে এটা কোনো ব্যাপারই নয় তার জন্য। কিন্তু সে জানত, সামনে বসা প্রত্যেকটা মানুষ আশায় রয়েছে তার ব্যর্থতার। কেঁপে উঠে, হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে কেঁদে উঠল সে, “যথেষ্ট হয়েছে!” ব্যাপারটা এভাবে ব্যাখ্যা করেছিল শিযুকু: একটা নির্দিষ্ট ডিগ্রিতে অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে প্রত্যেকেরই। বাকিদের থেকে সামান্য বেশি রয়েছে তার। কিন্তু শখানেক মানুষের সামনে, যাদের ইচ্ছা ওর ব্যর্থতা দেখার, এমতাবস্থায় ব্যাঘাত ঘটছে তার ক্ষমতার। প্রয়োগ করতে পারছে না সে।

ইকুমা আরও যোগ করেছিলেন : “শুধু শ’খানেক মানুষ নয়। সমগ্র জাপানের প্রত্যেকটা মানুষই আমার রিসার্চের ফলাফলের খিল্লি উড়াতে চাচ্ছিল। মিডিয়ার কল্যাণে যখন জনগণের মনোভাব ঘুরে যেতে আরম্ভ করেছে, সেসময় মিডিয়া একেবারে মুখে কুলুপ এটে বসে ছিল। লজ্জা হওয়া উচিত হারামখোরদের!” দর্শকদের দুয়োধ্বনির মাধ্যমে শেষ হয় এই ব্যর্থ প্রদর্শনীর। মিডিয়া ও প্রেস মুণ্ডুপাত করে ইকুমার।

মিডিয়ার প্রতি ইকুমার এত অভিযোগ ও গালাগালিকে তাদের ঘাড়ে নিজের ব্যর্থতার দায় চাপানোর প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছিল সবাই। পরেরদিন পত্রপত্রিকাগুলোতে ফলাও করে ছাপানো হয় : ‘অবশেষে সবকিছুই ভুয়া…মুখোশ খুলে গেল প্রতারক জুটির।’… ‘প্রতারক তাইদো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।’… ‘পাঁচ বছরের তর্ক-বিতর্কের অবসান : আধুনিক বিজ্ঞানের জয়জয়কার।”

একটা পত্রিকাও কথা বলেনি ওদের পক্ষে।

ঐ বছরের শেষে স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে ভার্সিটি থেকে ইস্তফা দেয় ইকুমা। ক্রমেই আতঙ্কগ্রস্ত হতে থাকে শিযুকু। এরপর নিজেই অতিপ্রাকৃত বিদ্যা শেখার জন্য উঠেপড়ে লাগে ইকুমা। পাহাড়ের গুহার গভীরে, এক ঝর্ণার নিচে স্বেচ্ছা নির্বাসন নেয় সে। কিন্তু যক্ষ্মারোগ ছাড়া আর কিছুই অর্জন করা সম্ভব হয়নি তার। হ্যাকনের এক হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। এদিকে দিনে দিনে আরও খারাপ হতে থাকে শিযুকুর মানসিক অবস্থা। আট বছর বয়সী সাদাকো মাকে বোঝায় সাসিকিজিতে ফিরে যাওয়ার জন্য। মিডিয়া ও পাবলিকের চোখের আড়াল হতে সেখানে ফিরে যায় ওরা। এরপর একদিন মেয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে আগ্নেয়গিরিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে শিযুকু। ফলে তছনছ হয়ে যায় তিনজন মানুষের জীবন।

একইসাথে দুই পৃষ্ঠার প্রিন্টআউট পড়ে শেষ করল আসাকাওয়া ও রুজি।

“ভয়াবহ,” বিড়বিড় করল রুজি। “একবার ভাবো, মায়ের মাউন্ট মিহারায় ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যার পর কেমন লেগেছিল সাদাকোর।”

“মিডিয়াকে ঘৃণা করত সে?”

“শুধু মিডিয়াকে নয়, জনগণকেও ঘৃণা করত। নিজের পরিবার ধ্বংসের জন্য তাদেরকেই দায়ী মনে করত সে। প্রথমে ওদের পরিবারকে সমাদরে গ্রহণ করে এরপর হাওয়া বদলের সাথে সাথে ছুঁড়ে ফেলে ওরা। তিন থেকে দশ বছর বয়স পর্যন্ত বাবা মায়ের সাথে ছিল সাদাকো, ঠিক? সেসময়ই সরাসরি জনগণের মতামতের প্রহসন সম্পর্কে টের পায় সে।”

“তাই বলে এভাবে গণহারে আক্রমণ চালানোর ব্যবস্থা করে রাখার কোনো মানে নেই!” বেশ সচেতনভাবে কথাটা বলল আসাকাওয়া। কেননা ও নিজেও মিডিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। মনের মধ্যে বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করছে আসাকাওয়া। জীবন বাঁচানোর জন্য কাকুতি মিনতির দশা হয়েছে ওর।

আমিও তার মতোই মিডিয়ার বাড়াবাড়ি ঘৃণা করি, মনে মনে বলল আসাকাওয়া।

“হেই, কি বিড়বিড় করছো?”

“হুহ?” মনের অজান্তেই বুদ্ধের মন্ত্র জপের মতো বিড়বিড় করে কথাটা বলে ফেলেছে, বুঝতে পারল আসাকাওয়া।

“আচ্ছা, আমরা তাহলে ভিডিওর দৃশ্যগুলোর তৎপর্য বুঝতে আরম্ভ করেছি। ভিডিওতে মাউন্ট মিহারা দেখা গেছে কেননা সেখানেই তার মা আত্মহত্যা করেছে। আর তাছাড়াও সেখানকার উদ্গীরনের ব্যাপারে ভবিষ্যৎবাণী করেছিল সাদাকো। পরের দৃশ্যে অক্ষরগুলো ‘পর্বত’ শব্দটা গঠন করেছে। সম্ভবত এটাই ছিল সাদাকোর প্রথম সাইকিক ফটোগ্রাফ। যা সে খুব ছোটবেলায় বানাতে সক্ষম হয়েছিল।”

“খুব ছোটবেলা?” কেন মনে হলো এই ফটোগ্রাফ খুব ছোটবেলায় বানানো, বুঝতে পারছে না আসাকাওয়া।

“হ্যাঁ, সম্ভবত যখন তার বয়স ছিল চার অথবা পাঁচ সেসময়। এরপরের দৃশ্যেই ডাইস দেখতে পাই আমরা। এই দৃশ্যের মাধ্যমে তার মায়ের দর্শকের সামনে দাঁড়ানোর ঘটনার ইঙ্গিত দিয়েছে সাদাকো। এই দৃশ্যের অর্থ হলো, উদ্বিগ্ন অবস্থায় মায়ের ডাইসের নম্বর ধারণা করা দেখছিল ছোট্ট সাদাকো।”

“দাঁড়াও, দাঁড়াও। এর মানে সেইসময় পাত্রে রাখা ডাইসের নম্বর স্পষ্ট কল্পনা করতে পেরেছিল সাদাকো।”

বলাই বাহুল্য, স্বচক্ষে দৃশ্যটা দেখেছে আসাকাওয়া ও রুজি। ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই ওদের।

“আর?”

“শিযুকু ধারণা করতে পারেনি ডাইসের নম্বর।”

“মেয়ে দেখতে পেল কিন্তু মা দেখতে পেল না, ব্যাপারটা অদ্ভুত না? লক্ষ করে দেখ, সাদাকোর বয়স মাত্র সাত। ঐ বয়সেই সে অতিক্রম করে গিয়েছিল মায়ের ক্ষমতাকে। একশো কেন, হাজার জনের ইচ্ছা শক্তি ও কিচ্ছু ছিঁড়তে পারত না সাদাকোর। একবার ভাব, এই মেয়ে নিজের কল্পনার দৃশ্যগুলোকে ক্যাথোড রে টিউবে প্রেরণ করতে পারত। টেলিভিশনের সৃষ্ট দৃশ্যের মেকানিজম ফটোগ্রাফির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুধু ফিল্মকে লাইটে রূপান্তরিত করলেই হয় না। টিভির দৃশ্য ৫২৫টি লাইনের সমন্বয়। সাদাকো সেটাকেও প্রভাবিত করতে পারত। তার ক্ষমতা একেবারেই অন্যরকম উচ্চতার।”

এই ব্যাখ্যাতেও খুব একটা সন্তুষ্ট দেখাল না আসাকাওয়াকে। “তার যদি অত্যধিক ক্ষমতা থেকেই থাকে তবে প্রফেসর মিউরার কাছে পাঠানো সাইকিক ফটোর ব্যাপারটা কী? সে তো চাইলে এর থেকেও উন্নত কিছু পাঠাতে পারত।”

“দেখে যা মনে হয় তার থেকেও বড় নির্বোধ তুমি। নিজের ক্ষমতার ব্যাপারে জানান দিয়ে তার মা কষ্ট ছাড়া আর কিছুই পায়নি। তার মা হয়তো একই ভুল মেয়ের ক্ষেত্রেও করতে চায়নি। সম্ভবত সে সাদাকোকে ক্ষমতা লুকিয়ে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার উপদেশ দিয়েছিল। এজন্য নিজেকে সতর্কতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করেছিল সাদাকো। মাত্র একটা সাইকিক ফটোগ্রাফ পাঠিয়েই ক্ষান্ত দিয়েছিল সে।”

সবাই চলে যাওয়ার পর রিহার্সেল হলে একাই থাকত সাদাকো। যেন টেলিভিশনের মাধ্যমে চর্চা করতে পারে নিজের ক্ষমতার। তখনকার দিনে এতটা প্রতুল ছিল না টেলিভিশন। সতর্কতার সাথেই কাজটা করত সে। কি করত সে, যেন কেউ টের না পায়।

“পরের দৃশ্যে যে বৃদ্ধাকে দেখা যায় কে সে?” জিজ্ঞেস করল আসাকাওয়া।

“আমি ঠিক জানিনা। হতে পারে তাকে স্বপ্নে দেখেছে সাদাকো। যে কিনা স্বপ্নে তাকে কোনো ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছে। ঐ বৃদ্ধার বলা কথাগুলো ছিল প্রাচীন উপভাষায়। হয়তো জানো, বর্তমান সময়ে সবাই আধুনিক জাপানি ভাষাতেই কথা বলে। মহিলার বয়স অনেক। হয়তো সে বারো শতকের কেউ, অথবা তার হয়তো এন নো ওজোনোর সাথে কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে।”

পরবর্তী বছরে তুমি জন্ম দেবে এক শিশুর।

“ভাবছি ঐ ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হয়ে যায় কিনা?”

“ওহ ঐটা। মানে একটা সদ্যজাত ছেলে সন্তানের দৃশ্য। আমি ভেবেছিলাম সাদাকোর বাচ্চা জন্ম দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ফ্যাক্সে তো ওরকম কিছু লেখা নেই।”

“তার একটা ভাই হয়েছিল কিন্তু। চারমাস বয়সে মারা গেছে…”

“ঠিক। আমার মনে হয় এটার কথায় বলেছে

“কিন্তু ভবিষ্যৎবাণীর ব্যাপারে কী বলবে? ঐ বৃদ্ধা তো সাদাকো’কে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছিল। সাদাকোর কোনো বাচ্চা রয়েছে নাকি?”

“জানিনা। বৃদ্ধার কথা বিশ্বাস করলে, অবশ্যই রয়েছে।”

“বাচ্চার বাবা কে?”

“আমি কীভাবে জানবো ভাই? শোনো, মনে করবে না দুনিয়ার সবজান্তা আমি। আমি একজন পর্যবেক্ষক।”

সাদাকো ইয়ামামুরার যদি সত্যি কোনো বাচ্চা থেকে থাকে তবে এই বাচ্চার বাবা কে? বাচ্চাটাই বা এখন কোথায়?

হঠাৎ করেই টেবিলের তলা থেকে পা সোজা করে উঠে দাঁড়াল রুজি।

“ক্ষুধা লেগেছে আমার সম্ভবত। দেখো দুপুর পার হয়ে গিয়েছে। আসাকাওয়া, আমি খেতে যাচ্ছি।” বলার সাথে সাথেই হাঁটু ঘষতে ঘষতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল রুজি। ক্ষিধে পায়নি আসাকাওয়ার। তবে কিছু একটা বিব্রত করছে ওকে। তার সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ও। কিছু একটা খতিয়ে দেখতে বলেছিল রুজি, মনে পড়ল ওর। এমন কিছু যেটার কোনো ব্লু নেই, এজন্য এখন পর্যন্ত এগোনো হয়নি এই ব্যাপারে। সেটা হলো, ভিডিওর শেষ দৃশ্যের লোকটার পরিচয় জানা। ঐ লোকটা সাদাকোর বাবা হিহাচিরো ইকুমা হতে পারে। কিন্তু প্রচণ্ড ঘৃণার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছে সাদাকো। স্ক্রিনে লোকটাকে দেখার পর, দেহের কোনো একটা অংশে অসহনীয় ব্যথা অনুভব করছিল আসাকাওয়া। সেইসাথে অদ্ভুত এক বিদ্বেষ অনুভব করেছে ও। সাদাচোখে লোকটাকে সুদর্শন বলেই মনে হয়েছে। এত ঘৃণা, বিদ্বেষ কেন? নিঃসন্দেহে ওরকম ঘৃণার দৃষ্টিতে কোনো আত্মীয়ের দিকে তাকাবে না সাদাকো। নিজের পিতার প্রতি বিদ্বেষ ছিল, এমন কিছু বলা নেই ইয়াশিনোর রিপোর্টে। বরং সেখান থেকে জানা যায়, বাবা-মার ছায়াতলেই থাকত সে। এই লোকটার পরিচয় বের করা হয়তো অসম্ভব, মনে হলো আসাকাওয়ার। নিঃসন্দেহে ত্রিশ বছরে বদলে গেছে লোকটার চেহারা। তবে হয়তো ইয়াশিনোকে বলা যেতে পারে ইকুমার কোনো ছবি বের করতে। রুজি হলে এই ব্যাপারে কি ভাবত, চিন্তা করল ও। রুজির হাতেই ছেড়ে দিতে চাচ্ছে এই ব্যাপারটাও। রুজিকে অনুসরণ করে হাটতে লাগল আসাকাওয়া।

বাইরে বইছে ভয়ানক ঝড়ো বাতাস। ছাতা ব্যবহার করারও উপায় নেই। রুজি আর আসাকাওয়া কাঁধ মিলিয়ে দৌড়ে প্রবেশ করল হারবারের পাশের বারে।

“বিয়ার হলে কেমন হয়?” জবাবের অপেক্ষা না করেই ওয়েট্রেসের দিকে ফিরল রুজি। “দুটো বিয়ার

“রুজি, আবারও একটু আগের প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হবে আমাদের। ভিডিওটির ব্যাপারে তোমার ফাইনাল মন্তব্য কি?”

“জানি না।”

কোরিয়ান বার্বি-কিউ দিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়ায় ব্যস্ত রুজি। একারণে জবাবও দিল সংক্ষেপে। কাঁটা চামচে সসেজ মুখে নিয়ে বিয়ারে চুমুক দিল আসাকাওয়া। জেটি দেখা যাচ্ছে জানালা দিয়ে। তোকাই কিরেন ফেরি লাইনের টিকেট কাউন্টারে একটা প্রাণীও নেই। সবকিছু একেবারে নিশ্চুপ। নিঃসন্দেহে-ই আইল্যান্ডের সব ট্যুরিস্ট দরজা জানালা বন্ধ করে বসে রয়েছে হোটেল ও লজে। দুশ্চিন্তা নিয়ে ভাবছে অন্ধকারে ছেয়ে যাওয়া আকাশ ও সমুদ্রের ব্যাপারে।

মাথা উঁচু করে তাকাল রুজি, “আমার মনে হয় মৃত্যুর আগমুহূর্তে মানুষের মাথায় কি চলে সেই বিষয়ে তুমি লোকমুখে শুনেছো, তাই না?”

তার দিকে দৃষ্টি ফেরাল আসাকাওয়া। “যেসব ঘটনা জীবনে গাঢ় প্রভাব ফেলেছে, সেসব দৃশ্য ভেসে ওঠে মৃত্যুর আগে। অনেকটা ফ্ল্যাশব্যাকের মতো।” একটা বই পড়েছিল আসাকাওয়া। ঐ বইয়ের লেখক বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছিল এই অভিজ্ঞতার ব্যাপারে। পাহাড়ী রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন লেখক। হঠাৎ-ই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি নিয়ে গিরিখাতে পড়েন তিনি। ভগ্নাংশ সেকেন্ড ঝুলে থাকার পর গিরিখাতে পড়ে গাড়িটা। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল মরতে বসেছেন তিনি। জীবনে ঘটা বিভিন্ন দৃশ্য ক্ৰমাগত ভেসে উঠছিল তার চোখের সামনে। দৃশ্যগুলো এতই স্পষ্ট ছিল, ক্ষুদ্র ব্যাপার-স্যাপারগুলোও দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। অবশেষে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন লেখক। তবে সেই স্মৃতি স্পষ্ট মনে থেকে গিয়েছে তার।

“তুমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবে না…. বাস্তবে এমনটাই কি ঘটে?” জিজ্ঞেস করল আসাকাওয়া। রুজি হাত উঁচিয়ে আরেকটা বিয়ার দেয়ার ইশারা করল ওয়েট্রেসকে।

“ভিডিওটা আমাকে যেটার কথা মনে করিয়েছে সেটাই বলতে চেয়েছি আমি। ভিডিওর প্রত্যেকটা দৃশ্য, সাদাকোর জীবনের অতিমাত্রায় আধ্যাত্মিক ও আবেগে পরিপূর্ণ সব মুহূর্তের প্রতিনিধিত্ব করে। এসব তার জীবনের গভীর প্রভাব ফেলা মুহূর্ত, এটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় না। বুঝলে?”

“বুঝতে পেরেছি। কিন্তু রুজি, এর মানে কি এই দাঁড়ায়…”

“ঠিক। যেমনটা ভাবছ সেটাই হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।”

তাহলে এই পৃথিবীতে বর্তমানে সাদাকো ইয়ামামুরার কোনো অস্তিত্ব নেই। মারা গিয়েছে সে। আর ভিডিওর ওসব দৃশ্যগুলো মৃত্যুর আগ মুহূর্তে ভেসে উঠেছিল তার কল্পনায়। যা ভিডিও আকারে রয়ে গেছে বর্তমান পৃথিবীতে, জীবিতদের জন্য। এমনটাই ঘটেছে কী?

“কেন মারা গেল সে? আরেকটা ব্যাপার, ভিডিওর শেষ দৃশ্যের লোকটার সাথে কি সম্পর্ক তার?”

“আমাকে এত প্রশ্ন করতে মানা করেছি কিন্তু। এটার বহু জিনিস আমারও মাথার ওপর দিয়ে গেছে।”

অসন্তুষ্ট দেখাল আসাকাওয়াকে।

“শোনো, নিজের মাথা ব্যবহারের চেষ্টা করো। তুমি হারামজাদা খুব অন্যের ওপর ভরসা করো। সমাধান বের করার আগেই আমার কিছু হয়ে গেলে করবে টা কি বাল?”

এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। হয়তো মারা যাবে আসাকাওয়া-ই। হয়তো একাই ধাঁধার সমাধান করে ফেলবে রুজি। কিন্তু এর বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

“ব্যুরোতে’ ফিরে এলো ওরা। ওদের জন্য অপেক্ষায় ছিল হায়াৎসু। “ইয়াশিনো নামের আপনার এক বন্ধু কল দিয়েছিল। অফিসে নেই সে এখন। এজন্য বলল, দশ মিনিটের মধ্যে কল ব্যাক করবে সে।”

ভালো খবরের আশায় ফোনের সামনে বসে থাকল আসাকাওয়া। বেজে উঠল ফোন। কল করেছে ইয়াশিনো।

“কখন থেকে কল দিচ্ছি। কোথায় ছিলে?” ভর্ৎসনার ছাপ তার কণ্ঠে।

“দুঃখিত ভাই,” বলল ও। “খেতে গিয়েছিলাম একটু বাইরে।”

“আচ্ছা। আমার পাঠানো ফ্যাক্স পেয়েছো?” কণ্ঠস্বর বদলে গেছে ইয়াশিনোর। ভর্ৎসনার বদলে কোমল হয়ে গিয়েছে তার কণ্ঠস্বর। খারাপ কিছুর পূর্বাভাস পেল আসাকাওয়া।

“হ্যাঁ, ধন্যবাদ। বেশ কাজে এসেছে ওটা।” বাম হাত থেকে ডান হাতে রিসিভার নিল ও। “আর, এরপর? এরপর সাদাকোর কি হয়েছে জানতে পেরেছ?”

জবাব দেয়ার আগে কয়েক মুহূর্ত থেমে থাকল ইয়াশিনো। “নাহ, কানাগলিতে এসে পৌঁছেছি।”

শোনার সাথে সাথেই মুখ বিকৃত হয়ে গেল আসাকাওয়ার। মনে হলো এখনই কান্নায় ভেঙে পড়বে ও। দাঁড়িয়ে থেকে ওকে লক্ষ করছে রুজি। কীভাবে একটা মানুষের অভিব্যক্তি আশা থেকে হতাশায় রূপ নেয়, দেখে অবাক হলো সে। এরপর বাগানের দিকে মুখ করে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল মেঝেতে।

“কানাগলি মানে? কি বলতে চাচ্ছ?” উদ্বেগের ছাপ আসাকাওয়ার কণ্ঠে।

“আমি মাত্র চারজন ইন্টার্নের খোঁজ বের করতে পেরেছি। যারা সাদাকোর সাথেই যোগ দিয়েছিল নাট্যদলে। ওদের কল করেছিলাম। কিন্তু কেউই কিছুই বলতে পারেনি। সবাই বলেছে কোম্পানির মুখপাত্র, শিগেমোরির মৃত্যুর পর ওরা কেউ আর তাকে দেখেনি। সাদাকো ইয়ামামুরার ব্যাপারে আর কোনো তথ্য নেই।”

“ধুর বাল! এভাবে শেষ হতে পারে না এটা।”

“যাইহোক, তোমার ওদিকের কি হাল?”

“আমার এদিকে কি হাল? বলছি দাঁড়াও তোমাকে। মনে হচ্ছে কাল রাত দশটা নাগাদ মরতে হবে আমাকে। আর শুধু আমি না, রবিবার সকাল এগারোটা নাগাদ আমার বউ বাচ্চাকেও মরতে হবে। আমার হাল এটাই।”

পিছনে থেকে বলল রুজি, “ভাই আমার কথাও ভুলো না! আমার কিন্তু মন খারাপ করিয়ে দিচ্ছ তুমি।”

তাকে পাত্তা না দিয়ে কথা চালিয়ে গেল আসাকাওয়া। “অন্য কোনো দিক দিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পার। হয়তো কোন ইন্টার্ন থেকে থাকতে পারে, যে জানে কি হয়েছে সাদাকোর। ভাই আমার পরিবারের বাঁচামরা এটার ওপর নির্ভরশীল।”

“তার আর দরকার নেই।”

“কি বলতে চাচ্ছ?”

“হয়তো ডেডলাইনের পরেও বেঁচে থাকবে তুমি।”

“বুঝতে পারছি। আমাকে বিশ্বাস করছ না তুমি।” চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে আসাকাওয়ার।

“আচ্ছা, কীভাবে এরকম একটা ব্যাপারকে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারি, বল?”

দেখ, ইয়াশিনো।” কীভাবে বলবে ও? আর কীভাবে তাকে বোঝানো যায়? “আমি নিজেও এর অর্ধেকটা বিশ্বাস করতাম না। পুরাই ফালতু বিষয়। ধাঁধার সমাধান? যত্তসব। কিন্তু দেখ, এটা অনেকটা জীবন বাজি রেখে জুয়া খেলার মতো। ছয়টার মধ্যে একটা উঠলেই শেষ! মনে কর, পিস্তলে একটি মাত্র বুলেট রয়েছে, আর তুমি জানো, ছয়বারের মধ্যে মাত্র একবার সম্ভাবনা রয়েছে ট্রিগার টানলে তোমার মৃত্যুর। তাই বলে সেই মুহূর্তে তুমি কি ট্রিগার টানবে? ঝুঁকিতে ফেলবে পরিবারকে? নিশ্চিতভাবেই ফেলবে না। কপাল থেকে অস্ত্রটা সরিয়ে নেবে। পারলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে সমুদ্রে। ঠিক? এটাই স্বাভাবিক।”

ক্লান্তবোধ করছে আসাকাওয়া। পেছনে চিৎকার করছে রুজি। “নির্বোধ আমরা! আমরা দুজনেই একেবারে নির্বোধ!”

“চুপ করো!” হাতের তালু দিয়ে রিসিভারটা ঢেকে তার দিকে তাকিয়ে বলল আসাকাওয়া।

“কোনো সমস্যা?” নিচু কণ্ঠে ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে বলল ইয়াশিনো। ‘শোনো ইয়াশিনো। আমি হাতজোড় করছি তোমার কাছে। তুমি ছাড়া ভরসা করার মতো কেউ নেই আমার।” হঠাৎ আসাকাওয়ার বাহু আঁকড়ে ধরল রুজি। বিরক্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার হাত সরিয়ে দিতে চাইল ও। কিন্তু দেখল আন্তরিক দেখাচ্ছে রুজিকে।

“আমরা নির্বোধ। তুমি, আমি দুজনেই মাথা গরম করে ফেলেছি,” শান্তস্বরে বলল সে।

“এক মিনিট একটু ধরবে?” রিসিভার নিচু করে রুজির দিকে ঘুরল আসাকাওয়া, “কি হয়েছে?”

“ব্যাপারটা খুবই সাধারণ। আগে মাথাতেই আসেনি কেন? ক্রমানুসারে সাদাকোর ট্রেইল ফলো করার কোনো প্রয়োজনই নেই। কেন একটু পেছনে ফিরে দেখছি না আমরা? বি-৪ কেবিনেই কেন ঘটল ঘটনাটা? ভিলা লগ কেবিনেই বা কেন? সাউথ হ্যাকনে প্যাসিফিক ল্যান্ডেই বা হতে হবে কেন?”

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মুহূর্তের মধ্যে অভিব্যক্তি বদলে গেছে আসাকাওয়ার। শান্তভাবে রিসিভার আবারও উঠিয়ে নিল ও।

“ইয়াশিনো?”

ফোনের অপরপ্রান্তে এখনো অপেক্ষায় আছে ইয়াশিনো।

“ইয়াশিনো, থিয়েটার কোম্পানির লিডের ব্যাপারে আপাতত ভুলে যাও। অন্য একটা ব্যাপারে দ্রুত একটু খতিয়ে দেখ। কেবল ধরতে পেরেছি। মনে হয় তোমাকে সাউথ হ্যাকনে প্যাসিফিক ল্যান্ডের ব্যাপারে বলেছিলাম…”

“হ্যাঁ বলেছিলে, ওটা রিসোর্ট ক্লাব, তাই না?”

“হ্যাঁ, যদ্দুর মনে পড়ে, দশবছর আগে ওখানে গলফ কোর্স নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে জায়গা বাড়িয়ে এখন রিসোর্ট বানানো হয়েছে। এখন শোনো, খুঁজে বের করার চেষ্টা করো প্যাসিফিক ল্যান্ডের আগে কি ছিল ওখানে।”

কাগজে লেখার আওয়াজ শুনল আসাকাওয়া।

“কি বলতে চাচ্ছ? কি ছিল ওখানে? সম্ভবত পাহাড়ি ভূমি।”

“হয়তো তোমার ধারণা ঠিক। আবার ভুলও হতে পারে।”

আবারও আসাকাওয়ার বাহুতে টোকা দিল রুজি। “লে আউটও খুঁজতে বলো। রিসোর্টের আগে যা ছিল সেটার। তোমার বন্ধুকে জানাও ওখানাকার গ্রাউন্ড ও বিল্ডিংয়ের লে আউটের খোঁজ করতে।”

ইয়াশিনোকে এই ব্যাপারে দেখার অনুরোধ করে ফোন রেখে দিল আসাকাওয়া। আশা করছে এমন কিছু খুঁজে পাবে সে, যা ব্যবহার করা যাবে গুরুত্বপূর্ণ লিড হিসেবে। সবারই সামান্য হলেও অলৌকিক ক্ষমতা থাকে, কথাটা আসলেই বাস্তব।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *