কি পেলাম – ১

০১.

চাঁদপুর জেলার চার নাম্বার পশ্চিম মবিদপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত বদরপুর গ্রাম। এই গ্রামে শফিউদ্দিন নামে একজন উচ্চি মধ্যবিত্ত লোক ছিলেন। উনি ও ওঁর স্ত্রী সাত বছরের একটা ছেলে ও দশ বছরের একটি মেয়ে রেখে এক বছরের মধ্যে মারা যান। ছেলেটার নাম শাহেদ আলী আর মেয়েটির নাম করিমন। মা বাবা মারা যাওয়ার পর দুভাইবোন নানার বাড়ি, খালার বাড়ি ও চাচাঁদের কাছে মানুষ হতে লাগল। শাহেদ আলী নানার বাড়ি থেকে প্রাইমারী পর্যন্ত পড়ে আর পড়াশুনা করল না। বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের বাড়ি ঘুরে বেড়িয়ে মানুষ হতে লাগল। জ্ঞান হওয়ার পর এখানে ওখানে অনেক রকম কাজকর্ম করল। তারপর ব্যবসা করে বেশ সাবলম্বী হয়ে উঠল। এদিকে করিমন বড় হয়ে যাওয়ার পর চাচারা তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। আরো কিছুদিন পর শাহেদ আলীর চাচারা ভিনো হয়ে গেল। শাহেদ আলী পৈত্রিক দুকামরা পাকা ঘর ও বিঘে তিনেক ফসলি জমি পেল। সে খুব পরিশ্রমী ছেলে। কিছুদিনের মধ্যে বেশ গুছিয়ে উঠল।

বদরপুর গ্রামের মাইল দেড়েক উত্তরে বাকিলাহ গ্রামের জয়নুদ্দিন বেশ অবস্থাপন্ন লোক। ওঁর এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে কামাল বড়। আর মেয়ে মেহেরুন্নেসা ছোট।

কামাল এস.এস.সি. পাশ করে বাবার সঙ্গে বিষয় সম্পত্তি দেখাশুনা করে। মেহেরুন্নেসা ক্লাশ নাইনে উঠার পর মেয়ের বাড়ন্ত চেহারা দেখে জয়নুদ্দিন তাকে আর স্কুলে পড়ালেন না। মেয়ের বিয়ের বয়স হতে তিনি পাত্রের সন্ধান করতে লাগলেন। বদরপুরের শাহেদ আলীর খবর পেয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, ছেলেটা এতিম হলেও কর্মঠ এবং ধার্মিক। অবস্থাও খুব একটা খারাপ না। চিন্তা করলেন, ঐ ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলে শ্বশুর, শাশুড়ী, ভাসুর, দেবর ও জায়েদের কোনো ঝামেলা তাকে পোহাতে হবে না। খুব নিঝঞ্ঝাটে সংসার করতে পারবে। তবে ছেলেটা মেয়ের চেয়ে কম লেখাপড়া করেছে। এটাই শুধু একটা বাধা। জয়নুদ্দিন স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করার সময় শাহেদ আলীর কথা বলে বললেন, হোক সে মেহেরুন্নেসার থেকে কম শিক্ষিত, তবুও আমি তাকেই জামাই করব। মেহেরুন্নেসা আমাদের খুব চালাক মেয়ে। অল্পদিনেই সংসারে উন্নতি করতে পারবে। স্ত্রী বেশি শিক্ষিত হলে স্বামী তাকে মেনে গুনে চলে। মেয়ে আমাদের সুখী হবে।

স্বামীর কথা শুনে স্ত্রী মাহফুজা বিবি অমত করলেন না। কিন্তু বাবার কথা শুনে কামাল বলল, আপনি যখন ভালো মনে করছেন তখন আর অমত করব না। তবে মেহেরুন্নেসা যদি ছেলে তার চেয়ে কম শিক্ষিত জেনে মনে কষ্ট পায়?

জয়নুদ্দিন বললেন, সেরকম বুঝলে আমি তাকে বুঝিয়ে বলব। তারপর স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি মেহেরুন্নেসার সঙ্গে আলাপ করে আমাকে জানিও।

মেহেরুন্নেসার গায়ের রং ফর্সা না হলেও দেখতে মোটামুটি ভালই। সুন্দর স্বাস্থ্য। গোলগাল চেহারা! বাবা স্কুলের পড়াশুনা বন্ধ করে দিলেও বাড়িতে রীতিমত পড়াশুনা করে। দুভাইবোনের মধ্যে খুব মিল। বোনের পড়াশুনার ঝোঁক দেখে কামাল তাকে ভালো ভালো গল্পের বই জোগাড় করে দেয়। অনেক ধর্মীয় বইও কিনে দেয়।

মেহেরুন্নেসা সব ধরণের বই পড়তে ভালবাসে। সংসারের কাজেও খুব পটু। মাকে কোনো কাজ করতে দেয় না। বেশ চটপটে মেয়ে। কিন্তু খুব ধার্মিক।

মাহফুজা বিবি একদিন মেয়েকে তার বাবার কথা জানিয়ে মতামত জানতে চাইলেন।

মেহেরুন্নেসা বিয়ের কথা শুনে লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে চুপ করে রইল।

মেয়ে লজ্জা পেয়েছে বুঝতে পেরে মাহফুজা বিবি বললেন, এতে লজ্জা পাওয়ার কি আছে? তোর আব্বার মুখে ছেলেটার কথা যা শুনলাম, তাতে আমার মনে হয়, তুই সুখে থাকবি। ছেলেটা তোর থেকে কম লেখাপড়া করেছে এই যা। চুপ করে থাকিস না, তোর আব্বা জিজ্ঞেস করলে কি বলব বল?

মেহেরুন্নেসা আরো অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নিচু করেই বলল, তোমরা যদি ভালো মনে কর, তবে আমার অমত নেই। তারপর সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে গেল।

জয়নুদ্দিন স্ত্রীর মুখে মেয়ের মতামত জেনে খুশি হলেন। তারপর অল্পদিনের মধ্যে শাহেদ আলীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ের কাজ সম্পন্ন করলেন।

মেহেরুন্নেসা স্বামীর ঘরে এসে স্বামীকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালবেসে খেদমত করতে লাগল। সেই সঙ্গে সংসারের উন্নতির জন্য তাকে পরামর্শ দিতে লাগল।

শাহেদ আলী নিজে যেমন ধার্মিক ও সংসারী, স্ত্রীকেও সেরকম দেখে যারপরনাই খুশি হয়ে আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায় করে সুখে দিন কাটাতে লাগল।

বিয়ের তিন বছর পর তাদের ঘর আলো করে এক পুত্র সন্তান জন্ম নিল। শাহেদ আলী সাতদিনে দুটো খাসি জবেহ করে ছেলের নাম রাখলেন জাহেদ। তারপর দুতিন বছর অন্তর তাদের আরো দুই ছেলে ও তিন মেয়ে জন্মাল। মেয়েদের নাম কুলসুম, রোকেয়া ও জুলেখা। আর ছেলেদের নাম বখতিয়ার ও বাহাদুর। বাহাদুর সকলের ছোট। সংসার বেড়ে যাওয়ায় শাহেদ আলী নিজের ও শ্বশুরের চেষ্টায় কাতার চলে গেলেন। প্রথমবারে দুবছর পরে আসেন। তারপর বছরে একবার করে আসতে লাগলেন।

এদিকে মেহেরুন্নেসা সংসারের হাল ধরলেন। তিনি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে লাগলেন।

জাহেদ এইচ. এস. সি. পাশ করার পর শাহেদ আলী ছেলেকেও কাতারে নিয়ে চলে গেলেন। তিনি এতদিন কাতারে গিয়ে সংসারের অনেক উন্নতি করেছেন। ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার পর দিন দিন তাদের আরো উন্নতি হতে লাগল।

জাহেদের পরেই কুলসুম। ডাক নাম রূপা। রূপা যখন ক্লাস এইটে পড়ে তখন একজন ঘটক তার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এল। শাহেদ আলী কয়েকদিন আগে কাতার থেকে দেশে ফিরেছেন। তিনি এত ছোট মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি হলেন না। ঘটককে বললেন, আমার মেয়ে-ছোট। তাছাড়া মেয়েকে আমি এস.এস.সি. পর্যন্ত অন্তত পড়াব। তারপর বিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করব।

বাকিলাহ গ্রামেই ঘটকের বাড়ি। শাহেদ আলী ও তার শ্বশুর জয়নুদ্দিনকে ভালভাবে চেনে। এই কাজ করাতে পারলে তাদের কাছ থেকে মোটা বখশিস যে পাওয়া যাবে, তা সে খুব ভালভাবে জানে। তাই শাহেদ আলীকে রাজি করাতে না পেরে তার শাশুড়ী রহিমন বিবি ও শ্বশুর জয়নুদ্দিনকে গিয়ে ধরল। পাত্রেরও পাত্রের বাবার অবস্থা এবং তাদের বাড়ির সকলের গুণাগুণ করে বলল, পাত্র শিক্ষিত। ইরাকে চাকরি করে। দেখতে শুনতে খুব ভালো। তারপর নানারকম চাল খেলে তাদের মন জয় করে ফেলল। রহিমন বিবি ও জয়নুদ্দিন সাবেক কালের মানুষ। তারা মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দিতে পছন্দ করেন। তাই রাজি হয়ে গেলেন।

শাহেদ আলী ছেলেবেলায় এতিম হয়ে মা-বাবার স্নেহ মমতা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। বিয়ের পর শ্বশুর শাশুড়ীর স্নেহ মমতা পেয়ে তাদেরকে নিজের মা-বাবার মত মনে করতেন। তারা যখন রূপার বিয়ে দেবার জন্য বললেন, তখন আর না করতে পারলেন না। শেষে তাদের মনে কষ্ট হবে ভেবে বিয়ের পাকা ব্যবস্থা করে কাতার চলে গেলেন। কারণ ছুটি শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই যাওয়ার সময় সমন্ধি কামালকে বললেন, রূপার বিয়েটা যেন ভালভাবে সম্পন্ন হয়।

শাহেদ আলী বিদেশ চলে যাওয়ার কয়েকদিন পর হঠাৎ একদিন পাত্রের বাবা এসে জয়নুদ্দিনকে বললেন, আমরা আপনার নাতনিকে বৌ করতে পারব না। এ বিয়ে হবে না।

জয়নুদ্দিন খুব অবাক হয়ে বললেন, কেন?

পাত্রের বাবা বললেন, আপনাদের চেয়ে আরো বড় ঘরের মেয়ে আমরা দেখেছি। সেই মেয়ে আপনার নাতনির থেকে অনেক বেশি সুন্দরী।

জয়নুদ্দিন শুনে খুব রেগে গেলেন। বললেন, এ আপনি কি বলছেন? যেখানে বিয়ের সম্বন্ধ পাকা হয়ে গেছে, সেখানে এমন কথা বলতে পারলেন? আমার জামাই মেয়ে ছোট বলে বিয়ে দিতে রাজি ছিল না। আমি বলে কয়ে রাজি করালাম। আপনারা মেয়ে দেখে পছন্দ করে সব ঠিকঠাক করে গেলেন। এখন আবার একি কথা বলছেন? আপনারা কি মানুষ একটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবনে দাগ দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে এই মেয়ের বিয়ে কি করে হবে, সে কথা চিন্তা করেছেন?

পাত্রের বাবা বললেন, আপনারা যাই বলুন না কেন, আমরা বিয়ে ভেঙ্গে দিলাম। আমরা বড় ঘরের মেয়ে বৌ করব। তারা আপনাদের থেকে অনেক বেশি বড়লোক। সেখানে পাকা কথাবার্তা হয়ে গেছে।

জয়নুদ্দিন আরো রেগে গিয়ে বললেন, আমাদের অবস্থা জেনে শুনেই তো আপনারা এই বিয়ে ঠিক করেছিলেন। এখন আবার গরিব বড়লোকের কথা বলছেন কেন? আপনাদের গায়ে কি একটুও মানুষের চামড়া নেই?

পাত্রের বাবা বললেন, আপনারা যা খুশি বলতে পারেন, তবু আমরা এই কাজ করব না। এ ব্যাপারে আপনাদের যা খরচপাতি হয়েছে বলুন, দিয়ে দিচ্ছি।

কামাল এতক্ষণ বাড়িতে ছিল না। এসে সবকিছু শুনে পাত্রের বাবার সঙ্গে অনেক কথা কাটাকাটি করল। পাত্রের বাবা তাদের কোনো কথায় কর্ণপাত না করে বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে চলে গেলেন।

জয়নুদ্দিন স্ত্রী ও কামালকে নিয়ে বদরপুরে এসে মেয়েকে রূপার বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার কথা বললেন।

মেহেরুন্নেসা শুনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। বললেন, এ কথা আমি তোমাদের জামাইকে জানাব কেমন কর? সে এখন রূপার বিয়ে দিতে একদম রাজি ছিল না। শুধু আপনাদের কথায় রাজি হয়েছিল। এখন আবার এই কথা জেনে কি করবেন কি জানি?

কামাল বলল, বুবু তুমি কেঁদ না। সবুর কর। আমি রূপার বাবাকে চিঠি দিয়ে বুঝিয়ে বলব। আর তোমরা দোওয়া কর, ইনশাআল্লাহ আমি যেন রূপার বিয়ে অতি শীঘ্র দিতে পারি।

জয়নুদ্দিনও মেয়েকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, তুই কিছু চিন্তা করিস না। আমি তোর মেয়ের বিয়ে তাড়াতাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।

বিয়ে ভেঙ্গে গেছে শুনে রূপার তরুণী মনে বেশ আঘাত লাগল। এরপর তাকে সবাই অপয়া মেয়ে বলে খোটা দেবে, পরে অন্য কোথাও বিয়ে হলেও তাকে শ্বশুর বাড়ির লোকেরা অনেক কথা শোনাবে, এইসব ভেবে তার মন খুব খারাপ হয়ে গেল।

মেহেরুন্নেসা মেয়ের মন খারাপ দেখে একদিন তাকে বললেন, তুই আবার স্কুলে যা।

বিয়ের কথা পাকা হয়ে যাওয়ার পর রূপা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। মায়ের কথা শুনে বলল, আমার বিয়ের কথা স্কুলের মাস্টাা ও ছাত্রীরা অনেকে জেনে গেছে। তারা যখন কিছু জিজ্ঞেস করবে তখন কি বলব? আমি আর স্কুলে যাব না।

মেহেরুন্নেসা আর কিছু বলতে পারলেন না।

এই ঘটনার চার পাঁচ মাসের মধ্যে কামাল চেষ্টা চরিত্র করে বড় ঘরে ভাগনির বিয়ে দিয়ে দিল। বিয়ের কাজটা খুব তড়িঘড়ি করতে হল বলে রূপার বাবাকে জানাতে পারল না। বিয়ের পর চিঠিতে বিস্তারিত জানিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিল।

রূপার ভাগ্য খুব ভালো। স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ী ও দেবর ননদেরা তাকে খুব ভালবাসে। তার স্বামীরা চার ভাই ও তিন বোন। সে-ই বাড়ির বড় বৌ। দুননদের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট পড়াশুনা করছে।

রূপার যখন বিয়ে হয় তখন তার মেজ বোন রোকেয়া ক্লাস সিক্সে পড়ে। ওদের বাড়ির সামনে দুটো পুকুর আছে। একটা ব্যবহার হয়। অন্যটা হয় না। সেটাতে শাপলা গাছে ভরা। একদিন দুপুরে রোকেয়া পাশের বাড়ির সমবয়সী মেয়ে নূরনাহারকে সাথে নিয়ে শাপলা তোলার জন্য পুকুরে নামল। কিনারেরগুলো তুলে একটু দূরে তুলতে গিয়ে দুজনেই ডুবে গেল। নূরনাহার সাঁতার জানত। সে সাঁতরে কিনারে এসে চিৎকার করে বলতে লাগল, রুকু তুই হাত উঠা।

রোকেয়া তখন ডুবে গিয়ে পানি খাচ্ছে। হঠাৎ নূরনাহারের কথা শুনতে পেয়ে হাত উঠাল। অমনি নূরনাহার রোকেয়ার হাত ধরে টেনে তুলে ফেলল। ততক্ষণে রোকেয়া বেশ খানিকটা পানি খেয়ে ফেলেছে। নূরনাহার পাড়ে উঠে রোকেয়াকেও ধরে উঠাল। আসলে পুকুরটায় পানি কম ছিল বলে এবং আল্লাহ পাক রোকেয়ার হায়াৎ রেখেছিল বলে সে যাত্রা বেঁচে গেল। এরপর থেকে রোকেয়া পানিকে ভীষণ ভয় করে। পুকুরে নেমে কোনোদিন আর গোসল করে না। পুকুর থেকে বালতিতে পানি তুলে পাড়ে গোসল করে। বৃষ্টির দিনে উঠোনে পানি জমে গেলে ভয়ে উঠোনেও নামে না। তাই দেখে অন্যান্য ভাইবোনেরা তাকে জোর করে উঠোনে নামায়। রোকেয়া তখন কান্নাকাটি করে। জাহেদ ও রূপা হেসে হেসে লুটোপুটি খেতে খেতে বলে তুই যে এই সামান্য বৃষ্টির পানিকে এত ভয় করছিস, যখন বন্যা হবে তখন কি করবি? আমরা তো সাঁতার জানি। সাঁতার কেটে কোথাও গিয়ে আশ্রয় নেব। তুই তো সাঁতার জানিস না, ডুবে মরবি। এই কথায় রোকেয়া আরো কান্নাকাটি করে। শেষে মেহেরুন্নেসা তাদেরকে ধমক দিয়ে রোকেয়ার কান্না থামান।

রোকেয়া দেখতে খুব সুন্দরী না হলেও সুন্দরী। পড়াশুনায় খুব ভালো। স্কুলে তাঁর অনেক বান্ধবী। ক্লাস সেভেনে উঠার পর লাকি নামে একটা মেয়ের সঙ্গে তার খুব ভাব হয়। তাদের বাড়ি রোকেয়াদের বাড়ির কাছাকাছি। মাত্র দুতিনিটে জমির পর। দুজনের গলায় গলায় ভাব। রাত ছাড়া সারাদিন এক সঙ্গে থাকে। কেউ কাউকে এক মিনিট না দেখে থাকতে পারে না। অসুখ বিসুখ হলে বা অন্য কোনো কারণে একজন স্কুলে না গেলে অন্যজনও যাবে না। একদিন রোকেয়া লাকিকে না বলে নানির বাড়ি গেল। সেদিন লাকি স্কুলে গেল না। পরের দিন রোকেয়া ফিরে এলে আঁশুভরা চোখে বলল, তুই আমাকে না বলে কোথাও যাবি না বল?

রোকেয়া তার চোখের আশু মুছে দিয়ে বলল, তুই আমাকে এত ভালবাসিস? আমারো কিন্তু নানির বাড়িতে তোর জন্য মন খারাপ হয়েছিল। তাইতো, নানি থাকতে বললেও থাকিনি।

লাকি বলল, আমার খুব ইচ্ছা হয়, তোকে সব সময় আমার কাছে রাখি। তোকে ছাড়া আমি একদম থাকতে পারি না।

রোকেয়া বলল, আমারো তোর মত ইচ্ছা হয়। আচ্ছা লাকি, এখন তো আমরা এক সাথে থাকি; কিন্তু যখন আমাদের বিয়ে হয়ে যাবে তখন কি করব?

এক কাজ করব, তোর বা আমার যার আগে বিয়ে হবে, সে অন্যকে তার দেবরের জন্য নিয়ে যাব। তাহলে আর ছাড়াছাড়ি হবে না।

রোকেয়া হেসে উঠে বলল, তা না হয় বুঝলাম; কিন্তু দেবর যদি না থাকে অথবা ছোট হয়, তখন কি হবে?

 তাহলে যার আগে বিয়ে হবে, সে অন্যকে সতীন কর নিয়ে যাবে। তাহলে চিরজীবন এক সাথে থাকতে পারব।

কথাটা মন্দ বলিসনি। কিন্তু এক স্বামীর কাছে দুজনে এক সাথে থাকব কেমন করে?

কেন? স্বামীকে মাঝখানে রেখে দুজন দুপাশে থাকব।

তুই না বড় দুষ্ট হয়ে গেছিস।

এতে দুষ্ট হবার কি হল? আমরা দুজনেই যেমন স্বামীকে পেলাম তেমনি একসাথেও থাকলাম।

এখন এরকম বলছিস, কিন্তু তখন আর বলবি না। মেয়েদের সব থেকে বড় দুশমন হল সতীন। স্বামীকে একা পাওয়ার জন্য সতীনকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবি। জানিস না, মেয়েরা সব সহ্য করতে পারে সতীনের জ্বালা সহ্য করতে পারে না?

তুই এসব জানলি কি করে?

আম্মা একদিন আব্বাকে বলছিল, তার এক খালাত বোন সতীনের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে বিষ খেয়ে মরে গেছে।

রোকেয়া বলল, তা হয়তো হবে।

এভাবে দিন গড়িয়ে চলল। রোকেয়া ও লাকি এখন ক্লাস টেনে পড়ছে। শাহেদ আলী আর কাতার যাননি। জাহেদকে নিয়ে গিয়ে চাকরি দেওয়ার দুতিন বছর পর থেকে তিনি বাড়িতেই আছেন।

একদিন রোকেয়া জ্বর নিয়ে স্কুল থেকে ফিরল। শাহেদ আলী ডাক্তার এনে চিকিৎসা করাতে লাগলেন। কিন্তু জ্বর কমা যেমন তেমন বেড়েই চলল। শেষে শাহেদ আলী অন্য ডাক্তার আনলেন।

তিনি রোকেয়াকে পরীক্ষা করার পর আগের ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখে বললেন, রোগী ভাল হবে কি করে? আপনার মেয়ের টাইফয়েড হয়েছে, আর উনি ফোঁড়ার ওষুধ দিয়েছেন। তারপর প্রেসক্রিপশন করে বললেন, আগের ওষুধ খাওয়াবেন না, এগুলো এনে খাওয়ান।

এই অসুখে রোকেয়া প্রায় দেড়মাস ভুগল। সে সময় লাকি সারাদিন রোকেয়ার কাছে থেকেছে। অনেক দিন স্কুল ও কামাই করেছে। রোকেয়া স্কুলে যেতে বললেও যায়নি।

অসুখ ভালো হয়ে যাওয়ার মাস দুয়েক পর একদিন রোকেয়া জুলেখাকে নিয়ে বাকিলাহ বাজার নানার বাড়িতে বেড়াতে গেল। লাকিকেও আসার জন্য বলেছিল। তার মায়ের অসুখের জন্য আসতে পারল না।

নানার বাড়ি এসে শুনল, পাশের গ্রামের দূর সম্পর্কের এক মামার বিয়ে। তারা দাওয়াত দিয়ে গেছে। রোকেয়ার নানা-নানি আগের দিন চলে গেছেন। পরের দিন রোকেয়ার মামী রোকেয়াকে বললেন, তোর মামা কাজের ঝামেলায় যেতে পারবে না। তুই জুলেখা, মনোয়ারা ও মানিককে নিয়ে যা। মনোয়ারাও মানিক রোকেয়ার মামাতো ভাই বোন। মনোয়ারা রোকেয়ারএক বছরের ছোট। মানিক তার চেয়ে তিন বছরের ছোট। সবাই যাওয়ার জন্য তৈরি হল। কিন্তু মানিক যেতে রাজি হল না।

রোকেয়া তাকে বলল, আমরা তিনটে মেয়ে একা একা যাব কেমন করে? তুই যাবি না কেন?

রোকেয়ার মামী শুনে ছেলেকে রাগারাগি করে বললেন, রোকেয়া ঠিক কথা বলেছে। তুই সাথে না থাকলে ওরা যাবে কেমন করে? কোনো পুরুষ ছেলে সাথে না থাকলে মেয়েদের বাইরে বেরোনো উচিত না।

মানিক বলল, কেন? ছেলেরা যেতে পারলে মেয়েরা পারবে না কেন?

মনোয়ারা বলল, তোকে আর যেতে হবে না, আমরা যেতে পারব। তারপর তারা তিনজন রওয়ানা দিল।

কিছুদূর যাওয়ার পর জুলেখা পিছন ফিরে মানিককে আসতে দেখে মনোয়ারাকে বলল, দেখ আপা, মানিক ভাই আসছে।

মনোয়ারা সেদিকে তাকাতে মানিকের চোখে চোখ পড়ে গেল।

মানিক দাঁড়িয়ে পড়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

মনোয়ারা বলল, দাঁড়িয়ে আর কি করবি; চলে আয়। বিয়েবাড়ি বেড়ানোর লোভ সামলাতে যে পারিব না, তা আমি আগেই জানতাম।

মানিক এগিয়ে এসে বলল, আমি আসতাম না, ভাবলাম, পথে যদি কোনো দুষ্টু ছেলে তোমাদেরকে উত্যক্ত করে অথবা কাউকে হাইজ্যাক করে নিয়ে যায়, তাই এলাম।

রোকেয়া বলল, থাক অত আর জ্যাঠামী করতে হবে না চল যাই।

বিয়ে বাড়িতে এসে রোকেয়ার সাথে একটি মেয়ের বন্ধুত্ব হয়ে গেল। মেয়েটির নাম আনোয়ারা। যে কদিন রোকেয়া সেখানে রইল, সে কদিন সব সময় আনোয়ারা তার সাথে থেকেছে। একদিন আনোয়ারা রোকেয়াকে বলল, তোমাকে আমার এত ভালো লেগেছে যে, কাছ ছাড়া করতেই মন চাচ্ছে না। তাই ভেবেছি তোমাকে ভাবি বানাব।

রোকেয়া হেসে উঠে বলল, মানুষ ইচ্ছা করলেই কি সবকিছু করতে পারে? আল্লাহ পাকের মর্জি না হলে কিছুই হয় না।

আনোয়ারা বলল, তা অবশ্য ঠিক। তবু মানুষকে চেষ্টা করতে হয়। আজ তোমাকে আমার ভাইয়াকে দেখাব। দেখলে নিশ্চয়ই তোমার পছন্দ হবে।

রোকেয়া আবার হেসে উঠেবলল, আর আমাকে যদি তোমার ভাইয়ার পছন্দ না হয়?

 বারে, তুমি কি অপছন্দ করার মত মেয়ে নাকি?

সকলের পছন্দ তো এক রকম নয়। তাছাড়া সব থেকে বড় কথা হল ভাগ্য। আল্লাহ পাক যার যেখানে ভাগ্য লিখেছেন সেখানে হবে।

সেতো নিশ্চয়, কিন্তু আল্লাহ তো ভাগ্যের উপর নির্ভর করে চুপচাপ বসে থাকতে বলেন নি।

তা বলেন নি। তুমি এখন এসব কথা বাদ দাও।

কেন বাদ দেব শুনি?

 কারণ আমার ইচ্ছা, অন্তত বি.এ. পাশ করব।

সেটা তো খুব ভালো কথা। ভাইয়া এম. এ. পাশ করে কলেজে প্রফেসারী করছে। বিয়ের পর ভাইয়া তোমাকে নিজের কলেজের ছাত্রী করে নেবে। এক সঙ্গে কলেজে খুব মজা করে যাবে আসবে।

রোকেয়া তার পিঠে একটা আদরের কিল মেরে বলল, তুমি তো দেখছি সবদিক দিয়ে পেকে গেছ।

আনোয়ারা বলল, তুমিওতো কম পাকনি।

কি করে?

কেউ নিজে না পাকলে অন্যের পাকামী ধরতে পারে না।

তাই নাকি?

 হ্যাঁ তাই। নিজের মনকে জিজ্ঞেস করে দেখ।

এমন সময় মনোয়ারা এসে বলল, তোমরা এখানে গল্প করছ, আর আমি তোমাদেরকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। চল খাবে চল।

পরের দিন আনোয়ারা রোকেয়ার কাছে এলে তার মুখটা ভার দেখে রোকেয়া জিজ্ঞেস করল, তোমার মন খারাপ কেন?

আনোয়ারা বলল, গত রাতে আম্মাকে তোমার কথা বলে ভাবি বানাবার কথা বলেছিলাম। আম্মা শুনে বলল, তোর ভাইয়া নিজেই একটা মেয়ে পছন্দ করেছিল। তোর আব্বা মেয়ের বাবার সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে কথার্তাও ঠিক করে ফেলেছে। জান রোকেয়া, কথাটা শোনার পর আমার মন এত খারাপ হয়ে গেল যে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।

রোকেয়া বলল, এতে মন খারাপের কি আছে? বিয়ে সাদির ব্যাপারে মানুষের কোনো হাত নেই। নসীবে যার যেখানে লেখা থাকবে সেখানে হবে। তুমি মন খারাপ করো না। নসীবে নেই বলে তোমার মনের বাসনা পূরণ হল না। তাই বলে আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হবে কেন? আমরা আমাদের বন্ধুত্ব আমরণ রাখার চেষ্টা করব।

আনোয়ারা বলল, তুমি ঠিক কথা বলেছ। তারপর ঠিকানা লিখে তার হাতে দিয়ে বলল, তোমারটাও লিখে দাও। চিঠির মাধ্যমে আমরা আমাদের বন্ধুত্ব আজীবন টিকিয়ে রাখব।

যার বিয়ে হচ্ছে তার নাম আজিজ। বিয়ের পরের দিন বাড়ির সব ছেলেমেয়েরা একটা ঘরে ভিডিও দেখছিল। রোকেয়াও সেখানে ছিল। এক সময় তার কানে এল, কে যেন বলছে, আজিজ, ঐ মেয়েটি কে রে? আজিজ বলল, সম্পর্কে আমার ভাগনী।

রোকেয়ার পাশে তার মামাত বোন মনোয়ারা বসেছিল। সে কথাটা শুনতে পেয়ে তাকে বলল, আপা, তোমার কথা ঐ ছেলেটা জিজ্ঞেস করছে।

যেদিক থেকে কথাটা রোকেয়ার কানে এসেছে, সেদিক একবার চেয়ে নিয়ে মনোয়ারাকে জিজ্ঞেস করল, ঐ ছেলেটা কে জানিস?

মনোয়ারা বলল, না আপা জানি না।

তাদের পাশে আনোয়ারাও ছিল। সেও ছেলেটার কথা শুনেছে। ওদের কথা শুনে বলল, ওতো আজিজ মামার বন্ধু হারুন।

রোকেয়া কাউকে কিছু না বলে উঠে চলে আসবার সময় হারুনকে আর একবার দেখতে গিয়ে তার চোখে চোখ পড়ে গেল। লজ্জা পেয়ে রোকেয়া মাথা নিচু করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

বিয়ে বাড়িতে তিন দিন থেকে চার দিনের দিন রোকেয়া সবাইয়ের সাথে নানার বাড়ি ফিরে এল। তারপরের দিন জুলেখা ও রোকেয়া নিজেদের বাড়ি বদরপুর চলে এল।

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *