৫
এই কাগজের টুকরোটা এখনো আমার কাছে আছে। আমার বন্ধুর এই একমাত্র স্মৃতি। (উপন্যাসের সেই পাণ্ডুলিপিটা যথাসময়ে, অলক্ষিতে সেই শূন্যে মিলিয়ে গিয়েছিলো যেখানে সব মৃত, লুপ্ত জিনিস রাশীকৃত।) এই অদ্ভুত সাহিত্য খণ্ডের দিকে তাকাতে গেলে আমি কষ্ট অনুভব না করে’ পারি নে। লেখা হিসেবে এটা নিৰ্ব্বদ্ধিতার একটা দৃষ্টান্ত, কিন্তু এর আন্তরিকতায় সন্দেহ করবার উপায় নেই। কিন্তু শুধু আন্তরিকতার জোরেই যদি আর্টে পৌঁছনো যেতো তা হ’লে পৃথিবীর বেশির ভাগ প্রেম পত্র এমন অসম্ভবরকম ক্লান্তিকর হ’তো না। তবু এই হাস্যকররকম অতিরঞ্জিত, জমকালো, প্রায় বৰ্ব্বর লেখার ভিতর দিয়ে ভবভূতি কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো এটা ঠিক যে কিছু বলতে চেয়েছিলো। ‘আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু ’ কথাটা এখন প্রায় ঠাট্টার মত শোনায়। বোধ হয় এটাই ভবভূতির শ্রেষ্ঠ রচনা।
যা ই হোক্, প্রতিদিন ওর কাছে বসে বসে ওর মুদ্রাকরস্থ উপন্যাসের সমস্ত খুঁটিনাটি বৃত্তান্তের বিবৃতি দিয়ে যেতে লাগলুম। যে আগ্রহ নিয়ে ও আমার কথাগুলো গিলতো তা একটা দেখবার জিনিস; অনুভূতির অমন প্রখরতা ওর মধ্যে সম্ভব তা আমি কখনো ভাবি নি। প্রুফ আমিই দেখছি। তবে এখন বাংলাদেশে বই বেরোবার মৈশুম সব প্রেসেই ভীষণ কাজের চাপ, আস্তে আস্তে হচ্ছে। তবে হ’য়ে যাবে পূজোর আগেই হ’য়ে যাবে। একেবারে বাঁধানো, ঝকমকে, হট প্রেসের ইস্ত্রি করা আনকোরা বই ও হাতে পাবে ওর নিজের বই। বিজ্ঞাপন যাবে সামনের মাস থেকে। শুনতে শুনতে ভবভূতি মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলতো দীর্ঘ পথের শেষ হ’লো, এতদিনে, এতদিনে বুঝি সময় এলো তা’র। দেখতে পাচ্ছে সে চোখের সামনে সন্ধ্যার সোনায় উদ্ভাসিত কোনো অদৃষ্টপূর্ব্ব, আশ্চর্য্য শহরের মত সাহিত্যিক যশের জ্যোতির্লোক। এ কথা মনে করে’ এখনো আমার তৃপ্তি হয় যে সেই শেষের ক’টা দিন আমি ওকে সম্পূর্ণ, সম্পূর্ণরূপে সুখী করতে পেরেছিলাম। অমন সুখী জীবনে ও কখনো হয় নি। আর সেই আনন্দের উদ্দীপনায় ও যেন সত্যি সত্যি ভালো হ’য়ে উঠতে লাগলো। যক্ষ্মা সারাতে আনন্দের মত কিছু নয় বিশেষজ্ঞের এই কথার এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে চমৎকৃত হলুম। এক সময় আমার এমনও আশা হয়েছিলো যে শেষ পর্য্যন্ত কে জানে, কিছুই বলা যায় না ভবভূতি হয় তো সেরেও উঠতে পারে। ও রকম নাকি অনেক সময় হয়, শোনা গেছে ।
বলা বাহুল্য, সে মোহ বেশিক্ষণ টিকলো না। যেন ওর শরীরের রোগটাই ক্লান্ত হ’য়ে একটু বিশ্রাম করে নিচ্ছিলো। তারপর নির্দ্দিষ্ট ও অনিবাৰ্য্য দিকে মোড় ফিরলে। বুঝতে পারলুম, আমার বন্ধুর দিন ঘনিয়ে এসেছে। চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলুম : আর কিছু করবার ছিলো না।
তবু মনে মনে আমি বললুম ও মরবে সুখী হ’য়ে, সেটাই বা কী কম? ওর এই সুখ থেকে আমি ওকে ভ্রষ্ট করতে যাবো কেন? না, আমি তা হ’তে দেবো না, হ’তে দেবো না। আর, কী সহজ ওকে সুখী করা শুধু মুখের কয়েকটা কথা, কয়েকটা লোকে বলবে মিথ্যা। মিথ্যা কিন্তু ওর মনে যদি তা ই সত্য হ’য়ে উঠে’ থাকে, তা হ’লে তফাৎটা কোথায়? ও যদি মনে মনে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরে থাকে মৃত্যুহীন মহিমায় একই তো কথা। আপনাদের সব চেয়ে কৃতী, সব চেয়ে যশস্বী যে বীর, তা’র নামের পাষাণ লেখন তা ও যে একদিন নিশ্চিহ্ন হ’য়ে মুছে না যাবে তা কে বলবে? না, একই কথা। ভবভূতিও তা’র চরম চরিতার্থতার অংশ পেয়েছিলো বই কি মৃত্যুর প্রান্তদেশে এসে। সে ও তা’র জীবনকে জয় করতে পেরেছিলো মৃত্যুর মুখোমুখি। ছিনিয়ে নিতে পেরেছিলো আনন্দের অংশ, তা’রও এসেছিলো রঙিন, ক্ষণিক দিন। স্বপ্ন? হ্যাঁ, স্বপ্নই তো; কিন্তু স্বপ্ন সত্য নয় এ কথা আপনাদের কে বললে? কল্পনাও একটা অভিজ্ঞতা : এবং অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতার চাইতে অনেক বেশি জীবন্ত, অনেক বেশি প্রখর । কেননা কল্পনাই চিরন্তনতা। বাস্তব সঙ্কীর্ণ, বাস্তব ঘটনা ও সময়ে সীমাবদ্ধ, বাস্তব অসম্পূর্ণ; কল্পনা অসীম ও চিরন্তন। হ্যাঁ, স্বপ্ন। মনে করুন এই আমাদের জীবন আমাদের সব কথা আর চিন্তা আর চেষ্টা মনে করুন এ সব কোনো বৃহত্তর সত্তার নিরবচ্ছিন্ন স্বপ্ন তা হ’লে আমরা কোথায় থাকি ? সেই স্বপ্ন যদি কখনো ভেঙে যায় তা হ’লে? এমন যদি হয় যে কোনো কালহীন, কাল অতীতের ভাবনা দিয়ে এই বিশ্ব তৈরি, তা হ’লে আমরা যা’রা মাংসের দেয়ালের, সময়ের শৃঙ্খলের মধ্যে বন্দী আমরাই বা নিজেদের অনুপাতে, নিজেদের ভাবনা দিয়ে নিজস্ব, গোপন বিশ্ব সৃষ্টি করতে পারবো না কেন? আর সে বিশ্ব যে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, তা’তে কি কিছু এসে যায়? তা তো একজনের পক্ষে সত্য হবারই জন্যে। না, আমাদের ভাবনাই সব : আমরা যা ভাবতে পারি, আমরা তা ই। এ কথা ভেবে আমার তো ভালো লাগে যে ভবভূতি জীবন যা’কে দিয়েছিলো শুধু দীনতা আর গ্লানি আর অতি ক্ষুদ্র, ধূলিময় সব দুঃখ, তা’র মৃত্যু হ’য়ে উঠেছিলো কল্পনায় জ্যোতিৰ্ম্ময়। যা’র জীবন ছিলো একটা অর্থহীন শূন্যতা, তার মৃত্যুর পথ সোনাছড়ানো, স্বপ্নের সোনা বসানো। সবদিক ভেবে দেখতে গেলে, সেটা কম সৌভাগ্য নয়। শেষ পর্য্যন্ত, হঠাৎ দেখতে যা মনে হ’তে পারতো অতি কুৎসিত প্রতারণা, তা ই হ’য়ে উঠলো শ্রীময়। শেষ পৰ্য্যন্ত আমি আমার আচরণের জন্য অনুতাপ করি নি।
ভবভূতির মৃত্যুর কয়েকদিন আগে কলকাতার আকাশ ভরে শরৎ এসেছিলো। শাদা মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলুম। কী সহজে ওরা ভেসে যায় আকাশের এক কোণ থেকে অন্য কোণে, মানুষের বাড়ি থেকে পা বাড়াতেই রেলভাড়া লাগে। সে বছর আমার রেলভাড়ার কমতি পড়েছিলো পূজোর হিড়িকে যা কিছু বাড়তি উপার্জ্জন, সব আমার বন্ধুর কৃপায় হাতে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই অদৃশ্য হ’য়ে যাচ্ছিলো। পূজোর সময়টা কলকাতায় বসে’ বসে’ ভাগ্যকে শাপ দিয়েছিলুম। বালক কালের চিত্তাহীনতায় আমি আর ভবভূতি প্রতিজ্ঞা করেছিলুম যে মৃত্যু পর্য্যন্ত আমরা বন্ধু থাকবো। কবেই বা তা বলেছিলুম আর কবে ভুলে গিয়েছিলুম কিছুই মনে ছিলো না : কিন্তু ভাগ্য যে তা অমন নির্মমভাবে মনে করে’ রাখবে তা কখনো ভাবতে পারি নি। কী দরকার ছিলো, কী দরকার ছিলো এ সমস্তর? কিন্তু কেন যে আমাদের জীবনে ও রকম না হ’য়ে এ রকম হয়, তা আমরা বলতে পারি নে। আমরা শুধু দুঃখভোগ করতে পারি, শুধু প্রতিবাদ করতে পারি। কিন্তু ঘটনার জটিল জাল থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করে’ নিতে পারি নে কিছুতেই। ভবভূতির জন্য কিছু ব্যয় করছি, এতে আমার নিজেরই এক এক সময় অবাক লাগতো। এ আমি করছি কী? এর চেয়ে মূঢ় অপব্যয় আর কী হ’তে পারে? ভবভূতি যে মরবে এ তো নিশ্চিত তা’কে বাঁচানো আমার এই অতি পরিমিত আয়ের তলানির সাধ্য নয়। তা ছাড়া, সত্যি বলতে, ভবভূতি এমন মানুষ নয় যে মরলে কি বাঁচলে খুব কিছু এসে যায়। মাঝখান থেকে আমি কেন নিজের উপর এই অত্যাচার করছি? ঈশ্বর জানেন, কী কষ্টসাধ্য, কী কৃপণ আমার এই উপার্জ্জন। নিজেরই কত ছোট খাটো ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। আমার উপর এই দাক্ষিণ্যের ভার এ যে দস্তুরমত রসিকতা। যে টাকা যাচ্ছে ভবভূতির চিকিৎসারূপ প্রহসনে (বলা বাহুল্য, বিশেষজ্ঞর বিধানের শতাংশও পালন করা সম্ভব হয় নি), তা দিয়ে আনাতোল ফ্রঁসের একটা সেট্ কেনা যেতো, বেইঠোফেনের কোনো রেকর্ড তা দিয়ে স্বাদ নিতে পারতুম কোনো দুর্লভ ম্যের, কবিতার চরণের মত যা’র নাম, সূর্যাস্তের আভার মত যা’র রঙ, আর যা’তে মলার আর অন্ধকারের আর স্মৃতির গন্ধ। তা দিয়ে সমুদ্রের ধারে গিয়ে দু’ সপ্তাহ আলস্য উপভোগ করে’ আসতে পারতুম। তা দিয়ে তা দিয়ে অনেক কিছু করা যেতো। ও সব জিনিস আমার দরকার। হয় তো ও সব আমাকে সাহায্য করতে পারে একটি সুন্দর কবিতা লিখতে।
সব চেয়ে আমার যা খারাপ লাগতো তা হচ্ছে ভবভূতির অর্দ্ধ স্ফুট, বিসদৃশ উচ্চারিত কৃতজ্ঞতা। ওর অত্যন্ত আন্তরিক উচ্চারণেও কেমন যেন শ্রী ছিলো না। শুনতে অস্বস্তি লাগতো, কষ্ট হ’তো। সে ই পৃথিবীতে সব চেয়ে বড় দুর্ভাগা, যে প্রকাশ করতে জানে না। তা’র অন্তরের নিবিড়তম অনুভূতির কথাও কেউ শুনতে চাইবে না, সে ভালো করে’ বলতে পারলে না বলে’ । জীবনে প্রতি পদে আর্টের স্থান। আমরা স্বাভাবিকতা চাই নে, আমরা সু অভিনয় চাই। আমরা কাঁচা মাল চাই নে, আমরা সৃষ্টি চাই। আমরা সত্যকে চাই নে, আমরা সুন্দরকে চাই। বার্নার্ড শ’র নাটকে অত্যন্ত সৎ, অত্যন্ত ভালো, নানারকম নৈতিক গুণসম্বলিত একজন লোককে মৃত্যুর মুখে ফেলে’ ডাক্তাররা তা’কেই বাঁচানো ঠিক করলেন যে দু’ হাতে টাকা ধার নিয়ে আর ফেরৎ দেয় না, যে তা’র স্ত্রীকে বিয়ে করে নি। এমন লোকের কথা সহজেই ভাবা যায়, যা’কে ভবভূতির অবস্থায় দেখলে তা’কে বাঁচাবার জন্য আমি পৃথিবী ওলোট পালোট করে ছাড়তুম। হয় তো তা’র আর কোনোই গুণ থাকতো না; শুধু শ’র চরিত্রের মত সে ভালো করে’ কথা কইতে পারতো। ভবভূতির জন্যে আমি যদি কিছু করে’ থাকি, ঈশ্বর জানেন তা ভালোবেসে করি নি : সুতরাং একাধিক অর্থে তা অপব্যয়। আর সেইজন্যই ভবভূতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আমার আরো বেশি অসহ্য লাগতো।
রোদে ভরে’ যাওয়া এক সকালবেলায় আমার যেন কিছুতেই আর কলকাতায় মন টিকছিলো না। কোথাও যেতে পারবো না মনে করতে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা অনুভব করছিলুম। ভবভূতির বিরুদ্ধে একটা ব্যক্তিগত রাগ মনের মধ্যে মাঝে মাঝে খোঁচা দিয়ে উঠছিলো। ওকে দেখতে বাস্ এ আসতে আসতে ওর মুখ মনে পড়লো ওর প্রেত মুখ। কী ভয়ঙ্কর সে মুখ, তা যেন সেই মুহূর্তে, স্বচ্ছ নীল সকালবেলার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে প্রথম উপলব্ধি করলুম। প্রায় লোভ হ’লো ফিরে যেতে। না, আজ নয়। আজ ওর মুখোমুখি হ’তে পারবো না। এই সকালবেলায়, নয়, দিগন্ত যখন নীলের গুঞ্জনে ভরে উঠলো। কিন্তু আমার উপর বিধাতার অভিশাপই এই যে আমি কখনো কোনো বিষয়ে চট্ করে’ মন ঠিক করে’ উঠতে পারি নে। বাস্ এগিয়ে গেলো নিছক অভ্যেসের জোরে ভবভূতির রাস্তার মোড়ে নেমে পড়লুম।
কিন্তু কী খারাপ, কী খারাপই আমার লাগছিলো আলোয় উজ্জীবিত, প্রাণ চঞ্চল রাস্তা ছেড়ে আলোহীন, আকাশহীন সেই গলিতে, শ্বাসরোধকারী, মৃত্যুময় সেই ঘরের মধ্যে ঢুকতে। আ, জীবনে সময় এত কম, এত কম তা’র মধ্যে এমন আশ্চৰ্য্য একটা সকালবেলা কি নষ্ট করতে হবে, রোগের শয্যাপার্শ্বে, মৃত্যুর নিঃশ্বাস ঘন সেই অন্ধকার ঘরে দারিদ্র্যের কঙ্কাল যেখানে প্রদর্শিত, জীবনের ক্ষীণ বুক ধুক্ধুকানি যেখানে অতি কষ্টে কান পেতে শুনতে হয়?
যেন আমার মনের ভাবকে বিদ্রূপ করে’, আমি ঘরে ঢোকামাত্র ভবভূতি বলে’ উঠলো, “এই তো তুমি এসেছো। আমি ঠিক জানতুম তুমি এখন আসবে।” হাসির চেষ্টায় ভবভূতির ব্যাধিগ্রস্ত কুৎসিত মুখ আরো একটু বিকৃত হ’য়ে গেলো।
হাতে ছিলো এক ঠোঙা কাবুলি ফল, ওর মা র হাতে সেটা দিয়ে এসে আমি ভবভূতির কাছে বসলুম। খানিকক্ষণ চুপ করে’ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে ও বললে, ‘তুমি আমার জন্যে যা করলে, রামতনু ’
অসহ্য। তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলুম, ‘কেমন আছো আজ?’
‘আর আছি!’ ভবভূতি তা’র একখানা হাড়ময় হাত কপালের উপর তুলে দিলে।
‘কাল রাত্রে ঘুমোতে পেরেছিলে?’ আমি চেষ্টা করলুম আলাপটা এই সাধারণতার স্তরে আবদ্ধ রাখতে।
ভবভূতি মাথা নাড়লে। না, ঘুমোতে সে পারে নি। তা’র চোখ দুটো কোটরের মধ্যে প্রায় অদৃশ্য হয়েছে। তা’র জীবনী শক্তি স্পষ্টত ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতরো হচ্ছে। যাক্, বেশি দেরি নেই।
একটু পরে ও জিজ্ঞেস করলে : ‘বই কদ্দূর হ’লো?’
‘হচ্ছে, আস্তে আস্তে হচ্ছে’, আমার উত্তর প্রস্তুত ছিলো, “তুমি ও সব নিয়ে ভেবো না, এখন ভালো হ’য়ে ওঠো।”
‘ভালো কি কখনো হ’বো?’
‘বাঃ, কী যে বলো! তুমি ভালো না হ’লে চলবে কী করে?’
‘আমার কিন্তু এক এক সময় মনে হয় ’
“ওঃ, তোমার মনে হয়! ভারি তুমি বোঝো এ সব জিনিসের।’
“তা হ’লে এখনো তা হ’লে আশা আছে?”
আমি হেসে উঠলুম। ‘আর কয়েকটা দিন যাক্ না”, বুঝতে পারছিলুম ওর মন এরই মধ্যে একটু ভালো করে’ দিতে সক্ষম হয়েছি; উৎসাহিত, আমি স্থির করলুম, এ বাড়ি থেকে বেরোবার আগে ওকে সম্পূর্ণরূপে সুখী করবো, ‘কয়েকটা দিন যাক্ না”, আমি বললুম, ‘তা’র পরেই পুরী। ডাক্তার অবিশ্যি বলেছিলো গোপালপুর, কিন্তু পুরীতে কতগুলো সুবিধে পাওয়া যাচ্ছে কিনা পুরী গেলে তোমার অসুখ কোথায় থাকে, দ্যাখো না!
‘পুরী!’ ভবভূতি বিহ্বলভাবে প্রতিধ্বনি করলে। আমার এই সঙ্কল্প ও এই প্রথম শুনলে। ওটা ছিলো আমার শেষ রঙের তাস।
‘একটা বাড়ি পাওয়া যাচ্ছে, বুঝলে না’, আমার উপস্থিত মুহূর্তের উদ্ভাবনাশক্তির উপর নির্ভর করে’ আমি বলতে লাগলুম, “ভাড়া নাম মাত্র দিতে হবে। যতদিন খুসি থাকো। একেবারে ভালো হ’য়ে না ওঠা পর্যন্ত তোমার কলকাতায় ফেরবার দরকার নেই।”
‘কিন্তু’, একটু চুপ করে’ থেকে ভবভূতি বললে, ‘আর সব খরচ?’
‘পুরীতে আবার খরচ কী? জলের মত সব শস্তা। আর রেল ভাড়া সে একটা ব্যবস্থা হবে’খন।’ কথাটা বলতে বলতে আমার নিজের দুর্দশার কথা মনে পড়লো। অসময়ে চুপ করে গেলুম।
‘সব ঠিক করে’ ফেলেছো?’ ভবভূতির অতি ক্ষীণ কণ্ঠস্বরে একটু উৎসাহ ফুটে ওঠবার চেষ্টা করলো।
‘হ্যাঁ, সব ঠিক’, আমি তাড়াতাড়ি বলতে লাগলুম। ‘বাড়িটা একেবারে সমুদ্রের উপর তুমি বারান্দায় শুয়ে থাকবে সব সময় তা’তেই ভালো হ’য়ে উঠবে। ডাক্তার তো বলেইছেন ওজোনই জীবন। একটু সবল হ’য়ে উঠলে আস্তে আস্তে ’
ভবভূতি যেন মনে মনে ছবি দেখছিলো, হঠাৎ বলে উঠলো, ‘সমুদ্র আমি কখনো দেখি নি।’
‘একটু সবল হ’য়ে উঠলে’, আমি বলে’ চললুম, ‘একটু একটু বেড়াতে পারবে; আর একেবারে যখন সেরে উঠেছো তখন সমুদ্র স্নান করে’ নতুন মানুষ হ’য়ে ফিরে আসবে কলকাতায়। সমুদ্র স্নান মানে, শরীরটাকে ধোবা বাড়ি থেকে কাচিয়ে আনা”, অন্য প্রসঙ্গে ব্যবহৃত রবীন্দ্রনাথের একটা উপমা চুরি করে’ আমি শেষ করলুম।
ভবভূতির চোখ বুজে এলো। ‘আ, যদি কখনো আবার ভালো হ’য়ে উঠি, তা হ’লে নতুন করে কত কিছুই আরম্ভ করতে পারবো। নতুন করে’ কত রকমের লেখা। যদি অনেক সময় থাকতো, যদি ‘ কথার মাঝখানে হঠাৎ থেমে গিয়ে ভবভূতি বললে, ‘চাকরিটা গেলো।”
‘ও চাকরি তোমার গেছে, ভালোই হয়েছে। ও কি তোমার করবার মত কাজ?’ (সুখ, সুখ! আমার প্রত্যেকটি কথা দুর্মূল্য ইনজেকশনের চাইতে অনেক বেশি ফলকারী আমি ওকে সুখে আচ্ছন্ন করে’ দিলুম, মগ্ন করে দিলুম।) ‘ও চাকরি কি তুমি এমনিই বেশিদিন করতে পারতে না, তোমায় করতে হ’তো? তোমার বইগুলো বেরোতে আরম্ভ করুক না তারপর আর তোমাকে পায় কে?’
‘আমি বই থেকে টাকা আশা করি নে ’
‘তোমার আশা করবার জন্যে অপেক্ষা করবে কিনা। টাকা একবার আসতে আরম্ভ করলে কে তা’কে থামায়!’
‘এ বইটা বেরোলে পরে’, ভবভূতি কথাটা কাৰ্য্যকরী ক্ষেত্রে নামিয়ে আনলে, ‘হয় তো কোনো বড় প্রকাশকের নজরে পড়তে পারে, যে টাকা দিয়ে আমার বই নেবে।’
‘সে তো হ’লো বলে’, আমি অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের স্বরে বললুম, ‘তোমাকে আটকাবে এমন সাধ্য আছে কা’র? তোমার জয় হবেই। এখানে এই বাংলাদেশেই তোমার জয় হবে।”
‘লোকে বলে, ভালো জিনিসের আদর এক সময়ে হয়ই।’
‘তা না হ’য়ে পারে?’ আমি খেলায় মেতে গেলুম, ‘এতদিন তুমি যে কষ্ট করলে, তা’র কি কোনো প্রতিদান হবে না? যে ব্যর্থতা, যে তিক্ততা, দুঃখের যে তীব্রতা এতদিন তোমাকে প্ৰতি মুহূর্তে ক্ষয় করলো, তা কি সুখে সৌভাগ্যে সার্থকতার দশগুণ হ’য়ে ফিরে আসবে না তোমার কাছে?’
‘আসবে? তুমি ঠিক জানো, আসবে?’
মর্মান্তিক প্রশ্ন। অসম্ভব প্রশ্ন। চিরন্তন প্রশ্ন। এক এক সময় ভাবি, যক্ষ্মার অন্তিম অবস্থার দারুণ যন্ত্রণার মধ্যে, মৃত্যুর ভীষণ মূর্তির সঙ্গে মুখোমুখি হ’য়েও ভবভূতি কি তা’র অনশ্বর সাহিত্যিক যশের নব জিরুসালেমের জ্যোতির্ম্ময় স্বপ্নে মুগ্ধ হয়েছিলো? না কি মুহূর্তের শীতল, শান্ত দৃষ্টিতে সে তা’র নিয়তিকে উপলব্ধি করেছিলো এক কণা ধূলোর মত সে তুচ্ছ, যা’কে তা’র মৃত্যুর দু’দিন পরে কেউ আর মনে রাখবে না, পরিবার গণ্ডীর বাইরে যা’র অভাব কেউ কখনোই অনুভব করবে না? জানবার উপায় নেই। তবে শেষ যেদিন ওকে দেখি, আমার একবার সন্দেহ হয়েছিলো যে আমি ওর জন্যে যে মোহ তৈরি করে’ দিয়েছিলুম, তা এইবার ছিন্ন হ’য়ে পড়েছে, হয় তো কোনোকালেই ও সত্যি সত্যি তা বিশ্বাস করে নি। একটা কাশির কারানি শেষ হ’য়ে যাবার পর ও শান্ত হ’য়ে অনেকক্ষণ শুয়ে ছিলো। ওর মুখের বিবর্ণতা কেটে গিয়ে ক্ষয়রোগের শেষ অবস্থার যা লক্ষণ তা রক্তাভ হ’য়ে উঠেছে কোটরগত চোখে অস্বাভাবিক, তীক্ষ্ণ উজ্জ্বলতা; হঠাৎ দেখলে মৃত্যুর এই প্রস্তাবনাকে সুন্দর স্বাস্থ্য বলে ভুল হয়। অনেকক্ষণ ভবভূতি রইলো চুপ করে’, চোখ বুজে; তারপর হঠাৎ সেই অস্বাভাবিক উজ্জ্বল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নিম্ন, অতি নিম্নস্বরে কানে কানে বলার মত করে জিজ্ঞেস করলে, “ও কি সত্যি?”
‘কী?’
‘এই আমার বই ছাপা হবার কথা?’
আমি চুপ করে’ রইলুম। কী ছিলো বলবার। মৃত্যু যখন এত কাছে থেকে একজনের মুখের দিকে তাকায়, তখন আর কী বলবার থাকে।
কয়েক মুহূর্ত ভবভূতির মৃত্যুময়, নির্নিমেষ দৃষ্টি আমার মুখের উপর অনুভব করলাম। তারপর আস্তে আস্তে ও বললে, ‘তবু তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তোমার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার সীমা নেই!’
কিছু বলতে হবে বলে’ই আমি বললুম, ‘এখন আর কিছু ভেবো না, ভালো হ’য়ে ওঠবার চেষ্টা করো।’
‘না, এখন আর আমার কোনো ভাবনা নেই”, ভবভূতি হাসবার চেষ্টা করলে। ‘তোমায় শেষ একটা কথা বলে’ যাই’, একটু চুপ করে’ থেকে সে আবার বলতে লাগলো, ‘আমি জানি, রামতনু, এতদিন আমি ভুল নিয়ে ছিলাম। যা কিছু আমি লিখেছি, সব বাজে, সব রাবিশ। তুমি আমার মনে কষ্ট না দেবার অনেক চেষ্টা করেছো; কিন্তু কেন যে ও সব পাগলামি করেছিলাম, এখন ভেবে অবাক লাগছে।’
সেই মুমূর্ষুর তীব্র দৃষ্টিতে আবিদ্ধ, আমার পক্ষে এ সব কথার কোনোরকম প্রতিবাদ করা অসম্ভব ছিলো। নীরবতায়, অসীম সময় থেকে মুহূর্তের পর মুহূর্ত্ত খসে পড়তে লাগলো। তারপর, আসন্নমৃত্যু যক্ষ্মারোগীর মনে যে তীব্র দুরাশা, বাঁচবার যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা হয়, তা’রই প্রেরণায় ভবভূতি বলতে লাগলো, ‘কিন্তু এখনো সময় আছে। আমার মনে হয়, রামতনু, আমি মরবো না। আমি ভালো হয়ে উঠবো, শিগগিরই ভালো হ’য়ে উঠবো! তারপর তারপর আর একবার দেখা যাবে। তুমি দেখে নিয়ো, রামতনু, আমি লিখবো। লিখবো। সত্যি সত্যি এমন জিনিস লিখবো ’
কিন্তু ভবভূতি তা’র সেই ভবিষ্যদ্বাণী শেষ করতে পারলে না। এই উত্তেজনায় আবার তা’র কাশি উঠলো; রক্তে বালিশ লাল হ’য়ে গেলো, তবু কাশি থামে না। আর সহ্য করতে না পেরে আমি তখন তখন সেখান থেকে বেরিয়ে গেলুম। সেই রাত্রেই ভবভূতি মারা গেলো।
এ জন্য অপেক্ষা করে’ই ছিলুম; তবু যখন মনে হ’লো যে ভবভূতি একেবারে নিঃশেষ, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, জলের রেখার মত মুছে গেছে বিশ্বের মুখ থেকে, চিরন্তন সময়ের মধ্যে তার ক্ষুদ্রতম কণা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, তখন কেমন একটু অবাক লাগলো। তা’র এত কষ্ট, এত চেষ্টা তা’র এতদিনের দীর্ঘ সাধনার আত্ম অত্যাচার, সব নিষ্ফল, শূন্য হয়ে গেলো। একদিনের জন্যও কেউ তা’কে মনে রাখবে না। বাংলাদেশে অনেক লেখক আসবে, লাভ করবে খ্যাতি, ডুবে যাবে বিস্মৃতিতে দু’ একজন হয় তো বা স্মরণীয় হ’য়ে থাকবে, কিন্তু কেউ কখনো জানবে না যে ভবভূতি নামের কেউ একজন কখনো লিখেছিলো, আশা করেছিলো শেষ পর্য্যন্ত তা’র আশার যূপে বলি দিয়েছিলো নিজের জীবন। এমন ভয়ঙ্কর ত্যাগ কা’কে কবে করতে শোনা গেছে? কিন্তু তা’তে কী এসে যায়? কিসেই বা কী এসে যায় এই ত্যাগে, এই আত্ম বিনাশে, এই সাধনায়? ও সব জিনিসের কোনো মূল্য দিতে পৃথিবী প্রস্তুত নয়। পৃথিবী আর কিছুই বোঝে না, শুধু বোঝে প্রতিভা। প্রতিভা যা দেয় হ’তে পারে মদের, কি তার চেয়েও তীব্র কোনো নেশার ঝোঁকে; হ’তে পারে পেটের দায়ে; হ’তে পারে কোনো স্ত্রীলোককে কি কোনো রাজাকে খুসি করবার জন্যে; অবজ্ঞায়, অশ্রদ্ধায়; ভোরের দিকে নাচ থেকে ফিরে পোষাক ছাড়তে ছাড়তে; এক বিকেলবেলায় বসে’ বসে’ আর কিছু করবার নেই বলে’; নিজের উপর কী অন্য কারো উপর রাগ করে’; প্রচলিত জনরুচির কি কোনো নিৰ্দ্দিষ্ট উপরিওয়ালার বিধান অনুসারে; অনুরুদ্ধ হ’য়ে, বাধ্য হ’য়ে, অনেক সময় নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রতিভা যা দেয়, যা কিছু ছড়িয়ে দেয় অবহেলায়, পৃথিবী তা ই মাথা পেতে নেয়, তা ই সযত্নে কুড়িয়েকাচিয়ে তার চিরকালের ভাণ্ডারে সঞ্চয় করে রাখে। কিন্তু তা ছাড়া যতই অচঞ্চল হোক্ আপনার নিষ্ঠা, আন্তরিক হোক উদ্দেশ্য, যতই আপনি সৎ হোন্, পরিশ্রমী হোন্, যত নিষ্ঠুর দুঃখই আপনি কেন সহ্য না করুন, পৃথিবী আপনার মুখের দিকে একবার ফিরেও তাকাবে না। যে সব ভালো ভালো গুণের উপর মানুষের সামাজিক জীবনে এত জোর দেয়া হয়, জীবনের সর্ব্বোচ্চ ক্ষেত্রে তা’র অপরিসীম অর্থহীনতা।
তবু তবু একবার এ প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, এত ইচ্ছা, এত চেষ্টা, এমন দারুণ অধ্যবসায়, উদ্দেশ্যের এই ভীষণ সততা এর কি একেবারেই কোনো মূল্য নেই? ভাবতে ভালো লাগে, ভবভূতি তার ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, অতীন্দ্রিয় কোনো সার্থকতা, পৃথিবী অতীত কোনো পূর্ণতা অন্য কোনো জীবনে। মনে মনে ব্রাউনিঙ্ আওড়াই : ‘Not on the vulgar mass called “work” must sentence pass ’ ইত্যাদি। আর আমাদের নিজস্ব রবীন্দ্রনাথ : ‘জীবনে যত পূজা হ’লো না সারা’ ইত্যাদি।
মুহূর্ত্তের জন্যও, নিষ্ফলতার এই মহিমায় যদি মুহূর্ত্তের জন্যও বিশ্বাস করতে পারতাম। এমন মোহ যদি মিথ্যা জেনেও মনে স্থান দিতে পারতাম যে এখানে যা অসম্পূর্ণ, অকৃত, স্তূপীকৃত ভগ্নাংশ, অন্য কোথাও, কোনো স্বর্গে, কোনো ঈশ্বরের চরণপ্রান্তে তা দীপ্ত হ’য়ে উঠছে নিটোল, নিখুঁত পরিপূর্ণতায়। কিন্তু আমরা যে জানি মৃত্যুই সৰ্ব্বশেষ সমাপ্তি, আমরা যে জেনেছি জীবন নিয়ে নিয়তির উচ্ছৃঙ্খল খেয়ালিপনা আমরা যে জানি অনেক কিছুই আমরা জানি নে। কী করে’ ব্রাউনিঙ্ কি রবীন্দ্রনাথের মত পরিতৃপ্ত প্রশান্তি নিয়ে আমরা বলতে পারি…না, আমাদের সব ব্যর্থতার অনিবাৰ্য্য প্রতিষেধক হিসেবে ঈশ্বরকে ব্যবহার করে’, আমাদের সব ঋণের দায় স্বচ্ছন্দে স্বর্গের ঘাড়ে চাপিয়ে যে এতটুকু সান্ত্বনা লাভ করবো, সে উপায়ও আমাদের নেই।
***
