সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত
Siddhiganjer Mokam
by Mihir Sengupta
published by Suprokash
প্রথম সুপ্রকাশ সংস্করণ সেপ্টেম্বর, ২০২০
.
আমার আত্মার আত্মীয়
অকালপ্রয়াত অশোক সেনগুপ্ত
এবং
শ্যামল রায়ের স্মৃতির উদ্দেশে
.
আগে পিছের কথা
১৯৬৩ সালে আর্থিক সমস্যার কারণে আমাকে নিতান্ত অনিচ্ছায় মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হয়েছিল। এর আট বছর পরে, বাংলাদেশের জন্মের ঠিক পরের বছর গিয়েছিলাম সেখানে। বিভিন্ন উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রধান ছিল ফেলে আসা দেশটির পুনর্দর্শন এবং এক বাল্যসখীকে বিয়ে করে ফিরে আসা। তখন সেই কাজটিতে ব্যস্ত ছিলাম। দেশ দর্শন হয়নিই প্রায় বলতে গেলে। তবে আবাল্য পরিচিত কিছু আত্মজনের সঙ্গে প্রায় আট বছর পরে সাক্ষাতের আনন্দ হয়েছিল। সেইসব মানুষেরাই নিম্নবর্গের জন বলে আধুনিক ইতিহাসে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু সেসব বিচার পণ্ডিতদের। আমার অনুভবের জগৎ আলোড়িত করেছিল তাদের জীবন-শৈলী। লেখায় তারই প্রকাশ।
এর চৌদ্দ বছর পরে ১৯৮৬ সালের শরতে কয়েকজন আত্মীয় কুটুম মিলে সেই মাটি এবং তার মানুষদের সান্নিধ্য উপভোগ করতে গিয়েছিলাম। আমার এই ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’ সেই অনবদ্য জীবনরস আস্বাদ করার বৃত্তান্ত। মানুষ জীবনে খুব কম বারই, এমন সৌভাগ্যের আনন্দ লাভ করে। সেই আনন্দরূপ তীর্থকল্প আমি এই বইখানির সাহায্যে আমার সহৃদয় পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেসব বৃত্তান্ত বইটি পাঠেই জানা যাবে। এখানে আমার একটু ভিন্ন কথা বলার আছে, সেই কথাই বলি। সে-কথা বইখানার জন্মবৃত্তান্ত সংক্রান্ত।
বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘নয়া উদ্যোগ’ নামক প্রকাশনার উদ্যোগে। এই প্রকাশনার ব্যাপারে প্রচুর জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত প্রচুর অর্থব্যয় হওয়া সত্ত্বেও একটি বিকলাঙ্গ বই কোনোরকমে প্রকাশের আলো দেখে। এ নিয়ে এতদিন বাদে বিশদ হতে গেলে সে সময়ের অনেক অন্তরঙ্গ সুহৃদের সঙ্গে এতদিন বাদে নতুন করে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা। সুতরাং সে প্রসঙ্গ থাক। তবে একটা কথা অবশ্য বলব যে বইটি বাজারস্থ করার কোনো উদ্যোগ প্রকাশকের তরফ থেকে নেওয়া হয়নি। এজন্য নিজের অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব কাণ্ডজ্ঞানের অভাব ছাড়া অন্য কিছুকে আমি দায়ী করতে পারি না। একটি হিন্দি প্রবচনে আছে যে, সংসারে বুরবকদের উপস্থিতি যতকাল থাকবে, হুঁশ-আক্কেলওয়ালাদের ততদিন করে খাওয়ার অসুবিধে হবে না।
সে যা-হোক, সাধারণ এবং অসাধারণ বেশ কিছু পাঠকের কাছে বইখানি ব্যাপক সমাদর পেয়েছিল। সাধারণদের মধ্যে ব্যাপক সমাদর পেয়েছি নিম্নবর্গীয় জেলে, ধীবর, কৈবর্ত সমাজের কাছ থেকে এবং অসাধারণদের মধ্যে ছিলেন তপন রায়চৌধুরী, যিনি বইটি নন্দন পত্রিকায় পর্যালোচনা করে আমাকে চিরঋণে আবদ্ধ করেছেন(এই বইয়ের পরিশিষ্টে আলোচনাটি মুদ্রিত হয়েছে)। এছাড়া নবনীতা দেবসেন, জ্যোতিভূষণ চাকী, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এবং অনুরূপ আরও অনেকে। তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত, শিবনারায়ণ রায় প্রমুখও ছিলেন। অবশ্য এঁরা সবাই যে লিখিতভাবে তাঁদের মুগ্ধতা জানিয়েছিলেন এমন নয়। এ নিয়ে নবনীতাদি একটা মজার কথা দেশ পত্রিকায় তারাপদ রায়ের একটা বই পর্যালোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে কথাটা জানাই। এক সন্ধ্যায় টেলিফোনে ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’ বইটি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আমার আনন্দর প্রকাশ দেখে বলেছিলেন– ‘তাই বলে আবার বোলো না, বইটার একটা রিভিউ করে দিন।’ আমি বলেছিলাম, ‘ওরকম হ্যাংলা আবদার আমি করি না।’ কথাটা শুনে বোধহয় তিনি নিজেই পরে লজ্জা পেয়ে থাকবেন। এরই বছর খানেক বাদে তারাপদদার বইটা পর্যালোচনা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, ‘তারাপদর বই পড়তে গেলে মনে হয়, ওর সঙ্গে যেন রাস্তায় হাঁটছি। যেমন মিহিরের ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’ পড়লে মনে হয় যেন, ওর হাত ধরে কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে হাঁটছি।’ এই একটা লাইনই। পড়ার পরই ফোনে বলেছিলাম, ‘বইটার আর কোনো পর্যালোচনার আমার দরকার নেই। এটাই যথেষ্ট।’
সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম পর্যালোচনার জন্য যাঁদের নাম বললাম, তাঁদের সবার লেখাই আমার কাছে সযত্নে রাখা আছে। তবে দুঃখের বিষয় শ্যামলদাকে, তিনি চাওয়া সত্ত্বেও এক কপি বই পৌঁছানোর সুযোগ আমার আর হয়ে ওঠেনি। অবশ্য তিনি নবনীতাদিকে দেওয়া কপিটি নিয়ে পড়েছিলেন। দিনটা মনে আছে। তপনদার সাময়িক একটা বাসায় সেদিন আমাদের দীর্ঘ সময় একটা আড্ডা বসেছিল। এই কাহিনী অনেক বিস্তৃত। এখানে তার প্রয়োজনও নেই।
নয়া উদ্যোগ কাণ্ডে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক হায়াৎ মামুদ আমার অনুরোধ ছাড়াই শুধুমাত্র স্নেহানুবর্তীতার কারণে প্রুফ এডিট করার কাজটা করে দিয়েছিলেন। সেটা আমার কাছে যে কতবড় সম্মান এবং গর্বের ব্যাপার হয়েছিল, তা বলে বোঝানো যাবে না। হায়াৎদা বিশ্বভারতীর রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ সত্যেন রায়কে প্রকাশকের মাধ্যমে এক কপি বই পাঠিয়েছিলেন। সত্যেন দা একখানা চমৎকার চিঠিতে বইটিকে অসাধারণ আখ্যা দিয়ে আমার ‘অহংকার’ বৃদ্ধি করেছিলেন এবং সেই সুবাদে একদিন বন্ধুবর অরুণ নাগ ও আমাকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িতও করেছিলেন।
ছাপার খরচ বাবদ তখনকার এক সদ্য আলাপিত বন্ধু জামাল ভাই দশ হাজার টাকার(সেই সময়ের দশ হাজার টাকা!) একটা চেক অযাচিতভাবে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও বইটি বিক্রির কোনো দায়িত্ব প্রকাশক গ্রহণ করেননি। ফলে, বইয়ের কপিগুলো কিছু পুশ-সেল এবং বেশিটা দাতব্য করে পাঠকদের পড়িয়েছিলাম। ২০০২ সালে নারায়ণগঞ্জ শ্রুতি একাডেমি, বাংলাদেশ তাঁদের বিচারে বিগত দশ বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে বইটিকে পুরস্কৃত করে এবং আমাকে একটা বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা জানায়। কিন্তু যেহেতু বইখানা একবার যেভাবেই হোক প্রকাশিত হয়েছে, তাই সেটি পৃথক বই হিসেবে আর প্রকাশ করা যাচ্ছিল না।
সে কারণে আমার আকাঙক্ষার ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’ পৃথক বই হিসেবে এতদিনেও আর বের হয়নি। নতুন সৃষ্টির বয়স আর নেই। সম্প্রতি সুপ্রকাশ-এর অনুরোধে একটি পৃথক বই হিসেবে কিঞ্চিৎ পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত আকারে প্রকাশের অনুমতি দিলাম। আশা করি ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’ একক বই হিসেবে সাধারণ পাঠকবর্গের সমাদর পাবে এবং সহজে ক্রয়সাধ্য হবে। সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট কৃতজ্ঞতা এবং প্রয়োজানুযায়ী ক্ষমা প্রার্থনা জানাই। অলমিতি
মিহির সেনগুপ্ত
রথযাত্রা ১০ আষাঢ়, ১৪২৭।
.
প্রাক্-বচন
সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম। সে মোকামের ঠিকানা একেকজনের একেক রকম। কেউ বা প্রযত্নে থাকে মঠ-মন্দির-মসজিদ-গির্জার, কেউ বা আবার গগনচুম্বি অট্টালিকার, সাতমহলা বাড়ির, ধন-ঐশ্বর্যের চোখধাঁধানো সমারোহের। আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকামখানা রয়েছে আমার হৃদয়েশ্বরী জলেশ্বরীর কোলের মধ্যে। সেখানে ভূপ্রকৃতির ইতিহাস নবীন কিন্তু মানুষ প্রাচীন। সে এখনও আধুনিকতার ধরতাই-এ হাঁটি হাঁটি পা পা। তার কথার লব্জে, চলার ছন্দে সামন্ত-পরম্পরার শ্লথ ভাবটি এখনও প্রবল। তথাপি হৃদয়বৃত্তের অলখ বলয়ের সাতরঙের হাতছানিতে সে আমাকে পৌঁছোয় যে স্থানে, সেই আমার মোকাম–আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম।
সেই মোকামের সওদাগর আমি। ফকিরসাব, মোকছেদ, কার্তিক এবং সর্বশেষ, হ্যাঁ–আমার শেকড়ের শেকড়, পিতৃকল্পপুরুষ ছোমেদ, আমার মহাজন। প্রত্যেক পরম্পরায়ই একজন বীজপুরুষ থাকে। তাকে ঘিরে থাকে তার পুষিপোনা-শিষ্যশাবকেরা। এখানে এই রচনায় উপস্থিত যে-সব মানুষ, তারা সবাই ফকিরসাব, মোকছেদ, কার্তিক এবং ছোমেদের শিষ্যশাবক, পুষিপোনা। এরা কেউই কথাকারের সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্র নয়। আমি এমত বলতে বা শপথ করতে পারব না যে, “এই উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরা সবাই কাল্পনিক চরিত্র, যদি কোনো বাস্তব ঘটনা বা চরিত্রের সঙ্গে এর কোনও মিল পাওয়া যায়, তা নিতান্ত আকস্মিক।” না, এ-রকম বলার কোনো উপায় আমার নেই। কেননা এরা সবাই বাস্তব চরিত্র, সবাই জীবিত, এমনকী এইসব নামেই। লেখাও হলো তাদের কথ্যপাঠ অনুসারেই।
১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল, এই ছ-বছরে একবার করে হলেও শারদীয় উৎসবের সময় আমার এই উজানযাত্রা ঘটেছে। এই সময়কালে যাদের আমি আমার মোকামের জন বলে জেনেছি–সবাই তারা এই রচনায় উপস্থিত। ১৯৬৩-র কোনো একটা সময়ে এইসব আত্মজনের আবেষ্টনী ছিঁড়ে আমাকে এসে পড়তে হয়েছিল নাগরিতার এই চক্রব্যূহে। তখন অবস্থা হয়েছিল চক্রব্যূহে শূন্যহাতে যুদ্ধরত সপ্তরথীবেষ্টিত অভিমন্যুর মতো। কিন্তু তার মতো ধরাশায়ী যে হইনি, তার প্রমাণ এই আলেখ্য–সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম। এই রচনার কোনো সাহিত্যিক তাৎপর্য আছে কিনা, তার বিচার মহাকালরূপী পাঠকের। তবে এই দলিলায়ন করা আমার পক্ষে নিতান্ত আবশ্যক ছিল, এবং তা ছিল আমার কোটির মনুষ্যজনের বাঁচার স্বার্থে। আমার কোটি বলতে এখানে আমি শুধু সমতট বঙ্গীয় নস্টালজিয়াক্লিষ্ট মানুষকেই বোঝাচ্ছি না, বোঝাচ্ছি বৃহৎ বঙ্গীয় তামাম সেইসব মানুষদের যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর তথাকথিত আধুনিকতার স্রোতের ধাক্কায় শিকড়-বাকড় হারিয়ে নাগরিক পঙ্কে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। আমাদের কোটির এই জনেরা ইতিহাসগত কারণেই এখনও লড়ে যাচ্ছে কবে তারা এই পঙ্ক থেকে মুক্তি পাবে এই আশায়। তাই সময়ের দলিল হিসেবে রেখে যাওয়া এই অক্ষর-শব্দ পদবন্ধসমূহ তাদেরই উৎসর্গ করি, যারা আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকামের অদ্যাপিও জাগ্রত মশালধারী। যারা ফকিরসাব, মোকছেদ, কার্তিক এবং ছোমেদের সঙ্গে এখনও উৎসবের রাত্রিতে উজাগর থাকে এবং দুঃখের রাত্রিতে অতন্দ্র থেকে যে-সব মহীয়সীরা রাত্রির কিনারায় এসেও স্নিগ্ধস্বরে আহ্বান করতে পারেন ওরে তোরা কয়জন আছ, রাইত শ্যাষ অইয়া গেছে, বইয়া পড়, মুই তোগো খাইতে দিতাছি।




পরিমল ভট্টাচার্যের সাতগাঁর হাওয়া তাঁতিরা ও অন্যান্য বই, অমর মিত্রের বই, ইন্দ্রাণীর সূর্যমুখীর এরোপ্লেনের মতো বই আপলোড করলে ভালো হয়।