সৈয়দ শাহনূর ও তাঁর গান – কাউসার চৌধুরী
প্রকাশকাল – অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯
প্রকাশক – মোস্তফা সেলিম, উৎস প্রকাশন
প্রচ্ছদ – মোস্তাফিজ কারিগর
Syed Shahnr Tar Gan by Kawsar Chwdhury
Published by Mustafa Salim of Uts Prkashan
.
উৎসর্গ
আতাউর রহমান চৌধুরী
রফিকুন্নেসা চৌধুরী
আমার পিতা-মাতা
যাঁদের ঋণ কখনো শোধ করা যাবে না
কবি রাগিব হোসেন চৌধুরী
যাঁর কাছে কৃতজ্ঞ আজীবন
.
ফ্ল্যাপের লেখা –
সুফিসাধক ও স্বভাবকবি সৈয়দ শাহনূর-এর (১৭৩০-১৮৫৬) জন্ম মৌলভীবাজারের কদমহাটায়। শৈশবে মা হারানো সৈয়দ শাহনূর ছিলেন ভাবুক প্রকৃতির। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও ভারতের আসাম রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়িয়েছেন জীবনভর। তাঁর জীবনের শেষাংশের রহস্যময় চরিত্র হল মন্দোদরী। যে রহস্য আজঅবধি রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে। তিনি নূর নছিহত, রাগনূর, নূরের বাগান, মনিহারি এবং সাত কন্যার বাখান নামের পাঁচটি গ্রন্থ রচনা করেন। সবকটি গ্রন্থই নাগরীলিপিতে রচিত। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার জালালসাফ গ্রামেই তিনি জীবনের শেষ সময়টুকু কাটান এবং জালালসাফেই তিনি শায়িত হন। তাঁর রচিত গানগুলো আজও কেবল সিলেট অঞ্চলেই নয় বাংলাদেশ-ভারতসহ বিশ্বে সমাদৃত। চলে যাওয়ার ১৬৩ বছর পরে এখনও ভক্ত, অনুরাগীসহ সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গান বিপুল জনপ্রিয়।
.
ভূমিকা
সেই ছোটোবেলা থেকেই সৈয়দ শাহনূর আমার কাছে একটি পরিচিত নাম। কেবলই পরিচিত নয়, খুবই পরিচিত। আমাদের এলাকার লোকজন সৈয়দ শাহনূরের ভক্ত। সৈয়দ শাহনূর আমার গ্রাম সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল গ্রামেও এসেছেন দু-একবার। এখানেও রয়েছেন তাঁর ভক্ত-মুরিদান। সৈয়দ শাহনূরের মাজার জালালসাফ গ্রামে। কিন্তু আমার কাছে এই গ্রামটি জালালাফ বলেই পরিচিত। প্রতি বছর জালালসাফের ওরসে গ্রামের লোকজন দল বেঁধে যান। যাওয়ার আগে একে-অপরের সাথে যোগাযোগ করেন এই বলে জালালসাফের উরুসে যাইতায়নি?।
সৈয়দ শাহনূর ও জালালসাফ সম্পর্কে জানলেও বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়নি কখনো। আমাদের প্রিয় লেখক ও গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল সাহেবের কাছ থেকে সৈয়দ শাহনূর সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য ও গল্প শুনে সাধক ফকির সৈয়দ শাহনূরকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এরপর তাঁর সম্পর্কে জানতে বইয়ের সন্ধান করতে লাগলাম। ১৬৩ বছর আগে গত হওয়া সাধক ফকির সম্পর্কে জানতে আগ্রহ বাড়লেও তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা কোনো গ্রন্থ পেলাম না। কয়েকটি গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে আংশিক তথ্য ও কয়েকটি গানের সন্ধান পেলাম। পরে জানতে পারলাম মৌলভীবাজারের একজন অধ্যাপক সৈয়দ শাহনূরকে নিয়ে সমৃদ্ধ একটি বই লিখেছেন। এই বইয়ে সৈয়দ শাহনূরের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। কয়েক মাসের চেষ্টার পর মোহাম্মদ ফয়জুর রহমানের লিখিত বইটি পেয়ে সৈয়দ শাহনূর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। আমার সহকর্মী সিলেটের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক সিলেটের ডাক-এর রাজনগর প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ অনেক চেষ্টার পর গ্রন্থটি সংগ্রহ করেন। তার মাধ্যমেই এই গ্রন্থটি পড়ার সৌভাগ্য হয়।
সৈয়দ শাহনূরের ব্যাপারে আমাদের বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম তাঁর গানে বলেছেন :
সৈয়দ শাহনুরের গানে
শুকনাতে দৌড়িল নাও।
সাধক ফকির সৈয়দ শাহনূরের কেরামতির ঘটনাবলি এখনো লোকজনের মুখে শোনা যায়। সৈয়দ শাহনূর সম্পর্কে আব্দুর রহমান নামে তাঁর এক ভক্ত দারুণ একটি গান লিখেছেন :
সৈয়দ শাহনূর বাবা হজরত শাহনূর
যার আগমনে ধন্য হইল দিনারপুর ॥
শাখা বরাক নদীর তীরে জালালসাফ গ্রাম
সেখানে রয়েছে বাবা শাহনূরের মোকাম
যার কাছে পাঠাইলা সালাম অন্তরীর ঠাকুর ॥
যে তাঁহারে বাসলো ভালো তার পুরিল আশা
সিলেট জেলার অনেক স্থানে শাহনূর পিরের বাসা
পাইলো তাঁহার ভালোবাসা কোরবান শাহ সাজুর ॥
মাঠের রাখাল ছেলের দলরে বাবায় কথা দিলো
মরা একটি বনের পাখি প্রাণ দিয়া উড়াইলো পাখি,
কোন সুরে গান গেয়ে গেল শুনলাম না সে সুর ॥
যাঁর দোয়াতে কাঠের তরী শুকনায় চলে মাঠে
আবদুর রহমান পার হতে চায় সে তরীতে উঠে
কোন দিন তরী আসবে ঘাটে সেদিন কত দূর।।
সৈয়দ শাহনূর সম্পর্কে অনেক লেখক-কবি তাদের লেখায় নানা তথ্য- কেরামতি তুলে ধরেছেন। সাধক ফকির সৈয়দ শাহনূরের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই আমি তাঁর গান নিয়ে একটি সংকলনের চেষ্টা করি। বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে এনে এক মলাটে বন্দি করার কাজটি আমি করেছি মাত্র। সৈয়দ শাহনূরের আলোচিত গ্রন্থ নূর নছিহত-এর পাণ্ডুলিপি সিলেটে কারও কাছে আছে বলে কোথাও তথ্য পাইনি। তবে ভারতের আসামের করিমগঞ্জে সৈয়দ শাহনূরের পাণ্ডুলিপি রয়েছে বলে বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রন্থগুলো নাগরীলিপিতে লিখিত। হয়তো আগামীতে কোনো না কোনো লেখক সৈয়দ শাহনূরের পাণ্ডুলিপি বাংলায় তুলে ধরতে পারেন।
আমার এই প্রচেষ্টায় লোকসংস্কৃতি গবেষক ও সাংবাদিক প্রিয় বন্ধু সুমনকুমার দাশের অনন্য ভূমিকা রয়েছে। বইটির পাণ্ডুলিপি পড়ে নানারকম পরামর্শ দিয়েছেন নাগরীলিপি গবেষক ও লেখক মোস্তফা সেলিম। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এছাড়াও আমার শ্রদ্ধেয়জন গল্পকার সেলিম আউয়াল, সহধর্মিণী ছায়েরা বেগমের উৎসাহ এ পথে পা বাড়ানোর সাহস জুগিয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক আ ফ ম সাঈদ আমার পাণ্ডুলিপি দেখে প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করে দিয়ে আমাকে কৃতার্থ করেছেন। তাঁর প্রতি রইল শ্ৰদ্ধা। আন্ত রিকভাবে চেষ্টা করেছি যাতে গ্রন্থটি পড়ে একজন পাঠক সৈয়দ শাহনূর সম্পর্কে ও তাঁর গান সম্পর্কে জানতে পারেন। তবে ভুলত্রুটি থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যদি কোনো ভুলত্রুটি কারো নিকট ধরা পড়ে পরবর্তী মুদ্রণে তা সংশোধন করা হবে।
এটি আমার প্রথম গ্রন্থ। তাই সুধী মহলের নিকট দোয়া-প্রার্থনা প্রত্যাশা করি।
কাউসার চৌধুরী
৪৮ রাজার গলি
দরগাহ মহল্লা, সিলেট।
.
সহায়ক গ্রন্থসমূহ
১. সিলেট ধন্য যাদের গুণে, মুহাম্মদ আসদ্দর আলী, প্রকাশকাল ২০০২;
২. হবিগঞ্জের মুসলিম মানস, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, প্রকাশকাল ১৯৯১;
৩. জালালাবাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, চৌধুরী গোলাম আকবর, প্রকাশকাল ১৯৯৮;
৪. আমার হবিগঞ্জ (ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ক প্রকাশনা), প্রকাশকাল ২০১২, তৃতীয় সংখ্যা;
৫. সিলেটের মরমী মানস, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, প্রকাশকাল ২০০৯;
৬. সিলেটের মরমী সঙ্গীত, ফজলুর রহমান, প্রকাশকাল ১৯৯৩;
৭. আধ্যাত্মিক সাধক ও মরমী কবি সৈয়দ শাহনুর (র.), মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান, প্রকাশকাল ২০০১;
৮. বাংলাদেশের বাউল-ফকির : পরিচিতি ও গান, সুমনকুমার দাশ, প্রকাশকাল ২০১৮ (দ্বি. সং.)।
৯. সিলেটি নাগরী লিপি সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, মোস্তফা সেলিম, প্রকাশকাল ২০১৮।
.
লেখক পরিচিতি
ছোটবেলা থেকেই লেখালেখিতে আগ্রহ। পেশায় সাংবাদিক। প্রায় দেড় দশক ধরে কাজ করছেন সিলেট অঞ্চলের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক সিলেটের ডাক-এ। তাঁর জন্ম ১৮ ডিসেম্বর, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল গ্রামে। পিতা প্রয়াত আতাউর রহমান চৌধুরী (সায়েস্তা মিয়া) মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার কর্তৃক নির্যাতিত। মা রফিকুন্নেসা চৌধুরী। তাঁর চাচা লেখক ও রাজনীতিবিদ সুজাত আহমেদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সুনামগঞ্জে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। তাঁর সহধর্মিণী ছায়েরা বেগম একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। বাউল-অনুরাগী কাউসার চৌধুরীর এটিই প্রথম গ্রন্থ। তাঁর কয়েকটি পাণ্ডুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।



Leave a Reply