অষ্টাদশ পর্ব

॥ আদি পর্ব ॥

॥ অষ্টবসুকে অভিশাপ দিলেন বশিষ্ঠ ॥

বশিষ্ঠের কামধেনু নন্দিনীকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে চুরি করে লুকিয়ে রেখেছেন অষ্টবসু। অষ্টবসু মানে দক্ষরাজকন্যা বসুর গর্ভজাত ধর্মের আট ছেলে। বশিষ্ঠ মুনি তো রেগেই আগুন। অভিশাপ দিলেন, ‘তোরা মর্তে মানুষ হয়ে জন্মাগে যা।’

সর্বনেশে কাণ্ড! মানুষ হয়ে জন্মাতে হবে? অষ্টবসু ছুটলেন গঙ্গার কাছে। ‘রক্ষে কর মা।’

‘আহারে বাছারা!’ গঙ্গা অভয় দিলেন, ‘চিন্তা করিসনে। আমি তোদের মা হয়ে জন্মাব। তোদের জন্মের সাথে সাথেই আমারই জলে তোদের ফেলে দেব। তোরা দৌড়ে চলে আসবি আবার স্বর্গে। বেশিক্ষণ তোদের মর্তে কাটাতে হবে না।’

॥ গঙ্গাকে বিয়ে করলেন শান্তনু ॥

হস্তিনাপুরের রাজা প্রতীপের ছেলে শান্তনু একদিন গঙ্গার ধারে বেড়াচ্ছেন। হঠাৎ দেখেন এক অপরূপ সুন্দরী যুবতী গঙ্গা থেকে উঠে এলেন। ‘দেবী নাকি! নাকি অপ্সরা। এত রূপ! এত যৌবন! এঁকে আমার চাই-ই চাই।’

‘কে আপনি দেবী? আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?’ শান্তনুর গলায় আকুতি। চোখে তৃষ্ণার্ত মিনতি।

‘মহারাজ শান্তনুর জীবনসঙ্গিনী হওয়া তো পরম সৌভাগ্যের কথা। কিন্তু, আমার দুটো শর্ত আছে মহারাজ।

‘আমি আপনার সব শর্ত মানতে রাজি দেবী।’ শান্তনু তখন প্রেমে উন্মাদ।

‘প্রথম শর্ত: আমি কে, কখনও জানতে চাইবেন না। দ্বিতীয় শর্ত: আমার কোনও কাজের ব্যাখ্যা জানতে চাইবেন না। শর্ত লঙ্ঘন করলেই আমি চলে যাব।’

‘তথাস্তু। এস দেবী। আমার বাহুবন্ধনে ধরা দাও। আমি যে তোমার জন্যে নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত।’ শান্তনুর আর্তি।

॥ জন্মগ্রহণ করলেন ভীষ্ম ॥

একে একে সাত সন্তানকে জন্মের সাথে সাথেই গঙ্গাগর্ভে জীবন্ত সলিল-সমাধি দিলেন গঙ্গা। বিস্মিত, বিচলিত, বজ্রাহত শান্তনু শর্ত লঙ্ঘনের ভয়ে দাঁতে দাঁত চেপে নীরবে সহ্য করলেন সব।

কিন্তু অষ্টম সন্তানের বেলায় সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল শান্তনুর। ‘দাঁড়াও! তুমি কে বল? আর তোমার এই নিষ্ঠুরতা, এই উন্মাদনার কারণ কি আমাকে বল।’

সব খুলে বললেন গঙ্গা। শান্তনু শান্ত হলেন। গঙ্গা বললেন, ‘এ ছেলেটিকে আমি সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি। সময়মতো তোমায় ফিরিয়ে দেব। এই-ই নন্দিনী হরণের মূলে ছিল। তাই একে বেশি দিন মর্তবাস করতে হবে। পূর্ব জন্মে এই ছিল অষ্টম বসু।’

কথামতো ছত্রিশ বছর পরে আদর্শ রাজা হবার সব শিক্ষা দিয়ে শান্তনুর হাতে ছেলেকে ফিরিয়ে দিলেন গঙ্গা। ছেলের নাম হল দেবব্রত। দেবব্রতকে যুবরাজ রূপে অভিষিক্ত করলেন শান্তনু।

॥ সত্যবতী ॥

সেবার ছিল গঙ্গা। এবার যমুনা। যমুনায় খেয়া পারাপার করছিলেন দাশরাজকন্যা জেলের মেয়ে সত্যবতী। রূপ যেন ফেটে পড়ছে। সুতরাং আবার সেই রূপসাগরেই ডুব দিলেন শান্তনু।

দাশরাজ বললেন, ‘সত্যবতীর সাথে আপনার বিয়ে হলে সত্যবতীর ছেলেকেই রাজা করতে হবে।’

‘না! না! এ কথা শোনাও পাপ। এ অসম্ভব! কিন্তু সত্যবতী? তাকে ছেড়েই বা আমি বাঁচব কেমন করে?’ চিন্তায় আহার-নিদ্রা ত্যাগ করলেন শান্তনু।

॥ ভীষণ প্রতিজ্ঞা করলেন ভীষ্ম ॥

সব জানতে পেরে দেবব্রত ছুটলেন দাশরাজের কাছে। ‘দয়া করে আমার বাবাকে বাঁচান। আমি কথা দিচ্ছি, মা সত্যবতীর ছেলেই হস্তিনাপুরের রাজা হবে।’

দাশরাজ বললেন, ‘আপনি না হয় রাজসিংহাসন থেকে আপনার দাবি তুলে নিলেন। কিন্তু আপনার ছেলেরা? তারা যে তাদের অধিকার ছেড়ে দেবে তার কী নিশ্চয়তা আছে?’

‘আছে। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, আমি বিয়ে করব না। চিরকুমার থাকব।’

দেবতা, ঋষি, অপ্সরা—সবাই মিলে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন দেবব্রতের মাথায়। ‘এ যে ভীষণ প্রতিজ্ঞা! আর প্রতিজ্ঞায় যিনি ভীষণ তাঁর নামই তো ভীষ্ম। কাজেই এঁর নাম হোক ভীষ্ম।’

‘পিতার জন্যে এত বড় আত্মত্যাগ!’ শান্তনু বললেন, ‘আমি বর দিচ্ছি, তোমার ইচ্ছামৃত্যু হবে। সত্যবতীকে পেলেন শান্তনু। সত্যবতীর গর্ভে তাঁর দুই ছেলে হল। চিত্রাঙ্গদ আর বিচিত্রবীর্য। ছেলেরা বড় হবার আগেই মারা গেলেন শান্তনু।

॥ রাজা হলেন বিচিত্রবীর্য ॥

চিত্রাঙ্গদের মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিলেন স্বয়ং ভীষ্ম—যাঁর নিজেরই আজ সে মুকুট পরার কথা। একেই বলে অদৃষ্টের পরিহাস।

চিত্রাঙ্গদ ওই ‘চিত্রাঙ্গদ’ নামেরই এক গন্ধর্বরাজার সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে অকালে মারা গেলেন। কিন্তু বিচিত্রবীর্য যে নেহাতই নাবালক। কাজেই ভীষ্মই বিচিত্রবীর্যের অভিভাবকরূপে রাজকার্য দেখাশোনা করতে লাগলেন। প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিচিত্রবীর্যই রাজা হলেন।

॥ অম্বা-অম্বিকা-অম্বালিকা ॥

এবার তো রাজার বিয়ে দিতে হয়। বড়দা ভীষ্ম কাশীরাজের তিন পরমাসুন্দরী মেয়ে অম্বা, অম্বিকা আর অম্বালিকাকে স্বয়ংবর সভা থেকে জোর করে তুলে আনলেন। উদ্দেশ্য, ছোট ভাইটির সাথে একসঙ্গে তিন কন্যের বিয়ে দেবেন।

কিন্তু না। বাদ সাধলেন অম্বা। আগে তিনি শাম্বরাজকে মনে মনে পতিরূপে বরণ করেছিলেন বটে। কিন্তু এখন ভীষ্মকে দেখে শাম্বরাজকে ভুলে গেলেন। ভীষ্মকে প্রেম নিবেদন করলেন অম্বা।

চমকে উঠলেন ভীষ্ম! ‘এ অসম্ভব প্রস্তাব! আমি যে চিরকুমার!

প্রত্যাখ্যাত হয়ে ভীষ্মকে অভিশাপ দিলেন অম্বা। ‘তুমি আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছ। বেশ! আমিও অভিশাপ দিচ্ছি, আমি আগামী জন্মে তোমার মৃত্যুর কারণ হব।’

আগুনে আত্মাহুতি দিলেন অম্বা। পরের জন্মে শিখণ্ডী হয়ে সত্যিই ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হলেন। যদিও সে মৃত্যুও ভীষ্মের স্বেচ্ছায় বরণ করা। কারণ পিতা যে তাঁকে ইচ্ছামৃত্যু বর দিয়েছিলেন।

দুই রূপসী স্ত্রী নিয়ে ভোগে মেতে রইলেন বিচিত্রবীর্য। দাদা চিত্রাঙ্গদের মতোই তিনিও অকালে নিঃসন্তান অবস্থায় প্রাণ হারালেন।

॥ ধৃতরাষ্ট্র-পাণ্ডু-বিদুর ॥

বংশরক্ষা হবে কি করে? সত্যবতীর অনুরোধে তাঁরই কানীন পুত্র (কুমারী অবস্থার পুত্র) ব্যাসদেব অম্বিকার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র, অম্বালিকার গর্ভে পাণ্ডু আর রাজবাড়ির এক দাসীর গর্ভে বিদুর—এই তিন ছেলের জন্ম দিলেন।

ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ ছিলেন। তাই রাজা হতে পারলেন না। রাজা হলেন পাণ্ডু। তাঁর গায়ের রঙ ছিল পাণ্ডু অথাৎ হলুদ। তাই তাঁর পাণ্ডু নাম।

বিদুর ছিলেন খুবই ন্যায়পরায়ণ। তিনি সবসময় সদ্‌বুদ্ধি এবং সৎ পরামর্শ দিতেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন। মহা ধার্মিক ছিলেন তিনি।

ধৃতরাষ্ট্রের সাথে বিয়ে হল গান্ধাররাজ সুবলের মেয়ে গান্ধারীর। গান্ধারীর ত্যাগের তুলনা হয় না। স্বামী জন্মান্ধ বলে তিনিও সারা জীবন এক কাপড়ের পট্টি দিয়ে নিজের চোখ বেঁধে রাখতেন। অসাধারণ বিদুষী ছিলেন তিনি।

॥ জন্ম হল কৌরব এবং পাণ্ডবদের ॥

ব্যাসদেব বর দিয়েছিলেন গান্ধারীকে ‘তুমি শত পুত্রের জননী হবে মা।’ গান্ধারীর গর্ভে ধৃতরাষ্ট্রের একশ ছেলে আর এক মেয়ে হল। ছেলেদের নাম দুর্যোধন, দুঃশাসন, বিকর্ণ ইত্যাদি। মেয়েটির নাম দুঃশলা।

গান্ধারী গর্ভবতী থাকাকালীন সৌবলী নামে এক বৈশ্যা দাসী ধৃতরাষ্ট্রের পরিচর্যা করতেন।

সৌবলীর গর্ভে ধৃতরাষ্ট্রের যুযুৎসু নামে এক অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছেলে হল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে এই যুযুৎসু পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়েছিলেন এবং যুদ্ধের শেষে ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেদের মধ্যে একমাত্র তিনিই বেঁচেছিলেন।

পাণ্ডু বিয়ে করলেন কুন্তীভোজ রাজার পালিতা কন্যা কুন্তী আর মদ্ররাজ শল্যের বোন মাদ্রীকে।

ঋষির অভিশাপে পাণ্ডু সন্তান উৎপাদনে অক্ষম ছিলেন। পাণ্ডুর অনুরোধে কুন্তী আর মাদ্রী দেবতাদের আহ্বান জানালেন তাঁদের গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্যে। তাঁদের প্রার্থনায় সাড়া দিলেন ধর্ম, পবন, ইন্দ্র আর দুই অশ্বিনীকুমার।

ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির, পবননন্দন ভীম আর ইন্দ্রপুত্র অর্জুন জন্ম নিলেন মা কুন্তীর গর্ভে। মাদ্রীর গর্ভে জন্মালেন অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের পুত্র নকুল আর সহদেব।

কুন্তী কুমারী অবস্থায় পরীক্ষাচ্ছলে একবার সূর্যকে ডেকেছিলেন। সূর্যের ঔরসে তখন কুন্তীর গর্ভে কর্ণের জন্ম হয়। ভূমিষ্ঠ হবার পর কর্ণকে নদীতে ভাসিয়ে দেন কুন্তী। সেই সদ্যোজাত শিশুকে নদীবক্ষে দেখতে পান অধিরথ নামে এক সূত (সারথি)। অধিরথ আর তাঁর স্ত্রী রাধা নিজপুত্র জ্ঞানে পরম যত্নে কর্ণকে লালন-পালন করতে লাগলেন। তাঁরা কর্ণের নাম রাখলেন বষুসেন।

ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডু দুজনেরই নবম পূর্বপুরুষ ছিলেন কুরু—যাঁর থেকে কুরু বংশের উৎপত্তি। সে হিসেবে এঁরা এবং এঁদের বংশধররা সকলেই কৌরব। কিন্তু, ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরাই কৌরব বলে পরিচিত ছিলেন। পাণ্ডুর ছেলেদের বলা হত পাণ্ডব। কুরুর ধ্যানে ধন্য ক্ষেত্রই কুরুক্ষেত্র।

কৌরব আর পাণ্ডবদের মধ্যে যুধিষ্ঠির সবার বড়। ভীম আর দুর্যোধনের জন্ম একই দিনে।

পাণ্ডু অকালে মারা গেলেন। ধৃতরাষ্ট্র নিজের ছেলের সাথে সমস্নেহে পাণ্ডবদেরও লালন-পালন করতে লাগলেন।

॥ বিবাদ শুরু ॥

ভীমের শক্তির সাথে কেউ এঁটে উঠত না। তার অত্যাচার আর দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল কৌরবরা। প্রতিশোধ নিতে খেলাচ্ছলে খাবারে বিষ মিশিয়ে সেই খাবার ভীমকে খাইয়ে দিল। ভীম অচেতন হয়ে পড়লে তাকে কৌরবরা জলে ফেলে দিল। গড়াতে গড়াতে ভীম চলে গেল পাতালে।

অন্য পাণ্ডবরা কৌরবদের এই চক্রান্তের কিছুই জানতে পারল না। তারা ভীমকে খুঁজতে লাগল পাগলের মতো।

পাতালে সাপেরা এসে কামড়াতে লাগল ভীমকে। ভালই হল। বিষে বিষে বিষক্ষয় হল। আট দিন পর চেতনা ফিরে পেল ভীম।

নাগরাজ বাসুকি ছিলেন ভীমের দাদামশাই কুন্তীতভাজের পরমাত্মীয়। তিনি ভীমকে পেট পুরে অমৃত রসায়ন খাইয়ে দিলেন। তা খেয়ে ভীমের শক্তি শতগুণে বেড়ে গেল।

অমিত বল নিয়ে মা আর ভাইদের কাছে ফিরে এলেন ভীম। যা ঘটেছিল সব বললেন। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘কৌরবরা আমাদেরই ভাই। তাদের কলঙ্ক মানে আমাদেরই কলঙ্ক। কাজেই এ সব চেপে যাও। পাঁচ কান কর না।’

॥ দ্রোণাচার্য এলেন ॥

একটা কাঠের গোলক নিয়ে খেলছিল রাজপুত্ররা। একটা পাত্‌কোর জলে সেটা পড়ে গেল। বহু চেষ্টা করল। উঁহুঁ। না। কেউ তুলতে পারল না। এই বিদ্যের দৌড়? ছিঃ! অপমানে মাথা নিচু করে বসে রইল রাজকুমাররা।

এক ব্রাহ্মণ যাচ্ছিলেন সে পথ দিয়ে। দেখেই বেশ শ্রদ্ধা হয়। সব শুনে তিনি বললেন, ‘এই কথা? বেশ! এই আমার আংটিটা আমি জলে ফেলে দিলাম। এবার দেখ তোমাদের গোলক আর আমার আংটি—দুটোই কেমন ওপরে উঠে আসবে।’

একটা কুশঘাসকে ছুঁচলো করে কেটে ব্রাহ্মণ সেটা ছুঁড়ে মারলেন গোলক লক্ষ্য করে। ছুচলো ডগা বিঁধে গেল গোলকে। তার পেছনে আরেকটা। তার পেছনে আর একটা। এভাবে কুশগাছের এক অবিচ্ছিন্ন দণ্ড তৈরি করে সহজেই সেই গোলককে টেনে তুললেন ব্রাহ্মণ। বালকদের তো চক্ষু চড়কগাছ। আনন্দে আত্মহারা সব।

এবার ব্রাহ্মণ কুয়োতে এমন এক বাণ মারলেন যে সেই বাণ তার ডগায় আংটিটাকে নিয়ে ওপরে উঠে এল। কুমাররা আহ্লাদে আটখানা হয়ে দৌড়ে গিয়ে ভীষ্মকে সব জানাল।

ভীষ্ম তো শুনেই বুঝতে পারলেন যে নবাগত ব্রাহ্মণ স্বয়ং দ্রোণাচার্য ছাড়া আর কেউ নন। কারণ এ ক্ষমতা আর কারো নেই। তিনি নিজেই চললেন দ্রোণের কাছে। দ্রোণকে রাজপুত্রদের অস্ত্রগুরু হিসেবে নিয়োগ করলেন। এর আগে কুমাররা কৃপাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা পাচ্ছিলেন। এবার পেলেন গুরুর মতো গুরু।

দ্রোণ ভাবলেন, ‘ভালই হল। দ্রুপদকে ভালমতোই শিক্ষা দিতে পারবে এই রাজকুমাররা। এরাই নিতে পারবে আমার অপমানের প্রতিশোধ।’

মহর্ষি অগ্নিবেশের কাছে একসাথে অস্ত্রশিক্ষা করার সময় দ্রুপদ দ্রোণকে কথা দিয়েছিলেন যে, তিনি (দ্রুপদ) রাজা হলে দুই বন্ধুতে সমানভাবে ভাগ করে নেবেন সে রাজ্য। তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। দ্রোণের ছেলে অশ্বত্থামা বড়লোকের ছেলেদের মতো দুধ খাবার বায়না করায় ধনীর দুলালরা চালের পিটুলি গুলে তাকে খেতে দিল। অশ্বত্থামা ‘দুধ খাচ্ছি’ ‘দুধ খাচ্ছি’ বলে আনন্দে নাচতে লাগল। ধনীর ছেলেরা হাততালি দিয়ে বিদ্রুপ করতে লাগল। হাসতে লাগল।

দ্রোণ দেখলেন সব। বুকে অত্যন্ত আঘাত পেলেন। মনে পড়ল বন্ধুর প্রতিশ্রুতির কথা। ছুটে গেলেন দ্রুপদের কাছে।

আরও বড় আঘাত অপেক্ষা করছিল দ্রোণের জন্য। দ্রুপদ বললেন, ‘বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে। সম্পদশালী রাজার সাথে দরিদ্র ব্রাহ্মণের বন্ধুত্বের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।’

সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই দ্রোণ এসেছেন হস্তিনাপুরে।

দ্রোণের শিক্ষায় কুমাররা এক একজন মহা মহা যোদ্ধা হয়ে উঠলেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন অর্জুন। দ্রোণ বললেন, ‘অর্জুন! তোমাকে আমি এমন শিক্ষা দেব যে স্বর্গ মর্ত পাতালে তোমার সমকক্ষ কেউ থাকবে না।’

দুর্যোধনের অনুরোধে কর্ণকেও অস্ত্রবিদ্যা শেখাতে লাগলেন দ্রোণ। কর্ণ অর্জুনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেন।

॥ একলব্য ॥

নিষাদ রাজপুত্র একলব্য দ্রোণের শিষ্যত্ব প্রার্থনা করে প্রত্যাখ্যাত হলেন।

একদিন মৃগয়ায় গিয়েছেন কুমাররা। সঙ্গে ছিল এক প্রভুভক্ত কুকুর। কুকুরটা বনে ঢুকেই কিছু একটা দেখে চেঁচাতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে কুকুর ফিরে এল। সাতটা বাণ তার মুখে কোন দক্ষ ধনুর্ধর এমনভাবে ছুঁড়েছে যাতে সে চেঁচাতে না পারে। অথচ তার একফোঁটাও রক্তপাত হয়নি। বাণগুলো তার দুই চোয়ালকে আটকে রেখেছে।

বিস্ময়ে হতবাক হলেন কুমাররা। কৌতূহল নিবৃত্ত করতে বনের গভীরে গিয়ে দেখেন দ্রোণের মাটির মূর্তি গড়ে তার সামনে একাই ধনুর্বিদ্যা অভ্যাস করছেন এক বনচারী। জটাজুটধারী। পরনে কালো হরিণের চামড়া। একলব্য!

ফিরে গেলেন কুমাররা। অভিমানী অর্জন দ্রোণকে বললেন, ‘আপনি না বলেছিলেন ধনুর্বিদ্যায় ত্রিভুবনে আমার সমকক্ষ কেউ থাকবে না? কই একলব্যের এ শিক্ষা তো আমি পাইনি!’

দ্রোণ এলেন একলব্যের কাছে। মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন একলব্য। বললেন, ‘শিষ্যকে আদেশ করুন গুরুদেব।’

দ্রোণ বললেন, ‘তোমার ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা কেটে আমাকে গুরুদক্ষিণা স্বরূপ দাও।’ নিষ্ঠুর আদেশ অম্লান বদনে পালন করলেন একলব্য।

নিশ্চিন্ত হলেন দ্রোণ। এবং অর্জুন। একলব্য তাঁর দক্ষতা চিরকালের জন্যে বিসর্জন দিলেন গুরুর প্রিয়তম শিষ্য অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্বলাভের পথ নিষ্কণ্টক করতে।

॥ কুমারদের পরীক্ষা নিলেন দ্রোণ ॥

গাছের ডগায় এক কৃত্রিম পাখি বসিয়ে দ্রোণ শিষ্যদের মনঃসংযোগ পরীক্ষার জন্যে একে একে সকলকে পাখির দিকে তাক করে শরসংযোগ করতে বললেন।

সকলকেই একই প্রশ্ন করলেন, ‘কী দেখছ?’

সবাই বললেন, ‘গাছ, পাখি, আকাশ ইত্যাদি দেখতে পাচ্ছি।’

বিরক্ত হলেন দ্রোণ। সবার শেষে অর্জুন এসে বললেন, ‘আমি শুধু পাখির মাথাটাই দেখতে পাচ্ছি।’

খুশি হলেন দ্রোণ। বললেন, ‘বাণ ছোঁড়।’ অর্জুনের বাণ তৎক্ষণাৎ পাখির ধড় থেকে মাথা আলাদা করে ফেলল।

দ্রোণ বললেন, ‘তুমিই পারবে দ্রুপদকে সমুচিত শিক্ষা দিতে।’

একদিন কুমীরে ধরল দ্রোণকে। দ্রোণ নিজেই ছাড়িয়ে নিতে পারতেন নিজেকে। কিন্তু শিষ্যদের পরীক্ষা করতে ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ বলে চেঁচাতে লাগলেন। সবাই যখন অসহায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় অর্জুন তখন তাঁর পরমারাধ্য গুরুদেবকে রক্ষা করলেন অপূর্ব কৌশলে তীরের পর তীর ছুঁড়ে॥

তুষ্ট হয়ে দ্রোণ অর্জুনকে দিলেন ‘ব্রহ্মশির’ নামে এক মহাস্ত্র। বললেন, ‘একান্ত প্রয়োজন ছাড়া এ অস্ত্র ব্যবহার কর না।’

॥ প্রকাশ্য অঙ্গনে কুমারদের অস্ত্র নৈপুণ্যের প্রদর্শন ॥

দ্রোণের আগ্রহে একদিন কুমাররা প্রকাশ্যে তাঁদের লব্ধ বিদ্যার পরিচয় দিলেন সবার সামনে। দর্শকরা সবাই বাহবা বাহবা করতে লাগলেন। ভীমে-দুর্যোধনে সত্যিকার যুদ্ধ লাগার উপক্রম হলে অশ্বত্থামা তা থামিয়ে দিলেন। অর্জুন আগ্নেয় বাণে অগ্নি, বরুণ বাণে বৃষ্টি, বায়ব্য বাণে বায়ু ইত্যাদি সৃষ্টি করে ধনুর্বিদ্যায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিলেন।

তখন কর্ণও দ্রোণের অনুমতি নিয়ে অর্জুনের দেখানো রণকৌশল সব প্রদর্শন করলেন। কর্ণার্জুনের বাগ্‌যুদ্ধ শুরু হল। শেষে দুই ধনুর্ধরই যখন পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্যত, তখন কৃপাচার্য এসে বললেন, ‘কর্ণ’! অর্জুন তো পাণ্ডু আর কুন্তীর ছেলে। কুরুবংশে এর জন্ম। তোমার মা, বাবা আর বংশের পরিচয় না পেলে এ লড়াই হতে পারে না।’

কর্ণের মাথা হেঁট হয়ে গেল। কী পরিচয় দেবেন তিনি?

দুর্যোধন তক্ষুণি কর্ণকে অঙ্গরাজ্যের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করলেন।

ভীম বললেন, ‘সূতপুত্র কখনই অর্জুনের সাথে লড়াই করতে পারে না। কুকুর যেমন কখনই যজ্ঞের ভাগ পেতে পারে না।’

অপমানে রক্তিম মুখে জন্মদাতা সূর্যের দিকে তাকালেন কর্ণ। বাদানুবাদের মধ্যেই সূর্যাস্ত হল। অস্ত্ৰখেলা শেষ হল। সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তবে পাণ্ডব কৌরবের বিবাদ আর গোপন থাকল না।

॥ দ্রুপদকে শিক্ষা ॥

দ্রোণের কথামতো কুমাররা আক্রমণ করল পাঞ্চাল রাজ্য। দ্রুপদ হারলেন। মূলত অর্জুনের বীরত্বের জন্যে। দ্রোণ দ্রুপদকে বললেন, ‘তুমি কথা রাখনি। আমি রাখব। অর্ধেক রাজত্ব ফিরিয়ে দিচ্ছি যাতে বন্ধুত্ব সমানে সমানে হয়।’

॥ যুধিষ্ঠির যুবরাজ হলেন ॥

এর এক বছর পরে যুধিষ্ঠিরকে যুবরাজ করলেন ধৃতরাষ্ট্র। হিংসেয়, ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেলেন দুর্যোধন। মামা শকুনির সাথে পরামর্শ করে ধৃতরাষ্ট্রকে রাজি করালেন যে, পাণ্ডবদের কুন্তীসহ কিছু দিনের জন্যে বারণাবতে যেতে বলবেন ধৃতরাষ্ট্র।

॥ জতুগৃহ ॥

বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও অন্ধ পুত্রস্নেহে কুন্তীসহ পাণ্ডবদের বারণাবতে পাঠালেন। পুরোচন নামে এক বিশ্বাসী মিস্ত্রিকে দুর্যোধন আগেই পাঠিয়েছিলেন বারণাবতে। সে পাণ্ডবদের জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্যে শন, ধুনো, গালা, ঘি, তেল আর কাঠ দিয়ে এক জতুগৃহ তৈরি করে রেখেছিল। সামান্য আগুনের ছোঁওয়া পেলেই তা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে। ভস্ম হয়ে যাবে মা সহ পঞ্চপাণ্ডব। দুর্যোধনের রাজা হওয়ার পথ নিষ্কণ্টক হবে।

বিদুর এক বিশ্বস্ত খনক পাঠিয়ে দিলেন। খনক পাণ্ডবদের পালাবার বিরাট সুড়ঙ্গ কেটে দিল।

ভীম নিজেই আগুন লাগালেন জতুগৃহে। তারপর সবাই মিলে সুড়ঙ্গপথে পালালেন।

এক নিষাদ স্ত্রী তার পাঁচ ছেলেকে নিয়ে ঘুমোচ্ছিল জতুগৃহে। তাদের পোড়া দেহ দেখে সবাই নিশ্চিন্ত হল যে পাণ্ডবরা কুন্তীসহ পুড়ে মারা গেছে।

ধৃতরাষ্ট্র কপট বিলাপ করলেন। ভীষ্ম আর কৌরবদের নিয়ে গঙ্গায় তর্পণ করলেন পাণ্ডবদের উদ্দেশ্যে।

॥ হিড়িম্বা ॥

শ্রান্ত ক্লান্ত পাণ্ডবরা পিপাসার্ত হয়ে এক বটগাছের তলায় বসলেন। সারসের ডাক শুনে ভীম বললেন, ‘কাছে নিশ্চয়ই জল আছে। আমি জল আনতে যাচ্ছি। তোমরা বিশ্রাম নাও।’

নিজের কাপড় ভিজিয়ে জল আনলেন ভীম। দেখেন সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছেন। ডাকলেন না।

সেই বনে থাকত ভয়ঙ্কর হিড়িম্ব রাক্ষস। সে মানুষের গন্ধ পেয়ে বোন হিড়িম্বাকে পাঠাল মানুষ ধরে আনতে।

হিড়িম্বা ভীমকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। তার দেরি দেখে ছুটে এল হিড়িম্ব। ভীম তাকে আছড়ে পিটিয়ে মেরে ফেললেন।

মায়ের নির্দেশে হিড়িম্বাকে বিয়ে করলেন ভীম। হিড়িম্বার ঘটোৎকচ নামে এক ছেলে হল।

॥ বক রাক্ষস ॥

ঘুরতে ঘুরতে পাণ্ডবরা এলেন একচক্রা গ্রামে। আশ্রয় নিলেন এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে। সেখানে তাঁরা ব্রাহ্মণ সেজে ভিক্ষে করতেন।সে গ্রামে বক নামে এক মহা বদ রাক্ষস থাকত। তার শর্ত হচ্ছে প্রতিদিন গ্রামের একজন লোক প্রচুর ভাত আর মোষের মাংস নিয়ে যাবে তার জন্যে। সে ওই মানুষটি সহ সব উদরসাৎ করবে।

একদিন পাণ্ডবদের আশ্রয়দাতা ব্রাহ্মণদের পালা এল। কান্নাকাটি পড়ে গেল বাড়িতে। কুন্তী আশ্বস্ত করলেন, ‘আজ ভীম যাবে। কোনও ভয় নেই। সে বককে যমালয়ে পাঠাবে আজ।’

ভীম বকের খাবার বকের সামনে নিয়ে নিজেই খেতে শুরু করলেন। বক, কিল চড় ঘুসি মেরেও ভীমের আহারে কোনও ব্যাঘাত ঘটাতে পারল না। বেশ চেটেপুটে খেয়ে ভীম এবার বকের দিকে মনোযোগ দিলেন। একেবারে পিষে মেরে ফেললেন।

বকের আর্তনাদ শুনে দৌড়ে এল যত রাক্ষসের দল। ভীম গর্জে উঠলেন, ‘সাবধান! ফের তোরা মানুষ খাবি তো সব ব্যাটাকে যমালয়ে পাঠাব।’

রাক্ষসেরা বলল, ‘আজ্ঞে! এই নাক মলছি, কান মলছি। আর কখনো এমন কাজ করব না।’

॥ দ্রৌপদী ॥

দ্রোণের কাছে চরম অপমানিত হবার পর দ্রুপদ এক যজ্ঞের আয়োজন করলেন। যাতে এমন একটি ছেলে হয় যে দ্রোণকে বধ করে এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে পারবে।

যজ্ঞের ধোঁয়া থেকে বেরিয়ে এল এক জ্যোতির্ময় ছেলে। ধৃষ্টদ্যুম্ন। সে সত্যিই পরে দ্রোণকে মেরেছিল। অবশ্য অসৎ উপায়ে।

আর বেরিয়ে এল এক জ্যোতির্ময়ী মেয়ে। গায়ের রঙটি চাপা বটে। কিন্তু কী তার রূপ! চোখ ফেরানো যায় না। হবে নাই বা কেন? স্বয়ং মা লক্ষ্মীই যে দ্রুপদ রাজার মেয়ে হয়ে জন্মেছেন। সে আর এক কাহিনী।

মেয়ের কত নাম। দ্রুপদের মেয়ে। তাই দ্রৌপদী। কৃষ্ণবণা। তাই কৃষ্ণা। যজ্ঞ থেকে উদ্ভূতা। তাই যাজ্ঞসেনী। পাঞ্চালরাজদুহিতা। তাই পাঞ্চালী।

সেই দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভা। একচক্ৰায় খবর পেলেন পাণ্ডবেরা। চললেন পাঞ্চাল। পথে গন্ধর্ব চিত্ররথকে লড়াইতে হারালেন অর্জুন। তাঁর কাছে শিখলেন ‘চাক্ষুসী’ বিদ্যা। অনেকটা আজকালকার টিভির মতো। ‘চাক্ষুসী’র দৌলতে তিন লোকের কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে অর্জুন সব দেখতে পেতেন।

পাঞ্চালে পৌঁছে পাণ্ডবরা এক কুমোরের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। একচক্রার মতোই এখানেও ব্রাহ্মণের বেশ ধরে ভিক্ষে করে খান।

স্বয়ংবর সভায় অনেক হাঁকডাকওয়ালা রাজারাজড়ারা এসেছেন। ঋষি গন্ধর্বরা এসেছেন। আর এসেছেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। আর বলরাম।

পাণ্ডবরা ছদ্মবেশেই এসেছেন। কৃষ্ণ-বলরামকে সভায় দেখেই পাণ্ডবরা মনে মনে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানালেন তাঁদের চরণে।

কৃষ্ণ ছাইচাপা আগুনের মতো ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশধারী পাণ্ডবদের দেখেই ফিসফিস করে বলরামের কানে বললেন, ‘পাণ্ডবদের চিনতে পারছ? জতুগৃহে যে তারা পোড়েনি তা আমি জানতাম।’

ধৃষ্টদ্যুম্ন যখন কনে দ্রৌপদীকে নিয়ে সভায় ঢুকলেন, তখন সারা সভায় গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল সেই অনিন্দ্যসুন্দরীর গুণগানে।

ধৃষ্টদ্যুম্ন বললেন, ‘এই আমার বোন দ্রৌপদী। ওপরে রয়েছে ওই লক্ষ্য। তার তলায় চক্রাকার যান্ত্রিক পথ। ওই পথের ভেতর দিয়ে তীর চালিয়ে যিনি লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন, আমার বোন তাঁরই গলায় মালা দেবে। তা তিনি যে নামের, যে গোত্রেরই হন না কেন।

একে একে রথী মহারথীরা এলেন। ধরাশায়ী হয়ে লজ্জায় নতমুখে ফিরে গেলেন। এলেন কর্ণ। দ্রৌপদী বললেন, ‘সারথির ছেলের গলায় আমি কিছুতেই মালা দেব না।

ঠোঁটের কোণে ভ্রূকুটির হাসি ফুটিয়ে ক্রোধকে চাপতে চেষ্টা করলেন কর্ণ। কিন্তু ক্রোধ কি চাপা যায়? রাগে শরীর থর্‌ থর্‌ করে কাঁপতে লাগল। পিতা সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সংযত করে ফিরে এলেন নিজের আসনে।

রাজাদের পালা শেষ। সবাই পরাস্ত। অপমানিত। এক ব্রাহ্মণ উঠে দাঁড়ালেন। কেউ বললেন, ‘আরে এ ব্রাহ্মণের কি মতিভ্রম হল নাকি? কত হাতি গেল তল, মশা বলে কত জল।’

অন্য অনেকেই বললেন, ‘না হে। এ পারবে। দেখছ না কী তাগড়াই চেহারা! শালপ্রাংশু! বৃষস্কন্ধ! আজানুলম্বিত বাহু! ময়দানের মতো ছড়ানো বুক। পদ্মের মতো চোখ! আর সে চোখে কী প্রতিজ্ঞা! কী আত্মবিশ্বাস! চলছে দেখ! যেন সিংহটি! এদিকে হিমালয়ের মতো ধীর! ধৈর্যশীল! এ পারবেই পারবে।’

অর্জুন ধৃষ্টদ্যুম্নকে বললেন, ‘ব্রাহ্মণের গলায় মালা দিতে আপনার বোনের আপত্তি নেই তো?’

‘আপত্তি? আমি যে তোমারই অপেক্ষায় এতকাল পথ চেয়ে আছি হে হৃদয়নাথ। তুমি হয়তো তা জান না। কিন্তু আমি জানি। আর জানেন অন্তর্যামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তুমি আমাকে গ্রহণ করে আমার জীবনকে ধন্য কর।’ কৃষ্ণা অর্জুনকে দেখে চঞ্চল হয়ে উঠলেন।

ধৃষ্টদ্যুম্ন বললেন, ‘না। আপত্তি নেই।’ মহাদেব আর কৃষ্ণকে মনে মনে প্রণাম জানিয়ে অক্লেশে লক্ষ্যভেদ করলেন অর্জুন। ধন্য ধন্য পড়ে গেল সভায়। দেবতারা আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করলেন। বেজে উঠল তুরী-ভেরী। গায়করা গাইতে লাগলেন অর্জুনের জয়গান।

আর দ্রৌপদী? আনন্দে আর উত্তেজনায় এবার বুঝি তাঁর সংজ্ঞালোপ হবে। তাঁর পা কাঁপছে! কম্পিত ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এলেন অর্জুনের সামনে। সব লজ্জার আবরণ ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে তাঁর। অর্জুনের গলায় মালা পরিয়ে দিলেন। নিৰ্ণিমেষ দৃষ্টিতে দেখলেন অর্জুনকে। কৃষ্ণকে মনে মনে প্রণাম জানালেন কৃষ্ণা। শুরু হল তাঁর সুখ, নাকি অনন্ত দুঃখের দিন, কে জানে?

এদিকে হেরে যাওয়া রাজারা এক ব্রাহ্মণ দ্রৌপদীকে নিয়ে যাচ্ছে দেখে দ্রুপদকে আক্রমণ করলেন। অর্জুন তীরধনু নিয়ে দ্রুপদকে রক্ষা করতে লাগলেন। আর ভীম বড় বড় গাছ দিয়ে পিটিয়ে রাজাদের একেবারে তুলোধোনা ধুনে দিলেন।

এদিকে কুন্তী ভাবছেন, ‘কী ব্যাপার! সেই কখন ভিক্ষেয় বেরিয়েছে বাছারা আমার! এত রাত হল। তবু ফেরে না কেন?’

‘মা। আজ তোমার জন্যে কী ভিক্ষে এনেছি দেখ।’

যুধিষ্ঠিরের গলা না? ‘যা এনেছ পাঁচ ভাই মিলে মিশে ভাগ করে নাও বাবা।’ ঘরের ভেতর থেকেই নির্দেশ দিলেন কুন্তী।

মাতৃআজ্ঞা শিরোধার্য। কাজেই পঞ্চস্বামীর গলাতেই মালা দিলেন দ্রৌপদী।

‘কে? কে ওখানে? আরে! সখা কৃষ্ণ! বলরাম! তোমরা এখানে কেমন করে?’

অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে কৃষ্ণ বললেন, ‘আমরা তোমাদের চিনতে পেরেছি।’ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘আগুন কখনও ছাই চাপা থাকে না। তবু আরও কিছু দিন ছদ্মবেশে থাকুন।’

দ্রুপদের কানে ঠিক পৌঁছে গেল তাঁর জামাইদের পরিচয়। আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। এমন জামাই-ই তো চেয়েছিলেন তিনি।

॥ ঘরে ফেরা ॥

খবরটা জানাজানি হয়ে গেল। বিদুর দৌড়ে গিয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে সুখবরটা দিলেন। ধৃতরাষ্ট্র জতুগৃহের ব্যাপারে মনে মনে অনুতপ্ত ছিলেন। এ খবর শুনেই বললেন, ‘বিদুর এখুনি ওদেরকে ফেরাও। দ্রৌপদীকে যথোচিত মর্যাদায় বরণ কর। রাজপুরীতে উৎসব লাগিয়ে দাও।’

দুর্যোধন, কর্ণ চাইলেন এখনই শত্রকে নির্বংশ করতে। ধৃতরাষ্ট্রের মন বিষিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন তাঁরা। ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর সবাই একবাক্যে বললেন, ‘রাজ্য দু’ভাগ করে দিন মহারাজ। সবাই সুখে থাকুক।’

এদিকে পাণ্ডবরা ফিরে এলেন কৃষ্ণের পরামর্শে। হস্তিনাপুরবাসীরা তাদের শতায়ু কামনা করে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিলেন নগরীতে।

॥ খাণ্ডবপ্রস্থ ॥

ধৃতরাষ্ট্রের নির্দেশে রাজ্য দু’ভাগ হল। পাণ্ডবরা গেলেন খাণ্ডবপ্রস্থ বা ইন্দ্রপ্রস্থে। আর কৌরবরা রয়ে গেলেন হস্তিনাপুরেই।

দেখতে দেখতে খাণ্ডবপ্রস্থ এক বর্ণাঢ্য মনোরম নগরীর চেহারা নিল। সত্যনিষ্ঠ প্রজাবৎসল রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজ্যে লক্ষ্মী-সরস্বতী অচলা হয়ে রইলেন। প্রজারা সবাই খুব সুখী।

॥ অর্জুনকে যেতে হল বনবাসে ॥

‘চোর! চোর! আমার গরু নিয়ে পালাল।’ এক অসহায় ব্রাহ্মণের আর্তনাদ।

‘ভয় নেই! আমি এখুনি অস্ত্র নিয়ে আসছি।’ অভয় দিলেন অর্জুন।

তারপর অস্ত্র নিতে ঢুকলেন অস্ত্রাগারে। কিন্তু মহা ভয় যে অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্যে অর্জুন তা কি জানতেন? অস্ত্রাগারে তখন যুধিষ্ঠির আর দ্রৌপদী! শর্তমতো এক ভাই যখন দ্রৌপদীকে নিয়ে কোনও ঘরে থাকবেন, অন্য ভাইয়ের তখন সেখানে প্রবেশ নিষেধ। শর্ত যাতে কেউ না ভাঙে সেজন্যে শাস্তির ব্যবস্থাও কড়া। বার বছর বনবাস।

ব্রাহ্মণকে তাঁর গরু ফিরিয়ে দিয়ে অর্জুন ক্ষমা চাইলেন যুধিষ্ঠিরের কাছে। বললেন, ‘অনুমতি দাও দাদা। আমি বনবাসে যাই।’

কত বোঝালেন যুধিষ্ঠির। কিন্তু অর্জুনের ধনুর্ভঙ্গ পণ। ‘বনবাসে যাবই। গেলেনও। মূর্ছা গেলেন দ্রৌপদী। সবাই তাঁর স্বামী বটে! কিন্তু অর্জুন অর্জুনই। তাঁর সঙ্গে কার তুলনা! বার বছর অর্জুনকে ছাড়া কিভাবে কাটাবেন তিনি?

॥ সুভদ্রা হরণ ॥

বনে বনে ঘুরছেন অর্জুন। তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এরই মধ্যে আরও দুই রাজকন্যা তাঁর প্রেমে ধরা দিয়েছেন। নাগরাজ কন্যা উলুপী আর মণিপুরের রাজনন্দিনী চিত্রাঙ্গদা। প্রভাসে দেখা হল প্রাণ-সখা কৃষ্ণের সাথে। দুই সখাতে কত কথা! কত আনন্দ! রৈবতক পর্বতে যাদবদের উৎসব। সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে মত্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলরাম। ‘ওই সুন্দরীটি কে কৃষ্ণ?’ অর্জুন চঞ্চল হলেন।

সখার মনোভাব বুঝে কৃষ্ণ বললেন, ‘পছন্দ? বেশ! তুমি ওকে হরণ করতে পার। ও আমারই বোন সুভদ্রা।’

দ্রুতগামী রথে চেপে সুভদ্রাকে হরণ করলেন অর্জুন। রথ ছোটালেন ইন্দ্রপ্রস্থের দিকে। ক্ষেপে গেলেন বলরাম। তাঁকে শান্ত করলেন কৃষ্ণ। কৃষ্ণও অর্জনের সঙ্গী হলেন।

॥ খাণ্ডবদাহ ॥

‘শ্বেতকি রাজার যজ্ঞে একনাগাড়ে বার বছর ঘি খেয়ে খেয়ে আমার প্রচণ্ড অরুচি হয়েছে। এখন প্রচুর মাংস না খেলে এই অরুচি ভাবটা যাবে না। এই খাণ্ডব বনটা আমি পুড়িয়ে খাবার চেষ্টা করছি। কিন্তু কিছুতেই পারছি না। ইন্দ্রের বন্ধু তক্ষক থাকে এই বনে। বনে আগুন লাগালেই ইন্দ্র মেঘ থেকে বৃষ্টি ঢেলে সব নিভিয়ে দেয়। তা, তোমরা কি আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পার?’ ব্রাহ্মণবেশী অগ্নি বলছেন কৃষ্ণ আর অর্জনকে। কৃষ্ণ আর অর্জন তখন সুভদ্রাকে নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থের পথে।

তাঁরা বললেন, ‘চেষ্টা করতে পারি, যদি তেমন অস্ত্র পাই।’

অগ্নি তখন অর্জুনকে দিলেন গাণ্ডীব ধনু। অক্ষয় তুণীর। আর কপিধ্বজ রথ। কৃষ্ণকে দিলেন সুদর্শন চক্র আর কৌমোদকী নামে এক গদা।

অগ্নি পরমানন্দে আগুনে পুড়িয়ে জীবজন্তু খান। কৃষ্ণার্জুন অস্ত্র নিয়ে পাহারা দেন। যেন কোনও জন্তু পালাতে না পারে। পনের দিন ধরে চলল এই ভুরিভোজ। তক্ষক তখন বনে ছিলেন না। তাঁকে বাদ দিয়ে মাত্র ছটি প্রাণী প্রাণে বাঁচল। তক্ষকের ছেলে অশ্বসেন, ময়দানব আর চারটে শার্ঙ্গক পাখি।

কৃষ্ণার্জুনের বীরত্বে খুশি হয়ে ইন্দ্র ধর্ম-ছেলে অর্জুনকে দিলেন অনেক মহাস্ত্র। আর কৃষ্ণকে বর দিলেন, ‘অর্জনের সাথে তোমার সখ্য হবে চিরস্থায়ী।’

॥ সভাপর্ব ॥

॥ সভাঘর তৈরি করলেন ময়দানব ॥

‘আপনি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন। বলুন আপনার জন্যে কী করতে পারি?’ ময়দানব করজোড়ে বললেন অর্জুনকে।

অর্জুন বললেন, ‘সখার জন্যে কিছু কর। তাতেই আমি খুশি হব।’

কৃষ্ণ বললেন, ‘যুধিষ্ঠিরের জন্যে এমন একটা সভাঘর করে দাও, যা ত্রিভুবনে কেউ কখনও দেখেনি।’

মৈনাক থেকে মণিমুক্তো নিয়ে এলেন ময়। ভীমের জন্যে আনলেন এক গদা। আর অর্জুনের জন্যে দেব দত্ত শঙ্খ। তৈরি হল অভূতপূর্ব এক সভাঘর। যার ভেতরে মণি-মুক্তো স্ফটিকে তৈরি হল পুকুর, বাগান, মাছ, ফুল, ফল আরও কত কী। সে এক এলাহি কাণ্ড।

শুভদিন দেখে গৃহপ্রবেশ করলেন পাণ্ডবরা। বিচিত্র এই সভাঘরের কথা ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। দেশ-বিদেশ থেকে রাজা এবং ঋষিরা সেই সভাঘরে এসে থাকতে লাগলেন পাণ্ডবদের সাথে।

॥ জরাসন্ধ বধ ॥

নারদ এসেছেন যুধিষ্ঠিরের সভায়। বলছেন, ‘যুধিষ্ঠির’ তুমি রাজসূয় যজ্ঞ কর। স্বর্গে পাণ্ডুর সাথে দেখা হল। তাঁরও তাই মত।’

কৃষ্ণের পরামর্শ ছাড়া এক পা চলেন না পাণ্ডবরা। কৃষ্ণ বললেন, ‘উত্তম প্রস্তাব। তবে কথা হচ্ছে মগধের রাজা জরাসন্ধকে পরাস্ত করাটাই একটা সমস্যা। তাঁর সেনাপতি শিশুপালও দুর্দমনীয়। ছিয়াশিজন রাজাকে বন্দী করে রেখেছেন জরাসন্ধ। একশজন হলে সবাইকে একসাথে রুদ্রদেবতার কাছে বলি দেবেন। আমি আর বলরাম জরাসন্ধের ভয়ে মথুরা ছেড়ে দ্বারকায় এসে থাকছি। সবার আগে জরাসন্ধকে বধ করা দরকার।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। কাজ নেই আর রাজসূয় যজ্ঞে।’

ভীম আর অর্জুন দাদাকে সমর্থন না করে জরাসন্ধ বধের আয়োজন করতে চাইলেন। কৃষ্ণও তাই চাইছিলেন। তাই হল।

কৃষ্ণ, ভীম আর অর্জুন তিন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ নিলেন। গেলেন জরাসন্ধের কাছে। জরাসন্ধ ব্রাহ্মণদের পা ধোয়াতে গেলেন। কৃষ্ণ তখন সবার প্রকৃত পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘হয় তুমি বন্দী রাজাদের মুক্তি দাও। নয়তো আমাদের মধ্যে যে কোনও একজনকে বেছে নাও, যে তোমায় যমালয়ে পৌঁছে দেবে।’

বন্দীমুক্তির বদলে ভীমকে বেছে নিলেন জরাসন্ধ। তের দিন ধরে লড়াই চলল। চোদ্দ দিনের দিন ভীম জরাসন্ধের দু’পা ধরে টেনে তাকে ছিঁড়ে দু টুকরো করে ফেললেন। অক্কা পেলেন জরাসন্ধ।

জরাসন্ধের জন্মের সময় তাঁর শরীরের বাম আর ডান দুই অর্ধেক আলাদাভাবে ভূমিষ্ঠ হয়। জরা নামে এক রাক্ষসী দু টুকলো জুড়ে এক করে দিয়েছিলেন। তাই জরাসন্ধ নাম। কৃষ্ণ ভীমকে সে কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাই ভীমের পক্ষে জরাসন্ধ বধের কাজটা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল।

ভীম আর অর্জুন সব বন্দী রাজাদের মুক্ত করে দিলেন। তাঁদেরকে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে উপস্থিত থাকতে বললেন কৃষ্ণ।

এবারে রাজকোষের দিকে নজর দিলেন যুধিষ্ঠির। অর্জুন গেলেন উত্তরে ধনকুবেরের দিকে। ভীম পুবে। নকুল পশ্চিমে। সহদেব দক্ষিণে। প্রচুর টাকা পয়সা মণিমুক্তো জমা পড়ল রাজকোষে।

॥ রাজসূয় যজ্ঞ ॥

রাজপুরোহিত ধৌম্যের পরামর্শ মতো যুধিষ্ঠির যজ্ঞের আয়োজন করতে লাগলেন। সারা পৃথিবীর সমস্ত রাজারাজড়া মুনি-ঋষিরা এলেন। এলেন ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর সহ যত কৌরবেরা। মহা ধুমধামের সঙ্গে যজ্ঞ শুরু হল।

যুধিষ্ঠির সবাইকে কাজ ভাগ করে দিলেন। উপদেষ্টা—ভীষ্ম এবং দ্ৰোণ। ভোজন—দুঃশাসন। ব্রাহ্মণসেবা— অশ্বত্থামা। রাজসেবা—সঞ্জয়। ধনরত্ন দেখাশোনা করা এবং দক্ষিণা দেওয়া—কৃপাচার্য। কোষাধ্যক্ষ—বিদুর। উপহার নেওয়া—দুর্যোধন। ব্রাহ্মণদের পা ধুইয়ে দেওয়া—শ্রীকৃষ্ণ।

যজ্ঞ শেষ। ভীষ্ম ডাকলেন যুধিষ্ঠিরকে। বললেন, ‘সবাইকে তার মর্যাদা মতো অর্ঘ্য দাও। একটা বিশেষ অর্ঘ্য সমাগত সবার মধ্যে শ্রেষ্ঠ যিনি তাঁকে দাও।’

যুধিষ্ঠির জানতে চাইলেন, ‘কে সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি?’ ভীষ্ম বললেন, ‘কেন? কৃষ্ণ! তাঁর সমকক্ষ আর কে আছেন এখানে?’

যুধিষ্ঠিরের আদেশে সহদেব সেই শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য কৃষ্ণকে দান করতেই চেদিরাজ শিশুপাল ক্ষেপে গিয়ে পঞ্চ মুখে কৃষ্ণ-নিন্দা শুরু করলেন।

ভীম যাচ্ছিলেন শিশুপালকে ময়দাঠাসা করতে। ভীষ্ম আটকালেন। শিশুপাল বললেন, ‘ছেড়ে দিন না ওকে। পতঙ্গের মতো পুড়ে মরুক আগুনে ঝাঁপ দিয়ে।’

ভীষ্ম বললেন, ‘তুমি কৃষ্ণের নিন্দা করছিলে না? বেশ তুমি তার সাথেই লড়।’

কৃষ্ণ মৃদু হেসে বললেন, ‘এই হতভাগার মাকে আমি কথা দিয়েছিলাম যে এর একশ অপরাধ ক্ষমা করব। তা আজ এর অপরাধ একশ ছাড়িয়ে গেছে। সুতরাং····’ বলে কৃষ্ণ সুদর্শন চক্র দিয়ে একেবারে ঘ্যাচাং করে শিশুপালের মুণ্ডু উড়িয়ে দিলেন।

কৃষ্ণ দ্বারকায় ফিরে যাবার সময় যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘জীবরা যেমন মেঘকে, আর পাখিরা যেমন বৃক্ষকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে, আপনার রাজ্যে ব্রাহ্মণরাও যেন ঠিক তেমনি আপনাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে পারে—নিষ্ঠার সাথে প্রজাপালন করুন।’

॥ হিংসেয় পুড়লেন দুর্যোধন ॥

দুর্যোধন আর কৌরবরা আরও দু-চার দিন ময়দানবের তৈরি বাড়িতে থেকে গেলেন। পদে পদে অপদস্থ হলেন দুর্যোধন। স্ফটিকের স্থলকে জল ভেবে কাপড় তুলে হাঁটলেন। আবার জলকে স্থল ভেবে কাপড়-চোপড় সব ভিজিয়ে ফেললেন। খোলা দরজা মনে করে বেরুতে গিয়ে স্ফটিকের দেওয়ালে খেলেন ধাক্কা। আবার এক দিন খোলা দরজাকেই স্ফটিকের দেওয়াল ভেবে বেরুবার পথ খুঁজতে লাগলেন। সবাই হাসাহাসি করতে লাগল। লজ্জায়, অপমানে, ঘৃণায় দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন দুর্যোধন। ঈর্ষা আর পরশ্রীকাতরতায় জ্বলতে জ্বলতে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিলেন।

সব শুনে কুচক্রী মামা শকুনি বললেন, ‘ঘাবড়িও না দুর্যোধন। মাথা ঠাণ্ডা করে যা বলি তাই শোন। তোমার বাবাকে বল পাশা খেলায় যুধিষ্ঠিরকে নেমন্তন্ন করতে। যুধিষ্ঠির হল পাশার পোকা। ও আসবেই। তার পরের ব্যাপারটা আমার হাতে ছেড়ে দাও। আমার নাম শকুনি।’

ধৃতরাষ্ট্র প্রথমে আপত্তি করলেন। কিন্তু দুর্যোধন আত্মহত্যার ভয় দেখানোতে স্নেহান্ধ পিতা পাশা খেলায় সম্মতি দিলেন। বিদুর পইপই করে বারণ করেছিলেন। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের বুদ্ধি তখন অন্ধ পুত্রস্নেহের কাছে পরাস্ত।

দুর্যোধনের মনে শান্তি আনতে ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে হস্তিনাপুরে ময়দানবের তৈরি বাড়ির আদলে এক বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করা হল। ঠিক হল সেখানেই হবে পাশা খেলা।

বিদুর এসে যুধিষ্ঠিরকে সব জানালেন। যুধিষ্ঠিরের প্রবৃত্তি হল না এই হীন চক্রান্তে জড়াতে। কিন্তু না গেলে জ্যাঠামশাইয়ের অপমান হতে পারে, এই চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত চার ভাই আর দ্রৌপদীকে নিয়ে রওনা হলেন হস্তিনাপুরের দিকে।

॥ সর্বনেশে পাশায় হারলেন যুধিষ্ঠিীর ॥

‘অতি জঘন্য কাজ এই বাজি রেখে পাশা খেলা। মহাপাপ। এতে কোনও বীরত্ব নেই। আর এতে মহত্ত্বও নেই।’ শকুনিকে বললেন যুধিষ্ঠির। কিন্তু শকুনির খোঁচায় জ্বলে উঠে শুরু করলেন খেলা। শুরু হল পাণ্ডবদের দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়।

দুর্যোধনের হয়ে খেললেন শকুনি।

যুধিষ্ঠির শকুনির কপটতার কাছে প্রতিবারেই হেরে গেলেন। যুধিষ্ঠির প্রথম বাজি রেখেছিলেন খুব দামী এক হার। দ্বিতীয় বাজি—সহস্র মুদ্রার পেটিকা। তৃতীয় বাজি—শতসহস্র সুসজ্জিত দাসী। এভাবে আস্তে আস্তে সমস্ত ধনসম্পত্তি। এমন কি শেষে নিজের ভাইদেরও পণ রেখে হারলেন। এবার পণ রাখলেন নিজেকে। নিজেকেও হারালেন। এবং সবশেষে প্রিয়তমা মহিষী দ্রৌপদীকেও।

দুর্যোধন, দুঃশাসন, শকুনি—এদের আহ্লাদ তো আর ধরে না। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে কুলাঙ্গার দুর্যোধনকে ত্যাগের পরামর্শ দিতে গিয়ে দুর্যোধনের কাছে যৎপরোনাস্তি অপমানিত হলেন। ভীষ্ম দ্রোণ ইত্যাদি প্রাজ্ঞরা অসহায় ভাবে সভায় বসে বসে সব দেখছিলেন। দ্রৌপদীকে জয় করে কৌরবরা একেবারে লাফালাফি শুরু করে দিলেন।

॥ দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ॥

দুরাত্মা দুর্যোধন দুর্বিনীত ভঙ্গীতে বিদুরকে আদেশ করলেন, ‘যান, দ্রৌপদীকে নিয়ে আসুন। সে আমাদের ঘরদোর ঝাঁট দিক।’

বিদুর বললেন, ‘ওরে নির্বোধ! তুই যে রসাতলে যাচ্ছিস তা টের পাচ্ছিস না। হরিণ হয়ে বাঘকে ক্ষেপাচ্ছিস! চিন্তা নেই। তোদের ধ্বংস অনিবার্য।’

নরপশু দুর্যোধন তখন পৈশাচিক আনন্দে উন্মত্ত। দুর্যোধনের আদেশে এক সারথি গেল দ্রৌপদীকে সভায় আনতে। সভয়ে ঢুকল সে দ্রৌপদীর ঘরে।

হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন তেজস্বিনী দ্রৌপদী। ‘যাও! তুমি সভায় গিয়ে জেনে এস, যুধিষ্ঠির আগে কাকে পণ রেখেছিলেন। নিজেকে, না আমাকে। যদি আমাকে আগে পণ রেখে থাকেন, তবেই আমি যাব। নইলে যাব না।’

সারথির কাছে এ কথা শুনে আহত সিংহের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন দুর্যোধন। দুঃশাসনকে বললেন, ‘যা, ওর চুলের মুঠি ধরে নিয়ে আয়।’

চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে দ্রৌপদীকে সভায় এনে ফেললেন দুঃশাসন। চলল অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ আর বহুবিধ নির্যাতন।

রাগে ঘৃণায় সর্বাঙ্গ কাঁপছে দ্রৌপদীর। বললেন, ‘ধিক্‌ এই সভাকে! ধর্ম কি লোপ পেয়েছে? ভীষ্ম, দ্রোণ এবং অন্য রথী-মহারথীরা কি মৃত?’

আরও বললেন দ্রৌপদী, ‘যে সভায় জ্ঞানবৃদ্ধরা থাকেন না, তাকে আমি সভাই বলি না। যাঁরা ধর্মের কথা বলেন না, তাঁদের বলি না জ্ঞানবৃদ্ধ। যাতে সত্য নেই, তাকে আমি ধর্ম বলতে পারব না। আর যা ছলনায় ভরা, তা কখনই সত্য নয়।’

সভার যত জ্ঞানীগুণীরা তেজস্বিনী এই বিদুষীর বাক্যবাণে মাথা হেঁট করে রইলেন। প্রতিবাদ জানালেন শুধু একজন। তিনি বিকর্ণ। দুর্যোধনেরই ভাই। বললেন, ‘এ অন্যায়! এ অধর্ম! মহারাজ যুধিষ্ঠিরের কাণ্ডজ্ঞানহীনতার জন্যে একজন নিরপরাধ অবলা নারীকে এভাবে লাঞ্ছিত করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এ মহাপাপ!’

দুঃশাসন দ্রৌপদীর পরনের কাপড় খুলে ফেলার জন্যে কাপড় ধরে টান দিলেন। দ্রৌপদী মনে প্রাণে তাঁর ইষ্টদেবতা কৃষ্ণকে ডাকতে লাগলেন, ‘হে মধুসূদন! হে জনার্দন! হে কৃষ্ণ! আমার লজ্জা নিবারণ কর।’

দ্রৌপদী পূর্বজন্মে একবার এক সাধুকে নিজের কাপড়ের খানিকটা ছিঁড়ে দিয়েছিলেন সাধুর লজ্জা নিবারণের জন্যে। সাধু স্নানের জন্যে নদীতে নামলে স্রোতে তাঁর কৌপীন ভেসে গিয়েছিল। সাধু দ্রৌপদীকে আশীর্বাদ করেছিলেন, ‘তুমি কখনও এমন বিপদে পড়লে শ্রীহরি নিশ্চয়ই তোমার লজ্জা নিবারণ করবেন।

কৃষ্ণের মায়ায় দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্র টেনে শেষ করতে পারলেন না। যতই টানেন ততই বাড়তে থাকে। অন্তরীক্ষ্য থেকে বস্ত্র যোগান কৃষ্ণ।

পশু দুর্যোধন উরুর কাপড় সরিয়ে দ্রৌপদীকে সেখানে বসতে ইঙ্গিত করলেন।

ভীম লাফ দিয়ে আগুন নিয়ে এলেন। বললেন, ‘দাদা যে হাতে পাশা খেলেছে, দাদার সেই পাপ-হাত আমি পুড়িয়ে দেব।’

অর্জুন ভীমকে নিবৃত্ত করলেন। ভীম প্রতিজ্ঞা করলেন, ‘ওই পশু দুঃশাসনের বুক চিরে আমি রক্ত পান করব। আর ওই শয়তান দুর্যোধনের উরু আমি গদা দিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেব।’

শিয়াল, গাধা ইত্যাদি প্রাণীরা অলক্ষুণে স্বরে ডাকতে লাগল। সবাই মহা অমঙ্গল আশঙ্কায় ‘স্বস্তি ‘স্বস্তি’ বলতে লাগলেন। ধৃতরাষ্ট্রকে সবাই বোঝালেন, ‘মহারাজ! পাণ্ডবদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করুন। নইলে কৌরবদের ধ্বংস অনিবার্য। এত বড় অন্যায়, এই অবিচার ধর্মের গায়ে সইবে না।’

চেতনা ফিরল ধৃতরাষ্ট্রের। ধিক্কার দিলেন নিজেকে। ‘তাই তো! ছিঃ! এতক্ষণ আমি কি করে এসব সহ্য করছিলাম? সহ্য নয়। বরং বলা ভাল, উপভোগ করছিলাম! আমি বারবারই জানতে চাইছিলাম, “আমাদের কি জয় হল?” ছিঃ!’

দ্রৌপদীকে ডাকলেন ধৃতরাষ্ট্র। স্নেহ আলিঙ্গনে তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘মা! ভুলে যাও যা ঘটেছে। আমাকে আমার কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে দাও। তুমি তিনটে বর চাও আমার কাছে।

দ্রৌপদী তিন বরে নিজেকে, স্বামীদের এবং হারানো সমস্ত সম্পদ ফিরে পেলেন।

যুধিষ্ঠিরের কাছে দুঃখপ্রকাশ করলেন ধৃতরাষ্ট্র। পাণ্ডবরা ফিরে চললেন ইন্দ্রপ্রস্থের দিকে।

॥ আবার পাশা, সর্বনাশা ॥

কিন্তু না। ইন্দ্রপ্রস্থে আর ফেরা হল না পাণ্ডবদের। পথে দূত গিয়ে খবর দিল, আবার পাশা খেলার আয়োজন হয়েছে। ধৃতরাষ্ট্র ডেকেছেন।

এর পেছনেও সেই দুষ্ট চতুষ্টয়। দুর্যোধন, দুঃশাসন, কর্ণ আর দুষ্টের শিরোমণি শকুনি। তাঁরা ভাবলেন, ‘যাঃ। এ ধৃতরাষ্ট্র কী করলেন? সব ষড়যন্ত্র, সব চক্রান্ত যে মাঠে মারা গেল! আহত সাপ কখনও আঘাতকারীকে ছাড়ে? সে যে আরও হিংস্র হয়ে উঠে সুযোগ পেলেই প্রতিশোধ নেয়। কাজেই ফেরাও পাণ্ডবদের। আবার খেলা হবে। এবার হারলে তের বছর বনবাস। তার মধ্যে শেষ এক বছর আবার অজ্ঞাতবাস। এর মধ্যে নির্ঘাত নিকেশ হয়ে যাবে আপদগুলো।’

জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র বুদ্ধিতে স্নেহান্ধ। কাজেই স্ত্রী গান্ধারীর ভৎসনা ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী সত্ত্বেও পুত্র দুর্যোধনের বেয়াড়া আবদারের কাছেই তিনি নতিস্বীকার করলেন।

যুধিষ্ঠির দূতের মুখে সব শুনে বললেন, ‘ঈশ্বরের যা ইচ্ছা, তাই হবে।চল দূত।’

আবার কপট পাশায় পাপাত্মা শকুনির কৌশলের কাছে হারলেন ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির। যদিও এই হারই পরে পাণ্ডবদের কপালে জয়তিলক এঁকে দিয়েছিল। আর কৌরবরা তাদের প্রাপ্য শাস্তিই পেয়েছিল। কিন্তু বিধাতার মনে কী আছে তা তখন কেই বা জানত?

॥ বনবাসের জন্যে যাত্রা শুরু ॥

রাজার পোশাক ছেড়ে হরিণের চামড়া পরে দ্রৌপদী সহ পঞ্চপাণ্ডব এলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর ইত্যাদি গুরুজনদের কাছে বিদায় নিতে। লজ্জায় মাথা হেঁট সবার। মুখে বাক্য নেই। চোখে জল।

বিদুর শুধু বললেন, ‘অধর্মের পরাজয় আর ধর্মের জয় অনিবার্য।’ কুন্তীকে তিনি বনে যেতে দিলেন না। রেখে দিলেন নিজের কাছে।

কিন্তু কুন্তী? এমন রত্নগর্ভা মা কেমন করে এমন হীরের টুকরো ছেলে, ছেলের বৌকে ছেড়ে থাকবেন? কান্নায় ভেঙে পড়লেন কুন্তী। তাঁর সাথে যোগ দিলেন গান্ধারী সহ যত কুরুকুলবধুরা। সবাইকে চোখের জলে ভাসিয়ে বনের পথে পা বাড়ালেন পঞ্চপাণ্ডব আর দ্রৌপদী। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল রাম, লক্ষ্মণ আর সীতার বনবাসযাত্রার সময়।

নগরীর যত লোক ‘ছিঃ! ছিঃ!’ করতে লাগল কৌরবদের। আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগল পাণ্ডবদের কল্যাণের জন্যে।

‘গরু! গরু!’ দুঃশাসন ভীমের পেছন পেছন চলেছেন ‘গরু! গরু! বলে উপহাস করতে করতে।

ভীম বললেন, ‘চিন্তা নেই রে দুঃশাসন। আমি ফিরে এসে তোর বুক চিরে রক্ত পান করবই করব। ওর জন্যে ভাবিস না।’

কর্ণের বিদ্রপের জবাবে অর্জুন বললেন, ‘কর্ণ! ফিরে এসে তোমাকে যদি বধ না করতে পারি তবে জেনো, হিমালয় তার জায়গা থেকে নড়ে বসবে। সূর্য হয়ে যাবে নিষ্প্রভ। আর চাঁদ হারাবে তার শীতলতা।’

সহদেব বললেন, ‘ওরে বজ্জাত শকুনি তোকে খুন করব, তবে আমার শান্তি।’

পাণ্ডবদের সঙ্গী হলেন তাঁদের পুরোহিত ধৌম্য আর শত শত ব্রাহ্মণ আর পুরবাসীরা। তাঁরা বললেন, এই নরকে আর এক মুহূর্তও আমরা থাকব না।’

বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের অভিপ্রায় মতো পাণ্ডবদের বনযাত্রার ধারাবিবরণী দিতে লাগলেন। বিনা মেঘে বজ্রপাত শুরু হল। ভূমিকম্প হতে লাগল। সূর্যগ্রহণে সূর্য চলে গেল চাঁদের আড়ালে। যত্র তত্র উল্কা পড়তে লাগল। শকুন-কাক-শিয়াল সমস্বরে অলক্ষুণে ডাক ডাকতে লাগল।

॥ বনপর্ব ॥

॥ শুরু হল বনবাস ॥

উত্তরে হাঁটতে হাঁটতে প্রথম রাত কাটালেন পাণ্ডবরা গঙ্গার ধারে এক বটগাছের তলায়। ব্রাহ্মণদের ফিরে যেতে বললেন যুধিষ্ঠির। বনে তাঁরা না হয় মাংস খাবেন। কিন্তু ব্রাহ্মণদের খাওয়াবার অন্ন কোথায় পাবেন? ব্রাহ্মণরা কিছুতেই ফিরবেন না। এখন উপায়?

সূর্যের পুজো করলেন যুধিষ্ঠির। সন্তুষ্ট হয়ে সূর্য এক থালা দিলেন। বললেন, ‘দ্রৌপদীর খাওয়া যতক্ষণ না শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ এ থালার অন্ন ফুরোবে না। প্রতিদিনই এমন হবে।’ অন্নচিন্তা চমৎকারা! চমকপ্রদভাবেই সমস্যা মিটল।

বক রাক্ষসের ভাই কির্মীর থাকত সেই বনে। দাদার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ভীমের ওপর চড়াও হল। ভীম তাকেও শমনসদনে পাঠালেন।

কৃষ্ণ এলেন দেখা করতে। পাশা খেলার ব্যাপার নাকি তিনি জানতেন না। কারণ তখন তিনি দ্বারকায়। দ্রৌপদীকে কে তাহলে অনন্তবস্ত্রের যোগান দিয়েছিলেন?

দ্বৈতবনে সরস্বতী নদীর তীরে প্রচুর ফলমূল। সেখানে আশ্রম তৈরি হল। সেখানেই থাকতে লাগলেন সদ্রৌপদী পাণ্ডবরা।

॥ যুধিষ্ঠির-দ্রৌপদী কথোপকথন ॥

(সন্ধ্যেবেলা। নদীর ধার। যুধিষ্ঠির, ভীম, দ্রৌপদী।)

দ্রৌপদী—খুব খারাপ লাগছে আমার আপনাকে এ অবস্থায় দেখে।

যুধিষ্ঠির—কেন?

দ্রৌপদী—পঞ্চপাণ্ডবের আজ কী দুর্দশা মহারাজ! এ কি এড়ানো যেত না? প্রয়োজনে তেজপ্রকাশ, প্রয়োজনে ক্ষমা এই তো ক্ষত্রিয়ের ধর্ম হওয়া উচিত। সে দিন তেজ দেখালে আজ এই বনবাসে এই হরিণের চামড়া পরে থাকতে হত?

যুধিষ্ঠির—ক্রোধ থেকে কখন কখন আপাত উন্নতি হয় মানছি প্রিয়ে! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ক্রোধ সর্বনাশই ডেকে আনে। ক্রোধীকে তেজস্বী বলবে কি তুমি? ক্রোধ জন্মালেও যাঁর বিচারবুদ্ধি লুপ্ত হয় না, পণ্ডিতদের মতে তিনিই তেজস্বী।

দ্রৌপদী—ধর্ম তাঁকেই রক্ষা করেন, যিনি ধর্মকে রক্ষা করেন। রাজার কাজ ধর্মরক্ষা। আপনি তা নিষ্ঠার সাথেই করে যাচ্ছেন। কিন্তু কই ধর্ম তো আপনাকে রক্ষা করছেন না?

যুধিষ্ঠির—লাভের প্রত্যাশা নিয়ে ধর্ম করা মানে তো ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা। কর্তব্য করে যাব। তাতে লাভই হোক আর লোকসানই হোক। এই আমার ধর্ম।

দ্রৌপদী—মানছি। কিন্তু অদৃষ্টবাদীর কপালে আছে দুর্ভোগ। আর অলসের ঘরে অলক্ষ্মী বাঁধা। চাষের জন্যে চাষাকে বৃষ্টির ওপর নির্ভর করতে হয় বটে, কিন্তু আগে তো তাকে জমিতে লাঙ্গল দিতে হবে? তেমনি ভাল-মন্দ ফলের জন্যে ঠাকুরের কৃপার ওপর নির্ভর তো করতেই হবে। কিন্তু, পুরুষকারকে কাজে লাগিয়ে চেষ্টা তো করে যেতে হবে? তবে তো কৃপা হবে?

ভীম—দ্রৌপদী তো ঠিক কথাই বলেছে মহারাজ। ক্ষত্রিয়ের কাজ বলপ্রয়োগে দুষ্টকে দমন করা। বনে এসে ফলমূল খাওয়া তো সাধুর কাজ।

যুধিষ্ঠির—আমার অন্যায় হয়েছে। আমি স্বীকার করছি। তবে সেটা বনে আসায় নয়। পাশা খেলতে রাজি হয়ে। পণ রেখে। কিন্তু সত্যরক্ষার জন্যে বনে আসা ছাড়া গতি ছিল না। সত্যই ধর্ম।

॥ মহাদেব-অর্জুন লড়াই ॥

ব্যাসদেব যুধিষ্ঠিরকে শেখালেন ‘প্রতিস্মৃতি বিদ্যা’। অর্জুনকে শেখালেন যুধিষ্ঠির। অর্জুন সে বিদ্যা শিখে ইন্দ্রের আরাধনা করলেন। ইন্দ্র বললেন, ‘মহাদেবের আরাধনা কর।’

অর্জুনের কঠোর তপস্যায় ব্যাধের বেশে দেখা দিলেন মহাদেব। এক বুনো শুয়োরকে কে আগে শিকার করেছেন সেই নিয়ে দু’জনে লড়াই। শেষে মহাদেব অর্জুনকে দেখা দিলেন। ‘পাশুপত’ অস্ত্র দিলেন। ইন্দ্র, বরুণ, কুবের, যম সবাই নানারকম মহাস্ত্র দিলেন। ইন্দ্র সারথি মাতলিকে পাঠিয়ে দিব্যরথে করে অর্জুনকে স্বর্গে আনালেন। নিজের কাছে পাঁচ বছর রেখে ধর্ম-ছেলেকে নানা ধরনের অস্ত্রবিদ্যা শেখালেন। গন্ধর্ব চিত্রসেনের কাছে অর্জুন শিখলেন নাচ-গান-বাজনা।

॥ তীর্থ থেকে তীর্থে ॥

লোমশ মুনি স্বর্গ থেকে এসে খবর দিলেন অর্জুন স্বর্গে আছেন এবং ভালই আছেন। নিশ্চিন্ত হলেন যুধিষ্ঠির এবং অন্যরা।

দ্বৈত বন থেকে দ্রৌপদী সহ চার পাণ্ডব চললেন তীর্থ পর্যটনে। গোমতী, প্রয়াগ, গয়া, অগস্ত্য-আশ্রম, ভূগুতীর্থ, গঙ্গাসাগর, মহেন্দ্র পর্বত, দাক্ষিণাত্য, প্রভাস, গন্ধমাদন পর্বত, বদরিকাশ্রম ইত্যাদি বহু তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়ালেন তাঁরা।

॥ ভীম হনুমানের দেখা পেলেন ॥

বদরিকাশ্রমে দ্রৌপদী এক অপূর্ব সহস্রদল পদ্ম দেখে ভীমকে বললেন, ‘ওই রকম অনেক পদ্ম আমার চাই।’

ভীম পদ্ম আনতে বেরুলেন। পথে হনুমানের দেখা পেলেন ভীম। হনুমান পাণ্ডবদের সর্বতোভাবে সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। কুবেরের বাগানের সরোবর থেকে পদ্ম তুলতে গিয়ে ভীমের সাথে কুবেরের সৈন্যদের লড়াই লেগে যাবার উপক্রম। ভীমের খোঁজে অন্য পাণ্ডবরাও দ্রৌপদীসহ সেখানে এলেন। কুবের গন্ধমাদনে পাণ্ডবদের সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার বন্দোবস্ত করে দিলেন।

শাপগ্রস্ত নহুষ অজগর হয়ে ভীমকে খেতে যাচ্ছিলেন। যুধিষ্ঠির অজগরের কঠিন আধ্যাত্মিক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ভীমকে মুক্ত করলেন। নিবাতকবচ নামে ইন্দ্রের শত্রু তিন কোটি দৈত্যকে বধ করে অর্জুন ফিরে এলেন।

॥ আচ্ছা জব্দ হলেন দুর্যোধন ॥

‘দ্বৈতবনে তো তোমার অনেক গরু আছে। গরু দেখার নাম করে চল একবার মজাটা দেখে আসি। দ্রৌপদীকে নিয়ে পাণ্ডবরা কী দুর্দশায় আছে একবার চোখে না দেখলে ঠিক সুখ হচ্ছে না।’ কুচক্রী শকুনি পরামর্শ দিলেন দুর্মতি দুর্যোধনকে।

গন্ধর্ব চিত্রসেন তখন প্রমোদ-ভ্রমণে দ্বৈতবনে। খেলাঘর তৈরি নিয়ে দুর্যোধনের সঙ্গে লাগল যুদ্ধ। চিত্রসেন কৌরবদের পিটিয়ে ছাতু করে বন্দী করে নিয়ে চললেন।

‘রক্ষে করুন মহারাজ। কৌরবদের খুব বিপদ।’ দুর্যোধনের মন্ত্রীরা দৌড়ে গিয়ে সব জানালেন যুধিষ্ঠিরকে।

ভীম শুনে মহানন্দে লাফ দিয়ে উঠে বললেন, ‘শাবাশ্‌! চিত্রসেন। এই তো চাই। আচ্ছা করে পেটাও ব্যাটাদের।’

যুধিষ্ঠিরের আদেশে পাণ্ডবরা গিয়ে রানীসহ দুর্যোধন, দুঃশাসন, কর্ণ, শকুনি সবাইকে মুক্ত করলেন।

লজ্জায়, অপমানে, ঈর্ষায় দুর্যোধন অনাহারে আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করলেন। কর্ণ আর শকুনি বললেন, ‘আরে ভায়া! এতে এত ভেঙে পড়ার কী আছে? পরের চালে নিশ্চয়ই কিস্তিমাত্‌ হবে। ঘাবড়াও মাত্‌।’

॥ জব্দ হলেন দুর্বাসাও ॥

দুর্বাসা মুনি তাঁর দশ হাজার শিষ্য নিয়ে এসে উঠলেন দুর্যোধনের রাজপুরীতে। ‘দুপুরবেলা দ্রৌপদীর খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে একবারটি দয়া করে আপনার এই দশ হাজার শিষ্য নিয়ে পাণ্ডবদের আতিথ্য নেবেন মুনিবর।’ হাতজোড় করে মুনির চরণে প্রার্থনা জানালেন কুবুদ্ধি দুর্যোধন।

দ্রৌপদীর খাওয়া শেষ। র্দুবাসা এলেন তাঁর দশ হাজার শিষ্য নিয়ে। বললেন, ‘নদীতে ডুব দিয়ে এখুনি আসছি আমরা এসেই কিন্তু খাবার চাই। সকলেই অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। খাবার না পেলে সব ভষ্ম করে দেব।’

‘হে কৃষ্ণ! রক্ষা কর প্রভু! হে মধুসূদন! হে ভক্ত বৎসল! থালায় যে আর খাবার নেই প্রভু! এখন কী করি ঠাকুর! তুমি তো উপায়হীনদের উপায়! তুমি উপায় কর প্রভু!’ দ্রৌপদীর কাতর প্রার্থনা।

ভক্তের কাতর প্রার্থনায় ভগবান সর্বদাই ছুটে আসেন। ‘তোমার থালাটা আন তো দেখি। এক কণা খাবারও কি তাতে লেগে নেই?’ কৃষ্ণ এসে দেখা দিয়ে বললেন দ্রৌপদীকে। থালা আনলেন দ্রৌপদী। ‘ওই তো! থালায় এক কণা অন্ন লেগে রয়েছে। এই অন্নের কণা আমি খেলাম। আমার তৃপ্তিতেই জগতের তৃপ্তি। দেখ গে র্দুবাসা আর তাঁর শিষ্যদেরও পেট ভরে গেছে। আমি চললাম। বিপদে পড়লেই মধুসূদনকে ডেক।’

সহদেব ডাকতে গিয়ে দেখেন সশিষ্য দুর্বাসা ভয়ে পালিয়েছেন। হঠাৎ করে সবার পেট ভরে হেউ ঢেউ অবস্থা দেখে মুনি ঘাবড়ে গেছেন।

পাণ্ডবরা হরিণের মাংস খেতেন রোজ। হরিণরা একদিন যুধিষ্ঠিরকে বলল, ‘হে ধর্মাবতার! আপনারা এ বনে আর বেশিদিন থাকলে আমাদের বংশ লোপ পাবে। আমাদের রক্ষা করুন।’ যুধিষ্ঠির দ্বৈতবন ছেড়ে চললেন কাম্যক বনে।

॥ দ্রৌপদী হরণ ॥

দুর্যোধনের বোন দুঃশলার বর সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ একদিন চোরের মতো এলেন দ্রৌপদীর কাছে। পাণ্ডবরা সবাই তখন মৃগয়ায়। ঘরে দ্রৌপদী একা। দ্রৌপদীকে জোর করে রথে নিয়ে পালালেন। যুধিষ্ঠির খবর পেয়েই ভীম আর অর্জুনকে পাঠালেন। ভীম অর্ধচন্দ্রবাণে মাথা মুড়িয়ে দিলেন জয়দ্রথের। মাথাই উড়িয়ে দিতেন। শুধু যুধিষ্ঠিরের আদেশের অপেক্ষা।

‘মা গান্ধারীর জামাই। আমাদেরও একমাত্র বোনটি বিধবা হবে। ছেড়ে দাও ভীম।’ যুধিষ্ঠির বললেন।

অপমানিত জয়দ্রথ হিমালয়ে শিবের তপস্যা করে এই বর পেলেন যে অর্জুন ছাড়া অন্য পাণ্ডবদের অন্তত একদিনের যুদ্ধে তিনি হারাতে পারবেন।

॥ কর্ণ কবচ-কুণ্ডল দিলেন ইন্দ্রকে ॥

জন্ম থেকেই কর্ণের কানে ছিল দিব্য কুণ্ডল। আর গায়ে অভেদ্য কবচ অথাৎ বর্ম। সুতরাং কর্ণ ছিলেন অবধ্য।

ইন্দ্র জানতেন সে কথা। কিন্তু ইন্দ্র যে পাণ্ডবদের পরম বন্ধু। অর্জুনের জন্মদাতা পিতা। কাজেই কর্ণের কাছ থেকে ওই কবচ-কুণ্ডল হাতাবার এক ফন্দি ঠাওরালেন তিনি।

কর্ণ তাঁর দানশীলতার জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। স্নানের পর তাঁর পিতা সূর্যের স্তব করতেন কর্ণ। সে সময় যে ব্রাহ্মণ যা প্রার্থনা করতেন তাকে তাই দিতেন।

ইন্দ্র এই সুযোগ নিলেন। ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধরে কর্ণের কাছে চাইলেন তাঁর কবচ-কুণ্ডল। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কর্ণ তা দিতে কুণ্ঠা করলেন না। বিস্মিত, অভিভুত ইন্দ্র আশীবাদ করলেন কর্ণকে। আর দিলেন অব্যর্থ ‘শক্তি অস্ত্র’।

॥ বক-যুধিষ্ঠির কথা ॥

কাম্যকবন ছেড়ে আবার পাণ্ডবরা এলেন দ্বৈতবনে।

একদিন এক ব্রাহ্মণ এসে বললেন, ‘একটা হরিণ তার শিঙে করে আমার দুটো যজ্ঞকাঠ—“অরণি” আর “মন্থ” নিয়ে পালিয়েছে। দয়া করে ও দুটো আমায় ফিরিয়ে এনে দিন মহারাজ। নইলে যজ্ঞ যে পণ্ড হয়ে যাবে।’

ভাইদের নিয়ে হরিণের খোঁজে বেরুলেন যুধিষ্ঠির। কোথায় হরিণ! ক্লান্ত, পিপাসার্ত হলেন। নকুল এক গাছে উঠে বললেন, ‘দূরে মনে হয় জল আছে। জলচর পাখিদের ডাক শুনতে পাচ্ছি।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘যাও। সবার জন্যে জল নিয়ে এস তোমার তুণীর ভরতি করে। দেখ। দেরি কর না যেন।’

স্বচ্ছ সরোবর। কাচের মতো স্বচ্ছ জল। ‘আঃ! আকণ্ঠ পান করি।’ নকুল জল তুললেন আঁজলা ভরে।

‘আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জল খেও না।’

‘কে কথা বলল? কই! কেউ তো নেই কোথাও! দূর! আগে তো তৃষ্ণা মেটাই। তারপর দেখা যাবে কে কথা বলছে।’

নকুল জল খাওয়া মাত্র প্রাণ হারালেন।

নকুলের দেরি দেখে সহদেবকে পাঠালেন যুধিষ্ঠির। তাঁর দেরি দেখে অর্জুনকে। তারপর ভীমকে। শেষে নিজে এসে দেখেন তাঁর চার ভাইয়ের মৃতদেহ পড়ে আছে সরোবরের ধারে।

বক—আমি বক পাখি। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জল খেলে আপনারও এই অবস্থাই হবে।

যুধিষ্ঠির—আপনি যে সামান্য পাখি নন সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আপনি যেই হন, বলুন আপনার প্রশ্ন কী?

বক—মাটির থেকে ভারি কে?

যুধিষ্ঠির—মা।

বক—আকাশ থেকে উঁচুতে কার স্থান?

যুধিষ্ঠির—বাবার।

বক—বায়ুর থেকে দ্রুতগামী কে?

যুধিষ্ঠির—মন।

বক—ঘাসের চেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়ে কী?

যুধিষ্ঠির—চিন্তা।

বক—সবচেয়ে বড় শত্রু কে?

যুধিষ্ঠির—ক্রোধ।

বক—কোন রোগের শেষ নেই?

যুধিষ্ঠির—লোভ।

বক—সাধু কে?

যুধিষ্ঠির—যিনি জীবের কল্যাণ করেন।

বক—অসাধু কে?

যুধিষ্ঠির—নির্দয়।

এরকম প্রচুর প্রশ্ন করলেন বক। যুধিষ্ঠির প্রত্যেকটির সদুত্তর দিলেন।

বক—আমি পাখি নই। স্বয়ং ধর্ম। তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম। তোমার উত্তরে আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমার ভাইদের একজনকে আমি বাঁচিয়ে দেব। বল তুমি কাকে ফিরে পেতে চাও?

যুধিষ্ঠির—নকুলকে।

বক—ভীম অর্জনের মতো বীরশ্রেষ্ঠ রত্ন ভাইদের ছেড়ে বৈমাত্রেয় ভাই নকুলকে কেন?

যুধিষ্ঠির—সবাই আমার অত্যন্ত প্রিয় ভাই। কিন্তু আপনি তো মাত্র একজনেরই প্রাণ ফিরিয়ে দেবেন। কুন্তীমায়ের এক ছেলে আমি তো বেঁচে আছি। আমার মাদ্রী মায়েরও একটি ছেলে প্রাণ ফিরে পাক।

বক—ধন্য যুধিষ্ঠির। তুমি সত্যিই ধন্য। ধন্য তোমার ধর্মবুদ্ধি। আমি তোমার চার ভাইয়েরই প্রাণ ফিরিয়ে দিলাম। তোমায় দুটি বর দিতে চাই। তুমি প্রার্থনা কর।

যুধিষ্ঠির—সেই ব্রাহ্মণের যজ্ঞ কাঠ ‘অরণি’ আর ‘মন্থ’ দয়া করে ফিরিয়ে দিন, যাতে ব্রাহ্মণের যজ্ঞ সম্পূর্ণ হতে পারে।

বক—সাধু যুধিষ্ঠির। সাধু। সাধু। এই নাও সেই কাঠ। দ্বিতীয় বর?

যুধিষ্ঠির—অজ্ঞাতবাসকালে আমাদের কেউ যেন চিনতে না পারে।

বক—তথাস্তু।

॥ বিরাট পর্ব ॥

॥ বিরাট নগরে ছদ্মবেশে এলেন পাণ্ডবরা ॥

মৎস্যদেশের রাজধানী বিরাটনগরে একবছরের অজ্ঞাতবাসকাল কাটাতে এলেন পাণ্ডবরা। নগরে ঢোকার মুখে ছিল এক বাবলা জাতের গাছ (শমিবৃক্ষ)। তার ডালে এক পুঁটুলিতে ঝুলিয়ে রাখলেন সব অস্ত্রশস্ত্র। সেই ডাল থেকেই ঝুলিয়ে দিলেন এক শবদেহ। দুর্গন্ধে, ভয়ে কেউ যাবে না সেদিকে। অস্ত্র আছে বলে সন্দেহও করবে না। সাবধানের মার নেই। বিরাট রাজা বসে আছেন সভায়। এক সুদেহী সুদর্শন ব্রাহ্মণ এলেন। যুধিষ্ঠির।

বিরাট রাজা—কে আপনি ব্রাহ্মণ?

যুধিষ্ঠির—আমি কঙ্ক। যুধিষ্ঠিরের সখা। ভাল পাশা খেলতে পারি। রাজসভায় রাখলে আনন্দ পাবেন।

বিরাট—অতি উত্তম। আপনি রাজসভাতেই রইলেন।

পরদিন ভীম এলেন পাচকের বেশে। হাতা খুন্তি হাতে। বললেন, ‘আমি বল্লব। দারুন সব রান্না জানি।’ তক্ষুনি রাজপাচকের চাকরি পেলেন।

তারপর এলেন দ্রৌপদী। বললেন, ‘আমি সৈরিন্ধ্রী। আমার পাঁচ স্বামী। তাঁরা পাঁচ গন্ধর্ব। ভাল কেশবিন্যাস করা, গায়ে গন্ধ মাখানো, ছবি আঁকা, মালা গাঁথা—এসব কাজে আমি পারদর্শিনী।’

‘তুমি শুধু পারদর্শিনীই নও। প্রিয়দর্শিনীও বটে। চল তুমি আমার সাথে অন্তঃপুরে।’ বললেন রাণী সুদেষ্ণা।

মাথায় বেণী দোলাতে দোলাতে সভায় এলেন অর্জুন। ‘আমি বৃহন্নলা। রাজকুমারীকে নাচ-গান শেখাতে চাই। নাচ-গানে আমার উচ্চশিক্ষা আছে।’ সুতরাং রাজকুমারী উত্তরাকে নাচ-গান শেখাবার জন্যে নিযুক্ত হলেন তিনি। গো-বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে অরিষ্টনেমি নামে এসে সহদেব নিযুক্ত হলেন রাজার গোশালার গবাদি পশু রক্ষার কাজে। নকুল এসে বললেন, ‘আমি অশ্ববিশারদ। আমার নাম গ্রন্থিক।’ রাজা তাঁকে তাঁর ঘোড়াশালার দেখাশোনার ভার দিলেন।

॥ কীচক বধ ॥

কীচক ছিলেন রাজার শ্যালক। রানী সুদেষ্ণার ভাই। রাজবাড়িতে তাঁর দোর্দণ্ড প্রতাপ। চরম ব্যভিচারী। দ্রৌপদীর ওপর তাঁর নজর পড়ল। শুরু হল কুৎসিত আচরণ।

দ্রৌপদী গোপনে সব, জানালেন ভীমকে। ভীম বললেন, ‘আজ রাতে নাট্যশালায় তাকে আসতে বলো। বলো যে তুমি সেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করবে। তারপর তার পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে দেব।’

কীচক তো আহ্লাদে আটখানা হয়ে গভীর রাতে চুপি চুপি চোরের মতো পা টিপে টিপে এলেন নাট্যশালায়। চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন ভীম।

তাঁকে দ্রৌপদী ভেবে কীচক যেই না ভীমকে স্পর্শ করেছেন, অমনি ভীম টুঁটি টিপে কীচকের ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলেন। সবাই ভাবল সৈরিন্ধ্রীর গন্ধর্ব স্বামীরাই রাতে কীচককে হত্যা করেছেন।

॥ গরু চুরি করতে গিয়ে গো-হারা হারলেন দুর্যোধন ॥

গুপ্তচরদের কাছে দুর্যোধন খবর পেলেন, পাণ্ডবদের কোনও খোঁজ-খবর নেই। বোধহয় তারা মৃত। বিরাট রাজার শ্যালক সেনাপতি কীচকও মৃত। ত্রিগর্তরাজ সুশর্মা বললেন, ‘বিরাটরাজ বড্ড বেড়েছিল। চলুন এই সুযোগে তাঁর ধনরত্ন আর গো-ধন লুঠপাট করে আনি।’ আনন্দে সম্মতি দিলেন দুর্যোধন।

সুশৰ্মাই’ এগিয়ে গিয়ে মৎস্যদেশ আক্রমণ করলেন। পেছন পেছন চলল, দুর্যোধনের ফৌজ। বহু গরু লুঠ করলেন তাঁরা। বিরাট যুদ্ধে সুশমার কাছে বন্দী হলেন।

যুধিষ্ঠির দেখলেন, আর তো চুপচাপ থাকা যায় না। আশ্রয়দাতাকে রক্ষা করা একান্ত কর্তব্য। যুধিষ্ঠিরের নির্দেশে ভীম গেলেন বিরাটকে মুক্ত করতে। বিশাল এক গাছ ওপড়ালেন।

‘আরে ভীম! কর কি, কর কি? লোকে তোমায় চিনে ফেলবে যে। ওসব গাছ-ফাছ ছেড়ে এমনি তীর ধনুক নিয়ে লড়াই কর।’ তাই করলেন ভীম। সুশৰ্মা বন্দী হলেন। বিরাট হলেন মুক্ত। যুধিষ্ঠিরের নির্দেশে সুর্শমা ছাড়া পেলেন।

সুর্শমাকে ঠেকাতে অর্জুন ছাড়া চার পাণ্ডবকে নিয়ে বিরাটরাজ ব্যস্ত ছিলেন রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ করলেন দুর্যোধন। পঞ্চভূতের ফাঁদে পড়ে এলেন ভীষ্ম আর দ্রোণও। তাঁরা বিরাটের ষাট হাজার গরু হস্তগত করলেন। গোপালক এসে খবর লি রাজপুত্র উত্তরকে। উত্তর একে বালক, তায় একা। অসহায়। বললেন, ‘তেমন রথ আর সারথি পেলে আমি দেখে নিতাম দুর্যোধনকে।’

‘চিন্তা কী? আমি সারথি হব।’ বললেন বৃহন্নলা।

‘সে কি! আপনি নারী! আপনি সারথি হবেন? বললেন উত্তর।

বৃহন্নলার জেদে রাজি হলেন উত্তর। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে কৌরবদের বিশাল সমরসজ্জা দেখে ভয় পেয়ে গেলেন বালক উত্তর। বললেন, ‘দোহাই আপনার! রথ ফেরান। নইলে এই আমি লাফ দিলাম।’ বলে রথ থেকে এক লাফ।

খপ করে উত্তরকে ধরে সারথির আসনে বসালেন বৃহন্নলা-বেশী অর্জুন। বললেন, ‘এতই যদি ভয়, তবে তুমি রথ চালাও। আমি যুদ্ধ করছি। আগে চল রাজ্যের প্রবেশপথের ধারে সেই শমিবৃক্ষের কাছে, যার ডালে আমাদের অস্ত্রশস্ত্র সব রাখা আছে।’

‘অস্ত্রশস্ত্র? শমিবৃক্ষ? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না! বিস্মিত হলেন উত্তর। ‘অর্জুনের নাম শুনেছ?’

‘ত্রিভুবনের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর অর্জুন? তাঁর নাম কে না জানে?’

‘আমি সেই অর্জুন। কঙ্ক যুধিষ্ঠির। বল্লব ভীম। গ্রন্থিক নকুল। অরিষ্টনেমি সহদেব। আর সৈরিন্ধ্রী হলেন আমাদের পাঁচজনের স্ত্রী দ্রৌপদী।’

উত্তর বিস্ময়ে, আবেগে, আনন্দে কী করবেন ভেবে পেলেন না। নারীবেশ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে স্বমূর্তি ধরলেন অর্জুন। ধনুতে টঙ্কার দিলেন।

ধনুষ্টঙ্কার শুনে দ্রোণ বুঝলেন এ অর্জুনের সৃষ্টি। দুর্যোধন বললেন, ‘তের বছর তো হয়নি এখনও। ধরা পড়লে বার বছরের জন্যে বনে যেতে হবে যে। অর্জুন সে ঝুঁকি নেবে?’

জ্যোতিষী গণনা করে বললেন, ‘তের বছর উত্তীর্ণ মহারাজ।’

‘সর্বনাশ!’ আঁৎকে উঠলেন দুর্যোধন।

দ্রোণের পায়ের কাছে এসে মাটিতে বিধল ছ’টা বাণ। কান ঘেঁষে গেল ছ’টা। গুরুকে প্রণাম জানালেন তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় শিষ্য। আর জিজ্ঞেস করলেন কুশল। দ্রোণ আনন্দে আত্মহারা।

সব গরু উদ্ধার হল। সদলবল পরাজিত হয়ে পালালেন দুর্যোধন। প্রাণ বাঁচল। কিন্তু মান? পাণ্ডবদের পরিচয় পেয়ে বিরাটরাজা আহ্লাদে আটখানা। উত্তরার সাথে বিয়ে হল, অর্জুনের (সুভদ্রার গর্ভজাত) ছেলে অভিমন্যুর।

॥ উদ্যোগ পর্ব ॥

॥ কৃষ্ণের কাছে অর্জুন-দুর্যোধন ॥

কৃষ্ণ বললেন, ‘পাণ্ডবরা অনেক দুঃখ কষ্ট ভোগ করেছেন। এবার হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্যে উদ্যোগী হন।’ বলে কৃষ্ণ ফিরে গেলেন দ্বারকায়।

বলরাম বললেন, ‘কৌরবদের সভায় শান্তিদূত পাঠানো হোক। আপস মীমাংসাই ভাল।

সাত্যকি বললেন, ‘আপসে হবে না। যুদ্ধ চাই।’

শান্তিদূত গেল হস্তিনাপুরে। দ্রুপদের পরামর্শে দেশে দেশে দূত গেল প্রয়োজনে যুদ্ধে সহায়তা প্রার্থনা করতে।

অর্জুন চললেন দ্বারকা। একই দিনে দুর্যোধনও সেখানে হাজির। কৃষ্ণ তখন ঘুমোচ্ছন। অর্জুন বসলেন কৃষ্ণের পায়ের তলায়। দুর্যোধন মাথার দিকে।

চোখ মেলে প্রথমে অর্জুনকেই দেখলেন কৃষ্ণ। তারপর দুর্যোধনকে। বললেন, ‘একদিকে আমি। আর এক দিকে আমার লক্ষ লক্ষ নারায়ণী সেনা। এর মধ্যে যার যা পছন্দ নিতে পার। একটা কথা। আমি যুদ্ধে সারথির কাজ করতে পারি, কিন্তু অস্ত্র ধরব না। চোখ খুলে আগে অর্জুনকে দেখেছি। তাছাড়া অর্জুন বয়সেও ছোট। কাজেই অর্জুনই আগে বেছে নাও।’

অর্জুন বললেন, ‘সখা! তুমি তো বেশ ভালই জান, তোমাকে পেলে এ বিশ্বসংসারে আর কিছুই চাই না আমি।’

দুর্যোধন ভাবলেন, ‘আচ্ছা আহাম্মক তো অৰ্জুনটা! কৃষ্ণ একা করবেটা, কী? তাও আবার বলছে অস্ত্রও ধরবে না। যাক্‌ গে, মরুকগে। আমি তো যা চাইছিলাম তাই পেয়ে গেলাম। তবে আর ভাবনা কী?’

দুর্যোধন দৌড়লেন এবার বলরামের কাছে। বলরাম বললেন, ‘আমাকে আর এর মধ্যে টেন না।’

॥ যুদ্ধ ছাড়া সূচ্যগ্র মাটিও দেব না ॥

রাজারা দু’ভাগ হলেন। পাণ্ডবদের দিকে এলেন সাত্যকি, ধৃষ্টকেতু, দ্রুপদ, বিরাট, ইত্যাদি। মোট সৈন্য সংখ্যা দাঁড়াল তাঁদের সাত অক্ষৌহিণী।

কৌরবপক্ষে যোগ দিলেন ভগদত্ত, শল্য, কৃতবর্মা, জয়দ্ৰথ, সুদক্ষিণ ইত্যাদি। এঁদের সৈন্য সংখ্যা দাঁড়াল এগার অক্ষৌহিনী।

যুধিষ্ঠির দূত মারফত খবর পাঠালেন, তাঁদের রাজ্য তাঁদেরকে ফিরিয়ে দিতে যদি কৌরবদের আপত্তি থাকে তো তাঁদের পাঁচ ভাইয়ের নামে পাঁচটা গ্রাম লিখে দিক কৌরবরা। তাতেই তাঁরা খুশি থাকবেন। সম্পদের চেয়ে শান্তি বড়। বিত্তের চেয়ে চিত্ত।

ভীষ্ম, দ্রোণ এমনকি ধৃতরাষ্টও শান্তিই চাইছিলেন। কিন্তু দুর্যোধন আর কর্ণ চান যুদ্ধ। অহংকারী দুর্যোধন সদম্ভে বললেন, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী।’

বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, ‘দৈব ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানুষ কী করবে? যা হবার তা হবেই।’

॥ ব্যর্থ হল কৃষ্ণের শান্তিদৌত্যও ॥

কৃষ্ণ বললেন, ‘আমি একবার দেখি শেষ চেষ্টা করে, দুর্যোধনের মতি ফেরাতে পারি কিনা। তা তোমাদের সব কী মত শুনি একবার?’

সহদেব আর দ্রৌপদী ছাড়া আর সবাই যুদ্ধ যাতে এড়ানো যায় সে চেষ্টাই করতে বললেন কৃষ্ণকে। স্বজনহত্যায় সম্মতি নেই কারো। সহদেব বললেন, ‘যুদ্ধই হওয়া দরকার। তবেই ওরা উচিত শিক্ষা পাবে।’

‘তুমি কৌরবসভায় যখন শান্তির প্রস্তাব দেবে কৃষ্ণ, তখন যেন ভুলে যেও না যে দুষ্ট দুঃশাসন আমার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে আমাকে প্রকাশ্য সভায় নিয়ে গিয়েছিল। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেছিল। আর সর্বোপরি আমার বস্ত্রহরণের পাশবিক চেষ্টা করেছিল। তখন তুমি আমার লজ্জা নিবারণ না করলে আজ দ্রৌপদীর কী অবস্থা হত একবার ভাব? আমি যে তোমাকে ছাড়া কিছু জানি না নাথ। যা ভাল মনে কর তুমি তাই কর।’ ব্যাকুলভাবে কাঁদতে কাঁদতে বললেন দ্রৌপদী।

কৃষ্ণ এলেন হস্তিনাপুরে। কিন্তু দুর্যোধনের যুদ্ধংদেহী মনোভাব একটুও বদলাতে পারলেন না। কৃষ্ণ গান্ধারীকে বললেন, ‘মা! আপনি একটু বোঝান ছেলেটাকে।’ গান্ধারীর কথায় চিঁড়ে ভিজল না। যুদ্ধ অবধারিত হয়ে উঠল।

॥ কর্ণ-কৃষ্ণ সংবাদ ॥

ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসছেন কৃষ্ণ। ‘ওকে! কর্ণ না? হ্যাঁ কর্ণই তো। দেখি একবার কর্ণকে বলে।’

‘কর্ণ! তুমি হয়তো জান না যে, তুমিই জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব। কুম্ভীর গর্ভজাত প্রথম পুত্র।’

মাথা নত করলেন কর্ণ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘জানি কৃষ্ণ। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে। দুর্যোধনের কাছে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর ফিরতে পারব না।

॥ কর্ণ-কুন্তী সংবাদ ॥

‘কর্ণ!’

‘কে? এ কি! মা কুন্তী! তুমি! তুমি এখানে কেন মা? একাকিনী?’ মাকে পরম শ্রদ্ধায় সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন কর্ণ।

‘কর্ণ! বাছা আমার! আমি একদিন অপরিণত বুদ্ধিতে যে অন্যায় করেছিলাম তার শাস্তি যতদিন বাঁচব ততদিন আমায় ভোগ করতে হবে? চল বাবা! ফিরে চল!

‘না মা। তা আর হয় না। বড্ড দেরি হয়ে গেছে মা। কর্ণকে তুমি মন থেকে মুছে ফেল মা। তবে তুমি যখন স্বয়ং এসেছ গর্ভধারিণী আমার, আমি কথা দিচ্ছি মা, এক অর্জুন ছাড়া আমার অন্য কোনও ভাইকে আমি বধ করব না। অর্জুন আর আমার মধ্যে একজন থাকবে। তোমার পাঁচ ছেলেই থাকবে।’

॥ বেজে উঠল তুরী-ভেরী-দামামা ॥

পাণ্ডবদের সাত দলের সেনাপতি হলেন দ্রুপদ, বিরাট, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, সাত্যকি, চেকিতান আর ভীম। প্রধান সেনাপতি ধৃষ্টদ্যুম্ন। প্রধান পরিচালক অর্জুন।

দুর্যোধন কৃপ, দ্রোণ, শল্য, জয়দ্ৰথ, সুদক্ষিণ, কৃতবর্মা, অশ্বত্থামা, ভুরিশ্রবা, শকুনি, বাহ্লীক ইত্যাদিকে এক এক বাহিনীর সেনাপতি করে দিলেন। ভীষ্ম কর্ণকে সহ্য করতে পারতেন না। বললেন, ‘ও অস্ত্র ধরলে আমি অস্ত্র ধরব না।’ কর্ণও উল্টোটাই বললেন। কর্ণ আপাতত সরে থাকলেন। ভীষ্ম হলেন প্রধান সেনাপতি।

ব্যাসদেব সঞ্জয়কে দিব্যদৃষ্টি দিলেন যাতে তিনি ঘরে বসেই পুরো যুদ্ধ দেখতে পারেন। ধৃতরাষ্ট্রকে শোনাতে পারেন তার ধারা-বিবরণী। সরাসরি তরঙ্গায়িত দূরদর্শন? বেজে উঠল তুরী-ভেরী-দামামা। বেজে উঠল অসংখ্য শঙ্খ।

॥ ভীষ্ম পর্ব ॥

॥ যুদ্ধের নিয়ম ॥

দু’পক্ষ মিলে কিছু নিয়ম কানুন ঠিক করে নিল যুদ্ধের।

এক—দিনে যুদ্ধ। সূর্যাস্তে যুদ্ধের অবসান। তখন পরস্পরের সঙ্গে প্রীতির সম্পর্ক।

দুই—সমানে সমানে যুদ্ধ হবে। বাক্‌যাদ্ধার সাথে বাক্‌যাদ্ধার। পদাতিকের সাথে পদাতিকের।

অশ্বারোহীর সাথে অশ্বারোহীর। গজারোহীর সাথে গজারোহীর। রথীর সাথে রথীর।

তিন—যে রণে ক্ষান্ত দিয়ে সরে দাঁড়াবে, তাকে কেউ আক্রমণ করবে না।

চার—নিরস্ত্র বর্মহীনকে আঘাত করা চলবে না।

পাঁচ—সারথি, মোটবাহক, অস্ত্রযোগানদার, বাজনদার, পতাকাবাহক, শুশ্রূষাকারী ইত্যাদি কারুকে অস্ত্রাঘাত করা যাবে না।

যদিও শেষ পর্যন্ত এসব নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়নি। আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল উভয়পক্ষেই

॥ কৃষ্ণার্জুন সংবাদ: শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা ॥

‘কৃষ্ণ! রথটাকে একবার পাণ্ডব কৌরবদের মাঝ বরাবর রাখ তো। দেখে নিই একবার, কাদের সঙ্গে লড়তে হবে।’ বললেন অর্জুন।

কৃষ্ণ রথ নিয়ে এলেন দু’পক্ষের মাঝখানে। অর্জুন ভাল করে দেখে নিলেন চারপাশ। তারপর আর্দ্রকণ্ঠে বললেন, ‘কৃষ্ণ! এ অসম্ভব! আমি যুদ্ধ করতে পারব না। আমার সারা গা থর থর করে কাঁপছে। হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ছে।’

‘সে কি সখা! কেন তোমার এমন হচ্ছে? কৃষ্ণ জানতে চাইলেন।

‘পিতামহ ভীষ্ম, গুরুদেব দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য আমার ভাইরা আর আত্মীয়-স্বজন সব সামনে। এঁদের হত্যা করে রাজ্য ফিরে পেতে হবে? রাজ্য তো দূরস্থান এঁদের বধ করে আমি স্বর্গও পেতে চাই না। কাজ নেই আর যুদ্ধ করে। আমি বরং সন্ন্যাসী হয়ে ভিক্ষে করে খাব, সেও ভাল। তবু এঁদের বধ করতে পারব না।’ অর্জুন ভেঙে পড়লেন।

কৃষ্ণ গম্ভীর হলেন। বললেন, ‘তুমি বীরশ্রেষ্ঠ। তুমিই যদি একথা বল তবে অন্যরা কী বলবে? ওসব কাপুরুষতা ছাড়। পুরুষকারকে জাগিয়ে তোল।’

‘কিন্তু এ যুদ্ধে বংশ-লেপ, ধর্ম-লোপ, এসব অকল্যাণ ছাড়া কল্যাণ কিছু হবে না কৃষ্ণ।’

‘অর্জুন! ভুলে যেও না, তুমি একজন ক্ষত্রিয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই না করাই তোমার পক্ষে অধর্ম। আর তুমি স্বজন-হত্যার কথা বলছ? তুমি জেনে রাখ, এঁদের মৃত্যু আমি নির্ধারিত করেই রেখেছি। আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারে না। আর আত্মা অবিনাশী। মৃত্যু তো দেহের ধর্ম। আত্মার জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরে, আত্মাও তেমনি কর্মফল অনুসারে দেহ থেকে দেহান্তরে যায় মাত্র। কাজেই ওর জন্যে তুমি শোক করো না।’

‘সবই বুঝতে পারছি কৃষ্ণ। কিন্তু···’

‘এখনও কিন্তু? এখনও সংশয়? বেশ, তবে এই দেখ আমার বিশ্বরূপ।’

‘একি! কৃষ্ণ! একি! এই নিখিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সবই যে তোমার দেহের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে! নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, বন, সব! সব তোমার মধ্যে! চাঁদ আর সুর্য যেন তোমার দুই চোখ! আমি, আমি এ কী দেখছি কৃষ্ণ! আজ যে আমার জীবন সার্থক হল। তোমাকে সখা ভাবে কত কথা বলেছি। না জেনে কতই না জানি অপরাধ করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর কৃষ্ণ। আমি তোমার দাসানুদাস মাত্র। তুমি কৃপা করে আমায় আদেশ কর কৃষ্ণ। বল কী করতে হবে?’

‘বাঃ এই তো বীরের মতো তুমি জেগে উঠেছ অর্জুন। এবার সামনে তাকাও। কর্তব্য স্থির কর। ভুলে যেও না কর্তব্যই কর্ম। আর তা নিষ্কামভাবে করতে পারলেই আমাকে লাভ করতে পারবে। হে ভারত, ধর্ম যখনই গ্লানিযুক্ত হয়, যখনই অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখনই সাধুদের বাঁচাবার জন্যে, দুষ্কৃতিদের ধ্বংস করার জন্যে আর ধর্মকে আবার তার গৌরবের জায়গায় সংস্থাপনের জন্যে আমি যুগে যুগে আবির্ভূত হই। আমি যুগে যুগে অবতার!

॥ আশীবাদ পেলেন যুধিষ্ঠির ॥

যুধিষ্ঠির ভীষ্মের পা জড়িয়ে ধরে তাঁর আশীর্বাদ চাইলেন। ভীষ্ম বললেন, ‘আমি এদের অন্নের দাস। তাই এদের হয়ে আমাকে অস্ত্র ধরতেই হচ্ছে। কিন্তু মনে রেখ, জয় সেখানেই, ধর্ম আছে যেখানে।’ দ্রোণ আর কৃপও একই কথা বললেন। যুধিষ্ঠিরের ডাকে সাড়া দিয়ে দুর্যোধনের বৈমাত্রেয় ভাই সৌবলীর ছেলে যুযুৎসু চলে এলেন পাণ্ডব পক্ষে।

শুরু হল লড়াই। ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র এক মুহারণাঙ্গনের চেহারা নিল।

ভীষ্ম একাই একশ’। অসংখ্য সৈন্য প্রাণ হারাল তাঁর অস্ত্রাঘাতে। প্রতিদিন দশ হাজার করে ন’দিনে নব্বই হাজার সৈন্য তিনি একাই শেষ করলেন।

যুধিষ্ঠির দেখলেন মহাবিপদ। ভীষ্ম এভাবে লড়লে আমাদের সব সৈন্য যে শেষ হয়ে যাবে। নবম দিনে রাতে ভীষ্মের কাছে গিয়ে সব বললেন।ভীষ্ম বললেন, ‘চিন্তা নেই। তোমরা দ্রুপদের ছেলে শিখণ্ডীকে সামনে রেখে যুদ্ধ কর। আগের জন্মে সে-ই অম্বা ছিল। ওকে দেখলে আমি আর যুদ্ধ করব না। তখন তোমরা আমাকে বধ করো।’

পরদিন শিখণ্ডীকে সামনে রেখে ভীষ্মকে বাণে বাণে জর্জরিত করলেন অর্জুন। সূর্যাস্তের আগেই তাঁর বাণ-বিদ্ধ দেহ পড়ে গেল। কিন্তু সারা দেহে এত শর, যে তা মাটি ছুঁল না। শরশয্যাতেই শুয়ে রইলেন ভীষ্ম।

পাণ্ডবরা অস্ত্র ফেলে দৌড়ে এলেন পিতামহের কাছে। এলেন কৌরবরাও।

ভীষ্ম বললেন, ‘আমাকে একটা বালিশ দিতে পার?’ দুর্যোধন দৌড়ে নিয়ে এলেন তুলতুলে নরম এক বালিশ।

ভীষ্ম বললেন, ‘উঁহুঁ। এ বালিশ ক্ষত্রিয়কে মানায় না। অর্জুন!’

অর্জুন বুঝলেন পিতামহ কী চান। তিন বাণে ভীষ্মের ঝুলে পড়া মাথাকে ওপরে তুলে দিলেন অর্জুন। এত যন্ত্রণাতেও ভীষ্মের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

যাঁর কোলে কতদিন মাথা দিয়ে শুয়ে কত প্রশ্নই করেছেন অর্জুন, আজ সেই প্রিয়তম পিতামহকেই শরের বালিশ দিতে বুক ফেটে গেল অর্জুনের। দুই গাল বেয়ে নেমে এল অশ্রুধারা।

পরদিন ভোরে আবার সবাই এলেন ভীষ্মের কাছে। ভীষ্ম বললেন, ‘বড্ড জল তেষ্টা পেয়েছে।’ ঠাণ্ডা জল নিয়ে এলেন দুর্যোধন। ভীষ্ম বললেন। ‘না। এ জল নয়। অর্জুনকে ডাক।’

অর্জন ভীষ্মকে প্রদক্ষিণ করে এক বাণে শীতল জলধারা এনে দিলেন ভীষ্মের মুখে। ভীষ্ম প্রাণভরে আশীবাদ করলেন অর্জুনকে। তারপর দুর্যোধনকে ডেকে বললেন, ‘এখনও সময় আছে। সন্ধি করে নাও পাণ্ডবদের সাথে। নইলে কিন্তু ধ্বংস অনিবার্য।’

কিন্তু ‘চোরা না শুনে কভু ধর্মের কাহিনী।’ দুর্যোধন ভীষ্মের কথায় কর্ণপাত করলেন না।

‘আমি কর্ণ! যে আপনার দুচোখের বিষ!’ কর্ণ এসে দাঁড়ালেন ভীষ্মের পাশে!

‘ছিঃ কর্ণ! তুমি দুর্যোধনকে কুপরামর্শ দিতে। তাই আমি তোমায় বক্‌তাম। তুমি কি জান? তুমি পাণ্ডবদের বড় ভাই? ভাইদের বিরুদ্ধে তুমি লড়বে?’

‘কী করব? আমি দুযোধনের কাছে প্রতিশ্রুত।’

‘বেশ! তবে স্বর্গলাভের জন্যে ধর্মযুদ্ধ কর।’ ভীষ্মকে প্রণাম ক’রে চোখের জল মুছতে মুছতে ফিরে গেলেন কর্ণ।

॥ দ্রোণ-পর্ব ॥

॥ অর্জুন বেঁচে গেলেন কৃষ্ণের কৃপায় ॥

এগার দিনের দিন দ্রোণ হলেন কৌরব সেনাপতি। যুধিষ্ঠিরকে বন্দী করতে আপ্রাণ লড়াই করলেন তিনি। পারলেন না অর্জুনের জন্যে।

বার দিনের দিন অর্জুনকে ব্যস্ত রাখলেন ত্রিগর্তরাজ সুশর্মা। ভীম আক্রমণ করলেন দ্রোণকে। ভগদত্ত অর্জনকে বৈষ্ণবাস্ত্র ছুঁড়লেন। বুক বাড়িয়ে দিলেন কৃষ্ণ। বৈষ্ণবাস্ত্র তাঁর গলায় মালা হ’য়ে দুলতে লাগল। কৃষ্ণ তা না করলে এ অস্ত্রে অর্জুন নির্ঘাত মারা যেতেন।

॥ অভিমুন্য বধ ॥

‘আপনি পাণ্ডবদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছেন। তাই আমরা সুবিধে করতে পারছি না।’ দ্রোণাচার্যকে বললেন দুর্যোধন।

‘কী? এত বড় কথা? ঠিক আছে। আজ আমি পাণ্ডবদের অন্তত একজন বীরকে নিধন করবই করব।’ দুর্যোধনের কটাক্ষে বিদ্ধ হয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন বৃদ্ধ দ্রোণ।

চক্রব্যুহ তৈরি করলেন দ্রোণ। এ ব্যুহে ঢুকে বেরিয়ে আসতে পারেন কেবল অর্জুন। অর্জুনকে ব্যতিব্যস্ত করে অন্যদিকে আটকে রাখলেন ত্রিগর্তরাজ সুর্শমা। অর্জুনের ছেলে অভিমন্যু চক্রব্যুহে ঢুকতে শিখেছে বাবার কাছে। কিন্তু বেরোতে শেখেনি। তা ছাড়া অভিমন্যু যে বালক! তাকে কী করে এই ব্যূহে পাঠানো যায়? কিন্তু পাণ্ডবদের মানমর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হবে ব্যূহ ভেদ করতে না পারলে।

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘অভিমন্যু! তুমি একবার শুধু ঢুকে পড় ব্যূহে। তারপর আমরা সবাই তোমার পেছন পেছন ঢুকে পড়ব। কোনও চিন্তা নেই।’

জয়দ্রথ দ্রৌপদীহরণের সময় ধরা পড়ে অপমানিত হয়েছিলেন। সেই জ্বালা মেটাবার এই তো সুযোগ। কারণ, শিবের বরে একদিন তিনি অর্জুন ছাড়া অন্য সব পাণ্ডবদের হারাতে পারবেন।

অভিমন্যু চক্রব্যূহে ঢোকার পরেই জয়দ্রথ ব্যূহের প্রবেশমুখে বাকি পাণ্ডবদের আটকে রাখলেন। প্রবল পরাক্রমে অসামান্য বীরত্বের সঙ্গে কৌরবপক্ষের সমস্ত রথী মহারথীদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেলেন অভিমন্যু একাই।

‘হ্যাঁ। বাপকা বেটা তৈরি হয়েছে। আহা!’ মনে মনে তারিফ করলেন দ্রোণ। অভিমন্যুর অস্ত্রের আঘাতে কর্ণ হলেন নাজেহাল। জ্ঞান হারালেন দুঃশাসন আর শল্য। ত্রস্ত হয়ে উঠলেন দ্রোণ, কৃপ, অশ্বথামা, বৃহদ্বল, কৃতবর্মা। দুর্যোধনের ছেলে লক্ষণ অভিমন্যুর ছোঁড়া ভল্লের আঘাতে প্রাণ হারাতেই ক্ষিপ্ত দুর্যোধন বললেন, ‘যে করেই হোক একে মার।’

তখন বিবেক-বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে সব রথী-মহারথীরা মিলে একসঙ্গে আক্রমণ করলেন অভিমন্যুকে! যুদ্ধের সব নিয়মকানুন ভেঙে! বেচারা! বালক অভিমন্যু! সারাদিন একা একা লড়তে লড়তে অন্যায়, অসমযুদ্ধে বীরের মতো প্রাণ দিলেন। ঘুমিয়ে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। মরে অমর হলেন অভিমন্যু।

॥ জয়দ্রথ বধ ॥

অভিমন্যুর খবরে শোকে ভেঙে পড়লেন পাণ্ডবরা। অর্জুন বাইরে ছিলেন। শিবিরে ফিরে খবর শুনেই জ্ঞান হারালেন। জ্ঞান ফিরলে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে লাগল দু’চোখে। চোয়াল শক্ত করে শপথ নিলেন, ‘কাল সূর্যাস্তের আগে হয় পাপিষ্ঠ জয়দ্রথকে বধ করব, নয় আগুনে আত্মাহুতি দেব।

প্রতিজ্ঞার খবর গেল কৌরব শিবিরে। পর দিন অর্জুনের হাত থেকে জয়দ্রথকে বাঁচাবার জন্যে দ্রোণ চক্র-শকট ব্যূহ তৈরি করলেন। সেই ব্যুহের ভেতর তৈরি করলেন আর এক ব্যূহ। পদ্মব্যূহ। পদ্মব্যূহের ভেতর তৈরি হল সূচীব্যূহ। সেই সূচীব্যূহর এক কোণে লুকিয়ে থাকলেন জয়দ্রথ।

জয়দ্রথের বাবা বৃদ্ধক্ষত্র বর লাভ করেছিলেন, যে তাঁর ছেলের মাথা মাটিতে ফেলবে, তার নিজের মাথাও সাথে সাথে উড়ে যাবে। কৃষ্ণ তা জানতেন। জানালেন অর্জুনকেও।

কিন্তু কোথায় জয়দ্রথ? বেলা যে পড়ে এল। কৌরবরা অর্জুনকে আত্মাহুতি দিতেই হবে—ধরে নিয়েছেন। মায়াধীশ কৃষ্ণ মায়াবলে সূর্যকে ঢেকে দিলেন। সূর্য গেল অস্তাচলে। সবাই ভাবল তাই। কৌরবরা হাত পা ছুঁড়ে নাচতে লাগলেন।

উল্লাসে অর্জুনের সামনে এসে আস্ফালন করতে লাগলেন জয়দ্রথ। তখন কৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন এক বাণে জয়দ্রথের মাথা কেটে বাণে বাণে তাকে উড়িয়ে নিয়ে ফেললেন তাঁর বাবা বৃদ্ধক্ষত্রের কোলে।

ধ্যানমগ্ন ছিলেন বৃদ্ধক্ষত্র। চমকে উঠে মাথা ফেলে দিলেন মাটিতে। বৃদ্ধক্ষত্রের নিজের পাওয়া বরে নিজের মাথাটিও উড়ে গেল।

মায়ামেঘ সরিয়ে নিলেন কৃষ্ণ। আকাশে কিরণ ছড়িয়ে আবার দেখা দিলেন দিনমণি। সবাই বুঝতে পারলেন—এ সবই কৃষ্ণের মায়া।

॥ ঘটোৎকচ বধ ॥

একমাত্র বোন দুঃশলার স্বামী জয়দ্রথ বধ হওয়ায় দ্রোণের বিশ্বস্ততাকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন দুর্যোধন। দ্রোণ বললেন, ‘মিছিমিছি আমাকে অবিশ্বাস করছ দুর্যোধন। এটা বুঝছ না কেন, আমি বুড়ো হয়েছি। চোখে ভাল দেখতে পাই না। হাত কাঁপে। তবু আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। বেশ, ঢ্যাঁড়া দাও, আজ সারারাত যুদ্ধ চলবে।’

ভীম-হিড়িম্বার ছেলে ঘটোৎকচই ছিলেন সেই নিশাযুদ্ধের নায়ক। কর্ণসহ কৌরবদের তিনি নাজেহাল করে তুললেন। কথায় বলে, ক্রোধে বুদ্ধিনাশ হয়। কর্ণও ক্রোধে দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ইন্দ্রের কাছ থেকে পাওয়া অব্যর্থ ‘শক্তিবাণ’ ছুঁড়ে বধ করলেন ঘটোৎকচকে। সেই শক্তিবাণ, যা কর্ণকে ইন্দ্র দিয়েছিলেন কবচকুণ্ডলের বিনিময়ে। যা কর্ণ এতদিন সযত্নে তুলে রেখেছিলেন অর্জুন বধের জন্যে।

ঘটোৎকচ-পতনে পাণ্ডব শিবিরে অন্য সবাই মুষড়ে পড়লেও কৃষ্ণকে বেশ খুশি খুশিই দেখাচ্ছিল। কারণ, কর্ণ কিছুতেই আর অর্জুনকে মারতে পারবেন না

॥ অশ্বত্থামা হত: ইতি কুঞ্জর ॥

পরদিন দ্রোণের হাতে প্রাণ দিলেন দ্রুপদ, বিরাট ইত্যাদি মহারথীরা। কৃষ্ণ বললেন, ‘দ্রোণকে অশ্বত্থামার মৃত্যুর খবর কৌশলে দিতে হবে। ছেলের মৃত্যুসংবাদ না পেলে তিমি অস্ত্র ছাড়বেন না। আর দ্রোণের হাতে যতক্ষণ অস্ত্র থাকবে, ততক্ষণ পাণ্ডবদের জয়ের কোনও আশাই নেই।’

অশ্বত্থামা নামে এক হাতি ছিল মালবরাজার। ভীম গদা দিয়ে পিটিয়ে তার ভবলীলা সাঙ্গ করলেন। তারপর দ্রোণকে গিয়ে বললেন, ‘অশ্বত্থামা মারা গেছে।’

দ্রোণ বললেন, ‘যুধিষ্ঠির ছাড়া কারো কথা আমি বিশ্বাস করি না।’

যুধিষ্ঠির তো মিথ্যে বলবেন না। কৃষ্ণ অনেক বোঝালেন, ‘দেখুন মহারাজ: ক্ষত্রিয় প্রয়োজনে ছল, বল এবং কৌশল অবলম্বন করতেই পারে। তাতে দোষ নেই।’

যুধিষ্ঠির তখন দ্রোণকে গিয়ে খুব জোরে জোরে বললেন, ‘অশ্বত্থামা হত। আর খুব আস্তে বললেন, ‘ইতি কুঞ্জর’। কুঞ্জর মানে হাতি। কাজেই যুধিষ্ঠিরের মিথ্যে বলাও হল না। আবার দ্রোণও ভাবলেন তাঁর ছেলে সত্যিই মারা গেছে। সাপ মরল। অথচ লাঠিও ভাঙল না।

অস্ত্রত্যাগ করলেন দ্রোণ। ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের চুলের মুঠি ধরে খড়গ দিয়ে তাঁর মাথা কেটে ফেললেন।

ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে অশ্বত্থামা ছুঁড়লেন নারায়ণী অস্ত্র। যে রথে, গজে, অশ্বে থাকবে বা যার হাতে অস্ত্র থাকবে, নারায়ণী অস্ত্র তাকেই সংহার করবে।

কৃষ্ণ তা জানতেন। কৃষ্ণের নির্দেশে অস্ত্র ফেলে মাটিতে লাফিয়ে পড়লেন সসৈন্য পাণ্ডবরা।

দুর্যোধন বললেন, ‘অশ্বত্থামা, আবার ছোঁড় নারায়ণী বাণ।’

অশ্বত্থামা বললেন, ‘না, এ অস্ত্রের নিয়ম হল দ্বিতীয়বার ছুঁড়লে যে ছুঁড়েছে তাকেই সংহার করবে। কৃষ্ণের জন্যেই পাণ্ডবরা আজ বেঁচে গেলেন।’

॥ কর্ণ পর্ব ॥

॥ কর্ণার্জুনের শপথ ॥

ষোল দিনের দিন কর্ণকে সেনাপতি করলেন দুর্যোধন। সারাদিন ধরে কর্ণ দাপটে যুদ্ধ করলেন।

পরদিন কর্ণ বললেন, ‘আজ আমার আর অর্জুনের মধ্যে একজন থাকবে। একজন যাবে।’

শুনে দুর্যোধন মহাখুশি। শল্যকে বললেন কর্ণের সারথি হতে। যুধিষ্ঠিরকে শল্য এক সময় কথা দিয়েছিলেন কর্ণার্জুনের যুদ্ধে তিনি অর্জুনকেই সাহায্য করবেন। এই তো সেই সুযোগ। এই মনে করে তিনি রাজি হলেন।

যুদ্ধক্ষেত্রে কর্ণ যতই বীরত্ব দেখান, যতই দম্ভোক্তি করেন, যতই আস্ফালন করেন, শল্য তাঁকে তীক্ষ্ণ কটাক্ষপাতে বিদ্রুপের কশাঘাতে ততই জর্জরিত, বিরক্ত করে তুললেন। যাতে কর্ণের মনঃসংযোগ নষ্ট হয়।

যুধিষ্ঠিরের এক বাণে জ্ঞান হারালেন কর্ণ। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর কর্ণ এবং অন্যান্যরা মিলে যুধিষ্ঠিরকে এমন শিক্ষা দিলেন যে যুধিষ্ঠির রণে ভঙ্গ দিয়ে শিবিরে এসে শুয়ে পড়লেন।

খবর পেয়ে অর্জুন কৃষ্ণকে নিয়ে ছুটে এলেন যুধিষ্ঠিরকে দেখতে। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘অর্জুন! কর্ণবধের মতো বড় বড় কথা না বলে, বরং নিজের গাণ্ডীব অন্যকে দিয়ে দাও।’

‘কী? এত বড় কথা?’ খড়গ নিয়ে অর্জুন কাটতে এলেন যুধিষ্ঠিরকে।

কৃষ্ণ খপ করে অর্জুনের হাত চেপে ধরে বললেন, ‘অর্জুন? ছিঃ! এ কী করছ! তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?’

অর্জুন বললেন, ‘অন্যকে গাণ্ডীব দিয়ে দেবার কথা যে আমায় বলবে, তাকেই আমি কাটব। এই আমার প্রতিজ্ঞা। আমি ক্ষত্রিয়। প্রতিজ্ঞা রক্ষা করাই আমার ধর্ম। কাজেই আমাকে ধর্মরক্ষা করতে দাও কৃষ্ণ।’

কৃষ্ণ বললেন, ‘ওঃ! খুব যে ধর্মজ্ঞান দেখছি। খুব হয়েছে। খড়্গ ফেল। কোনটা ধর্ম আর কোনটা অধর্ম তা বোধ করি তোমার কাছে আমাকে শিখতে হবে না। যা মানুষকে ধারণ করে তা-ই ধর্ম। যা তাকে কাম-ক্রোধ-লোভ- মদ-মোহ-মাৎসর্যের গর্তে ফেলে দেয়, তা-ই অধর্ম।’

অনুতপ্ত, লজ্জিত অর্জুন ক্ষমা চাইলেন যুধিষ্ঠিরের কাছে। বললেন, ‘আজ হয় কর্ণের মা, নয় অর্জুনের মা পুত্রহারা হবেন।’

হায় রে অর্জুন! তুমি তো জান না। সে দুই মা-ই যে একজনই। কুন্তী! কর্ণ যে তোমারই সবচেয়ে বড় দাদা!

॥ দুঃশাসনের বুক চিরে রক্ত পান করলেন ভীম ॥

যুদ্ধের শর্ত ভঙ্গ করে ভীমের সারথিকে মারলেন দুঃশাসন। ক্ষিপ্ত হয়ে মহাভীম ভীমসেন কৌরব সমরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। গদাঘাতে ছিটকে পড়লেন দুঃশাসন। তাঁর গলায় পা দিয়ে ভীম বললেন, ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা, তার কেশাকর্ষণ আর আমাকে পেছন থেকে “গরু, গরু” বলে ডাকার কথা তোর মনে আছে? আজ তার শাস্তি। আজ তোর বুক চিরে আমি রক্তপান করব। কারো ঘাড়ে মাথা থাকে তো বাধা দিক।’

ভীমের রক্তপান দেখে ভয়ে কৌরবরা পালালেন। ভীম বললেন, ‘আর একটা পাপাত্মা দুর্যোধনকে বধ করব, তবে আমার শান্তি।’ ভীমের হাতে সেদিন দুঃশাসন ছাড়া দুর্যোধনের আরও দশ ভাই প্রাণ দিলেন।

॥ কর্ণ বধ ॥

কর্ণের ছেলে কিশোর বৃষসেনকে দেখেই অভিমন্যুর কথা মনে পড়ে গেল অর্জুনের। প্রতিশোধের জ্বালা মেটাতে তখনই এক বাণে তাকে শেষ করলেন।

ক্রুদ্ধ কর্ণ ভয়ঙ্করভাবে আক্রমণ করলেন অর্জুনকে। কর্ণাজুনের যুদ্ধে পৃথিবী কেঁপে উঠল। ভয়ে সব দিশেহারা হয়ে উঠল।

তক্ষকের ছেলে অশ্বসেন খাণ্ডবদাহের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। তাকে বাণে পুরে কর্ণ ছুঁড়লেন অর্জুনের দিকে।

কৃষ্ণ পায়ের চাপে অর্জুনের রথ খানিকটা মাটিতে বসিয়ে দিলেন। অর্জুনের শুধু মুকুট খানিকটা পুড়ে গেল। প্রাণে বেঁচে গেলেন অর্জুন।

অর্জুন বাণে বাণে কর্ণকে বিধ্বস্ত করে ফেললেন। কর্ণের মুকুট বর্ম টুকরো টুকরো হয়ে গেল। কর্ণ কত দিব্য অস্ত্রের কথাই জানতেন। কী আশ্চর্য! আজ একটাও মনে করতে পারছেন না! তার ওপরে তাঁর রথের চাকা হঠাৎই যেন আস্তে আস্তে মাটিতে বসে যেতে শুরু করল!

মনে পড়ল কর্ণের পরশুরামের দেওয়া অভিশাপের কথা। পরশুরামের কাছে নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে মিথ্যে পরিচয় দিয়ে শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন কর্ণ। একদিন কর্ণের উরুতে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিলেন পরশুরাম। একটা জোঁক কর্ণের উরুকে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলে। গুরুর ঘুমের ব্যাঘাত হবে ভেবে সব যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করেন কর্ণ।

ঘুম ভেঙে উঠে পরশুরাম দেখেন রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘর! এ কী কর্ণ! কী হয়েছে তোমার? তুমি আমায় ডাকনি কেন?’ পরশুরাম চঞ্চল হয়ে উঠলেন।

গুরুর প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে কর্ণ খুলে বললেন সব কথা। পরশুরাম বললেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই ক্ষত্রিয়। ব্রাহ্মণ কখনও এই সহ্যশক্তির পরিচয় দিতে পারে না।’ কর্ণ স্বীকার করলেন সব।

পরশুরাম অভিশাপ দিলেন। ‘গুরুকে প্রতারণা করার জন্যে প্রয়োজনের সময় তুমি সব দিব্য অস্ত্রের কথা ভুলে যাবে।’

সেই ব্রাহ্মণের অভিশাপের কথাও মনে পড়ল কর্ণের। তাঁর একটা বাছুরকে কর্ণ মেরে ফেলেছিলেন। ব্রাহ্মণ অভিশাপ দিয়েছিলেন, ‘চরম সংকটের সময় তোমার রথের চাকা মাটিতে বসে যাবে।’

কী আশ্চর্য! আজ দুই অভিশাপই সত্যি সত্যি ফলে গেল! ‘অর্জুন! আমাকে রথের চাকা তুলতে দাও অর্জুন। এখন আমাকে বাণ মের না। এটা ক্ষত্রিয়ের ধর্ম নয়।’ কর্ণের ব্যাকুল আবেদন।

‘এখন যে বড় ধর্মের কথা শোনাচ্ছ কর্ণ? তোমার এই ধর্মবুদ্ধি এতদিন কোথায় ছিল?’ কৃষ্ণ বললেন।

শত টানাটানিতেও রথের চাকা উঠল না। বরং আরও বসে যেতে লাগল মাটিতে। অগত্যা কর্ণ মাটি থেকেই লড়াই করতে লাগলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ লড়তে পারলেন না। অর্জুনের ‘আঞ্জলিক বাণ’ বীরশ্রেষ্ঠ, কিন্তু দাম্ভিক কর্ণের শিরচ্ছেদ করল।

॥ শল্য পর্ব ॥

॥ দ্বৈপায়নে পালালেন দুর্যোধন ॥

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আঠার দিনের দিন সেনাপতি হলেন শল্য। যুধিষ্ঠির বীরের মতো লড়ে শল্যকে বধ করলেন। কুরু সেনা প্রায় শেষ হয়ে গেল।

বেগতিক দেখে আহত, ক্লান্ত দুর্যোধন পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিলেন দ্বৈপায়ন হ্রদে। খবর পেয়ে কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা আর কৃতবর্মা সেখানে হাজির হলেন। ‘মহারাজ! চলুন। হয় যুদ্ধে মরে স্বর্গে যাবেন। নয় যুদ্ধ জিতে রাজ্য ভোগ করবেন।’ অশ্বত্থামা বললেন।

দুর্যোধন বললেন, ‘আজ আমি বড্ড ক্লান্ত। আজকের রাতটা একটু বিশ্রাম করি। কাল সকালেই আবার যুদ্ধে যোগ দেব।’

ভীমকে মাংস যোগাত তিন ব্যাধ। তারা তখন জল খাচ্ছিল হ্রদে। তারা দৌড়ে গিয়ে ভীমকে খবরটা দিল।

॥ দুর্যোধনের উরু ভাঙলেন ভীম ॥

কৃষ্ণসহ পাণ্ডবরা ছুটলেন দ্বৈপায়নে। মায়া জলস্তম্ভ তৈরি করে তার ভেতরে লুকিয়ে ছিলেন দুর্যোধন।

‘সুযোধন!’ দুর্যোধনকে বরাবর এই নামেই ডাকতেন যুধিষ্ঠির। বললেন, ‘উঠে এস সুযোধন। বংশনাশ করে এখন নিজে লুকিয়ে থাকাটা কি খুব শোভন হচ্ছে? এস। বীরের মতো যুদ্ধ কর।’

‘আমি রাজ্য চাই না দাদা। আমি সন্ন্যাসী হয়ে বনে চলে যাব।’ দুর্যোধনের আকুতি।

‘সে কি?’ যুধিষ্ঠির বললেন, ‘মাত্র পাঁচটা গ্রাম চেয়েছিলাম পাঁচ ভাইয়ের জন্যে। তখন বলেছিলে, “যুদ্ধ ছাড়া সুঁচের ডগার পরিমাণ মাটিও দেব না।” আজ রাতারাতি হঠাৎ এত বৈরাগ্যের উদয় হল কেন তোমার?’

যুধিষ্ঠিরের শ্লেষে উঠে এলেন দুর্যোধন। তৈরি হলেন গদা নিয়ে। এদিকে ভীমও তৈরি।

খবর পেয়ে ছুটে এলেন বলরাম। বললেন, ‘লড়তেই হয় তো কুরুক্ষেত্রে লড়। এখানে কেন?’ কুরুক্ষেত্রের সীমানার মধ্যেই সমন্তপঞ্চক। সেখানে প্রবল লড়াইয়ের পর ভীম গদার আঘাতে দুর্যোধনের বাম উরু ভেঙে তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করলেন। তারপর দুর্যোধনের মাথায় পা দিয়ে বললেন, ‘দ্রৌপদীকে উরুতে বসতে বলা আর আমাকে “গরু গরু” বলে ডাকার এই হল শাস্তি।’

বলরাম ভীমকে লাঙল নিয়ে তাড়া করলেন। গদাযুদ্ধে কোমরের তলায় আঘাত করা বেআইনি। কৃষ্ণ বোঝালেন বলরামকে। ‘ভীম কী করবে? ও যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ক্ষত্রিয়ের ধর্মই হল প্রতিজ্ঞাপালন।’

॥ সৌপ্তিক পর্ব ॥

॥ রাতের আঁধারে পাণ্ডব শিবিরে হত্যাকাণ্ড ॥

কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা আর কৃতবর্মা উরুভাঙা অবস্থায় দুর্যোধনকে পড়ে থাকতে দেখে কাঁদতে লাগলেন। ওরই মধ্যে দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে সেনাপতি করে দিলেন অশ্বত্থামারই অনুরোধে। সেনাপতি হয়ে অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য আর কৃতবর্মা—তিনজনে আশ্রয় নিলেন এক গভীর বনে। রাতে কৃপাচার্য, আর কৃতবর্মা ঘুমোচ্ছন। কিন্তু ঘুম নেই কুরু-সেনাপতি অশ্বত্থামার চোখে। হঠাৎ অশ্বত্থামা দেখেন এক পেঁচা এসে গাছের ডালে ডালে ঘুরে কাকের ঘুমন্ত বাচ্চাগুলোকে হত্যা করে চলে গেল নিঃশব্দে।

চোখে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠল অশ্বত্থামার। কৃপাচার্য আর কৃতবর্মাকে ডেকে তুললেন। অশ্বত্থামা বললেন, ‘আমাদেরও ওই পেঁচার মতো নিশুতি রাতে ঘুমন্ত পাণ্ডবদের নিধন করতে হবে।’ বৃদ্ধ কৃপাচার্য রাজি হন না। কিন্তু অশ্বত্থামা পিতৃহন্তাদের যেন তেন প্রকারে নিধন করতে চান। তাঁর ইচ্ছারই জয় হল শেষ পর্যন্ত।

মহাদেব স্বয়ং পাণ্ডব শিবিরের দরজায় পাহারা দিচ্ছেন। ভেতরে সবাই গভীর ঘুমে। অশ্বত্থামা শিবের স্তব শুরু করলেন। শিব সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘অশ্বত্থামা! তোমায় আর কী বলব। এঁদের কাল হয়েছে। এই নাও শানিত খড়গ। তুমি তো উপলক্ষ মাত্র।’

অশ্বত্থামা প্রথমেই বধ করলেন তাঁর পিতৃহন্তা ধৃষ্টদ্যুম্নকে। তারপর অন্ধকারে যাকে সামনে পেলেন তাঁকেই। দ্রৌপদীর প্রতিবিন্ধ্য ইত্যাদি পাঁচ ছেলেকে অন্ধকারে পঞ্চপাণ্ডব ভেবে হত্যা করলেন।

॥ দেহ রাখলেন দুর্যোধন ॥

হিংস্র অশ্বত্থামা ছুটে চললেন দুর্যোধনের কাছে। সব বললেন তাঁকে। দুর্যোধনকে শিয়ালে বাঘে খাবার উপক্রম করছে। এরই মধ্যে এ খবর পেয়ে অশ্বত্থামাকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দুর্যোধন শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন।

॥ অশ্বত্থামার মণি চাই ॥

শোকে, ক্রোধে উন্মাদিনী দ্রৌপদী বললেন, ‘ওই নিষ্ঠুর অশ্বত্থামার মাথার মণি চাই।’ অশ্বত্থামার মাথায় এক মণি ছিল। জ্বলজ্বল করত।

অশ্বত্থামাকে পাওয়া গেল ব্যাসদেব সহ অন্য ঋষিদের মধ্যে। গঙ্গার পাড়ে। ভীমের তাড়া খেয়ে অশ্বত্থামা ভয়ঙ্কর ‘ব্রহ্মশির অস্ত্র ছুঁড়লেন। অর্জুনও পাল্টা ব্রহ্মশির ছুঁড়লেন। শুধু এই দু’জনকেই দ্রোণ ব্রহ্মশির অস্ত্রের ব্যবহার শিখিয়েছিলেন। দুই ব্ৰহ্মশিরের ঘাতে-প্রতিঘাতে সৃষ্টি লয় হবার উপক্রম। ব্যাসদেব আর নারদ ছুটে এসে বললেন, ‘ফিরিয়ে নাও তোমাদের অস্ত্র। নইলে সৃষ্টি নাশ হবে যে!’

কিন্তু ব্রহ্মশির একবার ছুঁড়লে আর ফেরানো যায় না। কাজেই স্থির হল অর্জুনের ব্রহ্মশির অশ্বত্থামার মণি উপড়ে ফেলবে। আর অশ্বত্থামার ব্রহ্মশিরে উত্তরার গর্ভে বেড়ে ওঠা অভিমন্যুর সন্তান মারা যাবে। কিন্তু কৃষ্ণ তাকে আবার প্রাণ ফিরিয়ে দেবেন। সেই সন্তানই পরিক্ষিৎ। পরিকল্পনা মতোই কাজ হল। অশ্বত্থামার মাথার মণি নিয়ে ভীম দিলেন দ্রৌপদীর হাতে। মণি হারিয়ে চিরজীবি অশ্বত্থামা চলে গেলেন বনে।

॥ স্ত্রী পর্ব ॥

॥ শোকঃ তর্পণ ॥

পুত্রশোকে কাতর ধৃতরাষ্ট্রকে সান্ত্বনা দিলেন সঞ্জয়, বিদুর, ব্যাসদেব, কৃপাচার্য, কৃতবর্মা ইত্যাদি। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে তর্পণ করতে সবাই চললেন কুরুক্ষেত্রের দিকে।

কৃষ্ণ, দ্রৌপদী আর চার ভাইকে নিয়ে যুধিষ্ঠির এসে দেখা করলেন ধৃতরাষ্ট্রের সাথে। আশীবাদ করে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, ‘ভীম কই? তাকে ডাক একবার।’

কৃষ্ণ ব্যাপারটা আগাম আঁচ করতে পেরে লোহার তৈরি ভীমের মূর্তি এগিয়ে দিলেন। ধৃতরাষ্ট্রের কঠিন আলিঙ্গনে তা চুরমার হয়ে গেল। ‘এ আমি কী করলাম!’ অনুশোচনায় ভেঙে পড়লেন অন্ধ বৃদ্ধ। কৃষ্ণ তখন তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন যে, ভীম বেঁচেই আছেন। লজ্জিত এবং আশ্বস্ত হলেন ধৃতরাষ্ট্র।

গান্ধারী বললেন, ‘আমার সব ছেলেই কি খারাপ ছিল? একজনকেও কি তোমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারতে না?’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘আমি সেই নৃশংস যুধিষ্ঠির মা, যে তোমার শতপুত্র নাশের জন্যে দায়ী। তুমি আমাকে শাপ দাও মা। এ জীবন আর রাখতে চাই না আমি।’

গান্ধারী জড়িয়ে ধরে অনেক আশীর্বাদ করলেন যুধিষ্ঠিরকে। তারপর চোখের বাঁধন খুলে প্রথম এবং শেষবারের মতো দেখলেন মৃত শত পুত্রের মুখ।

তর্পণ করার সময় কুন্তী পাণ্ডবদের জানালেন কর্ণের প্রকৃত পরিচয়। দুঃখে, কুন্তীর প্রতি অভিমানে ফেটে পড়লেন তাঁরা। বললেন, ‘কেন এত দিন এ কথা আমাদের জানাওনি মা তুমি? কেমন নিষ্ঠুর মা তুমি? আমরা যে আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ দাদাকে মাথায় তুলে রাখতাম।’ কান্নায় ভেঙে পড়লেন কুন্তী।

॥ শান্তি পর্ব ॥

যুধিষ্ঠিরকে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করা হল। ধৃতরাষ্ট্রকে মাথার ওপর রেখে সবাইয়ের ওপর নানা কাজের ভার দিয়ে পাণ্ডবরা সবাই মিলে চললেন পিতামহ ভীষ্মের কাছে।

॥ অনুশাসন পর্ব ॥

॥ ভীষ্মের দেহত্যাগ ॥

কুরুক্ষেত্রের ওঘবতী নদীর তীরে শরশয্যায় শুয়ে উত্তরায়ণের জন্যে প্রতীক্ষা করছেন ভীষ্ম। পাণ্ডবরা তাঁকে প্রণাম করে তাঁর চরণতলে বসে তাঁর কাছে রাজধর্ম, সত্যাসত্য, পাপ-পুণ্য, কর্তব্য-অকর্তব্য বিষয়ে অনেক মূল্যবান উপদেশ নিলেন কিছু দিন ধরে।

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘পিতামহ, ধর্ম কী?’

ভীষ্ম বললেন, ‘যে আচরণ অন্যে তোমার প্রতি করুক তা তুমি চাও না, সে আচরণ তুমিও অন্যের প্রতি কর না। সংক্ষেপে এই হল মানুষের ধর্ম।’

পিতামহের চোখে জল দেখে অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, ‘কৃষ্ণ! পিতামহ এত জ্ঞানী! তবু তাঁর চোখে জল কেন? উনি কি শোকে কাঁদছেন?’

কৃষ্ণ বললেন, ‘ওঁকেই জিজ্ঞাসা কর না।’

ভীষ্ম বললেন, ‘কৃষ্ণ! তুমি বেশ ভালই জান যে, আমি সে জন্যে কাঁদছি না। কাঁদছি এই ভেবে যে, যে-পাণ্ডবদের স্বয়ং তুমি সহায় তাদেরও দুঃখ কষ্টের শেষ নেই! তোমার লীলা কিছুই বুঝতে পারলাম না। তাই কাঁদছি।’

শরশয্যায় আটান্ন দিন কাটাবার পরে মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের উত্তরায়ণ কালে ভীষ্ম দেবব্রত তাঁর পিতার প্রদত্ত বর মতো ইচ্ছামৃত্যু বরণ করলেন। কী আশ্চর্য! দেহত্যাগের আগে সব তীরগুলো নিজের থেকেই খুলে গেল তাঁর দেহ থেকে! দেবতারা আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করলেন। শাপভ্রষ্ট অষ্টম বসু ফিরে গেলেন স্বর্গে।

॥ অশ্বমেধ পর্ব ॥

ব্যাসদেবের পরামর্শে অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করলেন যুধিষ্ঠির।

একটা তেজস্বী ঘোড়া নিয়ে চললেন অর্জুন। সব দেশের রাজারাই অল্পবিস্তর যুদ্ধ করে বা বিনা যুদ্ধেই যুধিষ্ঠিরের বশ্যতা স্বীকার করলেন। মণিপুরে চিত্রাঙ্গদার গর্ভজাত অর্জুনের নিজের ছেলে বভ্রুবাহনের বাণে অর্জুন প্রায় মারাই যাচ্ছিলেন। অর্জুনের আর এক স্ত্রী উলূপী এসে মৃত সঞ্জীবনী সুধা খাইয়ে বাঁচালেন অর্জুনকে।

সব দেশ ঘুরে যজ্ঞের অশ্ব ফিরে এল। মহাসমারোহে অশ্বমেধ যজ্ঞ মিটে গেল

॥ আশ্রমবাসিক পর্ব ॥

॥ বনে গেলেন ধৃতরাষ্ট্র ॥

ভীমের মুখ থেকে মাঝে মধ্যে কিছু কটুক্তি বেরিয়ে আসত কৌরবদের সম্বন্ধে। আঘাত পেতেন ধৃতরাষ্ট্র। একদিন যুধিষ্ঠিরকে তিনি জানালেন যে, গান্ধারীকে নিয়ে তিনি বনে গিয়ে তপস্যা করতে চান। কুন্তী বললেন, ‘মহারাজ চোখে দেখেন না। গান্ধারীর চোখ বাঁধা। আমিও যাব ওঁদের পথপ্রদর্শক হয়ে।’ বিদুরও চললেন সাথে।

বিদুর ধ্যানে বসে দেহত্যাগ করলেন। তখন সবাই জানতে পারলেন যে, স্বয়ং ধর্মই বিদুর হয়ে জন্মেছিলেন। একদিন দাবানলে ধ্যানস্থ অবস্থাতেই আত্মাহুতি দিলেন ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী আর কুন্তী।

॥ মুষল পর্ব ॥

॥ যদুবংশ ধ্বংস। অপ্রকট হলেন কৃষ্ণ-বলরাম ॥

যুধিষ্ঠিরের রাজত্বের ছত্রিশ বছর কেটে গেছে। যাদবা বিধর্মী, কদাচারী হয়ে পড়েছেন। খুবই খারাপ অবস্থা।

একদিন একটা ছেলেকে মেয়ে সাজিয়ে মুনিদের কাছে এনে তারা বলল, “আচ্ছা এর কী সন্তান হবে? ক্রোধে বিশ্বামিত্র, কন্ব আর নারদ অভিশাপ দিলেন, ‘এ মুষল প্রসব করবে। আর তা-ই হবে তোদের ধ্বংসের কারণ।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে একদিন কথা কাটাকাটি থেকে শুরু হল উন্মত্ত যাদবদের মারপিট। সেই মুষল সত্যিই প্রসব করেছিল সেই ছেলে। তা থেকে জন্মাল নল-খাগড়া। তাই এনে পরস্পরকে পেটাতে লাগল পানোন্মত্ত যাদবরা। এতেই তারা ধ্বংস হল। মূষলপ্রবকারী ছেলেটিই কৃষ্ণপুত্র শাম্ব।

যদুবংশের নারী বৃদ্ধ আর বালকদের রক্ষার ভার অর্জুনের ওপর দিয়ে কৃষ্ণ চললেন বলরামের খোঁজে। এক জায়গায় গিয়ে দেখেন মুখ থেকে এক হাজার মাথার এক সাদা সাপ বার করে দেহত্যাগ করলেন বলরাম।

ক্লান্ত হয়ে শুয়ে যদুবংশের কথা ভাবছেন কৃষ্ণ। জরা নামে এক ব্যাধ তাঁকে হরিণ ভেবে তীর ছুঁড়ল। তীর এসে বিধল তাঁর কোমল চরণে! কৃষ্ণ লীলা সম্বরণ করলেন! মহাভারতের মহানায়ক মহাপ্রস্থান করলেন।

অর্জন যাদবরমণীদের রক্ষা করতে গিয়ে দেখেন, বয়স তাঁকে দুর্বল করেছে। তাঁর সামনেই রমণীদের জোর করে নিয়ে যাচ্ছে দস্যরা। তিনি বাধা দিতে পারছেন না। দুর্বল। হাত কাঁপছে। ব্যাসদেব বললেন, ‘অর্জুন। তোমাদের সময় হয়েছে। এবার মহাপ্রস্থান কর।

॥ মহাপ্রস্থান পর্ব ॥

॥ পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থান ॥

অভিমন্যুর ছেলে পরীক্ষিৎকে সিংহাসনে বসিয়ে দ্রৌপদী আর ভাইদের নিয়ে যুধিষ্ঠির রওনা হলেন মহাপ্রস্থানের পথে। কোথা থেকে এক কুকুর এসে সঙ্গী হল তাঁদের। অগ্নিদেবের নির্দেশে অর্জুন তাঁর গাণ্ডীব ফিরিয়ে দিলেন বরুণ দেবকে।

হিমালয়ের দুর্গমপথে চলতে চলতে হঠাৎ দ্রৌপদী পড়ে গেলেন নিচে।

ভীম বললেন, ‘মহারাজ! দ্রৌপদী এত ধর্মপরায়ণা! সতী, সাধ্বী। তার পতন হল কেন?’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘অর্জনের প্রতি পক্ষপাত ছিল দ্রৌপদীর। অর্জুনকে অন্য চার স্বামীর চেয়ে সে মনে মনে অনেক বেশি ভালবাসত। তাই তার পতন হল।’

একটু পরেই পড়ে গেলেন সহদেব। ভীম সহদেবের পতনের কারণ জানতে চাইলেন।

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘সহদেব নিজেকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ভাবত। তাই তার পতন হল।’

এবার নকুল। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘নকুল নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর ভাবত। সেই অহঙ্কারেই তার পতন।’

অর্জুনেরও পতন হল। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘অর্জুন বলত, সে একাই সব শত্রু নিধন করবে। কিন্তু, কথা রাখতে পারত না। তাই তারও পতন হল।’

এবার ভীম নিজেই পড়ে গেলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘তুমি বড্ড বেশি খেতে। অন্যের শক্তি কতটা, তা না জেনেই নিজের শক্তির বড়াই করতে। তাই তুমিও পড়ে গেলে ভীম।’

রইলেন শুধু যুধিষ্ঠির। আর সেই কুকুর। হঠাৎ স্বর্গ থেকে ইন্দ্র তাঁর রথ নিয়ে হাজির। ইন্দ্র বললেন, ‘উঠুন রথে। স্বর্গে যাবেন।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘আমার চার ভাই আর দ্রৌপদীকে ফেলে আমি স্বর্গে যেতে চাই না।’

ইন্দ্র বললেন, ‘তাঁদের সবার দেহত্যাগ হয়ে স্বর্গলাভ হয়েছে। আপনি সশরীরেই স্বর্গে যাবেন। আপনাকে এই দেহ ত্যাগ করতে হবে না। স্বর্গে গেলেই তাঁদের সবাইকে দেখতেও পাবেন।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘কিন্তু এই সঙ্গী কুকুরকেও আমি সাথে নেব।’

ইন্দ্র বললেন, ‘আপনি অশেষ পুণ্যের জোরে স্বর্গে যাবেন। কিন্তু কুকুর কি করে স্বর্গে যাবে?’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘এ আমার আশ্রিত এবং দীর্ঘপথের বিশ্বস্ত সঙ্গী। আমি স্বর্গত্যাগ করতে পারব। কিন্তু একে ত্যাগ করতে পারব না।’

কুকুর তখন ধর্মরূপে দেখা দিলেন যুধিষ্ঠিরকে। বললেন, ‘ধন্য তোমার ধর্মজ্ঞান যুধিষ্ঠির। আমি তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম। চল তুমি স্বর্গে চল।’

॥ স্বর্গারোহণ পর্ব ॥

যুধিষ্ঠির স্বর্গে গিয়ে তো অবাক! দেখেন পাপাত্মা দুর্যোধন সেখানে আগেভাগে এসে বসে আছেন। ‘এটা কেমন হল? এই দুর্যোধন করেনি এমন খারাপ কাজ নেই। আমাদের কপট পাশায় হারিয়ে বনে পাঠিয়েছে। দ্রৌপদীকে অপমান করেছে। ভীমকে বিষ খাইয়েছে। অভিমন্যকে অসহায় অবস্থায় বধ করিয়েছে। কী করেনি? আর সে কি না সবার আগেভাগে এসে স্বর্গে বসে রইল?’ নারদকে বললেন যুধিষ্ঠির।

নারদ বললেন, ‘মহারাজ। স্বর্গে এসব বিভেদ মনে রাখতে নেই। এখানে শুধুই সখ্য। এখানে কেউ কারো শত্ৰু নয়। আপনি ওসব ভুলে যান।’

‘বেশ! তা হলে আমার জিতেন্দ্রিয় সত্যবাদী ভাইদের আর ধর্মপরায়ণা স্ত্রী দ্রৌপদীর কোন লোক লাভ হয়েছে? নিশ্চয়ই আরও ঊর্ধ্বলোক?’ যুধিষ্ঠির কটাক্ষ করলেন।

যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে যাওয়া হল যেখানে তাঁর নিকটাত্মীয়রা আছেন সেদিকে। অন্ধকার পথ। দুর্গন্ধে ভরা। রক্তে আর গলিত শবের মাংসে পিচ্ছিল। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘আর কত দূর?’

ইন্দ্রের দূত বললেন, ‘মহারাজ। আমার ওপর নির্দেশ আছে যেখান থেকে আপনি ফিরতে চাইবেন, ঠিক সেই পর্যন্ত আপনাকে নিয়ে যাওয়া।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘চল দূত। ফিরে যাই। আর এক মুহূর্তও এখানে নয়।’

‘না! মহারাজ! দোহাই আপনার! ফিরে যাবেন না। আর একটু থাকুন। আপনি এখানে থাকাতে আমরা প্রাণে খুব শান্তি পাচ্ছি।’

‘কে? কে কথা বলল?’

‘মহারাজ! আমি ভীম! আমি অর্জুন! আমি নকুল! আমি সহদেব! আমি দ্রৌপদী! আমি কর্ণ!····

‘এ কী! তোমরা? তোমরা এখানে কেন? দূত তুমি এক্ষুনি ইন্দ্রের কাছে গিয়ে জেনে এস তো এরা কী অপরাধ করেছে, যে এখানে এদের আসতে হল?’

ইন্দ্র এলেন। এলেন ধর্ম। চারিদিক সুরভিত হল। ইন্দ্র বললেন, ‘মহারাজ! এঁদেরকে এঁদের কর্মফল অনুসারে স্থান দেওয়া হয়েছে নরকে। আপনার জায়গা স্বর্গ। এটা নয়। দয়া করে আপনি সেখানে চলুন।’

যুধিষ্ঠির বললেন, ‘চাই না আমি সেই স্বর্গ যেখানে আমার ভাইরা নেই, দ্রৌপদী নেই, অন্য পরমাত্মীয়রা নেই।’

হঠাৎ নরক কোথায় মিলিয়ে গেল! চারপাশ স্বর্গের সুষমায় ভরে গেল। ধর্ম বললেন, ‘মহারাজ যুধিষ্ঠির! আমি আবার আপনাকে পরীক্ষা করলাম। দেখলাম আপনার ভ্রাতৃপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি কতটা আসল। ভয় নেই মহারাজ। আপনার আত্মীয়রা সকলেই স্বর্গেই আছেন। এ কথা স্বর্গের রথে আপনাকে তোলার সময়ই আমি বলেছিলাম।’

‘তা হলে এতক্ষণ আমি কী দেখলাম?’

‘যা দেখেছেন তা “মায়া-নরক” মহারাজ। আপনাকে পরীক্ষা করার জন্যে ইন্দ্র এটা তৈরি করেছিলেন। আমি তিনবার আপনার পরীক্ষা নিয়েছি। তিনবারই আপনি সসম্মানে উত্তীর্ণ!’

‘কী রকম?’

প্রথমবার পরীক্ষা নিই বক পাখি সেজে। দ্বিতীয়বার কুকুর সেজে। আর এবার নিলাম তৃতীয় পরীক্ষা “নকল-নরক” দেখিয়ে।’

‘এই “নকল-নরকই” বা কেন আমাকে দেখতে হল?’

‘আপনি দ্রোণ-বধের সময় “অশ্বথামা হত!” কথাটা জোরে বলেছিলেন। কিন্তু “ইতি কুঞ্জর” কথাটা খুব নিচু গলায় বলেছিলেন, যাতে দ্রোণ তা শুনতে না পান। তাই এই “নকল-নরক দর্শন হল আপনার।’

‘দুর্যোধনকেও কি আগে নরক দর্শন করানো হয়েছে?’

‘না।’

‘কেন?’

কারণ, যাঁরা প্রচুর পাপ আর সামান্য পুণ্য কাজ করেন, তাঁদের আগে সামান্য স্বর্গসুখ দিয়ে তারপর অনন্ত নরক ভোগ করানো হয়। আর যাঁরা বহু পুণ্যকাজের সাথে সামান্য পাপ করেন, তাঁদের আগে সামান্য নরকভোগ হয়। তারপর হয় অনন্ত স্বর্গবাস।’

দুর্যোধন কী ভাল কাজ করেছে?’

‘দুর্যোধন পাপাত্মা হলেও নির্ভীক ছিল। নির্ভীকতা ক্ষত্রিয়ের বড় গুণ।’

‘চলুন মহারাজ বিষ্ণুলোকে।’

‘চলুন!’

বিষ্ণুলোকে এসে যুধিষ্ঠির দেখেন কৃষ্ণ, তাঁর চার ভাই এবং দ্ৰৌপদীকে নিয়ে বসে হাসি-ঠাট্টা করছেন। যুধিষ্ঠিরকে দেখেই সবাই সসম্মানে উঠে দাঁড়ালেন। কৃষ্ণ সহ সবাই এসে প্রণাম করলেন। ভীষ্ম, দ্রোণ, কুন্তী, মাদ্রী, পাণ্ড, ধৃতরাষ্ট্র কে কোন লোকে আছেন সব জেনে আশ্বস্ত হলেন যুধিষ্ঠির। দ্রৌপদী যে স্বয়ং কৃষ্ণুপ্রিয়া লক্ষ্মী, তা জেনে যুধিষ্ঠির খুব আহ্লাদিত হলেন।

স্বর্গে আনন্দে দিন কাটাতে লাগলেন সবাই। শেষ হল মহাভারতের কথা।

মহাভারতের কথা নানা বই দেখে।
খেটেখুটে কোনও মতে দিলাম তো লিখে।
কিছুই জানি না। শুধু লিখবার শখ।
আনন্দ পাই কি না সেটারই পরখ।
কেউ যদি খুশি হন, বড় পাই মান।
মহাভারতের কথা অমৃত সমান।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *