কি পেলাম – ৩

০৩.

হারুন চার মাসের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছে। এখন তার বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু বন্ধু আজিজের বিয়েতে গিয়ে রোকেয়াকে দেখে সিদ্ধান্ত নিল তাকে বিয়ে করবে। সে কথা একদিন আজিজকে বলে বলল, আম্মাকে তোর ভাগনীর কথা সরাসরি বললে রাজি হবে না। তাই ভেবেছি, তোকে দিয়ে

তাকে থামিয়ে দিয়ে আজিজ বলল, কেন?

হারুন বলল, আম্মা একটা মেয়ে দেখে রেখেছে। আমি তাকে দেখেছি। সে মেয়েকে আমার একদম পছন্দ হয়নি। এখন তোকে যা বলছি শোন, তারপর যা বলার বলে বলল, কিরে যা বললাম পারবি না?

আজিজ হেসে উঠে বলল, নিশ্চয় পারব, এটা আর তেমন কঠিন কাজ নাকি?

কয়েকদিন পর একদিন আজিজ মুনসীরহাটে হারুনদের বাড়িতে এল। হারুনের সঙ্গে আগেই কথা হয়েছে, আজ এই সময়ে সে ঘরে থাকবে না। আজিজ হারুনের সাথে অনেকবার তাদের বাড়িতে এসেছে। সবাই তাকে চিনে। সে সরাসরি বাড়ির ভিতরে ঢুকে হারুনের নাম ধরে ডাকল।

হারুনের মা হনুফা বিবি উঠোন ঝাট দিচ্ছিলেন। আজিজকে দেখে বললেন, সে তো ঘরে নেই বাবা, কিছুক্ষণ আগে কোথায় যেন গেল। তারপর ঝাড়টা উঠোনের একপাশে রেখে বললেন, এস বাবা বস। ও হয়তো এক্ষুনি এসে পড়বে।

আজিজ ওঁর সাথে বারান্দায় এসে একটা চেয়ারে বসে বলল, চাচি আম্মা আপনিও বসুন।

হানুফা বিবি বললেন, তুমি বস, আমি তোমার জন্য একটু চা করে নিয়ে আসি।

আজিজ বলল, বাইরে থেকে এক্ষুনি চা খেয়ে এলাম, এখন আর খাব না। হারুন আসুক, তখন না হয় একসাথে খাব। আপনি বসুন, দুএকটা কথা বলব।

হানুফা বিবি বসে বললেন, ঠিক আছে, কি বলবে বল।

আজিজ বলল, এত বড় সংসারের কাজ আপনি একা আর কতদিন করবেন? এবার হারুনের বিয়ে দিন। বৌ এলে তবু আপনি একটু আরাম পাবেন। তাছাড়া আপনাদের ঘরে কোনো মেয়ে নেই। হারুনের বিয়ে দিলে তবু একটা মেয়ে আসবে।

হানুফা বিবি বললেন, আমি তো তাই চেয়েছিলাম। সে জন্যে একটা মেয়েও দেখেছিলাম। কিন্তু হারুন সেই মেয়েকে বিয়ে করবে না।

আজিজ বলল, সেই মেয়েকে হয়তো হারুনের পছন্দ হয়নি, তাই করতে চায়নি। আপনি আরো অন্য মেয়ে দেখুন। তাদের মধ্যে কাউকে না কাউকে তার পছন্দ হবে। আর যদি বলেন, আমিও মেয়ের সন্ধান করি। সে তো অনেকদিন থেকে বিদেশ করছে। তার বিয়ের বয়সও হয়েছে।

হানুফা বিবি বললেন, তাই দেখব। তুমিও ভালো মেয়ের খোঁজ কর। তারপর আবার বললেন, হারুন তো এখনো এল না। চা করে দিই, খেয়ে আজ তুমি যাও। পরে আবার এস। বেলা হয়ে যাচ্ছে। রান্না চাপাতে হবে।

আজিজ চা খেয়ে ফিরে আসার সময় পথে হারুনকে দেখতে পেয়ে সব কথা বলল।

হারুন মুচকি হেসে বলল, ঠিক আছে, আবার কবে আসবি?

আজিজ বলল, দুচার দিন যাক, তারপর আসব।

 তাই আসিস বলে হারুন সালাম বিনিময় করে ঘরের দিকে চলল।

দুচারদিন পর আজিজ হারুনদের বাসায় এল। আজও আসবার আগে হারুনের সাথে পরামর্শ করে এসেছে। তার মাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন চাচি আম্মা?

হানুফা বিবি সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, আমার আর থাকা না থাকা একই কথা। সংসারে খেটে খেটে জীবনটা শেষ হয়ে গেল।

আজিজ বলল, সেই জন্যেই হারুনের তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়া উচিত।

হানুফা বিবি বললেন, সে কথা তোমরা ভাবলেও হারুন ভাবেনি। তা না হলে কত মেয়ে তাকে দেখালাম, একটাকেও তার পছন্দ হল না কেন?

আজিজ হারুনের চালাকির কথা বুঝতে পেরে মনে মনে হাসল। মুখে রাগ দেখিয়ে বলল, তাই নাকি? দেখা হোক একবার, যা বলার বলব। কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে বলল, আমি একটা মেয়ে দেখেছি। আপনারা হারুনকে সাথে নিয়ে দেখুন। আমার মনে হয়, হারুনের অপছন্দ হবে না।

আজ হারুনের বাবা ঘরে ছিলেন। হারুনের বিয়ের কথা শুনে বেরিয়ে এসে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আজিজ ঠিক কথা বলেছে। তোমরা সবাই গিয়ে ঐ মেয়ে দেখে এস। পছন্দ হলে এবারেই হারুনের বিয়ে দিয়ে দেব। আবার কবে আসবে না আসবে তার কোনো ঠিক আছে? তারপর আজিজকে বললেন, আমরা কয়েকদিনের মধ্যে মেয়ে দেখতে যাব। যাবার আগে হারুনকে দিয়ে তোমাকে খবর দেব। তুমি মেয়ের বাবাকে সে কথা বলে রেখ।

আজিজ বলল, ঠিক আছে চাচা তাই হবে। তারপর সালাম বিনিময় করে বেরিয়ে এল। আজও হারুন আজিজের জন্য পথে অপেক্ষা করছিল। তাকে ফিরে আসতে দেখে বলল, কি খবর বল।

আজিজ তার বাবার কথা বলে বিদায় নিয়ে রোকেয়াদের বাড়িতে গেল।

শাহেদ আলী বাড়িতেই ছিলেন। সালাম বিনিময় করে বললেন, কি খবর বড় কুটুম? হঠাৎ কি মনে করে? শশুর বাড়ি যেতে যেতে পথ ভুলে বোনের বাড়ি ঢুকে পড়েছ মনে হচ্ছে?

আজিজ হেসে উঠে বলল, দুলাভাই কি যে বলেন? পথ ভুল হবে কেন? আসলে আপনাদের বাড়িতেই এসেছি।

শাহেদ আলী বললেন, তাহলে আগমনের হেতুটা বলে ফেল।

আজিজ হারুনের পরিচয় দিয়ে রোকেয়ার জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিল।

শাহেদ আলী রাজি হলেন না। বললেন, কয়েক মাস পরে ওর ম্যাট্রিক পরীক্ষা, এখন বিয়ে হলে তা আর হবে না। তারা যদি অপেক্ষা করতে পারে। তাহলে তখন দেখা যাবে।

আজিজ বলল, কিন্তু তারা তো এতদিন অপেক্ষা করবেন না। তাছাড়া ছেলে চার মাসের ছুটিতে এসেছে। আবার কবে ফিরবে তার কোনো ঠিক নেই। এবারেই ছেলের বিয়ে দিতে চান।

শাহেদ আলী বললেন, তাহলে তাদেরকে অন্য মেয়ে দেখতে বল।

আজিজ দুলাভাইকে রাজি করাতে না পেরে নাস্তা খেয়ে রোকেয়ার নানা নানিকে গিয়ে ধরল।

আজিজ রোকেয়ার নানির চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। ওরা তার কথা ঠেলতে পারলেন না। বললেন, তুমি এখন যাও। আমরা জামাইকে ডেকে রাজি করাবার চেষ্টা করব।

জয়নুদ্দিন একদিন জামাইকে ডেকে পাঠিয়ে আজিজের প্রস্তাবের কথা বলে বললেন, আমার মনে হয়, ওখানে রোকেয়ার বিয়ে হলে সুখী হবে।

সেখানে রোকেয়ার নানি রহিমন বিবি ছিলেন। তিনিও জামাইকে বললেন, এই কাজ করলে রোকেয়া সুখী হবে।

শাহেদ আলী শ্বশুর-শাশুড়ির কথা ফেলতে পারলেন না। বললেন, আপনারা যখন এই কাজ ভালো হবে বলছেন তখন আর আমি অমত করব না।

কয়েকদিন পর আজিজ এসে ওঁদের মুখে শাহেদ আলী রাজি হয়েছে শুনে একটা দিন ঠিক করে উভয় বাড়িতে খবর দিয়ে মেয়ে দেখার কথা জানাল।

আজ রোকেয়াকে দেখার জন্য তোক আসবে। তাই রোকেয়ার মা-বাবা মেহমানদের খানাপিনা তৈরির কাজে ব্যস্ত।

বেলা দশটার সময় হারুন ও তার দুভাই, তার মা, তিনজন চাচি, দুটো চাচাতো বোন, দূর সম্পর্কের এক ভাবি, হারুনের নানা, মোট এগার জন রোকেয়াকে দেখতে এল। হারুন প্রথমে আসতে রাজি ছিল না। শেষে আজিজ যখন তাকে বলল, তুই না গেলে তোর মা সন্দেহ করবে তখন না এসে পারেনি।

নাস্তা ও খাওয়া দাওয়ার পর রোকেয়াকে দেখে সকলের পছন্দ হল। শুধু হারুনের মা হানুফা বিবির ও তার এক জায়ের পছন্দ হল না। কিন্তু সকলের পছন্দ হয়েছে জেনে তারা সেখানে কিছু প্রকাশ করলেন না।

হারুনের নানা আনসার উদ্দিনের সব থেকে বেশি পছন্দ হয়েছে। তিনি খুব রসিক লোক। বললেন, রোকেয়ার দীর্ঘ চুল ও ডান চোখের কোনের পাশে যে তিলটা রয়েছে, তাতে করে তাকে খুব সুন্দর লাগছে। তারপর রোকেয়ার হাতে আংটি পরাবার সময় বললেন, এই মেয়েকে দেখিয়ে অন্য মেয়েকে দিলে ঐ দুটো জিনিস দেখে আমরা আসল নকল ধরে ফেলব। তারপর বিয়ের পাকা কথাবার্তা ও দিনক্ষণ ঠিক করে তারা বাড়ি ফিরে গেল।

বাড়িতে এসে হানুফা বিবি বললেন, মেয়ে আমার মোটেই পছন্দ হয়নি। সেই সাথে তার ঐ জাও বলে উঠলেন, আমারও পছন্দ হয়নি।

হারুনের নানা তাদের কথা শুনে বললেন, যখন সবাই পছন্দ করে কথাবার্তা পাকা হল তখন তোমরা কিছু বললে না, এখন আবার এরকম কথা বলছ কেন? তারপর মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন, দেখ হানুফা, তুই যদি এই মেয়েকে বৌ করে না আনিস, তাহলে আমি আর হারুনের বিয়েতে তো আসবই না, এমনকি সারাজীবনেও। তোদের বাড়িতে আসব না। এরপর হারুনকে বললেন, তুমি যদি রোকেয়াকে বিয়ে না কর, তবে আমিই করে ফেলব।

এই কথা শুনে হারুনু হাসি চাপাতে না পেরে সেখান থেকে চলে যাওয়ার সময় মনে মনে বলল, আল্লাহ পাক, তুমি এই বিয়ে কবুল কর।

পরের দিন হনুফা বিবি রোকেয়াদের বাড়ি পান-চিনি পাঠিয়ে দিলেন।

কয়েকদিন পর শাহেদ আলী খবর পেলেন, পাত্র পক্ষ বিয়ে ভেঙ্গে দেবেন। খবর পেয়ে তিনি খুব মুষড়ে পড়লেন। চিন্তা করলেন, বড় মেয়ে রূপারও একবার বিয়ে ভেঙ্গে গিয়েছিল। আবার মেজ মেয়ের বেলায়ও তাই হবে নাকি? আল্লাহ পাকের কাছে ফরিয়াদ করল, ইয়া আল্লাহ্, তুমি রাহমানুর রাহিম! তুমি আমাদের উপর রহম কর। আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা কর। যা শুনেছি তা যেন মিথ্যে হয়। আমার মান ইজ্জত ধূলোয় মিশিয়ে দিও না।

দুএকদিন পরে শাহেদ আলী জানতে পারল, বাড়ির মধ্যে শুধু হারুনের মা বিয়ে . ভেঙ্গে দিতে চাচ্ছেন।

এদিকে মা বিয়ে ভেঙ্গে দেবে শুনে হারুন অজ্ঞান হয়ে গেল। জ্ঞান ফিরে আসার পর সে মাকে বলল, পাকা কথা হয়ে যাওয়ার পর বিয়ে ভেঙ্গে দিলে গ্রামের লোকজন আমাদের গায়ে থুথু ছিটাবে। তখন আমাদের মান সম্মান থাকবে কোথায়? আমরা কারো কাছে মুখ দেখাতে পারব না। তাছাড়া নানাজী যেখানে মাথা হয়ে সবকিছু করলেন, সেখানে তুমি যদি বিয়ে ভেঙ্গে দাও, তাহলে তারও মান সম্মান থাকবে না। মুরব্বী মানুষের মান সম্মান তুমি মেয়ে হয়ে নষ্ট করবে? তার চেয়ে এক কাজ কর, বিয়ের কাজ হয়ে যাক। এখন যদি তুমি বৌ আনতে না চাও, তাহলে আমি এখন বিদেশ চলে যাই। আবার যখন আসব তখন না হয় বৌ আনবে।

হানুফা বিবি বললেন, আমি কারো তোয়াক্কা করি না। ঐ মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে দেব না। ওর বাপ গরিব। মেয়ে জামাইকে কিছু দিতে পারবে না। আমি তোর বিয়ে বড়লোকের মেয়ের সঙ্গে দেব।

হারুন মায়ের উপর রেগে গিয়ে বলল, তুমি গবিবদের এত ঘৃণা কর তা জানতাম না। আমরাও তো গরিব ছিলাম। আজ না হয় তিন ভাই বিদেশে চাকরি করে আল্লাহ পাকের রহমতে কিছু উন্নতি করেছি। তবু বড়লোক তো হতে পারিনি। আর বিদেশ কি আমাদের নানার বাড়ি যে, সেখানে চিরকাল থাকব? মেয়ের বাবার না হয় আমাদের চেয়ে অবস্থা একটু খারাপ। তাই বলে মেয়েটা কি দোষ করল? কেন তুমি তার ফুলের মত জীবনটা নষ্ট করতে চাইছ? আমারো শেষ কথা শুনে রাখ, তুমি যদি এই মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে না দাও, তাহলে সারাজীবন আমি আর বিয়ে করব না এবং বিদেশ থেকে দেশেও ফিরব না।

হানুফা বিবি যেমন মুখরা তেমনি হিংসুটে ও লোভী। তিনটে ছেলে বিদেশে থাকে। মোটা অংকের টাকা পাঠায়। তাই দেমাগে যেন মাটিতে পা পড়ে না। গরিবদের মোটেই দেখতে পারেন না। ছেলেদের বড়লোকের ঘরে বিয়ে দিয়ে অনেক সোনা-দানা, টাকা-পয়সা এবং ঘরের আসবাবপত্র পাবেন, সেই রকম আশা পোষণ করেন। আসলে কিন্তু রোকেয়ার বাবার চেয়ে নিজেরা যে বেশি বড়লোক নয়, সে কথা ভেবে দেখেন নি। উভয়ের আর্থিক অবস্থা প্রায়ই একরকম। তিনটে ছেলে রোজগারী বলে নিজেদেরকে খুব বড়লোক ভাবেন। তাই রোকেয়াকে বৌ করতে চান না। কিন্তু হারুনের কথা শুনে শেষমেষ মনের ক্ষোভ মনে চেপে রেখে বিয়ের ব্যবস্থা করলেন।

মাস খানেকের মধ্যে নির্দিষ্ট দিনে বিয়ে হয়ে গেল। বর ও বরযাত্রীরা রাত তিনটের সময় গাড়ি করে বৌ নিয়ে ফিরল। কিন্তু বৌকে কেউ ঘরে তুলল না। গেটের কাছে প্রায় তিন ঘন্টা বৌ গাড়িতে বসে রইল।

বাড়ির ভিতর এতক্ষণ ধরে হানুফা বিবি আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে চলেছেন। বৌয়ের মা-বাবারা যে সব জিনিসপত্র দিয়েছেন, তা যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি নিম্নমানের। আত্মীয়-স্বজনেরা অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে যখন বৌকে ঘরে তুলল তখন সকাল ছটা।

বৌকে তোলার পর হানুফা বিবির সেই জা তার সাথে তাল মিলিয়ে বলতে লাগলেন, এটা দেয়নি, ওটা দেয়নি। আমার মা-বাবারা এমন কোনো জিনিস দিতে বাকি রাখেনি, যা দেখে কেউ একটু মুখ খুলতে পারেনি।

হানুফা বিবি বললেন, আমি জানতাম ওরা গরিব। কোথা থেকে অত কিছু দেবে? এমন ছোটোলোকের ঘরের মেয়েকে আমি বৌ করতে চাইনি। এমন অলক্ষ্মী মেয়েকে নিয়ে আমি চলতে পারব না। সেই জন্যে আমি প্রথম থেকেই অমত করেছি। ঐ মেয়েকে আমার পছন্দও হয়নি, আর কোনোকালে হবেও না।

রোকেয়ার সঙ্গে তার নানি রহিমন বিবি এসেছেণ। তিনি এদের কাণ্ডকারখানা দেখেশুনে চিন্তা করতে লাগলেন, এ কেমন ব্যাপার? বৌ আনতে না আনতে এসব কি হচ্ছে? এরা তো দেখছি খুব নিচু মনের মানুষ। রোকেয়া খুব ছোটলোকের বাড়িতে পড়ল। জীবনে কোনোদিন এতটুকু সুখ শান্তি পাবে না। তখন ভাইপো আজিজের উপর খুব রাগ হল। আবার ভাবলেন, আজিজেরই আর দোষ কি? সে এদের মনের কথা জানবে কি করে? তিনি আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। রোকেয়ার শাশুড়ীকে বললেন, তোমরা কেমন মানুষ গো, নাতনির সাথে রাত তিনটে থেকে গাড়িতে বসিয়ে রাখলে, তারপর যদিও বা ঘরে নিয়ে এলে, এতক্ষণ পর্যন্ত একটা পানও দিলে না?

হানুফা বিবি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, কে তুমি? তোমাকে কে চিনে? আমি যা ইচ্ছা তাই করব, তুমি নাক গলাবার কে?

রহিমন বিবি বললেন, বাবারে বাবা, শুনেছিলাম, রোকেয়ার শাশুড়ী একদম সোজা মানুষ। এমন কি কেউ কোনোদিন তার গলা পর্যন্ত শুনেনি। এখন দেখছি আর উল্টো। রোকেয়া শাশুড়ীর সঙ্গে চলবে কি করে? এই ঘরে দিন গুজরান করবে কি করে?

হানুফা বিবির এক বোন ভাগনার বিয়েতে এসেছেন। তিনি সেখানে ছিলেন। বলে উঠলেন, উনি কি বৌয়ের নানি? না বৌয়ের সাথে বাদী হয়ে এসেছে?

রহিমন বিবি মনে খুব আঘাত পেলেন। ভাবলেন, এরা শুধু ছোট লোক নয়, খুব নিচু শ্রেণীর ছোটলোক। এদেরকে একটা কথা বললে সাতটা শুনিয়ে দেয়। তাই তিনি আর কোনো কথা না বলে চুপ করে গেলেন।

রোকেয়া ঘোমটা দিয়ে বসে বসে সবকিছু শুনছে আর চোখের পানি ফেলছে। এভাবে সারাদিন কেটে গেল। অবশ্য এক টাইম নাস্তা এবং দুটাইম ভাত তারা খাইয়েছে। রহিমন বিবির এখানে কিছু মুখে দিবার ইচ্ছা ছিল না। সে না খেলে রোকেয়াও খাবে না জেনে অল্প কিছু খেয়েছেন। আর রোকেয়ার কেঁদে কেঁদে পেট ফুলে গেছে। সে আর কি খাবে। তবু নানির জেদাজেদীতে দুচার গাল খেয়েছে।

রাতে রোকেয়াকে বাসর ঘরে নেওয়া হল। সাথে হারুনের দুজন চাচাতো ভাবি ছিল। তারা অনেক ঠাট্টা মস্করা করে এক সময় চলে গেল। রোকেয়ার একা একা বেশ ভয় করতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর হারুন এসে তার পাশে বসে রোকেয়ার একটা হাত ধরে বলল, রোকা, তুমি খুব ভয় পেয়েছ না? ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কত সাধনার পর তোমাকে পেয়েছি। যেই যা তোমাকে বলুক না কেন, তুমি কিছু মনে করবে না। আমি ঠিক থাকলে আল্লাহর রহমতে কেউ কিছু করতে পারবে না। তারপর তার ঘোমটা খুলে দিয়ে বলল, তোমাকে দেখার জন্য কতদিন রাস্তার ধারে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করেছি, কখন তুমি স্কুলে যাবে এবং আসবে। আমাকে খারাপ ছেলে ভাবতে পার ভেবে, ঐ একদিন ছাড়া আর কোনোদিন তোমার সামনে যাইনি। আজ আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় প্রাণ ভরে দেখব। কই মুখ তুলে আমার দিকে তাকাও তো।

স্বামীর কথা শুনে রোকেয়ার ভয় কেটে গেলেও লজ্জায় মাথা নিচু করেই রইল।

রোকেয়াকে ঐ অবস্থায় থাকতে দেখে হারুন বলল, আমাকে কি তোমার পছন্দ হয়নি? না হলে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন?

রোকেয়া আর চুপকরে থাকতে পারল না। মুখ তুলে তার দিকে চেয়ে বলল, এমন কথা বলবেন না। আপনাকে পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি। তারপর স্বামীর দুপায়ে হাত ছুঁয়ে সালাম করে বলল, সেই আল্লাহপাকের দরবারে শুকরিয়া জানাই, যিনি আমাকে আপনার মোবারক কদমের সেবা করার সুযোগ দিলেন।

হারুন তাকে দুহাত জড়িয়ে ধরে তার দুগাল চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিয়ে বলল, সত্যি রোকা, তোমাকে পেয়ে আমিও ধণ্য হলাম। সে জন্যে আমিও আল্লাহপাকের দরবারে শুকরিয়া জানাচ্ছি।

হারুন জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে রোকেয়াও তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। সে থেমে যেতে বলল, আমি কি আপনার ভালবাসার প্রতিদান দিতে পারব?

হারুন তাকে আরো জোরে বুকে চেপে ধরে বলল, কেন পারবে না? নিশ্চয় পারবে। আমাদের উপর সংসারের ব্যাপারে যত বড় তুফান বয়ে যাক না কেন, আমরা দুজন দুজনকে ভালবেসে সেসব সহ্য করে যাব। তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, তোমাকে কয়েকটা কথা বলছি মন দিয়ে শোন। যদি তুমি আমার কথাগুলো মনে রেখে সেই মত চল, তাহলে ইনশাল্লাহ আমাদের জীবনে কোনো অশান্তি প্রবেশ করতে পারবে না। জানতো সব মানুষ সমান হয় না। আল্লাহ মাফ করুক, আমি আমার আম্মার বদনাম করছি না, তোমাকে বোঝাবার জন্য বলছি। তুমি বোধহয় শুনেছ, তোমাকে আমার আম্মার পছন্দ হয়নি। সেই জন্য বিয়ে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছিল। আমি মায়ের অমতে তোমাকে জোর করে বিয়ে করেছি। তাই তুমি তার কথামত চলে, তারও আব্বার সেবা যত্ন করে আম্মাকে সন্তুষ্ট করবে। আমি প্রথম সন্তান। আমার ও তোমার উপর তাদের অনেক আশা ভরসা। আম্মার দোষ কোনোদিন ধরবে না। সংসার ক্ষেত্রে অনেক সময়। অনেক কিছু হবে। তুমি সে সব নীরবে সহ্য করবে। তুমি ঘরের বড় বৌ। সবাই তোমার কাছে নানা রকম আবদার করবে। তাদের আবদার সাধ্যমত পূরণ করার চেষ্টা করবে। তারপর হারুন স্ত্রীর দুটো হাত নিজের দুগালে চেপে ধরে বলল, রোকা, আমার কথাগুলো মনে রাখবে তো?

রোকেয়া বলল, ইনশাআল্লাহ রাখব। আপনি দোওয়া করুন, আল্লাহপাক যেন আমাকে আপনার কথামত চলার তওফিক দেন।

হারুন তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, করব কি? এখনই করছি। তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে দুহাত তুলে মোনাজাত করল, আল্লাহপাক, তোমার ইশারাতেই কুল মখলুকাত পরিচালিত হচ্ছে। তুমি সমস্ত সৃষ্টি জীবের মনের কথা জান। তুমি আমার ও আমার প্রিয়তমা স্ত্রীর মনের সমস্ত নেক মকসুদ পূরণ কর। আমাদের সাংসারিক ও দাম্পত্য জীবনে তোমার রহমত বর্ষণ কর। আমার প্রিয়তমা রোকাকে এবং আমাকে সংসারের সব রকমের অশান্তি সহ্য করার তওফিক দাও। আমাদের সব রকমের গোনাহ মাফ করে সদা সত্য পথে চালিত কর। তারপর আমিন বলে মোনাজাত শেষ করল।

রোকেয়াও এতক্ষণ স্বামীর সঙ্গে দুহাত তুলে আমিন আমিন করছিল। মোনাজাত শেষ হতে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আম্মা আমাকে পছন্দ করেন না, এই কথা মনে হলে আমার ভয় করে।

হারুন তাকে আদর করতে করতে বলল, ভয় পাওয়ার কি আছে? আমি তো আছি। আল্লাহপাকের উপর ভরসা করে আম্মার মন জয় করার চেষ্টা করবে। আব্বার দিকেও সব সময় লক্ষ্য রাখবে। জানতো পিতামাতার পদতলে সন্তানের বেহেস্ত? তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখলে যেমন ইহকালে ও পরকালে সুখ-শান্তি পাওয়া যায়, তেমনি অসন্তুষ্ট রাখলে ইহকালে দুঃখ ও অশান্তিতে ভুগতে হয় এবং পরকালে ও অনন্তকাল জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হয়। এবার অন্য কথায় আসি। দেখ রোকা, তুমি আর আমি কত কাছে, কিন্তু তবু মনে হচ্ছে কত দূরে।

রোকেয়া কথাটা বুঝতে না পেরে বলল, কেন প্রিয় এমন কথা বলছেন? আমি তো আপনার মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছি।

হারুন হেসে উঠে বলল, তাই যদি হয়, তাহলে আমাকে এতক্ষণ আপনি করে বলে দূরে সরিয়ে রেখেছ কেন?

রোকেয়া ও হেসে উঠে বলল, তাই বল; আমি তো তোমার কথা শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।

হারুন বলল, এই তো আমর প্রাণের রোকা আমাকে এবার কাছে টেনে নিল, তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে অস্থির করে তুলল।

রোকেয়া প্রথম দিকে লজ্জায় চুপ করে থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যে প্রতিদানে মেতে উঠল।

এভাবে তারা সারারাত আনন্দ ফুর্তি করে কাটাল।

.

হানুফা বিবির আব্বা আনসার উদ্দিন খুব অমায়িক লোক। বয়স ষাটের উপর। খুব রসিক লোক। বিয়ের পরের দিন তিনি রোকেয়ার চুল ও চোখের গোড়ার তিল দেখে হাসতে হাসতে বললেন, এই যে নাতবৌ, এইসব দেখলাম বলে রাগ করলে নাকি? আমরা যাকে পছন্দ করেছিলাম, তাকে পেলাম কি না টেস্ট করলাম। তারপর তিনি নিজের রসিকতায় নিজেই হাসতে লাগলেন। সেখানে হারুনসহ অন্যান্যরা যারা ছিল, তারাও হাসিতে যোগ দিল।

রোকেয়ার নানি রহিমন বিবি দুদিন থেকে কাল সকালে চলে যাবেন। রাতে সে কথা জানাতে রোকেয়া নানিকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদতে লাগল।

রহিমন বিবি নাতনিকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য বললেন, কাদিস না বোন কাদিস না। কেঁদে আর কি করবি। মেয়েদের আসল বাড়ি হল স্বামীর বাড়ি। সংসারের সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করবি। শ্বশুর শাশুড়ীকে নিজের মা-বাবার মত মনে করবি। ওঁরা কিছু বললে, প্রতি উত্তর করবি না। তোর মা-বাবাও তো অনেক সময় তোকে বকাবকি করেছে। ওঁরা যদি তাই করেন, তাহলে মনে করবি নিজের মা বাবা করছেন। আর শোন, ঠিকমত নামায রোযা করবি। স্বামীর মনে কোনোদিন কষ্ট দিবি না। যা বলবে তৎক্ষণাৎ তা শুনবি। মনে রাখিস, স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত। আমাদের নবী (সঃ) এর মেয়ে মা ফাতেমা (রাঃ)-র একটা ঘটনা বলছি শোন, একদিন মা ফাতেমা (রাঃ) নিজেকে ফুলের রাণী গোলাপ ফুলের সঙ্গে তুলনা করলেন। তখন হযরত আলী (কঃ) বললেন, গোলাপ ফুল কিন্তু তাড়াতাড়ি মলিন হয়ে যায় এবং ঝরেও যায়। এই কথায় মা ফাতেমা (রাঃ)র মনে একটু অভিমান হল। তিনি নবী করিম (সঃ) এর কাছে এসে স্বামীর কথা বলে নালিশ করলেন। নবী করিম (দঃ) বললেন, তোমার নালিশের ফায়সালা পরে করব। তার আগে অমুক মহল্লায় যে কাঠুরিয়া বাস করে,তার স্ত্রীর সঙ্গে তুমি দেখা করে এস।

মা ফাতেমা (রাঃ) সেই কাঠুরিয়ার বাড়ির দরজায় এসে সালাম জানালেন।

কাঠুরিয়ার স্ত্রী দরজা না খুলে সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, কে আপনি?

মা ফাতেমা (রাঃ) নিজের পরিচয় দিলেন। কাঠুরিয়ার স্ত্রী বললেন, বেয়াদবি মাফ করবেন, আপনি আগামীকাল আসুন। আমি আপনার আগমনের কথা বলে আমার স্বামীর হুকুম নিয়ে রাখব।

মা ফাতেমা (রাঃ) ফিরে এলেন। পরেরদিন কাঠুরিয়ার বাড়িতে যখন রওয়ানা হবেন তখন ছোট ছেলে হযরত হোসায়েন (রাঃ) বললেন, আম্মা, আমি আপনার সঙ্গে যাব। উনি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কাঠুরিয়ার বাড়ির দরজায় এসে সালাম জানালেন।

কাঠুরিয়ার স্ত্রী সালামের উত্তর দিয়ে দরজা খুলে সঙ্গে একটা ছেলে দেখে বললেন, মাফ করবেন, আমি আমার স্বামীর কাছে শুধু আপনার আসার হুকুম নিয়েছিলাম। তাই এই ছেলেসহ বাড়িতে ঢুকতে দিতে পারব না। আগামীকাল আসুন, আমার স্বামীর হুকুম। নিয়ে রাখব।

মা ফাতেমা (রাঃ) ফিরে এলেন। পরের দিন যাওয়ার সময় হযরত হাসান ও হোসায়েন (রাঃ) দুজনেই মায়ের সঙ্গে যাওয়ার জন্যে জীদ ধরলেন। ছোট ছোট ছেলেদের আবদার তিনি না রেখে পারলেন না। দুভাইকে সঙ্গে নিয়ে কাঠুরিয়ার দরজায় এসে সালাম দিলেন।

কাঠুরিয়ার স্ত্রী সালামের উত্তর দিয়ে দরজা খুলে আজ দুটো ছেলেকে দেখে বললেন, মাফ করবেন, আজও আপনাকে ভিতরে আসতে দিতে পারছি না। কারণ আমি স্বামীর কাছ থেকে একটা ছেলের কথা বলে হুকুম নিয়েছিলাম। আপনি দয়া করে আগামীকাল আসুন।

অগত্যা বাধ্য হয়ে মা ফাতেমা (রাঃ) সেদিনও ফিরে এলেন।

ঐ রাতে কাঠুরিয়া বাড়িতে ফিরে আসার পর যখন তার স্ত্রী ঘটনাটা বললেন তখন খুব রেগে গিয়ে বললেন, তুমি এই কদিন খুব অন্যায় করেছ। মা ফাতেমা (রাঃ) যদি দুনিয়াশুদ্ধ লোক নিয়ে আসেন, তবুও তাকে আর ফেরাবে না।

চতুর্থ দিন মা ফাতেমা (রাঃ) দুছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কাঠুরিয়ার বাড়িতে এসে সালাম দিলেন।

কাঠুরিয়ার স্ত্রী সালামের উত্তর দিয়ে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে অতি ভক্তি ও সম্মানের সাথে ঘরে নিয়ে এসে বসিয়ে বললেন, এই কদিন আপনাকে ফিরিয়ে দিয়ে আমি খুব অন্যায় করেছি। আমাকে মাফ করে দিন।

মা ফাতেমা প্রতিদিন ফিরে যাওয়ার সময় কাঠুরিয়ার স্ত্রীর কথা এবং নবী করিম (সঃ) কেন তাকে এনার কাছে দেখা করতে বললেন, এর ভেদ কি, চিন্তা করে কিছু সমাধান করতে পারেন নাই। এখন কাঠুরিয়ার স্ত্রীর কথা শুনে কিছু না বলে সেই কথা আবার চিন্তা করতে লাগলেন। কাঠুরিয়ার স্ত্রী সাধ্যমত খাতির যত্ন করে নাস্তা পানি করালেন। নাস্তা পানির পর মা ফাতেমা (রাঃ) ঘরের চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, রশি, ছেঁড়া জুতো, ছোট বড় পাথর এবং কয়েক পদের চাবুক বেশ সুন্দর করে একপাশে। গোছান রয়েছে। এইসব দেখে তার বেশ কৌতূহল জন্মাল। কথা বলতে বলতে এক সময় কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে ঐগুলোর দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে জিজ্ঞেস করলেন, ঐ জিনিসগুলো অত সুন্দরভাবে গুছিয়ে রেখেছেন কেন?

কাঠুরিয়ার স্ত্রী বললেন, আমার স্বামী সারাদিন কাঠ কেটে বাজারে বক্রি করে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরেন। সারাদিন পরিশ্রম করার ফলে কোনো কোনোদিন তার মেজাজ গরম থাকে। সেদিন বাড়িতে এসে সামান্য কোনো কারণে রেগে গিয়ে আমাকে মারধর করেন। আমাকে মারার জন্য যাতে কোনো কিছু খোঁজা-খুঁজি করতে না হয় সেজন্যে আমি ঐগুলো রেখেছি। যেটা দিয়ে ওর আমাকে মারার ইচ্ছা হবে, সেটা সহজেই হাতের কাছে পেয়ে যাবেন।

কাঠুরিয়ার স্ত্রীর কথা শুনে মা ফাতেমা (রাঃ) যেমন খুব অবাক হলেন তেমনি তার স্বামী ভক্তির কথা শুনে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। সেই সঙ্গে এ কথাও বুঝতে পারলেন, তার কথাগুলো শুনে নবী করিম (সঃ) কেন তাকে আগে কাঠুরিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন। কাঠুরিয়ার স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসে মা ফাতেমা (রাঃ) স্বামী হযরত আলী (কঃ) র পায়ে ধার ক্ষমা চেয়ে নেন।

ঘটনাটা বলে রহিমন বিবি রোকেয়ার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, শুনলি তো কাঠুরিয়ার স্ত্রীর স্বামীভক্তির কথা? আজকালের মেয়েরা স্কুল কলেজে পড়ে স্বামীকে গ্রাহ্য করে না, এটা যে কতবড় গোনাহর কাজ তা যদি জানত, তাহলে করতে পারত না। দোয়া করি, আল্লাহপাক যেন তোকে মা ফাতেমা (রাঃ) এর মত স্বামীভক্ত স্ত্রী করেন।

রোকেয়া নানির পায়ে হাত ছুঁয়ে সালাম করে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলল, আপনি দোয়া করুন নানি, আমি যেন আপনার সব কথা মেনে চলতে পারি।

রহিমন বিবি নাতনির মাথায় চুমো খেয়ে বললেন, আল্লাহ তোকে সব কিছু সহ্য করার ও সব কিছু মেনে চলার তওফিক দান করুক।

পরের দিন সকালে নাস্তা খেয়ে তিনি চলে গেলেন।

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *