রক্ষাকবচ – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

রক্ষাকবচ

সেদিন আর কিছুতেই ছাড়ল না সুবোধ, অটোট্যাক্সি থেকে নেমে অনুনয় জানাল। বললে, আজ চলুন না দাদা। অনেকবার বলেছেন আসবেন কিন্তু আসতে পারেননি। এখান থেকে বেশিদূর নয়। মা আমাকে কতবার বলেছে আমাদের নতুন হোটেলে এক বার আপনাকে নিয়ে আসতে। তার পরই জিজ্ঞাসা করল, এদিকে কোথায় এসেছিলেন?

বললাম, এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম। এখন বাড়ি ফেরার জন্যে একটা ট্যাক্সি খুঁজছি।

সুবোধ জিজ্ঞাসা করল, আপনার গাড়িতে আসেননি কেন?

বললাম, গাড়িটা গ্যারাজে দিয়েছি কয়েকটা মেরামতির জন্যে। কাল-পরশু পেয়ে যাব।

সুবোধ বলল, ট্যাক্সি দরকার নেই। এখন চলুন আমাদের ওখানে। তার পর আপনাকে আমি অটোতে করে পৌঁছে দেব।

সুবোধের অটোতে উঠে জিজ্ঞাসা করলাম, কী রকম রোজগার হয় অটো থেকে?

অটোতে স্টার্ট দিয়ে সুবোধ বললে, তা ভালই হয়। সবই আপনার আশীর্বাদে দাদা। কয়েকবছর আগে আমাদের যা অবস্থা হয়েছিল। সেদিন আপনি না-থাকলে আজ আমরা কোথায় তলিয়ে যেতাম।

বললাম, আমি আর কী এমন করেছি। তোমাদের বুদ্ধি আর পরিশ্রমের জন্যে আবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছ।

সুবোধ বললে, না দাদা, আপনি যা করেছেন …।

বললাম, থাক ও-সব কথা।

ওকে চুপ করতে বললাম বটে কিন্তু আমার মনের মধ্যে ওদের কথাই ঘুরপাক খেতে থাকল। আমাদের বাড়ির সামনে ফুটপাথের ওপর একটা গাছের তলায় ছিল ওদের চায়ের দোকান। তারই পাশে একটা ছাউনির তলায় ওদের শোয়া-বসা।

ছোট সংসার। বাবা, মা আর দুটো ছেলেমেয়ে। সুবোধ আর শৈলী। মা খুব ভোরে উঠেই উনুন ধরিয়ে বড় কেটলিতে চায়ের জল গরম করে। সকাল থেকেই খদ্দেরদের ভিড়। গরম গরম চা। সঙ্গে বিস্কুট অথবা সস্তার কেক। তার পর একটু বেলা হলেই পাউরুটির সঙ্গে আলুরদম কিংবা ঘুগনি। কাছাকাছি একটা ছোট কারখানা আছে। দুপুরে সেই কারখানার কয়েকজন আসে। তাদের জন্য ব্যবস্থা আছে ভাত, ডাল, মাছের ঝোলের।

রান্নার ভার সুবোধের মায়ের ওপর। সুবোধের বাবা সুধীর খদ্দের সামলায়। আর সুবোধ ফাইফরমাশ খাটে। শৈলীও মাঝে মাঝে খদ্দেরদের জল দেয়।

আমি দোতলার বারান্দা থেকে এদের দেখি। তখন জোর কদমে এদের কাজ চলছে। খদ্দের চেঁচাচ্ছে, কই মাছের ঝোল কী হল?

ভেতর থেকে সুবোধের মা বলে, এই যে দাদা দিচ্ছি। বলে সুবোধের বাবাকে তাড়া দেয়, যাও দিয়ে এস তাড়াতাড়ি।

সুধীরও হুকুম তামিল করে সঙ্গে সঙ্গে। সুবোধ মাকে বলে, যতীনবাবু ভাত চাইছেন।

তা দিয়ে আয়। বলে ডেকচির ঢাকনার ওপর দু’হাতা ভাত তুলে সুবোধের হাতে দেয়।

শৈলীকে দেখে একজন বলে, ও খুকি এক গ্লাস জল দাও।

শৈলী তাড়াতাড়ি ড্রাম থেকে এক গ্লাস জল নিয়ে খদ্দেরকে দেয়। পাশের লোককেও জিজ্ঞাসা করে, আপনাকে জল দেব? তিনি বলেন, হ্যাঁ, দাও একটু। শৈলী মগে করে জল এনে খদ্দেরের গ্লাসে ঢেলে দেয়। জল খাবার সময় গ্লাস উপচে কিছুটা জল বাইরে পড়ে। তাই দেখে সুধীর চড় উঁচিয়ে শৈলীকে বলে, ঠিক করে দিবি তো। দেখ তো পায়ের পাশে কতটা জল পড়ল।

ভদ্রলোক হেসে বলেন, থাক থাক, বাচ্ছা মেয়ে, ও একটু পড়বেই।

ওপর থেকে এ-সব দেখে বেশ ভালই লাগে। মাঝে মাঝে বিকেলের দিকে আমার কাছে কেউ এলে এদের কাছ থেকে চা এনে খাওয়াই। আমাকে এরা সবাই দাদা বলে। সুবোধের বাবা-মাও বলে দাদা। আবার সুবোধ-শৈলীও বলে দাদা।

আমি চা চেয়ে পাঠালে ভাইবোনের মধ্যে ঝগড়া লেগে যায়। সুবোধ বলে আমি নিয়ে যাব, শৈলী বলে আমি নিয়ে যাব। তখন ওর মা বলে, বেশ তো দু’জনেই যা। একজন চায়ের কেটলি নিয়ে যা, আর একজন গেলাস নিয়ে যা। দু’ভাইবোনে ওপরে এসে বেঁটে বেঁটে গ্লাসে চা ঢেলে দেয়। আমি চায়ে চুমুক দেওয়ার পর শৈলী জিজ্ঞাসা করে, চা ভাল হয়েছে দাদা?

বলি, হ্যাঁ, ভাল হয়েছে। আমি যখন কোথাও বেরই তখন শৈলী আর সুবোধ আমার গাড়ির সামনে এসে জিজ্ঞাসা করে, কোথায় যাচ্ছেন দাদা?

বলি, একটা কাজে যাচ্ছি।

শৈলী হেসে বলে, আজ বিকেলে চা খাবেন তো?

বলি, যদি কেউ আসে তো বলে পাঠাব।

শৈলী বলে, কেউ না-এলে খাবেন না?

বলতে হয়, আচ্ছা খাব।

এইভাবে ওদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমার। মাঝে মাঝে সুবোধ আর শৈলীকে এটা-ওটা কিনে দিই। ওরা জিনিস পেয়ে খুব খুশি হয়। সেবার শীতের সময় ওদের দু’জনকে দুটো সোয়েটার কিনে দিলাম। সোয়েটার পেয়ে দারুণ খুশি দু’জনে।

ওদের মা ঘোমটা দিয়ে আমার সামনে এসে বলল, আপনি কেন এ-সব দিতে গেলেন ওদের।

বললাম, ইচ্ছে হল তাই দিলাম।

বললে, না, সে-কথা নয়। আপনি ওদের ভালবাসেন তাই দিয়েছেন। কিন্তু, ওদের তো গায়ের চাদর আছে। শুধু শুধু পয়সা খরচ করতে গেলেন কেন? তার পরই ওর মা আমাকে একটা প্রণাম করে বলল, দাদা, আপনাদের পাঁচজনের দয়ায় আমরা দুটো খেয়ে-পরে বেঁচে আছি। আশীর্বাদ করুন এ-ভাবেই যেন আমরা কাজ করে ছেলেমেয়ে দুটোকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারি।

গাছতলায় দোকান চালিয়ে ওদের বেশ হাসিমুখেই দিন কাটছিল। কিন্তু, তার আয়ুও এক দিন শেষ হল।

হঠাৎ এক দিন কর্পোরেশনের লোক এসে গাছ কাটতে শুরু করল। দেখে তো এরা প্রথমে হতভম্ব, তার পর মরিয়া হয়ে বাধা দিল। সুবোধের বাবা-মা দু’জনেই রুখে দাঁড়াল। মা চিৎকার করে বললে, গাছ কাটা বন্ধ কর।

কিন্তু, কে কার কথা শোনে। ওরা কুড়ুলের কোপ বসাতে লাগল গাছের গোড়ায়। সুবোধের মা তখন অনুনয় জানাল। বললে, আমরা গরিব মানুষ। কেন আমাদের ভাত মারছ। আমরা তোমাদের কী ক্ষতি করেছি?

কিন্তু, কোনও কথা কানে নিল না ওরা। উপরন্তু গাছের নিচে ওদের ছাউনিটা উপড়ে ফেলে দিল। তখন স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ওপর। সুবোধও ছুটে এসে দাঁড়াল বাবা-মায়ের পাশে।

সুধীর প্রচণ্ড মার খেল ওদের হাতে। মাকে ওরা ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। আর সুবোধ তার প্রতিবাদ করাতে কয়েকটা চড়চাপড় খেল।

আমি তখন বাড়ি ছিলাম না। ফিরে যখন এলাম তখন গাছ কাটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আমাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে ছুটে এল সুবোধের মা। কাঁদতে কাঁদতে বললে, দেখুন দাদা আমাদের কী দশা করেছেন এরা। গাছ কেটে ফেলেছে। আমাদের ঘরটা ভেঙে দিয়েছে। দোকানের জিনিসপত্তর টান মেরে ফেলে দিয়েছে। আর সুবোধের বাবাকে কী মারটাই না মেরেছে। এখন আবার ওকে পুলিসে ধরে নিয়ে গেছে।

সুবোধও কাঁদতে কাঁদতে এসে দাঁড়াল। পাশে দাঁড়িয়ে শৈলীও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ওর কান্না দেখে আমারই চোখে জল এসে গেল।

গাছ যারা কাটছিল তাদের ধমকে বললাম, গাছটা কেটে এদের সর্বনাশ করছ কেন? এরা গরিব মানুষ। খেটেখুটে এই দোকানটা চালিয়ে পেটের ভাত জোগাড় করে। সেটা বন্ধ করতে কে বলেছে তোমাদের?

ওদের মধ্যে একজন বললে, আমাদের বলছেন কেন? কর্পোরেশনের হুকুম হয়েছে তাই কাটছি। আর এই বেআইনি ফুটপাথ দখল করে দোকান করাও বন্ধ করে দিচ্ছে কর্পোরেশন। সব জায়গায়ই তো এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আপনি থানায় জিজ্ঞাসা করে দেখুন।

এর ওপর আর কথা চলে না। থানায় জিজ্ঞাসা করেও কোনও লাভ নেই। তবু এক বার থানায় যেতে হল। সুবোধের মাকে বললাম, তুমি কিচ্ছু ভেব না। সুধীরকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনবার ব্যবস্থা করছি।

থানায় গিয়ে সব বললাম। ও সি শুনে বললেন, ঠিক আছে আপনি যখন এসেছেন ওকে ছেড়ে দিচ্ছি।

থানা থেকে সুধীরকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। আর তার পরেই শুরু হল সুবোধের মায়ের কান্না। কাঁদতে কাঁদতে বললে, আমরা এখন কোথায় যাব দাদা?

এ-কথার উত্তর দিতে একটু সময় নিলাম। তার পর বললাম, তোমাদের কোথাও যেতে হবে না। আমার বাড়ির সিঁড়ির তলায় তোমরা থাকো। ওরই একপাশে রান্না করে খাও।

আমার কথায় কান্না থামল সুবোধের মায়ের। আমার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বললে, গতজন্মে আপনি আমাদের বাবা ছিলেন। বলেই আবার কান্না।

আমি ওকে ভরসা দিলাম। বললাম, কিছু ভেব না। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

আমার বাড়ির সিঁড়ির তলায় ওদের কয়েকদিন বেশ নিশ্চিন্তে কাটল। কিন্তু, তার পরই চিন্তা। শুধু থাকার জায়গা হলেই তো পেট চলবে নমা। একটা কিছু করতে হবে। দোকান এখন দিতে পারবে না। নতুন জায়গা এখন খুঁজে বের করতে হবে। অতওব যতদিন না নতুন জায়গা পায় ততদিন ওরা বাড়ি থেকে ঘুগনি, আলুরদম বানিয়ে কাছাকাছি একটা সিনেমা হলের সামনে গিয়ে ওগুলো বেচতে লাগল। একটা তোলা উনুনে ওখানে বসেই সুধীরের বউ সুবালা চা তৈরিরও ব্যবস্থা করল।

প্রতিটি সিনেমা শো-এর হাফ টাইমে বিক্রি মোটামুটি ভালই হত। কিন্তু, ওখানে তো এরা একলা নয়। আরও অনেকে পাশাপাশি বসে বিক্রি করত। তাই আগের মতো রোজগার হত না। কিন্তু, যা হত তাতে চলে যেত ওদের।

সুধীর আর সুবালা সুবোধকে নিয়ে যেত ওখানে। কিন্তু, শৈলী থাকত আমাদের কাছেই। ওকে আমাদের কাছে রেখে যাওয়ার সময় সুবালা বলত, ও আপনাদের কাছে থাকুক। আমরা ফিরলে পর ওকে ডেকে নেব।

শৈলী আমাদের সঙ্গে বসে কত গল্প করত। দু-একটা কাজও নিজের থেকে করতে চাইত। কিন্তু আমরা বলতাম, কাজের লোক তো আছে। তোকে কিছু করতে হবে না।

ও তবু শুনত না। জোর করে দু-একটা কাজ করে দিত। এই যেমন জল চাইলে ও ছুটে গিয়ে জল নিয়ে আসত। লোকজন এলে ও হাতে হাতে চা দিত।

তখনই আমার স্ত্রী ওকে বললে, তুই এক কাজ কর। একটু লেখাপড়া শেখ। কাল থেকে আমি তোকে পড়াব।

শুনে ও খুব খুশি। বললে, তুমি আমাকে পড়াবে দিদি?

আমার স্ত্রী বললে, হ্যাঁ, পড়াব।

শৈলী আমার স্ত্রীর কাছে পড়তে শুরু করল। সে কী আগ্রহ পড়ায়। কয়েকদিনের মধ্যে ওর অক্ষর পরিচয় হয়ে গেল। ও যতক্ষণ আমাদের কাছে থাকত তার বেশির ভাগ সময়ই বই নিয়ে বসত। তাই খুব তাড়াতাড়ি পড়তে শিখে গেল। আর পড়তে শেখার পর কী খুশি। তখন খবরের কাগজ এলেই ও ছুটে আসত। টাটকা খবর আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে পড়ত। ওর মা সুবালা এক দিন আমার স্ত্রীকে বললে, দিদি আপনার জন্য শৈলী তবু একটু পড়তে-লিখতে শিখছে।

আমরা ঠিক করলাম এবার শৈলীকে কোনও স্কুলে ভর্তি করে দেব। মেয়েটার মাথা আছে। পড়া-লেখা করলে ওর ভবিষ্যৎ ভাল হবে। কিন্তু, সেটা আর শেষ পর্যন্ত করা গেল না। সুবালা এসে এক দিন বললে, দাদা, আমরা অন্য জায়গায় চলে যাব এবার। সিনেমার সামনে ফেরিওয়ালার মতো বিক্রি করে আমাদের পোষাচ্ছে না। ওখানে এখন অনেক ফেরিওয়ালা হয়ে গেছে। আমাদের বিক্রি খুব কমে গেছে। একটা নতুন দোকান দেওয়ার জায়গা পেয়েছি। সেখানেই চলে যাব।

যাওয়ার দিন সুবালা ছলছল চোখে বললে, আপনাদের ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু, ব্যবসার জন্য তো যেতেই হবে। একটু থেমে বললে, আশীর্বাদ করুন যেন আগের মতো আবার আমরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারি।

শৈলীর সে কী কান্না সকাল থেকে। ওকে অনেক করে বোঝালাম, কাঁদিস না। মাঝে মাঝে আমাদের কাছে চলে আসিস।

ওরা চলে যাওয়ার সময় আমারও বেশ কষ্ট হল। বিশেষ করে শৈলীর জন্যে। মেয়েটা প্রায় সব সময় আমাদের কাছেই থাকত। কেমন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল ওর ওপর।

এর পর দিন গড়িয়ে মাস আর মাস গড়িয়ে বছর পার হয়ে গেল। মাঝে কয়েকবার সুবোধ আর শৈলী আমাদের সঙ্গে দেখা করে গেছে। সুধীর আর সুবালা আসতে পারেনি। বলে পাঠিয়েছে এখনও খুব সুবিধে করতে পারেনি ব্যবসায়। চেষ্টা করে যাচ্ছে শুধু।

এ-ভাবে আরও দু-তিন বছর পার হয়ে গেছে। তার পরই সুখবরটা দিয়েছে সুবোধ। বলেছে, দাদা, এবার আমরা একটা পাকা দোকান দিয়েছি খুব ভাল জায়গায়। ব্যবসা ভাল চলছে। মা খবরটা আপনাকে দিতে বলেছে। আর বলেছে আপনি এক দিন এসে আমাদের দোকান যেন দেখে যান।

সুবোধকে বারকয়েক বলেছি যাব, কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি। আজ তাই দেখা হতে সুবোধ ছাড়ল না।

সুবোধ অটো থামিয়ে আমাকে নামতে বললে। নেমেই দেখি একটা সাইনবোর্ডে লেখা ‘নতুন হোটেল’। সুবোধ বললে, এটাই আমাদের।

আমাকে দেখে ওর মা এসে আগে প্রণাম করল। তার পর বললে, এতদিন পরে দাদার দেখা পেলাম। সেই কবে থেকে সুবোধকে বলছি দাদাকে এক বার এখানে নিয়ে আয়।

সুবালাকে বললাম, সুবোধ আমাকে অনেকবার বলেছে। কিন্তু, আমিই সময় করে আসতে পারিনি।

এটাও একটা গাছের নিচে। তবে, আগের থেকে অনেক ভাল বন্দোবস্ত। ইটের পাঁচিল দিয়ে জায়গাটাকে ঘিরে নিয়েছে। খদ্দেরদের বসবার জন্য লম্বা বেঞ্চি। সানমাইকা লাগানো খাবার টেবিল। পাশেই ঘেরা রান্নাঘর। দু-তিনটে অল্পবয়সী কাজের ছেলেও মাইনে দিয়ে রেখেছে। চমৎকার ব্যবস্থা।

গাছের এক পাশে হোটেল আর অন্য পাশে একটা পাকা ঘর। ঘরটা দেখিয়ে সুবালাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ওটা বুঝি তোমাদের থাকবার ঘর?

সুবালা মৃদু হেসে বললে, না দাদা, ওটা ঠাকুরের মন্দির। আগে এই গাছের গুঁড়ির ওপর পাথরের নুড়ি ঠাকুরের পুজো হত। আমরা খরচ করে পাকা মন্দির করে দিয়েছি। একজন পুরুত দিয়ে পুজো করাই এখন। তার পর বললে, আপনার আশীর্বাদে জমি কিনে একটা ছোট বাড়ি করেছি। এখান থেকে খুব কাছেই। এখন রাত্তিরে সেখানেই থাকি।

বললাম, শুনে খুব খুশি হলাম সুবালা। ব্যবসা তা হলে তোমাদের খুব ভালই চলছে।

সুবালা খুশি খুশি মুখে বললে, হ্যাঁ দাদা। আপনার আশীর্বাদে বেচাকেনা খুব ভাল। এখানে এসে এখন দুটো টাকার মুখ দেখতে পাচ্ছি।

জিজ্ঞাসা করলাম, শৈলী কোথায়?

সুবালা হেসে বললে, শৈলী ইস্কুলে গেছে। সেই যে দিদি পড়ার নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন সেই থেকে মেয়ের বায়না ইস্কুলে পড়বে। তাই ভর্তি করে দিয়েছি ইস্কুলে।

আমাকে কিছু না-খাইয়ে ওরা ছাড়ল না। সুবালা বললে, আমাদের হোটেলের তৈরি একটা কিছু খান। সুধীরও বললে, দাদা, আপনার জন্যেই আবার আমাদের সব হল। আপনি কিছু না-খেলে সুবোধের মা মনে কষ্ট পাবে। অতএব চায়ের সঙ্গে ওদের হোটেলের তৈরি একটা মাছের কাটলেট খেলাম।

এবার বাড়ি ফিরতে হবে। দেখলাম সবই ঠিক আছে। কিন্তু, একটা ব্যাপারে মনটা খুঁতখুঁত করতে থাকল। তাই সেটা জিজ্ঞাসা না-করে পারলাম না। সুবালাকে বললাম, হোটেল তো বেশ ভালই করেছ। বেচাকেনাও ভাল। কিন্তু, আবার সেই গাছতলায় করলে?

সুবালা বললে, গাছতলাতেই তো আমরা প্রথমে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। চলেওছিল ভাল। আবার দেখুন এখানে হোটেল করে ব্যবসা খুব ভালই চলছে। লাভের টাকায় সুবোধকে একটা অটো কিনে দিয়েছি। ছোটখাট একটা বাড়িও করেছি। তা হলে বলুন গাছতলা আমাদের পয়া জায়গা কি না।

বললাম, পয়া তো বুঝলাম, কিন্তু অপয়া হতে কতক্ষণ। আবার যদি আগের মতো কর্পোরেশন তোমাদের উচ্ছেদ করে?

সুবালা মৃদু হেসে বললে, এবার আর তা পারবে না দাদা।

জিজ্ঞাসা করলাম, কেন পারবে না?

সুবালা বললে, এই তো দেখছেন আমাদের হোটেলের এ-পাশে মন্দির আর ও-পাশে পীরের দরগা। এই দরগা দেখেই তো এখানে হোটেল খোলার মতলব দিলেন একজন। তিনিই বলেছেন, তোমাদের হোটেলের এক পাশে মন্দির আর অন্য পাশে পীরের দরগা। ও তোমার কর্পোরেশনই হোক আর সরকারই হোক, কার এমন বুকের পাটা যে, তোমাদের এখান থেকে উচ্ছেদ করে। কথা শেষ করে তারিয়ে তারিয়ে নিশ্চিত সুখের হাসি হাসতে লাগল সুবালা।

.

শারদীয় আজকাল ১৩৯৫-এ প্রকাশিত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *