২
পুরো দু’ বছর ভবভূতির সঙ্গে আমার চলেছিলো অবিচ্ছিন্ন বন্ধুতা; এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ও বয়েসের পক্ষে যেটা আশ্চৰ্য্য একদিনোর জন্যও আমাদের ঝগড়া হয় নি। তার পরে এলো সেই সময় ওঃ, অসহ্য, অসহ্য সময় যখন আমাদের ছাড়াছাড়ি হ’তেই হবে। বীরের মত হাসবার চেষ্টা করে’ আমরা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিলাম : পরবর্ত্তী জীবন একসঙ্গে কাটাবার বিস্তারিত প্ল্যান দু’জনের মধ্যে আবদ্ধ রইলো। একজনকে না হ’লে কোনো কাজে, কোনো আনন্দে, কোনো সার্থকতায় আর একজনের চলবে না, দু’জনের মনে মনে এই রইলো গোপন, গম্ভীর প্রতিজ্ঞা।
কিন্তু ছেলেবেলাকার বন্ধুতা তা গভীর হয়, অন্তরঙ্গ হয়, পারস্পরিক নিঃশেষিত আত্ম সমর্পণে উচ্ছ্বসিত হয়; কিন্তু স্থায়ী হয় না, হ’তে পারে না, বয়েস বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে তা ভেঙে পড়তে বাধ্য। কারণ, শৈশবে আমাদের বিচার বুদ্ধি হয় না, কা’র সঙ্গে নিজকে ঠিক মানাবে, বোঝবার ক্ষমতা হয় না; তা ছাড়া, মনটা থাকে নরম, হাতের কাছে যা’কে পাওয়া যায়, তা’কেই ভালো লাগে, মন তা’র জন্যই পাগল হ’য়ে ওঠে। খুব সহজেই তখন ভালোবাসা যায়; মনটা ভালোবাসবার জন্যে তৈরিই হ’য়ে থাকে, কোনো একটা উপলক্ষ্য পেলেই হ’লো। যা’র চরিত্রের যেটা বিশেষত্ব, সেগুলো থাকে চাপা; খোঁচা খোঁচা হ’য়ে কোথাও কিছু ফুটে নেই; দু’জন মানুষ, তাই, অনায়াসে পরস্পরের মধ্যে মিশে যেতে পারে, কোনোখানে এতটুকু আটকায় না। কিন্তু যৌবনের সূচনার সঙ্গে সঙ্গে যখন আমাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বিকশিত হ’য়ে উঠতে থাকে তখন দেখা যায়, বালক কালের সব বন্ধুতাই ভুল হ’য়ে গিয়েছিলো, সদ্য জাগ্ৰত প্ৰকৃত নিজত্বের আলোয় সেই সব পরম, পরম অন্তরঙ্গদেরকে কী হাস্যকর, কী অসম্ভব মনে হয়! ভেবে অবাক লাগে, ওদের সঙ্গে কী করে কখনো মিশতে পেরেছিলাম। এবং তাদের সম্বন্ধে শুধু এই আকাঙ্ক্ষা মনে জাগে আর যেন কখনো তাদের সঙ্গে দেখা না হয়। কারণ, দেখা হ’লে ব্যাপারটা এমন বিশ্রী হয় এমন অস্বস্তিকর; এমন কি, লজ্জাকর। লজ্জা হয়, পুরোনো বন্ধুতার মর্য্যাদা রাখতে পারছি নে বলে’; এই স্বল্পবুদ্ধি, বাজে চালিয়াৎ গোছের ছোকরার সঙ্গে কখনো অন্তরঙ্গ ছিলুম, এ কথা মনে করে’ (এবং এ ধারণা উভয়ত, সন্দেহ নেই; আমার ‘বন্ধু’ও আমার সম্বন্ধে যা ভাবতে থাকে তা মোটেই সুশ্রাব্য নয়। না, এ ধরণের পুনর্মিলন না হওয়াই ভালো, না হওয়াই ভালো। আমরা দু’জনে দু’দিক দিয়ে বেড়ে উঠেছি, আমাদের চরিত্রের জন্ম গত বিরোধিতা এতদিনে পরিস্ফুট হ’য়ে উঠেছে; বনিবনা হওয়া অসম্ভব। বন্ধুতা স্থাপন করবার সব চেয়ে ভালো সময় হচ্ছে প্রথম যৌবন; যখন আত্মসচেতনার উন্মেষ হয়, অথচ মনটা যখনও কঠিন হয়ে ওঠে না; যখন আমাদের নির্বাচন করবার ক্ষমতা হয়, অথচ হৃদয়ের কোমল বৃত্তিগুলো তাদের মূল সজীবতা, উন্মুখতা হারিয়ে ফেলে না। তখন পর্যন্ত নানারকম সাংসারিক সংঘাতের ফলে আমরা সাবধানী, সতর্ক হ’য়ে উঠি নে; নিজের চারদিকে নিরাপদ আড়াল রচনা করতে সর্ব্বদা সচেষ্ট থাকি নে; নিশ্চিত্ত আত্মকেন্দ্রগততার সমতলভূমি থেকে অন্তরঙ্গতার দুর্গম, বিপজ্জনক, উন্মুক্ত শিখরে আরোহণ করতে ভয় পাই নে, কুণ্ঠা করি নে। সেই হচ্ছে বন্ধুতা করবার বয়েস, জীবনের সেই মধুরতম সময়; সেই সব বন্ধুতাই স্থায়ী হয় এই পৃথিবীতে যদি কোনো জিনিসকে স্থায়ী বলা যায়। সেই সময়ে স্থাপিত বন্ধুতা নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে হয়; কারণ, পরবর্ত্তী জীবনে আমরা সঙ্গী পাবো, সহকর্মী পাবো; স্ত্রী, পরিজন, অনুচর এ সমস্তই পাবো; কিন্তু বন্ধু সেই পুরোনো যা’রা ছিলো, তা’রাই থাকবে, না হয় আদৌ থাকবে না। একটা বয়েস আছে, যার পরে আর নতুন বন্ধু করা যায় না। আমাদের মন তখন শক্ত হ’য়ে উঠেছে; সন্দিহান, আত্মরক্ষাশীল হয়ে উঠেছে; কোনো পরিচয়ই আর তখন নিবিড়তার রসে পেকে উঠতে পারে না; একজন লোককে খুব ভালো লাগে, প্রচুর মেলামেশা করি তা’র সঙ্গে; কিন্তু একটা জায়গায় বাধা থেকেই যায়, সেখানে লেশমাত্র আক্রমণ হ’লে আমরা সমস্ত শক্তি দিয়ে তা রোধ করি হ’তে পারে, সচেতনভাবে নয়, কিন্তু রোধ করি, ভয়ে নিজের মধ্যে নিজকে গুটিয়ে ফেলি; প্রথম সূচনাতেই সে সম্ভাবনাকে নষ্ট করে’ দিই।
অনিবার্য্যরূপে, ভবভূতি আমার মন থেকে লুপ্ত হ’য়ে গেলো। আমি বড় হ’য়ে উঠলাম, পৃথিবীর দিগন্ত হঠাৎ বহু দূর অবধি বিস্তৃত হ’য়ে পড়লো; দক্ষিণ পক্ক দ্রাক্ষার মত, আমার নতুন যৌবনাক্রান্ত মনে রস পীড়িত বন্ধুতা ঘনীভূত হ’য়ে উঠলো। তখন কোথায় বা গেলো ভবভূতি আর কোথায় তা’র হাস্যকর, অসম্ভব সব পদ্য! ওর সঙ্গে কখনো আবার দেখা হবে আশা করি নি; কিন্তু ভাগ্যের উদ্দেশ্য ছিলো অন্যরকম। ইন্টারমিডিয়েট পড়বার সময় আমার জীবনে আবার ভবভূতির উদয় হ’লো। বয়েসে ও আমার বছর দু’ একের বড় ছিলো; দ্বিতীয় চেষ্টায় দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করে’ ভর্ত্তি হ’লো এসে ঠিক আমার বছরেই। আমাদের এত যত্নে করা সব প্ল্যান কবে ভণ্ডুল হ’য়ে, ধূলো হ’য়ে ঊনপঞ্চাশ বায়ুতে মিলিয়ে গিয়েছিলো, মনেও নেই; কিন্তু আমাদের অলক্ষ্যে চলেছিলো অদৃষ্টের প্ল্যানহীন, উচ্ছৃঙ্খল অনিয়মিততা, তা’রই ফলে ভবভূতি আবার আমার সঙ্গে এসে জুটলো।
সত্যি কথাটা যদি বলতেই হবে, ভবভূতির মত ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পাশ করাবার চেষ্টা শুধু যে অর্থহীন, তা নয়, একাধিকভাবে ক্ষতিকর। সাধারণের চেয়েও নিম্নস্তরের বুদ্ধিতে অ্যাকাডেমিক বিদ্যা প্রবেশ করাবার চেষ্টা তা এতই নিষ্ফল যে তা হাসিরও উদ্রেক করে না। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা আমাদের দেশের সাংঘাতিকতম কুসংস্কারের মধ্যে একটা। কত কষ্ট, কঠোর ত্যাগ স্বীকার করে’ কোনো কোনো বাপ মা ছেলেকে (তাও এমন ছেলেকে, যে কোনোরকম শিক্ষা গ্রহণ করতে যে জন্ম থেকে অক্ষম) ‘শিক্ষিত’ করবার অদম্য প্রয়াসে গলদঘর্ম্ম হ’য়ে যান, তা দেখলে মৰ্ম্মাহত হ’তে হয়। শাদা যুক্তি দিয়ে বিচার করলে, ভবভূতিকে কলেজে ভর্তি করানো তা’র বাবার পক্ষে নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না; তাঁর একমাত্র কৰ্ত্তব্য ছিলো, একটা সুযোগ পেলেই তা’কে যে কোনো একটা কাজে ঢুকিয়ে দেয়া; তা’তে অর্থ ও সময় দু’য়েরই ব্যয়সঙ্কোচ হ’তো। কিন্তু এটাও কিছু কম সত্য নয় যে একটা জিনিসকে সব সময় শাদা যুক্তি দিয়ে দেখা যায় না, আশার মায়াবী আলো দৃষ্টিকে তোলে রঙিন করে’। ভবভূতির বাবার নিজের জীবনে যে সব আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়েছিলো, তিনি আশা করেছিলেন, দুরাশা করেছিলেন, ছেলেকে দিয়ে সেগুলোর পরিপূর্ণতা সাধন করবেন। বিদ্যার উপর ভদ্রলোকের একটা অমানুষিক সম্ভ্রম ছিলো সেটা কুসংস্কারেরই সামিল। ঢাকায় তাঁর এক পিস্তুতো শালা ওকালতি করতেন, বেশ সচ্ছল তাঁর অবস্থা। তাঁর বাসায় থেকে ভবভূতি কলেজে পড়বে এইরূপ ব্যবস্থা হ’লো। পৃথিবী পরিচালনার যদি লেশমাত্র ন্যায়জ্ঞান থাকতো, তা হ’লে ওর বাবার আন্তরিক ইচ্ছার জোরেই ভবভূতি বিদ্যা বিষয়ে কিছু না কিছু বিশেষত্ব অর্জন করতো। কিন্তু সত্যি সত্যি ব্যাপার যেমন…।
যা ই হোক, আশাতীত, অবাঞ্ছিত, ভবভূতি আমার জীবনে পুনঃপ্রবেশ করলে। কলেজের দুর্বিষহ অবসরের ঘণ্টায় একদিন কমন রূমে বসে’ পাঞ্চ পত্রিকার রসিকতা পড়ে’ হাসবার চেষ্টা করছি, অনুভব করলাম, উল্টো দিকের একটা চেয়ার থেকে একজনের দৃষ্টি বারে বারেই আমার উপর নিবদ্ধ হচ্ছে। চোখ তুলতেই মুহূর্তের জন্য দ্বিধা করা সম্ভব ছিলো না আমার বন্ধু ভবভূতিকে দেখলাম। আমার মুখ দিয়ে অজান্তে বেরিয়ে গেলো, ‘আরে!’
ভবভূতি উঠে আমার পাশে এসে বসলো। ও দাঁড়াতে লক্ষ্য করলাম, ও প্রকাণ্ড ঢ্যাঙা হ’য়ে গেছে। কিন্তু ওর চোখে সেই অসহায়, কাতর দৃষ্টি; তার ওপর, প্রথম যৌবনোন্মেষের ফলে ওর চলাফেরায়, ধরণ ধারণে কেমন একটা অস্বস্তির ভাব, একটু বিসদৃশতা নিজের সম্বন্ধে ও যেন অতিরিক্তরূপে, কষ্টকররূপে সচেতন। ওর রোগা (কারণ রোগা ও প্রায় আগের মতই আছে), লম্বা শরীর মূর্ত্তিমান একটা অ্যাপলজির মত এমন বিনীত, সঙ্কুচিত, সন্ত্রস্ত; কোনো ভঙ্গীতে বা আচরণে অন্যকে চটাবার ভয় সব সময় ওকে হানা দিচ্ছে; এবং ভয় পেয়ে ঠিক এমন সব কাণ্ড করে’ ফেলছে, যাতে লোকে চটতে পারে। নাকের নিচে ওর গোঁফের রেখা বেশ স্পষ্ট, পুরু হ’য়েই ফুটে উঠেছে; লক্ষ্য করে দেখলে থুনিতে দু’এক গাছা দাড়িও চোখে পড়ে। মাথার চুল ঘাড় আর কান বেয়ে ঝুলে পড়েছে, তা’তে যথেষ্ট তৈল প্রয়োগান্তে টেড়ি করবার প্রশংসনীয় চেষ্টার চিহ্ন বিরাজমান। গায়ে একটা আধ ময়লা ছিটের শার্ট; তা’র গলার বোতামটা আটকানো, কিন্তু বুকেরটা অনুপস্থিত থেকে মাঝে মাঝে বক্ষোস্থলে সদ্য বিকাশোন্মুখ রোমরাজির আভাস দিচ্ছে। না, একবার ওর দিকে দৃষ্টিপাত করে’ মুহূর্ত্তের জন্যও আমার পক্ষে দ্বিধা করা সম্ভব ছিলো না।
ভবভূতি মুগ্ধদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তোমাকে দেখে কী যে খুসি হ’লাম, রামতনু ’
আমি খুব সোৎসাহে নয় বললাম, ‘আমিও।’
তারপর খানিকক্ষণ চুপচাপ কাটলো। পাঞ্চ এর একটা ছবির উপর দৃষ্টি সন্নিবদ্ধ করে’ আমি ভাবতে লাগলাম, এর পরে কী বলা যায়? কী বলা যায়? আমার কপাল ভালো, তখনই ঘণ্টা বেজে উঠলো। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে’ আমি বললুম, ‘একটা ক্লাশ আছে আবার দেখা হবে।’
স্বীকার করবো, প্রথম থেকেই ভবভূতিকে আমি একটু দূরে দূরে রাখবার চেষ্টা করেছিলাম; আভাসে ইঙ্গিতে এমন কি, অনেকটা স্পষ্টভাবে তা’কে বুঝতে দিয়েছিলাম যে তা’র আর আমার মধ্যে যে স্বাভাবিক ব্যবধান গড়ে’ উঠেছে, তা অতিক্রম করতে আমি প্রস্তুত নই। অবিশ্যি অতিক্রম করা যে আমার পক্ষে সম্ভব হ’তো, তা ও নয়; যদি সে চেষ্টা করতাম, তা’র ফল আমার পক্ষে হ’তো শুধু যন্ত্রণাদায়ক, এবং ভবভূতিও তা’তে খুব আরাম বোধ করতো না। সুতরাং, প্রথম থেকেই আমি সাবধান হয়েছিলাম। যে পরিচয়কে বেশিদূর যেতে দেবার ইচ্ছে আপনার নেই, তা’কে প্রথম থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হয় : না হ’লে একবার প্রশ্রয় দিয়ে ফেললে, পরে আর সামলানো যায় না। সূচনাতেই আমি রাশ টেনে দিয়েছিলাম, পরে যা’তে বিপদে পড়তে না হয়। আমার কোনো দোষ ছিলো না; ভবভূতিকেই বা কী দোষ দেবো? দোষ আমাদের মধ্যবর্তী সময়ের। ভবভূতির সঙ্গে আমার শেষ দেখা হবার পর হাওড়া পুলের নিচ দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে; অনিবার্য্যরূপে, আমরা পরস্পরের অনেক, অনেক দূরে সরে’ এসেছি। সময় যেখানে তা’র অদৃশ্য হাত দিয়ে জীবনের ছবির রঙ বদলে দিয়ে যায়, আমি সেখানে কী করবো? অসম্ভব ছিলো, ভবভূতির সঙ্গে আমার ভাসা ভাসা আলাপের বেশি কোনো সম্পর্ক থাকবে। যদি ছেলেবেলাকার বন্ধুতার খাতিরে, কৰ্ত্তব্যবোধ থেকে, জোর করে’ আমি ওর সঙ্গে নিকটভাবে মিশতে যেতাম, তা হ’লে যেটুকু হৃদ্যতা ওর সঙ্গে ছিলো, তা ও বজায় থাকতো না; একদিন বাধ্য হ’তাম পাকা রকম ঝগড়া করতে। কোনো সন্দেহ নেই, তার চেয়ে এ ই ভালো হয়েছে এই ঈষদুষ্ণ, উত্তেজনাহীন পরিচয়। আর, ভবভূতিও এর বেশি কিছু চায় নি, আশা করে নি; এর বেশি কিছু পেলেই ও বিব্রত হ’য়ে পড়তো! আমার প্রতি ওর বালক কালের অ্যাডোরেশন নতুন উৎসাহে জেগে উঠলো; নিঃশব্দে, শান্তভাবে, অলক্ষিতে ও আমার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করলো; আঠার মত আটকে রইলো। অবিশ্যি আমার তা’তে কোনো ক্ষতি হ’তো না; ভবভূতি ছিলো সেই জাতের মানুষ, যাদের উপস্থিতি স্বচ্ছন্দে ভুলে থাকা যায়। ও বিরক্ত করতো না, কাজে বাধা দিতো না; ও কাছে থাকলেও অনায়াসে নিজের কাজ বা অন্য কারো সঙ্গে গল্প করা যেতো; নিজকে লুপ্ত করে’ দেবার ক্ষমতা ছিলো ওর অসাধারণ, তা ছাড়া কাছে ও বেশি থাকতোই না; ওর অ্যাডোরেশন প্রধানত ছিলো দূর থেকে। কোনোদিক দিয়েই যে ভবভূতিতে বিশেষ কিছু এসে যেতো তা নয়।
সেই সময়ে সাহিত্যক্ষেত্রে আমি একটু একটু পরিচিত হ’তে আরম্ভ করেছি। এবং তা নিয়ে ভবভূতির কী উল্লাস; ওর ম্লান মুখে, চোখের ভীত দৃষ্টিতে কী আশ্চর্য্য দীপ্তির বিদ্যুৎ স্ফুরণ! ওর আনন্দ দেখে তখনকার মত আমারও যেন একটু আনন্দ হ’তো কোনো এক নব্য মাসিকপত্রের আমি নিয়মিত লেখকশ্রেণীর অন্তর্ভূত, ভবভূতির চোখে ভয়ানক এই ব্যাপার। ‘আমি জানতুম, আমি আগাগোড়াই জানতুম, রামতনু, যে তুমি ভয়ানক একটা কিছু হবে।’ ‘দেখেছো রামতনু, এ মাসের অরুণোদয় তোমার কবিতা সম্বন্ধে কী লিখেছে?’ ‘ক্ষণপ্রভার সাহিত্যসমালোচনা পড়েছো? মাথা খারাপ না হ’লে কেউ অমন গায়ে পড়ে’ ঝগড়া করে!’ ভবভূতির স্তুতিতে কুণ্ঠা ছিলো না, শ্রান্তি ছিলো না, বিচার বোধ ছিলো না, মাত্রাজ্ঞান ছিলো না। আমার তৎকালীন সাহিত্যসৃষ্টির এই অতিরঞ্জিত, হাস্যকর মূল্যীকরণে প্রত্যেক মানুষের যে মজ্জাগত ভ্যানিটি আছে, সেখানে আমারও যে একটু কণ্ডূয়ন না হ’তো তা নয়; কিন্তু তা হ’লেও ভবভূতির উচ্ছ্বাস শুনতে শুনতে ক্লান্তিবোধ না করে’ পারতাম না। কারণ, ভবভূতির ছিলো সেই বিকৃত ক্ষমতা, যা’তে নিজের প্রশংসার মত প্রীতিকর বিষয়ও ওর মুখ থেকে শুনলে অসহ্য লাগতো। আমি অন্যমনস্ক হ’য়ে যেতুম, অন্যদিকে তাকিয়ে হাই গোপন করতুম, চেষ্টা করতুম প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে; কিন্তু ভবভূতি তার করুণ, অসহায় ধরণে আঁকড়ে ধরে’ থাকতো, আঠার মত আটকে থাকতো; সাহিত্য বিষয় থেকে ওকে স্খলিত করা সম্ভব হ’তো না। ও যেন আমার ভিতর দিয়ে ওর অপরিপূর্ণ এবং অপূরণীয় খ্যাতি লিপ্সাকে চরিতার্থ করতো; পরোক্ষে, বিচিত্র সম্ভাবনায় উজ্জ্বল সাহিত্যিক জীবন বাঁচতো। আমার তা ই মনে হয়েছিলো। অন্তত প্ৰথমটায়। কিন্তু কিছুদিন যেতেই টের পেলুম যে ভবভূতির একটা নিজস্ব হোক তা অতি গোপন, কৌমার্য্যের লজ্জা জড়িত উচ্চাকাঙ্ক্ষাও আছে; বাল্যকালে তা’র মনে যে বীজ সঞ্চারিত হয়েছিলো সে অপরাধ আমার, আমার! এখন পর্যন্ত কঠোর অধ্যবসায়ে সে তা লালন করে’ এসেছে। একটু বিস্মিতই হ’লাম! সত্যি বলতে, ভবভূতির কাছ থেকে এতটা আশা করি নি।
কী কঠিন চেষ্টায় তা’র প্রবল লজ্জা জয় করে’ ভবভূতি আমাকে তা’র ইদানীকার কাব্য প্রচেষ্টা দেখিয়েছিলো, তা আমি সহজেই বুঝতে পারি। অনেকক্ষণ ধরে’ই সে এ কথা ও কথায় ভূমিকার অবতারণা করছিলো; ব্যাপারটা তা’র পক্ষে একটু সহজ করবার জন্যে আমি বলেছিলাম, ‘তুমি আজকাল আর লেখো না?’
‘না না, আমি আর কী লিখবো না, আমি হ্যাঁ, এই একটু আধটু ’ ভবভূতি এলোমেলো ভাবে কথাটা অসমাপ্ত রাখলো।
তখন আমার বলা কৰ্ত্তব্য হ’লো : ‘আমাকে দু’ একটা দেখালেও তো পারো।’
অনেক আগেই লক্ষ্য করেছিলুম, ভবভূতির জামার বুক পকেট কাগজের তাড়ায় উঁচু হ’য়ে আছে। আমার বুঝতে বাকি ছিলো না কাগজগুলো যে কী, তা ও এইবার শীতের সকালে লোকে যেমন করে’ পুকুরে ঝাঁপ দেয়, তেমনি, চোখ মুখ বুজে, দাতে দাঁত লাগিয়ে ভবভূতি তার বুক পকেটস্থ কাব্য ভাণ্ডার আমার সামনে উজাড় করে’ দিলে। আমি একটা পড়লাম, দুটো পড়লাম, তারপর বললাম, ‘হুঁ।’
কাগজের দিকে তাকিয়েও আমি বুঝতে পারছিলাম, ভবভূতি রুদ্ধশ্বাসে, অনিমেষ দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। এইবার ঢোক গিলে বলে’ উঠলো, ‘কেমন?’
আমি অম্লানমুখে কারণ সেটাই সব চেয়ে সহজ ছিলো বললাম, ‘চমৎকার।’
‘না সত্যি বলো।’ উৎকণ্ঠায়, আনন্দে ওর গলা কেঁপে গেলো।
ওর চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, ‘সত্যি বলছি।’
সঙ্গে সঙ্গে ভবভূতির সমস্ত মুখে চোখে এমন এক আশ্চর্য্য রূপান্তর ঘটলো যে এই নির্লজ্জ মিথ্যা ভাষণের জন্য নিজকে আমি ধন্যবাদ দিলাম। এই দুঃখের সংসারে, তখন আমার মনে হয়েছিলো, এতখানি আনন্দ আনবার ক্ষমতা যদি একটা মিথ্যার থাকে কিন্তু আমার ভুল হয়েছিলো; তখনও বিচার করবার সময় হয় নি।
তা’র পর থেকে ভবভূতি প্রায়ই আমাকে দেখাবার জন্য তা’র পদ্য নিয়ে আসতো একটা নয়, দুটো নয়; রাশি রাশি, অজস্র শরতের সকালে ঝরে’ পড়া শেফালির মত, বর্ষায় গ্রামের পুকুরে কচুরি পানার মত অগুনতি। রুল টানা, মসৃণ কাগজে কোণবহুল হস্তাক্ষরে লেখা তা’র সব পদ্য ও যে ধৈর্য্য ধরে’ অত লিখতে পারতো সেই জন্যেই ওকে প্রশংসা করতে হয়। শুধু অবিশ্রান্ত, অক্লান্ত লিখে যাবার ক্ষমতা যদি কাব্য বিচারের একটা মান হ’তো, ভবভূতির আসন তা হ’লে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যেও অনেক উপরে প্রতিষ্ঠিত হ’তো, সন্দেহ নেই। ওর সঙ্গে আমার যখন ছাড়াছাড়ি হয়, তা’র পর থেকে এই ক’বছর ও অবিচলভাবে কবিতার পিছনে লেগে রয়েছে, অবিশ্রান্ত লিখে লিখে একদিন ও আমার কাছে স্বীকার করে’ ফেললো ছোট একটা পোর্টম্যান্টওয় ভরে’ রেখেছে; মাঝে মাঝে বা’র করে’ নিজেই সেগুলো পড়েছে। অন্যকে পড়াবার ইচ্ছে যে ওর না ছিলো, তা নয়; মানুষমাত্রেরই সে ইচ্ছে হ’য়ে থাকে। সে উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সাময়িক পত্রে ও বার বার কবিতা পাঠিয়েছে; বেশির ভাগ ফেরৎ এসেছে; কোনোখান থেকে বা ফেরও আসে নি। মোট কথা, এ পৰ্য্যন্ত একটা লেখাও প্রকাশ করতে ভবভূতি সক্ষম হয় নি। কিন্তু তা’তে কিছুমাত্র নিরুৎসাহ না হ’য়ে ও আরো লিখতে বসে গেছে। এমন অধ্যবসায়, এমন অবিচল নিষ্ঠা বাঙালি জাতে বিরল।
বাংলাদেশের সাময়িকপত্র সাধারণত পদ্য একটু চলনসই হ’লেই ছাপে, এবং তা দুটো কারণে। প্রথমত, তা’র জন্যে পয়সা দিতে হয় না; এবং, বাড়তি স্থান পূরণের উপায় হিসেবে পদ্যের মত কিছু নেই। এই অবস্থাতেও, কোনো পত্রিকাই যখন ভবভূতির কোনো রচনাকেই স্থান দিতে স্বীকৃত হয় নি, এ থেকেই বোঝা যায়, ওর পদ্য কী শ্রেণীর। অবিশ্যি, ভবভূতির কাছে যা মনে হ’তো সম্পাদকদের অন্ধ অবিচার, তা নিয়ে ওর মনে একটু আক্ষেপ ছিলো। স্বভাবতই। সেটা মোটেও পরিস্ফুট নয়, কিন্তু টের পাওয়া যেতো। মাঝে মাঝে ও আমাকে এই ধরণের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতো, ‘তোমার কি মনে হয়, রামতনু, আমার কোনো কবিতা ছাপা যেতে পারে?’
‘আমাদের সাহিত্যের বর্তমান অবস্থায়’, গম্ভীরমুখে আমি হয় তো বলতুম, ‘নয়।’
‘নয়!’ ভবভূতির মুখ শুকিয়ে যেতো।
‘না। কারণ তোমার কবিতার মর্ম্ম গ্রহণ করবার মত সূক্ষ্ম রসবোধ এ দেশে এখন পর্য্যন্ত খুব কম লোকেরই হয়েছে। কে বুঝবে তোমার লেখা? তুমি তো আর সাধারণ, জল ভাত গোছের লেখক নও, যা’র লেখা যে কোনো লোক পড়ে’ই বুঝে ফেলতে পারে। বিশেষ, কাগজের সব সম্পাদক তাদের মাথায় কি কিছু আছে? আমি যদি তুমি হুতুম, আমি তো কক্ষনো কোথাও লেখা পাঠাতুম না। এত ভালো যে লেখে, তার আবার ভাবনা কী?’
‘কাগজের সম্পাদকরা’, আমার কথাগুলো উগ্র মদের মত ভবভূতির সাহস বাড়িয়ে দিতো, ‘একটু যেন কেমন না? যে সব লেখা আসে, হয় তো না পড়ে’ই বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেন্? হয় তো বিশেষ কয়েকজন বন্ধু বা আত্মীয়ের বাইরে কারো লেখা নেই না?’
‘আর বোলো না ও কথা। কাগজের আপিসের ব্যাপার সবই তো জানি! এক এক জায়গায় এক এক দল ঘোঁট পাকিয়ে বসে’ আছে বাইরের কাউকে ঢুকতে দিতে কি চায়!’
‘হুঁ।… আচ্ছা, তোমার তো কোনো কোনো কাগজে জানাশোনা আছে। তুমি চেষ্টা করলে পারো না ’
‘চেষ্টা! তোমার কবিতার জন্য চেষ্টা করতে হবে কেন? সেটাই যে তোমার পক্ষে অপমান। লোকে তোমাকে লুফে নেবে, তোমার পায়ে ধরে’ সাধাসাধি করবে। তুমি তো আর দু’ একদিনের শস্তা খ্যাতির জন্য হাত পাততে যাবে না। তুমি যা লিখছো, তা যে চিরকাল থাকবে। তখন আজকাল যা’রা খুব আগডুম বাগডুম করছে, কোথায় থাকবে তা’রা? সম্প্রতি, লেখা ছাপা হওয়া আর না হওয়া কী এসে যায় তা’তে? তুমি যদি হাত পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে থাকো, তা হ’লেই বা তোমাকে আটকাবে কে? সময়ের বিচারে জয় তোমার হবেই।”
এ সব কথা বলতাম; কিন্তু নিশ্চিত অমরত্বের আশ্বাসেও ভবভূতির মন সম্পূর্ণ সান্ত্বনা মানতো বলে’ মনে হ’তো না। আশুলভ্য খ্যাতির অসারতা সম্বন্ধে তা’কে বোঝাতে বাকি রাখি নি তবু মাসিকপত্রে কবিতা ছাপানোর লোভ সে কিছুতেই গোপন করতে পারতো না। আমার পরিচিত যা দু’একটা নব্য কাগজ তখন ছিলো, সেখানে তা’র লেখা পাঠাতে স্পষ্টভাবে কি প্রকারান্তরে একটু সুযোগ পেলেই আমাকে অনুরোধ করতে তা’র ভুল হ’তো না; নানা অছিলায় আমি সে সব এড়িয়ে যেতাম। শেষ পর্য্যন্ত এক বছর কলেজ ম্যাগাজিনের ভার ছিলো আমার উপর; কলেজ ম্যাগাজিনগুলোর যা হাল হ’য়ে থাকে, ভবভূতির পদ্যের মত লেখাও তা’র কোনো ক্ষতি করতে পারে না; সুতরাং সেখানে অপরিবর্ত্তিত, বিশুদ্ধ অবস্থায় দিলাম ওর এক পদ্য ঢুকিয়ে। (বদলাতে গেলে নতুন করে’ লিখতে হ’তো তাই সে চেষ্টাও করলাম না।) ভবভূতির সমস্ত জীবনের পর্বত প্রমাণ সাহিত্যসৃষ্টির মধ্যে ঐ একটিমাত্র লেখা ছাপার অক্ষরে বিদ্যমান।
ভবভূতিকে আমি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে তা’র লেখা হচ্ছে সর্ব্বোচ্চশ্রেণীর, এবং সেই জন্যই যেমন চিরকাল হ’য়ে এসেছে সাধারণের সমাদর পেতে তা’র দেরি হচ্ছে। তবে সেটা আসবে অনিবার্য্যরূপে, যেদিনই এবং যেভাবেই হোক। এবং তখন আজকের বাজারে লোকের চাহিদা অনুসারে খেলো জিনিস তৈরি করে’ যা’রা নাম কিনছে কোথা থাকবে তা’রা? মুখে প্রকাশ না করলেও, এই ধারণা যে ওর মনে বদ্ধমূল হ’য়ে গেছে, তা আমি বুঝতে পারতাম। আমার দিক থেকে এ আচরণ অসঙ্গত, অন্যায় এমন কি, একটু হীন মনে হ’তে পারে। ঠিকই, মাঝে মাঝে সে কথা মনে করে আমার লজ্জা হয়, তা’র বেশি দুঃখ হয়। কিন্তু তখন ওকে নিয়ে মজা করবার জন্য যে আমি ও সব কথা বলতুম, তা নয়। এ ছাড়া আর কোন্ কথা বলে ওকে সান্ত্বনা দেয়া যেতো? সত্যি যেটা, তা বললে বড় নিষ্ঠুর হ’তো, বড় বেশি নিষ্ঠুর হ’তো। খামকা একজন নিরীহ, নির্দোষ লোকের মনে কষ্ট দিয়ে সত্যবাদিতার গৌরবে উল্লসিত হওয়া তা’র আমি কোনো সার্থকতা দেখি নে। অবিশ্যি অতদূর না গিয়ে মোলায়েম করে’ বলা যেতো, ওকে বুঝিয়ে দেয়া যেতো কিন্তু মুখে আমি যা বলি, ও তা ই একেবারে বিশ্বাস করে ফেলবে, ওর বুদ্ধি যে এতই কম, তা আমি মনে করতে পারি নি। ও যে ও সব কথা বিশ্বাস করতে পেরেছিলো, তা’তেই প্রমাণ হয় যে যে কোনো অবস্থাতেই ও অসম্ভব আত্মবঞ্চনা অভ্যেস করতে পারতো।
এখানে কয়েকটা বছর বাদ দিয়ে যাচ্ছি; কারণ এই সময়ে ভবভূতি দ্বিতীয়বার আমার দিগন্ত থেকে অন্তর্হিত হ’লো। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে আমি এসে ইউনিভার্সিটিতে ভর্ত্তি হ’লাম, আর ভবভূতি পরীক্ষায় ফেল করে’ কোথায় যে মিলিয়ে গেলো, তা’র আর কোনো দিশে পাওয়া গেলো না। ভবভূতি এমন লোক নয়, যা’র অভাব কেউ কখনো অনুভব করতে পারে; সুতরাং ওর দিশে পাবার আমি কোনো চেষ্টা করলাম না। চেষ্টা করলেও যে পেতাম, তা নয়। ও অদৃশ্য হ’য়ে গেলো, স্রেফ অদৃশ্য হ’য়ে গেলো। পাঁচ বছর পরে এক সন্ধ্যায় হ’লো ওর পুনরাবির্ভাব কলকাতায় এক বাস্ এর মাথায়। ক্লাইভ স্ট্রীটের মোড়ে আমার পাশে একজন এসে বসলো, টের পেয়েছিলুম; কিন্তু রাস্তার দিকেই তাকিয়ে যেতে লাগলুম; বাস্ এ যেতে যেতে যেকেউ আপনার পাশে এসে বসে, তা’রই মুখের দিকে তাকাবার কথা আপনার মনে হয় না। কিন্তু সেই পার্শ্ববর্ত্তী ব্যক্তি যদি আপনাকে নাম ধরে ডাকে, আপনি চমকে ফিরে তাকান; এবং রীতিমত একটা ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়েন, যখন দেখতে পান, এমন একজন লোক আপনার পাশে বসে আছে, এই পৃথিবীতে যা’র অস্তিত্ব সম্বন্ধে আপনি বছরের পর বছর সম্পূর্ণ নিশ্চেতন ছিলেন।
ভবভূতির গালে তিনদিনের দাড়ি, মুখে চোখে এক সম্পূর্ণ দীর্ঘ দিনের মস্তিষ্কহীন, যান্ত্রিক কাজের ক্লান্তি। তার চুলের ভাগ রেখা লক্ষ্য করলুম এতদিনে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় হয়েছে; তৈলাক্ত, সুবিন্যস্ত মাথায় সমস্ত দিন আপিস করবার পরও একটি চুল এদিক ওদিক নয়। তার মলিন শার্টের বোতামগুলো এখন ঠিকই আছে। প্রায় তেমনি রোগা, পাঁচ বছর আগে তা কে যেমন দেখেছিলুম; সমস্ত শরীরের মধ্যে শুধু মুখের উপর সময়ের চিহ্ন পড়েছে প্রথম যৌবনের তীক্ষ্ণ আত্ম সচেতনতা প্রসূত অস্বস্তির ভাব কেটে গিয়ে এখন তা সাবালকতায় স্বচ্ছন্দ, আত্মস্থ হয়েছে। না তা’রও বেশি : সে মুখ পরিপক্ক, অতিরিক্ত পরিপক্ব; অকাল প্রৌঢ়ত্বের ছায়ায় সে মুখ স্থবির, অনেকটা ব্যঞ্জনাহীন হ’য়ে পড়েছে। ওর চোখের ভীত, অসহায় দৃষ্টি এখন ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন।
