আমার বন্ধু – ৪

নাঃ, আর নয়। নিজের এই বিশ্রী কপটতায় নিজেরই ঘেন্না ধরে গেলো। একটা অপরাধের অস্বস্তিকর চেতনায় ভারি হ’য়ে উঠলো সমস্ত মন। এ আমি কী করছি? এ রকম ভাবে আর কিছুদিন চললে ভবভূতি যে দস্তুরমত বেসামাল হ’য়ে উঠবে। একদিন ওকে যে নিষ্ঠুর আঘাত দিতে হবে অনিচ্ছায়, কিন্তু অনিবার্য্যরূপে তা’র কথা ভেবে অত্যন্ত মন খারাপ হ’য়ে গেলো। কিন্তু ঈশ্বর আমার পক্ষে সেটা সহজ করে দিয়েছিলেন।

কী বলবো ভাবছি এমন সময় আর একজন এলো। সাহিত্যিক বন্ধু। ভবভূতির দিক থেকে মন সরিয়ে নেবার একটা উপলক্ষ্য পেয়ে কৃতজ্ঞ বোধ করলাম। কিন্তু একটু পরে ও ও উঠলো।

‘কী, যাচ্ছো?’

‘হ্যাঁ, চলি এবার।’

আমি কোনোরকম মন্তব্য করলুম না; সাহিত্যিক বন্ধুর সঙ্গে আমার অনেক পেশাদারি আলাপ করবার ছিলো। ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলুম। দরজার বাইরে এসে ও বললে, ‘তা হ’লে আমি কয়েকদিন পর এসে খোঁজ নিয়ে যাবো।’

‘তা তো যাবেই, কিন্তু তা ছাড়াও তুমি আসতে পারো যদি তোমার ইচ্ছে হয়।’ ভবভূতি যাবার জন্য উঠতেই আমার তা’কে ভালো লাগতে আরম্ভ করেছিলো; এখন, দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তা’র প্রতি উষ্ণ সহৃদয়তায় আমি যেন উন্মুখ হ’য়ে উঠলুম।

ফিরে এসে বসেছি, বন্ধুটি জিজ্ঞেস করলে, ‘কে হে এই লোকটা?’

‘আছে’, আমি সংক্ষেপে বললুম, ‘আমার এক বন্ধু।’ বন্ধুটি চেয়ারের পিঠে গা এলিয়ে দিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।

“তোমার বন্ধু! তোমার এত সব বন্ধু আছে জানতুম না তো।”

ভবভূতির অস্তিত্বের জন্য দায়ী ও ক্ষমাপ্রার্থী, আমি বললুম, ‘ছেলেবয়েসের…’

টেবিলের উপর ভবভূতির পাণ্ডুলিপিটার উপর বন্ধুর চোখ পড়লো। বাঁকা হেসে বললে, ‘কী, তোমার বন্ধু লেখা টেকা কিছু দিয়ে গেলো নাকি? ঐ কাগজের তাড়া ’

পাণ্ডুলিপিটা তাড়াতাড়ি বন্ধুর নাগালের বাইরে সরিয়ে বললুম, ‘ও কিছু নয়’, বলে’ অন্য কথা পাড়লুম।

দু’ সপ্তাহ পর ভবভূতি আবার আসতে আমি বললাম, ‘ভবভূতি, আমাদের দেশের সব প্রকাশক তা’দের কি বুদ্ধিশুদ্ধি জ্ঞানগম্যি সম্বন্ধে খুব সন্দেহ আছে? হাতের কাছে যে কোনো রাবিশ পায়, তা ই ছাপে, যদি লেখক একটু নাম করা হ’লেই হ’লো।’ উষ্মার স্বরে আমি জুড়ে দিলুম, ‘কী সব এক একজন!’

ভবভূতির ক্লান্ত চোখ নিরাশায় আনত হ’য়ে এলো : ‘হলো না তা হ’লে?’

‘পাগল!’ আমি রীতিমত উত্তেজিত হ’য়ে পড়লুম, ‘এটা তো জানো যে প্রচলিত ফ্যাশানের বিরুদ্ধে যে যায়, তার পক্ষে আত্মপ্রতিষ্ঠা করা কত কঠিন! সাহিত্যেও আর্টেও সাময়িকভাবে এই ফ্যাশানের বিধানই চূড়ান্ত; হাতে হাতে যশ আর টাকা পাবার লোভ যাদের, তারা এই ফ্যাশানেরই দাসবৃত্তি করে। কিন্তু তুমি তা করো নি, করতে পারো না। যদি পারতে, তা হ’লে তুমি আর তুমি থাকতে না। এ তো জানা কথা তোমার যে একটু সময় নেবে। আমাদের দেশের কথা ছেড়ে দাও; স্ট্রেচির এমিনেন্ট ভিক্টরিয়ান্স বা’র করতে প্রথমটায় লণ্ডনের কোনো প্রকাশকই রাজি হন নি।’

স্ট্রেচির নাম শুনে ভবভূতির মুখে কোনো দীপনা প্রকাশ পেলো না; এমন প্রমাণ পেলুম না, আমার কথা শুনে ওর মনটা আত্ম গৌরবে উষ্ণ হ’য়ে উঠেছে। একটু চুপ করে থেকে ও নির্জীবস্বরে বললে, ‘একবারেই তো আর কারো নাম হয় না। আজ যা’র নাম কেউ জানে না, হয় তো একখানা বই বেরোলেই ’

‘নিশ্চয়ই!’ সোৎসাহে আমি বললুম, ‘নিশ্চয়ই! কিন্তু এ ও বলছি, ভবভূতি, তোমার পক্ষে এই আগ্রহ অশোভন হ’য়ে পড়ছে। এটা কেন বুঝতে পারছো না যে আগুন আর প্রতিভা কেউ চাপা রাখতে পারে না; একদিন তা ফুটে বেরোবেই। বেরোবেই। আমার মত লেখককে যে সব জিনিসের জন্য ছুটোছুটি করতে হয়, তোমার কাছে সে সব নিজে থেকে, গায়ে পড়ে’ আসবে; তোমার পক্ষে চুপচাপ বসে’ থাকবার বেশি কিছুই করবার দরকার নেই।’

‘কিন্তু আমি যা লিখি’, ভবভূতি একটা খাঁটি কথা বললে, ‘লোকের তা পড়া তো দরকার।’

‘যথাসময়ে’, সংক্ষেপে, হেঁয়ালি ধরণে আমি বললুম।

‘হ্যাঁ, যথাসময়ে’, গম্ভীর নিম্নস্বরে ভবভূতি বললে, ‘সে সময়ের দেরি থাকতে পারে, কিন্তু’, এখানে আমি মাথা নেড়ে সায় দিলুম, ‘যখন আসবে, যখন আসবে ’

ভবভূতি তা’র কথা শেষ করবার ভাষা পেলো না; আমি তাড়াতাড়ি বলে’ উঠলাম, ‘নিশ্চয়ই।”

‘কিন্তু যতদিন তা না আসে’, সকুণ্ঠে, সলজ্জভাবে ভবভূতি বললে, ‘একটু একটু চেষ্টা করতেই বা দোষ কী? যা ই বলো, আজকালকার পৃথিবীতে কি আর প্রতিভার সে রকম আদর আছে!’

‘আজকালকার পৃথিবীর কথা আর বোলো না। একটা সিগ্রেট খাও।’

“আমি ভাবছি তোমাকে আর একটা MS দিয়ে যাবো। বলা যায় না হঠাৎ কারো হয় তো খেয়াল হ’তে পারে ’

দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপি ফেরৎ নিয়ে ভবভূতি আর একটা দিয়ে গেলো। তৃতীয়টা ফেরৎ দেবার সময় আমি প্রকাশকদের ভয়ঙ্কর নির্ব্বদ্ধিতা ও শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের অপ্রতিরোধ্য বিজয় গতি সম্বন্ধে আরো জোরালো ভাষার বক্তৃতা দিলুম। ঠিক সেই সময়ে, দুর্ভাগ্যবশত, ডাকযোগে এক মাসিকপত্র এসে উপস্থিত হলো : তা’তে, দেখা গেলো, ‘আধুনিক সাহিত্যে রামতনু’ নামে এক প্রবন্ধ; একফর্মা ভরা, কোটেশন বহুল আমার এক উচ্ছ্বসিত স্তুতি। ভবভূতি লেখাটা খানিকক্ষণ উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে চুপ করে’ রইলো।

আমি হেসে বললুম, ‘কী লিখেছে ইডিয়টচন্দ্র?’

प्रत्युत्तরে স্নান হেসে ভবভূতি বললে, ‘তুমি একেবারে দিগ্বিজয় করে’ ফেলেছো, দেখছি।’

সশব্দে, আমি হেসে উঠলুম। ‘আমি হচ্ছি ফ্যাশানের ঢেউয়ের উপরকার ফেনা, আজকের এই ক্ষণিক সূৰ্য্যালোকে, ঝিক্‌মিক্‌ করছি। হ’তে পারে, এই ঢেউ আরো স্ফীত হবে; আমার ঝিকিমিকি আরো চোখ ধাঁধানো হ’বে; কিন্তু তারপর এই ঢেউ যখন ভেঙে পড়বে কারণ, ভেঙে পড়তে তা বাধ্য কোথায় থাকবো আমি? সময়ের সমুদ্রে একটা বুদ্বুদ, মুহূর্ত্তের একটা রঙিন রামধনু। আর তুমি? তুমি চিরস্থায়ী শিলার মত; তোমাকে ঘিরে সময়ের অনেক জল চিরকাল বয়ে যাবে; অসংখ্য ঢেউয়ের ওঠা পড়ার মধ্যে স্থির, অক্ষয়, তুমি দাঁড়িয়ে।’

আমার এই কথা থেকে ভবভূতির মন গভীর প্রেরণা গ্রহণ করেছিলো কিনা জানি নে, কিন্তু তার পরে কিছুকাল আর ওর দেখা পাই নি। ভয় করেছিলাম, ও হয় তো আরো কোনো পাণ্ডুলিপি আমার কাছে দিয়ে যাবে; ধারণা হ’লো, শ্রেষ্ঠ সাহিত্য যে নিজেই নিজের পথ করে নেয়, সে বিষয়ে ওর মনে বিশ্বাস উৎপাদন করতে আমি সক্ষম হয়েছি। সময় বয়ে গেলো আর আমি ভবভূতির অস্তিত্ব প্রায় বিস্তৃত হ’য়ে গিয়েছিলুম। কেননা জীবন জটিল ও বহুমুখী এবং ও এমন লোক নয় যা’র অনুপস্থিতি অনুভব করবার মত। শেষটায় হিসেব করলে দেখা যাবে, প্ৰায় চার মাস পরে, কিন্তু জীবিকা সংগ্রহের সর্ব্বগ্রাসী চেষ্টায় যা’কে ব্যাপৃত থাকতে হয়, তা’র কাছে তা অতটা সময় মনে হয় না একদিন ওর এক পোস্টকার্ড পেলুম : ও রোগে শয্যাগত; আমি কি একবার সময় করে’ ওকে দেখে আসতে পারবো?

গেলাম ওকে দেখতে গলির পর সরু গলি পার হয়ে; পুরোনো, বনেদি কলকাতার শ্বাসরোধকারী, স্যাঁৎসেঁতে আবহাওয়ার ভিতর দিয়ে; গায়ে গা লাগা, বিবর্ণ, সূৰ্য্যহীন অন্তঃপুর সমন্বিত সব বাড়ির সারি পার হ’য়ে। দিনের বেলায়ই প্রায় অন্ধকার এক বাই লেনের ভিতর পাওয়া গেলো ভবভূতির বাড়ি। নিচের তলায়, রাস্তার উপর ওর দু’টি ঘর; তারই মধ্যে যেটি অপেক্ষাকৃত ভালো, সেখানে এক তক্তপোষে বিছানা পেতে চাদরমুড়ি দিয়ে ভবভূতি শুয়ে আছে। ওকে দেখে আমি চমকে উঠলাম। কোনোকালেই ও রোগা বই ছিল না; কিন্তু এখন আর ওকে মানুষ বলে’ই চেনা যায় না। মামির মত শীর্ণ, নীরক্ত বর্ণ হীন ওর মুখ; কুয়োর মত কোটরের নিচে ভারি, সবুজ জলের মত মিট্‌মিট্‌ করছে চোখ; চোখের নিচে, কপালে ছোট ছোট সব শিরাগুলো স্ফীত হ’য়ে ভয়ঙ্কর স্পষ্টতায় ফুটে উঠেছে; গালের উপর অনেকদিনের দাড়ি কোনো বিষাক্ত আগাছার মত কুৎসিত। একবার তাকিয়েই উপলব্ধি করলাম, আমি এক মৃতদেহের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি।

আমি যখন ঘরে ঢুকলুম, ভবভূতির স্ত্রী ওর শিয়রে বসে” হাওয়া করছিলো; আমাকে দেখেই সন্ত্রস্ত হ’য়ে ঘোমটা টেনে দিয়ে উঠে দাড়ালো। মুহূর্তের জন্য মেয়েটির চোখ আমার চোখে পড়লো; তা’তে কোনো অসাধারণ লাবণ্য বা দীপ্তি নেই; সে মুখের একমাত্র ভাব ব্যঞ্জনা হচ্ছে অমানুষিক সহনশীলতা, সে মুখে ভাগ্যের হাতে চরম আত্মসমর্পণের নির্ব্বদ্ধিতা, আলোকহীনতা। অনুমান করলুম, মেয়েটির বয়েস আঠারোর মত হবে, মেয়েলোকের পক্ষে যে বয়েসটা ঐশ্বর্য্যের মত কিন্তু এই তা’র রূপ! ভবভূতি এ মুখের দিকে ভালো করে’ তাকিয়ে দ্যাখে নি বলে’ সেই মুহূর্তে ওকে খুব দোষ দিতে পারলুম না। তাকিয়ে দেখবার মত, সত্যি, কিছু নেই। হঠাৎ আমার মনে হ’লো, এই মেয়ে যখন থান কাপড় পরবে, হাত থেকে খুলে ফেলবে শাঁখা, মুছবে কপালের সিঁদুর, তখন ওর সঙ্গে যেন তা মানিয়েই যাবে; বৈধব্যের কোনো কষ্ট অনুভব করবার ক্ষমতাও ওর নেই; ওর জীবনের এই অসামায়িক, কুশ্রী পরিসমাপ্তি ও অনায়াসে মেনে নেবে মোট কথা, এখনকার চাইতে যে কিছুমাত্র খারাপ থাকবে, তা নয়।

ভবভূতি ক্ষীণস্বরে বললে, ‘বোসো।”

হঠাৎ, কী ভাবছিলাম, তা টের পেয়ে নিজেই নিজের কাছে লজ্জা পেলাম। ঘরের মধ্যে একটামাত্র চেয়ার; সেটা টিনের, এবং তা’র উপর কতগুলো নোংরা কাপড় স্তূপীকৃত। সমস্ত ঘর এলোমেলো, বিশৃঙ্খল; পানের ডিবে থেকে আরম্ভ করে মুদিদোকানের কাগজের ঠোঙা পর্যন্ত কাজের ও অকাজের নানা রকমের জিনিস মেঝে ময় ছড়ানো; তা’রই মধ্যে এক উলঙ্গ শিশু হাত পা ছড়িয়ে বসে’ কাল্পনিক এক সঙ্গীর কাছে ও ছাড়া অন্য সবার কাছে অর্থহীন কথা বলে’ যাচ্ছে।

বৌটি নোংরা কাপড়গুলো নামিয়ে চেয়ারটা আমার কাছে এগিয়ে দিয়ে ঘর থেকে চলে গেলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছো, ভবভূতি?’

ভবভূতি মাথা নাড়লে। ‘ভালো না।’

‘কী হয়েছে?’

‘জ্বর।’

‘ক’দিন যাবৎ ভুগছো?’

‘আজ তেইশ দিন।’

‘হুঁ।’ একটু সময় আমি চুপ করে’ রইলাম ‘আপিস?’

‘একমাসের ছুটি পাওয়া গেছে। সামনের দশ তারিখে join করবার কথা। কিন্তু জ্বরটা কিছুতেই যে ছাড়ছে না। ভাবছি আরো ছুটি চাইলে দেবে তো?’

আমি কোনো কথা বললাম না। ভবভূতির অন্তহীন ছুটি মঞ্জুর হ’য়ে আছে, তা বুঝতে পারলে আপিসের ছুটির কথা ভেবে ও বিচলিত হ’তো না।

কপাল পৰ্য্যন্ত ঘোমটায় ঢেকে ভবভূতির মা এলেন। তাঁর কাছ থেকে রোগের ও চিকিৎসার সব বিবরণ শোনা গেলো। অনেকদিন যাবতই ভবভূতির খুসখুসে কাশি, বিকেলের দিকে সামান্য জ্বরও হয়। একাদশী আর পূর্ণিমা অমাবস্যায় উপোস করে ও সেটা কাটিয়ে ওঠবার চেষ্টা করেছে। কিছু ফল হয় নি। কাশিটা বরং দিন থেকে দিন বেড়েই চলেছে। শরীরও অত্যন্ত দুর্ব্বল হ’য়ে পড়তে লাগলো, হাঁটতে কষ্ট হয়। শেষ পৰ্য্যন্ত শয্যা নিতে হ’লো। পাড়ায়ই থাকেন এক কবিরাজ, তাঁর, আমার মনে হ’লো, সব চেয়ে বড় গুণ এই যে তিনি ভবভূতিদেরই দেশের লোক; তাঁকে দিয়ে চিকিৎসা চলছে। তিনি বলেছেন, বিশেষ কিছু নয়; ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হয়েছে, কাশির সঙ্গে যে রক্তটা পড়ে, সেটা বেশি কাশতে গলায় চোট লাগে বলে’। তাঁর নির্দেশ অনুসারে চ্যবনপ্রাশ আর সকালে বিকেলে তুলসী পাতা আর মিছরির অনুপান দিয়ে বড়ি খাওয়ানো হচ্ছে। কবিরাজটির হাত যশ আছে; ভগবানের ইচ্ছায় বাছা এখন শিগগির সেরে উঠলেই হয়।

ভবভূতির অসুখটা যে যক্ষ্মা, এবং যক্ষ্মারও বেশ একটু পরিণত অবস্থা, তা, এ সব বিষয়ে যা’র কিছু অভিজ্ঞতাও আছে, সে একবার ওকে চোখে দেখেই বুঝতে পারে। টিউবার্কল বীজাণু যে ওকে আক্রমণ করবে, তাতে কিছুই আশ্চৰ্য্য নেই; বরং যে সব কারণে তা শরীরের মধ্যে প্রবেশ ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে, তার প্রত্যেকটি ও অতিরিক্ত মাত্রায় পরিপূরণ করে’ এসেছে। বলা যায়, যক্ষ্মার জন্য ও নিজকে সযত্নে প্রস্তুত করে রেখেছিলো তা ছাড়া ওর উপায় ছিলো না। এই গলির ভিতর স্যাৎসেঁতে অন্ধকার এই ঘর, অপর্যাপ্ত, সারহীন আহার, অতিরিক্ত পরিশ্রম এতেও যদি ক্ষয়রোগ না হয় তো সেটা একটা মির্যাকূল্। এখন যা অবস্থা, ভবভূতিকে তা’তে মৃতের মধ্যে গণনা করলেও ক্ষতি নেই। অথচ, এখন পৰ্য্যন্ত চ্যবনপ্রাশের উপর নির্ভর করে এরা সবাই নিশ্চিন্ত। কিন্তু মন্দই বা কী? তা ই বা মন্দ কী? যে কোনো অবস্থাতেই ও মরবেই; স্বগ্রামীয় কবিরাজের চিকিৎসা ওর এমন কী আর ক্ষতি করতে পারবে? অন্তিম, ভয়ঙ্কর উপলব্ধি একদিন তো অনিবার্যরূপে আসবেই কেন সেটাকে অযথা এগিয়ে দেয়া? শিগগিরই সেরে উঠবে, এ বিশ্বাসে যতদিন ওরা সুখে থাকতে পারে, থাক্ না। কী লাভ হবে ওদের জানিয়ে দিয়ে যে ভবভূতির ব্যাধিটা হচ্ছে যক্ষ্মা এবং ওর মৃত্যু আসন্ন? এ হচ্ছে গিয়ে বড়লোকের রোগ; অকৃপণভাবে অজস্র টাকা খরচ করতে না পারলে সেরে ওঠবার লেশমাত্র সম্ভাবনা নেই : ভালোই তো, ওদের যদি ধারণা হয় যে ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হয়েছে। কী হবে, আমি যদি একজন ভালো ডাক্তার নিয়ে আসি? ডাক্তার এসেই তো বলবে, আশিটা ইনজেকশন দেয়া দরকার; তা’র একটার দামই ভবভূতির একমাসের মাইনে। তখন? বলবে, গোপালপুর অন সী নিয়ে যাও তখন? খেতে বলবে ডিম, দুধ, মাখন, লুচি, মাংস, অজস্র ফল তখন? না, না ডাক্তার না ডাকাই ভালো; কেন মিছিমিছি মন খারাপ করা? টাকার অভাবে, স্রেফ টাকার অভাবে একটা লোক মরতে বাধ্য হচ্ছে, এ চিন্তা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত কারো কাছে অসহ্য, বাইরের লোকের কাছেও প্রীতিকর নয়। সেই প্রায়ান্ধকার, বিশৃঙ্খল ঘরে বসে’ ভবভূতির মা র অজ্ঞান, স্নেহান্ধ, মিথ্যা আশা অবলম্বী কথা শুনতে শুনতে আমার ভয়ানক মন খারাপ হ’য়ে গেলো। যে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা পেয়ে পেয়ে মরবে, কয়েকদিনের মধ্যেই ভবভূতি সেই চিন্তায় আমি স্বচ্ছন্দে নিঃশ্বাস ফেলতে পারছিলাম না। কিন্তু বৃথা চিন্তা; আমি কী করতে পারি? কী ক্ষমতা আমার আছে?

সন্ধে হ’য়ে এলো। ‘একটা আলো নিয়ে আসি’, বলে ভবভূতির মা ভিতরের ঘরে চলে গেলেন। হঠাৎ, ভবভূতির সঙ্গে একা বসে’ আমি কী রকম দুর্ব্বল হ’য়ে পড়লাম; ওর দিক থেকে রইলাম মুখ ফিরিয়ে। সেই শিশুও কখন তা’র কাল্পনিক (কিন্তু যা’কে আমরা বাস্তব বলি, তার চেয়ে কিছু কম সত্য নয়) বন্ধুর সঙ্গে আলাপে ক্লান্ত হ’য়ে তা’র মা র কাছে চলে’ গেছে; স্তব্ধ ঘরে ভবভূতির দীর্ঘ, কষ্টকর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে লাগলাম।

খানিক পরে ভবভূতি ডাকলো : ‘রামতনু ’

আমি মুখ ফিরিয়ে তাকালাম।

‘শোনো’, তৃতীয় ব্যক্তির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভবভূতি বললে তা’র মনের কথা, ‘অসুখটা করে’ এমন বিশ্রী হলো; নতুন একটা উপন্যাস লিখছিলাম লিখতে পারলে অ্যাদ্দিনে শেষ হ’য়ে যেতো।’

আমি কণ্ঠস্বরে প্রফুল্লতা আনবার যথাসাধ্য চেষ্টা করে বললাম, ‘এমন আর তাড়া কী? সেরে উঠে তুমি অনেক উপন্যাস”, কথাটা আমার নিজের কানেই ঠাট্টার মত শোনালে, “শেষ করতে পারবে।’

‘এ বইটা খুব ভালো হচ্ছিলো; আমার সব চেয়ে ভালো।’

‘না, না’, আমি মিথ্যার উপর মিথ্যা জড়ো করতে লাগলাম, ‘এখন আর তোমার কী হয়েছে? সবে তো শুরু; তোমার যা সব চেয়ে ভালো, এখনো তা’র অনেক দেরি।’

কোটর নিহিত ভবভূতির চোখে ক্ষণিকের আনন্দ ঝিকমিক করে উঠলো। ‘শুয়ে শুয়ে প্রায়ই বইটার কথা ভাবি। এমন লিখতে ইচ্ছে করে!’

দিনব্যাপী আপিসের খাটনির পর বাড়ি ফিরে এসে আবার লেখা বোধ হয় এই তক্তপোষেই বুকের নিচে বালিশ দিয়ে উপুড় হ’য়ে শুয়ে অবিশ্রান্ত লেখা সে লেখায় যশ নেই, লাভ নেই, বাইরে থেকে কোনোরকম উৎসাহ নেই, তবু মুহূর্তের জন্য দমে’ না গিয়ে লিখে যাওয়া কী আশ্চৰ্য্য, কী ভয়ানক! হঠাৎ আমার মনে হ’লো, এই লেখার জন্য না হ’লে ভবভূতির হয় তো অসুখটা করতোই না। এত পরিশ্রমের উপযুক্ত স্বাস্থ্য নিয়ে ও জন্মায় নি। যদি সন্ধেবেলাটাও ও খোলা হাওয়ায় কাটাতো! কিন্তু তখনই আবার মনে হ’লো, এই ব্যাধির হাত থেকে নিস্তার ও কোনো রকমেই পেতো না; তবু যা হোক এই সান্ত্বনা নিয়ে ও মরতে পারবে যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ওর সাহিত্যসৃষ্টি থাকৰে ক্ষয়হীন গৌরবে প্রতিষ্ঠিত হ’য়ে; ও অন্তত জেনে যাবে, ওর জীবন একেবারে ব্যর্থ হয় নি।

কিন্তু সব জেনে শুনেও মনকে একেবারে পাথর করা গেলো না করতে হ’লো চিকিৎসার ভাণ। সে ভাণ একদিক থেকে যেমন হাস্যকর, অন্যদিক থেকে তেমনি মর্মান্তিক। আমার পক্ষে তা’র মর্মান্তিকতা দ্বিগুণ : কেননা তা আমার এমনিতেই শূন্য হয়ে যেতে উৎসুক পকেটকে দ্রুততরোভাবে শূন্যতরো হ’তে সাহায্য করেছিলো। দাক্ষিণ্যের প্রতি কোনোরকম উন্মুখতা আমার কখনো ছিলো না; সেটা একটা বিলাসিতা যা সত্যি, আমার অতীত। আমার নিজের অস্তিত্বই যা’কে বলে গিয়ে হাত থেকে মুখে। যে আমার কখনো কোনো কঠিন অসুখ করলে সোজা হাসপাতালে গিয়ে ওঠা ছাড়া উপায় থাকবে না, সেই আমাকেই এমন একজনের জন্য বাড়িতে লুকিয়ে ডাক্তারের ফীর ব্যবস্থা করতে হচ্ছে যা’কে, সত্যি বলতে, আমি ভালোও বাসি নে। ব্যাপারটায় মনে মনে একটু রাগও হ’লো, হাসিও পেলো। একেই বলে কপাল।

কলকাতায় ভবভূতির আত্মীয় স্বজন কেউ ছিলো না, জানতুম; বাইরে কেউ আছে কিনা, খোঁজ নেবার সময় ছিলো না এবং এমন সন্দেহ করি যে খোঁজ নিলেও বিশেষ কিছু ফল হ’তো না। প্রত্যেকেই নিজের জীবন নিয়ে যথেষ্ট বিব্রত অন্যের দিকে তাকাবার সময় কা’র আছে? তা ছাড়া ভবভূতির পারিবারিক ইতিবৃত্ত যদ্দূর জানতুম, ওর কোনো আত্মীয়র যে ওর মৃত্যুর মুহূর্ত্তে ওর কর্ণমূলে হরিনাম জপ ছাড়া (তাও খুব সোৎসাহে, উচ্চস্বরে নয়) আর কিছু করবার ক্ষমতা আছে, তা সম্ভব মনে হয় নি। আর তা ছাড়া, আত্মীয় বলতে সাধারণত যাদেরকে বোঝায় তা’রা হচ্ছে এক শ্রেণীর জীব যা’রা আপনার মৃত্যুতে শোক করতে সব সময়ই এত বেশি প্রস্তুত হ’য়ে আছে যে সে মৃত্যু নিবারণের উদ্দেশ্যে কোনোরকম চেষ্টা করবার খেয়াল তাদের হয় ন।

সুতরাং আমাকেই পরদিন শহরের এক যক্ষ্মা বিশেষজ্ঞকে নিয়ে যেতে হ’লো আমার বন্ধুকে দেখতে। রোগীর পরীক্ষা খুব সংক্ষিপ্ত হ’লো : পরীক্ষা করবার বিশেষ কিছু ছিলো না। ডাক্তার বেরোবার সময় আমাকে ইঙ্গিত করলেন। একটু সময় নিঃশব্দে তাঁর সঙ্গে হাঁটলুম। বাই লেনে ডাক্তারের গাড়ি ঢোকে নি; অপেক্ষাকৃত চওড়া গলিতেও সমস্তটা জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। গাড়ির পা দানিতে এক পা রেখে কোটের পকেট থেকে তিনি সোনার সিগ্রেট কেইস বা’র করলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘Clean case of tuberculosis’.

কথাটা শুনে রোমাঞ্চ হ’লো। যেন এ খবরটা জানবার জন্যেই একটা গল্পের সম্পূর্ণ উপার্জ্জন তাঁকে দক্ষিণা দিয়েছি। মুখে বললুম, ‘তা জানি। এখন কী করতে হবে বলুন।’

এর পরে ডাক্তার সিগ্রেট ধরিয়ে কতগুলো পারিভাষিক শব্দ বহুল কথা বললেন। মুগ্ধ হ’য়ে আমি শুনতে লাগলুম এবং দেখতে লাগলুম। লোকটি বেঁটে, মোটা এবং গৌরবর্ণ। মাথার চুল জর্মানদের মত ছোট করে’ ছাঁটা। ছোট ছোট নীচ চোখ ব্লন্ড একটুখানি গোঁফ। গাল দুটি আপেলের মত টুকটুক্‌ করছে। নিখুঁত নখগুলো যেন রক্তে ফেটে পড়ছে। সব জড়িয়ে তাঁর অতি প্রিয় ক্যাশিয়মের জীবন্ত বিজ্ঞাপন। কথা বলতে বলতে তাঁর বুকের সোনার চেন কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো; স্ফীততরো ও রক্তিমতরো হ’য়ে উঠতে লাগলো তাঁর গণ্ডদেশ।

সব শুনে আমি বললুম, ‘কিন্তু এখন কি কিছু করবার আছে?’ ডাক্তারবাবু গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন। ট্রিটমেন্ট অবিশ্যি করতে হবে ক্যাশিয়ম্ ইনজেকশন তা ছাড়া আর কোনো ওষুধ নেই। আর যে সব নিউ ফ্যাঙ্গল্ড্ ট্রিটমেন্ট বেরিয়েছে আমি তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলুম, ‘ইনজেকশন কি অনেকগুলো দিতে হবে?’

‘সে এখন কী করে’ বলি। কিন্তু’, ডাক্তারবাবু কথাটার গুরুত্ব স্ফুটতরো করবার জন্য মোটা, শাদা আঙুল দিয়ে তাঁর কোটের বোতামের উপর তিনবার টোকা দিলেন, ‘কিন্তু সবার আগে দরকার এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়া।” তিনি ঘোরতর অসমর্থনসূচক দৃষ্টিতে চারদিকে একবার তাকালেন, ‘এ রকম রাস্তার উপর এ রকম বাড়িতে বাস করলে যক্ষ্মা না হওয়াই যে আশ্চৰ্য্য।’

আমি চুপ করে রইলুম। এ রকম রাস্তা এবং তা’র উপর এ রকম বাড়ি থাকতে দেয়াই যে অন্যায়, কিন্তু যতদিন তা থাকে, কোনো না কোনো মানুষ সেখানে বাস করবেই, এ প্রসঙ্গ ধরে’ সে সময়ে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে সমাজনৈতিক তর্ক করা সম্পূর্ণ নিষ্ফল হ’তো।

“হ্যাঁ”, ডাক্তারবাবুর ক্যাশিয়ম পুষ্ট গণ্ডদেশে ঘাম চিক্‌চিক্‌ করছিলো, রুমাল দিয়ে একবার মুখটা মুছে নিয়ে তিনি বলতে লাগলেন, ‘আসল কথা হচ্ছে এ বাড়ি ছেড়ে যাওয়া, কলকাতার বাইরে যাওয়া। নয় তো”, সিগ্রেটটা ফেলে দিয়ে তিনি জুতোর নিচে মাড়িয়ে দিলেন, ‘কিছুই এঁকে বাঁচাতে পারবে না nothing on earth. Nothing on earth.’ একটু জাঁকালো গলায় তিনি আবার বললেন। ‘গম্ভীর, এমন কি বাই দি ওয়ে, আপনি রোগীর কে হন্?’

‘ও আমার এই, ও আমার বন্ধু আর কি।’

‘ও, ফ্রেণ্ড।’ ডাক্তারবাবু একটু যেন সন্দিগ্ধচোখে আমার দিকে একবার তাকালেন, ‘তা শিগগিরই ব্যবস্থা করে’ ফেলুন। Lose no time. গোপালপুর অন সী আজকাল খুব ভালো, ফ্রেশ জায়গা, বেশি রোগীর আমদানি হয় নি এখনো। আমার অনেক পেশেন্ট গোপালপুর গিয়ে ভালো হয়েছে। I never recommend Puri. It had had too much of T. B. in its time. হ্যাঁ, গোপালপুর। বেশ ভালো দেখে একটা বাড়ি নেবেন একেবারে সমুদ্রের উপরে হ’লেই ভালো। Ozone. Ozone is life. ঘাবড়াবেন না, আপনার বন্ধুর সেরে ওঠবার চান্সই বেশি এর চেয়ে অনেক খারাপ কেইস আমি সারিয়েছি but lose no time. এ উইকের মধ্যেই দু’টো ইনজেকশন দেবো প্রথমটায় আঠারোটা দিলেই যথেষ্ট, আর তা’র পরেই ’ ডাক্তারবাবু গাড়িতে উঠে বসলেন। ‘And make him feel happy in whatever way you can. Nothing like happiness to cure consumption… আচ্ছা, কাল একবার আসবেন। বাড়িতে আমার আওয়ার্স হচ্ছে সেভেন টু নাইন ইন দি মর্নিং।’

আমি ফিরে যেতে ভবভূতির মা বিশেষ উদ্বিগ্নভাবে নয় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী বললে ডাক্তার?’

আমি বললুম, ‘আপনারা কিছুদিন না হয় ওকে নিয়ে দেশে গিয়ে থাকুন না। ডাক্তার বললে, কিছুদিন খোলা হাওয়ায় থাকলেই সেরে যাবে।’

‘দেশে গিয়ে কোথায় থাকবো বাবা’, ভবভূতির মা যেন একটু বিরক্তই হলেন, ‘বাড়ি ঘরের যা অবস্থা। যদ্দিন না বিভুর চাকরি হয়েছিলো, ছিলুম আর কি কোনোরকমে। এখন আবার কে ফিরে যেতে চায় সেই সাপ খোপ জঙ্গলের মধ্যে, বলো। তা ছাড়া বয়েস হয়েছে, কবে চোখ বুজি ঠিক নেই, গঙ্গা ছেড়ে আমি যেতে পারবো না।’

তিনি যে পুণ্যের লোভে বসে আছেন তা যে তাঁর পুত্রের কপালেই আগে জুটবে, সে খবরটা গোপন করে বললুম, ‘ডাক্তার বলছিলো দেশে গাঁয়ে গিয়ে কিছুদিন থাকলেই ’

‘ওঃ, রেখে দাও ডাক্তার ব্যাটাদের কথা। অমন দুটো চারটে বোলচাল না ঝাড়লে ওদের ব্যবসা চলবে কেন? দেশে গিয়ে থাকো! এদিকে চাকরিটি যে মাথায় উঠবে, তা’র কী হবে শুনি? ডাক্তার দেবে চাকরি? খামোকা তুমি ডাক্তার ফাক্তার ডাকিয়ে অত হাঙ্গামা করতে গেলে। আমি কালই কালিঘাট গিয়ে নৈবিদ্যি ফুল এনে ওর মাথায় দেবো এখন শিগগির শিগগির ও আবার চাকরিতে যেতে পারলেই হয়।”

কালিঘাটের ফুলই, তা হ’লে। হোক্, কালিঘাটের ফুল যতক্ষণ শান্তি দিতে পারছে, তা ই বা মন্দ কী? আমি আমার সমস্ত বুদ্ধি নিয়ে তো তা পারি নে।

তবু একেবারে ছেড়ে দেবার আগে, নেহাৎই নিজের স্বভাবের দোষে একবার যাদবপুরে চেষ্টা করলুম। সেখানে তিনটিমাত্র বিনিপয়সার বিছানা, সেগুলো সারা বছরের মধ্যে একদিনের জন্যও ফাঁকা থাকে না। একজন রোগী মরবার কি খালাস পাবার সঙ্গে সঙ্গেই আর একজন জায়গা নেয়; অনেকদিন আগে থেকেই দরখাস্তর তাড়া অপেক্ষা করতে থাকে। অসম্ভব। আর পয়সা দিয়ে? সে আরো বেশি অসম্ভব।

এর পর আর কিছু করবার রইলো না। দিন কেটে যেতে লাগলো। দিনের পর দিন, সেই স্যাঁৎসেঁতে, অন্ধকার একতলার ঘরে, একটু একটু করে’, স্পষ্ট, প্রত্যক্ষভাবে ভবভূতি মরতে লাগলো। উপলব্ধি করলুম, ওর শরীরের আরামের চাইতে এখন আত্মার শান্তির চেষ্টা করাই বেশি বিবেচনার কাজ।

শয্যাগত অবস্থায় ওর প্রায় দু’ মাস কেটে গেলো। ছুটি আর টানা যায় না, ছাড়ানপত্র এলো আপিস থেকে। ভবভূতির মা শোকে আকুল হলেন। আমি তাঁকে যথাসাধ্য সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে’ বললুম যে ও একবার ভালো হ’য়ে উঠলে এমন অনেক চাকরি ইত্যাদি। বৌয়ের গায়ে সামান্য যা গয়না ছিলো, যেতে আরম্ভ করলো। নিজের উপর স্রেফ ডাকাতি করে’ আমি খুচরো এটা ওটা চালাতে লাগলুম। কী আশ্চৰ্য্য, মনে মনে আমি বললুম, ওর পরিবারকেও সর্ব্বস্বান্ত না করে’ কি ও ছাড়বে না? এইবার শেষ হ’য়ে গেলেই তো পারে। ও মরে’ গেলে ওর পরিবারের কী অবস্থা হবে তা ভাববার সাহস আমার কখনো হয় নি। সবটারই সীমা আছে।

একদিন ভবভূতি বললে, ‘তোমার কী মনে হয় রামতনু, আমি বাঁচবো না?’

‘এ সব কথা তোমার মাথায় ঢোকায় কে?’ আমি হাসবার চেষ্টা করলুম।

‘না, না, আমার কাছে লুকোচ্ছো কেন? আমি বুঝি, সবই বুঝি। আর বেশিদিন আমি নেই।’ ভবভূতি চোখ বুজে একটু চুপ করে’ রইলো। তারপর আস্তে আস্তে বললে, ‘কিন্তু, রামতনু, মরবার আগে আমার একখানাও যদি বই বেরুতো!’

‘সে জন্যে তুমি এত ব্যস্ত হচ্ছে। কেন? আগে ভালো হ’য়ে ওঠো, তারপর ’

‘যদি ভালো না হই? মরবার পর আমার লেখার কী হবে আর না হবে তা তো আমি দেখতে আসবো না। তা’র আগে তুমি যে কোনোরকম করে’ একখানা বই কি বা’র করে’ দিতে পারো না?’ মুমূর্ষুর দৃষ্টির সমস্ত ক্লান্ত করুণতা আমার মুখের উপর এসে নিপতিত হ’লো।

তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিয়ে আমি বললুম, ‘কী যে তুমি বলো তা’র ঠিক নেই। অবিশ্যি তুমি যদি চাও আমি আবার চেষ্টা করে’ দেখতে পারি ’

‘দ্যাখো না, তা ই একটু দ্যাখো না। এবার হয় তো হ’য়েও যেতে পারে। আমার একটা বইও যদি ছাপা হ’য়ে বেরিয়েছে, দেখতে পেতুম ’ নিছক শারীরিক ক্লান্তিতে ও কথাটা শেষ করতে পারলে না।

‘আচ্ছা, দেখি চেষ্টা করে’, আমি বলতে বাধ্য হলুম। ওর কণ্ঠস্বরে মিনতির যে অপরিসীমতা ছিলো তা সহ্য করা কোনো রক্ত মাংসের পক্ষে সম্ভব নয়।

আর সত্যি সত্যি, সেদিন ওর বাড়ি থেকে বেরোবার সময় হাতে করে’ নিয়ে এলাম এক পাণ্ডুলিপিও নিজেই সেটা বেছে দিলে (ওর সমস্ত রচনাস্তূপ ভাঙা, ডালাহীন একটা পোর্টম্যান্টওয় ঠাসা হ’য়ে ওর তক্তপোষেরই এক পাশে থাকতো ওর হাতের কাছে! এই রোগযন্ত্রণার মধ্যেও যখনই একটু সজীব বোধ করতো, সেগুলো দেখতো নাড়াচাড়া করে’)।

পরদিন গিয়ে আমি হাসিমুখে বললুম, ‘শুভ সংবাদ।’

‘নিয়েছে?’ ভবভূতির সমস্ত মুখে এক আশ্চর্য্য দীপ্তি ছড়িয়ে পড়লো। সেই মুহূর্তে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে সার্থক মনে হ’লো আমার এতদিনকার নির্লজ্জ নির্দয় প্রতারণা। ‘নিয়েছে?’ প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করতে তা’র গলা একটু কেঁপে গেলো, ‘কে নিলে?’

‘ছোট এক পাব্লিশার’, আমার সব উত্তর প্রস্তুত ছিলো, ‘এখন কিছু দিতে পারবে না, বললে লাভের আদ্ধেক ’

‘তা হোক্‌, তা হোক’, ভবভূতির জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে, দ্রুত, অনিয়মিত, কথাগুলো যেন দৌড়তে গিয়ে হোঁচট খেয়ে খেয়ে বেরুচ্ছে তার মুখ থেকে, ‘লাভ আমি আশাও করি নে। বই তা হ’লে ওরা বা’র করছে, সত্যি সত্যি করছে? কবে করবে?’

‘এই, পূজোর আগেই’, অনায়াসে আমি বললুম, কেননা ভবভূতি যে পূজো অবধি টিকবে, সে সম্ভাবনা খুবই কম বলে’ জানতুম।

তারপর এলো কয়েকটা মত্ত জল্পনার দিন বইয়ের চেহারা কেমন হবে, কী রঙের হবে মলাটের কাপড়, পিছনে সোনার জলে নাম লেখার দস্তুর আজকাল আছে কি নেই, বইয়ের নাম আর পৃষ্ঠাসংখ্যা কোন্খানটায় কী রকম করে’ বসালে একেবারে অভূতপূর্ব্ব হয় ইত্যাদি আর ইত্যাদি। তারপর বই বেরোলে পরে আমার কোন্ সাহিত্যিক বন্ধুকে দিয়ে কোন্ কাগজে রিভিউ করানো যায়, সমালোচনাগুলোর শ্রেষ্ঠাংশ চয়ন করে’ কোনো কাগজে একটা বিনিপয়সার বিজ্ঞাপন চালিয়ে দিতে পারবো কিনা, প্রকাশকই বা কী রকম করে’ বিজ্ঞাপন দেবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বইয়ের নামটা ঠিক হ’লো তো? গোড়ায় একটা ভূমিকা লিখে দিলে কেমন হয়? অগ্রিম কতগুলো মতামত সংগ্রহ করে জ্যাকেটের উপর ছেপে দিলে মন্দ হয় কী? আমি অবিশ্রান্ত পরামর্শ দিলুম, আশ্বাস দিলুম, প্রতিবাদ করলুম। বইখানা যে আমার নামেই উৎসর্গীকৃত হবে এই সম্মানও আমি গ্রহণ করলুম যথোচিত বিনয়ের সঙ্গে। এমন কি, উৎসর্গ লিপিও আমার অজ্ঞাত রইলো না। ও আমাকে একদিন ছোট্ট এক টুকরো কাগজ দেখালে। তা’তে লেখা :

বঙ্গের সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক,
বহুদূরবিস্তারী যশের অধীশ্বর, অতুলনীয় লেখনীর অধিকারী,
নিরহঙ্কার, নির্ম্মলচিত্ত, স্নেহময়, হৃদয়বান, আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু
শ্রীরামতনু মজুমদারকে আমার এই দীন প্রচেষ্টা উৎসর্গ করিয়া ধন্য হইলাম।

এ লিপি কখনো প্রকাশিত হ’লে গলায় দড়ি দিতে হ’তো; সে সম্ভাবনা নেই বলে’ই ধৈর্য্য ধারণ করতে পারলাম। মুখে বললাম, ‘এত কী লেখবার দরকার ছিলো।’

‘না, না’, ভবভূতি আকুলস্বরে বলে’ উঠলো, ‘থাক্, এই থাক্। আরো কত লেখবার ইচ্ছে ছিলো তুমি জানো না। এটা তুমি কালই দিয়ে এসো প্ৰকাশককে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *