সৈয়দ শাহনূর [১৭৩০-১৮৫৬]

সৈয়দ শাহনূর [১৭৩০-১৮৫৬]

মরমিবাদের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন আবু সুলায়মান আদ-দারানী। সুফিবাদের সংজ্ঞা প্রদান করে মারুফ আল-কারখী সুফিবাদকে খোদায়ী সত্তার উপলব্ধি বলে অভিহিত করেছেন। ভারতীয় সুফিবাদের মধ্যে হজরত খাজা মঈন উদ্দিন চিশতী (রহ.) সবার অগ্রভাগে। ওই সময়কার আরও ছিলেন শকরগঞ্জ (রহ.) ও হজরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ.)। সুফিসাধক হজরত সৈয়দ শাহনূর (রহ.) তাঁদেরই এক উত্তরসুরি।

মরমিবাদের মূলকথা হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া আর কিছুর বাস্তব সত্তা নেই। আল্লাহ অনন্ত সৌন্দর্যের প্রতীক এবং আল্লাহকে পাওয়ার প্রধান পথই হচ্ছে প্রেম। সুতরাং প্রেমই মরমিবাদের মূল ভিত্তি। দুনিয়া ও আখেরাত সম্পর্কে নবী (সা.) যে বার্তা দিয়েছেন তার ওপর ঈমান আনা এবং তা মেনে চলার মধ্য দিয়েই বান্দার পূর্ণতা লাভ করে। এ কারণেই সুফিসাধকরা ঈমানের বিষয়কে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রূপে বর্ণনা করেছেন। সুফিসাধক সৈয়দ শাহনূরের ভাষায় :

নূরে কান্দে, কান্দে নূরে ঈমানের লাগিয়া
হেলায় হারিলু ঈমান পাইমুনি খুঁজিয়া
হায় হায় রতন ধন হারিলু বিফলে
কি জুয়াব দিমু আমি হাশরের কালে।
হুব লোভ খিদা নিদরা সংগে আইল বৈরি
লোভ ডাকাইত অবশেষে ঈমান কৈল চুরি।
ষোল্ল আনা লইয়া আইলু এক আনা নাই
ঈমান ছাড়াইয়া দেয় তিরিপুত্র ভাই।
ভবের ধনের কিম্মত আছে ঈমানের নাই
ঈমান দুর্লভ ধন বিফলে গোয়াই।
সৈয়দ শাহনূরে কইন ঈমান বড় ধন
হেলায় হারিলু ঈমান অমূল্য রতন ॥

সুফিসাধক ও অমর স্বভাবকবি সৈয়দ শাহনূর কত সালে এবং কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা আজও নিশ্চিত করে কোনো গবেষকই বলতে পারেননি। তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত কোনো গ্রন্থেই এ বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে অনেক লেখক ও গবেষক সৈয়দ শাহনূরের জন্ম ১৭৩০ ইংরেজি সনে এবং ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন বলে একাধিক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সেই হিসেবে সৈয়দ শাহনূরের বয়স ছিল ১২৬ বছর। তবে চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণের মতে, সৈয়দ শাহনূর দীর্ঘজীবী পুরুষ ছিলেন এবং তিনি ৩০০ বছর জীবিত ছিলেন। যদি ১৮৫৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন তাহলে তাঁর চলে যাওয়ার ইতোমধ্যে ১৬৩ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। হজরত সৈয়দ শাহনূর (রহ.) বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার জালালসাফ গ্রামে শায়িত আছেন। এই গ্রামকে জালালাপ বলে অনেকেই চিনেন।

গবেষক আশরাফ হোসেন সাহিত্যভূষণ, যিনি প্রথম সৈয়দ শাহনূর সম্পর্কে লিখেছিলেন। আশরাফ হোসেন সাহিত্যভূষণ তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে লিখেন, সৈয়দ শাহনূর মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার কদমহাটায় জন্মগ্রহণ করেন। কদমহাটা গ্রামটি মৌলভীবাজারের ইটা পরগনায় ছিল। অপর গবেষক দেওয়ান নুরুল আনোয়ার চৌধুরী লিখেন, সৈয়দ শাহনূর হবিগঞ্জ জেলার দিনারপুর পরগনার (নবীগঞ্জ উপজেলা) জালালহাফ (জালালসাফ) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গবেষক আসদ্দর আলী লিখেন, সৈয়দ শাহনূর জন্মেছিলেন মৌলভীবাজার মহকুমার (বর্তমান জেলা) মাজার আছে জালালসাফ গ্রামে। লেখক ফজলুর রহমান লিখেন, সৈয়দ শাহনূরের জন্ম অষ্টাদশ শতকে লংলা পরগনার ঘড়গাও গ্রামে। লেখক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম লিখেন, সৈয়দ শাহনূর মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত ঘড়গাও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ লিখেছেন, সৈয়দ শাহনূরের জন্মস্থান হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) জালালপুর গ্রামে।

প্রাচীনতম সাহিত্য পত্রিকা আল ইসলাহ সম্পাদক মুহাম্মদ নুরুল হক লিখেন, সৈয়দ শাহনূর উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) জালালসাফ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। লোকসাহিত্যের গবেষক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন লিখেন, শাহনূর শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার জালালসাফ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ লিখেন, সিলেট জেলার মৌলভীবাজার মহকুমার এক গ্রামে সৈয়দ শাহনূরের জন্ম হয়েছিল। লেখক সৈয়দ আব্দুল্লাহ লিখেন, মৌলভীবাজার জেলার কোন গ্রামে কবির জন্ম হয়েছিল তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারে না। কেহ কেহ মনে করেন কবি সৈয়দ শাহনূরের জন্ম হয়েছিল উক্ত জেলার ঘড়গাঁও গ্রামে।

জালালসাফের শাহনূর সাহিত্য সংসদের সম্পাদক আব্দুল মান্নান লিখেছেন, উনবিংশ শতাব্দীর কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও দরবেশ হজরত সৈয়দ শাহনূরের জন্ম মৌলভীবাজার মহকুমার ঘড়গাঁও গ্রামে। লেখক তরফদার মো. ইসমাইল লিখেন, সৈয়দ শাহনূর মৌলভীবাজার জেলার ইটা পরগনার রাজনগর থানার অন্তর্গত মনসুরনগর ইউনিয়নের কদমহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। লেখক আব্দুল জব্বার লিখেছেন, সৈয়দ শাহনূর মৌলভীবাজার মহকুমার রাজনগর থানার অন্তর্গত কদমহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

উপর্যুক্ত লেখক ও গবেষকদের লেখায় সৈয়দ শাহনূরের জন্মস্থান হিসেবে তিনটি জায়গার নাম পাওয়া যায়।

১. সৈয়দ শাহনূর হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার জালালসাফ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এমন তথ্য ৫ জন লেখকের লেখায় পাওয়া যায়।

২. সৈয়দ শাহনূর মৌলভীবাজারের কদমহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এমন তথ্য ৩ জন লেখকের লেখায় উঠে এসেছে।

৩. সৈয়দ শাহনূর মৌলভীবাজারের ঘড়গাঁও গ্রামে জন্মেছিলেন বলে ৪ জন লেখক তাঁদের লেখায় উল্লেখ করেন।

তবে সৈয়দ শাহনূর মৌলভীবাজার জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে অধিকাংশ লেখক তাঁদের লেখায় উল্লেখ করেছেন।

সৈয়দ শাহনূর তাঁর একটি গানে কদমহাটার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি গানের একটি অংশে বলেন :

কদমহাটা বিনেছিরি
শাহনূরে বানাইলা বাড়ি
শাহনূর থাখইন চাড়াল পাড়ার মাঝে

আবার তিনি বলেন :

কদমহাটা বিনেছিরি
শাহনূরে না পাইলা বাড়ি
শাহনূর থাখইন চাড়াল পাড়ার মাঝে

গান দুটি ব্যাখ্যা করলে তিনি কদমহাটায় জন্মেছিলেন তা বোঝায় না। সৈয়দ শাহনূর তাঁর লেখনীতে নিজের জন্মস্থান সম্পর্কে কিছু না লিখলেও তিনি সৈয়দ বংশে জন্মেছেন সেটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন। সৈয়দ শাহনূর তাঁর কবিতায় উল্লেখ করেন :

জদ আমার নূর নবী
আমি সৈয়দ নছল
জন্মদাতা ভজিয়া কহি
সৈয়দ নবু নাম

কলসি বিবি তনু বেহেস্তের ঘর।

উল্লিখিত কবিতা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, সৈয়দ শাহনূরের পিতার নাম সৈয়দ নবু এবং মায়ের নাম কলসি বিবি। তিনি সৈয়দ বংশে জন্মগ্রহণ করেন।

সৈয়দ শাহনূরের পূর্ব পুরুষ সৈয়দ শাহ আলা উদ্দিন (রহ.) বাগদাদের বাসিন্দা ছিলেন। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর হজরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর বংশে রইলেন হজরত ইমাম সৈয়দ জয়নাল আবেদীন (রহ.)। তাঁর থেকেই হোসেনি বংশ বিভিন্ন শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃতি লাভ করে। হোসেনি বংশেরই এক রত্ন ছিলেন সৈয়দ শাহ আলা উদ্দিন (রহ.)। তিনি হজরত ইমাম জয়নাল আবেদীন (রহ.) হতে ষষ্টদশ পুরুষ ছিলেন। সৈয়দ শাহ আলা উদ্দিন (রহ.)-এর চার পুত্র ছিলেন। তারা হলেন সৈয়দ শাহ বাহা উদ্দিন, সৈয়দ শাহ তাজ উদ্দিন, সৈয়দ শাহ রুকুন উদ্দিন ও সৈয়দ শাহ শামছুদ্দিন। সৈয়দ শাহনূর হলেন সৈয়দ শাহ রুকুন উদ্দিনের বংশধর। শাহ রুকন উদ্দিন হলেন হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার একজন।

সৈয়দ শাহনূরের বংশবৃক্ষ বা নছবনামা :

সৈয়দ শাহ আলা উদ্দিন (রহ.)

সৈয়দ শাহ রুকুন উদ্দিন

সৈয়দ শাহ জায়ফর আলী

সৈয়দ শাহ আকবর আলী

সৈয়দ শাহ বাহাউদ্দিন

সৈয়দ শাহ নবু

সৈয়দ শাহনূর।

বালক সৈয়দ শাহনূর শৈশবেই অন্যান্য বালকের চেয়ে ভিন্ন স্বভাবের ছিলেন। তিনি নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করতেন। শৈশবে তিনি মা-কে হারান। এর ফলে তিনি ভাবুক প্রকৃতির হয়ে ওঠেন। সিলেটে ফকিরি ধারার এক অসাধারণ কিংবদন্তির নাম সৈয়দ শাহনূর। অর্ধশতাধিক বছর পূর্বে শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় সৈয়দ শাহনূর সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, যে যে ফকীরের কণ্ঠ-বাণীর সুরতরঙ্গে শ্রীহট্টের নিজস্ব কথায় অধ্যাত্মবাদ ফুটিয়া উঠিয়াছে, যাঁদের কথায় শ্রীহট্টের পল্লী ভাব-সাগরে সাঁতার দেয়, যাঁদের কাছে শ্রীহট্টের হিন্দুমুসলমান সমভাবে মাথা নোয়ায়, তাঁদের মাঝে সৈয়দ শাহনূর শীর্ষস্থানীয়।

সৈয়দ শাহনূর বাল্যকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকায় ঘুরাঘুরি করতেন। এক সময় তাঁকে কেউ খুঁজেও পাননি। পরে সিলেটের গোলাপগঞ্জে ঢাকাউত্তর পরগনার রাণাপিং মৌজার পাশের পাহাড়ি মৌজা ঘুগায় বসবাসরত সাধক ফকির শাহ মঞ্জুর আস্তানায় সৈয়দ শাহনূরকে পাওয়া গেল। অল্প সময় ও অল্প বয়সে সৈয়দ শাহনূর আধ্যাত্মিক ধারায় নিজেকে বিলিয়ে দিলেন। লেখক ও গবেষকদের অনেকে শাহ মঞ্জুর আলীকে সৈয়দ শাহনূরের মুর্শিদ বলে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ শাহ চান্দ বা শেখ চান্দকে সৈয়দ শাহনূরের মুর্শিদ বলে উল্লেখ করেন। সৈয়দ শাহনূর তাঁর মুর্শিদের ব্যাপারে একটি গানে উল্লেখ করেছেন। সৈয়দ শাহনূর বলেন :

সৈয়দ শাহনূরের মুর্শিদ শাহ মঞ্জুর আলী
নূরের তো শেষ নাই, নূর নাম খালী।
পিরের পির ভজিয়া কহি শাহ চান্দের চরণ
মুর্শিদ শাহ মঞ্জুর আলী পির শাহ চান্দ
আমার গলে দেখিলাম প্রেম রসের ফান্দ ॥

ঘুগার পাহাড়ি পরিবেশে মুর্শিদের তত্ত্বাবধানে যুবক সৈয়দ শাহনূর নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় উজাড় করে দিয়ে ইবাদাত-বন্দেগি শুরু করলেন। আল্লাহর প্রেমে বিভোর সৈয়দ শাহনূর গান গাইলেন। গানে সৈয়দ শাহনূর বললেন :

বন্ধুরে প্রেমের পিয়াসি বন্ধুরে বন্ধুরে
তোর সনে পিরিতি করি
ঘরে মুই না রইতে পারি।।
দিবানিশি ঝুরিয়া মরি, তুই বন্ধের লাগিয়া
রাইতে দিনে চাইয়া থাকি পথ নিরিখিয়া ॥
বন্ধুরে সইতে না পারি দুখে সদা জ্বলে হিয়া
স্বপনে দেখিলু বন্ধু, না পাই জাগিয়া ॥
বন্ধুরে সৈয়দ শাহনূরে কয় উদাসিনী হইয়া
কি দোষে পরানের বন্ধু না চাও ফিরিয়া ॥

সৈয়দ শাহনূর মুর্শিদের আস্তানা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকেন। আল্লাহ প্রেমে মশগুল হয়ে তিনি গান গাইতে লাগলেন। আল্লাহভীরু লোকজন সৈয়দ শাহনূরকে খুব পছন্দ করেন এবং তাঁর ভক্ত হয়ে যান। কিন্তু সৈয়দ শাহনূর কোনো স্থানেই বেশিদিন থাকতেন না। ভারতের আসামের করিমগঞ্জ এবং বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় তিনি বসবাস করেছেন। যত্ন সহকারে লোকজন সৈয়দ শাহনূরের বসতবাড়িগুলো সংরক্ষণ করেন। এরকম ৫৪টি বাড়ির অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। সৈয়দ শাহনূর যেসকল এলাকায় বসবাস করেছিলেন তার মধ্যে সিলেটের জৈন্তাপুর অন্যতম। জীবনধারায় এক সময় তিনি জৈন্তাপুরে ছিলেন বলে তাঁর গানের মধ্যেই প্রমাণ পাওয়া যায়। সৈয়দ শাহনূর বলেন :

সৈয়দ শাহনূরে কইন, বইয়া জৈন্তাপুরে
সকল যাইন মুর্শিদ বাড়ি আমি অধম দূরে।

জৈন্তাপুরের পর তিনি সুনামগঞ্জ চলে যান বলে একাধিক লেখক উল্লেখ করেন। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সৈয়দ শাহনূর অবস্থান করেন। বর্তমান দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জামলাবাদ, দিরাইয়ের তাড়ল, ধল, কুলঞ্জ, তাহিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন এলাকা, বর্তমান সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলার ইশবপুরের নাম পাওয়া যায়। তবে তিনি বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার তৎকালীন ইটা পরগনার লামুয়া ও কদমহাটা, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর ও হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের জালালসাফে বিভিন্ন সময়ে বেশি দিন অবস্থান করেন। জীবনের শেষ সময়ে জালালসাফেই ছিলেন সৈয়দ শাহনূর

সৈয়দ শাহনূর তিনটি বিয়ে করেন বলে নিজের গানেই উল্লেখ করেছেন। বিয়ের ব্যাপারে সৈয়দ শাহনূর বলেন :

তিনবার নূর পাগলে শরিয়ত করিলু
দুনিয়ার উপরে কোন পুতরু না পাইলু
দুনিয়ার উপরে মুই পুতরু না পাইলু
সে কারণে পরার পুতের যতন করিল।

লেখক মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান তাঁর লেখা আধ্যাত্মিক সাধক ও মরমী কবি সৈয়দ শাহনূর (র) শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, অনুসন্ধানে এ পর্যন্ত দুই বিয়ের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি মৌলভীবাজারের লামুয়া ও নবীগঞ্জের সদরঘাটে বিয়ে করেন। তবে নেত্রকোনায় তিনি আরেকটি বিয়ে করেছিলেন বলে শোনা যায়। মৌলভীবাজারের লামুয়া গ্রামে বিয়ের বিষয়টি তিনি তাঁর গানেই উল্লেখ করেন। সৈয়দ শাহনূর বলেন :

তুই শামে কলংকিনি কইলে মোরে
কলংকিনি কইলে
ধ্বনি আল্লার কুদরত বাণী বুঝিতে না পারি
উড়াল পঙ্খি হইয়া আমি ফান্দে বাজে মরি।।
লাগিছে কাষ্ট পাট না লাগিছে মুড়া
বিনা রশি এ দিল বান্দ না ছুটে যার জুড়া ॥
আনা সুতে বিনা পাটে কে বলিল দড়ি
বিনা লোহায় বিনা কামারে পায় লাগিল বেড়ি ॥
মুরশিদ মুরশিদ ডাকি তুমি স্বর্গের চান্দ
শাহনূরের পায়ে লাগিল শরিয়তের ফান্দ
সৈয়দ শাহনূরে কইন শা মনজুর ঠাকুর
কয়েদ ছাড়াইয়া রাখ বালক তোমার নূর ॥

এ বিয়ের সন্তান ও স্ত্রীকে লামুয়ার শ্বশুরবাড়িতে রেখে তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের সদরঘাটের দেওয়ান মো. বসিরের প্রথমা কন্যা ছামিনা বানুকে বিয়ে করেন। ছামিনা বানু সব সময় সৈয়দ শাহনূরের সঙ্গেই থাকতেন। ছামিনা বানু ছিলেন সিলেটের অন্যতম মহিলা কবি। ছামিনা বানু লিখেন :

কহে বিবি ছামিনা বানু শাহনূরের তিরি
মুর্শিদের লাগিয়া আমি দিবানিশি ঝুরি।

সৈয়দ শাহনূর তিনবার বিয়ে করেন বলে নিজের গানে উল্লেখ করেন। গানে তিনি এ-ও উল্লেখ করেন যে, তিনি সন্তান লাভ করেননি। কিন্তু নবীগঞ্জের জালালসাফ ও জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরে মৌলভীবাজারের লামুয়া ও নিচিনপুরে তার বংশধর বসবাস করছেন বলে বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, সন্তান লাভের পূর্বে বিয়ে ও সন্তান লাভ না করার বিষয়ে গান রচনা করেন। তবে সৈয়দ শাহনূর মছু নামের এক বালককে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। একসময় পালকপুত্র মছু কোনো এক কারণে সৈয়দ শাহনূরের কাছ থেকে চলে গেলে তিনি খুব ব্যথা পান। কি পরিমাণ ব্যথা তিনি পেয়েছিলেন, তা তার গানে উল্লেখ করেছেন তিনি। তিনি গানে বলেন :

তালিম হইতা আদমি আইন মুই আদমের গেছে
কইয়া দিতু তালিম হও মছুর পাছে
মুরিদ তালিম করিয়া বালক চলিয়া গেল দূরে
দাগা করি ফকির হইছে দুজখের করিডর
সৈয়দ শাহনূরে কইন কইলে নিরাশ
মুরশিদের দাগা করি গেলে দুজখে মছুর বাস।

সৈয়দ শাহনূরের জীবনীকার লিখেছেন : সৈয়দ শাহনূরের পবিত্র জীবনধারার শেষাংশের অপরিহার্য চরিত্র হচ্ছে—মন্দোদরী। প্রৌঢ় বয়সে দক্ষিণাবলী গ্রামে অবস্থানকালে পাশের বাড়ির চণ্ডালিনী গৃহবধূ পীর সাহেবের আধ্যাত্মিক ক্রিয়াকর্ম অবলোকন করত তার প্রতি চরম শ্রদ্ধাশীল হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণের মানসে সংসার ত্যাগ করেন। এ মহিলার গৃহত্যাগ ও পীর সাহেবের আস্তানায় আসা-যাওয়াকে কেন্দ্র করে পীর সাহেবকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে।

অনেকে লিখেছেন, সৈয়দ শাহনূর মন্দোদরী নামক এক চণ্ডালিনীর প্রেমে বিভোর হয়ে চাড়াল পাড়ায় থাকতেন। সৈয়দ শাহনূর তাঁর গানের মধ্যেও চাড়াল পাড়ার প্রসঙ্গ এনেছেন। সৈয়দ শাহনূর বলেন :

আমার শাহনূর থাকইন চাড়ালপাড়া,
পরানবন্ধু আ কালা
আমার শাহনূর থাকইন চাড়ালপাড়া।

আবার আরেক গানে সৈয়দ শাহনুর বলেন :

কদমহাটা বিনেছিরি শানূরে না পাইলা বাড়ি
শাহনূর থাকইন চাড়াল পাড়ার মাঝে।

কেউ কেউ লিখেছেন, সৈয়দ শাহনূরের এক প্রেমিকার নাম মন্দোদরী।

আবার কারো কারো মতে, সৈয়দ শাহনূর মন্দোদরীকে বিয়ে করেছিলেন। তবে সৈয়দ শাহনূরের জীবনীকার মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান মন্দোদরীকে সৈয়দ শাহনূরের বিয়ের বিষয়টি অসত্য বলে উল্লেখ করেছেন। সৈয়দ শাহনূর মন্দোদরীকে নিয়ে একটি গান লিখেন। গানের ভাবার্থ পর্যালোচনা করলে মনে হয় যে, সৈয়দ শাহনূর মন্দোদরীকে মেয়ে হিসেবে ধরে নেন। সৈয়দ শাহনূর তাঁর গানে বলেন :

মন্দোদরী মাই গো
তোমার বিলাই কেনে বান্ধনা
তোমার বিলাইর যন্ত্রণা
আমি সইতে পারি না
ও সে ছিকা ভাঙি
খাইলো ননি গো
তোমার বিলাইরে দিমু জেলখানা
তোমার বিলাইর যন্ত্রণা
আমি সইতে পারি না।

প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক লিখেছেন, মন্দোদরী এবং চাড়ালপাড়া নিয়ে সৈয়দ শাহনূরের জীবনে যে কিংবদন্তি আছে তা আজও রহস্যময়। সৈয়দ শাহনূর ও মন্দোদরীর সম্পর্ক মরমি ঘরানার এক মৌলিক মহাআখ্যান হিসেবে সিলেটের ফকির সমাজে এক কিংবদন্তি।

সুফিসাধক হজরত সৈয়দ শাহনূর নূর নছিহত, রাগনূর, নূরের বাগান, মনিহারি ও সাত কন্যার বাখান নামের পাঁচটি অমর গ্রন্থ রচনা করেন। নাগরীলিপি নবজীবনের পুরোধা লেখক ও গবেষক মোস্তফা সেলিম তাঁর সিলেটি নাগরীলিপি সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে জানান, শাহনূরের সব কটি গান নাগরীলিপিতে রচিত। তাঁর বহুলপ্রচলিত এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হচ্ছে সিলেটি নাগরীলিপিতে রচিত নূর নছিহত। গ্রন্থে সৃষ্টিতত্ত্ব, নূরতত্ত্ব, রহস্যময় পই-প্রবাদ ছাড়াও বিপুলসংখ্যক মরমিসংগীত রয়েছে। বাঙ্গালার বৈষ্ণভাবাপন্ন মুসলমান কবির পদমঞ্জুষা গ্রন্থে তাঁর ২০টি গান ছাপা হয়েছে। এছাড়াও শ্রীহট্টের লোকসংগীত, সিলেট বিভাগের পাঁচশ মরমি কবি ইত্যাদি গ্রন্থে তাঁর গান সংকলিত হয়েছে। আব্দুল জব্বার কর্তৃক শাহানূর গীতিকা গ্রন্থে তাঁর ৪৮টি গান মুদ্রিত হয়েছে। লোকসংস্কৃতি গবেষক সুমনকুমার দাশের বাংলাদেশের বাউল-ফকির : পরিচিতি ও গান বইয়ে শাহনূরের ২৫টি গান সংকলিত হয়েছে। কিন্তু সৈয়দ শাহনূরের নূর নছিহত গ্রন্থটি অদ্যাবধি সিলেটি নাগরী কিংবা বাংলায় মুদ্রিত হয়নি।

সৈয়দ শাহনূরের নূর নছিহত রচনা শেষ হয় (১২২৬ বাংলা সনের ভাদ্র মাসে) ১৮১৯ সালে। এর এক বছর আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মগ্রহণ করেন। এর প্রায় পাঁচ বছর পর জন্মগ্রহণ করেন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এর প্রায় উনিশ বছর পর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। সৈয়দ শাহনূর মৃত্যুঞ্জয় ও রামরাম বসুর সমসাময়িক লোক। ১৭৩০ সালে তাঁর জন্ম যখন বাংলা গদ্য আঁতুড়ঘরে লালিতপালিত হয়ে একটু একটু করে বর্ধিত হচ্ছে।

নূর নছিহত-এর ভূমিকায় সৈয়দ শাহনূর বলেছেন :

নূর নছিহত পুঁথি শাহনূর বান্দে,
নেড়া লুড়িয়া নুরে এ পুঁথি কান্দে।
ধান দাইয়া যেই মতে কিরানে লইয়া যায়
নেড়ার মাঝে লুড়িয়া যেমন দুখিজন খায়।
সকল ফকিরে যবে পুঁথি রচিয় ছিলা
আনামত যত কথা লেখিয়া পালাইলা।
ধান দাইয়া ঘরে নিলা ভরা কিডা পাইয়া
পীর মুর্শিদের বন্দে মুই নেড়া লুড়িয়া আইল।
চান্দ মঞ্জুরের মেহেরবানিয়ে মুই পুঁথি রচিলু ॥

সৈয়দ শাহনূর নূর নছিহত রচনা করলেও গ্রন্থটি প্রকাশ-মুদ্রণ বা ছাপাতে অসম্মতি দেন। সৈয়দ শাহনূরের অসম্মতি থাকায় আজও নূর নছিহত একত্রে প্রকাশ হয়নি। সৈয়দ শাহনূর এ প্রসঙ্গে গানের মধ্যেই বলেন :

কেও যদি চায় এই পুঁথি লেখিবার।
ছারা লেখিয়া পুঁথি করহ সমার ॥
পয়ার থইয়া যেই, রাগ নিত চাইব।
নিশ্চয়ই জানিও তার রুহ ছিয়া হইব ॥
তবে যদি কেউ চায় ভাংগিয়া লিখিবার।
আউয়ালে আখেরে সে হৈব গুনাগার ॥

নূর নছিহত সম্পর্কে ভারতের ন্যাশনাল পাবলিশার্স, আসাম থেকে প্রকাশিত ড. আব্দুল মুসাব্বির ভূইয়ার জালালাবাদী নাগরী-এ ইউনিট স্ক্রিপ্ট এন্ড লিটারচার অব সিলেটী গ্রন্থের এক জায়গায় বলা হয়, এতে কবি দেহ ও মনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। এই সম্পর্ক জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার—ইহজগতের সাথে পারলৌকিক জগতের। সার্বিক বিবেচনায় গ্রন্থটি সাধারণের জন্য রচিত হয়নি। গ্রন্থটি তাদের জন্য যারা একান্তভাবে ঈশ্বরের জন্য নিবেদিত। ড. আব্দুল মুসাব্বির উক্ত গ্রন্থে আরও উল্লেখ করেন যে, আমাদের হাতে নূর নছিহত-এর সম্পূর্ণ ও খণ্ডিত মিলিয়ে প্রায় পনেরোটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে। নূর নছিহত মুদ্রিত না হওয়ার বিষয়ে তার সিলসিলার ফকিররা বলে থাকেন, এতে নিষেধ রয়েছে। নূর নছিহত গ্রন্থে শুধু তত্ত্বকথা, পই এবং মরমিসংগীত ছাড়াও কৃষি ও গার্হস্থ্য বিষয়ক দৈনন্দিন জীবনের অনেক নীতিকথা, শুভাশুভ, জাগতিক ও আধ্যাত্মিক দিক নির্দেশনাও আছে। গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিকের এক লেখায় এই তথ্য পাওয়া যায়।

নূর নছিহতকে অপ্রকাশিত সিলেটি নাগরী পুঁথি উল্লেখ করে বলা হয়, সৈয়দ শাহনূর মজুফ ফকির ছিলেন। নূর নছিহতকে ১. পরমাত্মার রূপ ও সন্ধান, ২. দেহ ও আত্মা এবং ৩. লোকশিক্ষা এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়। গবেষক চৌধুরী গোলাম আকবর উপরিউক্ত তথ্য উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন, নূর নছিহতে ২৭৩ পৃষ্ঠা রয়েছে। এতে ২৭টি পয়ার ও ২১৩টি গানের মাধ্যমে কবি তন মন জীবাত্মা পরমাত্মা নবী রসুল মুরীদ মুরশিদ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের তরজমা করেছেন।

সৈয়দ শাহনূর তাঁর সৃষ্টিকর্তার প্রেমে কত পাগল ছিলেন তা লেখায় অনুধাবন করা যায়। সৈয়দ শাহনূর লিখেন :

১. ঘরে ঘরে ফিরি আমি মাঙ্কুর ভিখারি;
ভিখারি হইলাম আমি যাহার লাগিয়া;

২. বন্ধুরে দিবানিশি ঝুরিয়া মরি তুই বন্ধুর লাগিয়া
রাইতে দিনে চাইয়া থাকি পন্থ নিরিখিয়া।

৩.  তনের মাঝে আছে আল্লাহ্ কে বুঝিব লীলা।
যাদের ঘোড়া ছওয়ার হইয়া আসে আর যায়।
আঙ্খির নিকটে থাকে কেহ নাই পায়

৪. যে বলে বন্ধুর কথা তার দিকে যাই
মস্তকে মস্ত মারি ভূমিতে লুটাই।

৫. লাহুল দরিয়ার মাঝে পরান বন্ধুর খেলা,
ধরিমু ধরিমু করি বেরথা জনম গেলা।
জলকেলি করিয়াছে আশিক আর মাশুক ॥

সৈয়দ শাহনূরের প্রতিটি কবিতাংশে আল্লাহর প্রেমের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। নানাভাবে আল্লাহর অস্তিত্বের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহকে মাশুক বানিয়ে সৈয়দ শাহনূর নিজে আশিক সেজেছেন। সৈয়দ শাহনূর আত্মার স্বরূপ- অবস্থান ও দেহের সাথে আত্মার সম্পর্কের বিষয়টিও গানের মাধ্যমে তুলে ধরেন। সৈয়দ শাহনূর বলেন :

১. তনের মাঝে সপ্ত দরিয়া বস্তা জঙ্গল আছে
তনের মাঝে মক্কা মদিনা চন্দ্ৰ সূৰ্য নাচে।

২. নাই তার সঙ্গী সাথি নাই তারপর
মন ডুবে নাই থাকে সদায় চরাচর।
নাই তার মুন্ডু আঙ্খি, নাই তার অঙ্গ
নাই তার রবি শশি নাই তার সঙ্গ।

৩. সরূপার নিকটে আছে নিরূপার বাস
সেই ফুল বিকশিলে ভুবন বিনাশ।
নিকুঞ্জে ফুটে ফুল ভ্রমরা হতাশ
মুরশিদের গুপ্তবাণী রাখিছে পরকাশ।

৪. সৈয়দ শাহনূরে বলে দুনিয়া মিছা মায়া,
বাজিকরের বাজি দিয়া বন্দি কৈল কায়া ॥

৫. উদাসিনী কৈলে মোরে পাগলিনি কৈলে
কও তোমার পিরিতে মোরে উদাসিনী কৈলে।

আল্লাহ আমাদের কত নিকটে-আমরাবা আল্লাহর কত নিকটে তাও সৈয়দ শাহনূর সহজভাবেই বলে গেছেন। সৈয়দ শাহনূর বলেন :

আঙ্খির নিকটে আছে আল্লাহ নিরঞ্জন,
সামনে মানিক থৈয়া কেনে ভাঙ্গ বন।
ডাইনে গদা বায়ে যমুনা মাঝে এক কয়বর
গঙ্গা না কইতা পারইন যমুনার খবর ॥

সুফিসাধক সৈয়দ শাহনূরের কেরামতি নিয়ে আজও লোকমুখে অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। দেশের প্রাচীনতম সাহিত্য পত্রিকা আল- ইসলাহর ৪৯শ বর্ষের ১৩৮৭ বাংলার ৩৫-৩৬ পৃষ্ঠায় এক কেরামতির ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ঘটনাটি ছিল এমন যে, এক সময় সৈয়দ শাহনূর লামুয়া থেকে বের হয়ে পশ্চিম দিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে যাত্রা করলেন। শুকনো মৌসুম হওয়ার সুবাদে রাস্তায় হাওরের মাঝে কয়েক গরুরাখালের সাথে তাঁর দেখা হয়। গরুরাখালরা সৈয়দ শাহনূরকে ঘেরাও করে এবং একটি মরা পাখিকে জীবিত করে দিতে বলে। পাখিকে এই রাখালরাই তিন দিন আগে মেরে রেখেছিল। সৈয়দ শাহনূর অনেক বলার পরও রাখালরা তাঁকে পাখিকে জীবিত না করলে যেতে দেবে না বলে পথরোধ করে। রাখালদের কাছ থেকে রক্ষা পেতে মরা পাখিকে হাতে নিয়ে সৈয়দ শাহনূর পাঠ করলেন :

দেখা দাও পরান বন্ধু দেখা দাও আমারে
বেপারি দেখিলে বন্ধু দুখ যাইব দূরে রে।
কিঞ্চিৎ নয়নে যদি বন্ধে দয়া ধরে
শাহনূর বাউলে কই, মরা জিততে পারে রে
যদি বন্ধের দয়া ধরে রে…

এই চরণগুলো পাঠের পর পাখিটি জীবন পেয়ে আকাশে উড়ে যায়। শুকনোতে নাও দৌড়ানোসহ সৈয়দ শাহনূরের অসংখ্য কেরামতির ঘটনা রয়েছে।

সৈয়দ শাহনূরের জীবনীকার লিখেছেন, এক সময় সৈয়দ শাহনূর জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরে এসে হাজির হন। তার পূর্বপুরুষ সৈয়দ রুকুন উদ্দিনের ছোটো ভাই সৈয়দ শামসুদ্দিন (রহ.)-এর মাজার সৈয়দপুরে অবস্থিত। হয়তো এমনও ছিল যে সৈয়দ শাহনূর তার পূর্বসূরির টানে সৈয়দপুরে ছুটে যান। ১৮৪২ সালে সৈয়দপুর আসার পর এখানে তিনি দীর্ঘদিন বসবাস করেন। দীর্ঘদিন বসবাসের পর সৈয়দ শাহনূর একসময় সৈয়দপুর থেকে চলে যেতে চাইলেন। পরে সৈয়দপুর থেকে তিনি নবীগঞ্জের জালালসাফে এক মুরিদের বাড়িতে এসে হাজির হন। মুরশিদকে কাছে পেয়ে মুরিদ খুবই খুশি হন। জালালসাফের উত্তরপূর্ব দিকের প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আমকোনা গ্রামে বসবাস শুরু করেছিলেন। এখানে থাকাকালে সৈয়দ শাহনূরের অনেক কেরামতি প্রকাশ পেলে এলাকার লোকজন মুগ্ধ হয়ে তাকে একটি বাড়ি দান করেন। লোকজন এই বাড়িকে সৈয়দ শাহনূরের বাড়ি বলে জানেন। এই জালালসাফেই ১৮৫৬ সালে ১২৬ বছর বয়সে তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। জালালসাফেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন সুফিসাধক হজরত সৈয়দ শাহনূর (রহ.)।

সৈয়দ শাহনূর অল্প বয়সে ঘর থেকে বেরিয়ে যান এবং তিনি কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাস করেননি। ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ, বৃহত্তর সিলেটের অসংখ্য এলাকায় ঘুরেছেন। বাড়িবিহীন-ঘরবিহীন জীবনের সম্পর্কে তিনি তাঁর গানেও উল্লেখ করেছেন। সৈয়দ শাহনূর বলেন :

সমুদ্রের ফেনা অইয়া ভাসি ভাসি ফিরি
ফকিরের সাথে দুস্তি করি দিবানিশি ঘুরি।

সৈয়দ শাহনূর আরও বলেছেন, এইভাবে :

ইষ্টি নাই কুটুম নাই নাই দেশ খেশ
লাহুতে বসত করি নানান দেশ দেশ ॥

প্রখ্যাত লোক গবেষক ও সাহিত্যিক সৈয়দ মোস্তফা কামাল লিখেছেন,

মরমিকবি সৈয়দ শাহনূর (রহ.) হলেন হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গীয় দরবেশ সৈয়দ রোকন উদ্দিন (রহ.)-এর বংশধর। মৌলভীবাজারের ঘরগাঁওয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাজার রয়েছে নবীগঞ্জ উপজেলার জালালসাফ গ্রামে। তিনি রাজনগরের কদমহাটা, নবীগঞ্জের দিনারপুর ও জালালসাফ গ্রামে বসবাস করেছেন, প্রতি বছর জালালসাফে ৬ ও ৭ মাঘ সৈয়দ শাহনূরের ওরস উদযাপন করা হয়। ওরসে বৃহত্তর সিলেটসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার ভক্ত এসে অংশগ্রহণ করেন। সৈয়দ শাহনূরের গান তাঁর মৃত্যুর ১৬৩ বছর পরও এখনও দেশ-বিদেশে বাউল-ফকিরসহ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *