অনুপমা
তখনও জানতাম না ব্যাপারটা। তাই নাম জিজ্ঞাসা করতে মেয়েটি যখন হাসতে সুরু করল তখন বললাম, তোমার নামটা বোধহয় খুব মজার তাই হাসছ।
আমার কথা শুনে মেয়েটি আরও জোরে হাসতে হাসতে বললে, না না, এমনি সাদামাটা নাম। অনুপমা। সবাই ‘অনু’ বলে ডাকে। আপনিও তাই ডাকবেন। বলে আবার হাসতে লাগল অনুপমা।
বুঝলাম হাসিটা ওর কথার বাহন। গানের সঙ্গে যেমন তানপুরা ওর তেমনি কথার সঙ্গে হাসির ফোয়ারা। তার ওপর অনুপমা সুরূপা। ভারী সুন্দর মুখশ্রী। সঙ্গে এমন সরল হাসি। তাই ওর কথা শুনতে ভালই লাগে।
প্রথম যেদিন আমার কাছে এল সেদিন শুধু দু-চারটে কথা বলেই চলে গেল। বললে, আবার এক দিন আসব।
এর পর অনুপমা এক দিন এসে বললে, দাদা, আপনার একটা ছবি দেবেন?
হ্যাঁ, দেব।
ছবি দিলাম। ছবিটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে বললে, এর তলায় আমার ভাইয়ের নাম লিখে দিন। ছবিটা যেন আপনি আমার ভাইকে দিচ্ছেন। আমার ভাইয়ের নাম বিজয়।
ছবির তলায় লিখলাম, স্নেহের বিজয়কে—
খুব খুশি হল অনু। বললে, এটা পেয়ে আমার ভাই খুব খুশি হবে। বড় চঞ্চল ছেলেটা। তবে, আপনার গান শুনলে একটু স্থির হয়ে বসে।
এতগুলো কথার মধ্যে কত যে হাসল অনু তার হিসেব নেই। হাসলে ওর সাদা ঝকঝকে দাঁতগুলো যেন টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের কোনও মেয়ের মতো দেখায়।
এইভাবেই ও মাঝে মাঝে আসে আমার কাছে। এখন ওর কাছ থেকে জেনেছি ওর ভাই বিজয় কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আছে। হায়ার সেকেন্ডারি পাস করার পর আর পড়েনি। এখন দিনরাত কেবল পার্টি নিয়ে আছে। তাই অনুর খুব ক্ষোভ। বলে, এই দেখুন না আমার কথা। আমি একটা প্রাইমারি স্কুলের টিচার। বাড়িতে অসুস্থ বাবা। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। দুটো বোনও আছে। তারা এখনও স্টুডেন্ট। আর এই বিজয় আমাদের একমাত্র ভাই। ও কোথায় চাকরির চেষ্টা করবে তা নয় দিনরাত টো টো করে ঘুরছে। আমার একার রোজগারে এতগুলো লোকের খাওয়া-পরা। তাই আমাকে দু-চারটে প্রাইভেট টিউশনিও করতে হয়।
এতগুলো দুঃখের কথা বলল কিন্তু সব হাসতে হাসতে। নতুন কেউ শুনলে মনে করবে বানিয়ে বানিয়ে কথাগুলো বলছে। নইলে এ-সব কথা কি কেউ হাসতে হাসতে বলতে পারে!
প্রায়ই অনু আসে আর দু-চারটে কথা বলে চলে যায়। বেশিক্ষণ বসতে পারে না। বলে, অনেক কাজ দাদা। তবু আপনার কাছে এলে মনটা ভাল হয়ে যায়। বুঝতেই পারছেন আমার কত দায়িত্ব— বলে এমন হাসবে যেন মনে হবে ঠাট্টা করে কথাগুলো বলছে। কিন্তু, আমি তো জানি এগুলো ঠাট্টা নয়। সব সত্যি। আসলে হাসিটা ওর মুদ্রাদোষ। মুদ্রাগুণ বললেই ভাল হয়।
এর পর বেশ কয়েকদিন অনুর দেখা নেই। তার পর এক দিন হাঁপাতে হাঁপাতে এল। হাসতে হাসতে বললে, আপনার কাছে আসব আসব করেও আসতে পারিনি। কী করে পারব বলুন? এখন তো রান্নাটাও আমার ঘাড়ে পড়ল।
বললাম, কেন, তোমার মা তো রান্না করেন। তিনি বুঝি অসুস্থ?
অনু বললে, অসুস্থ তো হয়েছিল মা। কিন্তু, সুস্থ আর করতে পারলাম কই? চলে গেল। বলে হেসে উঠল অনুপমা।
মার মৃত্যুর কথা বলেও হাসি। এ-হাসিতে মন সায় দিল না আমার। চুপ করে গেলাম। অনু জিজ্ঞাসা করল, আপনার কি শরীর খারাপ দাদা? এত চুপচাপ হয়ে গেলেন যে?
বললাম, তোমার মার মৃত্যুর খবর শুনে আমি তো তোমার মতো হাসতে পারি না। তুমি যে কী করে হাস তা বুঝি না।
অনুপমা গলায় জোর এনে বললে, কেন হাসব না? ভগবানের কী কাণ্ড দেখুন। মা ছিল নিপাট ভালমানুষ। সংসারটাকে মাথায় করে রেখেছিল। তাঁকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আমাকে জব্দ করতে চায় ভগবান। আমাকে কাঁদাতে চায়। কিন্তু, আমিও তেমনি মেয়ে। কাঁদতে আমার বয়ে গেছে। বলে হাসতে লাগল অনু।
এমন মেয়ে এর আগে আমি দেখিনি। হাসতে দেখেছি অনেক মেয়েকে। প্রাণ খুলে হেসেছে তারা হাসির কথায়। কোনও সুখবর পেয়ে আনন্দে হেসেছে। কিন্তু, কান্নার কথায় হাসতে দেখিনি আর কাউকে। তবে, জগতে কত বিচিত্র মানুষ আছে। সকলকে কি আমরা জানি, না জানতে পারি।
অনুর অনেক সমস্যা। তার মধ্যে ওর এখন চিন্তা ভাই বিজয়কে নিয়ে। সেদিন এসে অনু বললে, জানেন দাদা, গতকাল আমার ভাইকে পুলিসে ধরে নিয়ে গেছে। তার পরই হাসতে হাসতে বললে, এখন হাজতে থাকুক। ভালই হল।
বললাম, ভাল কেন?
অনু বললে, বাইরে থাকলেই তো একটা না একটা গন্ডগোল বাধাবে। হাজতে আটকা থাকলে তবু কিছুটা জব্দ হবে। বলে খুব হাসতে লাগল অনু।
এক দিন অনু একটা মেয়েকে নিয়ে এল আমার কাছে। বললে, দাদা, এ আমার বন্ধু শিখা। এখন বেশ গাইছে। আপনি ওর গান শুনে দেখুন না এক বার? শুধু ও কেমন গাইছে এটা ওকে বলে দিলেই হবে।
বললাম, ঠিক আছে শুনব। তবে, আজ তো পারব না। আমাকে এখুনি বেরতে হবে। পরশু একে নিয়ে এস।
অনু বললে, পরশু তো আমি আসতে পারব না। ওদিন আমায় দু’জায়গায় পড়াতে যেতে হবে।
বললাম, শিখা একাই আসুক। গান শুনে নেব।
নির্দিষ্ট দিনে শিখা একাই এল! ওর গান শুনলাম। মোটামুটি ভালই গায়। সেই কথাই বললাম শিখাকে। শিখা শুনে খুশি হল। বললে, আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন যাতে আমি এক দিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি।
বললাম, আশীর্বাদ করছি। তবে, গানের লাইনে এখন ভীষণ প্রতিযোগিতা। এত ভিড় কাটিয়ে প্রথম সারিতে আসা খুবই মুশকিল।
আমার কথায় শিখা খুব দমে গেল। কান্নাভেজা গলায় বললে, তা হলে কি দাদা আমি দাঁড়াতে পারব না?
ওকে উৎসাহ দিতে বললাম, পারবে না কেন? নিষ্ঠা আর চেষ্টা থাকলে নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে যাবে।
এবার খুশি হল শিখা। বললে, চেষ্টা আমি করছি। আর নিষ্ঠা আমার আছে।
বললাম, তা হলে আর ভাবনা কী। তোমার হবে।
এর পরই আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, অনু তোমার কতদিনের বন্ধু?
শিখা বললে, আমরা পাশাপাশি বাড়িতে থাকি। আমাদের বন্ধুত্ব সেই ছেলেবেলা থেকে।
জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা একটা কথা বলতে পার?
কী কথা দাদা? বললে শিখা।
বললাম, অনু কি ছেলেবেলা থেকেই এইরকম? মানে এই কথায় কথায় হাসি। দুঃখের কথাও দিব্যি হাসতে হাসতে বলে?
শিখা বললে, অনুকে যে কত রকমের ঝামেলা পোহাতে হয় তা যদি জানতেন। বাবা অসুস্থ। মা মারা যাওয়ার পর সংসারের সব কাজ ওকে করতে হচ্ছে। ওর দুটো বোন আছে। তারা কলেজে পড়ছে। তারা অনুর মতো নয়। এর মধ্যেই বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছে। এ-সব ব্যাপারও নজরে রাখতে হয় অনুকে। তার ওপর নিত্য অশান্তি ভাই বিজয়কে নিয়ে। অনু কিন্তু এ-সব ঝামেলা হাসিমুখে সহ্য করে যাচ্ছে। সব দিক একা সামলাচ্ছে।
বললাম, অসাধারণ ক্ষমতা তো অনুর! তা-ও আবার হাসতে হাসতে লড়ছে!
শিখা বললে, হ্যাঁ, এই হাসিটাই ওর শক্তি। অনু বলে, দুঃখকে ভয় পাই না আমি। দুঃখের পরে দুঃখ এলে সহ্য করা সোজা। তাই দুঃখের কথা হাসতে হাসতে বলি। কিন্তু, আমার ভয় সুখকে। সুখের পরে দুঃখ এলে তা বোধহয় এমন হাসতে হাসতে সইতে পারব না। তাই সুখকে আমি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি।
খুব দামি কথা বলছে তো অনু। বললাম শিখাকে।
উত্তরে শিখা বললে, আপনাকে তা হলে একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। অনুকে তো এতদিন দেখছেন। সত্যিই সুন্দরী। একজন বড়লোকের ছেলে ওকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু, ও রাজি হয়নি। রাজি না-হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করাতে বললে, আমি গরিবের মেয়ে। ওদের অবস্থার সঙ্গে আমাদের অবস্থার আকাশ-পাতাল তফাত। রূপের মোহের আয়ু বড় অল্প। দু’দিন ঘর করতে করতেই অরুচি। তখন আমাকে ছেড়ে দিলে কী অবস্থা হবে আমার। পাহাড় থেকে গড়িয়ে একেবারে তলায়। খবরের কাগজ খুললে এ-রকম ঘটনা তো প্রায়ই দেখা যায়। না ভাই, দু’দিনের সুখের আমার দরকার নেই। আমার দুঃখই ভাল। তবু তো হাসতে পারছি।
এর মধ্যে অনু এক দিন এল। শিখার গান আমার ভাল লেগেছে জেনে খুব খুশি হল। বললে, শিখার চেষ্টা আছে। তবে দোষ কী জানেন, কোথাও একটু ধাক্কা খেলে বড্ড মুষড়ে পড়ে। তখন ওর কান্না কান্না মুখ দেখলে কষ্ট হয়। কিন্তু, ওকে সান্ত্বনা দেব কী, আমার হাসিটাই সব মাটি করে দেয়। কী মুশকিল বলুন তো।
অনুর এই সব কথা শুনতে বেশ লাগে। দুঃখ তো সংসারে সবারই আছে। কিন্তু, হাসি দিয়ে কীভাবে দুঃখকে ঢেকে রাখতে হয় তা পুরোপুরি রপ্ত করে ফেলেছে মেয়েটা।
এর পর বেশ কিছুদিন অনু এল না আমার কাছে। এতদিন তো দেরি করে না। যতই কাজ থাক তবু পাঁচ মিনিটের জন্যেও এক বার দেখা করে যায়। হাসতে হাসতে দু-চারটে দুঃখের খবরও দিয়ে যায়।
সেদিন নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম। হঠাৎ দেখি সামনে অনুপমা। চমকে উঠলাম ওকে দেখে। সিঁথিতে সিঁদুর। হাতে শাঁখা। পাশে যমদূতের মতো লম্বা-চওড়া একজন লোক। তার গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। বয়েস প্রায় ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ। তেইশ বছরের অনুপমার পাশে একেবারে বেমানান। আমাকে দেখে এগিয়ে এল অনু। পাশের লোকটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। বললে, ইনি আমার স্বামী। তার পর হাসতে হাসতে বললে, এই সব ব্যাপারে খুব ব্যস্ত ছিলাম বলে আপনার কাছে যেতে পারিনি। দু-এক দিনের মধ্যে যাব।
মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। এমন একটা ফুটফুটে চেহারার মেয়ের এই স্বামী! তা ছাড়া হঠাৎ বিয়েটা হলই বা কী করে। ও তো এক বারও নিজের বিয়ের কথা আমাকে বলেনি।
অনুপমা পরের দিনই এল আমার কাছে। স্বামীকে নিয়ে নয়। একলাই এল। এসেই কুলকুল করে হাসি। বললে, খুব অবাক হয়ে গেছেন তো।
বললাম, অবাক হওয়ারই কথা। বলা নেই কওয়া নেই একেবারে বিয়ে। তা-ও আবার…।
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই ও বললে, বুঝেছি আপনি কী বলতে চান। ওর চেহারাটা ও-রকম। গায়েও ভীষণ জোর। আমার মতো চারটে মেয়েকে এক সঙ্গে তুলে ধরতে পারে। এত ক্ষমতা ওর। কিন্তু দাদা, মানুষটা ভাল। একটু থেমে বললে, তা ছাড়া ওকে বিয়ে করতে হল। বলে একগাল হাসি।
জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার ভাই কী করেছিল?
অনু বললে, এমনিতে তো এদলে-ওদলে ঝগড়া-মারামারি লেগেই আছে। কিন্তু, এবারে একেবারে খুনোখুনি ব্যাপার। আমার স্বামী না-থাকলে সেদিন বিজয় নির্ঘাত খুন হত। উনি তো এককালে এ-সব করেছেন। তাই, সেই ছেলেটার হাত থেকে বাঁচাতে পারলেন বিজয়কে। আর তারই জোরে বিজয় খুন করল সেই ছেলেটাকে। সব ঘটনা ঘটল আমার স্বামীর চোখের সামনে। তার মানে পুরো ব্যাপারটার সাক্ষী থেকে গেলেন আমার স্বামী।
জিজ্ঞাসা করলাম, তার পর?
অনু বললে, তার পর আর কী। ইনি এলেন আমার কাছে। সোজা প্রস্তাব।
বললেন, তুমি যদি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হও তা হলে বিজয়ের কোনও ভয় থাকবে না। তুমি আমার স্ত্রী হওয়ার পর শালাবাবুকে তো আর ধরিয়ে দিতে পারব না। উল্টে প্রাণ দিয়ে রক্ষে করতে হবে বিজয়কে। ব্যস, রাজি হয়ে গেলাম।
বলে প্রায় দু’মিনিট ধরে হাসল অনু। তার পর হাসতে হাসতে বললে, আপনি ওকে ভুল বুঝবেন না দাদা। ভাবছেন আমাকে ব্ল্যাকমেল করে বিয়ে করল। ঠিক তা নয়।
তবে কী? জিজ্ঞাসা করলাম।
অনু বললে, ওর কথায় আমি নিজেই রাজি হয়ে গেলাম।
বললাম, কেন?
কেন আবার। ইদানীং আমাকে বিয়ে করার জন্যে বেশ কয়েকজন খুব বিরক্ত করছিল। এঁকে বিয়ে করে আমি রেহাই পেলাম। এখন আর আমার কাছ ঘেঁষতে কেউ সাহস করবে না। মানুষটি আগে যা ছিল ছিল। এখন ও-সব ছেড়ে দিয়েছে। শুধু আত্মরক্ষার জন্যে শক্তিটাকে বজায় রেখেছে। আমাকেও সেইভাবে তৈরি করতে চায়। আমার গা-হাত-পা টিপে বলে বড্ড নরম। তোমাকে ব্যায়াম শেখাব। এই বলে আমার শরীরটাকে নিয়ে লোফালুফি করতে থাকে।
বললাম, তোমার ভয় করে না? ওর হাত ফসকে পড়ে গেলে!
অনু হাসতে হাসতে বললে, পড়ে গেলে ওর যাবে। আমার কী। জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার স্বামী করে কী?
অনু বললে, ব্যবসা। এখন খুব সৎভাবে টাকা উপায় করে। খুব ভাল লোক দাদা। আমার কথা শোনে। হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে চলে গেল অনু।
শিখা এক দিন এল। জিজ্ঞাসা করলাম, অনু কেমন আছে?
বললে, অনু বেশ ভালই আছে। ওর বাবা মারা গেছেন। বোন দুটোরও বিয়ে দিয়ে দিয়েছে অনু। আর ভাইটা কলকাতা ছেড়ে অন্য কোথায় চলে গেছে। অবশ্য যাওয়ার আগে অনুকে জানিয়ে গেছে।
শুনে খুব ভাল লাগল। যাক, মেয়েটার ওপর থেকে অনেকগুলো দায়িত্ব চলে গেল। এখন ওরা স্বামী-স্ত্রী বেশ ভালই আছে তা হলে।
এখন অনু খুব বেশি আসতে পারে না। এলেও বেশিক্ষণ থাকে না। বলে, অনেক কাজ দাদা। আমার স্বামী তো তার ব্যবসা নিয়ে আছে। মাঝে মাঝে ব্যবসার কাজে দু-চার দিনের জন্যে কলকাতার বাইরেও যেতে হয়। তাই, বাড়ি ছেড়ে আসতে পারি না। আমাকেই তো সব কিছু দেখতে হয়।
জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার স্কুলের চাকরিটা করছ তো?
অনু বললে, না দাদা, ও-কাজটা ছেড়ে দিয়েছি। উনিই বললেন, এখন আর তোমার চাকরির দরকার কী। তার থেকে আমার ব্যবসার ব্যাপারে চিঠি লেখা, হিসেবপত্তর রাখা এই সব কাজ কর। তাই ছেড়ে দিলাম স্কুলের চাকরিটা। বলে আবার সেই হাসি।
বললাম, হ্যাঁ, দরকার যখন নেই তখন আর চাকরি করবে কেন। তার থেকে নিজেদের ব্যবসার কাজ দেখা অনেক ভাল।
এর পর অনেকদিন আর অনুর দেখা পাইনি। অবশ্য আজকাল এইরকম হচ্ছে। হয় তো আজ এল তার পর তিন-চার মাস আর দেখা নেই। তার পর হঠাৎ এক দিন এসে হাজির। কিন্তু, এবার প্রায় মাসছয়েক কি তারও বেশি আসেনি আমার কাছে। ওর কথা যখন প্রায় ভুলে যেতে বসেছি তখন এক দিন এসে হাজির।
কিন্তু, অনুর এ-রূপ আমি দেখার জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। সিঁথিতে সিঁদুর নেই। হাতের শাঁখা উধাও। সাদা সিল্কের থান পরে এসেছে।
ওকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই বললে, কপালে সইল না দাদা। উনি চলে গেলেন।
কী হয়েছিল? জিজ্ঞাসা করলাম।
অনু বললে, হবে আর কী। খুন। উনি যাদের হাত থেকে আমার ভাইকে বাঁচিয়েছিলেন তাদেরই কেউ বদলা নিল। বলে হাসল অনু।
ওর হাসিটা এবার আমার অন্যরকম লাগল। মনে হল যেন জোর করে হাসছে। আগের মতো সরল হাসি নয়। মেকি।
জিজ্ঞাসা করলাম, এখন কী করবে ঠিক করেছ?
বললে, কী আর করব। স্বামীর বিরাট ব্যবসা। ব্যবসাই দেখব। টাকার তো অভাব নেই। বাড়ি, গাড়ি সব হয়েছে। এখন আমার খুব সুখ। বলে হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলল অনুপমা।
.
শারদীয় আজকাল ১৩৯৬-এ প্রকাশিত।
