অসমাপ্ত আলিঙ্গন – রণজিৎ দাশ
সপ্তর্ষি প্রকাশন
রচনাকাল ২০১৩-২০১৫
দ্বিতীয় সংস্করণ এপ্রিল ২০১৯
প্রথম সংস্করণ জানুয়ারি ২০১৬
প্রচ্ছদ চিত্তপ্রসাদ-এর অঙ্কন থেকে
প্রকাশক স্বাতী রায়চৌধুরী
.
শর্মিলা-কে
.
সুদীর্ঘ নাটক শেষে, রাত্রির অন্তিম যবনিকা
যখন নিদ্রার মতো নেমে আসে বিস্তীর্ণ ভূভাগে—
তখনও মঞ্চের কোণে
তখনও দর্শকাসনে
তখনও ব্যাকুল ময়দানে
দিকে দিকে অসমাপ্ত আলিঙ্গন জাগে…
.
কে তুমি, সুন্দর আত্মা
কে তুমি, সুন্দর আত্মা, বিমর্ষ প্রেতের চরাচরে
বিরল ফুলের মতো
খুব অল্প মানুষের দেহমধ্যে থাকো—
কে তুমি, অরণ্যচারী পশুদের মুগ্ধ করে রাখো?
কে তুমি, বুকের মধ্যে
পাহাড়-বেষ্টিত হ্রদে অবতীর্ণ পাখি?
যার বুকে নেমে আসো, তার জলে সূর্য স্নান করে,
তার শীর্ণ দেহ ঘিরে তীর্থকাক, ধর্মধ্বজা ওড়ে।
মানুষের দুঃখে-শোকে
তার অশ্রু ধানখেতে বৃষ্টি হয়ে ঝরে।
তার খুব কাছে গেলে, উপশম জেগে ওঠে ক্ষতে।
অবাক বিস্ময়ে ভাবি, তাহলে ‘সুন্দর আত্মা’ বলে কিছু আছে,
প্রকৃতই, এ হিংস্র জগতে?
মুগ্ধ শিহরন জাগে পাতায় পাতায়, গাছে গাছে!
কে তুমি, সুন্দর আত্মা, অশ্রু-হ্রদে অবতীর্ণ পাখি,
অন্তহীন দুর্বিপাকে
ত্রাণ-শিবিরের মতো জাগ্রত, এলাকী
অল্প কিছু মানুষের দেহমধ্যে থাকো?
তোমাকেই খুঁজি আমি চরাচরে, গন্ধ শুঁকে শুঁকে,
আত্মার কুকুর হয়ে— মানুষের নষ্টনীড় বুকে।
কখনও সে মানুষের দেখা পেলে স্নেহস্পর্শ চাই,
আনন্দে লাফিয়ে উঠি, আত্মহারা লেজটি নাড়াই!
কে তুমি, সুন্দর আত্মা, কোথা থেকে আসো?
কীভাবে মানুষ বাছো, এ জগতে, কাকে ভালোবাসো?
পাখি
বুকের ভিতরে এসে বাসা বাঁধো, পাখি!
ঠোঁটে নিয়ে খড়কুটো, রৌদ্র, মায়া, রাত্রির জোনাকি।
আমার জটিল বুকে সর্পিল শূন্যের আলোছায়া
তোমারই প্রতীক্ষা করে— এই বুকে
তাস-টেক্কা-জুয়াড়ির ফাঁকি—
ভরে দাও লতাগুল্মে, সঙ্গমে, সংসারে—
বুকের ভিতরে তুমি ডিম পাড়ো, প্রতিটি বসন্তে
বারে বারে।
শিউলি গাছের নীচে
শিউলি গাছের নীচে
ঝরে পড়া শিউলি ফুলের
তন্ময় বর্ণনা আমি লিখিনি কখনও।
কবিতা লিখেছি কেন?
কবিতা লিখেছি তবে কেন?
ঘাসের সবুজ দাঁত
শিউলির গোলাপি গ্রীবায়
আলতো গেঁথে আছে— আমি দেখিনি কখনও।
কবিতা লিখেছি কেন?
কবিতা লিখেছি তবে কেন?
শুধু কি নিজের কথা, মধ্যরাতে, নেশাগ্রস্ত সুরে
জঙ্গলের চাঁদ আর দর্পণের সুন্দরীকে গেয়ে শুনিয়েছি?
শুধু কি নিজের জন্য পাখির চরণ আমি পয়ারে বেঁধেছি?
ছন্দের শিকল ছিঁড়ে সেই সব উড্ডীন চরণ
আমারই কপট বুকে থাবা মারে যখন-তখন,
তীব্র নখরাঘাতে খাঁচা ভেঙে উড়ে চলে যায়।
ভাঙা খাঁচা পড়ে থাকে আমার শিয়রে,
ভাঙা খাঁচা রাত্রি ভর ভৌতিক মায়ের মতো আর্তনাদ করে।
গভীর আতঙ্কে আমি ভ্যাপসা সিনেমাহলে, মেট্রোর সুড়ঙ্গে
নীরবে লুকিয়ে থাকি, শরৎকালের প্রতীক্ষায়—
আশ্বিনের ঢাক বাজে, ফুল ফোটে; একদিন, আশ্চর্য প্রভাতে
কাগজ-কলম নিয়ে প্রাণপণে ছুটে যাই শেফালিতলায়!
বার্বি ডল
যা কিছু প্রতীকী, তারই চক্ষু নীল, অগ্নিময় চুল—
আঁটো ফ্রকে ডাঁটো দেহ, শঙ্খিনী, দীঘল পা, বার্বি পুতুল।
যা কিছু প্রতীকী, তাই ভীতিপ্রদ, প্রহেলিকাময়,
টিভি-র উপরে এই বার্বি ডল কে রেখেছে, সন্ধ্যার সময়?
যত রাত বাড়ে, তত পুতুলটি দুই পা দোলায়!
(বাস্তব বিশ্বস্ত বন্ধু। যা কিছু প্রতীকী, তারই পাকে পাকে
বিপদ ঘনায়!)
পুতুলের চোখ জ্বলে নির্লজ্জ, নর্ডিক কামনায়!
তখনই তোমাকে ডাকি, রক্তমাংসে পরাক্রান্ত নারী—
দৌড়ে এ-ঘরে এসো, বার্বি ডল ছুঁড়ে ফেলে দাও
কল্পনার আস্তাকুঁড়ে। বাস্তব দু’হাতে,
শরীরের ঘামগন্ধে আমাকে জড়াও—
সারা রাত্রি, আজীবন, প্রতীকের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও!
পৃথিবীর কুকুরেরা
মানুষের কাছ থেকে কুকুরেরা
ভালোবাসা ছাড়া আর অন্য কিছু গ্রহণ করে না।
মাথায় বোলাও হাত, লোমশ শরীর
যত খুশি টিপে ছেনে আদর জানাও
দু’হাতে মুখটি ধরে কপালে আলতো চুমু খাও—
মুগ্ধ ও কম্পিত দেহে কুকুরেরা ভালোবাসা নেবে,
সজল, কৃতজ্ঞ চোখে তোমার মুখের দিকে নীরবে তাকাবে!
কিন্তু যদি মানুষের ধূর্ত ছলে, নিষ্ঠুর খেলায়
কখনও তাদের সঙ্গে প্রতারণা করো—
কুকুরেরা হতভম্ব, অস্থির, ভয়ার্ত, অসহায়
কেবলই তোমাকে ঘিরে গোঙাবে অবোধ যন্ত্রণায়।
‘মানুষআমার প্রভু, এ জগতে সুখে-দুঃখে আমার আশ্রয়।’
— এই বোধে, অনুভবে, আনন্দে, বিশ্বাসে
কুকুরেরা বেঁচে থাকে সকল সময়।
নিষ্ঠুর মানুষ যদি ফন্দি এঁটে, পাহাড়ি গুহায়
কুকুরকে অন্ধকারে ফেলে রেখে যায়,
কুকুর তবুও সেই গুহাতেই বসে থাকে—
যতক্ষণ প্রাণ থাকে— প্রভুর অটল প্রতীক্ষায়।
কুকুরের শুদ্ধ মন মানুষের পাপ, হিংসা, ছলনা বোঝে না।
পৃথিবীর কুকুরেরা
ভালোবাসা ছাড়া আর অন্য কোনও ভাষাই জানে না।
ঝাউফল
স্তনের বোঁটার মতো ঝাউফল বালির উপরে
শান্ত ফাঁকা ঝাউবনে, সারা দিন, টুপটাপ ঝরে।
অদূরেই পরিত্যক্ত বাতিঘর, বালিয়াড়ি, সমুদ্রের ঢেউ—
প্রত্যেকে নিঃসঙ্গ, ভীত। প্রতিটি মুহূর্তে
কার পাপ, কার পুণ্য ক্রমশ বাড়ছে—
জানে কেউ?
জানে না। সেজন্য আমি অকাতরে ফাঁকা ঝাউবনে
স্তনের বোঁটার মতো ঝাউফল দু’আঙুলে তুলে
আবার স্থাপন করি ঝাউকিশোরীর বুকে—
গান, শুধু গান জাগে মনে!
আগুনের জাদুকর
আমি শুধু চক্ষু দিয়ে
আগুন জ্বালাতে পারি, আর
আমি শুধু বুক দিয়ে
আগুন নেভাতে পারি, আর
কিছুই পারি না, আমি শুধু
দৃষ্টিতে, নিঃশ্বাসে, স্পর্শে, আলিঙ্গনে,
বাকে ও সংকল্পে
আগুন জ্বালাতে আর আগুন নেভাতে পারি
তোমার শরীরে— বার বার!
অন্ন
পথের কাঙাল আমি—
প্রতিবার আহারের আগে
আমার দৈনন্দিন ডাল ও ভাতের জন্য
হে ঈশ্বর, ধন্যবাদ জানাই তোমাকে।
একটি প্রার্থনা শুধু—
হে ঈশ্বর, অন্নদাতা, যে চাষির অন্ন খাই,
সে-ও যেন ঋণমুক্ত থাকে।
পবিত্রতা বিষয়ক
পবিত্রতার অনুভব কখনও কি হয়েছে জীবনে?
শুধু নিজের ক্ষুদ্র জীবনের চরম স্থূলতা, ত্রূরতা ও রিপুর তাড়না ছাড়া
আর কোনও শুদ্ধতর চেতনার অনুভব হয়েছে জীবনে? কখনও কি
ভেবেছি যে এই জন্ম পবিত্র, এই সূর্য-মাটি-জল-বাতাস পবিত্র,
এই ধানখেত পবিত্র, চাষির কুটির পবিত্র, এই নির্জন
ছাতিমতলাটি পবিত্র, এই সাঁওতাল পরিবার মূর্তিটি পবিত্র,
ফ্রেমে বাঁধানো আমার মায়ের মুখটি পবিত্র, এমনকি চায়ের দোকানের
দেবদূত ছেলেটি পবিত্র? ভেবেছি কখনও?
কখনও রোমাঞ্চিত শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ে ভেবেছি কি— চোখের সম্মুখে এই নদী ও আকাশ,
এই দৃশ্য, এই স্থান অত্যন্ত পবিত্র, আমি নিজে দেহ-মনে
প্রক্ষালনে শুদ্ধ না হয়ে এদের নিকটেই যেতে পারব না?
কখনও কি ভেবেছি আমি এই কথা— যা কিছু পবিত্র, তা এই
পার্থিব জগতের নয়? যা কিছু পবিত্র, তাকে আমি হীন ও অশুচি
হাতে স্পর্শ করি যদি, তবে কলুষিত হবে প্রাণ, কলুষিত হবে
গান, জেগে উঠবে ঘূর্ণিঝড়, বান?
‘পবিত্রতা’ শব্দটি আজও যে স্মরণে আছে, সেটুকুই শেষ পরিত্রাণ…
সমুদ্রতরঙ্গ তুমি
সমুদ্রতরঙ্গ তুমি, যুবতীর ছদ্মবেশে, জল থেকে উঠে,
আমার নিঃসঙ্গ, নীল খাঁড়ির ভিতরে,
বলিষ্ঠ ও আকস্মিক কলেজছাত্রীর মতো ধরেছিলে হাত—
বলেছিলে, ‘ঘরে নাও, ডেকে আনো বৃষ্টিঘন রাত!’
সমুদ্রতরঙ্গ তুমি, যুবতীর ছদ্মবেশে, ধরেছিলে হাত!
আমি সম্মোহিত, আমি জনাকীর্ণ আফিম বন্দরে
খুঁজেছি নির্জন ঘর, পেয়েছিও, ব্যাকুল বিবাহে
তোমার সফেন দুর্গে, পেতেছি সংসার।
শ্রাবণ-দেবতা আমি, তোমার চাহিদামাত্র, দুর্গের চূড়ায়
নামিয়েছি ঘোর বজ্রবিদ্যুতের রাত—
সমুদ্রতরঙ্গ তুমি, যুবতীর ছদ্মবেশে, ধরেছিলে হাত!
গানের সুড়ঙ্গ
যত গান শুনি, তত জটিল ও নিঃসঙ্গ হয়ে যাই—
ডিভোর্সি নারীর মতো, পুরুষের মরীচিকা থেকে বহু দূরে
শূন্য ঘরে একা কফি খাই,
কৃতি পুরুষের মতো, রাস্তার মিছিল থেকে দূরে
হোটেল লাউঞ্জে বসে পান করি স্কচ—
যত গান শুনি, তত পানশালা ছায়াঘন, সম্ভ্রান্ত, ডিবচ!
যত গান শুনি, তত জনশূন্য দ্বীপ হয়ে যাই—
ব্যর্থ প্রেমিকের মতো পরিত্যক্ত, নির্বাসিত প্রাণী
সেই দ্বীপে একা থাকি, চতুর্দিকে ঘোর কালাপানি।
গান কি তাহলে কোনও নিশিডাক? মধ্যরাতে, বুকের কপাটে
নৈঃসঙ্গ্যের দানবীর গুপ্ত কড়া-নাড়া?
সরোদের ঝংকারে নগ্ন কিন্তু অলংকৃত দরবারি কানাড়া?
যত গান শুনি, তত পাতাল নদীর মধ্যিখানে
ডুবন্ত নৌকোর মতো ভেসে যাই সুরের তুফানে—
তবু কেন গান শুনি?
গানে কি নিয়তি আছে? গানে কি চক্রান্ত আছে কোনও?
গানের সুড়ঙ্গ বড়ো অন্ধকার, চাপা স্বরে ডাকে,
‘অর্ফিয়ুস, পিছু ফেরো, শোনো—’
আমি সেই ডাকে চির-প্ররোচিত, ভীত আতঙ্কিত!
হে প্রিয় নৈঃশব্দ্য, প্রেম, হে মৌনমিছিল,
তোমরা আমার হাত ছেড়ো না কক্ষনো।
এক্সপায়ারি-ডেট
প্রতিটি প্রেমের গায়ে
এক্সপায়ারি-ডেট লেখা থাকে।
চুম্বনের আগে তুমি, হাঁটু গেড়ে বসে,
প্রেমিকার শরীরটি ঈষৎ ঘুরিয়ে, তার
বঙ্কিম কোমরের খাঁজে
বিন্দু বিন্দু রোমকূপে ব্রেইল-হরফে-লেখা
সেই গূঢ় মুদ্রিত তারিখ
অন্ধের আঙুলে পড়ে নিয়ো।
এবং দাঁড়িয়ে উঠে, পুনর্বার, চুম্বনের আগে,
তীক্ষ্ন চোখে দেখে নিয়ো— প্রেমিকার চোখে
সেই গুপ্ত তারিখের-ই নিওন সংকেত
ট্রাফিক আলোর মতো জ্বলে আর নেভে!
এবারে চুম্বন কোরো— অনিবার্য বিচ্ছেদের ত্রাসে
ক্ষিপ্ত পাগলের মতো— যখন তখন।
প্রতিটি চুম্বনই হল বিদায়ী চুম্বন।
প্রতিটি প্রেমের গায়ে
এক্সপায়ারি-ডেট লেখা থাকে।
চুম্বন করার আগে
অন্ধের আঙুলে তুমি পড়ে নিয়ো তাকে।
কবিতায় জিরো আওয়াজ
অবিচার
নিজের একাধিক সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্রটি ছিল টমাস মান-এর সবচেয়ে প্রিয়। একদিন রাতে সপরিবারে ডিনার খেতে বসে মান তাঁর নিজের হাতে কিনে আনা এক খণ্ড দামি কেক শুধু তাঁর বড়ো পুত্রকে খেতে দিলেন। বাকি সন্তানদের কিছুই দিলেন না। তারা বিমর্ষ চোখে তাকিয়ে রইল দাদার হাতের কেকটির দিকে। ডিনার শেষে মান-এর স্ত্রী শোবার ঘরে এসে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মানকে বললেন, ‘তুমি বেচারি ছোটো ছেলেমেয়েগুলোর সামনে এমন একটা অন্যায় অবিচারের কাজ করলে কী করে?’ স্ত্রীর এই ভর্ৎসনা শুনে নির্বিকারমুখে মান জবাব দিলেন, ‘চিলড্রেন শ্যুড বি এক্সপোজড টু ইনজাস্টিস ভেরি আর্লি ইন লাইফ।’ তাঁর এই নির্মম উত্তর শুনে শ্রীমতী মান স্তম্ভিত! ঘটনাটি বইতে পড়ে, আমিও তাই! শুধু মনে হল, সেদিন মান-এর মুখে এই কথাটি কি বলেছিলেন সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং ঈশ্বর?
চিকিৎসা
ফ্রয়েড তাঁর চিকিৎসাধীন পাগলদের সম্পর্কে একটি মর্মস্পর্শী মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে কিছু কিছু পাগলকে চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলতে তাঁর মন চাইত না। কারণ তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারতেন, এইসব পাগলেরা সুস্থ অবস্থায় এত ভয়ংকর মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেছে যে পাগল হয়ে যাওয়াতেই ছিল তাদের প্রকৃত মুক্তি ও উপশম। সুস্থ হলে তারা আবার হয়তো সেই যন্ত্রণার শিকার হবে। ফ্রয়েডের এই ভয়াবহ মন্তব্যটি পড়ার পর থেকেই আমি বুঝতে শিখেছি যে সব পাগল অসুস্থ নয়। কিছু পাগল মর্মান্তিকভাবে সুস্থ। এই জীবনে, কখনও কখনও, সুস্থতাই রোগ, পাগলামিই তার চিকিৎসা।
টাইমপাস
উনিশ শতকের প্যারিস শহরে কর্মহীন মানুষেরা সময় কাটানোর জন্য শহরের মর্গে গিয়ে বেওয়ারিশ নগ্ন লাশগুলি ঘুরে ঘুরে দেখত। দেখত লাশগুলির প্রায় পচে ওঠা বরফনীল দেহ, সেই দেহে কোনও দুর্ঘটনার কিংবা অপঘাতের চিহ্ন, কিংবা কোনও দুরারোগ্য অসুখের ক্ষত বা বিকৃতি; এবং অবশ্যই খুব কৌতূহলী চোখে দেখত লাশগুলির যৌনাঙ্গের খুঁটিনাটি। দেখত মৃত্যুর পরেও লাশগুলির মুখের অভিব্যক্তি কেমন— যন্ত্রণার না প্রশান্তির। ভাবত, এই লাশগুলির কি কোনও প্রিয়জন ছিল না? কোনও স্বামী বা স্ত্রী বা সন্তান ছিল না? ভাবত কোন লাশটা ক্রিমিন্যাল, কোন লাশটা ভবঘুরে, কোন লাশটা ভিখিরি বা বদ্ধ উন্মাদের। হয়তো এটাও ভাবত যে-কোন লাশের আত্মা স্বর্গে গেছে, আর কোন লাশের আত্মা নরকে। এই ছিল উনিশ শতকের প্যারিসে কর্মহীন মানুষদের অবসর বিনোদন। আজকাল আমরা যাকে বলি— টাইমপাস।
আমি আজ একুশ শতকের কলকাতায় কর্মহীন আলস্যে চৌরঙ্গিতে, শপিং মলে, মাল্টিপ্লেক্সে ঘুরে ঘুরে জ্যান্ত, সুখী, সুবেশ মানুষদের দেখি। শোকেসের আয়নায় নিজেকেও দেখি। এই হল আমার টাইমপাস। দেখি আর ভাবি, আমাদের মধ্যে কার আত্মা স্বর্গে যাবে, কার আত্মা করবে নরকবাস?
কামসূত্র স্যূপ
ক্ষুধার্তকে ঘরে ডেকে, খোলা চুলে, আগুনের আঁচে
গণ্ডারের খাগচূর্ণ মিশিয়ে দিয়েছ তুমি
বাঘের শিশ্নের ঘন স্যুপে!
তার ওপরে ছড়িয়েছ শিলাজতু, স্বর্ণভস্ম, গাঢ় পদ্মমধু,
এবং মাদকচূর্ণে রাক্ষসীর আসঙ্গ-কামনা।
সেই স্যুপে-ভরা বাটি, লেস দেওয়া ঢাকনাটি তুলে,
দু’ঊরু বিস্তার ক’রে জাদুকরি হাতের আঙুলে
ধরেছ আমার মুখে, বলেছ—
‘নিঃশেষ করো একটি চুমুকে!’
নিঃশেষ করেছি আমি, বাটি-সহ, সমগ্র তোমাকে!
রতি দেবী
তোমাতেই মতি রেখো, রতি দেবী, অগতির গতি—
মৃত্যুর কালেও যেন চোখের সম্মুখে দেখি,
রূপে আর স্বাস্থ্যে ভরা ঝলমলে যুবতী!
যখন বিষণ্ণ থাকি
যখন বিষণ্ণ থাকি, হাসপাতালের বেডে
হাঁটু মুড়ে বসে-থাকা শূন্যদৃষ্টি রুগির মতন—
তখনই বুঝতে পারি, সুস্থ আছি, স্বাভাবিক আছি।
যখন ফুর্তিতে থাকি, রাতের পার্টিতে
শ্যাম্পেন ফেনায় ভেজা পুরস্কৃত গায়কের মতো—
তখনই বুঝতে পারি,
ভীষণ অসুস্থ আমি, অন্ধ, মত্ত, বমনে উদ্যত।
কামে ও কুহকে ভরা নগরীর নাচের আসরে
বিষাদ আঁকড়ে থাকি, বিষাদেরই হাত ধরে নাচি।
মধ্যরাতে পুনরায়
হাসপাতালের বেডে ফিরে আসি—
নিদ্রাহীন, শূন্যদৃষ্টি রুগি হয়ে বাঁচি।
যখন বিষণ্ণ থাকি
বুঝি, আমি সুস্থ আছি, স্বাভাবিক আছি।
যখন বিষণ্ণ থাকি,
কাছে আসে উষ্ণ রোদ, পাখি, মৌমাছি।
কেবলই কলহ শুনি
যেখানে বেড়াতে যাই— জঙ্গলে, সমুদ্রে কিংবা গম্ভীর পর্বতে,
কেবলই কলহ শুনি পর্যটক পুরুষ ও নারীতে।
অবাক বিস্ময়ে শুনি সঙ্গী পুরুষের প্রতি রমণীর তীব্র ভর্ৎসনা—
‘এ কোথায় নিয়ে এলে? কী ফালতু আঁতেল তুমি, চতুর্দিকে মশা,
বিচ্ছিরি গরম আর কচুবন, বাঁদর ঝুলছে গাছে গাছে—
হোটেলে এসিও নেই, মধ্যরাতে চাঁদ নেই, এখানে দেখার কী আছে?’
ম্রিয়মান পুরুষটি যদি বলে, ‘কেন, এত ঘন পাইনবন, এত শান্ত বালুতট, বাতিঘর, সুনীলসমুদ্র,
এত ধ্যানী গিরিশৃঙ্গ— উজ্জ্বল শাশ্বত তুষার,
এই বিশ্বে কী চাও আবার?’
আরও তেতে ওঠে নারী, ‘চুপ করো, সংস্কৃত ভাষায়
ভুষিমাল চালিও না তুমি।
কয়েকটা রিকেটি গাছ, রোগা বেজি— অরণ্য না ছাই,
কমজোরি ঢেউ আর ঘোলা জল— সমুদ্র না ছাই,
ধ্বজভঙ্গ চূড়া আর নোংরা খাদ— পর্বত না ছাই,
তোমাকে বিবাহ করে আমার জীবন হল ছাই!’
রমণীর তিরস্কার অরণ্য, পর্বত আর সমুদ্র নির্বাক।
স্পষ্টই বুঝতে পারি—
এই গ্রহে পর্যটন বৃথাই, বৃথাই!
মাঝির সংসার
সমুদ্রে বেড়াতে এসে
মাঝির সংসার শুধু দেখি।
বালুতটে কালো একটা নৌকোর পিছনে বসে
ক্ষুধার্ত মাঝির খাওয়া দেখি—
শশা ও পেঁয়াজ দিয়ে কাঁসার বাটিতে ভর্তি মুড়ি
আহারের কালে তার কাঁধের গামছা ওড়ে সমুদ্রবাতাসে।
কিছু দূরে, বালির টিলায় তার কুঁড়েঘর,
উঠোনে দাঁড়িয়ে তার ঝাউ-শীর্ণ বউ মৃদু হাসে!
সমুদ্র বেড়াতে এসে
মাঝির সংসারই শুধু চতুর্দিকে ভাসে।
আর ভাবি, কেন তবে এ সমুদ্রে বেড়াতে এলাম?
এই পৃথিবীতে
যে কোনও ভ্রমণ বড়ো বেদনাদায়ক।
বেদনাকে জানাই প্রণাম।
সিনেমা
মৃত্যুর কথা ভাবি সিনেমাহলের কাছে, অদ্ভুত আগ্রহে!
ভাবি যে, কৈশোরে যেমন আমি স্কুলের পরীক্ষা শেষ হওয়ামাত্র
ছুটে যেতাম সিনেমা দেখতে— সাইকেলে চড়ে,
বার্ধক্যেও তেমনই আমি জীবনের পরীক্ষা শেষ হওয়ামাত্র
ছুটে যাব মৃত্যুর সিনেমা দেখতে— শববাহী গাড়িটাতে চড়ে!
বিদ্যুৎচুল্লির কাউন্টারে, টিকিট কাটার জন্য
নিশ্চল, শায়িত দেহে দীর্ঘক্ষণ লাইন দিতে হবে—
সে তো আজীবনের অভ্যাস, আমার জলে-স্থলে-নারীতে নক্ষত্রে
প্রতিটি শুক্রবারে শুভমুক্তিপ্রাপ্ত কমেডির অটল প্রতীক্ষা!
চুল্লির আগুনে পুড়ে, ছাই হয়ে, মৃত্যুর ওপারে,
রক্তচক্ষু মহিষের শিং-এ ঝুলিয়ে রাখা
আত্মার নতুন পোশাক পরে নিয়ে,
এক ভাঁড় চা খেয়ে, এবং মুখ থেকে সিগারেট ফেলে,
ঢুকে যাব যমলোকের নিকটতম সিনেমাহলে
(অবশ্যই এক পর্দার বনেদি সম্রান্ত হলে, যেখানে
বাইরে থেকে এগরোল কিনে ঢুকতে দেওয়া হয়,
যেখানে ক্যাবারে নাচ ও চুম্বনের দৃশ্যে সিটি বাজানো নিষিদ্ধ নয়।)
হলে ঢুকে দেখব সব সিটগুলি আগুনের, দর্শকেরা ‘কুল’—
হাসি গল্পে মত্ত সব মরণোত্তর কামনার জ্বলন্ত পুতুল—
পপকর্ন ভেজে খাচ্ছে নিজেদেরই দেহের আগুনে।
তখন পর্দায় চলবে বিজ্ঞাপন— যমলোকে
অশ্রান্ত চাবুকঘাতে দণ্ডিত আত্মাদের ক্ষতের জন্য নৈশমলম,
ধনাঢ্য আত্মাদের জন্য সুন্দরী প্রেতিনীদের বিলাসবহুল পার্গেটরি,
মামুলি আত্মাদের অবিরাম রোদনের জন্য স্বল্পমূল্যে গভীর অরণ্য।
এসব চলার ফাঁকে আমি আগে বাড়িতে পাঠাব টেলিগ্রাম—
‘নির্বিঘ্নে পৌঁছেছি। শিউলিফুলের গন্ধ সঙ্গে আছে। চিন্তা কোরো না।’
(পৃথিবীর প্রেমগন্ধ যতক্ষণ জেগে থাকে মৃতের আত্মায়,
ততক্ষণ সেই আত্মার সমস্ত মনের কথা টেলিপ্যাথি-মারফত
পৃথিবীতে বিলি হয়ে যায়।)
তারপরই অতিদ্রুত ভেবে নেব, সিনেমাশেষের পর,
এই যমলোকের চির-বিদ্যুৎ-চমকানো অন্ধকার পথে,
ভয়ংকর সিংহ, চিতা আর একটি মাদি নেকড়ের আক্রমণ এড়িয়ে
কীবাবে আমি খুঁজে নেব আমার বাবা ও মায়ের
বাদুড়-ওড়া জঙ্গুলে বাড়িটা—
হয়তো গলির মুখে, মা-ই দাঁড়িয়ে থাকবে,
হাতে নিয়ে স্বর্গীয় লণ্ঠন!
এবার আশ্বস্ত মনে যমলোকের সিনেমা দেখব—
নাচে-গানে-রোমান্সে ও অ্যাকশনে ভরপুর!
(এ ছবির নায়িকাও মধুবালা, নায়কের নাম শাম্মি কাপূর!)
হঠাৎ একটি দৃশ্যে, যমলোকের পানশালায়
আমার সকল মৃত বন্ধুদের দেখতে পেয়ে, উল্লসিত হয়ে,
হাত নেড়ে গেয়ে উঠব পৃথিবীরই গান!
মরণ রে, তুহুঁ মম সিনেমা-সমান!
আলাপপর্ব
কবির ছদ্মবেশে আমি এক
সুরাদেবতার অনুচর
অর্ধপশু, অর্ধমানব বনদেবতা—
সর্বদাই নৃত্যপর, নেশাগ্রস্ত, এবং কামতাড়িত।
এই আমার প্রকৃত আত্মপরিচয়।
আমি স্বরূপ ধারণ করি সন্ধ্যার সময়।
বাই দ্য ওয়ে, আপনিও কি অধ্যাপিকার ছদ্মবেশে
একজন অর্ধনারী অর্ধপক্ষী যৌনকুহকিনী?
সমুদ্রবক্ষে নাবিকদের গানের সুরে বিভ্রান্ত ক’রে
তাদের হত্যাকারিণী?
ইটস সো নাইস টু মিট ইয়ু!
চলুন কোথাও বসি, দুই পাত্র সুরাপান করি,
তারপর দুজনেই দুজনের কাছে
খুলে ধরি নিজেদের পৌরণিক হিংস্র পরিচয়—
পৃথিবীতে, রক্তবর্ণ সন্ধ্যার সময়।
কোথায় যাবেন বলুন? প্রমত্ত মরণে—
সমুদ্রে, না বনে?
বিষাদগাথা
চতুর্দিকে বৃষ্টিভেজা বনের উল্লাস,
তবু কেন মনে এক অর্ধমৃত জন্তুর হুতাশ—
বুঝি না, বুঝি না কেন এত ব্যথা, এত জলভার
বুকের ভিতরে। কেন শুধু তৃষ্ণা, শুধু ভয়, শুধু বজ্রপাত—
সমস্ত শরীরে কেন বিষাদের স্থির পক্ষাঘাত?
শুধু এইটুকু বুঝি, বুকের ভিতরে, স্তরে স্তরে,
পুঞ্জীভূত কালো মেঘ
তোমার মুখের মতো থমথম করে।
কে তুমি? কে তুমি? মা? ধাত্রীমা? প্রেয়সী?
এত বৃষ্টিঘন সন্ধ্যা, তবু মন খুশি না অখুশি—
কিছুই বুঝি না। শুধু ইচ্ছে করে, অন্ধকার ঘরে
বিমূঢ় শিশুর মতো নীরবে তোমার কাছে বসি।
কে তুমি? কে তুমি? মা? ধাত্রীমা? প্রেয়সী?
দেখি, তুমি অন্ন রাঁধো, অন্ন দাও মানুষের পাতে—
তোমার হাসির উষ্ণ ধোঁয়া ওঠে ভাতে!
শুধু যদি পাত পেড়ে তোমার কুটিরে আমরা গোল হয়ে বসি,
তাহলেই অন্ন পাব, আনন্দ উল্লাস পাব? খড়ের বিছানা
মাটির দাওয়ায় পেতে পাব গাঢ় ঘুম?
গোলাঘরে মধ্যরাতে লক্ষ্মীপ্যাঁচা ডেকে উঠবে ‘হুম’?
তোমার হাতের স্পর্শে
মাথা থেকে, বুক থেকে ঝরে যাবে সব জলভার?
মনে তো হয় না, তবু সত্য তুমি, তুমিই উদ্ধার।
কোথাও কি মেঘ ডাকে?
কোথাও কি মেঘ ডাকে?
কোথাও কি মেঘ ডাকে, সারাক্ষণ
বুকের ভিতরে মেঘ ডাকে?
জানালার কেঁপে-ওঠা গরাদের মতো
জীর্ণ, ভীত পাঁজরের ফাঁকে
কেন শুধু সারাক্ষণ গুমগুম কালো মেঘ ডাকে?
কেউ কি কোথাও কাঁদে?
কেউ কি কোথাও কাঁদে, সারাক্ষণ, অন্ধকার ঘরে
দু’হাঁটুতে মুখ গুঁজে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে শুধু কাঁদে?
যেদিকেই যাই, এই জীবনের আনাচে কানাচে
কেউ কি ঘরের কোণে সারাক্ষণ ক্ষীণ শব্দে কাঁদে?
কে কাঁদে? কোথায় কাঁদে?— মেঘের নির্দেশে
আমি শুধু খুঁজি তাকে, এই তীব্র বেদনার দেশে।
বিদায়
গোলাপগাছের নীচে
বাগানের ঘাসের উপরে
মরা প্রজাপতিটাকে ঘিরে
গোলাপের পাপড়ি ঝরে পড়ে
গোলাপের পাপড়ি ঝরে পড়ে
মহানগরীর কোনও মৃগনাভি নেই
‘সূর্যালোক প্রজ্ঞাময় মনে হলে হাসি;
জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে— অন্ধকারে—
মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসি।’
— জীবনানন্দ দাশ
১
মহানগরীর কোনও মৃগনাভি নেই, তবু
মধ্যরাতে, নিওন-জ্যোৎস্নায়
ঘাইহরিণীর ডাক, ময়দানে, স্পষ্ট শোনা যায়।
কাহারে সে ডাকে?
মৃত মৃগদের ছায়া দল বেঁধে এসে যেতে থাকে,
পুনর্বার মিলনের আশে—
বারুদের গন্ধ জাগে, পুনর্বার, গঙ্গার বাতাসে।
এই চলে, নগরীর কংক্রিট জঙ্গলে
পুলিশবুটের শব্দে, শিকারি ও শিকারের জন্মমৃত্যু খেলা;
কে শুয়েছে কার কোলে? সব কোল বেহুলার ভেলা।
২.
মহানগরীর কোনও মৃগনাভি নেই,
আছে পাতাল সুড়ঙ্গ—
সেখানে ডায়াবেটিক নগর চোঁয়ানো কালো জলে
আছে লৌহমরিচার কটুগন্ধ, আছে থার্ড রেলে মারণ বিদ্যুৎ—
ব্যর্থ মানুষের মৃত্যুদূত।
আছে সেই সুড়ঙ্গের সমুজ্জ্বল ট্রেনে
কানে-হেডফোন-গোঁজা, মোবাইলে নিবদ্ধ মুখ মিউট্যান্ট নিনজার দল—
ভয়াল ভিডিয়ো-গেমে তাদের ভৌতিক চলাচল।
৩
নিরুত্তর এ জগতে কেবলই প্রশ্নের জন্ম হয়।
এখানে বনের ধারে ক্যাম্প যিনি ফেলেছেন, তাঁকে বলি, সন্ধ্যার সময়—
‘অগাধ ধানের রসে আমাদের মন
আর কি ভরিবে কভু— গেঁয়ো কবি, পাড়াগাঁর-র ভাঁড়ের মতন?
সুপক্ক রাত্রির গন্ধে আমরা কি আর
নবান্নের পাব নিমন্ত্রণ?’
ধূসর, নিশ্চুপ তিনি, তাঁর চোখ নির্বিকার
মহাপৃথিবীর দিকে খোলা—
নিরুত্তর বনে শুধু জন্তুর ডাকের মতো জাগে
আমাদের মূঢ় প্রশ্নমালা।
৪
নিওন-জ্যোৎস্নার নীচে
একটা অন্ধতা বাস করে—
ঘুরে বেড়ায়— লোমাবৃত, রাত্রির শহরে।
তোমার সঙ্গে, আমার সঙ্গে, তার অদৃশ্য ধাক্কা লাগে,
যখনই আমরা, বাঁধা স্বপ্নের ভিতরে—
ঘুমন্ত অবস্থায় পথে হাঁটি— নাইটি ও পায়জামা পরে,
অন্ধতার ধাক্কা খেয়ে জেগে উঠি— জনশূন্য বিপণিচত্বরে!
তখনই পায়ের ভিতরে পা টলমল করে, মাথার ভিতরে মাথা—
বুঝতে পারি, এ বড়ো সুখের সময় নয়, এ বড়ো আনন্দের সময় নয়।
বুঝতে পারি আমাদের অন্তিম অনিদ্রা, আর বিষণ্ণ বিলয়।
৫
আর সে অন্ধতা ঘোরে পার্ক স্ট্রিটে, তার সঙ্গে জোরালো ধাক্কায়
একটা লাল হোণ্ডা গাড়ি আরশোলার মতো উলটে যায়।
সে অন্ধতা মুহূর্তেই ভিন্ন রূপ ধরে,
মিশকালো ড্রেস পরে নাইটক্লাবের বাউন্সার হয়ে,
স্থলিত ও নৃত্যরত নারীদের ডান্স ফ্লোরে নিঃশব্দে দাঁড়ায়—
বেসামাল শৃগালেরা কেঁপে ওঠে স্নায়ুর ভিতরে।
নিওন-জ্যোৎস্নার নীচে একটা অন্ধতা বাস করে…
৬
আর তীব্র হাওয়া ওঠে
উল্লসিত ময়দানে,
আর তীব্র হাওয়া পড়ে যায়—
সন্ধ্যার নিঃসঙ্গ যুবা, তারামণ্ডলের কাছে,
হাওয়ার ছলনা টের পায়
তীব্র হাওয়ার স্পর্শে কিছুকাল
গ্রামে গঞ্জে নগরে বন্দরে
নারীদের খোলা চুল পার্টিপতাকার মতো ওড়ে—
পর্ব থেকে পর্বান্তরে,
গঙ্গারিডি অববাহিকায়।
তারপর, সমুদ্রের শেষ নিঃশ্বাসের মতো,
অকস্মাৎ হাওয়া পড়ে যায়।
সন্ধ্যার নিঃসঙ্গ যুবা, অন্ধকার ময়দানে,
হাওয়ার ছলনা টের পায়।
৭
গ্র্যান্ড হোটেলের নীচে, মধ্যরাতে, গাড়িবারান্দায়
পাতলুন-গোটানো এক বুড়ো সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়!
আমি তাঁকে গ্রিট করি, ‘গুড ইভনিং, মিস্টার প্রফুক!
সব কলোনির শেষে অন্তিম কলোনি হল আপনার পোড়ো কাব্য—
অবসন্ন আত্মার কুহক!’
মৃদু হেসে ক’ন তিনি, ‘তোমাদের এই কলকাতায়
বড়ো ঘাম, বড়ো কাম, আশ্চর্য মসৃণ
প্রতিটি মুহূর্ত তা ক্রাইসিসে নিজেই পৌঁছায়,
এবং অসার হয়ে শূন্য হয়ে ভাঁড়ের হাসির মতো ফাটে;
ইটস অ্যামেজিং, বয়! কীভাবে তোমরা
বিশ্বকে ডিসটার্ব করো? কোন সর্বগ্রাসী প্রশ্ন তোমাদের সুতানুটি ঘাটে?’
এ প্রশ্ন কমন অতি, সত্তরের নকশাল সন্ত্রাসে
শিখেছি বারুদগন্ধে, তাঁকে বলি, ‘এই যে বসুধা—
এর সর্বগ্রাসী প্রশ্ন একটিই— ক্ষুধা ক্ষুধা ক্ষুধা
কীভাবে নিবৃত্ত হবে? অন্নব্রহ্ম: এই মহাকাশে।
‘শান্তি শান্তি শান্তি’ বলে কোথায় যাবেন আপনি?
আপনাকে দেখাব ভয় একমুঠো ভাতের গরাসে।’
৮
জোনাকির আলো হল জোনাকির কামাগ্নি
টুনি বালবের আলো হল টুনি বালবের কামশীতলতা—
টুনি বালব নিভে গিয়ে জোনাকিতে ছেয়ে যাবে সমস্ত শহর,
যদি শোনো মধ্যরাতে ছাদে পায়চারিরত
নিদ্রাহীন কবিদের কথা!
৯
প্রতিটি গলির মাথায় অদৃশ্য সমুদ্র
আছে, এই আশা নিয়ে গলি ধরে হাঁটে মানুষেরা।
চঞ্চল ট্যুরিস্টের মতো, গম্ভীর নুলিয়ার মতো,
ঝিনুকের অলংকার ফেরিওয়ালার মতো,
নালা ও ডাস্টবিন পেরিয়ে, দ্রুত পায়ে হাঁটে মানুষেরা,
যেন গলির মাথায় পৌঁছলেই, বিস্তৃত সুনীল জলরাশি!
গলির মাথায় আছে অনিবার্য চুন-খসা জরাজীর্ণ বাড়ি,
তাতে কাক ও কলহ আছে, টিভি আছে, আর কিছু নেই।
শুধু ফাঁকা দ্বিপ্রহরে যখনই সহসা এক সতেজ কিশোরী
হেসে ওঠে সে বাড়ির খোলা জানালায়—
তখনই গলির পিছে সমুদ্রের শব্দ শোনা যায়!
১০
মহানগরীর কোনও মৃগনাভি নেই, তবু
দমকা কস্তুরীগন্ধ কেন জাগে রাত্রির বাতাসে?
‘মাস্ক-ডিও, মাস্ক ডি-ও! মিথ্যা গন্ধ মিথ্যা সহবাসে!’
অস্থির, অতৃপ্ত, ক্রুদ্ধ হরিণীরা অট্টহাসি হাসে!
১১
ফেসবুকে ভাব করে ফরেস্ট বাংলোয় ধর্ষিতা হয়েছে যে মেয়েটি, যাকে
রক্তমাখা অচৈতন্য, জঙ্গলের শুঁড়িপথে ফেলে রেখে গেছে ধর্ষকেরা,
মৃত্যুর ওপার থেকে, রক্ত মুছে, বাস ধরে, সে মেয়েটি আজ
ফিরেছে শহরে—
দাঁতে দাঁত চেপে, ঊরুতে ঊরু চেপে, সর্বাঙ্গে ক্ষত আর অপমানের তীব্র ব্যথা চেপে,
সে ফিরেছে শহরে আজ, কাউকে কিছু বলেনি, নিজের বাড়িতেও যায়নি,
শুধু এক বান্ধবী আর এক বিষণ্ণ ডাক্তার
তাকে সাহায্য করেছে আহত যোদ্ধার মতো রণক্ষেত্রে উঠে দাঁড়াতে—
সে এখন কী করে, সেটাই দেখার।
সে কি অস্ত্র কিনবে, বিষ কিনবে, ভেঙে ফেলবে কম্পিউটার?
সে মেয়েটি কী করবে? তারই হাতে ভাগ্য— সভ্যতার।
১২
মধ্যরাতে এক পাগল
নাড়ি-দেখা ডাক্তারের মতো
অন্ধকার ট্রামলাইনে ছুঁয়ে থাকে হাত—
তার আঙুলের নীচে কেঁপে কেঁপে ওঠে বোবা, বিষণ্ণ ইস্পাত।
এলিয়টের স্ত্রী
‘Rose-pink, pink-rose, bring me a happy day.’
— Vivien Eliot
‘I am moved by fancies that are curled
Around these images and cling:
The notion of some infinitely gentle
Infinitely suffering thing.’
— T. S. Eliot
যে রমণী উন্মাদিনী, রূপে কামে লাস্যে ও দেমাকে
‘অস্থির চিত্রিত ছায়া’— পমেটম-মাখা ওফেলিয়া,
যে নারী কবির পত্নী, দার্শনিকের উপপত্নী—
আর্তনাদে, হিংস্রতায় কবির জীবনে এক দুঃসহ দানবী,
সেই নারী অবশেষে পরিত্যক্ত, দুঃস্থ, অসহায়,
তবুও কবিকে খোঁজে, চিঠি লেখে, জন্মদিনে টাকাও পাঠায়
একবার কবির সঙ্গে দেখা করবার জন্য দরজায় দরজায়
মাথা খুঁড়ে মরে, অনেক বছর ধরে, লন্ডনের হিম কুয়াশায়।
এবং নিষ্ফল হয়ে, উন্মাদ আশ্রমে যায়,
অবশেষে আত্মহত্যা করে।
সেই উন্মাদিনী তার দিনপঞ্জি রাতপঞ্জি হৃদয়পঞ্জিতে
জীবনের ফোঁটা ফোঁটা রক্তবিন্দু দিয়ে
লিখেছিল এই কথা—
‘একটি সুখের দিন দিও মোরে, হে রক্তগোলাপ!’
ক্রুশবিদ্ধ শব্দে লেখা এই লাইনটির
অনন্ত কোমল আর অনন্ত যন্ত্রণাভোগী সত্তাটিকে ঘিরে
কবির সমস্ত কাব্য গির্জার বেঞ্চির মতো স্তব্ধ, চুপচাপ…
মেরিলিন মনরো-র সঙ্গম সোফা
মেরিলিন মনরোর সঙ্গম-সোফা বিক্রি হবে নিলামে।
অভিনেতা গ্লেন ফোর্ড তাঁর বেভারলি হিলস-এর বাড়ির এই প্রশস্ত সোফাটিতে মেরিলিন মনরোর সঙ্গে সঙ্গম করেছিলেন কোনও এক অস্থির সন্ধ্যায়। গ্লেন ফোর্ড-এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র পিটার ফোর্ড আকস্মিকভাবে, এই অবৈধ মিলনকথা জানতে পারেন তাঁর বাবারই লেখা একটি গোপন নোট থেকে। সেটি সাঁটা ছিল সোফাটির মাথায় দেয়ালে ঝোলানো একটি তৈলচিত্রের পিছনে। সেই নোটে গ্লেন ফোর্ড লিখেছিলেন, ‘নীচের এই সোফাটিতে, আমাদের মিলনশেষে, অস্ফুট স্বরে মেরিলিন বলেছিল, ‘বড়ো ইচ্ছে হয় যেন আমি এই মুহূর্তে মরে যাই। কারণ এ মুহূর্তে আমি খুব, খুব সুখী!’
সুতরাং, স্মৃতিমধুর রতিমধুর এই সোফাটি এখন বিক্রি হবে বহু মূল্যে, অভিজাত নিলাম বিপণিতে। যে ধনকুবের এই সোফাটি কিনবেন, তিনিও কি, কোনও এক অস্থির সন্ধ্যায় তাঁর গোপন সঙ্গিনীর সঙ্গে মিলিত হবেন এই অদম্য, প্ররোচনামূলক সোফায়? এবং মিলনশেষে সেই নারীও কি বলবেন একই কথা, ‘বড় ইচ্ছে হয় যেন আমি এই মুহূর্তে মরে যাই, কারণ এ মুহূর্তে আমি খুব, খুব সুখী!’ এবং সেই নারীও কি, পরবর্তীকালে মেরিলিনের মতোই আত্মঘাতী হবেন?
মনে হল, মেরিলিন মনরোর সঙ্গম-সোফা, এক ধনীগৃহ থেকে অন্য ধনীগৃহ খুঁজতে শুরু করল তার গোপন শিকার…
অবৈধ সঙ্গম
অবৈধ সঙ্গম শেষ হওয়ামাত্র
অবৈধ প্রণয়েরও শেষ।
পড়ে থাকে দুটি দেহ—
কামনার ভুক্তাবশেষ।
পড়ে থাকে ভাঙা জিপ, ছেঁড়া শার্ট, রক্তমাখা ব্রা
বিছানার নীচে— এক অন্ধ খাদ, বুনো জন্তু, পাহাড়ি কুয়াশা
দুজনেই উঁকি মেরে দেখে, আর তীব্র ভয় পায়।
অপরিচিতের মতো, প্রচ্ছন্ন শত্রুর মতো
দুজনেই দুজনের দিকে
নীরবে তাকায়।
তখনও গেলাসে মদ, ছাইদানের নিভু সিগারেট,
তখনও ঝুলন্ত ঘরে হিমবাহ করেনি আঘাত,
কেবল কাঁপছে জল, ফুলদানি, বুদ্ধমূর্তি,
স্থলিত পোশাক—
অবৈধ সঙ্গম শেষ হওয়ামাত্র
ডাস্টবিনে ডেকে ওঠে কাক।
ও পুকুর
ও পুকুর, ও গাঁয়ের পুকুর—
তুমি যেভাবে নীরবে
ভরা বর্ষার জল
শেষ মুহূর্ত অব্দি
নিজের দুঃখিনী বুকে ধরে রেখে দাও—
যাতে গ্রাম না ভসে বন্যায়,
সেভাবে আমার দু’চোখে
প্রায়শ উপচে ওঠা বেদনার জল
চোখেরই ভিতরে ধরে রাখতে শেখাও।
ও পুকুর, ও গাঁয়ের পুকুর,
আমার চোখদুটোকে তুমি
পৃথিবীর অন্তহীন বন্যা ও বেদনা
ধারণ করার প্রশিক্ষণ দাও।
হাঁস চলার পথ
(উৎপলকুমার বসু-স্মরণে)
হাঁস চলার পথে, দেখি, কবি হেঁটে যায়!
ডানার পালক থেকে পানাপুকুরের
সব অকবিতা ঝেড়ে ফেলে,
হেলে-দুলে, ছায়াঘন গ্রামের সন্ধ্যায়,
দূরে কোন বালকের ‘চই চই’ ডাকে সাড়া দিয়ে,
ফর্সা ফতুয়া পরে প্রসন্ন হাঁসের মতো
কবি হেঁটে যায়!
হাততালি, তথ্যচিত্র, গাঁদাফুলমালা
সুদূর জংশনে জাগে। এখানে বাদুড়, চাঁদ,
বাঁশবন— একান্ত নিরালা।
এখানে সংকেত শুধু চাষির কুটিরে কুপি-জ্বালা
নারীদের হাসিমুখ, বালকের খিদে, ঘুম, গণিত-সহায়—
এরই মধ্যে কবি হাঁটে, হেলে-দুলে, প্রসন্ন হাঁসের মতো,
অনন্ত যাত্রায়!
আলস্যের গান
কেন তিরস্কার করো ইন্দ্রলোকে ঘুমন্ত আমাকে?
স্বপ্নের পাখিগুলো ভয় পেয়ে যায়!
তোমারই স্তাবক পাখি— দ্বিপ্রহরে কে গান শোনায়?
কেন তিরস্কার করো কাকভোরে আমার সুনিদ্রা? তুমি কেরালা মন্দিরে
অনন্তশয়ানে বিষু প্রণাম করোনি ভক্তিভরে?
সুতরাং কাছে এসো, আমার শয্যার পাশে, দু’মিনিট থামো—
যেভাবে দুরন্ত ট্রেন ব্রেক কষে, পাশে দীর্ঘ শান্ত জলাভূমি।
বুক ভরে শ্বাস নাও, হাওরের হাঁস-গন্ধী হাওয়া—
দেখো মাঝি, দেখো জল, দেখো কি নীরব তরী বাওয়া
জগৎ-সংসার জুড়ে। দেখো দূরে খড়ের কুটিরে
তোমার রন্ধনশালা মাছে ও শাপলাফুলে ভরা!
দেখো তুমি নিজেকেও, সুন্দরী গাঁয়ের বধু, স্নানশেষে সিক্তবসনা—
প্রতি অঙ্গে কি তরঙ্গ, কেঁপে উঠছে সকালের আলো!
আমার আলস্য ছাড়া কে বুঝবে তোমার লাস্য, বলো?
রাত্রি হলে, হাওরের কামটুঙি ঘরে
বাতাসের পদ্মগন্ধে, বাহুবন্ধে উত্তাল প্রহরে
মেটাব তোমার যত দাবি—
আপাতত একটি দ্রুত চুমু আর এক কাপ চা হবে কি, দেবী?
ওই পাখিটা পাখিমাত্র
যে মুহূর্তে তুমি বুঝতে পারবে ওই পাখিটা দেবী নয়,
ওটা একটা নগণ্য পাখিমাত্র, সেই মুহূর্তে তুমি
পক্ষী-নিপীড়ন থেকে চিরতরে মুক্ত ও স্বাধীন!
তোমার গলায় গান, ফুলেরা তোমার ইচ্ছাধীন!
যে-বাগানের মধ্যে তুমি, সম্মোহিত তরুণের মতো,
একটি মোহিনী পাখির নিশিডাকে
ঢুকে পড়ে তার ক্রীতদাস হয়েছিলে,
সেই বাগানের গেটে লেখা ছিল সুস্পষ্ট বিজ্ঞপ্তি:
‘প্রেমের ভিতরে সবরকম স্বাধীনতা নিষিদ্ধ।’
তুমি আহাম্মক, তুমি পাখির চটকে অন্ধ, তুমি সেই
সতর্কবাণী লক্ষ করোনি। এমনকি সেই বাগানের
প্রতিটি চুম্বন-বেঞ্চির ক্ষয়া পাটাতনে
সাদা পক্ষী বিষ্ঠা দিয়ে লেখা ছিল:
‘প্রেমের ভিতরে সর্বপ্রকার নিপীড়ন আইনসিদ্ধ।’
তুমি পাখির নখরায় অন্ধ, তুমি সেই
সতর্কবাণী পড়তে পারোনি। তাই সেই অহংকারী, সুন্দরী পাখির
ইমোশনাল অত্যাচারে, ঠোঁট আর নখরের আঘাতে আঘাতে
একটা থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো মরতে বসেছিলে।
তবু তুমি বেঁচে গেলে, শেষমেশ, বাগানের ক্রুদ্ধ করুণায়।
একদিন রাতে একটা হ্যান্ডসাম, নেশাগ্রস্ত চাঁদ
পাখিটাকে ফুসলে নিয়ে চলে গেল ভিন্ন বনে, ভিন্ন জ্যোৎস্নায়।
তুমি মুক্তি পেলে দীর্ঘ পক্ষী নিপীড়ন থেকে, ভোর হলে গাছের পাতায়!
সুন্দরী পাখির সঙ্গে রাত্রির বাগানে আর কখনও যেও না,
‘ওই পাখিটা পাখিমাত্র’— এই মন্ত্র কক্ষনো ভুলো না।
ফটোগ্রাফ
একজন পুরুষ যখন যৌনপল্লিতে গিয়ে তার বাঁধা গণিকার ঘরে বসে এবং গণিকাকে বলে, ‘আমি খুব ক্লান্ত আজ, তোমার কাছে এলাম একটু বিশ্রাম নেব বলে। শুধু দু’পেগ মদ খাব, আর তোমার কাছে তোমার দেশের বাড়ির গল্প শুনব— সেই যে তোমার ছোটোবেলায় সুন্দরবনের ঝড়বৃষ্টি, বাঘের ডাক, নৌকোর ডাকাত আর বিশাল চাঁদের শোভা, বনবিবির পুজো আর ব্যাঘ্রবিধবাদের গ্রাম! সেই সব গল্প শুনব, তারপর বাড়ি ফিরে যাব। প্লিজ, তুমি আজ শাড়ি ব্লাউজ একদম খুলো না।’ এবং পুরুষটির মুখে এই অপ্রত্যাশিত কথা শুনে দারুণ বিস্মিত ও খুশি হয়ে গণিকা যখন তাকে বলে, ‘তাহলে আজ একটু ভালো মদ খান বাবু, শ্যিভাস রিগাল দিই, অন দ্য রকস দেব তো? আর আপনার ফেবারিট চাট আনাই তবে— আপেল-কাজু আর রেশমি কাবাব?’ এবং গণিকার এই বিরল আন্তরিকতায় মুগ্ধ পুরুষটি যখন মাথা নেড়ে তার প্রস্তাবে সম্মতি জানায়, এবং পুরুষটির সেই বিরল প্রসন্ন মাথা-নাড়া দেখে আহ্লাদিত নিশিপদ্ম মেয়েটি যখন মদ ঢালতে যাওয়ার আগে, আচমকা পুরুষটির গালে একটি আলতো চুমু খেয়ে যায়, তখন সেই ক্লান্ত বাবুর গালে প্রফুল্ল গণিকার অতর্কিত প্রীতিচুম্বনের দৃশ্যটিই কি মানবসভ্যতার সত্যতম ফটোগ্রাফ বলে আপনি মনে করেন, প্রিয় সক্রেটিস?
তোমার জুতোর নীচে
তোমার জুতোর নীচে কত আত্মা পিষ্ট হল আজ?
পোকামাকড়ের আত্মা, গাছগাছালির আত্মা,
নিস্তব্ধ পুকুর আর চড়ুইপাখির আত্মা,
স্টেশনের কুলি আার ধূপবিক্রেতার আত্মা—
কত বোবা, দুঃখী আত্মা তোমার জুতোর নীচে পিষ্ট হল আজ?
কে তুমি, সুশীল নাগরিক?
বহুরূপী, ছদ্ম-মানবিক—
আয়নামহলে এত প্রতিবিম্ব
কোনটা তোমার মুখ, কোনটা মুখোশ?
মধুর সংগীতে-ভরা তোমার গৃহের
প্রবেশ দুয়ারে দেখি, অপূর্ব শৈল্পিক
পিষ্ট আত্মা ঝাড়ার পাপোশ!
বিশ্বাস আমার ধর্ম
বিশ্বাস আমার ধর্ম, ছলনা তোমার।
তোমাকে বিশ্বাস ক’রে, বার বার, তোমার নিকটে ঠকে ঠকে,
তবুও বিশ্বাস করে মানুষেরা সাজায় সংসার
তোমারই বিগ্রহে, ফুলে, প্রার্থনা সংগীতে।
এত ধ্যান, এত গান, এত প্রেম, এত দয়া মানুষের মনে
কী করে সম্ভব হল? এই খাদ্য-খাদকের বনে?
কখনও ভেবেছ তুমি— কী করে সম্ভব হল
এমন সারল্য, ত্যাগ, ন্যায়ের সংকল্প, অশ্রু, শুদ্ধতম সত্যের সন্ধান
মানুষের জান্তব শরীরে?
এ তোমার সাধ্য নয়! মানুষেরা তবে
তোমার সৃষ্টির চেয়ে বড়ো?
(মানুষের মূর্তি তুমি বসিয়েছ তোমার মন্দিরে?)
সত্য রচয়িতা তুমি— বস্তু ও প্রাণের,
অসাম্যের, হননের,
শঠতার, মায়াপ্রপঞ্চের—
স্বর্ণ আর গোলাপের ডাকিনী সত্যের।
কেবল একটি সত্য
এখনও পাওনি তুমি টের—
মানুষের হৃদয়ের নিষ্কম্প সত্যের—
প্রতারিত হওয়াই বিশ্বাসের একমাত্র প্রমাণ।
তোমাকে বিশ্বাস করে, প্রতারিত হয়ে,
তবুও বিশ্বাস করে আমি যে আনন্দ পাই—
সেআনন্দে বিশ্ব ঘূর্ণমান!
বাঙালির গান
পর্বতছায়ার নীচে সিন্ধুমোহানায়
আছে এক জাগ্রত বদ্বীপ—
যেন দীর্ঘায়িত এক মঙ্গলপ্রদীপ
এই পৃথিবীর, আমি সেই বদ্বীপের প্রাণী।
অজস্র নদীর জলে বাহিত কোমল কালো শুদ্ধতম পলির সঞ্চয়ে
আমি এই ভূমণ্ডলে হৃদয়ের জন্মকথা জানি।
আমি নদী, আমি নৌকো, আমি মাঝি, আমি ভাটিয়ালি
গানের বাঙালি।
আমি বীজ, আমি শস্য, আমি ধান
খেতের বাঙালি।
আমি এক ‘কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া লাভার্স লেন’-এর
চিরন্তন কবি, রক্ষী, কীর্তনিয়া, মালি।
সন্ধ্যার নিস্তব্ধ মেঘে আমারই প্রেমের
বিষণ্ণ বর্ণালি।
আমার মনের নাম ‘ভোলা মন’।
সেই মন কালো মেঘে বকের পাঁতির শোভা দেখে
আলপথে মুড়ি-খাওয়া বালকের মতো
অকস্মাৎ ভাবমূর্ছা যায়!
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়,
সেই মন খোঁজে শুধু মনের মানুষ— এই ভুবনডাঙায়।
এই বিশ্বচরাচরে আমাদের চেয়ে বেশি মায়া
ঈশ্বরও জানে না, তাই, ‘গীতাঞ্জলি’ আমাদেরই গাওয়া।
আমি গান, আমি ধান, আমি বৃষ্টি, আমিই কুয়াশা,
বাউল বাঙালি আমি—
কবিতা আমার মাতৃভাষা।
কবিপত্নী
দরজা খোলেন তিনি—
অন্তর্গত কুয়াশা ও শীতে
ডাকেন সাদরে, আমরা
নিঃশব্দে প্রবেশ করি কবির বাড়িতে।
বিষাদপ্রতিমা তিনি, মুখে ম্লান হাসি—
আমরা উপেক্ষা করি, আমাদের মন শুধু
দর্পিত ও স্বেচ্ছাচারী কবির প্রত্যাশী!
বিষাদপ্রতিমা তিনি, আমাদের আপ্যায়নে
সর্বদা সজাগ।
তবুও কবির চোখে তাঁর প্রতি ভ্রূকুটি, বিরাগ।
তিনি কবিপত্নী, তিনি কাব্যে উপেক্ষিতা।
আমাদের লক্ষ্য শুধু কবির রক্ষিতা—
আর তার কামনার উদ্দাম আগুনে দীপ্ত কবির কবিতা!
সে সব কবিতা ঘিরে আমাদের জয়ধ্বনির
শেষ নেই কোনও।
অবৈধ সঙ্গম ছাড়া সুখ নেই কবিতাপ্রেমীর!
তবুও নিষ্কম্প হাতে
তিনিই খোলেন দরজা, আমরাও ঢুকে পড়ি, তস্করের প্রায়—
কবির অবৈধ কবিতায়।
নীরবে দেখেন তিনি।
পৃথিবীর আলো নিভে যায়।
চুম্বনের তথ্যচিত্র
যেভাবে পাখিরা ওড়ে উঁচু থেকে আরও উঁচুতে,
নারীরাও সেভাবেই, প্রেমের ভিতরে,
এক চুম্বনের চেয়ে উচ্চতর চুম্বনের তৃষ্ণা বুকে ধরে।
নারীরা গোপনে তাই
পুরুষ জগতে
এক চুম্বনের চেয়ে উচ্চতর চুম্বনের
সমর্থ পুরুষ খুঁজে মরে।
হীনবীর্য পুরুষেরা জানে না সেকথা, তারা
আকাশে উড়ন্ত নারীদের
তৃপ্তিহীন ঠোঁট থেকে
অর্ধমৃত ইঁদুরের মতো খসে পড়ে।
নারীরা গোপনে শুধু
এক চুম্বনের চেয়ে উচ্চতর চুম্বনের
সমর্থ পুরুষ খুঁজে মরে।
হৃদয় আগ্নেয় শিলা
হৃদয় আগ্নেয় শিলা—
প্রণয়ের অটুট পাথর।
সেকারণে বুকে মুখ গুঁজে পাও ভয়।
বাহুবন্ধে পিষ্ট হয়ে টের পাও, আমার দেহের
আলিঙ্গনও কঠিন, তন্ময়!
আমার শরীরে তুমি, স্রোতস্বিনী, হয়েছ কি প্রীত?
পেয়েছ আমার প্রেম— ফেনোচ্ছল, উপলব্যথিত?
ভিন্ন শিহরনও আছে। হৃদয়ের শীর্ষে জ্বালামুখ
সর্বদাই মিলনার্ত, তোমার সংকেতে
অগ্ন্যুৎপাতে সতত উন্মুখ।
উদগীর্ণ লাভা-র স্রোতে
দগ্ধ হয়ে, পরিতৃপ্ত হয়ে—
ভস্মাবৃত দুটি দেহ, উর্বরতাময়।
হৃদয় আগ্নেয় শিলা—
তুমি বাহুলগ্ন, আর
পুনর্বার, সুকঠিন আমার প্রণয়!
বেগম আখতারের গান
‘ফিরায়ে দিও না মোরে শূন্য হাতে’—
গাইছেন বেগম আখতার, নিশুতি রাতে।
কোন প্রত্যাখ্যাত নারী কোন ক্রুর পুরুষের দ্বারে,
নির্দয় বিচ্ছেদ শেষে, তবুও ব্যাকুল অন্ধকারে
হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে গাইছে এ গান?
কী চায় সে নারী ওই নির্বিকার পুরুষের কাছে?
একটি বিবর্ণ ফুল, ছেঁড়া চিঠি, রুমালের অন্তিম আঘ্রান?
কী চায় সে নারী, তার নেই ক্রোধ, নেই অভিমান?
‘ফিরায়ে দিও না মোরে শূন্য হাতে’—
গাইছেন বেগম আখতার, নিশুতি রাতে।
সুরে সুরে জমে উঠছে ঘনকৃষ্ণ মেঘ—
যে ফিরায়ে দেবে, তার
মৃত্যু হবে বজ্রসম সুরেরই আঘাতে।
ঘোড়াদের বিষণ্ণতা
ঘোড়াদের বিষণ্ণতা বোঝে কেউ? পাকদণ্ডি পথে
তাদের ক্ষুধা ও ক্লান্তি, বেত্রাঘাতে কম্পিত কেশর
বোঝে কেউ? পর্যটক, পুলিশ, নক্ষত্র, মেঘ, পাইনের বন?
তীর্থযাত্রী পিঠে নিয়ে অনন্ত খাদের পথে
ঘোড়াদের বিশ্বস্ত চলন—
দেখি আর মুগ্ধ হই,
দেখি আর পাহাড়ি বিষাদে
স্তব্ধ হয়ে যাই।
এত রূপবান প্রাণী, অথচ কি সৎ!
বিশ্বাস হয় না— এই সুন্দর ছলনাময় গ্রহে
ঘোড়া কি অলীক প্রাণী? ঘোড়াই কি আসল বিগ্রহ—
সৌন্দর্য ও সততার অচ্ছেদ্য মিলনে?
এমনই ইশারা দেখি
ভণ্ড তীর্থযাত্রীদের পিঠে নিয়ে ঘোড়াদের বিশ্বস্ত চলনে—
ভণ্ডতর দেবতার উচ্চতর মন্দিরের দিকে।
নাস্তিকতা শুরু হয় ঘোড়াদের বিষণ্ণতা থেকে।
চিঠি
যখন তুমি প্রবলভাবে আমার বক্ষলগ্ন এবং চুম্বনে উদ্যত,
তখনও আমি মনের গোপনে তোমার আমার মধ্যে কিছুটা দূরত্ব
ধরে রাখি। যাতে সেই মুহূর্তেও, আমার মনের কোণে মনে হয়
যেন আমি বহুদূর পাহাড়ি প্রবাসে, উড়ন্ত মেঘের মধ্যে একটা
নিঃসঙ্গ পাথরে বসে কেবলই তোমার কথা ভাবছি। যাতে সেই
মুহূর্তেও আমার মন, সেই সুদূর প্রবাস থেকে, তোমাকে
লিখতে পারে চিঠি— ‘বাইরে তুমুল বৃষ্টি, আজ সারা রাত
আমি স্বপ্নের ভিতরে শুধু তোমাকে চাই!’ আমার কাছে, এই বিরহীর মিলনাকাঙ্ক্ষাই
হল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুখের অনুভূতি! এই অনুভূতিকে আমি
এক মুহূর্তের জন্যও হারাতে চাই না।
আমি তাই, সঙ্গমের মুহূর্তেও, তোমাকে চিঠি লিখতে চাই…
দীঘার সমুদ্র
দীঘার সমুদ্র কোনও পানাসক্ত অভিনেত্রী নয়।
তবু তার মত্ত ঢেউ, নৃত্য, ফেনা, লোনা দেহ, বুকের গর্জন
কেলিরত দম্পতিকে ধাক্কা মারে স্নানের সময়—
সতর্কবার্তার মতো; ঝাউবনে কেঁপে ওঠে ভয়।
আর তার তীব্র রূপ— স্থলিত উত্তাল নীল শিফনে সফেন,
যেন তার জনপ্রিয় রূপালি পর্দার নাম সাগরিকা সেন!
বর্ষীয়সী, ক্লান্ত, খ্যাপা, কিন্তু প্রণয়ের দৃশ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বিনী—
ভার্টিক্যাল তুফানের বাহুলগ্ন— প্রেমে উন্মাদিনী।
তবুও একথা ঠিক, দীঘার সমুদ্র কোনও পানাসক্ত অভিনেত্রী নয়,
বুড়ো নায়কের সঙ্গে ফালতু ফ্লার্ট করে না সে—
বরং সক্রোধে ভাঙে বালুতট— সৈকতের কপট হৃদয়।
দীঘার সমুদ্রে তাই নিঃসঙ্গতা আবিষ্কৃত হয়।
নদিয়া মান্দেলস্তাম
১৯৩৯ সালের এক নিস্তব্ধ দুপুর। মস্কো নগরীর একটি অফিসবাড়ির সামনে অতি ক্লান্ত ও বিষণ্ণ এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন একটি দীর্ঘ লাইনে। এই অফিস বাড়িটি হল সাইবেরিয়ার লেবার ক্যাম্পে দণ্ডিত বন্দিদের বিষয়ে খবরাখবর জানার দপ্তর। লাইনটিতে প্রতীক্ষারত প্রায় সকলেই মহিলা— বিপন্ন, হতাশ এবং চরম উদ্বিগ্ন। তাঁরা সেই বন্দিদের মা কিংবা স্ত্রী কিংবা নিকট আত্মীয়া। তাঁরা এসেছেন সেই বন্দিদের খবর জানার জন্য, এবং পুঁটুলিতে ভরে বন্দিদের জন্য কিছু গরম জামা বা জুতো বা প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পাঠানোর জন্য। আমাদের এই বিষণ্ণ মহিলাটিও তাঁদেরই একজন, তাঁর নাম নাদিয়া মান্দেলস্তাম, তিনি রাশিয়ার বিশিষ্ট কবি ওসিপ মান্দেলস্তাম-এর স্ত্রী। তাঁর স্বামী বরাবরই পার্টি-লাইন বিরোধী মুক্ত চিন্তার মানুষ, প্রলেতারিয় সাহিত্যের ফতোয়ায় অবিশ্বাসী, এবং তাঁর গভীর সাংকেতিক কবিতার জন্য পার্টি-তাত্ত্বিকদের নিন্দাভাজন, তদুপরি তিনি ১৯৩৪ সালে স্বয়ং স্টালিনকে ব্যঙ্গ করে একটি কবিতা লিখে স্টালিনের চরম কোপের শিকার হয়েছেন। তাঁর সমস্ত কবিতা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে এবং যথাসম্ভব বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে (কারুর কাছে তাঁর কবিতার একটি চিরকুট পাওয়া গেলেও সেই ব্যক্তির গ্রেফতার অবধারিত)। প্রথমে স্টালিনের ট্রাইবুনাল ওসিপকে শাস্তি হিসেবে দিয়েছিল তিন বছরের নির্বাসন, সুদূর উরাল অঞ্চলে, সেখানে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তখন তাঁর শাস্তি কিছুটা লাঘব হয় এবং রাশিয়ার প্রধান শহরগুলিতে তাঁর বসবাস নিষিদ্ধ করা হয়। অগত্যা তিনি একটি প্রত্যন্ত জায়গা ভোরোনেঝ-এ বাসা বাঁধেন। সর্বত্রই তাঁর স্ত্রী নাদিয়া তাঁর ছায়াসঙ্গিনী, এই নির্বাসনের চরম দারিদ্র্য ও দুর্দশার দিনগুলিতে তিনিই কবির জীবন ও কবিতার একমাত্র রক্ষক। ভগ্নস্বাস্থ্য এবং মানসিক বিপর্যয়ে আক্রান্ত ওসিপ মান্দেলস্তাম বুঝতে পারতেন যে তাঁর আয়ু আর বেশিদিন নেই। তাই তিনি, তাঁর প্রতিভার শেষ বিন্দু শক্তি প্রয়োগ ক’রে, এই ভোরানেঝ-বাসকালে রচনা করেন তাঁর জীবনের কিছু শ্রেষ্ঠ কবিতা, যা পরবর্তীকালে ‘ভোরোনেঝ নোটবুকস’ বা ‘ভোরোনেঝ পোয়েমস’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এইসব কবিতা ওসিপ মান্দেলস্তাম রচনা করতেন ভাবের ঘোরে, মুখে মুখে, এবং নাদিয়া সেগুলি নোটবুকে লিখে নিতেন। এ কারণে নাদিয়ার মনে হত যে এই কবিতাগুলির সৃজনপ্রক্রিয়ার তিনিও অংশীদার, এগুলি কিছুটা যেন বা তাঁর নিজেরও কবিতা। নির্বাসন শেষ হওয়ার পর তাঁরা দুজনে ফিরে আসেন, কিন্তু কিছুদিন পরেই, ১৯৩৮ সালের মে মাসে, দ্বিতীয়বার গ্রেফতার হন ওসিপ মান্দেলস্তাম। এবারে তাঁকে ‘প্রতিবিপ্লবী’ আখ্যা দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য লেবার-ক্যাম্পের কারাবাসে দণ্ডিত করা হয়। এবারে আর নাদিয়ার পক্ষে তাঁর স্বামীর সঙ্গিনী হওয়া সম্ভব হয়নি। তাই নাদিয়া নিয়মিত মস্কোর এই গুলাগ পরিচালন দপ্তরের অফিসটিতে স্বামীর খোঁজ নিতে আসেন। শেষ খবর অনুযায়ী, ওসিপ এখনও সাইবেরিয়ার মূল লেবার ক্যাম্পে পৌঁছাননি, দীর্ঘ পথে ভিন্ন ভিন্ন ট্রানজিট ক্যাম্প পার হয়ে এগিয়ে চলেছেন শুধু। এমনই একটি ক্যাম্প থেকে নাদিয়াকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন ওসিপ, স্ত্রীকে জানিয়েছেন তাঁর অকুণ্ঠ ভালোবাসা, এবং লিখেছেন যে তুন্দ্রার ভয়ংকর শীতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে খুব, দু’একটা গরম জামাকাপড় পেলে ভালো হত। কোনও এক ট্রানজিট ক্যাম্পের কাঠের তক্তার ব্যারাকে হাঁটু মুড়ে বসে শীতে কাঁপছেন ওসিপ, আর তক্তার ফাঁক দিয়ে ছুরির মতো তীক্ষ্ন ঠান্ডা হাওয়া তাঁর হাড়ে আঁচড় কাটছে— এই দৃশ্য কল্পনা করে দুঃখে বুক ফেটে গেছে নাদিয়ার। বহু কষ্টে কিছু গরম জামাকাপড় জোগাড় করে আজ একটি পুঁটুলিতে বেঁধে নিয়ে এসেছেন তিনি, এই অফিস মারফত তা ওসিপের কাছে পাঠানোর জন্য। সেই ১৯৩৪-এ প্রথম নির্বাসনের পর থেকেই তাঁর এবং ওসিপের প্রায় ভিখারির দশা, মস্কো লেনিনগ্রাদের লেখকবন্ধুরা প্রায় সকলেই সংস্রব ত্যাগ করেছেন। এই নিস্তারহীন দুর্দিনে তাঁদের মস্ত সহায় ছিলেন বরিস পাস্তেরনাক এবং আনা আখমাতোভা, কিন্তু তাঁরা নিজেরাও স্টালিন সন্ত্রাসে বিপর্যস্ত এবং নিস্তব্ধ।
আজ ঠান্ডা পড়েছে খুব, এই দুপুরবেলাতেও কনকনে শীত। নাদিয়ার সামনের লাইনটি এখনও অনেক লম্বা। একটু আগেই লাইনের মাথায় এক মাঝবয়েসি মহিলা অফিস কাউন্টারের কর্মীর সঙ্গে এক মুহূর্ত কথা বলেই ডুকরে কেঁদে উঠে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। এক প্রহরারত সৈনিক ও অন্যেরা তাঁকে ধরে সরিয়ে নিলেন দূরের বারান্দায়। এটি এ-লাইনের পরিচিত দৃশ্য, অর্থাৎ ওই মহিলার প্রিয়জন লেবার ক্যাম্প বন্দিটির মৃত্যু ঘটেছে। লাইনে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন নাদিয়া, এবং মনে মনে স্বামীর কবিতাগুলি আওড়াতে শুরু করলেন। নিজের এই চরম বিপর্যস্ত জীবনে, এখন এটিই তাঁর দিনরাতের প্রধান কাজ— মনে মনে স্বামীর কবিতাগুলি আবৃত্তি করা। কারণ ওসিপের কবিতাগুলি বাঁচানোর তো আর কোনও উপায় নেই, কোথাও সেই কবিতার একটি লিখিত লাইন পাওয়া গেলেও সেখানে সিক্রেট পুলিশ ‘চেকা’ হানা দেবে, তাই নাদিয়া তাঁর স্বামীর অপ্রকাশিত কবিতাগুলি প্রায় আদ্যোপান্ত মুখস্থ করে রেখেছেন। তাঁর মাথার ভিতর থেকে তো ওরা আর ওসিপের কবিতা ছিনিয়ে নিতে পারবে না, পুড়িয়ে ফেলতে পারবে না! সেজন্য নাদিয়ার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য, তাঁকে যে করেই হোক বেঁচে থাকতে হবে, ওসিপের কবিতাগুলি তাঁর স্মৃতির ভিতরে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এবং স্টালিন-সন্ত্রাসের অবসান ঘটলে (তা আদৌ ঘটবে কি না তিনি জানেন না, তবু তাঁর মনের আশা ও বিশ্বাস অটুট) তিনি ওসিপের কবিতাগুলি বিশ্বকে উপহার দেবেন। এই তাঁর জীবনের একমাত্র সংকল্প। নাদিয়া নিজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে দক্ষ (যা তৎকালীন রাশিয়ায় এক বিরল গুণ), রুশ কাব্যসাহিত্যের সমঝদার তো বটেই, কিন্তু বহুদিন ধরে তিনি অন্য কোনও কবির কবিতা পড়া ছেড়ে দিয়েছেন, কারণ তাঁর মনে ভয়— যদি অন্যের কবিতার লাইন অসতর্কভাবে তাঁর স্মৃতিতে তাঁর স্বামীর কবিতার ভিতরে ঢুকে যায়। যতই তিনি ওসিপের কবিতা আওড়ান মনে মনে, ততই তাঁর মনে হয় যেন কবিতাগুলি তাঁর নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের ভিতরে মিশে গেছে। তাঁর ভয় হয়— কবিতার লাইনগুলো তাঁর মুখের উপরে না ফুটে ওঠে, প্রচ্ছন্ন জলছাপের মতো! কবিতাগুলি স্মরণ করলেই নাদিয়া একটা অদ্ভুত গর্বের ও তৃপ্তির আস্বাদ পান এই ভেবে যে ওসিপের যেসব সতীর্থ কবিরা পার্টির দালাল হয়ে ওসিপের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, এবং স্বৈরাচারী রাইটার্স ইউনিয়নের সদস্য হয়ে ছড়ি ঘোরাচ্ছে, অচিরেই তাদের কবিতা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে লুপ্ত হয়ে যাবে, কিন্তু উজ্জ্বল হয়ে বেঁচে থাকবে তাঁর স্বামীর কবিতা— সৌন্দর্যময়, মৌলিক, অমর! দীর্ঘক্ষণ এইভাবে ওসিপের কবিতা নিঃশব্দে আবৃত্তি করতে করতে অবশেষে নাদিয়া হাজির হলেন লাইনের পুরোভাগে। হাতের পুঁটুলিটি তিনি আগে অফিসঘরের জানালা দিয়ে এগিয়ে দিলেন কর্তব্যরত কর্মীটির টেবিলে, তারপর যথাসম্ভব গম্ভীর গলায় উচ্চারণ করলেন তাঁর স্বামীর নাম: ‘ওসিপ মান্দেলস্তাম’। কর্মীটি পরপর দু’বার তার রেজিস্টারটি খুঁজেও দেখতে পেল না সেই নাম, এবং তখন সে নাদিয়াকে জানাল সেই অবধারিত সংবাদ, ‘এই বন্দি মৃত।’ সে নাদিয়ার পুঁটুলিটি নাদিয়াকে ফেরত দিয়ে দিল। সেই মুহূর্তে শরীর ও মনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন নাদিয়া, তাঁর মনে হল হয়তো ওই অফিসের জানালায় উঁকি দিয়েই তিনি শেষবারের মতন দেখতে পেতেন তাঁর প্রিয় ওসিপের মুখ! সুদূর বরফাস্তীর্ণ তুন্দ্রাভূমির কোন চিহ্নহীন গণকবরে চাপা পড়ল ওসিপের দেহ, কে জানে? তিনি তো আর সেই কবর খুঁজে পেয়ে তাকে একটি ফুলও দিতে পারবেন না কোনওদিন। তাহলে কী আর পড়ে রইল তাঁর নিঃসহায় নিঃসঙ্গ জীবনে?
রইল ওসিপের কবিতাগুলি, তাঁর স্মৃতির গোপন কুঠুরিতে। সেই কবিতাগুলির জন্যই তাঁকে বেঁচে থাকতে হবে। তিনি জানেন, ওসিপের মৃত্যুর পর এই বার চেকা পুলিশ হানা দেবে তাঁর দরজায়, ধরে নিয়ে যাবে তাঁকে। ওসিপের কবিতার শেষ চিহ্ন তারা মুছে দিতে চাইবে। সুতরাং অবিলম্বে তাঁকে মস্কো ছেড়ে পালিয়ে যেতে হবে। তাঁকে আত্মগোপন করতে হবে কোনও সুদূর অখ্যাত মফসসলে, ছদ্ম পরিচয়ে কোনও স্কুলে ইংরেজি শিক্ষিকার কাজ নিয়ে কোনওক্রমে বেঁচে থাকতে হবে— পুলিশের চোখ এড়িয়ে, ভবিষ্যৎ সুদিনের প্রতীক্ষায়। যখন তিনি ওসিপের কবিতাগুলি প্রকাশ করতে পারবেন জনসমক্ষে।
মস্কো ছেড়ে চলে যাওয়ার মুহূর্তে কেবল একটি আক্ষেপেই ভারাক্রান্ত হয়ে রইল নাদিয়ার মন। তিনি জানতে পারলেন না কোথায় কীভাবে মারা গেল ওসিপ, ঠিক কেমনভাবে কেটেছিল তার শেষ দিনগুলি।
ওসিপ মান্দেলস্তাম মারা গিয়েছিলেন পূর্ব সাইবেরিয়ার একটি ট্র্যানজিট ক্যাম্পে— অভুক্ত, অর্ধোন্মাদ অবস্থায়, ১৯৩৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর তারিখে। তাঁর এই মৃত্যু সম্পর্কে নানা সূত্রে নানা বিভ্রান্তিকর গুজব কানে আসত নাদিয়ার, এবং তিনি সঙ্গোপনে খোঁজ করতেন সেই ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে ফিরে-আসা অন্তত একজন বন্দির খবর সংগ্রহ করে তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য। কয়েক বছর পর স্টালিন সন্ত্রাসের তীব্রতা যখন একটু কম, তখন নাদিয়া মস্কোয় এসে দেখা করেছিলেন তেমনই এক ক্যাম্প ফেরত বন্দির সঙ্গে, যিনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন ওসিপের শেষ দিনগুলি। অনেক কষ্টে সেই সদা-সন্দিগ্ধ ও ভয়ার্ত মানুষটিকে কথা বলতে রাজি করিয়েছিলেন নাদিয়া। বছর তিরিশের সেই শীর্ণ, যক্ষ্মাক্রান্ত যুবক নাদিয়াকে বলেছিলেন এই মর্মস্পর্শী বিবরণ: ‘আপনার স্বামীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় একটি ট্রান্সপোর্ট ট্রেনে, ১৯৩৮-এর সেপ্টেম্বর মাসে, আমরা যাচ্ছিলাম ভ্লাডিভস্টক-এর দিকে। তাঁকে সবাই ডাকত ‘কবি’ বলে। কিছুদূর গিয়ে একটি নারকীয় ট্রানজিট ক্যাম্পে আমরা একসঙ্গেই ঢুকি। সেই ক্যাম্পের অবস্থা ছিল এমনই ভয়াবহ যে বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টায় স্রেফ এক টুকরো রুটির জন্য বন্দিদের অনেকেই একজন আর একজনকে খুন করতেও পিছপা হত না। মারপিট, হাঙ্গামা তো লেগেই থাকত। কিন্তু আপনার স্বামী ছিলেন অন্যরকম, একেবারেই সরল ও খামখেয়ালি স্বভাবের মানুষ, তিনি প্রায়ই খ্যাপার মতো আচরণ করে গার্ডদের চোখে পড়ে যেতেন এবং তাদের হাতে নিগৃহীত হতেন। আর তাঁর একটি বড়ো সমস্যা ছিল এই যে, তিনি খেতে চাইতেন না। তাঁর ঘোর সন্দেহ ছিল যে, তাঁর খাবারে নিশ্চয়ই বিষ মিশিয়ে দেওয়া আছে। তাঁকে আমার খুব পছন্দ হয়, আমি তাঁর অন্তরঙ্গ হয়ে উঠি, এবং বুঝতে পারি যে এই মানুষটির মধ্যে এমন কিছু আছে যা আমাদের আর কারুর মধ্যে নেই। একদিন আমাদের হুকুম দেওয়া হয় ক্যাম্পের বাইরে পাথুরে জমিটা সাফ করার জন্য। আমি ওসিপকে সঙ্গে নিয়ে যাই, এবং দুজনে মিলে কিছু পাথর সরানোর পরই ওসিপ হঠাৎ মজা করে বললেন যে তাঁর প্রথম কবিতার বইয়ের নাম নাকি ছিল ‘স্টোনস’। আমি তো অবাক, এমন নাম আবার হয় নাকি কবিতার বইয়ের? (এ’কথার উত্তরে নাদিয়া তাকে জানান যে ওসিপের প্রথম বইয়ের নাম সত্যিই ছিল ‘স্টোনস’)… যাই হোক, এরপর আবহাওয়া খুব খারাপ হয়ে ওঠে, আমাদের ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ে ভয়ংকর টাইফাস রোগ। আমিও অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং ক্যাম্পের হাসপাতালে পড়ে থাকি। কিছুদিন পর ক্যাম্পে ফিরে শুনি ওসিপ মারা গেছেন। টাইফাস-এ নয়, সম্ভবত হার্টফেল ক’রে।… সবশেষে আমি বলবো আপনাকে একটা বিশেষ ঘটনার কথা, যা আমি কখনও ভুলব না। ওসিপের মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগের কথা। আমাদের ক্যাম্পের একটা ব্যারাকে একদল ক্রিমিনাল জোট বেঁধেছিল। কারণ তখনও ক্যাম্পগুলোতে রাজনৈতিক বন্দি এবং সাধারণ অপরাধীদের একসঙ্গেই রাখা হত। যাই হোক, সেই ক্রিমিনালের দলটা খুব খারাপ ছিল না, তারা ছিঁচকে চুরি-চামারি করত বটে কিন্তু মারপিট করত না। তারা কিঞ্চিৎ দক্ষিণার বিনিময়ে ক্যাম্পের ভিতর নানা খবর চালাচালি করত। একদিন রাতে তারা আমাকে আমন্ত্রণ করে তাদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জন্য। আমার নিজের যেহেতু চুরি যাওয়ার মতো কিছু ছিল না, কাজেই আমি নির্ভয়ে তাদের কাছে চলে যাই, এবং গিয়ে দেখি, ওসিপ সেখানে উপস্থিত। সেই অন্ধকার ব্যারাকে রয়েছে একটা ওলটানো ড্রাম, তার উপরে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি এবং কিছু অদ্ভুত সাদা পাউরুটি, সেই ড্রামটি ঘিরে বসে আছে ক্রিমিনালদের দলটা, এবং ওসিপ তাদেরকে নিজের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন। সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে তারা শুনছে ওসিপের কবিতা। এবং প্রায়ই একটি কবিতাপাঠ শেষ হওয়ামাত্র তারা ওসিপকে অনুরোধ করছে আবার সেই কবিতাটি শোনানোর জন্য। আমি জীবনে কখনও শ্রোতাদের এমন একাগ্র নৈঃশব্দ্যের ভিতর কবির কবিতাপাঠ শুনিনি।
‘আপনার স্বামী খুব বড়ো কবি ছিলেন, তাই না?’
চোখের জল চেপে নাদিয়া উত্তর দিয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ, তিনি ছিলেন একজন খুব বড়ো কবি।’
আমাদের সৌভাগ্য যে, বহু কষ্টে বেঁচে থেকে, নিজের সংকল্প সফল করতে পেরেছিলেন নাদিয়া। স্টালিনের মৃত্যুর পর, ১৯৬০-এর দশকে ওসিপের সব কবিতা সযত্নে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। অচিরেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল ওসিপের কবিখ্যাতি। যতদিন বেঁচে ছিলেন নাদিয়া, ততদিনই স্বামীর স্মৃতিতে সর্বাগ্রে তাঁর মনে ভেসে উঠত ট্রানজিট ক্যাম্পের সেই দৃশ্যটি: একটি ওলটানো ড্রামের উপর একটি জ্বলন্ত মোমবাতি আর কিছু অপার্থিব সাদা পাউরুটি, আর সেই মোমবাতির আলোয় ওসিপের কবিতাপাঠরত মুখ।
নাদিয়া মান্দেলস্তামের এই জীবনকথা আমার কাছে, বিশ্বকাব্যের ইতিহাসের এক এপিক কবিতা। আমি তাই অতি সংক্ষেপে এই আখ্যান আমার অপটু হাতে, কিছু সম্ভাব্য ভুল ভ্রান্তিসহ, লিপিবদ্ধ করলাম। নাদিয়া মান্দেলস্তাম প্রেমের চেয়ে বড়ো, তিনি জীবনের চেয়েও বড়ো।
ঋণস্বীকার:
দ্য পোয়েটস ওয়াইভস— ডেভিড পার্ক, ব্লুমসবেরি, ২০১৪।
সিলেকটেড পোয়েমস— ওসিপ মান্দেলস্তাম, পেঙ্গুইন বুকস, ১৯৯১।
পেঙ্গুইন বুক অফ রাশিয়ান পোয়েট্রি, ২০১৫।
পক্ষীশাবকের ক্ষুধা
পক্ষীশাবকের ক্ষুধা এখনও শরীরে জাগে, সূর্য-ওঠা ভোরে!
সদ্যোজাত চোখা ঠোঁটে, বাগান-কাঁপানো চিৎকারে
আমার মুখের হাঁ এখনও বিশাল
রক্তজবার মতো লাল!
সুউচ্চ গাছের ডালে ঘনিষ্ঠ খড়ের নীড়ে আমি
এখনও লম্বা গলা— রোঁয়া-ওঠা লিকলিকে গলা—
বাড়িয়ে বাড়িয়ে এই ঘনঘোর জগৎটা দেখি—
দেখি, সর্বকামনার আগুনে কি তপ্ত, আভাময়
প্রতিটি বৃক্ষ ও প্রাণী! প্রত্যেকেরই দেহে কত ইশারা, উল্লাস
আমার উদ্দেশে! আমি চঞ্চল পাতার ফাঁকে নীল মহাকাশ
দেখি, আর তারই দিকে মাথা তুলে, প্রকাণ্ড হাঁ ক’রে
সারাটা সকাল শুধু চিৎকার করি তারস্বরে।
এখনও পক্ষীমাতা উড়ে এসে আমাকে খাওয়ায়,
এখনও আমার ডানা সাপের ছানার মতো নড়ে,
উড়াল শিখিনি আজও, শুধু এক সর্বগ্রাসী ক্ষুধা
নিয়ে আমি উপস্থিত এই পূর্ণ বিশ্বচরাচরে!
গান
প্রতিটি মানুষ তার
নিজস্ব গানের মধ্যে বেঁচে থাকে— মাথা-নাড়া পাগলের মতো!
সে গান শুনতে চাও?
শুধু তার বুকে কান পাতো!
মর্নিং স্কুলের কবিতা
প্রতিদিন ভোরে আমি, অবাক শিশুর চোখে দেখি, চরাচর
মর্নিং স্কুলের মতো প্রাণোচ্ছল, শান্ত ও সুন্দর!
দেখি, দীর্ঘ ঋজুদেহে রৌদ্রের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছেন
দিগন্তের চার কোণে, চার জন উজ্জ্বল শিক্ষক!
প্রতিদিন ভোরে আমি, দুষ্টমতি বালকের মতো,
দেখি, এই চরাচর সুগম্ভীর বিদ্যালয়— স্থির চক্ষু, শৃঙ্খলা-রক্ষক।
দেখি, মুক্ত আকাশের নীল বোর্ডে, উড়ন্ত বকের সাদা চকে
একটি অদৃশ্য হাত লিখে যাচ্ছে, নিরন্তর কবিতার কলি আর
অঙ্কের প্রশ্নকে।
বৃক্ষ-লতা, পশু-পাখি, পাহাড় ও সমুদ্র সেই কক্ষে পাঠরত।
প্রতিদিন ভোরে আমি, অবাক শিশুর চোখে দেখি, চরাচর
মর্নিং স্কুলের মতো স্নেহময়, শাসনে উদ্যত!
কবিতা পবিত্র লিপি
কবিতা পবিত্র লিপি—
অপবিত্র হাতে তাকে স্পর্শ কোরো না
কবিতা লেখার আগে
ঝরনাজলে স্নান করে এসো
কবিতা পড়ার আগে
অশ্রুজলে চোখ ধুয়ে এসো
পবিত্র বস্তুতে যদি বিশ্বাস না রাখো, তবে
কাব্যগ্রন্থ স্পর্শ কোরো না
পবিত্র বস্তুতে যদি বিশ্বাস না রাখো, তবে
কবিতা লিখো না।
মন্দিরে দেবতা যথা পুস্তকে কবিতা—
মনের মালিন্যে তাকে অশুচি কোরো না
ভীষণ অনর্থ হবে, তার দৈব রোষে
প্রতিটি গানের গর্ভে অসুর জন্মাবে
প্রতিটি শব্দের দেহে গর্ভপাত হবে
কবিতা লেখার আগে বৃক্ষতলে ধ্যান করে এসো
কবিতা লেখার আগে ভিখারিকে দান করে এসো
কবিতা লেখার আগে অনুতাপে দগ্ধ হয়ে এসো
কবিতা লেখার আগে অশ্রুজলে শুদ্ধ হয়ে এসো
কবিতা পবিত্র লিপি—
হৃদয়ের বীজমন্ত্র, নক্ষত্রলোকের প্রত্যাদেশও।
***




Leave a Reply