আমার বন্ধু – ১

হেরিডিটির রহস্য চিন্তা করলে বিস্ময়ে মুগ্ধ হ’য়ে যেতে হয়; আমি যে লেখক হয়েছি, আমার জন্ম দিয়ে বিচার করতে গেলে এ ঘটনা অত্যন্ত আশ্চৰ্য্য, প্রায় অস্বাভাবিক ঠেকে। কারণ, আমার পিতৃকুল ও মাতৃকুলে, যতদূর জানা যায়, কারো কোনো আর্টের প্রতি কোনোরকম উন্মুখতা ছিলো না। উভয় দিকেই, নিরেট মধ্যবিত্ততা থেকে আমি জাত। যতদূর জানা যায়। কিন্তু জানা কতদূর ই বা যায়? যেখানে আমাদের জ্ঞান পৌঁছতে পারে না, সেই দূর অতীতে, শতাব্দীর পর শতাব্দী পশ্চাতে আমার কোনো পূর্ব্বপুরুষ হ’য়ে সেখানে আমি ছিলাম; এবং সেই পূর্ব্বপুরুষের হয় তো খানিকটা সৃষ্টিকারী ক্ষমতা ছিলো; সেই ক্ষমতা, ভ্রূণাবস্থায় ক্রোমোজোমদের অজ্ঞেয় বিন্যাসের ফলে আজ আমি পেয়েছি বহু শতাব্দী পর, সহস্র নর নারীকে অতিক্রম করে’ সেই ক্ষমতার বীজ কী করে’ যে আমার মধ্যে সঞ্চারিত হ’লো, সৃষ্টির এই রহস্য এমন যে আমাদের সর্বজ্ঞ বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান, তা এখনো উদ্ঘাটন করতে পারে নি। যে সম্ভাবনা লাখে একও নয়, তা ই পরিপূর্ণ হ’লো; সাহিত্যিক ক্ষমতা নিয়ে আমি জন্মালাম।

অবিশ্যি সে সম্বন্ধে সচেতন হ’তে জীবনের অনেকগুলো বছর কেটে গিয়েছিলো। জ্ঞান হ’বার সঙ্গে সঙ্গে কী করে’ যেন আমার মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হ’য়ে গিয়েছিলো যে সাংঘাতিক একটাকিছু হবার জন্য আমি উদ্দিষ্ট। কিন্তু সেই সাংঘাতিকত্ব যে সাহিত্যের দিকে হবে, তা উপলব্ধি করলাম সেদিন, হঠাৎ যখন ইংরিজি ভাষায় এক শোক গাথা রচনা করে’ ফেল্লাম। আমার বয়েস তখন দশ; নোয়াখালিতে ঠিক নদীর ধারে ভারি সুন্দর একটা বাড়িতে আমরা থাকতাম। নদীর ধারে বলছি কিন্তু গোড়ায় বাড়িটা ছিলো নদী থেকে মাইল খানেক দূর; দেখতে দেখতে মধ্যবর্ত্তী মাটি অদৃশ্য হ’লো; নদীটা ঘোড়ার মত লাফাতে লাফাতে বাড়ির দরজায় এসে দাড়ালো। শেষে এমন সময় এলো, যখন আর ও বাড়িতে বাস করা যায় না; নদীর হাতে বাড়িকে সমর্পণ করে’ আমাদেরকে সরে পড়তে হবে। ব্যাপারটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং শোকাবহ বলে’ আমার মনে বাজলো; ঈশ্বরের রাজ্যের উচ্ছৃঙ্খল অবিচারের প্রথম দৃষ্টান্তে মর্মাহত হলাম। লিখলাম সেই বাড়িকে উদ্দেশ্য করে’ ইংরিজিতে এক বিদায় পদ্য। যথাসময়ে এবং যথাক্রমে সে পদ্য হ’লো আবিষ্কৃত; আমার স্বজনবর্গ স্তম্ভিত হ’য়ে গেলেন। আমার এই অসামান্য কীৰ্ত্তিকে তাঁরা ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না; বুঝে উঠতে পারলেন না, কী করবেন আমাকে নিয়ে। তাঁরা উল্লসিত হ’লেন, উদ্‌ভ্রান্ত হ’লেন, গৰ্ব্বিত হ’লেন, সন্দিহান হ’লেন। মুহূর্তের মধ্যে দশ বছরের বালক আমি বাড়ির মধ্যে প্রধানতম ব্যক্তি হ’য়ে উঠলাম। দেখতে না দেখতে আমার কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো সেই ছোট শহরের সর্বত্র। নিজের সম্বন্ধে আমার ভীষণ উচ্চ ধারণার এমন একটা জলজ্যান্ত সমর্থন পেয়ে মনটা বেশ খুসি হ’য়ে উঠলো।

আমার কবি কীৰ্ত্তি যা’তে ওখানেই ক্ষান্ত না হয়, সেই উদ্দেশে আমার এক আত্মীয় আমাকে উপহার দিলেন এক খাতা হায় রে কালান্তক, মর্মান্তিক খাতা! অদম্য উৎসাহ ও অধ্যবসায়ে আমি লেগে গেলুম সেই খাতার শাদা পৃষ্ঠাগুলো ভরাতে; এবং সেই যে নেশা করলাম (কারণ, নেশা ছাড়া এটা আর কী?), আজ পৰ্য্যন্ত আমি তা’র দাসত্ব করছি; সাধ্য নেই, তা’র সর্পিল, বিষাক্ত আলিঙ্গন থেকে নিজকে মুক্ত করতে পারি। বরং, যত দিন যাচ্ছে, এ নেশা ততই কঠিন, ততই ভয়ানক হ’য়ে উঠছে। প্রথমে ছিলো, লিখতে ভালো লাগে; তারপর হ’লো, না লিখলেই খারাপ লাগে ; এখন হয়েছে, লিখতে ভালো লাগে না, আবার না লিখলেও খারাপ লাগে। নেশাখোরের এটা হচ্ছে চরম অবস্থা। মাতাল যে, একটা সময় আসে, যখন মদের কথা ভাবতেই তা’র ন্যক্কার হয়; তবু, সন্ধে হ’তেই তা’র বোতল আর গেলাশ নিয়ে বসা চাই। তেমনি, লেখবার কথা ভাবলে আমার এখন মনের মধ্যে যন্ত্রণা হ’তে থাকে কিন্তু উপায় নেই, তবু আমাকে বসতেই হয় কাগজ আর কলম নিয়ে; এবং আত্ম নিপীড়ন যত নিষ্ঠুর হয়, কোনো এক বিকৃত উপায়ে মন তা ই থেকেই উপভোগ নিঙড়ে বা’র করে। উৎকট উপভোগ! কত উৎকট, বুঝতে পারি নেশার হাত থেকে মাঝে মাঝে যখন প্রশান্ত বিরতি আসে। যদি কখনো প্রশান্ত বিরতি না আসতো! যদি আমাকে আদৌ এ নেশা পেয়ে না বসতো! কিন্তু দেরি হ’য়ে গেছে; বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে; এখন আর এ সব আক্ষেপ করবার সময় নেই।

যা বলছিলাম, সেই খাতা ভরিয়ে তোলবার চেষ্টায় ভীষণ উৎসাহে আত্ম নিয়োগ করলাম। মধুসূদন দত্তর মত, গোড়ায় মাতৃ ভাষার প্রতি আমার তাচ্ছিল্যের সীমা ছিলো না; পরিণত শৈশব পৰ্য্যন্ত ভালো করে’ বাংলা শিখি নি। কিন্তু মধুসূদনের অনেক আগেই বিভাষায় সাহিত্য রচনার মূঢ়তা আমি উপলব্ধি করেছিলাম; ইংরিজিতে ঐ আমার প্রথম প্রচেষ্টা এবং শেষ। আমার দ্বিতীয় প্রচেষ্টাই হ’লো বাংলায়; তার বিষয় এখনো আমার মনে আছে ছিলো ‘ঊষা’। পয়ারে, ত্রিপদীতে, মিলের পরে মিল দিয়ে দিয়ে, রোজ দু’একটি করে’ নিয়মিতরূপে আমার পদ্য রচনা চলতে লাগলো। ভেবে ভেবে আমি সব কাব্যোপযোগী বিষয় বা’র করতাম; সন্ধ্যা, নদী, তারা, চন্দ্র, সূর্য্য, ফুল, শিশু আমার কাব্য ছাগশিশু সদ্য উন্মেষিত দাঁত দিয়ে পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু পরখ করে’ দেখতে লাগলো। সৌভাগ্যবশত, বাল্যকালে আমাকে ইস্কুলে পড়ে’ সময় নষ্ট করতে হয় নি, প্রচুর সময় ছিলো আমার হাতে; অবাধ, অক্ষুণ্ণ, দিন থেকে দিন প্রবলতরো গতিতে পদ্যের পর পদ্য নিঃসৃত হ’তে লাগলো; কয়েক মাসের মধ্যেই খাতা উঠলো ভরে’।

ইতিমধ্যে একটা ব্যাপার হ’লো; আমার সাহিত্যিক জীবনের সেটাই সব চেয়ে প্রধান ঘটনা বলে ধরা যেতে পারে। আমার আর এক আত্মীয় আমাকে একখানা রবীন্দ্রনাথের চয়নিকা উপহার দিলেন। (চারুবাবুর চয়নিকা ছোট সাইজের, ইণ্ডিয়ান প্রেসের নিখুঁত ছাপার। হায় সেই অতীত স্বর্ণ যুগ, দশজনের ভোট কুড়িয়ে যখন চয়নিকা তৈরি হ’তো না, যখন জাঁদরেল আকৃতিতে, ভীম ওজনে, বিশ্বভারতী প্রেসের যত্নহীন ছাপায়, তারিখ কণ্টকিত, এ অ্যা র উচ্চারণের পার্থক্য চিহ্ন বিভূষিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য কেতাব চয়নিকা বেরুতো না!) সেই বই খুলে প্রথম পৃষ্ঠায় পড়লাম :

আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিলো প্রাণের ’পর

সঙ্গে সঙ্গে, আমার মনেও নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হ’লো। এক সকালবেলায়, দশ নম্বর সদর স্ট্রীটের বাড়ির ছাতে দাড়িয়ে সূর্যোদয় দেখতে দেখতে রবীন্দ্রনাথের পৃথিবীর মুখ থেকে একটা পর্দা উঠে গিয়েছিলো; আমার পৃথিবীর মুখ থেকেও পর্দা সরে গেলো, জীবনে প্রথম যেদিন রবীন্দ্র কাব্যের সংস্পর্শে এলাম। আমার চোখের সামনে সমস্ত সৃষ্টির এক আশ্চৰ্য্য রূপান্তর ঘটলো আকাশের রঙ, ঘাসের রঙ, মানুষের কথাবার্তা, হাসির শব্দ সব যেন এক গভীরতরো ইঙ্গিত নিয়ে আমার মনকে স্পর্শ করতে লাগলো। বদলে গেলো সমস্ত পৃথিবীর চেহারা; বদলে গেলাম আমি।

আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিলো প্রাণের ’পর

ভালো করে’ বোঝবার ক্ষমতা তখনো হয় নি; বিস্ময়ের আনন্দের বন্যায় যা আমাকে তখন একেবারে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো, তা হচ্ছে কবিতার ছন্দ, তা’র ধ্বনি, সঙ্গীত। উন্মাদনার মত সেই সঙ্গীত আমাকে অভিভূত করলো।

আনন্দময়ী মুরতি তোমার কোন্ দেব তুমি আনিলে দিবা
অমৃত সরস তোমার পরশ, তোমার নয়নে দিব্য বিভঙ্গ।

‘পতিতা’র প্রকৃত বিষয় বস্তু না বুঝেও এই সঙ্গীতকে ঘিরে আমার বালক মন অস্পষ্ট রহস্যের ইন্দ্রজাল বুনে চললো; আমার মনের মধ্যে তা’র অবিশ্রান্ত গুঞ্জন; সেই সঙ্গীতের অশরীরী সঞ্চরণে আমার সমস্ত দিন মদির হ’য়ে উঠলো। গৃহের মধ্যে, পরিবারের মধ্যে আমি একা এক গোপন জীবন যাপন করতে আরম্ভ করলাম; সুরের মায়াচক্রের মধ্যে স্বেচ্ছা বন্দী, আমি জীবনের প্রথম পূজার দেবতাকে আবিষ্কার করে’ ধন্য হ’লাম। চয়নিকা হ’য়ে উঠলো আমার কাছে একটা অফুরন্ত খনি; এত ঐশ্বর্য্য একসঙ্গে পেয়ে প্রথমটায় আমি কী রকম একেবারে দিশেহারা হ’য়ে উঠলাম। সেই যে রবীন্দ্র মোহে পড়লাম, তা থেকে নিজকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে আনতে অনেক, অনেকদিন কেটে গেলো। এখনো কি সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হ’তে পেরেছি? সন্দেহ হয়।

তখন প্রথম চয়নিকা পড়বার পর যা আরম্ভ হ’লো, সেই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত, পরিপূর্ণ আত্ম সমর্পণ, সেই দাস্য অনুকরণ ওঃ, তা’র তুলনা হয় না। যা কিছু আগে লিখেছিলাম, সব যে রাবিশ, নিতান্ত ছেলেমানুষি, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ মনে রইলো না। এগারো বছরের আমি মৃদু হাস্য করে’ দশ বছরের আমির পিঠ চাপড়ালাম। সদ্য গিরি গুহা মুক্ত ঝর্নার মত উচ্ছ্বসিত উৎসাহে ছুটলো আমার রবীন্দ্র জাগরিত কাব্যস্রোত। সমস্ত চয়নিকা বলতে গেলে গুলে গিলে ফেললাম; তারপর, বিপর্যস্ত, বিকৃত হ’য়ে সেই সব আমার কলমের মুখ দিয়ে বেরুতে লাগলো; শিশুর মুখ দিয়ে দুধ যেমন ছানা হ’য়ে বেরোয়। পড়লাম ‘শুধু অकारण, পুলকে ’; তৎক্ষণাৎ লিখে ফেললাম এই গোছের এক পদ্য :

আজি উজ্জ্বল আলোকে
আমার পরাণ আপনা হারায়ে
ছুটিছে ব্যাকুল পুলকে।

‘বর্ষা সন্ধ্যা’ পড়ে’ হঠাৎ মেঘাক্রান্ত রক্ত সূর্যাস্তের প্রেমে পড়ে গেলাম; লিখলাম :

আজকে শুধু তোমার হাতের মধুর পরশে
হৃদয় আমার ফুলের মত ফুটবে হরষে।

ইত্যাদি, ইত্যাদি। এমনি অজস্র। যখনই যে কবিতা পড়তাম, আমার মনের অপরিণত পাক যন্ত্র থেকে তা ছানা হ’য়ে বেরুতোই। খাতার পর কবিতার খাতা ফেঁপে উঠতে লাগলো। তখন পৰ্য্যন্ত ভাবি নি, কবি ছাড়া আমি আর কিছু হ’বো; গদ্য জিনিসটা যে কষ্ট করে’ কাগজের উপর কলম দিয়ে লেখবার উপযুক্ত, তা আমি মনে করতাম না। কিন্তু এমন সময় আর একটা অ্যাকসিডেন্ট ঘটলো। আমাদের পরিবার মহলের মধ্যে কয়েক দিন পর পর দুটো বিয়ে হ’য়ে গেলো। সেই ডবল বিয়ের উপলক্ষ্যে যত রাজ্যের বাংলা উপন্যাস আর গল্পের বই এসে পড়লো আমার হাতে; আমার কারণ, যে মহিলাদেরকে বইগুলো উপহৃত হয়েছিলো, সেগুলোর দিকে তাকাবার সময় তাঁদের ছিলো না অন্তত, তখন ছিলো না। বইগুলো আমি এক নিঃশ্বাসে পড়ে’ ফেললাম; ঢকঢক্‌ করে’ গিলে ফেললাম, বলা যায়। (প্রসঙ্গক্রমে, বাংলা কথা সাহিত্যে আমার যা কিছু পাঠ, তা’র অনেকটা সেই যাত্রায় হ’য়ে যায়; যেটুকু বাকি ছিলো ইস্কুলে থাকতে একবার অসুস্থ হ’য়ে মাস দুই রাঁচিতে কাটাতে বাধ্য হই হিনুবাসী কেরানিদের লাইব্রেরির অনুগ্রহে তা শেষ করে’ ফেলি।) বাংলা গল্পের একবার স্বাদ পেয়ে আমার মত বদলে গেলো; আরম্ভ করলাম গদ্য লিখতে। আমার সরস্বতী তখন খাতার কারাগারে ছট্‌ফট্‌ করতে লাগলেন; তাঁকে আরো প্রচুর ক্ষেত্র দেবার জন্য দরকার হ’লো এক হাতে লেখা মাসিকপত্র বা’র করা। সে পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর ছিলাম আমি; তা’র অন্তর্গত কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ব্যঙ্গকৌতুক, সাহিত্য সমালোচনা বেশির ভাগ জিনিস লিখতাম আমি; এবং আমার মত এত উৎসাহী পাঠকও তা’র আর ছিলো না। না একজন ছিলো, যে আমার সম্পাদিত সেই মাসিকপত্র বোধ হয় আমার চেয়েও বেশি উৎসাহ নিয়ে পড়তো; কারণ, প্রতি সংখ্যায়ই থাকতো তা’র দু’একটা লেখা। তা’র উপর, কাগজের প্রচ্ছদপট হ’তো তা’র আঁকা। বস্তুত, মাসিকপত্র পরিচালনায় সেই আমার প্রথম প্রচেষ্টায় সে ছিলো আমার সহকারী। তার নাম ছিলো তা’র জন্ম ও পারিপার্শ্বিকের পক্ষে একটু অসাধারণ ভবভূতি। জজকোর্টের টাইপিস্ট তা’র বাবা বোধ হয় কোনো এক প্রচণ্ড দুরাশার মুহূর্তে ছেলের এই নামকরণ করে’ ফেলেছিলেন; তারপর নিজের এই ভীষণ দুঃসাহসে নিজেই ভীত হয়ে প্রাঞ্জল, অভিমানহীন বিভু নামে ওকে ডাকতে আরম্ভ করেছিলেন। বিভু বলে’ই ওকে সবাই ডাকতো; কিন্তু, এমন যে ওর চমৎকার, জমকালো ভবভূতি নাম, যা কিনা ওর শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলা যায়, তা অব্যবহারে লুপ্ত হ’য়ে থাকবে, আমি এই অবিচারের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই বিদ্রোহ করেছিলাম। আমার কান তখন থেকেই তৈরি হ’য়ে আসছিলো; একটা ধ্বনিময় শব্দ পেলে আমি অস্পষ্টভাবে তা’কে চিনতে পারতাম; তাই আমি করলাম ওর নামের উদ্ধার সাধন।

ভবভূতির সেই ছেলেবেলাকার চেহারা আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। কালো, রোগা মত এক ছেলে, মাথায় ছোট ছোট চুল; মুখে এমন কোনো বিশেষত্ব ছিলো না, যা উল্লেখ করা যায়। শুধু ওর চোখের দৃষ্টি ছিলো ভীত, অসহায় গোছের, একটু নির্ব্বোধ, একটু করুণ। তখন অতটা লক্ষ্য করতাম না, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সব সময় ওকে এক বেশে দেখতাম; পরণে নীল একটা হাফ প্যান্ট, বেল্টের অনেকটা অংশ পিছন দিকে লেজের মত ঝুলছে; গায়ে খাকি একটা শার্ট। ওর পকেট ভর্তি থাকতো ছোট বড় নানা রকম মার্বেল; মার্বেল খেলায় ও ছিলো নোয়াখালি শহরের চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু তা নিয়ে ওর এতটুকু গর্ব্ব ছিলো না; কোনো বিষয়ে গর্ব করবার ক্ষমতাই ওর ছিলো না। ও ছিলো সেই ধরণের মানুষ, জন্ম থেকেই যা’রা বিনীত, যা’রা আনত, নিজের ক্ষুদ্রতা বোধকে যা’রা কোনোরকমেই কাটিয়ে উঠতে পারে না, চায়ও না; অগৌরবের তমিত্রায় লুপ্ত হ’য়ে থাকা যাদের সব চেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। মার্বেল খেলার সখ আমারও খুব ছিলো, কিন্তু ক্ষমতা ছিলো না উপরন্তু, অক্ষমের অভিমান ছিলো। ভবভূতির সঙ্গে খেলতে গিয়ে বারে বারেই আমি বিশ্রীরকম হেরে যেতুম; যত হারতুম, ততই জেদ চড়ে যেতো। কখনো কখনো, আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে ভবভূতি আমাকে ইচ্ছা করে’ জিতিয়ে দেবার চেষ্টা করতো; এবং সে অপমান পরাজয়ের চেয়েও নিষ্ঠুর হ’য়ে আমার মনে লাগতো; রাগ করে’ আমি ওর সঙ্গে ঝগড়া করতুম। আমি আহত হয়েছি, এই আশঙ্কায় ওর চোখের দৃষ্টি আরো ভীত, আরো অসহায় হয়ে উঠতো; তখন যদি কেউ ওকে বলতো যে মার্বেল নিক্ষেপে অমোঘ ওর আঙুল কেটে ফেললে আমি তুষ্ট হ’বো, ও বোধ হয় অনায়াসে তা ই করতে পারতো।

কারণ, ভবভূতি ছিলো আমার প্রথম ভক্ত পাঠক; শুধু তা ই নয়, আমার শিষ্য, আমার উপাসক। আমার দিগ্বিজয়ী সাহিত্যিক কীর্ত্তির কাছে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে, সম্ভ্রমে ও একেবারে আত্মহারা হয়ে পড়তো। আমার দুটো পদ্য কলকাতার মাসিকপত্রে ছাপা হয়েছে, সত্যি সত্যি ছাপা হয়েছে! আমি দস্তুরমত বড়দের মত বিছানায় শুয়ে মুখ বুজে ইংরিজি গল্পের বই পড়ি! ওঃ ভবভূতির পূজা, তা ছিলো যেমন অযাচিত, তেমনি সম্পূর্ণ, নিঃসংশয়। শুধু ওর চোখে নয়, ওর পরিবারের চোখেও আমি ছিলুম ছোটখাটো একটি গড। ওর বাবা নিজে লেখাপড়ায় বেশিদূর এগোতে পারেন নি; ভবভূতিও ইস্কুলের পরীক্ষাগুলো অতি কষ্টে পাশ করে’ যাচ্ছে মাত্র, তা ও কখনো কখনো করে না (অথচ, পড়াশুনো করতে ও যে অবহেলা করে তা নয়; বরং রোজ সকাল সন্ধ্যায় বই পত্র নিয়ে বসে’ অ্যা অ্যা সুর করে’ ঘাড় দুলিয়ে দুলিয়ে পড়া মুখস্থ করে)। ওর বাবা, তাই, আমার সঙ্গে ওর বন্ধুতাকে একটা পরম শুভ ঘটনা বলে’ গ্রহণ করেছিলেন; অনেক সময় আমাকে মুখ ফুটে বলতেন : ‘সবাই তোমার মত হবে, তা তো আর আশা করা যায় না; তবে তোমার সঙ্গে থেকে ছেলেটার যদি কিছু হয়! তুমি ওকে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়ো।’ আমি ফ্ল্যাটার্ড হতাম, লজ্জিত হতাম, একটু যে গর্ব অনুভব না করতাম, তা ও নয়। ওদিকে ভবভূতি এ কথায় লেশমাত্র অবমাননা বোধ করতো না; বরং, আমার বন্ধুতা অধিকারের গৌরবে নিজকে ধন্য জ্ঞান করতো। আমি যে ওর বাড়ির লোকের কাছ থেকেই অতিরিক্ত সম্মান ও আদর পেতুম, তা’তে ওর মনে মুহূর্তের জন্য ঈর্ষার উদ্রেক হওয়া দূরে থাক, ওর সমস্ত অন্তরাত্মা আনন্দে জ্বলজ্বল করতো। কারণ, ঈর্ষা আমরা তাদেরকেই শুধু করি, যাদেরকে সমপদস্থ জ্ঞান করি। আমার পক্ষে ফোর্ড সাহেবের ঐশ্বর্য্য ঈর্ষা করা স্রেফ পাগলামি; তেমনি, ভবভূতি আমাকে ওর চাইতে এতই উঁচু স্তরের জীব বিবেচনা করতো যে আমাকে ঈর্ষা করার কথা স্বপ্নেও ওর কখনো মনে হ’তে পারতো না। আমার চোখ ধাঁধানো দীপ্তির মধ্যে নিজকে মিলিয়ে দেয়াই ছিলো ওর সর্ব্বোচ্চ সুখ।

তাই বলে’ এ কথা মনে করবার কোনো কারণ নেই যে ওর সঙ্গে আমার বন্ধুতার কোনোরকম ভেজাল ছিলো। ও ছিলো আমার নিতান্ত একনিষ্ঠ অনুচর, পার্শ্ববর্ত্তী ছায়া, তা ঠিক; কিন্তু তার চেয়েও বেশি সত্য এই যে আমি ওকে ভালোবাসতাম; ওকে না হ’লে কোনো কাজ আমার সম্পূর্ণ হ’তো না, মনের সব কথা বলতাম ওর কাছে। আমাদের ছিলো যেমন শৈশবের সব বন্ধুতাই হ’য়ে থাকে নিবিড়, অবিচ্ছেদ্য অন্তরঙ্গতা; কোনোকালে পরস্পরের ছাড়াছাড়ি তা যতই স্বল্পস্থায়ী, যতই সঘন পত্র ব্যবহারে বিকম্পিত হোক কোনোকালে যে ছাড়াছাড়ি হবে, তা মনে করতেই প্রায় চোখে জল এসে যেতো। তবে, এ বিষয়ে আমাদের কারো মনেই কোনো সন্দেহ ছিলো না যে মৃত্যু সভয়ে, পবিত্র রুদ্ধস্বরে আমরা কথাটা উচ্চারণ করতাম মৃত্যু পর্যন্ত আমরা বন্ধু থাকবো। ভবভূতিকে বলতাম ভবিষ্যতের জন্য আমার সমস্ত প্ল্যান; শুনতে শুনতে ওর চোখের ভীত, অসহায় ভাব কেটে গিয়ে তখনকার মত সেখানে এক আশ্চর্য্য উজ্জ্বলতা ফুটে উঠতো; বিহ্বল নিম্নস্বরে জিজ্ঞেস করতো, ‘তুই হাইকোর্টের জজ হ’বি হ্যাঁরে?’

তাচ্ছিল্যের স্বরে আমি বলতাম, ‘তা তো হ’বোই।’

‘হাইকোর্টের জজদের কী করতে হয়?’

সে বিষয়ে আমার মনেও খুব স্পষ্ট ধারণা ছিলো না; কিন্তু, আমার সাত পুরুষ যেন হাইকোর্টের জজিয়তি করেছে, এইভাবে আমি বলে দিতাম, ‘বাঃ, তা আর কে না জানে!”

এই ব্যাখ্যাতেই তৃপ্ত হ’য়ে ভবভূতি জিজ্ঞেস করতো, ‘কত মাইনে পায় তা’রা?’

‘ওঃ, ঢের!’

একটু ভেবে ভবভূতি বলতো, ‘পাঁচ শো?’

‘দূর বোকা। আমি আমার কল্পনাকে উদ্দাম করে’ ছেড়ে দিতাম, ‘হাজার হাজার টাকা।”

‘সেই কাজ তুই করবি!’ বিস্ময়ে, আনন্দে ওর চোখ যেন ফেটে পড়তো। মুহূর্তের এক ভগ্নাংশের জন্য সেখানে একটু সন্দেহের ছায়া পাতও হ’তো বোধ হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেই বিজাতীয় সংশয়কে যেন দুই হাতে ঠেলে’ ও বলে’ উঠতো, ‘করবি নিশ্চয়ই তুই জজগিরি করবি।’ এমনভাবে বলতো যেন কাজটা ঠিক আমার উপযুক্ত নয়। আমার যতটা বিশ্বাস না ছিলো, ভবভূতির ছিলো আমার উপর তার চেয়ে বেশি। শেষ পৰ্য্যন্ত, জজিয়তিটা আমার ফসকে যেতে পারে, এ রকম একটা সন্দেহ তখনই আমার মাঝে মাঝে হ’তো। সেই অনুসারে, আমি অন্য রকম প্ল্যান করতুম। কখনো বা বৈষয়িকতায় ক্লান্ত হ’য়ে সঙ্কল্প করতাম, সন্ন্যেসি হ’বো। কিন্তু নিয়ত পরিবর্তনশীলতার মধ্যে একটা উদ্দেশ্য আমার স্থির ছিলো; আমার সাহিত্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কখনো ব্যত্যয় হয় নি। এবং ভবভূতির কাছে সেই সব আশা আকাঙ্ক্ষার কথা উজাড় করে ঢেলে দেয়া আমাদের বন্ধুতার তা ই ছিলো উচ্চতম স্বর্গ। কত রবিবারের দুপুর মাসিকপত্র পরিচালনার উপলক্ষ্যে ভবিষ্যৎ রচনার দীর্ঘ, গোপন গুঞ্জনে কেটে গেছে। আমার সেই পত্রিকার মলাটে নানা রঙের কালি দিয়ে বিচিত্র সব চিত্র কী আনন্দ আর কত কষ্ট নিয়েই যে ও আঁকতো! চিত্রকলা সম্বন্ধে আমার রুচি বিকশিত হ’তে তখনো দেরি ছিলো; ও যা আঁকতো আঁকাবাঁকা লতাপাতায় ঘেরা পত্রিকার ও আমার নাম তা ই আমার তখন ভালো লাগতো; আন্তরিক প্রশংসা করতুম। আমার প্রশংসায় ও চঞ্চল, উদ্‌ভ্রান্ত অনেকটা আত্মহারা হ’য়ে পড়তো; এলোমেলোভাবে বলতো, ‘না না, এটা কিছুই হয় নি; সামনের মাসেরটা আরো ভালো করে’ এঁকে দেবো।” এখন বুঝতে পারছি, আমি যদি ওকে পর পর ছবির ফরমায়েস দিয়ে দশটা প্রত্যাখ্যান করে’, অনিচ্ছাসত্ত্বে একাদশটা গ্রহণ করতাম, যদি ছোটখাটো একটি অত্যাচারীর মত ওকে ব্যবহার করতাম, তা হ’লেই ও সব চেয়ে খুসি হ’তো।

ভবভূতির কার্য্যকলাপ ছবি আঁকাতেই সীমাবদ্ধ থাকতো; ও ও যে লিখতে পারে এবং সে লেখা, যে মলাটটা ও এত যত্নে এঁকে দেয়, তা’র ভিতরে স্থান পেতে পারে, এ কথা ভাববার দুঃসাহস ওর কখনো হ’তো না, যদি না আমি ওর মাথায় তা ঢুকিয়ে দিতাম। আমার বালক কালের সেই অবিবেচনার জন্য এখন মাঝে মাঝে অনুতাপ হয়। যদি সে জন্য না হ’তো, তা হ’লে ভবভূতি হ্যাঁ, দুঃখ পেতো কারণ পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে দুঃখের হাত থেকে নিস্তার নেই কিন্তু এতটা হয় তো পেতো না। তা হ’লে সংসারের সাধারণ সুখ দুঃখে, আশায় ব্যর্থতায় ও ও ওর জীবন একরকম করে’ কাটিয়ে দিতে পারতো আর পাঁচজন যেমন কাটায়। কিন্তু অজ্ঞাতে আমি একটা ভুল করে’ ফেলেছিলাম; অনেক বছর পরে সেই ভুলের ফল স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে গেলাম স্তম্ভিত হ’য়ে। সাধারণতার মসৃণ স্বর্গ থেকে ও ভ্রষ্ট হ’লো, এবং তা’র বদলে লাভ করলো কী? অপরিসীম হতাশা; তিক্ত, তিক্ত আত্ম গ্লানি। সাহিত্যিক হবার দুর্ব্বাসনা যদি ওর কখনো না হ’তো, তা হ’লে বিয়ে করে’, সন্তানোৎপাদন করে’, দীন অজ্ঞাততার আরামময় অন্ধকারে ও দিব্যি বসবাস করতে পারতো; এ কথা স্বপ্নেও ওর মনে হ’তো না যে কারো চাইতে ও খারাপ আছে বা ভাগ্য ওর উপর কোনো অবিচার করছে। দুঃখের পৃথিবীতে একজন লোকের অকারণে অসুখী হবার মূলে ছিলাম আমি, আমার অপব্যয়িত জীবনের এটা অন্যতম কুকাৰ্য্য।

যথাসময়ে ভবভূতি একদিন তা’র প্রথম সাহিত্যিক প্রচেষ্টা এনে আমাকে দেখিয়েছিলো সে যে কত লজ্জায়, কত ভয়ে ভয়ে, তা লক্ষ্য করে’ তখনই আমি মনে মনে হেসেছিলাম। জিনিসটা একটা পদ্য; পড়ে’ আমি খুব আন্তরিকভাবে নয় বলেছিলাম, ‘চমৎকার হয়েছে।” আমার সেই প্রশংসায় ভবভূতি এমনই অভিভূত হ’য়ে পড়েছিলো যে খানিকক্ষণ পর্য্যন্ত ভালো করে’ কথা কইতে পারে নি। তা’র পর থেকে আমার মাসিকপত্রের ও হ’য়ে উঠলো একজন নিয়মিত লেখক; ওর বাবা ছেলের এই আকস্মিক সাহিত্যিক প্রতিভা উদ্‌গমে উল্লসিত হ’য়ে উঠলেন; এবং আমার মত একজন তুখোড় ছেলের সঙ্গ লাভের কিছু না কিছু ফল যে ফলবেই, এ কথা চতুদ্দিকে প্রচার করে বেড়াতে লাগলেন। ছেলেবেলায়, আর যা ই হোক, সমালোচনার ক্ষমতা হয় না, কিছু দিনের মধ্যে ভবভূতির পদ্য আমার সত্যি সত্যি ভালো লাগতে আরম্ভ করলো। অবিশ্যি আমার মত নয় পাগল! তা ও কি কখনো হ’তে পারে? কিন্তু ঠিক আমার পরেই; শুধু আমার লেখার চেয়ে নিকৃষ্ট। এ বিষয়ে আমার মতের সঙ্গে ভবভূতির বিলক্ষণ ঐক্য ছিলো বলে মনে হয় : কারণ, যখনই আমি ওকে কোনো প্রশংসার কথা বলতুম, বিনা ব্যতিক্রমে ও বলে’ উঠতো, “তুমি যা লেখো, রামতনু, তুমি যা লেখো!” বা ঐ তাৎপর্য্যের অন্যকোনো কথা। যা কিছু আমি লিখতুম, ও উচ্ছ্বসিত হ’য়ে উঠতো; বলতো, ‘তুমি যা ই বলো, এ রকম আমি কখনো লিখতে পারবে না।” আসলে, আমি করতাম রবীন্দ্রনাথের প্যারডি, আর ভবভূতি করতো আমার প্যারডি। নকল করবার পক্ষে আমার চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ও খুঁজে পেলো না, এ থেকেই আমার বুঝতে পারা উচিত ছিলো যে সাহিত্যে ওর কিছু হবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *