ঝিলের ধারে একদিন

ঝিলের ধারে একদিন

“চাঁদু, শিগগির ওঠ। চাঁদু–” তারাপদ জোরে ধাক্কা মেরে চন্দনকে জাগিয়ে তোলবার চেষ্টা করল।

চন্দন যে ঘুমকাতুরে স্বভাবের তা নয়। ডাক্তার মানুষ, এক সময় হাসপাতালে দিনের পর দিন রাত জেগে কাজ করেছে। এখন অবশ্য তা করতে হয় না। তবে রাতবিরাতে তাকে ঠেলাঠেলি সহ্য করতেই হয়। পেশাদারি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা ডাক্তার না হলেও কখনও কখনও কিছু সামাজিক কর্তব্য তো থাকেই।

গায়ের হালকা কম্বলটা মুখের ওপর টেনে নিয়ে চন্দন পাশ ফিরল। মানে, বোঝাতে চাইল, যা ঝামেলা করিস না, ঘুমোতে দে।

চন্দনের গায়ের কম্বল টান মেরে উঠিয়ে নিল তারাপদ। “ওঠ, শিগগির ওঠ। সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড হয়ে গিয়েছে, তুই পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস! উঠে পড়। হারি আপ।”

চন্দন চোখ চাইল। সকাল হয়ে গিয়েছে বুঝতে তার কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। মাথার দিকের জানলা বন্ধ থাকলেও পায়ের দিকের জানলা খোলা। পাশের একটা আধ-ভেজানো জানলা দিয়েও সকালের ফরসাটে ভাব বোঝা যায় ।

চন্দন হাই তুলতে তুলতে উঠে বসল। “তোর মর্নিং ওয়াকে আমি নেই। কেন ডিস্টার্ব করছিস ফর নাথিং। ঘুমোতে দে।”

“ঘুমোতে হবে না। শিগগির চল। একটা লোক ঝিলের কাছে পড়ে আছে। হয়তো মারা গিয়েছে।”

মারা গিয়েছে–শোনামাত্রই চন্দন যেন চমকে উঠল। চোখের পাতায় ঘুমের রেশ থাকলেও চেতনায় আর না-ঘুম না-আলস্য। অবাক হয়ে বলল, “কী বলছিস?”

“দেখবি চল।”

চন্দন লাফ মেরে উঠে পড়ল। পরনে পাজামা, গায়ে পাতলা কস উলের

এক খাটো ঢলঢলে পাঞ্জাবি। কোনও রকমে গায়ের গরম চাদর টেনে নিয়ে চটিতে পা গলিয়ে দিল চন্দন। “চল। কিকিরাকে ডেকেছিস?”

“না। কাল ওঁর কঁচা সর্দিতে জ্বর-জ্বর ভাব হয়েছিল। এত সকালে ডেকে কাজ নেই।”

দু’জনেই বেরিয়ে পড়ল।

বাড়িটা ছোট। দু’কামরার মতন। রান্নাবান্না স্নানের ব্যবস্থা অবশ্য আছে। হাত কয়েকের বুনো বাগান। ছোট কাঠের ফটক। কাটাতার আর কাঠকুটোর একটা মামুলি ফেন্সিং।

এখন যে শীতকাল তাও নয়। হেমন্তের শেষ প্রায়। অগ্রহায়ণ মাস। তবু এখানে শীত এসে গিয়েছে। এ তো কলকাতা শহর নয়, শ’ তিন মাইল দূরের বিহারের আধা মফস্বলি পাহাড়ি জায়গা। না, ঠিক পাহাড়িও বলা যাবে না, পাহাড়তলির ছোট্ট জায়গা বলা যেতে পারে। পাহাড় অনেকটাই দূরে। তবে এখানকার মাটি শক্ত, মাঠঘাট উঁচুনিচু, সমতল ভূমি বড় একটা চোখেই পড়ে না, চারপাশে কত যে বুনো ঝোঁপ আর পাথরের টুকরো ছড়ানো রুক্ষ মাঠ, তার হিসেব পাওয়া ভার। গাছের মধ্যে নিম জাম কাঁঠাল আর হরীতকী বেশি। পলাশ মহুয়াও আছে।

অনেককাল আগে রেল কোম্পানি লাইন পাতার কাজ চলার সময় এখানে কুলি-লাইন বসিয়েছিল বলে শোনা যায়। তারপর গত বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সাহেবরা এখানেই চুপিচুপি বিশাল কাটাতারের বেড়া দিয়ে ছোট একটা পি. ও. ডবলু, মানে প্রিজনারস অব ওয়ার-এর ক্যাম্প বসিয়েছিল। সেসব কথা পুরনো। তারও পরে আশেপাশের রেল কলোনির কিছু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সাহেবরা ছোট ছোট বাংলো বাড়ি বা কটেজ করে বসবাসের চেষ্টা করে । মন হয়তো বসেনি শেষপর্যন্ত; কেউ কেউ মারা গেল, কেউবা দেখল ছেলেমেয়েরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে একে একে, তারা নিঃসঙ্গ, একা। এই পর্বও ঘুচে গেল একদিন। এখন হাবিলগঞ্জ নিতান্তই এক স্বাস্থ্যকর ছোট মফস্বলি শহর।

কিকিরা তার দুই চেলা নিয়ে এখানে দিন কয়েকের জন্য বেড়াতে এসেছেন। তাও চামেলিবাবুর জন্য। চন্দন আর তারাপদ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ছুটি নিয়েছে। দিন পনেরো না হলেও দিন দশেক থাকার ইচ্ছে তাদের।

চামেলিবাবুর কথা পরে, আগে আজ সাত সকালে যে-ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে তার কথা বলা যাক।

.

চন্দন আর তারাপদ প্রায় ছুটতে ছুটতে ঝিলের দিকে যাচ্ছিল।

চন্দন বলল, “ব্যাপারটা কী?”

তারাপদ বলল, “ভোর ভোর উঠে আমি খানিকটা বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে ওই ঝিলের দিকে গিয়েছি, ঝিলের গায়ে বড় আল দেওয়া যে পথ সেখান দিয়ে যাচ্ছি, দেখি একটা লোক ঝিলের পাশে পড়ে আছে। তার মাথাটা বড়সড় এক পাথরের ওপর, কোমরের দিকটা জলের তলায়। আমি ভাবলাম, লোকটা হয়তো পা পিছলে বেকায়দায় পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছে। মাথায়। তাকে ডাকলাম, জল ছিটিয়ে দিলাম চোখে মুখে। কোনও সাড়া নেই। ভেবে দেখ, এখন ঝিলের জল কত ঠাণ্ডা! সারারাতের হিমে জল তো বরফ।”

চন্দন অবাক হয়েই বলল, “চল, দেখি!”

বাড়ি থেকে ঝিল অন্তত সাত আট শ গজ। হাজারও হতে পারে। ওটাকে ঠিক ঝিল বলাও যাবে না। বড় পুকুর বা দিঘি হতে পারে। ঝিলের গা ধরেই এদিককার বড় রাস্তা। উত্তর দিকে। রাস্তাটা কাঁচা, নুড়ি পাথর আর কাদাটে মাটি ছড়ানো। ঝিলের উত্তর দিকের রাস্তাটাই এদিককার বড় রাস্তা। রাস্তাটা চলে গিয়েছে বরাবর; আধ মাইলটাক দূরে বাজার, রেলস্টেশন। লোকে সাধারণত এই পথ ধরেই আসা-যাওয়া করে স্টেশন বা বাজারে। তবে চামেলিবাবুর বাগান আর তার এলাকার মধ্যে যেসব ছোটখাটো ঘরবাড়ি আছে, এমনকী সামান্য তফাতে এক দেহাতি ছোট গাঁ –সেখানকার লোজন কাজেকর্মে এ দিকে আসতে হলে ঝিলের দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরেই আসে। অবশ্য ওটা রাস্তা নয়, মাটির উঁচু পাড় বা আলপথ । চওড়া মন্দ নয়। আলপথের এ-পারে ঝিল, অন্য পারে খেত-খামারি। গরমের দিন দু’চার হাত আল কেটে মাটি সরিয়ে জল দেওয়া হয় খেতিতে। এপাশে কোনও নদীনালা নেই। ঝিলটা নেহাতই প্রকৃতির দয়ায় কোনওকালে দেখা দিয়েছিল কি না কে জানে! তবে বেশ বড় ঝিল বা দিঘি। জল তেমন পরিষ্কার নয়; শ্যাওলা শালুক জলজ লতাপাতাও যথেষ্ট। আলের পাশে হেলে-পড়া দু-একটা বড় গাছগাছালিও আছে। চোখে দেখতে ভালই লাগে।

ততক্ষণে রোদ উঠে গিয়েছে। একেবারে কাঁচা রোদ নয়, আকাশ পরিষ্কার, সূর্য ঝকঝক করছে। পাখি উড়ে যাচ্ছিল, বাতাসে হালকা শীত।

তারাপদরা প্রায় ছুটতে ছুটতে ঝিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

দু-তিনজন দেহাতি জুটে গিয়েছে ইতিমধ্যে। হয়তো তারা কাজেকর্মে যাচ্ছিল আলপথ ধরে, একজন বাবু-লোক ওইভাবে পড়ে আছে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে জায়গাটায় ।

তারাপদ বলল, “ওই যে–!”

চন্দন আগেই দেখতে পেয়েছিল। একবার দেহাতি মানুষগুলোর দিকে তাকাল চন্দন, তারপর জলের কাছে নেমে গেল।

দেখল লোকটিকে। বাঙালি বলেই মনে হয়। দিন দুই হল চন্দনরা এখানে এসেছে। ঘোরাঘুরি সামান্য যা করেছে এ পর্যন্ত–তাতে এই লোকটিকে নজরে পড়েনি কোথাও।

চন্দন জলের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে লোকটির মুখ দেখল। ডাক্তারি চোখে নজর করল যেন। তারপর একটি হাত তুলে নিল তার। নাড়ি দেখল। মুখ গম্ভীর হয়ে গেল কখন। হাত নামিয়ে দিল লোকটির। বোজা চোখের পাতা টেনে টেনে চোখ দেখল। গলার কাছে হাত দিল একবার, চোয়ালের তলায়। লোকটির মাথা একপাশে কাত হয়ে আছে শুকনো পাথরের ওপর। খানিকটা রক্ত। জমাট, কালচে।

উঠে এল চন্দন।

“কী রে?”তারাপদ বলল উদ্বিগ্ন গলায়।

“ডেড!”

“মারা গিয়েছে,” আঁতকে উঠল তারাপদ। “কীভাবে? কখন?”

চন্দন চারপাশে তাকাল। সকালটি নিশ্চয় সুন্দর; একঝক বক উড়ে যাচ্ছে, দূরে ট্রেনের হুইসিল, মাঠ এখন খাঁখা, প্রথম শীতের বাতাস, রোদের রং আরও গাঢ় হয়ে এল। এমন এক সকালে এ কী বিশ্রী কাণ্ড!

চন্দন বলল, “কখন মারা গিয়েছে বলতে পারব না। তবে দু-এক ঘণ্টার মধ্যে নয়। আমার মনে হয় মাঝরাতের দিকে। আন্দাজে বলছি।”

দেহাতি লোকগুলো চন্দনকে দেখছিল। তারা জানে না, চন্দন ডাক্তার । কিন্তু ওর জলে নামা, নাড়ি দেখা, চোখ দেখা থেকে অনুমান করে নিল ওই বাঙালিবাবু নিশ্চয় ডাক্তার বদ্যি হবে। তারা তাকিয়ে থাকল, শুনতে চাইল বাবু কী বলে!

“তোমরা একে চেনো?” চন্দন বলল, “জান-পয়ছান?”

“না।” মাথা নাড়ল ওরা।

“বাবু জিন্দা নেই। মারা গিয়েছে।”

না-জানুক বাবুকে ওরা, হয়তো ওরাও এই রকম খারাপ কিছু অনুমান করছিল, চন্দনের কথায় একটা গুঞ্জন উঠল। সকলেই যেন হতবাক, বিষণ্ণ।

তারাপদ বলল, “চাঁদু এখন কী হবে?”

“এরা কাউকে খবর দিক। কাছাকাছি বাড়িতে গিয়ে বলুক–যদি তাদের চেনা লোক হয় ভদ্রলোক। তারপর থানা…।”

“থানা?”

“থানায় তো বলতেই হবে। তাদের লোক এসে দেখুক। ডেডবডি তুলে নিয়ে যাক। যা করার তাদেরই করতে হবে। দায়িত্ব তাদের।”

আরও দু’-একজন এসে পড়েছে ততক্ষণে । আলপথে আসা-যাওয়া করে অনেকেই। হাঁকডাকও শুনেছে অন্যদের। ঝিলের পুব দিকে মেঠো রাস্তা। তার গায়ে-গায়ে চামেলিবাবুর বাগান। আসলে পাঁচিল-ঘেরা সাত-আট বিঘে জমি, গাছপালার শেষ নেই, নিম কাঁঠাল শিরীষ থেকে আম জাম পর্যন্ত। কলকে করবীর ঝোঁপও আছে। আছে বেলফুলের কুঞ্জ, গাদার ঝোঁপ। ওরই মধ্যে চামেলিবাবুর বসতবাড়ি। বাড়িটা এমন কিছু বড় নয়, সুদৃশ্যও নয়, একতলা বেছাদ বাড়ি। পুরনো দিনের ধরন-ধারণে জানলা দরজা।

চামেলিবাবুর এই বাড়িটাকেই লোকে বলে চামেলিবাবুর বাগান। বাগানের গা ঘেঁষে তার কিছু জমি আছে। সেখানে মামুলি ছাদের আরও কয়েকটা বাড়ি । বাড়িগুলোর তিনটি চামেলিবাবুর। তিনি ভাড়া দেন। সিজন টাইমে দু-তিনমাস ভাড়াটে থাকে। বাকি দুটি বাড়ি তার নয়। সেখানে স্থায়ীভাবে অন্য দুই পরিবার থাকে ।

চন্দন বলল, “চল আমরা যাই। মুখ ধোওয়া চা খাওয়া পর্যন্ত হয়নি। কিকিরাও বোধ হয় উঠে পড়েছেন। পরে আবার আসা যাবে।”

তারাপদ ইতস্তত করে বলল, “যাব?”

“দাঁড়িয়ে থেকে আর আমরা কী করব!” বলেই চন্দনের কী মনে হল, দেহাতি লোকগুলোকে বলল, “আরে, কোই যাকে কুছ খবর দে দেও চামেলিবাবুকো। জলদি।”

সামান্য অপেক্ষা করে কে যেন বলল, “বাত তো ঠিক হায়–” বলে ছোকরা মতন লোকটা আলপথ দিয়ে ছুটতে লাগল। চামেলিবাবুকে খবরটা দিতে হবে ।

চন্দনরা আর দাঁড়াল না, ফিরতে লাগল। তারাপদ বলল, “ব্যাপারটা কী বল তো?”

“কীসের?”

“লোকটা কি জলে নেমেছিল? কেন নামবে?”

“বুঝতে পারছি না।”

“অত বড় পাথরটাই বা কেন থাকবে ওখানে?”

“পাথর আরও দু-একটা আছে এদিক-ওদিক। কাল আমরা যখন বেলায় ফিরছিলাম বাজার থেকে রাস্তা ধরে, আমি দেখেছি দুটো ধোপা ওখানে ভাটির কাপড় আছড়াচ্ছিল।”

“ধোপারা ওখানে কাপড় কাঁচে?”

“তাই তো দেখলাম।”

ব্যাপারটা ঠিক লক্ষ করেনি তারাপদ। এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে! মাত্র তো দু’দিন হল এসেছে তারা। গত পরশু বিকেলের দিকে। স্টেশন থেকে ওদের বাড়িটা মাইল খানেকের কম নয়। শর্টকাট করে মাঠ ভেঙে এলে সামান্য কম হয়। প্রথম দিন কে আর মাঠ ভেঙে আসে। তার ওপর সকালের দিকে বাজারে চক্কর মেরে বেড়িয়ে ফেরার সময় তারাপদ গাছপালা, দু-একটা ঘরবাড়িই লক্ষ করছিল। বিকেল বলতে এখন এক ফোঁটা । আলো মরছে কি সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার। স্টেশন, ডাকবাংলো, বাজারের জায়গাটুকু ছাড়া আলো নেই। তাও ইলেকট্রিকের আলো শুধু স্টেশন, বুকিং অফিস আর মুসাফিরখানায়, বাকি সব কেরোসিন ল্যাম্প। দোকানে পেট্রম্যাক্স।

তারাপদদের বাড়িটা চামেলিবাবুর জুটিয়ে দেওয়া। ছাদ পাকা, তবে মেঝে যেন খরখরে । সিমেন্ট আছে ঠিকই, কিন্তু কতটুকু কে জানে! বাড়িতে সরাসরি জলের ব্যবস্থা নেই; পাশের কুয়া থেকে একটা ছোকরা সকাল দুপুর জল তুলে দিয়ে যায়। রান্নার লোক খেপা যদু। পুরো নাম যাদব রায়। আদি বাড়ি বর্ধমান জেলার কোনও গ্রামে। যাদব অনেককাল থেকেই এখানে। অভয়বাবুর ভাত ডালের সস্তা হোটেল থেকে নিমাদের মিঠাইয়ের দোকানে কাজ করেছে। একবার পানের দোকান দিয়েছিল, ফেল মেরে গেল। তারপর কী খেয়াল হল দরজির দোকান বসাল বাজারে। সেটাও উঠে গেল। এখন সে যমুনাবাবুর কুঠিতে থাকে। নজরদারি করে। বাকি সময়টায় চামেলিবাবুর বাড়িতে ফাঁই ফরমায়েশ খাটে।

চামেলিবাবুই খেপা যদুকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। লোকটা দেখতে কাঠি, কিন্তু গলায় যেন মাইক ফিট করা। জোরালো গলা। ভাঙা ভাঙা স্বর। বকবক করে ভীষণ। তারাপদর ধারণা, খেপা যদু গাঁজা ভাঙ খায়।

তারাপদ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। চন্দনের কথায় ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। “কিছু বললি?” চন্দন বলল, “লোকটা–মানে ভদ্রলোকের বয়েস কত বলে তোর ধারণা?”

“কার! যে মারা গিয়েছে?”

“হ্যাঁ।”

“কত! চল্লিশের কম নয়, পঞ্চাশের বেশিও না। মাঝামাঝি।”

“স্বাস্থ্য তো ভালই মনে হল।”

“সলিড । ফাপা নয়। গায়ে ক্ষমতা আছে বলে মনে হয়।”

“দেখতেও মোটামুটি ভাল। তবে মাথার চুল কম। মনে হল, সবেই চুল ছেটেছে।”

“কী জানি! গায়ের রং একরকম ফরসা! তাই না! পরনে পাজামা, গায়ে পাঞ্জাবি। বাঙালি বলেই মনে হল। হাতের আঙুলে একটা তামার তারের আংটি। কেন কে জানে?”

“আমারও তাই মনে হয়। বাঙালি।”

“বেচারা!”

কথা বলতে বলতে বাড়ির কাছে এসে পড়ল দু’ জনে।

কিকিরা বাইরে একচিলতে বারান্দায় বসে আছেন। কাঠের মামুলি চেয়ারটা প্রায় বারান্দার শেষ প্রান্তে। রোদ এসেছে বারান্দায়। কিকিরার হাতে চায়ের পেয়ালা। পেয়ালা না বলে মগ বলাই ভাল। বসে বসে চা খাচ্ছিলেন। গায়ে হালকা গরম চাদর, গলায় মাফলার জড়ানো।

কিকিরা বললেন, “এই যে চন্দ্র-তারা! গুড মর্নিং। কোথায় গিয়েছিলে তোমরা? মর্নিং ওয়াক! চা যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল! যাও চা-টা ঢেলে নিয়ে খেয়ে নাও। আমিই করেছি। যদুবাবু এখনও আসেননি।”

খেপা যদু একটু বেলা করেই আসে। আসার সময় বাজার ঘুরে এটা-ওটা কিনে নিয়ে আসে। বলাই আছে তাকে। সকালের দিকে আনাজগুলো–তা

সে যাই হোক ভাল পাওয়া যায়। খেপা যদু দরাদরিতেও ওস্তাদ। এখানকার লোক বলে তাকে সিজনবাবু ভেবে দু পয়সা বেশি কামাবার উপায় নেই।

তারাপদ বলল, “গুড মর্নিং নয় সার, ভেরি ব্যাড মর্নিং!”

“ব্যাড মর্নিং! কেন?”

“সাত সকালে একটা খারাপ জিনিস দেখলাম! মৃত্যুদৃশ্য!”

“মৃত্যুদৃশ্য! বলো কী?” কিকিরা অবাক। চন্দন বলল, “আমি এখনও মুখে জল দিইনি। মুখ ধুয়ে চা নিয়ে আসছি, তারা। তুই কিকিরাকে ব্যাপারটা বল।” চন্দন চলে গেল ।

কিকিরা কিছুই জানেন না। অনুমান করারও উপায় নেই। তাকিয়ে থাকলেন তারাপদর দিকে।

তারাপদ সকালের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করতে লাগল। কিকিরা মন দিয়ে শুনছিলেন।

তারাপদ শেষ পর্যন্ত থামল। কিকিরা অল্পক্ষণ চুপচাপ। তারপর বললেন, “বাঙালি?”

“হ্যাঁ। আমাদের তো তাই মনে হল। বাঙালি ছাপ আছে।”

“কত বয়েস বললে, চল্লিশ-পঞ্চাশের মাঝামাঝি?”

“ওইরকম!”

“স্ট্রোক হয়েছিল নাকি? ভদ্রলোক জলেই বা নামতে যাবে কেন! আশ্চর্য! আর চাঁদুর কথা যদি ঠিক হয় তবে তো ভদ্রলোক শেষরাত বা মাঝরাতে মারা গিয়েছে। অত রাতে সে ঝিলের পাড়ে যাবে কেন! আশ্চর্য ব্যাপার!” বলে মাথা নাড়তে লাগলেন কিকিরা।

.

।। ২ ।।

খানিকটা বেলায় কিকিরা চন্দনদের নিয়ে যখন ঝিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন সেখানে বেশ ভিড় জমে গিয়েছে।

এখানকার থানা ছোট। নামেই পুলিশ স্টেশন। কাজকর্ম বিশেষ থাকে না। ছোটখাটো চুরি, গাঁ-গ্রামে দু’পক্ষের ঝগড়া লাঠালাঠি, কখনও বা বাজারের দিকে হইহল্লা থামিয়েই পুলিশের কাজ মিটে যায়। অবশ্য কদাচিৎ গাঁয়ের দিক থেকে খুনখারাপি, বিষ-খাওয়ার ঘটনাও এসে পড়ে। তখন দারোগাবাবুকে খানিকটা নড়েচড়ে বসতে হয় ।

কিকিরারা গিয়ে দেখলেন, থানা থেকে দারোগাবাবু এসে গিয়েছেন, সঙ্গে জনা দুয়েক গোঁফওয়ালা সেপাই। ওদিকে চামেলিবাবুও এসেছেন, তাঁর এলাকার দু-চারজন বাবু আর বাড়ির কাজের লোক। কৌতূহলী মানুষও রয়েছে।

কিকিরাদের দেখে চামেলিবাবু এগিয়ে এলেন।

কিকিরা বললেন, “কী হল চামেলিবাবু? হুট করে একটা লোক এভাবে মারা গেল।”

চামেলিবাবু বললেন, “এখানে কেউ এভাবে মরেনি রায়সাহাব! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।” বলে দারোগার দিকে তাকালেন। “আমাদের থানার অফিসার। আসুন পরিচয় করিয়ে দি।” কিকিরাকে চামেলিবাবু কখনও বলেন ‘রায়সাহাব’, কখনও ‘রায়বাবু।

দারোগাবাবুর নাম কৈলাসনাথ শর্মা। লোকে সাধারণত শর্মাজি বলে ডাকে। বয়েসে ছোকরাই; বছর পঁয়ত্রিশ হয়তো। মজবুত স্বাস্থ্য। চোখেমুখে পুলিশ অফিসারের রূঢ়তা ও কাঠিন্য নেই। বরং মোলায়েম ভাব। মুখে সামান্য দাড়ি। গোঁফটি ছোট করে ছাটা।

পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর শর্মাজি তারাপদ আর চন্দনকেও দেখলেন। কে যেন কিছু বলল ভিড়ের মধ্যে থেকে। চন্দনকে দেখিয়ে। গোড়া থেকেই ছিল বোধ হয় সে।

শর্মাজি চন্দনকে বললেন, “আপ ডক্টর? আপনি ডাক্তার?” হিন্দি বাংলা মিশিয়েই বললেন। “এরা বলছে, আপনি ওই লোকটির হাত তুলে পাস দেখেছেন?”

চন্দন মাথা হেলিয়ে বলল, “হ্যাঁ। আমি ডাক্তার। আমি ওকে দেখেছি। দেখেছি যখন তখন ও আর বেঁচে নেই। ডেড। “

“আপনিই প্রথম দেখেছেন?”

তারাপদ বলল, “না দারোগাজি, আমিই প্রথম দেখেছি।” বলে যা যা ঘটেছিল তারাপদ বলল পর পর।

দারোগা শর্মা কিছু বলার আগেই এক সেপাই এগিয়ে এসে বলল, “খাঁটিয়া আর হরিয়া ডোম আসছে, সঙ্গী নিয়ে।”

একটা ভাঙাচোরা দড়ির খাঁটিয়া নিয়ে দুজন লোক আসছিল। পুব দিকের মেঠো রাস্তা দিয়ে।

শর্মাজি মানুষটি ভাল। কিন্তু পুলিশ তো! আইন তাঁকে মানতেই হয়। চন্দনদের বললেন, “আপনাদের একবার থানায় যেতে হবে। ডর পাবেন না। রুটিন স্টেটমেন্ট নিতে হবে আমাকে।… আধা ঘণ্টা এক ঘণ্টা পরে আসবেন আপনারা, আগে এই বডিটা তুলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করি।”

কিকিরা চামেলিবাবু আর তারাপদরা একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, অন্যপাশে ভিড়ের মানুষ।

গাঁয়ের লোক বোধ হয় এ-ধরনের মরা মানুষ ছোয় না। জাত-পাত তো আছেই। তার ওপর বেমক্কা এক মরা লোক টানাটানি করে কে আর কোতোয়ালির নানান ফঁদে জড়িয়ে পড়তে চায়।

হরিয়া ডোমরা মাত্র দু’জন। জল আর পাথরের জায়গাটা তারা একটু পরিষ্কার করে নিল জল সরিয়ে–তারপর লোকটাকে টেনে তুলল। অর্ধেক শরীর ভেজা, কয়েকটা জলো লতা জড়ানো পায়ের দিকে। ভিজে সপসপে পাজামা। পায়ে স্ট্র্যাপ বাঁধা চটি, কোমরের তলায় একটা চামড়ার বেল্ট। পাজামার ওপর বেল্ট–বেশ অদ্ভুত ব্যাপার। তার চেয়েও অদ্ভুত বেল্টের বাঁ দিকে একটা খাপ। দেখলেই বোঝা যায়, পিস্তল নয়, ছোরা বা ড্যাগার রাখার খাপ। খাপটায় অবশ্য কিছু নেই। বাঁট বা মুখ দেখা যাচ্ছিল না ড্যাগারের।

লোকটাকে খাঁটিয়ায় শোয়ানো হল। প্রায় ধপ করে ফেলে দিল ডোমরা। নোংরা মারকিন বড় কাপড় সঙ্গেই ছিল তাদের। লোকটিকে দেখে গায়ে ফেলে দিল, মুখও ঢেকে দিল। এক সেপাই একটা কালো চাদর রেখে দিল খাঁটিয়ার পাশে। গরম চাদর।

চামেলিবাবু শর্মাকে জিজ্ঞেস করলেন, “চাদর কোথায় পেলেন?”

“মাঠে পড়ে ছিল–” বলে জায়গাটা দেখালেন। “একটা টর্চও পাওয়া গিয়েছে। এ টর্চ উইদাউট ব্যাটারি।”

“আচ্ছা! আজব ব্যাপার। টর্চ আছে ব্যাটারি নেই।”

“ওহি তো বাত।”

শর্মাজির হুকুমমতন তার সেপাইরা হরিয়া ডোমদের দিয়ে খাঁটিয়া তুলিয়ে নিল। তারপর চলে গেল। থানাতেই যাবে।

ভিড়টা একবার নজর করে দেখে নিলেন শর্মাজি। চেনা মুখ সব। দরকারে ওদের থানায় হাজির করাতে অসুবিধে হবে না।

ভিড় সরে গেল। সেপাই আর হরিয়া ডোমরা আলপথ ছেড়ে মেঠো রাস্তায় নামল।

কিকিরা কী মনে করে পাথরটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। জল খানিকটা ঘোলাটে, কিছু জলজ লতাপাতা অবশ্য আছে, শ্যাওলাও। তবু ততটা নোংরা নয়। ধোপারা এখানে কাপড় কাঁচার সময় জল সরিয়ে যতটা পারে পরিষ্কার করে নেয়। লক্ষ করলে ভাটির বড় গামলা অবশ্য এখন চোখে পড়বে না। তবে রাখার জায়গা আন্দাজ করা যায়, নীল আর মাড়ের জায়গাও। ঝিলের ওপাশে মাঠে তারা কাপড় শুকোতে দেয়। গতকাল কিকিরার চোখে পড়েছিল বড় রাস্তা দিয়ে ফেরার সময়।

রোদ বাড়ছিল।

শর্মাজি চলে যাবেন।

চামেলিবাবু হঠাৎ বললেন শর্মাজিকে, “বহুত মেহনত হল শমজি। চলুন, একটু চা-পানি খেয়ে যাবেন।”

চামেলিবাবুর বাগান বা বাড়ি কাছেই। শ দুয়েক গজ। সামান্য বেশিও হতে পারে।

শর্মাজি কী ভেবে বললেন, “চলুন।”

চামেলিবাবু কিকিরাদেরও ডাকলেন। “আসুন রায়সাহাব।”

কিকিরা আপত্তি করলেন না।

তারাপদ হঠাৎ শর্মাজিকে বলল, “আপনি এমন বাংলা কোত্থেকে শিখলেন শর্মাজি?”

শর্মাজি দাঁড়িয়ে পড়ে হেসে ফেললেন প্রথমে; পরে জোরেই হাসলেন। বললেন, “আমি দাদা সেভেন্টি পার্সেন্ট বাঙালি। বর্ধমানে আমার মামার বাড়িতে থেকে স্কুলে লেখাপড়া করেছি। গ্রাজুয়েশান করেছি কলকাতায়। সেন্ট পলসে পড়তাম। পুলিশ লাইনে আসার মতলব আমার ছিল না। আমার বাবা নেই। আমি যখন বালবাচ্চা তখনই মারা গিয়েছেন। মামারা গার্জেন ছিলেন। আমার বড়মামা পুলিশের লোক। ধানবাদে ছিলেন, মামা আমায়…”

বাকিটা আর বলতে হল না, তারাপদরা বুঝে নিল।

সামান্য পথ চুপচাপ। তারপর কিকিরাই চামেলিবাবুকে বললেন, “চামেলিবাবু ভদ্রলোক কে? আপনি চেনেন না?”

“না।” মাথা নাড়লেন চামেলিবাবু।

“আপনি এখানকার বরাবরের বাসিন্দে। ঘোরাফেরাও করেন। ভদ্রলোককে দেখেননি?”

“না, রায়সাহাব। দেখিনি। লোকটা নতুন। একদম নয়া এসেছে।” বলে একটু থেমে আবার বললেন, “আমি থাকি একদিকে, এই শহরটার তিনদিকে চারটে মহল্লা। কে কোথায় আসছে জানব কেমন করে! একটু পুরনো হয়ে গেলে হয়তো স্টেশনে বাজারে পোস্টঅফিসে মুখটা দেখা যায়। এ লোক নতুন।“

তারাপদ নিশ্বাস ফেলে, বিষণ্ণ গলায় বলল হঠাৎ, “ভদ্রলোক এখানে মরতে এসেছিল। কী কপাল!”

প্রথমে চুপচাপ, পরে শর্মা বললেন, “কমপ্লিকেটেড কেস। যে মরতে আসে তার কোমরে ড্যাগারের বেল্ট থাকে? ফাঁকা বেল্ট পরেই বা সে আসবে কেন?” কী যেন ভাবছিলেন শর্মা। টর্চটা দেখছিলেন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। “অ্যান্ড এ টর্চ উইদাউট ব্যাটারি! স্ট্রেঞ্জ!”

আর কোনও কথা বলল না কেউ।

চামেলিবাবুর বাগানে বসে চা খাওয়া শেষ হতেই শর্মাজি উঠে পড়লেন। তাঁর অনেক কাজ। যাওয়ার সময় চামেলিবাবুকে বললেন, “লোকটার পাত্তা আমি নিয়ে নেব। ডেডবডি থানায় পড়ে থাকবে এখন। বিকেলে চালান করে দেব সদরে। বাদে যা হয় বড়সাহেবরা করবেন। চলি..” বলে চন্দনদের দিকে তাকালেন, “থানায় আপনারা একবার আসবেন। প্লিজ। সাড়ে দশ বাজে আসুন। ও. কে।”

শর্মা চলে যাওয়ার পর কিকিরারা চুপচাপ। সাত সকালে এমন একটা ঘটনা ঘটবে কে জানত! মন খারাপ না হয়ে উপায় কী!

চামেলিবাবু যেন হঠাৎ অনুতাপ বোধ করে বললেন, “রায়সাহাব, আমার বড় খারাপ লাগছে। আপনাদের বলেকয়ে বেড়াতে নিয়ে এলাম এখানে। দু দিন যেতে না যেতে ঝাট! মাফি চাইছি।”

কিকিরা মাথা নাড়লেন। “না না, এতে আর আপনার দোষ কোথায়! জগতে কত কী তো হঠাৎ হয়ে যায়। ট্রেনে আসার সময় যদি একটা অ্যাকসিডেন্ট হত, ডাকাতের হাতে পড়তাম–আপনার কি তাতে দোষ থাকত!”

“আপনারা যখন থানায় যাবেন আমি সঙ্গে থাকব।”

“কোনও দরকার নেই। থানা চিনতে আমাদের অসুবিধে হবে না।”

তারাপদ বলল, “ডেডবডি সদরে পাঠাবার মানে কী, চামেলিবাবু?”

“সদরে হেড কোয়ার্টার। বড় পুলিশ অফিসাররা আছেন। সরকারি হাসপাতাল আছে। মর্গ আছে। বডির পোস্টমর্টেম হবে ওখানে।”

চন্দন মাথা হেলিয়ে বলল, “সাধারণ প্রসেসটা তাই। পোস্টমর্টেমটা জরুরি। অ্যাবনরমাল যে-কোনও মৃত্যুরই পোস্ট মর্টেম হওয়া উচিত। ওটা আইন। তবে আমাদের এখানে সব কাজ আইন মেনে হয় না।“ ।

চামেলিবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “এইসব ছোট গাঁ-গঞ্জে আইন বলতে পুলিশ । যা খুশি করতে পারে। … তবে শর্মা ভাল লোক। ভেরি গুড অফিসার। ওর বড়মামা ধানবাদ শহরে টেরার ছিলেন। মাফিয়াদের ঠাণ্ডা করে রাখার চেষ্টা করতেন ভদ্রলোক। অনেকবার ওঁকে মারার চেষ্টা হয়েছে…।”

কিকিরা যেন শুনছিলেন না কথাগুলো। অন্যমনস্ক। বললেন, “চামেলিবাবু আপনার এই বাগানের বাইরে গোটা পাঁচেক বাড়ি আছে, না?”

“হা, পাঁচ…।”

“বাড়িগুলো সব আপনার নয়?”

“তিনটে আমার। বাকি দুটো অন্যের। আমার কাছ থেকেই খানিকটা জমি কিনে বাড়ি করেছে।”

“কোন দুটো?”

“পশ্চিম দিকের। একটা বাড়ি শীতলবাবুর। ঘোলাটে দেখতে। হলুদ। ছোট বাড়ি। ভাঙাচোরা চেহারা। শীতলবাবু এখানেই কাজ করতেন একসময়। পোস্টমাস্টারবাবু। চাকরির পর এখানেই বাড়ি করে থাকতে শুরু করেন। প্রায় বুড়োমানুষ। ওঁর স্ত্রী আছেন। ছেলে ছিল। জোয়ান। বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে রাঁচির দিকে চলে যায়। সেখানে কাজকারবার করে। বাপের সঙ্গে সম্পর্ক নেই বলতে পারেন। বিয়ে-থা করে নিজের মতন থাকে তফাতে।”

“শীতলবাবুর চলে কেমন করে?”

“সামান্য জমানো আছে। বাকিটা চলে বদ্যিগিরি করে। উনি একদিকে কবিরাজ অন্যদিকে হোমিওপ্যাথ। গাঁ গ্রামের গরিব মানুষ শীতলবাবুর কাছে আসে। সকালে ভিড় হয়।”

“ও! অন্য বাড়িটা কার?”

“কচি–মানে কাঞ্চনের। কচির দোকান আছে বাজারে। স্টেশনারি। পুরনো দোকান। কচি তার মাকে নিয়ে থাকে। ছোকরা বেশ তেজি।”

“মানে?”

“মানে কাউকে রেয়াত করে না। কথা বলে কটকট করে! এমনিতে ভাল।”

“ওকে কি সকালে দেখেছি ভিড়ের মধ্যে?”

“না। ওকে কেমন করে দেখবেন! আজ বৃহস্পতিবার। ওর দোকান বন্ধ। ও বুধবার সন্ধের গাড়িতে মালপত্র কিনতে ধানবাদ আসানসোল চলে যায়। আজ বিকেলে ফিরবে। আপনি শীতলবাবুকে দেখেছেন।”

“রোগা বুড়োমতন দেখতে। গায়ে মেরুন রঙের চাদর ছিল।”

“ঠিক ধরেছেন। চুপচাপ মানুষ।”

“বাকি তিনটে বাড়ি আপনার?”

“করেছিলাম এক সময়ে। এখন ভাড়া দিই। সিজন টাইমে ভাড়া হয়ে যায়-অন্য সময় ফাঁকা।”

কিকিরা কথা বলতে বলতে কাশলেন বার কয়েক। “এখন তিনটে বাড়িতেই ভাড়াটে আছে?”

“তা বলতে পারেন।” চামেলিবাবু পকেট থেকে সিগারেট বার করলেন। “খাবেন নাকি?” কিকিরা মাথা নাড়লেন, কাঁচা সর্দিতে গলা জ্বালা করছে। চন্দনরা সিগারেট নিল।

চামেলিবাবুর বাড়িটি মাঝারি। একতলা। পুরনো ধাঁচের বাড়ি। বারান্দায় বসে চা খাওয়া হচ্ছিল। সামনে আশেপাশে বাগান। বড় বড় গাছ। ফুলবাগান মামুলি। অনেকটা তফাতে গোয়ালঘর। একপাশে বড় ইঁদারা।

কিকিরা বললেন, “ভাড়াটে কারা? কোত্থেকে এসেছে?” চামেলিবাবু বললেন, “কলকাতা থেকে এসেছেন গণপতি পাঁজা। বলেন, আলসারের রোগী। জল হাওয়া বদলাতে এসেছেন। মোটেই মিশুকে নন। ঘোরাফেরাও বড় করতে দেখি না। কথাবার্তা বলেন কম। চোখমুখ দেখলে মনে হয় স্বভাবে খিটখিটে।”

“কী করেন কলকাতায়?”

“চিৎপুরে পাঁজাবাবুর দু’ পুরুষের দোকান। ডিজাইনার অ্যান্ড ড্রেস মেকার। বলেন তো তাই। থিয়েটার যাত্রার সাজ তৈরি করান। নকল চুল দাড়িও। বলেন, ড্রেস মেকার পাঁজা বললেই–এক ডাকে সবাই চিনতে পারে, থিয়েটার যাত্রা মহলে!”

“ও! একাই এসেছেন?”

“স্ত্রী মারা গিয়েছেন বছর কয়েক আগে। এখন ভৈরব বলে একটা লোকই পাঁজাবাবুর দেখাশোনা করে। অনেক কাল ধরেই ওঁর কাছে। “

“ভৈরব!”

“চেহারা দেখলে মনে হয় ডাকাত। যেমন তাগড়া তেমনই কালো। মাথার চুল একেবারে সেই হাবসি টাইপ। বেটার গলায় আবার কণ্ঠি।” চামেলিবাবু হাসলেন যেন।

“অন্য ভাড়াটে কারা?”

“গোল বারান্দাওয়ালা বাড়িটায় এসেছেন, মাখনলাল দত্ত, ভদ্র সজ্জন মানুষ, কলকাতায় এক ছাপাখানার ম্যানেজার। সঙ্গে স্ত্রী আর একটি বাচ্চা ছেলে। স্ত্রী বোধ হয় গানটান জানেন। আসা যাওয়ার পথে শুনেছি এক-আধবার।”

“একেও কি আজ সকালে দেখেছি?”

“না। অত সকালে এঁদের কাউকে বাইরে দেখা যায় না। বিকেলবেলায় বেড়াতে বেরোন। “

“তিন নম্বর ভাড়াটে কারা মশাই?” চামেলিবাবু এবার যেন সামান্য বিরক্ত হলেন। বললেন, “আর বলবেন না, আগে তো কিছু জানতাম না। না জেনেই ভাড়া দিয়ে দিয়েছি। দুটো ষণ্ডা এসে জুটেছে। জামশেদপুর থেকে মোটরবাইক হাঁকিয়ে এসে হাজির। দুই বন্ধু। একজন বলে, সে বড় এক ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ, অন্য বন্ধুটি নাকি কপার কপোরেশানে। সে ছোকরা আবার খেলোয়াড়, হকি প্লেয়ার। দুই যেন মানিকজোড়। বয়েস কম। হুল্লোড় করে বেড়ায়। আবার কানে যন্তর লাগিয়ে নাচে। ওরা বোধ হয় বেশি দিন থাকবে না। ভাড়া অবশ্য পুরো মাসের দিয়েছে।”

“নাম কী?” চন্দন বলল।

“নামের বাহার আছে। একটার নাম, পল্লব; পল্লব মুখার্জি! আরেকটার নাম, লাডলি হালদার।”

“হকি খেলোয়াড়?”

“তাই হবে। বলে তো হকি খেলত! ওই দুটো ষাঁড় আমাকে জ্বালিয়ে মারছে।”

“কেন, কেন?”

“আরে মশাই, যখন তখন এসে নানান বায়নাক্কা করে।”

“কীরকম?”

“রকম আবার কী! মজা, খেয়াল, অন্যকে বিরক্ত করা। একবার হঠাৎ এসে বলল, মুরগির কী এক রান্না করবে, বাসন দাও!..আর একদিন এসে বলল, নাচ দেখবেন, ভাঙড়া নাচ?… দাদা চলুন না–একটু ফিশ খেলব। দু পয়সা পকেটে আসতে পারে…। আপনার বাগানে ভূত আছে নাকি–কে যেন মাঝরাতে নাক ডেকে ঘুমোয়! রসিকতা করে মশাই! সেদিন এসে বলল, ঘুমের বড়ি আছে? দিন না দুটো। সাউন্ড স্লিপ হচ্ছে না ক’দিন।”

তারাপদ হেসে ফেলল।

“হাসির কথা নয়। আমি ওদের বাপের বয়েসি। আমায় নিয়ে ঠাট্টা তামাশা!…তা সেদিন রেগে গিয়ে বলেছি, ওহে আমার বাড়িতে দোনলা বন্দুক আছে। দেখবে? তোমরা পুরনো বন্দুক দেখেছ! উইলসন রেঞ্জ! জানো না! একবার দেখবে! দেখে নাও! বলে জংলীকে ডাকলাম। জংলী আমার বাড়িতেই থাকে। জংলী বন্দুক এনে দিল। বন্দুক হাতে পেলে তার অবস্থাটা হয়ে দাঁড়ায় ভয়ঙ্কর। ওই দুটো ফাজিল ছেলেকে চোখের পলকে শেষ করে দিতে পারে।”

তারাপদ কৌতূহল বোধ করে বলল, “সর্বনাশ! ওরা জংলীকে বন্দুক হাতে দেখল!”

চামেলিবাবু মুখ টিপে হাসলেন। “দেখল বইকী! তারপর আর মুখে কথা নেই। পালিয়ে গেল। সেদিন থেকে আর জ্বালাতে আসে না।”

চন্দন চিনতে পারল ছোকরা দু’জনকে। কাল বিকেলেই বাজারের কাছে দেখেছে। মোটরবাইকে স্টার্ট দিচ্ছিল। জিনসের প্যান্ট আর গায়ে জ্যাকেট। বোম্বাই সিনেমার লড়াকু হিরোদের মতন দাঁড়িয়ে ছিল। তারাপদও দেখেছে। তবে কলকাতায় এসব আজকাল এত দেখা যায় যে, আলাদা করে চিনে রাখার দরকার করে না।

কিকিরা চামেলিবাবুকে বললেন ঠাট্টা করেই, “আপনি তাহলে বেঁচে গিয়েছেন বলুন!”

“বাঁচা আর কী! স্বস্তি পেয়েছি।…তবে ছোকরা দুটো এখানে আর বোধ হয় থাকবে না।”

“কেন? এক মাসের ভাড়া নিয়েছে…”

“মাস-ভাড়া ছাড়া বাড়ি তো আমি দিই না। কেউ দেয় না। ওরা ভাড়া নেওয়ার সময়েই বলে দিয়েছিল–হপ্তা দেড়েক থাকবে বড় জোর!”

“হপ্তা দেড়েক হয়ে গিয়েছে?”

“তা হল!”

কিকিরা এবার উঠে পড়লেন। খানিকটা আচমকাই। বললেন, “এখন চলি। চামেলিবাবু! অনেকক্ষণ হয়ে গেল! বেলা হয়ে যাচ্ছে! একবার থানায় যেতে হবে।”

ঘড়ি দেখল চন্দন। দশটা বেজে গিয়েছে।

চামেলিবাবু বললেন, “আমি আপনাদের সঙ্গে যাই। থানায় যাবেন–!

“আরে না না, আপনি বসুন! আমরা তো এ-সময় একবার টহল মারতে বেরোই। থানাটাও ঘুরে যাব।”

তারাপদরা উঠে পড়ল।

আসবার সময় তারাপদ হালকাভাবে বলল, “আপনার জংলীকে কিন্তু আমরাও দেখিনি। “

“আছে বাড়িতেই। ইঁদারার ওপরের ঢাকা জালটা ভেঙে গিয়েছিল একপাশে। সারানোর কাজ করছিল সকাল থেকেই। পরে দেখতে পাবেন, ওকে দেখা কঠিন কিছু নয়। কাজ নিয়ে থাকে।”

কিকিরারা আর দাঁড়ালেন না।

.

বাইরে এসে মাঠের রাস্তা ধরে যেতে যেতে কিকিরা প্রথমে ছড়ানো ছিটোনো বাড়িগুলো দেখছিলেন। আগেও দেখেছেন তবে নজর করে নয়। এখানে আসা তো মাত্র দিন দুই। গতকালই যা একবার এসেছিলেন চামেলিবাবুর বাগানে। আর আজ।

তারাপদ আর চন্দন থানায় গিয়ে কতক্ষণ আটকে যাবে সেটাই ভাবছিল। বেলা তো বেড়েই যাচ্ছে। বাজারে সামান্য কাজও ছিল। এ-বেলা হয়তো হবে না। খেপা যদু বাড়িতে কী করছে কে জানে!

কিকিরা হঠাৎ বললেন, “চাঁদু, ট্র্যাঙ্গল মানে ত্রিভুজ জানো তো!”

চন্দন তাকাল। তারাপদও।

কিকিরা হাত দিয়ে ঝিলের দিকটা দেখালেন। তারপর এপাশ ওপাশ। বললেন, “এটা একটু নজর করো। আমরা যে মাঠের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি–চামেলিবাগানের গা ঘেঁষে, এটা ঝিলের দক্ষিণ দিক। এই রাস্তাটা গিয়ে ওই বড় রাস্তা–মানে এখানকার মেন রাস্তায় পড়েছে। ওটা উত্তর দিক। আর ঝিল তো দেখতেই পাচ্ছ। আমরা থাকি উত্তর দিকে। প্রায় উত্তর। বিশ ত্রিশ পা হাঁটলেই কাঁচা মেন রোড। “

“আপনি সার আমাদের দিক শেখাচ্ছেন?”

“না। আমি বলছি, ঝিলের কথা। দু দিকে দুই রাস্তা। উত্তর আর পুবে। এ দিকে দক্ষিণে আলপথ ঝিলের। এই আলপথ দুই রাস্তাকে জয়েন করেছে। মানে ইট ইজ লাইক এ ট্র্যাঙ্গল। অর্থাৎ তিন দিকে তিন পথ, মাঝখানে ঝিল। ত্রিভুজ বলা যায় কি না!”

চন্দন দেখল । মাথা নাড়ল। “তা বলতে পারেন। “

“আমার প্রশ্ন হচ্ছে, মাঝরাতেই হোক কি শেষরাতে, একটা লোক বড় রাস্তা ছেড়ে আলপথ দিয়ে যাবে কেন? হোয়াই?”

তারাপদর মনে হল, প্রশ্নটা যথার্থ। কিকিরা বললেন, “লোকটা হয় চামেলিবাগানের দিক দিয়ে এসেছিল–মানে আসছিল; না হয় উত্তর দিক দিরে। শর্টকাট পথে। তাই না?”

চন্দন ভাবল কয়েক মুহূর্ত, তারপর বলল, “তাই তো মনে হয়।।“

কিকিরা হাসলেন। “লোকটা কে? কেন এভাবে যাচ্ছিল?”

.

৩ ॥

থানা ছোট। ইট রঙের বাড়ি। মাথায় টালির ছাদ। কম্পাউন্ডওয়াল বলে কিছু নেই। তফাতে দারোগাবাবুদের কোয়াটারস, অন্য পাশে সেপাই জমাদারদের। অন্তত তাই মনে হয়। গাছগাছালি কম নয় চারপাশে, মাঠও আছে। খানিকটা তফাতে বিশাল এক ঘোড়ানিম আর কাঁঠালগাছের তলায় একটা খাঁটিয়া পড়ে আছে। স্পষ্টই বোঝা যায়, সকালের সেই অজ্ঞাত মানুষটির মৃতদেহ।

কৈলাসনাথ শর্মা নিজের ঘরে বসে ছিলেন। কিকিরার ঘরে আসতেই শমজি বললেন, “বসুন। আপনাদের কথাই ভাবছিলাম।”

“দেরি হয়ে গেল?”

“না না, ঠিক আছে। “ বলে শর্মা তাঁর টেবিলের ওপর রাখা কাগজপত্র খাতা নাড়াচাড়া করলেন অন্যমনস্কভাবে। তারপর সাদামাটা গলায় যা বললেন–তার অর্থ হল তিনি সাধারণ একটা স্টেটমেন্ট লিখিয়েই চন্দনদের ছেড়ে দেবেন। এটা কোনও ডায়েরি নয়। মোটামুটিভাবে সকালে যা যা দেখেছে তারাপদরা, তা বললেই কাজটা মিটে যাবে। “ঘাবড়াবেন না, তামাকে আমার কাজটা করতে দিন, আপনাদের আমি এই মামলার সঙ্গে জড়াচ্ছি না।”

তারাপদ আর চন্দন যা বলার বলল। শর্মা নিজেই লিখে নিলেন খাতায়। তারপর খাতাটা এগিয়ে দিলেন। অর্থাৎ, আপনারা পড়ে দেখে নিন ভুলভাল লিখেছি কি না! তারপর একটা করে সই করুন প্লিজ।

তারাপদরা পড়ল। সই করে দিল।

কিকিরা বললেন, “আমাকে সই করতে হবে?”

“বেকার। আপনি সই করে কী করবেন! আপনি অনেক পরে এসেছেন। আমি তখন স্পটে প্রেজেন্ট ছিলাম। আরও বহুত লোক ছিল।”

সেপাই-জমাদার গোছের একটা লোক চার গ্লাস চা এনে টেবিলে রাখল। গ্লাসগুলো ছোট, কিন্তু পরিষ্কার।

“নিন বাবু, থোড়া চা পানি খান! পান সিগারেট খাবেন?”

“না না।” বলে চন্দন নিজেই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে এগিয়ে দিল।

শর্মা হাসলেন। বললেন, “সিগারেট আমি খাই না। প্যাকেটের খইনি খাই। খাবেন?” বলে টেবিলের ড্রয়ার টেনে খইনির প্যাকেট বার করলেন।

চন্দনরা মাথা নাড়ল। হেসে বলল, “বমি করে ফেলব দারোগাসাহেব, অভ্যেস নেই।”

চা খেতে খেতে কিকিরা বললেন, “ডেডবডিটা গাছতলায় ফেলে রেখেছেন? এবার তো পচতে শুরু করবে।”

শর্মা বললেন, “বিকেলে পাচার হয়ে যাবে।…রায়সাহেব, কী আজব বাত! আমি বিশ বাইশ জন লোককে থানায় হাজির করলাম : রেলস্টেশনের টিকিট কালেক্টর দু-তিনজন, এ এস এম পালবাবু, বাজারের হালুইঅলা লোচন, পানঅলা ভুলুয়া, ট্রেকারের ড্রাইভার মোহন–আরও ক’জন দোকানদার। ওরা বডি দেখল–আইডেন্টিফাই করতে পারল না। বলল, এই লোকটাকে তারা দেখেনি!”

“তাহলে লোকটা এল কোথা থেকে?”

“ওহি তো বাত।”

“আরও তো লোক থাকে এখানে শর্মাজি…”

“থানা থেকে আমার লোক পাঠিয়ে ঘরে ঘরে খোঁজ নিচ্ছি, সব খবর পাইনি এখনও।”

“নো ওয়ান ইজ মিসিং?”

শর্মা মাথা নাড়লেন। “নো। নান।” বলে চন্দনের দিকে তাকালেন শর্মা, “হোয়াট ইউ থিঙ্ক ডাগতারসাহেব? টাইম অব ডেথ?”

চন্দন কেমন বিভ্রমে পড়ে গেল। বলল, “শর্মাজি, আমার পক্ষে ঠিক বলা সম্ভব নয়। আন্দাজে বলতে পারি, মাঝরাত বা শেষরাত।”

“আপনি পারেন না?”

“না। ডাক্তারদের ওপিনিয়ান সব সময় ডিফার করে। এ ব্যাপারে বেস্ট জাজ পোস্টমর্টেম যিনি করবেন তিনি। যদিও দেখেছি এঁদের মতও পুরোপুরি মেলে না। আপনি অন্য কাউকে…”

শর্মা মাথা হেলালেন। মানে, তিনি এদিককার কোনও ডাক্তারকেও দেখিয়েছেন মৃতদেহ। তিনিও সময় বলতে পারেননি ঠিকমতন।

কিকিরা বললেন, “আপনি কী মনে করেন শমজি? ন্যাচারাল ডেথ?”

“না।” মাথা নাড়লেন শর্মা, “ন্যাচারাল মনে হয় না।”

“মার্ডার? এ কেস অব কিলিং?” তারাপদ বলল।

“আই থিঙ্ক সো! মাগর লোকটা কে? কে মার্ডার করল? হোয়াই? হু ইজ দিস ম্যান?”

কিকিরাও এই দুটি কথা জানতে চান। সামান্য সময় চুপ করে বসে থেকে হঠাৎ হাত বাড়ালেন, “দিন সার, আপনার প্যাকেটের খইনি দিন। আমি চুরুট খাই। খইনি হজম করতে পারব।”

চন্দন যেন আঁতকে উঠল। কিকিরার সর্দিজ্বর, সামান্যই জ্বর অবশ্য, গলা বসে আছে। কাশছেন মাঝে মাঝে। এর ওপর খইনি। নিঘাত কাশির দমকে একটা বিপদ বাধাবেন।

খইনির প্যাকেট নিয়ে কয়েক মুহূর্ত দেখলেন কিকিরা। তারপর হেসে বললেন, “এই খইনি কারা খায় শর্মাজি! গোলাপ মাকা খইনি! নরম বোধ হয়।” বলে প্যাকেট থেকে একটু জরদা বাঁ হাতের তালুতে ঢেলে নিলেন। প্যাকেটটা এগিয়ে দিলেন শর্মাকে।

“স্টেশনের বাবুরা লোকটিকে জানতে পারেন নাকি?” কিকিরা বললেন, খইনি তখনও মুখে দেননি।

শর্মা বললেন, “চান্স আছে। বাত কী জানেন রায়সাহাব, এখন প্রপার সিজন টাইম নয়; দেওয়ালি শেষ। পূজায় যারা এসেছিল তারা ফিরে গিয়েছে। নভেম্বরের এন্ডে কম লোক আসে এখানে বেড়াতে। ডিসেম্বরের মিড উইক থেকে আবার লোক আসবে। জানুয়ারিতে রাশ থাকে …। ব্যস সিজন খতম।”

কিকিরা শুনলেন, ভাল বুঝলেন না। তাকিয়ে থাকলেন।

শর্মা বুঝতে পারলেন, কথাটা ধরতে পারেননি রায়সাহাব। তারপর ব্যাখ্যা করে বোঝালেন, এ-সময় এত কম লোক আসে–মানে বেড়াতে আসে বাঙালিবাবুরা যে রেলস্টেশন থেকে বেরুবার সময় টিকিট কালেক্টররা মোটামুটি মুখগুলো নজর করতে পারেন। স্টেশনের মালবওয়া পোটাররাও চিনে নিতে পারে। শমজি সেই আন্দাজে ডেকে আনিয়েছিলেন জনা কয়েক স্টেশনের বাবুকে। কেউ কিছু বলতে পারল না। বাজারের লোকরাও নয়। তা ছাড়া একেবারে নয়া লোক না হলে হাটেবাজারেও তার মুখ দেখা যায়। এই লোকটি একেবারে নয়া হতে পারে।

খইনি মুখে দিলেন কিকিরা, ঠোঁটের তলায়। মুখ সামান্য বিকৃত করলেন। কাশলেন না।

শর্মা হাসছিলেন।

চন্দন বলল, “শর্মাজি, আমরা এবার উঠতে পারি?”

“জরুর পারেন। … আমার দরকার পড়লে আপনাদের সঙ্গে মিট করব।”

কিকিরা উঠলেন না। বললেন, “শর্মাজি, চামেলিবাবুর বাগানের বাইরে যে বাড়িগুলো আছে; তাদের খোঁজখবর রাখেন?”

শর্মা অবাক। বললেন, “শীতলবাবু! ওল্ড ম্যান। আমি চাচাজি বলি। গুড হোমিওপ্যাথ । পুরনো লোক। ভাল লোক!”

“কাঞ্চন। ছোকরা।”

“আরে, কচিবাবু আমার ইয়ার দোস্ত।”

“বাকিরা? চামেলিবাবুর ভাড়াটেরা?”

“শুনেছি। দেখিনি।”

“মোটরবাইক নিয়ে যে ছোকরা দুটো ঘুরে বেড়ায়।”

“দেখেছি। এনিথিং রং উইথ দেম?”

“না। ওই ছোকরা দুটো যাতে এখান থেকে হুট করে পালাতে না পারে, সার। দু-চারদিন আটকে রাখুন। পারবেন না?”

শর্মা অবাক হয়ে বললেন, “কেন?”

“দেখুন না ক’দিন।” কিকিরা এবার উঠলেন। খইনি হজম করে ফেলেছেন নাকি!

শর্মা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন–তার আগেই কিকিরা নিজের জিভ বার করে দেখালেন। জিভের ডগায় একটা কাশির দমক থামার বড়ি। “

অবাক হয়ে শর্মা বললেন, “আরে!”

“পেপস!… কাল এখানের দোকানে কিনেছি।”

“আমায় বুদ্ধ বানালেন রায়সাহাব।” শর্মা হাসতে লাগলেন। কিকিরা হাসতে হাসতে বললেন, “আমি ম্যাজিশিয়ান শর্মাজি। এক সময় খেলা দেখাতাম। এখন সিটিং আয়ছিল।”

শর্মাজি হো হো করে হাসতে লাগলেন। চলে আসার সময় কিকিরা কী মনে করে ঝিলের কাছে পাওয়া টর্চটা দেখতে চাইলেন। দেখালেন শর্মা। দেখলেন কিকিরা ।

.

বাড়ি ফেরার পথে তারাপদ বলল, “কিকিরা সার, বেড়াতে এসে আচ্ছা এক প্যাঁচে পড়ে গেলুম।”

“কেন?”

“কেসটা যদি মার্ডার কেস হয়, আমরা দুজন–চাঁদু আর আমি তো ঝামেলায় পড়ে যাব। উইটনেস হওয়ার জন্যে ডাক পড়বে না?”

“আরে দাঁড়াও। কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় দেখো আগে। আর উইটনেস হলে ফাঁসি যেতে হয় না।”

“আমার বাজে লাগছে।”

চন্দন বলল, “কিকিরা, এই চামেলিবাবু লোকটি কেমন?”

“কেমন করে জানব! পরিচয় সামান্য।”

“বাঃ!”

“বা কেন?”

“চামেলিবাবুর কথায় আপনি এখানে বেড়াতে এলেন, সঙ্গে লেজুড় করে নিয়ে এলেন আমাদের, এখন বলছেন–কেমন করে জানব!”

কিকিরা মজার গলায় বললেন, “সংস্কৃতে একটা কথা আছে, পত্রম্ ন পরিচয়তে গুণম্ …! ঠিক সংস্কৃতটা ভুলে গিয়েছি–মনে নেই। আদত কথাটা বলি, তোমরা তো আবার সংস্কৃত বোঝো না। নিমপাতা যে তেতো এটা অভিজ্ঞতা থেকে জানা গিয়েছে, মুখে না দিলে জানা যেত না। একটা বাচ্চাকে এক আধ চামচে নিমপাতার রস খাওয়ানো যায়–যতক্ষণ সে না বুঝছে জিনিসটা খেতে কেমন! একবার মুখে গেলে আর কি খেতে চায়! এটাও সেইরকম হে! চামেলিবাবুর সঙ্গে আলাপ হয়ে মন্দ লাগেনি। কত বাবুর সঙ্গেই তো পরিচয় হয়, আগে থেকে বুঝব কেমন করে সে কেমন–”ভাল, না, মন্দ!”

কথাটা কিকিরা মিথ্যে বলেননি। রজনী সরকারের বাড়িতে আলাপ হয়েছিল চামেলিবাবুর সঙ্গে। রজনীবাবুরা অ্যাটর্নির বংশ । তিন পুরুষ হয়ে গেল একরকম। রজনীবাবু অবশ্য আইনের চেয়ে ধর্মকর্মের বই লেখা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। পেটের চিন্তা নেই, পরমার্থ চিন্তাতেই আনন্দ পান। মানুষটি ভাল, সুরসিক। কিকিরার সঙ্গে পরিচয় অনেকদিনের।

রজনীবাবুর বাড়িতে চামেলিবাবুকে দেখেছিলেন কিকিরা, আলাপও হয়েছিল। নিজের বিষয়গত একটা কাজে কলকাতায় এসেছিলেন চামেলিবাবু। বছরে এক-আধবার তাঁকে আসতে হয় কলকাতায়, বৈষয়িক কাজে। অবশ্য বৈষয়িক কাজগুলোর বৃত্তান্ত কিকিরা জানেন না, জানার আগ্রহও বোধ করেননি।

চামেলিবাবুই বেড়াতে আসার কথা তুলে উসকে দিলেন কিকিরাকে।“চলে আসুন, মশাই। আমাদের হাবিলগঞ্জ নামকরা জায়গা নয়। ছোট জায়গা। লোকজন কম। কিন্তু ভাল জায়গা। ক্লাইমেট ভাল এখন। জল হাওয়ার গুণ রজনীবাবুই জানেন।“

রজনীবাবু বার দুই এসেছেন এখানে। তাঁর এক মক্কেলের বাড়িও আছে। বললেন, “যাও কিঙ্কর, ঘুরে এসো কিছুদিন। তোমার শরীরটাও তো ভাল যাচ্ছে না বলছিলে। দিস ইজ প্রপার টাইম-বেশি শীত পাবে না, ভিড়ও পাবে না, জলটাও এমন স্বাস্থ্যকর! চলে যাও।’

কিকিরার শরীর হালে ভাল যাচ্ছিল না। গ্যাসট্রিকের ব্যথা, খানিকটা দুর্বলতা, ঘুমের গোলমাল। কী যেন মনে করে রাজি হয়ে গেলেন।

চামেলিবাবুই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন সব। বাড়ি, খেপা যদু থেকে ঘরদোর ঝাড়মোছ করার একটা লোকও। সামান্য বিছানাপত্র ছাড়া কিকিরাদের কিছুই আনতে হয়নি । তক্তপোশ, অল্পস্বল্প আসবাব থেকে রান্নার বাসনপত্র–সবই ছিল এই বাড়িতে।

এখানে মাত্র দিন দুই এসেছেন কিকিরা। চামেলিবাবুর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা তেমন হয়নি। তবে এটুকু বুঝেছেন, ভদ্রলোকের মানমর্যাদা এখানে যথেষ্ট। পুরনো মানুষ তো অবশ্যই। তার ওপর মোটামুটি ধনী। কলকাতার ধনী বলতে যেমন বোঝায় লোকটি তেমন নয়। মানে ধনীর আড়ম্বর চাকচিক্য নেই। অহঙ্কারও নয়। সেদিক থেকে গেঁয়ো হয়তো। চামেলিবাবুর জমিজায়গা আছে এখানে, ধানের জমি আছে, বাজারে কয়লা কেরোসিনের ডিপো আছে, লোক আছে দোকানে। আরও টুকটাক আছে কিছু।

চামেলিবাবু কিন্তু অবিবাহিত। তাঁর নিজের কেউ নেই। একটি মাত্র ছেলে থাকে–সম্পর্কে ভাইপো। এখানে থাকে না। চামেলিবাবুর নিজের ভাই ‘একজন মাত্র। সে বরাবরই ঘরছাড়া। কবে কোন কালে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে জাহাজের আর্টিজান হয়েছিল। এখন পদমর্যাদা বেড়েছে অনেক। কিন্তু ঘরে ফেরা আর হয়ে ওঠেনি। মাঝে মাঝে চিঠি লেখে; শেষ দেখা একবারই হয়েছিল, বছর দুয়েক আগে। দাদাকে দেখা দিতে এসেছিল।

চামেলিবাবু সম্পর্কে এর বেশি কিছু জানেন না কিকিরা।

“কই, কিছু বলছেন না যে!” চন্দন বলল।

“কী বলব?”

“চামেলিবাবু কেমন লোক?”

“খারাপ বলে তো মনে হয় না এখনও।”

“মানে আপনি …”

“ক্রিমিন্যাল বলে মনে করি কি না জানতে চাইছ?… তা যদি বলো তাহলে আমি বলব, ক্রিমিন্যালদের ভ্যারাইটি বা ক্লাস আছে। খুনখারাবি যারা করে বা করায় তারা যে-জাতের ক্রিমিন্যাল, আর জমিজায়গা নিয়ে মামলায় অন্যকে যারা ফাঁসায় তারা অন্য ধরনের ক্রিমিন্যাল। চামেলিবাবু ব্যবসাদার লোক। চালাক হতেই পারেন। তবে এই কেসের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক আছে বলে আমি এখনও মনে করি না।”

“কার আছে, সার?”

“কেমন করে বলব। লোকটা যে কে এখনও জানা গেল না।”

“সত্যি, এটাই কেমন অবাক কাণ্ড।

“শর্মাজি কি পাত্তা করতে পারবে?”

“কী জানি! তেমন ভাবে লেগে থাকলে পারতেও পারে।”

তারাপদ বলল, “ডেডবড়িটা তো বিকেলে চালান হয়ে যাবে সদরে । সময় কম। “

কিকিরা কিছুই বললেন না।

.

৪ ॥

পরের দিন চামেলিবাবু নিজেই এলেন সকালের দিকে।

ভদ্রলোকের পোশাক সাধারণ। ধুতি, গরম পাঞ্জাবি, পায়ে মোজা আর চামড়ার জুতো। পাটকরা মোটা চাদর গলার কাছে জড়ানো। হাতে বেতের মোটা ছড়ি। চামেলিবাবুর বয়েস বুঝতে কষ্ট হয় না। ষাট পেরিয়েছেন। মাথায় পাতলা চুল। রগ ঘেঁষা চুলগুলো সব পাকা। দূরের জিনিস দেখতে অসুবিধে হয় না। কাছের জিনিস ঝাপসা দেখেন। চশর্মা আছে। তবে বেশিরভাগ সময় সেটা খাপ-সমেত পকেটে থাকে। চামেলিবাবুর গায়ের রং কালো, খয়েরি-কালো। গড়ন ছিপছিপে। মাথায় লম্বা।

হাঁটতে হাঁটতেই এসেছেন চামেলিবাবু। তাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আলপথ ধরে এবাড়িতে আসতে মিনিট কুড়ি-পঁচিশ সময় যায়। সাধারণ জোরে হাঁটলে। নয়তো সামান্য বেশি।

কিকিরা বাইরেই ছিলেন। রোদ লাগাচ্ছিলেন গায়ে পিঠে। বললেন, “আসুন, বেড়াতে বেড়াতে নাকি?”

চন্দন আর তারাপদ গিয়েছে বাজারে। খেপা যদুকে বাজারেই পাবে, পেলে একটু মাছের খোঁজ করবে। এখানে মাছ এ-সময় রোজই বড় একটা পাওয়া যায় না। সিজন টাইমে দু-এক ঝুড়ি আসে। খরিদ্দার থাকে তখন। এখন মাছ বলতে মৃগেল। ছোট ছোট। বাজারে মুরগি অবশ্য পাওয়া যায়।

তারাপদরা খেতে পারে না। বাঙালির পেট, মাংস আর কত খাওয়া যায়। যদুপতি–মানে খেপা যদুর হাতে মাংস আবার তেলঝালে ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

চামেলিবাবু বললেন, “বেড়াতে বেড়াতেই এলাম। ওই আল দিয়ে। ভাল করে সব দেখতে দেখতে। খবরটা ছড়িয়ে গিয়েছে রায়বাবু।” এবার আর রায়সাহেব বললেন না।

“কীরকম?”

“এ তো ছোট জায়গা। গাঁ গ্রামের দেহাতিরা অনবরত আসছে যাচ্ছে ওই রাস্তা দিয়ে। তার ওপর ডেডবডিটা সারাদিন পড়ে ছিল থানার সামনে। শর্মার হুকুমে লোকজনও কম ধরে আনা হয়নি লোকটাকে আইডেন্টিফাই করতে।…”

“হ্যাঁ! কিছু পাওয়া গেল! মানে কোনও খোঁজ?”

“না।”

“এখানে আসার ব্যবস্থা বলতে তো শুধু ট্রেন?”

“ট্রেন। আর অন্য ব্যবস্থা হল ট্রেকার। ট্রেকার মাত্র একটা। তাও সেটা ঝুমুরিয়ার মোড় থেকে আসে। হাটের দিন ছাড়া ট্রেকারে লোক পাওয়া যায়। না। “

“ট্রেকারে লোকটি আসেনি। শর্মা খোঁজ নিয়েছে।”

“ট্রেনেই এসেছে,” চামেলিবাবু বললেন। “ট্রেকারে নয়।”

“আসুন বসা যাক,” কিকিরা বারান্দার দিকে এগুলেন। “ট্রেনে এসেছে তা না মেনে উপায় নেই আপাতত! কিন্তু কেমন ভাবে এল! শর্মা বলছে, টিকিট কালেক্টার স্টেশনের খালাসি–কেউ ওকে দেখেনি নামতে।”

“না পারতে পারে। এখানে ট্রেন কমই আসে। দুটো প্যাসেঞ্জার, একটা বেলা দশটা নাগাদ, একটা বিকেলে। এক্সপ্রেস গাড়ি একটা। বাকি সব মালগাড়ি। . অ্যাাঁ, কোনও প্যাসেঞ্জার নামলে–দেহাতি যদি না হয়, বিশেষ করে কোনও নতুন বাঙালি ভদ্রলোক-স্টেশনের লোকের নজরে পড়ে। সেটা আমি মানছি। কিন্তু ভুল তো হয়। তা ছাড়া ধরুন কামরার উলটোদিক থেকে নেমে রেললাইন ধরে এগিয়ে তেঁতুলতলার আড়ালে চলে গেল। কে দেখবে! এখানে দেহাতিদের সে-অভ্যেসও আছে। টিকিট কাটে না। পেছন দিয়ে পালায়।”

কিকিরা কথাটা শুনলেন। আগে শোনেননি। তবে কামরার পেছন-দরজা দিয়ে নেমে পালানোর কথা নতুন কী! এ তো সর্বত্রই হয়।

“বসুন।”

চামেলিবাবু বসলেন কাঠের চেয়ারে।

“একটু চা করি?” কিকিরা বললেন।

“না না, আপনি কেন? ওরা কোথায়?”

“স্টেশনে বাজারের কাছে গিয়েছে। যদি মাছ পায় …”

“মাছ! আরে ওদের বলুন খেপাকে পুটলির কাছে যেতে । পুটলি ব্যবস্থা করে দেবে। আমি আবার মাছ-মাংস খাই না। ভাল কথা, কাল রাত্রে আমার ওখানে আসুন আপনারা। দুটো মুখে দেবেন।”

“পরশুদিনই তো খেলাম ..”

“খেলেন কোথায়! নতুন এলেন, দু-চারটে শাকসবজি পাঠিয়েছিলাম।”

প্রসঙ্গটা পালটে নিলেন কিকিরা। বললেন, “আপনি বলছেন লোকটি ট্রেনে এসেছিল। এসে লুকিয়ে গা-ঢাকা দিয়ে স্টেশন ছেড়ে পালিয়েছিল!”

“তা নয়তো আর কী হবে, আপনি বলুন?”

“বেশ, আপনার কথাই মানলাম। কিন্তু একজন ভদ্রলোক এমন কাজ করবে কেন? উদ্দেশ্য কী? মোটিভ?”

“তা বলতে পারব না,” চামেলিবাবু মাথা নাড়লেন। “আপনি তো দেখেছেন লোকটির কোমরে বেল্ট ছিল। ভোজালির খাপ…। লোকটিকে কি খুব নিরীহ মনে হয়! আমার তো হয় না।”

কিকিরা বললেন, “তা বলতে পারেন। … তবে এটাও ভাবতে হবে, ওটা ছিল কেন? আত্মরক্ষার জন্যে, না, কাউকে ঘায়েল করার জন্যে? যে-কোনও অস্ত্র দু’কারণেই ব্যবহার করা যায়? নয় কী?”

চামেলিবাবু মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “আপনাকে একটা জিনিস দেখাই। আজ এখানে আসার সময় আমি ঝিলপারের পথটা ভাল করে দেখতে দেখতে এসেছি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি চারপাশ। একটা জিনিসও পেয়েছি।”

কিকিরা তাকিয়ে থাকলেন। কৌতূহল বোধ করছিলেন।

চামেলিবাবু বললেন, “আপনি তো দেখেছেন ওই পথটার এখানে ওখানে ছোট ছোট ঝোঁপঝাড়, বুনো লতা- কত কী! আজ আমি কেমন ইচ্ছে করেই সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম! ভাবছিলাম, লোকটাকে যদি আড়াল থেকে লুকিয়ে কেউ মেরেই থাকে তবে একটুও ধস্তাধস্তি হবে না? যাই বলুন লোকটা দুবলাপাতলা নয়। ওকে দেখলে বোঝা যায় গায়ে ক্ষমতাও আছে খানিকটা। একেবারে বেটপ্পা-মানে আচমকা মার খেলাম আর ধড়াস করে পড়ে মরে গেলাম, তেমন মানুষ ও নয়। ঠিক কী না, বলুন?”

কিকিরা বললেন, “তা ঠিক। … আপনি একটু বসুন। আমি দু’ কাপ চায়ের জল চড়িয়ে আসি। শুধু মুখে কথা হয় না।” বলে একটু হেসে কিকিরা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।

সামান্য পরে ফিরে এসে কিকিরা বললেন, “জিনিসটা কী বললেন না?”

“আমি একটা তাবিজ লকেট পেয়েছি।” বলে জামার পকেট থেকে এক তাবিজের লকেট বার করে দেখালেন। হাতে বাঁধা থাকে এই ধরনের তাবিজ।

দেখলেন কিকিরা । সাধারণ জিনিস। রুপোর চেনে আটকানো রুপোর লকেট বা তাবিজতক্তি। পরে অনেকেই। ওর মধ্যে কী আর থাকতে পারে? কোনও ঠাকুর দেবতার পুজো দেওয়া শুকনো ফুলপাতা, কিংবা শেকড়-বাকড়, দৈব কিছুও হতে পারে।

“দেখি,” হাত বাড়ালেন কিকিরা ।

চামেলিবাবু জিনিসটা এগিয়ে দিলেন।

রুপোর লকেটটা বাহারি। গোল বা চৌকো নয়, গাছের পাতার ধরন–মানে পাতলা চ্যাপটা, ওপর-নীচে মানানসই করে ছড়ানো। লকেটের চেন ছিঁড়ে গিয়েছে। একটা আংটা ভাঙা। অন্যটার গায়ে একরত্তি চেন ঝুলে আছে।

না, রুপোর লকেটের ওপর কোনও নাম লেখা নেই। থাকে অনেক সময়, যেমন ‘অমূল্য’ ‘সলিল’ বা বেশ নকশা করে একটা অক্ষর ‘র’ ‘ফ’ অথবা ‘ইংরিজিতে ‘পি’ ‘এন। সেসব কিছুই নেই লকেটটায়, শুধু একটা অস্পষ্ট চিহ্ন। বোঝা যায় না, ওটা কী! হরফ কিছুতেই নয় ।

“কোথায় পেলেন?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।

“আলের গায়ে, একটা ছোট তেঁতুল ঝোঁপের পাতার আড়ালে।”

“শর্মাজির নজরে পড়েনি? তার সেপাইদের?”

“পাতার আড়ালে ছিল। সেখানে আগাছাও জন্মেছে।”

“নজর এড়িয়ে গিয়েছে তবে! তা চামেলিবাবু জায়গাটা …” বলতে বলতে উঠে পড়লেন কিকিরা। “একটু দাঁড়ান। চায়ের জল ফুটে গিয়েছে। আসছি…।”

কিকিরা চলে গেলেন।

চামেলিবাবু হাতের লাঠিটা কোলের পাশ থেকে সরিয়ে মাটিতে রাখলেন। এই বাড়িটা তাঁর নয়। দাসবাবুর। দাসবাবু মারা গিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী থাকেন আদায়, আশ্রমে। গুরুমায়ের কাছে। বিধবার সম্পত্তির জিম্মাদার এখন চামেলিবাবু। বাড়িটা ভাড়া খাঁটিয়ে বছরে যা পান, আদরায় পাঠিয়ে দেন চামেলিবাবু।

সকালটা চমৎকার গাঢ় হয়ে আসছিল। রোদে তাত ফুটছে। কোথায় যেন একটা রোড রোলার চলতে শুরু করল। কাছেই একটা রোলার পড়ে আছে বছর কয়েক ধরে, মাঝে মাঝে তার বুঝি ঘুম ভাঙে।

কিকিরা এলেন। হাতে চায়ের মগ।

“নিন। দুধ কম। যাদবচন্দ্র না এলে দুধ আসে না।”

“ও ঠিক আছে । অকারণ আপনি ব্যস্ত হলেন।”

“আমি অকম্ম নই, চামেলিবাবু! চা তো কিছুই নয়, কুকিংয়ে আমি আপনার খেপা যদুর কান কেটে দিতে পারি। ভেরি গুড কুক, সার। একদিন আপনাকে খাইয়ে সার্টিফিকেট নেব।” হাসতে লাগলেন কিকিরা। “হোটেলে চাকরি পেয়ে যেতে পারি।”

চামেলিবাবু চায়ে চুমুক দিলেন। হেসে বললেন, “বাঃ।”

“যা বলছিলাম সার । আপনি এই হাতে-পরা লকেটটা ঠিক কোথায় পেয়েছেন? মানে, যে-পাথরের কাছে লোকটি মরে পড়ে ছিল সেখান থেকে কতটা দূরে?”

“ক-ত-টা!…তা ধরুন, কতটা হবে, আন্দাজে বলতে হলে বলতে হয়, বিশ-পঁচিশ গজ দূরে।”

“বেশি দূরে নয় তবে!”

“না না। যদি আপনি ভাল করে নজর করেন, ওখানে মাটিতে টানাহেঁচড়ানির দাগও দেখতে পাবেন।”

“দেখেছি। তবে স্পষ্ট নয়।” কিকিরা বললেন, “ওখানকার মাটি শক্ত। ভিজে হলে দাগ ধরা যেত। কিন্তু…! আচ্ছা চামেলিবাবু, আপনার কি মনে হয় লোকটিকে আচমকা কেউ বা কারা অ্যাটাক করেছিল?”

“আমার তাই ধারণা। … আর এটাও মনে হয় আমার, লোকটার সঙ্গে হাতাহাতিও হয়েছিল। ও যা লোক, কোমরে ড্যাগারের খাপ, সে যে একেবারে ন্যাড়া হয়ে হাত-পা এলিয়ে দেবে তা আমার মনে হয় না। ফাইট একটা হয়েছিল।”

কিকিরা কিছু বললেন না, চা খেতে খেতে মাথা নাড়লেন। চামেলিবাবু চায়ের মগ নামিয়ে রেখে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট দেশলাই বার করলেন। “কাল কী তিথি ছিল জানেন?”

“অন্ধকার ছিল।”

“কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশী। আজ অমাবস্যা। ঘোর অন্ধকার ছিল কাল।”

“ওই অবস্থায় একটা নোক কেমন করে ঝিলের গায়ের আলপথ ধরে আসে, মশাই?”

“টর্চ নিয়ে এসেছিল। দেখেছেন তো আপনি। শর্মা টর্চটা পেয়েছে কাছেই।”

“দেখেছি। বড় টর্চ। তিন সেলের।”

“তবে?”

“কিন্তু টর্চটা ফাঁকা কেন? সেলগুলো কোথায় গেল! অবাক ব্যাপার নয়?” চামেলিবাবু মাথা নাড়লেন। তিনি কোনও জবাব দিতে পারলেন না। শেষে বললেন, “ব্যাটারিগুলো বার করে নিয়েছে।”

“কেন? কে নিয়েছে? কারা?” কিকিরার চোখ হঠাৎ ঝকঝকে হয়ে উঠল। এই একটা কথা তিনি প্রথম থেকে ভাবছেন। তাঁর কাছে এটাই যেন সবচেয়ে অদ্ভুত মনে হচ্ছিল। গতকাল রাত্রে তারাপদ আর চন্দনের সঙ্গে অনেক গবেষণা করেছেন বিচিত্র এই কাণ্ডটা নিয়ে। এ টর্চ উইদাউট ব্যাটারি কেন? চন্দনরা কোনও জবাব দিতে পারেনি। টর্চটা সত্যিই রহস্যের বস্তু। তা ছাড়া থানায় শর্মার কাছ থেকে টর্চটা চেয়ে নিয়েও দেখেছেন কিকিরা। মামুলি বাজারি টর্চ বলেই মনে হয়েছে। ভেতরে ফাঁকা।

দু’জনেই তখন চুপচাপ। হঠাৎ চোখে পড়ল, তারাপদরা আসছে। তারাপদ চন্দন খেপা যদু। যদুর হাতে বাজারের ব্যাগ।

“ওরা আসছে,” কিকিরা বললেন।

চামেলিবাবু বললেন, “তাবিজ লকেটটার কী হবে?”

“শর্মার হাতে তুলে দেওয়াই উচিত।”

চামেলিবাবু ঘাড় নাড়লেন। “আমিও তাই ভাবছিলাম। যার যা কাজ …!”

তারাপদরা কাছে চলে এসেছে।

খেপা যদুর হাতে বাজারের ব্যাগ। চন্দনের হাতেও একটা প্লাস্টিকের বাস্কেট।

ওরা কাছে এলে চামেলিবাবুর সঙ্গে আলাদা কথা হল দু’-চারটে।

বাজারের ব্যাগ তুলে নিয়ে যদু রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

তারাপদ সামান্য উত্তেজিত গলায় বলল কিকিরাকে, “একটা নিউজ আছে, সার?”

“কী নিউজ?”

চামেলিবাবুর দিকে তাকাল তারাপদ। “এখানে একটা ধর্মশালা আছে?”

চামেলিবাবু যেন প্রথমটায় খেয়াল করতে পারেননি। পরে বললেন, “ধর্মশালা! গিরিবাবার আখড়া। লোকে বলে বটে ধর্মশালা! কেন?”

“স্টেশন থেকে আধ মাইলটাক তফাতে। বিচলি গাঁওয়ের …”

“ওটা ঠিক ধর্মশালা নয়,” চামেলিবাবু বললেন, বলে হাত তুলে একটা দিক দেখালেন। “ওদিকে ছোট গাঁ আছে একটা, কয়েকটা মাত্র ঘর, লোকে বলে বিচলি গাঁও। ওপাশে ঝোঁপজঙ্গল শুরু হয়ে গিয়েছে। আমলকী গাছ আর মহুয়া ঝোঁপ। গিরিবাবা বলে এক সাধু ওখানে একসময়ে একটা চালা বেঁধেছিল। আশ্রম করেছিল। থাকত দু-চারজন চেলাচামুণ্ডা। গিরিবাবা অনেকদিন হল গত হয়েছে। ওখানে লোকজন বিশেষ থাকে বলে শুনিনি। তবে কখনও কখনও এক-আধজন সাধুটাধু জুটে যায়। চলেও যায় দু-চারদিন থাকার পর …। তা সেখানে” ।

“সেখান থেকেই একটা লোক উধাও হয়েছে, তারাপদ বলল।

“মানে?” কিকিরা বললেন। “উধাও হয়েছে মানেটা কী! ওটা কি বাসাবাড়ি, না হোটেল–যে একটা লোক আজ ছিল–কাল উধাও।”

চন্দন বুঝতে পারল, তারাপদ ব্যাপারটা ঠিক গুছিয়ে বলতে পারেনি। স্পষ্ট করে না বললে সত্যিই ধরা মুশকিল ঘটনাটা। চন্দন এবার বুঝিয়ে বলল ব্যাপারটা।

গিরিবাবার আশ্রমই হোক আর ধর্মশালাই হোক, যে দু-তিন জন পড়ে আছে। সেখানে, তারা সাদামাটা গেঁয়ো সাধু, নিজের মনে থাকে, কাজকর্ম সারে আশ্রমের, সকাল-সন্ধে ঘণ্টা বাজায় মন্দিরের, বাগান যেটুকু আছে দেখাশোনা করে। কোনও পথভোলা সাধুসন্ন্যাসী এখানে এসে পড়লে মাথা গোঁজার ঠাঁই পায়। নিজেই নিজের মতন করে দুটো রুটি-চাপাটি করে খেয়ে নাও, কুয়োর জল রয়েছে স্নান করো, ময়লা কাপড় কেচে নাও। শোওয়ার জন্য মাটি, দু-চার আঁটি খড়ও জুটে যেতে পারে। তা গত দিন দুই আগে এক সাধুজি এসে হাজির, বেলার দিকে। বিকেলেও ছিল সে। সন্ধেবেলাতেও তাকে দেখা গিয়েছে। পরের দিন ভোর থেকে আর নয়। কিছু ফেলে যায়নি সে, নেহাতই একটা দেশলাইয়ের খাপ আর বিড়ির টুকরো ছাড়া। যাওয়ার আগে কাউকে কিছু বলে যায়নি, তাকে চলে যেতে দেখেওনি কেউ।

গতকাল থানার শমজির লোক খোঁজাখুজি করে বেড়িয়েছে এখান-ওখান, ডেকে এনেছে অনেককেই থানায়, কেউ যদি কোনও হদিস দিতে পারে মৃত মানুষটির। পারেনি কেউ। আজই সকালে প্রথমে জানা গেল গিরিবাবার ধর্মশালার কথা। খবরটা রটে যাওয়ার জন্যই হোক কিংবা পুলিশের পোষা এই ইনফরমারের মুখে শমজি ধর্মশালার কথা শুনলেন। শুনেই ছুটেছিলেন নিজে ধর্মশালায়। খোঁজ নিলেন। কথাটা ঠিকই। এসেছিল একজন সামান্য বেলার দিকে। সারাদিন ছিল, তারপর রাত্রে সে উধাও।..

কিকিরা বললেন, “সেই সাধুই যে ওই ভদ্রলোক, তার প্রমাণ কী?”

“এমনিতে কোনও প্রমাণ নেই। ডেডবডি বিকেলে সদরে চালান হয়ে গিয়েছে। ধর্মশালার লোক এসে আইডেন্টিফাই করবে তার উপায় নেই।”

“তবে?”

“শর্মাজি রেলস্টেশনের টিকিট কালেক্টারের কাছে খোঁজ করে জেনেছেন–এক সাধু বাস্তবিকই এসেছিল। তার কাছ থেকে টিকিটও কালেক্ট করেছেন টি.সি। গুপ্তা বলে একজন তখন ডিউটিতে ছিলেন। তিনি বলেছেন, সাধুর মুখ তিনি দেখেছেন। দাড়ি ছিল, মাথা ভরতি রুক্ষ চুল। ঘাড় পর্যন্ত। গায়ে গেরুয়া আলখাল্লা। কাঁধে এক ঝোলা।”

চামেলিবাবু বললেন, “দাড়িঅলা গেরুয়া আলখাল্লা পরা এক সাধু আর ওই লোকটা–যে মারা গিয়েছে–দু’জনে এক হয় কেমন করে?”

তারাপদ বলল, “ব্যাপারটা এখানেই মিলছে না। গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।”

“শর্মাজির সঙ্গে তোমাদের দেখা হয়েছে বুঝি?” কিকিরা জানতে চাইলেন।

“খানিকটা আগেই হয়েছে, বাজারে।” তারাপদ বলল, “তিনিই বললেন ব্যাপারটা।”

কিকিরা তখন আর কিছু বললেন না। না বলে চামেলিবাবুর দিকে তাকালেন।

চামেলিবাবু ইঙ্গিতটা বুঝলেন। বুঝে রুপোর তাবিজ বা লকেটটা দেখালেন তারাপদদের। “এটাও আজ সকালে আমি পেয়েছি। ঘটনাটা যেখানে ঘটেছে তার কাছাকাছি এক ঝোঁপের কাছে।”

.

দুটো দিন কাটল ।

সদর থেকে কোনও খবর এসে পৌঁছল না। না আসাই স্বাভাবিক। বড়-বড় শহরে, যেখানে হাসপাতাল মর্গ পোস্টমর্টেম করার সব ব্যবস্থাই আছে–সেখানেও রাতারাতি কিছু হয় না। যথেষ্ট কাঠখড় পোড়ালেও অন্তত দুটো দিন তো কিছুই নয়, রিপোর্ট পেতে চার-পাঁচদিনও লেগে যায়। আর এ তো নেহাতই এই ছোট মফস্বল আধা-শহর, এখানে একটা বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া গেলে তার বৃত্তান্ত জানতে সময় তো লাগবেই।

শর্মাজির দোষ নেই। তিনি আর কী করবেন!

সেদিন তারাপদ কিকিরাকে বলল, “সার, কলকাতা হলে..”

চন্দন বিরক্ত হল। বলল, “বাজে বকিস না। কলকাতা হলে রাতারাতি সব হয়ে যায়, তোর ধারণা। কলকাতায় থাকিস, কাগজ পড়িস না! লাশ খোঁজ করতেই ক’দিন যায় দেখিসনি! একটা চুরি ডাকাতি, দিনের আলোয় মাড়ার–এসব নিত্যকার জিনিস ধরতে মাস কাবার হয়ে যায়–যায় না?”

তারাপদ হাসল। “খেপে যাস না! এমনি বলছিলাম…!”

চন্দন নীলচে রঙের পুলওভারটা গায়ে গলিয়ে নিল। এখন সন্ধে। আজ তারা চামেলিবাবুর বাড়িতে রাত্রে খেতে যাবে। গতকাল হয়ে ওঠেনি। অসুবিধে ছিল চামেলিবাবুর। দিন পালটে নিয়েছিলেন।

কিকিরার শরীর এখন ভাল। গোড়ার দিকে ঝপ করে নতুন জল-হাওয়ায় যে সর্দিজ্বর মতন হয়েছিল, চন্দনের ডাক্তারিতে তা সেরে গিয়েছে। তবু কিকিরা সাবধানী। জোব্বা চাপিয়েছেন গায়ে, গলায় মাফলার, মাথায় কাশ্মীরি টুপি।

যাদবচন্দ্র কাজ সেরে চলে গিয়েছে বিকেলের শেষে।

তারাপদও তৈরি।

“তাহলে চলো, বেরনো যাক,” কিকিরা বললেন।

“চলুন।”

“ঘরে তালাটালা দিয়ে নাও। একটা লণ্ঠন জ্বলুক। যাওয়ার সময় ওই বিরজুমিস্ত্রিকে বলে যাবে, একটু যেন নজর রাখে এ দিকে।”

.

সামান্য পরেই তিনজনে বেরিয়ে পড়ল।

তারাপদ আর কিকিরার হাতে টর্চ। চন্দন আর অনর্থক আলো নেয়নি।

কৃষ্ণপক্ষ শেষ হয়ে শুক্লপক্ষ পড়েছে। আকাশ ভরতি তারা। চাঁদের আলো যেটুকু ফুটেছিল সন্ধের আগে, এখন আর চোখে পড়ে না। শীত এসে গেল।

টর্চের আলোয় পথ দেখে এগোতে এগোতে কিকিরা বললেন, “দেখো চাঁদু, আমরা এখানে এসেছি বেড়াতে। লিভার-টনিক, মানে এখানকার জল দু’-চার গ্লাস খাচ্ছি রোজ, হাঁটছি দু’বেলা অল্পবিস্তর। নট ব্যাড। তা বলে এখানে কোনও খুনখারাপি হলে ওটা আমাদের জানার কথা নয়। চোরছ্যাঁচড়, ধান্দাবাজ, চিট, নচ্ছার লোকজনকে পাকড়াও করার বেশি মুরোদ আমাদের নেই। বৃথা গোঁফ ফুলিয়ে লাভ কী! এই যে একটা লোক হুট করে মারা গেল। বা তাকে মারা হল–আমরা ও নিয়ে মাথা ঘামাতে গেলে ব্রেন শুকিয়ে। যাবে। খুনটুন আমাদের ধাতে পোষায় না। এসব পুলিশের কাজ। নয় কী?”

চন্দন কিছু বলার আগেই তারাপদ খোঁচা মেরেই যেন বলল, “মাথা আর কে ঘামাচ্ছে! আপনিই বরং রোজ দাবার চাল দেওয়ার মতন মুখ করে ব্যাপারটা নিয়ে…”

“আবার ব্যাপার! তোমার সব কিছুতেই ব্যাপার!”

“আপনি মাথা ঘামাচ্ছেন না?”

“না । যাকে মাথা ঘামানো বলে–তেমন করে মাথা ঘামাইনি তারাবাবু! কেননা আমার মাথায় এসব ঢোকে না। …তবে!”

“কী তবে?”

“আমার কাছে অবাক অবাক লাগে! ভেরি স্ট্রেঞ্জ! অনর্থক একটা খুন হবে কেন?”

“কেন?”

“কেন?” কিকিরা ধীরে ধীরে বললেন, খানিকটা অগোছালো গলায়, “একে একে বলি তাহলে! …প্রথমে আমার কেমন এক ধোঁকা লাগে যখন ভাবি, হরবখত যেসব জায়গায় খুনটুন হয়, মানে ক্রাইম জিনিসটা ডালভাত হয়ে গিয়েছে যেখানে-সেখানে এসব জিনিস মানিয়ে যায়। এখানে মানায় না। শান্ত সুন্দর একটা নিঝুম জায়গা হাবিলগঞ্জ। ক্রিমিনালদের আস্তানা এটা নয়। এখানে বড়জোর দু’-একটা গাঁইয়া লাঠালাঠি হতে পারে। সেটা মানায়। খুন এখানে মানায় না। অবশ্য যদি এই ঘটনাটাকে মার্ডার কেস হিসেবে ধরা হয়। অ্যাকসিডেন্ট কেস হলে বলার কিছু নেই! কি চাঁদু, আমি রাইট কি না! অ্যাম আই রাইট সার?

চন্দন মাথা নেড়ে সায় দিল।

কিকিরা বললেন, “আমার হিসেব ধরলে বলতে হবে, এখানে যা ঘটেছে তার পেছনে একটা অঙ্ক আছে। মানে কোনওরকম প্ল্যান। পরিকল্পনা।”

“কেমন প্ল্যান?” তারাপদ বলল।

“সঠিক বলা মুশকিল। মনে হয়, দুটো পার্টিই এখানে হাজির হয়েছিল। একটা পার্টি কোনও মতলব নিয়ে এসেছিল, আর-একটা পার্টি হাজির হয়েছিল–কী বলব বুঝতে পারছি না, বোধ হয় কোনও লেনদেন মিটিয়ে ফেলতে!”

চন্দন মাথা নেড়ে বলল, “তা নাও হতে পারে। ধরুন, একজন ক্রিমিন্যাল অন্য এক ক্রিমিন্যালকে ফলো করে এখানে এসেছিল। উদ্দেশ্য একটাই। হয় এ ওকে মারবে, না হয় ও একে মারবে।”

হাঁটতে হাঁটতে আলপথের কাছে এসে পড়ল তিনজনে। টর্চ জ্বলছে। এই পথ ধরে ঝিল পেরোলেই মেঠো পথ। তারপরই চামেলিবাবুর বাগান।

চাঁদের আলোর অতি অস্পষ্ট আভাটুকুও আর নেই। তারার আলোয় অন্ধকার ঝিল যেন ঘুমিয়ে আছে। ঘটনা ঘটার পরের দিন থেকেই ঝিলটা যেন লোকের দেখার বস্তু হয়ে উঠেছে। লোকে আসে যায়, আর তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে।

কিকিরা বললেন, “তা বলতে পারো। …দুই রথীর লড়াই।”

“রথী বলবেন না সার,” তারাপদ বলল, “দুই ক্রিমিন্যালের লড়াই।”

“যাক গে,” কিকিরা বললেন, “লড়াইটা তো এখানে অন্য কোথাও হতে পারত। এমন ফাঁকা জায়গা, বিস্তর মাঠঘাট, চাই কী ঝোঁপজঙ্গলও কম নেই। এত ফাঁকা জায়গা থাকতে ওরা এই ঝিলের ধারে কেন?”

“আপনিই বলুন!”

“আমি একটা কথাই বলব । আগেই বলেছি। চামেলিবাবুর বাগান থেকে আমাদের বাড়ির দিকে যাওয়ার এটাই একমাত্র শর্টকাট রাস্তা। “

“কিন্তু আমরা তো কোনও পক্ষ নই এখানে।”

“আমরা নই। কিন্তু এক পক্ষ নিশ্চয়ই এদিকে থাকে, চামেলিবাবুর বাগানের দিকে?”

“সে কে?”

“খোঁজ করছি। ভাবছি। …আমি একটু-আধটু আলাপ জমাবার চেষ্টা করি সকলের সঙ্গে।“

“চামেলিবাবুকে কেমন মনে হয়?”

“সন্দেহ করতে পারো। তবে কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।”

“শীতলবাবু?”

“না। বেচারি বুড়ো মানুষ। নিরীহ। হোমিওপ্যাথি প্লাস কবিরাজি করেন। ওঁকে বাদ দাও।”

“কচি, মানে কাঞ্চন?”

“সন্দেহ করতে পারো। কিন্তু কচির কী স্বার্থ?”

“তা ছাড়া সেদিন তো সে রাত্রে এখানে ছিল না।”

“এটা কোনও প্রমাণ নয়। ধোপে না টিকতে পারে। ইচ্ছে করলে, আমরা সবাই একটা চাতুরি বা ছল করতে পারি। থেকেও থাকি না, না থেকেও থাকি। বুদ্ধিমান ক্রিমিন্যালরা খুব ভাল অ্যালিবাই বানাতে পারে। যাক গে কচিকে আমি বাদ দিতে পারি । ওর কোনও স্বার্থ দেখতে পাচ্ছি না।”

আলপথের মাঝামাঝি এসে দাঁড়ালেন কিকিরা। টর্চের আলো ফেলে ঝিলটা দেখলেন।

শীতের বাতাস এল মাঠ থেকে। ঝিলের জোলো ঠাণ্ডাও এখানে।

চন্দন পা বাড়াল। “আর কে থাকল তাহলে?”

তারাপদ বলল, “মাখনলাল দত্ত, কলকাতার এক ছাপাখানার ম্যানেজার । স্ত্রী আর ছেলে নিয়ে এসেছেন। ছেলেটা ছোট। বছর বারো বয়েস।”

চন্দন বলল, “বাজারে দেখেছি। আলাপও হয়েছে। বয়েস চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে। হাঁপানির রোগী। সাধারণ ভদ্রলোক। মনে হয়, কলকাতার পৈতৃক বাড়িটাই ওঁর সম্পদ। প্রেস-ম্যানেজারি করে যা পান সেটা বোধ হয় বিরাট কিছু

নয়। “

তারাপদ বলল, “ওঁকে বাদ দেওয়া যায়। “

কিকিরা আপত্তি করলেন না।

“ওই ছেলে দুটো সম্পর্কে সার কী বলেন?” চন্দন বলল।

কিকিরা বললেন, “ওই পল্লব মুখার্জি আর লাডলি–”

“লাডলি হকি প্লেয়ার ছিল।”

“আলাপ হয়েছে?”

“না।”

“আপাতত সন্দেহ যাচ্ছে না। “

“ওদের মোটরসাইকেল তো থানায় আটক পড়েছে সার। আপনি শর্মাজিকে নজর রাখতে বললেন। আর শর্মা একটা ছুতো করে বাইক আটক করে রাখলেন।”

কিকিরা মুচকি হাসলেন, “কার গোরুর গাড়িতে ধাক্কা মেরে একটা গোরুর পা জখম করে দিয়েছে ওরা.”

“পুলিশ সবই পারে।”

“ছোকরা দুটো সুবিধের হলে ভাল!” কিকিরা বললেন, “শর্মা ওদের একটু বাজিয়ে দেখতে চায় ।” আলপথের প্রায় শেষে এসে পড়েছেন কিকিরারা। সামনের মেঠো রাস্তার গা ঘেঁষেই এদিক-ওদিক ছড়ানো গোটা পাঁচেক বাড়ি । শীতলবাবু, চিনুরা থাকে একপাশে। অন্য দিকে চামেলিবাবুর ভাড়া-দেওয়া তিন বাড়িতে তিন ভাড়াটে। লণ্ঠনের সামান্য আলো দেখা যাচ্ছিল বাড়িগুলোতে। কিকিরা বললেন, “শর্মা কি তোমাদের বলেনি?”

“কী বলবেন?”

“ছোকরা দু’জন সম্পর্কে খোঁজ করতে লোক পাঠিয়েছে ওদের ঠিকানায়। ওরা জেনুইন, না, জাল?”

“মানে?”

“মোটরবাইকটার রেজিস্ট্রেশন নাম্বার গোলমেলে। অন্য স্টেটের।”

চন্দন অবাক হল । খেয়াল করেনি অতটা। মোটরবাইকটা দেখেছে। বাজারেই দেখেছিল একদিন। কে আর খেয়াল করে বাইকের নম্বর দেখবে!

তারাপদ বলল, “সার, এ তো দেখছি–জট পাকিয়েই যাচ্ছে পর পর। তা ওই আরেক জন–ওঁর সম্পর্কে?”

“কে? পাঁজামশাই! গণপতি পাঁজা!”

“হ্যাঁ, পেটের রোগী? আলসার পেশেন্ট! থিয়েটার যাত্রার ড্রেস ডিজাইনার অ্যান্ড মেকার। চিৎপুরে দোকান! আমি তো ভদ্রলোককে একদিনই দেখেছি। আপনি দেখেছেন?”

“দেখেছি। …আমার বাপু একটু ঘোরাফেরা স্বভাব। তোমরা যাও সকালে বাজারে বেড়াতে আমি আমাদের বড় রাস্তা ধরে খানিকটা ওয়াকিং করি।”

“আসলে আপনি ঝিলের গা বরাবর বড় রাস্তাটা ধরে হাঁটেন, তারাপদ ঠাট্টা করে বলল, “চোরের মন বোঁচকার দিকে।”

কিকিরা মুচকি হাসলেন। দেখা গেল না। টর্চের আলো পায়ের সামনে দোলাতে দোলাতে কিকিরা বললেন, “গতকালই পাঁজামশাইয়ের সঙ্গে খানিক আলাপ করলাম রাস্তার মধ্যে। আগেও মুখ-চেনা করেছি।”

“খেজুরে আলাপ?”

“বলতে পারো। আমি একসময় একটু-আধটু যেতাম ওদিকে। চিৎপুর পাড়ায় রাজুবাবু বলে আমার এক দোস্ত ছিল। তার হাতে দরজি ছিল ভাল ভাল। ম্যাজিশিয়ানরা এক-একজন সাজপোশাকের দিকে খুব নজর দেয়। রাজাগজা সাজে, আরব্য উপন্যাসের শাহাজাদা সাজে, কেউ-বা দেখবে সাজ পালটে চিনে চুং ফুং সাজে। এগুলো খেলা দেখাবার অঙ্গ। সাজের বাহার আলাদা একটা এফেক্ট তৈরি করে, ইলিউশন। কাজেও লাগে। সাজের কেরামতিতেও ম্যাজিক হয়। …তা পাঁজাবাবুর সঙ্গে খেজুরে গল্প করতে করতে আমার মনে হল, দশ আঙুলে ছ-ছ’টা আংটি পরে যে-লোক তার দৈব-ব্যাপারে যথেষ্ট বিশ্বাস আছে।”

“উনি কোনও দৈববাণী করলেন নাকি? মানে বাড়ির সামনে ঝিলে অমন একটা ঘটনা ঘটে গেল..” চন্দন বলল ।

“না। ও রাস্তায় হাঁটতেই চাইলেন না।”

“কেন?”

“তা বলতে পারব না। তবে চাঁদু, ভদ্রলোককে আমার ভাল লাগেনি।“

“কী জন্যে?”

“কী জন্যে! …দেখো, এক-একজন লোক থাকে যাদের দেখলেই তোমার কেমন খারাপ লাগে। চেহারার জন্যে নয়, তাদের মধ্যে এমন কিছু থাকে যা তোমাকে রিজেক্ট করবে, আসলে তুমি তার কাছে ঘেঁষতে চাইবে না। “

তারাপদ বলল, “ক্রিমিন্যাল টাইপের মনে হয়?” কিকিরা একটু ভেবে বললেন, “কোথায় যেন একরকম রোখ আর ধুরন্ধর ভাব আছে।”

“তাহলে গণপতি পাঁজাকে আপনি সন্দেহ করেন?”

“না করে পারছি না।”

“কিন্তু পাঁজাবাবু বয়স্ক লোক। আধবুড়ো। তিনি কী করে অমন জোয়ান গোছের লোককে খুন করবেন?”

“ঠিক কথা। কেমন করে? আর কেনই বা?” কিকিরা বললেন, “আমি তোমাদের মতন ওই কথাগুলো ভেবেছি। ভেবে কোনও উত্তর পাইনি। তবে নিজের হাতে খুন না করেও খুন করানো যায়। খুনে গুণ্ডার কি অভাব আজকাল! টাকা দিলেই তোমার কাজ করে দেবে। তা ছাড়া পাঁজাবাবুর হাতেই তো তাঁর মহাভৈরব আছে। লোকটা দৈত্যবিশেষ।”

তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল। অন্ধকারে মুখ দেখতে পেল না। উপরন্তু একটা হোঁচট খেল।

চামেলিবাবুর বাড়ির কাছে এসে পড়েছিল তারা।

ডাইনে ঘুরে বসত বাড়ির ফটক। ফটক খুলে এগিয়ে যেতে যেতে চন্দন বলল, “ভেতরে গলা পাওয়া যাচ্ছে যেন!”

কিকিরা কান পেতে শুনলেন। তারপর বললেন, “চামেলিবাবু রেডিয়ো শুনছেন! ট্রানজিস্টার।”

.

৷৷ ৬ ৷।

নিজেরই গরজ ছিল শর্মাজির। নয়তো আরও কত দেরি হত কে জানে! মফস্বলের এইসব অঞ্চলে কে কার কড়ি ধারে! বড় কিছু না ঘটলে মাথা ঘামায় না কেউ। দিন ছয়-সাতের মাথায় জানা গেল, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, ঘটনাটা স্বাভাবিক নয়, পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মক চোট পেয়ে লোকটি মারা যায়নি। তাকে আহত বা আঘাত করা হয়েছে মাথার পেছন দিকে। অর্থাৎ কোনও ভারী শক্ত জিনিস দিয়ে কেউ লোকটির মাথার পেছনে মেরেছিল। গুরুতর আঘাত অবশ্যই। উদ্দেশ্য সম্ভবত স্পষ্ট, লোকটিকে হত্যা করা।

থানায় বসে কথা হচ্ছিল। শর্মা বললেন, “এ কেস অব মার্ডার।” চন্দন, তারাপদ বা কিকিরা–কেউই আর অবাক হলেন না। একেবারে গোড়ায় যদি একটু সন্দেহ কিংবা দ্বিধা থেকে থাকে–পরে যত দিন গিয়েছে তাদের আর দ্বিধা ছিল না। তবু, যতক্ষণ না কাগজে-কলমে বলা হয়, ওটা দুর্ঘটনা নয়–হত্যাই–ততক্ষণ জোর করে বলা যাবে না একটা কথাও, আইনত।

“লোকটি কে–তা কিন্তু জানা গেল না,” কিকিরা বললেন।

“না। আইডেন্টিফিকেশন হল না। চেষ্টা করেছিলাম রায়সাহেব, সাকসেসফুল হলাম না। লাশ একেবারে পচে গিয়েছিল। সদরে মর্গের নামে

যে বাড়িটা পড়ে আছে সেখানে কুত্তা পর্যন্ত ঢুকতে চায় না। সো হরি কন্ডিশন। আমি গিরিবাবার ধরমশালার মুটিয়াকে নিজে টাকাপয়সা দিয়ে থানার লোক সঙ্গে দিয়ে সদরে পাঠালাম। ওই যে সাধুজি ভেগে পড়ল ওহি লোক আর ওই আদমি আগর একই হয়! তো মুটিয়া মর্গে গেল না। পালিয়ে এল। ভয়ে। বিমারি হয়ে গেল ব্যাটার।”

“লাশের কী হল?”

“যা হয়!”

কিকিরা অনুমান করে নিলেন, বেওয়ারিশ লাশ পুড়িয়ে ফেলেছে ওরা।

কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর কিকিরারা উঠে পড়ছিলেন, শর্মাজি বললেন, তিনি পুলিশের ক’ বছরের চাকরিতে মারদাঙ্গা, গোলমাল এমনকি ছোটখাটো লুটের কেসও ঘেঁটেছেন, খুনখারাপির ঘটনা নিয়ে তাঁকে মাথা ঘামাতে হয়নি। এই প্রথম। “এক্সপিরিয়ান্স ছিল না রায়সাহাব, ডিফিট খেয়ে গেলাম। কিন্তু একটা কথা জানবেন, অফিশিয়ালি এই কেসটায় আমি মার খেয়ে গেলেও আনঅফিশিয়ালি আমি ব্যাক আউট করছি না।”

কিকিরা উঠে পড়লেন। বললেন, “ঠিক কথা, শমজি। আপনি নিশ্চয় চেষ্টা করবেন দোষীকে খুঁজে বার করতে।” বলে দু পা এগিয়েই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

“জরুর।”

“আপনি যে টর্চটা সেদিন কুড়িয়ে এনেছিলেন স্পট থেকে–সেটা কোথায়?”

“আমার কাছে। টর্চ, চাদ্দর, চামেলিবাবুর দেওয়া চেন তাবিজ…” বলে ইশারায় নিজের ঘরের আলমারি দেখালেন। “আন্ডার লক অ্যান্ড কী। প্যাকেট করে রাখা আছে। সিল করে।”

“টর্চটা আপনার হাতে প্রথম এসেছিল। আপনি ভাল করে দেখেছিলেন। সার, ভেতরে কোনও কিছুই ছিল না! একেবারে খালি?”

“বিলকুল।…আপনিও তো দেখেছেন?”

“টর্চটায়–মানে টর্চের মুখে তখন বালব ছিল?”

“বালব আছে।”

“অবাক ব্যাপার! কিছু বোঝা যায় না। …চলি শর্মাজি।”

থানা থেকে বেরিয়ে কিকিরা বাজারের দিকেই হাঁটতে লাগলেন। বাজার বলতে যা বোঝায় সাধারণত তার সঙ্গে মিল নেই। মেঠো জমি, গাছ, ঢিবি, আশেপাশে কয়েকটা দোকান, মাঝখানে রেল স্টেশনের রাস্তা। রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে দু’পাশে পাকা আধপাকা এমনকি নিছক খাপরার চালার তলায় ছোটখাটো দোকান। মুদিখানা থেকে আয়ুর্বেদ ওষুধের দোকান, মনিহারি থেকে পান সিগারেট-সবই। রাস্তার পাশে বাজারও বসে শাকসবজির। চার-ছয় দোকানি। এখানে হাট বসে রবিবার, সেদিন হাটতলায় বিস্তর দোকানি এসেছে।

কিকিরারা হাঁটতে হাঁটতে কচি–মানে কাঞ্চনের দোকান পর্যন্ত এসে পড়লেন। দোকান খুলেছে কচি। বোধ হয় খানিকটা আগে। দু-তিনজন খদ্দের দাঁড়িয়ে।

কী মনে করে কিকিরা কচির দোকানের দিকে পা বাড়ালেন।

কচি একটা ছেলেকে চায়ের পাতা দিল ওজন করে। অন্যজন কাপড়কাঁচা সাবানের টিকিয়া নেবে। দামদস্তুর করে না কচি। তবু পঁচিশ পয়সা বেশি নিল। দাম নাকি বেড়ে গিয়েছে। তৃতীয় খদ্দেরের সঙ্গে বচসা বেধে গেল কচির। ছেঁড়াফাটা একটা প্যাকেট গছাবার চেষ্টা করছে কচি, মেয়েটা নেবে না। কচি প্রথমে তাকে বোঝাতে চাইল, অবশ্য মেজাজি গলায়, মেয়েটা শুনবে না। কচি তখন হাঁকিয়ে দিল। “ভাগ। অন্য কোথাও যা। সাত সকালে ধারে মাল কিনবি–তার আবার ছেঁড়াফাটা। যা যা, তোর মালকিনকে বলবি, আমার এখানে এইরকম মালই পাওয়া যায়।”

মেয়েটা বোধ হয় কাছের কোনও বাড়িতে কাজ করে। রুক্ষ চুল, ময়লা এক কাপড় পরনে, ওপরে ছেঁড়া সুতির চাদর। খালি পা।

কিকিরারা দোকানে এসে দাঁড়ালেন।

কচি তাকাল। চেনাজানা হয়েছে কিকিরাদের সঙ্গে। তবে ওই মুখচেনা গোছের। অল্প আলাপ।

কচি হাসল না । মেয়েটাকে ভাগিয়ে দিয়ে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছে।

“কী হল?” কিকিরা বললেন হাসিমুখেই।

“কিছু নয়। …আরে, আমি কি নিজে এখানে প্যাকিং করি। মাল আনতে গিয়ে একটু ছিঁড়েফেটে যেতেই পারে। তার আমি কী করব!”

“তা ঠিক। সবাই কি বোঝে?”

“মেয়েটা পাজি। বাড়িতে নিয়ে গেলে ওর মনিব–মালকিন বুঝত। নন্দীদার বউ আমায় বিলক্ষণ চেনে। জানে, আমি ভেজাল কারবার করি না । মেয়েটা পাজি। এখান থেকে নিল না, বলরামের দোকান থেকে নিয়ে যাবে। ওখানে খুচরো এটা-ওটা পায় যে! টিপ, সেফটিপিন, চিনির ডেলা লজেন্স..” বলতে বলতে কচি তার ক্যাশের ডালা খুলে খুচরো কিছু গুনে নিল। নিয়ে চন্দনের দিকে বাড়িয়ে দিল। “আপনার কালকের ব্যালান্স। সত্তর পয়সা। তখন দিতে পারিনি।”

কিকিরা হাসিমুখে বললেন, “ব্যবসা চালাতে গেলে ওরকম কিছু খুঁজতে হয়। আপনিও…”

“থাক মশাই, আমাকে আর খুঁজতে বলবেন না– কচি বিরক্ত হয়ে বলল, “এই ছোট্ট দোকানটা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আমার আট-দশ হাজার টাকা গলে গেছে। ক্রেডিট! ধার। ধারে মাল দিয়েছি, উসুল করতে পারি না। এর কাছে একশো ওর কাছে দেড়শো–এই করে লাস্ট পাঁচ বছরে হাজার সাত-আট। জোর করে আদায় করতে গেলে খদ্দের পালাবে। কাজেই টাকাটা গুরুর নামে লিখে ফেলে রেখেছি। ছিপ জানেন তো! ব্যবসার ছিপ ফেললে বঁড়শি অনেকটা টেনে নেয় জলে। মানে জলে পড়ে অনেক টাকা। খাতায় খরচ জলে লেখাই থেকে গেল!”

তারাপদ, চন্দন হেসে ফেলল।

কিকিরাও হাসলেন, “ব্যবসা বড় ঝকমারির কাজ। তবু ভাল। স্বাধীন বৃত্তি। …ভাল কথা, খবরটা শুনেছেন?”

“কীসের খবর?”

“ঝিলে যে লোকটিকে পাওয়া গিয়েছিল–অ্যাকসিডেন্টে সে মারা যায়নি, তাকে খুন করা হয়েছে।”

কচির মুখ দেখে মনে হল, খবরটা শুনে সে আকাশ থেকে পড়ল না। অপ্রত্যাশিত খবর এটা নয়, কেননা আজ কদিন ধরেই ঘটনাটির আলোচনা উঠলেই এই শহরের প্রায় সবাই মোটামুটি এইরকমই অনুমান করছিল।

“কোথায় শুনলেন?”

“থানায়। রিপোর্ট এসেছে। মার্ডার কেস। “

কচি অল্পসময় চুপ করে থেকে বলল, “আমাদের এখানে এমন কাণ্ড কখনও হয়নি। কেউ শোনেনি। অনেককাল আগে একবার ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে ক’জন মারা গিয়েছিল বলে জানি। দিস ইজ ফার্স্ট টাইম একটা মার্ডার হল । ….ইস, এমন পিসফুল ছোট্ট একটা জায়গায় খুন। ভাবাই যায় না।”

কিকিরা মাথা নাড়লেন।“সত্যি ভাবা যায় না।”

কচিরই যেন অনুশোচনা হচ্ছে। বলল, “আমরা এত কাছে থাকি, ঝিলের গায়ে, কিছুই জানতে পারলাম না ।…জানেন, আমি সাত তাড়াতাড়ি ঘুমোই না । রাত্রে খাওয়াদাওয়া সেরে ঘণ্টাখানেক রেওয়াজ করি। সারাদিন সময় পাই না। রাত্রে রেওয়াজ করা আমার অভ্যেস। সেতারটা নিয়ে বসি। মাঝেসাঝে বাদ যায়। তা আমি যে-ঘরে থাকি তার দক্ষিণের জানলা খুললে ঝিলটা দেখা যায়। এখন শীত পড়ছে। অন্য জানলা বন্ধ থাকলেও দক্ষিণেরটা খোলা থাকে। ঘরের পাশে অমন একটা খুন হয়ে গেল জানতে পারলাম না। সাড়াশব্দ চিৎকার কিছুই শুনলাম না–আশ্চর্য!”

কিকিরা একটু হাসলেন, দুঃখ জানিয়েই বোধ হয় বললেন, “আপনি তো ছিলেন না সেদিন।”

খেয়াল হল কচির। বলল, “তাই তো, আমি তো ছিলামই না।” বলেই একটু অন্যমনস্ক হল। পরে নিজেই বলল, “জানেন আমার মায়ের ঘুম পাতলা। মা বলছিল–সেদিন কেমন একটা ডাক শুনেছে। টিটিয়া পাখির ডাক যেন।”

তারাপদ আর চন্দন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। লোক দেখছিল রাস্তায় । একটা বড় চৌকোনো বাক্সকে চাকা লাগিয়ে ঠেলার মতন করে, ঠেলাগাড়ি বানিয়ে এক কুমোর রাজ্যের হাঁড়ি কলসি মালসা সাজিয়ে মাঠে নেমে গেল ।

কিকিরা কথা বলতে বলতে দু-চারটে জিনিস কিনে নিলেন কচির দোকান থেকে। টাকাপয়সা মেটালেন। “আচ্ছা কচিবাবু, এখনও আপনি রেওয়াজ করছেন তো?”

“হ্যাঁ। কেন?”

“আপনার নজরে আর কি কিছু পড়েছে, পরে?” ভাবল কচি। মাথা নাড়ল। বলল, “না। মানে আমি তো সেভাবে নজর করে বসে থাকি না। কেন বলুন তো?”

“এমনি বললাম।”

“আপনি…আপনার কি মনে হয়…না। থাক গে! আচ্ছা দাদা, আপনি কী? মানে কী করেন?”

“আমি!” হাসলেন কিকিরা। তারাপদদের দেখালেন, বললেন, “ওরা সব কাজকর্ম করে। ওর চাকরি, এর ডাক্তারি। আমি বেকার। বসে বসে দিন কাটাই। ..ভাল কথা, আমার টাকাটা দিয়েছি না?”

“দিয়েছেন।”

“তাস আছে আপনার দোকানে?”

“তাস?” কচি দোকানের চারপাশে তাকাল। “তাসের প্যাকেট ছিল। সিজনে মাঝে মাঝে বাবুরা চায়। এখন কোথায় রেখেছি দেখতে হবে। পরে খুঁজে দেখব। কী করবেন তাস নিয়ে? খেলবেন?”

“পেশেন্স!” কিকিরা মজার মুখ করে হাসলেন। “আমি তাসের খেলাও দেখাতে পারি।”

“ও!”

“চলি!” বলে তারাপদদের ডাকলেন। “চলো হে।”

বিশ-পঁচিশ পা এগিয়ে এসে কিকিরা বললেন, “কচির ব্যাপারে আমার একটা ধাঁধা থেকে গেল! ও সেদিন সত্যি কি এখানে ছিল না?”

“ধাঁধার কী হয়েছে? আপনি ওর বাড়িতে খোঁজ নিতে পারেন।”

“আমি?”

“না হয় চামেলিবাবুকেই বলবেন। কিন্তু কেন সার? কচি মামুলি ছেলে । ওকে এই মার্ডার কেসে টানছেন কেন?”

“টানিনি । ওকে টানছি না। কিন্তু আমার মনে হয়, ওকে একটু ওয়াচফুল থাকতে বললে হত।…আচ্ছা, কচির মা কি সত্যিই সেদিন কোনও ডাক শুনেছিলেন।”

“কেন?”

“কে-ন!…শুনলে বুঝতে হবে ওটা নিশাচরের ডাক। মিনিংফুল। …তা থাক, আমার মন কী বলছে জানো তারাবাবু! মন বলছে, খুনটা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু খুনের পর যে জাল গুটনো থাকে সেটা এখনও হয়নি। …বরং আরও গুছিয়ে বললে বলতে হয়, খুন করার পাটটা মিটলেও পরের কাজটা মেটেনি। মিটলে চামেলিবাবু আমায় একটা জরুরি খবর দেওয়ার জন্যে পাঠাতেন না।” ৭০

তারাপদ আর চন্দন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

কিকিরা পকেট থেকে একটুকরো কাগজ বার করে তারাপদদের দিলেন। বললেন, “ওঁর লোক সকালে এসে দিয়ে গিয়েছে। উনি নিজে বেরোতে পারেননি। হোঁচট খেয়ে বুড়ো আঙুল জখম।”

কাগজটা নিয়ে দেখল চন্দনরা।

চামেলিবাবু লিখেছেন : “আজ একবার অবশ্যই দেখা করবেন। নতুন খবর আছে। আমি নিজেই যেতাম। দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে ডান পায়ের বুড়ো আঙুল ভেঙেছি বোধ হয়। ফুলে গিয়েছে খুব, নীল হয়ে কালসিটে পড়েছে। পায়ের পাতা ফেলতে পারছি না। আসবেন আপনারা। কথা আছে।”

চিঠির টুকরোটা ফেরত দিল চন্দন । কিকিরা রাস্তায় উঠলেন। আজ মাঠে একরাশ ফড়িং উড়ছে। বর্ষাকালের মতন। কাঁটাঝোপে বেগুনি রঙের ফুল ফুটে আছে।

তারাপদ বলল, “জরুরি কথাটা কী হতে পারে, সার? আন্দাজ পাচ্ছেন?”

“না, কী কথা আন্দাজ করতে পারছি না। তবে বুঝতে পারছি, এই ঘটনা নিয়েই কথা।”

“উনি কি শর্মার কাছে সদরের দফতর থেকে আসা রিপোর্টের কথা শুনেছেন?”

“শুনতে পারেন। শর্মার কাছে খবর এসেছে কাল। চামেলিবাবুর সঙ্গে শর্মার যোগাযোগও আছে।”

“তাহলে কি এই খবরটাই উনি আমাদের শোনাতে চান?”

“না বোধ হয়।” চন্দন কী যেন ভাবতে ভাবতে বলল, “কিকিরা, আপনি যেন একটা আঁচ পাওয়ার অবস্থায় এসে পড়েছেন। কী? গন্ধ পাচ্ছেন নাকি?”

“না। এখনও অন্তত নয়। তা ছাড়া আমি তো আগেই বলেছি, খুনোখুনির কারবারে আমি নেই। আঁচ আমি বাস্তবিকই পাচ্ছি না। তবে একটা কথা আমি প্রায় জোর করেই বলতে পারি, মাখনবাবুর তন মানুষদের সাধ্য নেই এমন ভয়ঙ্কর কাজ করার। কিন্তু এঁরা কেউ ঘুণাক্ষরেও সেদিন কিছু জানেননি, শোনেননি–ভাবতে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তবু না হয় তাঁরা কিছুই না জানলেন–তারপরও কি কিছুই ওঁদের নজরে পড়ল না আজ পর্যন্ত! আমি তো আলাপ করে দেখলাম, ওঁরা একেবারে হাঁদাবোকার মতন ব্যবহার করেন।”

“ছেলে দুটো? পল্লব আর হকি প্লেয়ার লাডলি?”

“ঠাণ্ডা হয়ে আছে।…শর্মা ওদের এবার হয়তো ছেড়ে দেবে।”

তারাপদ বলল, “সার, ওদের ব্যাপারটা হল হিন্দি সিনেমার হিরো-মাকা । নাচ-গান হুল্লোড় । আমার মনে হয় না, ভেতরে ওরা বদ। চামেলিবাবুকে

জ্বালাত হয়তো। সে মজা করেই। সিরিয়াসলি নয়।”

কিকিরা কিছুই বললেন না।

.

চামেলিবাবুর বাগানের একটা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এখানকার জমি এমনিতেই সমতল নয়, উঁচু নিচু, কোথাও চড়াই মতন, কোথাও ঢালু। চামেলিবাবুর বাগানের দিকটা ঢালু হতে হতে মাঠের সঙ্গে মিশে গিয়েছে, যত বড় বড় গাছপালা সবই যেন ধাপ ভেঙে ভেঙে মাটিতে নেমেছে–মানে মাঠের দিকে। ওঁর বসতবাড়ি একতলা হলেও সবচেয়ে উঁচু জায়গায়। জলবৃষ্টিতে বাড়ির আশেপাশে একফোঁটাও জল থাকে না, গড়িয়ে বাগানে নেমে যায়। গোয়ালঘর বসতবাড়ি থেকে বেশ খানিকটা তফাতে, খামারি ঘর চমৎকার। পুব দিকে, সেখানে খেতের ধান কলাই যা ওঠানো হয় জমা পড়ে। ধান ভাঙার কাজ হয় অন্যত্র, খামারি ঘরের গায়েই।

সন্ধে বলতে এখন ঘড়িতে ছটাও বাজে না, তার আগেই অন্ধকার। আজ অবশ্য অন্ধকার তেমন ঘন নয় এখনও। শুক্লপক্ষ। চাঁদ রয়েছে আকাশে। নবমী দশমী তিথি হবে।

চা খাওয়ার পাট চোকাবার আগেই চন্দনকে দিয়ে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা দেখিয়ে নিয়েছেন চামেলিবাবু। না, ভাঙেনি। তবে জোর হোঁচট খেয়েছেন। গাঁটে লেগেছে। রক্ত জমে নীলচে আঙুল ফুলে আছে। একদিকে চুনহলুদ চলছে, অন্যদিকে শীতলবাবুর হোমিওপ্যাথি। ব্যথা কি তাতে তেমন কমে! তবে উনিশ বিশ ।

চামেলিবাবু বললেন, “এবার কাজের কথা বলি। .আমার এই বাড়ি থেকে ঝিলটা দেখা যায় জানেন তো রায়সাহেব।”

“জানি। দেখতেই পাওয়া যায়।”

“ভালই যায়। আমার বাড়িটা উঁচুতে। আর ওগুলো অনেক ঢালুতে।”

“বুঝেছি। ঝিলে..”

“শুনুন আগে সব।” চামেলিবাবু বললেন, “কাল পায়ের যন্ত্রণায় ঘুম আসছে না। একটু করে ঘুমোই, তন্দ্রার মতন হয়, আবার ঘুম ভেঙে যায়।…তা তখন মাঝরাত হবে, আমার শোয়ার ঘরের পাশে বিজুয়া শোয়। বিজুয়াকে তো চেনেন। দেখছেন সবসময়। ও আমার হাতের লাঠি। আমার সব কাজ ও করে। বুড়োমানুষ, কখন কী হয়, বিজুয়া আজ ক’বছরই রাত্রে আমার পাশের লম্বা ঘরটায় শোয় রাত্রে। কাল আমি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বিছানায় উঠে বসেছি। একবার কলঘরে যাব। আমার সাড়া পেয়ে বিজুয়া এসে বলল, বাবু একবার বাইরে এসে দেখে যান; ঝিলের ধারে ভুতুড়ে আলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। …বিজুয়াদের ভূতপ্রেতে বিশ্বাস থাকা অস্বাভাবিক নয়। ও ভয় পেয়েছিল বলে মনে হল। আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাইরে এসে দেখি, বিজুয়া ভুল বলেনি। একটা আলো, ঝিলের আলপথ ধরে ঘুরছে। ঘুরছে মানে, অনেকটা সেই আলেয়ার মতন এই একটা জায়গায় জ্বলল তা খানিক পরে নিভে গেল; খানিকটা তফাতে আবার দেখি আলো। অদ্ভুত ব্যাপার, মশাই।”

কিকিরাও অবাক হচ্ছিলেন। চন্দন আর তারাপদ বলল, “আলেয়া?”

“না,” চামেলিবাবু মাথা নাড়লেন, “আলেয়ার আলো আমরা অনেক দেখেছি। আগেকার মাইনিং ফিল্ডে হরদম ওটা দেখা যেত। ওটা গ্যাসের ব্যাপার। ছেলেবেলায় আমরা বলতাম, মাঠেঘাটে ভূতগুলো ছুটে বেড়ায় । কালকের দেখা আলো আলেয়া নয়।”

“কেমন করে বুঝলেন?”

“দেখে বুঝলাম। তা ছাড়া ঝিলের পাশে আজ পর্যন্ত কখনও কেউ আলেয়া দেখেনি।”

“কীসের আলো তবে?”

“মনে হয় লণ্ঠনের।…কাল যখন আলোটা দেখি–তখন আর আকাশে চাঁদ নেই। ডুবে গিয়েছে। পুরো অন্ধকার।”

“তখন ক’টা হবে?”

“পরে ঘড়ি দেখেছি, রাত সোয়া দুই।”

“আপনি কতক্ষণ দেখেছেন?”

“মিনিট দশ পনেরো বড়জোর। শীত করছিল। দাঁড়িয়ে থেকে কী আর করব। ঘরে চলে এলাম।”

চন্দন বলল, “আলোটা কতক্ষণ ছিল?”

“তা বলতে পারব না।”

তারাপদ বলল, “সকালে কাউকে দেখতে পাঠিয়েছিলেন?”

“বিজুয়াকেই পাঠিয়েছিলাম। ও ওই জায়গাটা দেখে আসার পর আমার চিরকুটটা রায়বাবুকে দিয়ে এসেছে।”

কিকিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, পরে বললেন, “কথাটা কি জানিয়েছেন কাউকে?”

মাথা নাড়লেন চামেলিবাবু। “না।…শুনুন রায়সাহেব, আমার বিশ্বাস শুধু ঝিলপাড়েই আলো ছিল না, অন্য কিছুও থাকতে পারে।”

“শর্মাকে জানিয়েছেন কথাটা?”

“না। আজ শর্মার সঙ্গে দেখা হয়নি। শুধু আপনাকেই জানিয়েছি। শর্মা যদি কাল আসে এদিকে, জানাব।”

“এটা ক’দিন হচ্ছে?”

“বলতে পারব না। কালকেই চোখে পড়ল প্রথম। “

“ঠিক আছে। আজ আমরাও নজর করব। আমাদের বাড়ি থেকে ঝিল দেখা যায় না। তবে ছাদে উঠলে আপনাদের এদিকটা দেখা যায়।”

“দেখুন তো একবার । আমিও দেখব।”

তারাপদ বলল, “কিকিরা সার, আমাদের সঙ্গে চামেলিবাবুর একটা সিগন্যালিং কোড থাকলে ভাল হত। উনি যখন দেখতেন…”

কিকিরা বাধা দিয়ে বললেন, “সে পরে হবে। আগে আমরা দেখি।”

চামেলিবাবু বললেন, “আমি জোর করে বলতে পারি, ভূত প্রেত নয়, আলেয়াও নয়, কেউ একজন ওখানে আলো হাতে ঘুরে বেড়ায়।…আপনারা কলকাতার লোক, কথাটা ঠিক বুঝবেন না হয়তো। কিন্তু আমরা বনজঙ্গলে ফাঁকা মাঠেঘাটে পড়ে থাকি। আমরা দেখেছি, কেউ যদি দূরের মাঠ দিয়ে হাতে লণ্ঠন ঝুলিয়ে হেঁটে যায়, আলোটা দোলে। মাঝে মাঝে উঁচু নিচু জায়গায় এমনকী লণ্ঠনধারীর গায়ের আড়ালেও পড়ে যায়। এই আলো মশাই, তেমন নয়। আলো হাতে কেউ হেঁটে যায় না একনাগাড়ে, আলোটা দেখলাম কমুহূর্ত, তারপর আর নেই। আবার একসময়…”

কিকিরা হেসে বললেন, “রহস্য তো ভালই জমেছে চামেলিবাবু। এতদিন ছিল লোকটা কে, কেমন করে মারা গেল? এখন আবার দেখা যাচ্ছে, ঝিলের আশেপাশে মাঝরাত্তিরে একটা ভৌতিক আলোও হাজির হয়েছে। মানে, এখন চলছে ভুতুড়ে খেলা। বোধ হয় হাতড়ানোর পালা…”

“হাতড়ানোর পালা?”

“খোঁজখবর হচ্ছে হয়তো!”

“কীসের?”

“সেটাই তো বলতে পারছি না আমরা। বুঝতেও পারছি না। পারব হয়তো এবার।”

উঠে পড়লেন কিকিরারা। “আসি।”

“সাবধানে যাবেন।”

“আমরা ইচ্ছে করেই আলপথ দিয়ে যাব না এখন। বড় রাস্তা ধরে ঘুরে যাব। আপনিও বেশি হাঁটাচলা করবেন না। ব্যথা বাড়বে।”

কিকিরারা আর বসলেন না। ওঠার সময় মজা করে বললেন, “দেখবেন মশাই, ভূতকে ভয় দেখানোর জন্যে যেন দোনলা চালিয়ে দেবেন না। তাহলে ভূত পালাবে।”

মাঠের রাস্তায় এখন স্পষ্ট জ্যোৎস্নার আলো। শীতের কুয়াশা ততটা ভারী হয়নি। রাতও বেশি নয়। মাত্র সাড়ে সাত । চামেলিবাবুর বাগানের লাগোয়া পাঁচটা বাড়ি গায়ে গায়ে নয়। তবু আলো জ্বলছিল ল্যাম্পের, লণ্ঠনের। কিকিরা যেন আরও নজর করে করে বাড়িগুলো দেখছিলেন। শীতলবাবুর বাড়ি প্রায় অন্ধকার। কচির বাড়িতে বাতি জ্বলছে। অন্য তিনটে বাড়িও অন্ধকার নয়।

তারাপদ হঠাৎ হেসে বলল, “কিকিরা সার, আপনি তাহলে আজ ভূত দেখবেন?”

“দেখব কি গো! ভূত নিয়েই তো আমার কারবার।”

তারাপদ ঠাট্টাটা বুঝতে পেরে হেসে উঠল ।

.

ঘড়ি দেখার দরকার হল না।

কিকিরা অনুমান করলেন, রাত দেড়টাও হয়তো হবে না, চামেলিবাবুর কথা বর্ণে বর্ণে মিলে গেল।

শীত কিন্তু বেশ কিকিরা গা-মাথা যতই ঢাকা দিন না কেন–শীতে কাঁপুনি ধরে যায়। চাঁদের আলো মরে গেল। শুক্লপক্ষ, তিথিও বোধ হয় নবমী। অস্ত গেল চাঁদ। অন্ধকার। তারা ফুটে আছে এপাশে।

ঝিলের আলপথে আলো দেখা গেল।

কিকিরারা দেখলেন ।

আলের উঁচু রাস্তায় কখনও, কখনও বা নীচে–ঝিলের গা ধরে একটা আলো জ্বলছে, থামছে। আড়াল পড়ে যাচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে ।

কিকিরা কিছুক্ষণ লক্ষ করতে করতে বললেন, “চাঁদু, তোমরা তৈরি?”

“হ্যাঁ, সার।”

“ঠাণ্ডা লাগবে না?”

“না সার, হেড টু ফুট এমনভাবে কভার করেছি যে, নর্থ পোলে চলে যেতে পারি।”

“তাহলে খানিকটা এগিয়ে যাও। এই ছাদ থেকে ঝিলটা আমি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ওপারে চামেলিবাগানের বাড়িগুলো নজরে পড়ছে না। তোমরা খানিকটা এগিয়ে বড় রাস্তায় জামগাছটার সামনে দাঁড়ালেই বাড়িগুলো দেখতে পাবে। একবার দেখে এসো ওই বাড়িগুলোর কোনওটা থেকে..”

“বুঝেছি সার। আলোর খেলা চলছে কিনা?”

“হ্যাঁ। যেমন বলেছিলাম।”

“আয় তারা, চলে আয়।”

তারাপদ বলল, “চল। জয় মা কালী । টর্চ নিয়েছিস?”

চন্দনরা ছাদ থেকে নেমে গেল।

কিকিরা মাথা বাঁচাবার জন্য কয়েক পা সরে গেলেন। ছাদের সিঁড়িঘরের মাথায় অ্যাসবেসটাসের শেড। এখান থেকেও ঝিলের দিকটা দেখা যায়।

আলোটা যে লণ্ঠনের, তা বোঝা যায়। টর্চের আলোর ধরন আলাদা। সাদাটে, উজ্জ্বল, স্থির। এই আলো ম্যাটমেটে, ঘোলাটে । মাঝে মাঝে আলোটা হারিয়ে যাচ্ছে, বা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। না, একেবারেই দপদপ করছে না।

কিকিরার মাথায় ঢুকছিল না, লোকটা কে হতে পারে? কেনই বা এই মাঝরাতে শীতের মধ্যে ঝিলের আলের পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে! কেন? মনে হয়, লোকটা যেন কিছু খুঁজছে। তন্নতন্ন করে। কিন্তু খোঁজাই যদি উদ্দেশ্য হয়–তবে দিনের আলোয় নয় কেন?

কিকিরা এটাও বুঝতে পারছিলেন না, ঠিক কতদিন ধরে আলোটা দেখা যাচ্ছে! হালে? না, আগে থেকেই! চামেলিবাবুর নজরে পড়েছে মাত্র গতকাল!

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে এল তারাপদরা। শীতে কাহিল।

কিকিরাও ছাদ থেকে নীচে নেমে এসেছেন।

তারাপদ আর থাকতে পারছিল না। ভীষণ উত্তেজিত। গা গরম করার জন্য হাত বাড়িয়ে সিগারেট চাইল চন্দনের কাছে। তারপর কিকিরাকে বলল, “সার, আপনি যা ভেবেছিলেন একেবারে রাইট। চামেলিবাবুর বাগানের বাইরে যে পাঁচটা বাড়ি আছে, চামেলিস ফাইভ ফিঙ্গার–” ঠাট্টা করেই বলল তারাপদ, এই ঠাট্টাটা সে করে মাঝেমধ্যে। “ওই বাড়িগুলোর একটার মধ্যে থেকে আলোর সিগন্যালিং চলছিল।”

“কেমন সিগন্যালিং?”

চন্দন বলল, “তারা পারবে না, আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলছি।…একটা বাড়ির একটাই জানলা খোলা ছিল। জানলার বাইরের দিকে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল না–আলো হাতে থাকলে বাইরে আলো পড়ত। মানে বাইরে আলো থাকলে আশপাশ থেকে চোখে পড়ত সহজেই। জানলার ভেতর দিকে ঘরের মধ্যে কেউ ছিল। তার আলোও টর্চের নয়, লণ্ঠনের। আলোটা কুপির আলোর মতন, কিংবা সাধারণ মোমের। ওই আলো কখনও ডাইনে কখনও বাঁয়ে কখনও ওপরে নীচে ঘোরানো হচ্ছিল। এক দু’বার দেখলাম ক্রশ চিহ্ন করল। সারকেলও করেছিল।…কোনও সন্দেহ নেই-ওপারে জানলার আড়াল থেকে কেউ সাঙ্কেতিকভাবে কিছু বোঝাতে চাইছিল ঝিলের লোকটাকে।”

“কোন বাড়ি বুঝতে পারলে?”

“পাঁজামশাইয়ের। ওটাই তো পশ্চিম দিকে একটেরে।”

তারাপদ বলল, “আমরা আরও অনেকটা এগুলে ঝিলের লোকটাকে আন্দাজ করতে পারতাম। এগিয়ে যেতে সাহস হল না। আপনি বারণ করেছিলেন। আমরা টর্চও জ্বালিনি, পাছে ওরা আলো দেখে ধরে ফেলে ওদের ওপর কেউ নজর রাখছে। “

কিকিরা বললেন, “ঝিলের লোকটা কখন ফিরে গেল?”

“ওপাশ থেকে বার কয়েক বাতি কম-বেশি করল। নিভিয়ে দিতেই লোকটা চলে গেল।”

“অন্ধকারে আর কিছু দেখতে পেলে না?”

“না, সার।”

কিকিরা চুপ। চন্দন বলল, “শর্মাজিকে ব্যাপারটা জানিয়ে আমরা এবার থার্ড পার্টি হয়ে যাই, কিকিরা! অযথা এই গণ্ডগোলের মধ্যে গিয়ে কাজ নেই। এসেছিলাম বেড়াতে, দু’দিন আরামসে থাকব, খাবদাব ঘুমোব, তা না কোথায় কে খুন হল, থানা পুলিশ..আমাদের মাথা ঘামিয়ে লাভ কী বলুন?”

কিকিরা মাথা নাড়লেন, যেন স্বীকার করে নিলেন কথাটা। বললেন, “মাথা আমরা ঘামাতাম না। সেদিন সকালে তারা তোমায় ডেকে নিয়ে গেল, তুমি ঝিলের কাছে গিয়ে একটি মানুষকে দেখলে। মারা গিয়েছে। তারপর থানা পুলিশ, স্টেটমেন্ট…। জড়িয়ে না গিয়ে কী করব! যাক গে, তুমি ঠিকই বলেছ। শর্মাকে এবার কথাটা জানাতে হয়। আমরা জানাতে পারি, চামেলিবাবুও পারেন। তবে চামেলিবাবুর চেয়ে আমরা আরও একটু বেশি দেখেছি।”

তারাপদ বলল, “সার, আপনি ঠিকই বলেছিলেন। গণপতি পাঁজা লোকটাকে সত্যিই সুবিধের মনে হচ্ছে না।”

“তাই দেখছি। একজন থিয়েটার যাত্রার ড্রেস মেকার, সাধারণ মানুষ, পেশাও মামুলি, পাঁজাবাবুর বয়েসও হয়েছে, ভদ্রলোক কেন এইসব গোলমেলে ব্যাপারের মধ্যে থাকবেন, আমি বুঝতে পারছি না।”

“আমাদের বুঝে দরকার নেই। যার বোঝার বুঝবে। আপনি চামেলিবাবুকে বলুন শর্মাজিকে ঘটনাটা বলতে। না হয় দু’জনেই বলুন।”

“ডাল ভার্সান!” তারাপদ ঠাট্টা করে বলল।

কিকিরা আর একটু বসে উঠে পড়লেন। “নাও, শুয়ে পড়ো। রাত কাবার হতে চলল।” বলে কিকিরা উঠে পড়লেন, নিজের ঘরে শুতে যাবেন।

ঘড়ি দেখার দরকার ছিল না। রাত যে শেষের দিকে টলে পড়ছে–বোঝাই যায়।

.

॥ ৮ ॥

চামেলিবাবু নিজেই হয়তো যেতেন পারলে, কিন্তু হাঁটার ক্ষমতা নেই থানা পর্যন্ত। কাজেই চিঠি লিখে থানা থেকে শর্মাজিকে ধরে আনলেন। কিকিরারাও ছিলেন।

সকালে বসা হয়নি। অন্য কাজ ছিল শর্মাজির। বিকেলেই এসেছেন তিনি। আর এখন বিকেল মানে আধ-সন্ধে।

কিকিরারাও এসে পড়েছেন সময়ে।

চামেলিবাবুর বসার ঘরে চা খেতে খেতে ঘটনাটা শুনলেন শর্মা। প্রথমে চামেলিবাবুর মুখে, পরে কিকিরাদের কাছে।

শর্মা ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলেন খানিক, তারপর বললেন, “চামেলিজি, ওই গণপত তো আপনার বাড়িতে ভাড়া থাকেন। আপনি আগে জানলেন না, আদমি কেমন?” শর্মা গণপতিকে বলে ‘গণপত’।

চামেলিবাবু বললেন, “না। আগে জানব কেমন করে! ভাড়া চেয়েছিল। দিয়ে দিলাম।”

“আপনার চেনা কেউ রেকমেন্ড করেছিল?”

“না, সেভাবে কেউ করেনি। চিঠি লিখেছিল ভদ্রলোক। এর আগে হরিবাবু বলে এক ভদ্রলোক ছিল বাড়িটায়, পুজোর আগে। কাশীপুরের লোক। কাপড়ের ব্যবসা শোভাবাজারে। তার মুখে আমার বাড়ির কথা শুনে চিঠি লিখেছিল…”।

“কমাস ভাড়া নিয়েছেন গণপত?”

“দু’মাস।”

“আছেন কত দিন?”

“পনেরো বিশ দিন হল।”

“আপনার কাছে আসেন?”

“না। দু-একদিন এসেছেন। কথা বেশি বলেন না। স্ত্রী মারা গিয়েছেন ক’বছর আগে। ভেতরে কোনও আফসোস আছে। মুখ দেখে তাই মনে হয়। … আমিই বরং খোঁজ নিতাম পাঁজার।”

“রায়সাহাব,” শর্মাজি কিকিরার দিকে তাকালেন, “গণপতিবাবুকে আজই থানায় তুলে নিয়ে যেতে পারি। থানায় ডেকে নিয়ে যাওয়া ডিফিকাল্ট নয়। তাতে কোনও কাম হবে না। অফেন্স? কোনও অফেন্স তো চাই। নিজের ঘরে আলো জ্বালায়–এ তো অফেন্স নয়!”

কিকিরা মাথা হেলালেন। এ তো সাফ কথা। রাম শ্যাম যদু মধু-যে কোনও লোক যখন খুশি তার বাড়িতে আলো জ্বালাতে পারে, তাতে তার দোষটা হচ্ছে কোথায়? মিছিমিছি এই বাজে কারণ দেখিয়ে কাউকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া যায় না। এমনকী…

কিকিরার আর ভাবা হল না, তার আগেই শর্মা কথা বললেন, “আজ আমি আমার লোক নিয়ে নাইটে ঝিলের আশপাশে থাকব। ওয়াচ করব। ওই লোকটাকে পাকড়াও করব! লেট আস সি…!”

চামেলিবাবু বললেন, “আজ যদি লণ্ঠনধারী ঝিলের কাছে না আসে?” কিকিরা বললেন, “মনে হয় আসবে।” বলে একটু হাসলেন, বললেন আবার, “আমি শিকারী নই, বনেজঙ্গলেও ঘুরে বেড়াই না। শুনেছি, বাঘসিংহ নাকি তার আধমরা বা মরা শিকার যেখানে ফেলে যায় সেখানে বারবার ঘুরে আসে। আমরা জানি না। কিন্তু আমার বিশ্বাস–ওই ঝিলের আশপাশে কোনও কিছু খোঁজার চেষ্টা হয়। সেটা সামান্য জিনিস নয়। ওই লণ্ঠনধারী আজও আসবে। পাঁজাবাবু কি জানতে পারছেন, আমরা ওঁদের আলোর খেলাটা নজর করেছি! করেননি। তিনি জানেন না। বরাত জোরে আমরা যা দেখেছি তা নেহাত তুচ্ছ নয় চামেলিবাবু, এই গিটটা খুলতে পারলে হয়তো অনেক জট আলগা হয়ে যাবে।”

চামেলিবাবু স্বীকার করলেন কথাটা। “দেখুন, কপালে যদি লেগে যায় আজ!”

শর্মাজি আর অপেক্ষা করতে চাইলেন না। সামান্য শলা-পরামর্শ করে তিনি উঠে পড়লেন।

.

মাঝরাতের পর পরই ঘটনাটা ঘটে গেল।

ঝিলের আলপথ ধরে যে-লোকটা ঘোরাফেরা করছিল, সে ধরা পড়ে গেল। তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি যে ঘন অন্ধকারে, ঝিলের গায়ে বাঁকা হয়ে ঝুলে পড়া গাছটার আড়াল থেকে কেউ আচমকা বেরিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলবে।

তবু হয়তো সে পালাবার চেষ্টা করত। কিন্তু বুঝতে পারল তাতে লাভ হবে না। পুলিশের হুইশলের শব্দ, টর্চের আলো, জনা কয়েক সেপাইয়ের ছুটে আসা, দারোগাজির হাতের অস্ত্রটি তাকে আর পালাবার সাহস জোগাতে পারল না।

লোকটাকে চট করে দেখলে মনে হয় না, ও মানুষ। চেহারায় যতটা ভীতিকর তার চেয়েও বেশি আতঙ্কজনক তার সাজপোশাক। ঘন কালো, কর্কশ এক কম্বলের কাপড় কেটে যেন তার গায়ে এক বেয়াড়া জোব্বা বা জামা চাপানো রয়েছে। গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা। মাথা মুখ গলা কালো টুপিতে আড়াল করা। হনুমান-মাকা টুপি। শুধু চোখ নাক দেখা যাচ্ছে। টুপির গলার কাছে একটা কালচে মাফলার। হাতে দস্তানা। সেটাও কালচে রঙের। পায়ের জুতো গামবুট ধরনের। অল্প আলো বা অন্ধকারে দেখলে লোকটাকে বুনো জন্তু বলেই মনে হয়।

ধরা পড়ে গেল লোকটা। তার হাতের লণ্ঠন কেড়ে নিল একজন সেপাই ।

কিকিরারাও ততক্ষণে হাজির হয়ে গিয়েছেন ঝিলের ধারে ।

শীতের দিন। তবু ঘন ঘন হুইশলের শব্দ, সেপাইদের চেঁচামেচিতে চামেলিবাবুর প্রতিবেশীদের কারও কারও হয়তো ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। জানলাও খুলে গেল দু-এক বাড়ির।

শর্মাজি আর দাঁড়াতে রাজি নয়।

লোকটাকে ধরে রাখল দুই সেপাই। অন্য একজনকে শর্মা হুকুম করলেন, গণপতি পাঁজার বাড়িতে গিয়ে পাহারায় থাকতে। ভোর হলেই তাঁকে তুলে নিয়ে থানায় যেতে।

“রায়সাহাব, আপনারা ঘর চলে যান। রাত বহুত হয়ে গেল। কাল থানায় আসবেন। “

কিকিরা পাঁজাবাবুর অনুগত লোকটিকে দেখছিলেন। দেখছিলেন আর ভাবছিলেন, বুনো জন্তুর মতন পোশাক পরলেও লোকটাকে অনেক বেশি ভৌতিক দেখায়। এরকম কাউকে রাত্রে আচমকা দেখলে ভয়ে মূর্ছা যাওয়া অসম্ভব নয়। হার্টফেলও হতে পারে দুর্বল চিত্তের মানুষের।

“তোমার নাম ভৈরব?” কিকিরা বললেন।

লোকটা জবাব দিল না কথার । সে যেন এখনও ভাবতে পারছে না যে কেমন করে সে ধরা পড়ে গেল।

জবাব না-পাওয়ায় কিকিরা যেন একটু হেসে বললেন, “তুমি বাপু কতক্ষণ আর বোবা হয়ে থাকবে! থানায় যাও, পুলিশের গুঁতো খেলে বোবারাও ‘বাবা’ বলে। কথা ওরা বলিয়ে নেবে।”

চন্দন বলল, “চলুন, সার। আজ আর নয়। ঠাণ্ডা লেগে গিয়েছে।”

কিকিরাও আর দাঁড়াতে রাজি নন। তারাপদকে টানলেন।“চলো।” যেতে গিয়ে শর্মার দিকে তাকালেন। “কাল আপনার সভা কখন বসবে দারোগাসাহেব?”

“স-ভা!”

“আমরা তো যাব ।”

শর্মা বুঝতে পারলেন। বললেন, “সাড়ে ন দশ বাজে আসুন।”

“চামেলিবাবু?…পায়ে ব্যথা।“

“আনিয়ে নেব।”

“চলি।”

কষ্টই হচ্ছিল যেতে। ঝিলপারের চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে উত্তরের। আকাশের তারাগুলিও যেন আবছা হয়ে এসেছে হিমে কুয়াশায়।

যেতে যেতে কিকিরা বললেন, “বুঝলে চাঁদু, পাঁজাবাবু, থিয়েটার যাত্রার ড্রেস মেকার, সাজ মাস্টার হতে পারেন। ওঁর সুনাম কতটা, আমি জানি না। তবে লোকটির অন্য মিস্ত্রিও আছে, চাঁদু। হয়তো সেটাই আসল! দেখা যাক, কী। বলেন উনি!”

.

৯ ॥

থানায় শর্মাজির অফিস ঘরে চামেলিবাবুরা সবাই বসে ছিলেন। কিকিরারা একপাশে; চামেলিবাবু শর্মার মুখোমুখি। বাঁদিকে একটা কাঠের চেয়ারে গণপতি পাঁজা। গণপতি পাঁজাকে দেখলে মনে হবে না, উনি ভয়ে তটস্থ হয়ে বা বিহ্বল হয়ে বসে আছেন। শক্ত মানুষ। গলার স্বর মিনমিনে নয়, খানিকটা নিস্পৃহ ও গম্ভীর।

প্রথমটায় তিনি শর্মাজিদের কথা শুনলেন। চামেলিবাবুর রাগারাগি দেখলেন। না জেনেশুনে অচেনা লোককে বাড়িভাড়া দিয়ে কত মূখামিই না করেছেন তিনি চামেলিবাবু আফসোস করছিলেন। অবশ্য এটা সবসময় সর্বক্ষেত্রে ঠিক নয়। ভাড়া তিনি অজানা অচেনাকেও দেন, তবে একটু দেখে শুনে।

এক তরফা নানান কথা শোনার পর গণপতি পাঁজা বললেন, অধৈর্য হয়েই, “আপনারা আমাকে থানায় ধরে এনেছেন কেন? ধরে এনেছেন প্রমাণ করতে যে আমি সেদিনের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছি। এই তো?”

চামেলিবাবু বললেন, “আলবাত। আপনি ছাড়া…”

হাত তুলে চামেলিবাবুকে থামতে বললেন গণপতি, তারপর চামেলিকে যেন উপেক্ষা করেই শর্মাজির দিকে তাকালেন। বললেন, “আমাকে আপনি আসামি হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন দারোগাবাবু! তা আপনি পারেন। সন্দেহ করে মামলা সাজাতে পারেন। কিন্তু আমার তরফেও আইন আছে। বড় বড় উকিল ব্যারিস্টারও খাড়া করতে পারি । সহজে আপনি আমায় ফাঁসাতে পারবে না।”

শর্মা উত্তেজিত হলেন না। ঠাণ্ডা গলাতেই বললেন, “আপনি যা বলার বলতে পারেন। আমার কাজ আমি করব।”

“করুন।” বলে কিকিরার দিকে তাকালেন গণপতি। “আপনি এদের দলে ঢুকে পড়েছেন! ভালই করেছেন। মশাই, মানুষ চেনায় ভুল আমার কমই হয়। আপনাকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। তবে আপনারা যে এতটা নেচে উঠবেন, বুঝতে পারিনি।”

কিকিরা অমায়িক মুখ করে হাসলেন। “আমারও হয়নি।”

“হয়নি?”

“না।”

“তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, আমি খুনি!”

“নিজের হাতে আপনি কী করেছেন আমি বলতে পারব না। তবে ওই মানুষটির খুনের পেছনে আপনার হাত থাকতে পারে।”

গণপতি সামান্য চুপ করে থাকলেন। দেখলেন কিকিরাকে তীক্ষ্ণভাবে। শেষে বললেন, “অশ্বিনী দালাল, ওরফে প্রেমলাল, ওরফে খুশিবাবু, জানেন লোকটাকে? নাম শুনেছেন? পুলিশের খাতায় লোকটা নামকরা স্মাগলার। বাইরে থেকে মাল আনে। সোনা, ড্রাগস– সব ব্যাপারেই হাত আছে। ক্রিমিন্যাল। একটা দল আছে ওর। ব্যবসা ছড়ানো। ব্যাঙ্ক ডাকাতিও করেছে।”

কিকিরা রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। স্মাগলারদের সম্বন্ধে তাঁর কোনও ধারণা নেই। কাগজে পড়েন মাঝে মাঝে, গল্পেও হয়তো শুনেছেন কারও কারও নাম- তবে পাকা স্মাগলার চোখে দেখেননি।

শর্মাজিও নড়েচড়ে বসলেন। এখানে স্মাগলার?

চন্দন আর তারাপদ মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। চামেলিবাবু চুপ।

“তাতে কী!” কিকিরা বললেন শেষপর্যন্ত, নিজেকে সামলে নিয়ে, “স্মাগলার হলে তাকে আপনি ধরিয়ে দিতে পারতেন, কোনও মানুষকে খুন করার অধিকার আপনার নেই।”

“আমি খুন করিনি।” গণপতি বললেন, একটু থেমে আবার, “আর অধিকার থাক শোধবোধের ব্যাপার ছিল।”

“কে খুন করেছে?”

“ইচ্ছে করে কেউ করেনি। গণ্ডগোলে হয়ে গিয়েছে।”

“গণ্ডগোলে হয়ে গেল?”

“হ্যাঁ। দু’জনে যদি লড়াই করে, একজন অন্যজনকে টুটি টিপে মারার চেষ্টা করে তাহলে যে যা পায় হাতের কাছে তাই দিয়ে অন্যকে জখম করে । স্বাভাবিক ব্যাপার এটা। প্রেমলাল জখম হয়েছিল।”

“কে করেছিল! ভৈরব!”

“হ্যাঁ।”

“আপনি হুকুম করেছিলেন?”

“না,” মাথা নাড়লেন গণপতি, “আমি খুন করতে হুকুম করিনি। চিরকালের মতন অকেজো করে দিতে বলেছিলাম। প্রেমলাল বাহাদুরি করতে গেল। ভৈরবের গায়ে অসুরের ক্ষমতা, ছাড়া ও লড়ালড়ির সময় ঝিলের পাড়ে একটা পাথরের টুকরো পেয়ে যায়, ভারী পাথর, প্রেমলালের মাথায় মেরেছিল। তার আগে প্রেমলালের ভোজালিতে সামান্য লেগেছিল ভৈরবের পিঠের দিকে। প্রেমলাল ভোজালি চালালেও জায়গা মতন জখম করতে পারেনি ভৈরবকে।”

শর্মা বললেন, “প্রেমলালকে জখম করার পর তাকে ঝিলের জলে পাথরের ওপর ফেলে দিয়েছিল আপনার ভৈরব।”

“হ্যাঁ। … তবে এখানে ও নিদোষ। ওর মাথায় বুদ্ধিটা খেলেনি। ওটা আমিই বলেছিলাম।”

“আপনি ওখানে ছিলেন?”

“সত্যি কথা বললে বলতে হয়–ছিলাম”, গণপতি বললেন, “নগদ টাকার তোড়া ওকে দিতে হলে থাকব না নিজে।”

শর্মা আর কিকিরা পরস্পরের দিকে তাকালেন। হয়তো চমকেও উঠেছিলেন ভেতরে ভেতরে। টাকা! তোড়া! কেন?

“আপনি ওকে টাকা দিতে গিয়েছিলেন কেন?” গণপতি যেন তামাশা করছেন, বললেন, “টাকা ছাড়া প্রেমলালের সঙ্গে লেনদেনের কারবার হয়! সোনার কাঠি শুনেছেন? হংকং গোল্ড স্টিক!”

“সেটা আবার কী?” চামেলিবাবু বললেন।

“পিনও বলতে পারেন।… হাই ক্লাস টুথ প্রিক কিংবা ধরুন ইনজেকশানের ছুঁচ নিশ্চয় দেখেছেন। এগুলো সেইরকম। জিনিসটা শুনতে যত মামুলি মনে হচ্ছে- আসলে তেমন নয়। সোনার কাঠি, খাঁটি, ভীষণ শক্ত, ওরা বলে– কী বলে যেন মানে দেখতে কাঠি হলেও ওজনে কাঠি নয়।”

“এসব আসে কোথা থেকে?”

“হংকং, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর চোরাপথে ঘুরেফিরে আসে।“

“ওই লোকটা যে মারা গিয়েছে, সে এসব আনাত?”

“লাইনে ছিল। আগেই বলেছি, ও স্মাগলার। ওর হাত হয়ে বাজারে সোনা, স্টোন, নেশাটেশাও ঘুরত।”

“মানে আপনি বলতে চাইছেন, বাইরে থেকে এইসব মাল সে নিজে বা লোক দিয়ে এখানে আনাত?”

“হ্যাঁ। তবে ওর মাথার ওপর লোক ছিল। প্রেমলালের মনিব । তার কাজকর্মের কথা আমি বেশি জানি না । শুধু জানি, বাইরে বাইরেই সে মক্কেল বেশি ঘুরত।”

“এখানকার বাজারে ওই সোনার কাঠির দাম কত হতে পারে?”

“দা-ম! তা এক-একটা কাঠি কম করেও আটশো হাজার।”

“সোনার বিস্কুটের কথা শুনেছি। কাঠি কখনও শুনিনি।”

“এসব হালে হয়েছে। চোখে ধূলো দেওয়ার জন্যে!… কাঠবাদাম জানেন তো, চিনেবাদাম নয়, সেই কাঠবাদামের মধ্যে করে চুনি আসে, হিরের কুচি আসে শুনেছেন? তবে বাদামগুলো কাঠবাদাম নয়, দেখতে অবিকল ওইরকম। নকল বাদাম। ধরা যায় না।”

শর্মা ড্রয়ার খুলে আবার বন্ধ করে দিলেন। ছোট্ট একটা জায়গার সাধারণ দারোগা। এত কথা কেমন করে জানবেন। “স্টিক বা কাঠি, নিডল আসে কীভাবে!”

“যেভাবে আসে, না দেখলে আপনারা বুঝতে পারবেন না।” গণপতি বললেন, “অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। তবে বেশিরভাগ সময়ে আসে বড় টর্চের ব্যাটারির সেলের মধ্যে। পিনগুলো লম্বায় ইঞ্চি দুই। বাণ্ডিল করা থাকে সেলের মধ্যে, ওপরের দিকটা অবিকল ওই সেলের মতন প্যাকিং। লেবেলিং। চট করে দেখলে ধরার উপায় নেই, ব্যাটারির সেল বলেই মনে হবে।”

কিকিরা বুঝতে পেরে গেলেন। একবার তাকালেন শর্মার দিকে। তারপর চোখ ফিরিয়ে গণপতিকে দেখলেন। “ও, আপনিই তাহলে টর্চ থেকে সেলগুলো বার করে নিয়েছেন? তিন সেলের টর্চ! কত টাকার মাল ছিল পাঁজাবাবু?”

গণপতি মাথা নাড়েন। “না, আমি বার করে নিইনি। নিতে পারিনি। নিতে পারলে কম করেও আড়াই লাখ টাকা হত।” মনে মনে একটা হিসেব ছিল যেন ওঁর।

“কেন পারলেন না?”

“আমার সঙ্গে কথা ছিল নগদ পঞ্চাশ হাজার পাবে প্রেমলাল। টোপ দিয়ে রেখেছিলাম। এখানে অত টাকা আমি পাব কোথায়? অবশ্য ওকে কথাটা জানাইনি। তা সেদিন একটা ছুতো দেখিয়ে বললাম, হাজার পাঁচ-সাত নাও, বাকি টাকা কলকাতায় গিয়ে অমুকের কাছ থেকে নিয়ে নিয়ো। আমি চিঠি লিখে এনেছি।”

“ও! টাকা নিয়ে গোলমাল? পাওনাগণ্ডা আদায়..”

“এককথার মানুষ আমি। কারবার আমার কাছে কারবার। প্রেমলাল চেল্লাতে লাগল। আমি বারণ করলাম। ও আমায় গালাগাল দিতে লাগল। বলল, টাকা দেব কথা দিয়েই আমি তাকে ডেকে আনিয়েছি। হ্যাঁ, তা ঠিকই। আনিয়েছিলাম। তবে সে অন্য মতলবে। প্রেমলালকে একটা ছুতো দেখাবার চেষ্টা করলাম। ও আরও খেপে গেল। ভৈরবকে বললাম, ওকে ধরতে। তখন ঝটপট লেগে গেল। ধস্তাধস্তি। প্রেমলাল ভোজালি চালাল। তারপর টর্চ থেকে ব্যাটারির সেলগুলো বার করে ঝিলের মধ্যে ফেলে দিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে।

শর্মাজি বললেন, “সেলগুলো আপনি পাননি?”

“না।”

“ওগুলো ঝিলের মধ্যে পড়ে আছে?”

“ঝিলের মধ্যে আছে । না, আশপাশেও পড়েছে দু-একটা ছোঁড়ার সময় জানি না।”

“আপনি ভৈরবকে দিয়ে রাত্রে সেগুলো খোঁজেন।” কিকিরা বললেন।

“অত টাকা…” গলার স্বর অন্যরকম শোনাল! তামাশা করলেন নাকি!

“তা দিনের বেলায় খোঁজেন না কেন?”

“না, দিনে নয়। ও মারা যাওয়ার পর আমি ঝিলের আশেপাশেও যাইনি। কার চোখে পড়ে, কী সন্দেহ হয়, কে বলতে পারে! পুলিশের নজর ছিল, আপনারাও ঘোরাঘুরি করতেন ঝিলের কাছে।”

“সাবধানের মার নেই” হাসলেন কিকিরা। “তা রাতের খোঁজটা শুরু হয়েছিল কবে থেকে?”

“এই তো দিন তিনেক…।”

“আপনার ভৈরব ওভাবে আলো নিয়ে অন্ধকারে…”

“ভৈরব দিনকানা!”

“দিনকানা! মানে!…শুনেছি প্যাঁচারা দিনে..” কিকিরা ঠাট্টা করলেন।

“রাতকানা তো শুনেছেন। দিনকানাও হয়। ভৈরব দিনের বেলায় ভাল দেখতে পায় না, ঝাপসাটে দেখে। এ ওর প্রায় জন্মগত রোগ। ডাক্তার দেখিয়েছি অনেক। তাঁরা বলেন, বুঝতে পারি না; তবে এমন হয় পাঁচ লাখে হয়তো দু-একজন । রোগের একটা নামও বলেন। …এক-একজন মানুষ নিয়মের বাইরে থেকে যায় মশাই, প্রকৃতির খেয়াল ।”

শর্মা নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। বললেন, “প্রেমলালই এখানে এসে ওই ধরমশালায় ছিল? গিরিবাবার ধরমশালায়?”

“হ্যাঁ।”

“দাড়িগোঁফ লাগিয়ে গেরুয়া আলখাল্লা পরে এসেছিল, ভেক ধরে?”

“হ্যাঁ। ভেক ধরতে কী আছে দারোগাবাবু। এক-দু’দিনের ভেক । প্রেমলাল কোন মুলুকে না চক্কর মারে! তা ছাড়া ওর ওপর নজর আছে পুলিশের। “

“হুঁ! ও আপনাকে জানিয়ে এসেছিল তাহলে!”

“চিঠি লিখে এসেছিল। চিঠি আমার কাছে আছে। আমি আসতে বলেছিলাম। ও চিঠি পড়লে আপনি কিছু বুঝবেন না। সাঁটে লেখা ।”

“বেশ,” কিকিরা বললেন, “চিঠি পেয়ে আপনি কেন লিখলেন না যে আপনার কাছে এখানে অত টাকা নেই।”

“সত্যি কথা আগেই বলেছি। ওকে আমি এখানে আনতেই চেয়েছিলাম।… তার কারণ ছিল। কী কারণ জানতে চাইবেন না। তবে সেদিন তবু ওকে আমি টাকার ব্যাপারে মিথ্যে বলিনি । টাকা আমার কাছে ছিল না। ও বলল, টাকা নিয়ে কালই সকালে ও গোরখপুর চলে যাবে। সেখান থেকে নেপালে। অনেক টাকার মাল আনতে হবে।”

শর্মা উঠে গিয়ে তাঁর অফিস ঘরের আলমারির তালা খললেন। তারপর একটা প্যাকেট বার করে আনলেন। কোরা কাপড়ে মোড়া। গালার সিল চার-পাঁচ জায়গায়।

নিজের চেয়ারে বসে প্যাকেটটার গালা ভাঙলেন।

ভেতরের জিনিসগুলো সামনে রাখলেন শর্মা। বললেন, “এই টর্চ! শাল! চিনতে পারেন?”

মাথা নাড়লেন গণপতি। “টর্চটা ওর হাতে ছিল । আমার হাতে আসেনি। “

“এই টর্চের ভেতরেই তো ছিল আসল জিনিস,” কিকিরা মুচকি হেসে বললেন।

গণপতি জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না প্রথমে। পরে কী ভেবে বললেন, “প্রেমলাল জখম হওয়ার পর ওর হাত থেকে টর্চটা আমরা কেড়ে নিতে পারতাম। কেন নিইনি কে জানে!”

“টর্চের ভেতর মাল ছিল না বলে।”

চামেলিবাবু আচমকা বললেন, “আচ্ছা পাঁজাবাবু, এই অন্ধকারে আপনার বন্ধুটি এল কেমন করে? তার চোখ কি আঁধারিতে জ্বলে?”

গণপতি নির্বিকারভাবে বললেন, “আরও একটা পকেট টর্চ ছিল ওর কাছে, আসল টর্চ, সেটা কোথায় আমি জানি না। পেয়েছেন নাকি?”

শর্মা মাথা নাড়লেন। না, পাননি।

“পুকুরের জলে পড়ে আছে হয়তো।” গণপতি বললেন।

শর্মা এবার রুপোর তাবিজ আর ছেঁড়া চেনটা দেখালেন। “এটা কার? চিনতে পারেন?”

গণপতি দেখলেন তাবিজ-লকেট আর চেনটা, হাত বাড়িয়ে নিলেন না। শুধু তাকিয়ে থাকলেন।

“কার এটা?” শর্মা আবার জিজ্ঞেস করলেন।

গণপতি কিছু বলার আগে কিকিরা বললেন, “গণপতিবাবুর দৈব বিশ্বাস খুব। অত আংটি আঙুলে। দামি দামি পাথর। তাই না, মশাই!… ওই তাবিজ-তক্তিও আপনার!”

জবাবটা দিতে সময় নিলেন গণপতি। বললেন, “হ্যাঁ। দৈবে বিশ্বাস। তবে তাতে কী?”

“তাতে আর কিছু নয়, শুধু প্রমাণ হয়, আপনি সে-সময় সেখানে ছিলেন। বোধ হয় ধস্তাধস্তির সময় এগিয়েও গিয়েছিলেন। কিন্তু বয়েস হয়েছে। লড়ালড়ি কি আপনার পোষায়! লাভের মধ্যে ওটা ছিঁড়ে হাত থেকে পড়ে গিয়েছে।”

গণপতি চুপ।

“কী আছে ওতে?”

“ধরুন, প্রসাদী ফুলপাতা।”

“ঠাকুরদেবতার ফুলপাতা নিয়ে কিছু বলতে নেই গণপতিবাবু! তবে আপনি কি সত্যি কথা বলছেন?”

গণপতি এবার বিরক্ত হলেন। বললেন, “ভেঙে দেখুন। …আমি দৈব বিশ্বাস করি আর না করি তাতে আপনাদের কী! …হ্যাঁ, করি। দৈব মেনে নিয়েছি বলেই পর পর কত বড় ঘা সইতে পেরেছি জীবনে আপনারা তার কী জানেন! ..আমার ছেলে গিয়েছে। তাজা ছেলে! ওই শয়তান প্রেমলাল তাকে নেশায় ভিড়িয়েছিল। ছেলেটা নিজের সর্বনাশ করছিল। আমাদেরও। শেষে একদিন গলায় দড়ি দিয়ে মরল। রাগে, অভিমানে। মাথা বিগড়ে গিয়ে। প্রেমলাল মুখে আহা-উঁহু করল। মনে মনে ভাবল, নেশার চক্করে পড়লে এরকম কতই না যায়! আরও একটা গেল। …আমার স্ত্রী সন্তানশোক সহ্য করতে না পেরে পরের বছরেই মারা গেল।” গণপতি থামলেন, যেন পুরনো কথা মনে এসে গেল পর পর। সামান্য থেমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “চোরাই কারবার আমার ছিল না। টাকা আমার আছে। …তবু একদিন আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ওই প্রেমলালকে আমি দেখে নেব । ওকে আর মানুষের চেহারায় বাঁচতে দেব না সংসারে। … আমার ভেতরের কথা ওকে বুঝতে দিইনি। ধীরে ধীরে ভাবসাব করেছি। কমসম চোরা কারবারও করেছি ওর সঙ্গে। …এবার ওকে এখানে টেনে এনেছিলাম আমি। ভুলিয়ে। নয়তো হাজার পঞ্চাশ ষাটের কারবার তো কলকাতাতেই হওয়ার কথা। এখানে কেন!” গণপতি থেমে গিয়ে এদিক ওদিক তাকালেন, “একটু জল খাওয়াতে পারেন! …যা বলছিলাম। বলছিলাম প্রেমলালকে ভুলিয়ে এখানে আনার একটাই কারণ, কলকাতায় ওর অনেক শাগরেদ। এখানে ও একা। ও একলা। আমরা দু’জন। আমি আর ভৈরব। ভৈরবকে দোষী করবেন না দারোগাবাবু! ও বোকা, ওর মাথা বলে কিছু নেই। আমার হুকুমই ওর কাছে সব।”

শর্মা জল আনতে বলেছিলেন হাঁক মেরে।

জল আসার আগেই কিকিরা বললেন, “আপনি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন বলছিলেন, প্রেমলালকে একরকম শেষ করতেই চাইছিলেন। ও তো মারা গিয়েছে সেদিনই। তাহলে আজ ক’দিন রাত্রে কী খুঁজে বেড়াচ্ছেন ভৈরবকে ঝিলের কাছে পাঠিয়ে? নিজেই বলেছেন, সেই সোনার কাঠিওলা ব্যাটারিগুলো। তাই না?”।

গণপতি কেমন মুখ করে হাসবার চেষ্টা করলেন একটু। ধীরে ধীরে বললেন, “না, সোনা নয়। সোনা বললে আপনাদের মগজে ঢুকবে, তাই সোনা বলেছিলাম। বাজারি সোনা দিয়ে আর আমি কী করব! ওই সোনার কী দাম আমার কাছে!”

“তবে?”

গণপতি চোখের ইশারায় তাবিজটা দেখালেন। “ওটারই খোঁজ করছিলাম। ওর মধ্যে সত্যি সত্যি ফুলপাতা নেই। আছে আমার ছেলে আর স্ত্রীর চিতার ছাই। প্রেমলালের জন্যে ওদের আমি চিতায় উঠিয়েছি। মন থেকে সেটা তাড়াতে পারতাম না। এই ক’বছর ওটা হাতেই ছিল। আজ আর নেই। বড় ফাঁকা লাগছিল। তবে সবই শেষ হয়ে গিয়েছে কখন। হয়তো কলকাতায় ফিরে ওটাও গঙ্গার জলে ফেলে দিতাম একদিন।“

চামেলিবাবু অপলকে তাকিয়ে থাকলেন।

তারাপদ আর চন্দন একদৃষ্টে তাবিজের দিকে তাকিয়ে ছিল।

শর্মা যেন অস্বস্তি বোধ করে অন্যমনস্কভাবে কালো শালটার কোণা খুঁটছিলেন।

কিকিরা একটিও কথা বললেন না। ততক্ষণে জল এসে গেল। একজন সেপাই গ্লাসে করে জল এনে টেবিলে রাখল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *