হেমন্তর গল্প – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
Hemantor Galpo – Collection of short stories
by Hemanto Mukhopadhay
প্রথম প্রকাশ – বইমেলা-১৯৯০
প্রচ্ছদ – দেবব্রত ঘোষ
.
উৎরে যাওয়া
রবীন্দ্রসদনে সেদিন সমরেশের স্মৃতিসভায় আমি অন্ধকারে পেছনের সিটে বসে আছি। হঠাৎ স্টেজে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ডাক পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে হারমোনিয়াম এসে যাওয়ায় মনে মনে একটি প্রমাদ গণলাম। ফের গান? এই বয়সে!
দেখিস বাবা
দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে।…
সারা হল স্তব্ধ। কারও মুখে কোনও কথা নেই।
আমার খুব ভয় হয়েছিল। কিন্তু, এবারও হেমন্ত উতরে গেল।
তার দু’দিন পরে জ্যোতি দত্ত হাজির। হাতে একটা গল্প! টাইপ-করা। কার গল্প? হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের। আমাদের মধ্যে শুধু জ্যোতিরই কোনওদিন বয়স বাড়ল না। যে-বয়সে ওর দাদামশাই হওয়ার কথা, সেই বয়সেও তুড়ি মেরে সমুদ্রে ভেলা ভাসানোর ওর বিরাম নেই। হাসলেই ওর কচি মুখ বেরিয়ে আসে।
ও, বুঝেছি। সেই সময়কার। যখন হেমন্ত গল্প লিখত। ভাল ভাল কাগজে ছাপাও হত।
জ্যোতি বলল, পুরনো নয়— নতুন গল্প।
মরেছে নতুন গল্প? তা-ও আবার এই বয়সে। লোকের নাম হয়ে গেল কত কী-ই না হয়। খ্যাতির বিড়ম্বনা? না ভিমরতি!
আমি কিন্তু তুড়ে দেব জ্যোতি।
যা আপনার খুশি।
হেমন্তর সাহস কম নয়।
হ্যাঁ, একদা গল্পই লিখত। কিন্তু, ওর গলার গান শোনার পর আমরা দুই পরম বন্ধু রমাকৃষ্ণ মৈত্র আর আমি ওর নৌকাটাকে ঠেলে আমার ও-গল্পের ঘাট থেকে কায়দা করে গানের ঘাটের দিকে ভিড়িয়ে দিয়েছিলাম।
আমাদের মধ্যে সাহিত্যে জ্ঞানগম্যি একমাত্র রমাকৃষ্ণেরই ছিল। ও ছিল পাকা জহুরি। ও বুঝত কার কতটা হবে না-হবে। ও-ই আমাকে পা থেকে ফুটবল ছাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত হাতে কলম ধরিয়ে দিয়েছিল।
ওর নাড়িজ্ঞান কাজ করেনি শুধু ওর নিজের বেলায়। কৈশোরে গল্প লিখে নাম করেও যৌবনে পা দিয়েই রাজনীতি ঘূর্ণিতে এমন জড়িয়ে গেল যে সাহিত্যে আর ওর মন বসল না। মন বসলে ও যে কোথায় উঠত তা সে নিজেই জানে না।
যাক, ও-সব পুরনো কাসুন্দি।
রমার কথা মনে পড়ল হেমন্তের লেখা গল্পের প্রসঙ্গে। আমি লেখালেখি করলেও সাহিত্যের কিছু বুঝি না।
হাতের কাছে রমা থাকলে আবার গল্প লেখার দায়ে হেমন্তকে তুড়ুং ঠুকে দেওয়া যেত। কিন্তু, ও এমন ডুব দিয়েছে যে ধরাই যাচ্ছে না।
অগত্যা ভয়ে ভয়ে হেমন্তের গল্পটা হাতে নিলাম।
ভাগ্যিস, বাংলায় টাইপ করা। নইলে হাতে লেখা কাগের-ঠ্যাং-বগের-ঠ্যাং দেখলেই তো আমার পিত্তি জ্বলে যেত।
‘শতাব্দির আর্তনাদ’। বানান ভুল। ‘শতাব্দী’ হবে।
গোড়ার বাক্যটাতে এসে একটু নড়ে বসতে হল। নাঃ, ছোকরা গল্প জমাতে জানে!
ছোকরা? হায়, কপাল! আমরা তো এখন তিন কাল গিয়ে এক কালে এসে ঠেকেছি। হেমন্ত আমার ছোট হলেও, কত আর?
শেষ করেছি এক নিঃশ্বাসে।
একেবারে জীবন থেকে নেওয়া গল্প।
হেমন্তের আর আমার জগৎ আলাদা হলেও, এ-চরিত্র আমারও খুব চেনা।
কিন্তু, ব্যর্থ শিল্পীর এ-গল্প আর কোনও সার্থক শিল্পীর কলম দিয়ে তো বেরোল না।
তার মানে, সার্থকতার শেষ ধাপে উঠে গিয়েও সিঁড়িও একেবারে নিচের ধাপে দাঁড়িয়ে ওপরে উঠতে না-পারা ভাগ্যহত মানুষগুলো সম্বন্ধে সমবেদনা আজও পূর্ণমাত্রায় তার মধ্যে থেকে গেছে।
করুণা নয়। ভালবাসা। অন্যের ব্যথার সুর নিজের প্রাণের তারে বাজিয়ে তোলা।
পড়তে পড়তে আমারও চোখে জল এসে গিয়েছিল।
তার মানে, প্রত্যাবর্তন কি? গান থেকে গল্প?
অসম্ভব নয়। জীবনে হেমন্ত তো দেখেছেও অনেক। এমন গল্প লিখতে থাকলে, রমার হয়ে আমিও কথা দিচ্ছি— গল্পের ঘাটে নৌকা ভেড়াতে আর আমরা বাধা দেব না।
অনায়াসে গল্প থেকে গানে, গান থেকে গল্পে—
নাঃ, হেমন্ত দেখছি বুড়ো হবে না। কপালও ওর পাতাচাপা। সব কিছুই ওর উতরে যায়।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
.
আইডিয়ার কামড়া
১৪ বছর বয়স থেকে গল্প লেখা শুরু করেছিলাম। তখন আমি ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনের ছাত্র। ওই বয়সেই আমরা কয়েকজন সহপাঠী মিলে একটা সাহিত্যিক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলাম। সন্তোষকুমার ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, রমাকৃষ্ণ মৈত্র, জগৎ দাস এবং আমি— এই ক’জন ক্লাসফ্রেন্ড এক সঙ্গে লেখালেখি করতাম। সন্তোষ আর সুভাষ উত্তরকালে বাংলা সাহিত্যে বড় মাপের প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। রমাকৃষ্ণ ও জগতের লেখার হাতও ছিল চমৎকার। কিন্তু, আমারই মতো ওরা লেখার অভ্যাসটা দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারেনি। পারলে ওরা সাহিত্য জগতে নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠা পেত বলে আমার বিশ্বাস। যাই হোক, যেটা ঘটেনি তা নিয়ে আক্ষেপ করা নিরর্থক। পুরনো দিনের দিকে একটু ফিরে তাকালে রোমন্থনজনিত বিষণ্ণতা সম্পূর্ণ কাটিয়ে ওঠা মুশকিল। মনে পড়ছে, স্কুলে পড়ার সময় গড়ে তুলেছিলাম কল্যাণ সঙ্ঘ সাহিত্যসভা। শাঁখারিপাড়ায় আমার মামাবাড়িতে এই সাহিত্যসভার অধিবেশন হত। প্রতি মাসে। আমার মামাতো দাদা অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সাহিত্যসভার মূল পান্ডা। তা ছাড়া তিনি ছিলেন বিপ্লবী রাজনীতির একজন একনিষ্ঠ কর্মী। ওঁর আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সের খবর আমি অবশ্য জানতে পেরেছিলাম অনেক পরে। যাই হোক, কল্যাণ সঙ্ঘ সাহিত্যসভার আমন্ত্রণে নরেন্দ্র দেব, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং বুদ্ধদেব বসুর মতো দিকপাল সাহিত্যসেবীও শাঁখারিপাড়ায় আমার মামাবাড়িতে আসতেন। ওঁদের ধরে আনার ব্যাপারে আমার মামাতো দাদার কৃতিত্বই ছিল সব থেকে বেশি। আমাদের সাহিত্য জীবনের গার্জেন ছিলেন মাস্টারমশাই সুধাংশু সেনগুপ্ত, নন্দগোপাল সেনগুপ্তের ছোটভাই। আমরা একটা লাইব্রেরিও চালাতাম। লাইব্রেরিতে বইয়ের সংগ্রহ খুব বিরাট কিছু ছিল না। কিন্তু, আমাদের মতো খুদে সাহিত্যিসাধকের কাছে এই লাইব্রেরি ছিল মন্দিরের মতো। পাঠ্যপুস্তকের জগতের বাইরে যে আরও একটা জগৎ আছে তা কিন্তু আমরা কল্যাণ সঙ্ঘ সাহিত্যসভার আশীর্বাদেই টের পেয়েছিলাম।
১৫ বছর বয়সে আমার গল্প প্রথম পত্রস্থ হয়। ‘আলেয়া’ নামে একটি পত্রিকায়। তার পর ‘বাতায়নে’ও কয়েকটা গল্প লিখি। কিন্তু, আমার যে-গল্প পাঠকসমাজে খানিকটা সাড়া তুলেছিল সেটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘দেশ’ পত্রিকায়, গল্পের নাম ‘একটি দিন’। সেই সময় ‘দেশ’ পত্রিকার কর্ণধার ছিলেন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়। আরও অনেকের সঙ্গে পবিত্রবাবুর মতো সাহিত্যিকও এই গল্পের প্রশংসা করেছিলেন বলে আজও রোমাঞ্চ অনুভব করি।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি গান গেয়েও ভীষণ আনন্দ পেতাম। বন্ধুরা প্রত্যেকেই ছিল আমার গানের উৎসাহদাতা। ক্লাস নাইনে যখন পড়ি তখন এক দিন সুভাষ রেডিওতে নিয়ে গেল। অডিশন দিয়ে রেডিও প্রোগ্রাম পেলাম। পরের বছরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হলাম। তখন থেকেই গল্প লেখা কমতে শুরু করে। গানের চর্চায় কিন্তু ছেদ পড়েনি এতটুকু। গানের জগতে আমার প্রতিষ্ঠার জন্য সুভাষের অবদানই সব থেকে বেশি। সে আমাকে নিয়ে বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানিতে দিনের পর দিন ধর্না দিয়েছে। ক্রমাগত বিফল হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত এক দিন— ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কলম্বিয়াতে পৌঁছলাম। আমার গানের অর্ধেক শুনেই কলম্বিয়ার তদানীন্তন বড়কর্তা শৈলেশ দত্তগুপ্ত মুগ্ধ হলেন। তার পর আমার গানের রেকর্ডিং হল। ব্যস, রাতারাতি আমি গানের জগতে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলাম। তার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে যত দ্রুত ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, সাহিত্যজগৎ থেকে ঠিক সেই গতিতে দূরে সরে যেতে হয়েছে। সাহিত্যিক বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে যায়। সুভাষ অবশ্য ব্যতিক্রম। সে আমার বাড়ির কাছেই থাকে। সেই সূত্রে এখনও ওর সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ রয়েছে। সন্তোষ মারা যাওয়ার আগে তার সঙ্গেও নতুন করে একটা যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। আসলে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্পর্কে সন্তোষের অপরিসীম ভালবাসাই আমাদের পুনর্যোগাযোগের ক্ষেত্রে সেতুবন্ধনের কাজ করছিল। কিন্তু, সন্তোষ হঠাৎই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। ওর অবর্তমানে এক এক সময় নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ বলে মনে হয়।
লেখক জীবনে ফিরে যাওয়ার কথা আর ভাবি না। সময়ও নেই হাতে। তা ছাড়া নিজের সাহিত্যিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও আমি ষোলো আনা সচেতন। তবু এখনও মাঝে মাঝে মাথায় গল্পের আইডিয়া আসে। জীবনের নানা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নিজের মধ্যে গল্প লেখার তাগিদটা দানা বাঁধতে শুরু করে। অবশ্যই অনিয়মিতভাবে। তবে, এখন আর কলম হাতে ধরি না। ওই ব্যাপারে বড্ড কুঁড়েমি এসে গেছে। একান্তই যদি গল্প লেখার তাগিদ এড়াতে না-পারি, মুখে মুখে বলতে শুরু করি।
আগেই বলছি, মনগড়া গল্প লিখতে পারি না। এ যাবৎ যৎসামান্য যা কিছু লিখেছি তার সঙ্গে আমার জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতার অচ্ছেদ্য যোগাযোগ রয়েছে। বছর খানেক আগে শেষ যে-গল্পটা লিখেছি তা-ও নিজের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে লেখা। একটি ছেলে আমার কাছে আসত। আমাকে মামা বলে ডাকত। ছেলেটির স্বপ্ন ছিল সে কিশোরকুমারের মতো গায়ক হবে। গানের জন্য জীবনের অন্যান্য কোনও দিকেই মনোযোগ দিতে চায়নি। অথচ ভাল ক্রিকেট খেলতে পারত, পড়াশোনাতেও খারাপ ছিল না। আমি ওকে বলতাম, গানকে কখনও পেশা করতে যেও না, তাতে বিরাট স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হতে পারে। কিন্তু, আমার কথা সে শোনেনি। পেশাদার গায়ক হওয়ার স্বপ্নে অন্য কোনও কাজই সে করল না। আর কিশোরকুমারও সে হতে পারেনি। আশাভঙ্গের বেদনায় শেষ পর্যন্ত উন্মাদ হয়ে গেছে।… মোটামুটি এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই শেষ গল্পটা লিখেছি। মানে বলেছি। তারাজ্যোতি ক্যাসেট থেকে ট্রান্সক্রাইব করেছে। ভবিষ্যতে অভিজ্ঞতাভিত্তিক আরও কিছু গল্প লিখতে পারি। কিন্তু, যুগন্ধর সাহিত্যিক হওয়ার বাসনা আমার নেই, কখনও ছিল না। স্রেফ অভিজ্ঞতা আর আইডিয়ার কামড়ে কিছু লিখতে চাই। পাঠকদের কাছে তার কতটা সমাদর হবে তা নিয়ে আমার বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়



Leave a Reply