৩
পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে সাধারণ কুশল জিজ্ঞাসায় প্রবৃত্ত হ’লাম। অনিচ্ছায়, ছাড়া ছাড়া ভাবে ও নিজের কথা বললে অবিশ্যি বলবারই বা কী ছিলো; ও যে এখন সওদাগরি আপিসের কেরানি, ওকে দেখে তা বলবার জন্য শার্লক হোম্স্ এর দরকার করে না। একবার ইণ্টারমিডিয়েট ফেল করে’ ওর পক্ষে আর দ্বিতীয় চেষ্টা করা সম্ভব হয় নি; ওকে শিক্ষা দান করতে ওর বাবার এমন যে উৎসাহ, তা ও মিইয়ে এসেছিলো। তিনি বাধ্য হয়েছিলেন এ সত্যটা স্বীকার করতে যে যতই না তিনি চেষ্টা করুন তাঁর জীবনের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা এ ছেলেকে দিয়ে পরিপূর্ণ হবার নয়। অপ্রিয়, নিষ্ঠুর সত্য কিন্তু এর হাত থেকে নিস্তার কোথায়? কত লোক তো নিতান্ত সাধারণ ঘরে জন্মে’ পৃথিবীতে তাদের নাম রেখে যায় তাঁর ছেলে কেন ও রকম হ’লো না? কেন? কেন? আশায় আকাঙ্ক্ষায় বিজড়িত আমরা মানুষ প্রশ্ন করি ব্যর্থতায়, বিদ্রোহে, অনুসন্ধিৎসায় প্রশ্ন করি : সমস্ত বিশ্ব নিরুত্তর। কেন যে তাঁর এত আশার ছেলে আর কিছু না হোক, অন্তত কৃতব্যি, অর্থশালী হবে না, নিজের জীবনে ব্যর্থ সেই বৃদ্ধ এই প্রশ্নের কোনো উত্তরই খুঁজে পান নি। কিন্তু সত্যকে এড়ানো গেলো না; পুত্রের জন্য বিদ্যার অনুধাবনে তিনি ক্ষান্ত হ’লেন। ভবভূতির কপাল ভালো ঠিক সময়ে তা’র একটা চাকরিও জুটে গেলো। ঢুকেছিলো পঁয়ত্রিশ টাকায়; এখন হয়েছে চল্লিশ। গেলো বছর, ছেলেকে তা’র চরম গৌরবে প্রতিষ্ঠিত দেখে ভবভূতির বাবা মারা গেছেন। এখন, বিধবা মা আর স্ত্রী পুত্র নিয়ে (চাকরি পেয়েই ভবভূতি বিয়ে করেছিলো) ও দর্জিপাড়ায় এক বাড়ি ভাড়া করে’ আছে। সংসারে দুঃখ কষ্ট, আপদ ঝঞ্ঝাট আমাদের সকলেরই আছে; ওর ভাগ্যেও তা’র অংশ জুটছে। ইচ্ছে করলে অবিশ্যি ওর জীবন নিয়ে ফেনিয়ে ফেনিয়ে এক স্যাঁৎসেঁতে দুঃখের গাথা রচনা করা যায়; কিন্তু সত্যি বলতে ও বেশ সুখেই আছে; ওর জীবনের উচ্চতম যা সম্ভাবনা, তা সফল হয়েছে; ওর জন্যে বিশেষরূপে দুঃখ করবার কী কারণ থাকতে পারে? ভবভূতির জীবনে এর বেশি কী আর হ’তে পারতো?
তবু, ওর সৌভাগ্যে মুখ ফুটে ওকে ঠিক অভিনন্দন করতে পারলাম না। বরং, ওর পাশে বসে’ নিজের জন্য যেন লজ্জাবোধ করতে লাগলাম। জীবনের ভারে মুয়ে পড়া, ক্লান্ত, বিক্ষতযৌবন ওর পাশে আমার বেশের পরিচ্ছন্নতা, মনের প্রফুল্লতা, আমার সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা, নিশ্চিন্ত লঘুচিত্ততা সব যেন ভাল্গার, অত্যন্ত ভাল্গার এমন কি, একটু অশ্লীল বোধ হ’তে লাগলো। ওর কথা শেষ হ’লে কী বলবো ভেবে না পেয়ে পকেট থেকে সিগ্রেট বার করে বললাম, ‘খাও।’
‘না, থাক।’
‘খাও না?’
‘তা নয় তবে, এখন থাক।’
‘খাও না একটা।’
‘আচ্ছা’, একটু ইতস্তত করে’ ভবভূতি বললে, ‘দাও তবে একটা।’ ঠোঁটের ওপর দু’ আঙুল ঠেকিয়ে শব্দ করে’ সিগ্রেটে টান দিয়ে বললে, ‘তুমি তো আজকাল রীতিমত ফেমাস্ হ’য়ে পড়েছো!’
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলুম, ‘পাগল ফেমাস্ আর কী!’
নীরবে আমার মুখে একটু তাকিয়ে ভবভূতি জিজ্ঞেস করলে, ‘সবসুদ্ধ ক’খানা বই হ’লো?’
যেন এটা মস্ত এক অপরাধের ব্যাপার, এই ভাবে, অস্পষ্টস্বরে আমি বললুম, ‘এই খান ছ’য়েক।’
‘বেশ আছো, মনে হচ্ছে। তা বেশ থাকবেই বা না কেন?’
‘বেশ! হ্যাঁ, বেশই তো আছি!” কণ্ঠস্বরে আমি অতিরিক্ত আয়রনি প্রকাশ করে ফেললুম, ‘চাকরি চাকরি করে’ পাগল হয়ে গেলুম, তবু একটা জুটছে না।’
‘কেন, তোমার আর চাকরির দরকার কী? বই লিখে টাকা পাও না?’
আমি কাঁধ ঝাঁকুনি দিলুম।
‘কোথায় যাচ্ছো এখন? চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে কোনো মেয়ের কাছে যাচ্ছো।’
ওর অনুমান যে একেবারে ভুল হয়েছিলো, তা নয়; মৃদু হেসে আমি চুপ করে রইলুম। একটু পরে, আমার পরিচ্ছন্ন বেশ, কেইস্ ভৰ্ত্তি সিগ্রেট, আমার সাহিত্যিক খ্যাতি, মুখের প্রশান্তি আর এই সন্ধ্যায় কোনো অস্পষ্ট, রহস্য অতিরঞ্জিত মেয়ে বন্ধুর কাছে যাত্রার প্রায়শ্চিত্ত করবার চেষ্টায় আমি বললুম, ‘বিয়ে করে’ কেমন আছো?’
ভবভূতি আড়ভাবে আমার মুখের দিকে তাকালে; প্রশ্নটা যেন ঠিক বুঝতে পারলে না।
‘যা ই বলো’, প্রায়শ্চিত্তে স্থিরপ্রতিজ্ঞ, আমি আবার বললুম, ‘স্ত্রী থাকলে জীবনের রঙই বদলে যায়।’
ভবভূতি মুহূর্ত্তকাল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর বললে, ‘তুমি তা হ’লে বিয়ে করো নি কেন?’
‘করবো’, সঙ্গে সঙ্গে আমি জবাব দিলুম। তা ছাড়া আর কোনো জবাব দেয়া সম্ভব ছিলো না। আমি যদি বলতুম, বিয়ে করলে চলবে কী করে’ ক্লান্ত, বিবর্ণ ভবভূতির পাশে, তা’র নিষ্প্রভ, অসহায় দৃষ্টির নিচে বসে সেটা নিছক বর্বরতা হ’তো। ওর দাম্পত্য জীবন ওরই চোখে রঙিন করে তোলবার জন্য আমার নিজেরই পরিণয়ে ঔৎসুক্য দেখানো ছাড়া উপায় ছিলো না। নিজের সুখীত্বে লজ্জিত, আমি চেষ্টা করতে লাগলুম ওকে ওর নিজের কাছে সুখী বলে’ উপস্থাপিত করতে। তা’তে যেন আমার খানিকটা নৈতিক সমর্থন।
‘কবে?’
‘শিগগিরই’, মুহূর্ত্তকাল দ্বিধা না করে’ আমি বললুম। বিবাহিত জীবনের পবিত্র আনন্দ সম্বন্ধে চেষ্টা করলুম মনকে ফেনিয়ে তুলতে। খেলাটা আমার কাছে একটু মজার লাগতে আরম্ভ করেছিলো।
একটু চুপ করে’ থেকে নিম্নস্বরে, কোনো গভীর, গোপন কথা জিজ্ঞেস করবার ধরণে ভবভূতি বললে, ‘কাকে?’
‘আছে একজন।’ আমার কণ্ঠস্বর, আমার বলবার ভঙ্গী ইঙ্গিত করলে একটা আবেগ ঘন রোমান্সের প্রতি। ভবভূতি যা শুনতে চায়, প্রাণ ধরে’ তা না বলে’ পারলুম না।
‘কে সে?’ ভবভূতির ক্লান্তি ধূসর, জীবন রেখাঙ্কিত মুখ মুহূর্ত্তের জন্য কৌতূহলে দীপ্ত হ’য়ে উঠলো।
‘আছে’, এ ছাড়া কী বলা যায় আমি ভেবে পেলুম না। দপ করে নিবে গেলো ওর মুখ : অবৈধ কৌতূহল প্রকাশ করে ফেলবার জন্য ও যেন সমস্ত শরীর দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে। মনে মনে আমি বিব্রত হ’য়ে পড়লুম, দুঃখিত হলুম। তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলুম, ‘তোমার স্ত্রী কেমন?’
‘কেমন আবার।’
‘কেমন দেখতে?’
‘কী যেন।’
ওর কুণ্ঠা অপসারণ করবার চেষ্টায় আমি বললুম, ‘বেশ ভালো ?’
‘কী যেন’, ভবভূতি এইবার একটা অদ্ভুত কথা বললে, ‘ভালো করে তাকিয়ে দেখি নি।’
কথাটা হাতুড়ির বাড়ির মত আমার মনের উপর এসে পড়লো। ভবভূতিকে প্রেমিকরূপে কল্পনা করা সোজা নয়; হৃদয়াবেগের তীব্রতায় ও আলোড়িত, উন্মথিত হচ্ছে, এমনতরো দুরাশা নাকরবার জন্য অসাধারণ বিচক্ষণ হ’তে হয় না, কিন্তু তাই বলে’ এই! ভালো করে’ তাকিয়ে দেখি নি! এই অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় উদাসীনতায়, মূঢ়তায়, আত্মার এই মৃতত্বে আমি স্তম্ভিত হ’য়ে গেলুম। আর যা ই হোক, মনে মনে আশা করবার সাহস আমার হয়েছিলো, আর যা ই হোক, যৌবনের একটা স্বধর্ম্ম তো আছে পুঞ্জীভূত ব্যর্থতা, দিন থেকে দিনে নিরবচ্ছিন্ন আত্মবিলোপকারী দীনতা অতিক্রম করে’ একটা জায়গায়, কোনো একটা জায়গায় যৌবন নিশ্চয়ই ঝলসে উঠবে তরবারির মত দীপ্ত। আমি চেয়েছিলুম সেই জ্যোতিরপভ্রংশ উন্মোচন করতে, প্রাত্যহিক তুচ্ছতারাশিতে শৃথ্বীকৃত এই ভবভূতির অন্তরের সেই সঙ্গোপনতায় প্রবেশ করতে, যেখানে কেবল তা’র যৌবনেরই জোরে সে রাজা। কিন্তু আমার ভুল হয়েছিলো : ভবভূতির যৌবন তা শুধু একটা ঐতিহাসিক তথ্য, তার বেশি কিছু নয়। সে সেই দুর্ভাগাদের একজন, যা’রা জাতবৃদ্ধ যারা কখনো, এক মুহূর্তের জন্যও জ্বলে’ ওঠে না, আন্দোলিত হ’য়ে ওঠে না ক্ষণিক বসন্তে একবারের জন্যেও অন্যায় করবার দেব অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হয় না, নিজকে কল্পনা করে না দেবতা বলে’ । প্রথম যৌবনে ওকে আমি দেখেছিলুম; সেই একটা সময় সমস্ত স্বর্গ যখন মানুষের আত্মায় পুষ্পিত হ’য়ে ওঠে তখনও ভবভূতি ওর দীনতার, নগণ্যতার স্তূপে আত্ম অপসৃত। আমার বোঝা উচিত ছিলো, আঠারো বছর বয়েসেও যে মানুষ নিজকে একবার ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতে পারলে না, তা’র মত দুর্ভাগা কেউ নেই।
কিন্তু তখনও আমার জানতে বাকি ছিলো যে যে ভবভূতি তা’র স্ত্রীর দিকে কখনো ভালো করে’ তাকিয়ে দ্যাখে নি, সে ও সে ও কল্পনা করছে অর্দ্ধ অচেতন নির্ঝ দ্ধিতার আচ্ছাদনে ধিকিধিকি জ্বলছে তা’র কল্পনা স্বপ্ন দেখছে এক জ্যোতির্ম্ময় অমরত্বর, সাহিত্য অমরাবতীর কালাতীত, চিরন্তন দেবত্বের। কিন্তু তা’র মূলে যৌবনের প্রেরণা নয়, তা উৎসারিত নয় প্রাণশক্তির অদম্য আগ্রহ থেকে। তা একটা অবিচল, অন্ধ ধারণা আত্মার একটা সর্ব্বনেশে ক্ষয়রোগ; ভবভূতির আত্মাকে ব্যাধির মত তা হানা দিচ্ছে, তা তা’কে পেয়ে বসেছে নির্মমভাবে, দিন থেকে দিন ভবভূতিকে জীর্ণ করে’ নিচ্ছে নিজের মধ্যে।
কথাটাকে অন্যরকম মোচড় দিয়ে মুখে আমি বললুম, ‘যা’কে ভালোবাসা যায় তা’কে কি যথেষ্ট করে’ দেখা যায় কখনো?’
ভবভূতি ফ্যালফ্যাল করে সামনের আসনে উপবিষ্ট একটি লোকের ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি ঈষৎ লজ্জিত বোধ করলুম। কথাটা এমন অবান্তর, অসঙ্গত শোনালো : স্থূল, বিকৃতরুচি কোনো রসিকতার মত।
খানিকক্ষণ চুপচাপ কাটলো। তারপর গাড়ি যখন কলেজ স্ট্রীটে পড়েছে, ভবভূতি মৃদুস্বরে আরম্ভ করলে, ‘আচ্ছা, রামতনু ’ এইটুকু বলে’ই থেমে গেলো।
‘কী, বলো’, আমি চোখে মুখে যথাসাধ্য উৎসাহ ফুটিয়ে তুললুম।
‘আচ্ছা, তোমার সঙ্গে তোমার সঙ্গে তো অনেক প্রকাশকের জানাশোনা আছে না?’ চমকে উঠলুম। একটা উৎকট সন্দেহ আকস্মিক শ্বেত বিদ্যুতের মত সমস্ত মন দীর্ণ করে’ দিয়ে গেলো। এ ও কি সম্ভব? এ ও কি সম্ভব যে বাল্যকালের এক অসাবধান মুহূর্তে যে বিষ তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিলো সে জন্য দায়ী আমি, আমি! এখনো তা’র প্রতিক্রিয়া নিঃশেষ হ’য়ে যায় নি? এমনও কি হ’তে পারে যে তা’র এই দৈনিক আট ঘণ্টা, তা’র সমস্ত অবয়বের এই নীরব ক্লান্তি, মুখের আলোহীন ধূসরতা এই সব কিছু সত্ত্বেও ভবভূতি এখনো লেখে? যে ভবভূতির তা’র স্ত্রীর মুখের দিকে ভালো করে’ তাকিয়ে দেখবার সময় হয় না?
‘না থেকে আর উপায় কী’, ওর প্রশ্নের উত্তরে আমি বললুম।
‘তা হ’লে তা হ’লে আচ্ছা ধরো ’ ভবভূতি হতাশভাবে কথাটা শেষ করবার আশা ছেড়ে দিলে।
আমি ওকে সাহয্য করলুম, ‘কেন, তুমি কিছু লিখছো টিকছো নাকি?’
“হ্যাঁ, লিখছি তো অনেকদিন ধরে’ই”, তাড়াতাড়ি, রুদ্ধস্বরে যেন নিজের সঙ্গে বাজি রেখে ভবভূতি বলতে লাগলো, ‘এখন তোমাকে পেলুম তুমি যদি দয়া করে’ একটু দেখে দাও ’
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।’
‘তুমি বললে কেউ হয় তো একটা বই বা’র করতে রাজি হ’তে পারে?’
‘সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।’ কথাটা সত্যি, কিন্তু তা বলে’ই অনুতাপ হ’লো। ভবভূতির হয় তো মনে হ’তে পারে, আমি তা’কে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছি, তা’কে সাহায্য করতে অস্বীকার করছি। পরের মুহূর্ত্তেই, তাই, কৌতূহল প্রকাশ করে বললাম, ‘তোমার বই শেষ হ’য়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী উপন্যাস?’
‘উপন্যাস। গল্পও আছে।’
‘তোমার অনেক লেখা জমা আছে বুঝি?’
শীতের সকালে পুকুরে ঝাঁপ দেবার ধরণে ভবভূতি স্বীকার করে’ ফেললে চার পাঁচখানা বই হবার মত গল্প আর খান দশেক উপন্যাস তা’র বাক্সে জমা হ’য়ে আছে। একটা সে প্রকাশ করে’ দেখতে চায়। চায় না; বই বা’র করে দিলেই সে খুসি। এর ভিতর থেকে অন্তত প্রথমে সে কিছু টাকা
বজ্রাহত হ’য়ে আমি বললুম, ‘সে কী! তুমি এত লিখেছো? সময় পাও কখন?’
‘সময় ইচ্ছে করলেই করে’ নেয়া যায়। আপিস থেকে ফিরে রোজ কয়েক ঘণ্টা লিখি রাত্তিরে ভাত খেয়ে আবার অনেক রাত পর্য্যন্ত।’
‘রোজ?’
‘প্রায় রোজই।’
‘কী করে’ পারো? ক্লান্ত লাগে না?’
‘তা লাগে বই কি, কিন্তু না লিখেও পারি নে।’
মুগ্ধদৃষ্টিতে ভবভূতির মুখে তাকিয়ে আমি বলে উঠলাম, ‘আশ্চৰ্য্য! আশ্চৰ্য্য ক্ষমতা তোমার।’
‘আমার মনে হয় কী জানো, রামতনু’, নিম্নস্বরে পবিত্র, গোপন কথা বলার মত করে’ ভবভূতি বললে, তা’র ম্লান, ক্লান্ত চোখ মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হ’য়ে উঠলো, ‘মনে হয়, আমি যা লিখি, তা বোঝবার উপযুক্ত বাংলাদেশ এখনো হয় নি। আমার সময় যখন আসবে তখন আসবে। সেই জন্যেই মুহূর্তের জন্য আমি লেখা বন্ধ করে’ দেবার কথা ভাবি নে।’
“হ্যাঁ, তা তো বটেই।’ বলে’ আমি উঠে দাঁড়ালাম; আমার গন্তব্য স্থান এসে গিয়েছিলো।
‘তা হ’লে একদিন তোমার ওখানে যাবো, কী বলো?’
‘হ্যাঁ, যেয়ো।” আমি ওকে আমার ঠিকানা দিলাম।
‘সামনের রোববার কেমন?’
‘আচ্ছা।’
‘আমার সময় যখন আসবে, তখন আসবে’ কথাগুলো আমার মনের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হ’তে লাগলো। তাদেরকে চিনতে পারলুম আমারই কথা বলে’ অনেক বছর আগে, অসতর্কে, লঘুচিত্তে উচ্চারিত। কী হাস্যকর ধূসর, গম্ভীর মুখে, ভুরু ঈষৎ উত্থিত করে’ ডান হাতের তর্জ্জনী দিয়ে শূন্যে একটা মৃদু টোক দিয়ে ভবভূতি ও কথা বলছে! না ভবভূতির মুখে ও স্পর্দ্ধার কথা হাস্যকর পর্যন্ত নয়। তা নিয়ে তামাসা করা পর্য্যন্ত যায় না। আমি, তা হ’লে, ওকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিলুম যে ওর সাহিত্য এতই মহৎ যে তা’র জন্য আমাদের দেশ এখনো প্ৰস্তুত হ’তে পারে নি। ও সে কথা যে শুধু বিশ্বাস করেছে তা নয়, এই দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সে ধারণাকে সযত্নে লালন করেছে নিজের মনে, সেই বিশ্বাসের জোরে লিখে ফেলেছে চার পাঁচখানা বই হবার মত গল্প আর খান দশেক উপন্যাস। এমন অমানুষিক হিউমারহীনতা যদি পৃথিবীতে সম্ভব, তা হ’লে আমরা হাসবে কোন মুখে? রবিবার সকালে ও যখন আসবে, ওর সঙ্গে যে সব কথাবার্তা বলতে হবে, তা মনে করে’ তখনই আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এই ছেলেমান্ষি খেলা কত আর ভালো লাগে। বয়েস যখন কম ছিলো, এ থেকে একরকমের আমোদ পাওয়া যেতো, কিন্তু এখন তা কেবলই ক্লান্তিকর আর এমন অপরিসীমরূপে অর্থহীন! সব চেয়ে কি ভালো নয় তা’কে মুখের উপর স্পষ্ট করে’ বলা কিন্তু কেন? কী দরকার? পরমুহূর্তেই আমার মনে হ’লো, কী দরকার ওর মোহ ভেঙে দিয়ে? জীবনে এমনিতেও তো দুঃখের অভাব নেই। কেন নয় যদি ওর একটু ভালো লাগে, যদি ও একটু সুখী হয়? আর যা ই হোক, এতে তো কারো ক্ষতি হচ্ছে না কোনো।
তখন আমি ঐ রকম ভেবেছিলুম, কিন্তু পরে ও কথা মনে করে’ তীব্র আত্ম অভিশাপে আমার সমস্ত মন বিষিয়ে উঠেছিলো। তখনও হয় তো সময় ছিলো, তখনও ভবভূতিকে বাচাতে পারতুম। আমিই পারতুম। কিন্তু আমি নিজকে ছেড়ে দিলুম সেই ভালোমানুষির হাতে কালান্তক দুর্ব্বলতা!
রবিবার সকালে ভবভূতি যখন এলো, আমি তখনও বিছানায় শুয়ে। ঘড়িতে তখন যে সময়, সেটা ভদ্রব্যক্তির শয্যাত্যাগের লগ্ন অনেকক্ষণ অতিক্রম করে’ গেছে। আর ভবভূতি এতদূর থেকে এসে উপস্থিত হ’তে পারলো, আমার কিনা ঘুমই ভাঙে নি। দস্তুরমত লজ্জিত বোধ করলুম! প্রয়োজনাতিরিক্ত হৃদ্যতার সুরে বললুম, ‘আরে এসো, এসো।”
‘তোমার ঘুম নষ্ট করে’ দিলুম নাকি?’
‘পাগল ঘুম কখন ভেঙে গেছে, খামকা শুয়ে ছিলুম। বোসো।’
ভবভূতি বসে’ একবার চারদিকে তাকিয়ে বললে, ‘বাঃ বেশ ঘরটি তোমার।’
‘বাইরে থেকে দেখতে অমন ভালোই’, ভবভূতির সামনে নিজকে খর্ব করা আমার কর্ত্তব্য মনে হ’লো, ‘কিন্তু কত যে অসুবিধে এ বাড়ির ’ কথাটা একটা ইঙ্গিতময় অসমাপ্তিতে ফেলে রেখে আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‘তুমি চা খাও তো?’
‘অভ্যেস নেই ’
‘খাও না এক পেয়ালা।’
‘না না, থাক্ আচ্ছা দাও।”
যে কোনো তুচ্ছ জিনিস গ্রহণে ভবভূতির এ কুণ্ঠা একটা লক্ষ্য করবার জিনিস। সমস্ত জীবন বঞ্চিত, কিছুই ও সহজে নিতে পারতো না। ও জানতোই না চাইতে। পৃথিবীর সাধারণ জীবন সম্বন্ধে এর কোনো মোহ ছিলো না। সাহিত্যিক খ্যাতির অমরত্বের উপর চোখ, উপস্থিত ও পারিপার্শ্বিক জীবন থেকে এতটুকু পাবার যোগ্যতাও যে ওর আছে, এমন ধারণা ওর মনে স্থান পায় নি।
চা এলো। দুটো পেয়ালার চা ঢেলে আমি অলসভাবে মুড়মুড়ে খবরের কাগজের ভাঁজ খুললুম। ভবভূতি আমার তখনো ঘুমের নেশায় আরক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘কাল অনেক রাত জেগেছো বুঝি?’
‘শুতে শুতে আমার একটু দেরিই হয়।”
‘নতুন কিছু লিখছো?’
সত্যি বলতে, আগের রাত্রে যে উপলক্ষ্যে রাত জেগেছি সেটা সাহিত্যসৃষ্টি নয়। তবু মান বজায় রাখবার জন্যে বললুম, ‘হ্যাঁ, একটা গল্প…’
ভবভূতি একটু আড়ষ্টভাবে, কথাটা বলা উচিত হবে কি না হবে যেন মনে মনে এই বিচার করতে করতে জিজ্ঞেস করে ফেললো, ‘কত পাও একটা গল্পের জন্য?’
‘পাই!’ নিজের অদৃষ্ট সম্বন্ধে আমার অভিযোগ অসাধারণরকম তীব্র হ’য়ে উঠলো, ‘মুখে আনা যায় না। আমাদেরকে যা করতে হয় তা নিছক ক্রাইম।’ বলতে বলতে আমি চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিলুম, ‘খাচ্ছো না যে?’
ভবভূতি যেন আমার মুখের এই কথার জন্যই অপেক্ষা করছিলো যেন বাধ্যভাবে, নেহাতই আমার কথা রাখবার জন্যে সে পিরিচ থেকে পেয়ালাটা তুলে নিয়ে নীরবে চুমুক দিতে লাগলো। নীরবে বললুম এই অর্থে যে সে কথা বলছিলো না; কিন্তু তা’র ওষ্ঠাধর যখন পেয়ালার প্রান্তে সংযুক্ত হ’য়ে মুখের ভিতর চা টেনে নিচ্ছিলো, সেই মুহূর্তে যে শব্দ উৎপন্ন হচ্ছিলো কোনো সাধারণ মানুষ কথা বলতে অত আওয়াজ করে না। স্পষ্ট বুঝতে পারলুম ভবভূতি তা’র চা উপভোগ করছে। সশব্দে, গোলমেলে ভাবে বলা যায়, নিয়মিত দীর্ঘ চুমুকের পর চুমুক, ভবভূতি চা খেতে লাগলো। তা’র মুখে চোখে একটা তন্ময়তা; চুমুক দেবার আগে সে পেয়ালার মধ্যে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিচ্ছে! যেন প্রতিবার দেখে নিচ্ছে আর কতটা বাকি।
একটু পরে আমি বললুম, ‘বাঃ, ডিম টিম কিছু খাবে না?’
‘ডিম?’ ভবভূতি যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠলো।
‘খাও একটা’, নিজের অজান্তেই আমার বলার ধরণে আদেশের সুর ফুটে উঠলো। ‘খাও না’, দ্বিতীয়বার, মোলায়েম করে আমি বললুম।
হাতের পেয়ালাটা টেবিলের উপর রেখে সে খেলো ডিম যেন কোনো কর্ত্তব্য পালন করলে খেতে খেতে একটি কথা বললে না। তারপর পেয়ালার বাকি চা তেমনি দীর্ঘ, সশব্দ চুমুকে চুমুকে শেষ করতে লাগলো। আমি খবরের কাগজের ছবি দেখছিলুম; শব্দ থামতেই বুঝলুম তা’র চা শেষ হয়েছে। চোখ তুলে বললুম, ‘আর একটু চা?’
‘না, আর নয়।’
‘নাও একটু’, বলে’ সে দ্বিতীয়বার প্রতিবাদ করতে পারার আগেই তা’র পেয়ালা অর্দ্ধেক ভরে’ দিলুম। ‘এই এই হবে’, মুহূর্ত্তের জন্য তা’র মুখের চিরন্তন ধূসরতায় একটু আলো খেলে গেলো, ‘যা ই বলো, গরম চা খানিকটা খেলে লাগে বেশ।’
অবাক হলুম, তা’কে তার নিজের লেখার বাইরে কোনো বিষয়ে এমন স্পষ্ট মত প্রকাশ করতে শুনে। অনভ্যস্ত মাথায় ট্যানিন রস হঠাৎ একটু নেশার মত সৃষ্টি করে তা’রই ফল। অনভ্যস্তের উপর ট্যানিনের প্রভাবও আশ্চৰ্য্য। ছেলেবেলায়, বাইরে কোথাও ছুটোছুটি, হুড়োহুড়ি করে’ লাল এবং গরম হয়ে কোনো বিকেলে হঠাৎ বাড়িতে ঢুকে পড়ে’ দেখেছি, সবাই চা খাচ্ছে। তাড়াতাড়ি মা র পেয়ালা থেকে ঢকঢক্ করে’ কয়েক চুমুক দিয়ে আবার দৌড় পরিত্যক্ত, তখনো অসমাপ্ত খেলার উদ্দেশ্যে। কী ভালোই লাগতো সেই কয়েক চুমুক। এখনো মনে পড়ে। এখন বুঝতে পারছি, ট্যানিন সঞ্চারে অতি ক্ষণিক এবং অতি মধুর একটু নেশা হ’তো। হায়রে, এখন বসে’ বসে’ কুঁদে কুঁদে ছ’ পেয়ালা চা গিললেও স্নায়ুগুলো সাড়া দেয় না, ক্লান্তি না কেটে বরং আরো যেন ক্লান্ত হ’য়ে পড়ি। এখন ঠিক সেটুকু নেশা তেমনি মৃদু, তেমনি ক্ষণিক করতে হ’লে কত তার জন্য আয়োজন, কত অর্থব্যয়।
আমাকে আর একবার পেয়ালা ভরতে দেখে ভবভূতি মন্তব্য করলে, ‘তুমি যে ভীষণ চা খাও দেখছি।’
‘বিষপানে আত্মহত্যা’, বলে’ আমি হেসে উঠলুম।
ভবভূতি সে হাসিতে যোগ দিলে না; গম্ভীরমুখে বললে, “কেন, চা খেতে তো বেশ ভালোই।’
“হ্যাঁ, বেশ ভালোই”, আমি তৎক্ষণাৎ সায় দিলুম। ভবভূতির উপস্থিতিতে কোনো হাস্যরসাত্মক কথা বলবার লোভ আমি এর পর থেকে সাবধানে সম্বরণ করেছি।
সিগ্রেট ধরিয়ে আমরা পরস্পরের দিকে তাকালুম। ভবভূতি ক্ষীণ একটু হেসে বললে, ‘তুমিই সুখে আছো, রামতনু।’
খবরের কাগজের উপর চোখ নামিয়ে আমি চুপ করে’ রইলুম। কী বলতে পারতাম? হ্যাঁ, সন্দেহ কী ভবভূতির তুলনায়, সন্দেহ কী, আমি সুখে আছি। আমি যা বাড়ি ভাড়া দিই, ওর তা এক মাসের উপার্জ্জন। সিগ্রেটে আমার যত পয়সা যায়, সমস্ত পরিবার শুদ্ধ ওর এক মাসের খাওয়া খরচ অত হয় না। আমি স্বাধীন (মানে, এই বৰ্ত্তমান যান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তির পক্ষে যতটা স্বাধীন হওয়া সম্ভব) অন্তত, আমি ইচ্ছে করলে যে কোনোদিন সকাল থেকে দুপুর অর্থাৎ বাড়ি বসে গল্প করে কাটিয়ে দিতে পারি, যে কাজটা আজ করা উচিত সেটা আমার কাল করলেও চলে। আমার কোনো উপরিওয়ালা নেই বরং, যে সম্মিলিত পাঠকপিণ্ড আমার উপরিওয়ালা তা’কে প্রত্যক্ষ দেখতে পাই নে বলে’ তার অস্তিত্ব ভুলে থাকতে পারি। তা ছাড়া, সবার উপর, আমার আছে সাহিত্যিক খ্যাতি, যা’র জন্য সেই কবে থেকে কী ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী চেষ্টার ভবভূতি মরে যাচ্ছে। পৃথিবীতে যদি নিছক অধ্যবসায়, সততা, উদ্দেশ্যের আন্তরিকতা, কঠিন, নিষ্করুণ নিষ্ঠার কোনো মূল্য থাকতো তা হ’লে ভবভূতির স্থান হ’তো চিরকালের শ্রেষ্ঠ কবিদের সঙ্গে। যদি এই বিশ্বের পরিচালনার কোথাও বিন্দুমাত্র ন্যায়জ্ঞান থাকতো, তা হ’লে এতদিন ধরে’ এত কষ্ট করে’, সংসারের এমন দারুণ প্রতিকূলতার ভিতর দিয়ে, অবিশ্বাস্য এই ধৈর্য্য সহকারে, অকল্পনীয় অন্ধতায় সে যে এতদিন ধরে’ এত রাশি রাশি লিখতে পেরেছে, শুধু সেই জন্যেই তা’র নাম থাকতো অমর হ’য়ে। কিন্তু তা হবার নয়। ও সব ভালো ভালো নৈতিক গুণের কোনো মূল্য দিতে পৃথিবী প্রস্তুত নয়। ব্যাপারটা শোকাবহ হ’তে পারে, কিন্তু সত্যি।
ভবভূতির মুখোমুখি বসে’, সিগ্রেটের সুরভিত ধূম বুকের মধ্যে গ্রহণ করতে করতে, উচ্চ সমাজের এক বিবাহের বর্ণনা পড়তে পড়তে (কেন? কেন আমাকে জানতেই হবে অমুক বাঙালি জাস্টিসের দৌহিত্রীকে বিয়ের সময়কার ক্রীম রঙে, শাড়িতে কেমন ‘চার্মিং’ দেখাচ্ছিলো অমুক জাস্টিসের দৌহিত্রী বিয়ে করুক কি গলায় দড়ি দিয়ে মরুক কি স্বাস্থ্য ভালো করবার জন্য জর্মানির কোনো স্পা তে যাক আমার তা’তে কী?), সকালবেলাকার উষ্ণ আলস্য পোহাতে পোহাতে আমার বন্ধুর তুলনায় নিজকে আমার কেমন যেন ছোট মনে হচ্ছিলো, একটু খেলো। আ, আমার এই চায়ের পেয়ালা আর ছবিদার কাগজ, রোদে উজ্জ্বল এই ঘর ভরে’ আলস্য সৌগন্ধ্য কী স্থূল, সাধারণ, অসহ্যরকম মধ্যবিত্ত, দস্তুরমত পেতি বুর্জোয়া। এই কি একজন আর্টিস্টের জীবন? আমি ম্যাক্সিম গর্কীর কথা ভাবলুম, বেইঠোফেনের… আমার বন্ধু ভবভূতির কথা ভাবলুম। যা ই বলো না কেন, ক্বতিত্ব জিনিসটাই ভাল্গার, কোনো আত্ম তৃপ্ত মানুষের মত ন্যক্কার জনক দৃশ্য পৃথিবীতে কমই আছে। ব্যর্থতায় গৌরব আছে, ব্যর্থতা মহান্। ব্যর্থতা রোমান্টিক, দৃশ্য হিসেবে ব্যর্থতা খুব জমকালো। কৃতীকে আমরা সম্মান করি, জয়মাল্য পরিয়ে দিই তা’র গলায় কিন্তু মনে মনে আমরা ভালোবাসি তা’কেই, জীবন পণ করে’ যে চেষ্টা করলো চেষ্টা করে’ পারলো না। আমাদের হৃদয়ের স্নেহে পরাজিতরই স্থান। নেহাৎই কৃতী হওয়া তা’র মূলগত সাধারণত্ব থেকে আমাদের মুখ ফেরাতে ইচ্ছে করে। বিজয়ী বীরকে বাহবা দিতে দিতেও আমাদের মন তা’র ভাল্গারিটিতে অসুস্থ বোধ না করে’ পারে।
তবু যদি আমাদের জীবন নিখুঁত নৈতিক বিধান মেনেই চলতো, যদি প্রত্যেক মানুষ তা’র একনিষ্ঠ চেষ্টার পরিমাপেই সব সময় ফল লাভ করতো যদি পৃথিবীর সমস্ত ব্যবস্থা এমন অসম্ভব এলোমেলো, চিন্তাহীন না হ’তো, তা হ’লে তা হ’লে আমার এই আরাম, এই খ্যাতি, এই যা কিছু আজ ভবভূতি মুগ্ধচোখে (কী ক্ষীণ, কী ভীরু, যে ঈর্যাটুকু তা’র দৃষ্টিকে মাঝে মাঝে ঘোলা করে তুলছে জোর করে’ ঈর্ষা করবার শক্তিও তা’র নেই) তাকিয়ে দেখছে, তা সবই যেতো তা’র কাছে। তা ই উচিত ছিলো। আমি এ সবের জন্য কিছুই করি নি; এর যোগ্যতা আমার নেই। সহজেই আমার কাছে এ সব এসে গেছে, বড় বেশি সহজে। আমি কখনো কোনো কঠিন সাহিত্যব্রত গ্রহণ করি নি, তিক্ত নিষ্ঠুর কোনো সংগ্রামের ভিতর দিয়ে আমাকে যেতে হয় নি; আমি কখনো অনাহারের তাড়নায় আত্মহত্যার কথা ভাবি নি, কখনো অন্ধকার রাত্রে একা ছট্ফট্ করতে করতে যদি বিশ্বে কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা থাকে তা’র কাছে নিজের ব্যর্থতা আর বিক্ষোভকে অঞ্জলির মত তুলে ধরি নি। তবু আমারই হ’লো। লোকে আমাকে কতদিন মনে রাখবে, কালস্রোতের কোন্ বিশেষ তরঙ্গের আঘাতে আমি ভেসে যাবো সময়ের অসীমতা দিয়ে বিচার করতে গেলে সেটা আপেক্ষিক ব্যাপার মাত্র। সবই যাবে, আমিও না হয় গেলাম। কিন্তু এটা তো রয়ে’ গেলো উজ্জ্বল কয়েকটা মুহূর্ত, সকালবেলাকার এই সুরভিত আলস্য। এ সত্য থেকে তো নিষ্কৃতি নেই যে আমি এটা পেয়ে গেলুম, আর আর ভবভূতি তা’র আপিসের ডেস্কে অথচ এ নিয়ে বিশেষ কোনো ভাবনা ছিলো না আমার মনে, এর জন্যে কোনো অসাধারণ দুঃখ আমাকে পেতে হয় নি। বরং, আমার সমস্ত জীবন ঠিক গোলাপের বিছানা না হ’লেও অপেক্ষাকৃত সুখেই কেটেছে, খ্যাতি যেন আমার কাছে এসেছিলো গায়ে পড়ে’, অনেক বন্ধুর ভালোবাসায় আমি ঐশ্বর্যবান। এদিকে ভবভূতি কী তা’র জীবন, আর সেই সঙ্গে কী তা’র প্রতিজ্ঞা। ঘোরতর তামসিক এই নিরবচ্ছিন্ন চরম দারিদ্র্য, আর তার মধ্যে তা’র অবিচল উন্মত্ত সঙ্কল্প। যদি ব্রতগ্রহণ দিয়েই কথা, যদি দুঃখের দুরূহ মূল্যদান দিয়েই বিচার, তা হ’লে ভবভূতির সঙ্গে কা’র তুলনা? সুখী হ’তে, মন খুলে হাসতে ও যেন কখনো জানেই নি। ওর জন্ম, ওর শিক্ষা, ওর শৈশবের পারিপার্শ্বিক তারপর আজ ওর এই কেরানিত্ব, স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে না দেখা বিবাহিত জীবন প্রতি মুহূর্তে ও অতি ভয়াবহ মূল্য দিয়ে আসছে। ঐ রকম জীবন যা’র, সে যে নিছক বেঁচে থাকবার বেশি কিছু করতে পারে, তা আমি কখনো কল্পনা করতে পারতুম না। আর ভবভূতি ক্লান্ত লিখে গেছে অৰ্দ্ধাহারে, রুগ্নদেহে নিজের প্রাণ বাজি লিখে গেছে, তবু সে হারলো। তবু সময়ের স্রোতে একটা আঁচড়ও সে কাটতে পারলে না। কেন এমন হয়? আমরা জানি নে। আমরা কিছুই জানি নে; শুধু জানি যে এমনিই হয়।
বুঝতে পারছিলুম ভবভূতি আমার কথা বলবার জন্য অপেক্ষা করছে। তা’র হাতে খবরের কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট অনেক আগেই লক্ষ্য করেছিলুম। এখন কাজের কথা, তা হ’লে। হাতের সিগ্রেটটা ছাইদানের মধ্যে দুমড়ে রেখে জিজ্ঞেস করলুম, ‘তোমার লেখা টেকা কিছু এনেছো নাকি সঙ্গে?’
‘হ্যাঁ, এই একটা ’
‘কই, দেখি’, আমি ওকে সাহায্য করলুম।
ও প্যাকেটটা আমার হাতে দিলে। খুলে দেখলুম, বড় বড় ছেলেমানুষি হস্তাক্ষরে ফুস্ক্যাপের তিন শো বারো পৃষ্ঠার এক উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি।
‘নিশ্চয়ই”, এ ছাড়া আমার মনে কোনো উত্তর এলো না; যদিও জানতাম যে শতবর্ষ পরমায়ু পেলেও ঐ পাণ্ডুলিপি আমি কখনো পড়বো না।
‘এ বইটা’, ভবভূতি বললে, ‘আমার নিজের খুব ভালো লাগে না; কিন্তু সেইজন্যই এটা নিয়ে এসেছি। প্রকাশকদের হয় তো বা পছন্দ হ’তে পারে। তা’র উপর, তুমি যদি একটু বলো ’
‘আমার যেটুকু সাধ্য, আমি করবো।” জেনে শুনে আর একটা মিথ্যে কথা বলতে হ’লো। অবিশ্যি, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করলেও যদি ভবভূতির বই প্রকাশিত হবার লেশমাত্র সম্ভাবনা থাকতো, তা হ’লে, কোনো সন্দেহ নেই, আমি তা করতাম। কিন্তু ওর পাণ্ডুলিপির উপর একটু চোখ বুলিয়েই যা বুঝতে পেরেছিলাম, তা’তে সে পরিশ্রম বাঁচানোই আমার কাছে সব চেয়ে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিলো।
‘এ বইটা যদি বেরোয়’, ভবভূতি বললে, ‘আর লোকে যদি নেয়, তা হ’লে আস্তে আস্তে সত্যিকারের ভালো বইগুলোও বা’র করা যেতে পারে। লোকের এ ধরণের জিনিস পড়ে’ তো অভ্যেস নেই; সইয়ে সইয়ে স্বাদ দেয়াই ভালো।’
‘ঠিক কথা’, আমি বললাম। ভবভূতির মুখ থেকে ও সব কথা শোনা প্রায় কষ্টকর। না, হাসাও যায় না; হাসতেও কষ্ট হয়। ও ছিলো একজন লোক, যা’র কোনো হিউমারের বালাই ছিলো না। আর, সে কথাই যদি ওঠে, অনেক কিছুরই বালাই ওর ছিলো না; বিধাতা ওকে তৈরি করেছিলেন ডিমের খোসার মত শূন্য করে’। সব মানুষই কিছু একটা প্রতিভাবান হয় না; কিন্তু কোনো মানুষের চরিত্র যে এমন একটানা বিবর্ণ, এমন ভীতিকররকম লেপাপোঁচা, একেবারেই কোনো কোণখোঁচছাড়া হ’তে পারে, তা বিশ্বাস করা শক্ত! সংসারে, ঈশ্বর জানেন, মূঢ়তার অভাব নেই : বরং, মূঢ়তার ভয়ঙ্কর সর্বব্যাপিতা দৃশ্যে এক এক সময় বনবাসী হ’তে ইচ্ছে করে। ঈশ্বর জানেন, সংসারে মাছির মত, ইঁদুরের মত, সাপের মত মানুষ চারদিকে কিবিল্ করছে এবং তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের একমাত্র অস্ত্র হচ্ছে হাসি, যদি অবিশ্যি তাদের আক্রমণ কাটিয়ে উঠে জীবনীশক্তি বজায় রাখতে পারবার মত ভাগ্যবান আমরা হই। কিন্তু ভবভূতির নির্ব্বদ্ধিতা এমনই যা’র সম্মুখীন হ’লে স্তম্ভিত হ’য়ে যেতে হয়, হাসি আসে না। ও যেন ঈশ্বরের নিজের হাতের আঁকা ব্যঙ্গচিত্র; সে অতিরঞ্জন এতই মাত্রাহীন যে হাস্যরসের সীমানা উল্লঙ্ঘন করে’ তা প্রায় ভয়াবহতার স্তরে গিয়ে পৌঁছায়। এর যদি মাঝামাঝিগোছের কি তা’র চেয়ে একটু নিম্নস্তরেও বুদ্ধি থাকতো, তা হ’লে ও বুঝতে পারতো ও কী করছে। লেখক হবার কোনোরকম সঙ্গতিই ওর ছিলো না কিন্তু তা তো অনেক লোকেরই থাকে না। তেমনি, লিখতে তা’রা যায়ও না। যেটা সত্যি শোকাবহ সেটা এই যে কাগজের উপর কতগুলো পর পর সাজানো অক্ষর কত প্রাণহীন, কত অনিপুণ, কত শূন্যময় হ’লে তা’কে আর লেখা বলে না, সে জ্ঞানও ওর ছিলো না। আর সেটাই ওর কাল হ’লো। সত্যি সত্যি ওর লেখা বাংলা মাসিকপত্রেও ছাপাবার অযোগ্য। আমি এখনো মাঝে মাঝে ভাবি, যে লেখা চোখ মেলে’ আধ মিনিট পড়া যায় না তা ও কী করে দিনের পর দিন অক্লান্ত, বীভৎস অধ্যবসায়ে লিখে যেতে পারতো। আর সব বাদ দিয়ে, শুধু ঐ লিখে যেতে পারার জন্যেই ওর প্রতি প্রশংসায় স্তব্ধ হ’য়ে যেতে হয়। বিধাতা সাধারণত একদিকের অভাব অন্য দিক দিয়ে পুষিয়ে দেন : ভবভূতিরও ক্ষতিপূরণ হয়েছিলো অতি মানবীয় ধৈর্য্যে, উদ্দেশ্যের আত্মাগ্রাসী অবিচলিতত্বে যা প্রায় উন্মত্ততার মত। অনুরূপ অবস্থায় যে কোনো স্বাভাবিক, সুস্থ মানুষ বাল্যকাল অতিক্রম করবার সঙ্গে সঙ্গেই সাহিত্যিকত্ব ছেড়ে দিয়ে আরো বেশি অর্থোপার্জ্জনে মন দিতো এবং সেদিকে হয় তো সফলও হ’তো। এতখানি সময় ও পণ্ডশক্তি অর্থোপার্জ্জনের চেষ্টায় নিয়োজিত করলে ভবভূতিও কী করতে না পারতো, জোর করে’ বলা যায় না। কিন্তু সেদিক দিয়ে ওর যেন কোনো আকাঙ্ক্ষাই ছিলো। ওর অবস্থা সম্বন্ধে ও যে অখুসি ওর কোনো কথায় কি আচরণে এমন আমার কখনো মনে হয় নি। এ সব তুচ্ছ, পার্থিব জিনিস সে অনায়াসে অবহেলা করতে পারে। সে কী খায় আর কী রকম বাড়িতে থাকে, তা’তে কী এসে যায় অনেক ঊর্দ্ধে তা’র আসন, সে বিরাট স্রষ্টা, অমরত্বে তার দাবি। এখন না হয় কেউ তা’কে না ই জানলো, তা’র সময় আসবে। আসবেই। সেইজন্য, বিবেচনাশীল, সে প্রথমটায় তা’র অপেক্ষাকৃত বাজে লেখা বাঙালি পাঠকসাধারণকে দিতে চাচ্ছে পরে, মূর্খ পাঠকদের যখন একটু গা সহা হ’য়ে এসেছে, আস্তে আস্তে তা’র সত্যিকারের ভালো জিনিসগুলো বার করবে। ততদিন, ভদ্র ছদ্মবেশী বস্তি অবস্থার মধ্যে বসবাস করতে তা’র আপত্তি নেই ।
‘ঠিক কথা’, আমি আবার বললুম।
‘বোধ হয় কেউ নিতেও পারে কী বলো?’
‘নেবে না!’ আমি সজ্ঞানে পাপের উপর পাপ চাপাতে লাগলুম, ‘কিন্তু প্রথমটায় জানোই তো ’
‘হ্যাঁ, জানি। কিন্তু তুমি চেষ্টা করবে? চেষ্টা করবে?’ ভবভূতির কণ্ঠস্বরে এমন মিনতির করুণতা ফুটে উঠলো যে ও যদি সত্যি চলনসইও কিছু লিখে থাকতো, তা হ’লে সেই মুহূর্ত্তে ওর প্রতি আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ বোধ করতুম।
‘আমার যেটুকু সাধ্য’, গম্ভীরভাবে আমি বললুম।
মুহূর্তের জন্য এর মুখ উদ্ভাসিত হ’য়ে উঠলো। আমি যখন বলেছি তখন ওর বই বেরিয়ে গেছে বললেও দোষের হয় না। কী গভীর, সম্পূর্ণ আশ্বাস ওর আমার কথায়। আমার মনটা একবার মোচড় দিয়ে উঠলো। একবার মনে হ’লো বলি, কিন্তু ওর মুখের সেই ক্ষণিক দীপ্তি দেখে বড় মায়া হ’লো। হায়রে মানুষের দুর্বলতা!
‘তোমার নতুন কোনো বই বেরোচ্ছে না পূজোয়?’ ভবভূতি জিজ্ঞেস করলে।
‘হ্যাঁ, খান দুই।’ সংখ্যাটাকে আমি সাবধানিভাবে কমিয়ে বললুম।
‘ইস্, অনেকগুলো তো বই হ’য়ে গেলো তোমার।’
“হ্যাঁ”, আমি উচ্চস্বরে হেসে উঠলুম, ‘বইয়ের সংখ্যা অশ্লীল রকম বেড়ে যাচ্ছে।’
‘তুমিই তো আজকালকার দিনের ’
‘যা বলেছো!’ আমি তা’কে কথাটা শেষ করতে দিলুম না, ‘হাঁড়ি চড়াতে হবে, তাই আমার লেখা। ওকে কি আর লেখা বলে!’
‘হ্যাঃ, তোমার আবার হাঁড়ি চড়াবার ভাবনা!’ আমার কথাটায় যথেষ্ট সত্য ছিলো, কিন্তু ও সেটাকে সম্পূর্ণ বিনয় হিসেবে নিলে।
‘সে ভাবনা যা’তে না থাকে, সেইজন্যেই তো ’
‘টাকার জন্য লিখলে লেখা একটু খারাপ হ’য়ে যাবার শিঙ্কা থাকে, না?’
‘শুধু তাই!’ অসাধারণ উৎসাহ নিয়ে বলতে লাগলুম, ‘যা’রা পয়সা দেয় তাদের কাছ থেকে কত অসহ্য অপমান। তোমার তো সেটাই একটা মস্ত সুবিধে’, আমার উৎসাহ মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে লাগলো, ‘তুমি কারো কাছে প্রার্থী নও। তোমাকে হিংসে হয়, ভবভূতি, তোমার মত দুঃখ নেবার সাহস যদি আমার থাকতো!”
ভবভূতি মিট্মিটে চোখে তাকালো। নিজের এই রোমাঞ্চকর সংবাদেও তা’র সম্বন্ধে খুব বেশি সচেতন মনে হ’লো না। নাঃ, তা’কে কোনো দুঃখ আমি যে তা’কে ঈর্ষা করি, এই সংবাদেও তা’র মুখে কোনো ব্যঞ্জনা ফুটলো না। আলোহীন, ভারিভাবে সে বললে, ‘হয় তো এরই মধ্যে তুমি ভালো লিখবে।’
